Articles published in this site are copyright protected.

নাজমা মোস্তফা,  ১০ই ডিসেম্বর ২০১৫ সাল

উপরের এ দুটি মৃত্যু কোন অকস্মাৎ ঘটনা নয়। ছলবাজদের হাতে পর পর সাজানো নাটকের অংশ মাত্র, আজ পাঠকের সামনে তুলে ধরবো। জিয়া হত্যার পর পরই তড়িঘড়ি মঞ্জুরকে হত্যাকারী হিসাবে প্রচার করা হয়, এটি ছিল এরশাদীয় কৌশল। বহু যুগ পূর্ব অপকর্মে কপটদের ঢেকে রাখা পাট প্রকাশ করেন লরেন্স লিফশুলৎজ (এপ্রিল ২৩ ২০১৪, প্রথম আলো)। বীরউত্তম খেতাবপ্রাপ্ত মোঃ আবুল মঞ্জুর সেনানিবাসে সামরিক হেফাজতে রহস্যজনকভাবে নিহত হন ১৯৮১ সালের ১লা জুনে। সেনাবাহিনীর তিনি ২৪তম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেধাবী দক্ষ কর্মকর্তা হিসাবে সুপরিচিত ছিলেন। একই ধারাবাহিকতায় এর আগে ৩০শে মে অপর মেধাবী জিয়াউর রহমানকে ময়দান থেকে মুছে দেয়া হয়। শুরু থেকেই স্বৈরশাসক এরশাদ নানান অভিযোগের সুরে ছলের নাটক করতে থাকেন। সত্য সন্ধান করতে হলে পাঠককে সত্য সূত্র ধরেই সন্ধানী দৃষ্টিতে পথ মাপতে হবে। জিয়া হত্যার ১২ ঘন্টার পর একটি মিথ্যা গল্প আকাশে বাতাসে প্রচার করা হয় যে, লোভী মঞজুর এ কাজ করেছে। সংশ্লিষ্ট যারা মঞজুরের খুব কাছে ছিলেন, কোনভাবেই এ গোজামেলে গল্প বিশ^াস করতে পারছিলেন না। তারা দেখেছেন জিয়া হত্যায় উৎকন্ঠিত মঞজুরের হতাশ দশা। ঐ সময় ঘটনাক্রমে বিদেশী সাংবাদিক লরেন্স ছিলেন ভারতের বিহারে। তিনদিন পর কলকাতা হয়ে বেনোপোল সীমান্ত দিয়ে ঢাকায় ফেরেন, তিনি টের পান ঢাকায় প্রকৃত গরম খবর সেনাদের মাধ্যমে ছাড়াচ্ছে। সেনারা বাতাসে ছড়ানো গল্প বিশ^াস করছে না। মাত্র এক সপ্তাহ ঢাকায় থেকে যথেষ্ট সংবাদ জোগাড় করা হলে লরেন্স ঢাকা ত্যাগে বাধ্য হন কারণ পুলিশের বাধা।

সেনাসূত্র অনুযায়ী জিয়া হত্যার পর মঞজুর যে এর কিছুই জানতেন না, তার সাক্ষ্যদাতা হিসাবে অনেকেই ময়দানের সাক্ষি হয়ে ঐ উৎকন্ঠায় মঞজুরের সাথেও শরিক ছিলেন। এদিকে এরশাদের নেতৃত্বে ঐ সময় বাংলাদেশের ঢাকা রেডিও থেকে ক্রমাগত এটি প্রচার করা হয় যে মঞজুর “খুনি ও বিশ^াসঘাতক”। তবে মঞজুর ধারণা করেছিলেন যে, ঢাকা গ্যারিসনে অবস্থানরত তার শত্রুরা, বিশেষত এরশাদ ও সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার ডিজিএফআইয়ের মেজর জেনারেল মহব্বত জান চৌধুরী জিয়াউর রহমানের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে তাকে খতম করে দিবে, এ সন্দেহ তার মনে জাগে। এসব মানতে না পেরে এ সময় বিরোধী দলীয় উপনেতা মহিউদ্দিন আহমেদ পুলিশের স্ববিরোধী বক্তব্যে বিচারের আগে মঞজুরকে দোষী করার কি যুক্তি থাকতে পারে তা জানতে চান, সূত্র: (কনফিউশন ওভার এ কিলিং, লরেন্স লিফশুলৎজ, ফার ইস্টার্ন ইকোনমিক রিভিউ, ১০ জুলাই ১৯৮১)।  ১৯৯৫ সালে হত্যাকান্ডের ১৪ বছর পর মঞ্জুরের ভাই মনসুর আহমেদ নিজেদের জীবনের শংকাকে পাশ কাটিয়ে অবশেষে জেনারেল এরশাদ ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে বীর মুক্তিযাদ্ধা ও বীরউত্তম মঞজুর হত্যা সংঘটনের অভিযোগে মামলা করেন এবারই প্রথম। আবুল মনসুরের করা মামলার কেইস নাম্বার ছিল “পাঁচলাইশ পিও ২৩”, তারিখ ২৮-২-৯৫ আপ ৩০২ বিপিসি। ইতমধ্যে ধড়িবাজ স্বৈরশাসক এরশাদ এক দশক পার করেছে। ১৯৭১এ বাকী মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধের ময়দানে থাকলেও এরশাদ কিন্তু পাকিস্তানে ছিলেন।

শহীদ জিয়ার হত্যাকান্ডের মূলনায়ক কে তা এই ভিডিও দেখলেই স্পস্ট হয়ে যাবেন

 

