Articles published in this site are copyright protected.

নাজমা মোস্তফা

(পূর্ব প্রকাশের পর) (৩)

ইতিহাস বলে ভারতের বাহির থেকে আগত আর্যরা ককেসাস পর্বত পার হয়ে মেসোপটেমিয়া ও এশিয়া মাইন থেকে আর্যদের আগমন। কেউ কেউ মধ্য এশিয়ার বদলে পূর্ব ইউরোপকে আর্যদের আদিবাস কেন্দ্র বলেন (সূত্র: বিনয় ঘোষ, ভারতজনের ইতিহাস, পৃষ্ঠা ৭০)। সিন্ধু নদীর অববাহিকায় যে সভ্যতার বিকাশ ঘটে তাই সিন্ধু সভ্যতা। হিন্দু কোন ধর্মের নাম নয় বরং সভ্যতার নাম। ভারতের আদিবাসী দ্রাবিড়। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় দেখা গেছে ইসলাম ও মুসলিমদের বিষয়ে অতীতেও নানা বই পুস্তক প্রবন্ধ নাটক চলচিত্র সংবাদপত্র প্রচার মাধ্যম রেডিও টিভির মাধ্যমে ভুল ম্যাসেজ ছড়ানো হয়েছে। কৌশলে দেখানো হয়েছে ভারতীয় মুসলিমরা বিদেশী, এরা মিত্র নয় বরং শত্রু আর বাকী সবাই স্বদেশী। ভারতীয় মুসলিমদের রচিত ইতিহাস ও বাস্তবতাকে খোদ রবীন্দ্রনাথ বলেছেন বিদেশী মুসলমান রচিত এসব মিথ্যা ইতিহাস (সূত্র: লেখক আবু ফাতেমা মোহাম্মদ ইসহাক)। এই দেশী বিদেশী মারপ্যাচে ভারতের জনতাকে পথহারা করতে প্রচার মাধ্যম, ইতিহাস সংবাদ, সাহিত্য, লেমটন লেকচার, এসব মাধ্যমকে হাতিয়ার হিসাবে নেয়া হয়। সং¯ৃ‹তিবানরা বৃটিশ তোষণে কার্পণ্যতা দেখান নি। যারা ভারতের সম্পদ লুটে নিয়ে অন্যত্র নিজেদের দেশকে সমৃদ্ধ করে তারা বরণীয় পূজনীয় হয় আর যারা নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়ে ভারতের মাটিতে নিজের ও প্রজন্মের একমাত্র ঠিকানা গড়ে সত্য প্রতিষ্ঠায়; সকল প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে সত্য ও সুন্দরের জন্য আল্লাহর আদেশ মেনে লড়ে যায় তারাই বিদেশী, ভারতে মোদিরা আজো ভাবে তাই। তারা মুসলিমদের ধ্বংস চায়। বাকী সব আর্যদের (?) জন্য দরজা খোলা, শুধু মুসলিমদের জন্য তালা ঝোলা। সেই বৃটিশ নির্গমনের পর থেকে আজো ভারত মুসলিমদের সাথে একতরফা বিমাতাসুলভ আচরণে তারা দক্ষ। এরাই একমাত্র সংখ্যালঘু দল যাদের অবদানে অর্জনে ঋণে ভারত আকন্ঠ নিমজ্জিত। মানবিকতা মাপার স্কেল তাদের অনেক ক্ষেত্রেই বিলুপ্ত। অকৃতজ্ঞতা একটি নিকৃষ্ট আচরণ, বিধাতার দৃষ্টিতে এটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সাম্প্রতিক ও নিকট অতীতে ভারতের মুসলিমরা আজো পরাধীন, বলাটা ভুল নয়। 

মিথ্যা অপশক্তিকে চিহ্নিত করে যদি সত্য স্পষ্ট হয়, সেটি কি সত্যের অপরাধ? ন্যায়ের ঝান্ডা হাতে মিথ্যার বিনাশে এই মুসলিমরা নিজের জীবনের সাথে ভারতের জীবনকে একসূত্রে গেঁথেছেন বলেই তারা ৭০০ বছরেরও বেশী এ দেশ শাসন করে তারাই সত্য সৈনিক, পথের দিশারী, স্বাধীনতার স্বপক্ষ শক্তি, স্বদেশী। বাকীরা বেশ বড়মাপে শোষক, নির্যাতনকারী সত্যবিনাশি মিথ্যার প্রতিষ্ঠাকারী। মূল সত্য শক্তিকে হটিয়ে দিতে বাকীরা কি করেছেন ইতিহাস দিয়ে সেটি পরখ করেন। ইতিহাসবিদ আমীর আলী বলেন, “মুসলমানগণ ইংরেজী শিক্ষার প্রয়োজন উপলব্ধি করার আগেই সরকারী অফিসের দ্বার তাদের জন্য রুদ্ধ হয়। (এস, এ রশিদ, ন্যাশনাল মহামেডান এসোসিয়েশন, ১৭-১৯)। ১৮৬৯ সালে ‘দূরবীণ’ নামের কলকাতার একটি ফার্সি সংবাদপত্র লিখে, “ছোটবড় সকল সরকারী পদ মুসলিমদের থেকে কাড়িয়া নেয়া হয় এবং অন্য সম্প্রদায়কে বিশেষ করে হিন্দুদেরে দেয়া হয়।” এ পত্রিকা আরো প্রকাশ করে সুন্দরবনের কমিশনার তার অফিসে শুধু হিন্দু প্রার্থীর দরখাস্ত আহবান করেন (হান্টার, প্রাগুক্ত, ১৫৯-১৬৭)। হান্টারের মন্তব্য ছিল, চাকরি ক্ষেত্রে মুসলিমদেরে এমনভাবে বাদ দেয়া হয় যে, কলকাতার অফিসগুলোতে চাপরাশি, কলম মেরামতকারী, এসব ব্যতীত অন্য কোন কাজে মুসলিমরা নেই বললেই চলে (সূত্র: ঐ)। ১৮৭১ সালে কলকাতার একটি বড় অফিসে খোঁজ নিলে জানা যায় সেখানে মুসলিমদের ভাষা পড়তে পারে এমন একজন লোকও নেই (এম এ রশিদ ২০-২৩)। আমীর আলী বলেন, গত বিশ বছর যাবত মুসলিমরা আগ্রাণ চেষ্টা করেও চাকরীতে দ্বার রুদ্ধ করে রাখায় তারা ঢুকতে পারে না। যদি কেউ সৌভাগ্যক্রমে ঢুকে তবে তা রক্ষা করাই তার জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ তাকে তাড়াবার জন্য অফিসে ষড়যন্ত্র চলতে থাকে (এম এ রশিদ ২৫-২৬)। ভাবতে অবাক লাগে সে মাটিতে আম জনতার মাঝেও বিবেক সম্পন্ন হিন্দুর উপস্থিতি কম; কোন বিশেষ কারণে মানবিক হিন্দুর সংখ্যা সবদিন অল্প। এটি সবাই স্বীকার করবেন তাদের এ প্রকৃতি আঁচ করতে পারে চতুর বৃটিশরা। তাই তারা হয় বৃটিশের দেশবিধ্বংসী সহযোগী। দেশ মাতৃকার সাথে প্রতারণায় তারা বড় মাপে ধরা খায়।

এরকম অবস্থায় একবার মুসলিমরা চাকরীর দাবী জানালে রবীন্দ্রনাথের জবাব ছিল “প্রভুর খানার টেবিলের নীচে নিক্ষিপ্ত খাদ্য টুকরার জন্য যে কোলাহল উত্থিত হইয়াছে, ইহা সমর্থণ করায় শুধু যে নীচতা আছে তাহা নয়, উহা চারিত্রিক দৌর্বল্যেরও পরিচায়ক (কবির ভাষণ থেকে, ১৯৩৭ সালের ‘মাসিক মোহাম্মদ’ থেকে উদ্ধৃত)। পাঠক লক্ষ্য করেন রবীন্দ্রনাথ বৃটিশকে প্রভু মানলেও মুসলিমদেরে কুকুরের মত নীচ পশু প্রজাতির বলে অপমান করেছেন তার ভাষণে এবং সেই কুকুর স্বভাবের মানুষগুলোর চারিত্রিক দুর্বলতাও প্রশ্নবিদ্ধ পরিচয় বলে প্রকাশ করেছেন। একদিনের চেতন সম্পন্ন মুসলিম জাতির ক্রমাগত চেতনহীন অবস্থানের জন্য এসব স্পষ্ট করা দরকার, সময়ের দাবী। হিন্দুরা সমষ্টিগতভাবে বৃটিশের ঐ হিংসা পরায়নতাকে বগলদাবা করে নিয়েছে। কারণ বৃটিশরা এটি বুঝতে পেরেছে যে মেরুদন্ড বাঁকা হিন্দুরা তাদের সহযোগী, এদের হাত দিয়ে কোন বিপর্যয় ঘটবে না বরং এই স্বাধীনচেতা মুসলিমরাই তাদের জন্য অশনিসংকেত। উভয় সম্প্রদায়কে বিচ্ছিন্ন করতে ডিভাইড এন্ড রুলসহ বাকী সব অস্ত্র সচল রেখেছে। এসব কারণে হিন্দুরা আগাগোড়া বৃটিশের অনুগত থেকেছে, তারা নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে নির্যাতীত হয়েও পরাধীনতার শিকল গলে পরে দলিত হয়ে থেকেছে। মূলত বর্ণ হিন্দুরা কলে কৌশলে সাহিত্য রাজনীতি ও ক্ষমতায়নে কপটতার স্বাক্ষর রেখেছে। এদের কারণেই এদেশে বৃটিশ শাসন প্রায় ২০০ বছর বিলম্বিত হয়। এজন্যই হাজার হাজার মুসলিম সত্য সৈনিকরা ফাঁসিতে ঝুলে ইহ ও পরকাল দুই জাহানে বিরাট অর্জন জমা করে দেশপ্রেমের অসাধারণ অর্জন জমা করতে পেরেছেন।

প্রায়ই মানুষকে ইসলাম নিয়ে কটাক্ষ করতে শুনি, ইসলাম নাকি জীবনে কোন কিছুই করে নাই, তলোয়ারবাজি সন্ত্রাসী ছাড়া। ছলবাজরা স্বীকার না করলেও যুগের প্রকৃত মনীষারা সত্য প্রকাশ করে গেছেন। “আরবের ভিতর দিয়েই মানুষ জগতে তার আলো ও শক্তি সঞ্চয় করেছে, —– ল্যাটিন জাতি দিয়ে নয়” বলেছেন মিঃ জি সি ওয়েলস। এভাবে পৃথিবীর এক প্রাপ্ত থেকে অন্যপ্রান্ত সত্যের আলোতে বিকশিত হয়েছে। অপকর্ম করতে নয় নিজের নিরাপত্তার জন্য তলোয়ারের প্রয়োজন অস্বীকার করার নয়। তবে মোদির ভারতের মত নির্দোষের উপর তলোয়ারবাজি ইসলাম সমর্থণ করে না। অপকর্মে ঢেকে রাখা সত্য বিবেককে জাগ্রত করতে কিছু সত্য প্রকাশ করতেই হয়। একজন নির্দোষ মানুষ হত্যাকে কুরআনে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যেন গোটা মানব সম্প্রদায়ের হত্যার সমান অপরাধ (সুরা মায়েদার ৩২ আয়াত দ্রষ্টব্য)। শত মিথ্যার জবাব হিসাবে এ তথ্যবহুল গ্রন্থটি একটি অনবদ্য প্রমাণ। “1001Inventions – The enduring Legacy of Muslim Civilization by Salim T.S.Al-Hassani, Chief Editor (national Geographic)”। বিজ্ঞানের প্রায় প্রতিটি বিভাগই আলোকিত করেছে মুসলিমরা। এখানে ১০০১টি আবিষ্কারের কথা উল্লেখিত হয়েছে।

তন্ত্রমন্ত্র নয়, গবেষনা দিয়ে অতীত ইতিহাস বিচরণ করে প্রথম বাণীর অনুসরণে পড়েন লিখেন সন্ধান করেন, নিশ্চিত প্রকৃত সত্য ধরা পড়বে। রসায়ন, ওষুধ বিজ্ঞান, ভূগোল, কম্পাস, মানচিত্র, সমুদ্র বিদ্যা, যুদ্ধ কৌশল সর্বত্রই মুসলিমদের জয়জয়াকার। একটি কলামে এত কথা স্পষ্ট করা প্রায় অসম্ভব। তবুও আমার ক্ষুদ্র প্রচেষ্টাকে পাঠকেরা গবেষনার সামান্য উপাত্ত সূত্র মনে করতে পারেন। ২৭৫টি গবেষনা পুস্তক রচয়িতা একজন আল কিন্দি, ৮৬০ সনে মুসলিম বিজ্ঞানীরা একশত রকমের যন্ত্র তৈরীর নিয়ম ও ব্যবহার নিয়ে গ্রন্থ তৈরী করেছেন। ৬০ জন মুসলিম ভূগোলবিদ পৃথিবীর প্রথম মানচিত্র অংকন করেন। কম্পাস, কাঁচ, লবন, পারদ, গন্ধক, আর্সেনিক আবিষ্কারও তাদের কাজ। অনেকেই জানেন গণিত বিশারদ ওমর খৈয়াম, নাসিরুদ্দিন তুসি, আবু সিনাদের মত অসংখ্যরা বহু বহু অর্জনে ময়দান আলোকিত করে রেখেছেন। হাজ্জাজ ইবনে মাসার ও হুনায়ুন ইবনে ইসহাক মানমন্দিরের প্রথম আবিষ্কারক পৃথিবীর প্রথম মানমন্দিরও মুসলিমদের হাতে ৭২৮ খৃ:, দ্বিতীয়টি ৮৩০ খৃ: জন্দেশপুরে, তৃতীয়টি বাগদাদে চতুর্থটি দামেস্কে (চেপে রাখা ইতিহাস, গোলাম আহমাদ মর্তোজা, পৃষ্ঠা ২২)। দেখা যায় নবী গত হওয়ার ১০০ বছর পূর্তির আগেই এমন অসাধারণ অর্জন জমা শুরু হয়ে যায়। স্বভাবতই জানতে চাইবেন এটি কেন কিভাবে হয়? কুরআনের প্রথম শব্দ যেটি নাজেল হয় সেটি ছিল “পড় এবং কলমের সাথে”। তার মানে পড়া ও লেখাই ছিল আল্লাহর প্রথম নির্দেশ। তাই মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে শুরু হয় গ্রন্থ রচনা করা, গ্রন্থাগার গড়া, মসজিদই ছিল প্রথম শিক্ষাকেন্দ্র, সাথে ধর্ম গড়ে দেয় পরিবারিক শৃংখলা। অতপর শুরু হয় মাদ্রাসা, মহাবিদ্যালয়, বিশ^বিদ্যালয় স্থাপন। সেদিনের মুসলিম মেয়েরা এমন কি তৎকালীন দাসীরাও অনেক বিদুষী সম্মানিতা ছিলেন কারণ তারা কবর থেকে উদ্ধারপ্রাপ্তা মুক্ত স্বাধীন জনতার অংশ। অল্প কথায় বিজ্ঞানের বিকাশের শুরুটা মুসলিমদের হাতে, আর এ বিজয়ের মূল কারণ অলৌকিক গ্রন্থ কুরআন ও তার পথনির্দেশ মানা দক্ষ মুসলিমদের আত্মায় অন্তরে ঐ সত্যকে গ্রহণ বরণ ও পালন। স্বভাবতই প্রশ্ন আসবে আজ মুসলিমদের কি হলো, প্রশ্নটি জমা রাখুন আমরা আসবো সেখানে আমাদের ব্যর্থতা আমাদের খুঁজতেই হবে। আমরা খুঁজবো। মনের মাঝে শুধু একটি আশা পুতে রাখুন আমরাই হবো আ’লা যদি আমরা সত্যবিমুখ না হই।

“শার্লেমেন ও তার লর্ডরা যখন নাম দস্তখত করতে শিখছিলেন, তখন আরব পন্ডিতেরা আরাস্তুর (এরিস্টটল) এর গ্রন্থ অধ্যয়নে ব্যস্ত ছিলেন। কর্ডোভার বিজ্ঞানীরা সতেরোটি বিরাট লাইব্রেরী নিয়ে গবেষণা করতেন। তার একটি লাইব্রেরীর বইএর সংখ্যা ছিল ৪ লক্ষ। সে পন্ডিতেরা যখন পরম আরামদায়ক গোসলখানা ব্যবহার করতেন তখন অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে শরীর ধোয়াকে এক ভয়ংকর অনাচার বলে বিবেচনা করা হতো। “আরব জাতির কাহিনী আমাদের কাছ এত গুরুত্বপূর্ণ এর কারণ, এর মূলে আছে এমন এক মহান ধর্ম প্রবর্তকের সাধনার কথা যিনি নিরাকারের উপাসনায় পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ  তিনজন ধর্ম সাধকদের মাঝে তৃতীয় ও আধুনিকতম অবস্থানে এবং তাঁর ধর্ম ইহুদী ও খৃষ্টানের সাথে সম্পৃক্ত” (আরব জাতির ইতিকথা, পৃষ্ঠা ৪, ফিলিপ কে হিট্টি, অনুবাদে অধ্যক্ষ ইব্রাহিম খাঁ)।

মুসলমানদের প্রত্যক্ষ প্রভাবেই ইউরোপে সরকারী গোসলখানা প্রবর্তিত হয় (ঐ ২১৬ পৃ:)।  ইসলামের বিজয় কতকটা ছিল একটি ভাষার বিজয় – একটি গ্রন্থের ভাষার বিজয় । কবিতা প্রিয়তাই ছিল বেদুইনদের একমাত্র সাংস্কৃতিক সম্পদ। সেদিনে কবিরাই ছিলেন মরু সমাজের প্রেস এজেন্ট ও সাংবাদিক (ঐ, ২৩ পৃ:)। — কবিতা আরবের পাবলিক রেজিষ্টার (ঐ, ২৪ পৃ:)—ঐ আমলে আরবে কুরআনই প্রথম গদ্যগ্রন্থ ছিল এবং আজো আদর্শ গদ্যগ্রন্থের আসনে প্রতিষ্ঠিত রয়েছে (৪১ পৃ:)। নামাজের ময়দানই ইসলামের প্রথম ড্রিলের ময়দান (৪৫পৃ:)— কুরআনই আল্লাহর শেষ প্রত্যাদেশ, সমস্ত মোজেজার মধ্যে কুরআন শ্রেষ্ঠতম মোজেজা (৪৩ পৃ:)” (ঐ)। চিকিৎসা বিজ্ঞানের একজন আধুনিক ফরাসী ঐতিহাসিক বলেন, হুনাইন নবম শতাব্দীর শ্রেষ্ঠতম মানুষ ছিলেন। তিনি ছিলেন সুদক্ষ অনুবাদকও। শাসক আল মামুন তার অনুদিত গ্রন্থ ওজন করে তাকে সেই পরিমাণ সোনা দিতেন। দুটি বস্তু চিকিৎসক হুনাইনকে কাজে উৎসাহ দিত। প্রথমতঃ ধর্ম, তাই শত্রুরও উপকার করা উচিত বলে মানতেন। দ্বিতীয়তঃ বন্ধুর জন্য তো আরো বেশী করা কর্তব্য মনে করতেন (ঐ গ্রন্থ ১১০/১১১ পৃ:)। মিঃ গীবন বলেছেন, আরবরা বিধর্মীদের গ্রন্থাদি বিনষ্ট করা পছন্দ করতেন না। তাদের ধর্মীয় নীতি এটি সমর্থণ করে না। (দ্র: গ্রন্থাগারের ইতিহাস মধ্যযুগ, শামসুল হক, ৩২ পৃষ্ঠা)। সর্বাপেক্ষা বিশুদ্ধ বক্তার মুখ ও মস্তিষ্ক নিঃসৃত বাণী লিখে সংগ্রহ করেছিলেন আবু আমর ইবনুল আ’লা যা একটি ঘরের ছাদ পর্যন্ত ঠেকে গিয়েছিল (এনসাইক্লোপেডিয়া অব ইসলাম ভল্যুয়ম ১, পৃ: ১২৭)। 

প্রথম ইসলাম গ্রহণকারী যুবক বালক পরিণত বয়সে চতুর্থ খলিফা হযরত আলী (রা:) প্রশাসন, বিদ্রোহ দমনে খুবই ব্যস্ত সময় পার করেছেন। এরপরও তার আমলে কুফার জামে মসজিদ জ্ঞানকেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। দেশ বিদেশের ছাত্ররা জ্ঞানার্জনের জন্য ছুটে যেতেন। আলী স্বয়ং ছিলেন অধ্যক্ষ (সূত্র: মুজীবুর রহমানের লেখা ‘হযরত আলী পুস্তকের ৩৬০ পৃ:, ছাপা ১৯৬৮)। উমাইয়া আমলে রাজতন্ত্রের নামে অপশক্তি ঢুকলেও ইসলামের জ্ঞানলব্ধ কাজ থেমে থাকে নাই। এ আমলেই ব্যাকরণ, ইতিহাস, স্থাপত্য বিদ্যার কাজ এগিয়ে চলে। উমাইয়া আমল হচ্ছে উন্নতির যুগ ‘ডিমে তা দেয়ার যুগ’ (সূত্র: হিস্ট্রি অব দ্যা আরবস, ২৪০ পৃ:)। যদিও রাজতন্ত্রের এ পরিণতি পরবর্তিতে সুখকর হয়নি। নবীর গঠনতন্ত্র বিরোধী এ খাদ ইসলামকে সার্বিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

খলিফা মামুনের বিরাট গ্রন্থাগারের লাইব্রেরিয়ান ছিলেন মুহাম্মদ ইবনে মুসা আল খাওয়ারিজমী, প্রথম বিজগণিতের জন্মদাতা, শ্রেষ্ঠ গণিতজ্ঞ। পড়া লেখা ও পর্যটনে তিনি দক্ষতার সাথে কুরআনকে অনুসরণ করেছেন। কিতাবুল হিন্দ নামের গ্রন্থে তিনি শূণ্যের অপরিসীম মূল্য তোলে ধরেন, এই শূণ্যের জন্মদাতাও তিনি। খলিফার অনুরোধে তিনি আকাশের মানচিত্র আঁকেন, পঞ্জিকার জন্ম দেন। সরকার উপাধি দেয় ‘সাহিব আলজিজ’ নামে (সূত্র: সমরেন্দ্রনাথ সেনের লেখা বিজ্ঞানের ইতিহাস, ২য় খন্ড, পৃ: ১২৬, ১৩৬৪) ও (‘চেপে রাখা ইতিহাস’ গোলাম আহমাদ মর্তোজা)।

১৩২৭ সালে একজন দূর ভ্রমণকারী বাগদাদে আসেন আর তিনি দেখতে পান যে, শহরের পশ্চিম অংশের তেরটি বাড়ীর প্রতিটিতে দুই হতে তিনটি ব্যাপকভাবে সজ্জিত গোসলখানা আছে। এবং প্রত্যেক গোসলখানায় গরম ও ঠান্ডা পানির ব্যবস্থা আছে। (১১৭ পৃষ্ঠা, আরব জাতির ইতিকথা গ্রন্থ)। নবী বলতেন বিজ্ঞানের দুই শাখা ধর্ম শাস্ত্র ও চিকিৎসা শাস্ত্র। তারাই প্রথম ঔষধ বিক্রেতার দোকান স্থাপন করে। প্রথম ফার্মাকোপিয়ার মূল তারাই। খলীফা আল মামুনের আমলেই ফার্মেসীওয়ালাদের (ঔষধ মিশ্রণকারী) একটি পরীক্ষা পাস করতে হতো। চিকিৎসককেও পরীক্ষা দিতে হতো। একটি অনাচার ধরা পড়ায় ৯৩১ সালে একজন সুবিখ্যাত চিকিৎসককে খলিফা হুকুম দেন যে, উক্ত চিকিৎসক বাকী সমস্ত চিকিৎসককে পরীক্ষা করবেন এবং কেবল উপযুক্ত ব্যক্তিদেরই সনদ দেবেন। ঐ সময় বাগদাদে ৮৬০ জনের উপর চিকিৎসক এ পরীক্ষায় পাশ করেন। এভাবে রাজধানী হাতুড়ে ডাক্তারদের হাত থেকে বেঁচে যায়। চিকিৎসকরা রোজ জেলখানাও পরিদর্শন করতেন। জনতার স্বাস্থ্যরক্ষায় এমন ব্যবস্থা ঐ সময় জগতে আর কোথাও ছিল না। নবম শতাব্দীর শুরুতে হারুনুর রশিদ পারস্যের আদেশে মুসলিম জগতে প্রথম হাসপাতাল হয়। এর অল্প দিনের মাঝে মুসলিম দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ৩৪টি হাসপাতাল গড়ে উঠে। মুসলিম হাসপাতালে নারীদের জন্য আলাদা বিভাগ ও ডিসপেনসারী থাকতো। কোন কোন হাসপাতালে থাকতো ডাক্তারী বইএর লাইব্রেরী ও চিকিৎসা শিক্ষাদানের সুযোগ (ঐ গ্রন্থ ১৩২/১৩৩ পৃষ্ঠা)।

আল রাজী (৮৬৫-৯১৫ সালে) কেবল মুসলিম জগতে নয়, সমস্ত মধ্যযুগের একজন মৌলিক চিন্তাবিদ, ও শ্রেষ্ঠ চিকিৎসাবিদদের অন্যতম ছিলেন। কথিত আছে হাসপাতালের স্থান নির্ধারণ করতে তিনি বিভিন্ন স্থানে মাংসের টুকরো টাঙ্গিয়ে রাখতেন। যে টুকরোতে কম পচন ধরতো সেখানে তিনি চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপন করার নির্দেশ দিতেন। সার্জারিতে তাকেই সিটনের আবিস্কারকর্তা বলা হতো। আরব চিকিৎসা শাস্ত্রে আল রাজীর পরেই ইবনে সীনার ক্যানন গ্রন্থ বিশ^কোষসম সে যুগের চিকিৎসা শাস্ত্রের শীর্ষে অবস্থান করতো এবং ইউরোপে পাঠ্য পুস্তক হয়ে  ছিল। এভাবে ইসলামই ইউরোপকে আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গির দিকে নিয়ে যায় দ্বাদশ থেকে সপ্তদশ শতাব্দী পর্যন্ত। পাশ্চাত্য জগতের চিকিৎসা বিজ্ঞানে এ গ্রন্থই পথ প্রদর্শক হিসাবে ছিল। ডাক্তার উইলিয়াম ওসলারের ভাষায়, “এ গ্রন্থটি অন্য যে কোন গ্রন্থের চেয়ে দীর্ঘতর সময় মেডিক্যাল বাইবেল হিসাবে টিকে ছিল”(ঐ গ্রন্থ ১৩৩/১৩৪/১৩৫ পৃষ্ঠা)। 

(চলবে)

লেখার সময়: ৬ ডিসেম্বর ২০১৯।

 

বি দ্রষ্টব্য: লেখাটি নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত ‘দি রানার নিউজ’ সাপ্তাহিকে ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯ সংখ্যায় ছাপা হয়।

নাজমা মোস্তফা

(পূর্ব প্রকাশের পর) (২)

মুসলিমরা এত গভীর ঘুমে যে তারা বাবরি মসজিদের রায়ে কোন বিচারপতির নাম উল্লেখ নেই, এটি সব মুসলিম জানেও না, বললেও বিশ^াস করে না। কত বড় প্রতারণা তাদের সাথে, মানে তারা আত্মসচেতন কম থাকার কারণে তাদের সব ক্রেডিট বিরোধীরা চাপা দিয়ে রাখতে পেরেছে। উল্টো কেউ কেউ মোদির স্বপক্ষে সমর্থণ করছেন সায় রায় দিচ্ছেন। এতে নির্দোষ বাবর বিনাকারণে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছেন। বাবর যদি অপকর্ম করেন তবে ৫ একর কেন, এক একরও তাকে দেয়া যায় না। ৫ একর এর মানে এটি তার পাওনা, আদালতী বিবেকের জমা। রঞ্জন গগৈ শেষ মুহূর্তে সত্য কথাটি স্পষ্ট করে বলেছেন চাইলেও পক্ষে রায় দিতে পারেন নাই। তাকে চুপ করে থাকতে হয়, এটি তিনি স্বীকার করে বিদেয় হন। তার মানে তিনি মিথ্যে রায় দিয়েছেন, এটি তিনি স্পষ্ট বলতে না পারলেও ঘুরিয়ে স্বীকার করেছেন। শোনা গেছে আফসোসও করছেন কষ্টও পাচ্ছেন। মিথ্যে রায় দিয়ে অনুশোচনা আর আক্ষেপ করলেই কি সব পাপ মুছে যাবে। ভারতে সংখ্যালঘুদের ন্যায় বিচার না পাওয়া এই বিচারই কি আজ নতুন? ইতিহাস তার অনেক বেদনা তুলে রেখেছে। দালাইলামা বিশ^কে শিয়া সুন্নী আহমদীয়া লড়াই দিয়ে মাপতে চাচ্ছেন। কিন্তু গভীর ইতিহাস বলে এর পেছনের ষড়যন্ত্রীরা সবাই এক পক্ষ যারা ইসলামকে কুনঠাসা করতে চায়। ওদের জোটবদ্ধ পরোক্ষ ইন্ধনে এসব লড়াই জীবন্ত রসদ পাচ্ছে। বেওকুফ শিয়া সুন্নী মুসলিমদের সেটি বোঝা উচিত ছিল।

বঙ্কিমের রচনায় বিষাক্ত সাম্প্রদায়িকতা ছিল ময়দানে স্পষ্ট। রবীন্দ্রনাথের চাপা সাম্প্রদায়িকতা দিয়ে যে আঘাত করা হয়েছে সেটিও মুসলিমদের মনের কষ্ট বাড়িয়েছে। শরৎচন্দ্র তার সাহিত্যে অলক্ষ্যে মুসলিমদের প্রশংসা করেছেন, হিন্দুদেরে পথ দেখাতে এর প্রয়োজন ছিল। রবীন্দ্রনাথ প্রকাশ্যে সময় সুযোগে শেল বিদ্ধ করেছেন মুসলিমদের বুকে, হিন্দু লেখক সাহিত্যিকরা সংকীর্ণমনা, উদার নন এ সত্য অনেক হিন্দু সাহিত্যিকও অকপটে স্বীকার করেছেন। মুসলিমরা সব সময়ই উদারমনা, সাম্প্রদায়িকতা ও সংকীর্ণতা মুক্ত। কমেন্ট সেকশনে হিন্দুদের অনেক মন্তব্য পড়ে বুঝা যায় ইসলাম ধর্ম সম্বন্ধে তারা জানেই না, আর জানলেও যা জানে মিথ্যা জানে। তাদের দোষ কি, তারা জানবেই বা কিভাবে। বড়র পিরিতিতে সব ঢেকে রাখা, শুধু বিদ্বেষ দিয়ে ভরা দিগ থেকে দিগন্ত। এতে উভয় সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

মুসলিমরাও গবেষনা থেকে দূরে গিয়ে ধর্ম ও রাজনীতির আবর্জনার মাঝে হাবুডুবু খাচ্ছে আর সীমাহীন গঞ্জনা সহ্য করে যাচ্ছে। ইত্যবসরে আকাশে বাতাসে একটি ম্যাসেজ ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে যে ইসলাম তলোয়ার রক্ত ও সন্ত্রাস দিয়ে জেহাদের নাম নিয়ে হুমকির মাঝে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। মুশরিক ও মোনাফিকরা সত্যকে সহজভাবে গ্রহণ করবে না, সমাজে বিশৃংখলা সৃষ্টি করবে সেটি কিন্তু কুরআনে স্পষ্ট করে বলাই আছে। সম্বিৎহারা মুসলিমরা কুরআনকে তোতাপাখির মত আওড়ালেও এর মূল বাণীর ভেতর ঢুকেছে কম। নয়তো তারা এ গোটা বিশ^ প্রাথমিক যুগের মুসলিমদের মতই প্রাপ্তি ও প্রশান্তিতে দুনিয়া সয়লাব করে দিত মানবিকতা, উদারতা ও মহানুভবতা দিয়ে। ময়দানের এ মিথ্যাচারের জবাব দিতে কয়জন মুসলিম কলম ধরেছেন, ময়দানে নেমেছেন, সত্যকে স্পষ্ট করেছেন। যদি মুসলিমদের মাঝে কোন ভুল, মিথ্যা, পাপ, নষ্টামী থাকে সেটিও স্পষ্ট করার দায় মুসলিমদের। তারা বরং অকর্মণ্য জীবন যাপনের পর সীমাহীন প্রাপ্তির আশায় সময় পার করছেন। কিন্তু প্রচেষ্ঠা ব্যতীত প্রাপ্তি কি কখনো অর্জিত হয়? চেতনহীনরা কর্তব্য কর্ম রেখে গভীর ঘুমে কাল পার করছেন।

ইতিহাস প্রমাণ ভারতে যখন মুসলিমদের প্রতি হিন্দুদের বিদ্বিষ্ট করে ভয়ংকর করে তোলা হলো তখন জিন্নাদেরও টনক নড়লো তারা বুঝতে পারলেন আর কংগ্রেসের ঢোল পিটিয়ে লাভ নেই। বরং নিজেদের স্বতন্ত্র পথ নির্মাণ ব্যতীত আর কোন বিকল্প নেই। সুভাষ বসু হিন্দু হয়েও দেশ থেকে পলায়ন করতে বাধ্য হন। এটি তখনকার হঠাৎ নেতাদের ময়দান দখল করা নেতাদের কারসাজির বৃহত্তম অংশ। তার ঠাঁই হয় জার্মানীতে। এ কারণেই জওহরলাল নেহরু বন্দুকের গুলির সন্ধান করছিলেন সুভাষকে শায়েস্তা করতে মিথ্যাচারে তার মৃত্যু সংবাদও ছড়িয়ে দেয়া হয় বিমান দুর্ঘটনায় তার মৃত্যু হয়েছে। মিথ্যার উপর ভর করে দাঁড়ানো এসব অপরাধীর ক্ষমা পাওয়ার কথা নয়। ঐ মানুষটি গুমনামি বাবা হয়ে কিভাবে ছদ্মনামে ছদ্মবেশ ছিলেন। তার পাপ কি ছিল, তার পাপ ছিল তিনি দেশটির প্রকৃত স্বাধীনতা চেয়েছিলেন, যার জন্য এসব দেশে গোটা পাকভারত উপমহাদেশেই আজ অবদি প্রকৃত স্বাধীনতা আসে নাই। দেশ যদি স্বাধীন হয় তাহলে কেন কখনো সংখ্যালঘু নির্যাতন হয় কখনো সংখ্যাগুরু নির্যাতন হয়। এর জবাব কি? সুভাষ বসুর আজাদ হিন্দের বেশীরভাগ বড় নেতারাই মুসলিম ছিলেন। আজ ভারতের হিন্দুরা কথায় কথায় মুসলিম মেরে সাইজ করছে, জোর করে হরে কৃষ্ণ বলাচ্ছে ভারতে ও বাংলাদেশে, তার ধর্মের অনুমোদিত খাবারে বাধা দিচ্ছে। এভাবে তারা বাস্তবকে নীতিকে ইতিহাসকে অবজ্ঞা করছে, সত্যকে অস্বীকার করে মিথ্যা নিয়ে বাহাদুরী করছে। ন্যায় অন্যায় বোধ তাদের রহিত হয়েছে। সবাই একবাক্যে বলছে ভারতের আদালতে ইনসাফহীন বিচার হয়েছে।

