Articles published in this site are copyright protected.

 নাজমা মোস্তফা

 

সময়টি শতাব্দীর শুরুর দশক পার করা। আজ থেকে আট বছর আগে লেখা কলামটি। পান্ডুলিপি হয়ে আমার খাতার নোটবুকে পড়েছিল। দশকের শুরুতেই ছিল পাগলা ঘন্টার তুমুল হল্লা। আজ জানুয়ারী মাস, তারিখটি ১৮, সালটা ২০১২এর শুরুর মাস। চলছেই একটির পর একটি। কত আর বলা যায় শিরোনাম সংবাদ প্রানকাড়া সব মৃত্যু ঘন্টার করুণ রাগিনী চারদিকে আকাশে বাতাসে প্রচন্ড বেগে বইছে। পৃথিবী নামের বলয় ভেদ করে যেন উগলে উঠছে মাটি ভেদ করে ফুসে উঠা ভিসুবিয়াসের জ্বালামুখ থেকে ভয়ানক সব লাভা জ্বলজ্বল করা। জমা হচ্ছে ই-মেইলরা হাজার হাজার,  তারপরও ডিলিট করা হয় না। সময় বড় অল্প, জমা রাখি পড়বো। পড়বার সময়ই বা কোথায়? সূর্যদোয় থেকে সূর্যাস্ত ঘন্টাতে কতই হয়? এর মাঝে সব জমা সামাল দিতে হবে। সংসার, কাজ, রান্না, পড়া, লেখা, চারপাশ দেখা। এক জোড়া হাতে মাত্র দশটি আঙ্গুল পিল পিল চলছে কিবোর্ডে যা এড়িয়ে যাবার উপায় নেই। দরকারী সবই ছুটে চলছে উর্ধ্বশ্বাসে। সারিবাধা সব কষ্টরা করছে বাস্তব জটলা। পত্রিকার ওয়েভ সাইটে ক্লিক করলেই উগলে বের হয় খবররা। থরে বিথরে সাজিয়ে রাখা। সত্যি ভাবতে অবাক লাগে জীবনটা কেমন যেন আসলের বদলে অদ্ভুত অন্য রকম এক পাওয়ার মাঝে বাড়তি ব্যস্ততা। বুদ্ধিধারীদের কেউ বা মন্তব্য করছে সমানে, আর মানুষ হাজার বছর উপরে পার করেও আজ ক্লান্ত। কেউ কেউ আকাশের তারাকে নিয়ে বেশী করে ভাবতে বলছে।

কিয়ামতের আগাম সংবাদ কি এটি? হয়তো বা! আজ আর লিখতে কাগজ লাগে না। সর্বত্র সাদা কাগজ সারাক্ষণ খালি পাওয়া যায় কম্পিউটারের ডেস্কটপে। প্রযুক্তি যে কত দিস্তা সেখানে ঢুকিয়ে রেখেছে, কেউ জানে না রেখেছে কয় মন কলমকালি সঙ্গোপনে। সবাই লিখছে দিনের পর দিন, যেন বছরের পর বছর চলছে তাদের যায় যায় দিন। কাকে রাখি কাকে ডিলিট করি, কুল পাই না। এ শতাব্দীর শুরুতে খোদ আমেরিকাতে এক ভয়ানক বিস্ফোরণ ৯/১১, তারিখটি আমেরিকার পুলিশ কল নাম্বারের সাথে মেলানো এক কঠিন ছকে আঁকা, প্লেন করে আঁকা ক্ষণটি। এর লেজ ধরে বিকল্প আসে আরো কত কত ওয়ান ইলেভেনরা, তাও ইতিহাসে যতনে জমা রাখা।

সমানেই শুনছি চারপাশে শুধু হাহাকার আর পাগলা ঘন্টার শব্দ

২০০৯ সাল, নতুন শতাব্দীর নয় বছরের ফেব্রুয়ারীর বিস্ফোরণ “বিডিআর বিদ্রোহ”

একটি স্বাধীন দেশের হৃদপিন্ডে যেন আকস্মিক মরণ কামড়!

“মাটি খুড়ে জঙ্গী খোঁজার ঘোষনা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর”।

কলাম আসে “আগে চাঁদাবাজদের ধরুণ, পরে ভিন্ন কথা বলুন”।

সময়টি একদম মুক্তিযুদ্ধ শুরুর মতনই, এক মার্চের কথা।

যশোর খুলনা ও সাতক্ষীরাতে হাইপ্রেসারও কিডনী রোগী বেড়েছে দারুণ।

পানিতে লবনাক্ততা বেড়েছে এটিই কারণ। যেভাবে পানির স্তর নামছে,

রাজশাহী ও চারপাশ মরূভূমির প্রস্তুতি নিচ্ছে। মরবার সাজ চলছে।

কি আশ্চর্য্য এ রকম প্রস্তুতিতে দিনে দিনে দেনা বাড়ছে, দেশটি আহত বিধ্বস্ত তিলে তিলে মুমূর্ষদশা। রুদ্র মূর্তি ধরেছে বনগাঁ থেকে বঙ্গোপসাগর। তারপরও কেন তোমরা অন্ধ থাকছো? নিজের বুদ্ধি বিবেককে কি এমন ভাবেই বন্ধক রাখতে হয়? এ যে মানবতার অপমান হবে বন্ধু! তোমার বিবেক কেন দেশমাতার বৈরীতায় মগ্ন? বিবেককে কেন পরের কারণে এমন বন্ধক রাখলে! এ যে লজ্জা! তাও কি বুঝো না?

জানো ওয়াশিংটন পোস্টে ১৯৯৭ সালের মার্চে আসে এক প্রতিবেদন। দূরে থেকেও কঠিন গোপন কথা বলে যা তোমরা অনেকেই জানছো না বুঝছো না; বোকার ভনিতা করছো। ওরা বলছে জানো কি, কখন থেকে বাংলাদেশের চরম সর্বনাশ শুরু হয়েছে, যখন ভারত গঙ্গার পানি সীমান্তে তার নিজের দিকে সরিয়ে নিয়েছে। ওরা পরিমাপ করেছে তোমাদের ক্ষতির পরিমাণ টাকার অঙ্কে, চার বিলিয়ন ডলারের বেশি হবে; তারপরও বোঝ না বন্ধু! তুমি শিখলে না চতুরতা, বুদ্ধিমত্তা তোমার জিম্মী কেন আজো? বন্ধুর স্বরুপ সন্ধান করতে তোমার চল্লিশটি বছর লেগে গেল! তোমার একজোড়া চোখ তোমাকে সারাক্ষণ পথ দেখাচ্ছে, হাটতে শিখাচ্ছে, গাইতে শিখাচ্ছে, বলতে শিখাচ্ছে তারপরও তুমি কেন অন্ধ? এসব ভাবলে মাথার কষ্ট বাড়ে। “গোলাপী এখন ট্রেনে”র গোলাপী তো অন্ধ ছিল, চোখে দেখতো না। তুমি কি জবাব দিবে? তোমার চোখ থাকতেও তুমি অন্ধ! বিধাতার কাছে তোমার কি জবাব হবে?

আবারো শুনতে পাই চারপাশে শুধু হাহাকার আর পাগলা ঘন্টার শব্দ।

শুনছি সমানেই! উদ্ভট সব আওয়াজের সে বিস্ফোরণ কি কিয়ামতের আলাপন?

দেশের নেতৃস্থানীয়রা আজ আর মিথ্যা বলতে পিছে তাকায় না, ভয় পায় না।

কেন এমন হলো? মানুষ এক কান দিয়ে শুনে অন্য কান দিয়ে বের করে দিচ্ছে, কোন পাত্তা দিচ্ছে না।

মানুষ আজ জেনে গেছে, শেষ জামানাতে এসব হবে কম বেশী সবাই জানে।

অপকর্মীরা আরো জানে এসব মিথ্যা বলার সব অধিকার তারা অর্জন করেছে,

২০১২, ধাপে ধাপে সিড়ি বেয়ে উপরে উঠেছে দেশ চল্লিশ পার করেছে।

চল্লিশে সাধুরা সোমত্ত হয়, বুদ্ধিদিপ্ত পদক্ষেপ রাখতে ভয় পায় না

এমনই পূর্ণতা এ সংখ্যাতে এমনই স্বার্থকতা। বর্ডারে হতভাগা হতভাগীরা মরছে,

প্রধানেরা চুপ, মুখে রা নেই, যেন কিছুই হয়নি। গরীবের বাচ্চারা মরেছে, মরুক।

উল্টো ওদেরে ডেকে এনে মালা পরাচ্ছে সোনার সোহাগে বন্ধুত্ব বিলাচ্ছে এমন দুর্দীনে, কোষাগার শূণ্য। কিন্তু তাতে কি, এটি এমনই এক রোগ সবার জানা। গরীবের ঘোড়া রোগ হয় না? এমনই এক রোগে পেয়ে বসেছে। বাহারী এ জাতির ঘাড়ে চেপেছে হতাশার সংক্রমন, মহামারী রোগ। আর্সেনিকে অবশ একাংশ, খরা দারিদ্রতা হাঁ করে আছে। তারপরও রাজসভা অতি বেশী তৎপর, দুহাতে বিলানো হচ্ছে সম্মান সাধনা চলছে সপ্তরাগে, উচ্চাঙ্গে। ওদের অপকর্মের বদলে শাসানী নয়, এ যে মায়াময় বুলি! গরীবের ফেলনা মেয়ে ফেলানীকে বাড়তি জ্ঞান দেয়া হচ্ছে! সে তো মরেছে! তার দেখবার চোখ সে কবে গলে পঁচে ভর্তা হয়েছে! দেখছে বাকী জনতারা যারা আজো বেঁচে আছে, সামনে মৃত্যুর অপেক্ষায় সময় পার করছে

চারপাশে শুধু হাহাকার আর পাগলা ঘন্টার শব্দ সমানেই শুনছি।

মানব বন্ধনে রাস্তারা সারি বাধা, কি করবে এরা দিশেহারা!

তারপরও তারা কত লড়বে কত দশক কত যুগ কত শতাব্দী।

জেনেছি নয় মাসে যুদ্ধ শেষ, এবার কেউ কেউ বলছেন চল্লিশেও শেষ নয়।

ছাত্র নামধারী লীগনেতারা সকল প্রেরণার উৎস, পানিশূণ্য মাঠে লগি বৈঠায় তারা,

স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি, যদিও জন্ম একাত্তর পার করা।

চাপাতি খুর দা পরখ করা। নব্য স্বাধীনতার নব্য রাজাকার এরা।

সুরঞ্জিতও বলছেন, “জাতি আজ দুভাগ হয়েছে” স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি আর বিপক্ষের ধারা।

এসব সাজানো গোজামিল কথা, বলাটা সঠিক না।

সত্তুরে যখন আমরা তরুণ, স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি ছিল গোটা বাংলাদেশ আজ তারা বিভক্ত, দুই ধারা।

পুরানো মূল স্বাধীনতার শক্তিরা ৫০ পার হওয়া রিটায়ার্ড ধাপে তারা।

নতুন শক্তিরা বাংলার তরুণ, মিথ্যায় আগাগোড়া মোড়া। প্রজন্মরা জেনেছে একদিন তারা পিন্ডির নিগড় থেকে বের হয়েছে বিগত সত্তুরে। ফের দিল্লীর নিগড়ে ঢুকতে যাবে কোন খেদে? এটি কি কোন জাগ্রত বিবেক বলে? এতেই তাদের বাধ প্রতিবাধ, গড়ে তোলা ভিন্নধারা। চল্লিশ বছরেও এত তেড়ে উঠে নি জাতি অতীতে। এটি ঐ চল্লিশের দৃপ্ত চেতনা জাতির সামনে। আর একটি আগত মুক্তিযুদ্ধের মুখোমুখি, এরা একবিংশের জাগ্রত জনতা!

অর্থনীতিবিদদেরও কপালে বলিরেখা। প্রশ্ন সোনালী দিন তো সামনে নয়

তবে কি এটি পেছনের হাটে ফেলে আসা? ডিজিটাল এ তো কথার কথা।

দেশ চলছে নগদ ছাপানো টাকাতে, যেন তলাহীন ঝুড়ির ঝাঝরা দশা।

পরীক্ষার পাশ ফেল আজ প্রশ্নাতীত, ফেল করেও চাকরি বাগায় ১৪৪ নেতা পাতিনেতা।

ভালো খবর আছে জমছে তলানীতে, তবে কেমনধারা যেন একহারা।

প্রধানমন্ত্রী আগামী কাল আগরতলা যাচ্ছেন। প্রাপ্তির পটে কিছু জমেছে

আগরতলায় সম্মানসূচক ডি-লিট মনে রাখবার, মুছে দিবার মত নয়।

তাইতো বলতেই হয় “এত কৃতজ্ঞতা কিভাবে ভুলা যায়”?

কিন্তু ফেলানীর সামনে সব কৃতজ্ঞতায় ভাটা পড়েছে!

কাঁটাতারে ঝূলতে থাকা উল্টে রাখা ফেলানীরা কি বড়বেশী অকৃতজ্ঞ?

কচি মেয়ের ধর্ষিত জীবন, হিসেবটা আবার করুণ – যারা বড়বেশী কৃতজ্ঞ!

 

বর্ডারে ফেনসিডিল, ইয়াবা, হিরোইন কত শত নতুন নাম না জানা মাল মশলা সমানেই আসছে।

ওরা গিলবে নাচবে মরবে। কাটাতাঁরের খাঁচাতে যারা আটকে আছে, কেমন মজা ওরা মরবেই?

যেন এক নতুন উপনিবেশ বাংলাদেশ, সেজেছে অপূর্ব বিবস্ত্র সাজ। মঞ্চে মঞ্চে উদ্যাম নৃত্য,

সাংস্কৃতিক আগ্রাসনে যুব সমাজ ঘোলা জল সমানেই গিলছে, শিখছে নতুন বুলি, সবহারা উন্মত্ত।

সব হারানোর বেদনা ভুলার ঔষধ হাতের কাছেই, এরা ড্রাগাসক্ত।

ওপার থেকে দম্ভের আওয়াজে চিদাম্বরম গগৈ,

“বৃহৎ নদী বাঁধ নির্মাণ হবেই। ট্রানজিট করিডোর আমাদের চাই”।

কচি ছেলের বায়না, নতুন মা দিশেহারা এমন আবদারে উচ্ছ্বসিত;

অন্তরে প্রেমের ফল্গুধারা! তরুণেরা বেকার, নেই চাকরী

কথা ছিল প্রতি ঘরে একটি চাকরী, পাঁচ লাখ আজ চাকরীর ফেরারী

জনতারা কাঁদছে সমানেই বিলাপ করুণ সুরে, রহিয়া রহিয়া।

যারা দূরে আছি, বলো – কেমনে রাখি আখিবারে চাপিয়া?

 

এখনো শুনতে পাচ্ছি চারপাশে শুধু হাহাকার আর পাগলা ঘন্টার শব্দ

চাকরীর বাজার ভারতীয়দের হাতে, এটি কেন?

বাংলাদেশ কবে ভারত হলো? জানলাম না কেন?

যেদিন বিডিআর এর ৫৭ মেধাবী জোওয়ান মরলো ২০০৯এর ২৫ ফেব্রুয়ারীতে,

সেদিনই কি? আমরা কি জানতে পারি না?

এ কি আমাদের অপরাধ? ঐ মৃত্তিকাতে আজো ঘুমিয়ে আছে আমার স্বজন, আমার হৃদয় মন আত্মা।

দরিদ্র এক দঙ্গল মানুষের নাড়িভূড়ি ফালি ফালি করে খুবলে খাওয়া এ কেমন উন্মাদতা?

ঐ শাস্ত্রে কি পরহেজ করার বিধান বাতিল?

পরস্বঅপহরণ কি শাস্তিযোগ্য অপরাধ নয়?

পরের জীবন হরণে কি বাড়তি পূণ্য হয়?

সবার বিধাতা একজনই, হোক সাদা কালো পিত বাদামী

সবার রক্তের রং লাল, এক বিধাতার সন্তান তুমি আমি!

এক একটি প্রশ্নের এক একটি উত্তর হয় কিন্তু আজকের সব প্রশ্নের উত্তর এক

যেন সরল অঙ্ক খুব সোজা, “যুদ্ধাপরাধীর বিচার ঠেকাবার কসরত সব”।

 

তারপরও থেমে নেই, চারপাশে শুধু হাহাকার আর পাগলা ঘন্টার শব্দ সমানেই শুনছি। ফারাক্কা টিপাইমুখ ট্রানজিট, হামলা মামলা গুম সব সারিবাধা, এক বন্ধু ভাগ্যে পাওয়া অগাধ উপার্জন।  তত্ত্বাবধায়ক নামের এক নতুন জিগির আকাশে বাতাসে। একে সরাতেই হবে, মুছে দেয়া হয়েছে কৌশলে। এবার ইভিএমে ভোটগ্রহণে বাড়তি বিতন্ডা, তাও অকারণ নয়। দিল্লী হাইকোর্টও বলছে, এতে কারসাজির সুযোগ রয়েছে। ভোট চুরির সম্ভাবনা সামনে, অতএব সাধু সাবধান!

বিশ্বাস করেন চারপাশে শুধু হাহাকার আর পাগলা ঘন্টার শব্দ

খালেদা জিয়ার রোডমার্চ বনাম প্রধানমন্ত্রীর চ্যাংদোলা তত্ত্ব, কেন কথার এমন ছিরি!

প্রধানের বাংলাতে  মনে হয় আরো পড়াশুনা দরকার। ভাষার জন্য এত রক্ত ব্যথায় ভরা

এক উপনিবেশ একবিংশ শতকের শুরুতে মানচিত্র জুড়ে অপূর্ণতা।

এরকম সময়েও ফেনীর জয়নাল হাজারীর সব দন্ড মওকুফ হয়।

আরেক মরণ ফাঁদ তিতাস মৃতপ্রায়; একতরফা বন্ধুত্ব কাম্য নয়।

লন্ডন সেমিনারে অ্যামনেস্টি: বাংলাদেশ মানবিক পরিস্থিতি সুবিধার নয়।

পলোগ্রাউন্ড থেকে উচ্চধ্বনি উঠে, “এ দেশ কারো করদরাজ্য নয়”।

সুজনেরা বলছেন লোহা তপ্ত থাকতেই হাতুড়ি ঠুকতে হয়।

“চুক্তি যেন গলার কাঁটা” বক পন্ডিত নির্বিকার, আছে শুধু বড়াই

প্রথম আলোতে আর কালের কন্ঠে চলছে কুৎসিত লড়াই।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানিতে লুটপাট, উচ্চ মূল্য বাজার, শেয়ার বাজারে ধ্বস,

স্বাধীনতা আজ পরাধীনতার লেবাস আটা, যেন এক উপনিবেশিক ফানুস।

আরো শুনতে চাও, বলবো আরো দুটি কথা! শুনতে চাও এ বেদনার উপাচার।

বেদনার ভারে উপচে পড়ছে চারধারে সঙ্গোপনে চেপে রাখা কষ্টরা।

বিশ্ববিদ্যালয় দলীয় আখড়া কেন? কেনই বা শিক্ষার পাশাপাশি জাতির ডুবার অঙ্গিকার?

একজন শিক্ষকের সামনে সন্তানসম ছাত্র তার; অনাগত ভবিষ্যত কেন এত ওজনহীন হালকা মূল্যহীন জমাট মাংসপিন্ড। এরা সবাই স্বার্থের পেছনে ছুটছে বলেই তারা একচোখা, দৃষ্টিহারা। চারপাশ আজ ঝাঝরা বিষফল ছড়ানো উত্তপ্ত আকাশ বাতাস, আগাম ভবিষ্যত অনেকেই অতীত লাশ। লাশের কপট ভারে বৃদ্ধ পিতার কাঁধ যেন টন টন বোঝার এক বরফগলা হিমালয়। পৃথিবী – তুমি কি ক্লান্ত আর বইতে পারছো না এ ক্লন্তির বোঝা? তবে কি কিয়ামত আগত, সামনে?  আমরা আতঙ্কিত!

যুক্তরাষ্ট্রের গ্লোবাল পোস্ট জানান দিয়েছে, আজ সারা বিশ্ব জানে বাংলাদেশের সীমান্ত আজ ইঁদুরের ফাঁদ “মৃত্যুর দেয়াল”। ইসরাইল ও ফিলিস্তিন থেকেও ভয়ঙ্কর এরা নির্যাতনে ছাড়িয়ে গেছে সবারে, চাঁদাবাজ ঘোষখোর বিএসএফ জোওয়ান। বিবিসির খবরে প্রকাশ ঘোষের টাকা চাইতে তারা হাবিবুরকে উলঙ্গ করেছে। আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে হাবিবুর কাঁদছে। ওরা নেকড়ের মত ঝাপিয়ে তৎপর শিকারের উপর। শিকারীর গোঙ্গানী শুনছে জনতারা ইউটিউবের চারপাশ থেকে। হিউমেন রাইটস ওয়াচ এক মানবাধিকার সংগঠন জানে কত রক্ত বইছে সীমান্তে কাঁটাতারের ফাঁক গলিয়ে। ঘুষের কত রকম উপার্জনের আয়োজন সেখানে। গত এক দশকে এক হাজার বাংলাদেশী বিএসএফের গুলিতে লাশেরা মুমূর্ষু মৃত। নির্যাতীতের সংখ্যা অফুরান, মোটেও হাজারে কুলাবার নয়, ওয়াচের মন্তব্য। তারা জোওয়ানরা হাবিবুরকেও মনে করেছিল মরে গেছে। তাই লাশ ছুড়ে ফেলে রাখে। বিধাতার দয়ার সৃষ্টি, তাই সে মরে নাই। মানচিত্রের ওপারে দিল্লীর প্রশাসন চিন্তিত, নিশ্চয় বিদেশী আইএসআই গোয়েন্দা জড়িত!

ওরা কতই না তৎপর কৌশলী! ভাগ্যিস এটি ফাঁস হলো আর ফাঁস না হওয়া

কত লাশেরা মিছিল করছে জনমানবহীন কাঁটাতারের সীমান্ত দেয়ালে।

মনে পড়ে বর্ডারে চেকিংএ গেলে, তারা কতই না টাকা খাবার ধান্ধা খোঁজে।

যদিও সীমান্ত খোলা, চোরাকারবারীরা সহজেই যেতে পারে বখরা দিলে।

কাঁটাতার এক অনাচার ফাঁদের নাম। বিচার শুধু ফেলানী আর হাবিবুরের জমা।

ঐ বিদেশীর গোয়েন্দা না থাকলেই কি বিধাতার ছবি কথা বলবে না, ঐ কিয়ামতের মাঠে?

ওরে পাষাণ! ঐ মাঠে কেউ ছাড়া পাবে না। হাতকড়া হাতে থাকবে সাথে সব জান ও মান।

জেনে রাখিস! ফেলানী ও হাবিবুরের থেকেও বহুগুণ কঠিন হবে তোদের পরিণাম।

পাঠক বন্ধু ! এক বিংশ শতকের এ নব্য উপনিবেশবাদের গল্প শোনার পরও

নিশ্চয় বিশ্বাস করতে কষ্ট সার! এতসব গল্প শুধু কবিতাই নয়,

সত্য কথন। হে বিধাতা! বন্ধ করো এ নির্যাতন। শুনছি সমানেই শুনছি

চারপাশে শুধু হাহাকার আর পাগলা ঘন্টার ঢং ঢং মতন শব্দের আয়োজন।

 

কিছু নতুন খবর আছে কেউ বলছে চাঁদের বুকে ষ্টেশন হবে। এলিয়েনরা আছে ধারে কাছে। কিন্তু তারচেয়েও গুরুতর সমস্যা সামনে। দেশবাসীর সামনে এলিয়েন নয়,  জয়নাল হাজারীরা টুপি মাথায় দাঁড়ি মুখে একপায়ে দাঁড়িয়ে। এদের দেখলে গলা শুকিয়ে কাঠ হয় সাধারণ জনতার। তারা সাধারণেরা সন্ত্রাস চায় না, চায় বাঁচবার নিশ্চয়তা। জয়নাল হাজারীরা মাথায় টুপি আর দাঁড়ি রাখলেই কি সাত খুন মাফ হয়ে যায়! সারিবাধা সব অপরাধ ধুয়ে মুছে যায়! তবে সব দাাঁড়ি সমান নয়! দাঁড়িরও রকম সকম ভিন্ন নিয়মে গড়া, গাটছড়া বাধা! আমরা সাধারণেরা চেয়ে আছি শুধু অপলক দৃষ্টিতে, ২০১২ জানুয়ারী, তুমি বছরের শুরু, তুমি সাক্ষী থেকো। শুনছি সমানেই চারপাশে শুধু হাহাকার আর পাগলা ঘন্টার শব্দ। আট বছর আগের লেখাটি পড়লে মনে হয় যেন গতকালের কথা বলছি। শুনছি তো শুনছি সমানেই শুনছি। আল্লাহ এ জটিল সঙ্গিন সময়ে জাতিকে সঠিক পথ বাতলে দিক। আমিন।

মূল রচনাকাল ১৮ জানুয়ারী ২০১২।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: ব্লগে ছাপা হয় ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২০। এ চলমান সপ্তাহে নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত দি রানার নিউজ থেকেও কলামটি ছাপা হয়।

 

নাজমা মোস্তফা

খবরটি স্টাফ রিপোর্টার কৃত ৭ ফেব্রুয়ারী ২০২০তারিখ মিডিয়ার খবর। কে বা কারা চাইছে আবরার ফাহাদের বাবাকে আড়াল থেকে মামলা আপসে মিটমাট করে ফেলতে কল করছে। বিনা অপরাধে মৃত্যুর জবাব কিভাবে ফয়সালা হয় তাও আবার আপোষে? শক্তির তলানীতে এটি সংগঠিত হয়েছে, এর অনেক সাক্ষ্য প্রমাণে ওরকমই মনে হয়। ঘটনা ঘটিয়ে সরকারও সিসিটিভির দাগ মিটানোতে উঠে পড়ে লাগে। সরকারের অতি চাতুরী ছাত্র জনতার কাছে ধরাও পড়লো। সাত্তার নামের একজন টেলিফোনে আল্লাহর বাণী শুনিয়ে আপোস প্রস্তাব দিচ্ছে। নির্দোষ মেধাবী আবরার হত্যায় আল্লাহর কথা মনে পড়ে নাই, এবার দুর্বৃত্তের জীবন বাঁচাতে আল্লাহকে মনে পড়েছে! ২০১৯ সালের ৭ই অক্টোবর প্রকৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে সরকার সমর্থক ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা হত্যা করে, সচরাচর ধারাবাহিক হত্যা গুমের মতই স্বাভাবিক এসব হত্যাকান্ড।

‘বাংলাদেশের বেসরকারী খাতে ভারতীয় দাপট’ খবরের শিরোনাম। পোশাক শিল্প, বায়িং হাউজ, আইটি এবং সেবা খাতে ভারতীয় দাপট বেড়েই চলেছে। চীনা ও শ্রীলংকা এরপরে থাকলেও করোনা ভাইরাসে চীনের দাপট কিছু কমলেও ভারতীয় দাপট আরো বেড়ে যাবার আশংঙ্খা করা হচ্ছে। বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলোতে এক লাখেরও বেশী ভারতীয় কাজ করেন। অন্যদিকে বায়িং হাউজে এই সংখ্যা আরো আরো বেশী। বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম, বিজ্ঞাপন, কনসালটেন্সি এসব খাতেও ভারতীয়রা রয়েছেন। সব মিলিয়ে বাংলাদেশে কম করে হলেও পাঁচলাখ ভারতীয়রা কাজ করে। কিন্তু তাদের অধিকাংশেরই কোনো ওয়ার্ক পারমিট নেই। তারা টুরিস্ট ভিসায় আসে। আর তাদের বেতন অনেক বেশী। টুরিস্ট ভিসায় যারা কাজ করে তাদের আয়কর পুরো অর্থই অবৈধ পথে বাংলাদেশের বাইরে চলে যায়। সফটওয়্যার ম্যানেজমেন্ট ও ভারতীয় কৌশলশর্ত জুড়ে দেয়ার কারণেও তাদের জনশক্তিকে কাজ দিতে হয়। ট্রাভেল এজেন্টদের বড় একটি অংশ তাদের নিয়ন্ত্রণে। সরকার এসব ব্যাপারে তৎপর নয় বরং চরম গাফলতি, দেশের স্বার্থকে খর্ব করছে।

বাংলাদেশের চাকরির বাজারে কর্মরত বিডিজবস ডটকমের পরিচালক ফাহিম মাশরুম বলেন, ‘বিদেশে কর্মীদের মাঝে ভারত সবার উপরে তারপর শ্রীলংকা, চীন থাইল্যান্ড। এদের দশভাগেরও ওয়ার্কপারমিট না থাকায় অবৈধভাবে কাজ করছে। তারা ভারত থেকে পেমেন্ট পায়। এ সিস্টেমও তারা ভারতীয়রা করে নিয়েছে।’ পোশাকখাতের বড় অংশ তাদের টেকনিশিয়ান ও ডিজাইনাররাই উঠায়। বিআইডিএস এর অর্থনীতিবিদ ডঃ নাজনীন আহমেদ জানান, ‘প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে পাঁচ বিলিয়ন ডলার দেশের বাইরে যাচ্ছে। বাংলাদেশের টার্গেট ২০ বিলিয়ন ডলার। তার মানে আনা রেমিটেন্সের এক উল্লেখযোগ্য ভাগ তাদের পাতে যায়। এটি হচ্ছে বৈধ চ্যানেলের কথা। আর অবৈধ পথে কত যায় তার কোন হিসাব সরকারী খতিয়ানে নেই। সবচেয়ে বেশী যায় ভারত ও শ্রীলংকায়। একাউটেন্ট ও প্রশাসনিক কাজেও বাইরে থেকে লোক নিয়োগ দেয়া হয়’ (পোশাক শিল্পের এসব সূত্র: ডয়েচে ভেলের রিপোর্ট)।

এই হচ্ছে পোশাক শিল্পের বর্তমান দশা। উন্নয়নের ফানুসে সরকার সবকিছু রঙ্গিন চশমা চোখে মাপছে। কালার ব্লাইন্ড সরকার যেন সবকিছু ভুল অংকে ভুল ফিরিস্তিতে দেশবাসীকে বোঝাচ্ছে? আইবিটিআইএফ সভায় বস্ত্রমন্ত্রী ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী ০৬ ফেব্রুয়ারী ২০২০ তারিখ বুধবার রাজধানীর লেকশোর হোটেলে প্রথমবারের মত দুই দেশের দুই দিন ব্যাপী সভা হয়। সভায় বলা হয়, উভয় দেশ উপকৃত হবে। কিন্তু প্রায় সব ব্যাপারে একতরফাভাবে পরনির্ভর মনেবৃত্তির সরকারের কাছ থেকে ঘাটতি মোকাবেলার ব্যাপারে জনগণের খুব একটি বিশ^াস জন্মাবার কথা নয়। কারণ কোন ব্যাপারেই সরকার কোন দক্ষতার দাগ দেখাতে পারে নাই। দেউলিয়া অর্থনীতির বোঝা কাঁধে নিয়ে পোশাক শিল্পকে খাদের কিনারায় নিয়ে দাঁড় করাতে সরকারের গাফিলতিও অস্বীকার করার উপায় নেই। যখন সরকারের অর্থমন্ত্রী সংসদে দাড়িয়ে বুক ফুলিয়ে সরকারের সুরে একই লাগামছাড়া মন্তব্য ছুড়ে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল প্রচার করেন, “আমি বিশে^র এক নম্বর অর্থমন্ত্রী”(৫ ফেব্রুয়ারী ২০২০, আমাদের সময়)। শেয়ার বাজারের সীমাহীন ধ্বসের উপর দাঁড়িয়ে এ হুংকার যেন ‘সিংহ আমি বনের রাজা’র মতই অহংকারী ভারসন। অর্থমন্ত্রী এতই সুবোধ বালক যে, ব্যাংকের মালিক ডিরেক্টররা ঋণ নিয়ে বসে থাকলেও তিনি কোন ব্যবস্থা নেয়ার দরকার বোধ করেন না। মনে হয় উনার লজ্জা লাগে। ঠিক যেভাবে ভারতীয়রা মালামাল বিনা ট্রানজিটে পার হয়, শুনেছি বাংলাদেশ সরকার চাইতে লজ্জা পায়! দেশ থেকে কোটি কেটি হাজার কোটি টাকা পাচার হলেও অর্থমন্ত্রী কোন ব্যবস্থা নেন না। কি কারণে তার এমন নিরবতা, সেটি তিনি ভালো জানেন। তবে নিজের কাজেকর্মে স্বচ্ছতা না থাকলে অপরকেও সুবিধা দেয়া ছাড়া উপায় থাকে না। শক্তির নীতিতে তারা দক্ষ, উল্টে পাল্টে দে মা, লুটেপুটে খাই!

সরকারের সব মন্ত্রীরা ঢোল পিটাতে পিটাতে ঢোল ক্ষয় হওয়ার শেষ ধাপে কিন্তু জনতারা যে যেদিকে পারে ময়দান ছেড়ে পালাতে চাইছে। এর কারণ কি? রোগীর লক্ষণ দেখে ডাক্তার রোগ নির্ণয় করে। কি কারণে তরুণদের এমন রোগ হলো সেটি নির্ণয় করা দরকার। এত সুখ সমৃদ্ধি উন্নয়ন মেগাপ্রজেক্ট রেখেও কেন তারা দেশ ছেড়ে পালাতে চাচ্ছে! আর ভারতীয়রা কিভাবে এখানে নিরাপত্তা পাচ্ছে! ওপরদিকে ভারত সরকার এনআরসির সোরগোল তুলেও ফায়দা লুটার মানসাঙ্কে ব্যস্ত। দেশটা কি শুধু অর্থমন্ত্রীর, সেতুমন্ত্রী কাদেরের, মন্ত্রী নাসিমের নাকি গভীর রাতে ভোট লুটেরা প্রধানমন্ত্রীর! জনতারা সব বেওয়ারিশ লাশ, খালেদার মতই। ডঃ কামাল সীমা ছাড়িয়ে গেছেন, বয়ানে কাদের (মানবজমিন, ১০ ফেব্রুয়ারী ২০২০), জিয়া এরশাদ খালেদা এ মাটির সন্তান নন, (শেখ হাসিনা, ৫ ফেব্রুয়ারী ২০২০)। মন্ত্রী নাসিমের বয়ান ভোটারদের সাথে সম্পর্ক না থাকায় ভোটে তারা কেন্দ্রে আসেনি, নাসিম, (৫ ফেব্রুয়ারী, নয়াদিগন্ত), ‘বর্তমান সরকারের সময় বিচার বিভাগ সম্পূর্ণ প্রভাবমুক্ত’ বয়ানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সারা জাতি কমবেশী জানে, ইতিহাস এ মাটির দাগদেয়া সন্তান জন্ম কাহিনীর অনেক কথা জমা করে রেখেছে, যা শুনতে বাজে লাগে। এখানে  সবার কথার মাঝে বাস্তবতার চরম সংকট। এরা দলগতভাবে সত্যকথা ও কাজ ভুলেই গেছে। কথায় কথায় বেফাঁস মিথ্যা হাসির খোরাক জমায়! এসব দেশের সমাজ চিত্র ও অর্থনীতির একটু ছোঁয়া। আবরার হত্যা, খালেদার কারাগার, মন্ত্রীদের বাগাড়ম্বর, ভোটের মৃত্যুদশা, অর্থনীতির গোজামিল অংকদশা, সচেতনকে গভীরভাবে ভাবায়। এ যেন শত্রু ঘুনপোকারা মজ্জা চুষে খাচ্ছে আর দেশের অস্থিমজ্জা ঝরঝরে হচ্ছে। অদেখা বিধাতা ছাড়া আর বিচার চাইবার কোন জায়গা সামনে পিছনে ডানে বামে অবশিষ্ট নেই। তারপরও সবহারাদের বড় ভরসা আল্লাহ, যে ময়দানে বিচার চাইবার জায়গা কোনদিনও শেষ হবার নয়।

৭ ফেব্রুয়ারী ২০২০।

বি দ্র: উপরের পুরো লেখাই নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত দি রানার নিউজ কলামে ছাপে ৭ ফেব্রুয়ারী ২০২০ সালে।

নাজমা মোস্তফা

কি কারণে একজন মুক্তিযোদ্ধা এরকম একটি আবদার করে বই লিখে গেলেন সেটি কি জাতিকে ভাবায় না? জাতির মগজ নামক শরীরের অঙ্গটি কর্মক্ষম থাকলে আর বিবেক কার্যকর থাকলে অবশ্যই তাদের ভাবতে হবে, একবার নয়, বার বার। কে কোন দল করে সেটি বিষয় নয় কে কে মানুষ সেটিই বিষয়। এখানে মানবিক ও পাশবিক বিবেচনা ছাড়া আর কোন প্রসঙ্গ নেই। এ মুক্তিযোদ্ধা সেদিন ২০২০ দেখেছিলেন বিধায় এমন রায় দিয়েছিলেন। এরা ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা। দেশপ্রেমের খাতায় এরা চিরজীবি। এদের পাওনা অফুরান, দুই জাহান ভরা স্বার্থক মানব সন্তান। ফাঁসি দেয়া ধান্ধাবাজরা বোকার মত দেউলিয়া হয়ে টিকছে, ক্ষমতার চেয়ার ব্যতীত এরা মানব হৃদয়ে কংকাল, অপরিচিত লাশের হাড় গোড় নয়তো ঘৃণ্য জীব। আকর্ষণ সম্মান দায়বদ্ধতা দয়া মায়া মমতা না হারালে কি কেউ ফাঁসির দন্ড চায়? মতিয়ুর রহমান রেন্টুর কাছে এরা কয় যুগ আগেই সর্বহারা হয়েছে। ক্ষমতার দাপটে অবৈধরা সব চাপা দিয়ে রেখেছে, বাজেয়াপ্ত করেছে। আজ এদের ময়দানের আচরণ স্পষ্ট করছে এরা গোটা জাতির কাছে নিঃস্ব দেউলিয়া হয়ে ধ্বংসের শেষ সীমানায় হাঁপাচ্ছে।

স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধের সৎ সাহসী যোদ্ধারাই প্রকৃত বিজয়ী। জাতিকে বাঁচাতেই তাদের আত্মত্যাগী সততার দাগ চিহ্ন। তারপরও জাতি কেন মরছে হাটু পানিতে? বিদ্রোহী মুক্তিযোদ্ধা মতিয়ুর রহমান রেন্টু তার বিদ্রোহের স্বাক্ষর রেখেছেন কাজে কথায় ও কালিতে। সরকার যা করছে, এটি তার বহু পুরানো জাত স্বভাব, ঐ মুক্তিযোদ্ধা বিগত শতকে অকপটে সব স্পষ্ট করে গেছেন। শেখ হাসিনার প্রাইভেট সেক্রেটারী তিনি নিজে ১৬ বছর ও তার স্ত্রী ৯ বছর একসাথে কর্মচারী কর্মকর্তা হয়ে থাকার পর এই তার পরিসংখ্যান। তথ্যবহুল বাস্তব ঘটনার প্রতিটি রাজনৈতিক জটিলতার খুটিনাটি সেখানে স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে।

নীচে মুক্তিযোদ্ধা মতিয়ুর রহমান রেন্টুর বই “আমার ফাঁসি চাই” (প্রকাশকাল ১৯৯৯, স্বাধীনতা দিবস), ঐ গ্রন্থ থেকে বিগত শতকের ইতিহাস দেখা কিছু বাস্তব সত্য তুলে ধরছি। মূল গ্রন্থে অনেক বিস্তৃত আলোচনা এসেছে, বইটি ময়দানে নেই, তবে অনলাইনে আছে বাংলা ও ইংরেজীতে। ঐ লেখকের দুটি বইএর অন্যটি হচ্ছে “অন্তরালে হত্যাকারী খুনী প্রধানমন্ত্রী” (জীবনাতঙ্কে ছুটে বেড়ানো রেন্টুর ভাতিজা রাকেশ রহমানের ভিডিও তথ্য)। সরকারের সৎ সাহস থাকলে বই দুটি ময়দানে থাকতো, বাজেয়াপ্ত কেন হবে? রাকেশও এই কথা বলেন। সহজ অংক, তার মানে সরকারই দোষী, আর রেন্টুর অর্জন ইহ ও পরকালে জমছে বহুগুণে। সরকারের অপকর্মের ১৫ মামলা বাতিল, রেন্টুর চ্যালেঞ্জ করে লেখা বইও বাতিল! সরকারকে বাতিল করাই মুক্তির একমাত্র বিশুদ্ধ জবাব। এ বইটি পড়ার পর কোন বিবেকবান মানুষ সরকারের সাথে থাকতে পারে না। শেখ মুজিবের উত্তরসুরীরাই তাদের পূর্ব পুরুষের পরিচিতি ঈমান আকিদা সততা, যোগ্যতা, মানবিকতার পক্ষে বিপক্ষে দলিল স্পষ্ট করছে, এদের সুকর্ম অপকর্মের দায় পাপ পূণ্য সংগৃহীত হচ্ছে। কুরআনে সুরা বাকারাহর ২১৭ আয়াতে আল্লাহ বলেন উৎপীড়ন হত্যার চেয়ে গুরুতর। তার মানে এরা হত্যার চেয়েও গুরুতর অপরাধ করছে। যোগ বিয়োগের হিসাবটি প্রজন্মকেই করতে হবে, জাতিও পরখ করতে পারে। যে কেউ বিগত সময়ের সব কার্যকারণ ও সাম্প্রতিক ২০২০ সালের ভোটের বাস্তবতা এর সাথে মিলিয়ে নিতে পারবেন। ঐ বইএর ১৩৮,১৩৯,১৪০ পৃষ্ঠা থেকে সামান্য সংগ্রহ দিলাম।