অপরাধ সংগঠিত হবার এত পর হলেও ভাইএর মামলা কিন্তু হাটে নাই বরং তারো দুই দশক পর আজ মামলা সামান্য নড়ছে, শমভুক গতিতে। উল্লেখ্য ১০ ফেব্রুয়ারী সেশন জজ হোসনে আরা আকতারের এই মামলার রায় ঘোষণা করার কথা ছিল। তাকে আকষ্মিকভাবে সরিয়ে দেয়া হয় অজ্ঞাত ইশারায়, আসেন খন্দকার হাসান মাহমুদ ফিরোজ। এ ভৌতিক রদবদলই বলতে পারবে কোথা থেকে চক্রান্তের কলকাঠি নড়ছে। আসামী জানে কিভাবে তাকে কোন পথে হাটতে হবে সব সূতানাতা ঠিক করেই এরা জাতির মজ্জা চুষে খাচ্ছে। এ দেশ স্বাধীন হতে পারে নি, হয়েছে শুধু স্বৈরাচার বদল, ইয়াহইয়ার বদলে এরশাদ পাকিস্তান বদলে হয়েছে পাপিস্তান। ১৯ বছর ধরে চলছে এভাবে ঐ মামলার গোজামিল খেলা। এর সূত্র ধরে ২০১৩ সালের নভেম্বরে বিচারক হোসনে আরা আক্তার সরকারী কৌসুলি আসাদুজ্জামান খানকে প্রকাশ্যে সমালোচনা করেন। আর এক সরকারী কৌসুলি আবুল কাশেম খান ২ ফেব্রুয়ারী গণমাধ্যমকে বলেন ১৯৯৫ সালের পর থেকে ২২ বার বিচারক পরিবর্তিত হয়েছে। এসব জটিল মামলা সাধারণত একজনই ভালো সামাল দিতে সক্ষম কিন্তু যাতে এটি আগাতে না পারে, তাই এসব ব্যবস্থা এসেছে আসামীর স্বার্থে। জিয়া, মঞজুর, তাহের এরা বীরউত্তমধারী যেখানে এরশাদ অমুক্তিযোদ্ধা শূণ্য রসগোল্লা। মুক্তিযুদ্ধের সময়ও তিনি পাকিস্তানে সময় পার করেন বরং বাকীরা সে দেশ থেকে ফেরত এসে মুক্তিযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। এর মাঝে বিগত ৩৩ বছরে একজনও মঞজুর হত্যার আসামী মঞ্চে আবির্ভুত হননি। চট্টগ্রামের তৎকালীন জেলাপ্রকাশক জিয়াউদ্দিন চৌধুরী ১৯৮১ সালের উপর একটি বই লিখেন “দ্য অ্যাসাসিনেশন অব জিয়াউর রহমান অ্যান্ড ইটস আফটারম্যাথ” নামে এবং ঐ হত্যাকে তিনি “দ্বিতীয় খুন” আখ্যা দেন। লেখক এখানের দুই খুনের ব্যাপারে অনেক কিছুই জেনেছেন। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারেও ২০০৬ সালে মইন স্বীকার করেন এখনো তাকে কেউ এসব নিয়ে প্রশ্ন করে নি, যদিও তিনি বইএ এসব প্রকাশ করেছেন। সংগঠক তো জানে ঘটনার সব দাগ তার জানা, তাই প্রশ্ন করার দায় নেই। মইন তার বইতে এটি স্পষ্ট করেছেন যে, এরশাদ ও তার সহযোগিরাই মঞজুর হত্যার কারিগর। তিনি তার বেদনার কথাটি প্রকাশ করেন যে আজো তদন্তকারীরা কেউই তার কাছে কখনোই এ ব্যাপারে কিছু জানতে চায়নি। জিয়া হত্যার পর জিয়াউদ্দিন চৌধুরী তার বইএর একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেন যাতে দেখা যায় মঞজুর ৪৮ ঘন্টা পর্যন্ত একজনের সাথে ফোনালাপ করেছেন, লেখক তখন অনেক পর তার গবেষনার ফসল হিসাবে লরেন্স থেকে জানতে পারেন কে ছিলেন অপর পাশের ব্যাক্তিটি। সাংবাদিক লরেন্স পরে এটি জেনেছেন ব্যক্তিটি ছিলেন মেজর জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরী, যাকে মঞজুর বিশ^াস করতেন।

জেনারেল এরশাদ ও জেনারেল মহব্বত জান চৌধুরী অমুক্তিযোদ্ধা ও পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অংশ ছিলেন। সে স্বৈরশাসক মুক্তিযুদ্ধ না করে উল্টো প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদেরে হত্যা করে ক্রমে সেনাবাহিনীর পুরোটাই দখলে নেয়। মঞজুরের আলাপ যে মইনের সাথে হয়েছিল তা মইনই প্রকাশ করেন সাংবাদিক লরেন্সের কাছে। এসব প্রকাশিত হয় তার লিখিত বই “এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য: স্বাধীনতার প্রথম দশক” বইটিতে। বইটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ সন্দেহ নেই, পাঠকরা পেলে পড়তে ভুলবেন না, দেখবেন এরশাদের নোংরামি কতদূর গভীরে প্রথিত। সেদিন জিয়াউদ্দিন এসবে প্রকাশিত দাপ্তরিক এরশাদীয় তথ্যাবলীতে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। এরশাদ ও মইনের তর্কযুদ্ধও সে বইটিতে স্থান পেয়েছে। ঠিক তখনই মইন বুঝতে পেরেছিলেন এসব মঞজুরকে ময়দান থেকে সরানোরই চাল। সারা দেশ জুড়ে প্রচার চালানো হয় মঞজুরের বিরুদ্ধে ঘৃণ্য অপপ্রচার। এরা ক্ষমতালোভী অমুক্তিযোদ্ধা, এজন্য কথায় কথায় মুক্তিযোদ্ধার নামে লড়াই করতে উৎসাহী, এরা প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদেরে কখনোই সহ্য করতে পারে না। সাংবাদিক লরেন্সএর লেখাতে পাই মাত্র একটি গুলিতেই ঢাকা থেকে আসা ব্যাক্তি কর্তৃক মঞজুরকে ময়দান থেকে পরিষ্কার করা হয়(২৩ এপ্রিল ২০১৪)।