সব অংকেই এটি স্পষ্ট ভারতের স্বাধীনতা যুদ্ধের মূল অবদান বড় সংখ্যায় সংখ্যালঘু মুসলিমরাই। কারণ তারা যে ঐশী শক্তি দ্বারা পরিচালিত হয় তারা সম্মানের মৃত্যুকে নিদ্বির্ধায় গ্রহণ করে। সংকীর্ণ হিন্দুত্ববাদ সবকিছুতেই সংকীর্ণ, মানীর মান দিতে অপারগ উল্টো চাপা দেয়ার খেলায় তারা জগৎসেরা। শুনতে ভালো না লাগলেও এটি স্পষ্ট করা সময়ের দাবী। সংখ্যায় মাত্র ৫% ব্রাক্ষ্মণ ১৫% কায়স্থ এই বর্ণ হিন্দুর যাতাকলে ভারত তাদের মনগড়া সাহিত্য, রাজনীতি ও কপট ষড়যন্ত্র দিয়ে প্রকৃত সত্যকে চাপা দিতে সক্ষম হয়েছে। রাজনীতির ইতিহাসে ধাপে ধাপে রজত, সুবর্ন ও হিরক জয়ন্তি পার হলেও তারা তাদের সংকীর্ণতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। এ লজ্জা ঢাকার কোন সুযোগ ভারতের নেই। আপাদমস্তক অপকর্মে আবৃত ভারতের সংকীর্ণতা তাদের মানসিক দেউলিয়াত্বকে স্পষ্ট করছে। একটি ইংরেজী বই “ The Rise of Islam and the Bengal Frontier (1204-1760)” by Richard M. Eaton” বইটি বাংলাতে অনুবাদ করেছেন হাসান শরীফ “ইসলামের অভ্যুদয় ও বাংলাদেশ” নামে। এটি তার উচ্চ শিক্ষার গবেষনার অংশ ছিল। ঐ গবেষনা পত্রে তিনি এটি ষ্পষ্ট করেন যে, এতদিন যা প্রচার করা হয়েছে ইসলামের নামে সবই ছিল চরম মিথ্যাচার। গোটা বিশ^ এই চৌদ্দশত বছর ধরে ঐ মিথ্যাচার নিয়ে ময়দান গরম করে রেখেছে। সপ্তম শতাব্দী থেকেই বিরুদ্ধবাদীরা ইসলামের পেছনে লেগেছে, এর সর্বনাশ করবে একে পৃথিবী থেকে নির্বংশ করবে। ঐ আরবের জাহেলিয়াতি থেকেই ঘরের শত্রু বিভীষণ হয়ে এরা বিচ্ছুরিত হয়েছে। ভিন ধর্মধারীরা ওদেরে লুফে নিয়েছে। গোটা বিশে^ ঐ থেকেই আজো ছলবাজি তলোয়ারী ইসলামের কার্টুন আঁকা হচ্ছে। প্রথম খলিফা আবু বকরের সোমত্ত্ব সম্ভ্রান্ত যোগ্যা সুশিক্ষিতা যোদ্ধা মেয়ে আয়েশার বিয়ে নিয়ে অতি দরদে মিথ্যা রসদে গোটা দুনিয়ার ছলবাজরা কেঁদে বুক ভাসিয়ে দিচ্ছে। যার মেয়ে তার খোঁজ নেই পাড়া পড়শির ঘুম নেই, এসব ধান্ধাবাজির নামে করা ষড়যন্ত্র খেলা।

এসব সুযোগ কাজে লাগিয়ে বাকী দুনিয়া খুশীতে তালিয়া বাজাচ্ছে। দালাইলামারা মহাপুরুষ সেজে মানবতার গড়া আদর্শটির দিকে কটু মন্তব্য ছুড়ার কাজ করবেন। ভাববার কথা এর পেছনের ঐশী শক্তি যদি মিথ্যা হতো তবে এরা নিজেরা সেই কবে ধ্বসে যেত। এরা এতই শক্তিধর যে গোটা দুনিয়া ধ্বসিয়ে দিতে একজোট হয়েছে কিন্তু তারপরও তারা টিকে আছে। তবে এটিও ঠিক তাদের টিকে থাকার মন্থর গতির কারণ দায়িত্বশীল মুসলিমদের পলায়নপর মনোবৃত্তি অনেকটা দায়ী। সব দায় কিছু অল্প শিক্ষিত মৌলভীদের হাতে ছেড়ে দিয়ে সক্ষম শিক্ষিতরা ধর্মনিরপেক্ষতার গ্যাড়াকলে পড়ে গেছেন। হিন্দুরা যেভাবে যুগে যুগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাদের নেতাদের সংকীর্ণতার জন্য। মুসলিমরাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ঐ ধারার নেতৃত্বের কারণে তাদের মাঝে সংশয় ও আস্থাহীনতা সৃষ্টি হয়। ঐ খেসারতে নাস্তিকতা আস্থাহীনতা প্রগতির পথে বেরিকেড হয়ে দাঁড়ায়। গবেষনার দুয়ারে ভাটা পড়েছে, অপশক্তি স্বরাজ পেয়েছে, সবচেয়ে আধুনিক ধর্মটি হয়েছে পশ্চাৎপদতার আর এক নাম। রিচার্ড এম ইটন তার লেখনীতে এটি স্পষ্ট করেছেন যে এই বাংলাতে সহজ সরল মানুষগুলো ইসলামের মহতী সৌন্দর্য্যে মুগ্ধ হয়ে দলে দলে ইসলামের ছায়াতলে এসে জড়ো হয়েছে। নিচু শ্রেনীর হিন্দু ও বৌদ্ধরা এখানে চরম নিগৃহীত হয়ে যখন সময় পার করছিল ঠিক এরকম সময় এমন এক আলোর বিচ্ছুরণ দেখে পূর্ব বাংলার পূর্ব পুরুষরা ঐ সত্যকে আলিঙ্গন করে আজ সংখ্যাগরিষ্ট মুসলিম তারা। ঐ আলোকরশ্মির মূলভিত্তি ছিল এক আল্লাহর অনুগত জাতপাতহীন সমাজ ব্যবস্থা, মানুষে মানুষে সমতার একাত্বতা, সামাজিক মানবিক ও আত্মিক সম্পর্ক গড়ে দেয়ার এক অচিন্তনীয় ব্যবস্থা, ভাতৃত্বের এমন বন্ধন তাদেরে এক সূত্রে বেধে দেয়। বাংলাদেশের মূল বাসিন্দারা বেশীরভাগই নিচু শ্রেণীর হিন্দু বৌদ্ধ থেকে ধর্মান্তরিত মুসলিম।

প্রতিটি মিথ্যাকে পরিষ্কার করতেই নবী মুহাম্মদ (সঃ)এর আগমণ সেখানে মাদুলী, মূর্তি, মাজার, তাবিজ কবজ, ধূপ বাতি এসব বাতিল ঘোষিত হয় কারণ এসবই ছিল মিথ্যা বন্দনার মাধ্যম, উপাদান মাত্র। ভুলভাবে পীর পুরোহিত তাবিজ কবজ মন্দির মাজার ধূপ বাতি এক কাতারে দাঁড়িয়ে কালে জায়গা খুঁজে নিয়েছে। এটি উদারতার চিহ্ন নয়, বরং অজ্ঞানতাকে জিইয়ে রাখার কসরত মাত্র। প্রতিবারই নবীরা চলে যাবার পর মানুষ পথ হারায়। শেষ নবী গত হবার পরও সেটি হয়েছে। এটি যে পদস্থলন সেটি জানতে হবে মানতে হবে। । সত্যকে নিয়ে গবেষনার বিকল্প নেই। যতই এর উপর কাজ করা যাবে ততই এ থেকে অমৃত বের হয়ে আসবে। সামনে নিয়ে যেতে অপারগ হলেও তাকে পেছনে টানার কোন অধিকার সহজে মানা যায় না। এতে জাতি সমাজ পথ হারায়, বার বার হুটচ খায়।

ইসলামের শিয়া সুন্নী বিভেদ, এটি ষড়যন্ত্রী সৃষ্ট এক বিষফোঁড়া। কিছু মোনাফিক শিশুইসলামকে ধ্বংস করার জন্যই এর শুরুটা হয়েছে। যারা এটি সাজিয়েছে তারা আজো বুকফুলিয়ে ইতিহাসের ময়দানে নিজেদের জায়গা করে রেখেছে। এদের চিনতে না পেরে বোকার মত মুসলিমরা আজো তাদেরে স্যালুট সালাম দেয়। এজন্য সত্য বিরোধী শক্তির ইন্ধনে আজো এটি মোটাতাজা আছে জীবন্ত থেকেছে, কারণ আমরা বেঘোরে ঘুমাচ্ছি। হয়তো অনেকের কাছে মোদি নির্দোষ উপযুক্ত, ভাঙ্গো বাবরী ভাঙ্গো। ভারতের ইন্ধনে নেচে বেড়ানো শক্তিও মুসলিম জাকির নায়েককে শত্রু ভাবে, মুসলিম নেতা আকবরুদ্দিন ওয়াইসি বাদ যাবেন কেন। নায়েক ইত্যবসরে আকাশচুম্বি অপরাধী কারণ তারা এমন এক ইস্যুর উপর দাঁড়িয়ে আছেন যাকে দেশ বিদেশ আন্তর্জাতিক সবাই রুখতে চায়। এর খেসারত হিসাবে ৯৫% মুসলিম বাংলাদেশে দাবার গুটিতে জাকির নায়েকের পিসটিভি বন্ধ থাকে। সত্যকে ময়দানে টিকে থাকা কত দুঃসাধ্য, এসব তার উত্তম উদাহরণ, ইতিহাসের নির্মম পরিহাস!

তাজমহল নিয়ে ষড়যন্ত্র বহুদিন থেকে গুণগুনানী শুনছি, এবার মোদির ভারত ভাঙ্গার যুদ্ধে বাড়তি চেতনা পাবে, সবকটির উদ্দেশ্য এক মুসলিমরা হয় কবরস্থানে যাবে নয়তো পাকিস্তানে। সেটি তারা সব সময় প্রকাশ করে। মোদির ভারত কোন ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র যেমন নয় তেমনি সমাজবাদি রাষ্ট্রও নয়। বরং কার্যত ভারত স্বাধীনতার শুরু থেকে আজো বর্ণহিন্দুদের চালে চালিত এক রাষ্ট্র। মোদি কোন বর্ণহিন্দু ব্রাক্ষ্মণ কিছুই নন। তারপরও তার দাপটের কারণে সংখ্যালঘু নির্যাতনে শুধু তার একাত্বতা পাওয়া গেছে, বর্ণহিন্দুর সাথে মিল ওখানেই। দক্ষিণ ভারতের মহীশূরের রাজা টিপু সুলতান সম্বন্ধে কর্নাটকে স্কুলের পাঠ্য ইতিহাসে এ যাবৎ যা উঠে এসেছে তা মুছে দেয়ার কথা ভাবছে বিজেপি সরকার। টিপুর জন্মজয়ন্তি আগেই বন্ধ করা হয়েছে। এবার বাকীটাও সরিয়ে ফেলার চেষ্টা চলেছে। মহীশূর বিশ^বিদ্যালয়ের ইতিহাসের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক সেবাস্টিয়ান যোসেফ বলেন, টিপু সুলতানকে ভারতীয় ইতিহাসের একজন খলনায়ক হিসাবে তুলে ধরার চেষ্টা করা হচ্ছে। মোদির ভারত টিপুকেও আজ গলাটিপে হত্যা করতে চাইছে। এদের অপরাধ এত উচ্চমার্গে পৌচেছে যে মনে হচ্ছে এরা অমনিতেই ধ্বসে পড়বে নিজের পাপেই এরা ইতিহাসে তলিয়ে যাবে। কথা না বলা একজন নিরব দর্শক সব পরখ করছে আর দুনিয়ার প্রতিটি জীব হিন্দু বৌদ্ধ খৃষ্টান জৈন শুদ্র চন্ডাল মুসলিম সবই তার সন্তান। তারা নির্যাতীত নিষ্পেষিত একটি ছোট পুরোহিত প্রজাতির ব্রাক্ষ্মণ গোষ্ঠীর কুপমন্ডুপ একদল জীবের কাছে জিম্মী সময় পার করছে।

বাবরী মসজিদ ভেঙ্গে এখন বাকী ইতিহাস মোচনের কাজও তারা লিস্ট হাতে করবে বলেই ধারণা দিয়েছে। এখানে আমেরিকাতে দেখা যায় বহু বহু গীর্জা মুসলিমরা খৃষ্টানদের থেকে কিনে নিয়ে কোন হিংসার স্বাক্ষর না রেখেই পরষ্পরের বোঝাপড়ার মাঝে কড়িতে কিনে নিয়ে তাকে না ভেঙ্গেই মসজিদে রুপান্তরিত করছে। অদেখা বিধাতার এবাদতখানা এবাদতখানাই থাকে। শুধু মালিকানা বদল হয় যুক্তির কথাটি হচ্ছে মানুষ গীর্জার প্রতি আগ্রহ হারিয়েছে, সঙ্গত কারণেই মুসলিমরা এটি কিনে নিচ্ছে। খৃষ্টানরা সে সত্য স্বীকার করে নির্দ্বিধায়, সারা বিশ^ জানে মানে মানুষ আজ আর মিথ্যাকে আলিঙ্গন করতে বিবেকের কাছেও প্রশ্নবিদ্ধ। ধর্মের বিবেকহীনতায়ও মানুষ কষ্ট পায়। বিবেকের কারণেই মানুষ ব্যতিক্রম, অসাধারণ ও মানবিক। নীতির কথাটি হচ্ছে “অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে তব ঘৃণা যেন তৃণ সম দহে” উভয়েই পাপ জমা করে। রবীন্দ্রনাথ হিন্দু জাগরণে এ সত্যটি  স্পষ্ট করেছেন যে মুসলিমরা যুদ্ধ করে মরে আর হিন্দুরা আত্মহত্যা করে মরে। সে হিসাবে একটি বিজয়ের মরণ আর অন্যটি পরাজয়ের মরণ। মুসলিমরা মরলে শহীদ বাঁচলে গাজি নীতিতে বিশ^াসী তারা সর্বাবস্থায় গর্ব জমা করে। ধর্মের নির্মল অর্জন তাদেরে এ অনুপম সৌন্দর্য ও সাহস দিয়েছে। এ কারণেই হাজার হাজার মুসলিমরা হাসতে হাসতে ফাঁসির কাষ্টে ঝুলেছে কিন্তু এদের জন্য একটি লাইনও বের হয়নি রবীন্দ্রনাথের মত বিখ্যাত কবির কলমের কালিতে। এর প্রধান কারণ ইসলাম মুসলিম কুরআন মুহাম্মদ তার সৃষ্টির মাঝে কোন ব্যতিক্রমী ভাবান্তর সৃষ্টি করতে পারে নি। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায় বাংলার সুফি ভাবধারাতে তিনি প্রভাবিত হয়েছিলেন। ধারণা করি প্রকটভাবে তা স্বীকার করার মত মন মানসিকতার অভাব সম্ভবত তার ছিল। শুধু রবীন্দ্রনাথ একাই নন। যারাই হিন্দুত্ববাদীতা লালন করেছেন তারা বেশীরভাগই উদারতার ছাপ রাখতে ব্যর্থ হয়েছেন। তাই প্রশ্নবিদ্ধ ভারত ও তার নৈতিক পতনের দায় তারা এড়াতে পারেন না। সম্প্রীতির সমতার মানবতার আদর্শের লালন না করে তারাই বরং যে বিদ্বেষের  রেশ সজ্ঞানে ভারতে পুতে গেছেন ঐ মর্মজ¦ালাতে ভারতবাসী আজও পুড়ছে ঐ মানসাংকে “আপনার মনে পুড়িয়া মরিছে গন্ধ বিধুর ধূপ।”

লেখার সময়। ২৭ নভেম্বর ২০১৯।

বি দ্রষ্টব্য: লেখাটি নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত ‘দি রানার নিউজ’ সাপ্তাহিকে ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯ তারিখে ছাপা হয়।

নাজমা মোস্তফা

মুসলিমদের ঘুমটি কম হয়নি বরং বেশী হয়ে গেছে। ১৪ শত বছর একদম কম সময় নয়। তারা অনেকটাই বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। একদল মসজিদে ছুটছে নামাজ পড়ছে বুঝে, অনেকে না বুঝে মাথা নোয়াচ্ছে কিন্তু শর্তের কথাটি হচ্ছে ধর্মটি বেওকুফের ধর্ম নয়। সে মাপে ফল জমছে না। একে বুঝে শুনে আত্মায় অন্তরে আত্মস্থ করতে হবে প্রতিটি সচেতনকে। ধর্মটি সত্য দিয়ে মোড়া, সহজ সরল ধর্ম, মোটেও জটিল নয়। তবে আজকে অনেক কিছুই মিথ্যা জটিল করে সাজানো হয়েছে। ১৯ অক্টোবরের একটি ইউটিউব পাই ৯২,৩৬৩ বৃটিশকালীন নিহত ভারতবাসী নিধনের লিস্ট হয়ে থাকা ইন্ডিয়া গেটের সংবাদটি। “ইন্ডিয়া গেটে ৬২,৯৪৫ জন মুসলমান শহীদের নাম পাবেন কিন্তু কোনো আরএসএস বিজেপি নেতার একটি নাম খুঁজে পাবেন না” শিরোনামের ইউটিউবটি কয় বার দেখি।  সেখানে ৬২,৯৪৫ মুসলিমরা শহীদ হয়েছেন আর বাদবাকীরা ভিন ধারার মানুষ। উইকিপিডিয়ার খবরে এটি প্রশ্নবিদ্ধ সংখ্যা। অধীর রঞ্জনের এ বক্তব্যে চারপাশ হাততালিতে মুখরিত খুব স্পষ্ট করে তিনি মুসলিমদের অবদানের কথা অকপটে বলে যান আর বিজেপির সংকীর্ণ হিন্দুত্ববাদের মুর্খতাকে স্পষ্ট করে দেখান। ম্যাসেজটি পেয়ে আমি অভিভূত হই। এমনিতেই আমার কাছে যথেষ্ট তথ্য ছিলই তারপরও সত্যকে গভীরভাবে জানতে আমি ঐ ভিডিওটির প্রতিটি কমেন্ট পড়ে দেখি। ১৯ অক্টোবর ২০১৯ এ আপলোড করা ভিডিওটিতে ৫৭০টি কমেন্ট পড়েছে। আমি সত্য সন্ধানে প্রতিটি কমেন্ট পড়লাম এমন কোন কমেন্ট পেলাম না যে এটি গোজামিল মিথ্যা বা প্রকৃত সংখ্যা নয়। বরং বেশীর ভাগ কমেন্ট মুসলিমদের  ধন্যবাদসূচক সমর্থন। কেন জানি হিন্দুদের কমেন্ট খুব কম। কারণ এমন স্পষ্ট সত্য কথার সামনে মনে হচ্ছিল তারা বোবা, নয়তো অন্যত্র এমন হলে তাদের গালাগালিতে কমেন্ট সেকশন ভরা থাকতো।

সত্য কথা অনেকের কাছে বড় তেতো লাগে। সেই তেতোটাই মাড়াবো আজ। ওঠো জাগো হাজার বছর ঘুমিয়ে থাকা মুসলিম, তোমাকে জাগতে বলবো! আর কত ঘুমাবে? আমি ঘাটছি ইতিহাসের ইতিহাস। বইএর নামটিও তাই, লেখক গোলাম আহমাদ মোর্তজা। পুরা প্যারাটা (ইতিহাসের ইতিহাস ৪২৪ পৃষ্ঠা থেকে নেয়া) ১৮,০০০ মুসলমান প্রত্যেকেই ইতিহাস খ্যাত মানুষ। তাদের থেকে ১৮ শতও দূরের কথা ১৮ জনও চলতি ইতিহাসে ঠাঁই পান নাই। যাকে একদিন সীমান্ত গান্ধী (খান আব্দুল গাফফার খান) নামে উপাধী দেয়া হয়েছিল তার কেন গান্ধীর পাশে একটুও স্থান হয় নাই। ১৮৭২ সালে মিঃ লর্ড মেয়োকে হত্যা করেছিলেন মুহাম্মদ শের আলী এবং তার ফাঁসি হয়েছিল। ১৮০৮ খৃষ্টাব্দে অত্যাচারী নীলকরদের বিরুদ্ধে যিনি প্রথমে বিদ্রোহে শহীদ হন তার নাম মুহাম্মদ রফিক মন্ডল। এদের নাম আজও মুছে যাওয়া উচিত নয়। (সূত্র: আজকাল পত্রিকায় প্রবন্ধ ভারতের মুক্তি সংগ্রাম ও মুসলিম সমাজ , শান্তিময় রায়, ১৯০৮ ডিসেম্বর)। ১৯০৬ সালে বরিশালের সংগ্রামে যিনি নেতৃত্ব দেন তার নাম হচ্ছে আব্দুল্লাহ রসুল। ইতিহাসে হিন্দুদের গুপ্ত সমিতির নাম থাকলেও মুসলিমদের প্রচুর গুপ্ত সমিতির নাম ইতিহাসে গুপ্তই আছে। “জাহানী ইসলাম” নামে একটি পত্রিকা জাহাজীরা বন্দরে বন্দরে বিলি করতেন তারা সবাই ছিলেন মুসলিম। ১৯১৫ সালের জানুয়ারী মাসে ১৩০ নাম্বার বেলুচি রেজিমেন্ট রেঙ্গুনে, ব্যাঙ্ককে সিঙ্গাপুরে বিদ্রোহের পতাকা উত্তোলন করে পরের মাসে ১৫ই ফেব্রুয়ারী ৫ নং নেটিভ লাইট পদাতিক সেনাবাহিনী সিঙ্গাপুরে বিদ্রোহ করে যার সবাই ছিলেন মুসলিম (শান্তিময় রায়, ঐ সূত্র)। ইংরেজরা এদের দুইজনকে ফাঁসি দিয়ে বাকীদের দীপান্তর দেয় (ইতিহাসের ইতিহাস ৪২৪ পৃষ্ঠা)।

ধনী হয়েও বিপ্লবীদের সাহায্য করে দারিদ্রতা গ্রহণ করেন যে ব্যক্তি, ঐ অপরাধে কাসেম ইসমাইল খানের ফাঁসি হয়। ১৯১৫ সালের মার্চে ইংরেজের বিরুদ্ধে বজ্র হামলা ও বিদ্রোহের অপরাধে মুহাম্মদ রইসুল্লা খানের ফাঁসি হয়। ঐ বছরেই  মুহাম্মদ ইমতিয়াজ আলী, রুকনউদ্দিন বীর দর্পে ফাঁসির মঞ্চে আরোহণ করে জীবন দান করেন। ইংরেজের কাছে প্রাণ ভিক্ষার আবেদন করলে মুক্তি মিলবে বলাতে তারা সেটি ঘৃণার সাথে প্রত্যাখ্যান করে হাসিমুখে বীর দর্পে মৃত্যু বরণ করেন। ১৯২৭ সালে বিপ্লবী বরকতুল্লাহ ভারতের বাইরে থাকা অবস্থায় স্বাধীন দেশের ইচ্ছা মনে পুষেই প্রাণত্যাগ করেন। বিখ্যাত বীর আমীর হাইদার গোটা বিশে^র বহু দেশ চষে বেরিয়েছেন, ঐ বীরকে বৃটিশ সরকার ধরতে পারে নাই। মৌলানা আজাদের বিপ্লবী সহকর্মী ছিলেন রেজা খাঁ। নেত্রকোনার মকসুদউদ্দিন আহমাদ, নাসিরুদ্দিন আহমাদ এবং তার কন্যা রাজিয়া খাতুন বিপ্লবী ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন। মৌলভী আব্দুল কাদের, কিশোরগঞ্জের আলী নেওয়াজ, মুহাম্মদ ইসমাইল, চাঁদ মিঞা ও আলতাফ আলীর নাম বিপ্লবী দলে থাকাতে তাদের জেল হয়।

১৯৩০ খৃষ্টাব্দের মে মাসে সোলারপুরের ফাঁসি মঞ্চে একইভাবে ইংরেজের প্রাণ ভিক্ষাকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে অনেকের সাথেই প্রধান দুজন ছিলেন কোরবান হোসেন ও আব্দুর রশীদ। উত্তর ভারতে বটুকেশ^র, চন্দ্রশেখর, ভগৎ সিং এদের মাঝে উল্লেখযোগ্য ছিলেন আসফাকুল্লার নাম। বীর রাম প্রসাদকেও বিপ্লবী অপরাধে ফাঁসি দেয়া হয়। উপরের তথ্যগুলো সংগৃহীত হয়েছে মৌলানা আবুল কালাম আজাদের লেখা (মহাফেজখানা), কালিচরণ ঘোষের  The Rule of Honour, পেশোয়ার ষড়যন্ত্র মামলা, বিপ্লবী জীবনের স্মৃতিকথা, ভুপেন্দ্র দত্তের সমকালের কথা, মুজাফফর আহমাদ প্রমুখের পুস্তক হতে। ইতিহাসে হঠাৎ নেতাদের নাম রইলো কিন্তু ইতিহাসের এসব মূল বিপ্লবী শিশুপুত্রদের নাম বাদ গেল কেন? এ প্রশ্ন লেখকের।

ফররুখ আবাদের নবাব ইকবাল মন্দ খাঁ, গজনফর হুসাইন খাঁও দেশের জন্য ফাঁসিতে প্রাণ দেন। সাখাওয়াৎ হোসাইন ও তাফাজ্জুল হুসাইনকে ক্ষুদিরামের মত ফাঁসি দেয়া হয়। মুনশি আব্দুল করিম, কাজী মিঞাজান, শেখ রহিম বখশ ও মাওলানা ইলাহী বখশকে আজীবনের জন্য নির্বাসন দন্ড দেয়া হয়। তাদের সহায় সম্পত্তি সব বাজেয়াপ্ত করে ইংরেজ সরকার। মাওলানা জাফর ও আলহাজ্জ মুহাম্মদ শফী সাহেবের ফাঁসির রায়ের পরও তাদের সতস্ফুর্ততা দেখে বিস্মিত ইংরেজরা ক্রোধে তাদের বীর হতে না দিয়ে নির্বাসন দিয়েছিল। এরা প্রত্যেকেই এত বড় মাপের মানুষ যে, এদের প্রত্যেকের জন্য স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচনা করা সম্ভব। পীর আলী যুদ্ধ করতে গিয়ে ৩১ জন সঙ্গি মুসলিম বীরকে নিয়ে বন্দী হন। ইংরেজরা একজন একজন করে প্রত্যেকের ফাঁসি কার্যকর করে।

এটি এমন সময় যখন কংগ্রেস দেশের তেমন কিছু নয় (সূত্র: অবিস্মরনীয় ২য় খন্ড, পৃষ্ঠা ২০, শ্রী গঙ্গানারায়ণ চন্দ্র)। ১৯৪১ সালের ১ মার্চ ভারত ত্যাগ করেন সুভাষ, দেশের নেতারা কেউ তার খোঁজ করেননি। ২৫ দিন পর সংবাদ পত্রে প্রকাশ হয় ‘সুভাষ চন্দ্র বসুকে পাওয়া যাচ্ছে না’। সুভাষ চন্দ্রের নামটি ইতিহাসে আছে, তবে লেখকের প্রশ্ন কেন জওহরলাল তাকে বলেছিলেন “সুভাষ এলে আমি রাইফেল হাতে তার বিরুদ্ধে দাঁড়াবো।” এই হঠাৎ নেতারা সুভাষকে সইতে পারছিলেন না এর প্রধান কারণ সুভাষ মুসলিমদের আন্দোলনের ফরমুলা গ্রহণ করেছিলেন। তার রাজনৈতিক গুরু ছিলেন মাওলানা উবায়দুল্লাহ সিন্ধী। তার আজাদ হিন্দ ফৌজের বড় নেতাদের বেশীর ভাগই মুসলিম। তাই ঐ স্ফুলিংগকে দেশ থেকে ঝেটিয়ে বিদেয় করা হয় বাকীদের নিরাপত্তার স্বার্থে। মাওলানা আজাদ ও মুসলিম বিপ্লবীর ১২৬ জনের এক দলকে একটি মালগাড়ীতে চড়িয়ে ৪৬০ মাইল পথ অতিক্রম করে নিয়ে যাওয়া হয়। ট্রেনের কুঠুরীতে ১৮ ফুট লম্বা, ৯ ফুট চওড়া ১৬২ বর্গফুট কামরা, দরজাতে তালা। পথেই ৫৬জন বন্দী পিপাসায় কাতর হয়ে শহীদ হন। বাকীরা নিজের ঘামে ভেজা কাপড় নিংড়ে পানি পান করার চেষ্টা করেন। পানি পানি চিৎকারের জবাব ছিল বিদ্রুপ আর নিষ্ঠুর হাসি। এসব ঘটনা হঠাৎ নেতাদের পরখ করা। ঐ সময় মুসলিমদের অবদানে চিত্তরঞ্জন অবাক হন। গান্ধীজীর অসহযোগ আন্দোলনের কথা কমবেশী সবাই জানে। কিন্তু যিনি এর গোড়ায় ছিলেন তার কথা কয়জন জানে? তিনি হচ্ছেন হযরত হুসাইন আহমাদ, ঐ আন্দোলনের উপর তার বিখ্যাত পুস্তকের নাম ‘রেসালাতে তরকে মুআলাত’। সারা ভারতে এ পুস্তকের জনপ্রিয়তায় ইংরেজ ভীত হয়ে বইটি বাজেয়াপ্ত করে। (সূত্র: হায়াতে মদনী, পৃষ্ঠা ১২৮, মাওলানা মুহীউদ্দীন খান ও মাওলানা মু: সফিউল্লাহ)।   

প্রসিদ্ধ ইংরেজদের রিপোর্ট মত ২৭/২৮ হাজার মুসলমানকে বিনা বিচারে ফাঁসি দেয়া হয়েছিল এবং সাত শত বিশিষ্ট আলেমকেও ফাঁসির কাষ্টে ঝুলতে হয়েছে (সূত্র: হায়াতে মাদানী, পৃষ্ঠা ৪১-৪২)। আসল হিসাবে ইংরেজদের রিপোর্ট থেকেও বহু বহু বেশী মুসলিমকে হত্যা করা হয়। বহু মুসলিমকে শুকরের চামড়ায় মাথা মুখ ঢেকে জলন্ত উনুন বা চুলাতে ফুটন্ত তেলের উপর ছাড়া হয়েছিল (এ বর্ণনা মিঃ এডওয়ার্ড টমসনের, দ্রষ্টব্য ঐ গ্রন্থ) (ইতিহাসের ইতিহাস, গোলাম আহমাদ মোর্তজা ৪১৭ পৃষ্ঠা)। ঐ সময় জিন্নাহ বললেন তিনি ইংরেজের বিরুদ্ধেই লড়বেন, ভারতের বিরুদ্ধে নয়। তখন হিন্দু মহাসভার নেতারা বললেন তারা লীগের বিরুদ্ধে লড়বে, ইংরেজের বিরুদ্ধে নয়; বরং তারা ইংরেজকে সহযোগিতা দিবে (শ্রী গঙ্গানারায়ন চন্দ্রের লেখা, অবিস্মরনীয় ২য় খন্ড ৫৪ পৃষ্ঠা)।

গোলাম আহমাদ মতোর্জা সাহেবের বহু বহু লেখনী থেকে জানা যায় মুসলিমদের অসাধারণ অর্জন সব লুকানো কিন্তু ভারতে যা প্রচারিত হয় তার বেশিরভাগই মিথ্যা রচনা, মুসলিমকে হেয় করার রচনা। ইদানিং কিছু হিন্দুর মুখেও সত্যটা শোনা যায়। খোদ রবীন্দ্রনাথ ছিলেন চরম মুসলিম বিদ্বেষী। ভাবতে অবাক লাগে এদের কাছে ইতিহাস সমাজ যত না বড় ছিল তার চেয়েও বড় ছিল ইসলামের বিরুদ্ধে তলোয়ারের জোরে মিথ্যা প্রচার। বৃটিশ সৃষ্ট মুসলিম বিদ্বেষ তারা খুব যতনে আদরে লালন করেছেন। গভীর ভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় সে সমাজের বিবেক যারা ছিলেন এরা বেশীর ভাগই ঐ মিথ্যা ইতিহাস চর্চাতে নিজেকে নিমজ্জমান রেখেছেন। এর বাইরে প্রকৃত সত্যে তারা বিচরণ করেন নাই । অতীত ভারতের মুসলিমদের গৌরবোজ্জল ইতিহাস গর্ব করার মত। যেখানে ইতিহাসকে চাপা দেয়া সম্ভব হয়েছে সেখানে উইকিপিডিয়াতে সত্য খোঁজলে কি পাওয়া যাবে? উইকিপিডিয়াতে ঐ নকল ইতিহাস পক্ষই তথ্য সাপ্লাই করে। সূত্র থেকে তারা যা পায় তাই আপলোড করে, সেটি প্রধান সোর্সও হতে পারে সেকেন্ডারী সোর্সও হতে পারে। বরং একমাত্র গবেষনা প্রকৃত সত্য উন্মোচন করতে পারে। মুসলিমরা না জাগলে এ কর্ম অন্য এসে করে দিবে না। অন্যরা ৭৫ বছরেও তা উন্মোচন করেনি বরং এসব প্রকাশে প্রতিরোধ করেছে। বড় সময় থেকেই মর্তোজা সাহেবের অর্জনকে চাপা দিয়ে রাখা হয়েছে। ঐ সব বস্তুনিষ্ট কাজ খুঁজে বের করার যে মহতী উদ্যোগ তিনি নিয়েছেন তাকে শত সালাম জানাই। 

আজকের মুসলিমরা গভীর ঘুমে অচেতন। সেটি মনে হলে কষ্ট হয়। একবিংশ শতকে চেতনহীন মুসলিমদের দায় অনেক বেশী। তারা মনে করে তাদের কোন দায় নেই। কিন্তু তারা যে আল্লাহর খলিফা হয়ে এ ধরায় এসেছে তা তাদের মনেই নেই। আল্লাহ তাদের উপর বিশাল দায় ভার চাপিয়ে দিয়েছেন তারা কিন্তু তাদের অধিকার ও কর্তব্য ভুলে বসে আছে। তাদের কর্তব্যজ্ঞানটুকু স্মরণ করিয়ে দিতে এ ক্ষুদ্র প্রয়াস। লেখাটি একটি সাইরেন ধ্বনি, ঘুম থেকে জেগে উঠার, নিজের দায়িত্ব বুঝে নেয়ার। (চলবে)

২৩ নভেম্বর ২০১৯

 

বি দ্রষ্টব্য: এ লেখাটি নিউইয়র্ক ভিত্তিক “দি রানার নিউজ” ২৯ নভেম্বর ২০১৯ তারিখের সাপ্তাহিকে ছাপা হয়েছে।

নাজমা মোস্তফা

(লেখাটি অনেক লম্বা ও পুরোনো লেখা ২০০৭ সালের তবে কোথাও প্রকাশ হয়নি, ধৈর্য্য ধরে পড়তে হবে।)।

শিরোনামটি বাংলাদেশের মানুষের কাছে একটি পুরোনো প্রসঙ্গ। এক মেয়ে অতি সম্প্রতি আমার কাছে জানতে চায় তসলিমা সম্পর্কীত কথা। কারণ সে ধরে নেয় এ মানব দরদী মহিলা ধর্মকে গালি দিয়ে অনেকের কাছে মহান কাজ করেছেন। সে নিজেও অনেক সময় তাই মনে করতো। মেয়েটি আমার কাছে ব্যখ্যা চায় আমি সংক্ষেপে তাকে জবাব দেই ই-মেইলে। সে বাংলা পড়তে পারে না। যে কোন জিনিসের প্রশ্ন হলে তার উত্তর দেয়া প্রাসঙ্গিকতার পর্যায়ে পড়ে। এ ক্ষেত্রে তসলিমা প্রসঙ্গ টানার আরেকটি কারণ সেই মেয়ে এর মাঝে একটি কান্ড করে বসেছে সত্য মিথ্যার বোধ হারিয়ে সে মরিচিকার পিছনে ছুটে গিয়েছে। সে ধর্মের বারোটা বাজিয়ে নিজের জীবনকে যুদ্ধের মাঠে নামিয়ে দিয়েছে। ধর্ম ছেড়েছে, ঘর ছেড়েছে, জীবনকে বাজি রেখে সে ডিগবাজী খাচ্ছে। স্বভাবতই আমি তার জীবন নিয়ে উদ্বিগ্ন। আমার এ লেখার এটি একটি বড় কারণ। এটি একটি মাত্র মেয়ের ঘটনা হলেও আজ একেও আমি বড় করে দেখছি। চিন্তার ক্ষেত্রে এটি নিছক ছোট কোন ঘটনা নয়। নয়তো এ পুরোনো কাসুন্দি ঘাটার ইচ্ছে ছিল না মোটেও। শুনেছি তসলিমাও চান সব সময় খবরের লাইম লাইটে থাকতে। কিন্তু নানা কারণে অনেক সময় প্রয়োজনেও পুরোনো কাসুন্দি নাড়তে হয়।