(১)        সম্পূর্ণ সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সঠিক সময়ে স্বাধীনতা ঘোষণা না করায়, ত্রিশ লক্ষ মানুষকে নিহত হতে হয়, দুই লক্ষ মা বোনকে ধর্ষিত হতে হয়, এর দায়ে দায়ী শেখ মুজিবর রহমানের মরণোত্তর ফাঁসি চাই।

(২)       মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধ্বংস করার অভিযোগে শেখ মুজিবর রহমানের মরণোত্তর বিচার চাই, শাস্তি চাই।

(৩)       মুক্তিযোদ্ধারা দেশ স্বাধীন করেছে, শেখ মুজিবর রহমানকে স্বাধীন দেশে ফিরিয়ে এনেছে, স্বাধীনতার পর ভারত থেকে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা না এনে, রাজাকার আলবদরসহ ভুয়া ব্যক্তিদের মুক্তিযোদ্ধা সনদ (সার্টিফিকেট) দেয়ার অভিযোগে শেখ মুজিবর রহমানের মরণোত্তর বিচার চাই, শাস্তি চাই।

(৪)       ক্ষমা না চাইতেই স্বাধীনতা বিরোধী রাজাকার, আলবদরদের ঢালাওভাবে ক্ষমা ঘোষনা করার অপরাধে শেখ মুজিবর রহমানের মরণোত্তর ফাঁসি চাই।

(৫)       মহান বিপ্লবী নেতা কমরেড সিরাজ সিকদারকে বন্দি অবস্থায় বিনা বিচারে গুলি করে হত্যা করার অপরাধে শেখ মুজিবর রহমানের মরণোত্তর ফাঁসি চাই।

(৬)       সিরাজ সিকদারকে খুন করে পবিত্র পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে সিরাজ সিকাদার আজ কোথায় বলে দম্ভকারী শেখ মুজিবর রহমানের মরণোত্তর ফাঁসি চাই।

(৭)       জনগণের ভোট দেয়ার অধিকার, মিছিল করার অধিকার, দল করার অধিকার ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণসহ সংবিধানের মৌলিক অধিকার হরণ করে জাতির উপর একদলীয় (বাকশাল) শাসন শোষন চাপিয়ে দেয়ার অপরাধে শেখ মুজিবর রহমানের মরণোত্তর বিচার চাই, শাস্তি চাই।

বাবার পর মেয়ের উপর ক্ষ্যাপা মুক্তিযোদ্ধা রেন্টু। এসব কি বিনা কারণে, বিবেককে প্রশ্ন করেন।

(ক) শেখ হাছিনা ভারত থেকে দেশে এসে সন্ত্রাসী, চোরাকারবারী, কালোবাজারী, ঘোষখোরদের রাজনীতির চালিকাশক্তিতে পরিণত করেছে এবং রাজনীতি থেকে সকল প্রকার নীতি আদর্শ ঝেটিয়ে বিদায় করে প্রতিষ্ঠিত করেছে নীতিহীন এক রাজনীতি, এই অপরাধে শেখ হাছিনার বিচার চাই শাস্তি চাই।

(খ) ভারতে বসে স্বাধীনতার ঘোষক মুক্তিযোদ্ধা রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হত্যার ষড়যন্ত্র ও পরিকল্পনা করে এবং ১৯৮১ সালের ৩১শে মে তা বাস্তবায়িত করার অপরাধে শেখ হাছিনার ফাঁসি চাই।

(গ) ১৯৮২ সালে গনগণ কর্তৃক নির্বাচিত বিএনপি সরকার উৎখাত করে সামরিক সরকার প্রতিষ্ঠিত করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকার অপরাধে শেখ হাছিনার বিচার চাই, শাস্তি চাই।

(ঘ) সামরিক স্বৈরাচার জেনারেল এরশাদকে হাতের মুঠোয় রাখার জন্য, ষড়যন্ত্র ও পরিকল্পনা করা, ছাত্র আন্দোলনের নামে ’৮৩র মধ্য ফেব্রুয়ারী ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্র জাফর ও জয়নাল এবং ’৮৪এর ফেব্রুয়ারীতে সেলিম ও দেলোয়ার হত্যার অপরাধে শেখ হাছিনার ফাঁসি চাই।

(ঙ) ১৯৯২ সালের ডিসেম্বরে সার্ক শীর্ষ সম্মেলণ পন্ড করার জন্য হিন্দু মুসলমান সাম্প্রদায়িক রায়ট লাগিয়ে দেওয়ার অপরাধে শেখ হাছিনার বিচার চাই, শাস্তি চাই।

(চ) ১৯৯২ সাল থেকে ১৯৯৬ সালের মার্চ পর্যন্ত আন্দোলনের ইস্যু তৈরী করার জন্য ঢাকা শহরে ১০৩ জন নিরীহ অজ্ঞাতনামা সাধারণ মানুষকে খুন করার অপরাধে শেখ হাছিনার ফাঁসি চাই।

বইটি পড়া প্রতিটি বাংলাদেশীর অবশ্য অবশ্য কর্তব্য। স্বাধীনতার শুরু থেকেই এরা দাগী আসামী। জেলখানায় চার নেতার মৃত্যু কেন, এদের প্রতি এ অভিযোগও তিনি করেছেন। আলোচনার বদলে নিরবতা ষড়যন্ত্রকথা! শেখ মুজিব ইচ্ছাকৃতভাবেই পাকিস্তানীদের হাতে ধরা দেন! ৭ নভেম্বরের সিপাহী জনতার বিপ্লব ছিল মুজিবের বাকশাল ও ভারতের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ!  ৮১ সালের ২৩শে ২৪শে মে টিএসসি তৃতীয় তলাতে কর্ণেল শওকত আলীর বয়ানে ছিল, “জিয়াউর রহমান চট্টগ্রাম গেলে —– মেজর জেনারেল মঞ্জুরের নেতৃত্বে জিয়া হত্যা হবে। এ হত্যাকান্ডের ব্যাপারে হাছিনা জ্ঞাত থেকে কাজ করতেও নির্দেশ দিয়েছেন। ধূর্ত এরশাদ মঞ্জুরকে ত্বরায় হত্যার নির্দেশ দিয়ে নিজের অপরাধ ঢাকে। এরশাদের দাগী অপরাধীরাই জেল থেকে খালাস পাওয়া ১৯৯০ সালের ২৭ নভেম্বর ডাঃ মিলনকে হত্যা করে। ঢাকা শহরের গুন্ডা বদমাইশদের হাতে নগদ পাঁচলক্ষ টাকা দিয়ে লুট হয় ঢাকেশ্বরী মন্দীর, রামকৃষ্ণ মিশন, তাতিবাজার, শাখারিপট্টি, ——- সার্ক সম্মেলন পন্ড করা হয় হাছিনার নির্দেশে।  সচিবদেরে ন্যাংটা করে ফেলার নির্দেশও ছিল হাছিনার। একজন আলমকে সচিবদের ন্যাংটা করার দায়িত্ব দিলেন। (ঐ গ্রন্থ, ১৬২ পৃষ্ঠা)। জেনারেল নাসিম বীর বিক্রমকে শেখ হাছিনা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করার প্রস্তাব দেন। ২০শে মে ’৯৬এর ক্যু দে তা’র পরিপ্রেক্ষিতে সীমান্তে ভারতীয় সেনা সমাবেশ কলাম থেকে “দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও সেনাবাহিনীর শৃংখলা বিরোধী কর্মকান্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল নাসিমকে সেনাবাহিনীর সুপ্রিম কমান্ডার প্রেসিডেন্ট আব্দুর রহমান বিশ^াস বরখাস্ত করেন। প্রেসিডেন্ট যথাসময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করলে এ দেশ ঐ দিনই একটি দেশের গোয়েন্দা ষড়যন্ত্রের ব্লু প্রিণ্টে স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বকে হুমকির মুখে দাঁড় করিয়ে দিতে পারতো (বাংলাদেশে ‘র’ আবু রুশদ পৃষ্ঠা ১৯২)। জনতার মঞ্চের আয়োজনে ও কলকাঠিতে শেখ হাছিনা। এক কথায় এ জাতির প্রতিটি দুর্যোগে দুর্ভোগে শেখ হাছিনা সরাসরি জড়িত। সমস্ত জাতি চোখ থাকতেও অন্ধ সিনেমার গোলাপীর মত পথ হাতড়ে চলেছে। এরপরও বাপ বেটির ঢোল কিভাবে পেটাবে বিবেকসম্পন্ন জনতা? প্রশ্ন সেটাই।তিহাস কথা কয়। কি কারণে একজন মুক্তিযোদ্ধা মরণের ভয় না করেও এমন প্রতিবাদ করে গেলেন, যখন ক্ষমতায় হাছিনা। যুগে যুগে জাতির স্যালুট এমন ত্যাগী মুক্তিযোদ্ধার পাওনা! ইসলামে একেই বলে জিহাদ, শত ষড়যন্ত্রেও সত্য প্রকাশ করার সাহস ঐ সব অসাধারণদের অর্জন। শুধু ইতিহাস কথা বলে না, বর্তমানও কথা বলছে। তার বাস্তব প্রমান সব জনতার চোখের সামনেই স্পষ্ট। একজন প্রাইভেট সেক্রেটারী হিসাবে ২২ বছর আগে দেখার শেষটা আর শুরুটা ৪০/৪১ বছর আগ থেকেই তিনি পরখ করছেন হাছিনার আচরণ গতিবিধি কাছ থেকে ঘরে থেকে। রেন্টু প্রথমে তার নিজের ফাঁসি চেয়ে বইএর নাম করেন। কারণ তিনি জেনেও এসব চেপে ছিলেন, এই অপরাধে! পরবতীতে যে দুজনের ফাঁসি চেয়েছিলেন তারা, বাপ বেটি! মুক্তিযোদ্ধা রেন্টুর রায়ে ফাঁসির আসামী!

(০২/০২/ ২০২০) = ফেব্রুয়ারীর ২, ২০২০।

 

নাজমা মোস্তফা

শান্তিময় দাসত্ব থেকে অশান্ত ভয়ের স্বাধীনতা উত্তম। উক্তিটি থমাস জেফারসনের। বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এর উত্তম উদাহরণ হিসাবে বাংলাদেশের নাম উঠে এসেছে একটি সাউথএশিয়া জার্নালে প্রকাশিত “Bangladesh: An Enslaved Nation? (Part 1) November 30, 2019 by R. Chowdhury লেখাটি ছাপে। যুদ্ধ ও গুলি ছাড়াই কিভাবে ভারত তার উদরে দেশটিকে ঢুকিয়ে দেয়ার সব কসরত সার্থকভাবে করছে তার চিত্র ফুটে উঠেছে ঐ লেখাটিতে। ৯০% মুসলিমদের দেশটিতে ভারতীয় সংস্কৃতির ভাগাড় করাসহ বাংলাদেশের এ দাস সরকার গণতন্ত্রের পথিকৃত তিনবারের প্রধানমন্ত্রীকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে শিকল পরিয়ে রেখেছে। কোন মানুষ ছাত্র নেতা শিক্ষক সাংবাদিক রাজনীতিবিদ স্বাধীনভাবে নিজের কষ্টও ব্যক্ত করতে পারে না। আজো মনে পড়ে স্বাধীনতা পরবর্তী ২৫ বছর চুক্তিটি জানতাম গোলামী চুক্তি হিসাবে, কিন্তু এটাকে ঘুরিয়ে প্রচার করা হতো মৈত্রী চুক্তি নামে। গোলামীর ঐ দড়ি সেদিনই সচেতনরা টের পায়। এর মূল শর্তগুলি বেশ ঢাকা ছিল। মানুষ দোটানার মাঝে ছিল দাসত্ব না মৈত্রী। আমার মনে পড়ে ঐ সময় এর উপর একটি লেখা ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের চারুকলার এক শিক্ষক আব্দুস সাত্তার সাহেব এর উপর তার নিজের লেখা একটি কপি দিয়েছিলেন, আমি খুব সযতনে সেটি আমার ফাইলে রেখেছিলাম। পরে কোনভাবে সেটি হারিয়ে ফেলি অন্য কিছু জরুরী কাগজপত্রের সাথে। ৭১ পরবর্তী এমন কোন আচরণ চোখে পড়ে নাই, যাতে ভারতকে পরম বন্ধু মনে করা যায়। বরং বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বন্ধুত্ব টিকিয়ে রাখার ব্যাপারে দীর্ঘমেয়াদী প্রচেষ্টা চোখে পড়েছে। অবৈধ দখলদার সরকার টিকে আছে তাদের সহযোগিতায়। যার কারণে শত অনাচারেও প্রতিবাদ প্রতিরোধ না করে সীমাহীন নীরবতা বাংলাদেশকে বিপন্ন করেছে। বাংলাদেশ আজ অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে। আমেরিকার প্রতিষ্ঠাতা শাসক থমাস জেফারসন মানুষের জন্য স্বাধীনতার যে স্বপ্ন দেখতেন সেটি আজ মুজিব কন্যা পুরোটাই ধ্বংস করে দিয়ে বাংলাদেশের জন্য সংকট সৃষ্টি করে চলেছেন। দেশের বর্তমান পরিস্থিতি যে কত ভয়ংকর বিপন্ন সেটি একটি কলামে ফুটিয়ে তোলা সম্ভব নয়। এমন পরাধীনতা পাকিস্তান আমলেও জাতি পরখ করে নাই, বৃটিশ আমলেও না। দেখা গেছে বৃটিশরা সাক্ষী মারা গেলে প্রমাণের অভাবে দোষী ব্যক্তিকেও ছেড়ে দিয়েছে। আর এ সরকারের সময় ফাঁসির রায় প্রাপ্ত মানুষকে দোষী হিসাবে পাকাপোক্ত করতে কারাগারের এজলাশেও মাথায় জঙ্গি টুপি পরানো যায়। যাকে তাকে জঙ্গি সাজানো যায়, হাটে ঘাটে মাঠে কেউ নিরাপদ নয়। লাশ গুম হত্যা রক্ত জঙ্গিপনা চাপানো যায় যে কোন নির্দোষের ঘাড়ে এ যেন মগের মুলুক।   

 

ভারতের সাথে কি চুক্তি হয়েছে বিএনপি জানতে চাইলেও সরকার নড়ে নাই। এবার তারা তথ্য প্রযুক্তিতে মামলা করবেন বলে ঠিক হয়েছে। তারা যা চুক্তি করেছে তাতে ন্যুনতম অর্জন না রেখেই একতরফা চুক্তি করা হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার, ফেনী নদীর পানির ব্যবহার, ট্রেন যোগাযোগে বাংলাদেশের ভারতের বিশাল ব্যয়ভার আমদানী রপ্তানীর সব খতিয়ান বাংলাদেশের উপর জেকে বসে, বিনা শুল্কে ট্রানজিট সুবিধা, ফেনী নদীর চুক্তিতে বিপর্যস্ত হবে মোহুরীর সেচ প্রকল্প, মৎস্য শিল্প ধ্বংস গুণছে, পরিবেশ হুমকির মুখে দাঁড়িয়ে। চুক্তির আগ থেকেই সুবিধাবাদী ভারত বাঁধ দিয়ে সারা দেশ শুকিয়ে খরাতে বিরান করে রাখতে সাহায্য করে থাকে, সেখানে ভারতকে এমন অবারিত বাংলাদেশ সরকারের অপ্রকাশিত লুকানো দান, বিএনপির মামলার সংখ্যা ২৬ লাখ থেকে ৩৫ লাখে পৌচেছে। টিউলিপের বরাতে কম্পিউটার কেনার গোজামেল কথার স্পষ্ট জবাব দেন বিএনপির বক্তারা। আন্তর্জাতিক বাজার মূল্যের দ্বিগুণ দামে কেনা সব কম্পিউটার কেনাতে কোম্পানীর স্বার্থকেই বড় করে দেখা হয়েছে। সেটি মূলত বাংলাদেশের স্বার্থবিরুদ্ধে চুক্তির অংশ ছিল। যেখানে পরবর্তীতে বিএনপি সরকার ন্যায্যমূল্যে কম্পিউটার কিনেছিল। পরে চুক্তি মাফিক ৫০ কোটি টাকা নেদারল্যান্ড সরকার দেয়নি। কথাছিল ঐ ক্ষতিপূরণ তাদের দেয়ার।  নেদারল্যান্ডসের নামে যে মিথ্যাচার গল্প প্রধানমন্ত্রী সাজিয়েছেন তার জবাব দেয়া হয় এভাবে। উপর্যুপরি তিনি তার সব অপকর্ম ঢাকার প্রয়াস চালান। সে চুক্তি কেন বাতিল হয়, দুর্নীতির প্রধান ৩ বড় কারণে ওটি বাতিল হয়, প্রধানমন্ত্রীর বোনের মেয়ে টিউলিপ নামের জন্য নয়। তার সবকটি কারণ বিএনপির রিজভী স্পষ্ট করেন। ওটিও ছিল আজকের মতই করা দুর্নীতি ও স্বার্থবিরোধী চুক্তির ধারাবাহিক নমুনার অংশ। দেশের স্বার্থের বিপরীতে উচ্চদামে করা কম্পিউটার চুক্তি, ডঃ মশিয়ুর রহমান ছুটির দিনে ঐ চুক্তি করেন ১০,০০০ কম্পিউটার কেনা হয় উভয় দেশের শেয়ারে। পরে গোজামিল সামলাতে ক্ষতিপূরণ উসল না করে উল্টো তাদের আমলে মোঃ আলী সরকার ২ মিলিয়ন ১৩০ হাজার ইউরো পৌছে দেন কঠোর গোপনীয়তার সাথে। তবে বাতিল হওয়ার কারণে সম্ভবত বাংলাদেশের ভাগে কোন প্রাপ্তি জমে নাই। মোট কথা হচ্ছে টিউলিপ নাটকের যে অবতারণা হাসিনা করেছিলেন, সেটি ধোপে টেকে নি।

 

কিছু দিন আগে ভারতের সংবাদ মাধ্যমেও দেখলাম মোদির নির্দেশে মানুষ মুসলিমদের দোষী সাব্যস্ত করতে লুঙ্গি পরে ট্রেনে আগুন দিচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা সেটি অনেক সভাতে প্রকাশ করে জনতাকে সাবধান করছিলেন। যার কারণে এরা হাতেনাতে ধরাও পড়ে, যার জন্য এটি বলা সম্ভব হচ্ছে। ধরা না পড়লে মুসলিমরাই স্থায়ী আসামী হতো। ২০০২ সালে করা গুজরাটের ঐ আগুনও ওরকমই ছিল। যার জের ধরে ২/৩০০০ মুসলিমকে ময়দানে মারা হয়, কত নারী সম্ভ্রম হারায়, লাশ হয়। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার এসব ঘটনা ভারতের নিত্যদিনের ঘটনা। সেখানে হাজার হাজার দাঙ্গা হয়, যা ভাবতেও গাঁ শিউরে উঠে। নিউজ টিভির খবর ও প্রথম আলোর বরাতে প্রকাশ ৩৫,০০০ কোটি টাকা নিয়ে চম্পট প্রশান্ত কুমার হাওলাদার। ২০১৪ সালের আগে পরের লুটপাটের এ মহানায়ক অতীতেও সব ধরণের সাহায্য সহযোগিতাও পেয়েছেন সরকারের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে। তিনি একা নন, তার পারিবারিক দলবল নিয়ে এসব করছেন। এত করেও অর্থসহ পালিয়ে যেতে পেরেছেন সার্থকভাবে। গত দশ বছরে দেড় হাজারেরও বেশী বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড হয়েছে। বন্দুকযুদ্ধের নামে এসব আরো সহজ হয়েছে। ভুক্তভোগীর হিসাব মত এটি ২,০০০ এরও বেশী। ভিন্ন মতের কারণে ৩৫লাখের বিরুদ্ধে মামলা, গুম ১,০০০ গ্রেফতার খুন খুব সহজ বাস্তবতা। প্রতিবাদে কাউকে রাস্তায় নামতে দেয়া হয়না, কার্যালয় ঘিরে রাখা হয়। কারণ নীতিহারা সরকারের ভিত নড়বড়ে। মানুষ দেখলে ভয় পায়। মানবাধিকার লংঘন করা সরকার পাশবিক বলেই ক্ষমতা ধরে আছে। ফাঁকে ফাঁকে উপদেশ বিলির নাটক চলমান আছে। একদিনের আওয়ামী নেতা ডাঃ কামাল বলেন, ৪৮ বছর পর একটি স্বাধীন দেশে মানুষকে লড়তে হচ্ছে অস্তিত্ব রক্ষার্থে। আইনের কর্তা মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, বিচারক নিয়োগের আগে কোন তদন্ত হয় না, আর নিয়োগে কোন আইন মানা হয় না। সব কাজেই কি অপরিসীম দক্ষ এ সরকার এ তার নমুনা মাত্র! তারপরও সরকার বলতেই পারে এসব মদীনার সনদের অংশ।

 

মজনু নামটি খাসা, এরা সময় সুযোগে ভার্সিটির লাইলিদের ধর্ষণ করে। সাম্প্রতিক সময়ে এটি সরকারী পাগলামি মঞ্চনাটকের অরেক নমুনা। মুখ দাতঁ বের করে রাখা এ প্রতিবন্ধীকে জাহাঙ্গির বিশ^দ্যিালয়ের সেঞ্চুরী করা মানিকের সাথে দেখতে অভ্যস্ত সরকার। শতবার ধর্ষনকারী মানিক নিরাপদ থেকেছে, বিচার বরাদ্দ হয়নি, বরং অনেক তথ্যে সরকারী প্রমোট পেয়েছে। দাঁত কেলিয়ে থাকা হাঁ করা মজনু মিয়ার রক্ষে নেই, ডিএনএর প্রমাণ সরকারের হাতে। চরম অসুস্থ খালেদা জিয়ার সুস্থ সার্টিফিকেটও সরকারের হাতে। এটিও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ রেডি রেখেছে, গড়গড় বলে দেয়। ডিজিট্যাল বাংলাদেশে ল্যাবেও দৌড়ানোর গরজ কম, কারণ দেশ উন্নয়নের মহাসড়ক। বিনাভোটের সরকার গদিতে। আজ ২৬ জানুয়ারী দেখলাম প্রধানমন্ত্রী বলছেন খেলাধুলার মাধ্যমে যোগ্য নাগরিক গড়ে তুলতে চাই। মানবিক অর্জণে শূন্যের কোঠায় নেমে সারা দেশ রসাতলে গিয়েও যদি খেলাই জাতির একমাত্র টিকে থাকার মানদন্ড হয়, তবে এ জাতির মরণ বড়ই সন্নিকটে, যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে। এ দেশে এ খেলায়াড় প্রধানমন্ত্রী ছাড়া কারো চাওয়া পাওয়ার কোন সুযোগ নেই। ময়নাতদন্ত, ডিএনএ, ইভিএম, হলি আর্টিজেন, জঙ্গি নাটক সবই সহজভাবে এ মুসলিম সংখ্যা গরিষ্ঠ দেশের সরকারের পক্ষে সাজানো সম্ভব। এর মাঝে ভারতের অমিত সাহা ও মোদির নাটকে যে ভেজাল ছিল সেটি সম্প্রতি স্পষ্ট হয়। জাকির নায়েকের স্বীকারুক্তিতে জানা যায় বোঝাপড়ার শর্তবদ্ধ প্রস্তাব মোদি দিয়েছেন জাকির নায়েককে, শর্ত হচ্ছে কাশ্মীর শোডাউনকে পজিটিভ ধরে স্বীকার করে সুকর্ম বললে তার বিরুদ্ধে সব মামলা প্রত্যাহার করে তাকে নির্দোষ করতে তিনি রাজি। তখন তিনি হবেন ধুয়ো তুলসি পাতা, ফুলের মত পবিত্র একজন। ঐ প্রস্তাবইতো জাকির নায়েককে ধুয়ে ফুলের মত পবিত্র করে দিল! এতেই জাকির নায়েকের নির্মলতা ও স্বচ্ছতা স্পষ্ট ।  মোদি হাসিনার সবই ছিল সাজানো হামলা মামলা! একজন সত্য সেবককে মিথ্যায় ফাঁসিয়ে কবরের পাশে কুরআন তিলাওয়াত করলে কি আল্লাহ সাত খুন মাফ করে দিবে বলে মনে হয়। সিরাতুল মোসতাকিম’ অর্থে সহজ সরল ধর্ম হলেও সত্য বিরোধী মানবিক নীতি বিরোধী প্রতিটি আচরণ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ এ ধর্মে। । কষ্টের কথাটি হচ্ছে পিস টিভি বন্ধের নাটকে মোদির সাথে আমাদের মুসলিম দেশের প্রধানমন্ত্রীকেও মোদি নষ্ট করে ছাড়লেন! মোদি ভিন দেশের কর্তা, তার সাথে তালিয়া বাজাতে সরকার কেন তার স্বকীয়তা অস্তিত্ব সবই হারায়। এখানে তারা উভয়েই এক খোরে মাথা মোড়ানোর দল। এরা দোষী এটি প্রমাণ করতে আর কয়টি সিল সার্টিফিকেট লাগবে? সর্বাঙ্গে এত দুর্গন্ধ কেন?  ফুলের মত পবিত্র করার একটি দাগও কেন বাংলাদেশ সরকারের নেই? সব নষ্ট নাটকের প্লাবনে ভরা। আবারো নির্বাচন আবারো ধরা খাওয়া। চরিত্র হারানোর দায় সরকারের চেয়ে বেশী আর কোন প্রতিবন্ধী মজনুর আমলনামায় আছে কি? 

লেখার সময়: ২৫ অক্টোবর ২০২০ সাল।

বি দ্র: উপরের পুরো লেখাই নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত দি রানার নিউজ কলামে ছাপে জানুয়ারীর ২৪ তারিখ ২০২০ সালে।

 

নাজমা মোস্তফা

এখানে আমার দুটি লেখার শিরোনাম। প্রথম শিরোনামটি বাংলাদেশের মানুষের জন্য জমা এক ভয়ংকর সংকেত। ক্রমাগত অনাচার দেশে চলমান আছে ও ধামাচাপায়ও সমান তালে তালিয়া বাজানো হচ্ছে। এর পরে আনবো ২০১২ সালে আমার দেশে ছাপা হওয়া একটি মৃত্যু ও সারিবাধা প্রশ্ন ও ধামাচাপা সংবাদ। পাঠক উপরের অংশটি পড়ে নীচের অংশটি মেলাতে ভুলবেন না। বাংলাদেশের বিএনপির নেতা ও জনতারা তাদের দলের চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে চিকিৎসার নামে স্লোপয়জনিংএর আশংকা করছেন।  দলের সিনিয়র মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী ০৪ এপ্রিল ২০১৯ বৃহষ্পতিবার এ আশংকা ব্যক্ত করেছেন, মুখ সিলকরা মিডিয়াও এটি প্রকাশ করেছে।  সরকার  থেকে যা বলা হচ্ছে তা সঠিক নয়। তাদের চিহ্নিত ডাক্তারদের বক্তব্যও সঠিক নয়। যেখানে কারাগারে গেলে ঐ ডাক্তাররা বলেন তিনি গুরুতর অসুস্থ আবার হাসপাতালে আসলে পরে পরিচালক বলে দিলেন তার অসুস্থতা গুরুতর নয়। সবার শংকা সরকারের চাপে কর্তৃপক্ষ এমন করছেন চাকরী ও পদ ধরে রাখার খাতিরে, খালেদা মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়ে ‘রাজার হালে আছেন’ বলতে মুখে বাধে না তার। ঐ যুক্তির পক্ষে অর্ডারী কর্তৃপক্ষও হাটি হাটি পা রাখছে। এ আচরণ অবৈধ পথের অর্জনধারী সরকারের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট। আদালত, হাসপাতালেও সরকারী হস্তক্ষেপের নজির এসব। আবরার হত্যায় অপরাধীর পক্ষে সিসিটিভির ফুটেজে ধামাচাপায়ও মুখর প্রতিবাদী প্রধানমন্ত্রী। তিনি একবার নন, বার বার ধরা খান তবে কোন লজ্জাবোধ করেন না।

গত সোমবার ২৩ ডিসেম্বার ২০১৯ কারাগার থেকে হাসপাতালে আসার এক ঘন্টা পরই বিএসএমএমইউর পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কে এম মাহবুবুল হক সংবাদ ব্রিফিংএ বলেছিলেন, চিকিৎসা শুরু হয়েছে উনি সুস্থ আছেন। রিজভীর দাবী কোন ধরণের উন্নত চিকিৎসা তাকে দেয়া হয়নি। তার ফ্রোজেন শোল্ডারসহ ডানহাত বামহাত নাড়ার শক্তি রহিত হচ্ছে, হাটতে পারছেন না। যেখানে গত বছর ফ্রেব্রুয়ারীতে তিনি কারাগারে গেলেন নিজে হেটে, আজ তাকে হুইল চেয়ার ব্যবহার করতে হয়। রিজভীদের ভয় সরকার কারাগারের ভিতরই কি স্লোপয়জনিংএর কোন ব্যবস্থা করছে কি না। না হলে কেনো তিনি এভাবে নিস্তেজ হয়ে পড়ছেন। আমরা শুনছি তার ব্লাড সুগার নামছে না, ১৬/১৭ উঠে, খুব একটা নামে না। সরকার ও তার সাঙ্গোপাঙ্গোরা কি যে করছে তার প্রমাণ গত বনানী এফ আর টাওয়ারে অগ্নিকান্ডের সময় কিভাবে সেই শিশু ছেলেটিকে সরকারী প্রপাগান্ডাতে নামানো হলো সেটি জাতি দেখেছে। মুখ দিয়ে বলানো হলো টাকাগুলি এতিম খানাতে দিয়ে দিবে, এর কারণও খালেদা। শয়নে স্বপনে ঐ জপমালা সরকারের পুথিবিদ্যা। মাইক হাতে নিলেই তাকে চপলা বালিকার মত এসব আবোলতাবোল বলতে শুনা যায়। মানুষ শুনে আর ধিক্কার দেয়। এটি হচ্ছে চলমান বাংলাদেশ ও তার রাজনীতির এক উদাহরণীয় প্রমাণ। সত্য ও মিথ্যার দ্বন্ধ ময়দানে প্রকট, এরা চায় গোটা জাতি মিথ্যুক হোক, শুধু তারা কিছু দলদাস টিকে থাকুক, বাকীরা ধ্বসে যাক। পুলিশ প্রশাসন আদালত হাসপাতাল কোথাও কোন মানবতা কার্যকর নয়, সর্বত্র পাশবিকতা। আরবাররা লাশ আর নূরেরা মৃত্যুর ময়দানে। নূরেরা বেঁচে যাওয়াতে তারা বাড়তি নাটক করতেও ভুলে না, নির্লজ্জের মত মাথায় হাত বুলিয়ে তারা প্রতারণা ঢাকতে ছুটে যায়। মূল দাগীগুলোকে সহজে ধরে না, বরং বাঁচানোর কসরত চালায়। বেকায়দায় পড়লে প্রতিবন্দি মজনুদের দিয়ে নাটক চলমান রাখে। গদি রক্ষার কিছু দরদ দেখাতে চাইলেও ভেতরের কপটতা ঢাকা থাকে না, দালালীটাও দেখা যায়, শোনাও যায়। অল্প সময়ের জন্যও তারা দালালী থেকে সরে না। এরা এভাবে গোটা জাতিকে স্লোপয়জনিং দিয়ে অবচেতন করে রেখেছে। এক আল্লাহর অলৌকিক সাহায্য ছাড়া এ জাতির বাঁচার সুযোগ প্রায় শূণ্যের কোঠায়, উদ্বেগে উৎকন্ঠায় জাতি জটিল সময় পার করছে। লেখার সময় ২৫ ডিসেম্বর ২০১৯।

 

একটি মৃত্যু সারিবাঁধা প্রশ্ন

মানুষ অনেক সত্যকে চাপা দিয়ে রাখে খুব কৌশলে, কিন্তু দেখা যায় কৌশলী কোনো এক সত্তা সেটির জট অনেক পরে হলেও খুলে দেয়। কোনো সত্যই চিরদিনের জন্য চাপা থাকে না। মাঝে কয়টি বছর হয়তো জনতা এর বাস্তবতা থেকে দূরে থাকে। ভুল খবরে সবাই বিশ্বাসী হয়ে ওঠে। গোটা বিশ্বে টেররিস্টের গুঞ্জন আকাশে-বাতাসে। একবিংশ শতকে এটি বেশ মোটাতাজা খবর বলা চলে। কোণঠাসা হয়ে পড়া মুসলমান পরিচয়ের জনতা এর জরুর আসামি। কিন্তু বাস্তবের সন্ত্রাসীরা যেন আর মিডিয়াতে কোনোভাবেই জায়গা করতে পারে না। দেরিতে হলেও যখন দখিনা বাতাস কিছু ছিটেফোঁটা প্রমাণ আমাদের দুয়ারে এনে পৌঁছে দেয়, তখন তা অবশ্যই মনকে নাড়া দেয়। এটি সত্য যে, নিশ্চয় কে বা কারা এর পেছনে দিবারাত্র কাঠখড় পুড়িয়ে যাচ্ছে, ইন্ধন জোগাচ্ছে। এরা সাধারণের চোখে ধরা পড়ে না বেশিরভাগ মিডিয়ার কারসাজিতে। তবে মিডিয়াতে যেটি খুব সোচ্চার হয়ে আসে, তার সুবাস-কুবাস সবই ছড়ায় খুব দ্রুত। একটি খবর ছড়াতে আজ মুহূর্তও সময় লাগে না। গোটা বিশ্বে জঙ্গি টেররিস্ট নামের জটিল প্রচারে সবাই বেশ সিদ্ধ। মনে মনে সবার জানা, কারা আজ টেররিস্ট। কিন্তু যখন অপর পিঠে হালকা মেজাজের কিছু গভীর জটিল খবরও ধরা পড়ে, তার পরও সেটি বেশ চাপা থাকে। না হলে কোনো সত্য চাপা থাকে না, থাকতে পারে না। যদি সেটি চাপা থাকে তাহলে বুঝতে হবে, এসব ছলবাজি দুনিয়ার কৌশলমাত্র। আজ এরকম একটি চাপা দেয়া অতীত কথা আলোচনা করব, যা সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশ করা হয়েছে।

একটি মৃত্যু যার প্রায় আট বছর হতে চলছে, যিনি ছিলেন একজন সংগ্রামী মানুষ, একটি নির্যাতিত জনপদের মুক্তির জন্য নিবেদিতপ্রাণ এক সত্তা তার নাম ইয়াসির আরাফাত। ফিলিস্তিনের নির্যাতিত জনতার সপক্ষে আন্দোলনরত এ ব্যক্তির সংগ্রামী জীবনের কথা বর্তমান সময়কার সচেতন মানুষ কম-বেশি সবাই জানেন। ২০০৪ সালের ১১ নভেম্বর ফ্রান্সের একটি হাসপাতালে তিনি মারা যান এবং পশ্চিম তীরের হেডকোয়ার্টার্সের কাছেই তাকে সমাহিত করা হয়। যখন তিনি মারা যান, তখন শোনা যায় লিভার সিরোসিসে তিনি মারা যান। কিন্তু অতি সমপ্রতি কিছু গবেষকের কাছে ভিন্ন খবর ঠাঁই পাচ্ছে। খবরে ধারণা করা হচ্ছে, ফিলিস্তিনের এ নেতা পলোনিয়াম বিষে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। আল জাজিরা টিভি চ্যানেল রিপোর্ট করে, বিজ্ঞানীরা তার ব্যবহার্য জিনিসপত্রের মাঝে অব্যাখ্যাকৃত অস্বাভাবিক পলোনিয়াম ২১০-এর সন্ধান পান। কাতারের সংবাদ সংস্থার উদ্ধৃতি দিয়ে আল জাজিরা ৪ জুলাই এটি প্রচার করে। সুইস গবেষকদের দ্বারা পরিচালিত লসেইন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণাতে ধরা পড়ে, উচ্চমানের পলোনিয়াম তার ব্যবহার করা জিনিসপত্র, যেমন কাপড়চোপড়, টুথব্রাশ, তার মাথার বস্ত্রাবরণ, আন্ডারওয়্যার এসবের মাঝে পাওয়া যায়। এই ইনস্টিটিউটের ডিরেক্টর ড. ফ্রাংকইস বচোড টিভি চ্যানেলকে বলেন, আমি এ বিষয়ে নিশ্চিত যে, ব্যাখ্যা না করা উচ্চমাত্রার অসাধারণ পলোনিয়াম ২১০-এর বায়োলজিক্যাল ফ্লুইডের প্রমাণ এ গবেষণাতে ধরা পড়েছে। এই সংস্থার লসেইন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা এখন আরাফাতের শরীর, হাড় ও তার কবরের মাটি পরীক্ষা করার কথা বলছেন। এদিকে আরাফাতের বিধবা স্ত্রী সুহা ফিলিস্তিনি সংস্থার কাছে এসব পরীক্ষার অনুমোদন চেয়েছেন। সুহা আরও বলছেন, এতে তার বুকের ওপর কিছু চাপ কমবে। অন্তত ফিলিস্তিনি জনগণ, আরব ও মুসলমানদের বোঝানো যাবে যে, এটি কোনো স্বাভাবিক মৃত্যু ছিল না। এটি ছিল একটি পরিকল্পিত অপরাধমূলক মৃত্যু। ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস সাংবাদিকদের বলেন, ইয়াসির আরাফাতের দেহ পরীক্ষা না করার কোনো কারণ থাকতে পারে না, তার বিষক্রিয়ায় মারা যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। 

আরাফাত ফ্রান্সের একটি হাসপাতালে মারা যান। সেখানে চারদিকে গুজব ছিল যে, তিনি লিভার সিরোসিসে বা ক্যানসারে বা এইডসে মারা গেছেন। ওই পরীক্ষার সঙ্গে জড়িত সুইস বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিনের প্রধান প্যাট্রিস ম্যানজিন বলেন, তার কোনো লিভার সিরোসিস হয়নি, কোনো ক্যানসারের লক্ষণ পাওয়া যায়নি, লিউকিউমিয়া, এইচআইভি বা এইডসও ছিল না। খবরে প্রকাশ, তিনি মারা যাওয়ার আগে ওজন হারানোর সমস্যা, ভীষণ বমিপ্রবণতা এবং ডায়রিয়ায় ভুগছিলেন। এখানকার সবক’টি লক্ষণই ওই বিষক্রিয়ার সম্ভাবনাকেই সুস্পষ্ট করছে। জানা যায়, আলেকজান্ডার লিটভিনেস্কো নামে একজন রাশিয়ান সিকিউরিটি এজেন্ট ২০০৬ সালে একই রকম জটিলতা নিয়ে মারা যান ওই পলোনিয়াম বিষক্রিয়ার কারণে। এ ঘটনাটিও ইয়াসির আরাফাত মারা যাওয়ার মাত্র দু’বছর পরের ঘটনা। এটিও আল জাজিরা টিভি চ্যানেলের খবরে উল্লেখ করা হয়। ২০০৬ সালে মারা গেলে তার ব্যবহার করা জিনিসপত্রে উচ্চমাত্রায় এ তেজস্ক্রিয় বিষের সন্ধান পাওয়া যায়।

ব্রিটিশ সাংবাদিক জর্জ গ্যালওয়ে নীতির প্রশ্নে সত্য প্রচারের কারণে এর গভীরে ঢুকতে তৎপর  থেকেছেন। তিনি একাধারে সাংবাদিক, রাজনীতিক ও গ্রন্থকার। তিনি ব্যক্তিগতভাবে তার জীবনের এক বড় অংশ এ ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত ছিলেন। এ বিষ পারমাণবিক বিষক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত একটি বিষ। সঙ্গত কারণেই এটি যে কারও কাছেই থাকার কথা নয়। যারা পারমাণবিক অস্ত্রে সক্রিয় ক্ষমতা অর্জন করেছে, একমাত্র তারাই এটি প্রয়োগ করতে পারে। জর্জ গ্যালওয়ে এটিও সুস্পষ্ট করেন মাত্র কিছু আগে ইসরাইলের এরিয়েল শ্যারন ও এহুদ এলমার্ট এটি প্রকাশ করেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইয়াসির আরাফাতের কোনো ক্ষতি করতে না পারার যে ওয়াদা ছিল, সেটি এর মাঝে শিথিল নয়, একদম বাতিল হয়েছিল। এমন কি শ্যারন এটিও সুস্পষ্ট করেন যে ইসরাইলের কোনো কর্মকাণ্ডের জবাবে ফিলিস্তিনের ওই নেতার কোনো বীমার পলিসিও কার্যকর নয়। এগুলো সবই প্রশ্ন; শুধু এটিই নয়, আরও বহু প্রশ্ন জমেছে এরই মাঝে। এগুলো হচ্ছে, ২০০৪ থেকে ২০১২ সাল বছর হিসেবে আজকের যুগে এটি খুব কম সময় নয়। কেন এতবড় একটি সময়ের কালক্ষেপণ? ফ্রান্স কেন এটি সে সময় খতিয়ে দেখার দরকার বোধ করল না? একজন স্বনামধন্য নেতার বিষয়টি কেন পোস্টমর্টেমের পর্যায় পর্যন্ত গেল না? কী কারণে ওইসব রক্তের, প্রস্রাবের, ঘামের সব রিপোর্ট ধ্বংস করা হলো? যদিও ফ্রান্সের গতানুগতিক নিয়মে তারা এসব দশ বছর পর্যন্ত সংরক্ষণ করে রাখে এক্ষেত্রে কেন তার ব্যতিক্রম হলো? কী কারণে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষও এ ব্যাপারে এতই নীরব ভূমিকা পালন করছে এসব সারিবাঁধা প্রশ্ন গবেষণায় প্রাপ্ত ফলাফলের সঙ্গে আরও প্রশ্নের সংখ্যা বাড়াচ্ছে। তবে ফিলিস্তিনের জনতা তাদের ৭৫ বছর বয়স্ক প্রয়াত নেতার প্রকৃত খবর জানতে চায়। আমরাও বাকি বিশ্বের জনতা সত্য উদঘাটনের অপেক্ষাতে উন্মুখ হয়ে রইলাম।