ফল্স ফ্ল্যাগ সম্বন্ধে আভাস পেলাম এখানে। এটি বিদেশে প্রচলিত একটি গোপন আধা সামরিক অপারেশন। এসব অপারেশন হয় যখন একের দায় চাপানো হয় অন্যের উপরে। এরকম ফল্স ফ্ল্যাগের যোগসাজসের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনাকারীকে আড়াল করে ফেলা হয়। জানা যায় ১৯৩৩ সালে রাইখস্টাগ অগ্নিকান্ড বা ১৯৬৪ সালে টনকিন উপসাগরের ঘটনায় মানুষ ও গণমাধ্যমকে ধোঁকা দেবার জন্য এই ফল্স ফ্ল্যাগ কৌশল হিসাবে ব্যবহার করা হয়। এরশাদ ও মহব্বত জান যা ঘটিয়েছেন তা যেন এরকমই কিছু, একটি ডাহা মিথ্যাচার ছাড়া আর কিছু নয়। তাই জীবিত মঞজুর এরশাদের পথের কাঁটা, মৃত্যু না হলে তার সমস্ত গোপন অভিসার প্রকাশ হয়ে পড়তো। তাই তড়িঘড়ি পথের কাঁটা সরিয়ে ফেলতে হয়। ক্ষমতায় বসে সামরিক বাহিনীর সব স্তর থেকে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সামরিক কর্মকর্তা ও সৈনিকদের অপসারণ করে অমুক্তিযোদ্ধা অদক্ষ সামরিক শাসনের খপ্পরে পড়ে দেশ। এরাই বর্তমান বাংলাদেশের প্রকৃত উদ্ধারকারী, ইতিহাস বিকৃতকারী। জেনারেল মইনুল হোসেনের বইএ এসব প্রকাশিত হয় যে, সেদিন ঘটনায় বেঁচে যাওয়া দুইজন গার্ড রেজিমেন্টের সদস্যকে সার্কিট হাউস থেকে তুলে নিয়ে হুশিয়ার করে মুখ বন্ধ রাখতে বলা হয়। যাতে কোনভাবেই যেন মঞজুরের কাছে ঘটনার মূল কোন খবর না পৌছায়। ঐ দিন অনেকটা ২০০৯এর বিডিআর বিদ্রোহের আদলে ছক সাজানো হয়। বর্ডারে ভারতীয় বাহিনী সেদিনও প্রস্তুত ছিল। জিয়া হত্যার দিনও ভারতীয় বাহিনী বর্ডারে প্রস্তুত ছিল, আমরা পরবর্তীতে তারও সূত্র পাব। এরশাদের ছড়ানো গুজব ছিল যে, মঞজুর বিক্ষুব্ধ জনতার হাতে খুন হন। কিন্তু এটি একাধিক সাক্ষ্যে প্রমান যে, মাত্র এক গুলিতে মঞজুরের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়, বিক্ষুব্ধ একঝাক গুলিতে নয়। দুটি গুলির দরকার পড়েনি। ডাক্তারী রিপোর্টও তাই বলছে।

সেদিন ঝড়ের রাতে জিয়া সার্কিট হাউসে ঘুমিয়ে ছিলেন। ভোর চারটার দিকে জুনিয়র অফিসাররা দু’ভাগে ভাগ হয়ে প্রথমে সার্কিট হাউসে রকেট লাঞ্চার নিক্ষেপ করে। পরে একটি গ্রুপ গুলি করে করে ঝড়ের বেগে সার্কিট হাউসে ঢুকে। জিয়া শব্দ শুনে বের হন। কয়জন অফিসার তাকে ঘিরে দাঁড়ান। ঐ সময় কর্ণেল মতিউর রহমান মাতাল অবস্থায় টলতে টলতে ‘জিয়া কোথায়, জিয়া কোথায়’ বলে সিড়ি বেয়ে উপরে উঠে গজ খানেক দূর থেকেই সামনে তার চায়নিজ স্টেনগানের পুরো এক ম্যাগাজিন মানে ২৮টি গুলি করে। অন্তত ২০টি বুলেট তার শরীর ঝাঝরা করে। তখন দু’ একজন চিৎকার দিয়ে উঠেন, তার সাথে সাথেই লাশ মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। ১৯৯১ সালে থাইল্যান্ডে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত থাকা অবস্থায় এ লেখক সাংবাদিক ঢাকায় এলে এসব ঘটনা আরো দুজনসহ প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকেও অবহিত করেন। কিন্তু অসীম ধৈর্যশীল এ সম্মানী মহিলাকে আমরা কোনদিনও এসব নিয়ে উচ্চবাচ্য করতে দেখি নাই, ধৈর্য্যই যেন তার সম্বল। অপর পক্ষের নেত্রীর কি আস্ফালন, কটুবাক্য উচ্চারণের দক্ষতায় যে কত গভীরে পৌছতে পারেন তা বলার দরকার নেই, জাতির জানা। প্রথম থেকেই জিয়াকে হত্যা করার পর, এক পরিকল্পনার ভেতর আর এক পরিকল্পনা করে রাখা হয়।