অতি সম্প্রতি প্রথম আলোর ব্যাপারে সারা দেশ জুড়ে যে কার্টুন বিদ্রোহের সংবাদ পাচ্ছি, আবার ‘সাপ্তাহিক ২০০০’ পত্রিকায় দাউদ হায়দারের আত্মজীবনীমূলক রচনা ‘সূতানটি সমাচার’ যেটি প্রকাশের আগেই বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে (মন্দের ভালো)। পত্রিকার মারফতে জানতে পারি অপ্রকাশিত লেখাটিতে নবী মোহাম্মদ(সঃ) এর নাম, রমজান নিয়ে কটাক্ষ, মক্কা শরীফ বা কাবা শরীফকে পতিতালয়ের সাথে তুলনা করা হয়েছে। কার্টুনটি আমি দেখেছি কিন্তু লেখাটি যদি সত্যি এভাবে লেখা হয় তবে মুসলমানদের জন্য এটি অবশ্যই সীমাহীন বেদনার কারণ, এটি স্বীকার্য। সব মিলে মনে হয় তসলিমার সেই খোড়া রোগে এখনো অনেকেই ভুগছেন, নাহলে রমজানের এ সংযমের সময়টিতে ইসলামের শ্রেষ্ঠ পথ প্রদর্শক নবী মোহাম্মদকে নিয়ে রংরস করার কথা ছিল না মোটেও। ‘মোহাম্মদ’ এবং ‘মক্কা’ দুটি একটির সাথে আরেকটি একসূত্রে গাঁথা। এখানে একজন স্বনামধন্য মানুষ এবং একটি স্থানের নাম ঐ ব্যক্তির জন্মের সাথে আসা যুদ্ধের ময়দান। এ এমন এক ব্যক্তি যাকে যুগে যুগে স্কলাররা সম্মানের তালিকায় উঠিয়েছেন তাকে কোন স্পর্ধার বলে হালকা ভাবে দেখছে এরা। তার মানে এটি নয় যে তারা খুব জ্ঞানী বরং এটি প্রমান করে এরা কতটা অসচেতন, সঠিক সত্যের সন্ধানে এরা শতভাগ অন্ধত্বের শিকার, এদের সুচিকিৎসার প্রয়োজন। এবার আমি মাত্র কিছু ঐতিহাসিক ব্যক্তির নাম উল্লেখ করতে চাই যারা এ সম্মানিত জনের ভূয়সী প্রশংসা করে গেছেন। তারা হচ্ছেন জর্জ বার্নার্ড শো, মহাত্মা গান্ধী, প্রফেসর কে এস রামকৃষ্ণ রায়, এস পি স্কট, রেভ বি মার্গালিউথ, এডওয়ার্ড গীবন, স্যার থমাস কার্লাইল, ষ্টেইনলি লেনপুল, রেভারেন্ড বি স্মিথ, এম এইচ হাইন্ডম্যান, হারকিউলস-দ্যা গ্রেট রোমান এম্পায়ার, উইলিয়াম মন্টোগোমারী ওয়াট। এরা অনেক আগের লেখক এবং মোটেও কাঁচা অর্বাচিন নন, এটি নিশ্চয় বর্তমানের হিরোরা অস্বীকার করতে পারবেন না। যারা বর্তমানে হিরো হবার বাসনায় পরিশ্রম করছেন, এরা কি মনে করেন যে বিদ্যায় বুদ্ধিতে তারা জগতসেরা, সবকে ছাড়িয়ে গেছেন। এ বিতর্ক প্রতিযোগিতা তারা নিজেরাই করতে পারেন। বেওকুবের মতো অন্যকে আছাড় দিতে গিয়ে নিজেরা আছাড় খেয়ে উল্টানো একমাত্র অর্বাচিনের পক্ষেই সম্ভব।

অতীতে দেখা গেছে ধর্মকে গালি দিতে বিধর্মী সাম্প্রদায়িক লেখকরা সাহিত্য করেছেন ঠিক এভাবে যে, ঢাকা শহরে খুব বেশী দেখা যায় কাক, কুকুর আর মুসলমান। সাহিত্যের সাধুর কি অসাধু তৎপরতা লেখাটিতে ফুটে উঠেছে যে কোন চিন্তাশীলেরই খুজে পাবার কথা। এখানে কৌশলে মুসলমানকে শুধু কাকের সাথে তুলনা করেই ক্ষান্ত হননি লেখক, পরম নিশ্চিন্তে কুকুরের সাথে তুলনা করে লেখক সাহিত্যিক নিজের অবস্থানও চিহ্নিত করে ফেললেন। মানবিক মর্যাদায় তার মাত্রাটা তিনি এঁকে দিলেন, তাকে এই একটি কর্ম দিয়েই মাপা সম্ভব। কার্টুনের উপর বিদ্রোহ মানলাম কিন্তু কোন ব্যাপারেই অতি বাড়াবাড়ি সীমালংঘনের লক্ষণ, ভালো নয়। সেটিও মনে রেখে চলাই ভালো। কারণ বাড়াবাড়ি আল্লাহরও অপছন্দের রাস্তা। এই রমজান মাসে এটিও স্মরণ রাখলে ভালো। সবারই উচিত আইনের প্রতি সম্মান দেখানো। সঠিক উপায়ে প্রতিবাদ করার অধিকার সবারই আছে, তবে কখনোই বিশৃংখলা করে নয়। আমাদের নবীর শেখানো রাস্তা এসবের ইঙ্গিত দেয় নি কখনোই। শত সমস্যায় জর্জরিত একটি দেশ যেন বাড়তি অসুবিধার মুখোমুখি না হয় সেটিও মাথায় রেখে চলা উচিত। যারা গুড় লাগাতে চাচ্ছে যে কোন বিশৃংখলাই তাদের জন্য আশায় ভরা যদিও অশনি সংকেত। সম্প্রতি গার্মেন্টস নিয়ে যে রংরস শুরু হয়েছে এর সমাধানেও কর্তৃপক্ষের সঠিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। প্রয়োজনে প্রত্যেকের পাওনা সাধ্যমতো সঠিক উপায়ে শোধ করে এর চালিকা শক্তিটুকু টিকিয়ে রাখার উদ্যোগ নিলেই মঙ্গল। সর্বাবস্থায় ‘দেশ সবার উর্ধ্বে’ একথাটি জনতাদের মাথায় রাখতে হবে। কিন্তু অবশ্যই সাবধান থাকা ভালো যে – কে বা কারা কি করতে পারে, কোন সাপ কতটা বিষ ধারণ করছে সেটি অবশ্যই একজন মাঠকর্মীর জানা দরকার।

দেখা গেছে রাজনীতির নামে বছরের পর বছর এসব করেছেন আমাদের সোনার সন্তানেরা, বিশৃংখলা সৃষ্টি করে গাড়ী ভাঙ্গার মতো কাজ যেন নিজের গায়ে নিজে কেরোসিন ঢেলে আগুন দেয়ার মতো কাজ। এসব থেকে দেশবাসীর দূরে সরে দাড়ানো অবশ্যই দরকার। দেখা গেছে এবারেও শ্রমিকরা গাড়ীতে আগুন ধরিয়েছে, দেখে দেখে খারাপ জিনিসটি শিখে নিতে কারোরই বেগ পেতে হয় না। গার্মেন্টএর মালিকের গাড়ীটিও কিন্তু দেশেরই সম্পদ। দুস্কৃৃতিকারী ধরা পড়লেও দুষ্টু ছেলের শাস্তি হচ্ছে কিন্তু জমা করা মালপানিটা যাচ্ছে দেশবাসীর জমা খাতায়। দুস্কৃতিকারীর দৃষ্টিতে দেখলেও সে এ টাকা উড়িয়ে দেয় কারণ অন্যায়ভাবে অর্জিত সম্পদ মঙ্গল আনে না। যে গাড়ীটি ভাঙছে এটি তার নিজেরই দেশের সম্পদ। সুতরাং তাকে গাড়ীটি ভাংতে সবাই একযোগে বাধা দিন। এ বোধটুকু প্রতিটি জনতার অন্তরে জাগাতে সমর্থ হোন। সব লুটেরা ধরা পড়লেও সম্পদ একত্রিত হচ্ছে দেশের জমা খাতায়। রাগ পাপীর উপর দোষীর উপর থাকতে পারে, জিনিসের উপর সম্পদের উপর রাগ, এটি শুধু বোকামীর অর্জন। একমাত্র বুদ্ধিশুদ্ধিহারা পরগাছা যারা, তারা এই হীনমন্য কাজ করে। তারপরও কথা আছে পাপকে ঘৃণা করো, পাপীকে নয়।  নিজের দেশটিকে নিজের একটি পর্ণ কুটির এটি সবার ভাবনায় রাখা জরুরী। কুটিরের ছাদ উড়ে গেলে সব ঝড়ঝাপ্টা নিয়ে বেঁচে থাকা যে দুঃসাধ্য সেটি মাথায় রাখুন। তবে দেখা গেছে সুমতি সব সময় কাজ করেনা, দুর্মতিরই জয় কেন হয় এটিও পরখ করা দরকার।

অনলাইনের একটি ওয়েভসাইট ‘সদালাপে’ আমার গ্রন্থ ‘তসলিমার কলামের জবাব’ বইটি ছিল। আমার মূল বইটিতে ‘র’ সম্পর্কিত বাড়তি অংশটুকু ছিল না কারণ ‘র’এর এই যোগসূত্র আমার আগে জানা ছিল না। বেশ আগে ওখানে একজন মন্তব্য করে এটি উল্লেখ করেন যে আমি আমার লেখাতে তসলিমার ‘র’ সম্পর্কীত বিষয় তেমন খোলাসা করিনি। ঐ খোলাসা করতে অনেক তথ্য আমি জানতে পারি লেখক আবু রুশদ এর লেখা গ্রন্থটিতে। যে কেউ এটি পড়ে নিতে পারেন। আমি ধরে নিয়েছি এটি অনেকেই জানেন তাই ও বিষয়ে বেশী নাড়ি নাই মূল গ্রন্থে ‘র’ সম্পর্কিত তথ্যটি দেই নি। মনে হতে পারে আমার যুক্তি কম। তবে এটি ঠিক কালের ধারায় থলের বিড়াল বেরিয়ে পড়ার সম্ভাবনা থেকে সত্য উন্মোচিত হয়ই, এভাবে মিথ্যা পালায়। স্মরণ করছি আর একটি বই এই ‘র’ সম্পর্কীত সম্প্রতি পুরষ্কার প্রাপ্ত হয়েছে বইটির নাম ‘র এ্যান্ড বাংলাদেশ’ লিখেছেন সাংবাদিক এবং গবেষক জয়নাল আবেদীন। লন্ডন ইন্সটিটিউট অব সাউথ এশিয়া সংক্ষেপে ‘লিসা’ তাকে সম্প্রতি পুরষ্কৃত করে। বইটি লিখা হয় ১৯৯৫ সালে। বইটিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের আগে ও পরে ঐ গোয়েন্দা সংস্থাটির অশুভ গোপন তৎপরতা উন্মোচন করা হয়েছে। বইটিতে শেখ মুজিবুর রহমান এবং জিয়াউর রহমানের হত্যাকান্ডে ইন্ডিয়ার ভূমিকার নেপথ্য কথাও তুলে ধরা হয়েছে। এওয়ার্ড বিষয়ক সাম্প্রতিক খবরটি আমাকে এ তথ্যটি দিতে উদ্বুদ্ধ করে, যদিও বইটি আমার পড়ার সুযোগ হয়নি।

আবু রুশদের বই: এবার আমি এ আর্টিক্যালটিতে লেখক আবু রুশদের লিখিত বাংলাদেশে ‘র’। এ সম্পর্কীত তথ্যাবলী ‘রিচার্স এন্ড এনালাইসিস উইং’ সংক্ষেপে ‘র’ এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন কংগ্রেস নেত্রী ইন্দিরা গান্ধী, এক্ষেত্রে বেছে বেছে কংগ্রেস সমর্থকদেরেই এখানে নেয়া হতো। এটি ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার নাম। প্রায় সমগ্র বিশে^ই এর নেটওয়ার্ক আছে। বিশেষ করে বাংলাদেশসহ উপমহাদেশের ছোট ছোট দেশগুলোর রাজনীতিতে এরা বিশেষভাবে তৎপর। লক্ষ্য করা যায় ৯১ সালের জুন জুলাই মাস থেকেই বাংলাদেশের প্রায় সকল সরকারী, আধাসরকারী প্রতিষ্ঠান, শ্রমজীবি, পেশাজীবি সংগঠনে ব্যাপক অসন্তোষ ও আন্দোলন নাড়া দিয়ে উঠে। একের পর এক শুরু হয় ধর্মঘট, জ¦ালাও পোড়াও ইত্যাদি। এসবের পিছনে সুপ্ত কারণ হিসাবে সে সময় পত্রিকায় প্রকাশিত একটি খবর ছিল এরকম ‘ইতিমধ্যে ‘র’ এজেন্টদের তৎপরতা লক্ষ্যনীয়। তাদের পরিকল্পনার উদ্দেশ্য হলো দেশে এক অস্থির পরিস্থিতি সৃষ্টি করা যাতে সরকার সন্ত্রাস, হরতাল, ধর্মঘট, কর্মবিরতি খুন, ডাকাতি বেড়ে চলে। দৈনিক নাগরিকের ২৭ জানুয়ারী ৯২ সংখ্যায় এক রিপোর্টে জানা যায় সরকারের ভিতরে বাইরে বিভিন্ন স্তরে ৩০ হাজার ‘র’ এজেন্ট তৎপর। মন্ত্রী, এমপি, আমলা, রাজনীতিবিদ. শিল্পপতি, ব্যবসায়ী, বুদ্ধিজীবি, লেখক, কবি সাংবাদিক, সাহিত্যিক, শিল্পী, প্রকাশক, অফিসার, কর্মচারী ইত্যাদি পর্যায়ের লোকজনই শুধু নয় ছাত্র, শ্রমিক, কেরানী, পিয়ন, রিকশাওয়ালা, ঠেলাওয়ালা, পোর্টার, কুলী, টেক্সি ড্রাইভার, ট্রাভেল এজেন্ট, ইন্ডেন্টিং ব্যবসায়ী, সিএন্ডএফ এজেন্ট, নাবিক, বৈমানিক, আইনজীবিসহ বিভিন্ন স্তরে তাদের এজেন্ট সক্রিয় রয়েছে। এ ছাড়া সারা দেশে ছড়িয়ে জালের মত বিস্তার করে আছে ৬০,০০০ ‘র’ এজেন্ট।

ভারতের বন্ধুত্বের আড়ালে শত্রুতা: দেখা যায় ভারতের এক বিরাট সমস্যাই সাম্প্রদায়িক সমস্যা। ভারতীয় ‘র’ তাদের রাজনৈতিক কৌশল হিসাবে তসলিমা নামের ‘ছাই ফেলতে ভাঙ্গা কুলো’ হিসাবে ব্যবহার করেছে। বাংলাদেশে যখন বাবরী মসজিদ ভাঙ্গার প্রতিবাদে সংসদে নিন্দা প্রস্তাব গ্রহণ করা হয় তখন এর জবাবে ভারত বাংলাদেশকে হুমকি প্রদান করে। এরকম হুমকিতে ভারত এটি প্রকাশ করে যে, ‘বাংলাদেশে শত শত মন্দির ধ্বংস হয়েছে, সহিংস ঘটনা ঘটেছে, তাতে ভারত সরকার বাংলাদেশ সরকারের ভবিষ্যত পদক্ষেপের উপর মনোযোগ সহকারে নজর রাখবে। ভারত সরকারের এই নজর রাখার মিথ্যাচারই বর্হিবিশে^ বাংলাদেশকে সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী চিহ্নিত করার পিছনে বিরাট ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে ভারত সরকারের হুমকি প্রদর্শিত হয় ২৩ জানুয়ারী ৯৩ সালে। এর মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় শুরু হয় একুশের বইমেলা। ঐ বারের বইমেলায় প্রকাশিত হয় তসলিমার ‘লজ্জা’। বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নেই, হিন্দুদের উপর যথেচ্ছা নির্যাতন এসব গালগল্পই ছিল ঐ বইএর মূল বিষয়। এতে অবশ্যই সারা বিশে^ বাংলাদেশের ভাবমূর্তি অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বস্তুত এ রকমভাবে সংখ্যালঘু নির্যাতন ভারতে নয়, এটি বাংলাদেশে সংগঠিত হচ্ছে একটি অপরাধ, এটি ‘র’ কৌশলে প্রতিষ্ঠিত করে সার্থকভাবে। এখানে যে কেউ মনে করতে পারেন এটি একটি উপন্যাস কিন্তু এর ভিতরের বক্তব্যকে কৌশলে ঢাল হিসাবে এমনভাবে এমন সময়ে ব্যবহার করে দেশটির বিরুদ্ধে ‘র’ চরম প্রতিশোধ গ্রহণ করে। তাই এরকম কোন মিথ্যাচারী লেখাকে অবলম্বন করে একটি হিংসার ময়দান তৈরী হয়। এসব থেকে জানার শিখার অনেক আছে। জাতি যেন অতীত থেকে শিখে প্রকৃত সত্যটি জেনে সঠিক কাজটি করে। গাড়ি ভাংচুর করে নয়,  চিন্তার ক্ষেত্রে প্রতিটি সচেতনকে এর মূলে প্রবেশ করতে হবে এবং এর বিপক্ষে নিজেদেরকে সেহিসাবে গড়ে তুলতে হবে। প্রতিটি ছাত্রকে, প্রতিটি সুনাগরিককে এর মর্মে প্রবেশ করতে হবে। আত্মায় অন্তরে এর মোকাবেলায় ইস্পাতকঠিন দৃঢ়তা নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। মানুষকে মানবিক মূল্যবোধে গড়ে তুলতে হবে। প্রতিটি প্রশ্নের জবাব খুজে নিতে হবে, প্রতিটি জনতা হবে আগামীর সৈনিক, এসব ষড়যন্ত্রের জবাব একমাত্র দক্ষতা দিয়ে মোকাবেলা করাই সম্ভব। বোমা দিয়ে নয়, যুক্তি দিয়ে, তথ্য দিয়ে, সত্য দিয়ে অসত্যকে রুখে দিতে হবে। অসৎ পথে যে হাটে সে চিরদুর্বল। ‘জোঁকের মুখে চুন’ দেয়ার একটি প্রবাদ সমাজে প্রচলিত আছে, প্রতিটি ক্ষেত্রে ঐ চুন দেয়ার কাজটি করতে হবে সঠিকভাবে।

ধর্মদ্রোহিতারও উপরে তসলিমার দেশদ্রোহিতা:  ঐ তসলিমা ইস্যুতে পরবর্তীতে পাই ঐ ‘র’ সম্পর্কীত অনেক প্রমান প্রতিবেদন। এমনকি ভারতীয় বিশ্লেষকগণ পর্যন্ত তসলিমা নাসরিনের ‘র’ সংশ্লিষ্টতা সম্পর্কীত মন্তব্য প্রকাশ করেন। এদেরই একজন হলেন ভারতের ‘ইন্সটিটিউট অব স্ট্রাটেজিক স্টাডিজের গবেষক অশোক এ বিশ^াস। ৩১ আগষ্ট ৯৪ সংখ্যা ‘দি নিউ নেশন’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘Raw’s Role in Furthering India’s Foreign Policy’ শীর্ষক এক নিবন্ধে মিষ্টার অশোক বিশ^াস উল্লেখ করেন যে, বিএনপি সরকারকে বিশ^ দরবারে সাম্প্রদায়িক, সংখ্যালঘু নির্যাতনকারী হিসাবে চিহ্নিত করার জন্য ‘র’ তসলিমা ইস্যু সৃষ্টি করেছে। তিনি একে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ‘র’ এর অন্যতম বড় সাফল্য বলে মন্তব্য করেন। তার ভাষ্য মতে, এই অনৈতিক তৃতীয় শ্রেণীর লেখিকাকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে কলকাতার প্রচার মাধ্যম। তাকে পুরো আর্থিক সহায়তা দিয়েছে ‘র’এবং ‘র’ খুব ভালভাবেই জানতো যে তসলিমা ইস্যু কিভাবে বাংলাদেশের ভিতরে গোলযোগ সৃষ্টি করবে। পশ্চিমী নারীবাদী সংগঠনসহ ইসলাম বিরোধীদেরে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে উস্কে দেয়ার জন্যই লজ্জাসহ অন্যান্য উগ্র কাজে তসলিমাকে লেলিয়ে দেয়। এর প্রেক্ষিতে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিজেপিসহ অন্যান্য হিন্দু সংগঠনগুলো তসলিমার সমর্থণে এগিয়ে আসে। এছাড়া আনন্দবাজার গোষ্ঠী ব্যাপক কভারেজ দেয় তসলিমাকে। এরা লজ্জাকে প্রমান হিসাবে ব্যবহার করে। এই আনন্দবাজার গোষ্ঠীই পরবর্তীতে তাকে পুরষ্কারে ভূষিত করে। দেখা যাচ্ছে ভারতই তার আশ্রয়স্থল আজো। ১৯৯৯ সালে আবারো তিনি ফিরে যান আনন্দবাজার গ্রুপের ইঙ্গিতে। ২০০০ সালে পুনরায় তিনি ভূষিত হন ‘আনন্দ পুরষ্কারে’। বর্তমানে এই ২০০৭ সালেও তিনি ভারতে সেখানের নব্য নাগরিকত্ব আদায়ে ব্যস্ত।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ধিকৃত বাংলাদেশ: ১৯৯৩-৯৪ সালে ভারতের সর্বত্র বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে মৌলবাদী সংগঠন বিজেপিসহ অপরাপর রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা তসলিমার সমর্থণে মিটিং মিছিল এর আয়োজন করে। তার ‘লজ্জা’ উপন্যাসের হাজার হাজার কপি ছাপিয়ে বিনামূল্যে বিলি করেছে। এ ব্যাপারে কলকাতা থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক ‘কলম’ পত্রিকার ১লা আগষ্ট ৯৩ সংখ্যায় বলা হয় ‘নারী কর্তৃক পুরুষের অবাধ ধর্ষণের প্রবক্তা আনন্দ পুরষ্কার ভূষিতা তসলিমা নাসরিনের সাম্প্রতিক একটি বইএর নাম ‘লজ্জা’। বইটি প্রকাশিত হয়েছে ঢাকা থেকে কিন্তু বিক্রি হয়েছে পশ্চিম বাংলায়। বিজেপি মানসিকতার বুদ্ধিজীবিরা ঝোলা বেগে বয়ে বয়ে বইটি পুশসেল করে বেড়ান। এক শিল্পপতি নাকি বিনামূল্যে বিতরণের জন্য বইটির আগাম কপি কিনে নেন। যাদবপুর বিশ^বিদ্যালয়ের এক ইতিহাসের অধ্যাপক নিজ খরচে বইটির ফটোকপি বিলি করে বেড়িয়েছেন। ‘লজ্জা’ নিয়ে এত মাখামাখি এ কারণে যে বইটিতে বাংলাদেশের মৌলবাদীদের নামে মিথ্যাচারের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। উপন্যাসের নামে দেশের হিন্দুদের খুন, ধর্ষণ, শোষন, নিপীড়ন, হতাশা, বঞ্চনা, গণহত্যা ও মানবেতর জীবনের এক রগরগে বর্ণনা রয়েছে এর ভিতরে। এসব কাজে ভারতের বড় লাভ হয় বারবী মসজিদ ইস্যুর বদলে স্থান করে নেয় তসলিমা ইস্যু। এর সূত্র ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সিএনএন থেকে শুরু করে নিউইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্ট এর মতো প্রভাবশালী পত্রিকাতে তসলিমা নাসরিনের সমর্থণে বাংলাদেশকে একটি মধ্যযুগীয় মৌলবাদী দেশ হিসাবে প্রচারনা চালানো হয়। ঠিক তখনই ‘নিউইয়র্ক টাইমস’ এ তসলিমা নাসরিনের উপর লেখা ‘সেন্সরশিপ বাই ডেথ’ শিরোনামের এক সম্পাদকীয়তে বাংলাদেশকে ধিক্কার জানানো হয়। তসলিমার লজ্জা বইএর নামের অনুকরণে ‘শেম’ শব্দ দিয়ে। ১৩ জুলাই ৯৪ সালে ঐ পত্রিকায় ছবিসহ তিন কলামের শিরোনামে একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। এর ঠিক পরদিন ১৪ জুলাই ৯৪ তারিখে আবার তসলিমাকে লেখা সালমান রুশদীর খোলা চিঠি সম্পাদকীয় পৃষ্ঠায় বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে ছাপে নিউইয়র্ক টাইমস।

বিজেপির ষড়যন্ত্রী হুমকি, অঙ্গরাজ্য করার হুমকি: এদিকে বিদেশী পত্রপত্রিকায় এই ফলাও করে প্রচারিত থাকার পিছনের শক্তিই ছিল ‘র’। এখানের নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক ঠিকানায়ও এসবের উপর এসময়কার খবর ছাপে। সে সময়ে বিজেপির হুমকি ছিল দুই কোটি মুসলমানকে বিতাড়িত করবো এবং বাংলাদেশকে অঙ্গরাজ্য বানাবো। বিজেপি ১৯৯৩-৯৫ সাল পর্যন্ত তসলিমার লজ্জাকে পুজি করে বাংলাদেশ থকে হিন্দু বিতাড়ন ও মুসলমান অনুপ্রবেশের প্রমান দাঁড় করিয়ে কাজ করে। উল্লেখ্য কলকাতা থেকে প্রকাশিত থেকে দৈনিক পত্রিকায় ২৭ সেপ্টেম্বর ৯৩ সংখ্যার এক খবরে বলা হয়, ‘বিজেপি কেন্দ্রে ক্ষমতায় যেতে পারলে এক মাসের ভেতর দুই কোটি মুসলমানকে ভেংগে ভেংগে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়া হবে। দেখা গেছে কখনো শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাসের পিছনে কাজ করেছে ‘র’। বাংলাদেশী ছাত্রছাত্রীদের ভারতে পড়াশুনার একটি ক্ষেত্র সৃষ্টি করতে এর চেয়ে বড় বিকল্প আর অন্য কিছু হতে পারে না। দুই বাংলা একত্রিকরণের একটি বিষয় এর মাঝে কাজ করে এর প্রমানও পাওয়া যায়। নিজের দেশটিকে ঘুড়ির লেজের দেশ মনে করে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা এবং বৃহৎ দেশটির প্রতি তার বাড়তি আকর্ষন লক্ষ্য করা যায় তার লেখাতেই। ১৯৯২, ১৯৯৩, ১৯৯৪ সালে দুই বাংলা একত্রিকরণের উপর ব্যাপক প্রচারণা হয় দুরদর্শনে, পেপারে, অপারের নাটকে নভেলে। বাস্তবতা হচ্ছে ভারতীয় জাতীয়তাবাদ ও হিন্দু জাতীয়তাবাদের মিথ্যা প্রচারণাকে অস্বীকার করে নিপীড়িত বিভিন্ন জাতি দিল্লীর শাসন থেকে মুক্তি চাইছে। যার কারণে নাগা মিজো, অহমিয়, গুর্খা, ঝাড়খন্ড, কাশ্মীর, ও পাঞ্জাবে স্বাধীনতাকামীদের সাথে তাদের নিয়তই লড়তে হচ্ছে। সিকিম গ্রাস করে ২২তম রাজ্য হিসাবে ঘোষনা করা ভারতীয় শাসকদের একটি অপকর্ম সন্দেহ নেই। হায়দ্রাবাদকে পেটে ঢুকিয়েছে। একই লক্ষ্যে ৩১ অক্টোবর ৯৩ তারিখে কলকাতার ‘আনন্দবাজার’ পত্রিকায় একটি ক্রোড়পত্র প্রকাশিত হয় বেশ ঢাকঢোল পিটিয়ে। ঐ ক্রোড়পত্রে এই আত্মবিক্রেতা মহিলার ‘বন্দী আমি; নামে একটি নিবন্ধ ছাপা হয়। সেখানে তিনি অনেক আক্ষেপ প্রকাশের পর লেখেন, ‘আমরা কবে এক হবো, হাঁটবো বনগাঁ থেকে বেনাপোল’। এসব প্রচার প্রচারণা মোটেও বিচ্ছিন্ন কোন ঘটনা ছিল না।

দেশদ্রোহীতায় দাগীরা: দেশের গুরুত্বপূর্ণ দলিল ভারতে পাচার ও রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিঘিœত করার অপরাধে অভিযুক্ত রাজশাহী বিশ^দ্যিালয়ের জেলাশাখার সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব রায় মিন্টু, কৃষি মজুর গয়ানাথ, এবং ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার আয়েজুদ্দিন, কারিতাস কর্মচারী চিত্তরঞ্জন, কেরানী তাপস মিশ্র, উমা রানী, অনুকূল বিশ^াস উল্লেখযোগ্য। এদের অনেকের কাছেই রাষ্ট্রীয় অনেক উল্লেখযোগ্য কাগজপত্র পাওয়া যায়। ২৮ ফেব্রুয়ারী ১৯৯২ সালে ঢাকার জাতীয় যাদুঘরে বিশ^ শান্তি পরিষদ ও বাংলাদেশ শান্তি পরিষদ নামের দুটি সংগঠন আয়োজিত ‘দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে নয়া তাগিদ’ সেমিনারে দুই বাংলা একত্রি করণের উপদেশ ও তাগিদ দেয়া হয়। সে সময় জিটিভিতে ‘ফিরে এলাম’ নামে একটি ধারাবাহিক প্রদর্শিত হয় দীর্ঘদিন ধরে। সহজেই বলা যায় আরো বহু ঘটনাই আছে যা সবকটি ঘটনাই কিন্তু একসূত্রে বাঁধা ঘটনাবলী। বিশ^ শান্তি পরিষদ, আনন্দবাজার, তসলিমা নাসরিন, জিটিভি এসব একই কন্ঠক মালার বিচ্ছিন্ন ফুল মাত্র।

২০০৭ এ সেই পুরোনো খেলা: সম্প্রতি এবারে এই ২০০৭এও শুরু  হয়েছে সেই পুরানো খেলা। সেখানে নন্দীগ্রাম, তসলিমা ইস্যু, একের বদলে অন্য, ইস্যু হলেই হলো একাকার হয়ে কাজ করছে। ভারতের এই লোকচুরি খেলা সাধারণেরা বুঝে কম, তাই চতুরেরা নীতিহীনরা এখেলা খেলতে উৎসাহী। যারা এ খেলার ভিতরে ঢুকবেন তারাই আঁচ করতে পারেন এর কানা মাছি ভোঁ ভোঁ খেলা বাংলাদেশে ‘র’ এর পক্ষে তারাই কাজ করতে উৎসাহ পাবে যার ভিতরে দেশপ্রেমের চেয়ে মরণ কামড় দিতে বেশী উৎসাহ। নয়তো কোন বিবেকবান সত্ত্বা এর ইন্ধনে কাজ করতে পারে না। কোন মুসলিমতো পারেই না, তার ঈমান থাকবে না। এরা আত্মবিকৃত জনতার অংশ, দেশদ্রোহিতার কাজ করছে। নিরপেক্ষতার অবয়বে আঁকা ধর্মে দ্রোহীর ভূমিকা রাখতে গিয়ে এই অপকর্মে  জড়িয়ে এ মহিলা যে নিকৃষ্ট পরিচয় স্পষ্ট করেছেন, তাকে ঘৃণা জানানোর ভাষা জানা নেই। সঙ্গত কারণেই বলি যে মানুষ এত সহজে নিজে বিক্রি হতে পারে, তার মুখে আর ধর্ম নিয়ে শুদ্ধির কাজ মানায় না। যে মিরজাফর জগৎশেঠ উমিচাঁদরা একদিন স্বদেশের বিরুদ্ধে গিয়েছিল শুধু মাত্র নিজের আখের গোছাতে, কিন্তু ইংরেজ তার নিজের জন্য নয়, বরং তার দেশের জন্য এদেশের আম ছালা সবই নিয়ে গেল। এ সোজা অংক বুঝলো না বিশ^াসঘাতকরা, এরা যুগে যুগে মানুষ নামের কলঙ্ক। তবে গালির ভাগ পুরোটাই পড়েছে মিরজাফরের উপর, বাকীরা আজো সরব আছে তাদের অপকর্মে, উপরে ওদের নাম বার বার আসছে। তসলিমা মিরজাফরের যমজ বোন। তার মুখে ধর্মের কথা, নীতির কথা, যেন ভুতের মুখে রাম নাম। যে নিজেই কলংকিত সে কোন সাহসে ধর্মের কথা শুদ্ধির কথা বলতে পারে। এত নিকৃষ্ট একটি দানব এ দেশে জন্মেছে মনে হতেও ঘৃণায় অন্তর গুলিয়ে উঠে। আমি তার বিরুদ্ধে বিগত শতকে বই লিখেছি, কোথাও তাকে আমি সামান্যতম কটু কথা বলি নাই। আজই প্রথম আমি নিজেকে সংযত রাখতে না পেরে কিছু শক্ত কথা বললাম।

অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ: এদের জীবন পুরোটাই ব্যর্থ, এতদিন তাকে অন্তত মানুষ মনে হতো। এর পর তাকে মানুষ মনে করার কোন অবকাশ নেই। বাংলাদেশের মানুষ যে কত ভালো এত করার পরও বাংলাদেশে কোন হিন্দু নির্যাতন নেই কোন গুজরাট কখনোই ঘটেনি। এরকম ঘটনা ঘটুক সেটি কেউ চায়ওনা। মোদির ভারত এখানে রচিত হোক এটি কারো কাম্য নয়। তারপরও দেখা যায় কথায় কথায় কৌশলে অনেকেই গুজরাটের প্রসঙ্গ টেনে উত্তরটি নিজে নিজেই দিয়ে দেন বলে বসেন, বাংলাদেশে যে হিন্দু নিধন হচ্ছে! জবাবটা ইতিহাসের পাতায় জমা থাক। ক্রুসেডের বদনাম খুব কৌশলে দিয়ে দেন প্রতিপক্ষের বক্তারা মুসলিমদের উপর। কিন্তু যারা সঠিকভাবে ক্রুসেডের ভিতরে ঢুকবেন একমাত্র তারাই বলতে পারবেন কোথাকার জল কোথায়, কতটুকু গড়িয়েছিল। ইতিহাস ছিল বলেই রক্ষা। তার স্বযতেœ রক্ষিত সংগ্রহই উত্তর জমা করে  রেখেছে খুব সন্তর্পনে। আর একজন নিরব দর্শক সব পর্যবেক্ষণ করছে এই ভরসা। যদিও জন্মান্ধ তসলিমার ঐ সত্যে মানা না মানাতে কিছু যায় আসে না। চোরা না শোনে ধর্মের কাহিনী।

কটি স্পষ্ট কথা: প্রকাশ্যে অপ্রকাশ্যে বর্তমান সময়টিতে অনেকেই মুসলমানদের উপর বেজায় ক্ষ্যাপা দেখা যায় কারণটি যে কি হতে পারে তা সঠিকভাবে বোধের মাঝে আসে না। টেররিস্ট নামের গালির ভার মুসলমান বয়ে বেড়াচ্ছে, তবে দিনে দিনে ঐ মিথ্যাচারের ইমেজে ফিকে রংএর প্রলেপও পড়ছে। অনেকের দুরভিসন্ধি প্রকাশ্য দিবালোকে বেরিয়ে পড়ছে। টেররিস্টের চুলোয় আগুন দিতে এখন আর মানুষ আগের মতো ছুটে আসতে পারছেন না, এমনকি টুইনটাওয়ারের বছরপূর্তি অনুষ্ঠানেও জনতার টান কমছে, কেন? এ কেনোর নিশ্চয়ই একটি উত্তর আছে, নিশ্চয় বিনা কারণে নয়। অনেকে এরকমও বলছেন এবার আসলেও আর আগামীতে আসবো না। সত্য আর মিথ্যা দূরীভূত হলে বহুধারার মিলন মেলা এই আমেরিকার মানুষ চলার পথে আরো সহজ রাস্তা খুজে পাবে, এটি ঠিক। যাক সে অন্য ইতিহাস, একটি বলতে আরেকটি টানতে চাচ্ছিনা। তবে মুসলিমদের প্রতি হিংসার একমাত্র কারণ হচ্ছে তাদের ফজলি আম হওয়া। তাই সবাই ঐ গাছে ঢিল মারে। শেওরা গাছে কেউ ঢিল মারে না, সে কথাটি আমি কলামের জবাবেও বলেছি। উদারমনা মুসলিমরা এসব এড়িয়ে গেছে সবদিন। ভারত সংকীর্ণতায় মানুষের বদলে দানবীয় অর্জনের বাহূল্যে ভরা। ইন্দিরা গান্ধী যদি নিজ দেশে এভাবে বিবেকহীনদের লেলিয়ে তুলেন তবে তাকে নিয়েও ইতিহাসে শ্রদ্ধার বদলে অন্য কিছু জমা হবে, নিকৃষ্ট অর্জন তারও জমবে। নষ্ট মিথ্যাকে পুরস্কৃত করা মানে দানবের পক্ষে মাস্তি করা। এরাই তারা যাদের নিজের লজ্জাবোধ শিকেয় তুলে রেখে অন্যকে জ্ঞান দিতে আসে। গুজরাটের অপকর্মের জমা, সাম্প্রতিক মানচিত্রে চৌর্যবৃত্তির খতিয়ান রেখে তারা মনের মাধুরী দিয়ে সর্বত্র মানুষের আদালতকে পাশবিকতায় পরিবর্তিত করছে কিসের অহংকারে। এ লজ্জা বাংলাদেশের ছিল না, বাবরী মসজিদ ভেঙ্গে, কাশ্মীরের মুসলিমদের উপর অন্যায় নির্যাতন করে, গুজরাটের নির্দোষ ২০০০-৩০০০ মুসলিম খুন করে নিজের লজ্জার দুর্গন্ধে আকাশ বাতাস কলুষিত করে রেখেছে ভারত, ওসব ঢাকবে কি দিয়ে? তাদের বর্ণবাদী ভগবান কি  দৃষ্টিহীন অন্ধ, তিনি কি এসব বিচার করবেন না বলেই মনে হয়? জবাব দিতে হবে বাংলাদেশের হিন্দুদেরকেও। ঘি খাবো ননী খাবো আর কিলের ভাগ নিবে শুধু মিরজাফর একা। তাই কি হয়? আপনাদের বিবেক কি বলে, আপনাদেরেও জিজ্ঞেস করছি, সত্যটা চড়া গলাতে বলতে শিখুন, যেটি আপনারা সচরাচর করেন না। আহারে ভারত নিজের অপকর্মে লজ্জা পায় না, আর তসলিমার লেখাতে লজ্জায় একদম লাল!