বি দ্র: উপরের পুরো লেখাই নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত দি রানার নিউজ কলামে ছাপে জানুয়ারীর ১৭ তারিখ ২০২০ সালে। তবে নীচের লেখাটি  ২০১২ সালের জুনের ২১ তারিখ আমার দেশ পত্রিকার অনলাইনে ছাপা হয়।

নাজমা মোস্তফা

সম্প্রতি গত শুক্রবার রাতের প্রথম প্রহরে ইরানের জেনারেল কাসেম সুলাইমানি মার্কিণ সেনাদের হাতে নিহত হন। মুসলিম বিশে^ শিয়া সুন্নীরা উভয়েই বলেন তারা মুসলিম, কিন্তু কুরআন এরকম বিভক্তি স্বীকার করে না। সে হিসাবে এ বিভক্তি কখনোই ধর্ম ইসলাম কুরআন দ্বারা অনুমোদন পায় না। কুরআনে নবীকে বলা হয়েছে, ‘যারা ধর্মকে বিভক্ত করেছে তাদের ব্যাপারে তোমার কোন দায় নেই’ (আল আনআম এর ১৬০ আয়াত)। এই সুবাদে এক দলের বিরুদ্ধে লেলিয়ে আরেক দলকে কবজা করার যে নীতি তাকেও সমর্থন করা যায় না। এ যাবত এরা একে অন্যের গুটি হয়ে বিধ্বস্ত হয়েছে। আর মধ্যসত্ত্ব লোভীরা এর থেকে উপকৃত হচ্ছে। ইসলামের প্রতিটি মাথাকে ঠান্ডা রেখে ঘটনাগুলি বিশ্লেষণ জরুরী। সুন্নী অনেকেই বলেন শিয়ারাই একমাত্র দোষী। কিন্তু নীতির কথাটি প্রকৃত দোষী খোঁজা, পক্ষপাত নয়। সুন্নী দোষী হলে তাদেরও ধরা উচিত, নয়তো ন্যায়বিচার অসম্ভব।   

এবার যদি বর্তমান বিশ্বের সংঘাতময় অবস্থানের দিকে তাকাই, শিয়া সুন্নী চালের গুটি বিভিন্নভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে স্বজাতি নিধনের উত্তম হাতিয়ার হয়ে। এত গভীর ক্ষতের পরও ইরাক ইরানের শিয়াদের মাঝে একটি গোত্রীয় একতা ছিলই, আমেরিকা এখানে পরস্পরের মাঝে বৈরী নীতি গ্রহণ করছে। আমেরিকা আরব বিশ্বে তার একটি অনুগত গোষ্ঠী গড়ে তুলতে চাচ্ছে ইরানের শিয়াদের বিরুদ্ধে। বোষ্টন ইউনিভার্সিটির একজন মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসের শিক্ষক আগাষ্টাস নরটন এ মন্তব্যটি করেন। তার মতে একই সময়ে আমেরিকা চাচ্ছে বাগদাদের গরিষ্ঠ সংখ্যক শিয়াদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখতে, তার ভাষায় ‘আমি মনে করিনা এটি কোন স্থায়ী সমাধান’। পলিটিক্যাল সায়েন্সের প্যালেস্টাইনের গাজার এক প্রফেসর বলেন, ‘তোমরা ইতিহাসের বিরুদ্ধে কাজ করছো, সেখানে আরব ভূমিতে কখনো কোন শিয়া শাসক এই ১৪ শতাব্দীর মাঝে ছিলনা। শিয়ারা আরব বিশ্বে কখনো শাসন করেনি এবং এটিই তোমাদের সবচেয়ে বড় ভুল। যার জন্য তোমাদের অনেক বেশী মূল্য দিতে হবে। একই রকম মন্তব্য করে প্যালেস্টাইনের পলিটিক্যাল বিজ্ঞানী প্রফেসর শাহিন বলেন, ‘তোমরা ইতিহাসের বিরুদ্ধে কাজ করছো। তোমরা ধর্মের ইতিহাস আঁচ করতে পারো নি। সুতরাং যদি একটি নতুন অধ্যায় তোমরা রচনা করতে চাও নতুন পলিসি দ্বারা, অবশ্যই তার জন্য ইতিহাসকে দরকার। তখন তোমাদের পলিসি অবস্থানহীন শূন্যের উপর দাঁড়াবে’। ইউনিভার্সিটি অব মিশিগানের মধ্যপ্রাচ্য ইতিহাসের প্রফেসর জোয়ান কোল বলেন, ‘আমি মনে করি বর্তমানের পলিসি সম্পূর্ণ নড়বড়ে অবস্থানে এগুচ্ছে যা প্রত্যেককে আমেরিকা বিরোধী করে তুলবে শেষ পর্যন্ত’। এখানে বেশ আগে করা কয়জন বিশেষজ্ঞ প্রফেসরের অভিমত তুলে ধরলাম।

এবার এর উপর আরো কিছু  তথ্য এখানে সংযোজন করবো যাতে মুসলিমরা  সঠিক সত্যে আসতে পারে। ইতিহাসের জটিলতায় এ বিভক্তি গড়ে উঠেছে, এর পিছনে ষড়যন্ত্রে কখনোই হযরত আলী নন, বরং ভয়ংকর দাগি আসামী জড়িত না থাকলে এরকম একটি একত্বের ধর্ম কুরআন বিরোধী অবস্থান নিয়ে দুভাগ হতে পারে না। মানুষের বিবেকের জন্যই সত্যের সাথে যেমন মিথ্যের দ্বন্ধ বাধে, তেমনি সচেতন বিবেকই সেটি স্পষ্ট করে। ঐ সময় ইসলামের ইতিহাসে রাজনৈতিক ছলচাতুরীর প্রমান ময়দানে স্পষ্ট। ধর্মের নামে, রাজনীতির নামে, রাজতন্ত্রের নামে, ধর্মের মূল থেকে সরাতে ষড়যন্ত্রীরা ইসলামের চরম সর্বনাশ করে তা চাপা দিয়ে রেখেছে, কৌশল আজ অবদি চলমান। যে ষড়যন্ত্রের চোটে একে একে খলিফাদের মৃত্যু, শেষ খলিফা আলী ও তার দুই সন্তান হাসান হোসেন ভয়ংকর ষড়যন্ত্রের জটিলতায় ইহকাল ত্যাগ করেন। সেই একই ষড়যন্ত্রে হাজার বছর থেকে মুসলিমদেরে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছে। আর কয় শতাব্দী পার করে মুসলিমরা পথ পাবে? এসব কৃতকর্মে পরবর্তী মুসলিমরা ঐ সময়ে ক্ষ্যাপেছে যার কারণে ময়দানে আজকের যুগের পাথর নিক্ষেপের মত কঙ্কর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটছে, ঠিক আজ যেমনটি প্যালেস্টাইনে কাশ্মীরে হচ্ছে। সে সময় হাজার হাজার মুসলিমরা নিহত হয়েছেন, এরা কি সবাই শিয়া বলে মনে হয়? না, এরা সবাই ছিল ইসলামের অনুগত সত্যিকারের আত্মত্যাগী প্রাথমিক যুগের নিবেদিতপ্রাণ মুসলিম। গণতন্ত্র ধ্বংসকারী শাসক দল কৌশলে শাসন ক্ষমতা হাতে নিয়েই এসব কাজ করে। সব দায় চাপিয়ে দেয় নির্দোষ মুসলিমদের উপর, ক্ষমতার অপকৌশলে অপরাধী সবার চোখে ধূলো ছিটিয়ে মানুষকে আজ অবদি ধাঁ ধাঁ লাগিয়ে রেখেছে। অনেকটাই ঠিক আজকের বাংলাদেশের রাজনীতির মতই। সেক্ষেত্রে মার খাওয়া শিয়া বা সুন্নী উভয়ে একই কষ্টের বাহক। এখানে শিয়াসুন্নী আর গোটা বাংলাদেশী হচ্ছে মার খাওয়া মুসলিম, যদি তারা সচেতন হতো তবে দেশ ধর্ম দুটিই রক্ষা পেতো।  লাভ আর লাভ শুধু একটি বড় গুটিবাজ ধান্ধাবাজ দেশিবিদেশী চক্রের, আর ক্ষতি পুরো দেশ লাশের ময়দান, কখনো আওয়ামী কখনো বেশীরভাগ বিরোধী বিএনপি জামাত বা বেওয়ারিশ জনতা। ঠিক আজকের রাজনীতির আদলে ধর্মের এ নাটকও সাজানো হয়েছিল। সঙ্গত কারণেই বলতে হবে গুটিবাজ প্রশিক্ষিত ইবলিসের দোসর। সবার অগোচরে দুষ্ট এর ফাঁক গলিয়ে ধর্মে বিভেদ গড়ে কুরআন বিরোধী প্রয়াস চালায় খুব কৌশলে। আমরা জানি কুরআনে বার বার চিন্তাশীলদের চিন্তাকে প্রসারিত করতে বলা হয়েছে। এমন সংকট সময়ে প্রতিটি বিবেককে সজাগ থাকতে হবে।

সময়ের প্রেক্ষিতে যখন দুষ্টের চালটা প্রতিষ্ঠা পায়, তখন স্বাভাবিকভাবে ভাংগন খেলাটা সাজানো সহজ হয় কৌশলী হাতে। ময়দানে পোড় খাওয়া নিবেদিত প্রাণ মুসলিম (আজকের শিয়া সুন্নী উভয়ে) কোনঠাসা হয় আর অল্প গুটি কয় দালাল ষড়যন্ত্রী সরকারের আদর আহ্লাদ পায়। ঐ সময়ের কোনঠাসা মুসলিমরা পরবর্তী বিভক্ত শিয়া ও সুন্নী। ইতিহাসে পাওয়া যায় ইমাম আবু হানিফা অষ্টম শতাব্দীতে জন্ম নেয়া শিয়াদের নেতা জাফর আস সাদিকের প্রতি অনুগত ছিলেন। ইনি শিয়া ও সুন্নী উভয়ের সাথে সম্পর্কীত সমাজের সম্মানিত জন। তার মানে সুন্নী ইমাম আবু হানিফা শিয়াদের প্রতি অনুরক্ত, দরদী ও একদলের ছিলেন। এরা উভয়ে শিয়া ও সুন্নী নামে প্রচারিত হলেও এক ছিলেন। শতাব্দীর পর শতাব্দী গড়ালে যখন বহু মিথ্যা সাজানো সম্ভব হয়, তখন ঐ সাজানো মিথ্যাচারে ওদের একাংশকে শিয়া নামকরণ করা হয় এবং এরা নানান বিভ্রান্তি জমা করে একই ভাবে পরবর্তী সুন্নীরাও সুন্নী নাম নিয়ে সেই মিথ্যার বন্যায় অনেক বিভ্রান্তিকে ধর্মের অংশ মনে করতে থাকে। ধর্মের নামে অনেক মিথ্যা ছলবাজিকে ধর্মে ঢুকানো হয়, সেটি করে ঐ দুষ্ট চক্র। দুষ্টের একমাত্র উৎসাহ নিজের অপরাধ ঢেকে রাখা ও ঐ বিভক্তিকে বাকীদের গেলানো ও স্থায়ী করা। এভাবে আজও দেখা যায় এসব সাজানো মিথ্যাচারে কুরআন বিরোধী কথাও ধর্মের নামে পালিত হচ্ছে পরম উৎসাহে। হিংসার পরিবেশ তৈরী হলে শিয়ারা নিজেদের আলাদা করতে যেয়ে নকল ইমামতির পথ তৈরী করে। অন্যদিকে সুন্নীরা কালে শিয়া বিরোধী হতে গিয়ে মূল ষড়যন্ত্রীদের কপট কৌশলে ঐ দলে পড়ে যায়। ষড়যন্ত্রী তার নিজের নিরাপত্তার জন্য এ অসম্ভব কাজটিকে সম্ভব করে রাজশক্তি দ্বারা।

চিন্তা করুণ, ২০০১ এ নিউইয়র্কে টুইন টাওয়ারের বোমার দায় হিসাবে ইরাককে দোষী সাব্যস্ত করা কতটা বেমানান, প্রমাণ ছাড়াও ইরাক আক্রমন সম্ভব হয়েছে। কিন্তু তারপরও সচেতনরা কি করেছে? বড়জোর বক্তৃতা বিবৃতি, দু একটি সম্পাদকীয় কলাম আমেরিকা বৃটেনের কিছু সাংবাদিকেরা লিখে সত্য প্রকাশ করছে কিন্তু তাতে কি শাসকবর্গের কিছু হয়েছে? এর সূত্র ধরে কি বলা যায় যে একবিংশ শতাব্দীতে কোন মুসলিম ছিল না। ইরাকে আমেরিকার আক্রমন কোন সময়ই যুক্তিসঙ্গত হয়নি। এভাবেই শক্তির তলানীতে যুগে যুগে অনেক অনাচার, অনেক নকল জমা হয়েছে। রাজতন্ত্রের প্রবক্তা মুসলিম নামধারী কুরআন বিরোধী ষড়যন্ত্রীদের হাতে কোন জবাব নেই। শেষ বিচার দিনের ফয়সালায় সঠিক সমাধান অবশ্যই অপেক্ষায় আছে। ইতিহাস বা অনেক হাদিস তথ্যেও দেখা যায় হযরত ওমরের সময় দেখা গেছে একজন মহিলারও অনেক স্বাধিকার ছিল। স্বয়ং খলিফা ওমরের বিরুদ্ধেও বলতে পেরেছেন কারণ কুরআন নির্ভর ইসলাম তার সামনে ছিল। মৌলিক ইসলামে ভক্তির নামে অন্ধভক্তি প্রতারণা ছলনার কোন সুযোগ নেই। তাবিজ কবজ ঝাড় ফুকের কোন অবকাশ নেই। এত কিছুর পরও ষড়যন্ত্রীর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে এমন হাদিসও রচনা করা হয়েছে যে, ‘কোন সাহাবীর বিরুদ্ধে কিছু বলা যাবেনা’। উল্লেখ্য এসব নবী পরবর্তী বহু বছর পরের ষড়যন্ত্রী সংযোজন। এটিও ষড়যন্ত্রের একটি শক্ত অংশ, শক্তির তলানীতেই সাজানো মিথ্যাচার। আল্লাহ স্বয়ং রসুলকে বলেছেন, “সেক্ষেত্রে আমরা নিশ্চয় তোমাকে দ্বিগুণ শাস্তি আস্বাদন করাতাম ইহজীবনে এবং দ্বিগুণ মৃত্যুকালে” (সুরা বনি-ইসরাইলএর ৭৫ আয়াত)। কুরআন বলে, অপরাধ করলে রসুলের জন্য দ্বিগুণ শাস্তি। ষড়যন্ত্রীরা কি রসুল থেকেও বড়!

ইমাম হোসেনের কারবালার পরাজয় ছিল এই চক্রান্তকারীদের একটি সাজানো খেলা, সেটা শিয়া বা সুন্নী উভয়ের এক নিদারুন কষ্টকথা, দু’দলেরই সমান কষ্ট। সেখানে যদি শিয়ারা ষড়যন্ত্রীদের অসহযোগিতা দেখায় বা কড়া প্রতিবাদ জানায় সেটা খুবই যৌক্তিক, সুন্নীরাও প্রতিবাদী ছিল, সেদিন উভয়েই এক ও প্রতিবাদী ছিল। যদি সুন্নীরা প্রতিবাদী না থাকে, তবে তারা কি চেতনহারা? মাঝখানে ষড়যন্ত্রকারী সে ইন্ধনে তাপ দিয়ে দ্বৈত ভূমিকা পালন করে সুন্নী নামে ধর্মের একটি নতুন মডেল তৈরী করতে পেরেছে। যার ফলে এ দু’ভাইএর ভিতর যুগ যুগ অবধি হিংসা বিদ্বেষ ও তোষের আগুন তাজা রাখা সম্ভব হয়েছে। সবই করা হয়েছে শুধু দুষ্টের নিজের নিরাপত্তার জন্য। যার সবটাই সাজানো শয়তানের কুটচাল, শিয়া সুন্নী বিভেদ তৃতীয় পক্ষের স্বার্থে রচিত উপাখ্যান। তার কিছু ঐতিহাসিক সত্যতা আমি শাহরিয়ার শহীদের রচিত “ইসলামে বিভ্রান্তি ও বৃটিশ স্বীকারোক্তি” গ্রন্থ থেকে খুব সংক্ষেপে পয়েন্টগুলো তথ্যসহ তুলে ধরছি।

(১) মুয়াবিয়াই ইসলামকে দু’ভাগ হিসাবে বিভক্ত করার পূর্ণ সূচনা করেন আর তার ফলে বিকল্প ইসলামের গোড়াপত্তন করলো তারই লম্পট পুত্র ইয়াজিদ (২৮ পৃষ্ঠা)।

(২) উমাইয়া খলিফাদের মধ্যে মুয়াবিয়ার পুত্র ইয়াজিদ খলিফাদের মধ্যে নিশ্চিতভাবে প্রথম মদ্যপ ছিলেন। তার পানাসক্তি উত্তরাধিকারসূত্রে অর্জন করেন দ্বিতীয় আল-ওয়ালিদ (৭৪৩-৭৪৪খ্রীঃ) (২৮ পৃষ্ঠা)।

(৩) আবু সুফিয়ান (মোয়াবিয়ার বাবা) সঙ্গীদের উদ্দেশ্য করে বলেন, দেখ, বহু কষ্টে ও সাধনার পর ক্ষমতা আমাদের হাতে এসেছে, এটাকে বলের ন্যায় বনি উমাইয়ার এক হাত থেকে অন্য হাতে রাখতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে এটি (খেলাফত) যেন, আর কোনদিন বনি হাশিমিদের (নবীর বংশধারীদের) ঘরে ফিরে না যায় (২৬ পৃষ্ঠা)।

(৪) ইমাম হাসান হতে খিলাফত জবরদখল করে নিয়ে মুয়াবিয়া রাজতন্ত্র গঠন করেনএবং রাজতন্ত্র কন্টকমুক্ত করার জন্য ইমাম হাসানকে তারই স্ত্রীর মাধ্যমে বিষ প্রয়োগ করান। ইমাম হাসানের শেষ ইচ্ছা ছিল, রসুল(সঃ)এর রওজার পাশে শায়িত হওয়ার কিন্তু মোয়াবিয়ার নির্দেশে লাশ মসজিদে নববীর পাশে আনলে মারওয়ানকে দিয়ে লাশের উপর তীর নিক্ষেপ করা হয় এবং সেখানে দাফন করতে দেয়া হয় না, দাফন হলো জান্নাতুল বাকি কবরস্থানে। তারপর খলিফা তার লম্পট পুত্র ইয়াজিদকে খলিফা ঘোষণা করা হয় ৫০ হিজরিতে (২৬ পৃষ্ঠা)।

(৫) মুয়াবিয়া তার সব প্রদেশের গভর্নরদের উপর এ নির্দেশ জারি করেন যে, “সকল মসজিদের খতিবগণ মিম্বর হতে আলীর উপর অভিসম্পাত দেওয়াকে যেন তাদের দায়িত্ব বলে মনে করেন”। ইয়াজিদের পিতা মুয়াবিয়াই ৪১ হিজরিতে জুমুআর নামাজের খুৎবায় আহলে বায়েতের প্রতি গালি দেয়ার রীতি প্রবর্তন করেন। ৭০ হাজারেরও বেশী মসজিদে জুমুআর নামাজের খুৎবায় হযরত আলী এবং তার পবিত্র বংশধরদের গালিগালাজসহ অভিসম্পাদ প্রদান করা হতো (২৭ পৃষ্ঠা)।

(৬) মুয়াবিয়ার গভর্নর যিয়াদ যখন কুফার মসজিদে খুৎবা দিতে দাঁড়ান (উদ্দেশ্য আলীকে গালিদান) তখন কিছু লোক তার প্রতি কঙ্কর নিক্ষেপ করে এর প্রতিবাদ জানায়। এতে তৎক্ষণাৎ মসজিদের দরজা বন্ধ করে ৩০ থেকে ৮০ জন লোকের হাত কেটে দেয়া হয়। হযরত আবু বকরের পুত্র মোহাম্মদ বিন আবু বকরকে হত্যা করে তার লাশ গাধার চামড়ায় ভরে জ্বালিয়ে দেয়া হলো (২৮ পৃষ্ঠা)।

(৭) ইয়াজিদ এক বিশাল সৈন্য বাহিনী মদীনায় প্রেরণ করেন। ইয়াজিদ তিন দিনের জন্য মদিনাকে হালাল করে দিলেন। রসুল (সঃ) এর বাড়ীকে পশুর আস্তাবল বানানো হলো। মদিনার পথে পথে গলিতে গলিতে মানুষের রক্তের স্রোত প্রবাহিত হলো। উক্ত মর্মান্তিক ঘটনায় মদিনায় শিশু ও মহিলা ব্যতীত বারো হাজার চারশো সাতানব্বই জন লোককে হত্যা করা হলো। মহিলাদের ধর্ষন করা হলো। ফলে একহাজার মহিলা অবৈধ সন্তান প্রসব করলো। যারা মারা যান তারা হলেন, মোহাজের, আনসার তাবেঈন, উলেমা ১৭০০জন, সাধারণ লোক ১০,০০০ জন, হাফেজ ৭০০ জন, কুরাইশ ৯৭ জন। এই সর্বোমোট ১২,৪৯৭ জন।

(৮) এতো গেল নিজেদের দলাদলির খবর। এর সূত্র ধরে বিরুদ্ধবাদী বৃটিশরা কিভাবে এর সুযোগ গ্রহন করে, তার উপরও প্রাপ্ত যথেষ্ট বক্তব্য এসেছে বইটিতে। এখানে এর কিছু উদাহরণ দেয়া হলো। “ওহে হ্যামফার তোমার পরবর্তী মিশনের জন্য দুটি কাজ। (১) মুসলমানদের দুর্বল জায়গার খোঁজ নিতে হবে। সেই দুর্বল জায়গা দিয়ে আমরা তাদের দেহে প্রবেশ করবো এবং অঙ্গ প্রত্যঙ্গ খুলে ফেলবো। বস্তুতপক্ষে শত্রুকে ঘায়েল করার এটাই পথ। (২) যে সময় তুমি এসকল দিক চিহ্নিত করতে সক্ষম হবে তখন আমি যা বলেছি তা করবে। —-যখন তুমি মুসলমানদের রজ্জুহীন করতে সক্ষম হবে এবং একজনকে আরেকজনের বিরূদ্ধে বিবাদে লিপ্ত করতে সক্ষম হবে তখনই তুমি হবে সবচেয়ে সফল এজেন্ট এবং মন্ত্রনালয় থেকে অর্জন করবে একটি মেডেল” (৫২ পৃষ্ঠা)।

(৯) মন্ত্রনালয়ের কেউ একজন আমায় বললেন, “আপনার কাজ হচ্ছে মতভেদ উস্কে দেয়া, মুসলমানদের একতাবদ্ধ হওয়ার ক্ষেত্রে চিন্তা করা নয়” (৫৪ পৃষ্ঠা)।

(১০) আমাদের বিদায় অনুষ্ঠানে উপনিবেশ সমূহের মন্ত্রী আমাকে বলেন যে, “আমরা মদ ও নারীর সাহায্যে অবিশ্বাসীদের (তার মতে মুসলমান) হাত থেকে স্পেন দখল করে নিয়েছি। এই দুটি বিশাল শক্তি দিয়ে আমাদের হৃত সকল ভূখন্ড ফিরিয়ে আনতে হবে” আমি জানি মন্ত্রীর বক্তব্য কত সঠিক ছিল (৬২ পৃষ্ঠা)।

চিন্তাশীলদের খোরাক আছে তথ্যগুলোর মধ্যে। টুইন টাওয়ার ধ্বংসের পর ইরাকে শিয়া সুন্নীদের বিভেদকে বড় করে দেখিয়ে, কখনো লুক্কায়িত পারমানবিক স্থাপনার কথা, কখনো ক্যামিক্যাল মারণাস্ত্রের অপবাদে মিথ্যে করে হলেও জাতিকে চরম দন্ড দিতে হয়েছে। দেখা যাচ্ছে আবারও ইরানকে অনেক দিন থেকেই শাস্তির জন্য টার্গেট করা হচ্ছে। তার মানে এখানের বিষয় কখনোই শিয়া বা সুন্নী নয়, প্রতিষ্ঠিত শক্ত শাসক পক্ষের দৃষ্টিতে কখনো সুন্নী সাদ্দাম দোষী আবার কখনো শিয়া ইরান দোষী, এককথায় উভয়ই দোষী, এদের পাপ এরা মুসলিম। প্রথমে ক্রুসেড নাম দিয়ে শুরু করা বুশের যুদ্ধে বিধ্বস্থ দেশটির করুন পরিণতি কি ইসলামের দায়? এভাবে যুগে যুগে মানুষকে মূল থেকে দুরে সরিয়ে রাখার কাজটি করেছে ষড়যন্ত্রী পক্ষ, আল্লাহ যার নাম দিয়েছে ইবলিস। ইবলিস কিয়ামত পর্যন্ত বেঁচে থাকবে, অর্থাৎ ইবলিসকে মোকাবেলা করেই প্রকৃত মেধাবী মানুষকে বিজয় ছিনিয়ে নিতে হবে।

এরা চৌদ্দ শত বছর ধরে ধর্মটিকে রাজতন্ত্রের মোড়কে গণতন্ত্র থেকে দূরে রাখে। যার জন্য আজো সৌদি আরবে রাজতন্ত্র, রসুলের প্রতিষ্ঠিত গণতন্ত্র সেখানে মৃত। ইসলামে অপকৌশল হয়েছে যুগে যুগে এসবই তার প্রমাণ। হয়তো শিয়ারা বাস্তবে বেশী প্রতিবাদী থেকেছে, যদি তাই হয় সেটাও নৈতিকতার ক্ষেত্রে তারা ঠিক ছিল। আর প্রতিবাদ সুন্নীরা করে নাই বলেও কোন প্রমাণ নেই, কারণ ঐ সময় যারাই নিহত হয়েছেন তারা সবাই অবিভক্ত মুসলিম ছিলেন। সাধারণ জনতা এর গভীরে না ঢোকে শুধু নিজের রক্ত ঢেলে খেসারত দিয়ে গেল আজীবন। কুরআন স্মরণ করেই মুসলিমরা দেড় হাজার বছর পর হলেও  এক প্লাটফরমে আসতে পারে এটা কোন বিতন্ডার বিষয়ই নয় বরং নিজেদের অজ্ঞতার কারণে অযথাই এ দলাদলি। এ অজ্ঞতা জনিত ত্রুটিও কম নয়। আত্মসচেতন না থাকার কারণে পরিস্থিতির শিকার হয়ে খেসারত পুরোটাই দিচ্ছে শিয়া সুন্নীরা। আল্লাহ সঠিক সত্য মিথ্যার ফয়সালাকারী। তবে অবশ্যই প্রতিটি সচেতন মুসলিমদের ভাংগনের অপরাধ থেকে বের হয়ে কুরআনের একতার পথে চলতে হবে। মোয়াবিয়া গোত্রের এই শতাব্দী পূর্ব অপকর্মের খেসারত পৃথিবীর মুসলিমদেরে আজ অবদি দিতে হচ্ছে। রাজতন্ত্র নামের এই অপকর্ম এরাই চালু করে যা কখনোই ইসলামে স্বীকৃত নয়। গণতন্ত্রের এই পূণ্যের ভান্ডে কে কি কৌশলে এই এঁটো মিশিয়ে দিলো তা নির্ধারণ করতে আমরা আজও ব্যর্থ হচ্ছি। এ ক্ষোভ শুধু শিয়াদের একার ক্ষোভ নয়, এটি সুন্নীদেরও ক্ষোভ। শিয়া সুন্নী কথাটি ভুলে যেতে হবে, এরা সবাই এক আল্লাহর অনুসারী মুসলিম জনতার অংশ।

এ কষ্ট এই দু’দলেরই সমান কষ্ট। একতার পথ রচনা করতে হবে রক্তপাত দিয়ে নয়, সম্প্রিতী দিয়ে, অস্ত্র দিয়ে নয় – বরং কলম দিয়ে, কথা দিয়ে, যুক্তি দিয়ে, চোখ ফুটানো সত্যতা দিয়ে সবার দৃষ্টি খুলে দিতে হবে, সবার অন্ধত্ব ঘুচিয়ে দিতে হবে। প্রকৃত ইসলামে স্বরচিত বিধান বা কোন ব্যক্তিতন্ত্র চাপিয়ে দেয়া ইসলাম নয়। পরবতীতে শিয়ারাও ইমামতির নামে অনেক বিভ্রান্তি জড়ো করেছে। প্রকৃত ইসলামের শিক্ষা ছিলো সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনা। সেখানে কারো ব্যক্তিগত খেলাফত নির্ধারণের কোন জায়গা নেই, খলিফা হবেন জনগণের মনোনিত শাসক, জনগণের ভোটেই তিনি নির্বাচিত হবেন, যেমন হয়েছিলেন হযরত আবুবকর, ওমর, আলী, ওসমানরা । লেখক শাহরিয়ার শহীদের সাথে সুর মিলিয়ে বলছি, হযরতের বিদায় হজ্জের একটি বাণী ছিল এরকম, “যদি কোন নাককাটা কাফ্রি ক্রীতদাসকেও তার যোগ্যতার জন্য তোমাদের আমীর করে দেয়া হয়, তোমরা সর্বোতোভাবে তার অনুগত হয়ে থাকবে। তার আদেশ মান্য করবে”। উপরোক্ত উক্তিটি ছিল নবী মোহাম্মদ (সঃ)এর মুখ নিসৃত অমৃত বানী। তিনি সেখানের জনতার কাছ থেকে এই অঙ্গিকারটুকুও আদায় করেন যে যারা এখানে উপস্থিত নেই তাদের কাছে “আমার এ বানী তোমরা নিজ দায়িত্ব মনে করেই পৌছে দিও”। তাই আজ চৌদ্দশত বছর পর আমরা সে বানী আজও অবগত হচ্ছি কিন্তু পালনের ক্ষেত্রে মূল থেকে সরে এসেছি। আমরা যদি সঠিক মুসলিম হই তবে আমাদের উচিত কুরআন ফলো করা। যে কুরআন শেষ নবীর মারফতে দুনিয়াতে এসেছে। নবী প্রবর্তিত এই কুরআনের নীতিমালাই ইসলামের বিধান। মুখ্যত আমরা অনুসরণ করবো এই নবীকে। তার পরবর্তী আবুবকর, ওমর, আলী খলিফারা আদৌ কোন ধর্মের অনুসারী ছিলেন, সেটিই আমাদের বিবেচ্য বিষয় হওয়া উচিত। এরা কি কখনো এরকম দলাদলীর মাঝে নিজেকে জড়িয়ে রেখেছিলেন? এরা কি কেউ শিয়া বা সুন্নী ছিলেন?

বস্তুত পূর্ববর্তী যুগের সত্য সাধকরা যে বিজয়ডঙ্কা বাজিয়ে গেছেন, কোন অবস্থায় আমরা যেন তার অমর্যাদা না করি। এরা সবাই ছিলেন উৎকৃষ্ট মুমিন, আল্লাহর অনুগত বান্দা, কুরআনের প্রতিষ্ঠাতা, প্রয়োজনে রক্তের বিনিময়ে, ত্যাগের বিনিময়ে তারা সেটি প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। আমরা আমাদের মূল ছেড়ে দিয়ে ডালপালা নিয়ে নাচানাচি করছি। কুরআনে যে বিভেদ সৃষ্টি করতে বার বার নিষেধ করা হয়েছে, আমরা সেটিই করে চলেছি। এসব বিচ্ছিন্নতা, দলাদলির কারণে ধর্মের সঠিক অনুসরণ না করে ফসল তুলতে পারছি খুব কম, যার ফলশ্রুতিতে আমাদের ধর্মের গৃহে আজ খরা, মন্দা, মহামারি, আকাল, দুর্ভিক্ষ অনেক বেড়েছে।

(১) বলো (হে মোহাম্মদ!) ‘মহাকাশমন্ডলীর ও পৃথিবীর কেউই গায়েব সম্বন্ধে জানেনা আল্লাহ ছাড়া’ (সুরা আন-নমল আয়াত ৬৫)।

(২) কিন্তু তাদের ক্ষেত্রে যারা সীমালংঘন করেছে তাদের আবাস হচ্ছে আগুন। যতবার তারা সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে চাইবে তাদের তাতে ফিরিয়ে আনা হবে; আর তাদের বলা হবে: ‘আগুনের শাস্তি আস্বাদন করো যেটিকে তোমরা মিথ্যে বলতে’ (সুরা আস-সাজদাহ আয়াত ২০)।

(৩) বলো ‘আমি তো তোমাদের সতর্ক করি কেবল প্রত্যাদেশের দ্বারা: আর বধির লোকে আহ্বান শোনেনা। যখন তাদের সতর্ক করা হয় (সুরা আল-আম্বিয়া ৪৫ আয়াত)।

(৪) যে কেউ রসুলের আজ্ঞাপালন করে সে অবশ্যই আল্লাহর আজ্ঞাপালন করে। আর যে কেউ ফিরে যায় আমরা তোমাকে (মোহাম্মদকে) তাদের উপর রক্ষাকারীরুপে পাঠাই নি (সুরা আন-নিসার ৮০ আয়াত)।

(৫) আর যারা নিজের আত্মাকে ফাঁকি দেয় তাদের পক্ষে বিতর্ক করো না। নিঃসন্দেহে আল্লাহ ভালবাসেন না তাকে যে বিশ্বাসঘাতক, পাপাচারি (সুরা আন-নিসার ১০৭ আয়াত)।

(৬) এ হবে না তোমাদের (মূর্তিপুজকদের) চাওয়া অনুসারে, আর গ্রন্থপ্রাপ্তদের চাওয়া অনুসারেও নয়। যে কেউ কুকর্ম করে তাই দিয়ে তার প্রতিফল দেয়া হবে আর তারজন্য সে আল্লাহকে ছাড়া পাবে না কোন বন্ধু, না কোন সহায় (সুরা আন-নিসার ১২৩ আয়াত)।

(৭) আর তাদের মতো হয়ো না  যারা বিচ্ছিন্ন হয়েছিল আর মতভেদ করেছিল তাদের কাছে সুস্পষ্ট নির্দেশাবলী আসার পরেও। আর এরা – এদের জন্য আছে কঠোর যন্ত্রণা, যেদিন কতকগুলো চেহারা হবে ঝকঝকে আর কতকগুলো চেহারা হবে মিসমিসে (কালো); তারপর যাদের চেহারা কালো হবে তাদের ক্ষেত্র হবে আরও গুরুতর। তোমাদের জন্য নির্দেশাবলী সুস্পষ্ট করলাম যদি তোমরা বুঝতে পারো। (সুরা আল-ইমরানএর ১০৪ ও ১০৫ আয়াত)।

উপরে মাত্র ৭টি আয়াত জটিলতাকে খোলাসা করতে একটি না এনে সাতটি আনতে হলো। আর এটি কোন হালকা জিনিস নয়। গ্রন্থটি এখানের দু’দলেরই অনুকরণীয় সিলেবাসের অংশ। দেখা যাচ্ছে যারা এই গোপন গায়েবের, ইমামতির স্বতন্ত্র মিথ্যা দাঁড় করাচ্ছে এরা কঠিন আগুনের মুখোমুখি দাঁড়াবে, কারণ সহজ সরল ধর্মটিতে এসব নেই। ধর্মের নামে যা বাড়াবে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এসব ইসলামে নেই, আল্লাহ ছাড়া কারো হাতে গায়েবের ক্ষমতা নেই। যারা সত্যকে অস্বীকার করে মিথ্যে প্রচার করে তাদের শাস্তি আগুন। একমাত্র সত্য বাণী আসে রসুলের মারফত প্রত্যাদেশের দ্বারা, ওহির দ্বারা, এখানে প্রত্যাদেশকৃত বাণীর জয় ঘোষিত হয়েছে। কুরআন আল্লাহর বাণী, নবীর স্বরচিত বাণী নয়। তাই নবীর আজ্ঞাপালন মানেও কুরআনের অনুসরণ, এটি আল্লাহর নির্দেশ। আর যদি কেউ ফিরে যায় আল্লাহ সে ক্ষেত্রে নবীকে কটাক্ষ করে বলছেন তাদেরে ফেরানোর দায়িত্ব তোমার নয়। “তাদের উপরে রক্ষাকারীরূপে নিযুক্ত করি নি, আর তুমি তাদের উপরে কার্যনির্বাহকও নও” (সুরা আনআমের ১০৮ আয়াত)। যারা মতভেদ ও বিচ্ছিন্নতায় ইন্ধন যোগায় তাদের অবস্থা হবে গুরুতর। এসবই আল্লাহর সুস্পষ্ট নির্দেশনা। আল্লাহ সবার জটিলতাকে সহজ করে দিক, এই কামনায়।

 

লেখাটির প্রকাশ সময়ের দাবী। জানুয়ারী ০৪, ২০২০ সাল।

মূল লেখাটি প্রায় ২০ বছর আগের জমা। একটি অপ্রকাশিত বই (শিয়া সুন্নী – পিছন ফিরে দেখা) এটি একটি চ্যাপ্টারের কিছু অংশ। মূল গ্রন্থটি ১৯টি চ্যাপ্টারে সাজানো। এর প্রতিটি চ্যাপ্টার দেড় হাজার বছরের শিয়া সুন্নীর সব জটিলকে স্পষ্ট করতে মূল ধর্ম ইসলাম ও কুরআনীয় বস্তুনিষ্ট সত্যের উপর ভিত্তি করে লেখা হয়েছে।

বি দ্রষ্টব্য: এ লেখাটি নিউইয়র্ক ভিত্তিক ‘দি রানার নিউজ’ সাপ্তাহিকে ১৭ জানুয়ারী ২০২০ সংখ্যায় ছাপা হয়।

নাজমা মোস্তফা

(২০২০ এর ছন্দকথা)

কিছু সত্য কথা, জানাবো ষ্পষ্ট কিছু ব্যাথাময় বার্তা। বাংলাদেশকে অশান্ত করতে ‘র’ শান্তিবাহিনী গড়ে।

গুপ্তচরবৃত্তি, চোরাকারবারি, নাশকতায় রত, কৌশল যত, সীমান্তের বাইরে নয় ভিতরে বসবাস অবিরত।

ইন্দিরা গান্ধী চাননি ভারতের পূবদিকে সূর্যের মত শক্তিশালী দেশের উদয়। ভাঙ্গা জরুরী, হাতুড়ী ছাড়াই কসরত,

অতপর মগজের লালিত সন্তান ‘র’এর উদয়। ভাঙ্গো পাকিস্তান, মেরুদন্ডহীন দেশ গড়ার অর্ডার জাতকের উপর।

তড়িঘড়ি ৭১ এ, চুক্তি স্বাধীনতার শুরুতেই ২৫ বছরের শিকল, শান্তি চুক্তির নামে করা গোলামী অবিকল।

‘এই শিকল পরা ছল মোদের এই শিকল পরা ছল, এই শিকল পরেই শিকল তোদের করবো রে বিকল।’

বাঁচবার জন্য কবিতার দরকার, কিন্তু শিকল কেন আবার? প্রতারণা কেন বারে বার, জবাবটাও দরকার।

তখনও নজরুল জীবিত ময়দানে বাকহারা, নয়তো তখনই জাতি জেনে যেত, তার হুঙ্কারে শিকল ছিন্ন হতো।

ইন্দিরা জানতেন এদের চেতনা শক্ত! মূর্তি নয় ঈশ^র গরু নয় মা তাদের, এক অদেখা আল্লাহতে ভক্ত।

গরু তাদের খাদ্য মূর্তি কখনো খেলনা। অন্তরে বিধাতার পদচিহ্ন এঁকে দিয়েছে, দুখুর সত্য সাধনা। 

কাশ্মীর দাপটের তলানীতে চেপে রাখা, সিকিম গিলে হজম, হায়দ্রাবাদও উদরে।

বাংলাদেশের কথা ভেবে কাঁপুনী জাগে। ঐ কাঁপুনীতেই ‘র’এর জন্ম আতুড় ঘরে মায়ের তদারকিতে,

কাশ্মীরের পরেই সাত রাজ্য সাত বোনের কান্না সোরগোল, ভাংগনের গুঞ্জন ময়দানে,

কাশ্মীরী মুসলিম আফজাল গুরু ফাঁসিতে, বিচার নয় প্রহসন, চলে খুশীর কপট নাচন।

জোরপূর্বক পাকিস্তান খন্ডনের অপরাধ মনের মাঝে আজো কাঁপন জাগায়।

খালেদায় কাঁপুণী আজ নতুন নয়। সময়টা ১৯৯৩ খালেদা কলকাতা দমদম বিমান বন্দরে।

খালেদার ইমেজে ভারত সংকটে। সাংবাদিকেরা উৎসুক।

জানানো হয় খালেদা ইচ্ছুক নন। দেখা করবেন না। উৎসুকরা আশাহত ভারতীয় যোগ।

খালেদা এক মানুষ আর ভারত এক দেশ। এত ছোট হওয়া, খালেদার ভয়ে মিথ্যা বলা?