সে সময় জিয়া হত্যার পর দিনই সাংবাদিক লরেন্স মঞজুরের সাথে কথা বলে প্রায় নিশ্চিত ছিলেন যে, মঞজুর এতে জড়িত নন। জনতারা হয়তো এটি মনে করতে পারবেন, অত্যন্ত ধৈর্যশীল খালেদা একবার এরশাদের সম্পৃক্ততার কথা এক জনসভাতে প্রকাশ করেন। মঞজুর হত্যার বিচারের দীর্ঘসূত্রতা ও ১৯৮১ সালের মাত্র দু’সপ্তাহের ভয়ংকর বিচারের পরিণতিতে সেদিন ১৩ জন কর্মকর্তাকে ফাঁসি দেয়া হয়। যারা ছিল দেশের প্রকৃত মুক্তিযুদ্ধের লড়াকু যোদ্ধা, তাদেরে এভাবে ময়দান থেকে সরিয়ে দেয়া হয়। জিয়ার শাহাদতের মাত্র এক মাসের মধ্যে অভিনব ‘এক্সপ্রেস’ ফিল্ড কোর্ট মার্শাল সকল আত্মপক্ষ সমর্থণের সব সুযোগ বাতিল করে স্বৈরাচারী অপকর্মে শক্ত দাগ রাখে। সেদিন জোর করে তাদেরে দিয়ে বলানো হয় যে ওটি ছিল তাদের অভ্যুত্থান। সেদিন মিথ্যে স্বীকারোক্তি আদায় করার জন্য তাদের প্রহার করা হয়, আঙুল থেকে নখ উপড়ে ফেলা হয়, যৌনাঙ্গ পুড়িয়ে দেয়া হয়। জুলফিকার আলী মানিক তার সাহসী বইএ এসব ঘটনার বর্ণনা তুলে ধরেন। নির্যাতনের পরেও তারা সাহসিকতার সাথে নির্যাতনকারীদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অভিসম্পাদ করেন। উল্লেখ্য, যে কোন কারণেই হোক সরকারী কৌসুলীরা মইনের গ্রন্থের অনুকুলে সত্যানুসন্ধান করতে পারে নাই। বিকৃত ইতিহাস সৃষ্টিকারীরা যে কত ভয়ঙ্কর! এ তার উদাহরণ!

25 August 2015 শেখ মুজিব হত্যায় এরশাদ জড়িত

এক প্রত্যক্ষদশীর সাক্ষাৎ পান ঐ সাংবাদিক, তার পাওয়া সোর্স নিজে চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টে ঐ হত্যার একজন সাক্ষী বলে দাবী করেন। মেজর মঞজুরকে তিনি ব্যক্তিগতভাবে জানতেন, চিনতেন। বন্দী হিসাবে আনার পর তিনি তাকে চিনতে পারেন। ফটিকছড়ির একটি গ্রামে মঞজুর শান্তিপূর্ণভাবে পুলিশের হাতে ধরা দেন। পরে তাকে হাটহাজারী থানার সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। এক উর্ধতন সামরিক কর্মকর্তা আসেন ঢাকা থেকে বলেন, তিনি এসেছেন তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য। এ কর্মকর্তাও ঐ সোর্সের পরিচিত। সেখানের উপস্থিত সবাই তাকে চিনতেন। সোর্স তাকে মঞজুরের কক্ষে ঢুকতেও দেখেন। কিছু পরেই সোজা বের হয়ে ঐ ব্যক্তি ঢাকা চলে যান। অতপর লেখকের সে সোর্স মঞজুরের কক্ষে প্রবেশের সুযোগ পান এবং দেখেন যে, মঞজুর নিহত। তাকে হত্যা করা হয়েছে। হত্যাকারীর নামটি প্রকাশ না করলেও এটি ঐ বিদেশী সাংবাদিকের জানা। সরকারের জন্য এটি একটি চ্যালেঞ্জ হলেও উপস্থিত পরিস্থিতিতে সোর্সের বিপদ নিয়েও আশংখা থেকে যায়। উল্লেখ্য সেদিন মেজর মঞজুরকে কোন জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় নি। তার উদ্দেশ্যই ছিল তাকে খুন করা আর তিনি সেটি এক গুলিতেই সমাধা করেন। এ সাংবাদিক লরেন্স লিফশুলৎজ দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিনিধি ছিলেন। তিনি দ্য গার্ডিয়ান, লে মদঁ দিপ্লোমাতিক, দ্য নেশন (নিউইয়র্ক) ও বিবিসির পক্ষে কাজ করেছেন। একই সূত্রে গাথা এবার আরো কিছু পাওয়া সূত্রের উল্লেখ জরুরী মনে করেই আনছি।

“এই জিয়া সেই জিয়া নয়” একটি কলামের শিরোনাম। “যদি ভালভাবে প্রচার করতে পার, এই জিয়া স্বাধীনতার ঘোষক জিয়া নয়, তাহলে দেখবে একদিন মানুষ এটাই বিশ^াস করবে” শেখ হাসিনা হিটলারের তথ্য উপদেষ্টা গোয়েবলস এর থিওরী অনুসরণ করতে বলেন” (আমার ফাঁসি চাই, মুক্তিযোদ্ধা মতিউর রহমান রেন্টু, পৃষ্ঠা ৪১)। সময়টি লক্ষ্য করুন, “৮১ সালের ২৩/২৪ মে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের টিএসসির তিন তলার সেমিনার কক্ষে ৭১ ও ৭৫এর যোদ্ধাদের এবং সেনাবাহিনীর প্রাক্তন সদস্যদের গোপন ও জরুরী বৈঠক বসে। এই বৈঠকে কর্ণেল শওকত আলী মুক্তিযোদ্ধা রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউর রহমান বীর উত্তমকে হত্যার পরিকল্পনা এবং হত্যাকালীন ও হত্যা পরবর্তী সময়ে করণীয় সম্পর্কে অবহিত করেন। কর্ণেল শওকত আলী বলেন, জিয়াউর রহমান চট্টগ্রাম গেলে চট্টগ্রামের জিওসি মেজর জেনারেল মঞজুর বীর উত্তম এর নেতৃত্বে জিয়াকে হত্যা করা হবে এবং এই হত্যাকান্ডের ব্যাপারে সভানেত্রী শেখ হাসিনা অবহিত আছেন। সভানেত্রী আমাদেরকে এই হত্যাকান্ডে সহায়তা ও ভূমিকা রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। বলা হয় শেখ হাসিনা দেশের বাইরে (ভারতে) থাকতেই এ বিষয়ে অবহিত আছেন। কর্ণেল শওকত আলী জিয়া হত্যাকান্ডে ও হত্যা পরবর্তী সময়ে আমাদের করণীয় সম্পর্কে বলেন যে, হত্যাকান্ডের সময় আমাদের চট্টগ্রাম ও ঢাকায় থাকতে হবে। আমাদের যারা চট্টগ্রামে থাকবে তাদের দায়িত্ব হবে জেনারেল মঞজুরের কাছ থেকে অস্ত্র নিয়ে ঢাকায় চলে আসা এবং ঢাকায় যারা থাকবে তাদের দায়িত্ব হবে চট্টগ্রাম থেকে আসা অস্ত্র নিয়ে ঢাকায় রেডিও টেলিভিশনসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। যখনই জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামে যাবেন তখনই তাকে হত্যা করা হবে। কর্ণেল শওকত আরো বলেন, জিয়া হত্যা সংগঠন পর্যন্ত সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল এইচ এম এরশাদসহ অন্যান্য জেনারেলগণ এবং রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের গার্ড রেজিমেন্টের কর্নেল মাহফুজুর রহমান অভ্যুত্থানের নেতা জেনারেল মঞজুরের সাথে থাকবেন।