পুরষ্কারের কি বাহারী নমুনা! এওয়ার্ড ও সাহিত্য, গবেষনা, মানুষকে মর্যাদাবান করে সন্দেহ নেই। সালমান রুশদীর এরকম একটি খবরে অনেকেই বিচলিত হয়েছেন। যোগ্যতার ভিত্তিতে নাইটহুড প্রাপ্তির বিরল সম্মান পেয়েছিলেন সালমান রুশদী, অপকর্ম করে যদি পুরষ্কার পাওয়া যায় তো ভালোই। তসলিমাও পেয়েছেন। কিন্তু অপকর্ম করেও যখন দানবেরা ওসব ছাই ভস্ম পায় তখন কি আর সে সম্মান মনে প্রশান্তি দিতে পারে? হয়তো নীতিহীনদের পারে। এরা এমন সব মানুষ যারা দুনিয়াতে অশান্তির দাগ রেখে বড় মাপের অশান্তি সৃষ্টি করেছে। কথা বলার ওজুহাতে স্বাধীনতার নামে মিথ্যাচার করবে ষড়যন্ত্র করবে অন্যের গুটি হয়ে দেশ বিরোধী কাজ করবে সেটি মানা যায় না। ধিক্কারই তাদের জীবনের জমা। কথা বলতে পারা সবার জন্মের অধিকার। তাই বলে একজন সম্মানিতকে অসম্মান করায় পুরষ্কার পাওয়া নীচতার পরিচয় দেয়, এ অপরাধের গভীরতা মাপার কোন যন্ত্র আবিস্কৃত হয়নি। এসব ঘটনা সভ্যতা মাপার ব্যারোমিটার অবশ্যই। সর্বাবস্থায় মুসলিমদের জন্য ধৈর্য্যই উত্তম মহৌষধ। তবে চেতনহীনতার কোন সুযোগ এখানে নেই। এখানের প্রতিটি সদস্যকে সচেতন থাকতে হবে, বিবেককে কড়া পাহারায় রেখে সিদ্ধান্তে অটল থাকতে হবে। সামান্য কারণেই অধৈর্য্য না হয়ে সাহসের সাথে প্রতিটি প্রতিকূলতা পার হয়ে মানবতাকে উপরে তুলে ধরে আত্মসম্মান নিয়ে বেঁচে থাকাই মানব জীবনের সার্থকতা।

এওয়ার্ডের আড়ালকথা: বৃটেনের বিখ্যাত ডেইলী মেইলের কলামিস্ট মিজ রুথ ডাডলি এয়ার্সএর উক্তি, ‘তিনি সালমান রুশদীর সেই বুকার প্রাইজ পাওয়া বইটি বহু চেষ্টা করে ৫০ পাতাও পড়তে পারেন নাই। কারণ হিসাবে উল্লেখ করেন এটি পাঠ যোগ্য কোন সাহিত্যই নয়। একই রকম বক্তব্য পাওয়া যায় স্যাটানিক ভার্সেসের উপরও। তিনি উল্লেখ করেন এটি একটি উস্কানী মূলক গ্রন্থ ছাড়া আর কিছুই নয়। এক কথায় সাম্প্রতিক উপাধীর নেপথ্যে কাজ করে বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী ব্লেয়ারের কৃতকর্মের সাক্ষর। খুব সহজেই এখানেও যুদ্ধবাজ মিঃ ব্লেয়ারকে ওজন নেয়ার আরেক সহজ অংক ধরা পড়ে। বৃটেনের হাউস অব কমন্সের ঝ্যাক স্ট্র একই রকম মন্তব্য রাখেন, ‘আমি তার কোন বই পড়ে শেষ করতে পারি নি। তার বই আমার কাছে কঠিন মনে হয়’ (তথ্যটি দি টাইমস ও ডেইলী মেইল অবলম্বনে)। সভ্যতার মানদন্ডে বিচার যে কিভাবে হচ্ছে, সেটি বোঝা ভার। এমনভাবে যে একজন কেমন করে একজনকে আক্রমণ করে গালাগাল অপকর্ম করেও পুরষ্কৃত হওয়া যায়। এভাবে ক্রসেড ক্রমে যুদ্ধের রুপ নেয় যদিও অনেকের চোখে হয়তো এটি ছিল মানবতার সেবা, হয়তো কারো চোখে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা। এরা যারা অতি অল্পেই সাহিত্যে সভ্যতায়, লাইম-লাইটে উঠে আসতে পারছে এই একটি কঠিন মিথ্যা বলতে পারার জন্যই মনে হয়। কখনো মনে হয় বর্তমান সভ্যতা মিথ্যাকে পছন্দ করে অতিরিক্ত। দেখা যায় এত প্রমাণ প্রতিবেদনের মাঝেও মিথ্যা তার অবস্থান করে নেয় ঠিকই। এটি কিভাবে সম্ভব হয়, স্বভাবতই এ প্রশ্নের উত্তর হলো এর পেছনে শক্ত মিথ্যার শক্তিশালী যোগানদাতার কারণেই এটি সম্ভব হয়, মিথ্যা সত্যের মতোই জীবন্ত হয়ে উঠে।

তারপরও বলতে হয় আজকের বিশ্ব ইসলাম আতঙ্কে ভুগছে, কিন্তু কেন? একটি টার্গেট করা ধর্মকে গালি দিতে পারার বাড়তি ক্রেডিটের কারণে অনেকে পুরষ্কৃত হচ্ছেন, সাথে সাথে পরিচিতি বেড়ে গেল, খবরের শিরোনাম হওয়া গেল, অনেক প্লাস পয়েন্ট অবশ্যই। তারপরও তাদের বাকী সবটুকুই হতাশার, আশার জমা কিছু নেই। সত্যের উপর ভর করা বিজ্ঞানীর আবিষ্কার ইতিবাচক ফল নিয়ে আসে সন্দেহ নেই কিন্তু মিথ্যার সাথে সন্ধি করে যারা বিজয় ছিনিয়ে আনে তাদের এ ঠুনকো পাওনা অতি অল্পেই তাসের ঘরের মতো ভেঙ্গে যাবেই। বরং অনাচারীদের অপকর্ম সত্যকে প্রতিষ্ঠা করতে উৎসাহ যোগায়। কখনো কি মনে হয় এসব কিছু সত্য ধর্মের বিপক্ষে যাচ্ছে? মোটেই না। বরং তাদের অপকর্ম ধর্মটির জন্য ইতিবাচক অবদান যোগাড় করছে বেহিসাবে। মানুষের কাছে সুস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে সত্য আর মিথ্যা, সাদা আর কালো, আলো আর অন্ধকার। মনে হচ্ছে সত্য যুগ খুব কাছেই।

কলামটি লেখার সময় ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০০৭।

 

বি দ্রষ্টব্য: লেখাটি নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক দি রানার নিউজে ০১/০১//২০২০ এ ছাপা হয়েছে।

নাজমা মোস্তফা

শিরোনামের কথাটি গবেষনার দৃষ্টিতে ধরা পড়া চরম সত্য কথার একটি। আদি সনাতন ধর্ম খুঁজলে একটি চরম সত্য ও সুন্দর সত্ত্বাই ধরা পড়ে। বাকী সবটাই বহুত্ববাদ নামের গোজামিল। ময়দানের দুর্বলরা এর ভোগের শিকার হয়েছে যুগে যুগে। সতিদাহের যন্ত্রণা নারীদের জন্য জমা করা। এটি যদি ধর্ম হতো তবে কেন বৃটিশকে পরিশুদ্ধির কাজ করতে হলো। বড়কবি রবীন্দ্রনাথ যে গতিতে বৃটিশ তোষামোদি বন্দনা করেছেন সে একই গতিতে ধর্মের নামে সতিদাহের নামে নষ্ট বন্দনা গীতি গেয়েছেন। তার মত মোড়লরা সংস্কারে হাত দেন নাই। উল্টো আরো সমাজ ধ্বসের রসদ জুগিয়ে গেছেন। সঙ্গত কারণেই আজও তাদের সমাজ তিমির অন্ধকারে ডুবে আছে। ঐ অপকর্মের খেসারত হিসাবে সারা বিশে^ ইসলাম ও মুসলিমরা আজ কার্তুজের সামনে। সত্যকে গ্রহণ করার মানসিকতায় তারা পিছিয়ে। এক হাতে তলোয়ার আর এক হাতে কুরআনের মিথ্যাচারে তারা প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। এর বড় কারণ তাদের হিনমন্যতা আর ইসলামের সুমিষ্ট ভাব, তার ফজলি আম হওয়া।

ধর্ম যদি মিথ্যার উপর ভর করে দাঁড়ায় তবে তা আর ধর্ম থাকে না। সেটি হয় অধর্ম। বিশেষজ্ঞরা বলছেন বাবরি মসজিদের নিচে কোন মন্দিরের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। এটি খবরের শিরোনাম (প্রথম আলো, ০৭ ডিসেম্বর ২০১৮)। খবরে প্রকাশ প্রতœতত্ত্ব বিশেষজ্ঞ সুপ্রিয় ভার্মা ও জয়া মেনন মসজিদ ধ্বংসের ২৬তম বার্ষিকী উপলক্ষে তারা হাফিংটন পোস্ট ডটইনের এক প্রতিবেদনে এটি স্পষ্ট করেন। ভারতের প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তর এএসআই এ মিথ্যায় ধরা পড়েছে। ২০০৩ সালে বাবরি মসজিদ খননকালে এলাহাবাদ হাইকোর্টকে এএসআই জানায় মসজিদের নিচে একটি নয়, তিনটি রামমন্দিরের অস্তিত্ব পেয়েছে। সুপ্রিয় ভার্মা জওহরলাল নেহরু ইউনিভার্সিটির প্রতœতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক এবং জয়া মেনন শিব নাদার ইউনিভার্সিটির ইতিহাস বিভাগের প্রধান। তারা খননকাজ পর্যবেক্ষন করে ২০১০ সালে ইকোনমিক অ্যান্ড পলিটিক্যাল উইকলি নিবন্ধে লিখেছিলেন।  বিজেপি সরকারের চাপে ছিলেন প্রতœতত্ত্ববিদরা, সাম্প্রতিক এটি স্পষ্ট হয়। এই হচ্ছে মিথ্যা মন্দিরের পক্ষের যুক্তি। ঐ সময় অনুসন্ধানের নেতৃত্বে ছিলেন বি আর মানি। ২০১৬ থেকে মোদি সরকার তাকে জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক পদে বসায়। সুপ্রিয় ভার্মার মতে, বাবরী মসজিদের নিচে পুরোনো ছোট মসজিদ ছিল। এর পশ্চিম দেয়ালে, ৫০টি পিলার ও স্থাপত্যশৈলী তারই প্রমাণ। পশ্চিমের দেয়াল দেখলেই বোঝা যায় ঐ পাশে মুখ করে নামাজ পড়া হতো। এর কাঠামো মসজিদের মত, মন্দিরের মত নয়। এই যদি হয় ধর্মের ও ভগবান রামের অবস্থা তবে আফসোস ঐ সব অনুসারীদের জন্য যাদের মাথা পুরোটাই গোবর গণেশ হয়ে গেছে। অতিসার অতিবুদ্ধিতে অসার মূর্তিপূজকদের দুর্দশা দেখে হতবুদ্ধ গোটা মুসলিম সমাজ। এই তাদের সাধুতার নমুনায় ভন্ডামীর উদাহরণ। অতি ভক্তি চোরের লক্ষণের মতই করজোড়ে প্রণামের মহাত্য বুঝি তাই! গান্ধীজীর মুখে ছিল ‘যহি আল্লাহ সহি রাম, সবকো সম্মতি দে ভগবান।’ আল্লাহর সাথে রামের একাত্বতার সব গোমর ফাঁস! জিহাদের নাম নিয়ে সারা দুনিয়ায় সন্ত্রাসী বানিয়ে ছড়ানো হয় ঠিক বাবরী মসজিদের প্রতœতত্ত্বের মিথ্যা প্রচারের মতই। ষড়যন্ত্রী ত্রিশূল হাতে পেটে বিদ্ধ করলেও তারা সাধু, সন্ত্রাসী নয়। হাজার হাজার লাশ লুটিয়ে পড়লেও ঐ ত্রিশূল লুকানো থাকে, প্রচারিত নয়, দেখে না দেখার ভান সবার। প্রচারে থাকে শুধু ছলবাজ তলোয়ার আর সত্য কুরআন যাকে মিথ্যে দিয়ে সাজিয়ে প্রতিনিয়ত শান দেয়া হয়। ঐ শান দানে কবি সাহিত্যিকরা নেতা নেত্রীরা আগুয়ান ছিলেন, এটিই ইতিহাস ও বাস্তবতা।

২০১২ সালে একটি বই লিখেছিলাম, বইটির নাম “একই ধর্ম একই ধারা”, ৩৫০ পৃষ্ঠার এ বইটিতে দেখাবার চেষ্টা করেছি কিভাবে প্রধান তিনটি ধর্ম ইহুদী, খৃষ্টান ও ইসলাম এক সূতায় গাথা একেশ^র ধর্মের গোড়াটা। তাছাড়াও বাকী বৌদ্ধ, জৈন, হিন্দু শিখ ধর্মের গোড়াটাও ঐ এক জায়গায়ই প্রাথিত। সবকটি প্রধান ধর্মই একেশ^রবাদ। এখানে দুই তিনের কোন অস্তিত্ব নেই তারপরও এরা কালের ধারাতে তেত্রিশ কোটিতেও পৌছে গেছে বিনা বাধায়। এই স্থলন ঠিক বাবরী মসজিদের স্থলনের মতই অনৈতিকতা দিয়ে ভরা। যুগে যুগে মোদিবাজরা এভাবে ধর্মের সর্বনাশ করেছে, বারোটা চৌদ্দটা বাজিয়েছে। আজ এত স্বল্প পরিসরে এত বিশাল বিষয়টি খুব সংক্ষেপে তুলে ধরতে চাচ্ছি।

ইসলামের শুরুটা হযরত আদমের সময় থেকে। আদমের ১০৫৬ বৎসর পর নূহের আবির্ভাব, ইবনে আব্বাস ও আবুজর বর্ণনা করেছেন যে, আদম ও নূহের মাঝখানে দশ শতাব্দী অতিক্রান্ত হয়েছে (মুস্তাদরাক, হাকেম ও তিবরানী)। নূহের যুগেই ধর্ম ব্যবস্থা সত্যিকার অর্থে একটি বিশেষ রুপ লাভ করে। আদমের যুগ ছিল প্রস্তুতির যুগ। আদমের যুগে সহোদর ভাই বোনদের মাঝেও বিবাহ ব্যবস্থা চালু ছিল। প্রাচীন ভারতেও সহোদর ভ্রাতাদের সাথে বোনদের বিয়ে হত। তখন বিয়ে ছিল বাধ্যতামূলক (ভারতে বিবাহের ইতিহাস ১৫ ও ২৫ পৃষ্ঠা।) দশরথ জাতকে ভ্রাতার সঙ্গে ভগ্নির বিয়ের কথা শোনা যায়। (জাতক চতুর্থ খন্ড, ৭৫ পৃষ্ঠা টীকা)। নূহের যুগের প্লাবন, নৌকা নির্মাণ, নৌকা নিয়ে পর্বতে আশ্রয় লাভ, কুরআনে সূরা হূদের ৩৮, ৪১, ৪৫ ও সুরা মু’মিনুনে প্লাবন ও নৌকার উল্লেখ আছে। তৌরাতের আদি পুস্তকে ৭ও ৮ অধ্যায়ে এ ঘটনার বিবরণ দেখতে পাওয়া যায়। অনুরুপ শতপথ ব্রাহ্মণে, মহাভারতে এবং অথর্ববেদে মনু মহাপ্লাবন ও নৌকা নির্মাণ  ইত্যাদির ঘটনা হুবহু কুরআন ও বাইবেলের অনুরুপ বর্ণিত হয়েছে। প্লাবন, নৌকা নির্মাণ, গিরিশৃঙ্গে গমন ও প্রাণীসমূহের বিনাশের কথা শতপথ ব্রাহ্মণের ১/৮/১/১-৬ শ্লোকে রয়েছে, প্রাণীর বিজ নিয়ে নৌকা যাত্রার কথা মহাভারতে ৩/১৮৭/৫২-৪ শ্লোকে বিবৃত হয়েছে। মনুর পুত্রের বিনষ্ট হওয়ার কথা মহাভারতের ১/৭৫/১৫.২-১৮ শ্লোক সমূহে দেখতে পাওয়া যায়। এসব বর্ণনায় নূহ এবং মনু যে অভিন্ন ব্যক্তি তাতে কোন সন্দেহ নেই। হযরত ইব্রাহিমও মূর্তিপূজকের ঘরে জন্ম নেন। পিতৃগৃহে প্রতিবাদী হয়েই তিনি ধর্মান্তরিত হয়ে নিজেই ইসলামে আসেন। বাবরী মসজিদ ভাঙ্গার শুরুতে যে বালবীর সে ইত্যবসরে ধর্মান্তরিত হয়ে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে ঢিলের বদলে পাটকেল হিসাবে শত মসজিদ বানাচ্ছে।

আল্লাহ ইব্রাহিমকে গ্রহণ করেছিলেন বন্ধুরুপে (সূরা নিসার ৪:১২৫ আয়াত)। ইব্রাহিম এবং তার সত্যিকার অনুসারীদের মধ্যেই রয়েছে উৎকৃষ্ট আদর্শ (সুরা মুমতাহানাহ ৫,৭ আয়াত)। কুরআন বলে আল্লাহর নিকট একমাত্র মনোনীত ধর্মই হল ইসলাম (সুরা আল-ইমরান ২০ আয়াত)। ইব্রাহিমকে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা হলেও তিনি আল্লাহর রহমতে তা থেকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার পেয়েছিলেন। তেমনি উপনিষদ বলে, সর্বজবেন তন্ন শশাকদগ্ধম অর্থাৎ আগুন ব্রহ্মার একটি তৃণও দগ্ধ করতে পারলনা। (কেনো ৬/৫/৬)। বাল্যকালে আমি আমার হিন্দু বান্ধবীদের কাছে শুনেছি যখন ধর্ম শিক্ষা বা ইতিহাস পড়তাম তখন বলতো তাদের চড়ক পূজাতে ইব্রাহিমের মতই একজনকে আগুণে ছুঁড়ে দেয়ার আনুষ্ঠানিকতা করতো। আমি অবাক বিস্ময়ে বোকার মতই তাদের গল্পকথা মনে পুষে রেখেছি, আজ মিলাচ্ছি।  উলেমাদের মধ্যে অনেকেই ইব্রাহিমকে ব্রহ্মা বলে স্বীকার করেছেন, যেমন আর্যদের মধ্য এশিয়া হতে ভারতে আগমন হতে এটুকু অনুমান করা যায় যে, আব্রাহাম বা ইব্রাহিমকে তারা ব্রহ্মা নাম দিয়ে পূজা করেছে। (তফসির সুরা ফাতেহা, মৌলানা শামছুল হক ফরিদপুরী কৃত, ৯০ পৃষ্ঠা)। সুরা আম্বিয়ার ৬৮ আয়াতে তাকে পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দিতে আমরা দেখি। অতপর ঐ সুরার (৬৯-৭০ আয়াতে) তাকে আল্লাহ কর্তৃক নিরাপত্তা দেয়া হয়। এই ব্রহ্মা ও ইব্রাহিম যে একই ব্যক্তি এর মাঝে কোন দ্বিমত থাকার কথা নয়।  নবী ইব্রাহিম যিনি মূর্তি নিধন করেও নিস্তার পাননি। পরবর্তীরা তার মূর্তি গড়েও পূজা দিয়েছে মক্কাতেই, প্রমাণ পাওয়া যায় সেখানের ৩৬০টি মূর্তির মাঝে ইব্রাহিমের মূর্তিও ছিল। হিন্দু আর্যরা অহুরকে অশূরে পরিণত করে এবং ইরানীরা দেবকে দেও বানিয়ে ঘৃণার সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করে বলে সর্বত্র প্রমাণ পাওয়া যায়। এখানেও দেখা যায় আর্য ও ইরানীদের মাঝে একটি অব্যর্থ বন্ধনের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে।

মহাভারতে বর্ণিত আছে ব্রহ্মা, যজ্ঞ, ব্রহ্মশালা, বলির জন্য যজ্ঞ পশু, এক ত্রিলোক বিশ্রুত কূপ, কেশচ্ছেদন, মোক্ষ (মক্কা) ঈশ^র, আশ্রম বায়তুল্লা (Comparative religion, p – 245, আল ফুরকান ডিসেম্বর ১৯৬৪)। শিব ব্রাহ্মণ আরবে গিয়ে উপাসনা করতেন (ঐ ৩৫ পৃষ্ঠা)। ডঃ সুনীতি চট্টোপাধ্যায় তার “অশাস্ত্রীয় পুরাণে” এই মক্কেশ্বর শিব সম্বন্ধে আলোচনা করেছেন (বাংলা একাডেমী পত্রিকা ৮/৪)। উপরের প্রতিটি অনুসঙ্গ ইসলামের হজ্জের সাথে সম্পর্কীত ও প্রমাণিত। ইসমাইলের অনুসারীরা পরবর্তীতে একের কথা গুলিয়ে ফেলে মূর্তিপূজা করেছে। ঠিক একইভাবে ইসহাকের অনুসারীরা এক আল্লাহকে ভুলে গিয়ে বাল দেবতার পূজা করেছে। সাধুদের সেলাই বিহীন ড্রেস (ইহরাম), উলুধ্বনি দেয়া, বিবাহে সাতপাক দেয়া রীতি সাতবার কাবা প্রদক্ষিণের অনুকরণে তারা আজও করে থাকে। উপনিষদের মতে স্বাস্থ্যবান সন্তান লাভ করতে হলে বা বেদ বুঝার মত জ্ঞান অর্জন করতে হলেও ষাড়ের মাংস খাওয়া জরুরী। প্রাচীনকালে অতিথিদের জন্যও গো বধ করার প্রচলন ছিল। তাই সংস্কৃত ভাষায় অতিথির অপর নাম গোঘনো (দুঃখিত, বানান বিভ্রাটের জন্য)। এ দ্বারা অতিথির আপ্যায়ন করার নিয়ম (বসিষ্ট সংহিতা)। অতএব দেখা যায় কুরআনে বর্ণিত হযরত ইব্রাহিমের গোমাংস দিয়ে আতিথেয়তায় ভারতীয়রাও এই চিরন্তন নিয়মেরই অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু মোদির ভারতে উল্টো, গো হত্যা পাপ, মানুষ মুসলিম হত্যা পূণ্য।

প্লাবন কালের নূহকে বলা হত মনূহ বা মনু Nuh / Manu / Manuh দেখা যায় এখানে Nuh এর আগে Ma যুক্ত করা হয়। A+braham+a =  Brahma. ইব্রাহিমের প্রথমা স্ত্রী সারাহ বেদে যাকে বলা হয়েছে স্মরস্মতি Sarah + Wati – Saraswati.  যার অর্থ দাড়ায় সারাহ নামের একজন মহিলা, ওয়াতি অর্থ মহিলা। দেখা যায় সারাহ একজন সতি (গুণবতি মহিলা)। বেশ কিছু পন্ডিতেরা অথর্ববেদকে আব্রাহামের গ্রন্থ হিসাবে মানেন। নবী ইসমাইল ও ইসহাক যথাক্রমে অথর্ব এবং আঙ্গিরা নামে বেদে উল্লেখিত হয়েছেন। মুসলমান ঐতিহাসিকেরা একটি মতামত দান করেন যে শীশ নবী ও আইয়ুব নবীর কবর ভারতের অযোধ্যাতে উত্তর প্রদেশ রাজ্যে আছে। জট জটিলতায় তাদের মনু একজন নয়, বহু বহু মনুরা সেখানে আছেন।

প্রতিটি জনপদে যে নবী আসেননি তাও কুরআন আমাদেরে জানিয়ে দিয়েছে। আল্লাহ বলেন, আমি ইচ্ছা করলে প্রতিটি জনপদে একজন করে সতর্ককারী প্রেরণ করতে পারতাম (সুরা ফুরকান ৫১ আয়াত)। আগের নবীরা নিজ নিজ সম্প্রদায়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন। কিন্তু মহানবী মোহাম্মদ (সঃ)কে প্রেরণ করা হয়েছে সমগ্র মানব জাতির জন্য। বিশ্বের যে কোন স্থানে যারাই বাস করুক না কেন তারা সবাই এই শেষনবী মুহাম্মদ (সঃ) এর উম্মত। আসলে হিন্দুরা যে সনাতনের বড়াই করে মুসলিমদের ঘৃণা করার প্রবণতাকে জিইয়ে রেখেছে। এর দায় তাদের নষ্ট নেতৃত্বের যা খুব আগে ছিল না। তাদের নেতাদের কৃতিত্বে তারা নিজের বিবেককে এতই কপটবদ্ধ করে রেখেছে যে, শঠতা, প্রতারণা, হিংসা, মিথ্যাচার, মসজিদ ভাংগা, নিজেদের লাভ জমা করতে তারা নিজের মন্দিরও ভাঙ্গার আচার জমা করে রেখেছে। আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে এ আচরণ হিন্দু সংখ্যালঘুরা বাংলাদেশেও করে দেখায়। দেশে ও বিদেশে অপকর্মে ধরা খাওয়া প্রিয়া সাহা তার সাম্প্রতিক বড় উদাহরণ। ধর্মের নামে সততার সব দাগ তারা মুছে দিতে কার্পণ্য করে না। তারা মনে করে অনড় মূর্তিরা তাদের রক্ষক হবে। এ অধর্ম দিয়ে ভগবান রামের বা অদেখা বিধাতার সামনে কোন সাহসে তারা সিনা টান করে দাঁড়াবে?

বাংলাদেশের মানুষ চিন্তাও করতে পারবে না ভারতের দাঙ্গার পরিসংখ্যান। তেজী নেতাদের কারণে কোন কোন বছর দাঙ্গা শত শত কোন বছরে হাজারও ছুঁয়েছে। গুজরাটের রক্ত: ভারতবর্ষের গর্ব না কলঙ্ক?  এরকম একটি ছক উৎসাহী পাঠক চাইলে সেটি পরখ করে নিতে পারেন।টি বিগত শতকের হিসাব। ইসলামের ঐ মশাল হাতে বাবর, শাহজাহান টিপু ছাড়া আরো অনেকেই ভারতবর্ষকে অসীম মর্যাদায় বিকশিত ও উন্নীত করেছিলেন। এরা অনেকেই ক্ষমতার পাগল ছিল না, ছিল আল্লাহর পাগল, সত্যের পাগল। কিন্তু খোদ রবীঠাকুরের চোখেও তারা ম্লেচ্ছ যবন নেড়ে ধেড়ে হয়ে রইলেন। তিনি এমনই সংকীর্ণ ছিলেন যে তার কাছে কুরআন মুহাম্মদ কিছুই দাগ কাটে নি। এরা বৃটিশ তোষণে নোবেল জমা করলেও ভারতের দূর্ভোগের দায় এদেরই। এরা জালিনওয়ালাবাগের অত্যাচার দেখেও বিক্ষুব্ধ হয়না, নাইট উপাধি স্যার টাইটেলের মায়া ত্যাগ করতে কুন্ঠিত থাকে। যার খেসারতে জনতারা বিক্ষুব্ধ হয়। বোকা নজরুলের মত এরা কারাগারে যায়না, উল্টো বিলেত তাদের নিরাপত্তা বলয় হয়। ঐতিহাসিক আর সি মজুমদার আক্ষেপ করে বলেছিলেন, জাতিভেদে জর্জরিত হিন্দু সমাজ মুসলমান সমাজের সাম্য ও মৈত্রীর আদর্শ হতে অনেক কিছু শিক্ষা লাভ করতে পারত কিন্তু তারা তা করে নাই (বাংলাদেশের ইতিহাস, ৩২৮ পৃষ্ঠা)। ওরা ইসলামকে চিনলো না, মুসলিমদেরেও না। মুসলিমরা মহা ঐশীগ্রন্থ কুরআনকে অন্তরে ধারণ করে এগিয়ে যাওয়া এক মহান জাতি। অবিস্মরনীয় এক মশাল তাদের হাতে, যার আলোতে গোটা বিশ^ আলোকিত হতে বাধ্য। এত বড় কথাটি বললাম কারণ এখানে কোন মিথ্যাচার নেই। এটি কোন মানুষের কথাও নয় এটি ঐশীগ্রন্থ ও ঐ কুরআনের বাণী ঐশীবাণী, সব ধর্মের গোড়ার কথা।

লেখার তারিখ: ১৮ই নভেম্বর ২০১৯।

 

বি: দ্রষ্টব্য: এ কলামটি ২২ নভেম্বর ২০১৯ তারিখে নিউইয়র্ক ভিত্তিক সাপ্তাহিক ‘দি রানার নিউজ’ ছাপে।

নাজমা মোস্তফা

 

ভারতে বাবরী মসজিদের রায়ের প্রায় দুই সপ্তাহ থেকে প্রস্তুতি পর্ব চলছে, আগে থেকেই ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। উত্তর প্রদেশের আম্বেদকর নগর জেলার আকবরপুর, তান্ডা, জালালপুর, ভিটি এবং আল্লাপুরের স্কুল কলেজে আটটি জেল তৈরী করা হয়েছে। স্কুল কলেজ সরকারী অফিস আদালত বন্ধ রাখা হয়েছে। অতীতে হিন্দু রাজত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা কল্পে লোকমান্য বাল গঙ্গাধর তিলক, গনপতি ও শিবাজী উৎসবের সঙ্গে গোরক্ষা আন্দোলনের সূত্রপাত । এসব হিন্দুত্ববাদ প্রতিষ্ঠার শুরুর ইতিহাস। এ ব্যাপারে স্বামী বিবেকানন্দের মতে, “সে রাবণ, রামায়ন পড়ে দেখ, রামচন্দ্রের দেশের চেয়ে সভ্যতায় বড় বৈ কম নয়। লঙ্কার সভ্যতা অযোধ্যার চেয়ে বেশী ছিল বরং কম তো নয়ই”(প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য, স্বামী বিবেকানন্দ পৃষ্ঠা ১১৩)। রামায়ন মহাভারত কিন্তু কাব্যের বই, ইতিবৃত্ত নহে। সত্য সত্য রাম ও যুধিষ্ঠির নামে কোন রাজা ছিল কি না, তাহা বলা যায় না (শ্রী সুরেন্দ্রনাথ সেন, এম এ, পিএইচ ডি, ডি লিট)। এ হচ্ছে ইতিহাস আর রামের অবস্থান। 

মনে রাখা প্রয়োজন মুসলিম বিপ্লবীরাই সর্বপ্রথম ভারতের বির্স্তীর্ণ অঞ্চলে সংঘবদ্ধভাবে ভারতবর্ষ হতে ইংরেজ বিতাড়নের জন্য সুদীর্ঘকাল ব্যাপী এক প্রশস্ত সংগ্রামে লিপ্ত হয়। এসব বিপ্লব আন্দোলনকে মুসলিম দ্বারা পরিচালিত ভারতবর্ষে প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম বলে উল্লেখ করা যায় (অমলেন্দু দে: বাঙ্গালী বুদ্ধিজীবী ও বিচ্ছিন্নতাবাদ, ১৩১ পৃষ্ঠা) (১৮৯ পৃষ্ঠা, গোলাম আহমাদ মোর্তজা, চেপে রাখা ইতিহাস)।  হযরত শাহ ওলিউল্লাহ ছিলেন সে যুগের ভারতের শ্রেষ্ঠতম আলেম। ১৭০৩ খৃ: তার জন্ম। তিনিই প্রথম চিন্তানায়ক আলেম যিনি ইংরেজকে ভারত থেকে তাড়িয়ে দেয়া জরুরী মনে করে সংগঠনের বীজ পুতেন। তার পুত্র, ছাত্র, ও শিষ্যগণ এ সুপরিকল্পিত সংগঠনের সভ্য ছিলেন। এভাবে প্রায় ১০০ বছরেরও বেশী সময় চলে মুসলিমদের এসব অভিযান। আজ বিজেপি চায় সেই মুসলিমদের ইতিহাস থেকে মুছে দিতে। সত্য মুচনের কি অপরিসীম প্রচেষ্টা আর মিথ্যা প্রতিষ্ঠার কি অসাধারণ প্রতিযোগিতা। এটি ভারতবর্ষ বলেই সম্ভব হচ্ছে। মুসলিম হয় লাশ আর গরু হয় দেবতা। ওদেশে অতীতে যুক্তি তথ্যের ভিত্তিতে ময়দানে যারা কথা বলেছে কাজ করেছে, তাদেরেই মাটিচাপা দিয়ে রাখা হচ্ছে।

এবার রায়ে দেখা যাচ্ছে ৩০ কোটি মুসলিমকে তাদের অধিকার ও ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছে। ২০০২ সালে গুজরাটে নির্দোষ কয় হাজার মুসলিম নিধনের মাধ্যমে ভারত তার আচরণকে বার বার স্পষ্ট করছে। গুজরাটে মুসলিমরা গোধরার আগুণের জন্য দায়ী ছিল না, কয় বছর পরের রায়ে সেটিও স্পষ্ট হয়। কিন্তু ইত্যবসরে লাশ হওয়া দুই হাজারের খেসারত পুরোটাই তাদের ঘাড়ের উপর দিয়ে যায়, বাকী আহত বিধ্বস্ত কত! সব সময়ই রক্তটা মূলত মুসলিমদের। এসব হচ্ছে সেদেশের সংখ্যালঘু মুসলিমদের দশা। বেশিরভাগ মানুষ জানেও না যে গোধরাতে মুসলিমরা কোনভাবেই জড়িত ছিল না, ট্রেনে তারা আগুণ দেয়নি। প্রথমে মুসলিম মারতে যত উৎসাহ থাকে ওরা নির্দোষ হলে ততটাই প্রচারে ভাটা পড়ে। ওসব ছিল সচরাচরের মতই পরিকল্পিত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। আসামী যখন করা হয় তখন বড় হেড লাইনে থাকে পত্রিকার প্রথম পাতাতে। ভারত এরকম আচরণ করে বিশে^র দেড়শত কোটি মুসলিমদের জন্য একটি কঠিন ম্যাসেজ ছুড়ে দিল। যেখানে বাবরী মসজিদ থাকার কোন তথ্য প্রমাণ পাওয়া যায় নি, সেখানে কিভাবে এরকম রায় বহাল হয়। যেন ঠিক গুজরাট দাঙ্গার মত ফের রায়ের দ্বারা পুনঃ অযোধ্যার অপরাধকে আইনসিদ্ধ করা হলো। মন্দির ভাঙ্গা যদি ইসলামের নীতি হত, ভারতে একটিও মন্দির থাকার কথা ছিল না। এক হাতে তলোয়ার আর অন্য হাতে কুরআন যারা বলেছেন তারা মিথ্যাচার করেছেন। এভাবে আচরণ করলে ভারতবর্ষে আজ একজনও হিন্দু থাকার কথা ছিল না আর মন্দিরের প্রশ্নই উঠতো না, যেখানে মুসলিমরা (১২০৬-১৭৭৪) পর্যন্ত শাসন করেছে। আর মন্দির ভাঙ্গা বাবরের প্রথম দিনই উৎখাত হবার কথা ছিল, কিন্তু ইতিহাস বলে বাবর ঐ মাটিতে সমাদৃত হন সুশাসক হিসাবে মর্যাদা পান।

মসজিদ নির্মাণের জন্য অন্যত্র ৫ একর জমি দিয়ে বিচারের স্বচ্ছতা বহাল রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। তার বদলে ঐ ৫ একর হিন্দুদের মন্দির নির্মান করার জন্য দিলে বিচারের স্বচ্ছতা বাড়তো। একটা কেন হাজারটাই নির্মান করুক। রায় মুসলিমরা মেনে নিয়েছে তবে সন্তুষ্ট হতে পারেনি। ১৫২৬ খৃষ্টাব্দে পানিপথের যুদ্ধ হয়। ইব্রাহিম লোদীর পক্ষে লক্ষাধিক সৈন্য থাকার পরও বাবর জয়লাভ করেন। বাবর একজন নিষ্ঠাবান মুসলিম ছিলেন। তার বুদ্ধিমত্তা, বীরত্ব, বিচার ক্ষমতা, দানশীলতা ও ধৈর্যের পরিচয় ইতিহাসে লিপিবদ্ধ আছে। মিঃ ভিনসেন্ট স্মিথ বাবরের প্রশংসা করে বলেছেন, “The most brilliant Asiatic Prince of his age and worth of high place among the sovereigns of any age or country” অর্থাৎ “এশিয়ার তদানীন্তন রাজাদের মাঝে বাবর ছিলেন খুব উন্নত এবং যে কোন যুগ অথবা যে কোন দেশের পক্ষে সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ একজন সমরাট।” আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, রাজনীতি ও কুটনীতিতে তিনি খুব পটু ছিলেন। মিষ্টার লেইনপুলও বলেছেন, “He is the link between Central Asia and India.”