তাদের ভয় খালেদাকে, সবদিন আজো এবং বিগত শতকেও।

পশ্চিমবঙ্গের বাঙ্গালীরাও যদি ‘দিল্লী হঠাও’ সুর তোলে!

তাদের অসংখ্য ভয়! সাত বোন যদি স্বাধীনতা চায়!

যদি বাংলাদেশ হয় পথ প্রদর্শক, শিক্ষক, দৃষ্টান্ত এক। তারা চায় এদের নির্জীব করে রাখতে,

মূর্তিপূজা আর মাতৃবন্দনা আচার, যদিও নারীরা শুদ্রানী এ পূজার বিচার।

ইয়াবা ফেনসিডিল কার জন্য?

ভারত বলে বাংলাদেশে সৈন্যের দরকার শূণ্য।

তাই বিডিআর মুছার আবদার নাম পাল্টাবার

বিডিআর আজ বিজিবি, দেশবাসী জানে না, কেন? অতীতে অনেক রাজনীতিবিদের ছিল শংকা,

প্রয়াত শ্রী জয় প্রকাশ নারায়নের মন্তব্য, বাংলাদেশ সৃষ্টি যদি আরেক পাকিস্তান সৃষ্টির আশংকা!

‘ধর্ম যার যার উৎসব সবার’। মদ গাজার মাতম উঠুক, কলেমা ছেড়ে রামধন গাইতে শিখুক।

‘যহি আল্লাহ সহি রাম’ তাদের কাছে সব সমান। আল্লাহর সাথে রামের সমতা বড়ই বেমামান!

পশুও মা হয় কিন্তু মুসলিম কখনোই মানুষ হয় না, দেবতার আদালতে।

এযাবৎ বলেছ মুসলিম অচ্ছুৎ ছোটলোক ম্লেচ্ছ, ছুলে জাত যায়!

গরুর নামে মুসলিম পিটায়! বিবেকরা শবমিছিলে মৃত পরলোকে গেছে।

পরজন্মে কীট পতঙ্গ রুপে গরুরও অধম হয়ে জন্মাবে। তারপরও জট খুলবে না?

নিকৃষ্ট আচরণ! মুসলিমরা অনুমোদিত খাদ্যে বঞ্চিত, প্রহৃত, লাঞ্ছিত সবে!

বাংলাদেশ দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্র মুজিব বলেছিলেন সেই কবে।

মানেক শ জানতেন, অনুপ্রেরণায় তারা যাবে ভারতের চেয়ে মক্কা ও মদীনায়।

প্রেরণার জায়গা পাকিস্তানও হতে কতক্ষন? অবশ্যই মানেক শ, তাতো মিথ্যে না!

ভারত চায় এদের অর্থনৈতিক মেরুদন্ড ভেঙ্গে দিতে, ভারতের উপর নির্ভরশীল রাখতে।

এমন হলে মেনে নিলে স্বাধীনতা ছাড়াই ৭১, পাকিস্তানেরই পদলেহন মন্দের ভালো হতো।

তাহলে ভারতের নাক গলানোর সুযোগ না হতো । মেজর জলিলের হুঙ্কারে ভারত বুঝেছিল,

এদের বাগে আনা সোজা না। চিন্তায় কপাল কুঁচকায়। তারপরও দাদারা বসে নেই, কম করে নাই।

আবরার, নূর, শত গুম খুন একপাশে রাখা এত অবিচার কত বলা যায়, এমন সমাচার।

মন মন টন টন উপচে পড়া কষ্টের জীবন ! শান্তিবাহিনী, বঙ্গসেনা, মোহাজির সংঘ, আরো কত কি?

যুদ্ধ তো পুরোটাই লুট করেছে দাদারা! কি লজ্জা?

যুদ্ধ করে মুক্তিযোদ্ধারা আর আত্মসমর্পণের দলিল তৈরী করে তারা!

কোনদিন কি তারা বিবেকের কাছেও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে?

এটি নীতি নৈতিকতার কথা, যুক্তির কথা ধর্মের কথা, তারা ভুলেই গেছে।

নজরুল সেই কবে বোবা অথর্ব, মৃতবৎ বোধের অতীত শিশুবৎ, তখনও জীবন্ত ফসিল এক।

শফি চাকলাদারের “কাফেরের তলোয়ার চাও কতল করিতে আমারে” –

মনে করিয়ে দেয় তার বাকহীনতার কথা। সবই তো গোপন করে রাখা!

কথাগুলি চাকলাদারের নয়, নজরুলের মার খাওয়ার পর আর বাকহারার আগের কথা।

কত মার খাবে বাছারা, সবার সাথে মানবতার কথা বলেছে, মানচিত্রের মর্যাদা চেয়েছে।

বন্ধুর বেশে তোমরা মানচিত্রে হামলে পড়লে শতাব্দীর শুরুতে! ভাবলে ম্লেচ্ছ যবন এরা!

ঠিক তোমাদের গুরুদেবের মতন। কষ্ট চেপে কত শত লাশ ময়দানে জানাজার অপেক্ষায়?

এত লোভ প্রতিবেশীর ভিটার পরে? সব ফুটেজ নিরব প্রতিবাদ জমছে প্রকৃতির পাতায়, 

পার পাবে না কর্তারা! শুধু মসজিদ নয়, মন্দিরের হিসেবও নেয়া হবে কড়ায় গন্ডায়!

বাবর আওরঙ্গজেবরা কত মন্দির গড়েছিল, সব ভুলে বসে আছ, ফুটেজ তো সংরক্ষিত খাতায়।

রাম পুনিয়ানীকে জিজ্ঞেস করে কিছুটা জানো। গোলাম আহমেদ মর্তোজা এখানো সংগ্রামরত।

সত্য বলতে শিখো, যত বড় পান্ডিত্যই থাক, মিথ্যার কোন পাওনা নেই। পুরষ্কার সত্যের জমা, দুই জনমে।

বাকীরা ব্যর্থ, বিধ্বস্ত, বাতিল, সর্বহারা। যত লাঞ্ছিত বঞ্চিত সবাই সারিবদ্ধ হও। পুরষ্কার গোলাতে উঠাও।

একটু গদ্যকথা শুনাই। বেমানান নয় মোটেও, তবে প্রবঞ্চনার কথা কিছু আছে ওখানেও।

 

১৯৯১ সাল নির্বাচনের সময় আনন্দবাজার গোষ্ঠীর সাপ্তাহিক সানন্দার সাম্পাদিকা অপর্ণা সেন, বাংলাদেশে আসেন। সানন্দা একটি সাপ্তাহিক আর বাংলাদেশ এক দেশ, দুয়ের ফারাক আকাশ পাতাল। কিন্তু সানন্দা সম্পাদিকা (একদিন এ দেশ তারও ছিল!) বাংলাদেশে  নির্বাচনের খোঁজে (?)। বেগম খালেদা জিয়ার সাথে সাক্ষাৎ না করে তড়িঘড়ি ছুটে যান অপেক্ষমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে সাক্ষাতের জন্যে। বস্তুত ঐ নির্বাচনে শেখ হাসিনা হেরেছিলেন, ঐ ছুটে যাওয়া ছিল কপট সংকীর্ণ রাজনীতির কতকথা। আর পরবর্তী নির্বাচনেও ভারতের অন্যায় সাহায্য ও সহযোগিতা ব্যতীত শেখ হাসিনার জেতার সম্ভাবনা কতটা পূর্ণ আর কতটা শূণ্য সেটি পাঠকরাই জানেন ভালো। অর্পণা সেনকে অনেকেই বাংলাদেশের মেয়ে মনে করে আহ্লাদে আটকানা! কিন্তু অর্পণারা দর্পণে কি তাদের চেহারা দেখেন? তাদের আচরণ সংকীর্ণ স্বার্থে গোলামী ও দাসত্ব শেখার প্রশিক্ষণ। সত্যকে ঠেলে দিয়ে মিথ্যার সাথে বসতি। কঠিন সত্য কথা বেমানান শুনালেও সত্য প্রকাশ যুগের মানবতার দাবী। নিজের অস্তিত্ব রক্ষার্থে সেটিও বিবেচনা করার সময় বাংলাদেশের! রবীন্দ্রনাথ সবার গলার তাবিজ, কিন্তু মুসলিমদেরে মানুষ না ভেবে বারে বারে ম্লেচ্ছ যবন ডাকে, তাতেও কি মুসলিমরা সম্মানিত? মুসলিমদের উদার সভ্যতা তাদের সংকীর্ণতা শেখায়নি। ধন্য তাদের বদান্যতা মহানুভবতা আন্তরিকতা! কিন্তু ইতিহাস তো সবাইকে জানতে হবে মানতে হবে! একে অস্বীকার করার সাধ্য কারো নেই! সঙ্গত কারণেই শত কষ্টকে চেপে রেখেও দুটো সত্য কথা বলা, যা সবার জানা, একটু ঝালাই করা। সবার সুমতি হোক, সবার সুগতি হোক। সবাই তাদের স্বাধীনতা বজায় রেখে মানুষ হয়ে বাঁচুক। পরম মালিকের কাছে এ প্রার্থণা জমা রেখে বছরের শুরুতে এ ছন্দকথা, শেষ করছি এখানেই। সবাই ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন।

০১/০১/২০২০

রাত ১টা ০২ মিনিটে: নতুন বছরের নতুন দিনের শুরুর সময়ে

 

 

নাজমা মোস্তফা

(পূর্ব প্রকাশের পর)

সম্বিৎহারা মুসলিমদের অপরাধ: সত্য ইতিহাস ধর্ম না জানা, চোখ কান থাকার পরও মিথ্যাতে মজে থাকা বিরাট অপরাধ। বর্তমান সময়ের সম্বিৎহারা মুসলিমদের জন্য এটি চরম লজ্জার কথা। মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব, আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ মুসলিমদের একমাত্র অবলম্বন, মানুষ মাত্রেরই সচেতন থাকা, মানবতা জীবনের মূল কথা। মানুষের বড় দোষ চেতনহীন ও  দেউলিয়া থাকা। অসচেতনরা নিজের উজ্জল অর্তীতকে ভুলে গোলামীতে দাসখত করে। পাপই পূণ্যকে আলাদা করে। শুরুতেই ধর্মটি কিভাবে দু টুকরো হলো, কে করলো (?) আজো এ ব্যাপারে নিরবতা চলছে। ধর্মের সত্যকে শক্ত করে ধরার নির্দেশ, নয়তো বিভক্তির দন্ড গুরুতর (আল ইমরানের ১০৩ আয়াত)। সেখানে মিথ্যার কোন জায়গা নেই। ময়দান থেকে সত্যের বাহক নবী পরলোকে গেলেও শত্রুপক্ষ শিশু ইসলামকে ধ্বংস করতে চেয়েছে। শত্রুকে সবাই চেনে কিন্তু অচেনা মোনাফেকও শত্রু হয়, কুরআন এভাবে আড়াল করা শত্রুদের পরিচিতি জানিয়ে প্রকাশ্য শত্রুদের চিনিয়েছে। এভাবে ইবলিস যুগে যুগে সুযোগের ব্যবহারে কার্পণ্যতা দেখায় নি। অতি অল্প দিনেই ইবলিসের সহযোগিতায় ভাংগনের কাজ সমাপ্ত হয়েছে। ধান্ধা লাগিয়ে আলখেল্লার ভেতরে দুর্বৃত্ত বহাল তবিয়তে কয় শতাব্দী অবদি জীবন্ত, এজন্য শিয়া সুন্নী বিরোধ আজো বহাল। এভাবে যুগে যুগে বোকারা অপরাধী ঠাকুরদেরে বড় আসন দিয়ে রেখে পূজো দিচ্ছে দিয়েছে হয়তো আরো দিবে। সত্য প্রকাশে বিরত থেকেছে ত্রাসে ভয়ে, ভুলেও অপরাধীর নাম মুখে আনে না। মনে রাখতে হবে আল্লাহর উপর কোন বড় কর্তা নেই, বড়হুজুর নেই। অপরাধ ধরা পড়লে ঢোল পিটিয়ে পাশবিকতা জানান দেয়া মানবতার কাজ। তবে কখনো নির্দোষকে নয়।

ইসলাম কি কেন, পরিচয় কি এর সদস্য কারা: সম্বিৎহারা মুসলিমকে জানতে হবে তারা কারা, কি তাদের পরিচয়? এ ধর্মের নীতি জটিলতাহীন সহজ সরল, অসীম ক্ষমতার অধিকারী এক আল্লাহতে বিশ^াস রাখা। মানুষের মুখাপেক্ষী না হয়ে আল্লাহকেই একমাত্র অভিভাবক মানা। মুসলিমদের চেতনহীনতা আৎকে উঠার মত ! এমনও বলা হয়েছে এমন এক সময় আসবে যখন ঐ ধর্মের নাম ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। ধর্মের নামে থাকবে অধর্ম! জ্ঞানের মূল্য কমবে, যোগ্যরা উপযুক্ত সম্মান পাবে না। সত্যচ্যুতির কারণে ধর্ম প্রচারকরাও জটিলতায় জড়াবে। কুরআন এক ব্যতিক্রমী গ্রন্থ, সাধারণ পুস্তকের মত মানুষের রচিত নয়। এটি পৃথিবীর একমাত্র ১০০% বিশ^াসযোগ্য গ্রন্থ যা পৃথিবী ধ্বংসের আগে বিলুপ্ত হওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই। নবীর জীবন কালীনই সুসংরক্ষিত ও সজ্জিত ত্রুটিমুক্ত (সুরা হিজর ৯ আয়াত)(সুরা আল ওয়াকিয়াহ ৭৭, ৭৮ আয়াত)। এর বানী সমূহ প্রায় ১৫শত বছর থেকেই একই, নিরাকার আল্লাহ এর সংরক্ষক। এজন্য এর সামনে পেছনে ডানে বামে কোন দিক আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা শূণ্য। যুগে যুগে সত্য সাধকরা এক সত্যের অনুশীলন করেছেন। অনুসারীরা সংকীর্ণতায় আমিত্বের অহংকারে ভিন্ন নামে আলাদা হয়েছে। অসাধারণ সব তথ্য ঐ গ্রন্থে জমা আছে। মূলত সারা মানব জাতি এক ঘরের বাসিন্দা। তাই আদম ইব্রাহিম ঈসা মুসা নামের সব সত্যসাধককে না মানলে কোন মানুষ মুসলিম দাবী করতে পারে না, এ ধর্মের নির্দেশনা। অঞ্চল ভিত্তিক গড়ে উঠা এক সভ্যতার নাম হিন্দু সভ্যতা। আঞ্চলিক নবী ঈসার ধর্ম খৃষ্টানিটি যেখানে বাইবেলে জেসাস ক্রাইস্ট নিজেই বলেন, আমি শুধু মাত্র ইসরাইলের হারানো গোত্রগুলির সন্ধানে প্রেরিত হয়েছি (ম্যাথু ১৫: ২৪)। পূর্ববর্তীরা আঞ্চলিক নবী হলেও শেষনবী মুহাম্মদ (সঃ) সারা দুনিয়ার সম্পদ, কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না (সুরা সাবার ২৮ আয়াত)। শেষ নবী হওয়ার কারণ তার সিলেবাসের পূর্ণতা ও সঙ্গত কারণে ওটি সিলমারা। এসব নবীদের নিয়োগ কোন মানবিক বরাদ্দ নয়, এরা অদেখা আল্লাহর নিয়োগপ্রাপ্ত। ঈসা নবীর মাত্র ৫৭০ বছর পরই প্রয়োজন পড়ে বলেই শেষ নবীকে আসতে হয়। ঐ নবীর পর আজ প্রায় দেড় হাজার বছর আর কেউ আসে নাই, সূত্র মতে আর আসবেও না।

 কুরআন একটি জীবন বিধান: সামাজিক, পারিবারিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয় সীমারেখা দাগ দেয়া সবার  জন্য। জাতিতে জাতিতে নবীরা এসেছেন (সুরা ইউনুস ৪৮ আয়াত)। শেষ নবীর মাধ্যমে নারীদের অধিকার নিশ্চিত হয়েছে। আমরা ইতিহাসে কোথাও পাই না নবী নিজ হাতে কোন যুদ্ধে মানুষ খুন করেছেন, এমন কোন উদাহরণ নেই। তারপরও তার বিরুদ্ধে একবিংশ শতক অবদি সন্ত্রাসীর খাতায় নাম তোলা হয়েছে। শত শত ইহুদী কেউ কেউ বলেন ৯০০ নিধনের অভিযোগ তোলে রাখা হয়েছে। সবই ইতিহাসের স্বরচিত মিথ্যাচার, ‘ইসলামে যুদ্ধ’ লেখাতে সেটিও খন্ডন করেছি। এ মিথ্যাচার অতীতে ইউরোপীয়রা করেছে ঐ পথে হেটেছে ভারতীয় ইতিহাসবেত্তারাও। মাঝের সময়ে মুসলিমরা বেঘোরে ঘুমাচ্ছে, এমন সুযোগে বিরোধীরা মনের মাধুরী দিয়ে নবীকে দাঙ্গাবাজ সাজিয়েছে। আগে নিজে জানুন তারপর অপরকে জানান। প্রতিটি বিবেকের দায়িত্ব ও কর্তব্য, সত্যের সাধনা করা। নাক ডাকিয়ে ঘুমের খেসারত দিচ্ছে মুসলিমরা, জেগে উঠার বিকল্প নেই। প্রতিটি সাজানো মিথ্যার বদলে সত্যকে স্পষ্ট করা প্রতিটি মানুষের ঈমানী দায়িত্ব। মুসলিমরা কখনোই অপকর্মী নয়, বরং কুরআন মূর্তিপূজকের উপাসককে গালি দিতে নিষেধ করে (সুরা আনাম ১০৯ আয়াত), তাদের বিপন্নকে নিরাপত্তা দিতে বলে (সুরা তওবা, ৬ আয়াত)। অসৎ উপায়ের অর্জন নিষিদ্ধ। মধ্যপন্থাকে উত্তম পন্থা ধরা হয়, চরমপন্থা থেকে দূরে থাকতে বার বার বলা হয়েছে। সীমালংঘনকারী আল্লাহর অপছন্দের। জ্ঞান আহরণ নারী পুরুষ উভয়ের জন্য ফরজ। বিচার সবার জন্য হবে নিরপেক্ষ (সুরা নিসা ৫৯ আয়াত)। মদ, নেশাদ্রব্য, ক্ষতিকর শুকরসহ কিছু খাদ্য হারাম ঘোষিত হয়েছে। মানব জীবনের চরিত্র গঠনের প্রতিটি বিষয় এ সিলেবাসের অংশ।

ইসলাম বিরোধীদের চরম সংকীর্ণ আচার আচরণ: বাংলাদেশের জন্মলগ্নে রবীন্দ্রনাথ বেঁচে ছিলেন না, নজরুল ছিলেন। নজরুলের গান ছিল না সেটিও বলা যাবে না। রবীন্দ্রনাথের একটি প্রশ্নবিদ্ধ মূর্তি বন্দনার গান কেটে ছেটে রবীন্দ্র সংগীত জাতির ঘাড়ে চাপলো কার পাপে? যুদ্ধ করলো জাতির সন্তানেরা প্রাণ দিল মান দিল কিন্তু অর্জন পুরোটাই লুটে নিয়ে গেল ভারত, গুন্ডে চলচিত্র ম্যুভিসব যেন নব্য স্বাধীনতা শেখানোর মহরত। সত্য বলা অপরাধ, বললে আবরার হবে লাশ, বিডিআরহয় বাতিল, ফেলানীরা প্রতিনিয়ত মরছে ঝুলছে কাঁটাতারে। এ কেমন নীচতা! জাতি কি ভুলে গেছে মেজর জলিলের প্রতিবাদ প্রতিরোধ কথা! মুক্তিযুদ্ধ বাতাসে মিলিয়ে গেল, সাথে মিলিয়ে গেল পাকিস্তানের ফেলে যাওয়া অস্ত্রগুলোও লুটেরার দখলে। মুক্তিযোদ্ধা মেজর জলিল হলেন প্রথম রাজবন্দী ছলবাজের  হাতে। রাত দুপুরের ডাকাতী নয়, দিন দুপুরে ডাকাতী। ২০০ বছরের ইংরেজ কৃত সম্বিৎহারা দশা কি আজো বহাল থাকবে? যতনে আড়াল করে রাখা সব অপরাধ থরে বিথরে। পূর্ব বঙ্গের চাষার ছেলেপেলেদের পড়াশুনায় বৈরী রবীন্দ্রনাথ নিয়ে আজ পূর্ববাংলায় মাতম চলছে। বাবু গিরীশচন্দ্র ব্যানার্জী, ডঃ স্যার রাসবিহারী ঘোষ এবং কলকাতার বিশ^বিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর স্যার আশুতোষ মুখার্জীর নেতৃত্বে বাংলার এলিটগণ ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে ১৮ বার স্মারলিপির মাধ্যমে  তদানিন্তন ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ এর উপর চাপ সৃষ্টি করলেন। ডঃ স্যার রাসবিহারী ঘোষের নেতৃত্বে হিন্দু প্রতিনিধিগণ বড় লাটের কাছে যুক্তি দেখান এরা কৃষক, এটি তাদের কোন উপকার করবে না (দ্রষ্টব্য: Calcutta University Commission report. Vol. IV পৃষ্ঠা ১১৩)। সেদিন তারা সব এক ছিল হিন্দু সংবাদপত্র, হিন্দু বুদ্ধিজীবি, নেতা নেত্রীরা বিভিন্ন শহরে মিটিং মিছিলের মাধ্যমে জোটবদ্ধভাবে কাজ করে ও বৃটিশের কাছে এ প্রস্তাব রাখে (দ্রষ্টব্য: ঐ গ্রন্থ, পৃষ্ঠা ১১২, ১৫১)। ঐ সব রাজকপালীদের উদ্দেশ্যে নজরুল লিখেছিলেন, “বড় ভাব বড় কথা আসে নাকো মুখে, তোমরা লিখিও অমর কাব্য যাহারা আছো সুখে।” মুক্তিযুদ্ধ কালীন তাজউদ্দিন ও ইন্দিরা গান্ধীর মাঝে সাতদফা চুক্তি ও যুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশের সাথে ভারতের ২৫ সালা চুক্তিটি সবার মুখে ছিল গোলামী চুক্তির নামান্তর। মহৎ কাজের অপর পিঠে যদি এভাবে ছুরি চালানো হয় তবে তাকে কি বলা যায়। মানবিক না পাশবিক?

সংকটাপন্ন বাংলাদেশ: বর্তমান সময়ে বাংলাদেশে বিভাজন এমনভাবে হয়েছে কেউ কাউকে চিনতে পারছে না, ভাই ভাইকে না। এর কারণ তারা ঘুমাচ্ছে বেঘোরে, ঘুম ভাংছে না। নজরুল ময়দানে নেই কিন্তু তার কথাগুলি ইথারে ইথারে আজো শিশুকবিতার ছলে “আমি হবো সকাল বেলার পাখি” হয়ে ছন্দকথা প্রতিটি হৃদয়ে আওয়াজ তুলতে পারে। পথ হারিয়ে ফেলা, শত্রু মিত্র বুঝতে না পারা জাতি যেন পথ খুঁজে পায়। দেশ নিজের নিয়ন্ত্রণে নেই, যেন এটি দ্বিতীয় পলাশীর প্রান্তর। কোম্পানীর শাসন জেকে বসেছে জাতির কোষে কোষে। গুপ্তচরবৃত্তি ময়দানে, ভারতের তালপট্টি দখল, দু দুজন রাষ্ট্রনায়ক হত্যা, স্বাধীন বঙ্গভূমি আন্দোলন, বারে বারে কাল্পনিক মিথ্যা সংখ্যালঘু নির্যাতনের বুলি কপচানো, গারো ল্যান্ড আন্দোলন, প্রতিবেশীর টাকাতে গদি দখল ও টিকে থাকা, অতীতের মোহাজির সংঘ, দরকারে খালেদা জিয়াকে হত্যার ষড়যন্ত্র এটি নতুন নয় বরং বহুদিনের, শিক্ষাঙ্গণে সন্ত্রাস সৃষ্টি, অতীতে জন্মাষ্টমীর মিছিলে হামলা ও দুর্গাপূজা নিয়ে চক্রান্ত, পুশইন পুশব্যাক আজকের ভারতীয় অনুপ্রবেশ, বিডিআর বিদ্রোহ, সাজানো ষড়যন্ত্রে বর্ডারে সৈন্য, দেশকে অস্তিতিশীল রাখার পিছনের দৈত্যকে চিহ্নিত না করা, এসব কারণেই দেশ হাটু পানিতে ডুবছে।

সত্য মিথ্যার চলমান লড়াই: প্রতিটি সুকর্ম মানুষের জন্য মুক্তির অর্জন আর প্রতিটি মিথ্যাচার স্বার্থপরতা অপকর্ম তাদের পাপ পরিণতির নামে বন্দিত্বের জমা। বিচারক বিধাতা ইতর মেথর সবার বিচারক। সংগ্রামের সম্পাদককে ও তার পত্রিকা অফিসকে ভেঙ্গে চুরমার করা হয়েছে কারণ তিনি একজন ফাঁসিতে দেয়া মানুষকে শহীদ বলেছেন। তিনি কি মিথ্যাচার করেছেন? তিনি যদি সত্য হন তবে তার পুরস্কৃত হবার কথা কয়েকগুণ। কুরআন বলছে জেনে শুনে সত্য গোপন করো না, সুকর্মের জন্য দশগুণ জমা। আর মিথ্যাচার করলেও তার শাস্তি তিনি পাবেন। যারা তাকে হাতে কলমে শিক্ষা দিয়ে যে অনাচার করছে তারা এর জবাব কিভাবে দিবে জানি না। তারা বিচারের মুখোমুখি করতে পারতো, তা না করে তার ও তার সংস্থার উপর হামলে পড়া কি সুসভ্যতা। দেশে যে অত্যাচারের মহামেলা চলছে এরকম অত্যাচার প্রাথমিক যুগের মুসলিমদের করা হতো। কুরআন নির্দিষ্ট করে দিয়েছে যারা সৎ থেকে আল্লাহর পথে মৃত্যুবরণ করে তারা মর্যাদাশীল, মহাপুরষ্কৃত (সুরা বাক্কারাহএর ৫৪, আল ইমরানের ১৪০, ১৫৭, ১৬৯, ১৯৫ আয়াত)। সততায় চলাদের দুটি (বাঁচলে গাজি মরলে শহীদ) কল্যানমূলক পুরষ্কারের খবর দেয়া হয়েছে (সুরা তওবায় ৫২ আয়াতে), এদের জন্য শাস্তি নয় বরং শান্তি প্রতীক্ষমান। ঘটনার ধারাবাহিকায় জানা যায় ঐ কাদের মোল্লা ও মাওলানা সাঈদী বর্তমান সরকারের কপট রাজনীতির শিকার। ময়দানের দাগ চিহ্নে কিছু লুকানো নেই। ইতিহাস কোন অবিচার সয় না, শেষ বিচারে মানুষের প্রতিটি অঙ্গই সত্য প্রকাশ করবে, সাক্ষ্য দিবে। একবিংশ শতকের মানুষও সত্য লুকাতে অপারগ হচ্ছে। শেষ বিচারকের সিসিটিভির রেকর্ড কতগুণ শক্তিশালী হয়ে গোয়েন্দাগিরি করছে, সময় স্পষ্ট করবে। বিচার হবে বালি পরিমান পক্ষপাত শূণ্য ঝকঝকা ফকফকা। সংগ্রাম সম্পাদককে ধন্যবাদ দিতে ইচ্ছে করছে এ জন্য যে তার পত্রিকার অনেক ব্যতিক্রমী উদাহরণীয় সত্য প্রকাশ আমাকে মুগ্ধ করেছে। বিগত শতকে বাংলাদেশ থাকা কালীন সময়েও দেখেছি অন্য অনেকের থেকে দেশপ্রেমে ভরা এ পত্রিকার কথা ও কাজ অনেক বস্তুনিষ্ট তথ্যবহুল দেশপ্রেমের অসাধারণ দাগ রাখা উদাহরণীয় অর্জনে ভরা। মনে হচ্ছে ঐ সততার অর্জনেই তিনি ধরা খেয়েছেন। সৎ ব্যক্তির অর্জন জমা হচ্ছে বাড়ছে প্রতিনিয়ত, কারো সাধ্য নেই কমানোর মিটানোর এর উপর কলম চালানোর। সত্য সমাগত হবে মিথ্যা দূরীভূত হবে এ আশায় রইলাম।

লেখার সময় ২০ ডিসেম্বর ২০১৯।

(চলবে)

বি দ্র: এই লেখাটি নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত ‘দি রানার নিউজ’ ২৫ ডিসেম্বর ২০১৯ সংখ্যায় ছাপা হয়েছে।

নাজমা মোস্তফা

(পূর্ব প্রকাশের পর)

বাংলার সবুজ চত্বরে ইসলাম: নবীর জন্ম ৫৭০ সালে। ঐ সময়ও আরব বণিকরা এদেশে আসতো। তাদের বানিজ্য সম্ভারের সাথে ধর্মও বাংলার সবুজ মাঠে এসেছে। ইসলামের আগে ঐ দেশের পৌত্তলিক মূর্তিগুলি আজ অবদি ঘরে ঘরে পূজিত হচ্ছে যা আমার অন্য কলামে এসেছে। বাংলাদেশের লালমনিরহাট জেলার পঞ্চগ্রাম ইউনিয়নের ‘মজেদের আড়া’ গ্রামে প্রাচীন একটি মসজিদের ধ্বংসাবশেষ থেকে একটি ইট পাওয়া যায় যাতে লেখা ছিল আরবী হিজরী ৬৯ সাল (৬২২+৬৯) মানে ৬৯১ সালের প্রমাণসহ কলেমার বাণীটি খোদাই করা। রংপুর জেলার ইতিহাস গ্রন্থ থেকে জানা যায়, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মামা, মা আমেনার চাচাতো ভাই আবু ওয়াক্কাস (রা.) ৬২০ থেকে ৬২৬ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত বাংলাদেশে ইসলাম প্রচার করেন (পৃ. ১২৬)। এতে প্রমাণিত হয় নবী পরবর্তী খলিফাদের পর সাহাবীদের যুগেই বাংলার সবুজ মাটিতে ইসলামের নাড়া পড়ে যায়। এতে বুঝা যায় ইসলাম আর বাংলাদেশের নিবিড় বন্ধন প্রায় শুরু থেকেই।

কেন মুসলিমরা লেখাপড়াতে পিছিয়ে থাকলো: আমরা জেনেছি লেখা এবং পড়ার নির্দেশ ছিল ইসলামের প্রথম বাণী। ওটি কখন কেন কিভাবে রুদ্ধ হয়ে গেল, সেটিও চিন্তার বিষয়। জেনারেল শ্লীম্যান মোগল যুগের শিক্ষার উচ্চমানের প্রশংসায় বলেন, “শিক্ষাক্ষেত্রে মুসলিমরা যেভাবে এগিয়ে গেছে পৃথিবীর খুব কম সম্প্রদায়ের মাঝে সেরুপ হয়েছে। কারণ তাদের মাঝে যে ব্যক্তি কুড়ি টাকা মাইনে পায় সে তার পুত্রের জন্য প্রধানমন্ত্রীর পুত্রের সমান শিক্ষার ব্যবস্থা করতো। অক্সফোর্ড থেকে যে জ্ঞান নিয়ে যুবকরা বের হতো মুসলিম যুবকরা সাত বৎসর সে জ্ঞান আহরণ করে মাথায় শিরস্ত্রাণ পরিধান করতো। সে অনর্গল সক্রেটিস, এরিস্টটল, প্লেটো, হিপোক্রেটিস, গেলেন ও ইবনে সিনা সম্বন্ধে আলোচনা করতে পারে” (বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস ১৭৫৭-১৯৪৭, এম এ রহিম, ১১১-১১২ পৃষ্ঠা)। উইলিয়াম হান্টারও স্বীকার করেছেন মুসলিমদের শিক্ষা ব্যবস্থা ঐ যুগের সমসাময়িক সবার চেয়ে উৎকৃষ্টতর ছিল (হান্টার প্রাগুক্ত ১৭০; মল্লিক প্রাগুক্ত ১৫০)।

মুসলিমদের জন্য চরম বৈরী পরিবেশ: যে জাতি চরম বৈরী পরিবেশে লড়াই করে টিকে তারা তলোয়ার দিয়ে হুমকির জোরে অপকর্ম করে টিকে না বরং ঐক্য সততা মানবতার ব্যতিক্রমী অর্জনে টিকার সাহস রাখে। বৃটিশ পিরিয়ডে পূর্ব ও দক্ষিণ বাংলায় শিক্ষার প্রতি সরকারের সীমাহীন উদাসীনতা অনেকের লেখাতে ফুটে উঠেছে। ঐ সময় মেরুদন্ড ভেঙ্গে দেয়া মুসলিম জমিদারদের আর্থিক অসঙ্গতি শিক্ষা গ্রহণে  বাধাগ্রস্ত করে। শিক্ষা, চাকুরী, জমি বাজেয়াপ্তকরণ, চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রয়োগ এসব নানা ইস্যুতে মার খাওয়া মুসলিমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বৃটিশ গভমেন্ট এর দ্বারা বাংলার মুসলমানদের আঘাত করে (হান্টার ৫৩-৫৪পৃ:)(বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস, এম এ রহিম ৫০ পৃ:)। এ অবস্থায় জমির প্রকৃত মালিকদের থেকে ছিনিয়ে নিয়ে এক শ্রেণীর বাবুদেরে সেটি দেয়া হয় যারা ঘুষ ও অন্যান্য অবৈধ উপায়ে ধনী হয়েছে (মল্লিক, প্রাগুক্ত ৩৪)। জেমস ও কেনেলী মন্তব্য করেছেন, রাজস্ব বিভাগের সামান্য কর্মচারীদেরে জমিদারীর মালিকানা দেয়া হয় ও অর্থ সংগ্রহ করার নানান সুযোগ দেয়া হয় যাতে মুসলমরা বঞ্চিত থাকে (হান্টার ৫৪-৫৫)। ঐ সময় সকল শিক্ষক ছিল হিন্দু এবং এডাম ঐ সময়ের পাঠ্য তালিকার উল্লেখ করে বলেন, প্রতিদিন সকালে হাটু গেড়ে নত মস্তকে সরস্বতী বন্দনা আবৃতি করতে হতো। পত্রলিখা মনসামঙ্গল এসব পাঠ্যতালিকাভুক্ত ছিল (এম এ রহিম বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস ১১৬, এ আর মল্লিক ১৬৪-১৬৫)। অপরদিকে কিছু মিশনারী স্কুল স্থাপিত হলেও সেখানে খৃষ্টধর্মীয় বই বাধ্যতামূলক পাঠ্য তালিকার অংশ ছিল অবস্থাদৃষ্টে পুনরায় মুসলিমরা মূর্তিপূজা ও খৃষ্টান তৃত্ত্ববাদের শিক্ষা নিতে বাধ্য ছিল। স্বভাবতই মুসলিমরা ঐ পাঠের প্রতি আগ্রহ হারায় (ঐ গ্রন্থ ১১৮)। হিন্দু কলেজ নাম দিয়ে কলেজ স্থাপিত হয় যেখানে শুধু হিন্দুরা পড়ার সুযোগ পেতো। মিশনারিজরাও চাইতো হিন্দুরা ইংরেজী শিখুক তাহলে তারা তাদের মূর্তিপূজার অসারতা বুঝতে পারবে এবং ধর্মান্তরিত হয়ে খৃষ্টান হবে ((ঐ, আর সি মজুমদার ৩২, ৪৮)। এককথায় লেখাপড়ার পরিবেশকে সবদিক থেকেই কঠিন করে তোলা হয় একেতো আর্ধিক মেরুদন্ড ভেঙ্গে পড়া মুসলিমরা লেখাপড়ার খরচ বহন করতে অপারগ ছিল এবং বাংলা পাঠ্যপুস্তক সব দেবদেবী ও পৌরাণিক কাহিনীতে পূর্ণ ছিল (জে লং, এডামস, সেকেন্ড রিপোর্ট, ৯৭-৯৯)। এ সম্বন্ধে ই, সি, বেইলী বলেন, শিক্ষা পদ্ধতি প্রবর্তন করার সময় তাদের সংস্কার বা শিক্ষার প্রতি কোনরুপ প্রয়োজনের প্রতি সরকার বিবেচনা করে নাই। শিক্ষা ব্যবস্থা তাদের স্বার্থের পরিপন্থী ও সামাজিক রীতিনীতির প্রতিকূল হয়ে পড়ে (হান্টার ১৭৩-১৭৫, মল্লিক ২৭৪-৮, ৩২৫)। বেইলী এটি স্পষ্ট করেন যে তাদের প্রাদেশিক ভাষা ও হিন্দু শিক্ষক উভয়ই তাদের জন্য অগ্রহণযোগ্য। সর্বোপরি ধর্ম শিক্ষার কোন সুযোগ নেই। যেখানে মুসলিমরা শিক্ষার সাথে ধর্মীয় শিক্ষাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করতো (সূত্র: ঐ)। চার্লস গ্রান্ড ১৭৯২ সালে পার্লামেন্টে বলেন, ‘প্রকৃতি সম্বন্ধে সত্যিকারের জ্ঞান বিচ্যুরিত হলে হিন্দু ধর্মের ভিত্তি খসে পড়বে এবং ক্রমে খৃষ্টধর্ম সেখানে জায়গা করে নিবে” (হিস্ট্রি অব ফিডম মুভমেন্ট, ২য় খন্ড ১ম ভাঃ, ২৫২)।

মীর এহিয়া চট্টগ্রামের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য যা দান করে যান, পরে তা বাজেয়াপ্ত করা হয় এবং এ বিদ্যালয়ের অধিকাংশ ছাত্র শিক্ষক ছিল হিন্দু তথাপি এ বিদ্যালয় থেকেও দরিদ্র মুসলিম ছাত্ররা কোনরুপ আর্থিক সুবিধা পায় নাই (হান্টার ১৭৩-১৭৫, মল্লিক ২২৬-৪৩, ২৪৯-৭৪)। কলকাতায় স্কুল কলেজ স্থাপিত হয়, মুসলিমরা কম থাকার কারণে সেখানেও মুসলিমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পূর্ব ও দক্ষিণ বাংলায় সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমদের শিক্ষার প্রতি সরকার উদাসীন ছিল। ঐ সময় বাংলার মুসলিম জমিদারদের সবদিকে দূর্বল করা হয়। অপর দিকে হিন্দু জমিদারগণ যারা কলকাতায় ছিল তারা অনেকে পশ্চিম বাংলায় তাদের সম্প্রদায়ের জন্য স্কুল স্থাপন করেন। ঠাকুর পরিবার ও আরো অনেক হিন্দু জমিদারের পূর্ব বাংলায় জমিদারী ছিল তারা কলকাতা ও পশ্চিমবঙ্গে বাস করতেন এবং সেখানে স্কুল স্থাপন করলেও পূর্ব বাংলায় কোন স্কুল স্থাপন করেন নাই। এখান থেকে লাভে মূলে কঠিন নির্যাতন করেও (কখনো বছরে দুইবার) খাজনার নামে উপসত্ত্ব তুলে নিয়েছেন। তারা অনেকেই পূর্ব বাংলার কৃষক সন্তানদের শিক্ষার বিরোধী ছিলেন। এর কারণ তারা মনে করতেন প্রজারা শিক্ষিত হলে জমিদারীতে তাদের কর্তৃত্ব দুর্বল হয়ে পড়বে (হান্টার ১৭৩-১৭৫, মল্লিক ২২৬-৪৩, ২৪৯-৭৪)। 

বৃটিশ পূর্ব ভারতবর্ষে মাদ্রাসা শিক্ষা খুব উন্নত মানের ছিল। হিন্দু শিক্ষক অপেক্ষা মুসলিম শিক্ষকরা অধিক যোগ্য ছিলেন। এডাম মন্তব্য করেন, “যদি বাঘা, বোহার, চাঙ্গারিয়া, ও মুর্শিদাবাদের মাদ্রাসাগুলি ভালভাবে পরিচালিত হতো তাহলে তারা উচ্চমানের শিক্ষাকেন্দ্রে উন্নীত হতো” ( জে  লেং, ১১-১৬, ৪৮-৭৩, ২১৫-৩২৭)। হিন্দুদের পরিচালিত স্কুলে মুসলিমদের পড়ার কোন সুযোগ ছিল না। তাছাড়া সরকার মুসলিমদের প্রতি উদাসীন। কোম্পানীর শাসকগণ নিষ্কর জমি বাজেয়াপ্ত করে। মুসলিম প্রতিষ্ঠানগুলির দান সম্পত্তি তারা অন্য কাজে লাগায়। এডাম সরকারের এ কাজের সমালোচনা করে বলেন, সরকার যদি এ দানের সম্পত্তিগুলি তাদের আসল উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতো তবে মুসলিমরা একটু হলেও উপকৃত হতো (মল্লিক ১৬৪, ২৯১-৯২, জে লং ২১৭)। ১৮০৬ সালে হাজি মুহম্মদ মহসিন ওয়াকফ সম্পত্তি মুসলিম ছাত্রদের জন্য দান করে যান কিন্তু তারা সেটি না করে ভিন্নভাবে ব্যবহার করে (মল্লিক, তৃতীয় অধ্যায় দ্রষ্টব্য)।