কিন্তু যেই মুহূর্তে হত্যা সংগঠিত হবে তখন থেকেই দ্বন্ধ শুরু হবে। — জনগণের ভোটে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আব্দুস সাত্তার হয়ে যান সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল এরশাদের নাচের পুতুল (ঐ, পৃষ্ঠা ৪৪)। শেখ হাসিনা সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল এইচ এম এরশাদকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের পূর্ণাঙ্গ আমন্ত্রণ জানাতে থাকেন। ৮২ সালের ২৪ তারিখে জেনারেল এরশাদ বিনা বাধায় বিনা বাক্যে জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আব্দুস সাত্তারকে ভবন থেকে গলা ধাক্কা দিয়ে বের করে দেন এবং পরের দিন আবার কলার ধরে নিয়ে এসে রেডিও টেলিভিশনে নিজের অযোগ্যতা ও তার সরকারের দুর্নীতি স্বজনপ্রীতি ইত্যাদি কারণে স্বেচ্ছায় সেনাবাহিনী প্রধান এরশাদের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর করে তিনি বিদায় নিলেন, তাকে এ মর্মে ভাষন দিতে বাধ্য করে। অশীতিপর বৃদ্ধ রাষ্ট্রপতি প্রাণভয়ে বিদায় নিলেন। এরশাদ দেশে সামরিক আইন জারি করে নিজেকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ঘোষনা করেন। শেখ হাসিনার গোপন আমন্ত্রণে এরশাদ সর্বময় ক্ষমতার মালিক হয়ে জগদ্দল পাথরের ন্যায় জনগণের বুকে চেপে বসলো”(ঐ, ৪৬ পৃষ্ঠা)।

“৩০শে মে ৮১ তে জিয়াউর রহমান নিহত হলে এনএসআইএর কর্মকর্তাগণ জিয়া বা বিএনপি সরকারের আমলে তৈরী করা সমস্ত নথিপত্র পুড়িয়ে ফেলতে চায়। ঠিক ঐ মুহূর্তে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সাত্তার অধিষ্ঠিত হন অর্থাৎ তিনি অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হলেও মূলত ক্ষমতা চলে যায় এরশাদের হাতে” (ঐ, ৪৭ পৃষ্ঠা)।  “শেখ হাসিনা ছাত্রদেরে বলেন, আমাদের চিরশত্রু জিয়াউর রহমান এবং তার দল বিএনপি। জিয়া তো শেষ। জেঃ এরশাদ বিএনপির কাছ থেকে মাত্র কিছু দিন হলো ক্ষমতা দখল করেছে। আমাদের এখন প্রধান কাজ বিএনপিকে চিরতরে শেষ করে দেয়া” (ঐ, ৫৩ পৃষ্ঠা)। “ব্রিগেডিয়ার মাহমুদুল হাসান জেনারেল এরশাদের পক্ষ থেকে ব্যক্তিগতভাবে শেখ হাসিনাকে নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করার অনুরোধ করেন এবং নির্বাচনী সকল ব্যয়ভার বহন করার প্রতিশ্রুতি দিলে শেখ হাসিনা আন্দোলনের অংশ হিসাবে নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করার পক্ষে মত দেন” (ঐ, ৫৪ পৃষ্ঠা)। “শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমাদের সময় নেই, তাড়াতাড়ি করতে হবে। খালেদা জিয়া এবং তার দল বিএনপিকে ল্যাং মেরে নির্বাচনে যেতে হবে” (ঐ, ৫৫ পৃষ্ঠা)।  ষড়যন্ত্রের পাওনা “নির্বাচনে যাওয়ার আগের নয় বস্তায় দশ কোটি টাকা ছিল। আর এখন তের বস্তায় পনর কোটি টাকা। —হাসিনা জনতার সমস্ত আশা আকাঙ্খা জলাজঞ্জি দিয়ে নীরবে নিঃশব্দে চুপিসারে স্বৈরাচারী জেনারেল এরশাদের পার্লামেন্টে যোগ দিলেন এবং এরশাদের পার্লামেন্টের বিরোধী দলীয় নেত্রী হলেন” (ঐ, ৫৭ পৃষ্ঠা)। “শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগ কর্মীদের বলে দেবে তারা যেন আন্দোলন আন্দোলন খেলা করে, কিন্তু আন্দোলন যেন না করে। অর্থাৎ আন্দোলনের সাথে থেকে আন্দোলনের পিঠে ছুরি মারতে হবে। ম্যাডামকে (খালেদা জিয়া) ব্যর্থ করে করে ঘরে বসিয়ে দিতে হবে, আর যাতে রাজনীতির নাম না নেয়” (ঐ, ৫৮ পৃষ্ঠা)। “জেনারেল এরশাদ ছাত্রনেতাদের ক্রয় করার জন্য শত কোটি টাকা খরচ করলো এবং জেলখানা থেকে দাগী অপরাধীদের ছাড়িয়ে এনে কোটি কোটি টাকা আর অস্ত্র দিয়ে আন্দোলন দমানোর ব্যবস্থা করলো। এই দাগী অপরাধীরাই ১৯৯০ সালের ২৭ শে নভেম্বর ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় লাইব্রেরীর পূর্ব দক্ষিণ কোনায় দূর থেকে গুলি করে ডাঃ মিলনকে হত্যা করলো” (ঐ, ৫৯ পৃষ্ঠা)। “১৯৯১ এর ২৭ শে ফেব্রুয়ারী শুধু বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে নয়, উপমহাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে এক নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত স্থাপন করে নর নারী নির্বিশেষে জনগণ হাসতে হাসতে নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করলো। খালেদা জিয়া ও তার দল নির্বাচনে বিজয়ী হলেন। —হাসিনা বলতেন, বেগম জিয়া সরকার গঠন করলে আমি এক মিনিটও খালেদা জিয়াকে সুস্থ থাকতে দেব না” (ঐ গ্রন্থ, ৬১ পৃষ্ঠা)।