বাবর তার আত্মজীবনী বাবরনামাতে নিজের দোষত্রুটিও বর্ণনা করতে দ্বিধা করেননি। এটা তার সততার পরিচয় বলা যায়। এ মহান মানুষটির সাথে বিধাতার মহামিলন অর্থাৎ পরলোকগমন হয় ১৫৩০ খৃষ্টাব্দে। (হুসাইনীর লেখা মোগল অ্যাডমিনিষ্ট্রেশন ও আরো মূল্যবান তথ্য বাবরনামাতে দ্রষ্টব্য)(চেপে রাখা ইতিহাসের ৮১ পৃষ্ঠাতে দ্রষ্টব্য)।  এসব সম্মানিতজনদের বিরুদ্ধে বেদনার অসংখ্য দাগ চিহ্ন ভারত তার জনতার কাছ থেকেও চেপে রেখেছে। মানুষকে ভুল ইতিহাস দিয়ে অভ্যস্ত করা হয়েছে আজও হচ্ছে। এ রায়ও যেন ভুল ইতিহাসের কথাই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। বিদগ্ধ লেখক আল্লামা গোলাম আহমাদ মোর্তজা সাহেব তার লিখিত বইসমূহে এসব অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রকাশ করেছেন। প্রকাশের অপরাধে তার লেখাকে যুগ যুগ অবদি বাজেয়াপ্ত করে রাখা হয়। তার কিছু গ্রন্থের নাম: ইতিহাসের ইতিহাস, পুস্তক সমরাট, এ সত্য গোপন কেন? বজ্র কলম, এ এক অন্য ইতিহাস, ইতিহাসের এক বিস্ময়কর অধ্যায়, বাজেয়াপ্ত ইতিহাস, চেপে রাখা ইতিহাস এসব উল্লেখযোগ্য।

“ভারতের দাঙ্গার জন্য দায়ী মিথ্যা ইতিহাস আর বিষাক্ত লেখক শ্রেণী”- আল্লামা গোলাম আহমাদ মোর্তজা। আজও গবেষকরা অযোধ্যাতে বাবরকে খুঁজে পেলেও রামের অস্তিত্ব খুঁজে পাচ্ছেন না আর তারা এরকম একটি (?) বিষয়ের উপর ভর করে বাবরী মসজিদটি গুড়িয়ে দিয়েছে। তারা গরুর দুধে ও গরুর মুত্রে সোনা খুঁজে পাচ্ছে কিন্তু সত্য খুঁজে পাওয়া অর্জিত স্পষ্ট ইতিহাসকে দুপায়ে দলে যেতে কার্পণ্য করছে না।

ভারতে মুসলিমদের বিরুদ্ধে প্রশাসন পুলিশের বিমাতাসুলভ আচরণ অতীতেও  লক্ষ্য করা যায়। আকবরের দেয়া উত্তরপ্রদেশের এলাহাবাদকে বিজেপি সরকার নতুন নামকরণ করেছে প্রয়াগরাজ, ৪৩৫ বছরের পূর্বে এলাহাবাদ নাম দেয়া হয়। গঙ্গা যমুনা এ জায়গায় মিলিত হয়েছে, এটি তীর্থস্থান ঠিকই কিন্তু ঐতিহাসিকরা ভিন্ন কথা বলছেন। প্রফেসর এনআর ফারুকী, এলাহাবাদ বিশ^বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ভাইস চ্যান্সেলর বলছেন বিভিন্ন ইতিহাসও প্রমাণ পঞ্জিকায় প্রমাণিত হয় যে, প্রয়াগরাজ কখনোই কোন প্রসারমান নগরের নাম ছিল না। কিছু কিছু সূত্রে জানা যায় এ নামে ছিল তীর্থস্থান। কিছু কিছু হিন্দু গ্রন্থে এ নাম পাওয়া যায় তবে কখনোই শহরের নাম ছিল না। তিনি আরো বলেন আকবর ১৫৭৪ সালে এ নামে নতুন করে শহরের পত্তন করে নামকরণ করেন ইল্লাহাবাদ। সেখানে তিনি দূর্গ নির্মান সহ উত্তর ভারতের সামরিক ও শাসন সুগঠিত করতে এর ভিত্তি স্থাপন করেন। পরের জেনারেশন একে ইল্লাহাবাদ বলতে শুরু করে, অতপর বৃটিশরা একে আল্লাহাবাদ বলে। স্থানীয় হিন্দি উর্দু সাহিত্যে এটি ইল্লাহাবাদ’ হিসাবে বহাল আছে (১৫৭৪-২০১৮)। এভাবে ক্রমে এটি এলাহাবাদ হয়েই জায়গা দখল করে। “এলাহাবাদ নাম চেঞ্জ করাতে আমার শহরের আত্মাকে বধ করা হয়েছে” বিজেপি এটি করছে গরুরক্ষার নামে মানুষ হত্যা থেকে শহর হত্যাও চালু রেখেছে। বৃটিশ কালীন ট্রেন ষ্টেশনের নাম ‘মোগলসরাই’ বদলে করেছে ‘দিনদয়াল উপাধ্যায়’। ‘ফয়জাবাদ ’ বদলে হয়েছে ‘অযোধ্যা’ (সূত্র: বিকাশ পান্ডে, বিবিসি নয়াদিল্লী, ৭ নভেম্বর ২০১৮)। এর প্রধান কারণ হচ্ছে ওখান থেকে মুসলিমদের নাম মুছে দিতে হবে। ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের এসব ইতিকথা। তারা চাইছে এভাবে যতটা পারা যায় চার পাঁচ শত বছরের মুসলিমদের শাসিত শহর নগরকে দাগ মুক্ত করতে।

এলাহাবাদ স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশেও ঐ স্থান উল্লেখযোগ্য। সেখানে অনেক হিন্দী লেখক রাজনীতিবিদ, অভিনেতা, বিজ্ঞানী ও সরকারী কর্মচারী অবদান রেখেছেন। “একটি ছোট জায়গায় এত যোগ্যরা অসাধারণ অর্জন জমা করেছেন সেখানে কে হিন্দু কে মুসলিম সেটি বড় ছিল না  – এটি তাদের সবাইকে অভিনন্দন জানায়”, প্রফেসর চতুর্ভেদী এটি বলেন। তিনি ঐ প্রয়াগরাজকে মানতে রাজি তবে এটি বাস্তবতা ঐ খানের মানুষ সব সময় নিজেকে এলাহাবাদের মানুষ বলেই জানে। ঐ শহরটি একটি তীর্থস্থান এটি সবাই জানে এটিকে প্রয়াগরাজ বলো আর না বলো। অনেকে ঐ নতুন নামকরণ মানতেও পারছে না। বরং তারা নিজেকে এলাহাবাদী বলতেই বেশী স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। তাদের একজন নামকরা উর্দু কবিকে তারা ‘আকবর এলাহাবাদী’ বলে ডাকে। এবার তাকে যদি ‘আকবর প্রয়াগরাজ’ বলতে হয় তবে সেটি বিশ^াস করতে খুব খুব কষ্ট হয়”। 

পৃথিবীর বুকে ইতিহাস শাস্ত্র মূলত মুসলমানদেরই জন্ম দেয়া, এটি বলা অন্যায় নয়। জনাব ইবনে খালদুন, জনাব আলি বিন হামিদ,  জনাব উৎবী, বাইহাকী, কাজী মিনহাজউদ্দীন সিরাজ, মহীউদ্দীন, মুহাম্মদ ঘোরী, জিয়াউিদ্দন বারনী, আমীর খসরু, শামসী সিরাজ, বাদশাহ বাবর, ইয়াহইয়া বিন আহমাদ, জওহর, আব্বাস শেরওয়ানী,  আবুল ফজল, বাদাউনি, ফিরিস্তা, কাফি খাঁ, মীর গোলাম হুসাইন, গোলাম হুসাইন সালেমী, সাইয়েদ আলী প্রমুখ। পৃথিবীর মূল ইতিহাস প্রায় সবই মুসলমানদের লেখা এবং বেশীর ভাগই আরবী ফারসী ও উর্দু ভাষায় সব তারিখসহ সব লেখকদের নামধাম গ্রন্থের নাম গোলাম আহমাদ মর্তুজার ইতিহাসের ইতিহাস গ্রন্থে এসেছে (গোলাম আহমাদ মর্তোজার বাজেয়াপ্ত ইতিহাস: ৫৩-৫৪ পৃষ্ঠায় দ্রষ্টব্য)।

গবেষনাতে দেখা যায় আইনত মন্দির ভাঙ্গার কাজ মুসলিম দ্বারা হয়নি। কিছু কিছু কারণে যেসব মন্দির ভাঙ্গা হয়েছে তার পেছনে অন্য কারণ জাড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। মসজিদ মন্দির ধ্বংস করা ইসলামের কাজ নয়। ইসলামের কাজ মানুষের মনের মন্দিরে প্রবেশ করে মানুষকে যুক্তির পথ আলোর পথ দেখানো। আর ভাঙ্গার কাজ করেছে প্রতিপক্ষরা তারা আজো সেটি ময়দানে করে দেখাচ্ছে। ভারত রাষ্ট্র ধর্ম তাদের স্বপক্ষে রায় বিলি করে তাকে হাতে কলমে প্রতিষ্ঠা করছে। 

কলামটি লেখার সময়: ৯ নভেম্বর ২০১৯ সাল।

এক স্বামী সবার পোল খুলল || এখানে রাম মন্দির ছিল না ||

Was Lord Ram born on Babri Masjid land? Prof Ram Puniyani explains conspiracy

(প্রথম আলোর একটি রিপোর্টের লিংক), বিশেষজ্ঞ মত: বাবরি মসজিদের নিচে মন্দির থাকার কথা মিথ্যা

পুনশ্চ: চোর পালালে অনেক প্রামাণ্য দাগ রেখে পালায়। রাম মন্দির সূত্রে বলছি সে সত্য অকপটে বলেই গেছেন রবীন্দ্রনাথ  উক্ত দুইছত্র কবিতার ছন্দে। অযোদ্ধায় রামের জন্মস্থান কোথাও খুঁজে না পাওয়া গেলেও ঐ কথাগুলি যা তোমার কল্পনার মনোজগৎ থেকে উৎসারিত হয়েছে, সেই মনোজগতই প্রকৃত সত্য, প্রকৃত ইতিহাস, বাস্তবতা নয়। তার সহজ মানে রাম ও অযোধ্যা বাল্মিকীর কল্পনার সৃষ্ট চরিত্র। রবীন্দ্রনাথ বাল্মিকীকে উদ্দেশ্য করে লিখেছিলেন, “তব মনোভূমি রামের জন্মস্থান, অযোধ্যার চেয়ে সত্য যেন এটি কবিতার সত্যকথন।  

 

 

বি দ্রষ্টব্য: লেখাটি নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত দি রানার পত্রিকায় ১৫ নভেম্বর ২০১৯ সংখ্যায় ছাপা হয়।

নাজমা মোস্তফা

শেখ হাসিনা কথায় কথায় জাতিকে স্মরণ করিয়ে দেন তার বাবা বাংলাদেশের স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন। যেখানে বলা হয় ৩০ লাখ বুকের রক্ত ঢেলে এ দেশবাসী দেশ স্বাধীন করেছে সেখানে এরকম একটি কথা বলে হাসিনা নিজেকে সংকীর্ণভাবে উপস্থাপন করেন। সংকীর্ণ চিন্তায় মুক্তিযুদ্ধের সাথে তিনি তার বাবাকে ও সারা জাতিকে অপমান করতে কখনো কার্পণ্য করেন না। মুক্তিযুদ্ধ তার বাবার জানার বাইরেই হয়। তিনি জানতেনও না দেশটি ইতমধ্যে স্বাধীন হয়ে গেছে কারণ তিনি ছিলেন পাকিস্তানের কারাগারে, তাও আবার স্বেচ্ছায় কারাবরণ করেছিলেন। এর পক্ষে তথ্য উপাত্ত সর্বত্র ধারে কাছের অসংখ্য সূত্রে প্রমাণিত হয়ে আছে। প্রয়াত সিরাজুর রহমানের কাছে ৩০ লাখের ভাষ্যও জমা রাখা।

আত্মসচেতন না থাকা একটি জাতির মৃত্যুর লক্ষণ। ময়দানের দালাল ব্যক্তিগুলি  বার বার লাত্থি গোতা খাওয়ার পরও বলে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনি এর বিচার করেন। পেট খাবাপ হলেও বলে বিচার করেন, মাথা ধরলেও বলে বিচার করেন। এই প্রধানমন্ত্রী নিজেই সব অপকর্মের মূল কার্যকারণ, যিনি নিজেই সকল দুর্যোগ দুর্ভোগের সূত্রকথা। তার কারণেই শাসন বিচার আইন সবই প্রশ্নবিদ্ধ। যেখানে ভাইরাস রোগের এমন বিস্তারে বিচার স্তব্ধ জটাবদ্ধ হয়ে আটকে আছে, সেখানে নির্যাতীতের পক্ষের বিচার আকাশ কুসুম কল্পনা মাত্র। তাকে কেউ সেধে কোন দায়িত্ব তুলে দেয় নাই। আগের রাতে ভোট চুরির গদি দখলদার হয়ে প্রতারণার খেলা খেলছেন। আর ইনিয়ে বিনিয়ে মান্নার কান্না আর রবের সরব হওয়া নিয়ে চুটকি কাটছেন।

ডাক্তাররা গোটা জাতির সেবক। সেখানে খালেদা জিয়ার জন্য নিয়োজিত প্রশ্নবিদ্ধ উর্দিপরা সরকারী চিকিৎসক কথা বলে হাসিনার শেখানো সুরে। উনার সাথে দেখা করতে হয় ১২টা একটার পরে। একজন ইনসুলিন নির্ভর রোগী কখনোই ১২টা পর্যন্ত নাটকের অপেক্ষায় থাকতে পারেন না। খালেদা জিয়া বলেন সকাল থেকে তাদের অপেক্ষায় থাকলেও তাদের দেখা মেলে না। এ হচ্ছে একজন তিনবারের প্রধানমন্ত্রীর চিকিৎসার দশা! এ মানসিকতার অবিশ^স্ত ডাক্তার যে কোন মুহূর্তে তার রোগীর জন্য ভয়ানক আতংক জমা করবে, এটি অবলীলায় বলা যায়। অনিয়ন্ত্রিত ডায়বেটিজ, হাইপারটেনশন, আর্থ্রাইটিজ, প্রতিটি জয়েন্ট শক্ত হয়ে যাওয়া , নড়াচড়া করতে না পারা, আলামত নির্দেশ করে তিনি পঙ্গুত্বের দিকে যাচ্ছেন আর তারা সত্যকে ধামাচাপা দিয়ে সরকারী দালালী চালিয়ে যাচ্ছে। সুস্বাস্থ্যের বানোয়াট সার্টিফিকেট বিলি করলেও আল্লাহর উপর ভরসা রাখতে শংকায় থাকছে ! সত্যের অপলাপ করে সরকারী ডাক্তাররা ডাক্তারী বিদ্যেকেও প্রশ্নবিদ্ধ করছে। কষ্টের কথাটি হচ্ছে গোটা জাতি আজ মুক্তিযুদ্ধের সাম্য মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের কথা ভুলে গেছে। সরকার তার নড়বড়ে গদি রক্ষার্থে সর্বত্র বেসুমার দালাল নিয়োগ দিয়েছে। উকিল মোক্তার ডাক্তার জমাদার পেশাদার সব কেনা দালালরা ময়দান গরম করছে। বাকী দেশ একদিকে আছে।

শোভন রব্বানীরা আওয়ামী লীগার হয়েও ধরা খায়। কারণ আবর্জনা বেশী হলে কিছু টয়লেট পেপার ডাস্টবিনের জন্য জমা হয়। দলবাজরা যখন সত্যের দাসত্ব করে না, তখন তারা বিবেকের কাছেও প্রশ্নবিদ্ধ হয় না। অতীতে দেখা গেছে এরা নিজ দলের ছাত্র মেরে লাশ জমা করে আন্দোলন চাঙ্গা করে। মানুষের যখন মানিবকতা হারিয়ে যায় তখন তারা দেউলিয়া হয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ে। জঙ্গলের বাঘ ক্ষুধার সময় তার বাচ্চাকে খেয়ে ফেলে। তাই এসব আচরনধারীকে পশুর তালিকায় রাখা হয়। পশুত্ব চর্চা ছাড়াও মানুষ আরো অনেক অপকর্ম করে বলেই তাদের জন্য বিচার বরাদ্দ, যদিও পশুর জন্য কোন বিচার বরাদ্দ নেই। মানুষকে বিবেক দেয়া হয়েছে বলেই পাপ পূণ্য সত্য মিথ্যার নিরিখে জবাবদিহিতার দায় রেখে বিচার মোকাবেলা করতে হবে তাদের। এসব কাজ করে প্রত্যেকে তাদের আমলনামা রেডি করছে, ফাইনাল পরীক্ষার জন্য। নীতিধর্মের কাজ হচ্ছে সব সময় অপরাধীকে চিহ্নিত করে শাস্তি দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে আপন পর বিচার করলেই দুষ্ট শাসক বিচারকের জন্য ফাঁসির রজ্জু রেডী হবে, দেরী নয়, সামনেই এবং শীঘ্রই। জাতির প্রতিটি ব্যক্তিকে জীবনের গভীর সত্যটি বুঝতে হবে। নয়তো সবাই শোভন, রব্বানী, সমরাট, সাকিবদের মতই ধরা খাবেন। এরা সরকারের চাটুকারী করেও বাঁচতে পারে নাই। এর বড় কারণ এরা সত্যকে নীতিকে মূল্যায়ন করেছে কম। এরা বৃহত্তর স্বার্থের কথা না ভেবে ব্যক্তি স্বার্থকেই বড় করে দেখেছে।

এখানে আবরার আর শোভন রব্বানি কিন্তু এক নয়। আবরারের পরিবারও আওয়ামী লীগ করতো কিন্তু রক্ত তর্পণের সময় লাল রক্ত হলেই হয়। তখন তারা শিবির বলে চালিয়ে দিতেও লজ্জাবোধ করে না। বিবেকের দংশনও তাদের নেই। দেশ বিপর্যস্ত আজ নতুন নয়, বহুদিন থেকে দেশ ডুবছে ক্রমে ক্রমে তলিয়ে যাচ্ছে, অনেক বড় বড় ক্রিকেটাররা  সেখানে টু শব্দটিও করে নাই, করতে পারে নাই, নিজ স্বার্থের উপরে দেশকে বড় করে দেখে নাই। এরা যত বড় ক্রিকেটার হোক, এরা আত্মসচেতন নয়। দেশ ডুবছে, তারা খেলছে। দেশ বড় না খেলা বড়? আবরার বড় না সাকিব বড়? মাশরাফিকে মানুষ শান্তিতে মাশাল্লাহ বলতে পারে নাই। কারণ তিনি নীতির কবর রচনা করে অনীতিকেই আলিঙ্গন করেছেন। তার মনুষ্যত্ব অল্প দামে বিক্রি হয়ে গেছে। তিনি সজ্ঞানে নিজেকে বিক্রি হতে দিয়েছেন। একজন মহৎ সাধু হাজার দুষ্টের থেকেও হাজার গুণ মূল্যবান। সাধু যখন দুষ্টের দলে যোগ দেয় তখন সে আর সাধু থাকে না, হয় দুষ্টের সহচর। খেলা পাগল ক্রিকেটাররা তাদের বিবেককে বন্ধক রেখে ক্রিকেটের স্বার্থে কথা বলাতে তাদের ফাঁসিয়ে দেয়া হলো। দুই বছরের আগের অপরাধও হুড়মুড় করে ত্বরিত গতিতে সাকিবের গলায় চেপে বসে। নয়তো শত অপরাধও ঢাকা থাকে, ওপেন হয় না। অনেকে নামকরণ করছে সবজান্তা গোয়েন্দা লীগ। গোয়েন্দার নামে যা ইচ্ছে তাই তারা করতে পারে। সব গোয়েন্দার খবর প্রধানমন্ত্রীর জানা তবে পাপনের ক্যাসিনো খেলার খবর বাদে। সম্প্রতি এটি জেনে তিনি আকাশ থেকে ধপাস করে পড়েছেন।

অপরাধের শাস্তি বিরোধী নিরপরাধের জন্য জমা রাখা। খালেদা জিয়ার মত সারা জাতি ভোগছে, দুর্ভোগ পোহাচ্ছে, ধুকে ধুকে মরছে। নুসরাত হত্যার পেছনের অপরাধী পুলিশ নিরাপদ। তাদের ধরা হয়না, অমিত সাহারা সাধারণত ধরা ছোঁয়ার বাইরে থাকে। এদের ধরতে সরকারের কষ্ট হয়। নরসিংদীর মহিলা এমপি বুবলী মোট আটজনকে দিয়ে তার নিজের পরীক্ষা দেয়ার মত ইতিহাস তৈরী করতে পেরেছে। সেটিই দেশটির অস্তিত্ব সংকট স্পষ্ট করছে, যেন বিশাল এক পদ্মাসেতু। ময়দানে পরীক্ষা দেয়ার সময়ও ঘটনাটি সবাই দেখেছে কিন্তু কারো সাহস হয়নি স্পষ্ট করে এর প্রতিবাদ করতে। কারণ তিনি মহিলা সাংসদ। এ হচ্ছে দেশটির বর্তমান অবস্থা। যে দেশ গড়ে উঠেছিল  মুক্তিযুদ্ধের সাম্য মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার উপর ভিত্তি করে, সে দেশ আজ এই অবস্থায় মুমূর্ষু দশা পার করছে। চারদিক আন্ধার দেখছে। ইয়া নফসি ইয়া নফসি করছে!

লেখার সময়:  ৩ নভেম্বর ২০১৯ সাল।

বি দ্রষ্টব্য: লেখাটি নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত আগামী সপ্তাহের ৮ নভেম্বর ২০১৯ সংখ্যার “দি রানার নিউজ” কলামে ছাপা হয়।

 

নাজমা মোস্তফা

ধারাবাহিক দুর্যোগের দেশ হচ্ছে বাংলাদেশ। গোটা জাতি এমন আচরণে নিঃসন্দেহ শংকিত। বাংলাদেশের মানুষ কি ফিলিস্তিনের ময়দানে ইসরাইলের বুলেটের মুখোমুখি আজ? একটি ভয়ংকর দুর্যোগ ময়দানে ঘটলে অতি সত্ত্বর পরেরটিও দেরী না করেই ঘটে যায়। পরবর্তী যেটি আসে সেটি যেন আরো বড় হয়ে আসে, আগেরটিকে ভুলিয়ে দেয়ার এটি মোক্ষম অস্ত্র। এক আবরারের পিছে শত শত আবরার আহত বিধ্বস্ত হয় আর একহালিএকজন (?) ইমাম আবরারের পথ ধরে লাশ হয়, পুলিশসহ দুই থেকে তিন শত আহত হয় । ভোলায় লাশেরা মিছিল করছে আর সচরাচরের মত দালাল মিডিয়ার কিছু সিলেক্টেড ব্যক্তি শিবির শিবির বলে চেঁচায়। পুলিশের মারমুখি আচরণ দেশবাসীকে আরো বিস্মিত করছে। পরিস্থিতি ভয়ঙ্কর অবস্থান পার করছে। বেশ আগে দেখা গেছে অপরিচিত জনতারা ভিন্ন ভাষার লোকেরা পুলিশের চাকরী নিচ্ছে। খবরে প্রকাশ ইসকন নামে হিন্দুত্ববাদীদের এক সংস্থার শংকিত আচরণে দেশের মানুষ বারে বারে নানান সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে। সংখ্যাগুরু মুসলিমদের দেশে এ সংস্থা শিশুদের হরেকৃষ্ণ হরে হরে বোল ছড়ানোর মঞ্চ নাটক, প্রিয়াসাহার অভিনব আস্ফালন, তার ভাঙ্গা পড়োবাড়ীতে তার নিজের দেয়া আগুন, সম্প্রতি বিপ্লব চন্দ্রের ফেসবুক আইডি থেকে আল্লাহ ও নবীকে নিয়ে কটুক্তির রেশ ধরে বিশৃংখলা বাংলাদেশে।

দেশের সংখাগরিষ্ট মুসলিমরা আজ  ভারতের সংখ্যালঘু মুসলিমদের মতই হিন্দুত্ববাদের মারমুখি আক্রমণে কেন? ভারতে হিন্দুরা উগ্রতাকে লালন করে বলে বাংলাদেশে কেন হিন্দুরা উগ্রতার পথ ধরবে? ঠিক এরকম সময়ে বাংলাদেশের পুলিশ কি কারণে অসাম্প্রদায়িক মুসলিমদের উপর হামলে পড়ে। অবস্থা দৃষ্টে ধর্মের নামে ভয়ংকর ম্যাসেজ মানুষের কাছে যাচ্ছে। এ দেশের মানুষ অতিরিক্ত অসাম্প্রদায়িক, এ তথ্যটি সারা বিশে^ সমাদৃত। ঐ নিরীহ গোষ্ঠীকেই এখন টার্গেট করা হচ্ছে কি কারণে? এমন একটি ঘটনার পরও চট্টগ্রামে মাদ্রাসার পাশে থাকা মন্দিরকে সুরক্ষার আগাম ব্যবস্থা করে মাদ্রাসার ছাত্ররাই। এ সুরক্ষা আজ নতুন নয়। মুসলিমরা এরকম সুরক্ষা দিয়ে আসছে যুগ যুগ অবদি। ভারতে বাবরি মসজিদ ভাঙ্গা হয় কিন্তু এরা ধৈর্যের পাহাড় গড়ে বড়জোর মিছিল করে প্রতিবাদ জানায়। তবে এটি ঠিক রাজনীতিকে নিজেদের দখলে রাখতে সবদিনই কিছু অসৎ নেতৃত্ব হিন্দুদেরে দাবার গুটির মত ব্যবহার করে এবং বেশির ভাগ হিন্দুরাও জেনেও না জানার ভান করে ওদের দাবার গুটি হয়ে নিজেদের জন্য লাভ জমা করে। লাভ এটিই জমে ইচ্ছেমত মুসলিমদের ফাঁসানো যায়। এসবের অনেক খবর ময়দানে আসলেও মিডিয়াতে জায়গা হয় কম। সে হিসাবে বাংলাদেশের গরিষ্ট মুসলিমরা ভারতের লঘিষ্ট মুসলিমদের মতই অনেক ক্ষেত্রে নিগৃহীত, এটি অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে এখানে হিন্দুরা আছে রাজসুখে, এটি সর্বজন স্বীকৃত।

আর একটি খবর চোখে পড়ার মত কিছু হিন্দুর বাড়ী ভাংচুর করা হয়, ভিডিওতে দেখি ও শুনি একদল অপরিচিত সন্ত্রাসী দ্বারা এটি করানো হয়। এ কান্ডটি বড় সময় থেকেই বর্তমান সরকারী দল করে এসেছে বিরোধীদলকে ফাঁসাতে ঠিক পেট্রোল বোমা ছোড়ার মত। নিরপরাধ বিরোধীর উপর দোষ চাপাতে তারা এটি করেছে অতীতে বারে বারে। বার্ণ ইউনিটে ভুক্তভোগী অসহায় গীতা রাণীরা এসব ষড়যন্ত্রের জবাব প্রধানমন্ত্রীর মুখের উপর ছুঁড়ে দিয়েছে। জাতি এসব ভুলে যায়নি। নিজেদের ছত্রচ্ছায়ায় হিন্দু পরিবহন সেক্টরের মালিকের বাসে আগুণ ধরে, প্রিয়া সাহাদের আগুণের মতই আগুন দেয়া হয় নির্দোষ মুসলিমদের ফাঁসাতে। এসব আজ লুকানো নেই। একই খেলা বার বার খেলা হচ্ছে। ন্যাড়াদের বেলতলাতে একবারই যাবার কথা কিন্তু বর্তমান সময়ে জনতাদের বার বার বেলতলাতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তাদের জীবনের দফারফা করতে। অজ্ঞাত পাঁচ হাজার ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে পুলিশের মামলা (বিবিসি বাংলা) হলেও মূল সন্দেহভাজন বিপ্লব বা জড়িত কে বা কারা তারা এখনো নিরাপদ অধরা, প্রকাশিত নয়। প্রকৃত আসামী ধরা পড়বে কি না বলা কষ্ট। ময়দানের সচেতনরা জাতির বিবেকরা এমন সংকট সময়েও অকপটে সত্য স্পষ্ট করছেন যদিও সরকার সবাইকে বেওকুফই মনে করছে। ১৮তারিখে পুলিশ স্পষ্ট করেছে যে শরিফ ইমন নামের দুই মুসলিম হচ্ছে মূল হ্যাকার। এটি বলা হলেও তাদের কোন অস্তিত্ব আজ অবদি নেই। পরে হয়তো জঙ্গি নাটকের মত ক্রস ফায়ারে এনে কোন নিরপরাধ সন্তানের মায়ের কোল খালি করা হবে।

অনেকেরই সন্দেহ এসবই ভারতীয় নাটকের অংশ। বিনামূল্যে পানি বিনামূল্যে ট্রানজিট বিনামূল্যে লাশ, সবই ৭১এর স্বাধীণতার অর্জন। ডাঃ জাফর উল্লাহ স্পষ্ট করেই বলেন ভোলার ঘটনাটি ঘটিয়েছে ভারতের “র”। তিনি বলেন উত্তপ্ত জনতা প্রশ্ন করলে ভারতের “র” এটি ঘটায় ঠিক রাশিয়া একদিন তার দেশের সংখ্যালঘু নির্যাতন ও পাশর্^বর্তীদের আক্রমণে বিধ্বস্ত হয় ও ভাঙ্গে। আজ পাশর্^বর্তী দেশ ভারতেও সে রকম আশঙ্কা বিচিত্র নয়। প্রধানমন্ত্রী ভারতে কি পেলেন কি দিলেন প্রশ্নে বিদ্ধ হওয়াতেই আবরারকে হত্যা করা হয়। তারপর আসে ভোলার কাহিনী। ভারত চুক্তির জটিলতা থেকে মানুষকে সরাতে এসব একের পর এক ঘটনা ঘটানো হচ্ছে। এর সবই পূর্ব পরিকল্পিত। ১৯৪৭ থেকেই বৃটিশ পরবর্তী শুরু থেকেই ভারত কাশ্মীরের মুসলিমদের উপর নির্যাতন চালাচ্ছে একইভাবে। তারা জাতিসংঘের নির্দেশ মত সেদেশে নির্বাচনও দিচ্ছে না। সম্প্রতি এসব স্পষ্ট করেন মুক্তিযোদ্ধা ডাঃ জাফর উল্লাহ। অমিত সাহা বলেছে বড় ভাইএর নির্দেশে আবরারকে হত্যা করা হয়েছে। এমন সংকট সময়ে মন্দির রক্ষার্থে মুসলিম সৈনিকরা পাহারা দিচ্ছে। বস্তুত এটিই ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা। একটি দেশের প্রতিটি মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত হতে হবে। এটিই ইসলামের সততা ও সৌন্দর্য্য।

একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায় সার্ট প্যান্ট পরিহিত কিছু গোন্ডা প্রকৃতির লোক ঢোকে নীচ থেকে লাঠি ছুড়ে ছুড়ে দিচ্ছিল মসজিদের দোতলায়। এবং পরবর্তীতে উপরে উঠে দাঙ্গার স্বরুপে নামে। ঠিক এরকম সময়ে কিছু মুসল্লিরা চিৎকার করে করে তাদের বাধা দেবার চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন। সেটিও স্পষ্ট দেখা গেছে। এটি সঠিক তদন্ত হলে অবশ্যই আসল ঘটনা বেরিয়ে আসবে। তবে তদন্তের নামে যদি অতীতের মতই একতরফা তদন্ত হয় পেট্রোল বোমার মত, বিএনপি সরকারের পতনের লক্ষ্যে যেভাবে আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের সম্মুখে মুফতি হান্নানদের দিয়ে বোমা হামলা করে আইভিসহ নিজদলের ২৪ জনকে হত্যা করা হয় ও ৫০০ জন আহত হয়। মৃত্যুর আগে হুজি নেতা মুফতি হান্নান এ সত্য প্রকাশ করে যান (১৪-০৫-২০১০ তারিখ, প্রথম আলোর বরাতে প্রকাশ)।  দরকারে সেটি পড়তে পারেন। (বিএনপি সরকার পতনের লক্ষে একুশে আগষ্ট ২০০৪, সচেতনের সন্দেহ প্রতিষ্ঠিত সন্ত্রাসীর দিকে!)

সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় তদন্ত ব্যতিরেকে অকস্মাৎ সরকার কেন অপরাধীর পক্ষে যোগ দেয়? এতে স্বভাবতই পুলিশের বন্দুক হুমড়ি খেয়ে পড়ে নির্দোষ মানুষ খুন করতে, হোক না এটি জনতার শাস্তিপূর্ণ মিছিল। কখন কিভাবে শাস্তিপূর্ণ প্রতিবাদ অশান্ত হলো, কার ইন্ধনে সেটি খুঁজে দেখা জরুরী। পরপর কয়টি ঘটনায়ই একই ম্যাসেজ বিলি করছে। বুলেট কেন কিভাবে কি কারণে এবং কখন হয় প্রতিবাদের অস্ত্র? সোস্যাল মিডিয়াতে ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায় কিভাবে একজন সাংবাদিক উর্ধতন পুলিশ কর্মকর্তাকে মিথ্যা বানোয়াট গল্প শিখিয়ে দিচ্ছে আর পরক্ষণেই পুলিশ কর্মকর্তা তোতাপাখির মত তা গড়গড় করে জনসমক্ষে প্রকাশ করছে। বেসামাল গদি দখলদার প্রধানমন্ত্রীও দেরী না করে পুলিশের অনুকরণে সেই সাংবাদিকের গল্পের অনুকরণে ময়দানে হাজিরা দেন। প্রচারে তিনি মুখর সবদিন। ঠিক যেন আবরার হত্যার সিসিটিভির লুকোনোর গল্পে তিনি যেমনি ছাত্রদের সামনে ধরা খান। সেদিন প্রশাসন চাইছিল সিসিটিভির ফুটেজ লুকিয়ে নিতে, সেটিও ভাইরাল হয়েছিল, প্রতিবাদী ছাত্ররা এটি স্পষ্ট করেছিল। একটি জিনিস সব সময় প্রধানমন্ত্রী অপরাধীকে বাঁচাতে ঢাল হয়ে দাঁড়ান। সেটি ২০০৯ সালের বিডিআর বিদ্রোহ থেকেই জাতি ময়দানে স্পষ্টভাবে পরখ করছে। ২০০৬ সালে লগি বৈঠা দিয়ে প্রকাশ্যে মানুষ মারার নীল নকশায় শেখ হাসিনার নির্দেশে যে তান্ডব হয়েছিল আজো তা মনে হলে জনতার বিবেক শিউরে উঠে। বিচিত্র কি ফেসবুকের বিপ্লব হয়তো ছিল শিকার ধরার টোপ। অল্প দামে কেনা কাকতাড়–য়া, মুফতি হান্নানের মত কেনা গোলাম, অল্প দামে কেনা শিকারের টোপ।  

এদেশে ভয়ংকর অপরাধ সমূহের বিচার মুখ থুবড়ে পড়ে থাকে, সুপথ পায় না। আদ্যপান্ত গোটা ঘটনায় মনে হচ্ছে অবশ্যই ডাল মে কুছ কালা হ্যায়। অপরাধী বিপ্লবকে শত পার্সেন্ট নিরাপত্তা দেয়া হলেও প্রতিবাদী আলেমদের নিরাপত্তা হুমকির মুখে, মৃত্যুই তাদের করুণ পরিণতি। তদন্তের অগেই সরকারী সাফাই তদন্তের কবর নিশ্চিত করে। অবশ্যই আগের পরের সব ফাইলই জমা আছে থরে বিথরে অদেখা বিধাতার আদালতে। একটি বুলেটের চেয়েও একটি নিরপরাধ মানুষের জীবনের দাম অনেক অনেক গুণ বেশী। 

লেখার সময় ২৬ অক্টোবর ২০১৯ সাল।

বি দ্রষ্টব্য: নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক ‘দি রানার নিউজ’ কলামে ১ নভেম্বর শুক্রবার ২০১৯ এ লেখাটি ছাপা হয়।

নাজমা মোস্তফা

এ প্রশ্নবিদ্ধ সরকারের নীতি হচ্ছে কলিজাতে কামড় না পড়লে কোন অবিচারের বিচার করে না। পরপর টানা দুই মেয়াদে মানুষ মরতে মরতে এই অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু বিচার হনুজ দূর অস্ত। অতি সম্প্রতি অনেকেই বলছে কোন বিশেষ কারণে সরকারের কলিজাতে কামড় পড়েছে, তাই শোভন রব্বানীরা আসামীর লিস্টে। সহজে এদের আসামী করা হয় না। অমিত শাহার রুমে আবরারকে মারা হলেও সে কোনভাবেই আসামীর খাতায় উঠে না। এখন এরা ধরা খেলে তারা বলছে উপরের নির্দেশে তারা এসব করেছে। উপরের মাত্রাটা কতটা উপর সেটি আল্লাহই জানে।

গত ৬ অক্টোবর আবরার কিছু চরম সত্য প্রকাশের অপরাধে নিহত হন। দেশবাসীদের কিছু মন্তব্য বিবেকের কথা বলে। যেমন “আবরারের লাশটা গণভবনে পাঠানো যায় না? আবরারের নিথর হাতের আঙ্গলের ফাঁকে থাকবে একটি চিরকুট। তাতে লেখা থাকবে, “হে স্বৈরাচারী, তুমি ক্ষমতাকে ভালোবেসে দেশ দিয়ে দিলে, আর আমি দেশকে ভালোবেসে জীবন দিয়ে গেলাম!” ভারতীয় আগ্রাসন বিরোধী প্রথম শহীদ আবরার। ফেনী নদীকে আবরার নদ করার দাবীও দেখলাম। একজন শেখ হাসিনাকে আবরারের ঘটনায় অতীত ইতিহাস মনে করিয়ে দিয়েছে। ব্লগার রাজিব হত্যার পর হাসিনা রাজিবের বাড়িতে গিয়ে রাজিবের মা বাবাকে বলেছিলেন জামায়াত শিবির একটি সন্ত্রাসী দল এদের রাজনীতি করার কোন অধিকার নেই। জামায়াত শিবিরকে নিষিদ্ধ করা হবে। এখন আবরারের বাড়িতে গিয়ে কেন বলতেছেন না ছাত্রলীগ একটি সন্ত্রাসী দল এদের রাজনীতি করার কোনো অধিকার নেই, ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ করা হবে।

৫২ সালের রফিক সালাম বরকতের লাশের উপর দিয়ে স্বাধীনতার গতিপথ নির্ধারিত হয়। কিন্তু ফেলানীর ঝুলে থাকা লাশ নিস্তব্ধ জাতিকে সম্বিত দিতে ব্যর্থ হলো জাতির উমিচাঁদ ঘষেটি বেগম মিরজাফরদের জন্য। প্রায় ৩০০ বছর থেকে এদের আত্মা মরে নাই, পুরোনো বোতলে নতুন মদের মতই এরা যুগে যুগে সচল থেকে জাতির কলিজাতে কামড় দিয়ে চলেছে। যার জন্য আবরার ১০০% নির্দোষ লাশ শিবির হয়ে ময়দানে হাজিরা দিচ্ছে। ঘটনাটি একটি বিষয় স্পষ্ট করলো নীতির দিকে শিবিররাই বাংলাদেশের পক্ষের শক্তি হলেও যারা এতদিন প্রতারণা করে বলেছে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি তারাই ক্রমে ক্রমে বিরাট দানবে পরিণত হয়ে দেশ বিরোধী নামে স্পষ্ট দাগ রাখছে। সবদিন খুনীরা আদর্শকে ভয় পায়। সব ভালো নীতির কাজ করে শিবির, আর সব খারাপ কাজ করে লীগ। এর কারণ একদল আদর্শের ধ্বজাধারী আর একদল গুম খুন ধর্ষন হত্যা ও মাদকের ধ্বজাধারী।

জাতির মূল অসুখের চিকিৎসা না করলে এসব মৃত্যু বন্ধ হবে না। ধানাই পানাই মার্কা সাময়িক বরখাস্তের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকবে। সিসিটিভির ফুটেজ লুকানোর কসরত করবে। সেন্ট্রির চোখে কিছুই ধরা পড়বে না। মেডিক্যাল রিপোর্টে কোন নির্যাতনের দাগ খুঁজে পাওয়া যাবে না। ভিসিরা রাজনীতির নামে শিক্ষাকে কবজা করে জাতিকে পঙ্গু করে দিবে। কারণ মূল অপকর্মীরা দলবলসহ বহাল তবিয়তে আছে থাকবে। মূল অপকর্মীদের না সরালে রোগের চিকিৎসা হবে না। শুদ্ধি অভিযান চলুক শুধু শোভন রব্বানীদের নয়, সমস্ত জাতির নষ্ট ভাইরাসকে বেছে বেছে পরিষ্কার না করলে এ জাতি ইতমধ্যে মেরুদন্ড হারা আত্মমর্যাদাহীন জাতিতে পরিণত হয়েছে। গোটা দেশকে অন্ধকারে রেখে অনির্বাচিত একটি ১০০% বিতর্কীত সরকার কেন চুক্তিতে সই করে, প্রতিবাদ করলে তাদের পোষা বাহিনী দিয়ে মানুষ মারে। জাতি ওটি জানে, আজ তারা কার কাছে বিচার চাইছে? ডাকাতের কাছে বাটপারের বিচার কি চাওয়া যায়? আরবার হত্যা ভোটের আগের রাতের ঘটনার পুনরাবৃত্তি, সুবর্ণচরের ধর্ষণের পুনরাবৃত্তি, ৫৭ সেনা অফিসার হত্যার মাধ্যমে বিডিআর বিদ্রোহের পুনরাবৃত্তি। প্রতিটি হত্যা মৃত্যুর দায় অবৈধ দখলদারের। সমস্ত জাতি মূলের পানে ছুটুক যদি জান মান নিয়ে বাঁচতে চায়। নয়তো আবরারের মতই সারা জাতিকে পিটিয়ে মারা হবে। কে কোন দল করে সেটি কোন বিষয় নয়। দলমত নির্বিশেষে  এটি আলামত মাত্র, সবাই মরবে, ইহ পরকাল দুই কালই ঝরঝরে হবে। সরকারের এ কলঙ্ক আরবার নদী হয়ে ফেনী নদীর নতুন নামকরণে রাজনীতি, ইতিহাস ভূগোল দখল করে রাখুক। চাপাতী লীগরাও সত্য ইতিহাসের অর্জনে জমা হচ্ছে।

যুগ যুগ অবদি মানুষ এ ইতিহাসের কথা জানবে। সরকারের দাপটিরা এতই সংঘবদ্ধ যে সিসিটিভির ফুটেজও তারা লুকিয়ে ফেলতে পারে, সরাতে পারে মিটাতে পারে, কমাতে পারে। এদের হাতে সিসেম ফাঁকের ভোটচুরি যাদুমন্ত্র। আবরারের লাশ সিড়িতে রেখে টিভিতে খেলা দেখে ছাত্রলীগের খুনীরা। পানি চুক্তিতে সমালোচনা করাতে আবরার হত্যা। পানি পানি চাইতে চাইতে মরেছে কিন্তু ওরা অবৈধপথে ভারতকে পানি দিলেও মরার সময় আবরার এক ফোটা পানি খুঁজেও পায় নাই। শারীরিক মানসিক তিন দফাতে তাকে মারা হয় ২২ জন নামধারী পদবীধারী দানব দ্বারা। এসব ধর্ম যার যার উৎসব সবার করা মদ্যপানের মহড়ার ফলাফল। প্রধানমন্ত্রী গর্ব করে বলেন আমি ছাত্র অবস্থা থেকে এভাবেই রাজনীতি শিখেছি। কিন্তু তার কাছের জনরাই বই লিখে স্পষ্ট করে গেছেন যে ১৯৯৬ সালের আগে তিনি কখনো কোন রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন না (মতিয়ুর রহমান রেন্টুর বই ‘আমার ফাঁসি চাই’ ৯০ পৃষ্ঠা)। ২০১৮ সালে মানুষ ভোট দেয়নি কিন্তু তিনি অকপটে বলে বেড়ান মানুষ ভোট না দিলে বিরোধীরা আমাকে গদিতে থাকতে দিত না। তিনি গদিতে থাকছেন এসব পেটুয়া বাহিনীর দ্বারা যারা পিটিয়ে সারা জাতিকে পঙ্গু অথর্ব করে রাখে। নির্দোষ বিরোধী নেত্রীকে কারাগারে ঢুকিয়ে তার উপর চরম অবিচারের সীমাহীন অনাচার চালায়। বিচার বিভাগও তার অধীনস্ত দাসত্বের শিকার। তার পছন্দের সুপ্রিম কোর্টের একজন প্রধান বিচারপতিও টিকতে পারেন নাই। সেখানে বিরোধী নেত্রীও কারাগারে, স্পষ্টভাষী সম্পাদকেরা বারে বারে কারাগারে গেছেন। সেখানে একমাত্র হলুদ সাংবাদিতা সমর্থনীয় ও পুরষ্কৃত।

সময়ে বিধাতাও বিরাগ হয়। বিধাতা চাইলে আবরারকে জীবিত রেখে দিতে পারতেন বাকী অনেকের মতই। কারণ সারা বছরই এভাবে টর্চার সেলে মানুষ ছাত্রদেরে পিটানো হয়। আর টর্চারের মাঝেও তারা বাঁচে। ফেরাউনের অত্যাচারে যখন নির্যাতীত মিসরবাসী প্রমাদ গুনছিল তখন মিসরে তাদের উদ্ধারকল্পে নবী মুসার জন্ম হয়। নজরুলের ভাষাতে ঘটনাটি কবিতার ছন্দে আনছি।

শুনিয়াছি, ছিল মমির মিসরে সমরাট ফেরাউন,

জননীর কোলে সদ্য প্রসূত বাচ্চার নিত খুন!

শুনেছিল বাণী, তাহারি রাজ্যে তারি রাজপথ দিয়া

অনাগত শিশু আসিছে তাহার মৃত্যু বারতা নিয়া।

জীবন ভরিয়া করিল যে শিশু জীবনের অপমান,

পরের মৃত্যু আড়ায়ে দাঁড়ালে সে-ই ভাবে পেল প্রাণ!

জন্মিল মুসা, রাজভয়ে মাতা শিশুরে ভাসায় জলে,

ভাসিয়া ভাসিয়া সোনার শিশু গো, রাজারই ঘাটেতে চলে।

ভেসে এল শিশু রাণীরই কোলে গো, বাড়ে শিশু দিনে দিনে,

শত্রু তাহারি বুকে চড়ে নাচে, ফেরাউন নাহি চিনে।

এল অনাগত তারি প্রাসাদের সদর দরজা দিয়া,

তখনো প্রহরী জাগে, বিনিদ্র দশ দিক আগুলিয়া!

রসিক খোদার খেলা, তারি বেদনায় প্রকাশে রুদ্র যারে করে অবহেলা।।

এমন সংকট সময়েও বিধাতার কাছে এ জাতির মুক্তির জন্য দোয়া চাইছি।

 বি দ্রষ্টব্য: ১১ই অক্টোবর ২০১৯ তারিখে নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত “দি রানার নিউজ” সাপ্তাহিকের কলামে এটি ছাপে।

নাজমা মোস্তফা

প্যারোলে জামিন বিক্রি হচ্ছে বাংলাদেশে। যদিও ক্রেতা নেই, বিক্রেতা চাইছেন প্যারোল দিতে। ৭৬ বছর বয়স্ক একজন তিন বারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে দরকষাকষি চলছে। বহুদিন থেকে যেচে যেচে বাদিপক্ষ বলে “প্যারোল নেবে গো” যদিও অধিকার না পাওয়া বঞ্চিতের দাবী এটি নয়। বিবাদিপক্ষ দয়া চান না, চান তার ন্যায্য পাওনা। এসব হতাশার কথা একবিংশ শতকে বাংলাদেশ শাসক বর্গের ইতিহাসে দাগ চিহ্ন হয়ে থাকবে। সরকার প্রধান দেশে ১০ টাকার টিকিট কেটে মানুষকে গোলক ধাঁধায় ফেলে পরক্ষণেই ছুটে যান বিদেশে চিকিৎসা নিতে। পক্ষান্তরে খালেদা জিয়া কোন সময়ই দেশের চিকিৎসায় হতাশ নন, তবে তার আবদার তার নিজস্ব চিকিৎসক ও হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়া,  যেখানে তিনি স্বচ্ছন্দ্য বোধ করেন। কিন্তু কোন এক অদৃশ্য কারণে এটি দিতে প্রতিপক্ষ নারাজ। এখানেই লুকিয়ে আছে গভীর শংকা, বিশ^াসহীনতা ও অপতৎপরতা। তাকে যেতে হবে সরকারের পছন্দের হাসপাতালে, যেখানে যেতে ডায়বেটিকসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত অসুস্থ খালেদা জিয়া স্বচ্ছন্দ্য বোধ করছেন না। এটি এমন একটি দেশ যেখানে তিনবারের প্রধানমন্ত্রীকেও উপযুক্ত মর্যাদা দেয়ার দরকার বোধ করে না মধ্য রাতের ভোটে জেতা সরকার। কিন্তু একজন সাধারণ নাগরিকেরও জামিন পাওয়ার মৌলিক অধিকার কেড়ে নেয়া  সরকারের জন্য শোভন কাজ নয়। মানুষ বা জাতি যখন মানবিকতা থেকে দূরে থাকে তখন মানুষ হিসাবে তাদের আর গর্ব করার কিছু থাকে না। এ মানসিকতায় জামিনের প্রশ্নে ভিন্ন ভাষায় প্রতিপক্ষের জবাব ‘নো কম্প্রোমাইজ’। কথাটি আদালতের কথা নয়, রায়ও নয়, এটি সরকারের মুখ নিঃসৃত প্রগলভ সংলাপ। অন্যদিকে নিজ দলের অপরাধীকে এরেস্ট না করে অপরাধীকে নজরদারীতে রেখে মন্ত্রীদের জবাব হচ্ছে ওয়েট এন্ড সি। এরা এতই দাপটি যে তাকে ধরতে সরকার সময় নেয়। সচেতনরা বলছেন দেশবিধ্বংসী চুক্তিগুলো দেশবাসীর কাছ থেকে আড়াল করার জন্যই এতসব চলমান মঞ্চনাটক, দৃষ্টি ঘোরাতে ট্রেনিং প্রাপ্তরা একই পথে হাটে। সব রসুনের কোয়ার মতই সব ডাকাত এক ধারায় প্রশিক্ষণ রপ্ত করে। প্রতারণার শেষ কৌশল জাতিকে বুড়ো আঙ্গুল দেখানো।

আল্লাহর হাতে অসীম ক্ষমতা, তারপরও আল্লাহ তার অধিনস্তের উপর অসীম নমনীয়, না চাইতেই আমরা রোদ বৃষ্টি আকাশ বাতাস সুজলা সুফলা সমৃদ্ধ ধনে দানে ধন্য হয়েছি। কিন্তু এত অর্জনের পরও উদ্ধত ফেরাউন নমরুদরা এর ব্যতিক্রম, উদারতায় মানবিকতায় এরা সবদিন কৃপণ। যুগে যুগে এভাবে ধরাকে সরাজ্ঞান করে শিরোপা নিয়ে দুই জাহানে তাদের নিজেদের ক্ষতি জমা করেছে। মুজিব পরবর্তী আওয়ামী লীগের ক্ষমতা দখল বেশীরভাগই প্রশ্নবিদ্ধ অথবা অবৈধ। কিছু মানুষ বোকার মত তাদের বিশ^াস করেছে, পরক্ষণেই বার বার ঠকেছে। এটি তার দলের চারপাশের ধারেকাছের পরিবারসহ গোটা জাতির বেশীর ভাগের ভালো করেই জানা। এ শংকাতেই তারা অবাধ ভোটে ভয় পায়, সাহস হারায়, আগের রাতে ভোট সারে। সাগরচুরি চাঁদাবাজি ধাপ্পাবাজির সব খানাখন্দক এদের ভিতর বাইরের খবর বারে বারেই ঘরের সাগরেদরাই খোলাসা করে গেছে। এবার সর্বশেষ ক্যালেঙ্কারীর নামে বিভিন্ন প্রকল্পের নামে মেডিক্যালের বই, ক্লিনারের বেতন, ঢেউটিন, রেলওয়েতে হরিলুট, বালিশ, পর্দা, বৈদ্যুতিক ক্যাটলী, বৈদ্যুতিক চুলা, রেফ্রিজারেটর, ওয়াশিং মেশিন, ড্রেসিং টেবিল, খাট. মেট্রেস, তোষক, সোফা, চেয়ারসহ ডাইনিং টেবিল, ভ্যাকুয়াম মেশিন, এসব প্রজেক্টে লাখ লাখ নয়, কোটি কোটি টাকার লুটপাট বানিজ্য উন্নয়নের জোয়ার হয়ে আছড়ে পড়ছে ময়দানে। সরকারের দাপটে মিডিয়া কত আর চেপে রাখবে। ফেসবুক ইউটিউবের যুগ, সারা উন্নয়নের বাটপারি জোয়ার হয়ে ভাসছে। এখানে হাজার লক্ষের কোন বিষয় নেই সাকূল্যে পেট ভরাতে সব কোটি কোটি টাকার কারবার। রাস্তার কংক্রীট হাতের ঠেলাতে উঠে আসছে, রডের বদলে বাঁশের বুনটে করা সেতু ধ্বসে পড়ে মানুষ মরছে। একটি বালিশ প্রকল্প ভবনের উপর উঠাতে এক হাজার টাকা, একটি বৈদ্যুতিক কেটলী উঠাতে ৩,০০০ টাকা, একটি ওয়াশিং মেশিন ভবনে উঠাতে ৩০,০০০ টাকা ধরা হয়েছে। লুটপাট কাহাকে বলে এটি কত প্রকার ও কি কি, এসব প্রশ্ন বেকুব হয়ে যাওয়া জাতির সামনে উদাহরণ হয়ে ঝুলছে। এরা যদি মাছ ভাত না খেয়ে স্বর্ণ খেত তবে তাদের এসব লুটপাটের যুক্তি মানা যেত। মানুষের এ ক্ষুধা, মৃত্যুক্ষুধা হয়ে সরকারকে উলংগ করে দিচ্ছে, একবার নয় বারে বারে।

শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ১১টি ভয়ংকর বড়সড় মামলা সরকারী আদেশে সরিয়ে নেয়া হয়েছে, তার লিস্টটা দেখলে আর টাকার পরিমাপ জানলে আপনাদের আত্মা শুকিয়ে যাওয়ার কথা। (১) নাইকো দুর্নীতি (২) মিগ ২৯ বিমানক্রয়ে দূর্নীতি (৩) কোরিয়ান ফ্রিগেট ক্রয়ে দূর্নীতি (৪) মেঘনা ঘাট বিদ্যুৎকেন্দ্র দূর্নীতি (৫) খুলনায় বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে ঘুষ গ্রহণ (৬) টুঙ্গীপাড়া স্মৃতিসৌধ নির্মাণে দুর্নীতি (৭) আজম জে চৌধুরীর ঘুষ গ্রহণ (৮) কাজী তাজুল ইসলামের ঘুষ গ্রহণ (৯) নূর আলীর নিকট থেকে ঘুষ গ্রহণ (১০) বেজপায় লবিস্ট নিয়োগে ঘুষ গ্রহণ (১১) নভো থিয়েটার নির্মাণে দুর্নীতি। পরিসর কমাতে আমি মোট টাকার সংখ্যাটি শুধু আনছি ১৪,৮৬২ কোটি টাকা। খালেদা জিয়া জিয়াউর রহমানের অনুদানের টাকা ব্যঙ্কে রাখলে সেটি কয়গুণ হয়, ২ কোটি হয়েছে ৬ কোটি মতান্তরে ৮ কোটি। এই অপরাধে তিনবারের প্রধানমন্ত্রীকে এরকম শাস্তি দিয়ে জামিন অযোগ্য করে রাখছে সরকার। ইয়াাসির আরাফাতকে স্লো পয়জনিংএর অভিযোগ উঠে তার মৃত্যুর পর, এর অনেক প্রমাণও পাওয়া যায়। একই কসরত কি এখানেও চালানো হচ্ছে, এ শংকা অনেকেই করছেন। আমরা জানি হিংসা মানুষকে ধ্বংস করে দেয়। তাই এটি শুধু খালেদাকেই ধ্বংস করছে না, বরং এসব কর্মকান্ডে হাসিনাসহ গোটা দেশই ধ্বংস হচ্ছে হয়েছে ধারণা হয় আরো হবে।

ভারতে গিয়ে সম্প্রতি বরাবরের মত অনেক দিয়ে এসেছেন, কিছু আনতে পারেন নাই। এসব দেনা পাওনা সম্পূর্ণ তার নিজের লাভ ক্ষতির উপর নির্ভর করে হয়। কারো মতামতের তোয়াক্কা করেন না, এসব প্রকাশও করেন না। কেউ বলেছে মূলা এনেছেন। এটিও তারা জানতে চাচ্ছে সত্যি কি তিনি মূলা আনতে পেরেছেন? আত্মপ্রচারে পারদর্শী প্রধানমন্ত্রী ভয়েস অব আমেরিকাতে গিয়ে বলে এসেছেন যেখানে দুর্নীতি সেখানেই অভিযান। সম্প্রতি শেখ হাসিনা বলেছেন নেতা হওয়ার আগে মানুষ হন। কথাগুলি খুবই সুন্দর কিন্তু ওটি কি তিনি পালন করেন? যে সব মামলাতে হাসিনা খালেদাকে ঘোলের জল খাওয়াচ্ছেন তার থেকে বহু বহু গুণ অপরাধে আক্রান্ত তিনি নিজে। রসুলের একটি হাদিসে এটি বর্ণিত হয়েছে একজন অতিরিক্ত মিষ্টি ভোক্তা তার কাছে বুদ্ধি নিতে আসে। নবীর নিজেরও ছিল খুব মিষ্টির প্রতি আসক্তি, তিনিও মিষ্টি পছন্দ করতেন। তার উত্তরটি ছিল যে এর পরিমাণ কমালে ভালো। কিন্তু রসুল নিজে মিষ্টি পছন্দ করতেন তাই তিনি জবাব দিতে কিছু সময় নেন। আগে নিজে মিষ্টি খাওয়া কমান এর পর উপদেশ বিলি করেন। কিন্তু দেখা যায় আমাদের সমাজে যারা অপকর্ম করে তারাই বেশী উপদেশ বিলি করে আত্মপ্রচার চালায়। এসব শুনলে মানুষের হতবাক হওয়া ছাড়া আর উপায় থাকে না। তার কথার সাথে উল্লেখিত লিস্টটি মিলিয়ে দেখলে দেশবাসী কি মন্তব্য করবেন সেটি আল্লাহই জানে ভালো। কিন্তু রসুলের নীতি অনুসারে আগে নিজের জীবনে প্রতিফলন করে তারপর উপদেশ বিলি বন্টন করলে সেটি সুস্থ রুচির পরিচয় বহন করে। সমস্ত জাতির একটি অধিকার আছে প্রতিটি যৌক্তিক অযৌক্তিক ইস্যুতে কথা বলার। ইসলামে একেই বলা হয়েছে জেহাদ। সত্য বলা, সত্য প্রচার করা, পালন করা মুসলিমদের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব ও কর্তব্য। তারা দেড় হাজার বছর থেকে এর প্রাকটিস করলে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জাতিতে পরিণত হতো।

অসুস্থ খালেদা জিয়ার জন্য সারা জাতি নিজেদের উদ্যোগে প্রাণ খোলে দোয়া করেন। তিনি নিজের কোন কাজই করতে পারছেন না। এটি খুবই কষ্টকর একটি সময়, যে কোন মানুষের জীবনেই এটি আসতে পারে। জাতির মুখে “আমার নেত্রী আমার মা জেলে থাকতে দেব না’ ‘জেলের তালা ভাংবো, খালেদা জিয়াকে আনবো’ ইহ ও পরকালে অর্জিত নিঃস্বার্থ দোয়া পাওয়া একজন মানুষের জীবনের সব চেয়ে বড় পাওনা। এটি সবার ভাগ্যে জোটে না। অনেকে মরেও সেটি পায় না। তিনি জীবিত অবস্থায় দেশবাসীর কাছ থেকে যে সম্মান পেলেন তার তুলনা হয় না। ধারণা হয় প্রতিটি বঞ্চিত নির্যাতীত মানুষের দোয়ার জরুর পাওনাদার খালেদা জিয়া। সবার শেষে অদেখা বিধাতার দেয়া একটি বাণীকে স্মরণ করছি। আল্লাহ অহংকারী মানুষকে বলেন, “আর মানুষের প্রতি তোমার চিকুব ঘুরিয়ে নিও না, আর পৃথিবীতে গর্বভরে চলাফেরা করো না। নিঃসন্দেহ আল্লাহ প্রতিটি উদ্ধত অহংকারীকে ভালবাসেন না (সুরা লুকমানএর ১৮ আয়াত)।

লেখার তারিখ = ০৪ অক্টোবর ২০১৯।

বি দ্র: লেখাটি নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত ‘দি রানার নিউজ’ সাপ্তাহিকে শুক্রবার ১১ই অক্টোবর ২০১৯ সংখ্যাতে ছাপে।

নাজমা মোস্তফা

আদমের সময় থেকেই ইবলিস ময়দানে উপস্থিত। বাংলাদেশের দখলদার সরকার বিরোধী দমনে যতই শক্তি দেখাক নিজ দলের পোষ্য সম্রাট সন্ত্রাসীদের কাছে সরকার রাজা নয়, প্রজা। কারণ এরাই অবৈধ দখলদারীত্ব সরকারের চালিকাশক্তি। সাত দেহরক্ষী নিয়ে চলা মাত্র একজন যুবলীগ নেতা জি কে শামিমরা অবৈধ সরকারের চালিকাশক্তি হয়ে প্রতিদিন ৫ লক্ষ টাকা ভাগ দিত আইন শৃংখলা বাহিনীকে, প্রতি মাসে ২৫ কোটি টাকা মন্ত্রী এমপিকে, ঠিকাদারী কাজ দেয়ার জন্য একজন প্রকৌশলীকে দিতে হয় মাত্র ১২ কোটি টাকা। এভাবে ৫ বছর চলছে, এদের পিঠ চাপড়ে বাহবা দিতে হয়েছে অবৈধ প্রশাসনকে। গদি টেকাতে নিজ দেশের মানুষের মুখের গ্রাস কেড়ে নিয়ে প্রতিবেশী দেশ বিধ্বংসী অপকর্ম ও বর্ডারে লাশ যোগানদারদের পাতে টন টন ৫০০ টন লোভনীয় উপহার তুলে দিতে হয়। মূল দুষ্টদের বাঁচাতে দখলদারীত্ব টিকাতে প্রধানমন্ত্রী দেশসেবার নামে যা ইচ্ছে তাই বলে বেড়াতে পারেন, তার মুখে লাগাম দেয়ার কেউ নেই। জনগণ আমাকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় বসিয়েছে, বলতেও প্রধানমন্ত্রীর মুখে আটকায় না। সারা দেশে একই সমাচার, ডাকাত ধরা পড়ছে, দ্বিগুণ উৎসাহে তারা প্রচার করছে অপদখলের জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। এরা এমন এক তরবারী এটি ধারেও কাটে আবার ভারেও কাটে, এ চাকুর দুদিকেই প্রচন্ড ধার। জাহান্নামের তালিকা হাতেও খুশীতে তালিয়া বাজায়, ইবলিসের সর্দার হতে পারছে ঐ খুশীতে। এরা গঙ্গার পানিতে ধোয়া তুলসিপাতা, সার্টিফিকেট নিজেদের করা।

শিকড় থেকে শাখা প্রশাখা কান্ড মূল সব এক ইবলিস প্রজাতি। তৃণমূল থেকে চূড়াতে পৌছা ৯৫% মুসলমানের দেশ আজ আইয়ামে জাহেলিয়াতের মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে অনেক অনেক আগে, লগি বৈঠাতে ইবলিসের জগতসেরা তারা। শেষ জামানার এ এক অসাধারণ নমুনা। প্রিয় নবী মোহাম্মদ (সঃ) নিজেই ছিলেন একজন শেষ জামানার নবী, তার পরে আর নবী নেই। তাই সে হিসাবে তিনি শেষ ধ্বংসের নিকট সময়ের নবী। এদের প্রভাবে তার স্বগোত্রীয় মুসলিমরা সততা, নীতি আদর্শের কথা ভুলে গেছে, শেষ সময়ে এরা কুরাইশের আদলে ময়দানে হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। বদর ওহুদ খন্দক চলছে। ডোবাতে কুচি কুচি করে টাকা কেটে কেটে ফেলা এক দুই বস্তা নয় কাড়ি কাড়ি গাড়ি গাড়ি বস্তা। একটি বাবার মেয়ে তার বাবার নাম ডুবিয়ে সারা জাতিকে নিয়ে এমন এক খেলায় মত্ত যেখানে এ ধর্মের সব দাগ চিহ্ন নীতি নৈতিকতা শেষ অবস্থানে। বাকী দেশের ভেতরে ধড়পাকড়ের মঞ্চ নাটক চলছে। বর্তমান সময়ে ইবলিস এদেশে আটকায় না, অবাধ স্বাধীনতা সুখ সম্ভোগে সময় পার করছে। একই সময়ে সাধুরা এদেশে ইজ্জত নিয়ে বাস করতে পারছেন না। এমন সংকটেও যে পুলিশ সদস্য সত্য প্রকাশ করছে তার চাকরি চলে যাচ্ছে, আবার ঐ পুলিশের ছত্রচ্ছায়ায়ই শক্তির তলানীতে নেপালী ভাড়াটে জোয়াড়েরা নিজদেশে স্বসম্মানে সমস্যা মুক্ত হয়ে চলে যেতে পারে। বালিশ উঠছে পর্দা পড়ছে, সবখানে কোটি কোটি টাকার খেলা। দুষ্টদের সাওয়ালরা ফোনে সাধুদেরে হুমকি ধমকি দিচ্ছে। ইবলিস যা কিছু করবে, তার সব কিছুই করা হচ্ছে এই বাংলাদেশে। যুগে যুগে শক্তির তলানীতে ইবলিসরা এভাবে কাজ করে গেছে, এ খবর দেড় হাজার বছর আগেই দেয়া হয়েছে। ইবলিসরা ছলে বলে কলে কৌশলে রাজ ক্ষমতা ধরে রাখতে পারে। কুরআন এদের পরিচয় স্পষ্ট করেছে এরা হবে অহংকারী অগ্নিমূর্তি, আচরণ দেখে ইবলিস চেনা যায়। এই ইবলিসদের কারণে ইমাম আবু হানিফা শান্তিতে মরতেও পারেন নাই, কারাগারে অবর্ণনীয় নির্যাতনে মারা গেছেন।

এভাবে ধর্মের সিলেবাসে দুষ্টের কৃতকর্মের জমা নির্দিষ্ট করা আছেই, যদিও চোরা না শোনে ধর্মের কাহিনী। আল্লাহর কথা দিয়েই শিষ্টাচারী মানুষদের স্মরণ করিয়ে দেই, আল্লাহ সব জানেন যা তারা লুকায় ও প্রকাশ করে (সুরা বাক্কারাহএর ৭৭ আয়াত)। এদের মাঝে নিরক্ষর তারা যারা উপকথার বেশী জানে না, এবং আন্দাজের উপর চলে (ঐ, ৭৮ আয়াত)। তাদের জীবনে মন্দ অর্জন করবে, যে অর্জনে পাপ তাদের ঘিরে ধরবে, এরা হচ্ছে আগুণের বাসিন্দা, তাতে থাকবে দীর্ঘকাল (ঐ, ৮১ আয়াত)। যারা আখেরাতের বদলে ইহকাল খরিদ করে অপকর্ম করছে তাদের উপর শাস্তি লাঘব করা হবে না, কোন সাহায্যও দেয়া হবে না (ঐ, ৮৬ আয়াত)। এসব বাণী দুর্বৃত্ত ছাড়া আর কেউ অস্বীকার করবে না (ঐ, ৯৯) আয়াত)। সামনে এমন দিন আসছে যখন কেউ কাউকে সাহায্য করতে পারবে না, কারো সুপারিশে কোন কাজ হবে না। এরা সাহায্যও পাবে না (ঐ, ১২৩ আয়াত)। এটি ঠিক অবিশ^াসীকে ক্ষনিকের জন্য ভোগ করতে দেয়া হবে। তারপর তাদের তাড়িয়ে নেয়া হবে আগুণের নিকৃষ্ট গন্তব্যের শাস্তির দিকে (ঐ, ১২৬ আয়াত)। পূর্ব পশ্চিমে মুখ ফেরানোর নাম ধর্ম নয় (ঐ, ১৭৭ আয়াত)। আল্লাহ খুব দয়ালু তবে প্রতিফল দানে বড়ই কঠোর (আর ইমরানের ১১ আয়াত)। গ্রন্থধারীদের মাঝে এমন লোকও আছে যার কাছে একগাদা জিনিস গচ্ছিত রাখলে সে ফিরিয়ে দেবে আবার এমন লোকও আছে যে তার বিপরীত কিছুই ফিরিয়ে দিবে না (ঐ, ৭৫ আয়াত)। গ্রন্থধারীও সত্যের সাথে মিথ্যাকে মিশায় আর জেনে শুনে সত্য লুকায় (ঐ, ৭১ আয়াত)।