কেন হিন্দু বৃটিশ একতরফা মুসলিম বিরোধী হয়ে উঠলো, এর উত্তরও সোজা। বৃটিশদের ভয়ের কারণ মুসলিমদের আদর্শগত অবস্থান,  হিন্দুদের পথহারা করতে রসদ জুগিয়েছে বর্ণ হিন্দু নামের খুব অল্প সংখ্যক সুবিধাভোগী ব্রাক্ষ্মণ, যারা মূলত বাকী সব মানুষকেই সাধারণ হিন্দুকেও অমানুষ মনে করতো। নিজ জাতির বাকীদেরে তারা নিচবর্ণ চিহ্নিত করে স্বরচিত বিধানে নিজেকে দেবতার আশির্বাদ পাওয়া বলে প্রচার চালাতো। তবে এটি ঠিক পরবর্তীতে অতি চর্চাতে তারা সেটি বাকী হিন্দুদের মাঝেও ছড়িয়ে দিতে পেরেছে। এ মিথ্যাচারিতা কুসংস্কারাচ্ছন্ন হিন্দুদের অনেক ক্ষেত্রেই মুসলিম বিরোধী করতে পেরেছে। যতদূর ঘেটেছি মুসলিমদের উদারতা ও মানবতার পরিচর্চার কারণেই বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতা জিরো অবস্থানে। যা আছে তা হিন্দুরাও স্বীকার করবে তা মিথ্যাচারের নামান্তর। শাস্ত্র সাধারণ হিন্দুর ধরা ছোঁয়ার বাইরে। এ সুযোগে স্বরচিত বিধানে তারা ধর্মের নামে হিংসার চর্চা যোগ করেছে, সাধারণ হিন্দুরা হয়েছে শুদ্র অচ্ছুৎ আর মুসলিমরা হয়েছে ম্লেচ্ছ যবন অচ্ছুৎ, বৌদ্ধরা হয়েছে নেড়ে। এদের ধরো, মারো, কাটো। বিশেষ করে মুসলিমকে, কাটাকাটির কাজটিও সেরেছে শুদ্র অচ্ছুৎ দিয়ে। কারণ তার চিন্তাশক্তির দৈন্যতায় সে নিজেই অস্তিত্বহীন মেরুদন্ডহীন। সে জেনেছে এটি করলে ধর্ম পালন হবে, হয়তো পাপী জীবনে কিছু জমবে। যদি তাদের বিবেক স্বচ্ছ থাকতো, কড়া পাহারায় থাকতো তবে এসব অনাচার হতো না। যে সাধুরা মিথ্যাচারে তা দিয়েছে সাধারণ হিন্দুরা ওদেরে বিশ^াস করেছে। এভাবে “স্বধর্মে নিধনং শ্রেয় পরধর্ম ভয়াবহ” কথাটি মানুষকে মূল সত্য থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে। যার জন্য মানুষ ক্রমেই ভাংছে মরছে মারছে ছোট থেকে ছোট হচ্ছে। এতো গেল ভারতবর্ষের মুসলিম দুর্গতির কারণ।

ধর্ম ও ইতিহাস বলে কিছু ক্ষেত্রে হিন্দু মুসলিম দুই জাতি একতার সুরে এক হয়েছে। পূজার উপকরণ হিসাবে ফুল, বেলপাতা, চন্দন, ধুপ ধোনা, মোমবাতি, মাদুলী, তাবিজ কবজ, ঝাড় ফুক, তুক তাক, তন্ত্র মন্ত্র ভুত প্রেত দেও দানব মূলত এসব হিন্দু সমাজের আচার। দুনিয়া থেকে এসব মিটিয়ে দিতেই নবীদের আগমণ এ পৃথিবীতে। নিরাকারের আদেশকে দূরে ঠেলে দিয়ে যুক্তিহীন ভাবে কাঠের মাটির মূর্তি পূজকরা জায়গা করে নেয়।  প্রতিটি ধর্মে আজো খুঁজলে প্রকৃত সত্য পাওয়া যায় যেখানে এসব কাজ নিষিদ্ধ। তারপরও তারা শাস্ত্র বিরোধী কাজ করছে। তুলনামূলক ধর্মের গবেষনায় এসব স্পষ্ট করা। ওদিকে ইত্যবসরে যারা ধর্মান্তরিত হয়ে এসেছে অনেকেই পূর্ববর্তী মিথ্যাকে কুসংস্কারের আকারে এখানেও নিয়ে এসে পালন করে। ইত্যবসরে মাজার পূজার আকারে মূর্তিপূজার ভিত্তি দাঁড়িয়ে যায়। মহাআনন্দে উভয় সমাজের লোকরা সেখানে বাতি ধুপ দিতে যায়, উভয়েই এক পাপে ধরা খায়। কুরআনে এ উভয় সম্প্রদায়কে বলা হয় মোশরেক। মুসলিমদের অন্য আর একদল লোক আছে যারা আল্লাহকে কাজে ও কথায় মানে বললেও উল্টো পথে চলে, তাদের আচরণ তাদের পরিচিতি স্পষ্ট করে। সে অনায়াসে নীতিবিরোধী অপকর্ম করে, মনে হয় সে কাউকে পরোয়া করে না এরা হচ্ছে মোনাফেক। তাছাড়া যে মুসলিমরা কথায় ও কাজে সৎকাজ করে সৎ পথে চলে তারা প্রধানত মুমিন, প্রকৃত ইসলাম অনুসারী। একজন মোনাফিক মুশরিক হিন্দুর মন্দির ভাংতে পারে কিন্তু একজন মুমিন কখনোই সেটি করতে পারে না এবং করলে সে তার পদ হারাবে। এটি তার সারা জীবনের একমাত্র অর্জন। সে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত ঐ পথের সাধনায় সময় পার করে, শিশুকাল থেকে সততার মানবতার ট্রেনিং পায় ও নেয়। যারা এটি নিতে চাইলেও ভুল পথে হাটে  তারা অনেক সময় পথ হারায়। উদাহরণ হিসাবে তসলিমা নাসরিন, হুমায়ুন আজাদের কথা বলতে পারি। এরা শিশুকাল থেকে বিকৃত ইসলাম দ্বারা লালিত হয়ে বিভ্রান্ত হয়েছেন, তাবিজ কবজ, ঝাড় ফুক, তুক তাক, তন্ত্র মন্ত্র দ্বারা সত্য ও মিথ্যাকে গুলিয়ে ফেলেছেন।

ইতিহাসে প্রমাণ পাওয়া যায় কিছু খৃষ্টান ইহুদী, গ্রীক, পার্সিক ধর্মান্তরিত মুসলিম হয়ে পূর্ববর্তী অনেক মিথ্যা আচারকে এখানে নিয়ে আসেন। এদের একজন ইতিহাসখ্যাত মনছুর হাল্লাজ (‘মোস্তফা চরিত’ মোহাস্মদ আকরম খাঁ, পৃষ্ঠা ৭৪)। খলিফাদের যুগে এসবের সুযোগ ছিল না। ইবনে মাজা ইবনে ওমর হতে নবীর কঠোর সাবধান বানী উচ্চারণ করেন যে, আখেরী জামানায় মুসলিমরা ঐসবে ডুবে ধ্বংস হতে থাকবে (তাবরানী)। খলিফাদের যুগে এসবের সুযোগ ছিল না কিন্তু পরবর্তী যুগে এমন কি বর্তমান যুগে এর উপর মহামারী চলছে। সত্যসাধকদের সাথে সচেতন হিসাবে বলবো অন্ধবিশ^াস জ্ঞান নয়, কুসংস্কার ভক্তি নয়, যুক্তিহীন কাজ এবাদত নয়। ধর্ম যদি মানুষকে পরিশুদ্ধ না করে পথহারা করে, সেটি ধর্ম নয়।  

(চলবে)

বি দ্র: লেখাটি নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত  “দি রানার নিউজ” ২০ ডিসেম্বর ২০১৯ সংখ্যায় ছাপে।

 

নাজমা মোস্তফা

(পূর্ব প্রকাশের পর) (৩)

ইতিহাস বলে ভারতের বাহির থেকে আগত আর্যরা ককেসাস পর্বত পার হয়ে মেসোপটেমিয়া ও এশিয়া মাইন থেকে আর্যদের আগমন। কেউ কেউ মধ্য এশিয়ার বদলে পূর্ব ইউরোপকে আর্যদের আদিবাস কেন্দ্র বলেন (সূত্র: বিনয় ঘোষ, ভারতজনের ইতিহাস, পৃষ্ঠা ৭০)। সিন্ধু নদীর অববাহিকায় যে সভ্যতার বিকাশ ঘটে তাই সিন্ধু সভ্যতা। হিন্দু কোন ধর্মের নাম নয় বরং সভ্যতার নাম। ভারতের আদিবাসী দ্রাবিড়। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় দেখা গেছে ইসলাম ও মুসলিমদের বিষয়ে অতীতেও নানা বই পুস্তক প্রবন্ধ নাটক চলচিত্র সংবাদপত্র প্রচার মাধ্যম রেডিও টিভির মাধ্যমে ভুল ম্যাসেজ ছড়ানো হয়েছে। কৌশলে দেখানো হয়েছে ভারতীয় মুসলিমরা বিদেশী, এরা মিত্র নয় বরং শত্রু আর বাকী সবাই স্বদেশী। ভারতীয় মুসলিমদের রচিত ইতিহাস ও বাস্তবতাকে খোদ রবীন্দ্রনাথ বলেছেন বিদেশী মুসলমান রচিত এসব মিথ্যা ইতিহাস (সূত্র: লেখক আবু ফাতেমা মোহাম্মদ ইসহাক)। এই দেশী বিদেশী মারপ্যাচে ভারতের জনতাকে পথহারা করতে প্রচার মাধ্যম, ইতিহাস সংবাদ, সাহিত্য, লেমটন লেকচার, এসব মাধ্যমকে হাতিয়ার হিসাবে নেয়া হয়। সং¯ৃ‹তিবানরা বৃটিশ তোষণে কার্পণ্যতা দেখান নি। যারা ভারতের সম্পদ লুটে নিয়ে অন্যত্র নিজেদের দেশকে সমৃদ্ধ করে তারা বরণীয় পূজনীয় হয় আর যারা নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়ে ভারতের মাটিতে নিজের ও প্রজন্মের একমাত্র ঠিকানা গড়ে সত্য প্রতিষ্ঠায়; সকল প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে সত্য ও সুন্দরের জন্য আল্লাহর আদেশ মেনে লড়ে যায় তারাই বিদেশী, ভারতে মোদিরা আজো ভাবে তাই। তারা মুসলিমদের ধ্বংস চায়। বাকী সব আর্যদের (?) জন্য দরজা খোলা, শুধু মুসলিমদের জন্য তালা ঝোলা। সেই বৃটিশ নির্গমনের পর থেকে আজো ভারত মুসলিমদের সাথে একতরফা বিমাতাসুলভ আচরণে তারা দক্ষ। এরাই একমাত্র সংখ্যালঘু দল যাদের অবদানে অর্জনে ঋণে ভারত আকন্ঠ নিমজ্জিত। মানবিকতা মাপার স্কেল তাদের অনেক ক্ষেত্রেই বিলুপ্ত। অকৃতজ্ঞতা একটি নিকৃষ্ট আচরণ, বিধাতার দৃষ্টিতে এটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সাম্প্রতিক ও নিকট অতীতে ভারতের মুসলিমরা আজো পরাধীন, বলাটা ভুল নয়। 

মিথ্যা অপশক্তিকে চিহ্নিত করে যদি সত্য স্পষ্ট হয়, সেটি কি সত্যের অপরাধ? ন্যায়ের ঝান্ডা হাতে মিথ্যার বিনাশে এই মুসলিমরা নিজের জীবনের সাথে ভারতের জীবনকে একসূত্রে গেঁথেছেন বলেই তারা ৭০০ বছরেরও বেশী এ দেশ শাসন করে তারাই সত্য সৈনিক, পথের দিশারী, স্বাধীনতার স্বপক্ষ শক্তি, স্বদেশী। বাকীরা বেশ বড়মাপে শোষক, নির্যাতনকারী সত্যবিনাশি মিথ্যার প্রতিষ্ঠাকারী। মূল সত্য শক্তিকে হটিয়ে দিতে বাকীরা কি করেছেন ইতিহাস দিয়ে সেটি পরখ করেন। ইতিহাসবিদ আমীর আলী বলেন, “মুসলমানগণ ইংরেজী শিক্ষার প্রয়োজন উপলব্ধি করার আগেই সরকারী অফিসের দ্বার তাদের জন্য রুদ্ধ হয়। (এস, এ রশিদ, ন্যাশনাল মহামেডান এসোসিয়েশন, ১৭-১৯)। ১৮৬৯ সালে ‘দূরবীণ’ নামের কলকাতার একটি ফার্সি সংবাদপত্র লিখে, “ছোটবড় সকল সরকারী পদ মুসলিমদের থেকে কাড়িয়া নেয়া হয় এবং অন্য সম্প্রদায়কে বিশেষ করে হিন্দুদেরে দেয়া হয়।” এ পত্রিকা আরো প্রকাশ করে সুন্দরবনের কমিশনার তার অফিসে শুধু হিন্দু প্রার্থীর দরখাস্ত আহবান করেন (হান্টার, প্রাগুক্ত, ১৫৯-১৬৭)। হান্টারের মন্তব্য ছিল, চাকরি ক্ষেত্রে মুসলিমদেরে এমনভাবে বাদ দেয়া হয় যে, কলকাতার অফিসগুলোতে চাপরাশি, কলম মেরামতকারী, এসব ব্যতীত অন্য কোন কাজে মুসলিমরা নেই বললেই চলে (সূত্র: ঐ)। ১৮৭১ সালে কলকাতার একটি বড় অফিসে খোঁজ নিলে জানা যায় সেখানে মুসলিমদের ভাষা পড়তে পারে এমন একজন লোকও নেই (এম এ রশিদ ২০-২৩)। আমীর আলী বলেন, গত বিশ বছর যাবত মুসলিমরা আগ্রাণ চেষ্টা করেও চাকরীতে দ্বার রুদ্ধ করে রাখায় তারা ঢুকতে পারে না। যদি কেউ সৌভাগ্যক্রমে ঢুকে তবে তা রক্ষা করাই তার জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ তাকে তাড়াবার জন্য অফিসে ষড়যন্ত্র চলতে থাকে (এম এ রশিদ ২৫-২৬)। ভাবতে অবাক লাগে সে মাটিতে আম জনতার মাঝেও বিবেক সম্পন্ন হিন্দুর উপস্থিতি কম; কোন বিশেষ কারণে মানবিক হিন্দুর সংখ্যা সবদিন অল্প। এটি সবাই স্বীকার করবেন তাদের এ প্রকৃতি আঁচ করতে পারে চতুর বৃটিশরা। তাই তারা হয় বৃটিশের দেশবিধ্বংসী সহযোগী। দেশ মাতৃকার সাথে প্রতারণায় তারা বড় মাপে ধরা খায়।

এরকম অবস্থায় একবার মুসলিমরা চাকরীর দাবী জানালে রবীন্দ্রনাথের জবাব ছিল “প্রভুর খানার টেবিলের নীচে নিক্ষিপ্ত খাদ্য টুকরার জন্য যে কোলাহল উত্থিত হইয়াছে, ইহা সমর্থণ করায় শুধু যে নীচতা আছে তাহা নয়, উহা চারিত্রিক দৌর্বল্যেরও পরিচায়ক (কবির ভাষণ থেকে, ১৯৩৭ সালের ‘মাসিক মোহাম্মদ’ থেকে উদ্ধৃত)। পাঠক লক্ষ্য করেন রবীন্দ্রনাথ বৃটিশকে প্রভু মানলেও মুসলিমদেরে কুকুরের মত নীচ পশু প্রজাতির বলে অপমান করেছেন তার ভাষণে এবং সেই কুকুর স্বভাবের মানুষগুলোর চারিত্রিক দুর্বলতাও প্রশ্নবিদ্ধ পরিচয় বলে প্রকাশ করেছেন। একদিনের চেতন সম্পন্ন মুসলিম জাতির ক্রমাগত চেতনহীন অবস্থানের জন্য এসব স্পষ্ট করা দরকার, সময়ের দাবী। হিন্দুরা সমষ্টিগতভাবে বৃটিশের ঐ হিংসা পরায়নতাকে বগলদাবা করে নিয়েছে। কারণ বৃটিশরা এটি বুঝতে পেরেছে যে মেরুদন্ড বাঁকা হিন্দুরা তাদের সহযোগী, এদের হাত দিয়ে কোন বিপর্যয় ঘটবে না বরং এই স্বাধীনচেতা মুসলিমরাই তাদের জন্য অশনিসংকেত। উভয় সম্প্রদায়কে বিচ্ছিন্ন করতে ডিভাইড এন্ড রুলসহ বাকী সব অস্ত্র সচল রেখেছে। এসব কারণে হিন্দুরা আগাগোড়া বৃটিশের অনুগত থেকেছে, তারা নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে নির্যাতীত হয়েও পরাধীনতার শিকল গলে পরে দলিত হয়ে থেকেছে। মূলত বর্ণ হিন্দুরা কলে কৌশলে সাহিত্য রাজনীতি ও ক্ষমতায়নে কপটতার স্বাক্ষর রেখেছে। এদের কারণেই এদেশে বৃটিশ শাসন প্রায় ২০০ বছর বিলম্বিত হয়। এজন্যই হাজার হাজার মুসলিম সত্য সৈনিকরা ফাঁসিতে ঝুলে ইহ ও পরকাল দুই জাহানে বিরাট অর্জন জমা করে দেশপ্রেমের অসাধারণ অর্জন জমা করতে পেরেছেন।

প্রায়ই মানুষকে ইসলাম নিয়ে কটাক্ষ করতে শুনি, ইসলাম নাকি জীবনে কোন কিছুই করে নাই, তলোয়ারবাজি সন্ত্রাসী ছাড়া। ছলবাজরা স্বীকার না করলেও যুগের প্রকৃত মনীষারা সত্য প্রকাশ করে গেছেন। “আরবের ভিতর দিয়েই মানুষ জগতে তার আলো ও শক্তি সঞ্চয় করেছে, —– ল্যাটিন জাতি দিয়ে নয়” বলেছেন মিঃ জি সি ওয়েলস। এভাবে পৃথিবীর এক প্রাপ্ত থেকে অন্যপ্রান্ত সত্যের আলোতে বিকশিত হয়েছে। অপকর্ম করতে নয় নিজের নিরাপত্তার জন্য তলোয়ারের প্রয়োজন অস্বীকার করার নয়। তবে মোদির ভারতের মত নির্দোষের উপর তলোয়ারবাজি ইসলাম সমর্থণ করে না। অপকর্মে ঢেকে রাখা সত্য বিবেককে জাগ্রত করতে কিছু সত্য প্রকাশ করতেই হয়। একজন নির্দোষ মানুষ হত্যাকে কুরআনে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যেন গোটা মানব সম্প্রদায়ের হত্যার সমান অপরাধ (সুরা মায়েদার ৩২ আয়াত দ্রষ্টব্য)। শত মিথ্যার জবাব হিসাবে এ তথ্যবহুল গ্রন্থটি একটি অনবদ্য প্রমাণ। “1001Inventions – The enduring Legacy of Muslim Civilization by Salim T.S.Al-Hassani, Chief Editor (national Geographic)”। বিজ্ঞানের প্রায় প্রতিটি বিভাগই আলোকিত করেছে মুসলিমরা। এখানে ১০০১টি আবিষ্কারের কথা উল্লেখিত হয়েছে।

তন্ত্রমন্ত্র নয়, গবেষনা দিয়ে অতীত ইতিহাস বিচরণ করে প্রথম বাণীর অনুসরণে পড়েন লিখেন সন্ধান করেন, নিশ্চিত প্রকৃত সত্য ধরা পড়বে। রসায়ন, ওষুধ বিজ্ঞান, ভূগোল, কম্পাস, মানচিত্র, সমুদ্র বিদ্যা, যুদ্ধ কৌশল সর্বত্রই মুসলিমদের জয়জয়াকার। একটি কলামে এত কথা স্পষ্ট করা প্রায় অসম্ভব। তবুও আমার ক্ষুদ্র প্রচেষ্টাকে পাঠকেরা গবেষনার সামান্য উপাত্ত সূত্র মনে করতে পারেন। ২৭৫টি গবেষনা পুস্তক রচয়িতা একজন আল কিন্দি, ৮৬০ সনে মুসলিম বিজ্ঞানীরা একশত রকমের যন্ত্র তৈরীর নিয়ম ও ব্যবহার নিয়ে গ্রন্থ তৈরী করেছেন। ৬০ জন মুসলিম ভূগোলবিদ পৃথিবীর প্রথম মানচিত্র অংকন করেন। কম্পাস, কাঁচ, লবন, পারদ, গন্ধক, আর্সেনিক আবিষ্কারও তাদের কাজ। অনেকেই জানেন গণিত বিশারদ ওমর খৈয়াম, নাসিরুদ্দিন তুসি, আবু সিনাদের মত অসংখ্যরা বহু বহু অর্জনে ময়দান আলোকিত করে রেখেছেন। হাজ্জাজ ইবনে মাসার ও হুনায়ুন ইবনে ইসহাক মানমন্দিরের প্রথম আবিষ্কারক পৃথিবীর প্রথম মানমন্দিরও মুসলিমদের হাতে ৭২৮ খৃ:, দ্বিতীয়টি ৮৩০ খৃ: জন্দেশপুরে, তৃতীয়টি বাগদাদে চতুর্থটি দামেস্কে (চেপে রাখা ইতিহাস, গোলাম আহমাদ মর্তোজা, পৃষ্ঠা ২২)। দেখা যায় নবী গত হওয়ার ১০০ বছর পূর্তির আগেই এমন অসাধারণ অর্জন জমা শুরু হয়ে যায়। স্বভাবতই জানতে চাইবেন এটি কেন কিভাবে হয়? কুরআনের প্রথম শব্দ যেটি নাজেল হয় সেটি ছিল “পড় এবং কলমের সাথে”। তার মানে পড়া ও লেখাই ছিল আল্লাহর প্রথম নির্দেশ। তাই মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে শুরু হয় গ্রন্থ রচনা করা, গ্রন্থাগার গড়া, মসজিদই ছিল প্রথম শিক্ষাকেন্দ্র, সাথে ধর্ম গড়ে দেয় পরিবারিক শৃংখলা। অতপর শুরু হয় মাদ্রাসা, মহাবিদ্যালয়, বিশ^বিদ্যালয় স্থাপন। সেদিনের মুসলিম মেয়েরা এমন কি তৎকালীন দাসীরাও অনেক বিদুষী সম্মানিতা ছিলেন কারণ তারা কবর থেকে উদ্ধারপ্রাপ্তা মুক্ত স্বাধীন জনতার অংশ। অল্প কথায় বিজ্ঞানের বিকাশের শুরুটা মুসলিমদের হাতে, আর এ বিজয়ের মূল কারণ অলৌকিক গ্রন্থ কুরআন ও তার পথনির্দেশ মানা দক্ষ মুসলিমদের আত্মায় অন্তরে ঐ সত্যকে গ্রহণ বরণ ও পালন। স্বভাবতই প্রশ্ন আসবে আজ মুসলিমদের কি হলো, প্রশ্নটি জমা রাখুন আমরা আসবো সেখানে আমাদের ব্যর্থতা আমাদের খুঁজতেই হবে। আমরা খুঁজবো। মনের মাঝে শুধু একটি আশা পুতে রাখুন আমরাই হবো আ’লা যদি আমরা সত্যবিমুখ না হই।

“শার্লেমেন ও তার লর্ডরা যখন নাম দস্তখত করতে শিখছিলেন, তখন আরব পন্ডিতেরা আরাস্তুর (এরিস্টটল) এর গ্রন্থ অধ্যয়নে ব্যস্ত ছিলেন। কর্ডোভার বিজ্ঞানীরা সতেরোটি বিরাট লাইব্রেরী নিয়ে গবেষণা করতেন। তার একটি লাইব্রেরীর বইএর সংখ্যা ছিল ৪ লক্ষ। সে পন্ডিতেরা যখন পরম আরামদায়ক গোসলখানা ব্যবহার করতেন তখন অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে শরীর ধোয়াকে এক ভয়ংকর অনাচার বলে বিবেচনা করা হতো। “আরব জাতির কাহিনী আমাদের কাছ এত গুরুত্বপূর্ণ এর কারণ, এর মূলে আছে এমন এক মহান ধর্ম প্রবর্তকের সাধনার কথা যিনি নিরাকারের উপাসনায় পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ  তিনজন ধর্ম সাধকদের মাঝে তৃতীয় ও আধুনিকতম অবস্থানে এবং তাঁর ধর্ম ইহুদী ও খৃষ্টানের সাথে সম্পৃক্ত” (আরব জাতির ইতিকথা, পৃষ্ঠা ৪, ফিলিপ কে হিট্টি, অনুবাদে অধ্যক্ষ ইব্রাহিম খাঁ)।

মুসলমানদের প্রত্যক্ষ প্রভাবেই ইউরোপে সরকারী গোসলখানা প্রবর্তিত হয় (ঐ ২১৬ পৃ:)।  ইসলামের বিজয় কতকটা ছিল একটি ভাষার বিজয় – একটি গ্রন্থের ভাষার বিজয় । কবিতা প্রিয়তাই ছিল বেদুইনদের একমাত্র সাংস্কৃতিক সম্পদ। সেদিনে কবিরাই ছিলেন মরু সমাজের প্রেস এজেন্ট ও সাংবাদিক (ঐ, ২৩ পৃ:)। — কবিতা আরবের পাবলিক রেজিষ্টার (ঐ, ২৪ পৃ:)—ঐ আমলে আরবে কুরআনই প্রথম গদ্যগ্রন্থ ছিল এবং আজো আদর্শ গদ্যগ্রন্থের আসনে প্রতিষ্ঠিত রয়েছে (৪১ পৃ:)। নামাজের ময়দানই ইসলামের প্রথম ড্রিলের ময়দান (৪৫পৃ:)— কুরআনই আল্লাহর শেষ প্রত্যাদেশ, সমস্ত মোজেজার মধ্যে কুরআন শ্রেষ্ঠতম মোজেজা (৪৩ পৃ:)” (ঐ)। চিকিৎসা বিজ্ঞানের একজন আধুনিক ফরাসী ঐতিহাসিক বলেন, হুনাইন নবম শতাব্দীর শ্রেষ্ঠতম মানুষ ছিলেন। তিনি ছিলেন সুদক্ষ অনুবাদকও। শাসক আল মামুন তার অনুদিত গ্রন্থ ওজন করে তাকে সেই পরিমাণ সোনা দিতেন। দুটি বস্তু চিকিৎসক হুনাইনকে কাজে উৎসাহ দিত। প্রথমতঃ ধর্ম, তাই শত্রুরও উপকার করা উচিত বলে মানতেন। দ্বিতীয়তঃ বন্ধুর জন্য তো আরো বেশী করা কর্তব্য মনে করতেন (ঐ গ্রন্থ ১১০/১১১ পৃ:)। মিঃ গীবন বলেছেন, আরবরা বিধর্মীদের গ্রন্থাদি বিনষ্ট করা পছন্দ করতেন না। তাদের ধর্মীয় নীতি এটি সমর্থণ করে না। (দ্র: গ্রন্থাগারের ইতিহাস মধ্যযুগ, শামসুল হক, ৩২ পৃষ্ঠা)। সর্বাপেক্ষা বিশুদ্ধ বক্তার মুখ ও মস্তিষ্ক নিঃসৃত বাণী লিখে সংগ্রহ করেছিলেন আবু আমর ইবনুল আ’লা যা একটি ঘরের ছাদ পর্যন্ত ঠেকে গিয়েছিল (এনসাইক্লোপেডিয়া অব ইসলাম ভল্যুয়ম ১, পৃ: ১২৭)। 

প্রথম ইসলাম গ্রহণকারী যুবক বালক পরিণত বয়সে চতুর্থ খলিফা হযরত আলী (রা:) প্রশাসন, বিদ্রোহ দমনে খুবই ব্যস্ত সময় পার করেছেন। এরপরও তার আমলে কুফার জামে মসজিদ জ্ঞানকেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। দেশ বিদেশের ছাত্ররা জ্ঞানার্জনের জন্য ছুটে যেতেন। আলী স্বয়ং ছিলেন অধ্যক্ষ (সূত্র: মুজীবুর রহমানের লেখা ‘হযরত আলী পুস্তকের ৩৬০ পৃ:, ছাপা ১৯৬৮)। উমাইয়া আমলে রাজতন্ত্রের নামে অপশক্তি ঢুকলেও ইসলামের জ্ঞানলব্ধ কাজ থেমে থাকে নাই। এ আমলেই ব্যাকরণ, ইতিহাস, স্থাপত্য বিদ্যার কাজ এগিয়ে চলে। উমাইয়া আমল হচ্ছে উন্নতির যুগ ‘ডিমে তা দেয়ার যুগ’ (সূত্র: হিস্ট্রি অব দ্যা আরবস, ২৪০ পৃ:)। যদিও রাজতন্ত্রের এ পরিণতি পরবর্তিতে সুখকর হয়নি। নবীর গঠনতন্ত্র বিরোধী এ খাদ ইসলামকে সার্বিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

খলিফা মামুনের বিরাট গ্রন্থাগারের লাইব্রেরিয়ান ছিলেন মুহাম্মদ ইবনে মুসা আল খাওয়ারিজমী, প্রথম বিজগণিতের জন্মদাতা, শ্রেষ্ঠ গণিতজ্ঞ। পড়া লেখা ও পর্যটনে তিনি দক্ষতার সাথে কুরআনকে অনুসরণ করেছেন। কিতাবুল হিন্দ নামের গ্রন্থে তিনি শূণ্যের অপরিসীম মূল্য তোলে ধরেন, এই শূণ্যের জন্মদাতাও তিনি। খলিফার অনুরোধে তিনি আকাশের মানচিত্র আঁকেন, পঞ্জিকার জন্ম দেন। সরকার উপাধি দেয় ‘সাহিব আলজিজ’ নামে (সূত্র: সমরেন্দ্রনাথ সেনের লেখা বিজ্ঞানের ইতিহাস, ২য় খন্ড, পৃ: ১২৬, ১৩৬৪) ও (‘চেপে রাখা ইতিহাস’ গোলাম আহমাদ মর্তোজা)।

১৩২৭ সালে একজন দূর ভ্রমণকারী বাগদাদে আসেন আর তিনি দেখতে পান যে, শহরের পশ্চিম অংশের তেরটি বাড়ীর প্রতিটিতে দুই হতে তিনটি ব্যাপকভাবে সজ্জিত গোসলখানা আছে। এবং প্রত্যেক গোসলখানায় গরম ও ঠান্ডা পানির ব্যবস্থা আছে। (১১৭ পৃষ্ঠা, আরব জাতির ইতিকথা গ্রন্থ)। নবী বলতেন বিজ্ঞানের দুই শাখা ধর্ম শাস্ত্র ও চিকিৎসা শাস্ত্র। তারাই প্রথম ঔষধ বিক্রেতার দোকান স্থাপন করে। প্রথম ফার্মাকোপিয়ার মূল তারাই। খলীফা আল মামুনের আমলেই ফার্মেসীওয়ালাদের (ঔষধ মিশ্রণকারী) একটি পরীক্ষা পাস করতে হতো। চিকিৎসককেও পরীক্ষা দিতে হতো। একটি অনাচার ধরা পড়ায় ৯৩১ সালে একজন সুবিখ্যাত চিকিৎসককে খলিফা হুকুম দেন যে, উক্ত চিকিৎসক বাকী সমস্ত চিকিৎসককে পরীক্ষা করবেন এবং কেবল উপযুক্ত ব্যক্তিদেরই সনদ দেবেন। ঐ সময় বাগদাদে ৮৬০ জনের উপর চিকিৎসক এ পরীক্ষায় পাশ করেন। এভাবে রাজধানী হাতুড়ে ডাক্তারদের হাত থেকে বেঁচে যায়। চিকিৎসকরা রোজ জেলখানাও পরিদর্শন করতেন। জনতার স্বাস্থ্যরক্ষায় এমন ব্যবস্থা ঐ সময় জগতে আর কোথাও ছিল না। নবম শতাব্দীর শুরুতে হারুনুর রশিদ পারস্যের আদেশে মুসলিম জগতে প্রথম হাসপাতাল হয়। এর অল্প দিনের মাঝে মুসলিম দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ৩৪টি হাসপাতাল গড়ে উঠে। মুসলিম হাসপাতালে নারীদের জন্য আলাদা বিভাগ ও ডিসপেনসারী থাকতো। কোন কোন হাসপাতালে থাকতো ডাক্তারী বইএর লাইব্রেরী ও চিকিৎসা শিক্ষাদানের সুযোগ (ঐ গ্রন্থ ১৩২/১৩৩ পৃষ্ঠা)।

আল রাজী (৮৬৫-৯১৫ সালে) কেবল মুসলিম জগতে নয়, সমস্ত মধ্যযুগের একজন মৌলিক চিন্তাবিদ, ও শ্রেষ্ঠ চিকিৎসাবিদদের অন্যতম ছিলেন। কথিত আছে হাসপাতালের স্থান নির্ধারণ করতে তিনি বিভিন্ন স্থানে মাংসের টুকরো টাঙ্গিয়ে রাখতেন। যে টুকরোতে কম পচন ধরতো সেখানে তিনি চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপন করার নির্দেশ দিতেন। সার্জারিতে তাকেই সিটনের আবিস্কারকর্তা বলা হতো। আরব চিকিৎসা শাস্ত্রে আল রাজীর পরেই ইবনে সীনার ক্যানন গ্রন্থ বিশ^কোষসম সে যুগের চিকিৎসা শাস্ত্রের শীর্ষে অবস্থান করতো এবং ইউরোপে পাঠ্য পুস্তক হয়ে  ছিল। এভাবে ইসলামই ইউরোপকে আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গির দিকে নিয়ে যায় দ্বাদশ থেকে সপ্তদশ শতাব্দী পর্যন্ত। পাশ্চাত্য জগতের চিকিৎসা বিজ্ঞানে এ গ্রন্থই পথ প্রদর্শক হিসাবে ছিল। ডাক্তার উইলিয়াম ওসলারের ভাষায়, “এ গ্রন্থটি অন্য যে কোন গ্রন্থের চেয়ে দীর্ঘতর সময় মেডিক্যাল বাইবেল হিসাবে টিকে ছিল”(ঐ গ্রন্থ ১৩৩/১৩৪/১৩৫ পৃষ্ঠা)। 

(চলবে)

লেখার সময়: ৬ ডিসেম্বর ২০১৯।

 

বি দ্রষ্টব্য: লেখাটি নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত ‘দি রানার নিউজ’ সাপ্তাহিকে ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯ সংখ্যায় ছাপা হয়।

নাজমা মোস্তফা

(পূর্ব প্রকাশের পর) (২)

মুসলিমরা এত গভীর ঘুমে যে তারা বাবরি মসজিদের রায়ে কোন বিচারপতির নাম উল্লেখ নেই, এটি সব মুসলিম জানেও না, বললেও বিশ^াস করে না। কত বড় প্রতারণা তাদের সাথে, মানে তারা আত্মসচেতন কম থাকার কারণে তাদের সব ক্রেডিট বিরোধীরা চাপা দিয়ে রাখতে পেরেছে। উল্টো কেউ কেউ মোদির স্বপক্ষে সমর্থণ করছেন সায় রায় দিচ্ছেন। এতে নির্দোষ বাবর বিনাকারণে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছেন। বাবর যদি অপকর্ম করেন তবে ৫ একর কেন, এক একরও তাকে দেয়া যায় না। ৫ একর এর মানে এটি তার পাওনা, আদালতী বিবেকের জমা। রঞ্জন গগৈ শেষ মুহূর্তে সত্য কথাটি স্পষ্ট করে বলেছেন চাইলেও পক্ষে রায় দিতে পারেন নাই। তাকে চুপ করে থাকতে হয়, এটি তিনি স্বীকার করে বিদেয় হন। তার মানে তিনি মিথ্যে রায় দিয়েছেন, এটি তিনি স্পষ্ট বলতে না পারলেও ঘুরিয়ে স্বীকার করেছেন। শোনা গেছে আফসোসও করছেন কষ্টও পাচ্ছেন। মিথ্যে রায় দিয়ে অনুশোচনা আর আক্ষেপ করলেই কি সব পাপ মুছে যাবে। ভারতে সংখ্যালঘুদের ন্যায় বিচার না পাওয়া এই বিচারই কি আজ নতুন? ইতিহাস তার অনেক বেদনা তুলে রেখেছে। দালাইলামা বিশ^কে শিয়া সুন্নী আহমদীয়া লড়াই দিয়ে মাপতে চাচ্ছেন। কিন্তু গভীর ইতিহাস বলে এর পেছনের ষড়যন্ত্রীরা সবাই এক পক্ষ যারা ইসলামকে কুনঠাসা করতে চায়। ওদের জোটবদ্ধ পরোক্ষ ইন্ধনে এসব লড়াই জীবন্ত রসদ পাচ্ছে। বেওকুফ শিয়া সুন্নী মুসলিমদের সেটি বোঝা উচিত ছিল।

বঙ্কিমের রচনায় বিষাক্ত সাম্প্রদায়িকতা ছিল ময়দানে স্পষ্ট। রবীন্দ্রনাথের চাপা সাম্প্রদায়িকতা দিয়ে যে আঘাত করা হয়েছে সেটিও মুসলিমদের মনের কষ্ট বাড়িয়েছে। শরৎচন্দ্র তার সাহিত্যে অলক্ষ্যে মুসলিমদের প্রশংসা করেছেন, হিন্দুদেরে পথ দেখাতে এর প্রয়োজন ছিল। রবীন্দ্রনাথ প্রকাশ্যে সময় সুযোগে শেল বিদ্ধ করেছেন মুসলিমদের বুকে, হিন্দু লেখক সাহিত্যিকরা সংকীর্ণমনা, উদার নন এ সত্য অনেক হিন্দু সাহিত্যিকও অকপটে স্বীকার করেছেন। মুসলিমরা সব সময়ই উদারমনা, সাম্প্রদায়িকতা ও সংকীর্ণতা মুক্ত। কমেন্ট সেকশনে হিন্দুদের অনেক মন্তব্য পড়ে বুঝা যায় ইসলাম ধর্ম সম্বন্ধে তারা জানেই না, আর জানলেও যা জানে মিথ্যা জানে। তাদের দোষ কি, তারা জানবেই বা কিভাবে। বড়র পিরিতিতে সব ঢেকে রাখা, শুধু বিদ্বেষ দিয়ে ভরা দিগ থেকে দিগন্ত। এতে উভয় সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

মুসলিমরাও গবেষনা থেকে দূরে গিয়ে ধর্ম ও রাজনীতির আবর্জনার মাঝে হাবুডুবু খাচ্ছে আর সীমাহীন গঞ্জনা সহ্য করে যাচ্ছে। ইত্যবসরে আকাশে বাতাসে একটি ম্যাসেজ ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে যে ইসলাম তলোয়ার রক্ত ও সন্ত্রাস দিয়ে জেহাদের নাম নিয়ে হুমকির মাঝে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। মুশরিক ও মোনাফিকরা সত্যকে সহজভাবে গ্রহণ করবে না, সমাজে বিশৃংখলা সৃষ্টি করবে সেটি কিন্তু কুরআনে স্পষ্ট করে বলাই আছে। সম্বিৎহারা মুসলিমরা কুরআনকে তোতাপাখির মত আওড়ালেও এর মূল বাণীর ভেতর ঢুকেছে কম। নয়তো তারা এ গোটা বিশ^ প্রাথমিক যুগের মুসলিমদের মতই প্রাপ্তি ও প্রশান্তিতে দুনিয়া সয়লাব করে দিত মানবিকতা, উদারতা ও মহানুভবতা দিয়ে। ময়দানের এ মিথ্যাচারের জবাব দিতে কয়জন মুসলিম কলম ধরেছেন, ময়দানে নেমেছেন, সত্যকে স্পষ্ট করেছেন। যদি মুসলিমদের মাঝে কোন ভুল, মিথ্যা, পাপ, নষ্টামী থাকে সেটিও স্পষ্ট করার দায় মুসলিমদের। তারা বরং অকর্মণ্য জীবন যাপনের পর সীমাহীন প্রাপ্তির আশায় সময় পার করছেন। কিন্তু প্রচেষ্ঠা ব্যতীত প্রাপ্তি কি কখনো অর্জিত হয়? চেতনহীনরা কর্তব্য কর্ম রেখে গভীর ঘুমে কাল পার করছেন।