এবার আর একটি বইএর সাহায্য নেব। লেখক আবু রুশদ এর লেখা “বাংলাদেশে ‘র’। “গভীর সংকটে জেগে উঠার সময়” লেখাটি বেশ ক’বছর আগের লেখা, ওতে এ বইএর সামান্য ছোঁয়া ছিল। “১৯৭১ সালের পর ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ও সেনা কর্মকর্তারা দক্ষিণ এশিয়াসহ অষ্ট্রেলিয়ার জলসীমা পর্যন্ত ভারতের একাধিপত্য কায়েমের মাস্টার প্ল্যান তৈরী করে। — বাংলাদেশ, ভুটান, নেপাল, শ্রীলংকা, মালদ্বীপ ও পাকিস্তানের অভ্যন্তরে বিভিন্ন সমস্যা সৃষ্টির কৌশল গ্রহণ করে। মাঠে নামিয়ে দেয় ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’কে। উপরোক্ত দেশগুলোর মধ্যে মালদ্বীপ ও ভুটানের কোন স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি নেই। এরা ভারতীয় বাজারের ক্রেতা। বাকী দেশগুলোর মধ্যে পাকিস্তান একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে” (ঐ গ্রন্থ,৫৩ পৃষ্ঠা)। “ইন্দিরা গান্ধীর এক প্রশ্নের জবাবে জিয়া কাওকে উল্লেখ করে মন্তব্য করেন যতটুকু না আমি জানি, তার থেকে এই ভদ্রলোক বেশি জানেন আমার দেশ কিভাবে চলছে। — জে. জিয়া পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে ভারতীয় বলয়ের বাইরে এসে চীন, পাকিস্তান ও মুসলিম দেশগুলার সাথে দৃঢ় সম্পর্ক গড়ে তুলেন। বিদেশী নীতির এই কৌশলের কারণেই বাংলাদেশে ভারতের সামরিক আগ্রাসন প্রস্তুতি নেবার পরও পিছিয়ে যেতে বাধ্য হয়। — মুজিব আমলে ভারতের সাথে ২৫ বছর মেয়াদী মৈত্রী চুক্তিতেও অধীনতামূলক বহু ধারা সংযোজিত ছিল। — জেনারেল জিয়ার জাতীয়তাবাদী দর্শন ভারতেকে সবচেয়ে বেশী বিচলিত করে তোলে, তাই ‘র’ জিয়া প্রশাসনকে বিশৃংখল করে তোলার পদক্ষেপ গ্রহণ করে” (ঐ, ৫৪, ৫৫ পৃষ্ঠা)। এর সূত্র ধরে গোটা দেশে শান্তিবাহিনী, বঙ্গভ’মি অন্দোলন, সশস্ত্রবাহিনীতে অভ্যুত্থান সংগঠনের চেষ্টা করাসহ হরতাল, ভাংচুর, সংখ্যালঘু ইস্যু সৃষ্টি এসবেই ভারতের শক্ত হাত কাজ করে। সাথে ভারতীয় দালালেরা এতে শক্ত ভূমিকা পালন করে। উপরোক্ত বিকৃত রুচির শাসকবর্গ কোনদিনও বাংলাদেশের রাজনীতি করেনি।