মেগা দুনীতির জবাব দেয়া হবে মেগা শাস্তি দ্বারা। কোন মানুষ এরকম বিচার করতে সক্ষম নয়, প্রতিদান দিতেও সক্ষম নয়। কারণ বলা হয়েছে সেদিন বালি পরিমাণও কারো প্রতি অবিচার করা হবে না। বালিশ দূর্নীতি, পর্দা দুর্নীতি, রেলওয়ে প্রকল্পের দুর্নীতি, পুলিশ, আইন বিচার বিভাগকে কবজা করার মিথ্যাচারী দুনীর্তি, গুম খুন, চাঁদাবাজি, ক্যাসিনো বানিজ্য, ধর্ষণ, মজুতদারী, নেশাখোরী, লুটপাট, প্রশিক্ষণের নামে আনন্দ ভ্রমণ, জনতার সম্পদ তসরুফ, সব পাই পাই হিসাব দিতে হবে সোনাচান্দ পাখিদের। জাতির মেগা সাধুরা ময়দানে নেই দেখেই মহা আয়োজনে এরা জাতির অর্থনীতিকে খুবলে খুবলে খাচ্ছে। আমরা মানুষরা প্রতিনিধিত্ব করছি আল্লাহর, আমরাই তার খলিফা তার আদেশ মানছি, তার সার্বভৌমত্ব স্বীকার করছি। সব পাই পাই হিসাব তাকে বুঝিয়ে দিতে হবে। আদম আর ইবলিসের গল্পটি দিয়ে মানব জীবনের শুরুতে আল্লাহ এ গল্প বলে দুনিয়ার খেলা শুরু করেছেন। এখানে এ দুজনার গল্প সাজানোর পেছনে বিধাতা গভীর প্রজ্ঞার মাধ্যমে বিবেক সম্পন্ন মানব সম্প্রদায়ের চিন্তাশীলদের কাছে ম্যাসেজ বিলি করেছেন আর বারে বারে বলেছেন তোমাদের উভয়ের বিচার হবে। এটিও স্পষ্ট করা হয়েছে বেশীর ভাগ মানুষ হবে ইবলিসের অনুসারী অল্প মানুষ থাকবে সৎপথ প্রাপ্ত সুপথের কারিগর ধৈর্যশীল সততায় অটল। ইবলিস তাদেরে কারাগারে ঢুকায় বারে বারে। ইবলিস ভালো করেই জানে তার পরিণতি কত ভয়ঙ্কর! একদিন ছুটির ঘন্টা বেজে উঠলে সব পন্ড করে খেলা শেষ ঘোষনা করা হবে যদিও আমরা জানি না সেটি কখন হবে। তবে বলা হয়েছে, বেশী দূরে নয়, হঠাৎ করেই এটি সংগঠিত হবে কেউ ধারণাও করতে পারবে না। কুরআনের শপথ নিয়ে কথাগুলি বললাম সুরা ইয়াসিনের দ্বিতীয় আয়াতে বলা হয়েছে এটি এমন ‘একটি গ্রন্থ যেটি জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় পরিপূর্ণ। বিবেক সম্পন্ন মানুষরা যেন তাদের বিবেক দ্বারা পরিচালিত হয় এ আশায় কলামটি শেষ করছি।

লেখার তারিখ= ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯।

বি দ্র: এ লেখাটি নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক দি রানার নিউজ সংখ্যায় ৪ অক্টোবর ২০১৯ তারিখে ছাপা হয়।


নাজমা মোস্তফা

মনের গোপন কোণে অনুসন্ধানের স্পৃহা ছিল প্রকট তাই ময়দান চষে বেরিয়েছি ইতিহাসের খানাখন্দকে ঘুরে ফিরে। মুসলিমরা সাড়ে পাঁচশত বছর শাসনের পরও কি কারণে ধ্বসে গেল মসনদ, এটি সবার জানা। প্রথম কয় বৎসর ইংরেজরা মুসলিম বিচারকদের রাখলেও ক্রমে ক্রমে উচ্চপদস্থ পদগুলিতে মুসলিমদের পদগুলি তারা ইংরেজদের নিয়োগ দিতে থাকে। ইংরেজের আগমনকে হিন্দুরা সাদরেই বরণ করে। এদেশে শিকড় গাড়তেও নেপথ্যে হিন্দুদের অপকর্মের অনেক দাগ ছিল। এর বড়দাগের প্রমাণ ছড়িয়ে আছে খোদ কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অনেক ভাবে কল্পনায় কবিতায় আচার আচরণে। এটি বৃটিশরা বার বার স্বীকার করেছে যে হিন্দুদের কারণেই তারা ঐ দেশে শিকড় পোক্ত করতে পেরেছে। ১৮১৩ সালে সিলেক্ট কমিটির এক প্রশ্নের জবাবে স্যার জন ম্যালকলম বলেন, আমাদের প্রতি হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকদের অনুরক্তি আমাদের ভারত সামরাজ্যের নিরাপত্তার প্রধান উৎস (এ আর মল্লিক ১৪৩ পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য)। ঐ সময়ে সিলেক্ট কমিটির এক সাক্ষ্যে ক্যাপ্টেন টি মাকানও একই মন্তব্য করেন। কর্নেল টমাস মনরো এটিও বলেন যতদিন হিন্দুরা আমাদের অনুরক্ত থাকবে ততদিন মুসলিমরা অসন্তুষ্ঠ থাকলেও আমরা এদেশে দন্ড ঘোরাতে পারবো (ঐ)। গভর্নর জেনারেল লর্ড এলেনবারা হিন্দুদের খুশী করতে মুসলিমদেরে আঘাত করতেও দ্বিধাবোধ করেন নাই। ফার্সি মুসলিম অভিজ্ঞদের ভাষা হলেও বৃটিশরা হিন্দু শিক্ষকের কাছে ফার্সি শিখে হিন্দু মনোরঞ্জন বহাল রাখে। মুসলিমদের ফকির বিদ্রোহ, তিতুমীরের বিদ্রোহ, সিপাহী বিদ্রোহ ও সীমান্তের জিহাদে তাদের কার্যকলাপে বৃটিশরা শংকিত ছিল এবং কোম্পানীর শাসন প্রলম্বিত হওয়ার পেছনে হিন্দুদের দেশ বিরোধী কর্মকান্ড সুস্পষ্ট থাকলেও একমাত্র মুসলিম মিরজাফরের ঘাড়েই সেটি চেপে রাখা হয়েছে। আর ইত্যবসরে রবীঠাকুরগংসহ বাকীদের সকল নীচতাকে কবর দিয়ে মনগড়া ভুল ইতিহাস চালু রাখা হয়েছে। বৃটিশরা যে মুসলিম দমন নিপীড়ন করেছে সেটি তারা তাদের লেখনীতেই প্রকাশ করে গেছে। আর হিন্দুরা যে তাদের সাথে তালিয়া বাজিয়ে গেছে সেটিও ঢাকা থাকে নাই। দৃশ্যতঃ খোলসের আড়ালে থেকে কথা বলে হাতজোড় করে নমঃ নমঃ ভঙ্গিতে প্রকৃত ক্রুড় স্বভাব চাপা পড়ে যায় না। বৃটিশরা মুসলিমদের বিচারিক দক্ষতা, সততা, ন্যায়বোধ জনিত বস্তুনিষ্ঠতার কারণে বৃহত্তর স্বার্থে কাজী, মুফতি, মৌলভী ও এরকম কিছু পদের কর্মচারীদের অনিচ্ছা সত্ত্বেও কিছুদিন রাখতে বাধ্য হয়। এভাবে রাজভাষা ফারসি থেকে তারা ক্রমে ক্রমে ইংরেজীতে প্রত্যাবর্তন করে।

মুসলিমদের ধ্বংস করতে তাদের হাতে সাজানো শিক্ষা ব্যবস্থায় ধর্মীয় সব দাগ মুছে দেয়ার প্রচেষ্টা চলে। যদিও মুসলিমরা সব সময় ধর্মীয় শিক্ষাকে অত্যাবশ্যকীয় বলে মনে করতো। মুসলিমদেরে ঠেকাতে ঐ সময় শুধু ভাষা নয়, পাঠ্যক্রমেও হিন্দুয়ানী জুড়ে দেয়া হয়। মুসলিম শিশুরা যাতে মনের দিক থেকেও হিন্দু হয়ে গড়ে উঠে সে প্রচেষ্টা চলে। ওদিকে পাঠ্যপুস্তকে জুড়ে দেয়া হয় রামের গল্প, শ্যামের গল্প, হরির কাহিনী কৃষ্ণের চরিত্র, যদু মধু, শিব ব্রহ্মা রাম হরি, এসব নামেই পাঠ আরম্ভ হয়। স্বরস্মতি বন্দনা, মনসা মঙ্গল এসব যখন বিদ্যালয়ের অংশ হয় এবং সেটি মুসলিম ছাত্রছাত্রীকেও বন্দনা গীতি গাইতে হয় তখন স্বভাবতই তারা শিশুকালেই চরম আঘাত প্রাপ্ত হয়। সাহিত্যে বাংলা ভাষায় মুসলিমদের অবদান অনস্বীকার্য, ইরানী সাহিত্যের সাথে সম্পৃক্ত বাংলা সাহিত্যের অনবদ্য হাতেখড়ির অবদান তারা রাখে সুলতানী আমলেই। সুলতানী আমলে বাংলা ভাষার যে বৃদ্ধি ও প্রচার হয় তাকে ইংরেজ আমলে শিকল পরিয়ে ওলট পালট করা হয়। ফারসির বদলে সংস্কৃতকে চাপিয়ে দেয়া হলো ভারতবাসীর উপর। সংস্কৃতবহুল না হলে হিন্দু প্রকাশকরা আরবী ফারসির শব্দ যুক্ত লেখা প্রকাশ করতেন না। এ নিয়ে সাহিত্যে খোদ রবীন্দ্রনাথের সাথে নজরুলেরও বাকবিতন্ডার কথা উঠে এসেছে। নজরুলও আক্রান্ত হলে জবাবে বলেছেন আমি কথায় কথায় রক্তকে ‘খুন’ বলে অপরাধ করেছি। আজ আমাদের মনে হচ্ছে আজকের রবীন্দ্রনাথ আমাদের সেই চিরচেনা রবীন্দ্রনাথ নন। তার পেছনের বৈয়াকরণ পন্ডিত এসব বলাচ্ছে তাকে। আমি শুধু খুন নয়, বাংলায় চলতি আরো অনেক আরবী ফারসী শব্দ ব্যবহার করেছি। আমি মনে করি বিশ^ কাব্যলক্ষীরও একটি মুসলমানি ঢং আছে। ও সাজে তার শ্রীর হানি হয়েছে বলে আমার জানা নেই। বাংলা কাব্যলক্ষ্মীকে দুটো ইরানী ‘জেওর’ পরালে তার জাত যায় না, বরং তাকে আরো খুব সুরতই দেখায়। আজকের কাব্যলক্ষ্মীর প্রায় অর্ধেক অলঙ্কারই তো মুসলমানী ঢংএর। — হৃদয়েরও খুন খারাবী হতে দেখি আর তা শুধু মুসলিম পাড়া লেনেই হয় না।’ এভাবে ঐ অস্বাভাবিক গতি প্রকৃতির কারণেই মুসলিমরা প্রতিনিয়ত বিপদগ্রস্ত হয় এবং বিদ্যালয়ে যেতে নিরুৎসাহী হয়। পেছনে পড়ে যার , এর মূলে কাজ করেছে বৃটিশ হিন্দু জোটের জট জটিলতা।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় মুসলিমরা ভারতবর্ষে শিক্ষা দীক্ষায় চিন্তায় অনেক উন্নত ছিল। বিদ্যা অর্জন তাদের জন্য অবশ্য করণীয় ধর্ম। আকবরের শিক্ষা বিষয়ক আইনে পাওয়া যায় ‘প্রত্যেক বালকের জন্য নীতিজ্ঞান, অংক, কৃষি, পরিমাপ বিদ্যা, পদার্থবিদ্যা, রাসায়ন ও ইতিহাসের জ্ঞান জরুরী ছিল। আবুল ফজল বলেন, এই আইনের বলে মাদ্রাসাসহ বিদ্যালয়গুলি উজ্জ¦ল আলোতে ভরে উঠে। জেনারেল শ্লীম্যান এটি স্বীকার করেছেন যে ভারতীয় মুসলিমরা যেভাবে শিক্ষিত হতো এ ধারায় পৃথিবীর খুব কম সম্প্রদায়ই শিক্ষা লাভ করেছে। গ্রীক ও ল্যাটিন থেকে অনুদিত আরবী ও ফারসি ভাষাতে তারা ব্যাকরণ, তর্কশাস্ত্র, এমনভাবে আয়ত্ব করতো যে, অক্সফোর্ড ফেরত যুবকদের সাথে তারা সমান তালে অনর্গল সক্রেটিস, এরিষ্টটল, প্লেটো, হিপোক্রেসিস, গেলেন ও ইবনে সিনা সম্বন্ধে আলোচনা করতে পারতো। সাত বছরের নিরলস প্রচেষ্ঠায় তারা শিরোস্ত্রাণ পরিধান করতো। শ্লীম্যান,উইলিয়াম হান্টার এরা স্বীকার করেছেন মুসলিমদের শিক্ষা অন্যদের থেকে বহু উন্নত ছিল। খুব কৌশলে মুসলিমদের হটিয়ে দিতে বৃটিশ হিন্দু জোট প্রতিপক্ষরা এমন কিছুই বাকী রাখে নাই, ঐ ষড়যন্ত্রে কাজ করে গেছে। তাই আজও প্রায় প্রতিটি সেক্টরেই অতীত ঐতিহ্য হারিয়ে বৃটিশের চক্রান্তে সাজানো পাঠ্যসূচিসহ অনেক কিছু লেজে গোবরে অবস্থানে আছে। যদিও অতীতের পন্ডিতেরা ময়দানে নেই, কিন্তু ঐ গোপন চাল আজো বাংলাদেশের নতুন জনমে কুটবুদ্ধি আকারে চাপিয়ে দেয়ার প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়। কিছু চিহ্নিত দালালরা আজো শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঐ আদলে মূল শিকড়হীন ভাবে মুসলিমদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে সাজাতে চায়।

সেদিন কৌশলীরা নিষ্কর জমি বাজেয়াপ্ত করে তাদের উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থায় ধ্বস আনে। এতে রাজ্যহারা বিত্তহীন মুসলিমদের পক্ষে শিক্ষার ব্যয়ভার বহন করা কষ্টকর হয়ে পড়ে। মুসলিমদের হাত থেকে সবকিছু কেড়ে নেয় তারা ধন জন বল শিক্ষা দীক্ষা চাকুরী সব। মুসলিম প্রতিষ্ঠানগুলির দান সম্পত্তি সরকার ভিন্নখাতে ব্যবহার করে। হাজী মোহাম্মদ মহসিনসহ মুসলিমদের সব দান ধন অর্জনকে উদরস্থ করে তারা। এডাম তৎকালীন সরকারের সমালোচনা করে বলেন, এই আত্মসাতের অভিযোগ সম্বন্ধে আলোচনা বড়ই কষ্টদায়ক, কারণ এ অভিযোগ অগ্রাহ্য করা অসম্ভব। এডাম এটিও বলেন ছাত্রদেরে প্রতিদিন হাটুগেড়ে নত মস্তকে স্বরস্মতি বন্দনা আবৃত্তি করতে হতো। পত্রলেখা মনসামঙ্গল এসবও তাদের পাঠ্য তালিকাভুক্ত ছিল। মিশনারী বাংলা বিদ্যালয়ে খৃষ্টধর্মীয় বই পাঠ্য তালিকার অপরিহার্য অংশ ছিল। দেখা যায় ঐদিন মুসলিমরাই ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের একমাত্র শত্রু। আর বাকীরা এক। একে অন্যে নোবেল আদানপ্রদান চলে। অনেক বিতর্কীত গালগল্প বাতাসে ছড়িয়ে আছে। আর প্রতিবাদী মুসলিমের ঠাঁই হয় ফাঁসিতে, গুলিতে, কারাগারে। যারা এ যাবৎ আদর্শের সাথে লড়ে গেছে, সত্য জীবন মোকাবেলা করেছে তাদের পায়ে বেড়ি পরিয়ে দেয়া হয়। ৪৭এর স্বাধীনতা পরবর্তীও রচিত হয় মিথ্যা ইতিহাস। ভুলে গেলে চলবে না, মিরজাফরের নামে দেশদ্রোহীর পাপ ও গালিটুকুনও মুসলিমদের কাঁধে চাপিয়ে দেয়া, আর ২০০ বছরের গোলামীর অর্জনকে যারা অভ্যর্থণা জানায় তারা ঐ পুরো সময় তুলনামূলক সমাদৃত হয়। এদের কারণেই ঐ প্রহরটি এত প্রলম্বিত হয়।

পুরাতন রাজস্ব ব্যবস্থা পরিবর্তন ও চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রচলন করে বৃটিশ গভর্ণমেন্ট বাংলাদেশের মুসলিমদের আর্থিক জীবনে তীব্র আঘাত হানে ( ডব্লিউ হান্টার, এন্যালস অব রুরেল বেঙ্গল, ৫৩-৫৪ পৃষ্ঠা)। এভাবে এসব ক্ষেত্রে মুসলিমদেরকে উৎখাত করে তাদের অধিনস্ত কর্মচারীদের অথবা বেনিয়া ব্যবসায়ীদের সহিত পাকা ব্যবস্থা করা হয়। এসব অবিচারের কথা স্বীকার করে মেটকাফ বলেন যে, “এই অবস্থায় জমির প্রকৃত মালিকদের থেকে জমি ছিনিয়ে নিয়ে এরুপ এক শ্রেণীর বাবুদেরে এটি দেয়া হয় যারা ঘুষ ও অন্যান্য অবৈধ উপায়ে ধনী হয়েছে” (এ আর মল্লিক ৩৪ পৃষ্ঠা)। এভাবে হিন্দু কর্মচারী যারা পূর্বে রাজস্ব কর্মচারী ছিল তারাই ক্রমে জমিদার হয়ে বসে।

কুষ্টিয়ার বনেদী জমিদার পরিবারের সন্তান মির মোশাররফ হোসেনের ‘গাজি মিয়ার বস্তানী’ থেকে ইতিহাসের তলানীতে পড়ে থাকা কষ্টকথার সামান্য আঁচ। “এ হাট তাদেরি ছিল, ফাঁকি দিয়ে কেড়ে নিল, পুরাতন নায়েবের ভাই। পৈত্রিক বসতবাড়ী, পুষ্করিনী গোলাবাড়ি, কিনিয়াছে তাহার জামাই। — সম্মুখে দাঁড়িয়ে রয়, জোড় হাতে কথা কয়, তোষামোদে বড় বাহাদুর। গন্ডমুর্খ জমিদার, ফুলে হল ঢোলাকার, শুনিতে ভাল লাগে কানে। আগ পিছ নাহি চান, আহলাদেতে গলে যান, খাবি খান খুশীর তুফানে। যদি বলি জল উচা, বলে হিন্দু তাই সাচা, প্রতিবাদ করে না কাহার। বিদ্যাহীন, বুদ্ধিহীন, একেবারে অর্বাচীন, বাঙ্গালার প্রায় জমিদার। — ডেপুটির পুত্র হয়ে, ডেপুটির বাক্স লয়ে, পালকির আগে আগে ধায়। মুন্সেফের সন্তান, মারিয়া তামাকে টান, বাজারেতে টিকি বেঁচে খায়। লক্ষপতি জমিদার, সন্তান সন্ততি তার, খেটে খায় অপরের বাড়ী। কাজ করিলে হেলা, মার খায় দুই বেলা, জুতা লাত্থি খড়মের বাড়ী। — বেগম নবাবজাদী, বাইজীর হল বাদী, কেহ সাদী করে ভেড়––য়ায়। কেহ গুড়গুড়ি মাজে, কেহ বা তামাক সাজে, কেহ বাও করিছে পাখা। বঙ্গের বুনেদী দল, গেছে সবে রসাতল, কেহ মরা কেহ আধমরা।”

কবিতার ছন্দে অনেক নাবলা কথা, সত্য হয়ে ভাসছে। বিভক্ত বাংলাদেশের মুসলিম আর ভারতের মুসলিমদের দেনা পাওনা সমান নয়, আজো তাদের মার খাওয়া চলছে, কাশ্মীরীরাও ঐ মারের ভাগ গিলছে, কারণ তারাও মুসলিম। মুসলিমরা সবদিন আক্রান্ত হলেও অসাম্প্রদায়িক থেকেছে ইসলাম ধর্মের কড়া নির্দেশের কারণে। এসব প্রচারে পাছে সাম্প্রদায়িকতা প্রকাশ পায় মনে করে আজো তা জনতার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রাখা, ৯৫% মুসলিম অধ্যুষিত পূর্ব পাকিস্তান বাংলাদেশেও কয়জন পড়েছেন গাজি মিয়ার বস্তানী আপনারাই পরিমাপ করুন। কিন্তু ইতিহাস জানা নিজেকে জানা চেনা মানব জীবনের কঠিন শর্ত, আত্মসচেতন থাকা এবাদতের অংশ। বেওকুফের জন্য এবাদত নয়, এটি চিন্তাশীলদের জন্য বিবেকবানদের জন্য প্রদর্শীত সুপথ। এটি ব্যতীত অদেখা পালনকর্তা আল্লাহকে জানা, চেনা যায় না; মানব জনমের প্রকৃত আত্মসমর্পণ অসম্ভব। ঐ আত্মসমর্পণই মুসলিমদের গন্তব্যে পৌছার একমাত্র সূত্রকথা। এইজন্য কুরআনে বলা হয়েছে তোমরা সত্যের সাথে মিথ্যাকে এক করে দিও না। সঙ্গত কারণেই আত্মসচেতনতার জন্য প্রতিটি সত্য প্রচার ও মিথ্যার উন্মোচন জরুরী। শতাব্দীপূর্ন এসব সংকটের পরও প্রার্থণা করি ঐসব নির্যাতীতের জন্য যারা জনম জনম নির্যাতীত হয়েছে, আজো হচ্ছে। আল্লাহ তাদের সহায় হোক।
১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯ সাল।

বি দ্র: এ লেখাটি নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক দি রানার নিউজ সংখ্যায় ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯ তারিখে ছাপা হয়।

নাজমা মোস্তফা

মানুষকে জোর জবরদস্তি করে ধর্মান্তর করা ধর্মের নিষেধ। জোর করা ছাড়া এ ধর্মের বানী প্রচার করার দায়িত্ব মুসলিমদের। তাই দৃশ্যত এ মহান ধর্মটির সুমহান ঐতিহ্য মাধুর্য্যে মোহিত হয়েই অত্যাচারের নিগড় থেকে নির্যাতীত মানুষরা যুগে যুগে ধর্মান্তরিত হয়ে এসেছে তাদের নিজেদের ইচ্ছায়। মুসলিমরা একে অন্যের ভাই। মুসলিমরা নেহরুর আজন্ম বৈরী হলেও পন্ডিত জওহরলাল নেহরুর বক্তব্যে এ সত্যও উঠে এসেছে যে, মানুষ প্রথম গণতন্ত্রের স্বাদ গ্রহণ করে ইসলাম থেকেই। । — “নিজের উপর আস্থা এবং বিশ্বাস একটি বড় জিনিস। ইসলাম ধর্মের বাণী হচ্ছে, ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা সবাই ভাই ভাই। এতে করে লোক গণতন্ত্রের কতকটা আঁচ পায়। অতীতে খৃষ্টধর্ম যেরুপ বিকৃত হয়ে পড়েছিল তাতে এ ভাতৃত্বের বাণী কেবল আরব জাতিকেই নয়, অন্যান্য দেশের অধিবাসীদের মনেও সাড়া জাগাতে সক্ষম হয়েছিল”। (বিশ্ব ইতিহাস প্রসঙ্গে, পন্ডিত জওহরলাল নেহরু, পৃষ্ঠা ১২৩)। সংকীর্ন চিন্তার মানুষরা এ সাড়া জাগানোকে সহজভাবে নিতে পারে নি বরং এর জবাবে তারা আজীবন বিদ্বেষের তাপে আগুণ দিয়ে যায়। যদিও এ ধর্মের বানী সবসময়ই সহনশীলতায় বিশ্বাসী। যার কারণেই মুসলমানরা অপর ধর্মধারীদের থেকে অনেক বেশী সহনশীল। কিন্তু বর্তমান সময়কার মিডিয়ার প্রচার কৌশলে সে প্রকৃত সত্য বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছে। শাস্ত্র নাড়ার ক্ষমতা না থাকলেও হিন্দু ধর্মে নারীর সৃষ্টি হয়েছে স্বামীকে পূজো করবে বলে। স্বামী যদি মরেও যায় বা তাকে বিক্রি করে দেয় বা ত্যাগ করে তারপরও তাকে পুরুষের পূজো দিতে হবে (মনুসংহিতা ৯অঃ ৪৬ শ্লোক)। সন্তান জন্মদানে দেবরের ভুমিকাসহ সামাজিক বিধানকে অস্বীকার করে সকল ন্যায়ধর্মের কবর রচিত হয়েছে এসব আচারী ধর্মে। যার জন্য নির্যাতীতা নারীদের বলতে হয়, এ ধর্মে আচার আছে ভাই বিচার নেই। এভাবে উচ্চবর্ণ হিন্দুরা নিজেদের সুবিধামতনই শোষণ করার শাস্ত্র সাজিয়েছে, দেব দেবীরা শত অপকর্ম করলেও দেবতা থাকতে পারে। নারীকে মরার জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছে, দরকারে সহমরণে যেতে হবে। কিন্তু ইসলামে এসব কিছু নেই। তারপরও কৌশলীরা সব অপবাদই সিলেবাসধারী মুসলিমদের উপর ঠেসে দিয়েছে। ইন্টারনেটে হিন্দুদের গালাগালিতে যে কেউ বিচলিত হতে পারেন। যাদের বড়াই করার কিছুই নেই তারা এমনভাবে মুসলিমদের পিছে লেগেছে জোকের মতই, এটি কি ন্যায়ধর্মের নমুনা? এসব খুটিনাটি হিসাবও মূল বিশ^কর্তার দৃষ্টি এড়াবার নয়।

আজকের দিনে যত মত তত পথ ছলনার প্রতারণার উৎস কথা। এর কারণ শত অনাচার দিয়ে সুপথ রচনা করা যায় না বরং সঠিক ন্যায় নীতির পথেই একমাত্র সুপথ রচিত হতে পারে। তাই সব ভুল নষ্ট পথেও মুক্তি মেলে কথাটি বড় ছলনার কথা। গোজামেলে মিথ্যাকে সামাল দিতেই এসব কথা বলা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশী খেদাও আন্দোলনে নেমেছে ভারত, ওদিকে হাজার হাজার ভারতীয়কে ইত্যবসরে ঠেলে দিয়েছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে যারা এদেশে চাকুরী করছে। কোন কৌশলে এ অসম্ভব সম্ভব হয়? বিগত শতক থেকেই শুনেছি পাঁচ লাখ এখন দেখছি উইকিপিডিয়াতে ২০০৯ এ পাঁচ লাখ সরকারী হিসাব আর বাকীটা তথৈবচ। আজ চলছে ২০১৯ একজন সচেতন বুঝতে পারেন, এর ব্যাপ্তি কতদূর গড়াতে পারে। মধ্যরাতে অপকর্মী চোর কখনো কখনো চেঁচিয়ে উঠে আর চোর চোর বলে চিল্লায়, যখন ধরা পড়ার সম্ভাবনা কাছে আসে ঠিক তখন। চোর এটি করে আত্মরক্ষার্থে যাতে কেউ তাকে চোর ঠাওরাতে না পারে। বিগত শতকে শুনেছিএ ধারার কিছু পুশইন পুশবেক নাটক সময়ে সময়ে হতো, যা নিয়েও ময়দান গরম হয়েছে। পুশইনএর উপর কবিতাও হয়েছে। বৃটিশের হাতে ভারত পাকিস্তান বন্টনের সময় থেকেই ভারতীয় বৃটিশ তোষণবাজরা পাকিস্তানের সাথে অনৈতিক বণ্টন যে করেছেন সেটি ঐতিহাসিক সত্য। তাদের পাওনা না বুঝিয়েই খেলা পন্ড করে বোকাদের পোকায় খাওয়া পাকিস্তান দেয়াটা কি মিথ্যা গুজব নাকি বৃটিশ ভারতের আভ্যন্তরিন বিষয় ছিল? ইতিহাস তলানীতে পড়ে কিন্তু ফসিল আকারে থেকে যায়, মরে না। তাই সময় সময় কথা বলে। এর উপর সচেতনরা অনেকেই জানেন। আর এসব কারণেই স্বাধীনতার পর থেকে দেশটিকে কবজা করতে ভারত বেশী সচেষ্ট থাকে। তা না হলে এমনও হতে পারে সদ্য মুক্ত দেশ তার অতীতের দেনা পাওনার হিসাব তুলে ধরতে পারে, প্রতারকদের কাছে সে হিসাবের ফয়সালা চাইতে পারে, সে ভয় তাদের ছিল আছে এবং থাকাটাই স্বাভাবিক। এ জন্যই কি ভারত চোর চোর বলে সারাক্ষণ চিল্লায়? মুসলিম ধর মার কাট এর নাম হচ্ছে অখন্ড ভারত তৈরীর প্রচেষ্ঠা। তারা মনে করে তাহলে মুসলিমরা চুপসে থাকবে আর হিসেব নিকেশ চাইবে না।

ইত্যবসরে ইসলাম সারা বিশে^ ছড়িয়ে গেছে আর মূর্তিপূজা ঐ গৃহকোণে আবদ্ধ হয়ে আছে। ঐ গৃহকোণও আজ ভঙ্গুর অবস্থায় কারণ মিথ্যা দিয়ে কি শাস্ত্রধর্ম টিকানো যায়? জাকির নায়েক কি কারণে আজ আসামী, কোন দোষ তারা প্রমাণ করতে পারে নি, তার মূল অপরাধ তিনি মুসলিম, কাশ্মীরীদের মত আসামী একজন। অপরাধীর সামনে সত্য বলা ও সত্য প্রচার করাও অপরাধ। নীতির ধর্ম ইসলাম এগিয়ে যাওয়ার মূল ধর মার কাটো নয়, বরং তার মানবিকতা, উদারতা মহানুভবতা, মধ্যপ্রচ্যের গন্ডি পেরিয়ে প্রবল বেগে স্ফুলিংগের মত গোটা বিশে^ ছড়িয়ে গেছে। সমস্ত বিশে^ মুসলিমদের মত এত সহনশীল জাতি আর দুটি নেই। প্রকৃত ইতিহাস বিশ্লেষণ ছাড়া এ সত্য লুক্কায়িত, ষড়যন্ত্রীরা দৃষ্টির আড়াল করে রেখেছে। ইহুদী খৃষ্টান হিন্দুদের মাঝেও অনেক সত্যবাদী আছেন যারা এ সত্যকে অকপটে স্বীকার করে গেছেন। যদিও এরা সংখ্যায় অল্প তারপরও ঐ অল্প সংখ্যাও ইতিহাসের কথা হয়েছে। সহজে সৎ চিন্তার মানুষ জন্মায় কম। কালে ভদ্রে সুভাষ চন্দ্র বোসরা জন্মালেও এদের তাড়িয়ে দেয়া হয় ময়দান থেকে। মিথ্যা গুজবে তাদের মেরে ফেলা হয়। আমরা জানি একজন সৎ হাজার অসৎ থেকেও ওজনদার। ইসলাম বিরোধীরা এক হয় তাড়াতাড়ি কারণ এদের প্রতিপক্ষ এক সততার আদর্শে বিশ^াসী। বাকীদের কাছে যত মত তত পথ, বহু সুবিধাবাদীর কুপথও তাদের কাছে সুপথ।

যখন বুদ্ধের আবির্ভাব হয়, তখন ভারতবর্ষে চলছিল ঈশ^রের নামে চরম অধপতনের যুগ। ৩৩ কোটি দেবতার পাপে টলটলায়মন ভারত বর্ষের স্বরুপ দেখে বিস্মিত বুদ্ধ সমাজ সংস্কারের নিমিত্তেই গৃহত্যাগ করেন। তিনি সেদিন পাগল ছিলেন না, ছিলেন সত্যান্বেষী এক সাধক।
তিনি কোনদিনও নাস্তিক ছিলেন না, কিন্তু এ সত্যসাধক অসীমের সন্ধান লাভ করেন। বিভ্রান্তরা তাকে কখনো বলেছে নাস্তিক কখনো বলেছে ঈশ^র কখনো বলেছে অবতার। যুগে যুগে এরা এসেছেন মানুষকে সুপথ দেখাতে আলোর মশাল হাতে এরা সমাজ থেকে মিথ্যা পুতুল পূজা, প্রেত পূজা, দূর করতেই কাজ করে গেছেন। সমাজ তাদের নিয়ে যা ইচ্ছে তাই করেছে করছে। কখনো বলেছে তিনি প্রাণী হত্যা নিষেধ করেছেন। আমিষভোজি বুদ্ধ মাছ মাংস খেতেন। তার মৃত্যু হয় চুন্দের দেয়া বিষ মিশ্রিত মাংস খেয়ে (উদ্বোধন, জৈষ্ঠ ১৩৭৮)। পরবর্তীতে শাসক অশোক নিরামিষ খাবারের প্রচলন করেন। মুখে এটি বললেও কার্যক্ষেত্রে বর্তমানে বৌদ্ধরা এমন এক জাতি যারা সর্বভুক, সব খায়। এদের অখাদ্য পৃথিবীকে কিছু নেই। এভাবে কালে এরা অনুসারীরা এসব সাধকদের সবদিকে কবর রচনা করেছে। আজকে মিয়ানমারের বৌদ্ধরা যা করে চলেছে তা গৌতম বুদ্ধকে কয় হাজার বার কবর দিয়ে দিয়েছে। কোন কোন পাঠে জানা যায় বৌদ্ধ চোর ছিলেন, নাস্তিক ছিলেন। জওহরলাল নেহরুও তার ডিসকভারী অব ইন্ডিয়া গ্রন্থে বলেছেন ভারতে নিচু জাতের কিছু দলিতমার্কা বৌদ্ধ ছিল। এভাবে তারা কালে বুদ্ধকে একদিকে যেমনি অবতার বানায় আবার তার অনুসারীকে দলিত শ্রেণীর বলে প্রচার চালায়।

ভারত আর মায়ানমার বাংলাদেশ বিরোধী অবস্থানে একাট্টা হয়ে কাজ করছে। কাজেকর্মে উভয়ের এই ঠেলাঠেলির বানিজ্যে এক ইস্যুকে ভয়ঙ্কর মিল দেখে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, ভারত মায়ানমার বন্ধু, বাংলাদেশের বন্ধু তারা নয়। রোহিঙ্গাদের দেখে ভারত উৎসাহী হয়েছে, ঐ খেলা ফের খেলতে চাচ্ছে বাংলাদেশে, উভয় ক্ষেত্রে ভোক্তভোগী ধরা হয়েছে মুসলিমদেরে। এটি আর লুক্কায়িত নেই যে মুসলিমদের বাদ দিতেই ভারতে মোদির সাম্প্রতিক সময়ের এই এনআরসি মঞ্চায়ন এবং ধরা খাওয়া। আবার এটিও তারা খোলাসা করেছে এনআরসিতে আটকে যাওয়া হিন্দুদেরে তারা সামাল দিবে। মোদি ও বিজেপি তাদের নিজেদের স্বমূর্তি খোলে ধরেছে, কিছুই ঢাকা নেই। একইভাবে রোহিঙ্গা ইস্যুতে মায়ানমারও খোলাসা। ঐ এক নীতিতেই হিন্দুদের প্রত্যাবাসন এগিয়ে নিতে তৎপর মিয়ানমার, খবর বিবিসির। একই সাথে তারা রোহিঙ্গা মুসলিমদের গ্রাম ধ্বংস করে গুড়িয়ে দিয়ে তৈরী করছে পুলিশ ব্যারাক ও সরকারী ভবন। বিবিসি এরকম চারটি স্থাপনা খুঁজে পেয়েছে, স্যাটেলাইট কৃত ছবি থেকে যেখানে আগে ছিল রোহিঙ্গা মুসলিম বসতি। যদিও সরকারী কর্মকর্তা তা স্বীকার করছে না। বিবিসিসহ কিছু সংবাদ মাধ্যমকে তারা আমন্ত্রণ জানালেও ছবি তোলা, সাক্ষাৎকার নেয়া, নিজস্ব গাড়ী ব্যবহার ও প্রবেশের ক্ষেত্রে কড়াকড়ি লক্ষ্যনীয়। অষ্ট্রেলিয়ান স্ট্র্যাটেজিক পলিসি ইন্সটিটিউট জানায়, ২০১৭ সালে ক্ষতিগ্রস্ত রোহিঙ্গা গ্রামগুলির কমপক্ষে ৪০ ভাগ গ্রাম পুরোপুরি গুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। ‘মিয়ার জিন’ নামে এক রোহিঙ্গা গ্রাম বুলডোজার দিয়ে গুড়িয়ে দেয়া হয়। ‘ইন দিন’ নামে আর একটি গ্রামে ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে ১০ জন বন্দী মুসলিম পুরুষকে হত্যা করা হয়। অল্প বিস্তর অপরাধ যা তারা স্বীকার করে ‘ইন দিন’ তার একটি। এ গ্রামের তিন চতুর্থাংশই মুসলিম আর বাকীরা বৌদ্ধ। এখন সেখানে মুসলিমের কোন চিহ্ন নেই। অতীতে যেখানে মুসলিমরা থাকতো সেখানে তৈরী হয়েছে কাটাতারের বেড়া আর বিশাল সীমান্ত রক্ষী পুলিশের ব্যারাক। মিয়ানমার সরকারের প্রশ্নবিদ্ধ আচরণ, রোহিঙ্গা মুসলিমদের চলাফেরাতে স্বাধীনতা না দেয়া, সর্বোপরি নাগরিকত্ব অস্বীকারের মত বিষয়কে অমীমাংসিত রেখে রোহিঙ্গারা ফিরতে পারে না। ওখানে বাস্তুচ্যুত এক তরুণের ভাষ্যে জানা যায় বিনা অনুমতিতে কোন বিদেশীর সাথে কথা বলার অধিকার তাদের নেই। ২০১২ সাল থেকে মোট সাত বছর থেকে ক্যাম্পে আটকে পড়া ঐ তরুণের লেখাপড়ার কোন সুযোগ নেই। অনুমতি ব্যতীত ক্যাম্পের বাইরে যাবার অনুমতিও তার নেই। সে নিষেধ করে বাংলাদেশে থাকা রোহিঙ্গারা এ অবস্থায় কখনোই যেন না ফেরে, প্রকৃত সমস্যার সামধান না করে ফিরলে কোনভাবেই তাদের দুর্ভোগ কমার সুযোগ নেই।