ইতিহাস প্রমাণ ভারতে যখন মুসলিমদের প্রতি হিন্দুদের বিদ্বিষ্ট করে ভয়ংকর করে তোলা হলো তখন জিন্নাদেরও টনক নড়লো তারা বুঝতে পারলেন আর কংগ্রেসের ঢোল পিটিয়ে লাভ নেই। বরং নিজেদের স্বতন্ত্র পথ নির্মাণ ব্যতীত আর কোন বিকল্প নেই। সুভাষ বসু হিন্দু হয়েও দেশ থেকে পলায়ন করতে বাধ্য হন। এটি তখনকার হঠাৎ নেতাদের ময়দান দখল করা নেতাদের কারসাজির বৃহত্তম অংশ। তার ঠাঁই হয় জার্মানীতে। এ কারণেই জওহরলাল নেহরু বন্দুকের গুলির সন্ধান করছিলেন সুভাষকে শায়েস্তা করতে মিথ্যাচারে তার মৃত্যু সংবাদও ছড়িয়ে দেয়া হয় বিমান দুর্ঘটনায় তার মৃত্যু হয়েছে। মিথ্যার উপর ভর করে দাঁড়ানো এসব অপরাধীর ক্ষমা পাওয়ার কথা নয়। ঐ মানুষটি গুমনামি বাবা হয়ে কিভাবে ছদ্মনামে ছদ্মবেশ ছিলেন। তার পাপ কি ছিল, তার পাপ ছিল তিনি দেশটির প্রকৃত স্বাধীনতা চেয়েছিলেন, যার জন্য এসব দেশে গোটা পাকভারত উপমহাদেশেই আজ অবদি প্রকৃত স্বাধীনতা আসে নাই। দেশ যদি স্বাধীন হয় তাহলে কেন কখনো সংখ্যালঘু নির্যাতন হয় কখনো সংখ্যাগুরু নির্যাতন হয়। এর জবাব কি? সুভাষ বসুর আজাদ হিন্দের বেশীরভাগ বড় নেতারাই মুসলিম ছিলেন। আজ ভারতের হিন্দুরা কথায় কথায় মুসলিম মেরে সাইজ করছে, জোর করে হরে কৃষ্ণ বলাচ্ছে ভারতে ও বাংলাদেশে, তার ধর্মের অনুমোদিত খাবারে বাধা দিচ্ছে। এভাবে তারা বাস্তবকে নীতিকে ইতিহাসকে অবজ্ঞা করছে, সত্যকে অস্বীকার করে মিথ্যা নিয়ে বাহাদুরী করছে। ন্যায় অন্যায় বোধ তাদের রহিত হয়েছে। সবাই একবাক্যে বলছে ভারতের আদালতে ইনসাফহীন বিচার হয়েছে।

সব অংকেই এটি স্পষ্ট ভারতের স্বাধীনতা যুদ্ধের মূল অবদান বড় সংখ্যায় সংখ্যালঘু মুসলিমরাই। কারণ তারা যে ঐশী শক্তি দ্বারা পরিচালিত হয় তারা সম্মানের মৃত্যুকে নিদ্বির্ধায় গ্রহণ করে। সংকীর্ণ হিন্দুত্ববাদ সবকিছুতেই সংকীর্ণ, মানীর মান দিতে অপারগ উল্টো চাপা দেয়ার খেলায় তারা জগৎসেরা। শুনতে ভালো না লাগলেও এটি স্পষ্ট করা সময়ের দাবী। সংখ্যায় মাত্র ৫% ব্রাক্ষ্মণ ১৫% কায়স্থ এই বর্ণ হিন্দুর যাতাকলে ভারত তাদের মনগড়া সাহিত্য, রাজনীতি ও কপট ষড়যন্ত্র দিয়ে প্রকৃত সত্যকে চাপা দিতে সক্ষম হয়েছে। রাজনীতির ইতিহাসে ধাপে ধাপে রজত, সুবর্ন ও হিরক জয়ন্তি পার হলেও তারা তাদের সংকীর্ণতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। এ লজ্জা ঢাকার কোন সুযোগ ভারতের নেই। আপাদমস্তক অপকর্মে আবৃত ভারতের সংকীর্ণতা তাদের মানসিক দেউলিয়াত্বকে স্পষ্ট করছে। একটি ইংরেজী বই “ The Rise of Islam and the Bengal Frontier (1204-1760)” by Richard M. Eaton” বইটি বাংলাতে অনুবাদ করেছেন হাসান শরীফ “ইসলামের অভ্যুদয় ও বাংলাদেশ” নামে। এটি তার উচ্চ শিক্ষার গবেষনার অংশ ছিল। ঐ গবেষনা পত্রে তিনি এটি ষ্পষ্ট করেন যে, এতদিন যা প্রচার করা হয়েছে ইসলামের নামে সবই ছিল চরম মিথ্যাচার। গোটা বিশ^ এই চৌদ্দশত বছর ধরে ঐ মিথ্যাচার নিয়ে ময়দান গরম করে রেখেছে। সপ্তম শতাব্দী থেকেই বিরুদ্ধবাদীরা ইসলামের পেছনে লেগেছে, এর সর্বনাশ করবে একে পৃথিবী থেকে নির্বংশ করবে। ঐ আরবের জাহেলিয়াতি থেকেই ঘরের শত্রু বিভীষণ হয়ে এরা বিচ্ছুরিত হয়েছে। ভিন ধর্মধারীরা ওদেরে লুফে নিয়েছে। গোটা বিশে^ ঐ থেকেই আজো ছলবাজি তলোয়ারী ইসলামের কার্টুন আঁকা হচ্ছে। প্রথম খলিফা আবু বকরের সোমত্ত্ব সম্ভ্রান্ত যোগ্যা সুশিক্ষিতা যোদ্ধা মেয়ে আয়েশার বিয়ে নিয়ে অতি দরদে মিথ্যা রসদে গোটা দুনিয়ার ছলবাজরা কেঁদে বুক ভাসিয়ে দিচ্ছে। যার মেয়ে তার খোঁজ নেই পাড়া পড়শির ঘুম নেই, এসব ধান্ধাবাজির নামে করা ষড়যন্ত্র খেলা।

এসব সুযোগ কাজে লাগিয়ে বাকী দুনিয়া খুশীতে তালিয়া বাজাচ্ছে। দালাইলামারা মহাপুরুষ সেজে মানবতার গড়া আদর্শটির দিকে কটু মন্তব্য ছুড়ার কাজ করবেন। ভাববার কথা এর পেছনের ঐশী শক্তি যদি মিথ্যা হতো তবে এরা নিজেরা সেই কবে ধ্বসে যেত। এরা এতই শক্তিধর যে গোটা দুনিয়া ধ্বসিয়ে দিতে একজোট হয়েছে কিন্তু তারপরও তারা টিকে আছে। তবে এটিও ঠিক তাদের টিকে থাকার মন্থর গতির কারণ দায়িত্বশীল মুসলিমদের পলায়নপর মনোবৃত্তি অনেকটা দায়ী। সব দায় কিছু অল্প শিক্ষিত মৌলভীদের হাতে ছেড়ে দিয়ে সক্ষম শিক্ষিতরা ধর্মনিরপেক্ষতার গ্যাড়াকলে পড়ে গেছেন। হিন্দুরা যেভাবে যুগে যুগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাদের নেতাদের সংকীর্ণতার জন্য। মুসলিমরাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ঐ ধারার নেতৃত্বের কারণে তাদের মাঝে সংশয় ও আস্থাহীনতা সৃষ্টি হয়। ঐ খেসারতে নাস্তিকতা আস্থাহীনতা প্রগতির পথে বেরিকেড হয়ে দাঁড়ায়। গবেষনার দুয়ারে ভাটা পড়েছে, অপশক্তি স্বরাজ পেয়েছে, সবচেয়ে আধুনিক ধর্মটি হয়েছে পশ্চাৎপদতার আর এক নাম। রিচার্ড এম ইটন তার লেখনীতে এটি স্পষ্ট করেছেন যে এই বাংলাতে সহজ সরল মানুষগুলো ইসলামের মহতী সৌন্দর্য্যে মুগ্ধ হয়ে দলে দলে ইসলামের ছায়াতলে এসে জড়ো হয়েছে। নিচু শ্রেনীর হিন্দু ও বৌদ্ধরা এখানে চরম নিগৃহীত হয়ে যখন সময় পার করছিল ঠিক এরকম সময় এমন এক আলোর বিচ্ছুরণ দেখে পূর্ব বাংলার পূর্ব পুরুষরা ঐ সত্যকে আলিঙ্গন করে আজ সংখ্যাগরিষ্ট মুসলিম তারা। ঐ আলোকরশ্মির মূলভিত্তি ছিল এক আল্লাহর অনুগত জাতপাতহীন সমাজ ব্যবস্থা, মানুষে মানুষে সমতার একাত্বতা, সামাজিক মানবিক ও আত্মিক সম্পর্ক গড়ে দেয়ার এক অচিন্তনীয় ব্যবস্থা, ভাতৃত্বের এমন বন্ধন তাদেরে এক সূত্রে বেধে দেয়। বাংলাদেশের মূল বাসিন্দারা বেশীরভাগই নিচু শ্রেণীর হিন্দু বৌদ্ধ থেকে ধর্মান্তরিত মুসলিম।

প্রতিটি মিথ্যাকে পরিষ্কার করতেই নবী মুহাম্মদ (সঃ)এর আগমণ সেখানে মাদুলী, মূর্তি, মাজার, তাবিজ কবজ, ধূপ বাতি এসব বাতিল ঘোষিত হয় কারণ এসবই ছিল মিথ্যা বন্দনার মাধ্যম, উপাদান মাত্র। ভুলভাবে পীর পুরোহিত তাবিজ কবজ মন্দির মাজার ধূপ বাতি এক কাতারে দাঁড়িয়ে কালে জায়গা খুঁজে নিয়েছে। এটি উদারতার চিহ্ন নয়, বরং অজ্ঞানতাকে জিইয়ে রাখার কসরত মাত্র। প্রতিবারই নবীরা চলে যাবার পর মানুষ পথ হারায়। শেষ নবী গত হবার পরও সেটি হয়েছে। এটি যে পদস্থলন সেটি জানতে হবে মানতে হবে। । সত্যকে নিয়ে গবেষনার বিকল্প নেই। যতই এর উপর কাজ করা যাবে ততই এ থেকে অমৃত বের হয়ে আসবে। সামনে নিয়ে যেতে অপারগ হলেও তাকে পেছনে টানার কোন অধিকার সহজে মানা যায় না। এতে জাতি সমাজ পথ হারায়, বার বার হুটচ খায়।

ইসলামের শিয়া সুন্নী বিভেদ, এটি ষড়যন্ত্রী সৃষ্ট এক বিষফোঁড়া। কিছু মোনাফিক শিশুইসলামকে ধ্বংস করার জন্যই এর শুরুটা হয়েছে। যারা এটি সাজিয়েছে তারা আজো বুকফুলিয়ে ইতিহাসের ময়দানে নিজেদের জায়গা করে রেখেছে। এদের চিনতে না পেরে বোকার মত মুসলিমরা আজো তাদেরে স্যালুট সালাম দেয়। এজন্য সত্য বিরোধী শক্তির ইন্ধনে আজো এটি মোটাতাজা আছে জীবন্ত থেকেছে, কারণ আমরা বেঘোরে ঘুমাচ্ছি। হয়তো অনেকের কাছে মোদি নির্দোষ উপযুক্ত, ভাঙ্গো বাবরী ভাঙ্গো। ভারতের ইন্ধনে নেচে বেড়ানো শক্তিও মুসলিম জাকির নায়েককে শত্রু ভাবে, মুসলিম নেতা আকবরুদ্দিন ওয়াইসি বাদ যাবেন কেন। নায়েক ইত্যবসরে আকাশচুম্বি অপরাধী কারণ তারা এমন এক ইস্যুর উপর দাঁড়িয়ে আছেন যাকে দেশ বিদেশ আন্তর্জাতিক সবাই রুখতে চায়। এর খেসারত হিসাবে ৯৫% মুসলিম বাংলাদেশে দাবার গুটিতে জাকির নায়েকের পিসটিভি বন্ধ থাকে। সত্যকে ময়দানে টিকে থাকা কত দুঃসাধ্য, এসব তার উত্তম উদাহরণ, ইতিহাসের নির্মম পরিহাস!

তাজমহল নিয়ে ষড়যন্ত্র বহুদিন থেকে গুণগুনানী শুনছি, এবার মোদির ভারত ভাঙ্গার যুদ্ধে বাড়তি চেতনা পাবে, সবকটির উদ্দেশ্য এক মুসলিমরা হয় কবরস্থানে যাবে নয়তো পাকিস্তানে। সেটি তারা সব সময় প্রকাশ করে। মোদির ভারত কোন ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র যেমন নয় তেমনি সমাজবাদি রাষ্ট্রও নয়। বরং কার্যত ভারত স্বাধীনতার শুরু থেকে আজো বর্ণহিন্দুদের চালে চালিত এক রাষ্ট্র। মোদি কোন বর্ণহিন্দু ব্রাক্ষ্মণ কিছুই নন। তারপরও তার দাপটের কারণে সংখ্যালঘু নির্যাতনে শুধু তার একাত্বতা পাওয়া গেছে, বর্ণহিন্দুর সাথে মিল ওখানেই। দক্ষিণ ভারতের মহীশূরের রাজা টিপু সুলতান সম্বন্ধে কর্নাটকে স্কুলের পাঠ্য ইতিহাসে এ যাবৎ যা উঠে এসেছে তা মুছে দেয়ার কথা ভাবছে বিজেপি সরকার। টিপুর জন্মজয়ন্তি আগেই বন্ধ করা হয়েছে। এবার বাকীটাও সরিয়ে ফেলার চেষ্টা চলেছে। মহীশূর বিশ^বিদ্যালয়ের ইতিহাসের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক সেবাস্টিয়ান যোসেফ বলেন, টিপু সুলতানকে ভারতীয় ইতিহাসের একজন খলনায়ক হিসাবে তুলে ধরার চেষ্টা করা হচ্ছে। মোদির ভারত টিপুকেও আজ গলাটিপে হত্যা করতে চাইছে। এদের অপরাধ এত উচ্চমার্গে পৌচেছে যে মনে হচ্ছে এরা অমনিতেই ধ্বসে পড়বে নিজের পাপেই এরা ইতিহাসে তলিয়ে যাবে। কথা না বলা একজন নিরব দর্শক সব পরখ করছে আর দুনিয়ার প্রতিটি জীব হিন্দু বৌদ্ধ খৃষ্টান জৈন শুদ্র চন্ডাল মুসলিম সবই তার সন্তান। তারা নির্যাতীত নিষ্পেষিত একটি ছোট পুরোহিত প্রজাতির ব্রাক্ষ্মণ গোষ্ঠীর কুপমন্ডুপ একদল জীবের কাছে জিম্মী সময় পার করছে।

বাবরী মসজিদ ভেঙ্গে এখন বাকী ইতিহাস মোচনের কাজও তারা লিস্ট হাতে করবে বলেই ধারণা দিয়েছে। এখানে আমেরিকাতে দেখা যায় বহু বহু গীর্জা মুসলিমরা খৃষ্টানদের থেকে কিনে নিয়ে কোন হিংসার স্বাক্ষর না রেখেই পরষ্পরের বোঝাপড়ার মাঝে কড়িতে কিনে নিয়ে তাকে না ভেঙ্গেই মসজিদে রুপান্তরিত করছে। অদেখা বিধাতার এবাদতখানা এবাদতখানাই থাকে। শুধু মালিকানা বদল হয় যুক্তির কথাটি হচ্ছে মানুষ গীর্জার প্রতি আগ্রহ হারিয়েছে, সঙ্গত কারণেই মুসলিমরা এটি কিনে নিচ্ছে। খৃষ্টানরা সে সত্য স্বীকার করে নির্দ্বিধায়, সারা বিশ^ জানে মানে মানুষ আজ আর মিথ্যাকে আলিঙ্গন করতে বিবেকের কাছেও প্রশ্নবিদ্ধ। ধর্মের বিবেকহীনতায়ও মানুষ কষ্ট পায়। বিবেকের কারণেই মানুষ ব্যতিক্রম, অসাধারণ ও মানবিক। নীতির কথাটি হচ্ছে “অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে তব ঘৃণা যেন তৃণ সম দহে” উভয়েই পাপ জমা করে। রবীন্দ্রনাথ হিন্দু জাগরণে এ সত্যটি  স্পষ্ট করেছেন যে মুসলিমরা যুদ্ধ করে মরে আর হিন্দুরা আত্মহত্যা করে মরে। সে হিসাবে একটি বিজয়ের মরণ আর অন্যটি পরাজয়ের মরণ। মুসলিমরা মরলে শহীদ বাঁচলে গাজি নীতিতে বিশ^াসী তারা সর্বাবস্থায় গর্ব জমা করে। ধর্মের নির্মল অর্জন তাদেরে এ অনুপম সৌন্দর্য ও সাহস দিয়েছে। এ কারণেই হাজার হাজার মুসলিমরা হাসতে হাসতে ফাঁসির কাষ্টে ঝুলেছে কিন্তু এদের জন্য একটি লাইনও বের হয়নি রবীন্দ্রনাথের মত বিখ্যাত কবির কলমের কালিতে। এর প্রধান কারণ ইসলাম মুসলিম কুরআন মুহাম্মদ তার সৃষ্টির মাঝে কোন ব্যতিক্রমী ভাবান্তর সৃষ্টি করতে পারে নি। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায় বাংলার সুফি ভাবধারাতে তিনি প্রভাবিত হয়েছিলেন। ধারণা করি প্রকটভাবে তা স্বীকার করার মত মন মানসিকতার অভাব সম্ভবত তার ছিল। শুধু রবীন্দ্রনাথ একাই নন। যারাই হিন্দুত্ববাদীতা লালন করেছেন তারা বেশীরভাগই উদারতার ছাপ রাখতে ব্যর্থ হয়েছেন। তাই প্রশ্নবিদ্ধ ভারত ও তার নৈতিক পতনের দায় তারা এড়াতে পারেন না। সম্প্রীতির সমতার মানবতার আদর্শের লালন না করে তারাই বরং যে বিদ্বেষের  রেশ সজ্ঞানে ভারতে পুতে গেছেন ঐ মর্মজ¦ালাতে ভারতবাসী আজও পুড়ছে ঐ মানসাংকে “আপনার মনে পুড়িয়া মরিছে গন্ধ বিধুর ধূপ।”

লেখার সময়। ২৭ নভেম্বর ২০১৯।

বি দ্রষ্টব্য: লেখাটি নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত ‘দি রানার নিউজ’ সাপ্তাহিকে ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯ তারিখে ছাপা হয়।

নাজমা মোস্তফা

মুসলিমদের ঘুমটি কম হয়নি বরং বেশী হয়ে গেছে। ১৪ শত বছর একদম কম সময় নয়। তারা অনেকটাই বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। একদল মসজিদে ছুটছে নামাজ পড়ছে বুঝে, অনেকে না বুঝে মাথা নোয়াচ্ছে কিন্তু শর্তের কথাটি হচ্ছে ধর্মটি বেওকুফের ধর্ম নয়। সে মাপে ফল জমছে না। একে বুঝে শুনে আত্মায় অন্তরে আত্মস্থ করতে হবে প্রতিটি সচেতনকে। ধর্মটি সত্য দিয়ে মোড়া, সহজ সরল ধর্ম, মোটেও জটিল নয়। তবে আজকে অনেক কিছুই মিথ্যা জটিল করে সাজানো হয়েছে। ১৯ অক্টোবরের একটি ইউটিউব পাই ৯২,৩৬৩ বৃটিশকালীন নিহত ভারতবাসী নিধনের লিস্ট হয়ে থাকা ইন্ডিয়া গেটের সংবাদটি। “ইন্ডিয়া গেটে ৬২,৯৪৫ জন মুসলমান শহীদের নাম পাবেন কিন্তু কোনো আরএসএস বিজেপি নেতার একটি নাম খুঁজে পাবেন না” শিরোনামের ইউটিউবটি কয় বার দেখি।  সেখানে ৬২,৯৪৫ মুসলিমরা শহীদ হয়েছেন আর বাদবাকীরা ভিন ধারার মানুষ। উইকিপিডিয়ার খবরে এটি প্রশ্নবিদ্ধ সংখ্যা। অধীর রঞ্জনের এ বক্তব্যে চারপাশ হাততালিতে মুখরিত খুব স্পষ্ট করে তিনি মুসলিমদের অবদানের কথা অকপটে বলে যান আর বিজেপির সংকীর্ণ হিন্দুত্ববাদের মুর্খতাকে স্পষ্ট করে দেখান। ম্যাসেজটি পেয়ে আমি অভিভূত হই। এমনিতেই আমার কাছে যথেষ্ট তথ্য ছিলই তারপরও সত্যকে গভীরভাবে জানতে আমি ঐ ভিডিওটির প্রতিটি কমেন্ট পড়ে দেখি। ১৯ অক্টোবর ২০১৯ এ আপলোড করা ভিডিওটিতে ৫৭০টি কমেন্ট পড়েছে। আমি সত্য সন্ধানে প্রতিটি কমেন্ট পড়লাম এমন কোন কমেন্ট পেলাম না যে এটি গোজামিল মিথ্যা বা প্রকৃত সংখ্যা নয়। বরং বেশীর ভাগ কমেন্ট মুসলিমদের  ধন্যবাদসূচক সমর্থন। কেন জানি হিন্দুদের কমেন্ট খুব কম। কারণ এমন স্পষ্ট সত্য কথার সামনে মনে হচ্ছিল তারা বোবা, নয়তো অন্যত্র এমন হলে তাদের গালাগালিতে কমেন্ট সেকশন ভরা থাকতো।

সত্য কথা অনেকের কাছে বড় তেতো লাগে। সেই তেতোটাই মাড়াবো আজ। ওঠো জাগো হাজার বছর ঘুমিয়ে থাকা মুসলিম, তোমাকে জাগতে বলবো! আর কত ঘুমাবে? আমি ঘাটছি ইতিহাসের ইতিহাস। বইএর নামটিও তাই, লেখক গোলাম আহমাদ মোর্তজা। পুরা প্যারাটা (ইতিহাসের ইতিহাস ৪২৪ পৃষ্ঠা থেকে নেয়া) ১৮,০০০ মুসলমান প্রত্যেকেই ইতিহাস খ্যাত মানুষ। তাদের থেকে ১৮ শতও দূরের কথা ১৮ জনও চলতি ইতিহাসে ঠাঁই পান নাই। যাকে একদিন সীমান্ত গান্ধী (খান আব্দুল গাফফার খান) নামে উপাধী দেয়া হয়েছিল তার কেন গান্ধীর পাশে একটুও স্থান হয় নাই। ১৮৭২ সালে মিঃ লর্ড মেয়োকে হত্যা করেছিলেন মুহাম্মদ শের আলী এবং তার ফাঁসি হয়েছিল। ১৮০৮ খৃষ্টাব্দে অত্যাচারী নীলকরদের বিরুদ্ধে যিনি প্রথমে বিদ্রোহে শহীদ হন তার নাম মুহাম্মদ রফিক মন্ডল। এদের নাম আজও মুছে যাওয়া উচিত নয়। (সূত্র: আজকাল পত্রিকায় প্রবন্ধ ভারতের মুক্তি সংগ্রাম ও মুসলিম সমাজ , শান্তিময় রায়, ১৯০৮ ডিসেম্বর)। ১৯০৬ সালে বরিশালের সংগ্রামে যিনি নেতৃত্ব দেন তার নাম হচ্ছে আব্দুল্লাহ রসুল। ইতিহাসে হিন্দুদের গুপ্ত সমিতির নাম থাকলেও মুসলিমদের প্রচুর গুপ্ত সমিতির নাম ইতিহাসে গুপ্তই আছে। “জাহানী ইসলাম” নামে একটি পত্রিকা জাহাজীরা বন্দরে বন্দরে বিলি করতেন তারা সবাই ছিলেন মুসলিম। ১৯১৫ সালের জানুয়ারী মাসে ১৩০ নাম্বার বেলুচি রেজিমেন্ট রেঙ্গুনে, ব্যাঙ্ককে সিঙ্গাপুরে বিদ্রোহের পতাকা উত্তোলন করে পরের মাসে ১৫ই ফেব্রুয়ারী ৫ নং নেটিভ লাইট পদাতিক সেনাবাহিনী সিঙ্গাপুরে বিদ্রোহ করে যার সবাই ছিলেন মুসলিম (শান্তিময় রায়, ঐ সূত্র)। ইংরেজরা এদের দুইজনকে ফাঁসি দিয়ে বাকীদের দীপান্তর দেয় (ইতিহাসের ইতিহাস ৪২৪ পৃষ্ঠা)।

ধনী হয়েও বিপ্লবীদের সাহায্য করে দারিদ্রতা গ্রহণ করেন যে ব্যক্তি, ঐ অপরাধে কাসেম ইসমাইল খানের ফাঁসি হয়। ১৯১৫ সালের মার্চে ইংরেজের বিরুদ্ধে বজ্র হামলা ও বিদ্রোহের অপরাধে মুহাম্মদ রইসুল্লা খানের ফাঁসি হয়। ঐ বছরেই  মুহাম্মদ ইমতিয়াজ আলী, রুকনউদ্দিন বীর দর্পে ফাঁসির মঞ্চে আরোহণ করে জীবন দান করেন। ইংরেজের কাছে প্রাণ ভিক্ষার আবেদন করলে মুক্তি মিলবে বলাতে তারা সেটি ঘৃণার সাথে প্রত্যাখ্যান করে হাসিমুখে বীর দর্পে মৃত্যু বরণ করেন। ১৯২৭ সালে বিপ্লবী বরকতুল্লাহ ভারতের বাইরে থাকা অবস্থায় স্বাধীন দেশের ইচ্ছা মনে পুষেই প্রাণত্যাগ করেন। বিখ্যাত বীর আমীর হাইদার গোটা বিশে^র বহু দেশ চষে বেরিয়েছেন, ঐ বীরকে বৃটিশ সরকার ধরতে পারে নাই। মৌলানা আজাদের বিপ্লবী সহকর্মী ছিলেন রেজা খাঁ। নেত্রকোনার মকসুদউদ্দিন আহমাদ, নাসিরুদ্দিন আহমাদ এবং তার কন্যা রাজিয়া খাতুন বিপ্লবী ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন। মৌলভী আব্দুল কাদের, কিশোরগঞ্জের আলী নেওয়াজ, মুহাম্মদ ইসমাইল, চাঁদ মিঞা ও আলতাফ আলীর নাম বিপ্লবী দলে থাকাতে তাদের জেল হয়।

১৯৩০ খৃষ্টাব্দের মে মাসে সোলারপুরের ফাঁসি মঞ্চে একইভাবে ইংরেজের প্রাণ ভিক্ষাকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে অনেকের সাথেই প্রধান দুজন ছিলেন কোরবান হোসেন ও আব্দুর রশীদ। উত্তর ভারতে বটুকেশ^র, চন্দ্রশেখর, ভগৎ সিং এদের মাঝে উল্লেখযোগ্য ছিলেন আসফাকুল্লার নাম। বীর রাম প্রসাদকেও বিপ্লবী অপরাধে ফাঁসি দেয়া হয়। উপরের তথ্যগুলো সংগৃহীত হয়েছে মৌলানা আবুল কালাম আজাদের লেখা (মহাফেজখানা), কালিচরণ ঘোষের  The Rule of Honour, পেশোয়ার ষড়যন্ত্র মামলা, বিপ্লবী জীবনের স্মৃতিকথা, ভুপেন্দ্র দত্তের সমকালের কথা, মুজাফফর আহমাদ প্রমুখের পুস্তক হতে। ইতিহাসে হঠাৎ নেতাদের নাম রইলো কিন্তু ইতিহাসের এসব মূল বিপ্লবী শিশুপুত্রদের নাম বাদ গেল কেন? এ প্রশ্ন লেখকের।

ফররুখ আবাদের নবাব ইকবাল মন্দ খাঁ, গজনফর হুসাইন খাঁও দেশের জন্য ফাঁসিতে প্রাণ দেন। সাখাওয়াৎ হোসাইন ও তাফাজ্জুল হুসাইনকে ক্ষুদিরামের মত ফাঁসি দেয়া হয়। মুনশি আব্দুল করিম, কাজী মিঞাজান, শেখ রহিম বখশ ও মাওলানা ইলাহী বখশকে আজীবনের জন্য নির্বাসন দন্ড দেয়া হয়। তাদের সহায় সম্পত্তি সব বাজেয়াপ্ত করে ইংরেজ সরকার। মাওলানা জাফর ও আলহাজ্জ মুহাম্মদ শফী সাহেবের ফাঁসির রায়ের পরও তাদের সতস্ফুর্ততা দেখে বিস্মিত ইংরেজরা ক্রোধে তাদের বীর হতে না দিয়ে নির্বাসন দিয়েছিল। এরা প্রত্যেকেই এত বড় মাপের মানুষ যে, এদের প্রত্যেকের জন্য স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচনা করা সম্ভব। পীর আলী যুদ্ধ করতে গিয়ে ৩১ জন সঙ্গি মুসলিম বীরকে নিয়ে বন্দী হন। ইংরেজরা একজন একজন করে প্রত্যেকের ফাঁসি কার্যকর করে।

এটি এমন সময় যখন কংগ্রেস দেশের তেমন কিছু নয় (সূত্র: অবিস্মরনীয় ২য় খন্ড, পৃষ্ঠা ২০, শ্রী গঙ্গানারায়ণ চন্দ্র)। ১৯৪১ সালের ১ মার্চ ভারত ত্যাগ করেন সুভাষ, দেশের নেতারা কেউ তার খোঁজ করেননি। ২৫ দিন পর সংবাদ পত্রে প্রকাশ হয় ‘সুভাষ চন্দ্র বসুকে পাওয়া যাচ্ছে না’। সুভাষ চন্দ্রের নামটি ইতিহাসে আছে, তবে লেখকের প্রশ্ন কেন জওহরলাল তাকে বলেছিলেন “সুভাষ এলে আমি রাইফেল হাতে তার বিরুদ্ধে দাঁড়াবো।” এই হঠাৎ নেতারা সুভাষকে সইতে পারছিলেন না এর প্রধান কারণ সুভাষ মুসলিমদের আন্দোলনের ফরমুলা গ্রহণ করেছিলেন। তার রাজনৈতিক গুরু ছিলেন মাওলানা উবায়দুল্লাহ সিন্ধী। তার আজাদ হিন্দ ফৌজের বড় নেতাদের বেশীর ভাগই মুসলিম। তাই ঐ স্ফুলিংগকে দেশ থেকে ঝেটিয়ে বিদেয় করা হয় বাকীদের নিরাপত্তার স্বার্থে। মাওলানা আজাদ ও মুসলিম বিপ্লবীর ১২৬ জনের এক দলকে একটি মালগাড়ীতে চড়িয়ে ৪৬০ মাইল পথ অতিক্রম করে নিয়ে যাওয়া হয়। ট্রেনের কুঠুরীতে ১৮ ফুট লম্বা, ৯ ফুট চওড়া ১৬২ বর্গফুট কামরা, দরজাতে তালা। পথেই ৫৬জন বন্দী পিপাসায় কাতর হয়ে শহীদ হন। বাকীরা নিজের ঘামে ভেজা কাপড় নিংড়ে পানি পান করার চেষ্টা করেন। পানি পানি চিৎকারের জবাব ছিল বিদ্রুপ আর নিষ্ঠুর হাসি। এসব ঘটনা হঠাৎ নেতাদের পরখ করা। ঐ সময় মুসলিমদের অবদানে চিত্তরঞ্জন অবাক হন। গান্ধীজীর অসহযোগ আন্দোলনের কথা কমবেশী সবাই জানে। কিন্তু যিনি এর গোড়ায় ছিলেন তার কথা কয়জন জানে? তিনি হচ্ছেন হযরত হুসাইন আহমাদ, ঐ আন্দোলনের উপর তার বিখ্যাত পুস্তকের নাম ‘রেসালাতে তরকে মুআলাত’। সারা ভারতে এ পুস্তকের জনপ্রিয়তায় ইংরেজ ভীত হয়ে বইটি বাজেয়াপ্ত করে। (সূত্র: হায়াতে মদনী, পৃষ্ঠা ১২৮, মাওলানা মুহীউদ্দীন খান ও মাওলানা মু: সফিউল্লাহ)।   

প্রসিদ্ধ ইংরেজদের রিপোর্ট মত ২৭/২৮ হাজার মুসলমানকে বিনা বিচারে ফাঁসি দেয়া হয়েছিল এবং সাত শত বিশিষ্ট আলেমকেও ফাঁসির কাষ্টে ঝুলতে হয়েছে (সূত্র: হায়াতে মাদানী, পৃষ্ঠা ৪১-৪২)। আসল হিসাবে ইংরেজদের রিপোর্ট থেকেও বহু বহু বেশী মুসলিমকে হত্যা করা হয়। বহু মুসলিমকে শুকরের চামড়ায় মাথা মুখ ঢেকে জলন্ত উনুন বা চুলাতে ফুটন্ত তেলের উপর ছাড়া হয়েছিল (এ বর্ণনা মিঃ এডওয়ার্ড টমসনের, দ্রষ্টব্য ঐ গ্রন্থ) (ইতিহাসের ইতিহাস, গোলাম আহমাদ মোর্তজা ৪১৭ পৃষ্ঠা)। ঐ সময় জিন্নাহ বললেন তিনি ইংরেজের বিরুদ্ধেই লড়বেন, ভারতের বিরুদ্ধে নয়। তখন হিন্দু মহাসভার নেতারা বললেন তারা লীগের বিরুদ্ধে লড়বে, ইংরেজের বিরুদ্ধে নয়; বরং তারা ইংরেজকে সহযোগিতা দিবে (শ্রী গঙ্গানারায়ন চন্দ্রের লেখা, অবিস্মরনীয় ২য় খন্ড ৫৪ পৃষ্ঠা)।

গোলাম আহমাদ মতোর্জা সাহেবের বহু বহু লেখনী থেকে জানা যায় মুসলিমদের অসাধারণ অর্জন সব লুকানো কিন্তু ভারতে যা প্রচারিত হয় তার বেশিরভাগই মিথ্যা রচনা, মুসলিমকে হেয় করার রচনা। ইদানিং কিছু হিন্দুর মুখেও সত্যটা শোনা যায়। খোদ রবীন্দ্রনাথ ছিলেন চরম মুসলিম বিদ্বেষী। ভাবতে অবাক লাগে এদের কাছে ইতিহাস সমাজ যত না বড় ছিল তার চেয়েও বড় ছিল ইসলামের বিরুদ্ধে তলোয়ারের জোরে মিথ্যা প্রচার। বৃটিশ সৃষ্ট মুসলিম বিদ্বেষ তারা খুব যতনে আদরে লালন করেছেন। গভীর ভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় সে সমাজের বিবেক যারা ছিলেন এরা বেশীর ভাগই ঐ মিথ্যা ইতিহাস চর্চাতে নিজেকে নিমজ্জমান রেখেছেন। এর বাইরে প্রকৃত সত্যে তারা বিচরণ করেন নাই । অতীত ভারতের মুসলিমদের গৌরবোজ্জল ইতিহাস গর্ব করার মত। যেখানে ইতিহাসকে চাপা দেয়া সম্ভব হয়েছে সেখানে উইকিপিডিয়াতে সত্য খোঁজলে কি পাওয়া যাবে? উইকিপিডিয়াতে ঐ নকল ইতিহাস পক্ষই তথ্য সাপ্লাই করে। সূত্র থেকে তারা যা পায় তাই আপলোড করে, সেটি প্রধান সোর্সও হতে পারে সেকেন্ডারী সোর্সও হতে পারে। বরং একমাত্র গবেষনা প্রকৃত সত্য উন্মোচন করতে পারে। মুসলিমরা না জাগলে এ কর্ম অন্য এসে করে দিবে না। অন্যরা ৭৫ বছরেও তা উন্মোচন করেনি বরং এসব প্রকাশে প্রতিরোধ করেছে। বড় সময় থেকেই মর্তোজা সাহেবের অর্জনকে চাপা দিয়ে রাখা হয়েছে। ঐ সব বস্তুনিষ্ট কাজ খুঁজে বের করার যে মহতী উদ্যোগ তিনি নিয়েছেন তাকে শত সালাম জানাই। 

আজকের মুসলিমরা গভীর ঘুমে অচেতন। সেটি মনে হলে কষ্ট হয়। একবিংশ শতকে চেতনহীন মুসলিমদের দায় অনেক বেশী। তারা মনে করে তাদের কোন দায় নেই। কিন্তু তারা যে আল্লাহর খলিফা হয়ে এ ধরায় এসেছে তা তাদের মনেই নেই। আল্লাহ তাদের উপর বিশাল দায় ভার চাপিয়ে দিয়েছেন তারা কিন্তু তাদের অধিকার ও কর্তব্য ভুলে বসে আছে। তাদের কর্তব্যজ্ঞানটুকু স্মরণ করিয়ে দিতে এ ক্ষুদ্র প্রয়াস। লেখাটি একটি সাইরেন ধ্বনি, ঘুম থেকে জেগে উঠার, নিজের দায়িত্ব বুঝে নেয়ার। (চলবে)

২৩ নভেম্বর ২০১৯

 

বি দ্রষ্টব্য: এ লেখাটি নিউইয়র্ক ভিত্তিক “দি রানার নিউজ” ২৯ নভেম্বর ২০১৯ তারিখের সাপ্তাহিকে ছাপা হয়েছে।

নাজমা মোস্তফা

(লেখাটি অনেক লম্বা ও পুরোনো লেখা ২০০৭ সালের তবে কোথাও প্রকাশ হয়নি, ধৈর্য্য ধরে পড়তে হবে।)।

শিরোনামটি বাংলাদেশের মানুষের কাছে একটি পুরোনো প্রসঙ্গ। এক মেয়ে অতি সম্প্রতি আমার কাছে জানতে চায় তসলিমা সম্পর্কীত কথা। কারণ সে ধরে নেয় এ মানব দরদী মহিলা ধর্মকে গালি দিয়ে অনেকের কাছে মহান কাজ করেছেন। সে নিজেও অনেক সময় তাই মনে করতো। মেয়েটি আমার কাছে ব্যখ্যা চায় আমি সংক্ষেপে তাকে জবাব দেই ই-মেইলে। সে বাংলা পড়তে পারে না। যে কোন জিনিসের প্রশ্ন হলে তার উত্তর দেয়া প্রাসঙ্গিকতার পর্যায়ে পড়ে। এ ক্ষেত্রে তসলিমা প্রসঙ্গ টানার আরেকটি কারণ সেই মেয়ে এর মাঝে একটি কান্ড করে বসেছে সত্য মিথ্যার বোধ হারিয়ে সে মরিচিকার পিছনে ছুটে গিয়েছে। সে ধর্মের বারোটা বাজিয়ে নিজের জীবনকে যুদ্ধের মাঠে নামিয়ে দিয়েছে। ধর্ম ছেড়েছে, ঘর ছেড়েছে, জীবনকে বাজি রেখে সে ডিগবাজী খাচ্ছে। স্বভাবতই আমি তার জীবন নিয়ে উদ্বিগ্ন। আমার এ লেখার এটি একটি বড় কারণ। এটি একটি মাত্র মেয়ের ঘটনা হলেও আজ একেও আমি বড় করে দেখছি। চিন্তার ক্ষেত্রে এটি নিছক ছোট কোন ঘটনা নয়। নয়তো এ পুরোনো কাসুন্দি ঘাটার ইচ্ছে ছিল না মোটেও। শুনেছি তসলিমাও চান সব সময় খবরের লাইম লাইটে থাকতে। কিন্তু নানা কারণে অনেক সময় প্রয়োজনেও পুরোনো কাসুন্দি নাড়তে হয়।

অতি সম্প্রতি প্রথম আলোর ব্যাপারে সারা দেশ জুড়ে যে কার্টুন বিদ্রোহের সংবাদ পাচ্ছি, আবার ‘সাপ্তাহিক ২০০০’ পত্রিকায় দাউদ হায়দারের আত্মজীবনীমূলক রচনা ‘সূতানটি সমাচার’ যেটি প্রকাশের আগেই বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে (মন্দের ভালো)। পত্রিকার মারফতে জানতে পারি অপ্রকাশিত লেখাটিতে নবী মোহাম্মদ(সঃ) এর নাম, রমজান নিয়ে কটাক্ষ, মক্কা শরীফ বা কাবা শরীফকে পতিতালয়ের সাথে তুলনা করা হয়েছে। কার্টুনটি আমি দেখেছি কিন্তু লেখাটি যদি সত্যি এভাবে লেখা হয় তবে মুসলমানদের জন্য এটি অবশ্যই সীমাহীন বেদনার কারণ, এটি স্বীকার্য। সব মিলে মনে হয় তসলিমার সেই খোড়া রোগে এখনো অনেকেই ভুগছেন, নাহলে রমজানের এ সংযমের সময়টিতে ইসলামের শ্রেষ্ঠ পথ প্রদর্শক নবী মোহাম্মদকে নিয়ে রংরস করার কথা ছিল না মোটেও। ‘মোহাম্মদ’ এবং ‘মক্কা’ দুটি একটির সাথে আরেকটি একসূত্রে গাঁথা। এখানে একজন স্বনামধন্য মানুষ এবং একটি স্থানের নাম ঐ ব্যক্তির জন্মের সাথে আসা যুদ্ধের ময়দান। এ এমন এক ব্যক্তি যাকে যুগে যুগে স্কলাররা সম্মানের তালিকায় উঠিয়েছেন তাকে কোন স্পর্ধার বলে হালকা ভাবে দেখছে এরা। তার মানে এটি নয় যে তারা খুব জ্ঞানী বরং এটি প্রমান করে এরা কতটা অসচেতন, সঠিক সত্যের সন্ধানে এরা শতভাগ অন্ধত্বের শিকার, এদের সুচিকিৎসার প্রয়োজন। এবার আমি মাত্র কিছু ঐতিহাসিক ব্যক্তির নাম উল্লেখ করতে চাই যারা এ সম্মানিত জনের ভূয়সী প্রশংসা করে গেছেন। তারা হচ্ছেন জর্জ বার্নার্ড শো, মহাত্মা গান্ধী, প্রফেসর কে এস রামকৃষ্ণ রায়, এস পি স্কট, রেভ বি মার্গালিউথ, এডওয়ার্ড গীবন, স্যার থমাস কার্লাইল, ষ্টেইনলি লেনপুল, রেভারেন্ড বি স্মিথ, এম এইচ হাইন্ডম্যান, হারকিউলস-দ্যা গ্রেট রোমান এম্পায়ার, উইলিয়াম মন্টোগোমারী ওয়াট। এরা অনেক আগের লেখক এবং মোটেও কাঁচা অর্বাচিন নন, এটি নিশ্চয় বর্তমানের হিরোরা অস্বীকার করতে পারবেন না। যারা বর্তমানে হিরো হবার বাসনায় পরিশ্রম করছেন, এরা কি মনে করেন যে বিদ্যায় বুদ্ধিতে তারা জগতসেরা, সবকে ছাড়িয়ে গেছেন। এ বিতর্ক প্রতিযোগিতা তারা নিজেরাই করতে পারেন। বেওকুবের মতো অন্যকে আছাড় দিতে গিয়ে নিজেরা আছাড় খেয়ে উল্টানো একমাত্র অর্বাচিনের পক্ষেই সম্ভব।