আজো মায়ার টানে এরশাদ ভারতে ছুটে যান। মায়ার টান থাকা ভাল তবে দালালীর টান বড়ই বিপদজ্জনক। “ভারতীয় ‘সানডে’ পত্রিকার ১৮তম সংখ্যায় প্রকাশিত দি সেকেন্ড ওল্ডেস্ট প্রফেশন” শীর্ষক এক প্রতিবেদনে প্রকাশিত “৭৫ সালের পর ইন্দিরা গান্ধীর অনুমোদন নিয়ে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে হত্যা করার চক্রান্ত বাস্তবায়নে অগ্রসর হয়। — ৮০ সালে ইন্দিরা গান্ধী নির্বাচনে বিজয়ী হবার পর বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট জিয়া নিহত হন। ‘র’এর তৎকালীন প্রধান কাশ্মীরী ব্রাহ্মণ আর এস কাও ও সহকারী প্রধান শঙ্কর নায়ার জিয়া হত্যার চক্রান্ত করেন” (ঐ গ্রন্থ, ৫৯ পৃষ্ঠা)। এ লক্ষ্যে আওয়ামী লীগকে যে কোন উপায়ে ক্ষমতায় বসানো ছিল ভারতের লক্ষ্য, হাসিনার নির্বাচনী ব্যয়ভার ভারতকে বহন করার খবর বারে বারে প্রকাশিত হয়েছে। ঢাকার নিউ নেশন পত্রিকায় ২৯ সেপ্টেম্বর ১৯৮৮ তারিখে এ খবর প্রকাশিত হয় যে, ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরার অনুমোদনক্রমে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে হত্যার রহস্যজনক ষড়যন্ত্র করা হয় এবং তাকে নিষ্ঠ’রভাবে হত্যা করা হয়। — হত্যা সংবাদ প্রথম আকাশবাণীতে প্রচারিত হয়” (ঐ, ৬৩ পৃষ্ঠা)। সেদিনের ঘটনায় জড়িত দুই পলাতক সেনা অফিসার আজো ভারতে বসবাস করছেন (শামছুর রহমান, বাংলাদেশ ভারত সম্পর্ক, সাপ্তাহিক বিচিত্রা, ২২ বর্ষ ৯ সংখ্যা, ২৩ জুলাই ৯৩/৮ শ্রাবণ, ১৪০০, পৃষ্ঠা ৩৭)। “জিয়াউর রহমান হত্যাকান্ডের খবর পেয়ে সিলেট থেকে ঢাকা ফেরার সময় শেখ হাসিনা ব্রাহ্মণবাড়ীয়ার সীমান্ত দিয়ে পাড়ি দেয়ার সময় সীমান্তরক্ষী কর্তৃক বাধাপ্রাপ্ত হন” (শওকত মাহমুদ, বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনার ১২ বছর, দৈনিক দিনকাল, ২০/৫/৯৩ সংখ্যা)। “হত্যাকান্ডের একদিন পূর্বে ভারত বাংলাদেশ সীমান্তে অতিরিক্ত সৈন্য মোতায়েন করে। ২ জুন ৮১ তারিখে আকাশবাণী পরিবেশিত সকাল ৭টা ৫৫ মিনিটের খবরে এটি প্রচারিত হয়। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ নয়াদিল্লীস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশনে জানতে চান যে, শেখ হাসিনাকে গ্রেফতার করা হয়েছে কি না। এর মাত্র ১৩ বা ১৭ দিন আগে ভারত থেকে শেখ হাসিনা ঢাকাতে ফেরত আসেন স্বয়ং জিয়াউর রহমানের সহযোগিতায়, এতদ সংক্রান্ত উপরের অনেক যুক্তি সিরাজুর রহমানের কলামেও পাওয়া যায়।

ভারত থেকে ভারতীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নে এতদসংক্রান্ত সকল দাগে উপরে বাংলাদেশী হাসিনা-এরশাদ জোটবাধা শাসকবগের্র যুক্তি খাপে খাপে মিলে। যারা প্রকৃতই ভারতীয় দালালিতে বাংলাদেশ বিরোধী কাজে সরাসরি জড়িত। এরা সুরঞ্জিতগংদের সাথে পাকিস্তান পাকিস্তান করে চিৎকার দেয় শুধু ভারতের দুর্গন্ধ ঢেকে রাখার জন্য। এরাই মিরজাফর, উঁমিচাদ, রায়দুর্লভের বংশধারা। দেখা যায় মঞজুরের জড়িত থাকার নাম কর্ণেল শওকত আলীরও জানা, ঘটনার ৬/৭ দিন আগে থেকেই ঐ নাম জড়িয়ে শওকত ও হাসিনা তার ছাত্রনেতাদের গাইড করার প্রমান পাওয়া যায়। আমার ফাঁসি চাই বইটির লেখক দাবী করেন ১৯৮১ সালের ১৭ই মে শেখ হাসিনা দেশে আসার পর থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত প্রায় ১৬ বছর লেখক শেখ হাসিনার অলিখিত কনসালটেন্ট ছিলেন। লেখকের স্ত্রী নাজমা আক্তারী ময়না ১৯৮৮ সাল থেকে ১৯৯৭সাল পর্যন্ত  ৯ বছর শেখ হাসিনার অবৈতনিক হাউজ সেক্রেটারী ছিলেন। প্রায় ৩০টি ছবি সম্বলিত অনেক তথ্যাবলীর ফটোকপিসহ বইটির ছত্রে ছত্রে অতীতের ঘটে যাওয়া বাংলাদেশের প্রতিটি দুর্ভোগের এক নীল নকশা, যা ঘটেছে হাসিনার নীল হাত দিয়ে। ছবি ছাড়া ১৪০ পৃষ্ঠার বই এটি। আফসোস লাগে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর দেশটির আত্মহত্মার এ পোর্টমোর্টেম রিপোর্ট দেখে আত্মা কেঁপে কেঁপে উঠে! এত অনাচার দেখেও অনেকের মত নীরব থাকার অপরাধে প্রথমে লেখক তার নিজের জন্য ফাঁসি দাবী করেন। তাই বইটির নাম হয়েছে, “আমার ফাঁসি চাই”। বইটি হাসিনা সরকারের প্রধানমন্ত্রীত্বের সময়ই ছাপানো হয়, লেখক এটি এ যুক্তি দেখান যে, তিনি যখন সত্য প্রকাশ করছেন, তখন ঐ সরকারের সামনেই এটি প্রকাশ করবেন, লুকোচুরি তার পছন্দ নয়। অতঃপর সরকার এটি কোনভাবে ব্যান্ড করে দেয়। ঠিক ঐ সময় নিয়তি আমাকে এক কপি দান করে। তাই বেদনার ভার কমাতে এখানে মাত্র কটি লাইন জুড়ে দিলাম। আমি মনে করি বইটির প্রতিটি ছত্রই যেন কথা বলছে, সত্য উন্মোচন করছে, যেন এক কিয়ামত দেখা। ভিডিওটি দেখতে পারেন।