হিন্দু শাস্ত্রের নীতি হচ্ছে সুরা খাও, পিও আর নারী নিয়ে আনন্দ কর। ইন্দ্রের ভালোবাসার কাজই ছিল দাসদের হত্যা করা। এসব ঋকবেদ শাস্ত্রের কথা। অনেক লেখাতে পাওয়া যায় মনুস্মৃতি লেখা হয় ছয়শত খৃষ্টাব্দের কাছাকাছি সময়ে তার আগে নয়। তাহলে এটি স্পষ্ট করছে ইসলামের শেষ নবীর আগমনের সময়ই এর সংযোজন। বিবেকানন্দ, গান্ধী, রামকৃষ্ণ এরা বুঝতে পেরেছিলেন সহনশীলতা ছাড়া এ বিকৃত নীতিহীন ধর্মকে রক্ষার উপায় নেই, তাই তারা অন্য বর্ণহিন্দুদের থেকে অনেকটাই উদার থাকার চেষ্টা করে গেছেন। রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব ইসলাম ও খৃষ্টান ধর্মের অনুকরণে কিছুটা উদারতার দিকে গিয়ে ‘যত মত তত পথ’ বাতলে গেছেন। মূলত হিন্দু শাস্ত্রগুলি লুকিয়ে রাখা, এটি কোন শাস্ত্রের ধর্ম নয়, এটি হচ্ছে একরাশ আচারের ধর্ম। সেখানে নীতি থাকতে পারে অনীতিও সমান তালে সমাদৃত। একে অবশ্যই শুদ্ধ করতে হবে যত মত তত পথ নয় বরং হবে যত মত এক পথ। এক কর্তার এক পথ , ন্যায়ের পথ সততার পথ। একমাত্র এ সুপথে হয়তো ভারতবাসী মুক্তির স্বাদ পেতে পারে। বিবেকসম্পন্নরা এটি ভেবে দেখতে পারেন।
লেখার তারিখ = সেপ্টেম্বরের ১৩ তারিখ।

বি দ্র: লেখাটি ২০ সেপ্টেম্বর তারিখে ২০১৯ নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক রানার নিউজ সংখ্যায় ছাপা হয়েছে।

নাজমা মোস্তফা

যুগে যুগে মুসলিমরা ষড়যন্ত্রীদের সাজানো অপবাদ মাথায় নিয়ে তলোয়ারের বদলে ইসলামধর্ম প্রচারের মিথ্যা জারিজুরি নিয়ে ঘুরছে, কোন প্রতিবাদ ছাড়াই। যদিও এ অপবাদ কোনভাবেই তাদের উপর বর্তায় না। এবার আসামের বোঝা চাপিয়ে দেয়ার যে গোপন বাসনা ভারত লালন করছে, কখনো কখনো তার অতি লোভী সাগরেদরা সেটি প্রকাশও করছেন, গিলে ফেলবেন অন্তত এক তৃতীয়াংশ খুলনা থেকে রংপুর সিলেট কিছু বাকী নেই। এর কারণ হচ্ছে এই বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্র নীতির দাসত্ব মানসিকতা। কোন বিবেকহীন সরকার এভাবে বিক্রি হলে সে সরকার অবশ্যই প্রশ্নবিদ্ধ দাগী আসামী, আর এমন অবস্থায় ভারতও কি ছাড় পাবে মানবতার আদালতে? ভারত একটি দেশ যদি এভাবে তার সর্বস্ব হারায় তবে এ বেঁচে থাকার অর্থ কি হতে পারে? ২০১০ সালের জানুয়ারীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দিল্লীতে যেসব চুক্তি করে এসেছেন, তা দেশবাসী আজো জানে না। ভবিষ্যতেও যাতে দেশবাসী জানতে না পারে তাই খানাখন্দ বন্ধ করতে সংবিধানও পরিবর্তন করা হয়েছে। ক্ষমতার অবৈধ দখল নেয়া হয়েছে। এভাবে সামান্য কয় পার্সেন্ট হিন্দুরা কিভাবে বাংলাদেশের সব সেক্টর দখল করে বসে থাকে? এতে কি ভারতের মানসিকতায় বিচারিক কোন জবাবদিহিতা থাকবে না? নাকি এটিও আভ্যন্তরিন ব্যাপার বলে চালিয়ে যাবে ভারত? হিন্দু শাস্ত্রে দেখি পরস্ত্রী হরণ বা পরস্ত্রী বরণ কোন অপরাধ নয়। শাস্ত্রে তাদের দেবদেবীরা তাই করেছেন। পরস্ব হরণও কি তারা আইনের চোখে ন্যায়কাজ বলে মনে করেন?

শিরোনামটি এ কারণে করা যেখানে বাংলাদেশ শত সমস্যায় জর্জরিত, সেখানে লাখ লাখ ভারতীয় কেন জাতির ঘাড়ে চেপে বসলো? একদল প্রচার চালাচ্ছে বাংলাদেশে প্রিয়াসাহাদের জায়গা হচ্ছে না এমন সংকটে ভারতের লাখ লাখ প্রিয়াসাহারা কেন সে দেশে জেকে বসেছে? অনেকে সন্দেহ করেন ঐ ২০১০ সালের গোপন চুক্তিতেই ভারত এসব অনাচার করার সব দাসখত করিয়ে নিয়েছে বাংলাদেশের অবৈধ সরকার দিয়ে। ভারতের ময়দানে সারা বছর সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে কাটে মারে, একই ধারার সাম্প্রদায়িক অপরাধ একবার নয়, বারে বারেই হয়, আর বিচারের নামে চলে প্রহসন। প্রতিবেশীর সাথে সারাক্ষণ মাতবরী করে, তারা মনে করে তাদের এসব অপকর্ম কেউ দেখছে না। অন্তত এটি নিশ্চিত গরু বা মূর্তি ভগবান তো দেখবে না। এদিকে আকন্ঠ অপরাধে ডুবে থাকা মুজিবের কন্যা সরকারের গদি রক্ষার ভান ধরে আছেন, কেউ তারে ভোট দেয়নি, এটি সারা বিশ^ জানে। কোন বাছবিচার না করেই কি কারণে সর্বস্ব অকাতরে বিলিয়ে দেয়া ভারতকে, সেটি গোটা জাতির প্রশ্ন। ভারতের বোঝা উচিত দেশটি কি কারো একার সম্পত্তি? গরু ভারতের আরাধ্য পূজ্য হলেও বাংলাদেশের নয়, ওটি তাদের ভোগ্যপন্য, খাদ্য। তারা আল্লাহ নামের এক অদেখা শক্তির কাছে সব মামলা অপবাদ অনাচার নির্যাতনের বিষয় জমা রাখে আর বিশ^াস করে একমাত্র ঐ সত্যকে, দেরীতে হলেও পাওনাদাররা সুবিচার পাবে। তারা বিশ^াস করে নিজেরা অপরাধী হলে যেমনি শাস্তি পাবে ঠিক তেমনি অন্যেরা অপরাধী হলেও সে মাপে শাস্তি গোলাতে উঠাবে। এ কারণে শত নির্যাতনের পরও এরা মরতে ভয় পায় না। ফিলিস্তিনীরা কাশ্মীরীরা ময়দানে মরেও কিন্তু জিতে আর অনাচারীরা দৃশ্যত মনে হয় জিতছে কিন্তু এ বিজয় তাদের বিকলাঙ্গ করছে, ভিসুবিয়াসী অর্জনে অগ্নির জমা বাড়িয়ে চলছে। মধ্যযুগ নয় বরং একবিংশ শতকে পরস্ব হরণের এ খেলা কলঙ্ক হয়ে তাদের আমলনামাতে জমছে।

শত শত হাজার হাজার ভারতীয়রা বাংলাদেশে কাজ করছে। বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয় ২০০৯ সালে কম পক্ষে পাঁচলক্ষ ভারতীয় বাংলাদেশে বসবাস করছে। তাদের বিভিন্ন এনজিও, গার্মিন্টস, টেক্সটাইল আইটিতে কাজ করছে এবং হুন্ডিতে তারা ভারতে টাকা পাঠাচ্ছে। এদেশ থেকে সর্বোচ্চ লিষ্টে পঞ্চম স্থানে থেকে ভারতীয়রা টাকা পাঠাচ্ছে। ২০১২ তে দেখা গেছে ৩.৭ বিলিয়ন ডলারেরও বেশী তারা ভারতে পাঠায়। তারা বাংলাদেশকে পঞ্চম রেমিটেন্সের দেশ হিসাবে সুবিধা নিচ্ছে। এটি হচ্ছে সরকারের হিসাব যেখান আনঅফিসিয়াল খবর আরো ব্যাপক। এদের বেশীর ভাগই ভ্রমণে আসে আর ফেরত যায় না (উইকিপিডিয়ার সূত্র) সংবাদ। লাখ লাখ ভারতীয়রা বেআইনীভাবে বাংলাদেশে বসবাস করছে এরা পশ্চিমবঙ্গ, মেঘালয়, আসাম, ত্রিপুরা এবং মিজোরাম থেকে এসে এখানে থেকে যাচ্ছে। এভাবে তারা সারাদেশের গ্রামে গঞ্জে আনাচে কানাচেও ছড়িয়ে আছে। ২০১৬ সালের জুলাইতে একসাথে চার হাজার ভারতীয় লোক এখানে অবস্থান নেয় ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে, বন্যা উপলক্ষে। (1) Jump up to:a b Sadeque, Syeda Samira. “Dhaka has a question: what about the illegal Indian immigrants in Bangladesh?”. Scroll.in. Retrieved 20 April 2017. (2) ^ Madhok, Diksha. “Bangladeshis in India sent back $6.6 billion last year—6% of their homeland’s GDP”. Quartz. Retrieved 20 April 2017. (3) “Flood-affected Indians take shelter in Bangladesh”. The Daily Star. 27 July 2016. Retrieved 20 April 2017.

প্রায় প্রতি সাপ্তাহেই বাংলাদেশে বর্ডারে মানুষ মরে, বিএসএফ এদেরে পাখির মতই মারে। আজকে ৬ সেপ্টেম্বর খবরে প্রকাশ চুয়াডাঙ্গাতে ও দামুড়হুড়া প্রতিনিধির বরাতে একজনের গরু ভারতের মাঠপাড়া থেকে তাড়িয়ে আনতে গেলে বিএসএফ তাকে গুলি করে হত্যা করে। গরু তো গরুই, মানচিত্র কি বুঝে? সেটি কি গরু পূজক বিএসএফের সদস্যরা বুঝে না? একদিন না একদিন প্রতিটি রক্তের বদলা যে দিতে হবে, সে হিসাবে তারা নেই। পতাকা বৈঠকে তারা এ হত্যার কথাটি স্বীকার করেছে আর দুইদিন পর লাশ হস্তান্তর করেছে। দাস স্বভাবের সরকার নড়বে কেন? বাংলাদেশের ভাগ্যে জুটেছে অবৈধ সৎমা সরকার। শেয়ার মার্কেটের ২৭ হাজার কোটি টাকার গায়েব হয়ে যাওয়ার ঘটনা, ডেঙ্গু সবই ছিল সরকারী ভাষাতে গুজব। প্রিয়া সাহারা কার দালাল সেটি বুদ্ধিমানদের বুঝে নিতে হবে। সবই কঠিন চাদরে ঢেকে রাখা মিডিয়াতেও এসেছে। সম্প্রতিক সময়ের এনআরসি (ন্যাশনাল রেজিষ্টার ফর সিটিজেনশিপ) বিজেপির জন্য বুমেরাং! এ ছিল খবরের শিরোনাম, প্রধানত তিন কারণে (১) আসামে এক কোটি বহিষ্কারের কল্পনার গল্পের সাথে বাস্তবের মিল নেই। (২) বাদপড়া ১৯ লাখের বড় অংশই হিন্দু (১১ লাখ হিন্দু + ৬ লাখ মুসলিম + দুই লাখ বিহারী নেপালী লেপচা) (৩) ঢাকা বা দিল্লী বলছে, এটি ভারতের আভ্যন্তরীণ ব্যাপার। বিজেপির বহুদিনের ছক মুসলিমদের পায়ে জনম দড়ি দিবে, তারা এটিও বলছিল হিন্দু হলে তাদের ছাড় দেয়া হবে। এখন বিজেপি কি করে দেখা যাক কারণ বেশীরভাগই তাদের ভোটার। বিজেপি এ খেলা শুরু করেছিল ৪১ লাখ বাসিন্দার মাঝে ১৯ লাখ ছাড়া বাকী ২২ লাখ সম্মুখ ময়দানে রক্ষা পেল, গুয়াহাটির যুগশঙ্খ তাই বলছে। বিজেপি তাদের ছকে জিতে গেলে লাখ লাখ মানুষ গৃহহারা হয়ে পড়তো। এর মধ্যে এটিও স্পষ্ট হয়েছে অনেকে অধিকারহারা হয়ে এর মাঝে আত্মহত্যা করেছে, পরিবারের একজন অধিকার পেলে অন্যজন ঝরে গেছে। বাপ পেলো তো ছেলে ঝরে গেল।

খুব সহজে একটি হিসাব মুসলিমরা যারা বহু প্রজন্মই সেখানে কাটাচ্ছে তারাই মানুষের মর্যাদা পায় না, সেখানে কোন সাহসে নব্য মুসলিমরা সেদেশে স্থায়ীভাবে বসতি করতে যাবে। হিন্দুরা যায়, এটি বলার অপেক্ষা রাখে না। তারা বেশীরভাগ হিন্দুরা মনে করে ভারত মাতা তাদের মাতৃভূমি না হলেও মূর্তিভূমি। যেখানে ভারতে মুসলিমদের এত অত্যাচারের পরও ভারতের মুসলিমরা ভুলেও দেশত্যাগের কথা মুখে আনে না। কারণ এরা সত্যিকারের দেশপ্রেমিক। বাংলাদেশে কোন ধরণের অনাচার নির্যাতন ব্যতিরেকেই হিন্দুরা বাংলাদেশে টাকা অর্জন করে স্বর্ণ কিনে রাখে, টাকা জমায় আর অনেকে ভারতে পাঠায়। আবার অনেকে দুদেশেই লুটেপুটে খেতে পছন্দ করেন। কেন করে সেটি ঐ সব দুদোল্যমনা মানসিকতার প্রিয়াসাহারাই বলতে পারবেন। এখানে প্রিয়াসাহার ট্রাম্প নাটকের পর তার গ্রামের স্বজাতিরা এক বাক্যে বলেছে ওসব ছিল প্রিয়াসাহার সাজানো মিথ্যাচার। সে নিজেই তার লোকজন দিয়ে ভাঙ্গা পড়ো বাড়ীতে আগুন দিয়ে মুসলিমদের ফাঁসাতে এসব মোদিবাজী নাটক করেছে। বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমদের বিরুদ্ধে সীমান্তের ওপারে মোদির এ নাটকের সাথে প্রিয়া সাহাদের এসব নাটক আর কতকাল চলবে? এরকম হাজার প্রশ্নের মুখোমুখি স্বাধীন একটি দেশ বাংলাদেশের মুসলিমরা কঠিন সময় পার করছে। লাখ লাখ ভারতীয়রা বেআইনীভাবে বাংলাদেশে থাকছে, এর দায় নিতে বেআইনী ভারতীয়দের জন্য বাংলাদেশী এনআরসি কি জরুরী নয়?
লেখার সময় = ৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯ সাল।

বি দ্রঃ এ কলামটি সেপ্টম্বরের ১৩ তারিখ ২০১৯ সালে নিউইয়র্কের “দি রানার নিউজ” এ ছাপা হয়।

নাজমা মোস্তফা

বাংলাদেশ এমন একটি সময় পার করছে এবং বড় সময় থেকে গোটা জাতিকে বিভক্ত করে রাখা হয়েছে। সেটি দেশপ্রেমিক জনতারা বুঝতে পারলে মঙ্গল হতো। স্বাধীন দেশে বাস করেও মানুষ আজো কেন পরাধীনতার আতঙ্কে। জাতিকে যারা ভাগ করেছে আড়াল থেকে, সেটি বুঝতে জাতির এত সময় লাগার কথা ছিল না। এর ফাঁকে অন্যেরা বাংলাদেশীদের মাথাতে কাঠাল ভেঙ্গে খাচ্ছে। পূর্ব পাকিস্তানের অধিকারে এগিয়ে আসা ভারত ১৯৭১ সালে খুবই উৎসাহী ছিল কিন্তু ১৯৪৭ থেকে নির্যাতনের যাতাকলে পিষ্ট কাশ্মীরীদের প্রশ্নে তারা উল্টো। সেই ৭১ সালেই ভারতের নীতি থাকলে কাশ্মীরের প্রতি মানবিক আচরণ করতো। কেন করছে না, সেটি সময়ের বড় প্রশ্ন। কাশ্মীর বিচ্ছেদ্য অংশ না অবিচ্ছেদ্য অংশ তা নিয়ে ধান্ধাবাজি সময় পার করছে। এটি নিশ্চয় আজ স্পষ্ট যে পাকিস্তানকে ভেঙ্গে দু টুকরো করার স্বপ্নেই ভারত বিভোর ছিল সেদিন। সেদিন এ কথাটি মনে ছিল না যে ওটিও ছিল পাকিস্তানের আভ্যন্তরিন বিষয়, কিন্তু ভারত নাক গলায়। আগরতলা মামলা তার উদাহরণ হয়ে আছে। আজ স্বাধীনতার ৬ যুগ পর কেন কাশ্মীরী মুসলিমদের সাথে অমানবিক আচরণের ষ্টিম রোলার চালিয়ে যাচ্ছে ভারত। এতদিন দেয়া নগন্যতম অধিকারও কেন কেড়ে নিচ্ছে। শুরু থেকেই সৈন্য ছাড়া কাশ্মীরকে সামলাতে অপারগ ভারত। কেন জবরদস্তি করে লাখ লাখ সৈন্য বহাল রেখে ও বৃদ্ধি করে মানুষকে বন্দুকের নলের সামনে দাবড়ানি দিতে হয় ভারতকে। এসব প্রমাণ করে ভারতের আচরণ ৬ যুগ থেকেই প্রশ্নবিদ্ধ। ভারত এমন একটি দেশ, নিচুবর্ণের হিন্দুদের ও মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠদের সাথে অমানবিক আচরণ করতে কখনোই বিচলিত হয়নি। সবদিনই তারা তাদের বিবেককে বন্ধক রেখে পরম নিশ্চিন্তে অপকর্মে তালিয়া বাজিয়ে গেছে। সময়ে সময়ে সরকারও সহযোগিতা দিয়ে গেছে।

১৯৩০ সালে একদল মুচি বা চামার গোষ্ঠীর ধৃষ্ঠতা হয়েছিল রাজপুত্রের মত পোষাক পরিয়ে তাদের এক বরকে ঘোড়ার পিঠে সওয়ার করানোর। আজ থেকে প্রায় ১০০ বছর আগে ঐ অপরাধে বর্ণ হিন্দুরা নির্যাতীতদের প্রতি তাদের এগারোটি নির্দেশমূলক আদেশ জারি করল।

(১) হাঁটুর নীচ পর্যন্ত কাপড় পরা যাবেনা।
(২) নারী পুরুষের স্বর্ণালঙ্কার পরিধান করা যাবেনা।
(৩) মেয়েরা জল বহন করবে শুধু মাটির পাত্রে, তামা বা পিতলের পাত্রে নয়।
(৪) ছেলেমেয়েরা পড়াশুনা করবেনা বা নিজেদেরকে শিক্ষিত করে তুলবেনা।
(৫) ছেলেমেয়েরা শুধু মিরাশদারদের গরু চরাবে।
(৬) পুরুষরা ও মেয়েরা মিরাশদারদের গোলাম হিসাবে কাজ করবে।
(৭) মিরাশদারদের কাছ থেকে জমি ইজারা নিয়ে চাষ করতে পারবেনা।
(৮) মিরাশদারদের কাছে নিজের জমি বিক্রি করবে খুব সস্তা দামে, অন্যথায় জলসেচের জন্য তাদেরকে কোন জল দেয়া হবেনা।
(৯) সকাল সাতটা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত পুরুষরা এবং মেয়েরা উপবাসী প্রায় হারে মিরাশদারদের কুলির কাজ করতে থাকবে।
(১০) অনুষ্ঠানাদিতে ভারতীয় সঙ্গিত ব্যবহার করা চলবে না।
(১১) বিবাহ মিছিলে ঘোড়া ব্যবহার করা যাবেনা, শুধু তাদের ঘরের দরজা পাল্কী হিসাবে ব্যবহার করতে পারবে। এবং কোন অভিপ্রায়েই কোন যানবাহনের ব্যবহার করতে পারবেনা (“ভারতের নির্যাতিত শ্রেণী”, ডঃ বি, আ, আম্বেদকর এম.এ, পি.এইচ.ডি, এস.সি, বার.এট.ল)

উপরের আদেশগুলি দেখলে বোঝা যায় বর্ণহিন্দু কি জিনিস। ভারত বিভাগে এই বর্ণহিন্দুদের শক্ত হাত সচল ছিল বলেই মানুষের দুর্ভোগ আজ অবদি কমছে না। এভাবে এরা মানুষের মানবিক আচরণের বাইরে থেকে কাজ করে গেছে। যেখানে এ ধারার আচরণ করে তারা স্বজাতির সাথে। সেখানে ভিনধর্মী মুসলিমদের সাথে তারা কি আচরণ করতে পারে সেটি খুব সহজেই অনুমেয় । ৭৩ সাল অবদি কাশ্মীরীরা এসব ক্ষতচিহ্ন নিয়ে সময় পার করছে। সম্ভবত ভারতের বর্তমান শাসক মোদি হিন্দু উচ্চবর্ণের নন। কিন্তু তার শক্তির তলানীতে হিন্দুত্ববাদীরা ঐ চর্চাকে মোটাতাজা করতে নির্যাতনে অব্যাহত আছে। ২০০২ সালে গুজরাটে ২০০০এরও বেশী মুসলিম নিধনের কারিগর এই মোদিকে ভারতীয়রা গদিতে বসিয়েছে। এতেও ভারতীয় মানসিকতা স্পষ্ট হয় এই একবিংশ শতকেও। গরু নিয়েই তারা মুখর ও অবিচল, মানুষের দিকে তাদের নজর কম।

বিগত শতকের শেষ দিকে বেড়াতে গিয়েছিলাম ভারতের শিলচরে আমার মামার কাছে। মামী বললেন এখানে এক মেয়ে তোমার নাম করাতে খুব উৎফুল্ল হয়ে বললো সে তোমাকে চিনেছে। একদিন তোমাকে নিয়ে যাব তাদের বাসাতে। মেয়েটির নাম ইভা। আমি অবাক বিস্ময়ে বলি আমি চিনি একজন ইভাকে, কিন্তু সে কি আমার সেই চেনা ইভা, তাতো জানি না। একদিন গেলাম গিয়ে অবাক হয়ে একে অপরকে জড়িয়ে ধরি। সত্যিই এ আমার পরিচিত সেই ইভা। ওর সহপাঠি শক্তি ভক্তিরা সবাই ধারেকাছে আছে, ভালো চাকরি করছে। কিন্তু দেখতে শুনতে লেখাপড়াতে ভালো হলেও যোগ্যতার কমতি না হলেও সে মুসলিম এ অপরাধে তার কোন সুগতি হয়নি অধগতি ছাড়া। তার কোন পথ নেই কোন বাঁচার ব্যবস্থা নেই। দিল্লীতে থাকা স্বজনদেরও একই অবস্থা। সেখানে মুসলিম হয়ে কাজ করা বড় কষ্টের তারা সারাক্ষণ সন্দেহ করে আর নানান অনাচার করে যাতে স্বচ্ছন্দে চাকরি করা যায় না। প্রধানত সেদেশে মুসলিমদের জন্য চাকরিই নেই, আর কেউ যোগ্যতা বলে পেলেও ধরে রাখতে পারে না। আমার ছোটবোন ইভা সেদিন তার মনের দুয়ার খোলে অনেক বেদনাঘন বিষয়ের বর্ণনা করে যায়। কথাচ্ছলে সে বলে তার পূর্বপুরুষ ভারতের বাসিন্দা। আমার পূর্বপুরুষও ভারতের বাসিন্দা হওয়াতে আমি বেড়াতে গিয়েছি। সে সুবাদে তাদের জায়গাজমি সবই ওখানে স্বাধীনতা পূর্ব থেকেই যা আজও আছে। চমৎকার একটি মেয়ে ইভার জীবন এখন আজ এই মুহূর্তে কি পর্যায়ে আছে আমি জানি না। তবে সময়ে সময়ে তার কথা মনে পড়ে যখন মুসলিমদের দুর্দশার কথা পড়ি জানি তখন তার কথাও মনে পড়ে, এক নিরব সাক্ষী পথ চলতে এরকম অনেক নির্যাতীতা মুসলিম মেয়ের কপট কষ্ট শুনেছি জেনেছি।

ডঃ আম্বেদকর পন্ডিত নেহরুর ক্যাবিনেট আইনমন্ত্রী ছিলেন। তাকে ভারতীয় শাসনতন্ত্রের রচয়িতা বলা হয়। তিনি অচ্ছুৎ সম্প্রদায়ের লোক। দক্ষিণ ভারতের আওরঙ্গাবাদ শহরের অচ্ছুৎ সম্প্রদায় মারহাটওয়ারা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন করে ডঃ আম্বেদকর বিশ্ববিদ্যালয় রাখার পরিকল্পনা করায় মহারাষ্ট্রে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয়ে যায়। এই প্রয়াত ডঃ কর শৈশবে একবার তার বড়ভাইএর সাথে ট্রেনযোগে পাঞ্জাবের গুরগাঁও মেলায় যান। তাদের পিতা তখন সেখানে অবস্থান করছিলেন। কোন টাঙ্গাওয়ালা তাদেরকে রেলষ্টেশন থেকে শহরে পৌছতে রাজী হয়নি। কারণ তারা ছিল ছোটজাত। হাইস্কুলে ব্ল্যাকবোর্ডের কাছে যাবার তার অনুমতি ছিলনা। কারণ উচ্চবর্ণ হিন্দুর ছেলেরা ঐ ব্ল্যাকবোর্ডের কাছে তাদের টিফিন বক্স রাখতো। কলেজে সবার সাথে ক্যান্টিনে গিয়ে চা খেতে পারতেন না তিনি। কারণ ক্যান্টিন পরিচালনায় ছিলেন একজন ব্রাহ্মণ। উচ্চশিক্ষা সমাপান্তে বারোদা স্টেইটে গেলে সেখানে কোন হোটেলে তাকে কামরা দেয়া হয় না। খাতায় নাম লিখতে গিয়েই বাধলো বিপত্তি। খাতা টেনে নেয়া হল। বারোদায় চাকরি পেলেন কিন্তু তারই চাপরাশি তার সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণ করল। বাড়ীওয়ালা তার পরিচয় জানতে পেরেই তার বাড়ী খালি করার নোটিশ দেয়। কলেজ সহকর্মী লেকচারার তার সোরাহী থেকে তাকে পানি দিতে অস্বীকার করে। সারাজীবন এই অমানবিক জীবন কাটানোর পর এই তিক্ততা থেকে মুক্তির অন্বেষায় তিনি বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেন। সে সাথে তিনি অচ্ছুৎদেরেও উপদেশ দিয়ে যান যে, “তোমরা বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করো নয়তো হিন্দুরা তোমাদের খেয়ে ফেলবে”। সর্ব বিষয়ে সুপন্ডিত এ ব্যক্তিটি জাতিতে নিচুবর্ণের সাহার শ্রেণীভুক্ত হওয়ায় বর্ণ হিন্দুদের দ্বারা যেভাবে লাঞ্ছিত হয়েছিলেন সে লাঞ্ছণা থেকে বাঁচার জন্য তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে চেয়েছিলেন। পরে গান্ধির অনুরোধে তিন লাখ অনুসারীসহ বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেন। ডঃ বি আর আম্বেদকর ক্ষুব্ধ চিত্তে তার “এ্যানিহিলেশন অব কাষ্ট” বইতে লিখেছেন, “যদি তুমি জাত ব্যবস্থাকে ভাংতে চাও, তবে তোমাকে বেদ এবং শাস্ত্রগুলিকে – যা কোন যুক্তিকে স্বীকার করেনা, যা নৈতিকতাকে অস্বীকার করে ডিনামাইট দিয়ে উড়িয়ে দিতে হবে। তোমাকে অবশ্যই ধ্বংস করতে হবে স্মৃতি অনুসারী ধর্মকে”। অনেক তথ্য উপাত্ত বলে গান্ধী মুসলিম ঘেষা ছিলেন কিন্তু এখানে এটি স্পষ্ট তিনি আম্বেদকরের খুঁজে পাওয়া ইসলাম থেকে তাকে বৌদ্ধ ধর্মের দিকে ঘুরিয়ে দেন। যে বৌদ্ধরা আজকের দুনিয়ায় কলঙ্কিত অধ্যায় রচনা করছে, যদিও গৌতম বৌদ্ধ এমন ছিলেন না।

ডঃ আম্বেদকর ও তার ভাইকে দ্বিতীয় ভাষা হিসাবে সংস্কৃত ভাষাটি শিখতে দেয়া হয়নি। ব্রাহ্মণদের ধারণা ছিল যে, দেবভাষা শিখে ফেললে হয়তো অস্পৃশ্য শুদ্রেরা নিষিদ্ধ গ্রন্থ বেদ পাঠ করে তা অপবিত্র করে ফেলতে পারে। একইভাবে দেয়া হয়নি ডঃ শহীদুল্লাহকে বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিস্ময়ের ব্যাপার হল, এরাই আবার বিদেশী ও বিধর্মী মনিষীদের বেদ সংক্রান্ত আলোচনা পাঠে অপরিসীম উৎফুল্ল হয়ে উঠতো। অথচ শুদ্রদেরে বেদ পাঠের অধিকার থেকে নির্লজ্জভাবে বঞ্চিত করে রেখেছিল। বাধ্য হয়েই ডঃ আম্বেদকরকে দ্বিতীয়ভাষা হিসাবে ফার্সি পড়তে হয়। লক্ষ্যনীয়, ফার্সি পড়তে তাদের কোন বাধার সম্মুখিন হতে হয়নি। ৪ জুন ১৯১৩ সালে উচ্চ শিক্ষা লাভ করার জন্য তিনি নিউইয়র্ক যান। আমেরিকাতে প্রত্যেকটি মানুষই সমান মর্যাদার অধিকারী। তিনি সকলের সঙ্গে একত্রে চলছেন, একই টেবিলে বসেছেন। এ যেন তার কাছে স্বর্গ লোকের ঘটনা। তখন তিনি বলেছিলেন, “আমি অস্পৃশ্য হয়ে জন্মেছি কিন্তু আমি অস্পৃশ্য হয়ে মরবোনা”। এই একবিংশ শতকেও ভারত কেন আজো ঘুমন্ত বিবেকের দাসত্ব করছে, আর কতকাল করবে?

মোদি ভারতে চরম মুসলিম জাতিবিধ্বংস নীতি শুধু করেছেন এ শতাব্দীর শুরু থেকে। এর দেড়যুগ পরও তিনি একবিন্দুও সরে আসেন নাই। গুজরাট অপকর্মের পর এই মোদিকে আমেরিকা নিষিদ্ধ ঘোষনা করেছিল, সে গ্লানির কথা দুনিয়ার মানুষ ভুলে যায়নি। ১৯৪৭ থেকে ২০১৯ গোটা ভারতে হাজার হাজার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার নামে মুসলিম নিধনের যে মহামেলা সময় সময় তারা চালাচ্ছেন, আজকের সবকটি অপকর্ম ঐ আগের ধারাবাহিকতার অংশ। আইয়ামে জাহেলিয়াত নামে পরিচিত আরবের কুরাইশরা এটি ষষ্ট শতাব্দীতে জোরে সোরে চালু করেছিল। হিন্দু নামে কোন ধর্ম নেই, সিন্ধু নদের নাম অনুসারে ভুলভাবে ধর্মের পরিচয় দেয়। তারা বলে পৃথিবীর সবচেয়ে পুরানো ধর্মের নাম সনাতন ধর্ম। ইসলাম চৌদ্দশত বছর আগে এসেছে, কথাটি পুরোপুরি সত্য নয়। সময়টি শুরু নয় বরং শেষ, সর্বশেষ ইসলাম এসেছে ঐসময় আর শুরুটা সেই আদমের সময় থেকে। নবী আদম হচ্ছেন প্রথম প্রতিষ্ঠিত নবী। এর পরে কুরআনে বর্ণিত ২৫জন নবীর প্রমাণ মেলে। ইতিহাস ভূগোলে এরও প্রমাণ পাওয়া যায় এই আরবীয় বণিকেরা কালের ধারাতে সারা বিশে^ এমনকি ভারতেও ছড়িয়ে পড়ে। ইসলামের সুখবর প্রায় নবী মোহাম্মদের সমসাময়িক সময়েই ভারতের উপকন্ঠে পৌছায়। কিন্তু আরব বণিকদের মারফতে ছড়িয়ে যাওয়া কুরাইশদের ঐ মূর্তিপূজা ভারতেও ছড়িয়ে পড়ে। গবেষনায় প্রাপ্ত নবী নূহের সময়কার অভিশপ্ত জাতির চালচিত্র ভারতীয়রা আজো ধারণ করে আছে। নূহের মহাপ্লাবনকে তারা নাম দিয়েছে জ¦ালা প্রলয়াম। আমরা জানি মুসার অবর্তমানে তার বিভ্রান্ত অনুসারীরা গরুর বাছুরের পূজা শুরু করে। “আর স্মরণ করো! আমরা মুসার সঙ্গে চল্লিশ রাত্রি নির্ধারিত করেছিলাম। তখন তোমরা বাছুরকে তার অনুপস্থিতিতে গ্রহণ করলে আর তোমরা হলে অন্যায়কারী (সুরা বাক্কারাহএর ৫১ আয়াত)।”এর প্রমাণ আজো কুরআনে ছড়িয়ে আছে। এভাবে মধ্য প্রাচ্যের মূর্তিপূজার দখলদার হয় ভারত, আর সনাতনের বড়াই করে সেই নবীদের অনুসারীদের উপর চড়াও হয়ে যুদ্ধ করছে একবিংশ শতক অবদি। এভাবে বিগত ষষ্ঠ শতকের কুরাইশদের আদলে আইয়ামে জাহেলিয়াতের মতই ইসলামের শিকড় বাকড় ধরে বাহবা কুড়াতে জগতের সব নিকৃষ্ট কাজ করে চলেছে তারা ধর্মের নামে। সে হিসাবে তারা কয়েক শতাব্দী পিছিয়ে পড়া ধর্মের দল। কয় শতক পূর্ব বর্বর ধর্ম নামের অধর্ম চালিয়ে সারা ময়দানে লঙ্কাকান্ড বাধিয়ে পুতুল পূজা বহাল রেখেছে। বিবেক সম্পন্ন মানুষ মাটির কাঠের ষ্টিলের পাথরের পুতুলের বদলে পশু গরুর বদলে বিবেকসম্পন্ন মানুষকে সম্মান করতে শিখুক, এটিই একবিংশ শতকের প্রত্যাশা হওয়া উচিত। আর এটি রপ্ত করতে না পারলে জাতি হবে বিবেকহারা কপট কদাকার ও কলঙ্কিত। মানুষের ময়দানে এক ও মানবিক হওয়াই সব কথার শেষ কথা।
৩১ আগষ্ট ২০১৯।
বি দ্র: লেখাটি নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত দি রানার নিউজ সাপ্তাহিকে ৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯ তারিখে ছাপে।

Tag Cloud