অতীতে দেখা গেছে ধর্মকে গালি দিতে বিধর্মী সাম্প্রদায়িক লেখকরা সাহিত্য করেছেন ঠিক এভাবে যে, ঢাকা শহরে খুব বেশী দেখা যায় কাক, কুকুর আর মুসলমান। সাহিত্যের সাধুর কি অসাধু তৎপরতা লেখাটিতে ফুটে উঠেছে যে কোন চিন্তাশীলেরই খুজে পাবার কথা। এখানে কৌশলে মুসলমানকে শুধু কাকের সাথে তুলনা করেই ক্ষান্ত হননি লেখক, পরম নিশ্চিন্তে কুকুরের সাথে তুলনা করে লেখক সাহিত্যিক নিজের অবস্থানও চিহ্নিত করে ফেললেন। মানবিক মর্যাদায় তার মাত্রাটা তিনি এঁকে দিলেন, তাকে এই একটি কর্ম দিয়েই মাপা সম্ভব। কার্টুনের উপর বিদ্রোহ মানলাম কিন্তু কোন ব্যাপারেই অতি বাড়াবাড়ি সীমালংঘনের লক্ষণ, ভালো নয়। সেটিও মনে রেখে চলাই ভালো। কারণ বাড়াবাড়ি আল্লাহরও অপছন্দের রাস্তা। এই রমজান মাসে এটিও স্মরণ রাখলে ভালো। সবারই উচিত আইনের প্রতি সম্মান দেখানো। সঠিক উপায়ে প্রতিবাদ করার অধিকার সবারই আছে, তবে কখনোই বিশৃংখলা করে নয়। আমাদের নবীর শেখানো রাস্তা এসবের ইঙ্গিত দেয় নি কখনোই। শত সমস্যায় জর্জরিত একটি দেশ যেন বাড়তি অসুবিধার মুখোমুখি না হয় সেটিও মাথায় রেখে চলা উচিত। যারা গুড় লাগাতে চাচ্ছে যে কোন বিশৃংখলাই তাদের জন্য আশায় ভরা যদিও অশনি সংকেত। সম্প্রতি গার্মেন্টস নিয়ে যে রংরস শুরু হয়েছে এর সমাধানেও কর্তৃপক্ষের সঠিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। প্রয়োজনে প্রত্যেকের পাওনা সাধ্যমতো সঠিক উপায়ে শোধ করে এর চালিকা শক্তিটুকু টিকিয়ে রাখার উদ্যোগ নিলেই মঙ্গল। সর্বাবস্থায় ‘দেশ সবার উর্ধ্বে’ একথাটি জনতাদের মাথায় রাখতে হবে। কিন্তু অবশ্যই সাবধান থাকা ভালো যে – কে বা কারা কি করতে পারে, কোন সাপ কতটা বিষ ধারণ করছে সেটি অবশ্যই একজন মাঠকর্মীর জানা দরকার।

দেখা গেছে রাজনীতির নামে বছরের পর বছর এসব করেছেন আমাদের সোনার সন্তানেরা, বিশৃংখলা সৃষ্টি করে গাড়ী ভাঙ্গার মতো কাজ যেন নিজের গায়ে নিজে কেরোসিন ঢেলে আগুন দেয়ার মতো কাজ। এসব থেকে দেশবাসীর দূরে সরে দাড়ানো অবশ্যই দরকার। দেখা গেছে এবারেও শ্রমিকরা গাড়ীতে আগুন ধরিয়েছে, দেখে দেখে খারাপ জিনিসটি শিখে নিতে কারোরই বেগ পেতে হয় না। গার্মেন্টএর মালিকের গাড়ীটিও কিন্তু দেশেরই সম্পদ। দুস্কৃৃতিকারী ধরা পড়লেও দুষ্টু ছেলের শাস্তি হচ্ছে কিন্তু জমা করা মালপানিটা যাচ্ছে দেশবাসীর জমা খাতায়। দুস্কৃতিকারীর দৃষ্টিতে দেখলেও সে এ টাকা উড়িয়ে দেয় কারণ অন্যায়ভাবে অর্জিত সম্পদ মঙ্গল আনে না। যে গাড়ীটি ভাঙছে এটি তার নিজেরই দেশের সম্পদ। সুতরাং তাকে গাড়ীটি ভাংতে সবাই একযোগে বাধা দিন। এ বোধটুকু প্রতিটি জনতার অন্তরে জাগাতে সমর্থ হোন। সব লুটেরা ধরা পড়লেও সম্পদ একত্রিত হচ্ছে দেশের জমা খাতায়। রাগ পাপীর উপর দোষীর উপর থাকতে পারে, জিনিসের উপর সম্পদের উপর রাগ, এটি শুধু বোকামীর অর্জন। একমাত্র বুদ্ধিশুদ্ধিহারা পরগাছা যারা, তারা এই হীনমন্য কাজ করে। তারপরও কথা আছে পাপকে ঘৃণা করো, পাপীকে নয়।  নিজের দেশটিকে নিজের একটি পর্ণ কুটির এটি সবার ভাবনায় রাখা জরুরী। কুটিরের ছাদ উড়ে গেলে সব ঝড়ঝাপ্টা নিয়ে বেঁচে থাকা যে দুঃসাধ্য সেটি মাথায় রাখুন। তবে দেখা গেছে সুমতি সব সময় কাজ করেনা, দুর্মতিরই জয় কেন হয় এটিও পরখ করা দরকার।

অনলাইনের একটি ওয়েভসাইট ‘সদালাপে’ আমার গ্রন্থ ‘তসলিমার কলামের জবাব’ বইটি ছিল। আমার মূল বইটিতে ‘র’ সম্পর্কিত বাড়তি অংশটুকু ছিল না কারণ ‘র’এর এই যোগসূত্র আমার আগে জানা ছিল না। বেশ আগে ওখানে একজন মন্তব্য করে এটি উল্লেখ করেন যে আমি আমার লেখাতে তসলিমার ‘র’ সম্পর্কীত বিষয় তেমন খোলাসা করিনি। ঐ খোলাসা করতে অনেক তথ্য আমি জানতে পারি লেখক আবু রুশদ এর লেখা গ্রন্থটিতে। যে কেউ এটি পড়ে নিতে পারেন। আমি ধরে নিয়েছি এটি অনেকেই জানেন তাই ও বিষয়ে বেশী নাড়ি নাই মূল গ্রন্থে ‘র’ সম্পর্কিত তথ্যটি দেই নি। মনে হতে পারে আমার যুক্তি কম। তবে এটি ঠিক কালের ধারায় থলের বিড়াল বেরিয়ে পড়ার সম্ভাবনা থেকে সত্য উন্মোচিত হয়ই, এভাবে মিথ্যা পালায়। স্মরণ করছি আর একটি বই এই ‘র’ সম্পর্কীত সম্প্রতি পুরষ্কার প্রাপ্ত হয়েছে বইটির নাম ‘র এ্যান্ড বাংলাদেশ’ লিখেছেন সাংবাদিক এবং গবেষক জয়নাল আবেদীন। লন্ডন ইন্সটিটিউট অব সাউথ এশিয়া সংক্ষেপে ‘লিসা’ তাকে সম্প্রতি পুরষ্কৃত করে। বইটি লিখা হয় ১৯৯৫ সালে। বইটিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের আগে ও পরে ঐ গোয়েন্দা সংস্থাটির অশুভ গোপন তৎপরতা উন্মোচন করা হয়েছে। বইটিতে শেখ মুজিবুর রহমান এবং জিয়াউর রহমানের হত্যাকান্ডে ইন্ডিয়ার ভূমিকার নেপথ্য কথাও তুলে ধরা হয়েছে। এওয়ার্ড বিষয়ক সাম্প্রতিক খবরটি আমাকে এ তথ্যটি দিতে উদ্বুদ্ধ করে, যদিও বইটি আমার পড়ার সুযোগ হয়নি।

আবু রুশদের বই: এবার আমি এ আর্টিক্যালটিতে লেখক আবু রুশদের লিখিত বাংলাদেশে ‘র’। এ সম্পর্কীত তথ্যাবলী ‘রিচার্স এন্ড এনালাইসিস উইং’ সংক্ষেপে ‘র’ এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন কংগ্রেস নেত্রী ইন্দিরা গান্ধী, এক্ষেত্রে বেছে বেছে কংগ্রেস সমর্থকদেরেই এখানে নেয়া হতো। এটি ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার নাম। প্রায় সমগ্র বিশে^ই এর নেটওয়ার্ক আছে। বিশেষ করে বাংলাদেশসহ উপমহাদেশের ছোট ছোট দেশগুলোর রাজনীতিতে এরা বিশেষভাবে তৎপর। লক্ষ্য করা যায় ৯১ সালের জুন জুলাই মাস থেকেই বাংলাদেশের প্রায় সকল সরকারী, আধাসরকারী প্রতিষ্ঠান, শ্রমজীবি, পেশাজীবি সংগঠনে ব্যাপক অসন্তোষ ও আন্দোলন নাড়া দিয়ে উঠে। একের পর এক শুরু হয় ধর্মঘট, জ¦ালাও পোড়াও ইত্যাদি। এসবের পিছনে সুপ্ত কারণ হিসাবে সে সময় পত্রিকায় প্রকাশিত একটি খবর ছিল এরকম ‘ইতিমধ্যে ‘র’ এজেন্টদের তৎপরতা লক্ষ্যনীয়। তাদের পরিকল্পনার উদ্দেশ্য হলো দেশে এক অস্থির পরিস্থিতি সৃষ্টি করা যাতে সরকার সন্ত্রাস, হরতাল, ধর্মঘট, কর্মবিরতি খুন, ডাকাতি বেড়ে চলে। দৈনিক নাগরিকের ২৭ জানুয়ারী ৯২ সংখ্যায় এক রিপোর্টে জানা যায় সরকারের ভিতরে বাইরে বিভিন্ন স্তরে ৩০ হাজার ‘র’ এজেন্ট তৎপর। মন্ত্রী, এমপি, আমলা, রাজনীতিবিদ. শিল্পপতি, ব্যবসায়ী, বুদ্ধিজীবি, লেখক, কবি সাংবাদিক, সাহিত্যিক, শিল্পী, প্রকাশক, অফিসার, কর্মচারী ইত্যাদি পর্যায়ের লোকজনই শুধু নয় ছাত্র, শ্রমিক, কেরানী, পিয়ন, রিকশাওয়ালা, ঠেলাওয়ালা, পোর্টার, কুলী, টেক্সি ড্রাইভার, ট্রাভেল এজেন্ট, ইন্ডেন্টিং ব্যবসায়ী, সিএন্ডএফ এজেন্ট, নাবিক, বৈমানিক, আইনজীবিসহ বিভিন্ন স্তরে তাদের এজেন্ট সক্রিয় রয়েছে। এ ছাড়া সারা দেশে ছড়িয়ে জালের মত বিস্তার করে আছে ৬০,০০০ ‘র’ এজেন্ট।

ভারতের বন্ধুত্বের আড়ালে শত্রুতা: দেখা যায় ভারতের এক বিরাট সমস্যাই সাম্প্রদায়িক সমস্যা। ভারতীয় ‘র’ তাদের রাজনৈতিক কৌশল হিসাবে তসলিমা নামের ‘ছাই ফেলতে ভাঙ্গা কুলো’ হিসাবে ব্যবহার করেছে। বাংলাদেশে যখন বাবরী মসজিদ ভাঙ্গার প্রতিবাদে সংসদে নিন্দা প্রস্তাব গ্রহণ করা হয় তখন এর জবাবে ভারত বাংলাদেশকে হুমকি প্রদান করে। এরকম হুমকিতে ভারত এটি প্রকাশ করে যে, ‘বাংলাদেশে শত শত মন্দির ধ্বংস হয়েছে, সহিংস ঘটনা ঘটেছে, তাতে ভারত সরকার বাংলাদেশ সরকারের ভবিষ্যত পদক্ষেপের উপর মনোযোগ সহকারে নজর রাখবে। ভারত সরকারের এই নজর রাখার মিথ্যাচারই বর্হিবিশে^ বাংলাদেশকে সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী চিহ্নিত করার পিছনে বিরাট ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে ভারত সরকারের হুমকি প্রদর্শিত হয় ২৩ জানুয়ারী ৯৩ সালে। এর মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় শুরু হয় একুশের বইমেলা। ঐ বারের বইমেলায় প্রকাশিত হয় তসলিমার ‘লজ্জা’। বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নেই, হিন্দুদের উপর যথেচ্ছা নির্যাতন এসব গালগল্পই ছিল ঐ বইএর মূল বিষয়। এতে অবশ্যই সারা বিশে^ বাংলাদেশের ভাবমূর্তি অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বস্তুত এ রকমভাবে সংখ্যালঘু নির্যাতন ভারতে নয়, এটি বাংলাদেশে সংগঠিত হচ্ছে একটি অপরাধ, এটি ‘র’ কৌশলে প্রতিষ্ঠিত করে সার্থকভাবে। এখানে যে কেউ মনে করতে পারেন এটি একটি উপন্যাস কিন্তু এর ভিতরের বক্তব্যকে কৌশলে ঢাল হিসাবে এমনভাবে এমন সময়ে ব্যবহার করে দেশটির বিরুদ্ধে ‘র’ চরম প্রতিশোধ গ্রহণ করে। তাই এরকম কোন মিথ্যাচারী লেখাকে অবলম্বন করে একটি হিংসার ময়দান তৈরী হয়। এসব থেকে জানার শিখার অনেক আছে। জাতি যেন অতীত থেকে শিখে প্রকৃত সত্যটি জেনে সঠিক কাজটি করে। গাড়ি ভাংচুর করে নয়,  চিন্তার ক্ষেত্রে প্রতিটি সচেতনকে এর মূলে প্রবেশ করতে হবে এবং এর বিপক্ষে নিজেদেরকে সেহিসাবে গড়ে তুলতে হবে। প্রতিটি ছাত্রকে, প্রতিটি সুনাগরিককে এর মর্মে প্রবেশ করতে হবে। আত্মায় অন্তরে এর মোকাবেলায় ইস্পাতকঠিন দৃঢ়তা নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। মানুষকে মানবিক মূল্যবোধে গড়ে তুলতে হবে। প্রতিটি প্রশ্নের জবাব খুজে নিতে হবে, প্রতিটি জনতা হবে আগামীর সৈনিক, এসব ষড়যন্ত্রের জবাব একমাত্র দক্ষতা দিয়ে মোকাবেলা করাই সম্ভব। বোমা দিয়ে নয়, যুক্তি দিয়ে, তথ্য দিয়ে, সত্য দিয়ে অসত্যকে রুখে দিতে হবে। অসৎ পথে যে হাটে সে চিরদুর্বল। ‘জোঁকের মুখে চুন’ দেয়ার একটি প্রবাদ সমাজে প্রচলিত আছে, প্রতিটি ক্ষেত্রে ঐ চুন দেয়ার কাজটি করতে হবে সঠিকভাবে।

ধর্মদ্রোহিতারও উপরে তসলিমার দেশদ্রোহিতা:  ঐ তসলিমা ইস্যুতে পরবর্তীতে পাই ঐ ‘র’ সম্পর্কীত অনেক প্রমান প্রতিবেদন। এমনকি ভারতীয় বিশ্লেষকগণ পর্যন্ত তসলিমা নাসরিনের ‘র’ সংশ্লিষ্টতা সম্পর্কীত মন্তব্য প্রকাশ করেন। এদেরই একজন হলেন ভারতের ‘ইন্সটিটিউট অব স্ট্রাটেজিক স্টাডিজের গবেষক অশোক এ বিশ^াস। ৩১ আগষ্ট ৯৪ সংখ্যা ‘দি নিউ নেশন’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘Raw’s Role in Furthering India’s Foreign Policy’ শীর্ষক এক নিবন্ধে মিষ্টার অশোক বিশ^াস উল্লেখ করেন যে, বিএনপি সরকারকে বিশ^ দরবারে সাম্প্রদায়িক, সংখ্যালঘু নির্যাতনকারী হিসাবে চিহ্নিত করার জন্য ‘র’ তসলিমা ইস্যু সৃষ্টি করেছে। তিনি একে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ‘র’ এর অন্যতম বড় সাফল্য বলে মন্তব্য করেন। তার ভাষ্য মতে, এই অনৈতিক তৃতীয় শ্রেণীর লেখিকাকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে কলকাতার প্রচার মাধ্যম। তাকে পুরো আর্থিক সহায়তা দিয়েছে ‘র’এবং ‘র’ খুব ভালভাবেই জানতো যে তসলিমা ইস্যু কিভাবে বাংলাদেশের ভিতরে গোলযোগ সৃষ্টি করবে। পশ্চিমী নারীবাদী সংগঠনসহ ইসলাম বিরোধীদেরে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে উস্কে দেয়ার জন্যই লজ্জাসহ অন্যান্য উগ্র কাজে তসলিমাকে লেলিয়ে দেয়। এর প্রেক্ষিতে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিজেপিসহ অন্যান্য হিন্দু সংগঠনগুলো তসলিমার সমর্থণে এগিয়ে আসে। এছাড়া আনন্দবাজার গোষ্ঠী ব্যাপক কভারেজ দেয় তসলিমাকে। এরা লজ্জাকে প্রমান হিসাবে ব্যবহার করে। এই আনন্দবাজার গোষ্ঠীই পরবর্তীতে তাকে পুরষ্কারে ভূষিত করে। দেখা যাচ্ছে ভারতই তার আশ্রয়স্থল আজো। ১৯৯৯ সালে আবারো তিনি ফিরে যান আনন্দবাজার গ্রুপের ইঙ্গিতে। ২০০০ সালে পুনরায় তিনি ভূষিত হন ‘আনন্দ পুরষ্কারে’। বর্তমানে এই ২০০৭ সালেও তিনি ভারতে সেখানের নব্য নাগরিকত্ব আদায়ে ব্যস্ত।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ধিকৃত বাংলাদেশ: ১৯৯৩-৯৪ সালে ভারতের সর্বত্র বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে মৌলবাদী সংগঠন বিজেপিসহ অপরাপর রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা তসলিমার সমর্থণে মিটিং মিছিল এর আয়োজন করে। তার ‘লজ্জা’ উপন্যাসের হাজার হাজার কপি ছাপিয়ে বিনামূল্যে বিলি করেছে। এ ব্যাপারে কলকাতা থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক ‘কলম’ পত্রিকার ১লা আগষ্ট ৯৩ সংখ্যায় বলা হয় ‘নারী কর্তৃক পুরুষের অবাধ ধর্ষণের প্রবক্তা আনন্দ পুরষ্কার ভূষিতা তসলিমা নাসরিনের সাম্প্রতিক একটি বইএর নাম ‘লজ্জা’। বইটি প্রকাশিত হয়েছে ঢাকা থেকে কিন্তু বিক্রি হয়েছে পশ্চিম বাংলায়। বিজেপি মানসিকতার বুদ্ধিজীবিরা ঝোলা বেগে বয়ে বয়ে বইটি পুশসেল করে বেড়ান। এক শিল্পপতি নাকি বিনামূল্যে বিতরণের জন্য বইটির আগাম কপি কিনে নেন। যাদবপুর বিশ^বিদ্যালয়ের এক ইতিহাসের অধ্যাপক নিজ খরচে বইটির ফটোকপি বিলি করে বেড়িয়েছেন। ‘লজ্জা’ নিয়ে এত মাখামাখি এ কারণে যে বইটিতে বাংলাদেশের মৌলবাদীদের নামে মিথ্যাচারের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। উপন্যাসের নামে দেশের হিন্দুদের খুন, ধর্ষণ, শোষন, নিপীড়ন, হতাশা, বঞ্চনা, গণহত্যা ও মানবেতর জীবনের এক রগরগে বর্ণনা রয়েছে এর ভিতরে। এসব কাজে ভারতের বড় লাভ হয় বারবী মসজিদ ইস্যুর বদলে স্থান করে নেয় তসলিমা ইস্যু। এর সূত্র ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সিএনএন থেকে শুরু করে নিউইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্ট এর মতো প্রভাবশালী পত্রিকাতে তসলিমা নাসরিনের সমর্থণে বাংলাদেশকে একটি মধ্যযুগীয় মৌলবাদী দেশ হিসাবে প্রচারনা চালানো হয়। ঠিক তখনই ‘নিউইয়র্ক টাইমস’ এ তসলিমা নাসরিনের উপর লেখা ‘সেন্সরশিপ বাই ডেথ’ শিরোনামের এক সম্পাদকীয়তে বাংলাদেশকে ধিক্কার জানানো হয়। তসলিমার লজ্জা বইএর নামের অনুকরণে ‘শেম’ শব্দ দিয়ে। ১৩ জুলাই ৯৪ সালে ঐ পত্রিকায় ছবিসহ তিন কলামের শিরোনামে একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। এর ঠিক পরদিন ১৪ জুলাই ৯৪ তারিখে আবার তসলিমাকে লেখা সালমান রুশদীর খোলা চিঠি সম্পাদকীয় পৃষ্ঠায় বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে ছাপে নিউইয়র্ক টাইমস।

বিজেপির ষড়যন্ত্রী হুমকি, অঙ্গরাজ্য করার হুমকি: এদিকে বিদেশী পত্রপত্রিকায় এই ফলাও করে প্রচারিত থাকার পিছনের শক্তিই ছিল ‘র’। এখানের নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক ঠিকানায়ও এসবের উপর এসময়কার খবর ছাপে। সে সময়ে বিজেপির হুমকি ছিল দুই কোটি মুসলমানকে বিতাড়িত করবো এবং বাংলাদেশকে অঙ্গরাজ্য বানাবো। বিজেপি ১৯৯৩-৯৫ সাল পর্যন্ত তসলিমার লজ্জাকে পুজি করে বাংলাদেশ থকে হিন্দু বিতাড়ন ও মুসলমান অনুপ্রবেশের প্রমান দাঁড় করিয়ে কাজ করে। উল্লেখ্য কলকাতা থেকে প্রকাশিত থেকে দৈনিক পত্রিকায় ২৭ সেপ্টেম্বর ৯৩ সংখ্যার এক খবরে বলা হয়, ‘বিজেপি কেন্দ্রে ক্ষমতায় যেতে পারলে এক মাসের ভেতর দুই কোটি মুসলমানকে ভেংগে ভেংগে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়া হবে। দেখা গেছে কখনো শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাসের পিছনে কাজ করেছে ‘র’। বাংলাদেশী ছাত্রছাত্রীদের ভারতে পড়াশুনার একটি ক্ষেত্র সৃষ্টি করতে এর চেয়ে বড় বিকল্প আর অন্য কিছু হতে পারে না। দুই বাংলা একত্রিকরণের একটি বিষয় এর মাঝে কাজ করে এর প্রমানও পাওয়া যায়। নিজের দেশটিকে ঘুড়ির লেজের দেশ মনে করে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা এবং বৃহৎ দেশটির প্রতি তার বাড়তি আকর্ষন লক্ষ্য করা যায় তার লেখাতেই। ১৯৯২, ১৯৯৩, ১৯৯৪ সালে দুই বাংলা একত্রিকরণের উপর ব্যাপক প্রচারণা হয় দুরদর্শনে, পেপারে, অপারের নাটকে নভেলে। বাস্তবতা হচ্ছে ভারতীয় জাতীয়তাবাদ ও হিন্দু জাতীয়তাবাদের মিথ্যা প্রচারণাকে অস্বীকার করে নিপীড়িত বিভিন্ন জাতি দিল্লীর শাসন থেকে মুক্তি চাইছে। যার কারণে নাগা মিজো, অহমিয়, গুর্খা, ঝাড়খন্ড, কাশ্মীর, ও পাঞ্জাবে স্বাধীনতাকামীদের সাথে তাদের নিয়তই লড়তে হচ্ছে। সিকিম গ্রাস করে ২২তম রাজ্য হিসাবে ঘোষনা করা ভারতীয় শাসকদের একটি অপকর্ম সন্দেহ নেই। হায়দ্রাবাদকে পেটে ঢুকিয়েছে। একই লক্ষ্যে ৩১ অক্টোবর ৯৩ তারিখে কলকাতার ‘আনন্দবাজার’ পত্রিকায় একটি ক্রোড়পত্র প্রকাশিত হয় বেশ ঢাকঢোল পিটিয়ে। ঐ ক্রোড়পত্রে এই আত্মবিক্রেতা মহিলার ‘বন্দী আমি; নামে একটি নিবন্ধ ছাপা হয়। সেখানে তিনি অনেক আক্ষেপ প্রকাশের পর লেখেন, ‘আমরা কবে এক হবো, হাঁটবো বনগাঁ থেকে বেনাপোল’। এসব প্রচার প্রচারণা মোটেও বিচ্ছিন্ন কোন ঘটনা ছিল না।

দেশদ্রোহীতায় দাগীরা: দেশের গুরুত্বপূর্ণ দলিল ভারতে পাচার ও রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিঘিœত করার অপরাধে অভিযুক্ত রাজশাহী বিশ^দ্যিালয়ের জেলাশাখার সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব রায় মিন্টু, কৃষি মজুর গয়ানাথ, এবং ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার আয়েজুদ্দিন, কারিতাস কর্মচারী চিত্তরঞ্জন, কেরানী তাপস মিশ্র, উমা রানী, অনুকূল বিশ^াস উল্লেখযোগ্য। এদের অনেকের কাছেই রাষ্ট্রীয় অনেক উল্লেখযোগ্য কাগজপত্র পাওয়া যায়। ২৮ ফেব্রুয়ারী ১৯৯২ সালে ঢাকার জাতীয় যাদুঘরে বিশ^ শান্তি পরিষদ ও বাংলাদেশ শান্তি পরিষদ নামের দুটি সংগঠন আয়োজিত ‘দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে নয়া তাগিদ’ সেমিনারে দুই বাংলা একত্রি করণের উপদেশ ও তাগিদ দেয়া হয়। সে সময় জিটিভিতে ‘ফিরে এলাম’ নামে একটি ধারাবাহিক প্রদর্শিত হয় দীর্ঘদিন ধরে। সহজেই বলা যায় আরো বহু ঘটনাই আছে যা সবকটি ঘটনাই কিন্তু একসূত্রে বাঁধা ঘটনাবলী। বিশ^ শান্তি পরিষদ, আনন্দবাজার, তসলিমা নাসরিন, জিটিভি এসব একই কন্ঠক মালার বিচ্ছিন্ন ফুল মাত্র।

২০০৭ এ সেই পুরোনো খেলা: সম্প্রতি এবারে এই ২০০৭এও শুরু  হয়েছে সেই পুরানো খেলা। সেখানে নন্দীগ্রাম, তসলিমা ইস্যু, একের বদলে অন্য, ইস্যু হলেই হলো একাকার হয়ে কাজ করছে। ভারতের এই লোকচুরি খেলা সাধারণেরা বুঝে কম, তাই চতুরেরা নীতিহীনরা এখেলা খেলতে উৎসাহী। যারা এ খেলার ভিতরে ঢুকবেন তারাই আঁচ করতে পারেন এর কানা মাছি ভোঁ ভোঁ খেলা বাংলাদেশে ‘র’ এর পক্ষে তারাই কাজ করতে উৎসাহ পাবে যার ভিতরে দেশপ্রেমের চেয়ে মরণ কামড় দিতে বেশী উৎসাহ। নয়তো কোন বিবেকবান সত্ত্বা এর ইন্ধনে কাজ করতে পারে না। কোন মুসলিমতো পারেই না, তার ঈমান থাকবে না। এরা আত্মবিকৃত জনতার অংশ, দেশদ্রোহিতার কাজ করছে। নিরপেক্ষতার অবয়বে আঁকা ধর্মে দ্রোহীর ভূমিকা রাখতে গিয়ে এই অপকর্মে  জড়িয়ে এ মহিলা যে নিকৃষ্ট পরিচয় স্পষ্ট করেছেন, তাকে ঘৃণা জানানোর ভাষা জানা নেই। সঙ্গত কারণেই বলি যে মানুষ এত সহজে নিজে বিক্রি হতে পারে, তার মুখে আর ধর্ম নিয়ে শুদ্ধির কাজ মানায় না। যে মিরজাফর জগৎশেঠ উমিচাঁদরা একদিন স্বদেশের বিরুদ্ধে গিয়েছিল শুধু মাত্র নিজের আখের গোছাতে, কিন্তু ইংরেজ তার নিজের জন্য নয়, বরং তার দেশের জন্য এদেশের আম ছালা সবই নিয়ে গেল। এ সোজা অংক বুঝলো না বিশ^াসঘাতকরা, এরা যুগে যুগে মানুষ নামের কলঙ্ক। তবে গালির ভাগ পুরোটাই পড়েছে মিরজাফরের উপর, বাকীরা আজো সরব আছে তাদের অপকর্মে, উপরে ওদের নাম বার বার আসছে। তসলিমা মিরজাফরের যমজ বোন। তার মুখে ধর্মের কথা, নীতির কথা, যেন ভুতের মুখে রাম নাম। যে নিজেই কলংকিত সে কোন সাহসে ধর্মের কথা শুদ্ধির কথা বলতে পারে। এত নিকৃষ্ট একটি দানব এ দেশে জন্মেছে মনে হতেও ঘৃণায় অন্তর গুলিয়ে উঠে। আমি তার বিরুদ্ধে বিগত শতকে বই লিখেছি, কোথাও তাকে আমি সামান্যতম কটু কথা বলি নাই। আজই প্রথম আমি নিজেকে সংযত রাখতে না পেরে কিছু শক্ত কথা বললাম।

অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ: এদের জীবন পুরোটাই ব্যর্থ, এতদিন তাকে অন্তত মানুষ মনে হতো। এর পর তাকে মানুষ মনে করার কোন অবকাশ নেই। বাংলাদেশের মানুষ যে কত ভালো এত করার পরও বাংলাদেশে কোন হিন্দু নির্যাতন নেই কোন গুজরাট কখনোই ঘটেনি। এরকম ঘটনা ঘটুক সেটি কেউ চায়ওনা। মোদির ভারত এখানে রচিত হোক এটি কারো কাম্য নয়। তারপরও দেখা যায় কথায় কথায় কৌশলে অনেকেই গুজরাটের প্রসঙ্গ টেনে উত্তরটি নিজে নিজেই দিয়ে দেন বলে বসেন, বাংলাদেশে যে হিন্দু নিধন হচ্ছে! জবাবটা ইতিহাসের পাতায় জমা থাক। ক্রুসেডের বদনাম খুব কৌশলে দিয়ে দেন প্রতিপক্ষের বক্তারা মুসলিমদের উপর। কিন্তু যারা সঠিকভাবে ক্রুসেডের ভিতরে ঢুকবেন একমাত্র তারাই বলতে পারবেন কোথাকার জল কোথায়, কতটুকু গড়িয়েছিল। ইতিহাস ছিল বলেই রক্ষা। তার স্বযতেœ রক্ষিত সংগ্রহই উত্তর জমা করে  রেখেছে খুব সন্তর্পনে। আর একজন নিরব দর্শক সব পর্যবেক্ষণ করছে এই ভরসা। যদিও জন্মান্ধ তসলিমার ঐ সত্যে মানা না মানাতে কিছু যায় আসে না। চোরা না শোনে ধর্মের কাহিনী।

কটি স্পষ্ট কথা: প্রকাশ্যে অপ্রকাশ্যে বর্তমান সময়টিতে অনেকেই মুসলমানদের উপর বেজায় ক্ষ্যাপা দেখা যায় কারণটি যে কি হতে পারে তা সঠিকভাবে বোধের মাঝে আসে না। টেররিস্ট নামের গালির ভার মুসলমান বয়ে বেড়াচ্ছে, তবে দিনে দিনে ঐ মিথ্যাচারের ইমেজে ফিকে রংএর প্রলেপও পড়ছে। অনেকের দুরভিসন্ধি প্রকাশ্য দিবালোকে বেরিয়ে পড়ছে। টেররিস্টের চুলোয় আগুন দিতে এখন আর মানুষ আগের মতো ছুটে আসতে পারছেন না, এমনকি টুইনটাওয়ারের বছরপূর্তি অনুষ্ঠানেও জনতার টান কমছে, কেন? এ কেনোর নিশ্চয়ই একটি উত্তর আছে, নিশ্চয় বিনা কারণে নয়। অনেকে এরকমও বলছেন এবার আসলেও আর আগামীতে আসবো না। সত্য আর মিথ্যা দূরীভূত হলে বহুধারার মিলন মেলা এই আমেরিকার মানুষ চলার পথে আরো সহজ রাস্তা খুজে পাবে, এটি ঠিক। যাক সে অন্য ইতিহাস, একটি বলতে আরেকটি টানতে চাচ্ছিনা। তবে মুসলিমদের প্রতি হিংসার একমাত্র কারণ হচ্ছে তাদের ফজলি আম হওয়া। তাই সবাই ঐ গাছে ঢিল মারে। শেওরা গাছে কেউ ঢিল মারে না, সে কথাটি আমি কলামের জবাবেও বলেছি। উদারমনা মুসলিমরা এসব এড়িয়ে গেছে সবদিন। ভারত সংকীর্ণতায় মানুষের বদলে দানবীয় অর্জনের বাহূল্যে ভরা। ইন্দিরা গান্ধী যদি নিজ দেশে এভাবে বিবেকহীনদের লেলিয়ে তুলেন তবে তাকে নিয়েও ইতিহাসে শ্রদ্ধার বদলে অন্য কিছু জমা হবে, নিকৃষ্ট অর্জন তারও জমবে। নষ্ট মিথ্যাকে পুরস্কৃত করা মানে দানবের পক্ষে মাস্তি করা। এরাই তারা যাদের নিজের লজ্জাবোধ শিকেয় তুলে রেখে অন্যকে জ্ঞান দিতে আসে। গুজরাটের অপকর্মের জমা, সাম্প্রতিক মানচিত্রে চৌর্যবৃত্তির খতিয়ান রেখে তারা মনের মাধুরী দিয়ে সর্বত্র মানুষের আদালতকে পাশবিকতায় পরিবর্তিত করছে কিসের অহংকারে। এ লজ্জা বাংলাদেশের ছিল না, বাবরী মসজিদ ভেঙ্গে, কাশ্মীরের মুসলিমদের উপর অন্যায় নির্যাতন করে, গুজরাটের নির্দোষ ২০০০-৩০০০ মুসলিম খুন করে নিজের লজ্জার দুর্গন্ধে আকাশ বাতাস কলুষিত করে রেখেছে ভারত, ওসব ঢাকবে কি দিয়ে? তাদের বর্ণবাদী ভগবান কি  দৃষ্টিহীন অন্ধ, তিনি কি এসব বিচার করবেন না বলেই মনে হয়? জবাব দিতে হবে বাংলাদেশের হিন্দুদেরকেও। ঘি খাবো ননী খাবো আর কিলের ভাগ নিবে শুধু মিরজাফর একা। তাই কি হয়? আপনাদের বিবেক কি বলে, আপনাদেরেও জিজ্ঞেস করছি, সত্যটা চড়া গলাতে বলতে শিখুন, যেটি আপনারা সচরাচর করেন না। আহারে ভারত নিজের অপকর্মে লজ্জা পায় না, আর তসলিমার লেখাতে লজ্জায় একদম লাল!

পুরষ্কারের কি বাহারী নমুনা! এওয়ার্ড ও সাহিত্য, গবেষনা, মানুষকে মর্যাদাবান করে সন্দেহ নেই। সালমান রুশদীর এরকম একটি খবরে অনেকেই বিচলিত হয়েছেন। যোগ্যতার ভিত্তিতে নাইটহুড প্রাপ্তির বিরল সম্মান পেয়েছিলেন সালমান রুশদী, অপকর্ম করে যদি পুরষ্কার পাওয়া যায় তো ভালোই। তসলিমাও পেয়েছেন। কিন্তু অপকর্ম করেও যখন দানবেরা ওসব ছাই ভস্ম পায় তখন কি আর সে সম্মান মনে প্রশান্তি দিতে পারে? হয়তো নীতিহীনদের পারে। এরা এমন সব মানুষ যারা দুনিয়াতে অশান্তির দাগ রেখে বড় মাপের অশান্তি সৃষ্টি করেছে। কথা বলার ওজুহাতে স্বাধীনতার নামে মিথ্যাচার করবে ষড়যন্ত্র করবে অন্যের গুটি হয়ে দেশ বিরোধী কাজ করবে সেটি মানা যায় না। ধিক্কারই তাদের জীবনের জমা। কথা বলতে পারা সবার জন্মের অধিকার। তাই বলে একজন সম্মানিতকে অসম্মান করায় পুরষ্কার পাওয়া নীচতার পরিচয় দেয়, এ অপরাধের গভীরতা মাপার কোন যন্ত্র আবিস্কৃত হয়নি। এসব ঘটনা সভ্যতা মাপার ব্যারোমিটার অবশ্যই। সর্বাবস্থায় মুসলিমদের জন্য ধৈর্য্যই উত্তম মহৌষধ। তবে চেতনহীনতার কোন সুযোগ এখানে নেই। এখানের প্রতিটি সদস্যকে সচেতন থাকতে হবে, বিবেককে কড়া পাহারায় রেখে সিদ্ধান্তে অটল থাকতে হবে। সামান্য কারণেই অধৈর্য্য না হয়ে সাহসের সাথে প্রতিটি প্রতিকূলতা পার হয়ে মানবতাকে উপরে তুলে ধরে আত্মসম্মান নিয়ে বেঁচে থাকাই মানব জীবনের সার্থকতা।

এওয়ার্ডের আড়ালকথা: বৃটেনের বিখ্যাত ডেইলী মেইলের কলামিস্ট মিজ রুথ ডাডলি এয়ার্সএর উক্তি, ‘তিনি সালমান রুশদীর সেই বুকার প্রাইজ পাওয়া বইটি বহু চেষ্টা করে ৫০ পাতাও পড়তে পারেন নাই। কারণ হিসাবে উল্লেখ করেন এটি পাঠ যোগ্য কোন সাহিত্যই নয়। একই রকম বক্তব্য পাওয়া যায় স্যাটানিক ভার্সেসের উপরও। তিনি উল্লেখ করেন এটি একটি উস্কানী মূলক গ্রন্থ ছাড়া আর কিছুই নয়। এক কথায় সাম্প্রতিক উপাধীর নেপথ্যে কাজ করে বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী ব্লেয়ারের কৃতকর্মের সাক্ষর। খুব সহজেই এখানেও যুদ্ধবাজ মিঃ ব্লেয়ারকে ওজন নেয়ার আরেক সহজ অংক ধরা পড়ে। বৃটেনের হাউস অব কমন্সের ঝ্যাক স্ট্র একই রকম মন্তব্য রাখেন, ‘আমি তার কোন বই পড়ে শেষ করতে পারি নি। তার বই আমার কাছে কঠিন মনে হয়’ (তথ্যটি দি টাইমস ও ডেইলী মেইল অবলম্বনে)। সভ্যতার মানদন্ডে বিচার যে কিভাবে হচ্ছে, সেটি বোঝা ভার। এমনভাবে যে একজন কেমন করে একজনকে আক্রমণ করে গালাগাল অপকর্ম করেও পুরষ্কৃত হওয়া যায়। এভাবে ক্রসেড ক্রমে যুদ্ধের রুপ নেয় যদিও অনেকের চোখে হয়তো এটি ছিল মানবতার সেবা, হয়তো কারো চোখে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা। এরা যারা অতি অল্পেই সাহিত্যে সভ্যতায়, লাইম-লাইটে উঠে আসতে পারছে এই একটি কঠিন মিথ্যা বলতে পারার জন্যই মনে হয়। কখনো মনে হয় বর্তমান সভ্যতা মিথ্যাকে পছন্দ করে অতিরিক্ত। দেখা যায় এত প্রমাণ প্রতিবেদনের মাঝেও মিথ্যা তার অবস্থান করে নেয় ঠিকই। এটি কিভাবে সম্ভব হয়, স্বভাবতই এ প্রশ্নের উত্তর হলো এর পেছনে শক্ত মিথ্যার শক্তিশালী যোগানদাতার কারণেই এটি সম্ভব হয়, মিথ্যা সত্যের মতোই জীবন্ত হয়ে উঠে।

তারপরও বলতে হয় আজকের বিশ্ব ইসলাম আতঙ্কে ভুগছে, কিন্তু কেন? একটি টার্গেট করা ধর্মকে গালি দিতে পারার বাড়তি ক্রেডিটের কারণে অনেকে পুরষ্কৃত হচ্ছেন, সাথে সাথে পরিচিতি বেড়ে গেল, খবরের শিরোনাম হওয়া গেল, অনেক প্লাস পয়েন্ট অবশ্যই। তারপরও তাদের বাকী সবটুকুই হতাশার, আশার জমা কিছু নেই। সত্যের উপর ভর করা বিজ্ঞানীর আবিষ্কার ইতিবাচক ফল নিয়ে আসে সন্দেহ নেই কিন্তু মিথ্যার সাথে সন্ধি করে যারা বিজয় ছিনিয়ে আনে তাদের এ ঠুনকো পাওনা অতি অল্পেই তাসের ঘরের মতো ভেঙ্গে যাবেই। বরং অনাচারীদের অপকর্ম সত্যকে প্রতিষ্ঠা করতে উৎসাহ যোগায়। কখনো কি মনে হয় এসব কিছু সত্য ধর্মের বিপক্ষে যাচ্ছে? মোটেই না। বরং তাদের অপকর্ম ধর্মটির জন্য ইতিবাচক অবদান যোগাড় করছে বেহিসাবে। মানুষের কাছে সুস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে সত্য আর মিথ্যা, সাদা আর কালো, আলো আর অন্ধকার। মনে হচ্ছে সত্য যুগ খুব কাছেই।

কলামটি লেখার সময় ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০০৭।

 

বি দ্রষ্টব্য: লেখাটি নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক দি রানার নিউজে ০১/০১//২০২০ এ ছাপা হয়েছে।

নাজমা মোস্তফা

শিরোনামের কথাটি গবেষনার দৃষ্টিতে ধরা পড়া চরম সত্য কথার একটি। আদি সনাতন ধর্ম খুঁজলে একটি চরম সত্য ও সুন্দর সত্ত্বাই ধরা পড়ে। বাকী সবটাই বহুত্ববাদ নামের গোজামিল। ময়দানের দুর্বলরা এর ভোগের শিকার হয়েছে যুগে যুগে। সতিদাহের যন্ত্রণা নারীদের জন্য জমা করা। এটি যদি ধর্ম হতো তবে কেন বৃটিশকে পরিশুদ্ধির কাজ করতে হলো। বড়কবি রবীন্দ্রনাথ যে গতিতে বৃটিশ তোষামোদি বন্দনা করেছেন সে একই গতিতে ধর্মের নামে সতিদাহের নামে নষ্ট বন্দনা গীতি গেয়েছেন। তার মত মোড়লরা সংস্কারে হাত দেন নাই। উল্টো আরো সমাজ ধ্বসের রসদ জুগিয়ে গেছেন। সঙ্গত কারণেই আজও তাদের সমাজ তিমির অন্ধকারে ডুবে আছে। ঐ অপকর্মের খেসারত হিসাবে সারা বিশে^ ইসলাম ও মুসলিমরা আজ কার্তুজের সামনে। সত্যকে গ্রহণ করার মানসিকতায় তারা পিছিয়ে। এক হাতে তলোয়ার আর এক হাতে কুরআনের মিথ্যাচারে তারা প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। এর বড় কারণ তাদের হিনমন্যতা আর ইসলামের সুমিষ্ট ভাব, তার ফজলি আম হওয়া।

ধর্ম যদি মিথ্যার উপর ভর করে দাঁড়ায় তবে তা আর ধর্ম থাকে না। সেটি হয় অধর্ম। বিশেষজ্ঞরা বলছেন বাবরি মসজিদের নিচে কোন মন্দিরের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। এটি খবরের শিরোনাম (প্রথম আলো, ০৭ ডিসেম্বর ২০১৮)। খবরে প্রকাশ প্রতœতত্ত্ব বিশেষজ্ঞ সুপ্রিয় ভার্মা ও জয়া মেনন মসজিদ ধ্বংসের ২৬তম বার্ষিকী উপলক্ষে তারা হাফিংটন পোস্ট ডটইনের এক প্রতিবেদনে এটি স্পষ্ট করেন। ভারতের প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তর এএসআই এ মিথ্যায় ধরা পড়েছে। ২০০৩ সালে বাবরি মসজিদ খননকালে এলাহাবাদ হাইকোর্টকে এএসআই জানায় মসজিদের নিচে একটি নয়, তিনটি রামমন্দিরের অস্তিত্ব পেয়েছে। সুপ্রিয় ভার্মা জওহরলাল নেহরু ইউনিভার্সিটির প্রতœতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক এবং জয়া মেনন শিব নাদার ইউনিভার্সিটির ইতিহাস বিভাগের প্রধান। তারা খননকাজ পর্যবেক্ষন করে ২০১০ সালে ইকোনমিক অ্যান্ড পলিটিক্যাল উইকলি নিবন্ধে লিখেছিলেন।  বিজেপি সরকারের চাপে ছিলেন প্রতœতত্ত্ববিদরা, সাম্প্রতিক এটি স্পষ্ট হয়। এই হচ্ছে মিথ্যা মন্দিরের পক্ষের যুক্তি। ঐ সময় অনুসন্ধানের নেতৃত্বে ছিলেন বি আর মানি। ২০১৬ থেকে মোদি সরকার তাকে জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক পদে বসায়। সুপ্রিয় ভার্মার মতে, বাবরী মসজিদের নিচে পুরোনো ছোট মসজিদ ছিল। এর পশ্চিম দেয়ালে, ৫০টি পিলার ও স্থাপত্যশৈলী তারই প্রমাণ। পশ্চিমের দেয়াল দেখলেই বোঝা যায় ঐ পাশে মুখ করে নামাজ পড়া হতো। এর কাঠামো মসজিদের মত, মন্দিরের মত নয়। এই যদি হয় ধর্মের ও ভগবান রামের অবস্থা তবে আফসোস ঐ সব অনুসারীদের জন্য যাদের মাথা পুরোটাই গোবর গণেশ হয়ে গেছে। অতিসার অতিবুদ্ধিতে অসার মূর্তিপূজকদের দুর্দশা দেখে হতবুদ্ধ গোটা মুসলিম সমাজ। এই তাদের সাধুতার নমুনায় ভন্ডামীর উদাহরণ। অতি ভক্তি চোরের লক্ষণের মতই করজোড়ে প্রণামের মহাত্য বুঝি তাই! গান্ধীজীর মুখে ছিল ‘যহি আল্লাহ সহি রাম, সবকো সম্মতি দে ভগবান।’ আল্লাহর সাথে রামের একাত্বতার সব গোমর ফাঁস! জিহাদের নাম নিয়ে সারা দুনিয়ায় সন্ত্রাসী বানিয়ে ছড়ানো হয় ঠিক বাবরী মসজিদের প্রতœতত্ত্বের মিথ্যা প্রচারের মতই। ষড়যন্ত্রী ত্রিশূল হাতে পেটে বিদ্ধ করলেও তারা সাধু, সন্ত্রাসী নয়। হাজার হাজার লাশ লুটিয়ে পড়লেও ঐ ত্রিশূল লুকানো থাকে, প্রচারিত নয়, দেখে না দেখার ভান সবার। প্রচারে থাকে শুধু ছলবাজ তলোয়ার আর সত্য কুরআন যাকে মিথ্যে দিয়ে সাজিয়ে প্রতিনিয়ত শান দেয়া হয়। ঐ শান দানে কবি সাহিত্যিকরা নেতা নেত্রীরা আগুয়ান ছিলেন, এটিই ইতিহাস ও বাস্তবতা।

২০১২ সালে একটি বই লিখেছিলাম, বইটির নাম “একই ধর্ম একই ধারা”, ৩৫০ পৃষ্ঠার এ বইটিতে দেখাবার চেষ্টা করেছি কিভাবে প্রধান তিনটি ধর্ম ইহুদী, খৃষ্টান ও ইসলাম এক সূতায় গাথা একেশ^র ধর্মের গোড়াটা। তাছাড়াও বাকী বৌদ্ধ, জৈন, হিন্দু শিখ ধর্মের গোড়াটাও ঐ এক জায়গায়ই প্রাথিত। সবকটি প্রধান ধর্মই একেশ^রবাদ। এখানে দুই তিনের কোন অস্তিত্ব নেই তারপরও এরা কালের ধারাতে তেত্রিশ কোটিতেও পৌছে গেছে বিনা বাধায়। এই স্থলন ঠিক বাবরী মসজিদের স্থলনের মতই অনৈতিকতা দিয়ে ভরা। যুগে যুগে মোদিবাজরা এভাবে ধর্মের সর্বনাশ করেছে, বারোটা চৌদ্দটা বাজিয়েছে। আজ এত স্বল্প পরিসরে এত বিশাল বিষয়টি খুব সংক্ষেপে তুলে ধরতে চাচ্ছি।

ইসলামের শুরুটা হযরত আদমের সময় থেকে। আদমের ১০৫৬ বৎসর পর নূহের আবির্ভাব, ইবনে আব্বাস ও আবুজর বর্ণনা করেছেন যে, আদম ও নূহের মাঝখানে দশ শতাব্দী অতিক্রান্ত হয়েছে (মুস্তাদরাক, হাকেম ও তিবরানী)। নূহের যুগেই ধর্ম ব্যবস্থা সত্যিকার অর্থে একটি বিশেষ রুপ লাভ করে। আদমের যুগ ছিল প্রস্তুতির যুগ। আদমের যুগে সহোদর ভাই বোনদের মাঝেও বিবাহ ব্যবস্থা চালু ছিল। প্রাচীন ভারতেও সহোদর ভ্রাতাদের সাথে বোনদের বিয়ে হত। তখন বিয়ে ছিল বাধ্যতামূলক (ভারতে বিবাহের ইতিহাস ১৫ ও ২৫ পৃষ্ঠা।) দশরথ জাতকে ভ্রাতার সঙ্গে ভগ্নির বিয়ের কথা শোনা যায়। (জাতক চতুর্থ খন্ড, ৭৫ পৃষ্ঠা টীকা)। নূহের যুগের প্লাবন, নৌকা নির্মাণ, নৌকা নিয়ে পর্বতে আশ্রয় লাভ, কুরআনে সূরা হূদের ৩৮, ৪১, ৪৫ ও সুরা মু’মিনুনে প্লাবন ও নৌকার উল্লেখ আছে। তৌরাতের আদি পুস্তকে ৭ও ৮ অধ্যায়ে এ ঘটনার বিবরণ দেখতে পাওয়া যায়। অনুরুপ শতপথ ব্রাহ্মণে, মহাভারতে এবং অথর্ববেদে মনু মহাপ্লাবন ও নৌকা নির্মাণ  ইত্যাদির ঘটনা হুবহু কুরআন ও বাইবেলের অনুরুপ বর্ণিত হয়েছে। প্লাবন, নৌকা নির্মাণ, গিরিশৃঙ্গে গমন ও প্রাণীসমূহের বিনাশের কথা শতপথ ব্রাহ্মণের ১/৮/১/১-৬ শ্লোকে রয়েছে, প্রাণীর বিজ নিয়ে নৌকা যাত্রার কথা মহাভারতে ৩/১৮৭/৫২-৪ শ্লোকে বিবৃত হয়েছে। মনুর পুত্রের বিনষ্ট হওয়ার কথা মহাভারতের ১/৭৫/১৫.২-১৮ শ্লোক সমূহে দেখতে পাওয়া যায়। এসব বর্ণনায় নূহ এবং মনু যে অভিন্ন ব্যক্তি তাতে কোন সন্দেহ নেই। হযরত ইব্রাহিমও মূর্তিপূজকের ঘরে জন্ম নেন। পিতৃগৃহে প্রতিবাদী হয়েই তিনি ধর্মান্তরিত হয়ে নিজেই ইসলামে আসেন। বাবরী মসজিদ ভাঙ্গার শুরুতে যে বালবীর সে ইত্যবসরে ধর্মান্তরিত হয়ে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে ঢিলের বদলে পাটকেল হিসাবে শত মসজিদ বানাচ্ছে।

আল্লাহ ইব্রাহিমকে গ্রহণ করেছিলেন বন্ধুরুপে (সূরা নিসার ৪:১২৫ আয়াত)। ইব্রাহিম এবং তার সত্যিকার অনুসারীদের মধ্যেই রয়েছে উৎকৃষ্ট আদর্শ (সুরা মুমতাহানাহ ৫,৭ আয়াত)। কুরআন বলে আল্লাহর নিকট একমাত্র মনোনীত ধর্মই হল ইসলাম (সুরা আল-ইমরান ২০ আয়াত)। ইব্রাহিমকে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা হলেও তিনি আল্লাহর রহমতে তা থেকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার পেয়েছিলেন। তেমনি উপনিষদ বলে, সর্বজবেন তন্ন শশাকদগ্ধম অর্থাৎ আগুন ব্রহ্মার একটি তৃণও দগ্ধ করতে পারলনা। (কেনো ৬/৫/৬)। বাল্যকালে আমি আমার হিন্দু বান্ধবীদের কাছে শুনেছি যখন ধর্ম শিক্ষা বা ইতিহাস পড়তাম তখন বলতো তাদের চড়ক পূজাতে ইব্রাহিমের মতই একজনকে আগুণে ছুঁড়ে দেয়ার আনুষ্ঠানিকতা করতো। আমি অবাক বিস্ময়ে বোকার মতই তাদের গল্পকথা মনে পুষে রেখেছি, আজ মিলাচ্ছি।  উলেমাদের মধ্যে অনেকেই ইব্রাহিমকে ব্রহ্মা বলে স্বীকার করেছেন, যেমন আর্যদের মধ্য এশিয়া হতে ভারতে আগমন হতে এটুকু অনুমান করা যায় যে, আব্রাহাম বা ইব্রাহিমকে তারা ব্রহ্মা নাম দিয়ে পূজা করেছে। (তফসির সুরা ফাতেহা, মৌলানা শামছুল হক ফরিদপুরী কৃত, ৯০ পৃষ্ঠা)। সুরা আম্বিয়ার ৬৮ আয়াতে তাকে পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দিতে আমরা দেখি। অতপর ঐ সুরার (৬৯-৭০ আয়াতে) তাকে আল্লাহ কর্তৃক নিরাপত্তা দেয়া হয়। এই ব্রহ্মা ও ইব্রাহিম যে একই ব্যক্তি এর মাঝে কোন দ্বিমত থাকার কথা নয়।  নবী ইব্রাহিম যিনি মূর্তি নিধন করেও নিস্তার পাননি। পরবর্তীরা তার মূর্তি গড়েও পূজা দিয়েছে মক্কাতেই, প্রমাণ পাওয়া যায় সেখানের ৩৬০টি মূর্তির মাঝে ইব্রাহিমের মূর্তিও ছিল। হিন্দু আর্যরা অহুরকে অশূরে পরিণত করে এবং ইরানীরা দেবকে দেও বানিয়ে ঘৃণার সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করে বলে সর্বত্র প্রমাণ পাওয়া যায়। এখানেও দেখা যায় আর্য ও ইরানীদের মাঝে একটি অব্যর্থ বন্ধনের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে।

মহাভারতে বর্ণিত আছে ব্রহ্মা, যজ্ঞ, ব্রহ্মশালা, বলির জন্য যজ্ঞ পশু, এক ত্রিলোক বিশ্রুত কূপ, কেশচ্ছেদন, মোক্ষ (মক্কা) ঈশ^র, আশ্রম বায়তুল্লা (Comparative religion, p – 245, আল ফুরকান ডিসেম্বর ১৯৬৪)। শিব ব্রাহ্মণ আরবে গিয়ে উপাসনা করতেন (ঐ ৩৫ পৃষ্ঠা)। ডঃ সুনীতি চট্টোপাধ্যায় তার “অশাস্ত্রীয় পুরাণে” এই মক্কেশ্বর শিব সম্বন্ধে আলোচনা করেছেন (বাংলা একাডেমী পত্রিকা ৮/৪)। উপরের প্রতিটি অনুসঙ্গ ইসলামের হজ্জের সাথে সম্পর্কীত ও প্রমাণিত। ইসমাইলের অনুসারীরা পরবর্তীতে একের কথা গুলিয়ে ফেলে মূর্তিপূজা করেছে। ঠিক একইভাবে ইসহাকের অনুসারীরা এক আল্লাহকে ভুলে গিয়ে বাল দেবতার পূজা করেছে। সাধুদের সেলাই বিহীন ড্রেস (ইহরাম), উলুধ্বনি দেয়া, বিবাহে সাতপাক দেয়া রীতি সাতবার কাবা প্রদক্ষিণের অনুকরণে তারা আজও করে থাকে। উপনিষদের মতে স্বাস্থ্যবান সন্তান লাভ করতে হলে বা বেদ বুঝার মত জ্ঞান অর্জন করতে হলেও ষাড়ের মাংস খাওয়া জরুরী। প্রাচীনকালে অতিথিদের জন্যও গো বধ করার প্রচলন ছিল। তাই সংস্কৃত ভাষায় অতিথির অপর নাম গোঘনো (দুঃখিত, বানান বিভ্রাটের জন্য)। এ দ্বারা অতিথির আপ্যায়ন করার নিয়ম (বসিষ্ট সংহিতা)। অতএব দেখা যায় কুরআনে বর্ণিত হযরত ইব্রাহিমের গোমাংস দিয়ে আতিথেয়তায় ভারতীয়রাও এই চিরন্তন নিয়মেরই অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু মোদির ভারতে উল্টো, গো হত্যা পাপ, মানুষ মুসলিম হত্যা পূণ্য।

প্লাবন কালের নূহকে বলা হত মনূহ বা মনু Nuh / Manu / Manuh দেখা যায় এখানে Nuh এর আগে Ma যুক্ত করা হয়। A+braham+a =  Brahma. ইব্রাহিমের প্রথমা স্ত্রী সারাহ বেদে যাকে বলা হয়েছে স্মরস্মতি Sarah + Wati – Saraswati.  যার অর্থ দাড়ায় সারাহ নামের একজন মহিলা, ওয়াতি অর্থ মহিলা। দেখা যায় সারাহ একজন সতি (গুণবতি মহিলা)। বেশ কিছু পন্ডিতেরা অথর্ববেদকে আব্রাহামের গ্রন্থ হিসাবে মানেন। নবী ইসমাইল ও ইসহাক যথাক্রমে অথর্ব এবং আঙ্গিরা নামে বেদে উল্লেখিত হয়েছেন। মুসলমান ঐতিহাসিকেরা একটি মতামত দান করেন যে শীশ নবী ও আইয়ুব নবীর কবর ভারতের অযোধ্যাতে উত্তর প্রদেশ রাজ্যে আছে। জট জটিলতায় তাদের মনু একজন নয়, বহু বহু মনুরা সেখানে আছেন।

প্রতিটি জনপদে যে নবী আসেননি তাও কুরআন আমাদেরে জানিয়ে দিয়েছে। আল্লাহ বলেন, আমি ইচ্ছা করলে প্রতিটি জনপদে একজন করে সতর্ককারী প্রেরণ করতে পারতাম (সুরা ফুরকান ৫১ আয়াত)। আগের নবীরা নিজ নিজ সম্প্রদায়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন। কিন্তু মহানবী মোহাম্মদ (সঃ)কে প্রেরণ করা হয়েছে সমগ্র মানব জাতির জন্য। বিশ্বের যে কোন স্থানে যারাই বাস করুক না কেন তারা সবাই এই শেষনবী মুহাম্মদ (সঃ) এর উম্মত। আসলে হিন্দুরা যে সনাতনের বড়াই করে মুসলিমদের ঘৃণা করার প্রবণতাকে জিইয়ে রেখেছে। এর দায় তাদের নষ্ট নেতৃত্বের যা খুব আগে ছিল না। তাদের নেতাদের কৃতিত্বে তারা নিজের বিবেককে এতই কপটবদ্ধ করে রেখেছে যে, শঠতা, প্রতারণা, হিংসা, মিথ্যাচার, মসজিদ ভাংগা, নিজেদের লাভ জমা করতে তারা নিজের মন্দিরও ভাঙ্গার আচার জমা করে রেখেছে। আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে এ আচরণ হিন্দু সংখ্যালঘুরা বাংলাদেশেও করে দেখায়। দেশে ও বিদেশে অপকর্মে ধরা খাওয়া প্রিয়া সাহা তার সাম্প্রতিক বড় উদাহরণ। ধর্মের নামে সততার সব দাগ তারা মুছে দিতে কার্পণ্য করে না। তারা মনে করে অনড় মূর্তিরা তাদের রক্ষক হবে। এ অধর্ম দিয়ে ভগবান রামের বা অদেখা বিধাতার সামনে কোন সাহসে তারা সিনা টান করে দাঁড়াবে?

বাংলাদেশের মানুষ চিন্তাও করতে পারবে না ভারতের দাঙ্গার পরিসংখ্যান। তেজী নেতাদের কারণে কোন কোন বছর দাঙ্গা শত শত কোন বছরে হাজারও ছুঁয়েছে। গুজরাটের রক্ত: ভারতবর্ষের গর্ব না কলঙ্ক?  এরকম একটি ছক উৎসাহী পাঠক চাইলে সেটি পরখ করে নিতে পারেন।টি বিগত শতকের হিসাব। ইসলামের ঐ মশাল হাতে বাবর, শাহজাহান টিপু ছাড়া আরো অনেকেই ভারতবর্ষকে অসীম মর্যাদায় বিকশিত ও উন্নীত করেছিলেন। এরা অনেকেই ক্ষমতার পাগল ছিল না, ছিল আল্লাহর পাগল, সত্যের পাগল। কিন্তু খোদ রবীঠাকুরের চোখেও তারা ম্লেচ্ছ যবন নেড়ে ধেড়ে হয়ে রইলেন। তিনি এমনই সংকীর্ণ ছিলেন যে তার কাছে কুরআন মুহাম্মদ কিছুই দাগ কাটে নি। এরা বৃটিশ তোষণে নোবেল জমা করলেও ভারতের দূর্ভোগের দায় এদেরই। এরা জালিনওয়ালাবাগের অত্যাচার দেখেও বিক্ষুব্ধ হয়না, নাইট উপাধি স্যার টাইটেলের মায়া ত্যাগ করতে কুন্ঠিত থাকে। যার খেসারতে জনতারা বিক্ষুব্ধ হয়। বোকা নজরুলের মত এরা কারাগারে যায়না, উল্টো বিলেত তাদের নিরাপত্তা বলয় হয়। ঐতিহাসিক আর সি মজুমদার আক্ষেপ করে বলেছিলেন, জাতিভেদে জর্জরিত হিন্দু সমাজ মুসলমান সমাজের সাম্য ও মৈত্রীর আদর্শ হতে অনেক কিছু শিক্ষা লাভ করতে পারত কিন্তু তারা তা করে নাই (বাংলাদেশের ইতিহাস, ৩২৮ পৃষ্ঠা)। ওরা ইসলামকে চিনলো না, মুসলিমদেরেও না। মুসলিমরা মহা ঐশীগ্রন্থ কুরআনকে অন্তরে ধারণ করে এগিয়ে যাওয়া এক মহান জাতি। অবিস্মরনীয় এক মশাল তাদের হাতে, যার আলোতে গোটা বিশ^ আলোকিত হতে বাধ্য। এত বড় কথাটি বললাম কারণ এখানে কোন মিথ্যাচার নেই। এটি কোন মানুষের কথাও নয় এটি ঐশীগ্রন্থ ও ঐ কুরআনের বাণী ঐশীবাণী, সব ধর্মের গোড়ার কথা।

লেখার তারিখ: ১৮ই নভেম্বর ২০১৯।

 

বি: দ্রষ্টব্য: এ কলামটি ২২ নভেম্বর ২০১৯ তারিখে নিউইয়র্ক ভিত্তিক সাপ্তাহিক ‘দি রানার নিউজ’ ছাপে।

নাজমা মোস্তফা

 

ভারতে বাবরী মসজিদের রায়ের প্রায় দুই সপ্তাহ থেকে প্রস্তুতি পর্ব চলছে, আগে থেকেই ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। উত্তর প্রদেশের আম্বেদকর নগর জেলার আকবরপুর, তান্ডা, জালালপুর, ভিটি এবং আল্লাপুরের স্কুল কলেজে আটটি জেল তৈরী করা হয়েছে। স্কুল কলেজ সরকারী অফিস আদালত বন্ধ রাখা হয়েছে। অতীতে হিন্দু রাজত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা কল্পে লোকমান্য বাল গঙ্গাধর তিলক, গনপতি ও শিবাজী উৎসবের সঙ্গে গোরক্ষা আন্দোলনের সূত্রপাত । এসব হিন্দুত্ববাদ প্রতিষ্ঠার শুরুর ইতিহাস। এ ব্যাপারে স্বামী বিবেকানন্দের মতে, “সে রাবণ, রামায়ন পড়ে দেখ, রামচন্দ্রের দেশের চেয়ে সভ্যতায় বড় বৈ কম নয়। লঙ্কার সভ্যতা অযোধ্যার চেয়ে বেশী ছিল বরং কম তো নয়ই”(প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য, স্বামী বিবেকানন্দ পৃষ্ঠা ১১৩)। রামায়ন মহাভারত কিন্তু কাব্যের বই, ইতিবৃত্ত নহে। সত্য সত্য রাম ও যুধিষ্ঠির নামে কোন রাজা ছিল কি না, তাহা বলা যায় না (শ্রী সুরেন্দ্রনাথ সেন, এম এ, পিএইচ ডি, ডি লিট)। এ হচ্ছে ইতিহাস আর রামের অবস্থান। 

মনে রাখা প্রয়োজন মুসলিম বিপ্লবীরাই সর্বপ্রথম ভারতের বির্স্তীর্ণ অঞ্চলে সংঘবদ্ধভাবে ভারতবর্ষ হতে ইংরেজ বিতাড়নের জন্য সুদীর্ঘকাল ব্যাপী এক প্রশস্ত সংগ্রামে লিপ্ত হয়। এসব বিপ্লব আন্দোলনকে মুসলিম দ্বারা পরিচালিত ভারতবর্ষে প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম বলে উল্লেখ করা যায় (অমলেন্দু দে: বাঙ্গালী বুদ্ধিজীবী ও বিচ্ছিন্নতাবাদ, ১৩১ পৃষ্ঠা) (১৮৯ পৃষ্ঠা, গোলাম আহমাদ মোর্তজা, চেপে রাখা ইতিহাস)।  হযরত শাহ ওলিউল্লাহ ছিলেন সে যুগের ভারতের শ্রেষ্ঠতম আলেম। ১৭০৩ খৃ: তার জন্ম। তিনিই প্রথম চিন্তানায়ক আলেম যিনি ইংরেজকে ভারত থেকে তাড়িয়ে দেয়া জরুরী মনে করে সংগঠনের বীজ পুতেন। তার পুত্র, ছাত্র, ও শিষ্যগণ এ সুপরিকল্পিত সংগঠনের সভ্য ছিলেন। এভাবে প্রায় ১০০ বছরেরও বেশী সময় চলে মুসলিমদের এসব অভিযান। আজ বিজেপি চায় সেই মুসলিমদের ইতিহাস থেকে মুছে দিতে। সত্য মুচনের কি অপরিসীম প্রচেষ্টা আর মিথ্যা প্রতিষ্ঠার কি অসাধারণ প্রতিযোগিতা। এটি ভারতবর্ষ বলেই সম্ভব হচ্ছে। মুসলিম হয় লাশ আর গরু হয় দেবতা। ওদেশে অতীতে যুক্তি তথ্যের ভিত্তিতে ময়দানে যারা কথা বলেছে কাজ করেছে, তাদেরেই মাটিচাপা দিয়ে রাখা হচ্ছে।

এবার রায়ে দেখা যাচ্ছে ৩০ কোটি মুসলিমকে তাদের অধিকার ও ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছে। ২০০২ সালে গুজরাটে নির্দোষ কয় হাজার মুসলিম নিধনের মাধ্যমে ভারত তার আচরণকে বার বার স্পষ্ট করছে। গুজরাটে মুসলিমরা গোধরার আগুণের জন্য দায়ী ছিল না, কয় বছর পরের রায়ে সেটিও স্পষ্ট হয়। কিন্তু ইত্যবসরে লাশ হওয়া দুই হাজারের খেসারত পুরোটাই তাদের ঘাড়ের উপর দিয়ে যায়, বাকী আহত বিধ্বস্ত কত! সব সময়ই রক্তটা মূলত মুসলিমদের। এসব হচ্ছে সেদেশের সংখ্যালঘু মুসলিমদের দশা। বেশিরভাগ মানুষ জানেও না যে গোধরাতে মুসলিমরা কোনভাবেই জড়িত ছিল না, ট্রেনে তারা আগুণ দেয়নি। প্রথমে মুসলিম মারতে যত উৎসাহ থাকে ওরা নির্দোষ হলে ততটাই প্রচারে ভাটা পড়ে। ওসব ছিল সচরাচরের মতই পরিকল্পিত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। আসামী যখন করা হয় তখন বড় হেড লাইনে থাকে পত্রিকার প্রথম পাতাতে। ভারত এরকম আচরণ করে বিশে^র দেড়শত কোটি মুসলিমদের জন্য একটি কঠিন ম্যাসেজ ছুড়ে দিল। যেখানে বাবরী মসজিদ থাকার কোন তথ্য প্রমাণ পাওয়া যায় নি, সেখানে কিভাবে এরকম রায় বহাল হয়। যেন ঠিক গুজরাট দাঙ্গার মত ফের রায়ের দ্বারা পুনঃ অযোধ্যার অপরাধকে আইনসিদ্ধ করা হলো। মন্দির ভাঙ্গা যদি ইসলামের নীতি হত, ভারতে একটিও মন্দির থাকার কথা ছিল না। এক হাতে তলোয়ার আর অন্য হাতে কুরআন যারা বলেছেন তারা মিথ্যাচার করেছেন। এভাবে আচরণ করলে ভারতবর্ষে আজ একজনও হিন্দু থাকার কথা ছিল না আর মন্দিরের প্রশ্নই উঠতো না, যেখানে মুসলিমরা (১২০৬-১৭৭৪) পর্যন্ত শাসন করেছে। আর মন্দির ভাঙ্গা বাবরের প্রথম দিনই উৎখাত হবার কথা ছিল, কিন্তু ইতিহাস বলে বাবর ঐ মাটিতে সমাদৃত হন সুশাসক হিসাবে মর্যাদা পান।

মসজিদ নির্মাণের জন্য অন্যত্র ৫ একর জমি দিয়ে বিচারের স্বচ্ছতা বহাল রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। তার বদলে ঐ ৫ একর হিন্দুদের মন্দির নির্মান করার জন্য দিলে বিচারের স্বচ্ছতা বাড়তো। একটা কেন হাজারটাই নির্মান করুক। রায় মুসলিমরা মেনে নিয়েছে তবে সন্তুষ্ট হতে পারেনি। ১৫২৬ খৃষ্টাব্দে পানিপথের যুদ্ধ হয়। ইব্রাহিম লোদীর পক্ষে লক্ষাধিক সৈন্য থাকার পরও বাবর জয়লাভ করেন। বাবর একজন নিষ্ঠাবান মুসলিম ছিলেন। তার বুদ্ধিমত্তা, বীরত্ব, বিচার ক্ষমতা, দানশীলতা ও ধৈর্যের পরিচয় ইতিহাসে লিপিবদ্ধ আছে। মিঃ ভিনসেন্ট স্মিথ বাবরের প্রশংসা করে বলেছেন, “The most brilliant Asiatic Prince of his age and worth of high place among the sovereigns of any age or country” অর্থাৎ “এশিয়ার তদানীন্তন রাজাদের মাঝে বাবর ছিলেন খুব উন্নত এবং যে কোন যুগ অথবা যে কোন দেশের পক্ষে সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ একজন সমরাট।” আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, রাজনীতি ও কুটনীতিতে তিনি খুব পটু ছিলেন। মিষ্টার লেইনপুলও বলেছেন, “He is the link between Central Asia and India.”

বাবর তার আত্মজীবনী বাবরনামাতে নিজের দোষত্রুটিও বর্ণনা করতে দ্বিধা করেননি। এটা তার সততার পরিচয় বলা যায়। এ মহান মানুষটির সাথে বিধাতার মহামিলন অর্থাৎ পরলোকগমন হয় ১৫৩০ খৃষ্টাব্দে। (হুসাইনীর লেখা মোগল অ্যাডমিনিষ্ট্রেশন ও আরো মূল্যবান তথ্য বাবরনামাতে দ্রষ্টব্য)(চেপে রাখা ইতিহাসের ৮১ পৃষ্ঠাতে দ্রষ্টব্য)।  এসব সম্মানিতজনদের বিরুদ্ধে বেদনার অসংখ্য দাগ চিহ্ন ভারত তার জনতার কাছ থেকেও চেপে রেখেছে। মানুষকে ভুল ইতিহাস দিয়ে অভ্যস্ত করা হয়েছে আজও হচ্ছে। এ রায়ও যেন ভুল ইতিহাসের কথাই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। বিদগ্ধ লেখক আল্লামা গোলাম আহমাদ মোর্তজা সাহেব তার লিখিত বইসমূহে এসব অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রকাশ করেছেন। প্রকাশের অপরাধে তার লেখাকে যুগ যুগ অবদি বাজেয়াপ্ত করে রাখা হয়। তার কিছু গ্রন্থের নাম: ইতিহাসের ইতিহাস, পুস্তক সমরাট, এ সত্য গোপন কেন? বজ্র কলম, এ এক অন্য ইতিহাস, ইতিহাসের এক বিস্ময়কর অধ্যায়, বাজেয়াপ্ত ইতিহাস, চেপে রাখা ইতিহাস এসব উল্লেখযোগ্য।

“ভারতের দাঙ্গার জন্য দায়ী মিথ্যা ইতিহাস আর বিষাক্ত লেখক শ্রেণী”- আল্লামা গোলাম আহমাদ মোর্তজা। আজও গবেষকরা অযোধ্যাতে বাবরকে খুঁজে পেলেও রামের অস্তিত্ব খুঁজে পাচ্ছেন না আর তারা এরকম একটি (?) বিষয়ের উপর ভর করে বাবরী মসজিদটি গুড়িয়ে দিয়েছে। তারা গরুর দুধে ও গরুর মুত্রে সোনা খুঁজে পাচ্ছে কিন্তু সত্য খুঁজে পাওয়া অর্জিত স্পষ্ট ইতিহাসকে দুপায়ে দলে যেতে কার্পণ্য করছে না।

ভারতে মুসলিমদের বিরুদ্ধে প্রশাসন পুলিশের বিমাতাসুলভ আচরণ অতীতেও  লক্ষ্য করা যায়। আকবরের দেয়া উত্তরপ্রদেশের এলাহাবাদকে বিজেপি সরকার নতুন নামকরণ করেছে প্রয়াগরাজ, ৪৩৫ বছরের পূর্বে এলাহাবাদ নাম দেয়া হয়। গঙ্গা যমুনা এ জায়গায় মিলিত হয়েছে, এটি তীর্থস্থান ঠিকই কিন্তু ঐতিহাসিকরা ভিন্ন কথা বলছেন। প্রফেসর এনআর ফারুকী, এলাহাবাদ বিশ^বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ভাইস চ্যান্সেলর বলছেন বিভিন্ন ইতিহাসও প্রমাণ পঞ্জিকায় প্রমাণিত হয় যে, প্রয়াগরাজ কখনোই কোন প্রসারমান নগরের নাম ছিল না। কিছু কিছু সূত্রে জানা যায় এ নামে ছিল তীর্থস্থান। কিছু কিছু হিন্দু গ্রন্থে এ নাম পাওয়া যায় তবে কখনোই শহরের নাম ছিল না। তিনি আরো বলেন আকবর ১৫৭৪ সালে এ নামে নতুন করে শহরের পত্তন করে নামকরণ করেন ইল্লাহাবাদ। সেখানে তিনি দূর্গ নির্মান সহ উত্তর ভারতের সামরিক ও শাসন সুগঠিত করতে এর ভিত্তি স্থাপন করেন। পরের জেনারেশন একে ইল্লাহাবাদ বলতে শুরু করে, অতপর বৃটিশরা একে আল্লাহাবাদ বলে। স্থানীয় হিন্দি উর্দু সাহিত্যে এটি ইল্লাহাবাদ’ হিসাবে বহাল আছে (১৫৭৪-২০১৮)। এভাবে ক্রমে এটি এলাহাবাদ হয়েই জায়গা দখল করে। “এলাহাবাদ নাম চেঞ্জ করাতে আমার শহরের আত্মাকে বধ করা হয়েছে” বিজেপি এটি করছে গরুরক্ষার নামে মানুষ হত্যা থেকে শহর হত্যাও চালু রেখেছে। বৃটিশ কালীন ট্রেন ষ্টেশনের নাম ‘মোগলসরাই’ বদলে করেছে ‘দিনদয়াল উপাধ্যায়’। ‘ফয়জাবাদ ’ বদলে হয়েছে ‘অযোধ্যা’ (সূত্র: বিকাশ পান্ডে, বিবিসি নয়াদিল্লী, ৭ নভেম্বর ২০১৮)। এর প্রধান কারণ হচ্ছে ওখান থেকে মুসলিমদের নাম মুছে দিতে হবে। ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের এসব ইতিকথা। তারা চাইছে এভাবে যতটা পারা যায় চার পাঁচ শত বছরের মুসলিমদের শাসিত শহর নগরকে দাগ মুক্ত করতে।

এলাহাবাদ স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশেও ঐ স্থান উল্লেখযোগ্য। সেখানে অনেক হিন্দী লেখক রাজনীতিবিদ, অভিনেতা, বিজ্ঞানী ও সরকারী কর্মচারী অবদান রেখেছেন। “একটি ছোট জায়গায় এত যোগ্যরা অসাধারণ অর্জন জমা করেছেন সেখানে কে হিন্দু কে মুসলিম সেটি বড় ছিল না  – এটি তাদের সবাইকে অভিনন্দন জানায়”, প্রফেসর চতুর্ভেদী এটি বলেন। তিনি ঐ প্রয়াগরাজকে মানতে রাজি তবে এটি বাস্তবতা ঐ খানের মানুষ সব সময় নিজেকে এলাহাবাদের মানুষ বলেই জানে। ঐ শহরটি একটি তীর্থস্থান এটি সবাই জানে এটিকে প্রয়াগরাজ বলো আর না বলো। অনেকে ঐ নতুন নামকরণ মানতেও পারছে না। বরং তারা নিজেকে এলাহাবাদী বলতেই বেশী স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। তাদের একজন নামকরা উর্দু কবিকে তারা ‘আকবর এলাহাবাদী’ বলে ডাকে। এবার তাকে যদি ‘আকবর প্রয়াগরাজ’ বলতে হয় তবে সেটি বিশ^াস করতে খুব খুব কষ্ট হয়”। 

পৃথিবীর বুকে ইতিহাস শাস্ত্র মূলত মুসলমানদেরই জন্ম দেয়া, এটি বলা অন্যায় নয়। জনাব ইবনে খালদুন, জনাব আলি বিন হামিদ,  জনাব উৎবী, বাইহাকী, কাজী মিনহাজউদ্দীন সিরাজ, মহীউদ্দীন, মুহাম্মদ ঘোরী, জিয়াউিদ্দন বারনী, আমীর খসরু, শামসী সিরাজ, বাদশাহ বাবর, ইয়াহইয়া বিন আহমাদ, জওহর, আব্বাস শেরওয়ানী,  আবুল ফজল, বাদাউনি, ফিরিস্তা, কাফি খাঁ, মীর গোলাম হুসাইন, গোলাম হুসাইন সালেমী, সাইয়েদ আলী প্রমুখ। পৃথিবীর মূল ইতিহাস প্রায় সবই মুসলমানদের লেখা এবং বেশীর ভাগই আরবী ফারসী ও উর্দু ভাষায় সব তারিখসহ সব লেখকদের নামধাম গ্রন্থের নাম গোলাম আহমাদ মর্তুজার ইতিহাসের ইতিহাস গ্রন্থে এসেছে (গোলাম আহমাদ মর্তোজার বাজেয়াপ্ত ইতিহাস: ৫৩-৫৪ পৃষ্ঠায় দ্রষ্টব্য)।

গবেষনাতে দেখা যায় আইনত মন্দির ভাঙ্গার কাজ মুসলিম দ্বারা হয়নি। কিছু কিছু কারণে যেসব মন্দির ভাঙ্গা হয়েছে তার পেছনে অন্য কারণ জাড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। মসজিদ মন্দির ধ্বংস করা ইসলামের কাজ নয়। ইসলামের কাজ মানুষের মনের মন্দিরে প্রবেশ করে মানুষকে যুক্তির পথ আলোর পথ দেখানো। আর ভাঙ্গার কাজ করেছে প্রতিপক্ষরা তারা আজো সেটি ময়দানে করে দেখাচ্ছে। ভারত রাষ্ট্র ধর্ম তাদের স্বপক্ষে রায় বিলি করে তাকে হাতে কলমে প্রতিষ্ঠা করছে। 

কলামটি লেখার সময়: ৯ নভেম্বর ২০১৯ সাল।

এক স্বামী সবার পোল খুলল || এখানে রাম মন্দির ছিল না ||

Was Lord Ram born on Babri Masjid land? Prof Ram Puniyani explains conspiracy

(প্রথম আলোর একটি রিপোর্টের লিংক), বিশেষজ্ঞ মত: বাবরি মসজিদের নিচে মন্দির থাকার কথা মিথ্যা

পুনশ্চ: চোর পালালে অনেক প্রামাণ্য দাগ রেখে পালায়। রাম মন্দির সূত্রে বলছি সে সত্য অকপটে বলেই গেছেন রবীন্দ্রনাথ  উক্ত দুইছত্র কবিতার ছন্দে। অযোদ্ধায় রামের জন্মস্থান কোথাও খুঁজে না পাওয়া গেলেও ঐ কথাগুলি যা তোমার কল্পনার মনোজগৎ থেকে উৎসারিত হয়েছে, সেই মনোজগতই প্রকৃত সত্য, প্রকৃত ইতিহাস, বাস্তবতা নয়। তার সহজ মানে রাম ও অযোধ্যা বাল্মিকীর কল্পনার সৃষ্ট চরিত্র। রবীন্দ্রনাথ বাল্মিকীকে উদ্দেশ্য করে লিখেছিলেন, “তব মনোভূমি রামের জন্মস্থান, অযোধ্যার চেয়ে সত্য যেন এটি কবিতার সত্যকথন।  

 

 

বি দ্রষ্টব্য: লেখাটি নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত দি রানার পত্রিকায় ১৫ নভেম্বর ২০১৯ সংখ্যায় ছাপা হয়।

Tag Cloud