জিয়া হত্যাকাণ্ডের পর আখাউড়া সীমান্ত দিয়ে শেখ হাসিনা বোরকা পড়ে পাল

 

এরা কেন মাওলানা ভাসানীকে, কর্ণেল ওসমানীকে, জিয়াউর রহমানকে, সাইফুর রহমানকে, তাজউদ্দিনগংসহ ডঃ ইউনুসকেও সইতে পারে না, এ তাদের সহজাত রোগ বালাই, ক্যান্সারিক আদলের ভাইরাস হয়ে জাতিকে পঙ্গু করে রেখেছে। এদের কারণেই মুসলিমদের কুরআন আজ জঙ্গি বইএর নামে পরিচিতি অর্জন করছে। যুদ্ধাপরাধের নামে নিরপরাধ প্রতিপক্ষকে ফাঁসানোর খেলায় দাগ রাখছে। এদের কারণেই মাহমুদুর রহমানের মত একজন দেশপ্রেমিক আজ বন্দিশিবিরে। ফখরুল ইসলাম, শওকত মাহমুদ, রিজভী, মান্না, সালাহ উদ্দিনরা বন্দিত্বের শিকার। প্রতিটি আদর্শধারী সৎ মানুষই এদের শত্রু, কারণ সততার সাথে পাল্লা দেবার যোগ্যতা এরা হারিয়েছে, এ যোগ্যতা তাদের নেই। এরা দেশবিরোধী দেশদ্রোহী দালালের দল। তাই সব সাধুরা, মুক্তিযোদ্ধারা তাদের কাছে অচ্ছুৎ। আসলে তারাই ধড়িবাজ, দানব, দালাল, প্রকৃত ইতিহাস তাদেরে আস্তাখুঁড়ে ছুড়ে দিবে, কালের কলঙ্কিত জায়গাই তাদের আবাস। উপরের আলোচনাতে এটি স্পষ্ট যে নেতৃস্থানীয় আওয়ামীরা, ছাত্রনেতারা, নেতারা এসব অপকর্মের খবর জানে। তারা ঐ নেত্রীর কথামতই আচরণ করে চলেছে। এ জন্যই এরা আদর্শের অনুকরণ অনুসরণ করতে শিখে নি। এরা আইয়ামে জাহেলিয়াতিতে আকন্ঠ ডুবে আছে। দুঃখ সেইসব সোনার ছেলেদের জন্য যারা একটি সঠিক মুক্তিযুদ্ধের এত মর্মর ধ্বনি শুনেও কিছু রপ্ত করতে পারলো না। ৭১ পরবর্তী প্রজন্মরা স্বাধীনতা রক্ষায় দেশবিরোধীর ভূমিকা রেখে গেলে, এর চেয়ে দুঃখ আর কি হতে পারে? এ সহজ অংক বোঝার মত বোধ ঐ সব তরুণদের কেন হলো না? তারা তাদের তারুণ্যকে দাসত্বের শিকলে বেধে দিতে কেন উৎসাহী হলো, একজন আত্মবিক্রিত লেন্দুপ দর্জির ব্যক্তি স্বার্থের চক্রান্তে পড়ে? এ কেনর জবাব কেন তারা খুঁজে না? বর্তমানের নেপালের কাছ থেকে আজকে বাংলাদেশীদের শিখবার আছে অনেক কিছু। তারাই মেরুদন্ড শক্ত রাখার যুদ্ধে অবদান রাখতে যা করতে পারছে, ওটি আওয়ামী দলদাসরা এর বিন্দু বিসর্গও করতে অপারগ। ভবিষ্যতে মানুষ ঐ দলটির নাম নিতে মিরজাফরের মতই শংকা ও লজ্জা বোধ করবে, সন্দেহ নেই!

 

সূত্র:

(১) লরেন্স লিফশুলৎজ (এপ্রিল ২৩ ২০১৪, প্রথম আলো)।

(২) কনফিউশন ওভার এ কিলিং, লরেন্স লিফশুলৎজ, ফার ইস্টার্ন ইকোনমিক রিভিউ, ১০ জুলাই ১৯৮১

(৩) মইনুল ইসলাম চৌধুরীর “এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য: স্বাধীনতার প্রথম দশক”।

(৪) জিয়াউদ্দিন চৌধুরী  “দ্য অ্যাসাসিনেশন অব জিয়াউর রহমান অ্যান্ড ইটস আফটারম্যাথ”, ১৯৮১ সাল।

(৫) আমার ফাঁসি চাই, মুক্তিযোদ্ধা মতিউর রহমান রেন্ট, প্রকাশকাল ১৯৯৯সাল।

(৬) গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক প্রধানদের কথা, বাংলাদেশে ‘র’, আগ্রাসী গুপ্তচরবৃত্তির স্বরুপ সন্ধান, আবু রুশদ, ২০০১।

(৭) “ভারতীয় ‘সানডে’ পত্রিকার ১৮তম সংখ্যায় প্রকাশিত দি সেকেন্ড ওল্ডেস্ট প্রফেশন”।

(৮) শামছুর রহমান, বাংলাদেশ ভারত সম্পর্ক, সাপ্তাহিক বিচিত্রা, ২২ বর্ষ ৯ সংখ্যা, ২৩ জুলাই ৯৩/৮ শ্রাবণ, ১৪০০, ৩৭পৃষ্ঠা।

(৯) শওকত মাহমুদ, বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনার ১২ বছর, দৈনিক দিনকাল, ২০/৫/৯৩ সংখ্যা)।

১০ই ডিসেম্বর ২০১৫ সাল

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

Tag Cloud

%d bloggers like this: