Articles published in this site are copyright protected.

Archive for the ‘Article’ Category

২০২১এর রমজান ও আমার চিন্তা


নাজমা মোস্তফা

২০২০এর রমজানের ৩১ মে তারিখে আমার ব্লগে একটি লেখা আপলোড করেছিলাম। লেখাটির শিরোনাম ছিল “আমরা কি আল্লাহর রমজান পালন করছি?” আজ ২০২১এর রমজান শুরু হয়েছে আজ রাতেই এপ্রিলের ১৩ তারিখে আমরা প্রথম সেহরী দিয়ে এবারের রোজা শুরু করবো। প্রতিটি কাজই যখন এবাদতের অংশ, তখন প্রতিটি সুচিন্তা আমাদের পথ দেখায় যেখানে প্রতিটি কুচিন্তা মানুষকে পথহারা ও বিভ্রান্ত করে। খোলামনে ভাবলে বোঝা যায় বাংলাদেশীরা খুব ভয়ংকর খারাপ সময় পার করছে। রাজনীতি ও ধর্ম দুটোই কেমন যেন গোলমেলে ঠেকছে। অনেকে বলবেন রাজনীতির সাথে ধর্ম মেলানোতেই এ গন্ডগোল। আমি মনে করি কথাটি ঠিক নয়। কারণ ইসলামই একমাত্র ধর্ম যেখানে এ দুয়ের সংমিশ্রণ হয়েছে আল্লাহর আদেশে ও নবীর কর্মকান্ডে। ইসলামের ইতিহাস বলে মসজিদই ছিল ইসলামের প্রথম পার্লামেন্ট হাউস। সেখান থেকেই দেশের সমাজের সব সমস্যা আলোচিত হতো ও সমাধান আসতো। হাতের কাছেই ছিল খোদা প্রদত্ত সিলেবাস। তা খেজুর পাতায় লিখা হোক আর সাহাবাদের অন্তরেই খোদাই করা হোক। সেটি বদলাবার বা ওদলবদল করার কোন সুযোগ কোনদিনও ছিল না। এর কারণ ঐ দিন থেকেই এটি মানুষের মুখে মুখে অবস্থান নিয়েছে। আরবের বাসিন্দারা তাদের নিজ ভাষাতে এটি রপ্ত করেছে, আর রপ্ত করার সাথে সাথে তারা সেটি বুঝতেও পেরেছে। বিপদ হয়েছে অন্য ভাষাভাষীদের তারা সুরা রপ্ত করলেও ওর অর্থ বুঝতে পারছে কম। তবে প্রতিটি সুরার সাথে সাথে ঘটনা জানা থাকলে অতি অল্পেই ওসবও রপ্ত করা যায়। বিশেষ করে নামাজে যেসব সুরা আমরা ব্যবহার করি তা অর্থ না জেনে নামাজ পড়ার কোন যুক্তি হয় না। লেখাপড়া জানা প্রতিটি মানুষকে এটি অর্থ বুঝে রপ্ত করলে নামাজের আগ্রহ ও একাত্মতা বহুগুণ বাড়ে। গতবছরের লেখাতে আমি দেখিয়েছি আমাদের অনেকেই আল্লাহর নির্দেশিত রোজার পাশে রসুলের নামে নির্দেশিত আরো বাড়তি কিছু রোজায় অভ্যস্ত হয়ে আছেন, ছিলেন হয়তো আরো বড় সময় থাকবেন।

কারো কারো মতে রোজার আগে ছয় ও পিছে ছয় আর কেউ কেউ বলেন শুধু শেষের ছয় রোজা রাখার বিধান রাখা হয়েছে যার কোন দাগ কুরআনে নেই। এই ছয় রোজা আমার জীবনের মোড় লেখালেখির দিকে ঘুরিয়ে দেবার এক মহাসোপান। ঐ ঘটনাই আমাকে অনুপ্রেরণা দেয় লেখালেখিতে ঢুকতে ঐ বিষয়েও একটি লেখা আছে যার নাম হচ্ছে ‘হোঁচট’। যদিও চিন্তার চলা আমার অনেক আগে থেকেই। সাম্প্রতিক সময়ে মামুনুল হক নামে এক হেফাজত কর্তাব্যক্তির অনেক উল্টাসিধা কাজের সুবাদে সৃষ্ট জটিলতা থেকে গোটা দেশে তুলকালাম কান্ড ঘটছে। অনেক সূত্র তথ্য বলছে এসব কান্ড সরকারই ঘটাচ্ছে, নিজের পাপ লুকাতে এসব অপকর্ম সাজানো হচ্ছে। মনে হচ্ছে কেহ কারে নাহি পারে সমানে সমান। কিছু আগে অতি সম্প্রতি বাংলাদেশের অবৈধ সরকারের অপকীর্তির মহা মহা সংকট কথা আল জাজিরা প্রকাশ করে একদম দেশকে উলংগ করে দিয়েছে। এদেশে কোন নীতি নৈতিকতা আর বাকী থাকে নাই। ২০০৯ সাল থেকেই শুরুতে নিজ দেশের বিডিআর হত্যা ঘটিয়ে শেখ মুজিবের কন্যা সরকার অপকর্মে ও মিথ্যাচারে এমন কিছু বাকী রাখেন নাই যা তিনি করেননি। বর্তমানে দিনের ভোট হয় রাতে, কোন বৈধতা নেই। মানুষ আজকাল ভোট দিতে যায় না। ওটি কন্যা সরকার গিলে হজম করে দিয়েছেন। আবার প্রতারণার হাতিয়ার হিসাবে কথায় কথায় লজ্জাস্কর ভাবে জায়নামাজ খোঁজা নামাজ পড়া তাহাজ্জুদ পড়া কুরআন তেলাওয়াত করার গল্প করেন, এসব বলে নিজেকে মুসলিম বলে জাহির করার চেষ্টা করেন। কেউ তাকে অমুসলিম বলে না, তারপরও কেন করেন জানি না। এর একমাত্র কারণ এরা কুরআন বুঝে কখনোই পড়েন না। পড়লে আল্লাহ যেখানে এসব না করতে আদেশ দিয়েছে সেখানে তাদের এসব করার কথা ছিল না। এরা আসলে বর্ণচোরা ধর্ম ব্যবসায়ী, রাজনীতির আড়ালে এটি তাদের বর্ণচোরা ব্যবসা। কন্যা সরকার সমানেই অনাচারে মিথ্যায় ধরা খাচ্ছেন কিন্তু তিনি এসব নিয়ে নীতি নৈতিকতার বিষয়ে মোটেও ভাবেন না। ভাবখানা এমন যেন খোদা প্রদত্ত কোন এজেন্ডাতে তারা ধর্ম নিয়ে মাঠে আছেন। এ জন্যই বলছি ধর্মটি সবার হাতের পুতুল নাচের বিষয় কি? সহজভাবে অনেকেই বলেন এসব মনে হচ্ছে রোজ কিয়ামতের আলামত মাত্র। সবার মুখে ধর্ম আর কাজে অধর্ম খোদ অবৈধ প্রধানমন্ত্রীসহ। আমি হোঁচট খেয়েছিলাম আজ থেকে ২৫ বছর আগের রমজান পার করা সময়ের ঐ হোঁচট আমার গতি ঘুরিয়ে দিয়েছিল। সেদিন থেকে আজ অবদি আমি কমবেশী লিখছি, থামি নাই।

গতবছরের লেখাটির উদ্দেশ্য ছিল আল্লাহর নির্দেশিত রোজা কি আমরা করছি? আজ থেকে পঁচিশ বছর আগে আমি নিতান্ত একজন সাধারণ চিন্তাশীল ছিলাম, লেখিকা ছিলাম না মোটেও। তবে তুখোড় কারো ঝগড়ার জবাব দিবার মত রসদ আমার জমা ছিল না। আজ একটি কঠিন সত্য প্রকাশ করছি বাহাদুরী বা কৃপণতা প্রকাশ করছি না মোটেও। আমি যখন ক্লাস এইটে পড়ি সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত জীবনেও কোন রোজা আমার বাকী নেই। আমি সবকটি রোজা পালন করেছি। কোন রোজা ভাংলেও সেটি আমি পরবর্তীতে রোজা শেষ হওয়ার নিকট সময়েই রেখেছি। কিন্তু জীবনেও এর বাইরে আর বাড়তি কোন রোজা রাখি নাই। আমার পূণ্য হোক আর পাপ হোক এটি আমার কৃতকর্ম। রোজার এই বস্তুনিষ্ঠতা এটি আমার আত্মবিশ^াস গড়ে দিয়েছে। আমি যদি মিথ্যা বলি আমি জানি তার দন্ড কত কঠিন হবে আর সত্যটা বলা দরকার তাই বলছি। একবার আমরা সমবয়সী সহপাঠিরা প্রায় পাঁচ সাতজন এক হয়েছি রোজার পর পরই। প্রশ্ন উঠেছে কে কয়টি রোজা রেখেছো? ওখানে অনেকেই আমার বড় আপা খালা, তারা আমার থেকেও অনেক কম রেখেছেন, কেউই সবকটি রোজা রাখেন নাই। আমার নিজেরই লজ্জা লাগলো, কেউ বললো আমি সাতটি কেউ বলে আমি পাঁচটি, সামনে পরীক্ষা, আমি হু বলে এমনভাবে মাথা নাড়ি যে তোমাদের মতই। স্পষ্ট কথাটি হচ্ছে আমি সেদিন গর্ব করে বলতে পারি নাই, যে আমি সবকটি রেখেছি।

তাই সংসার জীবনে পরবর্তীতে যখন ঢুকি তখন ঢাকাতে পাড়ার এক ভাবীর ছোবলে আমি এমনই আহত হই যে আমার জীবন স্থবির হয়ে পড়ে। কয়টি দিন আমার কেটেছে এরকম কষ্ট আমি জীবনেও পাই নাই। বিষয়টি ছিল রোজার পরের ঐ ছয় রোজা রাখা মহিলা রোজা মুখে আমার উপর হামলে পড়েন যেন আস্ত গিলে খাবেন। আমি হাসিমুখে বলেছিলাম রোজা শেষ এখন আবার কিসের রোজা। আমি তার ঐ রোজা সম্বন্ধে জানি না বলেই তার এত হামলে পড়া। জবাবে আমি বলি জানি না রে ভাই। আমি জীবনেও রোজা বাকী রাখি নাই আর বাড়তি কোন রোজাও করি নাই। তখন মহিলা আমাকে টিটকারী দিয়ে বলেন, আপনি তো বেহেশতে চলে যাবেন। আমি মনের বেদনা মনেই চেপে রেখে বলি আল্লাহ কবুল করুক। এতে মহিলা আরো বেশী রেগে যান। তার হিসেব মত আমাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে কারণ আমি ঐ ছয় রোজার কথা জানিইনা আর তিনি জানেন। জানি না আল্লাহ আমার দোয়া কবুল করেছে কি না, তবে এসব আমার জীবনের ঘটে যাওয়া ঘটনা। যখন প্রায় বেশ দিন গড়িয়ে যাচ্ছে কোন কাজই করতে পারি না, ঐ কষ্টে আমি এতই আহত বিধ্বস্ত হয়েছি যে বলার মত না। এর বড় কারণ আমাকে জীবনেও কেউ এভাবে সাক্ষাৎ ছোবল মারে নাই। বাসায় এসে কর্তাকে বড় ছেলেকে বলেছি তারপরও মনে শান্তি পাইনা। হঠাৎ কি মনে করে টেবিলে কাগজ কলম নিয়ে বসি আর গড় গড় করে আদ্যপান্ত সব লিখে নেই, ঐদিন কি ঘটেছিল, লেখা শেষ হলে আমি ওটি চাপা দিয়ে রেখে দেই। মনের অলক্ষ্যেই বুঝি মনটা হাল্কা হয়ে যায়। আমি আমার দৈনন্দিনের কাজে নেমে পড়ি। ঐসময় আমার বড় ছেলে বাহির থেকে ঘরে ঢুকেই কাগজটি উল্টে দেখে সে গড় গড় করে ওটি পড়ে নেয়। এবং ঐ কাগজ নিয়েই আমার কাছে ছুটে যায় আর বলে ‘আম্মু তুমি লিখছো না কেন? তোমার কষ্টটি আমি শুনেছি তোমার মুখে আর তোমার লেখাটি দেখে ভাবছি তুমি লিখছো না কেন?’ ঐটি আমার আজকের লেখার হাতে খড়ি দুর্ঘটনার বদৌলতে পাওয়া পুরস্কার। আমার ছেলের অনুপ্রেরণা আমার আজকের লেখার কৃতিত্ব তার বড় পাওনা। সাথে ছিল বাবার সুপ্ত অনুপ্রেরণা।

https://wordpress.com/post/nazmamustafa.wordpress.com/6018

গত বছরের রমজানের লেখাটি আবারো অনুরোধ করবো লিংকটি আবারো দিলাম, সেটি পড়তে অনুরোধ করবো। মুসলিমদের অপকর্ম ব্যর্থতা ও মূল সত্য কুরআনকে এড়িয়ে চলাই কি ইসলাম? ওটি পরখ করেন, পড়েন। আল্লাহকে অন্তরে ধারণা করেন, কুরআনকে বুকে ঠাঁই দেন, শুধু মুখে নয়। বেশীর ভাগ মানুষ কুরআন জপেন মানেনও না, পালনও করেন না। মনে করেন জপেই শেষ। শিক্ষিতরা একথা বলে পার পাবেন না। আপনার চক্ষু কর্ণ হাত কেউই নিরাপদ নয়। আপনার বিপক্ষে প্রতিটি অঙ্গ রায় দেবে। আল্লাহর কালামের চেয়ে বড় অন্য কিছুই হতে পারে না। আগে আল্লাহকে প্রতিষ্ঠা করবেন তার বাইরে যা করবেন তা, অপরাধ হিসাবে গণ্য হবে। কারণ সেটি নির্দেশ নয়। তার নাম বিদআত। বিদআত কি? যা ধর্ম নয়, ধর্মের নামে বাড়তি সংযোজন করতে নিষেধ করা হয়েছে। এটি নবীর কড়া নিষেধ ছিল। ইহুদীরা এভাবে ধ্বংস হয়েছে, আমরা যেন বাঁচি। ঐ নির্দেশ কুরআনে এসেছে। অনুরোধ করছি কুরআন পড়েন, জানেন, বুঝে পালন করেন। ঐ কুরআন প্রতিষ্ঠার জন্য নবী এসেছিলেন, তিনি কুরআনকে পাশ কাটিয়ে ভিন্ন কথা বলতেই পারেন না। অসম্ভব, কুরআনের বাইরে ভিন্ন কথা বললে কুরআন বলে তাকে মোকাবেলা করতে হবে দ্বিগুণ শাস্তি তার জীবিত অবস্থায় ও মৃত্যুকালে (বনি ইসরাইলের ৭৫ আয়াত)। মুসলিমরা কিভাবে ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে এর উদাহরণ ময়দানে সবাই দেখছেন। সরকারসহ জনতারা অনেকেই ধর্মের নাম নিয়ে অনেক কিছু করছে এসব ধর্ম নয়। কুরআন দ্বারা কোন অপকর্ম প্রমাণ করা যায় না, এটি অসম্ভব। কিছু তফসিরকারক বলেন নবী হযরত ইব্রাহিম (আঃ) মিথ্যা বলেছেন। যারা এটি বলে এরা কুরআনের ভুল ব্যাখ্যা করে। সত্যটি হচ্ছে বালক ইব্রাহিম ঐ সময় বড় মূর্তিটাকে ভাঙ্গেন নাই এবং কুঠারটি তার কাঁধে রাখেন। তারা তাকে প্রশ্ন করলে তিনি মিথ্যাচার করেন নাই বরং উল্টো বলেন, বড়টি তো দাঁড়িয়ে রয়েছে তাকে জিজ্ঞেস করো। সে বলতে পারে না? তিনি চেয়েছেন তাদের অন্ধদের চক্ষু খুলে দিতে। যে মূর্তি তার নিজেকে প্রতিরোধ করতে পারে না সে কিভাবে তোমাদের প্রতিরোধ করবে।

মানুষের স্বরচিত হাদিস দ্বারা তারা প্রমাণ করে দেয় রসুলের নামে প্রচারিত হাদিসে মিথ্যা বলা জায়েজ। তার সহজ জবাব এসব বাতিল হাদিস সৃষ্ট হয়েছে ইসলামের মূল সত্যকে ধ্বংস করার জন্য। ঐ সময়ও যারা ইহুদী খৃষ্টান থেকে ধর্মান্তরিত হয়ে ইসলামে এসেছে তারা এসব গালগল্প হাদিসের বরাতে ঢুকিয়ে দিয়েছে মানুষকে সত্য থেকে বিচ্যুত করতে এটি তারা করেছে, ইতিহাস গবেষণা তাই স্পষ্ট করছে। অনেকে অতীত ধর্মকে ভুলে না গিয়ে ওসব ঢুকিয়ে দেয় চেতনে অবচেতনে।

ইসলামের সুক্ষ্ম গবেষক মোহাম্মদ আকরম খাঁর মোস্তফা চরিত থেকে উদ্ধৃত করছি। সাহাবীগণ যা বলেছেন বা করেছেন তার জন্য সাহাবীগণই দায়ী; হযরতের বা ইসলামে তার জন্য কোন জওয়াবদিহিতা নেই (৬০, ৬১ পৃষ্ঠা)। ‘আলায়ী বলেন, সকল দলের অপেক্ষা অধিক অনিষ্টকারী তারা যারা খুব পরহেজগারী দেখিয়ে থাকে’ (ইমাম আলায়ী সুফিদের কথা বলে দেখিয়েছেন, কিভাবে তারা অসংখ্য মিথ্যা হাদিস রচনা করেন, পৃষ্ঠা৬২)। এভাবে জানা যায় যা সাহাবীগনের নামে বা স্বয়ং হযরতের উক্তি বলে কথিত হয়েছে যদিও সেগুলি অসংলগ্ন, অবিশ^াস্য ও অপ্রামাণিক”(৬৩ পৃষ্ঠা)। ‘জ্ঞান ও যুক্তি দ্বারা আমরা এই শ্রেণীর হাদিস গুলি আবার বাছাই করে নিতে পারি (ফওজুল কবির, মোহাম্মদী প্রেস, ৪১ পৃষ্ঠা, মোস্তফা চরিত ৬৪ পৃষ্ঠা)। ‘আর একটা গুঢ় তত্ত্ব এই যে, ইহুদী ও খৃষ্টানদের নিকট থেকে (আগত বিশ^াস সংস্কার ও কিংবদন্তিগুলি) প্রচুরভাবে আমাদের ধর্মে প্রবেশ করেছে। কিন্তু আমাদের স্বীকৃত শাস্ত্রীয় বিধান এটি যে, ইহুদী ও খৃষ্টানদের বর্ণনাগুলিকে সত্য ও মিথ্যা কোন প্রকার বলিও না।’ এই শাস্ত্রীয় বিধান থাকার পরও লেখকগণ ঐ সকল বিবরণকে সত্যরুপে গ্রহণ ও বর্ণনা করেছেন (ঐ ফওজুল কবির সূত্র)। এ প্রসঙ্গে ইবনে খাল্লেদুন বলেছেন: ‘আমাদের লেখকগণ ঐ সকল কিংবদন্তি ও গল্প গুজব নকল করে তফসিরের কেতাবগুলোতেও ভরে তুলেছেন। আগেই বলা হয়েছে এসব গল্পের মূল মূর্খ ও অজ্ঞ মরু প্রান্তরবাসী ইহুদীদিগের নিকট থেকে গৃহীত। অথচ তারা যা নকল করেছেন তার সত্যাসত্যও তারা পরীক্ষা করে দেখেন নাই মোকদ্দমা ইবনে খাল্লেদুন) (মোস্তফা চরিত ৬৪/৬৫ পৃষ্ঠা)।

ইমাম আহমদ ইবন হাম্বলের একটি উক্তি বিখ্যাত কালবী ও মোকালেতের তাফসির প্রথম হতে শেষ পর্যন্ত আগা গোড়াই মিথ্যায় ভরা। তিনি ঐসব তাফসির পড়াও হারাম বলে ফতোয়া দিয়েছিলেন। কথা ছিল জাল ও দূর্বল হাদিস চিহ্নিত করণের কিন্তু পরবর্তীরা এর উপর আরোপিত কঠোর আদেশ পালন করেন নাই। (ঐ গ্রন্থ, ৬৮ পৃষ্ঠা)।

কে বা কারা এসব অপকর্মে জড়িত থেকেছে তাদের চিহ্নিত করা হয়েছে। (ঐ গ্রন্থ, ৬৯ পৃষ্ঠা)।


(১) জিন্দিকগণ: এরা ধর্মের সর্বনাশ করতে বহু সংখ্যক হাদিস জাল করেছেন, এরা মূলত পার্সিক ধর্মাবলম্বি। এরা ইসলামে আসলেও ইসলামের ক্ষতি করতে তাদের পূর্ববর্তী বিশ^াসের উপরই কাজ করে। বর্তমানে প্রচলিত অনেক বেদআতের মূল এরাই।
(২) অতি পরহেজগারগণ: (সওয়াব ও ফজিলতের আশায়)
(৩) মোকাল্লেদগণ: নিজ মাযহাবের নামে ও প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে অসংখ্য জাল হাদিস রচনা করেন
(৪) মোসাহেবগণ: রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে রাজা বাদশাহ আমির ওমরাহ প্রভুর সমর্থণে মিথ্যা হাদিস রচনা করেন
(৫) ওয়ায়েজগণ: ওয়াজের অভিনবত্ব ও চমৎকারিত্ব প্রদর্শণ করতে ওয়াজ ব্যবসায়ীরা আজগুবী প্রচারে এসব মিথ্যা হাদিস প্রচার করেন।


হযরতের জীবনকালে মিথ্যা, জেনা, চুরি মদপান, ও নরহত্যা ইত্যাদি হারাম কার্য কোন সাহাবী কর্তৃক কখনো ঘটে নাই, এ কথা কি কেউ বলতে পারেন? এসব সাহাবী নরনারীদের দন্ডভোগের কথা কি হাদিসে বর্ণিত হয় নাই? জিজ্ঞাসা করি, ওসমান, তালহা, জুবের, এসব সাহাবীদেরে হত্যা করা, পরস্পর যুদ্ধ বিগ্রহে লিপ্ত হওয়া এবং সাহাবীদের হাতেই বহু সংখ্যক সাহাবী হত্যা – এসব কি ইসলামে অনুমোদিত হালাল ও পূণ্য কার্য? (কুরআন ও বহু সহি হাদিসে এর উল্লেখ আছে) (ঐ গ্রন্থ ৫৮ পৃষ্ঠা)।

শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া এ প্রসঙ্গে বলেছেন, সাহাবীদের মধ্যে এরুপ লোকও ছিলেন, যারা সময় সময় ভ্রম করতেন, তাদের পরবর্তী সময়েও এই অবস্থা। এজন্য সহী আখ্যায় যেসব হাদিস সংকলিত হয়েছে, তার মধ্যে এরুপ হাদিসও আছে, যা ভ্রম বলে পরিজ্ঞাত (কেতাবুল তাওয়াচ্ছোল ৯৬ পৃষ্ঠা)। সাহাবীদের ভক্তি করতে অন্ধভক্তি করতে ইসলাম বলে না। বিবেকবর্জিত এসব বিশ^াসই হচ্ছে নরপূজার ভিত্তি। তারা বাড়াবাড়ি করতে করতে এমন কথাও বলে যে আল্লাহর পক্ষেও মিথ্যা বলা সম্ভব কারণ তিনি সব পারেন (ঐ গ্রন্থ ৫৮ পৃষ্ঠা)। এরকম অবস্থায় একজন সত্যনিষ্ট মুসলিমকে খুঁজে দেখতে হবে সহি হাদিস হবে মাত্র সেটি যা কুরআন দ্বারা অনুমোদন পায়, নয়তো তা সহি বলে গন্য হবার নয়। কুরআনে নেই এবং স্বপক্ষের কোন কথা কখনোই বলা সঠিক নয় যে এটি নবী মোহাম্মদ বলেছেন, তার ভিত্তি একমাত্র কুরআন। সত্যকে সন্ধান করতে অসংখ্য যুক্তিসমূহ ময়দানে থাকলেও এর সমাদর করা উৎসাহী খুব কম। বাইবেল ও কুরআনে বর্ণিত ঐ গল্পের আদম ও ইবলিসের রুপক গল্পের ইশারা সেই সত্যটি স্পষ্ট করছে। ইবলিস কিভাবে আল্লাহর সাথে সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে জিতছে, এসব তারই ইঙ্গিত বহন করছে। তবে আল্লাহ তাকে জবাবে বলেছেন আমার প্রকৃত অনুসারী যারা তাদের তুমি কখনোই তোমার দলে ভিড়াতে পারবে না। একমাত্র এই জায়গায় ইবলিস হতাশ হবে। আল্লাহ আমাদের নবীকে বলেন, “তুমি তাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না যারা আল্লাহর বাণী প্রত্যাখ্যান করে, পাছে তুমি ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যকার হয়ে যাও” (সুরা ইউনুসের ৯৫ আয়াত)। আল্লাহ যা নবীকে বলেছেন, তা কি আমাদেরেও বলা হয়নি? প্রশ্নটি সবার সামনে রেখে লেখাটি এখানেই শেষ করছি।

সবাই ভালো থাকেন সুস্থ থাকেন।
রমজান মোবারক।
এপ্রিলের ১৩ তারিখ ২০২১। রাত তিনটা।

তসলিমার কলামের জবাব

নাজমা মোস্তফা

প্রকাশিকাঃ

নাজমা মোস্তফা

প্রচ্ছদঃ এহতেশাম মোস্তফা,

বইটির প্রচ্ছদ উপরে আমার বুক্স আইকনে আছে।

৬২/সি ইউনিভার্সিটি কোয়ার্টার

নীলক্ষেত ঢাকা- ১০০০

ফোন ৮৬৯৬৩৯

প্রকাশকালঃ জুলাই ১৯৯৬ ইং

কম্পিউটার কম্পোজঃ অপূর্ব কম্পিউটার।

মুদ্রণেঃ অপূর্ব প্রিন্টার্স

১৯০, এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা।

ফোনঃ ৮৬৩১১৩

মূল্য ৬০.০০ টাকামাত্র।

সূচীপত্র:

(১) কুসংস্কারের জঞ্জালে জ্বলছি মোরা (ক)

(২) কুসংস্কারের জঞ্জালে জ্বলছি মোরা (খ)

(৩) নির্বাচিত কলামের নির্যাতিত নারী

(৪) ইসলামের ইজ্জত ইরানের নারী

(৫) পাশ্চাত্যে নারী

(৬) অনেকের চোখে

(৭) ভারতে মিশ্র বিয়ের প্রস্তাব

(৮) যুক্তির মাধ্যমে মুক্তির অন্বেষায়

(৯) তসলিমার তমসার তন্দ্রা কি কাটবে?

(১০) ভিন্ন সম্প্রদায়ের মনিষীদের দৃষ্টিতে

(১১) সংকীর্ণতার গন্ডিতে বাধা ধর্মের মহানুভবতা

(১২) ইসলামে বিয়ে 

(১৩) উত্তরাধিকারের গ্যাড়াকলে নাসরিন

(১৪) রসুল(সঃ)এর বিয়ে

(১৫) ইসলামের পর্দায় তসলিমার লজ্জা

(১৬) পর্দার আয়াত

(১৭) তসলিমা নাসরিনের উত্থানের নেপথ্যে কিছু তথ্য

(১৮) শিকড়ের সন্ধানে

(১৯) ইসলামপূর্ব জগতের অবস্থা

(২০) উপসংহার

উৎসর্গ:

যারা আমায় তিল তিল করে গড়ে তুলেছেন, সত্যের দীপশিখা জ্বালিয়ে জীবনকে উপলব্ধি করতে শিখিয়েছেন, সেই পরম শ্রদ্ধেয় বাবা-মা এর প্রতি উৎসর্গ করলাম আমার এই প্রয়াসটুকু। আমার সুকর্মের অংশীদার তারাও। আল্লাহ তাঁদের অনন্ত জীবন মহাআনন্দের করুক। আজ বাস্তবের সংকীর্ণতার বাইরে তাদের বসবাস। জীবনের অনেক হতাশার রাস্তায় আলো জ্বালতে আজীবন প্রাণান্তর প্রচেষ্টা চালিয়েছেন এই দুই জোড় মানিক আমার। স্রষ্টার আপনার হোন, আদরের হোন, সম্মানের অংশীদার হোন আমার বাবা-মা।

ভূমিকা :

     ধর্মের মৌলিক জিনিসকে অবজ্ঞা করে সমাজের নানান ত্রুটি বিচ্যুতিই ধর্মের অঙ্গ হিসাবে সমাজের সর্বত্র অনাচার হয়ে ছড়িয়ে আছে আর আমাদের সমাজপতিরা তার প্রতিবাদ না করে বরং প্রতিপালনই করে থাকেন। সে কারণেই আজ এসব তসলিমাদের আবির্ভাব। যুগে যুগে ধর্মের নামেই অধর্মের সৃষ্টি হয়েছে, আর এ অধর্মের অনাচারকে ঠেকাতে এগিয়ে এসেছে কঠিন হাতে এক শান্তির ধর্ম-ইসলাম।

     ইসলামকে নিয়েও ব্যবসা কম হয় নি, এখনও হচেছ, হয়তো আরও হবে। তবু অবশ্যই এই শান্তির ধর্ম প্রতিষ্ঠিত হবে সারা বিশ্বময়-এ কুরআনেরই ভাবষ্যদ্বানী।

     তসলিমা এবং তারই সহযোগী বেশ কিছু বিশেষ ব্যক্তিত্বের নাস্তিকতার জবাব এই গ্রন্থখানি। সে হিসাবে তাদের অনেক ভুল, বিভ্রান্তির জবাবে আমার এ সামান্য প্রয়াসটুকু যেন তসলিমাসহ গোটা বিশ্বের হতাশার মাঝে আলোর সঞ্চার ঘটায় এ আকাঙখা রেখেই এ লেখার উপস্থাপনা।

     নাসরিনের ভাষায় ইসলাম একটি বিতর্কিত বাজে উপাখ্যান। যার প্রতিবাদ করতে বসেই আমার এ বই লেখা। তাই এ উপাখ্যান যে বাজে নয়, তা প্রমাণ করতে অবশ্য আরো আরো গুণীজনদের সাহায্য সহযোগিতা আমাকে প্রমাণ স্বরূপ খাড়া করতে হয়েছে। যার কারণে অনেক সময় অনেক বিজ্ঞ জনের জ্ঞানগর্ভ কথা ও তথ্য সংগ্রহ করেছি আমার বক্তব্যকে আরো বস্তুনিষ্ট ও জোরালো করার জন্যই।

     তাছাড়া আলহাজ্জ ডাঃ জহুরুল হকের ‘সহজ সঠিক বাংলা কুরআন’ থেকে তসলিমার বিতর্কিত বেশ কিছু আয়াতের বাংলা তরজমা সুবিন্যস্তভাবে দেয়ার চেষ্টা করেছি। তাছাড়া আরো আরো তরজমা থেকেও আমি উদ্ধৃতি টেনেছি। ডাঃ হকের তরজমা কিছুটা বিশ্লেষণধর্মী হওয়াতে পাঠকের বুঝার সুবিধার্থে আমি এটার সাহায্য নিয়েছি। ‘নির্বাচিত কলামের’ প্রতিটি আয়াত যেগুলোকে নিয়ে নাসরিন খেলো কথাবার্তা বলেছেন তা আমি অবশ্যই এখানে এনেছি। তাছাড়া বিয়ে, তালাক, পর্দা ও উত্তরাধিকারের নানান ত্রুটি বিচ্যুতি তুলে ধরার কারণে কুরআনের দৃষ্টিতে পাঠকের কাছে এসব কিছুর একটা ধারণা দেয়ার জন্য আমি অনেক সময় যথেষ্ট সংখ্যক কুরআনের উদ্ধৃতি টানতে বাধ্য হয়েছি।

     আমার এ লেখা শুধু তসলিমার প্রতিবাদ করাই মুখ্য উদ্দেশ্য নয়, আমার মূল লক্ষ্য আমার দেশের উঠতি তরুণ তরুণীর আশায়ভরা অনাগত ভবিষ্যত; যার দিকে আমরা তাদের সুন্দর জীবনের জন্য উন্মুখ হয়ে আছি। বিজয় স্মরণীর মাঠের গত বইমেলার ‘মন্তব্য পুস্তিকাতে’ আমার দেশের তরুণদের কিছু মন্তব্য আমাকে বেদনাহত করে যার ফলশ্রুতিতে আমি আরো বেশী করে অনুপ্রাণিত হই বইটি লেখার কাজে হাত দিতে। তাই আমার টার্গেট তসলিমা নন, বরং আগত প্রজন্ম। প্রগতির নামে গতিহীনতার শিকার যেন না হয় আমাদের প্রজন্ম। বিভ্রান্ত যুক্তির মানদন্ডে প্রকৃত যুক্তির মাপকাঠিতে বিচার করার বোধ তাদের মাঝে বিকাশ লাভ করুক, এই কামনায় আমার এ প্রয়াসটুকু শুধু তাদের জন্য। খুব স্বল্প সময়ের আয়োজনে আমার এ লেখার প্রথম সংস্করণে ত্রুটি বিচ্যুতি থাকা স্বাভাবিক। আমি আশা করি আপনাদের সুবিবেচনাই আমার মূল্যায়নের মাপকাঠি হবে। আল্লাহ হাফিজ।

নাজমা মোস্তফা।

প্রথম চ্যাপ্টার:

কুসংস্কারের জঞ্জালে জ্বলছি মোরা

((১ – ক), (২ – খ), (৩), (৪), (৫)

     এখন সন্ধ্যে পেরিয়ে রাতের শুরুটা হয়েছে মাত্র। আগামীকাল আমার ছোট ছেলের এস, এস, সি পরীক্ষা। সন্ধ্যের নাস্তাটা সেরে চুলোয় ভাত চড়িয়ে এসে বসেছি কাগজ কলম নিয়ে। মাঝে মাঝে আঁকিবুকি দিই ঠিকই, কিন্তু কোনো বই লেখার কাজে হাত দিতে পারবো এত তাড়াতাড়ি চিন্তা করিনি।

     আজ আমার আব্বা বেঁচে নেই। কিন্তু লিখতে বসেছি এ কথাটি শুনলে আব্বা বড্ড খুশী হতেন। তিনি ডাক্তার ছিলেন কিন্তু ডাক্তারীর পাশাপাশি নেশা ছিল তাঁর অনেক: রাজনীতি, সমাজনীতি, ধর্মনীতি এসবের সমান্তরালে লেখালেখির হাত তাঁর সচল ছিল। তাঁর পাঁচ ছ’টা বই তিনি জীবিতাবস্থায়ই প্রকাশ করে যান আবার পান্ডুলিপি আকারেও বাংলা ও ইংরেজী বই লিখে রেখে গেছেন, যেগুলো এখনও প্রকাশিত হয় নি। মাত্র বছর গড়িয়ে এলো আমার বাবা অনন্ত যাত্রা করেছেন। তিনি সব সময় আমাদেরে কুরআনের আলোকে দিক নির্দেশনা দেয়ার চেষ্টা করতেন। কুরআনের প্রথম নির্দেশনা `ইকরা’ অর্থাৎ`পড়’ আয়াতটির উপর উনি সবচেয়ে গুরুত্ব দিতেন এবং আমাদেরেও স্মরণ করিয়ে দিতেন:

     `পড়ো! আর তোমার প্রভু (যিনি লেখাপড়ার মাধ্যমে মানুষকে সম্মান ও মর্যাদা দিয়ে থাকেন, আর তোমাকেও নিরক্ষরতা সত্ত্বেও বিশ্বের শ্রেষ্ঠ জ্ঞান দান করতে চুড়ান্ত মর্যাদার আসনে বসাতে যাচেছন)। যিনি শিক্ষা দিয়েছেন কলমের সাহায্যে (কাজেই এই কালি কলমের জোরে, তলোয়ারের জোরে নহে, কুরআনের বানী প্রচারের কঠোর জিহাদ চালিয়ে তুমি দুনিয়ার মানুষকে শিক্ষিত তথা জ্ঞানীগুনী বানিয়ে তোলো ২৫: ৫২)।’

    `যিনি শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে (এমন সব জিনিস) যা সে জানতোই না (২:৩১-৩৩ আর কুরআনের প্রথম প্রত্যাদিষ্ট এই পাঁচটি আয়াতে নিহিত বানীতে তোমার স্রষ্টার পরিচয় ও শিক্ষার গুরুত্ব সম্মন্ধে সম্যক জ্ঞানলাভের মাধ্যমে মানুষের পূর্ণবিকাশ ও মনুষ্যত্বলাভ ঘটবে; কাজেই খৃষ্টান ধর্মমতানুযায়ী অজ্ঞানতার মধ্যেই ধার্মিকতা বিদ্যমান, জেনে ২:১৬-১৭, এমন ধারণা সম্পূর্ণ ভুল) (সুরা আলাক ৩-৪-৫)।“

     লেখা ছাড়া শুধু পড়া মানুষকে ঈস্পিত লক্ষ্যে পৌছায় না। মনে পড়ে অনেক আগে সুমন নামের একটা ছেলে আমাকে প্রায়ই বলতো, লিখতে, তখন আমার বড় ছেলেটা তিন চার বছরের মাত্র। নিজে সব সময়ই নিজের পড়া, সংসার, বাচচা-কাচচা এসব নিয়ে এত ব্যস্ত থাকতাম যে তার কথার কেন পাত্তাই দেই নি।

     তিন চার দিন আগে তসলিমা নাসরিনের কলকাতা থেকে প্রকাশিত `নির্বাচিত কলাম’ বইটি পড়লাম। অনেক দিন থেকেই আমার বড় ইচছা ছিল তাঁর বই পড়ার। খন্ড খন্ড পড়া হলেও কিন্তু বই পড়ার সময় ও সুযোগ এর আগে আর হয়ে উঠেনি। বইটা পড়া অবধি মনে হচেছ আমি কিছু একটা লিখবো, সেটা আমার বিবেকের তাড়না মাত্র। আমি নিজে একদম আনাড়ি, ঐ বললাম না, আঁকিবুকি করেছি মাত্র, -কিন্তু বই লেখার এমন দুঃসাহস আমার এর আগে আর কস্মিনকালেও ঘটেনি। মনে পড়ছে ইংরেজীতে একটি কথা আছে `Every event must have a cause” অর্থাৎ প্রত্যেক জিনিসেরই একটা কার্যকারণ আছে। তাই আমার এই দুর্ঘটনা অনেকটা ঐ গ্রন্থ পাঠের সুবাদেই।

     আমি একজন মেয়ে-মানুষ, নাসরিনের ভাষায় যাকে নিয়ে রয়েছে এক বিরাট প্রশ্নবোধক চিহ্ন?

     তসলিমার ভাষাতে “তবে কি এই-ই সত্য যে নারীর না মরে মুক্তি নেই?” আমি নারী হিসাবে নিজেকে এত হেয় মনে করিনা, কারণ  আমি মনে করি আমি সৃষ্টি জগতের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি, আশরাফুল মখলুকাত। পুরুষ শাসিত সমাজের সর্বক্ষেত্রেই বাড়াবাড়ি, উশৃংখলতা, পক্ষপাতিত্ব, একদর্শীতা কম বেশী অবশ্যই রয়েছে। তাই বলে বিংশ শতাব্দীর এই ঝলমলে নিয়ন আলোর ঝলকানীর মাঝে নারীর মরে মুক্তি পাওয়ার কোন অবকাশ আমি দেখি না।

      বইটা পড়তে যেয়ে তার ভালমন্দ দুটো দিকই আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। শিশুকাল থেকে আজ অবধি সমাজের নানান ত্রূটি-বিচ্যুতি, বৈষম্য লেখিকার মন ও মগজে অনুরণন তুলেছে এবং এসব দ্বন্ধকে ঘিরেই তার অন্তরে এক ধরণের বিদ্রোহী মনোভাবের প্রকাশ ঘটেছে, অনেক ক্ষেত্রে তা প্রশংসার  দাবীদার। লেখিকার ‘নির্বাচিত কলামের’ শুরুতেই পাই, বারো তেরো বছরের একটি ছেলে জলন্ত সিগারেট লেখিকার হাতে চেপে ধরে, যখন তার বয়স আঠারো-উনিশ। ‘মেয়েরা গাছে উঠলে গাছ মরে যায়’ মা এর এই সতর্কবাণীর কারণে লেখিকা তার দুরন্ত কৈশোরে ফলবতী বৃক্ষে চড়তে বাধাগ্রস্থ হয়েছেন। হাজার বছরের স্তুপীকৃত কুসংস্কার, অশিক্ষা এসব ধর্মশিক্ষা নয়। ধর্ম মানুষের জন্য এসেছে, মানুষ ধর্মের জন্য আসেনি। এখানে মানুষই প্রধান, ধর্ম তার নিয়ন্ত্রক যন্ত্র মাত্র।

মেয়েরা গাছে উঠলে গাছ মরে যায়।

খালি কলস দেখা অমঙ্গলের লক্ষণ।

শনি মঙ্গলবারে যাত্রা নাস্তি।

পেঁচা ডাকলে বিপদের আশংকা।

চিরুণী পড়লে কুটুম্ব আসে।

     আমি খুব বেশী আর কুসংস্কারের উদ্ধৃতি টানতে পারছি না, কারণ আমি নিজে খুবই মুক্ত পরিবেশে মানুষ হয়েছি যেখানে কোন অজ্ঞানতা, কোন কুসংস্কার কখনোই শিকড় বিস্তার করতে পারেনি। আমার বাবা-মা দুজনাই ছিলেন ইসলামী চিন্তাধারার ধারক ও বাহক। তাই একদিকে মায়ের নির্দেশনা অন্যদিকে বাবার সুচিন্তিত কুসংস্কারমুক্ত মন সবসময় আমাকে যোগ্য দিকনির্দেশনা দিতে সাহায্য করতো, আর তাই আমি শিশুকাল থেকেই সমাজের এই কালো চ্যাপ্টারের মোকাবেলা করে আসছিলাম যুক্তি ও বিজ্ঞান দিয়ে। আমার এক খালাতো বোন অন্তঃসত্ত্বা, একদিন তার বাড়ী বেড়াতে গেলাম; বয়সে সে আমার সামান্য ছোট ছিল। যাক, আমাকে দেখে সে প্রায় কাঁদো কাঁদো হয়ে তার জন্য দোয়া চাইতে খুব করে অনুরোধ করলো।

ঘটনাটা ঘটেছে এই যে, সে হাতে মেহেদী পরেছে আর তার দুই তিন মাস পরই তার বাচচা হবে, তা দেখে পাশের বাসার খালাম্মা তাকে খুব ধমকে দিয়েছেন যে, কেনো সে বাপের বাড়ী বেড়াতে গিয়ে মেহদী পরে এসেছে। তিনি রায় দিয়েছেন যে তার পেটের সন্তান তার এই হাতের মতই চিত্রা হরিণের রূপ নিয়ে জন্মাবে। এই ভয়ে তার এই কান্না। আমি যতদূর পারি স্বান্তনা দিলাম এবং মহিলার যুক্তির অসারতা বুঝাতে চেষ্টা করলাম।

     পরবর্তীতে আমার তিনবার সিজারিয়ান অপারেশন হয়েছে এবং এই তিনবারই আমি দু’হাতে মেহেদী রাঙ্গিয়ে অপারেশন থিয়েটারে গিয়েছি। আমার ডাক্তাররা আমাকে নিয়ে হাসিঠাট্টাও কম করেননি যে আমাদের পেসেন্ট খুবই রসিক। এত বিপদের দিনেও তার রসের কমতি নেই। আর আমার এ খালাতো বোনের সুন্দর ফুটফুটে মেয়ে শাহজালাল ইউনিভার্সিটিতে এবার ইকোনোমিক্স-এ অনার্স পড়ছে। সে চিত্রা হরিণ মোটেও হয় নি। আর আমার দু’ছেলের একজন ডাক্তারী পড়ছেন আর আরেকজন এবার এস, এস, সি পরীক্ষা দিচেছন। আর সর্বশেষের অপারেশনের সন্তান ঢাকা মেডিকেলের গাইনীর ডাঃ কোহিনূরের আন্ডারে ডাক্তারদের অবহেলার কারণে মারা যায় আমার পেটে থাকা অবস্থায়। আমি সব সময় ডাক্তারকে বলছিলাম আমার অপারেশন করে নিতে কারণ আমার আগের দু’টোই সিজারিয়ান অপারেশন, কিন্তু আমার সব কিছু ভালো বলে ডাক্তারেরা গা করলেন না। পরে রাগের মাথায় তাঁদেরে খুনী বলেও গালি দিয়েছি। ডাঃ এজাজ বলে এক ভদ্রলোক ছিলেন আমার গালাগাল শুনেও আমায় স্বান্তনা দিয়েছেন। ডাঃ কোহিনূরকে আমি কড়া কথা বলবো ঠিক করেছিলাম কিন্তু পারিনি শেষ পর্যন্ত যখন শুনলাম তিনি নিঃসন্তান।

     “ইন্নাল্লাহা মা’আস্ সা’বিরিন।“

      ধৈর্য্যধারীর সাথে আল্লাহ আছেন। তাই ধৈর্য্য ধারণই আমার জন্য উত্তম ঠিক করলাম। ঘটনাটিতে আমার বাবাও ক্ষেপে গিয়েছিলেন কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমরা ধৈর্য্য ধারণ করেছি। কিন্তু আমার ছেলের মৃত্যুর জন্য দায়ী ছিল ডাক্তারের গাফিলতি, আমার হাতের মেহেদী কক্ষনো নয়। আর ছেলে মানে একদম পুতুলের মত হয়েছিল, শুনেছি সবার কাছে, আমাকে দেখতে দেয়া হয় নি।

      ইসলাম এমন এক আলো যেখানে বিজ্ঞানের সাথে তার কোন দ্বন্ধ নেই। বিজ্ঞান মানেই বিশেষ জ্ঞান। আর ইসলাম জ্ঞানের উৎকৃষ্ঠ ভান্ডার। বিজ্ঞান ও ইসলাম ভাইবোনের মত, এ দুই ভান্ডারের কর্তৃত্ব তো একজনের হাতেই।

      আমারই এক প্রতিবেশিনী মিসেস বিশ্বাস সতেরো-আঠারো বছরের সংসার জীবন ঘাটলেও স্বামী আজ অবধি তার মুখপানে ভালো করে তাকায়নি। আর ঘরের ছেলে ঘরেও উঠে নি। উড়নচন্ডির মত সে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদের জুটিতে কোনদিনও ভাবের আদান-প্রদান হয় নি। কিন্তু শাস্ত্রের অগ্নি সাক্ষী করে ওদের বিয়ে হয়েছে। মহিলার বাবা গতায়ু আর বিয়ের সাক্ষী অগ্নি, সুতরাং এ বিয়ের নাকি আর কোন পরিণতি নেই, কোন সমাধান নেই। যার কারণে বিচ্ছেদ অসম্ভব। আমি আক্ষেপ করে দিদিকে বলেছিলাম, “দিদি! কি আফসোস, যার জন্য সারা জীবন সিঁথিতে সিঁদুর এঁকে থাকলেন, থাকবেন, থাকছেন- সে একটি বারের জন্যও আপনার মুখপানে ফিরে তাকালো না।” উত্তরে দিদি বলেছিলেন, `এ ধর্মে আচার আছে ভাই, বিচার নেই।’ কথাটা আজো আমি ভুলতে পারি নি।

      ধর্মের দেয়া মেকি শিকলে মিঃ বিশ্বাস নিজের বিয়ে নিয়ে বড়ই বিপাকে আছেন। মিঃ বিশ্বাস বলেছিলেন, `হিন্দু ধর্ম একখানি স্রোতহীন ধর্ম। এ ধর্মে কোন গতিশীলতা নেই। এ ধর্মে মুক্তির রাস্তা নেই।’ সারা জীবন স্বামী-স্ত্রী হিসাবে নাম সই করে যেতে হবে যদিও কাজে কর্মে কোনই সম্পর্ক নেই দু’জনাতে। সমাজের এমনি সব আচার-অনাচার কুসংস্কারের বিরূদ্ধেই চ্যালেঞ্জ স্বরূপ এসেছিলেন একখানি অস্ত্র নিয়ে সেই মহামানব, শুধু মুসলমানের নবী হয়ে নয়, বিশ্ব মানবের অবতাররূপে, মুক্তিদাতারূপে। তিনিই বিশ্বনবী হযরত মোহাম্মদ মোস্তফা(সঃ)। এ ব্যপারে কুরআন কি বলে দেখুন।

      “আমি তো তোমাকে সমগ্র মানব জাতির প্রতি সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করেছি কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না” (সুরা সাবা: ২৮ আয়াত)।

      হিন্দু ধর্মে শুদ্রদেরে ধর্মগ্রন্থ পাঠের অধিকার দেয়া হয় না। এটা নাকি ব্রাক্ষ্মণের একার সম্পত্তি। আসলে হিন্দু, বৌদ্ধ, খৃষ্টান, মুসলমান, জৈন পারসিক বলে কোন কথা নয়, সবই এক স্রষ্টার সৃষ্টি। সকল মিথ্যার অবসান ঘটিয়ে সত্যের বিজয় কেতন উড়াবার মিছিলে সবাই এক হোন। সত্যের পতাকাতলে সবাই সমবেত হোন। দলিত মথিত করে ফেলুন সমস্ত অন্যায়ের পাপাচারের বেড়াজাল। শুধুমাত্র টিকে থাকুক নির্জলা সত্যটুকু।

     আজও আমাদের সমাজে, পরিবারে সর্বত্র আমাদের পূর্ব পুরুষদের নানান কুসংস্কার, নানান অনাচার আমাদের রক্তের সাথে মিশে আছে। বিচিত্র কি, আমারই পূর্ব পুরুষ হয়তো বা মঙ্গলঘন্টা বাজিয়ে স্থানে স্থানে শক্তির পূজা করেছিলেন – কখনো সূর্যকে, কখনো চন্দ্রকে, কখনো গরু, সাপ, গাছ, পাহাড়কে। সে হিসাবে আজকের শক্তিপূজকদের উচিত ফ্রিজ, টেলিভিশন, এয়ার কন্ডিশনার, কম্পিউটার, রোবটকে পূজা দেয়ার। কারণ এসবের শক্তির কাছে সাধারণ মানুষের বিদ্যাবুদ্ধি হার মানে। আর এই সব শক্তি পূজকদের ব্যাপারে আল্লাহ কি বলেন, দেখুন –

     “যারা তাদের প্রতিপালককে অস্বীকার করে তাদের উপমা তাদের কর্মসমূহ ভষ্মসদৃশ যা ঝড়ের দিনে বাতাস প্রচন্ড বেগে উড়িয়ে নিয়ে যায়। যা তারা উপার্জন করে তার কিছুই তারা কাজে লাগাতে পারে না। এটাতো ঘোর বিভ্রান্তি” (সুরা ইব্রাহিম: ১৮আয়াত)।

     “যারা কুফরি করে তাদের কর্ম মরুভূমির মরীচিকাসদৃশ, পিপাসার্ত যাকে পানি মনে করে থাকে, কিন্তু সে তার নিকট উপস্থিত হলে দেখবে তা কিছুই নয়” (সুরা নূর: ৩৯আয়াত)।

     প্রত্যেক জিনিসই তার মূল্যবোধের মাধ্যমে ভালমন্দরূপে গ্রহনীয় হওয়া উচিত। ইসলামে কোন কালেই ধর্মে জোর জবরদস্তী স্বীকৃত নয়। যারা ইসলামকে বুঝতে চেষ্টা করে না বা বুঝতে চায় না তাদেরকে আল-কুরআনে কাফেরুন বলা হয়েছে। কাফেরুন অর্থ সেই সব লোক যারা নিজেদেরকে আড়াল করে রাখে অর্থাৎ ইসলামের পরিভাষায় যারা ইসলামের কাছ থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখে বা নিজেদেরকে লুকিয়ে রাখে।

     পড়ার উপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন নাসরিনের বাবা, কিন্তু আফসোস নাসরিনের জন্য! শত ফুল থেকে মধু আহরণ করে মৌমাছি অবশেষে মৌচাক গড়ে তোলে। সব ধর্মের নির্যাস ঘেটে যদি সামান্যতম মধু মতাদর্শ বা দিক নির্দেশনা তিনি সমাজকে দিতে পারতেন বা নিজেও গ্রহণ করতে পারতেন তবে তার সাহিত্যিক জীবন ও মানব জীবন ধন্য হত। একটা আগাগোড়া জগাখিচুড়ী চিন্তাধারার ধারক তিনি, না ঘরকা, না ঘাটকা।

     মানুষের জীবন শৈশব, কৈশোর, যৌবন, বার্ধ্যক্য এই চারটি ধাপের সম্মিলিত সোপান। তিনি শুধু তৃতীয় ধাপটিকে লাভে-লোকসানে উসুল করার তাগাদায় ব্যস্ত থেকেছেন। আর জীবনের বাকী ধাপগুলোকে বিড়ম্বনার মাঝে ফেলে দিয়েছেন। তার উদ্দাম স্বাধীনতার ফসল হবে অজস্র জারজ সন্তান, উশৃংখল কৈশোর, মদোন্মত্ত যৌবনদীপ্ত স্বাধীনতা আর মৃত্যুর বিভীষিকার মাঝে পড়ে থাকা হতাশার বার্ধ্যক্য। এই হলো তার আদর্শের পরিণতি।

    “যে দেশের অধিকাংশ নারীই বস্ত্রহীনতায় ভোগে, সে দেশে কাপড়ের উপর কাপড় পরিধান দৃষ্টিকটু তো ঠেকেই, বৈষম্যের ব্যবস্থাগুলোও আরো বেশী প্রকট হয়।’

     নাসরিনের উপরোক্ত বক্তব্যটা আসলেই কি সঠিক? অর্থনৈতিক পুষ্টিতে ভরপুর পাশ্চাত্যের অফুরন্ত প্রচুর্যের ভেতরে নারীদেহের কাপড়ের স্বল্পতা কি এটাই প্রমাণ করেনা যে, প্রাচুর্যে ভরা সভ্যতাতেও কাপড়ের ক্রাইসিস অত্যন্ত প্রকট? পাশ্চাত্যের মহিলারা শরীরের উপর নীচের প্রায় উদোম রেখে মাঝখানে একটা কিছু পরে সভ্যতার চিহ্ন বহন করে বেড়ান। আর হতদরিদ্র দেশে আমাদের কাপড়ের এমনই স্বল্পতা দেখা দেয়নি যে, স্রষ্টার নির্দেশ পালন করার জন্য একখানি স্কার্ফ, ওড়না বা চাদরের বাজেট আমরা যোগান দিতে পারবো না। পাশ্চাত্য সভ্যতার দেশে দেখা যায় কাপড় না পরা বা প্রায় উলঙ্গ থাকাটাও এক ধরণের গ্ল্যামার বলেও দিব্যি চালানো যায়। আমাদের তসলিমা এসবের হাতছানিতে এই মেকী গ্ল্যামারের গ্লানিতে তার উৎকৃষ্ট সংস্কৃতিকে অবজ্ঞা করে মেকি জিনিসটাকে বড় করে দেখেছেন বলেই তার মাঝে এই ব্যাল্যান্সএর ব্যাপারটা সঠিক দিকদর্শন পায়নি। চিরটা কাল তিনি ভেবে আসছেন যে তিনি প্রচন্ড নির্যাতিতা। আসলে উন্নত অনুন্নত উভয় সমাজেই ভিন্ন আকারে নারীরা পন্য আকারে ব্যবহৃত হচ্ছে। কারোর কপড়ের সল্পতা কারো মনের দৈন্যতায় উভয়েই আক্রান্ত উন্নত মন মানসিকতার অভাবে। 

বিশেষ দ্রষ্টব্য: ‘তসলিমার কলামের জবাব’ গ্রন্থটি এখানে অধ্যায় হিসাবে ধাপে ধাপে দিব। দুই যুগ আগে ছাপা হওয়া বইটির ভূমিকা, সূচি ও প্রথম অধ্যায়সহ আনুসাঙ্গিক শুরুর সবটাই দিলাম। সূচিরও আগে শুরুতে আমার দেশের অনেক দাগ লেগে আছে, তাই দিলাম।। বইএর বাকীটাও ধাপে ধাপে আসবে।

চ্যাপ্টার দুই:

কুসংস্কারের জঞ্জালে জ্বলছি মোরা (খ)

আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলীয় নেত্রী মাথায় কাপড় দেয়াতে নাসরিনের বেজায় আপত্তি। আজীবন আপনার মা-চাচী সবাই মাথায় কাপড় দিলেন আর আজকের আধুনিকা নাসরিন নিজের মাথাকে উলঙ্গ রেখে পুরুষের সাথে সমতা আনার চেষ্টা করছেন। রাজনীতির কারণে যদি নেত্রীরা মাথার কাপড় দেন, তবে মুসলিম হিসাবে আমিও খুশী হবোনা। তবে আমার বিশ্বাস প্রতিটি মুসলিম নারীরই স্রষ্টার নির্দেশ পালন করার নিমিত্তে মাথায় কাপড় তোলা উচিত।

এই তো কিছুদিন আগে মনে পড়ে এক বিয়ের জলসা থেকে ফিরছিলাম আমরা ছ’জন মহিলা। পাঁচ জনার মাথাই খোলা ছিল, ব্যতিক্রম ছিলাম আমি। হঠাৎ করে এর মধ্যে এক মহিলা বলে উঠলেন, “ভাবী আপনার এমন সুন্দর মুখখানা ঢেকে রেখেছেন কেন?” বস্তুতঃ আমি বাইরে সব সময়ই মাথায় স্কার্ফ বা একটা হেড কাভারিং ব্যবহার করে থাকি। আরো অনেক কথার মাঝে মহিলার কথাও হারিয়ে যায়। বিয়ের আনন্দ জলসা থেকে ফেরার পথে আমি উপস্থিত সবার মাথা খোলা দেখে মহিলার প্রশ্নের কোন প্রত্যুত্তর করিনি। তবে একান্তে ঐ মহিলাকে আমার কিছু স্পষ্ট কথা বলার প্রয়োজন ছিল। কারণ জীবনের একটি চরম সত্য কথা হয়তো তিনি জানেন না বলেই এসব ব্যাপারে রসিকতা করতে পেরেছেন। মেয়েদের হেড কাভারিং বা মাথা ঢাকা আল্লাহর দেয়া স্পষ্ট নির্দেশ। যদি কেউ এটা অমান্য করে তবে সে স্রষ্টাকেই অমান্য করলো।

পুরুষ শাসিত সমাজের কারো রক্তচক্ষুর ভয়ে আমি আমার আঁচল মাথায় চড়াই নি। এ আমার দাসীর চিহ্ন নয়। আমি মানুষ, স্রষ্টার শ্রেষ্ঠ জীব আমি। স্রষ্টার প্রতিনিধিত্ব করাই আমার কাজ। আর আমার মাথার আঁচল আমার পরিচয় বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দিচ্ছে যে আমি আল্লাহ ছাড়া কাউকে পরোয়া করি না। শুধু মাত্র আল্লাহকে পরোয়া করি বলেই মাথায় আমার বিজয়ের চিহ্ন। পৃথিবীর যে কোন জনপদে যে কোন প্রত্যন্ত অঞ্চলে আমাকে দেখলে যে কেউ বুঝতে পারবে আমি প্রতিনিধিত্ব করছি এক জনেরই, সে আর কেউ নয়, আল্লাহ।

কিন্তু আফসোস! নাসরিন আপনার কোন চিহ্ন নেই। আপনাকে দেখে বুঝার উপায় নেই যে আপনার পরিচয় কি? শত মুখে বলছেন এ দেশে আপনার যোগ্য একটা পুরুষও জন্মায় নি। তাও আবার এরি মধ্যে তিন তিন জন পুরুষকে মাড়িয়ে এসেছেন; একজন তো ইহধাম ছেড়ে চলেও গিয়েছেন। যাক এ ব্যাপারে আপনার কথায় ও কাজে যথেষ্ট মিল অমিল দুই-ই আছে।

আপনার বাবা-মায়ের লড়াইয়েও আপনার বাবাই সম্ভবতঃ পুরুষ মানুষ তো তাই জিতেছেন। আপনার মা রান্না শেখাতে তাগাদা দিতেন আর আপনার বাবা পড়ার তাগাদা দিতেন। বুঝা যায় আপনি রান্না শেখেননি, শুধু পড়তে শিখেছেন। তবে আপনার বাবা আপনার পড়ার ব্যাপারে তৃপ্ত হতে পেরেছেন এমন কথা আমি পাইনি এ পর্যন্ত। আপনার বাবা-মা সম্ভবত দু’জন দুমেরুর মানুষ। তাই দুজনেই সংসার করলেও দুজনাই একা।

আপনার বিতর্কিত কিছু কলামের উপর আমি আপনাকে তথ্যগত ধারণা দেয়ারই চেষ্টা করবো। অনেক জায়গায় আপনি নামাজ নিয়ে খেলো কথাবার্তা বলতে পেরেছেন কারণ নামাজের মর্ম আপনি অন্তর থেকে উপলব্ধি করতে পারেননি। ইসলামে আসলে কোন ধরণের পূজাই স্বীকৃত নয়, তা পীর পূজাই হোক, আর মূর্তি পূজাই হোক, কবর পূজাই হোক আর মাজার পূজাই হোক। মৌল ইসলামে একমাত্র আল্লাহর একত্বই স্বীকৃত। এখানে আর কোন ইলাহ নেই। পীর, পুরোহিত, তাবিজ, কবজ যে সবের উপর আপনি ধিক্কার দিয়েছেন, ওগুলো ইসলামের জিনিস নয়।

আর নামাজ মুসলমানের এমন একটা ধর্মানুষ্ঠান যেখানে আমার আর আমার স্রষ্টার মধ্যে কোন প্রতিবন্ধকতা নেই। আমার স্রষ্টাকে ধরতে হলে মন্ত্রী মিনিস্টারের দরবারে দৌড়াতে হয়না, পীর পুরোহিতের বাড়ী লাইন দিতে হয়
না। আমার পর্ণ কুটিরে বসেই আমি তাঁর সথে যোগাযোগ করতে পারি, এটাই আমার উত্তম মাধ্যম। তাছাড়াও দাঁড়িয়ে, শুয়ে, বসে সর্বাবস্থায় আমি স্রষ্টার সাহায্য চাইতে পারি। আমি মেয়ে হয়েও পারি, এর জন্য কোন পুরুষকেও আমার ধরতে হয় না, আমি একাই একশ।

হাবিবুল্লাহ নামক ছেলের সাথে আপনি বন্ধুত্ব করতে চেয়েছেন আজীবন, কিন্তু হাবিবুল্লাহর প্রেমের ডাকে আপনি মর্মাহত হয়েছেন। ঘৃণায় তাকে ফিরিয়ে দিয়েছেন। তবে আপনি স্বীকার করেছেন যে ছেলে মেয়েতে আসলে বন্ধুত্ব হয় না। আপনারা পাঁচ বছর এক সঙ্গে পড়েছেন, চলেছেন। হাবিবুল্লাহ কখনো আপনার আঙ্গুল স্পর্শ করার লোভ করেনি। হাবিবুল্লাহ ফেরেশতা ছিলেন কি না জানি না। তবে আজকাল আর হাবিবুল্লাহদের মত এরকম ফেরেশতা খুব একটা দেখা যায় না।

আজকাল আপনাদের নব্য কালচারের জোয়ারে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে যে জোড়ায় জোড়ায় ঢলাঢলি করে চলে বেড়ান, তা রাস্তাঘাটে লজ্জা শরমের মাথা খেয়ে পাশ্চাত্যের বাতাস লাগানো বুঝি? নব্য শহুরে কালচারের মাঝে নিজেকে বিকিয়ে দেয়ার মানেই কি আধুনিকতা? উশৃংখলতার মাঝেই কি জীবনের সার্থকতা? লাগামহীন উচছলতাই কি স্বাধীনতা? সোহরাওয়ার্দির চত্বরে হাঁটতে যান, রমনা পার্কে ধানমন্ডি লেকের ধারে দেখে আসুন আগত প্রজন্ম কেমন নেশাখোর হয়ে পড়ে আছে প্রেমের মদিরতায়; নিজের বয়সের কাছে তারা পিছলে পড়ছে। অনাগত সুন্দর ভবিষ্যৎটাকে প্রেম প্রেম খেলা খেলে জীবনকে বিষিয়ে তুলছে। সামনে তার অফুরন্ত জীবন ভান্ডার উন্মুক্ত।

আপনারা সতীদাহ প্রথা, বাল্য বিবাহের কথা বলছেন, খুব সুখের কথা, এসব প্রথা সমাজকে পঙ্গু করে রাখে, কোমর সোজা করে দাঁড়াতে দেয়নি ঠিকই। কিন্তু পাশাপাশি সমাজে নারীপুরুষের সমতার নামে বেহায়াপনার যে ডাক দিয়ে যাচ্ছেন তাতে উঠতি কৈশোর, যৌবন বিপন্ন অবস্থার সম্মুখিন হচ্ছে। নষ্ট কৈশোর, নষ্ট যৌবন দিয়ে একটা ছেলেমেয়ের জীবনকে হত্যা করার এমন কোন ষড়যন্ত্র কোন সাহিত্যিকের থাকা উচিত নয়। এ দেশের আলো বাতাসে আমরা লালিত। আমাদের ঋণ কখনো শোধ হবার নয়। আমাদের কর্ম দিয়েই আমাদের ঋণ শোধ করতে হবে।

আমার দু’খানা ছেলে মাত্র। জগত জোড়া লক্ষ লক্ষ ছেলে, কোটি কোটি মেয়ে লাঞ্ছনার হাত থেকে রক্ষা পাক, দিশেহারা জীবন-তরণীর উত্তাল উন্মত্ততার মাঝেও নিজের দিশা ঠিক করে নিতে ওরা সচেষ্ট হোক। ওরা সার্থক মানুষ হোক, ওরা সার্থক প্রেমিক হোক, ওরা আদর্শের ধারক হোক। আমার দেশের ছেলে-মেয়েরা যদি সঠিক আদর্শ চিহ্নিত করে নিজের ভালোমন্দ স্থির মস্তিষ্কে ঠিক করতে পারে তবে ইনশাআল্লাহ, এ গোটা বিশ্ব জয় করতে তাদের থোড়াই পরোয়া করতে হবে।

নাসরিনের কিছু কিছু ক্ষেত্রে যথেষ্ট যুক্তিবাদী কথাবার্তা আমার মত যুক্তিবাদী মানুষকে আকৃষ্ট করলেও অনেক ক্ষেত্রে আমার মনকে প্রতিবাদীও করে তুলেছে। বিভিন্ন ধর্মের অসারতার যে ছবি তিনি তুলে ধরেছেন তার ভূমিকা আমরাও ইতিহাস ঘাটলে পাই, সর্বোপরি শ্রেষ্ঠ ধর্ম ইসলাম সম্পর্কে কিছু বাড়াবাড়ি বা বুঝার কমতিই সম্ভবতঃ তাকে এমন ইসলাম বিদ্বেষী করে তুলেছে।

তাই আমি সব সময়ই চেষ্টা করবো তথ্য ভিত্তিক কিছুটা ধারণা দিতে। আমি তার ঘুম ভাঙ্গানোর চেষ্টা করবো আর আমার দেশের ভাইবোনদের, ছেলেমেয়েদের কাছে আমি যতটুকু বুঝেছি ততটুকু তুলে ধরার চেষ্টা করবো। তবে জেগে যদি কেউ ঘুমানোর ভান করে তবে তার ঘুম ভাঙ্গানো যায় না। যদি কেউ বুঝেও না বোঝার ভান করে তবে আমার বলার কিছুই থাকবে না। তবে আমার প্রয়াসটুকু রইলো মাত্র। জগতের, সমাজের, আমার দেশের, গোটা বিশ্বের ভালো আমি চাই। কারো ক্ষতি করা, কারো অমঙ্গল করা আমার ইচছা নয়। পুরুষ নারীতে কোন বৈষম্য স্রষ্টা সৃষ্টি করেনি, করেছে মানুষ। আর পুরুষ আমার সর্বনাশ করেছে বলে আমিও তার সর্বনাশ করবো এ বোধ আমার নেই। আমি উত্তম হতে চাই কারণ আমার পরিচয় ‘আশরাফুল মখলুকাত’। আমার পরিচয় পুরুষ নারীতে নয়। “তুমি অধম তাই বলিয়া আমি উত্তম হইবো না কেন?” এই নীতিতেই আমি বিশ্বাসী।

পীরতন্ত্র, কবরপূজা, মাজারপূজা সম্বন্ধে নানান কুসংস্কারের অনেক প্রশ্নের মুখোমুখি আপনি দাঁড়িয়ে। এসব কক্ষনো ইসলামে স্বীকৃত নয়। এ সম্বন্ধে বেশ কয়েকটি কুরআনের আয়াতের উদ্ধৃতি আমি নীচে দিচ্ছি। পীরতন্ত্র, শিরকী প্রথার বিরুদ্ধে কুরআন কি বলে দেখুন –

“নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমা করবেন না যে তাঁর সাথে কাউকে শরীক করবে (এই জন্য নয় যে তিনি দেবদেবীর প্রতি ঈর্ষাপরায়ন, বরং এর কারণ এই যে, এতে মানুষের মর্যাদা যার পর নাই ক্ষুন্ন হয়, কেন না আল্লাহ মানুষকে তার প্রতিনিধিরূপে দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন, ২:৩০ এবং সারা বিশ্ব জগতকে সৃষ্টি করেছেন মানুষেরই সেবার জন্য ১৪:৩৩, কাজেই মানুষ যদি মনিব হয়ে চাকরের কাছে জী হুজুর করে, সাহেব হয়ে গোলামকে কুর্নিশ করে, রাজা হয়ে প্রজার পায়ে মাথা ঠেকায় তবে এর চেয়ে লন্ডভন্ড কান্ড আর কি হতে পারে?), আর তাছাড়া আর সব (ভুলভ্রান্তি পাপাচার) তিনি ক্ষমা করেন যার জন্য (উপযুক্ত বিবেচনায়) তিনি ইচছা করেন। আর যে কেউ আল্লাহর সাথে শরিক করে সে তাহলে উদ্ভাবন করেছে বিরাট পাপ (তথাপি আল্লাহর সাথে পাল্লা দেবার পরেও তারা যদি অনুতাপ করে ও নিজেদের জীবনধারা সংশোধন করে নেয় তবে আল্লাহর করুণার দ্বার রয়েছে সদা উন্মুক্ত” (সুরা নিসার ৪৮, ১১৬ আয়াত)।

“(হে মুহাম্মদ!) তুমি কি তাদের (পীর ফকির ও সাধু সন্ন্যাসীদের) দিকে চেয়ে দেখোনি যারা (আর তাদের মুরিদ শিষ্য-সাগরেদদের থেকে তাবেদারী দাবী করে ২৯: ১২)? না, (আল্লাহকে তাদের ব্যবসার পণ্য করার জন্য ও লোককে ধাপ্পা দিয়ে ফুঁক ও থুক দেয়া পানি খাইয়ে এবং তাবিজ কবজ বিলিয়ে লোকঠকানো ধান্ধা ফাঁদার জন্য তারা পবিত্র তো নয়ই, বরং) আল্লাহ পবিত্র করেন (নির্ভেজালভাবে তাঁরই প্রতি অনুগত বান্দাদের) যাদের তিনি পছন্দ করেন (অতএব বিশুদ্ধ জল পেতে চাইলে নোংরা খাল-বিল-ডোবা প্রভৃতির ন্যায় ধাপ্পাবাজদের খপ্পরে না পড়ে, ৩৯:৩, বরং সোজা ঝরনার উৎস স্থলে চলে যাওয়াই শ্রেয় ২৯:৬৯)। আর (যারা এই সব দালাল তূল্য লোকদের খপ্পর এড়িয়ে সোজা আল্লাহর শরণাপন্ন হয়) তাদের প্রতি অন্যায় করা হবে না খেজুর বিচির পাতলা আবরণ পরিমাণেও” (সুরা নিসার ৪৯আয়াত)।

“আর যারা অবিশ্বাস করে (এবং পীর ফকির ও সাধু সন্নাসী সেজে বেহেশত দুযখের কন্ট্রাকটরি করে) তারা যারা (আল্লাহ ও রসুলের প্রতি) বিশ্বাস করেছে তাদের বলে: (আমাদের মুরিদ শিষ্য হয়ে) আমাদের পথ অনুসরণ কর, তাহলে আমরা (পরকালে) তোমাদের পাপ বহন করবো (এবং বেহেশতে সিট রিজার্ভ করে ঢুকিয়ে দেব)।” বস্তুতঃ তারা তো ওদের পাপের থেকে কিছুরই ভারবাহক হবে না (কেন না তাদের নিজেদের পাপের বোঝায় তাদের ঘাড় ভেঙ্গে যাচেছ, আর কারোর ঘাড়েই তো দুটো মাথা থাকে না, তাই প্রত্যেককেই নিজ নিজ বোঝা নিজের মাথায় বইতে হবে, ৬:১৬৫) নিঃসন্দেহ (যারা অন্যের পাপের ঝুড়ি বওয়ার ঝুট ওয়াদা করে কুলি মজুরের ন্যায় পয়সা কামাতে দ্বিধা করে না) তারাই মিথ্যাবাদী” (সুরা আনকাবুত ১২ আয়াত)।

“আর তারা তাদের (পাপের) বোঝা অবশ্যই বইতে, আর তাদের (আপন) বোঝার সঙ্গে (তাদের চেলাদের) অন্য বোঝাও (তাদের বইতে হবে, কেননা তারাই তো শিষ্যদের আল্লাহর বন্দেগীর নামে তাদের তাবেদারীতে নিয়োগ করে ওদের পাপের ঝুড়ি ভারী করে দিয়েছিল, ১৬:২৫) আর কিয়ামতের (শেষ বিচারের) দিনে তাদের অবশ্যই প্রশ্ন করা হবে যে (মিথ্যা পীর মুরশিদি ও সন্নাসগিরি) তারা উদ্ভাবন করেছিল সে সম্বন্ধে” (সুরা আনকাবুত এর ১৩ আয়াত)।

“যারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে (মিথ্যা দেবদেবী, ভন্ড পীর ফকির ও সাধু সন্নাসী, অন্ধ বিশ্বাস থেকে উদ্ভুত উদ্ভট আচার অনুষ্ঠানে, ঝাড় ফুঁক তথা তাবিজ কবচ ও গ্রহরত্নের উপর ভরসা ও আস্থা স্থাপনের দ্বারা ঐসব নিরর্থক বিষয়বস্তুর ন্যায়) অন্য অভিভাবক গ্রহণ করে (২৫:৪৩) তাদের উপমা হচেছ মাকড়সার দৃষ্টান্তের ন্যায়, সে নিজের জন্য (নানান ধরণের পরিকল্পনা করে ও নকশা কেটে) ঘর বানায়, অথচ নিঃসন্দেহ সবচেয়ে ঠুনকো বাসা হচেছ মাকড়সারই বাসা, যদি তারা জানতো (যে বুদ্ধি বিবেচনাহীন লোকের অন্ধ বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে যারা কুসংস্কারের মায়াজাল বোনে নির্বোধ লোকদের তাতে জড়াতে চায় তাদের ক্রিয়াকলাপ ইসলামের দুর্বার অগ্রগতির প্রথম আঘাতেই মাকড়সার জালের ন্যায় ছিঁড়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে)” (সুরা আনকাবুত এর ৪১আয়াত)।


তৃতীয় চ্যাপ্টার:

‘নির্বাচিত কলামের’ নির্যাতিত নারী

 

নাসরিনের নির্বাচিত কলামের সবচেয়ে আলোচিত পয়েন্ট এই নির্যাতিত নারী। শুরুতে জলন্ত সিগারেটের আঘাতে পোড় খাওয়া দেহের বেদনার ক্ষোভ দিয়েই লেখিকা নিরীহ নারীদের নির্যাতনের ইতিহাস থরে বিথরে বলে গেছেন। নাসরিনের মত নাজমাও তো নারী, তাই স্বভাবতই স্বজাতির বেদনায় আমি অবশ্যই মর্মাহত।

আলো আর অন্ধকার, শিক্ষা-অশিক্ষা, কুশিক্ষা-সুশিক্ষা সবই দিন রাতের মত একে অন্যের প্রতিপক্ষ হয়ে আছে। তবে নারী নির্যাতনের জন্য নাসরিন শুধুমাত্র দায়ী করেছেন পুরুষ শাসিত সমাজের সমাজপতিদের, পুরুষদের। আমাদের সমাজের বঞ্চনার জন্য শাসিতের একনায়কত্ব অনেকাংশে দায়ী বটে, তবে এটিই একমাত্র কারণ বলে আমি মনে করি না। অশিক্ষা, কুশিক্ষা আর অন্ধকারের সাথে যাদের বসবাস তারা তো বারে বারে হোঁচট খাবেই।

শিক্ষার আলোই নারীকে মুক্তি দেবার একমাত্র বাহন। এটাই আমার বিশ্বাস। বৈদিক যুগ,শতপথ ব্রাক্ষ্মণ, তৈত্তিরীয় সংহিতা, ঐতরেয় ব্রাক্ষ্মণ, বশিষ্ট ধর্মসূত্র, আপাস্তম্ভ ধর্মসূত্র, বৃহদারণ্যক উপনিষদ, মৈত্রায়নী, সংহিতা ইত্যাদি থেকে নানান উদ্ধৃতি দিয়ে লেখিকা নারী জনমের অসারতা তুলে ধরেছেন গ্রন্থটির ছত্রে ছত্রে।

লেখিকার ভাষায় শকুনি, নেউল, ছুঁচো, কুকুর, শুদ্র ও নারীর মধ্যে শাস্ত্র কোনো পার্থক্য করে নি। শাস্ত্র করে নি বলে সমাজও করে নি। বৈদিক ভারতবর্ষ নারীকে মানুষ বলে স্বীকৃতি দেয় নি। খৃষ্টপূর্ব দ্বাদশ শতকের সমাজ নারীকে যতটুকু অসম্মান করেছে, তিন হাজার বছরও বর্তমান খৃষ্টাব্দের সমাজ ভিন্ন কৌশলে ভিন্ন ব্যবস্থায় নারীকে একই রকম অসম্মান করে যাচ্ছে।

লেখিকা তার নির্বাচিত কলামের পনেরো পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেন, “মেয়েদের কোরান শিক্ষা দেওয়া হতো স্বামীর মঙ্গলের জন্য যেন সে দোওয়া দুরুদ পড়তে পারে।”

সাহিত্য সৃষ্টি করার নামে মিথ্যার বেসাতি করা তো কোন সাহিত্যিকের কাজ নয়। কোন ব্যাপার সম্বন্ধে সঠিক ধারণা না নিয়ে কোন কথা বললে উপস্থিত চমক আনা যায় হয়তো বা, কিন্তু তা কোন আদর্শ স্থাপন করতে পারে না। আপনার এই ঠুনকো কথাটা কেমন করে কুরআন উড়িয়ে দিচেছ দেখুন –

“আর যে কেউ কোনো ত্রুটি বা পাপ অর্জন করে, তারপর (উদর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপিয়ে) এর দ্বারা দোষারূপ করে নির্দোষকে (১২:৭০), সে তাহলে নিশ্চয়ই বহন করেছে কলঙ্কারোপের ও স্পষ্ট পাপের বোঝা” (সুরা নিসার ১১২ আয়াত)।

এখানে পুরুষ নারী বলে কোন কথা নেই। প্রত্যেককে প্রত্যেকেরই বোঝা বহন করতে হবে। একের পাপ অন্যে খন্ডানোর কোন জালিয়াতি সিস্টেম কুরআনে নেই। সব সময় কুরআনের সত্যতাকে প্রকাশ করার স্পষ্ট নির্দেশ কুরআনে আছে। ধর্মকে নিয়ে ব্যবসা না করতেও কুরআনই হুশিয়ারি উচচারণ করেছে। ‘স্বামীর পায়ের নীচে স্ত্রীর বেহেশত’ বলে কোন প্রমাণ কুরআন হাদিসে নেই। বরং নারীর সম্মানার্থে হাদিসের উদ্ধৃতি আছে “মায়ের পায়ের তলায় সন্তানের বেহেশত।” আপনারা শোনা কথাকে, পৌরানিক গালগল্পকে ব্যবসায়িক কথাকে ইসলামের অঙ্গীভূত করবেন না। ইসলাম অর্থ শান্তি, নির্জলা সত্যের মাঝেই তার প্রকাশ। নানী দাদীদের উপকথা অন্য ধর্মের কথা হতে পারে, ইসলামের নয়।

“অশিক্ষিত মানুষ ভাল মন্দ শিক্ষা নেয় ধর্ম থেকে।” নাসরিনের ৬৯ পৃষ্ঠায় নির্বাচিত কলামের উপরোক্ত কথাটি অবশ্যই আনন্দেরই কথা। ইসলাম এমনই একটা ধর্ম যেখানে শিক্ষিত, অশিক্ষিত সকল মুসলমানই ইসলাম জানে এবং মানে। জ্ঞানের স্বল্পতার কারণে হলেও তারা ধর্মকে জানার প্রয়াস চালায় যেটা আর কোন ধর্মে দেখা যায় না। এরা যদি সুশিক্ষিত হতো, শিক্ষার আলো পেতো তবে অন্তত: নিশ্চয়ই আপনাদের মত মন মানসিকতার লোক ইসলামের বারোটা বাজানোর জন্য তৎপর হতে পারতেন না। আর এসব স্বল্পশিক্ষিতদের মনগড়া তথ্য দিয়ে সমাজটাতে ধস নামানোর প্রয়াসও করতেন না।

কলেজ পাঠকালীন সময়ে আমরা সহপাঠিরা হোস্টেলে অবসরে ধর্মালোচনা করতাম, এর উদ্দ্যোক্তা আমরা ২/৩ জন মুসলমান মেয়েই ছিলাম। কোনো সাম্প্রদায়িকতা নয়, সর্ব ধর্মের সবাই সবার কথা বলতাম। এখানে হিন্দু মুসলমান ও খ্রীষ্টান এই তিন পক্ষেরই প্রতিনিধিরা থাকতো। দেখা যেত কার্যত: মুসলমান মেয়েরাই ধর্ম সম্বন্ধে অনেক কিছুই বলছে কিন্তু কোন হিন্দু মেয়ে কোন গল্প বা তথ্যভিত্তিক কথা বলতে পারতো না, আর খ্রীষ্টান মেয়েদের পক্ষে লুসি গাবিল নামে আমার এক সহপাঠিনী তার ধর্মের অনেক কথাই বলতো। এ রকম ঘটনায় হিন্দু মেয়েরা লজ্জা পেত। ওরা বলতো, “কি জানি বাবা, তোরা জন্মেই ধর্মচর্চা শুরু করে দিস্, আমরা ওসব পারলে শেষ বয়সে মৃত্যুর আগে আরতি, অর্চনা, উপবাস যা পারি করে যাব, এখন এসব আমাদের মাথায় নেই।” শেষ পর্যন্ত উপস্থিত সভার মনোয়ারা নামের আমাদের এক সহপাঠিনী সে রামায়ণ, মহাভারত পড়েছিল। সে হিন্দুদের পক্ষ থেকে ওসব গ্রন্থের কিছু গালগল্প বলে আমাদের শোনাতো। তাছাড়া আমরা আঞ্চলিক কথাবার্তা নিয়েও আলোচনা করতাম। এক এক অঞ্চলের এক এক ভাষা আমাদের দারুণ আনন্দের খোরাক যোগাত।

নাসরিনের ৮৫ পৃষ্ঠাতে লেখা, “ধর্ম নারীকে অমানুষে পরিণত করে, ধর্ম নারীকে করে পুরুষের ক্রিতদাসী।” আবার ১১২ পৃষ্ঠায় “বিভিন্ন সম্প্রদায়ে বিবাহিত, অবিবাহিত ও বিধবা নারীর সজ্জা বিভিন্ন রকম। নারী এয়োতির চিহ্ন বহন করে, হাতে শাঁখা, সিঁথিতে সিঁদুর, নাকে নোলক, গায়ে গয়না, কাতান বেনারসি পরে নারী প্রমাণ করে সে বিবাহিত। বিধবা বা বিপতœীক এর মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্যের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিধবার গা থেকে যাবতীয় অলংকার খুলে ফেলতে হবে। বিধবার পরিধেয় বস্ত্র হবে কাফনের মত সাদা, অন্য এক সম্প্রদায়ে বিধবার আমিষ খাওয়ার বিধান নেই, বিধবা মাছ মাংস, ডিম-দুধ খেতে পারবে না। কিন্তু বিপত্নীক পুরুষের জন্য কিছুই বাধা নয়, তাকে নিরাভরণ এবং নিরামিষাশী হতে হয় না।”

উপরের প্রত্যেকটি অপলাপ মুসলিম ছাড়া অন্য অনেক সম্প্রদায়ের ধর্মের অঙ্গ বলে পালন করা হয়। এসব কোন বিধানই ইসলামের অঙ্গ নয়। ইসলামে কোন বিধবা যদি সাদা কাপড় পরে তা তার নিজের অভিরুচী, ধর্মীয় নির্দেশ নয়। বৃটেনের রানীও বিয়ের পোশাকে কফিনের মত সাদা ড্রেস পরে শব সেজে থাকেন। ইসলাম কোন মেয়েকে বিধবা সেজে কৃচ্ছতা পালন করতে বলেনি। প্রয়োজনে ইদ্দত পালন করার পর সে তার গতিশীল জীবনের চিন্তা করতে পারে, নতুন জীবনের জন্য স্বামী নির্বাচন করতে পারে, এ অধিকার তার আছে। ইসলামে বধুকে শাখা, সিঁদুর, গয়না, কাতান, বেনারসি দিয়ে বিবাহিতার প্রদর্শনী করার কোন বিধান নেই। কারো ইচ্ছে হলে কাতান বেনারসি সে পরতে পারে, তাকে আটকাবার কোন শক্তিও কারো নেই। মৌল ইসলাম এক গাদা সংস্কারের জঞ্জাল নয়, ইসলাম চির মুক্ত, চির নবীন, চির সুন্দর ও আধুনিক।

ইসলামে বিয়ে ও তালাক প্রসঙ্গে বিরুদ্ধবাদীরা মনে করে ইসলামী সমাজে পুরুষরা ইচছামত চারটি বিয়ে করতে পারে এবং যখন ইচছা স্ত্রীকে ত্যাগ করতে পারে। অথচ কুরআন মজিদে আল্লাহপাক বলেছেন, “তোমরা যতক্ষণ স্ত্রীদের মধ্যে সমতা ও ইনসাফ কায়েমের ব্যাপারে নিশ্চিত না হবে ততক্ষণ একের অধিক বিয়ে করবে না।” আয়াতের শেষাংশে বলেছেন যে, “আমি জানি, তোমরা স্ত্রীদের মধ্যে সুবিচার করতে পারবে না।”

অজ্ঞতার সুযোগে ইসলামকে নিয়ে অনেকেই ব্যবসা করেছে, যার যার মনগড়া তথ্য দিয়ে অনেকেই ইসলামকে কলুষিত করেছে। যুদ্ধবিগ্রহে লিপ্ত আরব পুরুষরা প্রায়ই ঐ সময় যুদ্ধে নিহত হয়, এতে লক্ষণীয় ঐ সময় পুরুষের স্বল্পতা প্রকট ছিল। ইসলাম সব সময়ই সমতা ও ইনসাফের ভিত্তিতে এক বিয়েরই পক্ষপাতি। আর অনেক পুরুষরা এ আয়াতের বিকৃত ব্যাখ্যা দিয়ে সমাজে অনাচারের মাত্রা বাড়িয়ে তুলেছেন সত্য, সে ত্রুটি সমাজেরই ত্রুটি, সমাজের মানুষের ত্রুটি, ইসলামের নয়।

আর তালাক এমন একটি বিধান যাকে অজ্ঞ লোকেরা নির্যাতনের হাতিয়ার বলে চালিয়ে সমাজের পরিবশেকে বিষিয়ে তুলেছে, বিজ্ঞানের অনেক আবিষ্কারে প্রয়োগের ক্ষেত্রে আশীর্বাদ অভিশাপ দুটোই যেমন কুড়ানো যায়। প্রয়োগকর্তা যদি নিজের খেয়াল খুশি মত এটা দিয়ে হিরোসিমা নাগাসাকিদের উপরে তান্ডব ক্রিয়া চালিয়ে যায় তবে এটি নিশ্চিত এর অপপ্রয়োগই এর হতাশার কারণ। আমার আগের আলোচিত মিসেস বিশ্বাসের সমাজ তাকে এরকম একটি বিধান উপহার দিতে পারে নাই বলে আজীবন আপন স্বামীর ঘরে অভিনয় করে তাকে মেকী লোকের স্ত্রী সেজে নাটকের যবনিকার জন্যে অপেক্ষা করে যেতে হয়। এ ছাড়া তার বাঁচার রাস্তা নেই। ইসলাম মুক্ত ও আধুনিক চিন্তার ধারক। এসব ব্যতিক্রমী দৈব দূর্ঘটনায় এটা প্রয়োগ করারই বিধান দেয়া হয়েছে।

তালাক সম্বন্ধে কু’রআনের সুরা বাক্বারাহ ২৩০, ২৩১, ২৩২, ২৩৪ ও ২৩৬ আয়াতের বিস্তারিত বর্ণনা আমি নিচে দেয়ার প্রয়োজন বোধ করছি।

“তারপর (উল্লেখিত প্রক্রিয়ায় দুইবার বৈবাহিক চুক্তি নিয়ে তালাক ও পূণর্মিলনের চেষ্টা চালানোর পরেও) যদি সে (তৃতীয়বার) তাকে তালাক দেয় তবে সন্দেহাতীতভবে এটা প্রমাণিত হয়ে যায় যে, এ বিবাহ চুক্তি টিকবে না, তাই) এরপর সে (নারী) তার জন্য বৈধ হবে না যে পর্যন্ত না সে অন্য স্বামীকে (ঠিকঠিক) বিবাহ করে। এখন যদি সেই স্বামীও (নতুন স্বামী বাধ্য হয়ে) তাকে তালাক দিয়ে দেয় (অবশ্য হীন ও ঘৃণ্য ‘হালালাহ’ করার জন্য নয়, যার দ্বারা আল্লাহর ধিক্কার পড়ে, যে তা করে ও যার জন্য তা করা হয় তাদের উভয়ের উপরে, তির (৯:২৫) তাহলে (দ্বিতীয় বিবাহ ভেঙ্গে যাওয়ায় প্রথম জোড়ার যদি জ্ঞানোদয় হয় ও নিজেদের দোষত্রুটি সংশোধন করে আবার জুড়ি বাধতে আগ্রহী হয়, তবে কদাচিৎ প্রয়োজন হওয়া এমন বিরল ক্ষেত্রে) তাদের উভয়ের অপরাধ হবে না যদি তারা পরষ্পরের কাছে (পুনরায় বৈবাহিক চুক্তিতে) ফিরে আসে, যদি তারা বিবেচনা করে যে তারা (এখন বনিবনাও করে) আল্লাহর গন্ডির মধ্যে (বৈবাহিক সম্পর্কে বহাল রেখে) থাকতে পারবে। আর এগুলো হচেছ আল্লাহর নির্দেশিত সীমা তিনি সুস্পষ্ট করে দেন সেই লোকদের জন্য যারা (বিধি নিষেধ সম্বন্ধে) জানে” (সুরা বাক্বারাহ ২৩০ আয়াত)।

“আর যখন (তোমাদের) স্ত্রীদের তালাক দাও, আর তারা তাদের ইদ্দত (বা অপেক্ষাকাল, ২:২২৮) পূর্ণ করে, তারপর হয় তাদের রাখবে সদয়ভাবে (পুনরায় বিয়ে করে), নয় তাদের (তোমাদের ঘরবাড়ী থেকে যাবার জন্য ৬৫:১,২) মুক্তি দেবে সদয়ভাবে, তাদের মহরানা ও দেনা পাওনা যথযথভাবে মিটিয়ে দিয়ে, ২:২২৯; ৬০:১০)। আর তাদের আটকে রেখো না (তোমাদের অধীনে ছলচাতুরি বা জবরদস্তি করে) ক্ষতি করার জন্য (তাদের উপর কোনো প্রকার আক্রোশ মেটাতে বা তোমাদের থেকে মুক্তি আদায়ের জন্য মহরানা পরিত্যাগে তাদের বাধ্য করতে। যার ফলে তোমরা (বিধি নিষেধের) সীমা লংঘন করবে; আর যে তাই করে সে নিশ্চয় তার নিজের প্রতি অন্যায় করে। আর (ঝুটমুট তালাক দেয়া, প্রতি তালাকে সালিশীর ব্যবস্থা না করা, বা “হালালাহ” র ন্যায় মেকী বিবাহ প্রচলনের দ্বারা) আল্লাহর প্রত্যাদেশকে তামাশার বস্তু করে নিও না; আর স্মরণ করো তোমাদের উপরে আল্লাহর নিয়ামত ও তোমাদের কাছে যা তিনি অবতরণ করেছেন কিতাব (যথা কুরআন) ও (তার মধ্যে থাকা) হিকমত (জ্ঞান বিজ্ঞান) সম্পর্কে, যার দ্বারা তিনি তোমাদের উপদেশ দিচেছন (যাতে তোমরা সব ব্যাপারে সঠিক পথ অবলম্বন করতে পার)। আর আল্লাহকে ভয়ভক্তি করবে, আর জেনে রেখো নিঃসন্দেহ আল্লাহ সবকিছু সম্পর্কে সর্বজ্ঞাতা” (সুরা বাক্বারাহ ২৩১ আয়াত)।

“আর যখন তোমরা স্ত্রীদের (প্রথম বা দ্বিতীয় দফায়, ২:২২৯) তালাক দাও, আর তারা তাদের ইদ্দত বা প্রতিক্ষাকাল ২:২২৮) পূর্ণ করে, তখন তাদের বাধা দিও না তাদের (আগেকার) স্বামীদের (সরাসরি) বিয়ে করতে (বা ফ্যাঁকড়া তুলো না তদের হীন ও ঘৃন্য ‘হালালাহ’র ন্যায় আগে অন্য পুরুষকে বিয়ে করতে), যদি তারা নিজেদের মধ্যে রাজী হয় সঙ্গতভাবে (পুনরায় সংসার করতে)। এইভাবে এর দ্বারা (অর্থাৎ কুরআনের চিরসুন্দর বানী দ্বারা) উপদেশ দেয়া হচ্ছে তাকে তোমাদের মধ্যে যে আল্লাহতে ও শেষ (বিচারের) দিনে ঈমান আনে। এইটি তোমাদের জন্য (অজ্ঞানতার দিনের হালালাহর চেয়ে) অধিকতর পরিচ্ছন্ন ও পবিত্রতর। আর আল্লাহ (ভালমন্দ সব) জানেন অথচ তোমরা জানো না” (সুরা বাক্বারাহ ২৩২ আয়াত)।

“আর তোমাদের মধ্যে যারা মারা যায় ও রেখে যায় স্ত্রীদের, তারা (স্ত্রীরা) নিজেদের অপেক্ষায় রাখবে চারমাস ও দশ (মৃত স্বামীর প্রতি শোক ও সম্মান দেখানোর জন্যে, আর ইতিমধ্যে গর্ভ হবার কোন লক্ষণ প্রকাশ পায় কিনা দেখতে, ২:১২৮; ৬৫:৪)। তারপর তারা যখন তাদের সময়ের মোড়ে পৌঁছে যায় তখন তোমাদের কোনো অপরাধ হবে না যা (বৈবাহিক আলাপ আলোচনা ও সম্বন্ধ) তারা নিজেদের জন্য করে ন্যায়সঙ্গতভাবে। আর তোমরা যা কর সে সম্বন্ধে আল্লাহ ওয়াকিফহাল” (সুরা বাক্বারাহ ২৩৪ আয়াত)।

“তোমাদের অপরাধ হবে না যদি তোমরা তালাক দাও স্ত্রীদের যাদের এখনও তোমরা (সহবাসের জন্য) স্পর্শ করো নি বা দেয় (মহরানা) যাদের জন্য ধার্য করো নি। আর (এহেন অবস্থাতেও) তাদের জন্য (ভরণ পোষণের) ব্যবস্থা করো ধনবানের ক্ষেত্রে তার সামর্থ্য অনুসারে ও অভাবীর ক্ষেত্রে তার সামর্থ অনুসারে (ভরণ পোষণের) ব্যবস্থা হবে পুরোদস্তুরভাবে। সৎকর্মীদের জন্য (এটি) একটি কর্তব্য” (সুরা বাক্বারাহ ২৩৬ আয়াত)।

“কিন্তু যদি তোমরা তাদের তালাক দাও তাদের স্পর্শ করার আগে এবং ইতিমধ্যে দেয় (মোহরানা) তাদের জন্য ধার্য করে ফেলেছ, (তাদের প্রাপ্য হচ্ছে) যা ধার্য করেছ তার অর্ধেক, যদি না তারা মাফ করে দেয় (তাদের প্রাপ্য অর্ধেকের কোন অংশ) অথবা তারা (স্বামীরা) দাবী মাফ করে দেয় যাদের হাতে রয়েছে বিবাহ গ্রন্থি (আর তাই স¤পূর্ণ মোহরানাই যদি স্ত্রীদের দিয়ে দেয়) আর যদি (স্বামীরা) দাবী ছেড়ে দেয় তবে তা ধর্মপরায়নতার অধিকতর নিকটবর্তী, আর তোমাদের পর®পরের মধ্যে (দান উপহারের মাধ্যমে) সদয়তা ভুলে যেয়ো না। নিঃসন্দেহ তোমরা যা করো আল্লাহ তার দর্শক” (সুরা বাক্বারাহ ২৩৮ আয়াত)।

“আমাদের দেশে নামাজ রোজা ধর্মোৎসব ইত্যাদি বেশ ঘটা করে পালন করা হয় কিন্তু ধর্মগ্রন্থ এবং নানা ধর্মীয় পুস্তক সম্পর্কে বিশদ কোনো আলোচনা হয় না, যা হওয়া উচিত। ধর্মচর্চা সঠিকভাবে হলেই দেশশুদ্ধ ধর্মব্যবসার পসার যেমন কমবে, তেমনী ধর্মীয় কুসংস্কারাচছন্ন মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে হ্রাস পাবে”। নির্বাচিত কলামের ১৬৯ পৃষ্ঠার উক্ত বক্তব্যটির “ধর্মগ্রন্থ সম্বন্ধে আলোচনা হয় না” কথাটি সঠিক নয়। নাসরিনের সাথে আমার আপত্তি আমার ধর্মগ্রন্থ নিয়েই, যা কোন মানুষ লেখেনি, যে গ্রন্থে কোন লেখকের নাম নেই। যে গ্রন্থ দাবী করা হয় ঐশীগ্রন্থ যা স্রষ্টার বা আল্লাহর প্রেরিত। আর অবশ্যই এর চর্চা আরো বেশী বাড়লে সমস্ত মেকি সভ্যতা, কুসংস্কারকে এ পৃথিবী ছেড়ে মঙ্গলগ্রহে বা অন্য কোথাও আশ্রয় নিতে হবে। এ গ্রন্থের চর্চা বৃদ্ধি হলে আমি নিজেও খুশী হতাম আর সুষ্ঠুভাবে চর্চা করলে ভারতের প্রখ্যাত ডক্টর শিবশক্তি সরুপজী মহারাজ ধর্মাচার্য্য আদ্যশক্তিপাঠ এর ন্যায় ইসলাম উদ্দিন (নও মুসলিম হিসাবে নতুন নামকরণ) নাম নিয়ে তার চিরাচরিত জঞ্জালের ভান্ডার ফেলে মুক্তির অন্বেষায় ছুটে আসতো জগতের সমস্ত সর্বহারার দল।

আমাদের রসুল মোহাম্মদ (সঃ) দৃশ্যতঃ কোন বিদ্যাপিঠে বিদ্যালাভ করেন নাই তবে মেধা ও মননে বিদ্যা ও বুদ্ধিতে জগতে শ্রেষ্ঠত্বের অবদান রেখেছিলেন। সবচেয়ে আশ্চর্য্যরে বিষয় কোন মানুষ তার শিক্ষক ছিল না। তিনি স্রষ্টা কর্তৃকই শিক্ষিত হয়েছিলেন, এই স্বশিক্ষিত মানুষটি দশ সহ¯্র সৈন্য নিয়ে মক্কা বিজয় করেছিলেন তলোয়ার দিয়ে নয়। এই অস্ত্রখানি দিয়ে যা আজকের আলোচ্য বিষয়, তা আল-কুরআন। নাসরিনের হৃদয় উৎসারিত নানান প্রতিবাদের তোপের মুখে আমিও কোন তলোয়ার নিয়ে আসি নি। আমার হাতেও সেই অস্ত্রখানি যা দিয়ে আমি আপনার শত বঞ্চনার জবাব দেবার আশা পোষণ করছি।

নির্বাচিত কলাম বইটির ১৬৮ পৃষ্ঠায় আপনি নাসরিন বলেছেন, “নারীকে সবচেয়ে বেশী অমার্যাদা করেছে ধর্ম এবং কোন ধর্মই নারীকে মানুষের সম্মান দেয় নি।”

তুলনামূলক ধর্মীয় চর্চা (ঈড়সৎধৎধঃরাব ংঃঁফু ড়ভ ৎবষরমরড়হ) যদি আপনি সঠিকভাবে করতেন তবে অবশ্য দিশা আপনার পাবার কথা ছিল। আপনার চর্চাতে গলদ আছে নির্ঘাৎ, নয়তো সত্য মিথ্যা আলো অন্ধকার আপনি বুঝতে পারেন না, নাকি বুঝেও না বুঝার ভান করে থাকেন। অনেক ধর্মেই নারীকে তুুচ্ছার্থে ব্যবহার করেছে ঠিকই কিন্তু ইসলামই নারীকে প্রকৃত মর্যাদা দিয়েছে।

শিশুকালে একটা গল্প শুনেছিলাম দুই পড়শিতে তাদের গরু নিয়ে ঝগড়া লেগেছে। উপায়ান্তর না দেখে দু’জনে ছুটলো এক অল্পশিক্ষিত হুজুরের কাছে। এই হুজুর নামধারী লোকটা ছিল একটা ফটকাবাজ লোক। লোকটা কুরআনের আয়াত দিয়ে বোকা পড়শিদের বুঝালো ‘কুরআনের ব্যাখ্যা দিয়ে যে আল্লাহতায়ালা স্বয়ং কুরআনেই বলেছেন, “হাজা বালাদাল আমিন।” অর্থাৎ এটা আমিন মৌলভীর বলদ। বস্তুতঃ ঐ ফটকাবাজ লোকটার নামও ছিল আমিন। বাস্ বলদটা আমিন মৌলভীর ভাগে পড়লো। আসলে এই আয়াতটা সুরা আত্তীনের তিন নাম্বার আয়াত, এখানে মক্কা নগরীকে নিরাপত্তার কেন্দ্র হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে। বালাদ অর্থ নগর কিন্তু এই ফটকাবাজ মৌলভী বালাদকে বলদ বলে চালিয়ে দিল। গল্পের দুই বোকা পড়শি ফিরে গেল। ওই হুজুর নির্ঘাৎ একটা জোচেচার ছিল এবং তার অন্তরে কোন খোদাভীতি মোটেও ছিল না। সে ছিল একজন ইসলামের, কুরআনের শত্রু।

আপনারা অনেকেই যা ধর্ম নয় তাই ধর্ম বলে চালিয়ে দিলেই তো আর সেটা ধর্মের অঙ্গ হবে না। কুরআনের ব্যাখ্যাকে সঠিকভাবে না নিয়ে নিজেদের মনগড়া তথ্য দিয়ে কুরআনকে গ্রহণ করলে কোনদিনই সত্যের নাগাল পাবেন না। আর কঠিন সত্যকে আহরণ করতে হলে সঠিকভাবে তার চর্চা করতে হবে। যারা কুরআনকে সত্যের কষ্টি পাথরে যাচাই করে সঠিকভাবে কুরআনকে ধারণ করতে পারে নি তাদের প্রতি ইঙ্গিত করে কবি নজরুল গেয়েছেন।

“হায় তোতাপাখি —-
ফল বহিয়াছ, পাও নিক রস, হায়রে ফলের ঝুড়ি
লক্ষ বছর ঝর্ণায় ডুবে রস পায় নাকো নুড়ি”।

সেই নজরুলেরই ভাষায় বলি,

“গাহি সাম্যের গান
বিশ্বে যা কিছু চির কল্যাণকর
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী
অর্ধেক তার নর”।

আল্লাহ বলেন—“ভ্রুন পুরুষ বা নারী যাই হোক একটিতে রূপ নেবার পর তাতে রূহ বা আত্মার সঞ্চার হয়”। আল্লাহতায়ালা বলেছেন, “অতপর তিনি তা থেকে সৃষ্টি করেন যুগল নর ও নারী।”

নারী মূল্যায়ন সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, “শপথ রাতের, যখন সে আচ্ছন্ন করে, শপথ দিবসের যখন তা আবির্ভূত হয় এবং শপথ তাঁর যিনি নর ও নারী সৃষ্টি করেছেন” (সুরা লায়ল ১-৩ আয়াত)।

নারী ও পুরুষ দুজনই মানুষ। সেই মানুষকে আল্লাহ বলেন, “শপথ মানুষের এবং তাঁর যিনি মানুষকে সুঠাম করেছেন, তারপর তাকে তার অসৎকর্ম ও সৎকর্মের জ্ঞান দান করেছেন” (সুরা শামস ৭-৮ আয়াত)।

চেষ্টা সাধনা, অধ্যয়ন গবেষণার মাধ্যমে মানুষকে ইহকাল ও পরকালীন মুক্তির উপায় আহরণের ইঙ্গিত দিয়েছেন আল্লাহ “প্রত্যেকেই ভেবে দেখুক আগামীকালের জন্য সে কি অগ্রিম পাঠিয়েছে” (সুরা হাশর ১৮ আয়াত)।

“নিশ্চয়ই আমি নষ্ট করে দিই না তোমাদের মধ্য থেকে কোন আমলকারীর আমলকে সে পুরুষ হোক অথবা নারী, তোমরা আসনে এক ও অভিন্ন” (সুরা আল-ইমরানের ১৯৫আয়াত)।

“যে ভালো কাজের সুপারিশ করবে সে তা হতে অংশ পাবে। আর যে খারাপ কাজের সুপারিশ করবে, সেও তা হতে অংশ পাবে” (সুরা নিসার ৮৫ আয়াত)।

উপরের পাঁচ ছয়টা কুরআনের উদ্ধৃতিতে ইসলামে নারীকে কিরুপ দৃষ্টিতে দেখা হয় তা নিশ্চয় পাঠকের বুঝতে অসুাবিধা হবার কথা নয়। নারী সম্পর্কে অনেকের ভুল ভ্রান্তির প্রতিবাদ স্বরুপ কুরআনের যে দৃপ্ত অঙ্গিকার তা উপরোক্ত এ সব কটি আয়াতে স্পষ্ট স্বাক্ষর রাখার যোগ্যতা রাখে।

কোথাও কি মনে হয় নাসরিন, যে স্রষ্টা নিজেও পুরুষ? আপনি আপনার বাবার কথামত আজীবন পড়লেন কিন্তু সত্য উদঘাটন করতে পারলেন না বলে বড়ই আফসোস হয়। তবে আমার বিশ্বাস সত্যিই যদি আপনি “ইকরা” কথাটির উপর গুরুত্ব দিয়ে থাকেন সত্যের নাগাল আপনি একদিন পেতেও পারেন কারণ আল্লাহর মূলমন্ত্র তো আপনার হাতে আছে, এ মন্ত্রের রহমতে হয়তো বা আপনার এ হতাশায় ভরা জীবন আশার আলো পেতেও পারে। আমরা ইসলামের নারীরা এমনিই মুক্ত। যতটুকু বন্দীত্ব তা আসল নয়, সব মেকী। ইসলামকে গ্রহণ করতে না পারার, না বুঝার গঞ্জনা মাত্র । তাই তো আমাদের মরে মুক্তি পাওয়ার কোন প্রয়োজনই নেই।

ইসলামে নারীর অবস্থান সম্পর্কে ঢাকাস্থ ইরানী রাষ্ট্রদূতের পত্নী মাসুমেহ বায়াত সম্প্রতি এক সেমিনারে বাংলাদেশের মজলুম নারীদের উপর এক বক্তব্য রাখেন যার সামান্য সংগ্রহ আমি উল্লেখ করছি। “মানুষের আসল পরিচয় ও ব্যক্তিত্ব তার আত্মার সাথে, নারী ও পুরুষ আত্মার দিক থেকে অভিন্ন। পার্থক্য শুধু বাহ্যিক গড়ন ও যোগ্যতা। ইসলামের দৃষ্টিতে নারী ও পুরুষের সম্পর্ক হৃদ্যতাপূর্ণ, অথচ পাশ্চাত্য নারী ও পুরুষকে পরষ্পরের বিরুদ্ধে সংঘাতে ঠেলে দিয়েছে।

তিনি বলেন, “পর্দা প্রগতির অন্তরায় নয়। তার অর্থ এও নয় যে, ইসলাম নারীকে ঘরের কোনায় আবদ্ধ রাখতে চায়। পর্দার অর্থ যদি নারীর ঘরের কোনে বসে থাকা হতো তাহলে পর্দার হুকুম ও আল্লাহ দিতেন না। কেন না নারীর ঘরে বসাই বিধান হলে পর্দার হুকুমের কোন প্রয়োজন ছিল না। তিনি বলেন, তিন বছরের অধিককাল বাংলাদেশে অবস্থান করে যে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছি তা হলো এখানকার মুসলিম মহিলারা সত্যিই মজলুম। মজলুম এই অর্থে যে, তাদের ইসলামের সঠিক জ্ঞান দেয়া হয় না যে জন্য তরুণ সমাজ ইসলাম থেকে দূরে সরে যাচেছ।

আল্লাহপাক আমাদের পুরুষদেরকে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের হুকুম দিয়েছেন। তারা তা না করে বিয়ের পিছনে পড়ে তার জন্য ইসলামের দোহাই পাড়ে।

সমাজে নারী ও পুরুষের অবস্থাকে আমরা মানবদেহে প্রাণ ও মস্তিষ্কের সঙ্গে তুলনা করতে পারি। উভয়ের সহযোগিতায় মানব জীবনের অস্তিত্ব সম্ভব। এর একটি অকেজো হলে অপরটিও অচল হতে বাধ্য। আবার প্রাণ ও মস্তিষ্কের মধ্যে একটিকে অপরটির উপর প্রাধাণ্য দিতে গেলে বিপত্তি ঘটবে। অনুরূপভাবে উভয়টি একই কাজ করতে গেলেও জীবন অচল হয়ে পড়বে। মানব সমাজে নারীকে মস্তিষ্কের সাথে তুলনা করলে পুরুষের অবস্থান প্রাণ ও আত্মার মত অথবা পুরুষ মস্তিষ্ক এবং নারী প্রাণ ও আত্মা। উভয়ের গুরুত্ব ও অধিকার সমান কিন্তু দায়িত্ব ও অবস্থান ভিন্ন। তিনি আরো বলেন, “ইসলামের সাথে মুসলিম মহিলার স¤পর্ক মাটির সাথে গাছের সম্পর্কের মত। গাছকে শিকড় উপড়িয়ে মাটি থেকে স্বাধীন ও মুক্ত করতে চাইলে তার অস্তিত্ব বিপন্ন হবেই। অনুরুপভাবে মুসলিম মহিলাকে ইসলামী আদর্শ থেকে বিচিছন্ন করার চেষ্টা করা হলে তার অস্তিত্বের দর্শনই বিপন্ন হয়ে পড়বে।”

আল-কুরআনে নারীদের সম্মানে ‘নিসা অর্থাৎ নারী’ বলে একটা সুরা নাজিল হয়েছে। উক্ত সুরাতে নারীদের ব্যাপারে খুব সুন্দরভাবে বিস্তৃত বর্ণনা এসেছে। জীবনের সকল সরল ও জটিল অধ্যায় যা সব নারীকেই বাস্তব জীবনে মোকাবেলা করতে হয়।

নিচে নারীর উপর কয়টি কুরআনের উদ্ধৃতি

“তারা স্ত্রীরা তোমাদের অঙ্গাবরণ এবং তোমরাও তাদের অঙ্গাবরণ, তাদের প্রতি তোমাদের যেমন অধিকার রয়েছে তোমাদের প্রতিও তাদের তেমনি অধিকার আছে” (সুরা নিসা)।

“আর যে কেউ ভালো ভালো কাজ করে, পুরুষ হোক বা নারী আর সে মুমিন হয়, (কারণ মুমিনরাই আল্লাহর আদেশ নির্দেশ উপদেশ সঠিকভাবে পালন করে থাকে), এরাই তবে বেহেশতে প্রবেশ করবে আর তাদের অন্যায় করা হবে না খেজুর বিচির খোসা পরিমানেও” (সুরা নিসার ১২৪ আয়াত)।

“নিশ্চয়ই (লেভ ১২:২-৫, ২য় ক্রনি ৮:১১, ১ম সামু১৮:২১, এক্লে ৭:২৬ এর বর্ণনানুযায়ী নারী পাপের প্রতীক না হয়ে বরং আল্লাহতে আত্মসমর্পণকারী) মুসলিম পুরুষ ও মুসলিম নারী (২:১১২) এবং মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী (২:১১২) এবং মুমিন পুরুষ ও অনুগত নারী, সত্যনিষ্ঠ পুরুষ ও মুমিন নারী এবং অনুগত পুরুষ ও সত্যনিষ্ঠ নারী আর অধ্যবসায়ী পুরুষ ও অধ্যবসায়ী নারী, আর বিনয়ী পুরুষ ও বিনয়ী নারী আর দানশীল পুরুষ ও দানশীল নারী, আর রোজাদার পুরুষ ও রোজাদার নারী, আর নিজেদের আব্রুরক্ষাকারী পুরুষ ও(আব্রু) রক্ষাকারী নারী আর আল্লাহকে বহুলভাবে স্মরণকারী পুরুষ ও (তেমন) স্মরণকারী নারী— আল্লাহ এদের সকলের জন্য ব্যবস্থা করেছেন (ভুলভ্রান্তি ও পদস্থলন থেকে) পরিত্রাণ ও এক বিরাট প্রতিদান” (সুরা আল-আহযাব: আয়াত ৩৫)।

“যে ব্যক্তি স্বীয় আত্মাকে কুপ্রবৃত্তি হতে বিরত রেখেছে নিশ্চয়ই বেহেশতই তাহার শান্তিনিকেতন” (সুরা নাজেয়াত ৪০-৪১ আয়াত)।

ইসলামের ইজ্জত ইরানের নারী

‘নারী’ নামক এই দুই অক্ষরের একটি বিদ্রোহী সত্তা সমস্ত বইটিতে আলোড়নের ঝড় তুলেছে। কিন্তু অনেক সময় নাসরিনের বইটিতে অনেক উল্টাসিধা বক্তব্যও আছে। তার ১০৭ ও ১১৯ পৃষ্ঠায় নির্বাচিত কলামে এক মুখে দুই কথার প্রকাশ ঘটে। কিছুদিন আগে আমাদের বাংলাদেশে মহা সারম্ভরে ‘মুনির’ নামের এক বিকৃত মানসিকতার পুরুষের ফাঁসিতে অপমৃত্যু ঘটে। উল্লেখ্য পরকিয়া প্রেমিক মুনির নিজ স্ত্রী শারমিন রীমাকে ভ্রমণরত অবস্থায় পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে। খুকু নামের একটা নষ্টা মেয়েও এ ঘটনার সাথে জড়িত ছিল। যাক্ খুকু যত নষ্টই হোক সে আদালতে রেহাই পায় কিন্তু নষ্ট মুনিরের সেদিন ফাঁসি হয়। সমস্ত জাতি এ ঘটনা প্রত্যক্ষ করে।

মেয়েদের অর্থ উপার্জনের মানে এই নয় যে, পরিবারের ভরন-পোষণের দায়িত্ব তাদের। মেয়েরা যে অর্থ উপার্জন করবে তা তাদের নিজস্ব। সেই অর্থ স্বাধীনভাবে খরচ করার অধিকার তার রয়েছে। এই অর্থ পরিবারের জন্য খরচ করতে সে বাধ্য নয়। মেয়েদের অর্থনৈতিক স্বাচছন্দ্য সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অগ্রগতি সাধনে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। ইসলামী সমাজের অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে নারী পুরুষের সহযোগিতা জাতীয় সুখ ও সমৃদ্ধিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ইরানের নেতা নি¤œলিখিত নীতিমালার ভিত্তিতে নারী স্ব^াধীনতার ব্যাখ্যা উপস্থাপনা করেছেন।
(১) ইসলাম ও নারী স্বাধীনতার সমন্বয়।
(২) নারী স্বাধীনতার মূল উৎস হলো ইসলাম। মানব ইতিহাসে নারী স্বাধীনতার প্রতি ইসলামের যে অবদান তার কোন তূলনা নেই। ইসলামে নারী জাতিকে দাসত্বের শৃংখল থেকে মুক্ত করে ব্যক্তিত্ব ও মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
(৩) মানব ইতিহাসে নারী মুক্তির একমাত্র সহায়ক মতাদর্শ হলো ইসলাম।
(৪) অভিভাবকত্বের দৃষ্টিকোণ থেকে পুরুষের চেয়ে নারীর মর্যাদা।
(৫) সমাজে শিক্ষিত নারীর অবস্থান।
(৬) ইসলাম পুরুষের চেয়ে নারীকে বেশী মর্যাদা দিয়েছে; তাদের অধিকার বেশী স্বীকার করেছে। নারীরও ভোটাধিকার রয়েছে। ব্যবসা বানিজ্যেও তারা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে। তারা যেমন নির্বাচন করতে পারে তেমনি নির্বাচিত হতে পারে। ইসলাম নারী পুরুষ উভয়কেই কর্তৃত্বের অধিকার দিয়েছে। নারী পুরুষের মধ্যে যদি কোন পার্থক্য থেকে থাকে তাহলে তা প্রাকৃতিক কারণে। ইসলাম নারীদের যেসব স্বাধীনতায় বাধা দেয় তার ফলে আসলে নারী অনৈতিকতা ও যৌন অপরাধ থেকে মুক্তি পায়। এভাবে ইসলাম নারী জাতিকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করে।

মেয়েদের অর্থ উপার্জনের মানে এই নয় যে, পরিবারের ভরন-পোষণের দায়িত্ব তাদের। মেয়েরা যে অর্থ উপার্জন করবে তা তাদের নিজস্ব। সেই অর্থ স্বাধীনভাবে খরচ করার অধিকার তার রয়েছে। এই অর্থ পরিবারের জন্য খরচ করতে সে বাধ্য নয়। মেয়েদের অর্থনৈতিক স্বাচছন্দ্য সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অগ্রগতি সাধনে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। ইসলামী সমাজের অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে নারী পুরুষের সহযোগিতা জাতীয় সুখ ও সমৃদ্ধিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ইরানের নেতা নি¤œলিখিত নীতিমালার ভিত্তিতে নারী স্ব^াধীনতার ব্যাখ্যা উপস্থাপনা করেছেন।
(১) ইসলাম ও নারী স্বাধীনতার সমন্বয়।
(২) নারী স্বাধীনতার মূল উৎস হলো ইসলাম। মানব ইতিহাসে নারী স্বাধীনতার প্রতি ইসলামের যে অবদান তার কোন তূলনা নেই। ইসলামে নারী জাতিকে দাসত্বের শৃংখল থেকে মুক্ত করে ব্যক্তিত্ব ও মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
(৩) মানব ইতিহাসে নারী মুক্তির একমাত্র সহায়ক মতাদর্শ হলো ইসলাম।
(৪) অভিভাবকত্বের দৃষ্টিকোণ থেকে পুরুষের চেয়ে নারীর মর্যাদা।
(৫) সমাজে শিক্ষিত নারীর অবস্থান।
(৬) ইসলাম পুরুষের চেয়ে নারীকে বেশী মর্যাদা দিয়েছে; তাদের অধিকার বেশী স্বীকার করেছে। নারীরও ভোটাধিকার রয়েছে। ব্যবসা বানিজ্যেও তারা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে। তারা যেমন নির্বাচন করতে পারে তেমনি নির্বাচিত হতে পারে। ইসলাম নারী পুরুষ উভয়কেই কর্তৃত্বের অধিকার দিয়েছে। নারী পুরুষের মধ্যে যদি কোন পার্থক্য থেকে থাকে তাহলে তা প্রাকৃতিক কারণে। ইসলাম নারীদের যেসব স্বাধীনতায় বাধা দেয় তার ফলে আসলে নারী অনৈতিকতা ও যৌন অপরাধ থেকে মুক্তি পায়। এভাবে ইসলাম নারী জাতিকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করে।

পাশ্চাত্যে নারী:

আবার নির্বাচিত কলামের ৯৯ পৃষ্ঠায় নাসরিন একটি সুন্দর গল্প ফাঁদেনÑ
“এদেশে চিকিৎসকরা সুযোগ পেলে ইরান চলে যান। আমার বেশ ক’জন চিকিৎসক বন্ধু ইরান থেকে ফিরে এসে ওখানকার গল্প বলেছেন। তারা যে কথাটি সবচেয়ে বেশী বলেন তা হলো ইরানী মেয়েরা পা থেকে মাথা অবধি ঢেকে রাখে বটে তবে চিকিৎসকের কাছে অসুখ দেখাতে এসে নিজে থেকেই পুরো কাপড় খুলে উলঙ্গ হয়ে শুয়ে পড়ে। চিকিৎসকরা পরীক্ষা করে ওদের শরীরে বিশেষ কোন অসুখ খুঁজে পান না। ওদের অসুখ আসলে মনে। চার দেয়ালে অবদ্ধ থাকা মেয়েগুলো আসলে বেরুতে চায়, তাই অসুস্থতার ছুতোয় ওরা বেরিয়ে পড়ে। মূলতঃ বের হওয়াই ওদের উদ্দেশ্য। এবং বিদেশী মানুষ পেলে ওরা দেশী নিয়ম ভেঙ্গে মনের অসুখ দূর করে।”

“আমার চিকিৎসক বন্ধুরা ইরানী মেয়েদের শরীরের বড় প্রশংসা করেন। কড়ে আঙ্গুলে ব্যথার কথা বলে পুরো উলঙ্গ হয়ে যাওয়া মেয়েদের গা টিপে টিপে দেখতে হয় আর কোথাও ব্যথা আছে কি না, না হলে ওরা বড় রাগ করে। পরাধীনতা মানুষকে অসুস্থ করে, বিকৃত করে, মন এবং শরীরকে পঙ্গু করে” (১০০ পৃষ্ঠা, নির্বাচিত কলাম)।

লেখিকার স্বপেশার বন্ধুরা বিদেশে ডাক্তারী করার নামে নারীদের নাড়ীটেপার যে গল্প শোনালেন তা অবশ্যই ভাববার বিষয়। বিশ্ব এখন আর বিশাল নয়। মায়ের কাছে মামার বাড়ীর গল্প লেখিকা ভালই আমাদের শোনালেন। তা আমি ভাবতে পারি না কোন সুস্থ চিকিৎসক কি কড়ে আঙ্গুলে ব্যথার নামে রোগীর কথাতে পুরো শরীর টিপে দিতে রাজি হবে? আর যদি কোন চিকিৎসক রাজি হয় তাকে কি সুস্থ বলা যাবে? আরেকখানি দুঃখ আমার প্রতিপক্ষ লেখিকা যেখানে খুকুর জন্য কুম্ভিরাশ্রু ফেলতে ফেলতে প্রাণান্তর সেখানে এরকম ঘটনায় এই ইরানী মেয়েটার জন্য একটু চোখের জলও ফেলতে পারলেন না? কেন? ওহ! সে পর্দার ভিতর ছিল বলে, নাকি তার ধারে কাছে ইসলামের গন্ধ ছিল বলে, হয়তো বা।

আমাদের দেশ মুসলিম প্রধান একটি দেশ। এ দেশে কত খুকু কত লিমার জন্ম হচ্ছে যারা জারজ সন্তান দিয়ে দেশটা ছেয়ে দিতে চায় সে রকম একখানা নষ্ট মেয়ে ইরান দেশে পাওয়া গেলে কি সমস্ত ইরান নষ্ট হয়ে যায়! আর আমার বিশ্বাস এ গল্পখানি বিকৃত ডাক্তারদের নিজেদের বিকৃতিরই বহিঃপ্রকাশ কারণ উনারা আবার ইরানী মেয়েদের শরীরের বড়ই প্রশংসা করেন। তাছাড়া ইরানী মেয়েরা বন্দী নয়। পর্দা পালন করে বলেই তারা সর্বক্ষেত্রে নিজেদের যোগ্যতা মতন কাজ করে যাচেছ।

“অসুস্থতুার ছুঁতোয় ওরা বেরিয়ে পড়ে।” ইরান সম্বন্ধে লেখিকার ধ্যান ধারণা নেই বলেই এমন সত্যের অপলাপ মিশ্রিত কথা তিনি বলতে পেরেছেন। নাসরিন, আপনার দৃষ্টিতে নষ্ট ইরান আসলেই কি নষ্ট? ইরানের কিছু তথ্য নিচে দিলাম, পাঠক আপনারাই বিচার করবেন-

ইসলামী সংস্কৃতি ও নারীর সামাজিক মর্যাদার উপর ইমাম এর নেতৃত্বের প্রভাব ছিল অসাধারণ। ইরানে মহিলাদের মর্যাদা সংরক্ষিত হবার পর মহিলারা সর্বোচচ সাফল্য অর্জনের লক্ষ্যে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচেছ। ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সংবিধানের ৩, ২১, ২৮, ৪৩ ধারায় নারীর সম্মান ও মর্যাদার কথা লিপিবদ্ধ আছে। এই সংবিধান বলে ইরানের পুরুষের মত নারীরাও সমান অধিকার ভোগ করে থাকে। স¤পূর্ণ ইসলামী নীতিমালার ভিত্তিতে ইরানে মহিলাদের সার্বিক কর্মকান্ড পরিচালিত হচ্ছে। সমসাময়িক কালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম খোমেনী এর বলিষ্ঠ নেতৃত্বের ছোঁয়ায় ইরানের নারী সমাজ বিশ্বের মুসলিম নারী সমাজের আদর্শ হিসাবে নিজেদের অবস্থানকে সৃদৃঢ় করতে সক্ষম হয়েছে।

হযরত ফাতেমা জোহরা এর আদর্শ ও অনুপ্রেরণা ইসলামী বিপ্লব বিজয়ে ইরানী নারীদের অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে। শুধু ইরানে নয়, সারা বিশ্বের নারী সমাজের আদর্শ হিসাবে হযরত ফাতেমা জোহরা এর আদর্শ অনুপম। একজন নারী হিসাবে এবং সর্বগুণে গুণান্বিতা একজন মানুষ হিসাবে হযরত ফাতেমা জোহরা ছিলেন অতুুলনীয়া। খোদার বিশেষ অনুগ্রহ লাভে তিনি ধন্য ছিলেন। তিনি স্বয়ং মহানবী (সঃ) কর্তৃক প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত হন।

ইমাম খোমেনী (রাঃ) বিভিন্ন ক্ষেত্রে শিক্ষা গ্রহন যেমন—পরীক্ষামূলক বিজ্ঞান, শিল্প-সংস্কৃতি, সাহিত্য, দর্শন, ধর্মতত্ত্ব, মরমীবাদ ও তাফসীর এসব বিষয়ের শিক্ষা লাভের উপরই মুসলিম নারীর নৈতিক ও আধ্যাত্মিক ভূমিকায় জোর দেওয়া হয়। পরিবারে নারীর আদর্শ মা ও স্ত্রীর ভূমিকা সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ভূমিকার বিরোধী নয়, বরং সহায়ক। পরিবারের আদর্শ মা, স্ত্রীই পারে সমাজে আদর্শ নারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে। তাই ইরানী পরিবারে নারীদের সাংস্কৃতিক শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ইসলামী বিপ্লবে নারীদের সাহস, আত্মত্যাগ, ধার্মিকতা, দৃঢ় প্রত্যয় ছিল অসাধারণ। পুরুষের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ইরানের নারীরা ইসলামী বিপ্লবের গতিকে ত্বরান্বিত করতে কার্যকরী ভূমিকা পালন করেছেন। ইরানে উৎপাদন, বন্টন, ব্যবহার ও ব্যবসায়ে মুসলিম নারীর অধিকার রয়েছে। তারা ইচছা করলে পুরুষদের মত ব্যবসা বানিজ্যও করতে পারে। বিভিন্ন শিল্প, কৃষি, প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনায় নারীদের মালিক হবার অধিকার রয়েছে। মোট কথা, মুসলিম সমাজে নারীদের পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক স্বাধীনতা রয়েছে।


পাশ্চাত্যে নারীদেরকে পুরুষের মত সমান অধিকার দিতে গিয়ে আসলে নারীকে মর্যাদাহীন করে তাকে নিছক প্রদর্শনী ও ভোগ্যপন্যে পরিণত করা হয়েছে। অথচ নারীও সম্মানিত মানুষ। তাদেরও মর্যাদা লাভের অধিকার রয়েছে। পাশ্চাত্যের এই বর্ধিত বস্তুবাদিতা এবং জোরালো আত্মকেন্দ্রিক অহংবোধের ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে মহিলাদের কাছে স্বামী ও সন্তানদের স্থান হচ্ছে খুব কম এবং কখনো একেবারেই হচ্ছে না। শিশুদের লালন পালনে অত্যন্ত নিষ্ঠা ও সময় দরকার এবং এব্যাপারে সুফল ও সাফল্য পাওয়া যায় দীর্ঘকাল পরে। এর অর্থ সন্তান লালন পালনের ধৈর্য ও সহনশীলতা আবশ্যক। পশ্চিমা সমাজে এই ধৈর্য কোন জোরালো উপাদান নয়, সেখানে যা জোরালো তা হলো মহিলাদের ব্যক্তিত্ব এবং রুঢ় অর্থে অহংবোধ। এর ফলে পারিবারিক কাঠামো ভেঙ্গে গেছে এবং পরিবারে পুরুষের ভূমিকায় ধস নেমেছে।

ইউরোপীয় মহিলাদের মধ্যে এখন খুব হালকা মানসিকতার বিস্তার ঘটছে। কেন না, পশ্চিমা সমাজে বহু রকমের হালকা ও অর্থহীন ব্যাপারে মহিলাদের ব্যস্ততা ও অনুশীলনের দরুণ তাদের মধ্যে কোন স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গি ও সংকট সমাধানোপযোগী মানসিকতা গড়ে উঠছে না। যা কিছু তাদের কাছে আধুনিক ও নতুন মনে হয়, সেটিই তাদের কাছে চমৎকার মনে হয়। এমন কি তা কোন যৌক্তিক বা বুদ্ধিবৃত্তিক বিষয় না হলেও। যেমন: কুকুর, গাড়ী, ও চিত্রতারকাদের প্রতি আকর্ষণ। একদল স্বার্থপর পশ্চিমা মহিলা সন্তান লাভের উদ্দেশ্যে পুরুষের সাথে স¤পর্ক কামনা করলেও স্বামী গ্রহণের ধারনা নাকচ করে দিয়েছে। কেন না তারা মনে করে সন্তান হলো পুতুলের মত এবং তার মালিক কেবল তারাই। এখানে স্বামী বা সন্তানের পিতা হিসাবে কারো উপস্থিতি থাকলে সে সন্তানের অংশীদারিত্ব দাবী করবে আবশ্যিকভাবে। এই নীতি অনুশীলনের মাধ্যমে তারা পিতাদের সন্তানের অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে এবং সন্তানকে বঞ্চিত করছে পিতৃ¯েœহ ও অধিকার থেকে। উভয়ের প্রতিই এ এক বিরাট বে-ইনসাফী।

৮৫শতাংশ আমেরিকান মনে করে তারা খৃষ্টান। বাস্তবে কিন্তু খুব কমই ধর্মানুসারী পাওয়া যাবে। কিছু খৃষ্টান দাবী করে যে খৃষ্টধর্মের শিক্ষা অনুসারে সকল মানুষের জীবন পবিত্র এবং গর্ভপাত হত্যাকান্ডের শামিল। অন্যরা মনে করে খৃষ্টধর্মে নারীর অধিকারের সম্মান জানানো হয়েছে। নারী তার নিজ শরীরকে যা ইচ্ছা তাই করতে পারে। কিছু লোক মনে করে খৃষ্টধর্ম সমকামিতার বিরোধী, আর কিছু লোক মনে করে সমকামিতায় কোন দোষ নেই। এরা সমকামিদের বিবাহ উৎসব পালন করে থাকে। পাশ্চাত্যে ইহুদী ধর্মের অবস্থা তদ্রƒপ। এদের কেউ কেউ চরম উদার নীতিবাদে বিশ্বাসী। আবার কেউ কেউ নানা রকম আচার অনুষ্ঠান নিয়ে ব্যস্ত।

যুক্তরাষ্ট্রের শহরগুলোতে দুর্নীতি সন্ত্রাস ক্রমেই বৃদ্ধি পাচেছ। সরকারী নীতি বলছে যে, এসব নিয়ন্ত্রণের জন্য পর্যাপ্ত কর্মী বাহিনীর অভাব। কিন্তু নৈতিক বিপর্যয় যে মারাত্মক আকার ধারন করেছে তা সকলেই স্বীকার করছে। কিছু কিছু বুদ্ধিজীবি মত প্রকাশ করছেন যে, এই নৈতিক অবক্ষয়ের কারণ হলো উদার নৈতিক মতাদর্শ। কিছু সংখ্যক রাজনৈতিক, দার্শনিক, উদারনৈতিক দর্শনের বিরুদ্ধে বই পুস্তকও রচনা করেছেন। ম্যাকিনটায়ার তার গ্রন্থে ধর্মের প্রতি প্রত্যাবর্তনের আহবান জানিয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্র তার নাগরিকদের নৈতিক মূল্যবোধ উপস্থাপনে অক্ষম হয়ে পড়েছে। এই সমাজ নিদারুণভাবে হতাশাগ্রস্থ। দেশের উদারনৈতিক ভিত্তি সমাজের এই ভঙ্গুর পরিস্থিতিতে প্রয়োজনীয় নৈতিক নেতৃত্ব দিতে অক্ষম। তারপরও আশা করার কারণ রয়েছে। অপরাধ ও অনৈতিকতার সমস্যা যতই প্রকট হয়ে উঠছে ততই জনগন উদারনীতিবাদের অসারতা বুঝতে পারছে। জনগন এখন নতুন মূল্যবোধের সন্ধান করছে। মানুষ ধর্মের প্রতি আবারো মুখ ফেরাচেছ, বিভিন্ন ধর্মীয় বই পুস্তক ও পত্র পত্রিকা প্রকাশ পাচ্ছে। প্রাচ্যদেশীয় ধর্মীয় চিন্তাধারার প্রতিও মানুষের আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। অনেক আমেরিকানের মন এখন আধ্যাত্মিক প্রশান্তির জন্য আকুলি বিকুলি করছে। ইসলাম ধর্মের প্রতিও মানুষের দৃষ্টি আকৃষ্ট হচ্ছে। এখন আমেরিকানদের জন্য সময় এসেছে ইসলামের কৃতিত্ব সমূহের প্রতি নজর দেওয়া, ইসলামকে ভালোভাবে অধ্যয়ন করা।

শেখ হাসিনার রাজনীতির পোস্ট মর্টেম

নাজমা মোস্তফা

যে ধারা চালু করেছিলেন শেখ মুজিব নিজে, সেটি ধরে রেখেছেন তার কন্যা আজ অবধি। ১২ নভেম্বর বৃহস্পতিবারে সিটি নির্বাচনের দিন হঠাৎ ৭/৮/৯ (?) বাসে আগুন দেয় কে বা কারা। কয়েকটা রং এর বাস পুড়তে দেখলাম। এর মাঝে জনতার কেউ একজন বেশ চড়া গলাতে বলতে শুনলাম এক বাসের সাথে অন্য বাসের ধাক্কা লেগে আগুন ধরেছে। মূল সত্যকে এড়াতে এরা সরকারের পোষা দালাল, ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে নিয়োগপ্রাপ্ত। এ ঘটনায় শাহবাগ, পল্টন, মতিঝিল, বংশাল, কলাবাগান, কাঁটাবন, সূত্রাপুর, গুলিস্তানের গোলাপ শাহ মাজার ও প্রেস ক্লাব, খিলক্ষেত ও তুরাগ আক্রান্ত। বিভিন্ন থানায় ৯ মামলায় ২৮ জনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত। এভাবে গোটা ঢাকাতে স্থানে স্থানে বাসে আগুন দেয়া হয়, ৩২ জন ধড়পাকড় আসামী সেই শনিবারের বিকেল অবধি, এদের বিভিন্ন মেয়াদে রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়েছে। দুইশ জনকে আসামী টার্গেট করে এসব কাজ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সরকার। প্রায় সবাই বিরোধী দলের নেতাকর্মী। ১১টি মামলায় ৪৮ জন করে বিএনপির কর্মীরা কারাগারে রয়েছেন। ১০টি মামলার বাদী হচ্ছে পুলিশ ও একটি মামলা করেছেন এক পরিবহনের মালিক ব্যবসায়ী দুলাল মিয়া, তিনি যদিও বাদী কিন্তু ঐ মামলার কোন খবর জানেন না। দুলাল বলেন সব করেছে খিলক্ষেত থানার পুলিশ, সেখানে ১১৪ জনকে আসামী করা হয়েছে। সবই হাসিনার গোঁজামিল আর নাটুকেপনা (প্রথম আলো, ১৬ নভেম্বরে খবর প্রাপ্ত)। বাদী দুলাল মিয়া বলেন, তিনজন যুবক এসে পেট্রোল দিয়ে বাসটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়। মামলার বাদী বলেন, পুলিশ বলছে, শুধু একটি সই দেন আমরা গাড়ীর ব্যবস্থা করবো। তিনি শুনেছেন তার ড্রাইভারের কাছে তিনি এসব দেখেন নাই। সাদেক হোসেন খোকার ছেলে ইশরাকও আসামী তিনিও কভিডাক্রান্ত, ছাত্রনেতা জুয়েল কভিড আক্রান্ত, চেন্নাই হাসপাতালে আরেক ছাত্র নেতা, ভর্তিকৃত রোগী এরা সবাই মামলার আসামী। কোন সময় ক্ষ্যাপন না করেই আওয়ামী সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সচরাচরের মত বয়ানে বলেন ‘হঠাৎ নাশকতা প্রমাণ করে বিএনপি সন্ত্রাসী পন্থা পরিহার করে নাই। করোনার এই কঠিন সময়েও জনতাকে সাথে নিয়ে তার দাঁত ভাঙ্গা জবাব দিবে আওয়ামী লীগ।’ একের পর এক হত্যা গুম খুন ধর্ষণের রানী সেজে অবৈধ গদি দখলদার নির্লজ্জ হাসিনা যুগ পার করছেন। তারও আগেপিছে কখনোই তার অনাচার থেমে নেই, তবে কপট মিথ্যা শক্তির বলে কিছু দিন ধামাচাপা দিয়ে রাখতে পেরেছেন বলেই আজো কিছু বোকারা তার পিছে ঘটি ধরে আছে। মানুষ যদি সচেতন হতো তবে কোন সৎ মুসলিম অন্তত তাকে অনুসরণ করতে পারতো না, কারণ এসব আদর্শহীনতা ঈমান ও সততার সাথে যায় না। এর প্রধান কারণ এদের বাপ বেটি মুজিব ও হাসিনার মাঝে নেতৃত্বে সততার চরম অভাব। আওয়ামী লীগের কামরুল ইসলামের টিভি চ্যানেল সময় টিভিও সাথে সাথে এ খবর প্রচার করে, ‘আবারো বিএনপি ফিরেছে অগ্নিসংযোগের রাজনীতিতে।’ হাসিনার হুকুমে সব অপকর্ম হয়। তার নিজের নিরাপত্তাকর্মী মেজর সিনহাকে মেরে জনতার আন্দোলনকে সামলাতে আইএসপিআর নাকে খত দিয়ে বলেছিল আর কোন গুম খুন হবে না। এ কথাই প্রমাণ তাদের দীর্ঘদিনের অসংখ্য মনগড়া গুম খুনের নাটকীয়তা। এরপরও খুন ধর্ষণ কিন্তু চলছে, বন্ধ হয়নি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্বদ্যিালয়ের সেঞ্চুরি করা মানিক হাসিনারই আদর্শের ধ্বজাধারী সন্তান। 

বাস পোড়ার সাথে সাথে বিশেষজ্ঞরাসহ অনেকেই সরকারকে সন্দেহ করেছেন, এসব কাজ সরকার ছাড়া কেউ করবে না। অনেকেই কমেন্টে এর কারণ বিশ্লেষণ করছেন। নিজের নাক কেটে তিনি পরের যাত্রা ভঙ্গের দক্ষতায় একজন তুখোড় মহিলা। বাস পোড়ানোর সাথে সাথেই বিএনপির অফিস ঘেরাও করে রাখা, ধড়পাকড় করা পুলিশের উপর নির্দেশ থাকে আগে থেকেই। সবাই জানে এসব সরকারের পরিকল্পিত পাতা ফাঁদ। ধড়পাকড়ের এসব লিস্ট আগেই রেডি থাকে। কাকে কাকে খুন করবে কাকে কাকে আসামী বানাবে। তারা প্রচার করে গোয়েন্দা খবরে প্রাপ্ত হয়ে তারা এসব করছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে কখনোই হাসিনার গোয়েন্দারা সঠিক খবর পায় না। মনগড়া খবর ব্যতীত তারা বিডিআর জটিলতার খবরও পায় না। গতকাল যে ধরা পড়া মূল আসামীগংদের একজন মারুফ নামের ছেলেটি ধরা খেল ফেইসবুকে ইউটিউবে তার মুখ থেকে সব খবর দেশবাসী জানলো, এ সব দাগী আসামীদের খবর গোয়েন্দারা পায় না। প্রথমে সে বলতে চায় নাই, পরে জনতার তোপে পড়ে বলতে বাধ্য হয়। তারা ১৫/২০ জনের একটি দল সারা ঢাকা চষে বেড়ায় এবং আগুন দেয়, এ ধারার কিশোর ছেলেদের দিয়ে এসব গুণ্ডামি করানো হচ্ছে। সে অকপটে সব গড়গড় করে বলে দেয়, নিজের জান বাঁচাতে। ঘটনার একটু পরই ফেইসবুকের মাধ্যমে ভিডিওটি পাই। পরদিন দেখি ছাত্র পরিষদের মশিউরের মুখে পুরো ঘটনাটি ইউটিউবে। গোয়েন্দারা শুধু শেখ হাসিনা যা সাজিয়ে দেন, তাই প্রচার করতে পারে। অন্য প্রকৃত গোয়েন্দা খবর তাদের জন্য প্রকাশের অনুমতি নেই। মেজর দেলোয়ার হোসেন এটি স্পষ্ট করেন এদেশের প্রতিটি অপকর্ম সাজানো হয় ভারতের পরিকল্পনাতে আর ঘটানো হয় বাংলাদেশে। তা ছাড়া বাংলাদেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পায়তারা মানুষ বহুদিন থেকে লক্ষ্য করছে ও তার প্রমাণ পাচ্ছে। কারণ এতে ভারতের নির্বাচনও প্রভাবিত হবে। দেশ চরম ভঙ্গুর অবস্থানে সময় পার করছে। মিথ্যা প্রচারের জারিজুরির উপর দেশ চলছে। উন্নয়নের জোয়ারে দেশ ভাসছে, এটিও হাসিনার সম্পূর্ণ মিথ্যাচারী প্রচারণা। কংক্রিটের গাঁথুনি হচ্ছে রডের বদলে বাঁশের ফালি দিয়ে। রাস্তার পিচ উঠে যায় অতি অল্প সময়ে। ব্যাংক খালি করা, রিজার্ভ চুরি, শেয়ার ধ্বস, সবদিকে এ সরকার দেশটির মেরুদণ্ড একদম ভেঙ্গে ঝরঝরে করে দিয়েছে বলেই বিশেষজ্ঞদের ধারণা। কথা হচ্ছে এসব সম্পত্তি নষ্টের জঙ্গিপনার কোন দিনই বিচার হয়নি। বিগত শতকে এই আওয়ামীদের ষড়যন্ত্রী ইন্ধনে ১৭৩ দিন দেশে হরতাল হয়েছিল। এতে যে শত শত কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে, গাড়ী পোড়ানো হয়েছে, মানুষ হত্যা করে তারা লাশের রাজনীতি করেছে। এর কোন বিচারও হয়নি, তবে এদের বিচার জমা খাতায় থাকবে। আওয়ামী নাম নিয়ে যে বা যারা এসবে রসদ যুগিয়ে যাচ্ছেন এদেরকে ইহ ও পরকালেও এর খেসারত বহন করতে হবে। প্রতিটি অপকর্মের চুল পরিমাণ বিচার অপকর্মীকে বইতে হবেই, এর থেকে পালিয়ে যাবার কোন সুযোগ নেই। বিগত এক লেখাতে ‘অবৈধ সরকারের আয়নাবাজি’ নামে তাদের দাগাবাজির এক চিত্র তুলে ধরেছিলাম। আজো সেই সূত্রে পাওয়া আরো কিছু কথা না বলে পারছি না। এসব তাদের সাজানো সারিবাঁধা অনাচারের অল্প কিছু মাত্র। 

মুজিবের মেয়ে বাংলাদেশে যা করছেন তা অকস্মাৎ কোন ঘটনা নয়। তার বাবা শেখ মুজিবও মুক্তিযুদ্ধে যেমন ছিলেন না তেমনি রক্ষীবাহিনী নামের এক দানব বাহিনীর মাধ্যমে স্বাধীন একটি দেশের মানুষকে ভয়ংকর দুর্যোগের দুর্ভোগের দিকে ঠেলে দিয়েছিলেন। ঐ সময় ভারতীয় বাহিনী এ দেশ থেকে গেলেও মানুষ ঐ দানবদের সাথে দেশীয় দানবদের আক্রমণে বিধ্বস্ত হতে থাকে। এটি শুধু ভারতের মেজর জেনারেল উবানের নেতৃত্বেই গঠিত হয় নাই অনেক ভারতীয়রাও এখানে সরাসরি যুক্ত থেকে দেশ বিধ্বংসী কার্যক্রম চালু রাখেন বলে জানা যায়। মুজিবের কর্তৃত্বের সাথে ওটি খুব মিলে যায়, তাই জাতীয় রক্ষী বাহিনী এক্ট নামে ১৯৭২ সালে মুজিব এটি জারি করেন। যিনি চাইতেন না কোন বিরোধী দল থাকুক, সচেতনদের লেখনীতে উঠে এসেছে পাঁচটির বেশী বিরোধী আসন দিতে তিনি নারাজ ছিলেন। অপকর্মের অবাধ স্বাধীনতা নিয়ে রক্ষী বাহিনী গোটা জাতির উপর হামলে পড়ে। ঘটনার ধারাবাহিকতায় যদিও জিয়াউর রহমানের সুবাদে শেখ হাসিনা এদেশে এসে মুজিবের হাতে বিলুপ্ত মৃত আওয়ামী লীগকে কবর থেকে তুলে আবারো রাজনীতি শুরু করেন। বহুত্ববাদী গণতন্ত্রের সুযোগও করে দেন জিয়াউর রহমান। আকারে ইঙ্গিতে বেশ-ভূষায় তিনি কান্নাকাটি করে সরল মানুষদের দ্বিতীয়বারের মত প্রতারণায় নামেন। সহজ সরল মানুষরা তাকে গ্রহণ করেছিল কিন্তু তিনি তাদের সে সরলতার কোন মর্যাদা দেননি। “তোমরা আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকিও কৃতঘ্ন হইও না (আল কুরআন)।” আদেশকৃত এ কথা থেকে বুঝা যায় কৃতঘ্ন বা অকৃতজ্ঞ হওয়া একটি মানুষ ভয়ংকর অধঃপতিত নিকৃষ্ট জীব মাত্র। শেখ হাসিনা ভারত থেকে যার মদদে ফেরত আসেন, এসেই তার বিরুদ্ধে বিষোদগার শুরু করে তার মৃত্যু পরোয়ানা নিয়ে এ মাটিতে পদার্পণ করেন। তিনি প্রায়শ বলেন জিয়াউর রহমানই তার বাবাকে হত্যা করেছেন, এ কথাটি তার ঐসব বিধ্বংসী ষড়যন্ত্রের অংশ মাত্র। হাসিনা তার শাসনামলে যত মিথ্যাচার করেছেন, তার কোন ইয়ত্তা নেই। কোন কোন রসিক জন আবার মিথ্যাচার সিরিয়েলি লিপিবদ্ধ করেছেন। লিখিত আকারে তা চিহ্নিত ও বর্ণিত আছেই জনতার আদালতে। ভারতফেরত হাসিনার কয়টি বড় অপকর্ম আনছি একটি লিখিত দলিল থেকে। যা তার প্রাইভেট সেক্রেটারি মুক্তিযোদ্ধা মতিউর রহমান রেন্টু নিজের ফাঁসি চেয়ে জাতিকে সচেতন করে গেছেন যাতে এ জাতি বাঁচে। নীচে তার পৃষ্ঠাসহ ঘটনার সামান্য উল্লেখমাত্র। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে বইটি বাজেয়াপ্ত করে রেখেছে সরকার যার জন্য মানুষ বইটির ভিতরে ঢোকার সময় সুযোগ পেয়েছে কম। সরকারের বুকের পাটা নেই ঐসব প্রকাশিত খবরাদি মোকাবেলা করার, ঐ হাসিনা সরকারের আমলেই তিনি বইটি ছাপেন এ যুক্তিতে তার প্রতিটি কথাই তথ্য ও যুক্তি দিয়ে সত্যে মোড়া। আর প্রতিটি ব্যাখ্যাকৃত ঘটনাই প্রমাণ করে এর সত্যতা কত জীবন্ত ও স্পষ্ট, বাংলাদেশের রাজনীতি বুঝতে হলে এটি প্রতিটি বাংলাদেশীর পড়া উচিত। “আমার ফাঁসি চাই” গ্রন্থ থেকে সামান্য দাগ সমূহ।   

(১) ৮৩ এর মধ্য ফেব্রুয়ারির ছাত্র হত্যা ছিল টাকার বিনিময়ে করা হাসিনার অর্ডারি লাশ (৪৬ পৃষ্ঠা)। গুলিবিদ্ধ জয়নাল ও জাফরের লাশ মাটিতে লুটিয়ে পড়লে, এ লাশের কোন বিচার পায়নি ছাত্ররা। বরং উল্টো হাসিনা এরশাদের সাথে শর্তবদ্ধ সমঝোতা করে ছাত্রদের বিরুদ্ধে একশন নিতে উৎসাহ যোগান। জানা গেল অজ্ঞাত পরিচয়ের সাথে (?) তিনি কালো বোরকা পরে অজ্ঞাত স্থানে গিয়েছেন (৪৯ পৃষ্ঠা)। অতঃপর ৮৪ সালে ঐ একই কায়দায় রুদ্ধদ্বার কক্ষে ছাত্র আন্দোলনের নামে পৈশাচিকতার মহড়া মিটিং ডাকেন। এভাবে হাসিনার সহযোগিতায় চলমান থাকে এরশাদের প্রতাপী মসনদীয় স্বৈরশাসন। টাকার বিনিময়ে রায়ট পুলিশের গুলিতে ট্রাকের চাকায় পিষে হত্যা করা হয় সেলিম ও দেলোয়ারকে। এক দানবীর নির্দেশে তাদের মায়ের বুক খালি করে তারা রাস্তায় লুটিয়ে মরে। এমন খবরে পুলকিত নেত্রী আবারো ছুটেন লং ড্রাইভে (৫১ পৃষ্ঠা)।  

(২) পরপর ছাত্র হত্যায় বিক্ষুব্ধ ছাত্ররা আন্দোলনে যেতে চাইলে আশ্বস্ত করে হাসিনা বলেন, “আমাদের শত্রু ছিল জিয়া, এরশাদ নয়। আবারো আমাদের মূল শত্রু বিএনপি, জিয়া তো শেষ। এরশাদ মাত্র ক্ষমতা ধরে রেখেছে। আমরা এরশাদের বিরুদ্ধে সরাসরি যাব না। আমাদের এখন প্রধান কাজ বিএনপিকে চিরতরে শেষ করে দেয়া। এভাবে এ জাতির ঘাড়ে এরশাদ নামের একটি দুর্বৃত্ত স্বৈরশাসক দাঁড় করিয়ে দেন শেখ হাসিনা (৫০, ৫২ পৃষ্ঠা)। ৮৬ এর নির্বাচন প্রক্রিয়া, দেশ দুই দলে ভাগ হলো। হাসিনার দল তার নিজের দেয়া বেইমানের তকমা লাগিয়ে সমঝোতা করে এরশাদের সাথে নির্বাচন করে, আর খালেদার দল আপোষহীন আন্দোলনে অনড় থাকে। 

(৩) হাসিনার বলা ও খেলা ছিল আন্দোলন আন্দোলন খেলা। থাকেন খালেদার পিছন পিছন ভান করেন আন্দোলন করছেন, নাম লাগান মাত্র; ছাত্রদেরকেও সেই নির্দেশ দেন (৫৭ পৃষ্ঠা)। ছাত্রলীগদের এভাবে দানবরুপে প্রতারকরুপে গড়ে তোলেন হাসিনা। সেদিন নেতৃত্বে থাকেন খালেদা জিয়া আর জীবন দেয় বুকে “স্বৈরাচার নিপাত যাক” আর পিঠে “গণতন্ত্র মুক্তি পাক” খচিত নূর হোসেন (ঐ)।  

(৪) ১৯৯১ সালে অবাধ স্বচ্ছ একটি নির্বাচনের পর খালেদা জিয়া জিতলেন। খালেদার বিজয়ের পর হাসিনা বললেন তাকে তিনি একদণ্ড শান্তিতে থাকতে দিবেন না। যেমন বলা তেমন কাজ। প্রথমে অভিযোগ তুললেন সূক্ষ্ম কারচুপির, ১৭৩ দিনের হরতাল তার বাস্তবতা। এরপর হাসিনার পদত্যাগ নাটক ও তার মিথ্যাচারিতা সবই তার ধারাবাহিকতা চলছে আজ অবধি। এই হাসিনা নিজেও এক স্বৈরশাসকের কঙ্কাল হয়ে বেঁচে আছেন; কারো দৃষ্টিতে মাফিয়া রানী, লেডী হিটলার, মিথ্যা প্রচারের নায়ক গোয়েবলসএর অনুসারী আজ অবধি।

(৫) এরশাদ আর জিয়ার মাঝে কি তুলনা চলে? না চলে না। জিয়া ছিল এ জাতীর অস্তিত্ব, প্রাণ, জীবন দানের অসাধারণ এক অর্জন। হাসিনার সাহসে কুলায় নাই গদিতে যাবার, তাই ক্ষমতালোভী এরশাদকে এগিয়ে দেয়, স্বৈরশাসকের তকমা লাগিয়ে, যেন নব্য আইয়ুব খান। হাসিনা রইলেন পিছে এরশাদের বোন হয়ে, আইয়ুবের তৃতীয় প্রেতাত্মা হয়ে। 

(৬) কারো ভালো বা অর্জনকে তিনি সইতে পারেন না। তাই জাহানারা ইমামও তার চোখের শূল ছিলেন। তাদের বিরুদ্ধেও তিনি মিথ্যাচার প্রচারে অবদান রাখেন (৬৩ পৃষ্ঠা)।

 (৭) বাংলাদেশে হিন্দু মুসলিম সম্প্রীতির অনন্য উদাহরণ যুগ যুগ ব্যাপী বর্তমান। এর গোড়াতে বিষ ঢালেন শেখ হাসিনা। তিনি কৌশলে হিন্দু মুসলিম রায়ট লাগান যেখানে মুসলিমরা প্রহরা দিয়ে হিন্দুদের নিরাপত্তা দিয়েছে সেখানে তিনি নিজে টাকা খরচ করে হিন্দু মুসলিম রায়ট লাগান, এতে বিশ্ব জানলো বাংলাদেশের মুসলিমরা হিন্দু নির্যাতন করে। এর জন্য ঢাকা শহরের সব গুণ্ডা বদমাশদের হাতে নগদ ৫ লক্ষ টাকা তুলে দেয়া হয় (৯২ এর হিন্দু মুসলিম রায়ট ৬৩ পৃষ্ঠা)। বললেন, এখনই রায়ট লাগাতে পারলে সার্ক সম্মেলনও পণ্ড হয়ে যাবে। এসব ষড়যন্ত্রে বাড়তি সচেতনতা হিসাবে নিজের টেলিফোন ব্যবহার না করে পাশের চাচাতো চাচা শেখ হাফিজুর রহমানের বাসা থেকে কল করা হয় (৬৪ পৃষ্ঠা)। পাঁচ লক্ষ টাকা ছাড়াও নগদে কড়কড়ে কয়েকটি করে এক শত টাকার নোট দাঙ্গাবাজদের হাতে গুজে দেয়া হয়। হিন্দুরাও বাড়তি সুবিধা পেতে কিল খেয়ে কিল হজম করতো। যারা তাদের মারে, তারা উল্টো নির্দোষদের দিকে আঙ্গুল দেখাতো হাসিনাকে সুহৃদ ভেবে। এতে তারা কিলও খেতো আবার লাভের গুড়ও তারা জমাতো। বাকী কিলগুলো পড়তো নিরপরাধ মুসলিমদের উপর। ওরা নির্দোষ মুসলিমরা নানা ভৎর্সনা লাভ করতো আর একুল ওকুল হারিয়ে কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে থাকতো। শুরু হলো হৈ হৈ করে শিববাড়ী মন্দির, ঢাকেশ্বরী মন্দির, রামকৃষ্ণ মিশন, তাতি বাজার, শাঁখারি পট্টি, বাংলাবাজার, মালাকাটোলা, মিলব্যারেক, গুসাইবাড়ী, নারিন্দা, টিকাটুলি ও ইসলামপুরে চলে টাকার অঙ্কে খেল খতম কাজ। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরসীমা রাও এর ঢাকা আসা বন্ধ হয়। সার্ক সম্মেলন পণ্ড হয় (৬৫ পৃষ্ঠা)।

 (৮) কোকোর মৃত্যুর পর বিধ্বস্ত খালেদার উপর অভিযোগ তিনি কেন হাসিনার সাথে দৌড়ে বের হয়ে এলেন না। ধারণা সেদিন হাসিনা খুব উৎফুল্ল ছিলেন কারণ তিনি নিজ দলের ছাত্ররা মরলেও উৎফুল্ল থেকে মিষ্টি বিতরণে আগ্রহী হন। ওদিকে সেদিন অসুস্থ মুমূর্ষু মা খালেদা জিয়া পুত্রের মৃত্যু শোকে কাতর থেকে ডাক্তারের নির্দেশে বিশ্রামে ছিলেন। ঐ সময়ই কেন হাসিনাকে আসতে হলো! তার কি উচিত ছিল না সময় নির্ধারণ করে সঠিক সময়ে তাকে দেখতে আসা। টকশোতে সব সময় কিছু দালালকে সমস্ত দেশ লুটপাটের জবাবে এই কয়টি কথাকে ঢাল হিসাবে দাঁড় করাতে দেখি। কারণ হাসিনার অপকর্মের কোন জবাব তাদের জানা নেই, এই দু তিনটি সাজানো নাটক ছাড়া। একটি হলো খালেদা কেন দৌড়ে বের হলেন না। আর তারেক ও তার মা কিভাবে বোমা মেরে হাসিনাকে মারতে গেলেন? কেন সারা দেশে একযোগে বোমা ফুটলো? কেনো তাকে ১৯ বার মারার চেষ্টা হলো। এসব সত্য হলে মানুষ সবার আগে এরশাদকেও মারতে যেত। কিন্তু এরশাদকে তারা একবারও মারতে গেল না। কারণটি কি? এক কথায় সহজ উত্তর এসবই মিথ্যা বলাতে পারদর্শী হাসিনার নিজ হাতে সাজানো নাটক। যেন টকবাজরা বলতে চায় ঐ দিন খালেদা দৌড়ে বের হলে আর হাসিনাকে মারতে এই ২০০৪ এর বোমা নাটক না হলেই তারা নির্দোষ বলে গণ্য হতেন। সমস্ত জাতি জানে অসংখ্য প্রশ্নবিদ্ধ আচরণে শেখ হাসিনা এসব নাটকের অংশ সজীব রেখেছেন। তার শত শত অপকর্মকে ঢেকে রাখার জন্যই এসব মিথ্যা নাটকের অবতারণা। নিজ হাতে বোমা মারার সব সূতানাতা ঠিক করে বহু পরে তারেক জিয়ার নাম জড়িয়ে অভিযোগ তোলেন। আর মৃত ছেলের মাকে দেখতে কি সত্যিই হাসিনা উদগ্রীব ছিলেন, এটি কি তাই ছিল? কিন্তু ঘটনার ধারাবাহিতা বলে তার কারসাজিতে সত্যটা হচ্ছে তার দুই ছেলেকেই হাসিনা মারতে চেয়েছিলেন! অত্যাচারে নিগ্রহে এক ছেলে মরেছে আর অন্য ছেলে আজো ভিন দেশে লড়ে যাচ্ছে আর মায়ের মন ঐ দুর্বৃত্তকে দেখে খুশীতে নেচে উঠবে! কোকোর কথা থাক আমরা জানি খোদ হাসিনা তার স্বামীর সাথেও মানবিক আচরণ করেন নাই। এটি অনেকেই জানেন তাকে বহুদিন গৃহবন্দী করে রেখেছিলেন। মেয়ে পুতুলের বিয়ের দিনে ডঃ ওয়াজেদের অমতে বিয়ে হওয়াতে খালেদা জিয়ার সাথে মাত্র ৩/৪ মিনিটের জন্য দেখা হলেও হাসিনার সাথে তার কোন কুশলাদি হয়নি, তিনি খালেদা জিয়ার সাথেই বের হয়ে গেলেন (৭৫ পৃষ্ঠা)। তিনি যে কত ভদ্র ও সুশীল এ থেকেই প্রমাণ পাওয়া যায় কোকোর জন্য তিনি কতই না নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন, যেখানে স্বামীই মানুষের মর্যাদা পান নাই! ডঃ ওয়াজেদ এটি বুঝতে পেরেছিলেন হাসিনার হাত দিয়ে দেশ ভীষণ সংকটের মাঝে পড়েছে। এসব কথা তিনি বার কয়েক উচ্চারণও করেছেন। সাথে সাথে গৃহবন্দিত্বই তার ভাগে জমা হয়েছে, এসব অনেকেই জানেন, দৈবাৎ হয়েও মিডিয়াতে এসেছে।

 (৯) সেক্রেটারীয়েটের একজন কর্মচারীকে কিভাবে দিগম্বর করা হয়েছিল তাকি ভুলে গেছেন দেশবাসী? ওটিও ছিল হাসিনার নির্দেশে করা, একজন অসুস্থ মানুষ না হলে এসব কোন সুস্থ মানুষ করতে পারে না। তিনি অনেক টাকা খরচ করে ওটি করিয়েছিলেন (৮১ পৃষ্ঠা)। এটিও সত্য আদালত তাকে রং হেডেড তকমা দিয়েছিল। (খাতা কলম গোলাবারুদ ও দিগম্বর কাহিনী শিরোনামে ৮২ পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য), ১২ ডিসেম্বর ১৯৯৪ সাল। মঞ্চে উঠেছেন বিরোধী নেত্রী হাসিনা। মঞ্চে শুধু ছাত্রনেতারা ও হাসিনা নিজে, সেদিন কোন নেতা নেই, তারা নীচে বসা। ছাত্রদের হাতে নাটকীয় ভঙ্গিতে খাতা কলম তুলে দিয়ে এক অসাধারণ পরিবেশ তৈরি করা হলো। আর উদাও আহবান করা হলো পূর্ণ উদ্যমে পড়াশুনা করো। ফটো সাংবাদিকদের ক্লিক ক্লিক শব্দে চারদিক ঝলসে উঠলো। ঐদিনই বিকেল তিনটায় ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের লাইব্রেরী কক্ষে ছাত্রলীগ নেতা অজয় কর, পঙ্কজ, হিমাংশু দেবনাথ, জ্যোতির্ময় সাহা, ত্রিবেদী ভৌমিক, ও আলমসহ মোট ৯ জনকে ডেকে গোলাবারুদ ও অস্ত্রসহ কেনার জন্য ১ লক্ষ টাকা হাসিনা দেন। বলেন, আগামী ২৮ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদ থেকে পদত্যাগ করার পর তোমরা ঢাকা শহরসহ সারা দেশে নজিরবিহীন ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করবে। খালেদা জিয়ার পতন না হওয়া পর্যন্ত এসব চলবে। দৈনিক ৫/১০টা লাশ তোমাদের ফেলতেই হবে। নইলে জিয়ার পতন হবে না। গোলাবারুদ বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বরে বাইরে রাখবে, নয়তো পুলিশ পেয়ে যাবে। হরতালের দিনেও সচিবরা কার্যালয়ে হেটে যায় ঐ দিন তোমরা ওৎ পেতে থাকবে এবং তাদের কাপড় খুলে নিয়ে তাদের অপদস্থ করে দিগম্বর করে দিবে। ৯ জনকে দুদলে ভাগ করে দিয়ে একদলকে অস্ত্র ও গোলাবারুদের দায়িত্বে ও অন্য দলকে সচিবকান্ড ঘটাতে নির্দেশ দেন। পর পর অনেক হরতালেই তারা সফল হতে না পারলে তিনি বিরক্তি প্রকাশ করেন এবং শর্তের হুমকি দেন। শর্ত হচ্ছে এটি করতে না পারলে তাদের দেয়া এ বাবদ টাকা ফেরত দিতে হবে, মানে এটি করতেই হবে। অতঃপর আলম নামের মহা গুণধর (?) হাসিনার ছেলে সেটি করতে পারলে তিনি আনন্দে নেচে উঠে বলেন তাকে নিয়ে এসো, মিষ্টি খাবো তার সাথে। ততক্ষণে আলম শ্রী ঘরে (৮২/৮৩)। 

(১০) দিনাজপুরে ইয়াসমীন নাটককে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে ভয়ংকর রূপ দানেও হাসিনার হাত ছিল। সেখানেও তিনি অজস্র টাকা ঢেলে একে ফলপ্রসূ করেন। নগদে ২০ লাখ টাকা দেয়া হয় এবং প্রয়োজনে আরো পৌঁছে দেয়া হবে কাজ পুরোপুরি হলে। এসব কাজে সন্দেহ এড়াতে হাসিনা সব সময় ঐ চাচার ফোনই ব্যবহার করতেন। খালেদার সময়ে দিনাজপুরে এক ইয়াসমীনের বদলে পুলিশের গুলিতে নিহত ৭ লাশ জমা করে বিবেচক খালেদাকে তিনি বেকায়দায় ফেলেন। সাথে সাথে তিনি দিনাজপুরে ছুটে গিয়ে মানুষকে শান্ত থাকার নির্দেশ দিয়ে কিছু মায়াময় বুলি আওড়ে ঢাকাতে ফেরত এসে বললেন, যত গুড় (টাকা!) তত মিঠা হয়নি (৮১ পৃষ্ঠা)। 

(১১) তিনি এমন একজন নেত্রী যিনি তার কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিতেন এবার ‘পুলিশের লাশ চাই, মিলিটারির লাশ চাই’ (৮৩ পৃষ্ঠা)। বড় অংকের টাকা খরচ করেও সেটি ঘটানো হয়। এভাবে শত শত মানুষকে তিনি অর্ডার দিয়ে হত্যা করেন। এমনকি এসব বলে শেষ করার মতো নয়। তিনি বলেন জিয়া মুজিবকে মেরেছেন বস্তুত সত্য হচ্ছে তিনি জিয়ার মৃত্যুর পারোয়ানা নিয়ে ভারত থেকে আসেন। আর পরবর্তীতে তিনি খালেদাকে হত্যা করতেও আগাম টাকা বায়না করেন। জাতি ঘুমিয়ে আছে বলে সত্যটা জানে কম। 

(১২) এবার ঐ ভয়ংকর অসুস্থ মহিলাটির প্রকৃত স্বরূপ স্পষ্ট করতে হলে ঐ মুক্তিযোদ্ধা মতিউর রহমান রেন্টুর পুরো বইকে এনে হাজির করতে হবে। এবার শেষ একটি কথা তার দুর্বৃত্তায়নের কথা বলে আজকের ডজন নম্বর শেষ করবো। যখন তিনি এসব কাজ করে সারা দেশে বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে পারছিলেন আর গোটা দেশ এর জন্য বিরোধী খালেদাকে দোষ দিচ্ছিল। আজো অনেককে বলতে শুনি এ দুটি দলই সমান সমান, বস্তুত এরা আচরণে এতই পরস্পর বিরোধী যে এদেরকে এক পাল্লায় মাপা বেমানান। দুজন দু পাড়ের বাসিন্দা। তিনি নিজে অর্ডার দিয়ে লাশ ফেলতেন আবার পরোক্ষনেই রুমালে গ্লিসারিন মেখে দৌড়ে মেডিক্যালে ছুটে যেতেন আর চোখে রুমাল ধরে রাখতেন, ক্লিক ক্লিক শব্দে সাংবাদিকরা ছবি তুলতেন আর মুজিব কন্যা অপার আনন্দ বুকে নিয়ে লাশের বোঝা ঠেলে নিজের বিলাস ঘরে ফিরতেন। আনন্দের আতিশয্যে এতই উৎফুল্ল থেকেছেন যে কারো অপেক্ষা না করেই হাসিনা নিজেই স্কুটারে আগুন দেন। দেখুন ৮৫ পৃষ্ঠায় ইতিহাস কি ভাবে কথা বলতে জানে। এ মহিলা নিজেই গাড়ীতে আগুন ধরানোর মত মেধার অধিকারী তিনি। এ জন্যই সব সম্মানিত জনদের বিরুদ্ধে গাড়ীতে আগুন দেয়ার মামলা, পেট্রোল বোমার মামলা দিতে তিনি পিছপা হন না। সব কর্মেই তার হাত লম্বা। তাহাজ্জুদের নামাজ ও মদীনার সনদে দেশ চালাবার প্রতিশ্রুতি দেন, প্রায়শই নামাজের বাহাদুরী, হজের পাগড়ি পরে নিজেকে ধার্মিক প্রচার চালান। সারাক্ষণ কথায় কথায় জায়নামাজ খোঁজা তার স্বভাবের অংশ, এসব জাতিকে শোনান। সহজ সরল দেশবাসীকে প্রতারণা করাই যাদের একমাত্র ধ্যান ধারণা কৌশল। এরাই ধার্মিক না হয়েও প্রকৃতপক্ষে ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করে আর সারাক্ষণ বাকী ধার্মিকদেরকে টিটকারি করে কপট মন্তব্য করে। 

১৫ নভেম্বর ২০২০

বিশেষ দ্রষ্টব্য: লেখাটি আমার দেশ অনলাইনে আজ ১৯ নভেম্বর ছেপেছে।

জয় শ্রীরাম ও কার্টুন মারণাস্ত্র

নাজমা মোস্তফা

খবরের শিরোনামে কিছু ম্যাসেজ এসেছে। মুসলিমরা সব পারে কোন মানুষকে প্রভুভক্তি দিতে পারে না। তাদের মর্মবাণী খুব অল্পকথা কিন্তু খুব উচ্চকন্ঠ। “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই, কোন আইকন নেই যাকে ওরকম ভক্তি করার মত। নবী মোহাম্মদ (সঃ) তাদের প্রাণের জন একজন মানুষ, যার হাত দিয়ে তারা এ পরম সত্য লাভ করেছে, বিশে^র অসাধারণ নির্দেশনামা ঐশীগ্রন্থ কুরআন তাদের হস্তগত হয়েছে। আজ চৌদ্দশত বছর থেকে যা অপরিবর্তনীয় হয়ে মানুষকে পথ নির্দেশ করছে। মুসলিমরা কখনোই তাদের নবীর পূজা করে না, তবে তাকে প্রাণদিয়ে ভালবাসে। 

ধর্মনিরপেক্ষ হিন্দু ভারত চায় মুসলিমরা তাদের ধর্মের আল্লাহর নির্দেশিত খাদ্য গরু খেতে পারবে না। করো জোড়ে গরুকে মা বলে ডাকতে হবে নইলে মরার বিপদ, এবং একজন মানুষ বন্দনার নামে ‘জয় শ্রী রাম’ বন্দনা গাইতেই হবে। গরুকে বাকীদের কেন মা মানতে হবে? ভারতে জয় শ্রীরাম এখন মুসলিম নিধনের বড় হাতিয়ার। যদিও তথ্য বলে ভারত উচ্চ মাত্রায়  গরুর মাংস  রপ্তানীকারক দেশ। আবার ঘুষের বিনিময়ে গরু পাচারে বিএসএফ জড়িত সিবিআইএর প্রতিবেদনে সে সত্যও উঠে এসেছে (অর্থ সূচক, কেএসআর, সূত্র আনন্দবাজার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০)। বাংলাদেশে গরু আদান প্রদানে জীবন দেয় বাংলাদেশীরা একতরফাভাবে কিন্তু বিএসএফ ও ভারতের অসাধু কর্মকর্তারা কাস্টমসসহ ভারতের সরকারী কর্মকর্তারাও জড়িত থেকে কোটি কোটি টাকা কামায়। বড় গরুকে বাছুর বানিয়ে নিলাম করে গরু প্রতি বিএসএফ পেতো ২,০০০ আর কাস্টমস ৫০০ টাকা। পকেট গরম করা ব্যবসা আর পিটুনী মার বাংলাদেশীদের, বর্ডারে লাগাতার মৃত লাশ তাদের ভাগের জমা। ভারতের গোরক্ষকদের আঘাত করে অতীতে বিবেকানন্দ বলেছিলেন,  তোমরা যে উপযুক্ত গরুর সন্তান, তোমাদের আচরণে তা স্পষ্ট। প্রচারে বন্ধুত্বের এসব গুলি বড় নির্মম! ১০ জুলাই ২০১৯ তাবরেজ আনসারী “জয় শ্রীরাম” না বলায় তাকে মারধর করা হয়। তারপর পুলিশ হেফাজতে চারদিন পর তার মৃত্যু হয়। তাকে তার পরিবারের কারো সাথে দেখাও করতে দেয়া হয়নি। জুন মাসেও এরকম অত্যাচারে অনেকেই বিধ্বস্ত হন। প্রাণ বাঁচাতে তিনি জয় শ্রীরাম বলেছেন, তারপরও তার রক্ষা হয়নি। ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের অধর্মাচারের নমুনা, পশুরও একটি নীতি থাকে, কিন্তু এদের নীতি থাকতে নেই। জয়শ্রীরাম, বন্দেমাতারাম, শ্লোগানগুলি যথাক্রমে ভারত মাতা কি জয়, পাকিস্তান মুর্দাবাদ উল্লেখযোগ্য। পাকিস্তান তাদের চিরশত্রু কারণ এরা মুসলিম। কাশ্মীর, বাংলাদেশ বা অন্য যে কোন মুসলিম দেশ বাকী থাকবে কেন, প্রতিটি আদর্শে অটল থাকা মুসলিম দেশ ভারতের শত্রু। যেখানে তারা তাদের নিজ নিচুবর্ণের নাগরিককে শত্রু জ্ঞান করে, সেখানে বাকীদের অবস্থা সহজেই অনুমেয়। আসামের বড়পেটা জেলাতে একদল মুসলিমের উপর হিন্দু টেররিস্টরা হামলে পড়ে। মোম্বাইতে ২৫ বছরের এক টেক্সিচালককে তার বিকল হওয়া টেক্সি ঠিক করার সময় তার উপর একযোগে হামলে পড়ে। একইভাবে কলকাতায় ১জন মাদ্রাসা শিক্ষক ট্রেনে ভ্রমণকালে নাজেহাল হন। তার ড্রেস ও দাঁড়ি নিয়ে টিটকারী চলে। তাকে একইভাবে শ্লোগান দিতে বললে তিনি অস্বীকৃতি জানান তখন তাকে তারা চলন্ত ট্রেন থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলে তিনি মারা না গেলেও আহত হন (আনন্দবাজার পত্রিকা সূত্র) ।এসব শুধু রাস্তাঘাটে নয়, পার্লামেন্টেও চলছে এসব স্টানবাজি খেলা । 

গোরক্ষার নামে তারা বাড়তি লাই পেয়ে এসব করছে। হাট থেকে দুটো দুধেল গাই ৭৫,০০০ টাকায় কিনে ফিরছিলেন পেহলু খান। জয়পুর থেকে ওলওয়ার ফিরছেন তারা ছয়জন। বৈধ কাগজপত্র থাকার পরও তারা হামলার শিকার কারণ তারা মুসলিম। চালক হিন্দু থাকাতে তার রক্ষে হয়। তাকে পালানোর নির্দেশ দেয়া হয়। বাকী পাঁচজন বেধড়ক মারের পর আহত হন। পেহলু খান মারা যান। গোমাতা কেনার সাধ তার চিরতরে পুরো হয়ে যায়। এ ঘটনা রাজস্থানের । মালদহ থেকে রাজসমন্ধে মজুরীর কাজে এ মুসলিম ভাইটি যাত্রা করলে পথে শম্ভুলাল রেগর পিছু নেয়। পরে ধারালো অস্ত্রে ধরাশায়ী করে তার দেহে আগুণ ধরায়। এর নাম ভারত আর তার মুসলিমরা। এ ঘটনা পশ্চিমবঙ্গের। মালদহের জামাল মুমিন ট্রেন ধরেছেন হাওড়া থেকে, কয়জন যুবক তাকে জানালার কাছ থেকে উঠে যেতে নির্দেশ করে। বিস্মিত জামাল কিছু বুঝে উঠার আগেই শুরু হয় মার কিল ঘুষি। চলে ধর্মের বাক্যবাণ। সারা ভারত জুড়ে এ ধারার কেরিক্যাচার জোরেসোরে মোদির ভারতে চলমান। রাজস্থান থেকে বাংলা, হরিয়ানা থেকে কর্নাটক । গোরক্ষার নামে, মুসলিম, নিধন ভারতের বিরত্বের বাহাদুরী। ভারতের দৃষ্টিতে মুসলিমরা গরুরও অধম। ১৮৫৭ খৃষ্টাব্দের সিপাহী বিদ্রোহের ঠেলা সামাল দিতে গিয়ে ডিভাইড এন্ড রুলের নামে যে বিষবৃক্ষ পুতে গেছে বৃটিশ, ঐ তাপে আজ অবদি ভারত পুড়ছে। এর কারণ ভারতের বড় বড় বুদ্ধিজীবিরা ওতে বাড়তি তাপ দিয়েছেন। যে কাজ বাংলাদেশে বা অন্যত্র ঐমাপে হয় নি বলেই ভারত সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতায় কাঞ্চনজঙ্ঘা, হিমালয়ের চূড়া। ২০১০ থেকে মোদির ভারত লাফিয়ে আগাচ্ছে। ২০১৪ থেকে ২০১৮ তে ৮৫টি হামলা হয়। আক্রান্ত হয়েছেন ২৮৫ জন, মৃত্যু হয়েছে ৩৪ জনের। ধর্মনিরপেক্ষ ভারতে মুসলিম নিধনের জয়জয়াকার। গুজরাট, মহারাষ্ট্র, কর্নাটক, হরিয়ানা, ঝাড়খন্ড, বিহার, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, সবরাজ্যে একই নাটক চলমান। ২০১৭ সালে জলপাইগুড়ি থেকে কোচবিহারের তুফানগঞ্জে যাওয়ার পথে নুরুল ইসলাম , আনোয়ার হোসেন, ও হাফিজুল শেখ আক্রান্ত হলে, গাড়ী চালক নুরুল পালান কিন্তু বাকী দুজনের মৃত্যু হয় গণপ্রহারে। প্রশাসন এসব কাজে খুব বাধা দেয় না। ভোক্তভোগীরাসহ বাস্তবতা তাই প্রকাশ করে। বরং পুলিশ হেফাজতে মারা আরো সহজ হয়। মোদী সরাসরি উস্কানীতে না থাকলেও শাসক দলের নিরব সমর্থন ব্যতীত এসব হতো না। সম্প্রতি আরো একটি আচার বেড়েছে মানুষ নিধনের অস্ত্র হিসাবে গুজবে ছেলেধরা হিসাবে প্রচার চালিয়ে মানুষ নিধন করা হচ্ছে।

গো পূজার নামে মুসলিম নিধনের অসম্ভব এক খেলা ভারত সচল রেখেছে ধর্মনিরপেক্ষতার খোলসে। একই ভাবে ফ্রান্সেও ঐ খোলসের আড়ালে মুসলিমদের শিক্ষা দিতে তৎপর। মুসলিম দেশগুলোকে কিভাবে আসামী বানিয়ে গোটা দেশ ধ্বসিয়ে দেয়া হয়েছে তার উদাহরণ সবার জানা। অতীতের ঘটনাগুলি তার জ¦লজ্যান্ত প্রমাণ। বুশের ক্রুসেড নাম নেয়া ৯/১১এর হত্যাযজ্ঞের নিহতরা কার পাপে লাশ হয়েছে, আজকের বিশ^ তা জানে, লুকানো নেই। বুশেজ ওয়ার, মাইকেল ম্যুরের ফারেনহাইট ৯/১১, লুজ চেঞ্জ ৯/১১ এসবের উপর অসংখ্য প্রামাণ্য প্রতিবেদন ময়দান চষে বেড়াচ্ছে। ফ্রান্সে মতামতের স্বাধীনতা শিখাতে গিয়ে স্কুল শিক্ষক স্যামুয়েল প্যাটি কাজটি করে নিজেও প্রশ্নবিদ্ধ। তারচয়ে কম বয়সের আবদৌলখ ছেলেটিও নিজের জীবনকে বেওকুফের মত মৃত্যুর দিকে ঠেলে ঘটনাস্থলেই পুলিশের গুলিতে মারা গেল। সমগ্র মুসলিম বিশ^ বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে যখন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রো বাহাদুরী করে বলেন তিনি তার অবস্থান থেকে সরবেন না, ব্যঙ্গচিত্র প্রকাশ থামবে না, এটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। উল্টো তিনি বলেন মুসলিমরা গোটা বিশে^ বিচ্ছিন্নতাবাদকে জন্ম দিয়েছে, এরা সংকট তৈরী করছে। গোটা মুসলিম বিশে^ ফ্রান্সের পন্য বয়কটের হিড়িক পড়ে। বহুদিন থেকে বাংলাদেশ সংকটের কারণেও পন্য বয়কটের অভিযোগ উঠেছে ভারতের বিরুদ্ধেও। মুসলিমরাও এমন হতবুদ্ধ হয়ে পড়েছে যে তারা অনেক মুসলিম মনে করছে তারা নিজেরাই অপরাধী। এটি সারা বিশে^র সচেতনরা জানে ফলস ফ্লেগ নামের এক অপদেবতা গোটা দুনিয়া চষে বেড়াচ্ছে। দৃশ্যত দেখা যায় মুসলিমরা আসামী, যদিও এসব ফলস ফ্ল্যাগের গুটিবাজি মাত্র। বিনা কারণে মুসলিমদের কোনঠাসা করতে বহুদিন থেকে এ খেলা চলছে।

জাস্টিন ট্রুডো বলেছেন স্বাধীন মতামতেরও একটি লিমিট থাকতে হবে। তিনি এটিও স্পষ্ট করেন যে এ কমিউনিটি এখন পর্যন্ত বিশে^ অনেক ধরণের বৈষম্যের শিকার। সঙ্গত কারণে আচরণে আরো সংযত থাকা জরুরী। তার দেশ ফ্রান্সের জনতার পাশে এভাবে মানবতার বানী নিয়ে হাজির হয়েছে। যে মাধুর্য্যতা ইমানুয়েল ম্যাক্রোর আচরণে ছিল না বরং উগ্রতা দিয়ে তিনি মুসলিম বিরোধী ভূমিকায় নামেন। উদ্ধত আচরণধারী ভারত সময় ক্ষ্যাপন না করেই ফ্রান্সের সাথে একাত্মতা জানিয়ে মাসতুতো ভাই হিসাবে একতার কথা জানিয়েছে। ড্যানিশ ডেইলি এসব প্রথম ছাপে ২০০৫ সালে। ফ্রান্সের চার্লি হেব্দো সেটি আবারও ছাপে ২০০৬ সালে। এসব ধারাবাহিক পূণমুদ্রন চলছে ২০১১, ২০১২, ২০১৫। ২০১৫তে এরকম ক্ষিপ্ত হয়ে দুজন মুসলিম ১২ জনকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ে। ১১ জন মারা যান ও ১১ জন আহত হন। উল্লেখ্য একজন মুসলিম পুলিশও ঐ চার্লি হেব্দোর পক্ষে মারা যায়। উল্লেখ্য ১৬ই অক্টোবর ২০২০ সালে সম্প্রতি স্যামুয়েল প্যাটিকে হত্যা করে এক চেচেন তরুন কারণ শিক্ষক তার ছাত্রদের এসব কার্টুন হজম করা শিখাচ্ছিলেন। মানুষ যখন রাগে তখন হিতাহিত জ্ঞান হারায়। শিক্ষক কিন্তু স্থির মস্তিষ্কে এই কর্মটি করেন, যারা বেঁচে আছে তার ছাত্ররা, তারা ঐ শিক্ষক থেকে কি শিখলো? তারা তাদের বাকী জীবনে এই ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন কথা কেমন করে ভুলবে। তাদের প্রিয় শিক্ষকের ও তাদের প্রিয় সহপাঠির এই অকাল প্রস্থান দুটোই কি তাদের জীবনের একটি বড় ক্ষত হয়ে থাকবে না? অন্যের ছিদ্রান্বেষন করে মিথ্যার প্রচার করাই ধর্মনিরপেক্ষতা, মতামতের স্বাধীনতা, এটা কি একবিংশ শতাব্দীর শিক্ষকরা শিখাবেন? আল জাজিরার বরাতে জানা গেল ‘৮০%এরও বেশী ক্ষতিগ্রস্তরা মুসলিম’এটি ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট জানেন। তারপরও কি উদ্দেশ্যে মিঃ ম্যাক্রো এমন উৎসাহী হয়ে মুসলিম বিরোধী অবস্থান নিয়ে উত্তপ্ত কড়াইতে ঘি ঢাললেন?

অনেকের মতে ভারত ও ফ্রান্সের মূলত এটি রাজনীতির খেলা। শাসক কুলের সামনে ঝুলে রাজনীতি ও ভোট। এসব সামান্য খড়কুটো মানুষের সামনে এনে শাসকবর্গ অনেক সময় ভোটের রাজনীতি করে থাকে। একদলকে হামলে অন্য দলকে জায়গা দেয়, এ নষ্ট কৌশল থেকে মানব জাতিকে সরে আসা সময়ের দাবী। মানবতার কল্যাণে সব দেশের জনতার স্বার্থে যা উৎকৃষ্ট, তাই গহণ করা উচিত শাসকবর্গের। রাজনীতির এই কপট নীচতা থেকে বের হয়ে এক বিশ^ সমাজ রচনা করতে পারলেই গোটা মানব জাতি উপকৃত হতো। ধর্মনিরপেক্ষতার নাম নিয়ে বিশে^ যা করা হচ্ছে তা নিন্দনীয়। ধর্মনিরপেক্ষ ভারত কি করছে? ধর্মকে পিটাচ্ছে, খুন জখম করছে। বিরোধী ধর্মের কোন মর্যাদা তারা করে না। ধর্মনিরপেক্ষতার নাম নেয়া এসব ভন্ডামীর অবসান হওয়া জরুরী। মানুষ তো পশু নয়। তার ধর্ম কেন সে পালন করতে পারবে না। জয়শ্রীরাম, বন্দেনাতরম, কার্টুন কেন হবে তাদের মানুষ নিধনের হাতিয়ার? বস্তুত এসব দেশে মানুষের স্বাধীনতা প্রশ্নবিদ্ধ করতেই এসব কসরত। সবার আগে মানুষ হওয়াই শর্তের অংশ। যে বা যারা এসব সংকীর্ণ কাজ করছে, তারা কি মানুষের কাজ করছে? কমরেড এম এন রায় বহু আগেই অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন, “ইউরোপ মুসলমানদের থেকে শিক্ষা লাভ করে বর্তমান সভ্যতার নেতৃত্বে আসীন হয়েছে। আজো ইউরোপের উদার ও কৃতজ্ঞ প্রকৃতির চিন্তাবিদগণ অবনত মস্তকে এটি স্বীকার করে থাকেন। দুর্ভাগ্যবশতঃ ভারত ইসলামী চিন্তাধারার যথাযোগ্য সমাদর না করার দরুন লাভবান হতে পারে নাই কারণ তারা অস্পৃশ্যতার বেড়াজাল ভুলতে রাজি নয়। আজো ইচ্ছা করলে জাগরণের যুগে মানবতার ইতিহাসের ঐ গৌরবময় অধ্যায় হতে উভয় সম্প্রদায়ের লোকই অনুপ্রেরণা লাভ করতে পারেন” (The Historical Rule of Islam)।

ইসলামের সত্যকে ছড়িয়ে দেবার দায়িত্ব প্রতিটি মুসলিমের। আমাদের অপরিণামদর্শীতার কারণে আমরা এটি গোটা বিশে^ ছড়িয়ে দিতে পারি নাই। এ ব্যর্থতা আমাদের নিজেদের। ইসলাম ধর্ম একটি ব্যতিক্রমী ধর্ম, এটি শুধু মুসলিমদের একার ধর্ম নয়। এটি গোটা বিশে^র ধর্ম। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খৃষ্টান, ইহুদী, জৈন, পারসিক, শিখ সবার ধর্ম এটি, এটি বিশ^ধর্ম। এর মূল বাণী মানবতার বাণী। এ ধর্ম বড় শক্ত ধর্ম, ছুৎমার্গ নয়, ছুলেই জাত যায় না। এখানে কোন সংকীর্ণতা, অমানবিকতা নেই। মানুষ হিংসের বশবর্তী হয়ে এটি থেকে যোজন যোজন দূরে থেকেছে। যাদের একে লুফে নেবার কথা ছিল তারা হিংসের অনলে পুড়ে একে দূরে ঠেলে রেখে নিজেরাই গভীর অন্ধকারে পড়ে রইলো। যার কারণে তারা জানেও না যে এ ধর্মগ্রন্থে তারাও শরিক, এটি তাদেরও ধর্ম, এ নবী তাদেরও নবী। আমি কুরআনের সুরা সাবা থেকে একটি আয়াত সংযোজন করছি তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে, “আমি (আল্লাহ) তোমাকে (মোহাম্মদকে) সমগ্র মানব জাতির প্রতি সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরুপে প্রেরণ করেছি, কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না”। এই না জানার কারণেই মানুষ এত হিংস্র ও ভয়ংকর স্বরুপ নিয়েছে। তাই উদার চিত্তে আহবান করবো এটি এমন এক ধর্ম যেখানে সত্য ছাড়া মিথ্যার কোন বেসাতি নেই। এর সমস্ত গ্রন্থে অসংখ্য বৈজ্ঞানিক সত্যতা লুকিয়ে ছড়িয়ে আছে। দুর্ভাগ্য ভারতবর্ষের মুসলিমরা ৭০০ বছর রাজত্ব করেছে কিন্তু সংকীর্ণতা জাতিভেদপ্রথার গোজেমেলে অবস্থানে ভারতবাসী আটকে পড়ে আছে আজ অবদি। মানবতাহীনতা মানুষের মৃত্যুর নিশানা। অতীতে কার্টুনের ভয়ংকর খেলায় ২০১৫ সালে লেখা কার্টুন এক হাস্যকর তামাশা | Nazma Mustafa’s Blog এ উৎসাহী পাঠকরা পড়তে পারেন। আত্মসচেতনতা ও মানবিকতা দিয়েই এর মোকাবেলা করা উত্তম, হিংসা ও সংকীর্ণতা দিয়ে নয়।

১ নভেম্বর ২০২০ সাল।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: লেখাটি আমার দেশ অনলাইন ইউকে থেকে নভেম্বরের ৯ তারিখ ২০২০ সংখ্যায় এসেছে। নীচে লিংক দেয়া হলো।

জয় শ্রীরাম ও কার্টুন মারণাস্ত্র

কার্টুন এক হাস্যকর তামাশা

নাজমা মোস্তফা

(বিশেষ দ্রষ্টব্য: কার্টুন এক হাস্যকর তামাশা পুরোনো লেখাটি উপরে আনলাম বর্তমান ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোর সাম্প্রতিক পদক্ষেপের উপর নির্ভর করে। এটি পুরোনো লেখা, আজকের নয়)।

ফ্রান্সের প্যারিসে নবী মোহাম্মদ (সঃ)কে নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে কার্টুন এঁকে যে হাস্যকর তামাশার সূত্রপাত হয় তা অনেক দূর গড়ায়। শুধু এটিই নয়, প্রায়ই বেশ ক বছর থেকে এসব হচ্ছে। ২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে মুসলিম বিরোধী মূভি “ইনোসেন্স অব মুসলিমস” মূভ্যিটি সারা মুসলিম বিশে^ বেদনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তখন একটি কলাম লিখেছিলাম “ইনোসেন্স অব মুসলিমস: এক উদভ্রান্ত পাগলা ঢিলের নাম” শিরোনামে। প্রায়ই এসব হয় এবং হচ্ছে, ডেনিশ কার্টুন সাম্প্রতিক সময়ের কার্টুন এসব নিয়ে নাস্তিকদের সাইটে সারা বছরই কলমের মল্লযুদ্ধ লেগে আছে ইসলামিস্টদের সাথে। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে কখনো মুসলিমরা বিরোধীকে আঘাত করছেন কখনোবা তারা নিজেরাও নিহত হচ্ছেন। কথা হচ্ছে ফাস্টবয়কে লাস্টবয়রা সবদিনই ঘৃণা করে এবং করবে। এতে ক্ষিপ্ত না হয়ে শান্তিপূর্ণভাবে যুক্তির মাঝে জবাব দেয়াই উত্তম বলে মনে করি। কারণ যার কাছে যুক্তি সে জিতবেই, তার হারার কোনই সম্ভাবনা নেই। ফ্রান্সের কার্টুনিস্ট চার্লি হেবদো তার ম্যাগাজিনে এক গুচ্ছ কার্টুন এঁকে সারা বিশে^ বেশ বড় রকমের নাড়া তৈরী করতে সক্ষম হয়। এ রোগ ২০১১, ২০১২, ২০১৫ ক্রমেই এসব হচ্ছে একের পর এক, গোটা বিশ^ দেখছে। সাম্প্রতিক সময়ে ২রা জানুয়ারীর ২০১৫ তে দেখা যায় দুজন লোক সশস্ত্র সাজে সজ্জিত হয়ে এক নাগাড়ে ঐ কার্টুনিস্টসহ তার সাথের আরো ১২জন মানুষকে প্রকাশ্য ময়দানে গুলি করে বসে। প্রথমে ১১জন মারা যায় এবং সেখানে আরো ১১জন আহত হয়। ঠিক ঐ সময় সেখানে একজন ফ্রেন্স মুসলিম পুলিশও ঐ বিতন্ডাতে চার্লি হেবদোর পক্ষে নিরাপত্তা দিতে গিয়ে খুন হয়। মিডিয়া সমান গলাতে প্রচার করছে এসব করেছে মুসলিম টেররেস্ট জঙ্গিরা।

ওদিকে ১১ই জানুয়ারীতে ৪০টি দেশে হর্তাকর্তাসহ এর প্রতিবাদে জড়ো হন প্যারিসের সব মিলে প্রায় ৩.৭ মিলিয়ন মানুষ। সেদিন তাদের সবার হাতের পতাকাতে একটি ম্যাসেজই ছিল “জে স্যুট চার্লি” এর অর্থ হচ্ছে “আমি চার্লি।” এর পর প্রায় এক মাস পর ১১ই ফেব্রুয়ারীতে নর্থ ক্যারোলিনার ইউনিভার্সিটি টাউন অব চ্যাপেল হিলে তিনজন মুসলিম নিহত হয় যাদের মাঝে এক দম্পতি স্বামী স্ত্রীসহ তিনজন, তৃতীয়জন ঐ মেয়েটির বোন একসাথে একজন সন্ত্রাসীর হাতে মারা যায়। এর ধারাবাহিকতায় ৪৬ বছরের স্টিফেন হিক্সকে আক্রমণকারী হিসাবে পুলিশ আটক করে। এসব ঘটনার পর আমার মনে ঐ কার্টুন দেখার বিষয়ে কিছু উৎসাহ তৈরী হয় যার প্রেক্ষিতে আমি ওগুলো খুঁজতে থাকি। যদিও ফ্রেন্স ভাষা না জানাতে তাদের প্রতিটি কথার অর্থ আমি বুঝতে পারিনি, তবে কিছু ধারনা পাই কিছু কার্টুনের আকার ইঙ্গিত দেখে। দু একটি ছবি দেখার পর আমার এসব দেখার উৎসাহ কমে আসে। কারণ সেই পুরনো একই খেলা কত আর শোনা যায় বা দেখা যায়, জনম জনম থেকে সেই এক সাপের নাচন খেলা, ওসব দেখতে কি আর মন চায়? মনে হলো মিডিয়া, চার্লি ও অন্যান্য কার্টুনিস্টরা যা করছে, এসব কত যে বড় রকমের হাস্যাস্পদ কাজ তারা করছে, সেটি তারা নিজেরাও চিন্তা করতে পারছে না। এটা অনেকটা মিথ্যার সাথে যুদ্ধ করার মত, ছায়ার সাথে যুদ্ধ করার মত ব্যাপার। ইতিহাসে প্রমান পাওয়া যায় কিছু জনেরা নবী ইসা (আঃ)কে বাস্টার্ড গালি দিয়ে চরম প্রশান্তি অর্জন করেছে। তখনকার ইহুদী রাব্বিরা তাকে শূলে চড়ায়, তাদের দাবী অনুযায়ী তাকে ক্রুশে চড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে। ঐ ঘটনার আলোকে মানুষটিকে টিটকারী মশকরা করার কোন কমতি তারা রাখে নাই। থুথু ছিটিয়েছে, মাথায় কাটার মালা পরিয়েছে, বাস্টার্ড বলে গালি দিয়েছে, একই  আদর্শের দিশা ধরে ভিন্ন আরেকদল যখন নবী মোহাম্মদ (সঃ)কে একজন যুদ্ধবাজ, নারী নির্যাতনকারী বা নারী লোভী হিসাবে উপস্থাপন করে চরম তৃপ্তি পেতে চায়। যখন একজন সম্মানিতকে কোনভাবেই অবদমিত অপমানিত করার সুযোগ থাকে না, তখন অসুস্থ জনতারা মনের স্বান্তনার জন্য এসব অপবাদকে মুখরোচক হিসাবে গ্রহণ করে, আর ওতেই স্বান্তনা পেতে চায়। বস্তুত এসব করে তারা নিজের অন্তরের হিংসার ক্ষতের উপর প্রলেপ লেপে দিতে চায়।

ধর্ম এক চরম মিথ্যাচার, এ বিতন্ডার কোন সুযোগ নেই। এর প্রধান প্রমান হচ্ছে এক ধর্মের সাথে অন্য ধর্মের একাত্বতা। ইহুদী খৃষ্টান আর ইসলাম, ধর্মের যোগসূত্রে বাধা এরা তিন। সোজা করে তাকালেই দেখা যায় এরা সবাই এক ঘরের মানুষ, মূলত এরা এক আলোর দিশারী। এমনও দেখা গেছে যারা যৌবনে ধর্ম মানেনি তারাই প্রৌঢ় হলেই ধর্মের ঘাড়ে ভর করে দাঁড়াতে চেয়েছে। কিন্তু যখন গায়ে শক্তি থেকেছে তখনই শক্তির বাহাদুরিতে ধর্মকে অবজ্ঞা করেছে বহু বেশী, হয়েছে নাস্তিক। ধর্মের এ বিতন্ডা দেখে নাস্তিকতায় স্বান্তনা খুঁজেছে অনেকে, এ হচ্ছে বোকামীর ধর্ম দর্শন। দেখা যায় ইসলামকে প্রতিপক্ষ জেনে সেই সপ্তম শতাব্দী থেকে চলছে এসব লড়াই। আজ এত পরেও সেটি শেষ না হয়ে বরং যেন দিনে দিনে মহিরুহ হয়ে উঠছে। তাই মহিরুহের অবস্থানকে স্পষ্ট করার দায়িত্ব ছিল আমাদের প্রতিটি ধর্মধারীর। যারা এর পেছনে রসদ যুগিয়ে চলেছে, তাদের স্বযতœ তদারকিতে এটি বেড়েই চলেছে। আর যাদের দায়িত্ব ছিল এসব জটিলকে খোলাসা করার তারা দিনে দিনে ধর্মের মূল গবেষনা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বরং উল্টো বিরোধীকে রসদ যুগিয়ে গেছে। এরকম বহু উদাহরণ চারপাশে ছড়ানো আছে।  এ শতকের শুরুতে ৯/১১ এ ঘটে ভিন্ন রকম যুদ্ধের সূচনাপর্ব। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বুশ একে “ক্রুসেড” বলে ডাক দিলেও প্রতিবাদ উঠলে তাকে ‘সরি’ বলতে হয়েছে। কিন্তু প্রথমে সময় ক্ষ্যাপন না করে তিনি ক্রুসেডের ডাক দেন। সভ্যতার যে সংকটের আশংকা করেছে সচেতনরা, তারা ওটি নির্মুল করতে আজ নতুন করে ভাবছে কিভাবে প্রত্যেকের ই-মেইল ইন্টারনেট চেক করবে। এতে মানুষের প্রাইভেসির মাত্রাটি একদম শূন্যের কোঠাতে নেমে আসবে, সন্দেহ নেই। তারপরও কি যুদ্ধকে সামাল দেয়া যাবে বলে মনে হয়, যদি না এসব মিথ্যা ক্যারিক্যাচার বন্ধ হয়?

বিগত শতকে হিটলার (অনেকের ধারণা মতে ৬০ লাখ) ইহুদী নিধন করে সহজ একটি সমাধান করতে চান। এতে কতদূর যে সমাধান হয়েছে তা ইতিহাসই সাক্ষী। বরং এক হিটলারের বদলে গোষ্ঠীবদ্ধ হয়ে ইহুদীরাই পরবর্তী বিশে^র হিটলার হয়ে নতুন জন্মে ফিলিস্তিনের কলিজাতে কামড় দিয়ে চলেছে। যদিও ফিলিস্তিনিরা এর জন্য মোটেও দায়ী নয়, জার্মান হিটলারের দায় তাদের ঘাড়ে চাপার কথা নয়, কিন্তু অবিবেচকের মত বিশ^ মোড়লরা এ ব্যাপারে চরম অনাচার করে বিধাতার দরগাহে খুব বড়দাগেই আজকের দন্ডধারী আসামী। বড়কর্তারা যারা শুরু থেকেই এর পেছনে তেল যুগিয়েছে তাদের ঘাড়েই এর দায় বর্তায়। সেখানে দেখা যায় নিরপরাধ প্যালেষ্টিনিয়ানদের শিশু, মেয়ে, মহিলা, পুরুষ কারো মুক্তি মেলেনি, ঐসব দানব স্বরুপ পরবর্তী ইহুদীদের অত্যাচার থেকে। তাদেরে স্বগৃহ থেকে বের করে নিয়ে সর্বস্ব লুন্ঠন করে পথে বসিয়েছে, এমন অনাচার নাই যা তারা করে নাই। জাতিসংঘ নির্ধারিত স্কুলেও হামলে পড়তে তাদের বাধে নাই। বাড়ির মূল কর্তাকে বের করে নিয়ে গোটা বিশ^ থেকে ছন্নচ্ছাড়া ইহুদীদেরে ধরে ধরে এনে নতুন বসতি গড়ে তোলে। যেন এরকম, আমাদের পূর্ব পুরুষেরা আরবে বাস করতেন, এর পর আমরা গোটা বিশে^ ছড়িয়ে পড়লেও কৌশলবাজরা ধরে ধরে আমাদেরে এনে ফের আরব ভ’মিতে বসিয়ে দেয়, আর মূল আরববাসীকে তাদের পূর্ব পুরুষের ভিটাবাড়ি থেকে উচ্ছেদ করে দেয়। বিবেকের কাছে এটি যেমন একটি অনাচারি কাজ হবে, ইহুদীদেরে ইসরাইলে বসিয়ে দেয়া ওরকমই একটি বড় অনাচারের উৎকৃষ্ট নমুনা মাত্র। নবী ইসা এসেছিলেন একজন আঞ্চলিক নবী হয়ে বাইবেলের হিসাবেও ইহুদীদের হারানো গোত্রের সন্ধানকর্তা হিসাবে এসেছিলেন, তিনি ছিলেন আঞ্চলিক নবী। এরা মূলত নবী মুসা(আঃ)এর অনুসারীরা এভাবে ক্রমে সারা বিশে^ এখানে ওখানে ছড়িয়ে পড়ে। তাই বাইবেল বলে, “তিনি (জিসাস ক্রাইস্ট) উত্তরে বলেন, ইসরাইল কুলের হারানো মেষ ছাড়া আর কারো নিকট আমি প্রেরিত হই নাই” (বাইবেল, ম্যাথ্যু ১৫:২৪ আয়াত)। দেখা যায় যে মুসার অনুসারী ইহুদীদের খুঁজে দেখার কাজে তিনি এসেছিলেন, তারাই তাকে এর মাঝেই শুলে চড়ায়। এরা বিভ্রান্ত হয়েছিল বলেই পরবর্তী নবী ঈসা (আঃ)কে আসতে হয়। এবং নবী ঈসার অনুসারীরাও বিভ্রান্ত হয়েছিল বলে তারও পরবর্তী আর একজনকে আসতে হয়, তিনি হচ্ছেন শেষ নবী মোহাম্মদ (সঃ)। তার হতেই ধর্ম পূর্ণতা লাভ করে। আল্লাহ বলেন, “যারা অবিশাস পোষন করে তারা আজকের দিনে তোমাদের ধর্ম সম্বন্ধে হতাশ হয়েছে, কাজেই তাদের ভয় করো না, বরং ভয় করো আমাকে। আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের ধর্ম ব্যবস্থা পূর্ণ করলাম” (সুরা মায়েদার ৩ আয়াত)। ধারাবাহিক ২৩ বছরে ধর্মটি এভাবে পূর্ণতা পায়। তারপরও এর মাঝে কোন জটিলতা ধরা পড়লে বা তৈরী হলে তাও ঐ কুরআনের প্রথম বাণী “পড়” কথার অনুসরণে ধর্মধারী জনগণকেই প্রয়োজনে চর্চা গবেষনা করে সঠিককে বেছে নিতে হবে এবং তারই সাধনা করতে হবে। বিদায় হজে¦র বাণীতে ছিল মিথ্যা ‘চিরতরে দূরিভূত হয়েছে’।

প্রায় দুই হাজার বছর পরের ইতিহাসে সারা বিশ^ থেকে ইহুদীদেরে ধরে এনে প্যালেস্টাইনে ঠাঁই দেয়। সাম্প্রতিক সময়ে বৃটিশ এমপি মিঃ ডেভিড ওয়ার্ড ইসরাইলী প্রাইম মিনিস্টারের বেনজামিন নেতানিয়াহুর প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেন ঐ প্যারিস সংহতিতে ২০১৫ সালের জানুয়ারীর ১১ তারিখে। এবং তিনি শুধু প্রতিবাদই করেন নাই তার প্লেকার্ডের বানী ছিল “জে স্যুট প্যালেস্টাইন” “আমি প্যালেস্টাইনী” ছিল তার প্রতিবাদের শ্লোগান। গাজার হামলার প্রতিবাদে তিনি বলেন, “আমি যদি তখন গাজাতে থাকতাম, আমি ইসরাইলের প্রতি রকেট নিক্ষেপ করতাম”। ৬০ বছরেরও বেশী সময় থেকে প্যালেস্টাইনীরা এ মার খেয়ে যাচ্ছে। যদিও সমস্ত বিশে^র সুজনদের মেধাবীদের শরীরের উপর বিবেক নামের মস্তিষ্কটি আজো সচল আছে এবং ছিল। যে ধর্ম দিয়ে বিরুদ্ধবাদীরা ইসলামের জনতাকে পাগল ঠাওর করতে চাচ্ছেন মুক্তির রাস্তা খুঁজতে এমন জটিল সময়ে সে গ্রন্থ থেকে কিছু বানী আনছি। সে গ্রন্থে পাওয়া যায় খৃষ্টানরাই মুসলিমের সবচেয়ে কাছের স্বজন। আর ইসলামের শুরু থেকেই এর সর্বনাশ  ও ধ্বংস সাধনে ইহুদীরা অতোপ্রতোভাবে জড়িত থাকার ইতিহাস পাওয়া যায় সর্বত্র। নবী মোহাম্মদকে হত্যা করার ষড়যন্ত্রের সাথে তারা বারে বারে জড়িত থেকেছে। এসব আচরণের কিছু দাগ চিহ্নও পবিত্র গ্রন্থ কুরআনে পাওয়া যায়। এতে ইহুদীদের কপটতা ও খৃস্টানের সহজতা ধরা পড়ে (সুরা মাইদাহ এর ৮২ আয়াত)। অতীতে ইহুদীরাই নবী ইসাকে অর্থাৎ জিসাসকে নিয়ে মশকরা করেছে আর আজকে তারা দুদলই (ইহুদী ও খৃষ্টান) নবী মোহাম্মদকে নিয়ে মশকরা করছে, আর নাস্তিক্য ধারার কারণে এসব বেড়ে চলেছে। যদিও ধর্মের একত্ব যেখানে লক্ষ্য করা যায়, সেখানে এসব হবার কথা ছিল না।

(কুরআনে সুরা নিসার ৫ ও ৬ আয়াতে) দেখা যায় আল্লাহর নির্দেশ এসেছে কিভাবে সংশ্লিষ্টরা একজন সাধারণ মুসলিম অনাথের প্রতি যতœবান হবেন। সেখানে বলা হয় তাদেরে যতœ নিতে হবে যতদিন না তারা বিবাহযোগ্যা হয়ে উঠে ততদিন তাদের দেখভাল করতে হবে, তাদের সহায় সম্পত্তির রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে। তাড়াহুড়ো করে তা নষ্ট করা যাবে না। অতপর তাদের সম্পত্তি তাদের বুঝিয়ে দিতে হবে। সবার শেষে সাবধান বাণী হিসাবে বলা হয় হিসাব রক্ষক হিসাবে আল্লাহই যথেষ্ট। ইসলামের এরকম একটি নির্দেশের পর কেমন করে নবী মোহাম্মদ (সঃ) একজন ৬ বা ৯ বছরের মেয়েকে বিয়ে করতে পারেন বলে যা চৌদ্দশত বছর পরও বিরোধীর জ¦ালা হয়ে জ¦লছে। ধারাবাহিকভাবে সমাজে এ নিয়ে বিতন্ডা তৈরী করা হচ্ছে। সবার উপর আবু বকর ছিলেন বিবি আয়েশার বাবা, বাবার কষ্টের চেয়েও আজকের বিরোধীর কষ্ট যেন বহুগুণ বেশী। তিনি এমন একজন বিচক্ষণ সাহাবা (নবীর সহচর) যাকে নবীর পরই খলিফার মর্যাদা দেয়া হয়। এতে কি এসব স্পষ্ট হয় না, এসবই বিরুদ্ধবাদীদের অপপ্রচার ছাড়া আর কিছু নয়? সবচেয়ে বড় কথা নবী মোহাম্মদ(সঃ) ২৫ থেকে ৫০ বছর পর্যন্ত এক স্ত্রী বিবি খাদিজা ছাড়া আর কারো পানি গ্রহণ করেননি। ঐ সময় তার ঘরে চার চারজন মেয়ে ফাতেমা, কুলসুম, রোকেয়া, জয়নব এদের রক্ষণাবেক্ষনের জন্যও একজন বুদ্ধিমতি যোগ্য অভিভাবকের সংবাদ নিয়ে খাওলাহ নামের এক মহিলা বিবি আয়েশার নাম উচ্চারণ করে বিয়ের পয়গাম নিয়ে আসেন, তখন নবীর ৫৫ বছরে ঐ বিয়ে হয়। এসব ক্ষেত্রে যে বা যারা আরবী ভাষাটি জানেন তারা ভাল করেই জানেন “বিকর” শব্দটি কখনোই কোন অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুর জন্য বা নয় বছরের বাচ্চার জন্য ব্যবহার হয় না। এটি একমাত্র তার জন্যই ব্যবহার হয়েছে যে এরি মাঝে বিবাহযোগ্যা (তাইয়্যিবা) হয়ে উঠেছে। আমি দেখেছি অনেক মুসলমানও বিষয়টি ভালো করে জানেন না। অনেকে সহিহ হাদিসের দোহাই দিয়ে এরকম কুরআন বিরোধী মিথ্যার প্রচার করে ধর্মের বারোটা বাজিয়ে চলেছেন, যার ইন্ধনে গোটা বিশে^ লঙ্কাকান্ড চলছে। সহি হাদিসের বড় শর্ত হচ্ছে তা কুরআন বিরোধী হতে পারবে না। কোন হাদিস কুরআন বিরোধী হলে, তা বাতিল বলে গন্য হবে, এটি হাদিসের প্রধান শর্ত। সারা বিশ^ই আজ বিবি আয়েশার মা বাবা সেজে যুদ্ধের মাঠে নেমেছে। বিবি আয়েশা আজ তাদের হাতের গিনিপিগ। আর বিরোধীরা মহা উৎসাহে এসবের উপর নটনৃত্য চালিয়ে যাচ্ছে। কার্টুন রচিত হচ্ছে এসব ভুলের উপরই রঙ্গমেলা চলছে, কলমের কালিতে কার্টুনের আঁকিবুকিতে ওটিই ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে। 

দেখা যায় বেশীর ভাগ কার্টুনের ক্যারিকেচার হচ্ছে বহু বিবাহ, বিবি আয়েশার বিয়ে, যুদ্ধবাজ ধর্ম এসব নিয়ে বিতন্ডা। আমরা সবাই জানি বাইবেলে বহু বিবাহ একটি সাধারণ ঘটনা। নবী ইব্রাহিমের দু সন্তান ইসমাইল ও ইসহাক দু মায়ের দু সন্তান। তাই বলে ওসব নিয়ে ইসলামে কোন বিতন্ডা করতে দেখা যায় না বা কোন বিতন্ডা বাধে না। ইসলামের বক্তব্যও এক বিয়েতেই টিকে, সুরা নিসার ৩ আয়াতে শর্ত হচ্ছে একাধিক  স্ত্রী থাকলে সবার সাথে সমতা রাখতে হবে, এবং সেটি জটিল। তোমরা একাধিকের সাথে সমতা রাখতে পারবে না (৪:১২৯) তাহলে একজনকেই এবং এটিই বেশী সঙ্গত” (সুরা নিসার ৩ আয়াত)। ইসলামের শক্তি প্রবল বলেই হয়তো মিথ্যা গল্প জুড়ে কুরআন, মোহাম্মদ, ও ইসলাম নিয়ে মশকরা করার লোকের বিধর্মী বা নাস্তিকের কোন কমতি নেই এ পৃথিবীতে, কোন যুগেই এদের কমতি হয়নি। বেশীর ভাগ বিতন্ডাকারীদের কথা হচ্ছে বিবি আয়েশার বিয়ে হয়েছে ৬ বছর বয়সে আর ঘরে তোলা হয়েছে ৯ বছর বয়সে। গোটা বিশে^ এরকম অনেক কর্ম অপকর্ম আছে যার কোন অভাব নেই কিন্তু ইসলামকে নিয়ে এ ক্যারিকেচার যেন কিয়ামত পর্যন্তই চলবে। সেদিন যখন কার্টুন খুঁজতে থাকি তখন দুটি আঁকিবুকি আমার কাছে স্পষ্ট হয় একটি চাকাওয়ালা বাহনে দেখা যায় নবী মোহাম্মদ (সঃ) ও ছয় বছরের বাচ্চা আয়েশা বসে আছেন এবং ছবিতে টেগ লাগানো আছে যে মোহাম্মদ ও তার কনে আয়েশা এরকম কিছু একটা। অন্য একটি ছবিতে এক মুসলিম সম্ভবত নবী স্বয়ং কুরআন হাতে দাঁড়িয়ে আর দূর থেকে সেখানে শেলের মত কিছু এসে কুরআনকে বিদ্ধ করছে। যেন কুরআনের সাথে যুদ্ধ চলছে, অস্ত্রের যুদ্ধ। আজ থেকে প্রায় বারো তেরো বছর আগে ইন্টারনেটে নাস্তিকের সাথে যুদ্ধ করতে যেয়ে এর জবাবে ১৬ টি পয়েণ্টের ভিত্তিতে যুক্তি  খুঁজে পাই যেখানে প্রমাণিত হয় যে, বিবি আয়েশার বিয়ে মোটেও ৬বা ৯ বছরে হয় নি, বরং বিয়েটি হয় ১৯ বছর বয়সে তার বহুবিধ প্রমান পাওয়া যায়। কিভাবে মিথ্যার সাথে আজ চৌদ্দ শতাব্দী পরও তারা যুদ্ধ করে চলেছে, যেন ছায়ার সাথে যুদ্ধ করছে। ওখান থেকে শুধু কুরআনের যুক্তিটুকুই যথেষ্ট মনে করে আনছি, কারণ এটি আল্লাহর বানী। “আর এতিমদের পরীক্ষা করে দেখবে যে পর্যন্ত না তারা বিবাহ বয়সে পৌছে যায়, তারপর যদি তাদের মধ্যে বিচারবুদ্ধি দেখতে পাও তবে তাদের সম্পত্তি তাদের হস্তার্পন করবে, আর তা মাত্রাতিরিক্তভাবে ও তাড়াহুড়া করে খেয়ে ফেলো না পাছে তারা বড় হয়ে যাবে (এই আশঙ্কায়) আর যে অবস্থাপন্ন সে যেন বিরত থাকে, আর যে গরীব সে ন্যায়সংগতভাবে খায়। তারপর যখন তোমরা তাদের সম্পত্তি তাদের ফিরিয়ে দাও তখন তাদের সামনে সাক্ষী ডাকো। আর হিসাবরক্ষকরুপে আল্লাহ যথেষ্ট” (সুরা নিসার ৬ আয়াত)।

বাকী অনেক হাদিস ও ঐতিহাসিক যুক্তিতেও এসব বানোয়াট কথা টিকে না। এবন হেশাম, হালবি, এয়াবা প্রভৃতিতে পাওয়া যায় বিবি আয়েশা (রাঃ) সমরক্ষেত্রে উপস্থিত থেকে সৈনিকদের সেবা শুশ্রুষা করেন। বিবি আয়েশা বদর যুদ্ধের ময়দানে সেবা শুশ্রুষা করেন। ইতিহাসে বা হাদিসে পাওয়া যায় প্রত্যক্ষ যুদ্ধের ময়দানে অংশ নেয়ার একটি বয়স নির্ধারিত আছে ১৫ বছরের নীচে কেউ যুদ্ধে যোগ দিতে পারতো না। এমতাবস্তায় তিনি ৬ বছরের বা ৯ বছরের হলে কেমন করে বদর যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করবেন। এরকম কোন যুক্তিতেই এসব টিকে না যে বিবি আয়েশার বয়স ৬ বা ৯ ছিল। সুক্ষ্মভাবে প্রতিটি কার্টুনের নষ্টামির স্পষ্ট জবাব দেয়া সম্ভব। তা না করে মিছামিছি খন্ডযুদ্ধ করার কোন মানে নেই। কারণ তা হলে ওতে অসহিষ্ণুতার উদাহরণ তৈরী হয়। মুসলমানকে ধৈর্য্য ধারণ করতে শক্ত করেই বলা হয়েছে। বিনিময়ে তাদের জন্য অফুরান পাওনা জমা আছে। সবার উপর মানুষকে কুরআনে বলা হয় আশরাফুল মকলুকাত। মানে মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব। আর এই শ্রেষ্ঠ জীবের স্বীকৃতি স্বরুপ মাথাটি তার প্রতিটি সুকর্মের প্রকৃত যোগানদাতা। তাই কাউকে নিয়ে মশকরা করার পূর্বে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করার পূর্বে দরকার তার মূল ইতিহাসকে জানার। ঘটনার মূল গোড়াতে না পৌছে শুধু ডালপালা নিয়ে নাড়াচাড়া করলে ডাল ভেঙ্গে হাত পা ভাঙ্গার সমূহ সম্ভাবনাকে এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। তারা ইহকালে কোনদিনও সফল হতে পারবে না। ধৈর্য্য ও সবরের আয়াতটি হচ্ছে: “তারাই শ্রেষ্ট যারা ঈমান এনেছে, সৎকাজ করছে ও পরষ্পরকে সততা অবলম্বনে উপদেশ দিচ্ছে এবং পরষ্পরকে ধৈর্য্য ধরার পরামর্শ দিচ্ছে” (সুরা আল আসরের ৩ আয়াত)। ধৈর্যের মাধ্যমে জটিলকে মোকাবেলা করার আহবান জানিয়ে এখানেই শেষ করছি। আল্লাহ হাফেজ।

২৪ ফেব্রুয়ারী ২০১৫।

অবৈধ সরকারের আয়নাবাজি

নাজমা মোস্তফা

বাংলাদেশের মানুষ রাজনীতি সচেতন, যদিও বারে বারে কপট নষ্ট রাজনীতির কাছে মার খাচ্ছে। ময়দানে সাধু আর শয়তান যদি লড়েসাধুর নাকানি-চুবানি দশা কমে নাবরং অতি সাধুতার নীরবতায় সেটি বাড়ে। অতি সাধু থাকাও জাতির জন্য বড় সংকট তৈরি করে। স্বাধীনতার পর থেকেই ময়দানে এ জাতি যুদ্ধ থেকেও বড় লড়াই লড়ছে যা তারা অতীতে কখনোই মোকাবেলা করে নাই। যখন বাংলাদেশে ছিলাম তখন একজন খৃষ্টান সম্প্রদায়ের ফ্রিজ মেকানিক ছিলেন তার নাম ছিল পিটার গোমেজ। স্বভাব সুন্দর মানুষটিকে আজো হয়তো অনেকে তার নাম জানবেন। সব সময় বাংলাদেশের রাজনীতির বিতণ্ডা দেখে অকপটে বলতেন আমরা এখন থেকে পাকিস্তান আমলেই ভালো ছিলাম। কারণ পাকিস্তানেও রাষ্ট্র পরিচালনাতে কিছু নীতি নৈতিকতা ছিল যা বর্তমান সময়ে বাংলাদেশে চোখে পড়ে না। ঐ সময়ও দেশে মানুষ নিরাপদ থেকেছেশান্তিতে বসবাস করেছে। আজ স্পষ্ট করবো, কিভাবে নিকট সময়ে রাজনীতিকে কলঙ্কিত করা হয়েছে কিছু চিহ্নিত মিডিয়াতে মনগড়া মিথ্যা প্রচারের মাধ্যমে। সত্যকে স্পষ্ট করা কুরআনের নির্দেশসঙ্গত কারণে এসব স্পষ্ট করা জরুরী।

(১) ভুয়া ভিডিও দিয়ে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে অপপ্রচার করেছেন শেখ হাসিনার উপপ্রেস সচিব আশরাফুল আলম খোকনপ্রচারিত ৩ জুন ২০১৮ তারিখ। ১৯ সেকেন্ডের এই ভিডিওটির শিরোনাম “ম্যাডাম জিয়ার মুখেই শুনুন” নামের ভিডিওতে শোনা যায় খালেদা জিয়া বলছেন, “আপনারা যতই বলেন আন্দোলন আন্দোলনঢাকায় সেভাবে করা সম্ভব হয়নি। এখানে পরিবারের মধ্যে গণ্ডগোল আছে। তারেক রহমানকে তো আপনারা ভালো করেই চেনেনবউ এর সঙ্গেও গণ্ডগোল। বউও চায় ক্ষমতাসেও চায় ক্ষমতা।”

(২) ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭ সালে সংসদে শেখ হাসিনা দাবী করেন জিয়া পরিবারের ১২ মিলিয়ন ডলার পাচারের একটি প্রতিবেদন তার হাতে এসেছে। এর কিছু দিন পর শেখ হাসিনার তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরীর ওয়েবসাইট ওবজারভার ডটকম ও জনকণ্ঠ নামের (প্রশ্নবিদ্ধ পত্রিকা) দাবী করে আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে জিয়া পরিবারের দুর্নীতি নিয়ে একাধিক প্রতিবেদন প্রচার করেছে। তিনি তার ওয়েবসাইটেআরব ভিত্তিক টিভি চ্যানেল গ্লোবাল ইন্টেলিজেন্স নেটওয়ার্ক ও ক্যানাডিয়ান টেলিভিশন দ্য ন্যাশনাল এসব সূত্রের কথা উল্লেখ করেন। জনকণ্ঠও উৎস হিসাবে দুবাই ভিত্তিক টেলিভিশন ও বাংলাদেশ প্রেস অনলাইন এর নাম উল্লেখ করে। ৩০ শে নভেম্বর সোবহান চৌধুরী “খালেদা জিয়ার দুর্নীতি” (Khaleda’s corruption)  শিরোনামে একটি ভিডিও প্রকাশ করেনসূত্র হিসাবে উল্লেখ করেন দুবাই ভিত্তিক টেলিভিশন চ্যানেলটিকে।

(৩) জনকণ্ঠ(?) ৯ ডিসেম্বর ২০১৭ তারিখে একটি খবর ছাপে যে খালেদা ও তারেক সৌদি বিনিয়োগের মুনাফায় জঙ্গী তৎপরতায় যুক্ত থাকলেও ভারত ও সৌদির যৌথ তৎপরতার দুর্নীতি বিরোধী তদন্তে বিভিন্ন দেশের সরকার প্রধানদের জড়িত থাকার প্রমাণ বেরিয়ে এসেছে। উল্লেখ্য খালেদা ও তারেক যথাক্রমে ১২শ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করেছেন যার এক অংশ যেত জঙ্গী অর্থায়নে ও মৌলবাদীদের পৃষ্ঠপোষকতায়।

(৪) সৈয়দ বোরহান কবিরের ‘বাংলা ইনসাইডার’ এসব কাজে অগ্রপথিক। তিনি তার ‘বাংলা-ইনসাইডার ডট কমে’ প্রচার করেন দুর্নীতিতে জিয়া পরিবার বিশ্বে তৃতীয় (১০ অক্টোবর ২০১৭)। প্রথম হলেন পাকিস্তানের মুসলিম লীগের সভাপতি নেওয়াজ শরিফ ৪০০ কোটি ডলারদ্বিতীয় উত্তর কোরিয়ার একনায়ক কিম জং উন আর তৃতীয় বেগম খালেদা জিয়া ২৫০ কোটি ডলার অবৈধ সম্পদ।

(৫) মুখরা প্রধানমন্ত্রী তার চরদের দ্বারা এসব সাজালেও যখন বাংলাদেশের মিডিয়া নীরব ছিল তখন তিনি সাংবাদিকদের উপর বিষোদগার করে বলেন আমরা তন্ন তন্ন করে দেখেছি শুধু দুটি চ্যানেল ও দুটি পত্রিকা নিউজটা করেছে। তার কিছু পালিত সাংবাদিক আছেন যারা সারাক্ষণ টকশো গরম করে রাখেনএটি জাতি দেখে ও জানে। তিনি বাকীদের ঘুষ খাওয়ার খোটা দেনতখন অনলাইন সংবাদ সংস্থা বিডিনিউজ২৪ ডটকম ও সাংবাদিক গোলাম মর্তুজা জবাবে জানান শেখ হাসিনার সূত্রগুলোর প্রকৃত কোন সন্ধান না পাওয়ায় তারা এসব এড়িয়ে গেছেন। তারপরও কিছু পত্রিকা এসব ভুয়া খবর ছাপিয়েছে সরকারী দাপটে। সরজমিনে এমনও দেখা গেছে ইকবাল সোবহান চৌধুরীর ভিডিওতে বক্তার উচ্চারিত কথার সাথে ঠোটের অমিল। তাকে বার বার সূত্রের ঠিকানা দিতে বললেও তিনি নীরব থাকেন। উল্টো আদালতের শরণাপন্ন হবার যুক্তি দেখান। তারা জানে আদালত তাদের মামলাও নেবে নানড়বেও না।

(৬) এসব প্রতিবেদনে তারেককে খুব শক্তভাবে আক্রমণ করা হয়। বলা হয় জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব তারেক রহমান প্রতিটি সরকারী ক্রয় ও নিয়োগে ঘুষ গ্রহণ করতেন। তারেক নিজেই ছিলেন বাংলাদেশের রাজনীতির অস্থিতিশীলতা ও দুর্নীতির যোগানদাতা। দুর্নীতিগ্রস্ত থাকার পরও তত্ত্বাবধায়ক সরকার তাকে মুক্তি দিয়েছে চিকিৎসা করার জন্য। তারেক রহমান বড় বড় ব্যবসায়ীদের হুমকি দিয়ে চাঁদা আদায় করতেনবিদেশী প্রতিষ্ঠান থেকেও তিনি কমিশন আদায় করতেন। এসব ছিল তার নিয়মিত ব্যবসাতারেক ও তার ভাই কোকোর ঘুষ গ্রহণের কথা এসেছে। বিদেশী কোম্পানিকে ডলারে আর দেশী কোম্পানিতে টাকাতে ঘুষ নিতেন। জিয়া অরফানেজ থেকে তিনি ৪১ লাখ ৫০ হাজার ডলার ঘুষ নিয়েছেন। এতে বাংলাদেশ আমেরিকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমেরিকার দৃষ্টিতে মুসলিম মডারেট হিসাবে দেশকে বিনষ্ট করেছে।

(৭) এসব বিনিয়োগের তথ্য কিভাবে সামনে আসলো তার যুক্তি হিসাবে বলা হয় ভারতের সাবেক আইপিএস কর্মকর্তা শান্তানু মুখার্জি তার ৬ ডিসেম্বর তারিখে প্রকাশিত প্রবন্ধে বলেনতারেক রহমান দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত লাখ লাখ ডলার বিভিন্ন দেশে বিনিয়োগ করেছেন। এর এক বড় অংশ বিনিয়োগ করা হয়েছে সৌদি আরব ও পশ্চিম এশিয়ার অন্যান্য দেশে। ভারতের নিরাপত্তা ধ্বংসে তিনি আন্ডারওয়ার্ল্ডের মাফিয়া চক্রে জড়িত থেকে ভারতকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টায় জড়িত। বিএনপি জামাতের সময় থেকেই এরা মৌলবাদ ও সন্ত্রাসকে লালন করে।

(৮) অল্প দামে কেনা সংবাদগুলি দালালদের সাজানো। এ ছাড়াও “খালেদার মানি লন্ডারিং নিয়ে বোমা ফাটালো আন্তর্জাতিক মিডিয়া” (৩০ নভেম্বর ২০১৭বাই অবজারভার বিডি ডট কম)/ আটক সৌদি শাহজাদাদের দুর্নীতির সঙ্গে খালেদা তারেকের নাম? (৩০ নভেম্বর ২০১৭জনকণ্ঠ)/ বিএনপি নেতাদের বিদেশে থাকা সম্পদের তদন্ত চলছে: সংসদে প্রধানমন্ত্রী” (১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭বাংলা ট্রিবিউন)। প্রণব মুখার্জিরা বাংলাদেশে জন্ম নিয়ে কিভাবে এ দেশের কলিজাতে কামড় দিয়ে ভারত

বন্দনা কাজে জড়িত থেকেছেনতা তার গ্রন্থে তিনি নিজেই স্পষ্ট করেছেন। আজ অক্টোবরের ১৪ তারিখে দেখি ভিপি নূরকে ধর্ষক বানাতে শেখ হাসিনার ঐ উপ সচিব আশরাফুল আলম খোকন লাইভে কমেন্ট করে তাকে ধর্ষক বানানোর প্রক্রিয়াতে জড়িত আছেন। যিনি খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মিথ্যায় শক্তদাগে জড়িত।

(৯) ভারত খুব সহজে বাংলাদেশের কিছু মুসলিম মোহাজিরকে তাদের দালাল বলে অপকর্ম করাতোএদের একজন ছিলেন এরশাদ। দালালীতে তাঁর সম্পৃক্ততার অনেক তথ্য প্রমাণ রয়েছে। আর প্রিয়া সাহার মত বেশ কিছু হিন্দুরা গোপনে বা প্রকাশ্যেই দেশবিধ্বংসী কাজ করে চলেছে। এর কারণ এদের দলে ভিড়ানো ভারতের জন্য বেশী সহজ। তারা অনেকে থাকে এ দেশে আর সম্পদ পাচার করে ভারতে। এরা প্রকৃতই নির্বোধসারা জীবন নিজের সাথে, দেশের সাথে প্রতারণা করে গেল। যে কোন মানুষই যারা এসব করছে তারা বিবেকের কাছে চিরস্থায়ী ইহ ও পরকালের আসামী।

লক্ষ্য করলে দেখা যায়, এই তথ্য প্রমাণগুলি সব সময় ভারত বন্দনা ও বাংলাদেশকে জঙ্গি দেশ হিসাবে তুলে ধরতে চেষ্টা চালাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য বিষয়ক উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী সম্পাদিত দ্য ডেইলি অবজারভারে ১ ডিসেম্বর ২০১৭ সালে আরব ভিত্তিক টিভি চ্যানেলের সূত্রে গ্লোবাল ইন্টেলিজেন্স নেটওয়ার্ক (জিআইএন) (এ নামে কোন গণমাধ্যম পাওয়া যায় নি) ও কানাডার টিভি চ্যানেল দ্য ন্যাশনাল এর কথা বলে (ওরকম সংবাদ মাধ্যমও পাওয়া যায়নি। কানাডার টিভি চ্যানেল পাওয়া গেলেও সেখানে খালেদা সংক্রান্ত কোন খবর পাওয়া যায়নি। আমরা জানি ২০০৪ সালের ২১ শে আগস্টের বোমা হামলায় তারেক রহমানকে প্রথমে যুক্ত না করলেও বহু পরে তাকে আসামী করা হয়। ঐ হামলাটিও ছিল হাসিনার মনগড়া সাজানো মানুষ নিধনের ভয়ংকর হত্যাযজ্ঞ। এর উপর প্রামাণ্য লেখাও (https://nazmamustafa.wordpress.com/2015/08/24/একুশে-আগষ্ট-২০০৪-সচেতনের/) আমার ব্লগে (Nazma Mustafa’s Blog) বর্তমান। ১৯৯৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর তারিখে দলবলসহ প্রথমে প্লেনে ও পরে ট্রেনে উত্তরবঙ্গে নির্বাচনী প্রচারণার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। পথে মদন নামে তার এক কর্মচারীর পরামর্শে পিস্তল দিয়ে কয়েক রাউন্ড গুলি করা হয় অন্য কামরাতে ঘুমে ঢলে পড়া সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে। হাস্যরসের মাধ্যমে হাসিনার নির্দেশে প্রচার করা হয় তাকে মারার চেষ্টা করা হচ্ছিল। এভাবে তিনি প্রায়শই বলতেন তাকে ১৯ বার মারার চেষ্টা করা হয়েছে। ঐ ঘটনায় পরদিন হরতাল ডাকা হয়। ঐ সময় এভাবে ১৭৩ দিন হরতাল হয় (আমার ফাঁসি চাইমতিউর রহমান রেন্টুর ৭৩,৭৪,৭৫ পৃ: দ্রষ্টব্য)।

আয়নাবাজিতে খুব দক্ষ অবৈধ পথে আসা এই সরকার। কথায় কথায় সম্মানিত লোকজনকে কটাক্ষ করা, মানুষকে আক্রমণ করে কথা বলা তাঁর স্টাইল। শুনেছি বিদ্যুতের স্লিপে নাকি লেখা থাকে “শেখ হাসিনার উদ্যোগ, ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ”প্রতিবছর প্রশ্ন ফাঁস যে সরকারের অর্জন তারা প্রচার করে “শিক্ষা নিয়ে গড়ব দেশশেখ হাসিনার বাংলাদেশ”। সাংবাদিকরা ধমক খায় নসিহত শুনে “আমি তো পত্রিকা পড়ে দেশ চালাই নাদেশকে ভালোবেসে দেশ চালাইবাবার কাছ থেকে শিখেছি।” অবাক হয়ে ভাবি শেখ মুজিব তার মেয়েকে এসব আয়নাবাজি কি সত্যিই শিখিয়ে গেছেন?

১৪ অক্টোবর ২০২০ সাল।

ডাকাতের কবলে দেশ

নাজমা মোস্তফা
এককালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বলা হতো বলে শুনেছি। এরপর স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে একে ডাকাতের গ্রাম বলতেও শুনেছি। এখন দেখছি গোটা দেশই ডাকাতের হাতে জিম্মি হয়ে আছে। ৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ এর রাতে বাংলাদেশ ব্যাংক ডাকাতি হয়। অসংখ্য অঘটনের পর এ কাজটি মাত্র এক ধাপ ডাকাতি। এ ধারার অসংখ্য ডাকাতির নমুনা দেশে চলমান আছে। এটি ঘটানো হয় সাইবার হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে ঠিক এমন সময়, যখন এর মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশ, আমেরিকা ও ফিলিপাইনে সরকারী ছুটি কার্যকর ছিল। যার জন্য হ্যাকাররা একটি বাড়তি সময় পায়। রিজার্ভ চুরির কথা অনেকেই অনেক কিছু জেনেছেন। সম্প্রতি মেজর দেলোয়ারের ইউটিউবে প্রকাশিত বক্তব্য থেকেও জাতি আবারো জানলো রাকেশ আস্থানা গুটি চালকে পাকাপোক্ত করার উত্তম হাতিয়ার ছিল । এটি অনেকেই জানতেন, তার আচরণে অনেক আপত্তিকর অবস্থান লক্ষ্য করা গেছে। তারপরও মেজর দেলোয়ারের বলাটা বাড়তি দলিল হয়ে রইলো। রাকেশ আস্থানা হাসিনাপুত্র জয়ের বন্ধু। কয় দিন পর পর জয় ফেইসবুকে এটা ওটা চমক লাগানো কথা লিখেন। ২০১৮ সালের ২৩ মে “The Diplomat” ম্যাগাজিনে একটি কলাম লিখেন যার শিরোনাম ছিল, “Bangladesh: ‘Disappeared’ Reappear All the Time”। এখানে তিনি বলতে চেয়েছেন বাংলাদেশে একটিও গুমের ঘটনা ঘটেনি। সব মিথ্যা, বানোয়াট, রূপকথা ও গালগল্প মাত্র। তার ভাষায় বিরোধীরা সব অপরাধী হওয়াতে তারা লুকিয়ে থাকে এবং সফল পুলিশরা তা খুঁজে বের করতে সমর্থ হয়। এই পুলিশ বাহিনী এতই দক্ষ যে জাতিসংঘ নাকি যার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। জয় তার মা অবৈধ প্রধানমন্ত্রীর মতই মুখর।

কিছু খবরের শিরোনাম : যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির মামলা খারিজ (২৩ 

মার্চ ২০১৯)। একে একে অবসরে যাচ্ছেন সন্দেহভাজনরা (৪ ফেব্রুয়ারি বণিকবার্তা)। দশটি কেলেঙ্কারিতে ২২,৫০২ কোটি টাকা লোপাট (৯ ডিসেম্বর ২০১৯)। বাংলাদেশ ব্যাংকের অদক্ষতা ও অবহেলাতে অর্থচুরি (১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯ প্রথম আলো)। শীর্ষ আট কর্মকর্তা দায়ী (১৪ জানুয়ারি ২০১৯ যুগান্তর)।Bangladesh Bank heist was state sponsored: US official (31 March 2018) এটি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় রিজার্ভ চুরি: এফবিআই ১০ মার্চ ২০১৮) নয়া দিগন্ত। রিজার্ভ চুরির হোতারা বাংলাদেশ ব্যাংকের ভিতরেই আছে (২৩ মার্চ ২০১৮) বিবিসি বাংলা। রিজার্ভ চুরির সাথে জড়িতরা চিহ্নিত (৮ নভেম্বর ২০১৭) যুগান্তর। রিজার্ভ চুরির হোতারা ভারতে (২৮ অক্টোবর ২০১৭) দৈনিক আমাদের সময়। রাকেশ আস্থানার উপস্থিতির রহস্য ভাংতে পারছে না সিআইডি (২৪ জুলাই ২০১৭) বণিক বার্তা। বিশেষজ্ঞদের অভিমত: ব্যাংকিং খাতে লুটপাটে সহযোগিতা করছেন অর্থমন্ত্রী (৪ জুন ২০১৭) সম্পাদক ডটকম। সবার শেষে একটি কলাম ছাপা হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির দায়ে ফিলিপিন্স ব্যাংক কর্মকর্তার কারাদণ্ড, বাংলাদেশে এই মামলার অগ্রগতি কতদূর? (১০ জানুয়ারি ২০১৯) বিবিসি বাংলা।

এর সুবাদে ডঃ ফরাস উদ্দিনের তদন্ত প্রতিবেদন বলে গভর্নর আতিউর রহমান গর্হিত কাজ করেছেন রিজার্ভ চুরির ঘটনাকে চেপে রেখে। চুরি হয় ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার। তদন্তে আট কর্মকর্তাকে অপকর্ম, গাফিলতি ও অবহেলার জন্য দায়ী করা হয়েছে বলে শোনা যায়। আমরা অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিতের বরাতে শুনেছি যে, এসব প্রকাশ করা হবে না। গণমাধ্যমে বিভিন্নভাবে তাদের নাম প্রকাশিত হলেও অপরাধীরা বহাল তবিয়তে কর্মরত আছেন, বরং অনেকের পদোন্নতি হয়েছে। ২০১৫ সালের আগস্ট-অক্টোবর থেকেই সুইফটটি অরক্ষিত করে রাখা হয়। সম্প্রতি তদন্ত প্রতিবেদনটির মূল অংশ যুগান্তরের হাতে

আসাতে কিছুটা জানা গেল। রিজার্ভ চুরিতে অন্তত দুইজন কর্মকর্তা সম্পর্কে গভীর সন্দেহ রয়েছে। ৭ ফেব্রুয়ারি ডেপুটি গভর্নর আবুল কাশেমকে জানানো হলে তিনি সরকারকে অবহিত করতে লিখিত দেন। তারপরও গভর্নর আতিউর রহমান এ নিয়ে কঠোর গোপনীয়তা রক্ষার নির্দেশ দেন। ঐ সময় আমরা গভর্নরের মুখে শুনেছি তিনি বলেছেন যে, প্রথমেই বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীকে জানালে তিনি এটি চেপে রাখতে বলেন। সুইফটের নিরাপত্তা বেষ্টনী সরিয়ে ফেলা হয় ২০১৫ থেকেই, আগেই বলেছি। গণমাধ্যমে পরবর্তীতে প্রকাশিত হয়, যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির মামলা খারিজ হয়ে যায়। নিউইয়র্কের ম্যানহাটন সাউদার্ন ডিসট্রিক্ট কোর্ট গত ২০ মার্চ বাংলাদেশ পর্যাপ্ত তথ্য প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি বিধায় এটি খারিজ করে।

২০১৬ সালের ৫ ও ৬ ফেব্রুয়ারি (শুক্র ও শনিবার) ছিল বাংলাদেশের সাপ্তাহিক ছুটি। ৬ ও ৭ ফেব্রুয়ারি নিউইয়র্কের সাপ্তাহিক ছুটি, আর ৬, ৭ ও ৮ ফেব্রুয়ারি ফিলিপাইনের সাপ্তাহিক ছুটি ও চীনা নববর্ষের সাপ্তাহিক ছুটি। ফরাস উদ্দিন কমিটির প্রতিবেদন কোন কারণে অকার্যকর থেকেছে। অনেকটাই বিডিআর বিদ্রোহের মত এই ঘটনারও তদন্ত রিপোর্ট গোপন রাখার প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। উল্লেখ্য গত দশ বছরে ব্যাংকিং খাতে ১০টি বড় কেলেঙ্কারির ঘটনায় ২২ হাজার ৫০২ কোটি টাকা গচ্চা দিতে হয়েছে। এসব ঘটেছে সরকারী ব্যাংক সমূহে। সোনালী ব্যাংকের হল-মার্ক দিয়ে শুরু হলেও জনতা ব্যাংকে বড় ধ্বস নামে। এভাবে বেসিক ব্যাংক, ফারমার্স ব্যাংকের অনিয়ম আর দুর্নীতির ঘটনা অনেক লাগাতার দুর্ভোগের সাথে জড়িয়ে থাকা বাংলাদেশ, উন্নয়নের জারিজুরি। প্রশ্ন হচ্ছে বিডিআর বিদ্রোহ নাম দিয়ে বিডিআর ধ্বংসের যে বিশাল ঘটনা সংগঠিত হয়েছে, তারপর আর এ সরকারকে বিশ্বাস করার কিছু নেই। একের পর এক দুর্ঘটনা এসব প্রশ্নকে বাড়তি যুক্তি হিসেবে সামনে নিয়ে

আসছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে গভর্নর আতিউর রহমানের গোপনীয়তা এবং বিষয়টিকে ধামাচাপা দেয়ার কসরত হিসাবে দেশবাসীকে না জানিয়ে ঐ সময়ই তার ভারত ভ্রমণ জাতিকে আরও স্তম্ভিত করেছে। সবচেয়ে আশ্চর্যের কথা হলো, এমন দুর্ভোগেও বাংলাদেশ ব্যাংক আভ্যন্তরীণ কোন তদন্ত কমিটি গঠন বা বিভাগীয় কোনো উদ্যোগ নেয়নি। ফিলিপিনের কিছু কর্মকর্তা বিশ্বাস করেন, যারা এ অপরাধের সূচনা করেছিল তারা বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভেতরের লোক। সিআইডি বলছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন অনেকেই শুধু গাফেল ছিলেন না, বরং ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থেকে সরাসরি অপরাধেও জড়িত। নাম প্রকাশ না করেও একজন কর্মকর্তা বলেন, উচ্চ পর্যায়ের অনেকেই জড়িত। এদের অপরাধ তদন্তেও ধরা পড়েছে, আসামী ধরা পড়লে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ফেঁসে যাবেন। দৈনিক আমাদের সময় বলেছে, চুরির মূল হোতারা ভারতে অবস্থান করছেন। বিশ্বস্ত সূত্রের বরাতে ব্রিটিশ ডেইলি মেইল অনলাইন এক প্রতিবেদনে তা প্রকাশ করেছে। এরা অর্থ হাতিয়ে নেয়ার জন্য এক বছরেরও বেশী সময় থেকে একাধিক ব্যক্তির পরিকল্পনাতে ছক করে তা বাস্তবায়ন করে (২৮ অক্টোবর ২০১৭)।

অনেকে প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিচার চায়। এ সরকারের কাছে কিসের বিচার? সে নিজেই অপরাধী। সচেতনদের ধারণা সরকার নিজেই মেজর সিনহাকে মেরেছে, সাগর-রুনিকে হত্যা করেছে, বিডিআর বিদ্রোহের নামে বিডিআরকে ধ্বংস করেছে। সরকার অবৈধ পথে এসেছে, উদ্দেশ্য গদি ধরে রাখা আর ঐসব কাজ সমাধা করা। খালেদা জিয়া একজন গৃহবধূ থেকে অসাধারণ অর্জন দিয়ে তার রাজনীতির ময়দানকে আলোয় আলোয় ভরিয়ে দিতে পেরেছেন বলেই হাসিনার মনের জ্বালা দ্বিগুণ থেকে বহুগুণ। সদিচ্ছা থাকলে মানবিকতার চাষ করলে এই মুজিব কন্যাও জনতার বুকে স্থায়ী আসন গাড়তে পারতেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য তার। মিথ্যায় মিথ্যায় তার রাজনীতির শুরু থেকে শেষ। অতীতে তিনি রাজনীতিতে কখনোই ছিলেন না। জাতি জানেন সব। তারপরও তিনি বলেন তিনি নাকি ইডেন কলেজেই ছাত্রলীগের নেত্রী ছিলেন। এসব যে মিথ্যাচার ছিল সেটিও মুক্তিযোদ্ধা রেন্টুর গ্রন্থে স্পষ্ট। আর যারা ময়দানে আছেন তারা কি সত্যটা জানেন না? নিজের ডাকাতি ঢাকতে সারাক্ষণ প্রতিপক্ষকে এতিমের টাকা চোর, এতিমের টাকা চোর বলে লাফালাফি করে নিজের ডাকাতদের উপঢৌকন ঘুষ দিয়ে সামলাবার আপ্রাণ চেষ্টা করেন। কিভাবে ভৌতিক দানবরা ইলিয়াস আলী, সালাউদ্দিন, চৌধুরী আলমদের মত শত শত রাজনৈতিক কর্মীকে গুম করে? অবৈধ প্রধানমন্ত্রীর বুদ্ধিলোপ পাবার এসব বুদ্ধি কিভাবে তার মগজে ঢুকলো? এটি ঠিক, অনেক দিন থেকে বাংলাদেশে রামরাজত্ব কায়েম রাখতে পেরেছেন মুজিবকন্যা হাসিনা। পারবেন কি আজীবন এটি টিকিয়ে রাখতে? তার বিবেক কেমন করে এত অধঃপাতে নামলো? আর বর্তমানে চরম ধ্বংসের শেষ অপেক্ষার সময় পার হচ্ছে। তার পরিচয় তিনি নিজে, হিংসার এক কুশপুত্তলিকা। তার প্রতিটি কথাই হিংসার বাণী ছড়ায়, এর জবাব তিনি নিজেই ব্যতিক্রমী উদাহরণ। অপকর্মকারিরা বার বার অপকর্ম করে। হয়তো এর কারণ এরা শিখে না সৎকর্ম কি? অবস্থার প্রেক্ষিতে ক্রুদ্ধ হাসিনার একমাত্র যুক্তি ঐ একটাই; জাতিকে কেন জিয়াউর রহমান একবার নয়, বরং বার বার উদ্ধার করতে ময়দানে! এ জাতির উদ্ধার হওয়া দেখতে তারা অভ্যস্ত নয়, তারা বিড়ম্বনা চায়। হাসিনার সহোদররা শেখ কামাল শেখ জামালরা অস্ত্র হাতে ময়দান গরম করে রাখতেন। ধারণা হয়, ওদের দাপট বহাল থাকলে এতদিনে দেশ অতল গহ্বরে নিপতিতই হতো। চরম হিংসুটে মানসিকতায় শেখ হাসিনার সব কাজের বড় কাজ দেশের সবচেয়ে প্রথম ও প্রধান যোগ্য পরিবারকে ডাকাত বানাতেই হবে। তার পরিবারের সদস্যরা বহির্বিশ্বে কারাগারের আসামী হয়ে সময় পার করছে। বাংলাদেশের মিডিয়া এসব সত্য প্রকাশের অধিকার হারিয়েছে। তারপরও ঐ প্রধানমন্ত্রীর টনক নড়ে না। এবারও ৪৮ বছরের সমান ব্যাংকঋণ এ বছরই নেবে সরকার (৬ মার্চ ২০২০) সূত্র: দেশ রূপান্তর। তারপরও কি জোটবদ্ধ ডাকাতদের হাত থেকে এ জাতির শেষ রক্ষা হবে? বাংলাদেশের ৯০% মুসলিমরা আল্লাহর উপর ভরসা হারাতে পারে না। তাই এসব ফেরাউনের অত্যাচারে যুগে যুগে দেশ-সমাজ পতিত হয়েছে, তারপরও মানুষ মাথা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে, মুক্তির স্বপ্ন দেখেছে। আজও তার ব্যতিক্রম হবে কেন? মানুষ বাঁচবার আশায় বুক বেধে আছে।

চেতনার বরপুত্ররা বীরধর্ষক

নাজমা মোস্তফা

পাকিস্তানী সৈন্যের হাতে যারা সম্ভ্রম হারিয়েছেন তাদের বলা হয়েছে বীরাঙ্গনা। বর্তমানের বীর ধর্ষকরা রাজনীতির সৃষ্ট দানব। এদের বিবেক যেমন মরে গেছে, লাজ লজ্জাও মরে গেছে, যাদের কোন হায়া লাজ বলে কিছু বাকী নেই, থাকলে অন্তত দানবদের নেত্রী পদত্যাগ করে জাতিকে মুক্তি দিতেন। এরা জাতিকে জিম্মী করে রেখেছে, এর ধারাবাহিকতা স্বাধীনতার শুরু থেকেই চলমান। ৭২-৭৫ বিধ্বস্ত দেশের বিধ্বস্ত দশা। জাসদের ৩০,০০০কে হত্যা করেছে আওয়ামী রক্ষীবাহিনী। আজকের চুরি ডাকাতী, গুম, গায়েবী মামলা, সর্বোপরি ধর্ষণ এসব হাসিনার লালিত প্রশ্রয়ে অর্জিত অপকর্মের ধারাবাহিকতা। যে কাজ অতীতে তার সোহদর ভাইরা ময়দানে করেছেন, মানুষ মুখ খুলার সাহস করে নাই, আজকের ব্যাংক ডাকাতীর শুরুটাও হাসিনার সহোদর জড়িত ছিলেন। ব্যংক লুট ছিল তাদের বড় অর্জন, মিডিয়াতেও ওটি আসে। ভোটচুরি, করোনাচুরি, তেলচুরি, ডাল চুরি, বালিশ চুরি, পর্দাচুরি, গোটা দেশ চুরি। তাই বলতে হয়, শেখ হাসিনা একা নয়,  তার বাবাও তার ভাইয়েরাও ঐ পথে হেটেছেন। বাবা চুরিতে না থাকলেও চোরদের প্রশ্রয় দিয়েছেন। যার বাস্তব খেসারতে ১৫ই আগষ্ট তারিখে তাদের হত্যাটি ছিল অনেকটাই তাদের অপকর্মের অর্জন, অনেকটা তাদের নিজের আত্মহত্যা। যার জন্য কপট বেদনায় বিবর্ণ জাতি কাঁদে নাই, কাঁদতে পারে নাই। আজ ঐ মুজিবের কন্যা ঐ এক আদর্শহীন পথেই হাটছেন। ব্যক্তির সামনে জাতির সামনে সমাজের সামনে আদর্শ থাকতে হয়, না হলে জাতি আগাতে পারে না। সে আদর্শ যদি ডাকাতকে ধরা হয় তবে সে জাতি পুরোটাই ডাকাত হতে বাধ্য। সবচেয়ে বড় কথা জাতি দেরীতে হলেও বুঝতে পারছে, সে আদর্শ নেতৃত্ব ঐ মুজিব পরিবারের মাঝে ছিল না কোনকালেই। এরা রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বের শিকার। এরা ক্ষমতা পেলেও ধরে রাখতে পারে নাই বরং লোভের বশবর্তী হয়ে সংকীর্ণতায় আকন্ঠ ডুবেছে।

১৯৯৮ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক জসিম উদ্দিন মানিক ধর্ষণের সেঞ্চুরী করে সমালোচনার ঝড় তুলেছিলেন। এরাই তারা যারা মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চের সভাপতি হয়। এটি তাদের বড় প্রমান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নামের নাটক এসব। । সিলেটসহ সারা দেশে এ রক্তক্ষরণে প্রতিটি হৃদয়ে চলছে রক্তক্ষরণ। সিলেট এমসি কলেজ এমন একটি জায়গা,  যে কারো মনে হতে পারে ওখানে একটু ঘুরে আসি। এমসি কলেজে থাকে ছাত্রলীগের সরকারী দানবেরা, তারা অপকর্মের ময়দান তরতাজা রেখেছে সেটি জানা ছিল না এলাকার ঐ নব দম্পতির। তারা মনে করেছিল তাদের চিরচেনা সোনার দেশের পাহাড়ী সৌন্দর্য্যে ঘেরা সিলেটের সবুজে একটু ঘুরে আসি। তারা অংক কষতে পারে নি যে এর মাঝে যে বিষধর সাপ লুকিয়ে ছিল ঐ সবুজের চত্বরে সরকারী প্রহরায় তারা দংশন করতে পারে। অনেকে শেখ মুজিবের সুনাম ধরা রাখার ব্যর্থ চেষ্টা করেন। কেন বললাম এ কথা, কারণ শেখ মুজিব নিজেও ছিলেন এমন এক নেতা তাকে নষ্ট নীতিহীন পথে হাটতে দেখা গেছে। যার খেসারতে তাকে প্রাণ খোয়াতে হয়। এর প্রমাণ হিসাবে ভুক্তভোগী সিনিয়র সাংবাদিক হাবিবুর রহমান হাবিব সাংবাদিক কনোক সারোয়ারের সাথে এ বিষয়টি স্পষ্ট করেন এক ইউটিউবে। যদি সুযোগ পান ওটি দেখবেন প্রতিটি বাংলাদেশের মানুষের এটি জানা দরকার। এ ছাড়া এসব সত্য অনেক লেখনীতেও স্পষ্ট হয়েছে। কোন সত্যকেই বেশী দিন চাপা দিয়ে রাখা যায় না। যদিও সেনাপ্রধাণের পদটি ছিল জিয়ার পাওনা কিন্তু কোন এক অজানা কারণে শেখ মুজিব তাকে না দিয়ে তার অধস্তন অযোগ্য শফিউল্লাহকে সেনাপ্রধান নিয়োগ দেন। এখানেই মুজিবের দ্বিচারিতার এক নজির ইতিহাসে দাগ হয়ে আছে।

১৯৭৫ সালে জিয়া উপসেনাপ্রধান ছিলেন, জিয়া সেনাপ্রধান থাকলে মুজিব হত্যা ঘটতো না। মুজিব তার লাগামছাড়া সন্তানদেরে বাগে রাখেন নাই। এদের অত্যাচারে মানুষ নিগৃহীত হয়েছে। তবে শেখ হাসিনা ভারত ফেরত এসে জিয়ার নামে মিথ্যাচারীতা প্রচারের উপর জোর দেন। তার ছাত্রনেতাদের নির্দেশ দেন সারাক্ষণ বলতে থাকবে ‘এই জিয়া সেই জিয়া নয়’। তখনকার সময় এসব নিয়ে ছাত্রদের মাঝেও চরম হাসাহাসি হয়। মুক্তিযোদ্ধা রেন্টুর গ্রন্থ (অবশ্য পাঠ্য সবার জন্য) এসব অনেক খুটিনাটি স্পষ্ট করেছে। একমাত্র জিয়াউর রহমান ঐ মুজিব হত্যার পরবর্তী শপথের অনুষ্ঠানে যোগদান করেন নাই বরং তার জনপ্রিয়তায় ক্ষমতা গ্রহণ তার উপর অর্পিত হয়েছে। শেখ হাসিনা বাংলাদেশে এসেই মিথ্যাচার শুরু করেন আর জিয়াকে মুজিবের খুনী বলে প্রচার চালাতে থাকেন, যেটি তিনি আজ অব্দি বহাল রেখেছেন। আর্মির চেইন অব কমান্ড বজায় থাকবে না এ বিষয় জেনেও শেখ মুজিব কপটতার আশ্রয় নিয়ে জিয়ার প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়ে তাকে সেনাপ্রধান না বানিয়ে কয়েক ধাপ পেছনের মানুষকে শফিউল্লাহকে সেনাপ্রধান বানান। ঐ সময় কর্ণেল শফিউল্লাহও নিজে এটি মেনে নিতে ইতস্তত করেন। এই জিয়া যে কি জিয়া সেটিও খুব কম মানুষ জানে। ১৯৬৫ সালে জিয়াউর রহমান ভারত পাকিস্তান যুদ্ধে যে সম্মান অর্জন করেন সেটিও ভারতের জন্য সুখকর ছিল না। পাঞ্জাবের খেমখারান সেক্টরে  সেখানেও জিয়াউর রহমান বাড়তি সম্মানের অধিকারী। তাই হাসিনার শত মিথ্যাচারকে মানুষ প্রকৃত সত্যের সাথে মিলাতে পারে না। যার খেসারতে সেনাপ্রধান শফিউল্লাহ ঐ জটিল অবস্থা মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হন। মিলিটারী উইকি থেকে একটি প্যারা “Ziaur Rahman himself won the distinguished and prestigious Hilal-e-Jurat (10) (Cresent of Courage), medal, Pakistan’s second highest military award, and his unit won 2 Sitara-e-Jurat (Star of Courage) medals, the third highest military award, and 9 Tamgha-e-Jurat (Medal of Courage) medals, fourth highest award from the army for their brave roles in the 1965 war with India. In 1966, Zia was appointed military instructor at the Pakistan Military Academy, later going on to attend the prestigious Command and Staff College in Quetta, Pakistan, where he completed a course in command and tactical warfare (https://military.wikia.org/wiki/Ziaur_Rahman).  যাদের জানার অভ্যাস কম, আর যারা মিথ্যা জানেন তাদের জন্য নিজের অস্তিত্ব রক্ষার্থে এসব জানা খুব জরুরী। ১৯৬৫ সালের ভারত পাকিস্তান যুদ্ধে জিয়ার অবদানকে খাটো করে দেখেছে মুজিব পরিবার বাবা থেকে কন্যা। শেখ হাসিনা মিথ্যাচার না করলে এসব কখনোই নাড়া হতো না। কারণ উভয়েই জাতির শ্রদ্ধার্ঘ।

২০১৬ সালে প্রকাশ্য দিনদুপুরে জনতার সামনে মহিলা কলেজের ছাত্রীকে চাপাতি দিয়ে কুপায় ছাত্রলীগের বদরুল। তার চিৎকারে জনতার তোপের মুখে পড়লেও বিধ্বস্ত দেহ নিয়ে মৃত্যুর সাথে লড়ে প্রাণে বাঁচেন এই খাদিজা। এদের কর্মকান্ড বলতে গেলে গোটা কলামই চেতনাবাজদের  দিয়ে ভরে যাবে। এরা খুব সাহসী সরকারের মতই অপকর্মে তোখড়, শত অপরাধ দেখেও যারা না দেখার ভান করে তারা ঐ নেত্রীর সব চুরির, অপকর্মের দায়ভার অবশ্যই নিজের কাঁধে বইবে। পুলিশ, রাষ্ট্রপতি, সাঙ্গোপাঙ্গো সবাইকে এ দায়ভার সমানভাবে বইতে হবে। তারা সৎ থাকলে সহজেই পদত্যাগ করতে পারতেন। তলারটাও খাবেন উপরেরটাও খাবেন আর দুইজাহানে ডুগডুগি বাজাবেন, তাতো হয় না। শেখ মুজিব পাকিস্তান আমলে ডেপুটি স্পিকার শাহেদ আলীকে চেয়ার ছুঁড়ে মারেন ১৯৫৮ সালে, যার খেসারতে তাকে মৃত্যু বরণ করতে হয়। অনেকে গর্ব করেন তার আত্মজীবনী নিয়ে, এ কথাটি স্পষ্ট করা হয়নি কেন তার আত্মজীবনীতে যদি সত্যই এটি তিনি রচনা করেন আর সত্যবাদী হন তবে এটি তার বলা উচিত ছিল। এতে বোঝা যায় এদের অবস্থান কিভাবে সত্য এড়িয়ে মিথ্যায় ভরা। একদিন শেখ মুজিব গোটা জাতির প্রাণের নেতা ছিলেন। বাংলাদেশে নির্দোষকে দোষী করার সংস্কৃতি হাসিনা তার অবৈধ গদি দখলের সাথে জায়েজ করে নিয়েছেন। ঠিক যেমন গায়েবী মামলাকে জায়েজ করেছেন। গুম খুনকে জায়েজ করেছেন।

সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্রী ধর্ষিত হন। ছাত্রীর বক্তব্যে প্রকাশ এক শক্ত সামর্থ শক্তিমান ক্ষমতাধর যুবক তার ধর্ষক, যাকে সে জীবনেও ভুলবে না। সেই শক্তিমান যুবককে বাঁচাতে কোন এক প্রতিবন্দীকে ধরে কারাগারে পুরিয়ে দিয়ে নাটক চলছে। আসামী রাস্তার এক টোকাই জীর্ণ শীর্ণ ব্যক্তি এক মানুষ নামধারী ফসিল নামের কঙ্কাল মজনু তাদের জালে ধরা পড়েছে। যখন বিচারের জন্য কারাগার থেকে আনা হচ্ছিল। সে হাতপা ছুঁড়ে মাটিতে গড়াগড়ি আর বিকট কান্নারত, ভিডিওতে দেখা যাচ্ছিল। মন্তব্য কলামে সরকারের এসব নাটকের উপর শত শত ধিক্কার পড়ে। একমাত্র আওয়ামী সরকারী দালাল ভিডিও ফুটেজে বলেন, তার আচরণ প্রমান করে সে আসামী। এরা রাজনীতির সাথে সাথে তাদের বিবেককেও বন্ধক রেখেছে। ভাবতে অবাক লাগে এরা মৃত্যুভয়ে মোটেও কাতর নয়, যদিও তারা অমর নয়। একটি প্রতিবন্দীকে এনে দাঁড় করিয়ে ঐ ছাত্রীকে অপমান করা হয় প্রথমত তাকে ধর্ষন করার রাজনৈতিক পরিবেশের জন্য, দ্বিতীয়ত  একজন নির্দোষকে অপরাধী করে তাকে অপদস্ত করা হয়, বাড়তি মনোকষ্ট দেয়া হয়। নিজের ডাকাতদের বাঁচাতে ছাত্রীটিকে এমন এক মেরুদন্ডহারা করা হয়, যে তার মুখের বুলিকে হাস্যকর করা হয়। প্রমান হয় ঐ মেয়ে প্রতিবন্দীরও অধম, সে প্রতিবাদ করলো কেমনে?  ছাত্রীও সম্ভবত বাকহারা জিম্মী দশাতে, কইতে নারি সইতে নারি অবস্থানে এ লজ্জা সারা জাতির শিক্ষার মুখে হাতুড়ীপিটে রাজনীতির কপট অবস্থানকে সবার সামনে তুলে ধরছে।

খবরে প্রকাশ এমসি কলেজের অধ্যক্ষ বলেন, সব কথা বলতে পারেন না, মুখে তালা দিয়ে রাখেন। ডেইলী ষ্টারের কাছে এক সাক্ষাৎকারে (২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০) অধ্যক্ষ সালেহ আহমদের সাথে কথা হয়। এই ছাত্রবাসই ২০১২ সালে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয় । তিনি বলেন বিচারের ভার তাদের নয়। তাদের সীমাবদ্ধতা আছে, সে হিসাবে তারা অসহায়। একজন কলেজের অধ্যক্ষকে পানিতে ফেলে দেয়া হয়েছিল, পত্রিকা মারফতে এসব জাতি জানে। আগুনে হল পুড়ে যাওয়ারও কোন বিচায় হয়নি। বরং তখন থেকেই এরা হলটি জবর দখল করে রেখেছে। যারা সম্পৃক্ত এদের একজন ছাড়া বাকীরা চার থেকে পাঁচ বছরের পুরোনো ছাত্র। এসব অপকর্মের তদন্তও প্রকাশিত হয় না এবং কোন পদক্ষেপও নেয়া হয় না। এসব প্রশ্নের কোন জবাবদিহিতা অধ্যক্ষের জানা নেই। অধ্যক্ষের মনেও একই প্রশ্ন, কেন এসবের কোন সুরাহা হয় না। যেখানে অধ্যক্ষের সাহসে কুলায় না, সেখানে দারোয়ান কোন ছার! অবৈধ শুধু সরকার নয়, গোটা প্রশাসনেই এই অবৈধ অস্তিত্বের নেতৃত্ব দিচ্ছে। এমসি কলেজ ১৮৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত অনেক পুরোনো কলেজ, ১৯২০ সালে নির্মিত ছাত্রাবাসে ২০১২ সালের ৮ জুলাই পুড়ে ছাত্রাবাস আওয়ামী ক্ষমতার দম্ভে। পরে নতুন নির্মিত ভবন ফের আওয়ামী লীগের দখলে, সারা দেশের মতই অবৈধ জবরদখলীসত্ত্ব। করোনার কারণে এটি বন্ধ থাকলেও ছাত্রলীগ নেতারা সেখানে আসন গেড়ে হোষ্টেল সুপারের বাংলো দখল করে থাকে। দলবল নিয়ে আড্ডা দেয়, ইয়াবা গেলে, নারীকেলী চলে।  হবিগঞ্জ, বালাগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, ধিরাই, জগন্নাথপুর, জকিগঞ্জের ছাত্ররা ধর্ষক। প্রথম আলোর (২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০) বরাতে জানা যায় ২০১২ সালে ৪২টি কক্ষ পুড়িয়ে দেয় এবং এরপর ২০১৪ সালের ১৪ অক্টোবর এটি উদ্বোধনের পর থেকেই ছাত্রলীগ এককভাবে এখানে কর্তৃত্ব করে আবাসিক ছাত্রদের সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করছে। যদিও এমসি কলেজে তাদের কোন কমিটি নেই। ২০১৭ সালের ১৩ জুলাই তাদের দুই দলে আধিপত্য বিস্তারে আবারো ছাত্রাবাস ভাংচুরের ঘটনা ঘটে। ঐ সময় ২৯ জুলাই তারিখে পুনরায় ছাত্রাবাস খোলা হয়। এর পর ৬ আগষ্ট পুনরায় ঐ ৭ নম্বর ব্লকের কয়েকটি কক্ষ ও নতুন ভবন দখলের তৎপরতার মুখে আবারো বন্ধ করে দেয়া হয়। সংক্ষেপে এরা সরকারের মতই অতিরোধ্য অপকর্মী। ছলে বলে কলে কৌশলে হলেও তাদের একক কর্তৃত্ব চাইই। এভাবে শাহজালালের পবিত্র ভূমি আজ দানবদের দখলে।

স্বামীর কাছ থেকে তারা মেয়েটিকে ধরে নিয়ে যায়। স্বামীর শত চিৎকারও দুর্বৃত্তদেরে ঠেকানো যায় নি। তাদের সাহস দিনে দিনে বেড়েই চলেছে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে তারা এসব কর্মকান্ডের এজেন্ডা নিয়ে বেড়ায়। তাদের ইচ্ছে হলে আগুন দিবে, ইচ্ছে হলে ধর্ষণ করবে। এ দেশে তাদের অবৈধ সরকারই সব সামাল দিবে, তা তারা জানে। এরা অপকর্ম করে বারে বারে পুরষ্কৃত হয় সরকার দ্বারা। যারা মানুষ পেটাবে, ধর্ষণ করবে তারাই তো সোনার ছেলে (মানিকদের) অবৈধ সরকারের বেশী দরকার, গদি রাখার ইঞ্জিনিয়ার তারা। এরাই সুবর্ণ চরের চার সন্তানের মাকে বিনা বিচারে ধর্ষণ করে। কারণ ঐ মেয়ে সরকারকে ভোট দেয় নি। যদিও তাদের গদিতে যেতে ভোট লাগে না, আগের রাতেই ভোট সারে। কিন্তু প্রতিপক্ষ অন্যরা কেন একটি ভোট পাবে সেটি তারা সইতে পারে না। শেখ মুজিব তার ছেলেদের বিচার করেন নাই, যেদিন তারা খুন গুম ধর্ষণ অপকর্ম করে ময়দান গরম করেছিল। তারা নাকি ছিল রাজপুত্র, সাত খুন মাপ। ঐ সময়ে ময়দানে থাকা আমরা এসব তখনও লোকমুখে শুনে অভ্যস্ত ছিলাম। রাজধানীতে সন্ধ্যের পর সাধারণত মানুষ রাস্তায় নামতো না। কেউ ব্রিফ কেইস হাতে চলাফেরা করতো না। দিনে দুপুরেও ভয়ে কাটাতো। ১৯৭৪এর দুর্ভিক্ষে মানুষে আর কুকুরে কামড়াকামড়ি করে খাবার খেয়েছে। এসব অবর্ণনীয় সমাজ চিত্র বর্ণনা করতেও কষ্ট হয়। শেখ মুজিব কেমন করে যেন আগাগোড়া বদলে গেলেন তার আগের সব ভাব মর্যাদাতে ভাটা পড়লো। কঙ্কালসার মানুষের দিকে নজর না দিয়ে তিনি তার যুবরাজদের সোনার মুকুট পরিয়ে বিয়ের বাহাদুরীতে ছেলেবৌদের রাজরানী বানাতে ব্যস্ত। আর বাকীরা বকুল ফুলের মালা দিয়ে বিয়ে করবে, স্লোগানে স্লোগানে বাকীদের জন্য সুবাক্য জমা ছিল। 

অনেকেই বলছেন ইসলামের আইন প্রয়োগ করা হোক। কুরআনের আইনে এদের ১০০ বেত্রাঘাত করার কথা। আর সেটি হবে প্রকাশ্য ময়দানে। দারোয়ানকে সাসপেন্ড করা ও শিক্ষককে সাময়িক অবসরে দেয়া খুব সহজ কিন্তু আসল ডাকাতের বিচার হয়নি বলেই দেশ এ পর্যায়ে এসেছে। কোনদিনই সঠিক ধর্মের প্রয়োগ হয়নি। হয়েছে ধর্মহীনতার চাষ, সত্য ইসলাম জানা না থাকলে তাহাজ্জুদের মিথ্যে ফাঁকিবাজি দিয়ে আর কতদিন চলে! বাংলাদেশের এসব অনাচারের বিচার শেখ মুজিব করেন নাই বলেই তাকেও মেজর ডালিমদের হাতে প্রাণ হারাতে হয়। এ কথাটি একবাক্যে দেশের সবাই বলে, আমরাও শুনে শুনে ধাতস্থ হয়েছি। সারা দেশে অস্থির রাজনীতি, বিশ^বিদ্যালয়কে বলা হতো ডাকাতের গ্রাম। আর সেখানে বর্তমানে যারা অপকর্ম করছে তাদের নামই লিষ্টের ধারাবাহিকতায় সবদিন শিখরে। এর কারণ নেতাদের অতি আহ্লাদে সোনার ছেলেরা নীতিহীনতার ফসল ফলাতো দাপটের সাথে। জাহাঙ্গীরনগর ভার্সিটির মানিক ধর্ষণের শত সেঞ্চুরী করে মিষ্টি বিলাতে লজ্জিত নয়, সে দেশের নেতৃত্বে যখন আওয়ামী লীগ। এটি কি ছিল শেখ মুজিবের আদর্শ বাস্তবায়ন?

যে বা যারা সরকারের পক্ষে চড়া গলাতে গলাবাজি করছে তারাও এর শরিক শক্তি। একদিন এ দেশের শতভাগ মানুষ ঐ দলকে সাপের্ট করেছিল এটি ধ্রুব সত্য কথা!  কিন্তু ক্রমে ক্রমে বিবেক সম্পন্নরা সেখান থেকে সটকে বেরিয়ে যায়। খালেদাকে কারাগারে রেখে হাসিনার ভোট গ্রহণ। সবাই এটি স্বীকার করছে যে শত শত কোটি কোটি মানুষের হক কেটে খেয়ে হাসিনা ধার্মিকতার ভান করে টিকে আছেন। যেখানে একটি মানুষকে অন্যায়ভাবে আঘাত করার অধিকার দেয় না যে ধর্মে, সেখানে কোটি কোটি জনতার হক নষ্ট করে তাহাজ্জুদধারী নামাজী হাসিনার বিবেকের কোন কষ্ট নেই। চলছে ধর্মের নামে মিথ্যা জারিজুরি। বাস্তবতা বর্জিত চাটুকার রাখাল ছেলে আতিয়ুর রহমানের হাতে দেশ আজ ফকিরের ঝুলা / বাংলাদেশে ধর্ষণের বিচার হয় না। হলে স্বাধীনতার শুরুতেই  শেখ কামালদের বিচার হতো। যা আজো মানুষ ভুলে নাই ঐ তাপে দীর্ঘশ^াস ফেলছে আর ভোক্তভোগীরা দেশছেড়ে বহির্বিশে^ দম ছাড়ছে। আকাশে বাতাসে এসব কথা ছড়িয়ে আছে। ঐ প্রতাপীদের বোনই ক্ষমতার দাপটে, মানুষ সত্য বলতে ভয় পায় না, শুধু আত্মরক্ষার্থে সামনে বলে না। সবার আমলনামা সবার গলাতে বাঁধা আছে। ওটি লুকাবার সাধ্য কারো নেই। মনে করতে হবে বাংলাদেশ ৯০% মুসলিমদের দেশ সেখানে এর কঠোর বিচার প্রয়োগ করতেই হবে। ধর্ম যার যার উৎসব সবার বলার কোন সুযোগ নেই।

শেষ কথা:  কুরআন আল্লাহর কালাম। একে এড়ানোর  সাধ্য কারো নেই। মুসলিমদের উপর নির্দেশ একে অনুসরণ করা ফরজ, অবশ্য করনীয় কাজ। মাত্র একটি আয়াত আনছি (সুরা নিসার ২৫আয়াত দ্রষ্টব্য) “ব্যভিচারিণী ও ব্যভিচারী তাদের দুজনের প্রত্যেককে একশ’বেত্রাঘাতে চাবুক মার। আর আল্লাহর বিধান পালনে তাদের প্রতি অনুকম্পা যেন তোমাদের পাকড়াও না করে। যদি তোমরা বিশ^াস করো। (তবে যদি কোন সতি সাধ্বী ধর্ষিতা হয় তবে শাস্তি পাবে ধর্ষণকারী, নিরপরাধীর উপর শাস্তি বর্তাবে না। আর মুমিনদের দল যেন তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে (যাতে দর্শকরাও এ ধরণের পাপাচারকে ভয় করে চলে । এটি কুরআনের নির্দেশ। তবে সেঞ্চুরী বাজদের অপরাধ ঐ মাপে শতগুণ বাড়বে এটি নিশ্চিত। তবে কমার কোন সুযোগ নেই। নীতির কথা হচ্ছে এসব মূল বাণী থেকে দূরে সরে থাকলে মানুষ চিরকালীন ধর্ষক হয়ে থাকবে, সত্যিকারের মানুষ হতে পারবে না। সে যদি মানুষই না হয় তবে তার নামাজ, তাহাজ্জুদ লোকদেখানো এবাদতের কোন মর্যাদা নেই। তাদের কুরআন মানতে হবে বুঝতে হবে পালন করতে হবে, এর কোন বিকল্প নেই। এদের এসব করতে নিষেধ করেছে কুরআন। মানুষকে প্রতারণা করতে কিছু প্রতারকরা ভিন্ন কথা বলে মানুষকে বিভ্রান্ত করে। এদের জন্য কঠোর হুশিয়ারী উচ্চারিত হয়েছে। কুরআন অনুমোদন ও নিষেধ দুটোই স্পষ্ট করে রেখেছে। এর ব্যত্যয় করা মানে আল্লাহকে অস্বীকার করা। এক শ্রেণী ধর্মকে প্রতারণার কৌশল হিসাবে নেয়। দিনে দিনে সরকারের এ প্রতারণার দেনা বেড়েই চলেছে। ভোটচুরি, সাগরচুরি, থেকে এখন হচ্ছে ইজ্জতচুরি। আর কিছু অবশিষ্ট নেই বাংলাদেশীদের, এটি তাদের সর্বশেষ লুন্ঠন। আল্লাহ তার রহমত দ্বারা বাংলাদেশের মানুষকে এ জাহেলিয়াতের পথ থেকে সঠিক পথে নিয়ে আসুক, এ কামনা করছি।  

২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০।

সিরাজ সিকদার থেকে সিনহা রাশেদ খান বলির পাঠা

নাজমা মোস্তফা

প্রায় ৪৯/৫০ বছর আগে যখন লাল ঘোড়া দাবড়িয়ে মানুষ হত্যা করার নামে ক্রস ফয়ারের শুরুটা সিরাজ সিকদার দিয়ে শুরু হলো অতপর রক্ষী বাহিনী ও হাজার হাজার লাশের গোপন কান্না কি প্রাকস্বাধীনতার ভালবাসার গান দিয়ে ঢাকা যাবে? প্রাক স্বাধীনতার সোরগোলে আমরাও ছিলাম। আজকে বিদগ্ধ জনরা তাদের মেকী ভালোবাসার কান্না দিয়ে কি এসব দগদগে ঘাঁ এর ক্ষত মেটাতে পারবেন? প্রশ্নটি বাংলাদেশের সচেতন মানব সম্প্রদায়ের কাছে আবেদন রেখে অনেক দিন পর কলামটি লিখছি। একের পর এক মারদাঙ্গা সারাদেশে লেগে আছে, কারণ সরকার অবৈধ, আচার সেখানে বৈধতা পায় না। প্রতিটি বিতর্কীত প্রশ্নবিদ্ধ মৃত্যুকে জায়েজ করতে চান হাসিনা তার বাপের পরিবারের মৃত্যু দিয়ে। বারে বারে আসামী ধরে ধরে বাপের বিচার করেও তার সাধ মেটে নি। তিনি কখনোই তার বাপের ভাইএর অপরাধ গুনেন না। ধরে নেন এরা মহাপুরুষ। তিনি কি জানেন তার ভাইদের ‘কামালনামা’ আজও ইন্টারেনেটে রাজত্ব করছে, দম ছাড়ছে পূর্ব থেকে পশ্চিম মাতিয়ে বেড়াচ্ছে। তার ভাইদের যুগে বাপের দুর্দন্ড প্রতাপ আছর করে গুণধর ভাই কামালের উপর, তার দাপটে নারীরা দুর্বলরা নীরিহরা নির্যাতীত হন। যার খেসারত আজ অবদি দেশে ঐসব প্রেতাত্মারা ঘুরছে দাপট দেখাচ্ছে, ময়দানের ঐসব অপকর্ম রাজভোগ হয়ে আছে। সেদিন যদি শেখ মুজিব তার দুর্বৃত্ত ছেলেদের কঠিন ভাবে রাশ ধরে টান দিতেন। সারা জাতি তাকে মাথায় তুলে রাখতো। বিশ^বিদ্যালয় পাড়া তখন থেকে তাদের কপট রাজত্বে থরথর করে কেঁপেছে। যার জন্য তাদের মৃত্যুতে দেশের মানুষ কাঁদে নাই। উল্টো খুশী হয়ে দম ছেড়েছে ‘ফেরাউন নিপাত গেল’। অপকর্মে নির্যাতনে আজকের মতই মানুষ ৫০ পূর্ব দেশের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে উঠে। আজও যদি ৭৫এর পালাবদল হয় একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে, এটি আওয়ামী দলবলসহ সবাই জানে। মুজিবকে হত্যা করা হবে এটি মানুষ স্বপ্নেও ভাবে নাই। কল্পনায়ও দেখে নাই। যে ঘটনা সচরাচর তেমন শোনা যায় না। খুবই সুক্ষ্মদর্শী ছাড়া এটি অনেকের প্রায় অজানা, এসব জটিল সত্যকে সাধারণের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছে। একটু মন দিয়ে শুনুন, অনেক তথ্য এটি স্পষ্ট করে, সেদিন মেজর ডালিমরা শেখ মুজিবকে হত্যার উদ্দেশ্যে যায়নি। তাদের উদ্দেশ্য ছিল তাকে বন্দী করে জবাবদিহিতার মুখোমুখি দাঁড় করানো। আপনারা বলবেন তাহলে মাজেদরা কেন বললেনা না। যারা দাপটিদের হাতে বন্দী সেখানে মৃত্যু মুখেও কি সত্য বলার সুযোগ ছিল? এসবই বিবেকের জমা। এখানে বিচারে তাই বলা যাবে, যা বলাতে চায় সরকার। কিন্তু সত্য হচ্ছে সেদিন শেখ মুজিব দর্পের উপর, আছর করা কামাল জামালরা চৌকশ অস্ত্র পরিদর্শণে দক্ষতায় ময়দান কাঁপানো অসংখ্য অঘটন ঘটন পটিয়সী ছিলেন। তাদের হাতের কাছেই ছিল অস্ত্রের ভান্ডার। যার বিরুদ্ধে তাদের পরিবার কোন প্রতিরোধ গড়ে নি। কেন তাদের পরিবার সন্তানদের এমন আশকারা দিল, তাদের হাতে অস্ত্র তুলে দেয়া হয় আর শেখ হাসিনা মাঝে মাঝে মিথ্যাচার করেন তার ভাইদের নামে। মিথ্যা কথা তাদের মুখে কখনোই আটকায় না। তারা ধরে নিয়েছে তারা দেশের জমিদারের সন্তান, তাই সবই তাদের কাছে ছেলের হাতের মোয়া। মুজিবের সন্তানেরাই প্রথমে ঐ দাপটের বন্যায় প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে গুলি ছোড়ে। যার প্রেক্ষিতে মেজর ডালিমরাও অস্ত্র হাতে নিজের মেজাজ সামাল দিতে অপারগ হয়। এসব তখন ধারেকাছের বেঁচে যাওয়া প্রত্যক্ষদর্শীদের কথা থেকেও স্পষ্ট হয়েছে। ঘাটেন, ঐ সত্য সবদিন ছিল আছে, শুরু থেকেই মানুষ এটি জেনেছে, যারা এর সন্ধান করেছে। “অতি বাড় বেড়ো না ঝড়ে পড়ে যাবে, অতি ছোট হয়ো না ছাগলে মোড়াবে”। যখন কামালরা অতি বাড় বাড়লো তখন ডালিমরা ভাবলো আমাদের কেন ছাগলে মোড়াবে। ঠিক তখনই তারা সিদ্ধান্ত নিল এদের একজনকেও ছাড় দেয়া হবে না। তাই শিশু রাসেলও হয় তাদের অস্ত্রবাজ ভাইদের অপকর্মের ধারাবাহিক শিকার। এটি জাতির প্রতিটি সদস্যের জানা দরকার। তাই বিদগ্ধ জনকে বলতে শুনেছি এদের হত্যা করা হয়নি, এরা আত্মহত্যা করেছে। কামালের জন্য মায়াকান্না আর রাসেলের জন্য কুম্ভিরাশ্রু ফেলার আগে তাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যকে সবার সামনে তুলে ধরা জরুরী। এসব মৃত্যুর দায় তাদের নিজেদের।

লক্ষ্য করার মত বিষয়, সিনহার মাকে স্বান্তনা কল করে শেখ হাসিনা তার নিজ পরিবারের হত্যাকে ত্বড়িতে নিয়ে আসতে ভুলেন না। সে হিসাবে তিনি ঐ হত্যা দিয়ে একে জায়েজ করার একটি অপচেষ্টা করেন। আমিও আপনার মত, বলার মানে এত কি সহজ? সিনহা কারো উপর অন্যায় খবরদারী করেছে বলে জানা যায় নাই। কারো উপর লাল ঘোড়া দাবড়ায় নাই। বরং জানা যাচ্ছে ঐ লাল ঘোড়ার দাবড়ানির জেরে তাকে প্রাণ হারাতে হয়েছে কি না সে শংকা সচেতন দেশবাসীরা করছে। গোটাদেশ আজ নন্দলাল প্রদীপদের দখলে। ঠিক যেভাবে মিরজাফর ছিল ময়দানের দৃশ্যতঃ নিমকহারাম। বাকী জগৎশেঠ, রায়দুর্লভ, উমিচাঁদি, রায়বল্লভরা পিছন থেকে তলানী ঝাঝরা করার মহরত চালালেও হাদা মিরজাফর ছিল পালের গোদা। বাকীদের সব অপকর্ম কাঁধে নিয়ে আজীবন গালির বোঝা কাঁধে নিয়ে তার পরিজন আজো অপরাধী হয়ে ঐ লজ্জায় বিবর্ণ জীবন কাটাচ্ছে। প্রদীপ কুমার দাসরা শত অপরাধেও ধরা পড়ে না, বরং বাড়তি পদক পায়। জানা যায় প্রদীপ বিএনপির যুগে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে ঘুপটি মেরে বসে ছিল, সুযোগের অপেক্ষায়। অতপর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে উনি চারাগাছ থেকে মহিরুহ হয়ে উঠেন উপযুক্ত পরিচর্যা পেয়ে। মুসলিম মেজরিটি দেশে হিন্দু হয়েও নিয়োগ পান বিএনপির যুগে। এটিও প্রমাণ করে হিন্দুরা কোন যুগেই অবহেলিত নন, তারা চাকরি পায়, যা ভারতের জন্য মুসলিমদের চাকরি স্বপ্ন। বরং সাম্প্রতিক আচরণগত বৈশিষ্ট্য বলে এরা বেশীরভাগ ভিন দেশের দালাল, সময় সুযোগ পেলে কলিজাতে কামড় বসায়। বাংলাদেশে মুসলিমরাও বসান, তবে সংখ্যালঘু বলে কোন সময়ই ভীত নন, বরং কামড়ে বর্তমান সময়ে তারা অতিরিক্ত সরব, অতিরিক্ত যামাই আদর ও পরিচর্যাপ্রাপ্ত এরা। গরীব সাধারণ জনতা যারা প্রত্যক্ষদর্শীরা সাক্ষ্য দিচ্ছেন, যা তারা দেখেছেন তাই বলেছেন। এর পর থেকে তারা হুমকি ধমকির শিকারও হচ্ছেন। প্রদীপরা হত্যার পরও যামাই আদর পায়, কারাগারেও তাদের জন্য থাকে ভিন ব্যবস্থা। বরং তার দালালগং কর্তৃক অসহায় জনতারা হুমকির শিকার হচ্ছে। মানুষ নিধনে দক্ষ এ প্রদীপ সেজদারত এক মুসল্লী / ইমাম হত্যা করেও মহান থাকে, পদোন্নতি পায়। এর বড় কারণ সেজদারত ব্যক্তি যদি বিএনপি বা জামায়াতের মানুষ হয় তবে সরকারের জন্যও খুশীর সংবাদ। তখনই সরকার বুঝে প্রদীপরা সরকারের উন্নয়নের স্বপক্ষে কাজ করছে। সহজভাবে বলা যায় ভারতের স্বপক্ষে কাজ করছে। ৩১ জুলাই কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভে ৩৬/৩৭ বছরের মেজর গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষীর ভাষ্যে বাহারছড়ার ওসি লিয়াকত হোসেন চারটি গুলি করে, তার সাথে কোন কথা না বলেই। লিয়াকত হোসেনের এটি প্রথম ক্রসফায়ার নয়, জানা যায় এটি ১৬৭তম। সাধু সজ্জনরাই এদের শিকার। মাদক নির্মূৃলের নামে এদের মাদক ধরিয়ে দিয়ে অপরাধী বানিয়ে ক্রস ফায়ার দেয়। সম্ভবত এটি শুধু প্রদীপের এজেন্ডা নয়, এটি অবৈধ পথে আসা সরকারের প্রতিটি অতীত এজেন্ডার সাথে খাপে খাপে মিলে।

প্রশিক্ষিত সুশিক্ষিত রাওয়া ক্লাবের সদস্য সিনহা নিজেও। এর পার্টনাররাই এখন তাকে বাঁচাতে নাটক করে বেড়াচ্ছে সারা দেশে। অন্য আসামীর মত তড়িঘড়ি প্রদীপকে রিমান্ড দেয়া হয় নাই। কারণ মানুষ এসব নিয়ে প্রতিবাদ মুখর হয়ে উঠে। ৯৬ সালে ঘুষ প্রদানের মাধ্যমে প্রদীপ চাকরি পায়। অতপর সুযোগমত ১৭টি পরিবারকে নির্যাতন করে ভারতে পাঠায়। স্মরণ করার বিষয় হচ্ছে সচরাচর এসব ঘটনা বাংলাদেশে যদিও কম হয়, তারপরও যদি হয় এসব অপরাধ হয় আওয়ামী সরকারের সময়ে এবং দোষ চাপানো হয় বিএনপি জামাতের উপর। এটি তাদের আর একটি অপকৌশল, সাম্প্রতিক সময়ের প্রিয়া সাহা তার এক উত্তম উদাহরণ। তিনি ডনাল্ড ট্রাম্পএর কাছে আবদার রেখেছেন মৌলবাদী মুসলিমরা তাদেরকে দেশে থাকতে দিচ্ছে না। এটিও মিডিয়াতে স্পষ্ট হয়েছে ইউটিউবের বদৌলতে যে তার এক ভাঙ্গা ছাপড়া ঘরে আগুন দিয়ে তিনি মুসলিমদের অপরাধী সাজান। যার প্রমাণ তার প্রতিবেশী হিন্দুরা বলেও দিয়েছে তার নিজের সাজানো আগুন কিভাবে নীরিহ মানুষ হয়রানির অপকৌশল মাত্র। সরকারও তড়িঘড়ি হাজিরা তহবিল নিয়ে সাধুতার ভানে লেগে যায়, মুসলিম নিধনে সোচ্চার আর তাদের সুরক্ষায় সচেষ্ট। শুরু হয় প্রতিপক্ষের প্রতি বিষোদগার, এর নাম বাংলাদেশ। খারাপ সবার জন্যই খারাপ, বোনের সম্পত্তি কেড়ে নেয়াতেও প্রদীপ ওস্তাদ, বৌ নির্যাতনেও দক্ষ,  এক পুলিশ তার স্ত্রীকে সহযোগিতা দিলে তাকে দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়। তার কথা, “— (?) অমুক এ্যামবেসির পেছনের দরজা বন্ধের দিনও তার জন্য খোলা থাকে”। জানা যায় তার সম্পত্তির পরিমাণ ৩,০০০ কোটি টাকা। অযোগ্যরা যখন দেশ চালায় তখন এসব ঘটনা, অযোগ্যতাই বড় যোগ্যতা। তার এতই শক্তি যা ইচ্ছে তাই করতে পারে। সে সিনিয়র লেভেল থেকে শত অপকর্মেও আশ^াস পায়। যে দেশের এ্যামবেসি তার জন্য খোলা থাকে, ধারণা হয় তার পাসপোর্ট থাকবে এটি বিশ^সযোগ্য কথা। পাঠক, চিন্তা করুন আর সত্যকে স্পষ্ট করুন।

(১) প্রধানমন্ত্রী এ যাবৎ অনেক হত্যাকান্ডেই আশ^াস দিয়েছেন, যদিও এসব কথার কথা। যে অপকর্ম ঘটায় তার আশ^াস কি কার্যকর হয়?
(২) সাগর রুণি, মেঘ/ ইলিয়াস আলী / চৌধুরী আলম / তনু/ আবরার/ সিনহা। একই ধারার বলির পাঠা, সরকারের আশ^াসভরা অপকর্ম ।
(৩) ইলিয়াস কোবরা আর এক অভিনেতাকে টেনে আনা হয়েছে। ইলিয়াস কোবরা, তার বাগানবাড়ি, ছয়বার এসএমএস, তারপরও সরকারই প্রশ্নবিদ্ধ?
(৪) বাংলাদেশ প্রতিদিন সরকার পন্থী একটি পত্রিকা ও তার প্রতিবেদন ঐ কোবরা নাটকের অবতারণ, প্রবল প্রতিবাদী কোবরা।
(৫) স্বপ্নের মেরিন ড্রাইভ যারা গড়তে অবদান রেখেছেন তারাও হচ্ছেন ওখানের লাশ। শেষ উদাহরণ রাশেদ খান সিনহা।
(৬) সর্বোচ্চ পদকসহ (২০১৯ সালে) ৬টি পদক লাভ করেন প্রদীপ কুমার। স্বপ্নের মেরিন ড্রাইভে ২০৪ লাশ।
(৭) লাশ হবার আগে ১০/১২ দিন রাখা হতো থানা হাজতে।
(৮) প্রদীপ গায়েবী হামলা, ও অগ্নিসংযোগের হুমকি দিতেন। প্রশাসন শুনেও না শোনার ভান করে থাকতো নীরব।
(৯) জনতার স্ত্রীদের অভিযোগ নির্দোষ স্বামীদের ঘর থেকে ধরে নিয়ে হত্যা করা হতো।
(১০) সেদিন মসজিদের মাইকে প্রচার করা হয় ডাকাত দল আসছে। সিনহাকে এভাবে ডাকাত সাজানো হয়।
(১১) প্রদীপ দশ বছরে ভয়ানক দানব, উন্নয়নের মহাসড়ক বাহারছড়ার পোস্টে নিয়োগ ।
(১২) নির্যাতীতদের মামলার আসামীদের সাথে চাঁদাবাজির ব্যবসা তার। থাকেন ধরা ছোঁয়ার বাইরে।
(১৩) রাষ্ট্রীয় মদদে এরা বিদেশ থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। এসব বাংলাদেশের উন্নয়নের রোজনামচা, দরিদ্র প্রদীপ আজ ধনাঢ্য কুমীর।
(১৪) ধুমপান না করা একজন সিনহা মৃত্যুর আগে মাদকসেবী ইয়াবাখোর হিসাবে প্রদীপের আসামী।
(১৫) প্রথমে ওরা অভিযোগ তোলে সিনহা অস্ত্র তাক করে তাদের গুলি করেন, পরে বলে ইয়াবা পাওয়া গেছে।
(১৬) একজন এসপি ফোনে দুর্বৃত্তকে শিখিয়ে দেন কিভাবে কি বলতে হবে। কম্পিউটারের সব তথ্য সরানো হলো, কেন?
(১৭) বাংলাদেশ প্রতিদিনের সাংবাদিকের নিউজ অল্প সময়ে বদলে যায় (১০ আগষ্ট ২০২০)। প্রথমটি বদলে অন্যটি।
(১৮) নাটকের পর নাটক সাজছে। শুরু হয়েছে সংবিধান থেকে ইসলাম মুছে দেবার নাটক।
(১৯) অপকর্ম ঢাকার এসব কৌশল নীতি, নতুন অপকর্ম এনে পুরোনোটা ঢেকে রাখা।

(২০) তাই সিনহাকে মুছার পরও তারচেয়ে বড় ‘ইসলাম’ আজ ময়দানে মুছার অপেক্ষায়।

(২১) সরকারের শক্তির তলানীতে এসব হচ্ছে না, বলার কি কোন ফুসরত আছে?

(২২) ৩১ জুলাই ২০২০ একজন বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধার সন্তান সিনহাকে হত্যা করা হয়। এর মাত্র চারদিন আগে ২৬ জুলাই তারিখে সিনহা তার বড়বোনকে গভীর কিছু সত্য প্রকাশ করেন। যা একমাত্র বাংলা নিউজ ৭১ ইউটিউব চ্যানেল প্রচার করেছে, অনেকেই এর মোড় ভিন্ন খাতে নিতে কোবরা, শিপ্রা, সিফাত, ইয়াবা, প্রচার করছেন। যে কঠিন সত্য বের হয়ে পড়েছে ঐ ইউটিউব চ্যানেলে সেটি শত ইলিয়াস কোবরার নাটক থেকেও মূল্যবান। সিনহার জন্মদিনে তিনি তার বড়বোনের কাছে প্রকাশ করেন, যা অতীতে তিনি কখনোই বলেন নাই। চাকরী থেকে অবসর নেয়ার যা খবর এতদিন থেকে প্রচারিত ছিল, ওটি ছিল মিথ্যা, তাকে সম্ভবত চাকরী থেকে অবসর নিতে বাধ্য করা হয়। এবং তিনি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স (এসএসএফ) এর দায়িত্বে নিয়োজিত একজন কর্মকর্তা। গত দেড় বছর থেকে তিনি এ ব্যাপারে মুখ খুলেন নি। এখন এসব রিপোর্ট গোয়েন্দাদের হাতে, তাদের ফোনকল লিস্ট থেকে এসব ঘটনা জানা গেছে। সেই সুবাদে তিনি এই মেধাবী মানুষটি অনেক খবর জানতেন বলেই ঐ জানাটাই তার মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে তিনি শংকা প্রকাশ করেন তার বোনের কাছে। এটি প্রকাশের পঞ্চম দিনেই তাকে হত্যা করা হয়। এ জন্যই প্রদীপকে সমানেই বলতে শোনা গেছে আমার কিছুই হবে না। কারণ সে সব ধরণের নিরাপত্তায় আশ^াস প্রাপ্ত। মূল আসামী প্রদীপ নয়, প্রদীপ হচ্ছে হুকুমের আসামী। মূল আসামীকে ধরে বাক্কারাহ সুরার ৪২ আয়াতটিকে প্রতিষ্ঠা করেন। এসব সত্য মদীনার সনদে সবদিন পালিত হয়েছে। বাংলা নিউজ একাত্তর যা ইতমধ্যে প্রকাশ করেছে, তার সঠিক মূল্যায়ন করেন।

(২৩) কম্পিউটারের সব তথ্য যারা সরিয়েছে একই উদ্দেশ্যে সাগর রুণি সাংবাদিকদের তথ্য সরিয়ে তাদের খুন করা হয় ঠিক সিরাজ সিকদারের মতই। ৪৮ ঘন্টার মুচলেকা দেয়া সরকার যা লুকাতে চেয়েছে, তাই আজ অবদি লুকিয়ে রেখেছে। বিডিআর হত্যা করে যে সব তদন্তকে চাপা দিয়ে রাখতে চেয়েছে, তাই আজ অবদি করতে পেরেছে। সর্বশেষ সিনহা মরার পর তারা বলছে আর ক্রসফায়ার হবে না। এটাই শেষ; তার মানে তারা স্বীকার করছে আগের সব মৃত্যু তারা তাদের মদদে ঘটিয়েছে। সিরাজ সিকদারের মৃত্যু থেকে শুরু থেকে শেষ সব দায় তারা তাদের কাঁধে বহন করে নিয়েছে বলাটা দোষের হবে না। সর্বপরি সিনহা মৃত্যুর চার দিন আগে প্রকট সত্যটি বলে গেছেন।

(২৪) অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করলেও তার ক্ষমতা দেখাতে, সাম্প্রতিক চুক্তিতে ভারতীয় পন্য বাংলাদেশের আগে অগ্রাধিকার পাবে সেটি গত দুই বছর আগেই করা হয়েছে, কিন্তু দেশবাসীর জানা ছিল না। মুজিবের কন্যা সব সময় বলতেন আমার উপর ভরসা রাখবেন। আমি দেশ বিরোধী কিছু করবো না। সবচেয়ে বড় কথা তিনি দেশের বিপক্ষে কাজ করেন। সব কাজই প্রতিবেশীর স্বার্থে দেশ বিক্রির পক্ষের উদাহরণ হয়ে থাকে। উল্টাপাল্টা বলতে বলা তাদের নীতির অংশ, যেন তারা সত্য কথা বলতেই ভুলে গেছে।

(২৫) সবশেষ নাটক কোবরা থেকে সরে এসে সংবিধান থেকে ইসলাম মুছে দেয়ার নাটক। সবাই সোচ্চার হোন, ৯৫% মুসলিম দেশে কেন মুজিবকে ছাড়িয়ে ইন্দিরা বন্দনার নীতি? সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষ কথাটি সরান। এটি ইন্দিরা গান্ধীর এজেন্ডা ছিল, মুজিবের নয়। মুজিবের ছয় দফাতে এসব বিন্দু বিসর্গও ছিল না। ভারত তার দেশে স্থাপনের আগে ১৯৭২ সালে এটি বাংলাদেশের সংবিধানে সংযোজন ঘটায়। পরে তাদের সংবিধানে সংযোজিত হয়, বাংলাদেশের পর। ভারত  সংখ্যালঘু মুসলিম নিধনে জগতসেরা। ধর্মনিরপেক্ষ তাদের শুধু সংবিধানে থাকলেও এটি পালিত করার দায় তাদের নেই। মুসলিম মরতে দেখলে তাদের প্রশাসন পুলিশ থাকে নীরব। মুসলিমরা তাদের ধর্ম পালন করবে কি, ধর্ম অনুমিত খাবারও খেতে পারে না। ৭১ পরবর্তী বাংলাদেশটি মুক্ত হোক এ পরাধীনতার নিগড় থেকে, এ কামনা প্রতিটি দেশপ্রেমিকের। প্রতিটি মিরজাফর উঁমিচাঁদ রায়বল্লভ, রায় দুর্লভ, ইয়ার লতিফ, ঘসেটি বেগমরা চায় দেশ ডুবুক, ধ্বংস হোক। দু’দলের দুটি গন্তব্য। একদল হবে আগুণের বাসিন্দা, অন্যদল ফুটন্ত ফুল বাগানের বাসিন্দা। তবে সততায় দাগ রেখে অটল থেকে কাজ করে যাওয়াই সততার নীতি। তাদের কর্মই তাদের স্থান নির্ধারণ করবে। সত্যের পথে যারা থাকে, তাদের হতাশার কিছু নেই। শত কষ্টের পরও তারাই হবে আ’লা, তারাই জগতসেরা।

২১ আগষ্ট ২০২০।

রেশমা ও সুমন নাটকের ভয়ংকর মিল

 

না জ মা মো স্ত ফা   ১৯ মে ২০১৩, ২১:৫৭ অপরাহ্ন (আমারদেশে ছাপা হয়েছিল)।

ভূমিকাটি (২০২০ সালের ১৯ জুন তারিখে লেখা): সাম্প্রতিক বাংলাদেশে সুমন নামের একজন পুরুষ লঞ্চ ডুবির পর বাংলাদেশে ১৩ দিন পানির নীচে বেঁচে ছিল। এসব ঘটনা কিভাবে বর্তমান সরকারের সহযোগিতা পায় সেটি জমা প্রশ্নের সংগ্রহে থাক। একবিংশ শতকের মাথা মোটা সরকার মানুষকে এভাবে গভীর রাতের ভোটকে গেলাতে চাচ্ছে। মানে এ দেশের সবকিছুই অলৌকিক, কাকতালীয় ভৌতিক। হয়তো বা দৈবের ইচ্ছার ফসল, জনগণকে সত্যের বদলে মিথ্যা গেলানোর এসব প্রানান্তকর প্রয়াস মাত্র। ধর্মের নামে অনেকে এসব গিলে। কিন্তু ইসলাম ধর্মে এসব অতিভৌতিকতা মিথ্যাচার যায় না। শুধু মাত্র যারা ধর্ম জানে না, তারাই এসব ধর্ম নাটক সাজায়, বানায় ও ছড়ায়। ভয়ংকর অবস্থা চলছে দেশটিতে। লাখ কেউ হিসাব করে না কোটিতে সব চলছে। দেশটিতে প্রধানমন্ত্রীর দফতরে প্রতিদিনের খরচ হচ্ছে ১০ কোটি ৫২ লাখ টাকা (অনেকের টকশো সূত্র)। যার যাকে ইচ্ছে গুম করতে পারে মেরে ফেলতে পারে, বিনা পরিশ্রমে। শক্তিমানদের থেকে সহযোগিতা পায়, মনে হয় যেন এটি নিশ্চিত। প্রশ্ন কার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলবেন। গোড়াতেই গলদ। গোড়াই এসব সাজাচ্ছে। কভিড ১৯এ যারা স্বাস্থ্যখাত নিয়ে বুলি কপচাচ্ছেন, সবই এক মিথ্যাকে অন্য মিথ্যা দিয়ে ঢেকে রাখার কসরত মাত্র। দুর্ভাগ্যের কথাটি হচ্ছে শেখ মুজিবের কন্যা যিনি এই অবৈধ রাতের অন্ধকারে ছলবাজি ভোটের সরকার। গুম,খুন, অবিচার অনাচারের সব পাঠই দেশে কদর পাচ্ছে। একবিংশ শতকে একটি দেশ আছে যেখানে মিথ্যারা চড়া গলাতে ১৬/১৭ কোটি মানুষকে (অবশ্যই এদের বিবেক আছে) ভেড়া বানিয়ে রেখেছে। আর তার দলবলরা এটিও প্রচার করে যে, ঐ মহিলাটিই ঐ দেশের একমাত্র পুরুষ। ভূমিকাটি না দিয়ে উপায় ছিল না। নীচের লেখাটি আজ থেকে ৭ বছর আগে ছাপা হয় “ইলিয়াস, সাগররুনিরা মৃত : সুখরঞ্জন ও রেশমারা কতটুকু নিরাপদ? ” । সরকারী প্রতারণার একই নজির।

সবার আগে বলছি ইলিয়াস আলীর কথা। তার অপরাধ দেশের জন্য মাথা উঁচু করেছিলেনটিপাই মুখের নামে একটি জাগরণ তৈরি করেছিলেন। দেরিতে হলেও তার পাওনা তিনি পাবেন আশা করি । নিউইয়র্ক থেকে আবু জাফর মাহমুদ সম্পাদকের লেখনীতে ২০১২ সালের ২৪ এপ্রিল এটি বিবৃত হয়েছে যে, তাকে ও তার ড্রাইভারকে পুড়িয়ে মারা হয়েছে ফরিদপুর গোয়ালন্দ ঘাটে। বিশাল বেশ্যা পল্লীর পেছনে নদীর দিকে নেমে যাওয়া ঢালুর ছাপরা ঘরে। ১৮ এপ্রিল ভোর সাড়ে চারটায় ঘাতকরা তাদের এ কাজ শেষ করে। পর পর বিদেশি দুটি প্রভাবশালী গোয়েন্দা সংস্থা এ তথ্য বিলি করার পর সরেজমিনে এটি নিশ্চিত করেছে অন্য অনুসন্ধানীরা। তাদের হত্যা করতে নাইট্রিক এসিড ব্যবহার করা হয়েছে। অভিজ্ঞ ঘাতকরা সোজা পৌঁছে যায় তাদের গন্তব্য ঘাটে। ঠাণ্ডা মাথায় খুন করে একজন তরতাজা উদ্দীপ্ত মানুষকে। কম সময়ে সেটি তারা সারতে পেরেছে তত্পরতার সঙ্গে। বাকি কিছু অপোড়া হাড়হাড্ডি ও কিছু দাগ-চিহ্ন ছুড়ে ফেলে দেয়া হয় পদ্মার মরা বুকে। ইলিয়াসের জন্য সিরিয়াস জাতি কিছুই করতে পারল না। একই ভাবে মারা যান হতভাগ্য ছেলে মেঘের মাবাবা সাগররুনী নামের মানিকজোড়। আর এদিকে একজন সম্পাদক দ্বিতীয়বারের মতো এক মাসের বেশি সময় ধরে ধুঁকে ধুঁকে কারাগারে বন্দিসবাই কি ওই অপেক্ষায় কাল কাটাচ্ছেন যেইলিয়াসের পরিণতিই হোক এক এক করে সমাজের সব সম্পাদকরাজনীতিক  সাংবাদিকের?
এমন না যে এসব কথার কথা। আন্তর্জাতিক হিউম্যান রাইটস ওয়াচের বিবরণেও তা ধরা পড়ছে। বাংলাদেশের মানবাধিকারের প্রসঙ্গে ‘অধিকার’ নামের এক সংস্থা বস্তুনিষ্ঠ কাজের ক্ষেত্রে বেশ কৃতিত্বের দাবি রাখে। ৬ মে রাতের কোরআন পোড়ানো ও সেখানে আগুন দেয়ার যে বিবরণ ভিডিও ফুটেজেও আমরা দেখেছি দাপুটেদের উল্লাস আর বর্বরতা, এক্ষেত্রেও সরকার আবার নাকি সুরে উদোর পিণ্ডি বুদোর ঘাড়ে চাপানোর তার সেই স্বভাবসিদ্ধ পুরনো খেলায় বড় গলায় মেতে আছে। গোটা দেশের বেশিরভাগ মিডিয়া যেন করে চলেছে জনগণের নয়, সরকারের গোলামি। এত অনাচারের ভার সইতে না পেরে তাই প্রত্যক্ষদর্শীরা নিজের একার কম শক্তি নিয়েও সজোরে প্রতিবাদ করছে। আলজাজিরার ফুটেজে দেখিএক বোবা আবদুল জলিল হাতপা ঘুরিয়ে গলায় জবাইয়ের ইঙ্গিত বারবার করে দেখাচ্ছেআর হেফাজতি সদস্যদের লাশ খোঁড়া জমিতে সদ্য পোঁতা বিশাল কবরগাহ দেখিয়ে দিচ্ছে। ধারণা ছিলবোবা তো কাউকে কিছু বলবে না।

তারপরও বোবা কথা যেটুকু বলেছেওতেই অনেক মৃত্যু রহস্য ঝরঝরে সুস্পষ্ট হয়ে গেছে। প্রতিটি মানুষ যদি চিন্তা করে এ ঝড় যদি তার নিজের ওপর দিয়ে যেত, তবে কেমন হতো? কেমন করে তারা সত্যকে গোপন করে যাচ্ছে; প্রকারান্তরে তারা বিধাতার বিরোধীপক্ষ, সব সুনীতির বিরোধিতা করছে।
সম্প্রতি একটি নামের মা অন্তে প্রথম রেশটি শেষ হয়েও শেষ হচ্ছে না, তার পুরো নাম রেশমা। তার কারণ হচ্ছে, সে বেশ প্রশ্নের পাহাড় তৈরি করতে পেরেছে। সবাই ধ্বংসযজ্ঞে মরছে, আর সে অমর হয়ে কাপড় পাল্টাচ্ছেম্যাচিং করছেকারণ সে (ধারণা হয়জানত যেতাকে উদ্ধারে আসবে স্যাররাইভাইরা সেদিন পাত্তাও পাবে না। রেশমার চাকরির মেয়াদ একমাসও হয়নিবিল্ডিং ধসের ১৭ দিন পর এক অবিস্মরণীয় উদগীরণ। তার আটকে পড়া ১৭ দিন ছিল মন্দের ভালোকাটছিল শুকনো চার পিস কখনও শুনি চার প্যাক বিস্কুট আর পানিতেকখনও শুনি শুকনো খাবারে। ম্যাচিং সালোয়ারকামিজ যে করেই হোক কংক্রিটের চাপা থেকেও উদ্ধারে সে সক্ষম হয়েছে। কেউ বলছে হেঁটে হেঁটে ড্রেস খুঁজে নিয়ে শুয়ে শুয়ে বড় কষ্ট করে পরেছে। তার মনোবল তারপরও মোটেও ভেঙে পড়েনি। সে ছিল ঝরঝরে ছিমছাম। কোনো অধামাস পার করা দুর্ভিক্ষের ছাপ পড়েনি তার অলৌকিক অ্যাডভেঞ্চারের ওই দেয়ালচাপা শরীরে। বারবার তাকে প্রসঙ্গ পাল্টে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য দিতে দেখা যায়। কখনও দালানে কখনও মসজিদতাতেই বাঁচে তার প্রাণ। গত শতকে রওশন এরশাদের সন্তান জন্মদানকালে বেশ চটকদার গল্পকথা শুনেছিলাম। ছিলাম ঢাকায়। মহিলারা বলেন, ‘বাবারে, রাজকীয় লোকের সন্তান মনে হয় লুকানোই থাকে। এই তো সেদিন দেখলাম কতই না বাহারি সাজে মহিলাকে মিডিয়াতে, স্কিনটাইট বডি, আজ আবার এ কী কথা শুনি মন্থরার মুখে! রেশমা তুমি কি ভাগ্যবতী না হতভাগী, জানি না। হয়তো নিকট ভবিষ্যতে তোমাকে খুন করা হবে, নয়তো বিদেশে পাড়ি দেবে তুমি, নয়তো বর্ডারে ধরা খাবে। আশা করি, এটি আগাম ধারণা করাতে দোষ হওয়ার কথা নয়।

রেশমাকে খোদ প্রধানমন্ত্রী তার গায়ের চাদর খুলে দেন। দেখা যায় রাতের চাদরে ঢাকা অন্ধকারে মানুষ মারলেও কিছু দয়ামায়া যে এখনও অবশিষ্ট আছে, তার প্রমাণ মনে হয় এসব। তবে সবার জন্য এটি নয়, শুধু সেভাবে লৌকিকতার সীমানা এড়িয়ে আসতে পারলে ওই রেশমার মতো একজনের জন্য শুধু। কীভাবে কী হলো বলতে অপারগ রেশমা। জানানো হচ্ছে গল্পের রেসের মা জ্ঞান হারিয়ে ছিল। এক লেখাতে পাই ১৭ দিন পর এক ইট কংক্রিটের ভেতর থেকে এক পোশাককন্যার আবির্ভাব। মাত্র ক’দিন আগে কাজে যোগদান করে, তার কাছে ছিল শুকনো খাবার (১৭ দিনের?) কেউ বলছেনমসজিদে পাওয়া গেছেকেউ বলছেন দোতলায়। কথায় হরেক রকম রকমের ভার্সন পাওয়া গেছে। উদ্ধার পাওয়া রেশমা বাংলানিউজকে বলে ১৭ দিন পানি খেয়ে বেঁচেছে। নিচতলায় আটকালেও পরে নামাজ ঘরে চলে যায়। উপর থেকে উদ্ধারকর্মীদের পাঠানো বোতল দুটি কোনোভাবে সংগ্রহ করে। সেই থেকে প্রতিদিন অল্প অল্প পানে জীবন বাঁচে। দ্বিতীয় ভার্সন—এভাবে চলে ১৫ দিন আর বাকি থাকে মাত্র দু’দিন উপবাসে। তৃতীয় ভার্সন—মেয়েটির বরাতে মেজর মোয়াজ্জেম সাংবাদিকদের বলেন, ধসে পড়ার দিনও সে কোনো খাবার নিতে পারেনি। কেবল হাত ব্যাগে ছোট্ট চার প্যাক বিস্কুট ছিল। সেগুলোই অল্প অল্প করে খেয়েছে। উদ্ধারের পর অবাক-বিস্ময়ের শেষ ধাপে পৌঁছেন অনেকেই। কোনো ছাপই নেই তার পোশাকে অবয়বেজামাকাপড় অক্ষত।  কোনো ভৌতিক ব্যাপার নয় তো? ওহ! জানা গেল উদ্ধারকর্মীর বরাতে, অনেক শুকনো খাবার পড়ে ছিল যে, তা-ও সে খেতে পারেনি। চতুর্থ ভার্সন সবশেষে সাংবাদিকের ভাষ্যে রেশমা ২ বোতল পানিতে ও ৪ পিস বিস্কুটে এসে ঠেকেছে। মায়াবিণীর একদম শেষের এক কথাজাস্ট একটু পানি খাইছিআর কিছু খাইনি দিয়ে কেটেছে ১৭ দিন। এ জটিল উদ্ভাবন কেমনে হলো? মনোয়ার নামের এক কিশোরের নজরে পড়ে প্রথম, ১৭ দিন পানি পান করা রেশমার পাইপ নাড়াচাড়া। সে বলেছিল ‘ভাই আমারে বাঁচান।’ শেষে কর্তাদের দেখে সে বলে, ‘স্যার, আমাকে বাঁচান।’ স্যারটি হচ্ছেন ওয়ারেন্ট অফিসার আবদুর রাজ্জাক। অনেকের মনে প্রশ্ন জাগলেও মেজর মোয়াজ্জেমরা প্রশ্নহীন। অনেকের জেগে ওঠা প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, ভেতরে ধুলোবালি ছিল নাতাই কাপড়চোপড় পরিষ্কার। বাংলাদেশের ধুলো দেশবাসী কমবেশি নিশ্চয় জানেন। সাধারণ কয়তলা উপরে সাজানোগোছানো ঘরেও থাকে ধুলোর আস্তরণ থরেবিথরে। এক ঝাড়ে যায় না। তাকে পরিষ্কার করতে হলে রেশমাসুদ্ধ দশ ঝাড় দিতে হবে।
পরে আরও ভিন্ন ভার্সনের সন্ধান পাওয়া যায়। তা আরও ভয়ানক। একটি হচ্ছে অন্য মৃতদেহ থেকে কাপড় খুলে পরেছে রেশমা। কী ভয়ানক তার ১৭ দিনে না খাওয়া শরীরে এত ক্ষমতাধৈর্যসাহস বা মৃতের কাপড় খুলে পরার গল্পের প্লট কে জোগাল  —বিধাতা না সরকার? তারপর বলা হলো রানা প্লাজার দোকানের তাক থেকে কাপড় এনে অদলবদল করে পরেছে রেশমা !বেশ মাবেশ মা, তাহলে বেশ ভালোই ছিলে মা! মনে পড়ে আমার ছোটবেলায় এক ছোট বোন বড় আপামণির বিয়েতে আপুর কান্না দেখে বলেছিল, আপু কেন এত কাঁদছে? আমাকে এত কাপড়-গয়না দিলে আমি একরত্তিও কাঁদব না। রেশমার এ অবস্থায় কী বলা উচিত, বুদ্ধিতে আসছে না। তবে সে দেখি বলছে আর কখনও গার্মেন্টসে কাজ করবে না। এসব সত্যি হলে সে কাজ আর করল কোথায়করল মঞ্চ নাটক। হাঁটা-চলার কোনো সুযোগ ছিল না। সে ১৭ দিন শুয়ে ছিল ৩-৪ ফুট দেয়ালচাপার গভীর অন্ধকারে। তাহলে সে কেমন করে মসজিদে গেল আর দোকান খুঁজে পেল? তার জামা কাপড় ছিঁড়ে যায়, পরনে কোনো কাপড় ছিল না। উদ্ধারের দিন টর্চলাইট দিয়ে কাপড় খুঁজে এনে পরে তারপর উদ্ধার হয়। নাটক বেশ জমেছে মনে হচ্ছে। সে এ চিন্তাও করেছে কেমন করে বের হবে। সে তো মেয়ে, ছেলে নয়! নাটকের ডায়ালগ একদম তুঙ্গে। এক রসিকজনা কর্নেল আরশাদের বরাতে বলেনসে কাপড়ের মার্কেটে গিয়ে পড়েআর সেখান থেকে শুয়ে শুয়ে পরে নেয় পছন্দের কাপড়টি। সে নিশ্চয় পছন্দ করেই নেয়বরং সঙ্গে মাবোনদের জন্য আরও টি নিতে পারত। ১৭ দিনের আধমরার এ ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতা একদম নতুন; তাই কেমন করে কী বলতে হবে, কোনটা খাপে খাপে মিলবে, তা তার জানা ছিল না। তাই অনেকের কাছে কিছু বেখাপ্পা ঠেকছে। চার পিস বিস্কুট বা শুধু পানিতে বা দুই বোতল পানিতে এত ঝরঝরে থাকা যে কেউ টেস্ট করে নিতে পারেন আর সাত্ত্বিক মুসলিমরা এ পরীক্ষা দেন প্রতি বছরে একবার। একদিন ক’ঘণ্টার না খাওয়াতেই অনেকে খেই হারিয়ে ফেলেন, আর সে তো আধা রমজানেরও বেশি কাটিয়ে দিল সাহরিইফতারবিহীনরাতের খাবারও অনুপস্থিত। তারপরও সতেজ থাকারেশমার ঈমানদারির সঙ্গে পৃথিবীর কোনো মানুষের এঁটে উঠবার কথা নয়। অলৌকিক ঈমানদারি ফুটে উঠেছে তার বিরল এ ক্যারিশম্যাটিক শরীরে।

তার কাটা চুল নাকি সে ইট দিয়ে কেটেছে। তারপরও নাদানরা কত কিছু লক্ষ করেছে! কেউ বলছে নখও একদানা লম্বা হলো না কেমনেদাঁতও হলুদ হলো নাঝকঝকে পরিষ্কার; একই অঙ্গে এত রূপ কেমনে আটকায়? সে মাঝে মঝেহেসেছে, মনের কাছে না হেসে তার উপায়ও নেইসবাইকে এমন বোকা বানাতে মে মাসই ধরা খেলএপ্রিলে নয়। বাংলাদেশীরা এবার মে মাসের বোকা সাজল। তার সামনে অনেক মানুষ মারাও গেল, উদ্ধারও হলো, কিন্তু সে কেন ওই সময় আওয়াজ করল না? এর কোনো উত্তর তার জানা ছিল না। ফ্যাল ফ্যাল করে চাওয়া ছাড়া অন্য জবাব ছিলমরা’ । ১৭ দিন গত হলে পর তার আওয়াজ নিঃশেষ না হয়ে বরং সেদিনের বলিষ্ঠ আওয়াজই পৌঁছে জনতার কানে। তা-ও সাধারণ আনোয়ার-মনোয়ার নয়, একদম মেজর মোয়াজ্জেম বা হর্তাকর্তারা সেখানে কী পাহারা দিচ্ছিলেন, ইট-পাথর নাকি রড-ধুলো? জীবন্ত মানুষ তো থাকার কথাও নয়, তখন কার্যত বেশি শ্রমিকেরই থাকার কথা। এ ধরনের শত বিষয় প্রশ্নবোধক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

পৃথিবীতে মিথ্যাকে সত্য বানানোর মতো কঠিন কাজ আর দুটি নেইবরং এক্ষেত্রে সত্যকে উদ্ঘাটন করা খুব সহজ কাজ। বাস্তবিকই সে হিসেবে বর্তমান সরকার অনেক কঠিন কাজ করছে। বিডিআরসাগর রুনীইলিয়াস আলীসুখরঞ্জন, ধরনের হরেক সত্যকে মিথ্যা করে সাজানোতে যে মেধা পরিশ্রম সরকারকে ব্যয় করতে হচ্ছেতার তুলনা নেই। এটি প্রায় অসম্ভব কাজ সরকার করছে। সোনার পাথরবাটি আর কী!

রেশমার চোখে কোনো মলীনতা কারও চোখে ধরা পড়েনি। সেটি সবাই দেখেছেছবিতে ভিডিওতে সেটি খুবই সুস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। এটি লুকানোর সাধ্য নেই। বোঝা যাচ্ছে, মরুর লু হাওয়া বা ধসের তাণ্ডব তার ওপর দিয়ে মোটেও যায়নি, বরং বলা চলে বয়ে গেছে বেহেশতের হিমেল হাওয়া। এপ্রিল-মে’র গরমে তার সিদ্ধ হয়ে যাওয়ার কথা।মেজর জেনারেল সারোয়ার্দী সংক্ষিপ্ত সংবাদ সম্মেলনে বলছেন, তার সঙ্গের তিন পোশাক শ্রমিককে আগেই উদ্ধার করা হয়—যারা ছিল মৃত। তা হলে সে কেমন করে জীবিত থেকেও উদ্ধার হতে এত সময় নিল? কোথায় ছিল সেরানা প্লাজার দোকানে ড্রেস খুঁজতেনা অন্য কোথাও! এত তেজস্বী শক্তিধর, এত বড় ধসও তার সামনে কিছুই নয়, রেশমা কিন্তু কোথায় কাজ করত তা বলতে পারে না—আটকে যায়। স্মৃতি তার বিলুপ্ত নয় মোটেও। বাকি সবই মনে আছে—প্রধানমন্ত্রী হেলিকপ্টারে যান তাকে দেখতেশুনেছি কে জানি বললসে নাকি দেখতে চেয়েছে প্রধানমন্ত্রীকে! প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার কী সম্পর্ক ছিল, জানি না; সহজভাবে সব অঙ্ক মিললে কোনো কথা ছিল না। কিন্তু অঙ্ক গোঁজামেলে হওয়ায় সবকিছুই যেন ঝাপসা লাগছে। অলৌকিক রেশমা শুধু একটি কথা বলছে, আল্লাহর ইচ্ছায়। উদ্ধার কাজে থাকেন জেনারেল সরোয়ার্দী। কী অসাধারণ এ অভিযান, যেন ১৯৬৯ সালের চন্দ্রাভিযানকেও হার মানাবে! জানলাম, তার অলৌকিক অভিযানের সম্মানে আবার নারায়ে তাকবিরও দেয়া হয়।কিন্তু বিধাতা মানুষের জন্য এসব টিটকারির জবাবে কিছু কথা বলে রেখেছেন। মেজর জেনারেল হর্তাকর্তারা এটি স্মরণ রাখবেন। সে সময় মিডিয়ার কেউ ছিল না। সেনা অফিসার রাজ্জাক বলেন, তিনি মিডিয়ার লোকেদের ভবনের উপরে নিয়ে যান আর এ ফাঁকে অলৌকিক অভূতপূর্ব এ কাণ্ড ঘটে যায়।সে ১৭ দিন পানি খেয়ে বেঁচে ছিল, আর পাশের লোকরা পানি না পেয়ে অনেক আগেই মরেছে এবং উদ্ধারও হয়েছে। সবই বিবেককে আহত করছে।

সবাই তার জন্য অতিমাত্রায় কাতর ও ব্যস্ত, কিন্তু সে হিসাবে রেশমা মোটেও ব্যস্ত বা ক্লান্ত নয়। একটি ছবিতে দেখি, সে তার নিজ হাত দিয়েই কিছু চেপে ধরেছে নাকের কাছটায়। বলা চলে, সে অনুপাতে সে বেশ উত্ফুল্ল, ছিমছাম, হৃষ্টপুষ্ট। বেশ নাদুসনুদুস রেশমা, হাঁটাচলাতেও ভালো অভ্যস্ত, ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন দূরে ঠেলে রাখলে। কেউবা বলছে একমাত্র গাঁজাখোর এ গল্প বিশ্বাস করবে আগে-পরে, আর বিবেকবানরা প্রথমে সহজ অঙ্ক হিসেবে ধরে নিলেও পরে হোঁচটে আটকাবেন। গোলক ধাঁধা নামের চক্করে দেখবেন ‘মাথা যে ঘোরে!’ মিডিয়ার সামনে আসতে প্রস্তুতির রেশ ধরে রেশমার বেশ সময় লাগে। সাংবাদিকদের দেয়া হয় নানা বিধিনিষেধ। অর্ধশত উপস্থিত হলেও প্রশ্ন করার সুযোগ পান অতি ভাগ্যবান তিনজন সিলেক্টেড সাংবাদিক। ১টা থেকে ৫টা পর্যন্ত অপেক্ষার পর তারা তার সুযোগ পান। হাঁটতে বসতে জাতি লাথিগুঁতো খেলেও রেশমার মর্যাদা কোথায় পৌঁছেছে বুঝতে কারও অসুবিধা হবে না! মেজররা একপায়ে দাঁড়া। মেজর মোতৌহিদউজজামান কে কী প্রশ্ন করবেনতার তালিকা তৈরি করেন। মেজর জামান বারবার সতর্ক করে দেন যেএকটির বেশি প্রশ্ন করা যাবে না। সাংবাদিকেদের মনেও প্রশ্ন, এত লাশের সারিতে এ মেয়েকে নিয়ে কেন এত বাড়াবাড়ি? আড়ালেআবডালে সরিয়ে রাখার একটি প্রয়াস লক্ষ করা যাচ্ছে। কত ছেঁড়াল্যাংড়ালুলা পড়ে রইল সারাদেশেআর  সুস্থ মেয়ে দিব্যি বিস্কুটপানি খেয়ে আছেতার জন্য এত আদিখ্যেতা করার কী অর্থ থাকতে পারে? মেজর তৌহিদ-উজ-জামান অনেক প্রশ্নের জবাবে বলেছেনও, এসব কিছু প্রশ্নের উত্তর সংবাদ সম্মেলনে দেয়া সম্ভব নয়। এটি ছিল বিপাকে পড়া জামান সাহেবের জবাব। এটি তিনি আলাদাভাবে সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকদের জানাবেন, এটি জানে শুধু আইএসপিআর। প্রেস ব্রিফিংয়ের সময় রেশমার মা-বাবা বা অন্য কাউকে দেখা যায়নি। তার আচরণে কখনোই তাকে কাতর বা ভীত মনে হয়নি। কিন্তু সেনা কর্মকর্তা ও চিকিত্সকরা বলছেন ভিন্ন কথা। তার আচরণকে সামাল দিতে পেছন থেকে নার্স আইরিনকে তার ঘাড়ে চাপা সঙ্কেত দিয়ে তাকে সামাল দিতে হচ্ছে। যাবার সময় সে হাসিখুশিভাবে সাংবাদিকদের উদ্দেশে হাত নেড়ে দেখায়।

সুখ রঞ্জনের মুখের কথা ইউটিউবে সাক্ষীর বক্তব্য হিসেবে শুনে থাকবেন দেশের ভেতরের-বাইরের সচেতনরা; কারণ বিষয়টি বিশ্ব নাড়িয়ে দিয়েছে। ট্রাইব্যুনালের গেট থেকে তাকে অপহরণ করে সরকারের নিরাপত্তা বাহিনী। সরকারের গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন অপহরণ করে তাকে ভারত সীমান্তে ঠেলে দেয়। কারাগারে থেকেই তিনি তার আদ্যপান্ত অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন। ইংরেজি দৈনিক নিউএজ এক অনুসন্ধানী কাজে এটি উন্মোচন করতে সক্ষম হয়। এটি লিখে পাঠান ডেভিড বার্গম্যান। বালী ছিলেন দেলাওয়ার হোসাইন সাইদীর একজন সাক্ষী। আদালতে এসেছিলেন গত ৫ নভেম্বরে। পিরোজপুরের হিন্দু সম্প্রদায়ের  সাক্ষী সত্য প্রকাশেই উত্সাহী ছিলেনবিধায় সাক্ষীকে  প্রক্রিয়ায় সরকার আস্ত গিলে ফেলে। আদালত চত্বর থেকে তাকে তুলে নিয়ে পুলিশের গাড়িতে করে ডিবির অফিসে নেয়া হয়। অপহরণ করে পার হয় বিএসএফের দোরগোড়ায়। ওরা খুব সহজে বাংলাদেশী মানুষকে মেরে ধরে গুলি করে হজম করতে পারে। গত  এপ্রিল ভারতে অবৈধ অনুপ্রবেশের দায়ে দেশটির ফরেনার অ্যাক্ট ১৯৪৬এর অধীনে কলকাতার একটি আদালত বালীকে ১০৫ বা ১১০ দিনের কারাদণ্ড দেয়। সুখরঞ্জন বালীর ভাই বিশা বালীকে হত্যার অভিযোগে দেলাওয়ার হোসাইন সাইদীর ফাঁসির রায় হয়। এটি এমন এক রায়যেটি মৃতের আপন ভাইও  মিথ্যা সায় দিতে রাজি নয়। সেটি আমরা ইউটিউবেও দেখেছি। সেখানে তার আরও সদস্যদের একই বক্তব্য। তাই যত বিভেদের ফ্যাকড়া বিঁধেছে। বালী বলেনঅফিসের লোকজন পুলিশের পোশাকে ছিলকিন্তু তাকে অপহরণ করে সাদা পোশাকের লোক। দুটি ক্ষেত্রেই ইলিয়াস  বালীর অপহরণে এক ধরনের দাগচিহ্ন পাওয়া যাচ্ছে। বিচারের নামে প্রহসন আর কত হবে? বাংলাদেশে তাকে মারার হুমকিও দেয়া হয়—এভাবে যে, সাইদীকে ফাঁসি দেয়া হবে এবং তাকে হত্যা করা হবে।

দেশের আইন এমন পর্যায়ে গেছে যে বাদীআসামি দুজনাই ফাঁসিতে ঝুলবেন; শুধু বিচারক বেঁচে রইবেন তার নষ্টের প্রতাপী দলবল নিয়ে। নিউইয়র্কভিত্তিক হিউম্যান রাইটস ওয়াচের নিজস্ব ওয়েবসাইটে পোস্ট করা এক প্রতিবেদনে খবরটি প্রকাশিত হয় ১৬ মে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক ব্রাড অ্যাডামস বলেন, ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের একজন সাক্ষীকে এভাবে অপহরণ করার ঘটনা মারাত্মক উদ্বেগের বিষয়। এ পুরো বিচার প্রক্রিয়া, এর বিচারকরা এবং বাংলাদেশ সরকারের বিষয়ে আমাদের মারাত্মকভাবে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।’ এক খবরে দেখি তাকে পুশব্যাকের চেষ্টা করা হচ্ছে, আর আন্তর্জাতিক সংস্থাসহ সবাই আতঙ্কে আছে। জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনের (ইউএনএইচসিআর) ভারতীয় অফিসের সঙ্গে সুখরঞ্জন বালীর সাক্ষাত্ হওয়ার আগে তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো উচিত হবে না—এ খবরেও ওই সংস্থা আতঙ্কে আছে। বিবিসির বাংলা অনলাইন ভার্সনেও ট্রাইব্যুনাল চত্বর থেকে নিখোঁজ হওয়া সুখরঞ্জন আলোচনায় এসেছেন। বালীই উদ্যোগী হয়ে নিজেকে ওপেন করেন। এর জন্য সেখানকার একজন জেল কর্মকর্তা সহযোগিতা দেন। যার খেসারত হিসাবে শাস্তির গুরুদণ্ড এবার ওই জেল কর্মকর্তাকেও গুনতে হবে। তার ব্যাপারেও হিউম্যান রাইটসের এগিয়ে যাওয়া উচিত।

বর্তমানে শাসকপক্ষের কিছু বৈশিষ্ট্যএরা সব হ্যাঁকে না করতে পারেআবার সব নাকে হ্যাঁ করতে পারে। যেমন প্রধানমন্ত্রীর বায়না বিরোধী নেত্রী তাকে গ্রেনেডে মারতে চান। কিন্তু তিনি সবসময়ই ছাত্রনেতাসহ দলেবলে পুলিশি দেশের হুমকিতে ওই গ্রেনেড নিয়ে দেশময় কর্তৃত্ব করে বেড়াচ্ছেন। আর একটি কথা বহু আগে থেকেই শোনা যায়, সেটি হচ্ছে লাশের রাজনীতি। সম্প্রতি (২০১৩ সালে) লাশ আর লাশনীতিই শক্তিধর জীবনের এক অমোঘ নীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। রামুতে হিন্দুমন্দিরে হামলা—শক্তিধররা সবখানেই এ ধ্বংস নীতিতে জড়িত। সুখরঞ্জন বালী হিন্দু না মুসলিম, সেটি বড় হয়ে দেখা দেয়নি। সুখরঞ্জন বালী এক সত্যনিষ্ঠ দরিদ্র মানুষ। বড় বড় কর্তাদের কাছে তিনি কিছুই নন। কিন্তু তার অন্তরে একটি সত্ মানুষ যে ঘুমিয়ে আছে, তা তাকে কলকাতার কারাগারে রাখলেও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে। কাল একজন বলছিলেন, সুখরঞ্জন বালী ছিলেন আওয়ামী লীগের একজন একনিষ্ঠ ভক্ত। তারপরও তিনি সত্যের কারণে শক্ত থাকতে পেরেছেন। এটি অনেক সাহসের কথা। বিএসএফের কর্মকর্তারা তাকে নির্যাতন করে। সে হিন্দু বলে কি তাকে সেখানে পাঠানো হলো—এর যুক্তি কী? চার ব্লগারকে আমেরিকা পাঠানোর পাঁয়তারা চলছে। সরকার কেন সুখরঞ্জনকেও আমেরিকা পাঠাল নাসেটি ভাবছি। ইলিয়াস আলীর অবস্থা আরও করুণ। তাকেও আমেরিকা না পাঠিয়ে পরপারে পাঠিয়ে দেয়া হলো কেন? সরকার নিজেই বলছে আতঙ্কে আছে। তত্ত্বাবধায়ক এলে নাকি ফের কারাগারে ঢুকতে হবে। সরকারের কারাগারে ঢোকানোর অনেক রসদ এযাবত্ সরকার নিজের উদ্যোগে তৈরি করে রেখেছে। কারাগারে যাওয়ার জন্য আর তত্ত্বাবধায়কের অপেক্ষা করতে হবে না। তাকে এমনিতেই ঢোকানো যাবে।

চোরা না শোনে ধর্মের কাহিনী। তারপরও বলি। যারাই সত্য উন্মোচন করছেন, তারা পুণ্যের কাজ করছেন, যা তাকে ব্যতিক্রমী অর্জনধারী করে তুলবে। সুখরঞ্জন বালীরা ওই দলে ঢুকছেন। আর যারা অপরাধ ঢেকে রাখছেন, তারাও কর্মকর্তার সমান পাপের অধিকারী হয়ে থাকবেন। ঐশী নির্দেশ তাই জানান দিচ্ছে। আর সত্যকে তোমরা মিথ্যার পোশাক পরিয়ো না বা সত্যকে গোপন করো নাযা তোমরা জানো (সুরা বাকারার ৪২ আয়াত) তাই জেনেশুনে সত্য গোপন না করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এযাবত্ সাংবাদিকতার নামে, বা যে কোনোভাবে সত্য প্রকাশে অবদান রাখছেন বা সত্য উদ্ঘাটনে কাজ করছেন, তারা প্রকৃতই বিধাতার একনিষ্ঠ সৈনিক। সুখরঞ্জন বালীও তাদের একজন।
১৭ মে ২০১৩

ইসকন হিন্দুত্ববাদের এক নবতর সংস্করণ

নাজমা মোস্তফা

(সংকট সময়ে একটি লেখা সাজালেও যখন করোনার মরোনায় ওলট পালট গোটা দুনিয়া, তাই থমকে দাঁড়ায় লেখাটি, দেয়া হয়নি। যদিও এটি দেয়ার প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়নি)।

ধর্মের নামে একটি সংস্থা “ইসকন” (ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি ফর কৃষ্ণ কনসাসনেস) লালিত পালিত ও মোটাতাজা হয়ে খোলা ময়দানে সম্প্রতি সরবে হাজিরা দিচ্ছে বাংলাদেশে। ইসকন এক চিকন আস্তানা, সাজানো স্বাধীনতার শুরুতেই দেশ বিধ্বংসী এক গুটি, বাংলাদেশের কলিজাতে প্রোথিত হয়ে এর বিজ রুপিত আছে। কিছু জনরা চাইছে একে সাধুতার লেবাস পরিয়ে মানুষকে আরো ঘুম পাড়িয়ে রাখতে, হরে হরে সাধু সাধু কৃষ্ণ নামের আড়ালে দূরদৃষ্টিসম্পন্ন সচেতনরা দেখছেন ষড়যন্ত্রের বাঘ নখর। যেটি সাম্প্রতিক নানা ভাবে ওপেন হয়েছে। যদিও তারা বাঘনখর লুকিয়ে বলছে সাধু সাধুই আমাদের ধ্যান ধারণা। ‘ধর্ম যার যার উৎসব সবার’ এক মহৎ বানী! বলা হচ্ছে এটি ঐক্যের, সমতার মহান বানী! স্বাধীনতা যুদ্ধ পরবর্তী ভারতীয় লুটপাটের শ্রী দেখে বিস্মিত মুক্তিযোদ্ধা মেজর জলিল তার ক্ষোভ আচরণে, প্রতিবাদে, লিখিত আকারেও প্রকাশ করেছেন, এছাড়াও প্রত্যক্ষদর্শী ময়দানের বাসিন্দারাও সাক্ষী। পাকিস্তানের ফেলে যাওয়া কয়েক হাজার সামরিক বেসামরিক গাড়ী, অস্ত্র, গোলাবারুদ, আরো সব মূল্যবান জিনিসপত্র ট্রাক বোঝাই ট্রেন বোঝাই করে ভারতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, প্রাইভেট কারও রক্ষা পায়নি। যশোহর সেনানিবাসের প্রত্যেকটি অফিস তন্ন তন্ন করে, বাথরুমের ফিটিংসসহ সব খুটিনাটিও তারা লুট করেছে, ভিন্ন সীমান্তের অবস্থানও একই। সেদিন ভারতীয় জেনারেল দানবীরের আচরণে বিস্মিত মেজর জলিল, মনে হচ্ছিল তিনি যেন তার এক অধিনস্ত প্রজা মাত্র। খুলনা ত্যাগ করার সময় যখন বলা হলো ভারতীয়দের নির্দেশ ব্যতীত মেজর জলিল নড়তে পারবেন না। তখনই তাদের কু-মতলব তার কাছে বিদ্যুৎ গতিতে স্পষ্ট হয়ে যায়। সেদিন একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত জাতির নাড়ী বোঝার জন্য সামান্যতম ধৈর্যও তারা প্রদর্শন করেনি। মুক্তিযুদ্ধে অনেক অস্ত্র প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের টাকাতে কেনা হয়। সে অস্ত্র সম্পদ ছিল মুক্তিযুদ্ধের সম্পদ। মুক্তিযুদ্ধের সম্পদ ভারতীয়দের কাছে অর্পন করার কথা নয়, কিন্তু তারা ওটিই চাইছিল। সবকিছুই তারা নিয়ে যেতে উদ্যত। এসবের প্রতিবাদ করাতে মেজর জলিলকে গ্রেফতার করা হয়। একজন মুক্তিযোদ্ধার সাধের স্বাধীন বাংলাদেশে তিনি হলেন প্রথম রাজবন্দী। ১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত ভারতীয়রা যুদ্ধে ময়দানে নামে, মাত্র ১৩ দিন চলে সে যুদ্ধ। এর মানে এটি নয় তারাই গোটা যুদ্ধের শক্তি! বরং বলতে হয় পাকিস্তানকে কবজা করতে এর আগে তারা বারে বারে অপারগ হয়ে ব্যর্থ ছিল। গোটা নয় মাস যুদ্ধ করেছে বাংলার প্রকৃত দামাল মুক্তিযোদ্ধারা। অনেক তথ্য স্পষ্ট করে ঐ সময়ে বর্তমান সময়কার ক্ষমতালোভী শাসকবর্গের প্রশ্নবিদ্ধ সম্পর্ক। এ জন্যই প্রায় পঞ্চাশ পার করেও টিকে থাকার ধান্ধায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা গীতি গাইতে হয় তাদের। ক্ষমতান্ধ বেশীরভাগ নেতারা আরামে আয়েশে বিলাসে সময় পার করেছে। ৭১ সালের ৩১ শে ডিসেম্বর তারিখে সকাল এগারোটায় ময়দানের মুক্তিযোদ্ধা মেজর জলিলকে ভারতীয় সেনারা বন্দী করে। এ আচরণে চরম হতাশায় তার বিস্ময়কর ছন্দ প্রকাশ “রক্ত দিয়ে এ স্বাধীনতা আনলে তোমরা”!

৭১এর মুক্তিযুদ্ধ ছিল জাতির স্বাধীনতা সমতা মানবিক মর্যাদার যুদ্ধ, ওটি কখনোই ধর্মযুদ্ধ ছিল না। ইসলাম শান্তিপূর্ণ সহঅবস্থানে বিশ^াসী সবদিন। স্বাভাবিক মানবিক কারণেই বাংলাদেশের ৯৫% গরিষ্ঠ সংখ্যক মুসলিম মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের প্রধান শক্তি। ধর্মনিরপেক্ষতা সেদিন কথায় কাজে দলিলে কোথাও ছিল না। সেটি খুব কৌশলে ইন্দিরা সরকার স্বাধীন বাংলাদেশে জুড়ে দেন ঠিক যেন অস্ত্র লুটপাটের মতই স্বাধীনতা পরবর্তী ৭২ সালে। এমনও প্রমাণিত ভারতের সংবিধানেও ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ সংযোজিত হয় বাংলাদেশে সংযোজনেরও অনেক পরে। এই যদি হয় ভারতের মানসিকতা তার মানে বলতে হবে ভারত নিজেই সেদিনই প্রথম মুক্তিযুদ্ধের সমাপ্তির সময় থেকেই অফিসিয়ালী বাংলাদেশের সাথে পুনরায় লুটপাটের মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধের বিজ বপন করে। আওয়ামী লীগ জানতো জনতার মনোবৃত্তি, ধর্মনিরপেক্ষতার কথা শুনলে সব ভেস্তে যাবে। তাই ভুলেও এটি ৭০এর আগে বা পরে কখনো বলে নাই। ঐ নীতির ম্যান্ডেট নেয়ার সাহস তারা কখনোই দেখায় নাই। সেদিন থেকেই কপট নীতির দেশবিরোধী কিছু কাজকর্মে মানুষ বিতশ্রদ্ধ। যুদ্ধ পরবর্তী ২৫ বছরের শান্তি চুক্তি ছিল গোলামী চুক্তির নামান্তর। স্বাধীনতার শুরু থেকেই দাসত্ব চুক্তির আড়ালে কিভাবে লুটপাটের মহামেলা তৈরী করেছে তখনকার ক্ষমতায় থাকা দল। যার অনেক দাগ রেখা স্পষ্ট করে মেজর জলিল তার অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা গ্রন্থ রচনা করেন ১৯৮৮ সালে। আজ ২০১৯ সাল অবদি সেই একই ঘরোয়া লুটপাটের মহা মঞ্চনাটক ময়দানে বহমান চলমান আছে। এদেশের অর্থনীতি, রাজনীতি, সমাজনীতি, ধর্মনীতি, সংস্কৃতি নিয়ে পাশর্^বর্তী দেশের অতিরিক্ত নাকগলানোর কায়দা লক্ষ্যনীয়। নির্বাচনসহ শেয়ার বাজার লুটপাট, ব্যাংক লুট, ক্যাসিনো বানিজ্যসহ হত্যা গুম খুনে তাদের সম্ভাব্যতা স্বাধীনতা পরবর্তী বর্তমান সময়ে ভয়ংকর খেলা সচেতনদের নজর কেড়েছে। খোদ ধর্মনিরপেক্ষ ভারত হচ্ছে মুসলিম নিধনের উত্তম ভাগাড়। মোদির ভারত সবার জন্য উদার হলেও মুসলিমদের জন্য কবর। এটিও লুকানো নয়, বরং স্পষ্ট। মুসলিমরা তাদের ধর্মীয় নির্দেশ অনুমোদিত মাংস খেলেই এদের মারা যায়, একদম তক্তা পিটা মরণ। ভারতীয় মুসলিমদের একটি অসাধারণ বৈশিষ্ট্য তারা কখনোই মনে করে না পাকিস্তান বা বাংলাদেশ তাদের দেশ। জনম জনম থেকে তারা মনে করে ভারতই তাদের দেশ। যেখানে বাংলাদেশের বেশিরভাগ হিন্দুরা রেখে ঢেকে আমতা আমতা করেও মানে ভারতই তাদের হিন্দুদেশ। প্রকৃত ইতিহাসে ভারতীয় মুসলিমরা অকাতরে দেশের জন্য জীবন দিয়েছে, বাকী ভারতীয়রা অনেকটাই ব্যর্থ, এমনকি সংকীর্ণতায় ঢাকা মুসলিমদের কৃতকর্মকে স্বীকার করতেও কপটতা দেখিয়েছে।

ইতিহাস তথ্যে প্রমাণ, অনেকে বলেন বন্ধু ভারত তবে সংখ্যালঘু নির্যাতনের মিথ্যা কল্পকাহিনী ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশকে একটি সাম্প্রদায়িক দেশ হিসাবে চিহ্নিতকরণে ভারতের ভূমিকা অনেক ব্যাপক ও কপটতায় ভরা। এটি ভারতের “র” এর অনেক বড় পরিকল্পিত লক্ষ্য, সাজানো পরিকল্পনার অংশ। এর সুবাদে বাবরী মসজিদ ইস্যুকে চাঙ্গা করার সাথে সাথে বাংলাদেশের হিন্দুরাও এ মিথ্যাচারে জড়িত থেকেছে। বাংলাদেশের ছয়টি জেলা নিয়ে বঙ্গভূমি আন্দোলনের নামে একটি হিন্দু রাষ্ট্র গঠনের পরিকল্পনা প্রকাশ পায় (১৯৯২ সালের জুনে দৈনিক মিল্লাত এসবের ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে)। এসব অপতৎপরতাতে ধরা পড়ে স্বাধীনতার পর থেকেই লোক দেখানো ত্রাণ তৎপরতার নামে ভারত বাংলাদেশে বঙ্গভূমি আন্দোলন শুরু করে। জানা যায় ঐ বঙ্গভূমি আন্দোলনের নেতা কালিদাস কর্মকার ভারত থেকে তিনটি ইট নিয়ে এসেছেন বাংলাদেশের তিন জায়গায়  তিনটি রাম মন্দির নির্মান করার জন্য। এর একটি হবে পাইকগাছায়। সরকারের হিন্দু সদস্যরা এর পিছনে ইন্ধনে ছিল আছে, হয়তো সামনেও থাকবে। বঙ্গভূমি আন্দোলনের সাথে ভারতের বিজেপি, বিশ^ হিন্দু পরিষদ, শিবসেনা, বজরঙ্গ দল এরা এক সূতায় গাঁথা। বাংলাদেশ বিরোধী কর্মে আরো জড়িত আছে বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু সমাজ সংস্কার সমিতি, প্রণব মঠ ও সেবাশ্রম, ভারত সেবাশ্রম সংঘ, বাংলাদেশ সন্তু মহামন্ডল, বাংলাদেশে হিন্দু ফাউন্ডেশন, বিশ^ ধর্ম ও শান্তি সম্মেলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ চৈতন্য সাংস্কৃতিক সংঘ, হিন্দু বৌদ্ধ খৃষ্টান ঐক্য পরিষদ, ইত্যাদি। এরা আবার নিয়মিত পত্রিকা বের করে। উল্লেখ্য, তাদের পত্রিকা অবিভক্ত ভারত প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখে।

সমাজ দর্পন এরকম এক পত্রিকার উদাহরণ। এর মাল মসালা বাংলাদেশে সহজলভ্য নয়, তাই কলকাতা থেকে ছাপিয়ে আনা হয়। এসবের সমন্বয় সাধন করে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা। বাইর থেকে মনে হবে “ইসকন” নিছক সাধু সাধু, আসলে এরা বাংলাদেশের পানি যা ভারতে জল, ঘোলা করে শিকার করছে। ইন্দিরা গান্ধী নিজেই এদের সহযোগিতা দিতে ইঙ্গিত দিয়ে গেছেন। বাংলাদেশকে পরাধীনতার শিকল পরার ছলাকলার নামে এসব করা হচ্ছে। সমাজ দর্পণের সম্পাদক হচ্ছেন শ্রী শিবশংকর চক্রবর্তী। কে এম দাস লেনস্থ ভোলাগিরি আশ্রম থেকে এটি প্রকাশিত হয়। এসব পুস্তিকা ও প্রচারপত্র বঙ্গভূমি আন্দোলনসহ অবিভক্ত ভারত প্রতিষ্ঠার স্বপ্নকে লালন করে। ইন্দিরা গান্ধী নিজেই এই সংস্থার পিছনে কাঠখড় পুড়িয়ে গেছেন, এ তথ্য বিলি করেন সংস্থার প্রধান বিজয়ানন্দজী বনগাঁর বঙ্গভূমিওয়ালাদের এক সম্মেলনে সব স্পষ্ট করেন। এর জন্য আওয়ামী সরকারকে বেছে নিয়ে বিধ্বংসী হিসাবে নির্দেশ চলেছে। স্বাধীনতার পর থেকেই এরা তৎপর। ১৯৭৫ সালে আওয়ামী লীগ সরকার পতন হলে ভারতীয় কর্মকর্তারা সরে পড়ে। এরা দলে দলে মঠ সেবাশ্রমের আড়ালে নিজেদের কাজ চালাচ্ছে “ইসকন” নামে। এদের সদর দফতর নদীয়া জেলার পাশে মায়াপুরে। এ সংগঠনের কাজ হচ্ছে বাংলাদেশে উস্কানীমূলক ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করা, উদ্দেশ্য সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টি করা। ৮৮ সালের মার্চে নেপালে অনুষ্ঠিত বিশ^ হিন্দু পরিষদের মহাসম্মেলনে ১৯০ জন বাংলাদেশী অংশ নিয়েছিল। এ ছাড়াও বিশে^র অন্য দেশ থেকেও প্রতিনিধিরা আসেন। ভারত থেকে বিশ^ হিন্দু পরিষদ ও বিজেপি ও বিশ^ হিন্দু পরিষদের কাজ বাংলাদেশের সংখ্যালঘু নির্যাতনের নামে মিথ্যাচারকে অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করে। একইভাবে ভারতের প্রতিটি উগ্র হিন্দু পরিষদ বাংলাদেশে ও ভারতে এ কল্পিত হিন্দু নির্যাতনের প্রচার চালায়। নামে থাকছে (সাধু সাধু ভাব, ইন্টারনেশন্যাল সোসাইটি ফর কৃষ্ণ), এর প্রধান কাজ হচ্ছে বাংলাদেশে ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন উদ্দেশ্য সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টি। এই শিব শংকর বিশাল ব্যক্তি। তাদের কর্মকান্ড বিজেপির কর্মকান্ডের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। বিশ^ হিন্দু পরিষদের এ সম্মেলন ৮৮ সালে মরিসাসে ও ৮৯ সালে ভারতের এলাহাবাদ, গোরখপুরে অনুষ্ঠিত হয় সব সম্মেলনেই শিবশংকরের তৎপরতা লক্ষ্যনীয়।

উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য করা নেপালের হিন্দু সম্মেলনের টার্গেটও কিন্তু বাংলাদেশ। লক্ষ্যনীয়, ঐ ‘ইসকন’ সম্মেলনের ১৫ নম্বর সিদ্ধান্তে বলা হয় রামের জন্মস্থান অযোধ্যা হিন্দুদের জন্মগত অধিকার, তাই এটি হিন্দুদের দিয়ে দিতে হবে। উল্লেখ্য ঐ স্থানে রাম নামে আদৌ কারো জন্ম হয়েছিল কি না সেটিও  প্রশ্নবিদ্ধ(?), কোনভাবেই স্পষ্ট নয়। খৃষ্টপূর্ব ১,০০০ বছর আগে বলা হয় রামের জন্ম যদিও কিন্তু প্রত্মতাত্মিক বিশেষজ্ঞদের গবেষনা বলে ঐ সময় ওখানে কোন মানব বসতিই ছিল না। মাত্র কয় শতক আগে তুলসী দাস রামচরিত লিখে গেছেন কিন্তু সেখানে একটি লাইনও খুঁজে পাওয়া যায় না যে বাবর মন্দির তোড়ে মসজিদ বানিয়েছেন। ভারত ও তাদের প্রাদেশিক সরকার তুলসী দাসের ৫০০শ তম জন্মবার্ষিকী পালন করেছে ১৯৯৭ সালে (উইকি সূত্র)। রাম নন, বরং বলা যায় বাবর আর তুলসী দাস সমসাময়িক, জন্ম কাহিনী লিখলেন আর মন্দির ভাঙ্গা এড়িয়ে গেলেন কি যুক্তিতে? বিবেকবান মানুষের জন্য একবিংশ শতকে যুক্তি বিহীন সব ধর্ম নামের অধর্ম অবস্থান বেমানান। যুক্তির মানদন্ডে তাকে টিকতে হবে, নয়তো তাসের ঘরের মত ভেঙ্গে যাবে। যুগে যুগে সত্য ধর্মেও মিথ্যারা আসন গেড়ে বসে। মানুষের বিবেকের মসনদে অসত্যকে ময়দান থেকে বিদায় নিতেই হবে। স্বাধীনতা পরবর্তী ভারতের সরকারী ইতিহাস সবসাজানো মিথ্যা ইতিহাস। সেখানে ভারতের ইতিহাসে শেখানো হয়েছে সিরাজ মাতাল, দুষ্ট লোভী ও নষ্ট ছিলেন। এসব ছিল নষ্ট কথা (ডাঃ সুরেন্দ্র নাথ সেন)। যদিও বেশির ভাগ হিন্দুরাই সাম্প্রদায়িক মনোবৃত্তির প্রমাণ পাওয়া যায় তবে এদের মাঝে ব্যতিক্রম ছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ, অরবিন্দ ঠাকুর এরা সাম্প্রদায়িক ছিলেন না। “ইতিহাস রচনার প্রণালী”তে ডাঃ রমেশ চন্দ্র মজুমদার অনেক সত্য তুলে ধরেন। বাংলাদেশের জাতীয় ক্রিকেট দলের খেলোয়াড় সৌম্য সরকারের ইসকন মন্দিরে অর্ঘ্য প্রদান আতংক বাড়ায়। এর মূল কারণ ধর্মের নামে ইসকন জটিলতা। সিলেট, খাগড়াছড়ি, বরিশাল, বান্দরবন, চট্টগ্রাম, এভাবে সুবিধাজনক জায়গাগুলোকে ইসকন হামলে পড়েছে মুসলিমদের উপর। জীবন্ত মুসলিমরা হচ্ছে লাশের শিকার আর প্রিয়া সাহাদের মত নটরাজরা মিথ্যাচার করে নিজেদের পর্ণ কুটিরে নিজেরা আগুন দিয়ে সরকারের কাছ থেকে বেহিসাব ক্ষতিপূরণ লাভ করে তৃপ্তির ঢেকুর তুলছে। ষড়যন্ত্রী হিন্দুরা বার বার অনাচারেও নিরাপদ থাকছে, সরকারের সীমাহীন নীরবতায় মুসলিমরা বিধ্বস্ত। একইভাবে রংপুরের ঘটনায় হিন্দুরা নিরাপদ আর মুসলিমরা কেউ প্রাণ হারিয়েছে, মামলা খেয়েছে ৫,০০০ মুসলিম, ক্ষতিপূরণ পেয়েছে শুধু হিন্দুরা (১৩ই নভেম্বর ২০১৭, দৈনিক ইনকিলাব)। এটি তারা বড় সময় থেকে করছে, এভাবে উপকৃত হয়েও সময়ে সময়ে মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিবেক হারিয়ে মিথ্যাচার করতে পিছপা হয় না। এ হচ্ছে পরাধীনতার খোলসে স্বাধীন বাংলাদেশের বাস্তব অবস্থান। অজানা কারণে মুসলিম ভুক্তভোগীদের খবর মিডিয়াতেও আসে কম। এ দেশে তাদের কথা ভাবারও যেমন কেউ নেই, বিপদে শোনারও কেউ নেই। ভারত তার সীমান্তের প্রতিবেশীদের হাতে ক্ষণে ক্ষণে বেদম প্রহার হজম করলেও আর ঐ খেদ মেটাতে একমাত্র বাংলাদেশের বর্ডারে মানুষ খুন করে তৃপ্তির ঢেকুর তুলছে। কিন্তু ঐ মানচিত্রের মানুষগুলো এ ক্ষোভের কথা কখনোই ভুলে যাবে না, সেটি মনে রাখলে ভালো হতো। সারাক্ষণ পাকিস্তানকে মুখে মুখে শত্রু ঠাওরালেও ময়দানে হাতজোড় করে সমিহ করেই চলে, যা বাংলাদেশের জন্য কখনোই নয়। বাংলাদেশের আত্মমর্যাদাহীন অবস্থানের দায় মেরুদন্ডহারা শাসক বর্গের নিজের অর্জন।

ফিরে যাচ্ছি নেপালের সেই ইসকন সম্মেলনের সূত্রে। সেখানে ২৪ নম্বর সিদ্ধান্তে স্থির হয় এখানে এমন শক্তিশালী রেডিও স্থাপন হবে যেখান থেকে সারা বিশে^ বিভিন্ন ভাষাতে প্রচারণা চলবে। সম্মেলনের ৩৬ নাম্বারে বলা হয় গরু হত্যা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করতে হবে এবং গোহত্যা সমান মানুষ হত্যা রুপে চিহ্নিত করতে হবে। প্রকারান্তরে তারা বলতে চাচ্ছে মুসলিমরা গোহত্যাকারী, যুক্তিতে এর সোজাসাপটা অর্থ হচ্ছে এরা মানুষ হত্যাকারী। যদিও ভারত গরুর মাংস রপ্তানীতে শীর্ষে থেকেও মুসলিম নিধনে আগুয়ান! বাংলাদেশে প্রতিবছর হাজার হাজার মা বাবা গরুদের কি কারণে তারা কুরবানীর নামে বর্ডার পার করে দেয়। তখন তাদের ধর্ম কোন মাত্রায় থাকে? তাদের ধর্মযুক্তিতে গরু = মানুষ। কিন্তু মুসলিমদের ধর্মযুক্তিতে গরু = পশু, খাদ্য, বলা চলে প্রাণিজ ব্যঞ্জন। ভগবান, মা, দেবতা কিছুই নয়। ৭১ সালে ভারতে জেনারেল উবানের নেতৃতে মুজিব বাহিনী গঠনের উদ্দেশ্য ছিল জাতীয়তাবাদী শক্তিকে নির্মূল করা, স্বাধীনতা পরবর্তী এই মুজিব বাহিনী অনেক অপকর্মের হোতা। ১৯৮১ সালের ৩১ শে মে “র” এর পরিকল্পনা মাফিক চট্টগ্রামে জিয়াউর রহমানকে হত্যা করা হয়। কলকাতা থেকে প্রকাশিত একটি রিপোর্টের উদ্ধৃতি দিয়ে ঢাকার ইংরেজী ‘দি নিউ ন্যাশন’ পত্রিকায় বলা হয় “ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর অনুমোদনক্রমে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে হত্যার ষড়যন্ত্র করে এবং নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে” (The New Nation 29 September, 1988, RAW planned to kill Ziaur Rahman.. স্মরন করার বিষয় ৮১ তে জিয়া হত্যার খবর, ২০০৯এ বিডিআর হত্যার খবরও ভারতই প্রথম প্রচার করে। এরকম অনেক ঘটনায় হত্যার আগের দিনই সীমান্তে সৈন্য সমাবেশ, হত্যার খবর সকাল ৭টা ৫৫ মিনিটে আকাশবানী থেকে প্রচার করা হয়। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ নয়াদিল্লীস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশনে জানতে চান যে, শেখ হাসিনাকে গ্রেফতার করা হয়েছে কি না? ভারতীয় আচরণ যেন চোরের মনে পুলিশ পুলিশ। জিয়ার স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি ও স্বকীয় অস্তিত্ব রক্ষার্থে কৌশলগত নীতিমালার কারণেই তাকে হত্যা করা হয়। জিয়া হত্যার দায়ে দুই পলাতক সেনা অফিসার দীর্ঘকাল ভারতে আশ্রয় পায়, এমন কি এখনো একজন কলকাতা নগরীতে ব্যবসা বানিজ্য করছেন (শাসছুর রহমান, বাংলাদেশ ভারত সম্পর্ক, সাপ্তাহিক বিচিত্রা, ২২ বর্ষ ৯ সংখ্যা)। জিয়াউর রহমানের হত্যার পর এরশাদ নাটের গুরু আসার পর থেকেই আবারো বিভিন্নরুপ এজেন্ডা চালু হয়। জিয়ার হাতে করা বাংলাদেশের অসামান্য অবদানকে ভারত ভালো চোখে দেখে নাই। যার ফলশ্রুতিতে আজ অবদি বাংলাদেশ ধুকে ধুকে মরছে (লেখকের এ নিবন্ধটি দৈনিক দিনকাল, ৩০ শে মে’৯৭ উপলক্ষ্যে বিশেষ সংখ্যায় প্রকাশিত)। তথাকথিত বঙ্গভূমির ব্লু প্রিন্ট হচ্ছে একটি স্বাধীন হিন্দু রাষ্ট্র তৈরীর প্রথম চক্রান্ত। ভারতের তালপট্টি দখল, শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন, ও এরশাদের ক্ষমতায়ন একসূত্রে গাথা (আবু রুশদএর বাংলাদেশে ‘র’ গ্রন্থ, ১৬৫-১৭৯ পৃষ্ঠা )। ঐ বইটি গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক প্রধানদের কথা বাংলাদেশে ‘র’ আগ্রাসী মনোবৃত্তির স্বরুপ সন্ধানে সকল ভারতীয় ষড়যন্ত্র ওপেন করে দেখিয়েছে। প্রতিটি বাংলাদেশীর নিজের অস্তিত্ব রক্ষার্থে ২৮৮ পৃষ্ঠার পুরো বইটি আগাগোড়া পড়া দরকার।

ইসলাম কারো ধর্মে অন্যায় হস্তক্ষেপের অধিকার স্বীকার করে না। কিন্তু ভারত শিকড় থেকে বড় সময় আজ অবদি সেটি রাখছে। শুদ্রকে স্পর্শ করলে কাপড়শুদ্ধ ধৌত ও উপবাস করতে হতো। চন্ডাল ছিল অম্পৃশ্য। ব্রাহ্মণদের সাথে কথা বললে ছায়া মাড়ালে প্রায়শ্চিত্য করতে হতো। যার সহজ হিসাবে বৌদ্ধ জৈনসহ ব্রাহ্মণ ছাড়া সবাই অচ্ছুৎ। নারীর কোন স্বাধীনতা থাকতে নেই। আজকে ভারতীয় নারীরা সম্পত্তির ভাগও পাচ্ছে, এর পিছনেও মুসলিমদের থেকে শেখা বুলিতে আজ সমৃদ্ধ। স্বামীর মৃত্যুর পর চিতায় গমন নারীর ঠিকানা। মুসলিম সংস্কৃতির সবকটি অর্জনে তারা ধন্য হলেও গো মাংস ভক্ষণ মুসলিমরা করে বলেই তাদের বিদ্বেষ চরমে।  অতীতে এত ছিল না, বর্তমানে বেড়েই চলেছে। রামেশচন্দ্র মজুমদারের বাংলাদেশের ইতিহাসের ১৮৯ পৃষ্ঠাতে বর্ণিত হয়েছে তাদের ধর্মের এমন সব নির্দেশনা এসেছে পুরানে, যুক্তি হিসাবে শ্লীলতা বজায় রেখে তা উল্লেখ করা যায় না। শ্রী মজুমদার আরো লেখেন, সে যুগের পন্ডিতগণ প্রামাণ্য গ্রন্থে প্রকাশ করেন, শুদ্রাকে ব্যবহার করা অসঙ্গত কিন্তু তার সাথে অবৈধ সহবাস করা ঐরকম নিন্দনীয় নয় (পৃ: ১৯৩)। তারা যাই বলতো তাই ছিল ঈশ^রবাক্য। সমুদ্র যাত্রাও ছিল প্রায়শ্চিত্যযোগ্য পাপ। ইতিহাস গবেষকরা এসব চেপে রাখা ইতিহাস সাম্প্রতিক উগলে বের করেছেন। তারপরও বেশীর ভাগ সাধকেরা এসব চেপে রেখে প্রশ্রয় দিয়ে গেছেন বলেই ভারতীয় জটিলতা শেষ হতে চায় না, একবিংশ অবদি চলমান। বাংলাদেশের কৃষকের ছেলেরা লেখাপড়া শিখবে সেটি সইতে পারেন নাই খোদ রবীন্দ্রনাথও। ধর্ম তাকে উদারতা শিখায় নাই, যেখানে নজরুল তাকে এ ক্ষেত্রে ছাড়িয়ে গেছেন যোজন যোজন দূর। তিনি চেয়েছেন হিন্দু মুসলিমদের পরস্পরের গালাগালিকে গলাগলিতে পরিণত করতে। আর ঢাকাতে বিশ^বিদ্যালয় স্থাপনে মক্কা ইউনিভার্সিটি / ফাক্কা ইউনিভার্সিটি বলে টিটকারী করা / কৃষকের ছেলেদের এসব দরকার নেই / জমিদার রবীবাবু উপসত্ব উঠাতে ব্যস্ত থাকলেও এদের জন্য কিছু করার কোন প্রয়োজনও বোধ করেন নাই বরং ম্লেচ্ছ যবন বলে বার বার গালি পেড়েছেন। এসব সংকীর্ণ সাধুদের অপরাধেই ভারত আজ অবদি মানবতার বিপক্ষ অবস্থানে আছে। ১৯২১ সালের ঢাকা ইউনিভার্সিটি স্থাপনের এসব কষ্টকথা অসংখ্য লেখনীতে জীবন্ত হয়ে আছে। কিভাবে তারা সংঘবদ্ধভাবে মুসলিম বিরোধী ভূমিকা রেখেছে তা অকল্পনীয়, প্রায় দুইশত গণ্যমান্য হিন্দু ঢাকার প্রখ্যাত উকিল বাবু আনন্দ চন্দ্র রায়ের নেতৃত্বে যারা রাজনীতি করতেন না, কিন্তু মুসলিমদের বিরোধীতা করতে তারাও এগিয়ে আসেন। রাসবিহারী ঘোষ, আশুতোষ মুখোপাধ্যায় ও গুরুদাস বন্দোপাধ্যায়, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী সবাই এক খোরে মাথা মোড়ানোর দল, সাথে কবি রবীন্দ্রনাথও থাকেন নেতৃত্বে।  এভাবে বাবু গিরীশচন্দ্র ব্যানার্জী, ডঃ স্যার রাসবিহারী ঘোষ এবং কলকাতা বিশ^দ্যিালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর স্যার আশুতোষ মুখার্জীর নেতৃত্বে এসব এলিটরা ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে ১৮ বার স্মারক লিপি দ্বারা বৃটিশ ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ এর উপর চাপ সৃষ্টি করেন (Calcutta University Commission report. Vol. IV পৃষ্ঠা ১১৩ পৃষ্ঠা ১১২, ১৫১ তে আরো বর্ণিত আছে)। ১৯১২ সালের ২৮শে মার্চ কলকাতার গড়ের মাঠে ঢাকঢোল পিটিয়ে যে সভা হয় সেখানে সভাপতিত্ব করেন কবি রবীন্দ্রনাথ (অসংখ্য সূত্রে প্রমাণিত/ অধ্যাপক আব্দুন নূর (চ. বি) দৈনিক সংগ্রাম দ্রষ্টব্য ২৬ এপ্রিল ১৯৯৩ ইং)। এসব কারণে এটি প্রতিষ্ঠায় অনেক অর্থকষ্ট ও সংকট অতিক্রম করতে হয়। এর ব্যপ্তি ও শর্ত ছিল ক্ষমতা ও অধিকার হবে ঢাকা শহরের দশ মাইলের মধ্যে সীমাবদ্ধ (‘জীবনের স্মৃতিদ্বীপে’ ডক্টর রমেশচন্দ্র মজুমদার)। টিটকারীতে শুধু ঢাকা মক্কা হয়নি, বুড়িগঙ্গা নদী হয়েছে বৃদ্ধগঙ্গা নদী, যারা এখানে আসবে তারা হবে সবাই অসুর, দেও দানব। ঐ উক্তিটি ছিল ভান্ডারকরের, সেটিও ডক্টর রমেশচন্দ্র তার জীবনের স্মৃতিদ্বীপে উল্লেখ করেন। ঘটনাটি ঘটবে “কলিযুগে বৃদ্ধগঙ্গা নদীতীরে (হরতগ) নামে এক অসুর জন্ম গ্রহণ করবে। —- যারা অর্থলোভে পূর্ববর্তী আশ্রম ছেড়ে এই অসুরের আকর্ষণে বৃদ্ধগঙ্গার তীরে যাবে তারা ক্রমে অসুরত্ব প্রাপ্ত হবে ও অনেক দুর্দশাগ্রস্ত হবে। এটি প্রমাণিত পরবর্তীতে সেই অসুরেরা সদলে ঐখানে চাকুরী নিয়ে দেও দানবের স্বরুপ নেন। সংখ্যা বৃদ্ধি করেন। মুসলিমদের প্রতি তাদের ঘৃণা ও বৈরিতা যে কত গভীর ও তীব্র ছিল এসব তার প্রমাণ মাত্র। এই দেও দানবের সংখ্যা এতই বৃদ্ধি পায় যে, ভোটের সময় তারা অনায়াসে জিততে পারতো। সেটিও জীবনের স্মৃতিদ্বীপে লেখক উল্লেখ করেছেন। আবুল আসাদের লেখা ‘একশ বছরের রাজনীতি’ থেকে পাওয়া কথাগুলি বৃটিশ ভারত অধিকৃত প্রতিটি মানুষের জানার দরকার আছে। এসব চেপে রাখা ইতিহাস চাপাই আছে এর প্রধান কারণ হচ্ছে অসাম্প্রদায়িক মুসলিমদের সীমাহীন হজমশক্তি। হিন্দুরা হলে এ নিয়ে সেই কবে লঙ্কাকান্ড বাধাতে যেত। সত্য মিথ্যা পাঠকের বিবেচনাতেই জমা রইলো। এসব চেপে রাখা ইতিহসের লজ্জাস্কর ভাসুরদের নাম কেউ সজ্ঞানে নেন না। কিন্তু ইতিহাস জানতে হলে সত্যকে বুঝতে হলে এর কোন পাঠই অবহেলার নয়। এ ইতিহাস জনতা নাড়ে না বলেই মিথ্যা ইতিহাসে রচিত কুরুক্ষেত্র সমান লঙ্কাযুদ্ধ বাবরি মসজিদ নিধনসহ একের পর এক ধ্বংস যুদ্ধ চলমান আছে। ইসকন একই ধারাবাহিকতা, যেটি আরো ভয়ংকর ও জটিল। ধর্মের নামে অসংখ্য অনাচারের নতুন আমদানী।

ইতিহাস কখনোই অবহেলার জিনিস নয়, সময় কথা বলে। থরে বিথরে মূল্যবান অতীতের জমা চাপা দিয়ে রাখা যা অতি উত্তাপে আগ্নেয় বিস্ফোরণে বিচ্ছুরিত হয়। আজ বাংলাদেশের সন্তান আবরাররা নিজ দেশের পক্ষে কথা বলতে পারে না, নির্দেশ আসে এদের মেরে ফেলতে। আবরার হত্যার পর বিশ^বিদ্যালয়ের ভিপি নূরদের উপর সদলবলে হামলা হয়। প্রশ্ন করা হয় তুমি কে? এর জবাব ছিল আমি কে, কিছুক্ষণ পরই বুঝবি। এটি ছিল ভিপি নূরকে ইসকন সদস্য সনজিৎ এর জবাব। অনেকেই বলছে সনজিৎ ইসকন সদস্য, আবরার হত্যায় জড়িত অমিত শাহও তাই। এসব কেমন ধারার একবিংশের ধর্মভাষা? ভাগ্যের ফেরে নুরুরা বেঁচে আছে। নতুন বছরে ২২ জানুয়ারীতে ৪ ছাত্রকে আবরারের মতই রাতে নির্যাতন করা হয়েছে হাতুড়ী রড লাঠি ও স্ট্যাম্প দিয়ে, এতে তারা মার খেতে খেতে অচেতন হয়ে থানায় সোপর্দ হয়। কারণ তারা জানে এতসব অপরাধের পরও অপরাধীরা নিরাপদ থাকবে। কে করবে এ রাষ্ট্রের বিচার, শিকড় থেকে শাখা প্রশাখা সর্বত্রই অন্যায় অবিচারে ঠাসা। মিথ্যার ময়দানে মেরুদন্ড ভাঙ্গা ভারতের পুতুল সরকার ক্ষমতায়। সব অংকই ২+২=৪ এর মতই স্পষ্ট। এখানে কোন গোজামিল নেই। জাতির প্রতিটি সদস্য আজ শত্রু ও বন্ধু চিনতে পারে। দখলদার সরকার সময় সময় নষ্ট সাধুদের মত উপদেশ বাণী ছুড়ে সাধুতার কসরতে বয়ান ছাড়ে। হতবুদ্ধ জনতারা হাসবে না কাঁদবে বুঝতে পারে না।

স্মরণ করার বিষয়, জিয়ার বদৌলতে ভারত ফেরত হাসিনার দেশে পদার্পনের মাত্র ১৩ দিনের মাথায় জিয়া হত্যার ঘটনা ঘটে। এরপর পরই শেখ হাসিনা সিলেট থেকে ফেরত আসার পথে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সীমান্ত দিয়ে বোরখা পরে ভারতে পাড়ি দেয়ার সময় সীমান্তরক্ষীরা বাধ সাধে” (শওকত মাহমুদ, বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনার ১২ বছর, দৈনিক দিনকাল ২০/৫০৯৩ সংখ্যা)। বিগত শতকে “র” এর ছত্রচ্ছায়ায় তসলিমা ইস্যুকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে তোলা হয়েছে, হিন্দু নির্যাতনের মিথ্যাচারে বাংলাদেশকে আসামী করার ব্যবস্থা পাকাপোক্ত হয়। ঐ পাশাপাশি সময়ে শেখ হাসিনাও নিজে কলকাতা গিয়ে সংখ্যালঘু নির্যাতনের মিথ্যাচারে বাড়তি যোগ করেন (দৈনিক যুগান্তর, কলকাতা ০৪-০৬-৮৭সংখ্যা)। চাকমাদের বিষয়েও একইভাবে শেখ হাসিনা মিথ্যাচার করেন (দৈনিক আদালত, কলকাতা ০৪-০৭-৮৭ সংখ্যা)। এসব মিথ্যা অভিযোগ ভারত সব সময়ই করতো, এসব রসদ পেয়ে দেশবিরোধী উস্কানীতে ভারত আরো বেশী তাল পায়। সিকিমের লেন্দুপ দর্জি বেওকুফের মত নিজ দেশ সিকিমকে দেউলিয়ার শেষ ধাপে ধ্বংস করে নিজেও ধ্বংস হয়। ভারতের প্রতিবেশীদের বেলায় একই ধারার ইতিহাস বার বার রচিত হচ্ছে। যার সহজ পরিণতিতে গোটা জাতির উপর মিথ্যাচারের তকমা সাটা হয়। মিথ্যাচারে মুজিবের কন্যার জুড়ি মেলা ভার, একটি জাতির জন্য এর চেয়ে বেশী লজ্জার আর কি হতে পারে? ভোটের আগে মধ্যরাতের ভোট তার উজ্জ¦ল উদাহরণ। এ অসাম্প্রদায়িক দেশকে সাম্প্রদায়িক বানানোর প্রাণান্তকর প্রচেষ্ঠায় সবদিন ভারত নিবেদিত। ইসলামের আদর্শকে সত্যকে যুক্তিকে মিথ্যারা ভয় পায়। ইসলামের ইতিহাসের গৌরবগাথায় বিমুগ্ধ জওহরলাল নেহরু এটি স্বীকার করে গেছেন তার লিখিত গ্রন্থ “Glimpses of World History (Delhi: Oxford University Press, 1989, Centennial Edition, pp. 141-145) যে কিভাবে এ ধর্মটি অতি অল্প দিনের মাঝে পূর্ব রোমান সা¤্রাজ্য ও পারস্যের সাসানীয় সা¤্রাজ্য, ইহুদী ও খৃষ্টানের করায়ত্ব জেরুজালেম তাদের দখলে যায়। গোটা সিরিয়া, ইরাক পারস্য সবই আরব সা¤্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। এসব মিথ্যাচারের জোরে নয়, ন্যায়ের সত্যের আদর্শের সৎ শক্তির কাছে ওসব অঞ্চল পদানত হয়। ইসলামের সত্য হারিয়ে আওয়ামী লীগ জাতির উপর ধর্মনিরপেক্ষতার বুলি আওড়ায়। প্রধানত ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করে আওয়ামী লীগই, হরকাতুল মার্কা অবাঞ্ছিত কিছু ধর্মধারীদের সহযোগিতায় তারা চেতনা ব্যবসা চালায়। আবার আওয়ামী লীগ নিজেদের প্রয়োজনে জামাতের সাথে আঁতাত গড়ে তোলতেও ইতস্তত করে না। কিন্তু জামাতের সাথে অন্যরা গেলে বাকীদের বেলা তালাক তালাক নিচতার জপমালা। আবার কাজ হাসিল হলে যে কাউকেই এমন কি নিজ দলের লোককেও তারা দূরে ছুড়ে ফেলে দেয় টয়লেট পেপারের মত। যে কোন অপকর্ম করিয়ে নিতে তাদের আটকায় না। ভারতেও কৃষ্ণের জন্মাষ্টমী পালিত হয় না কিন্তু এরশাদ তার আমলে বাংলাদেশে জন্মাষ্টমীর ছুটি শুরু করেন। এরশাদও ছিলেন ভারতের দেরাদুনের স্পেশাল ট্রেনিংপ্রাপ্ত। ১০০% মুসলিম অধ্যুষিত একটি দেশ কাশ্মীর ও তাদের মুসলিমদের উপর অপরিসীম নির্যাতন বহাল রেখেছে ভারত। সৎ সাংবাদিকরা দেশে টিকতে পারেন না, অনেকের মন্তব্য এর কারণও ভারতের ঠেলা। দেশপ্রেমিকরা দেশে থাকলে দেশদ্রোহিতা করা কষ্টকর। যাদের মাথায় সামান্যতম দেশপ্রেম আছে তারা জানেন জিয়া কতটা দেশপ্রেমিক ছিলেন। প্রতিটি দেশপ্রেমিক তাদের চোখে রাজাকার, দালাল পাকিস্তানের সুহৃদ। এতে একটি ম্যাসেজ স্পষ্ট হয়। অবশ্যই বাংলাদেশের সুহৃদ হতে হবে পাকিস্তানকে। বাংলাদেশ কারো সাথে শত্রুতায় বিশ^াস করে না, তাহলে পাকিস্তানের সাথে শত্রুতা থাকবে কেন?

পশ্চিম পাকিস্তান কোন দিনও পূর্ব পাকিস্তানের শত্রু ছিল না। রাজনীতির ইতিহাস ঘাটলে ইতিহাসই সেটি বলে দেয়, কাউকে মুখ ফুটে বলতে হয় না। কোন কিছুই চাপা থাকে না। বর্ণভেদে জর্জরিত ভারত ইসলামের মহান মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ হয়ে নিজেদের মুক্তির পথ ভেবে স্বজ্ঞানে ইসলামের ছায়াতলে আসে। নবী মোহাম্মদ (সঃ) এর জন্মের অতি অল্প সময়ের মাঝেই এ ধর্মের মহৎ বাণী ভারত বর্ষে ছড়িয়ে পড়ে। এভাবে গোটা বিশে^ আমেরিকা, অষ্ট্রিয়া, ইংল্যান্ড, জাপান সর্বত্র মানুষ এ ধর্মের বাণীতে মুগ্ধ হয়ে এর মানবিকতায় মুগ্ধ হয়ে এ সত্যে আত্মাহুতি দেয়। মুর্শিদ কুলি খাঁর জন্মও বিখ্যাত ব্রাহ্মণ বংশে। সুলাইমান করনানীর সেনাপতি কালাপাহাড় সম্ভ্রান্ত কায়স্থ বংশীয় হিন্দু ছিলেন। বাংলার বার ভূইয়াদের অগ্রণী ঈসা খাঁর বাবার নাম কালীদাস, ব্রাহ্মণ থেকে ধর্মান্তরিত মুসলিম। ভারতীয় ঐতিহাসিকরা তাদের স্বরচিত ইতিহাসে মিথ্যাচার করে এটি প্রচার করে যে মুসলিমরা তলোয়ারের জোরে ভারতবর্ষ শাসন করেছে। এভাবে মিথ্যায় ভর করে তারা তাদের প্রকৃত বর্ণবাদী স্বরুপ প্রকাশ করে। ঐতিহাসিক শ্রী দাসগুপ্ত স্বীকার করেছেন, স্থানীয় অধিবাসীদের আরব বণিকদের সদ্ভাব বিদ্যমান থাকার কারণেই তাদের কর্মচারীরা এদের সংস্পর্শে এসে ঐ নতুন শাস্ত্র সম্বন্ধে জ্ঞাত হয় ও পরম উৎসাহে ঐ ধর্মে আত্মসমর্পণ করে। জনাব জৈনুদ্দিন লেখেন, ‘তুহফাতুল মুজাহিদিন’ গ্রন্থে হিন্দুরা মুসলিম হলে অন্যেরা তাকে আরো ঘৃণা করতো। কিন্তু একটি বিষয় মুসলিম হলে তারা সবার সাথে সমান মর্যাদা পেতো। এটা ছিল হিন্দুদের ইসলাম গ্রহণের প্রধান কারণ। (সূত্র: দাশগুপ্তের ভারতবর্ষ ও ইসলাম, পৃ: ১২৭-১২৮)। এসব কথা ডাঃ তারাচাঁদ বাবুও স্বীকার করেছেন। শ্রী দাশগুপ্ত আরো লিখেছেন, “বজ্র আটুনী ফসকা গেরো, হিন্দুরা যতই কঠোর হতে থাকে, মুসলিমরা ছিল ততোধিক বহুভাবে উদার” (ঐ পুস্তকের ৫৪ পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য)। ব্রাহ্মণরা বৌদ্ধদের প্রতি চরম অবিচার করতো, তারা তাদের মাথা ন্যাড়া করতো তাই তাদের ডাকা হতো নেড়ে বলে। ব্রাহ্মণদের অত্যাচার সীমা ছাড়িয়ে গেলে তারা দলে দলে ইসলামে প্রবেশ করে। পরে ঐ নেড়ে অপনামটি মুসলিমদের উপরও ম্লেচ্ছ যবনের সাথে নেড়ে ধেড়ে বহু উপনাম হিন্দুরা সেটে দেয়। ভারতবর্ষে আরেক দল ছিলেন জৈন। এরাও ঠিক ঐভাবে দলে দলে ধর্মান্তরিত হয়ে মুসলিম হয়েছে আবার অনেকে মৃত্যুবরণও করেছে। শ্রী দাশগুপ্ত বলেন, একবার একদিনে আট হাজার জৈনকে শূলে হত্যা করা হয়। কথাটি তামিল পূরানে উল্লেখিত আছে।

যে সরকার দেশের স্বার্থ দেখে না, সে কিভাবে সামাল দিবে প্রিয়া সাহার নাটক, জাকির নায়েকের বিরুদ্ধে মামলা নাটক, হলি আর্টিজেনের মত মঞ্চনাটক, সব কিছুর সাথেই তাল দিতে হয়েছে মেরুদন্ডহারা সরকারকে। মোদিজির পুশইন নাটক সবই একসূত্রে গাঁথা মঞ্চনাটকের অংশ মাত্র। সব কিছুর উপর একজন পরম বিধাতা নিরব দ্রষ্টা ছিলেন আছেন থাকবেন, তাকে ভুললে চলবে কেন? বিপদ হচ্ছে তাকে খোলা চোখে দেখা যায় না, অন্তদৃষ্টি দিয়ে দেখতে হয়।  ভয়ে ও আতংকে সময় সময় আমছালা নিয়ে ইত্যবসরে অনেক চোর বাটপার মন্ত্রী মিনিষ্টারও বাংলাদেশ থেকে সপরিবারে পালাচ্ছে লুটাকম্বল নিয়ে। মুসলিম হয়েও যারা তাকে চেনে না, তাদের পরিচয়ও ময়দানের মানুষের কাছে স্পষ্ট করা হয়েছে। তাদের মুসলিম না বলে মোনাফিক বলা হয়েছে। সত্য সংগ্রামীদের অফুরান পাওনা জমছে, ষড়যন্ত্রীদের জন্য কাঁচকলা। ভগবানের ভগবতী আছে আল্লাহর কোন স্ত্রীলিংগ নেই। আল্লাহ নামের সেই বিধাতার কাছে সব আমের আর ছালার খবর তার হাড়িতে ছিল আছে থাকবে। সত্যসাধকদের ঐ একটি জায়গাতে একমাত্র ভরসা! বিবেকধারী মানুষ নামধারী অপকর্মী কেউ ছাড়া পাবে না, পাবার কথা নয় ঐ সত্য আদালতের ময়দানে, তবে শুধু পশু হতে পারলেই রক্ষা! গরুরা নিরাপদ, গরু মা-ই হোক আর পশুই হোক, তবে গো রক্ষকরা, গোসেবকরা নিরাপদ নন, নিজেদের জন্য নিজেরাই আপদ!

রচনাকাল: করোনার সংকট সময়ের শুরুতেই ২০ জানুয়ারী ২০২০ সাল।

 

 

ইসলামে ফতোয়া

নাজমা মোস্তফা

“ফতোয়া” শব্দটি সাধারণ অর্থে ধর্ম বিষয়ক অবস্থান নির্ণয় করতেই ব্যবহার করা হয়। এটি মুসলমানেরা তাদের ধর্মের নিয়ম কানুন হিসাবে দরকারে এর ব্যবহার করছেন। এ হিসাবে এর গুরুত্ব অনেক বেশী এবং ধর্মের সিলেবাস বলতে প্রধাণত মূল গ্রন্থটি স্বয়ং আল্লাহর কাছ থেকে এসেছে, সেটি আল কুরআন। সে হিসাবে একমাত্র আল্লাহই হবেন প্রকৃত ফতোয়ার মালিক মোক্তার। ইসলাম অর্থ শান্তি, সালাম বা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ। এই মূল নীতির উপরই ইসলাম সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল। এখানের নবী ছিলেন এ ধর্মটির এক প্রামান্য প্রতিনিধি এ কারণে যে তার মাধ্যমেই এ ধর্মটি আস্তে আস্তে সুদীর্ঘ ২৩ বছরে নাজেল হয়। তিনি ছিলেন এক জীবন্ত বাস্তবতা। তাকে জনতারা প্রধান নির্দেশক বলেই মানতো। তাই সেদিনের নেতা, লিডার বা নির্দেশক বলতে তার অনুসারীরা তাকেই বুঝতো। ইসলামের এ যাত্রা একদম সেদিন থেকেই শুরু হয়নি এটি শুরু হয় সেই প্রথম নবী আদম (আঃ) থেকেই। তাই এটি কোন নতুন ধর্ম নয়, এটি অনেক পুরানো ধর্ম। ধাপে ধাপে এটি আগায় এবং সবার শেষ ভারসন হিসাবে কুরআন আমাদের হাতে এসেছে এর পূর্ণতা নিয়ে মাত্র চৌদ্দশত বছরের কিছু আগে। এ গ্রন্থেই সে পরিপূর্ণতার সে আধুনিকতার সবটুকু বাণীই বিলি করা হয়েছে।

এরকম একজন নবী চলে যাবার পর পূর্বযুগেও দেখা গেছে তার অনুসারীরা অনেক অনাচার করেছে এমন কি সম্পূর্ণভাবে ভুলে গেছে তাদের পূর্ববর্তী সত্যকে এবং সম্পূর্ণ মিথ্যার মাঝে ধর্মকে দাঁড় করিয়ে মিথ্যা রুপরেখায় ধর্মকে সাজিয়ে নিয়েছে। সত্য বাণী এর মাঝে যত তাড়াতাড়ি পারে তারা ভুলে যায়, এটিই সব যুগেরই নীতি। ওদের থেকে আমাদের এ শেষগ্রন্থের ব্যতিক্রম এইটুকু যে এটি কেউ নড়াতে সরাতে বা বদল করতে পারবেনা, যা অতীতে এ কাজটি সবাই করেছে। এরকম একটি খবরের ধারণাতে শয়তান নামের ছলবাজ বেশ বড় একটি ধাক্কা খায়। কুরআন বলে “আর আমার বান্দাদের বলো যে তারা যেন কথা বলে যা সর্বোৎকৃষ্ট। নিঃসন্দেহ শয়তান তাদের মধ্যে বিরোধের উসকানি দেয়। শয়তান মানুষের জন্য নিশ্চয় প্রকাশ্য শত্রু” (বনি ইসরাইলএর ৫৩ আয়াত) তারপরও সে কিন্তু বসে নেই, সেটি কুরআন বলে। সে ব্যাপারে আমাদের তেমন কোন সচেতনতাও নেই। নবীর যুগে নবীই ছিলেন কুরআন প্রচারে নিবেদিত আর নবী মারা যাবার পরও ঐ সময়টিতে কুরআনের বাইরে কাউকে ফতোয়া দিতে দেখা যায়নি। একদম যে কেউ দেয়নি তাও নয়, তবে বড়ই শক্ত প্রহরা ছিল সে সময় তার প্রমাণ পাওয়া যায়, পরিপূর্ণ ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কাছাকাছি সময়টিতে কেউই এসব নিয়ে মোটেও ব্যবসা করতে পারত না। তাছাড়া প্রতিষ্ঠার যুগে আরবে কোরাইশের অত্যাচারে মুসলমানরা কি পরিমাণ যাতনার সময় কাটিয়েছেন তা যারা প্রকৃতই এর ভেতর ঢুকেছেন তারা এর খবর জানেন। তাছাড়া ইসলামের মহান মানবতার বানী, উদারতার চমক খুব অল্প সময়েই ভূগোলের অনেক বিরাট অংশ দখল করে নেয়। চরম অত্যাচারী জাতি আরবের কোরাইশদের করায়ত্বে থাকা গোটা মক্কা বিজিত হয় গর্বের সাথে দর্পের সাথে কোথাও সমস্ত আরবে এক ফোটা রক্তও ঝরেনি, বলা হয় রক্তপাতহীন বিজয়। ইসলাম এরকম একটি ফতোয়াবাজ অত্যাচারী ধর্ম হলে এর বানী এত দ্রুত কোন সময়ই বিরোধীদেরে কাছে টানতো না।

নবী গত হবার পরই ইসলামের শাসনভার পড়ে খলিফাদের হাতে। এরা প্রত্যেকেই ছিলেন সত্যের সৈনিক, তাদের অতন্দ্র প্রহরায় এসব অপরাধ মানুষ যখনই করেছে; একটু বাড়াবাড়ি করলেই কঠিন শাস্তি ভোগ করেছে। যার জন্য সে সময়টিতে এসব মনগড়া ফতোয়া দিতে মানুষ কখনোই উৎসাহ বোধ করতো না। সে সময় যদি কোন বিচারক কোন অন্যায় করতেন তাকেও বেত্রাঘাত করা হত, কঠিন শাস্তি পেতে হত। এটি যেন ছিল সে যুগের এক সহজ নিয়ম। নবম হিজরীতে তামীম নামের একজন খৃষ্টান সন্ন্যাসী, যিনি প্যালেষ্টাইনের অধিবাসী ছিলেন। ইসলাম গ্রহণ করার পর খৃষ্টানদের পুরানো বানোয়াট কাহিনী, জগতের সৃষ্টিতত্ত্ব এবং নবীগণের কেচ্ছা কাহিণী এসব তার নিজের সংস্কার ও বিশ্বাসমত মুসলমানদের মাঝে বর্ণনা করেন। এজন্য হযরত ওমর তাকে দোররা মারার হুকুম দিয়েছিলেন। মসজিদে প্রদীপ জ্বালাবার প্রথাও এই তামীম প্রথম প্রচলন করেন। হযরত ওসমানের শহীদ হবার পর তিনি সিরিয়ায় চলে যান (এসাবা ৮৩৩ নং ও একমাল প্রভৃতি)। এরকম নিরাপত্তায় এদের হাতে সংরক্ষিত একটি ধর্মের নাম ছিল ইসলাম, আল্লাহর ধর্ম। অনেক সময় কাব্য করে বলা হয় যে রাস্তা ছিল চুলের চেয়েও চিকন এবং ছুরির চেয়েও ধারালো, বাস্তবে এ এক সহজ সরল পথ। কবি গোলাম মোস্তফার সুরা ফাতিহার অনুবাদের ভাষায় “সরল সঠিক পূন্য পন্থা মোদেরে দাও গো বলি” কিন্তু ছলবাজের জন্য এটি বড়ই কঠিন, সত্য সাধকদের জন্য সহজ ধর্ম। এবার ধর্মীয় গবেষকদের চোখে পড়া গবেষনাতে পাওয়া কিছু মূল্যবান যুক্তি আনছি।

মোল্লা আলী কারী হানাফি “মউজুয়াতে কবির” পুস্তকে “ওয়াজকারীদের অবস্থা” থেকে সংগৃহীত তখনকার অবস্থা সম্বন্ধে আলোকপাত করা মাত্র কয়টি পয়েন্ট এখানে উদাহরণ হিসাবে আনছি।

(১)        হযরত আবু বকর ও ওমর কারো মুখে কোন হাদিস শুনলে বর্ণনাকারীকে সেই হাদিস সংক্রান্ত অন্য সাক্ষী উপস্থিত করতে আদেশ করতেন।

(২)       অধিকাংশ কথক ও ওয়ায়েজ তফসির ও তার রেওয়ায়েত এবং হাদিস ও তার মর্যাদার ক্রম সম্বন্ধে অজ্ঞ ছিলেন।

(৩)       এদের সম্বন্ধে একটি অসুবিধা এই যে এরা অজ্ঞ জনসাধারণের কাছে এমনভাবে কথা বলে যে, জ্ঞান বুদ্ধির দ্বারা যার মর্ম উদ্ধার করা অসম্ভব। অনেক সময় প্রামাণ্য ও সহী হলেও ঐ সব উক্তি দ্বারা নানা প্রকার বাতিল আকিদা ও ভ্রান্ত বিশ্বাস সৃষ্টি হয়ে যায়।

(৪)       ইমাম আহমদ কৃত মুসনাদে, সহী সনদে, তাবরানীতে ও অন্যান্য বহু হাদিস গ্রন্থে তামীমদারীর ঘটনা বিবৃত হয়েছে। তামীম হযরত ওমরের নিকট ওয়াজের অনুমতি চাইলে প্রথমে তিনি অনুমতি প্রদান করেননি। শেষে তার বিশেষ অনুরোধে, ওমর তাকে একবার মাত্র অনুমতি দিয়েছিলেন। সেই একবার অনুমতি দেয়ার পরই তাকে তা বন্ধ করতে নির্দেশ দেয়া হয় এবং এ কৃত অপরাধের জন্য তাকে শাস্তি দেয়া হয়।

(৫)       আবু দাউদ ও নাসাই পুস্তকদ্বয়ে সহী সনদে বর্ণিত হয়েছে যে, সাহাবীদের সময় খলিফা বা তার নির্বাচিত ব্যক্তিগণ ব্যতীত অন্যের পক্ষে এই প্রকার ওয়াজ করা নিষিদ্ধ ছিল।

(৬)      তাবরানীর এক রেওয়ায়েতে বর্ণিত হয়েছে ইসরাইল বংশীয়রা এই প্রকার পৌরানিক গল্প গুজবে মত্ত হয়ে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে।

(৭)       ইবনে মাজা ইবনে ওমর হতে বর্ণনা করেন যে, হযরতের বা আবুবকর ও ওমরের সময় এই সকল গল্পের প্রচলন ছিলনা। আখেরী জামানায় মুসলমানগণ ঐ সব গল্পে মজে যে ধ্বংস পেতে বসবে, হযরত তারও স্পষ্ট ইঙ্গিত করেছেন (তাবরানী)।

ইহুদী জাতি তালমুদের মোহে মজে তৌরাতকে ভুলে ছিল। এভাবে আজ তারা মূল তৌরাত থেকে বহু দূরে অবস্থান করছে। খৃষ্টানেরা যীশু সংক্রান্ত আজগুবী গল্পগুজবকেই আকড়ে প্রকৃত যীশুকে হারিয়ে ফেলেছে। বর্তমান সময়টিতে ফতোয়া দেশে বিদেশে বিশেষ করে মুসলিম দেশগুলোতে একটি প্রচলিত আইনের মত চেপে বসেছে জনতার উপর। কথায় কথায় জনতাকে ফতোয়া দিতে দেখা যায়। এর সুফল কুফল দুটোই আছে, দু’টোই জনতাকে ভোগ করতে হয়।

ইসলাম আসে আজ থেকে ১৪০০ বছরেরও কিছু আগে। এটি এসেছিল এর আলোতে সবদিক আলোকিত করে দিতে এবং সকল অন্ধকার দূর করে দিতে। কিন্তু এটি ঠিক সেভাবে সঠিকভাবে পালন করা হয়নি। এর প্রধান কারণ মুসলমানরা এমন সব স্ববিরোধী সময় কাটিয়ে এসেছে এবং এখন মনে হয় অনেক অংকেই যেন ভুল রিডিং দিচ্ছে। মনে হচ্ছে কোথাও হয়তো কিছু ঘাপলা হয়েছে। এটি এমন বড় কিছু হয়তো না, তারপরও এটি খুঁজে দেখার কাজটি সঠিকভাবে করতে না পারলে নির্ঘাৎ আমরা গভীর তিমির অন্ধকারেই মিলিয়ে যাব। আর কাজটি সঠিকভাবে করতে পারলে উপকৃত হবারই কথা। সেই গলদ ধরতে পারলে সে শুদ্ধির কাজটিও করে নেয়া যায়। জং ধরা যন্ত্রাংশের মাঝে তেল দিতে হলে অবশ্যই আগে জেনে নিতে হবে কোন পার্টসএ সমস্যা হচ্ছে। একটি গতিশীল জিনিসের নির্ভেজাল গতির জন্য আমাদের কোন ইঞ্জিনে সমস্যা হচ্ছে সেটি আমাদের বিশেষজ্ঞদের অবশ্যই বুঝতে হবে। তারপর চিকিৎসার ব্যবস্থা করা যাবে, হয়তো সামান্য তেলই তাকে মসৃণ করে চলবার গতি ফিরিয়ে দিবে। ইতিহাসের সব কটি পাতা উল্টালেই দেখা যায় সব বেদনা হাসি কান্নার ধারাবিবরণী থরে বিথরে সাজানোই আছে। শুধু আশরাফুল মখলুকাতের সেই সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীবটির সেই মগজটিকে খাটাতে হবে, যা আমাদের সবার সাথেই একটি করে আছে।

খলিফাদের সচেতন যুগ চলে গেলে পরেই শুরু হল আমাদের প্রকৃত যুদ্ধের যুগ। দেখা যায় হাদিস মুসলমানদের এক বিরল সংগ্রহ। কিন্তু এর সাথে সাথে জমা হতে থাকে—জাল হাদিস—আবু হানিফা তার যুগে এর একজন কড়া প্রহরী ছিলেন—-শিয়া——আলী—-সুন্নী—দলাদলি—খারেজী—ফাতেমী—-সুফী—সালাফি—সপ্তদশ ইমামে বিশ্বাসী—-দ্বাদশ ইমামে বিশ্বাসী—-আলাওয়ি—কাদিয়ানী—হাজার তরিকার দলাদলি। এখানের সবকটিই আমাদের ধর্ম ইসলামের খুব জরুর ক্ষতের চিহ্ন। এমন একটি সত্য ধর্মে এসব হতেই পারেনা। এক নবীর এক আল্লাহর, এক গ্রন্থের ধর্মে এসব বিভেদ থাকতেই পারেনা। এখানের আমরা সবাই এক মায়ের সন্তান। এ ব্যাপারে আল্লাহর বক্তব্য হচ্ছে “তাদের মত হয়ো না যারা বিচ্ছিন্ন হয়েছিল ও মতভেদ করেছিল তাদের কাছে সুস্পষ্ট নির্দেশাবলী আসার পরেও। আর এরা এদের জন্য আছে কঠোর যন্ত্রণা” (সুরা আল ইমরানের ১০৪ আয়াত)”। এরকম আয়াত দেখার সাথে সাথে আমাদের সবারই ভয়ের উদ্রেক করার কথা। 

বিভেদের এ ত্রুটি প্রধাণত পূর্বেকার শাসক বর্গের ত্রুটি, এটি মোটেও ধর্মের বা কুরআনের নবীর বা তার সম্মানিত খলিফাদের ত্রুটি কখনোই নয়। এর শুরুটা তারাই করেছে যারা ধর্মকে ভাগ করেছিল। নিজেরা শোষকের আসনে বসেছিল এবং নিবেদিতপ্রাণ ধর্মের সঠিক অনুসারীকে সেদিন তারা কপট শাসনে হত্যা, গুম, বিষপান করিয়ে নিজের পথ পরিষ্কার করে। এসব কখনোই ইসলামের বিজয় যুগের কর্ম নয়। এসব ইসলামের কষ্টের পাতা উল্টালেই এসবের সন্ধান পাওয়া যায়। যদি মানুষ ঐ সঠিক গ্রন্থটির চৌধারে সঠিকভাবে থাকতো তবে তারা অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারত। যেমনটি তারা করেছিল অতীতে ইসলামের প্রাথমিক যুগে। তারপরও এত অনাচার যুগের ফাঁকে ফাঁকেও কিছু অসাধারণ কাজ হয়েছিল যা আজও জগতের বিস্ময় হয়ে আছে, ইউরোপের রেঁনেসা সম্ভব হয়েছিল যুক্তিবাদী বিজ্ঞানমনা মুসলিমদের জীবনধর্মী  কৃতকর্মের জন্য। ইতিহাস বলে মাঝের সময়টিতে মুসলমানরা তাদের চিন্তাকে শৃংখলিত করে ফেলে।

বর্তমানে সচেতন জনতারা গবেষনা, বুদ্ধিবৃত্তিক অনুসন্ধান, সৃষ্টিশীল কাজ, উৎপাদনশীল কাজ যা মানুষের জীবনকে উন্নত করে তার চর্চা করে। এর বিনিময়ে মানুষ সংগ্রাম করে বেঁচে থাকার প্রেরণা পায়। এসবের উপর দক্ষতার কারণেই মানুষ গোটা বিশ্বের যে কোন জায়গার অবস্থান যে কোন সময়ে আগে থেকেই ধারণা করতে পারে। মানুষ আজ উচ্চচাপ নিম্নোচাপ, বাতাসের গতিবেগ বরফ বৃষ্টি ভুমিকম্প, প্রাকৃতিক দুর্যোগ সম্বন্ধে আগে থেকে ধারণা পেয়ে যাচ্ছে। বিজ্ঞানের এ আলোর যুগে এটি বুঝা উচিত যে, এসব কেমন করে হচ্ছে। মানুষ তার সঠিক জ্ঞান বিজ্ঞানকে কাজে লাগিয়েছে বলেই সেই “ইকরা” অর্থাৎ “পড়” কথাটির উপযুক্ত মর্যাদা দান করার জন্যই মানুষ আজ এ পর্যন্ত আসতে পেরেছে। এত কিছুর মূল সূত্র সেই “ইকরা” এবং এর উপর চর্চা চালিয়ে যাওয়া। কুরআন সব সময়ই যুক্তির প্রচার করে, জ্ঞানের প্রচার করে, সঠিক সত্যই তার প্রধান অর্জন। ফতোয়া কিন্তু সব সময় সেটি করছে না কারণ সেটি ক্ষেত্রবিশেষে ধরা পড়ছে কুটিল মানুষের হাতের সাজানো এক মানবিক সৃষ্টি। মানুষের তৈরী “ফতোয়া” কখনোই আল্লাহর কোন বিধান নয়। আমার দোররা লেখাতে আমি দেখিয়েছি কিভাবে একে আল্লাহর বাণীর বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে অনেক সময় অকুরআনীয় জিনিস দেদারসে প্রচার করা হচ্ছে ফতোয়ার মাধ্যমে এতে এটি প্রমাণিত হয় যে এসব দ্বারা শুধু যে ধর্মের বাণী ছড়ানো হচ্ছে সেটি যেমন সঠিক নয়, আবার এসব দ্বারা সঠিক কুরআনেরই প্রতিষ্ঠা হচ্ছে সেটিও সঠিক নয়। কুরআন প্রতিষ্ঠার জন্য সবচেয়ে বেশী দরকার এর উপর আমল করার। আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর এর ভাষ্যে ইহুদীরা নবী মোহাম্মদের কাছে একজন ইহুদী নারী ও পুরুষকে ব্যভিচারের অপরাধী হিসাবে ধরে আনে। তিনি তাদেরে পাথর মেরে মারার হুকুম দেন। (বোখারী ২৩ নং বই হাদিস নং ৪১৩) । যদি তিনি এর বিচার করতেন কুরআনের ভাষ্য মতে তবে অবশ্যই তিনি তাদেরে দোররা মারার নির্দেশ দিতেন। কিন্তু উল্লেখ্য এরা ইহুদীরা ঐ সময়টিতে তারা নিজেরাই ছিল নবী মোহাম্মদ(সঃ) এর জন্য একটি বিষফোঁড়া। আজও অনেকে শান্তির নবীকে শুধু ঐ মদীনার ইহুদীদের কারণে মনে করেন তিনি একজন যুদ্ধবাজ ছিলেন। যদিও এসব প্রকৃত ঘটনা নবীকে কখনোই যুদ্ধবাজ প্রমাণ করেনা। কিছু সংখ্যক ইউরোপীয় পন্ডিতেরা সেটিই দেখাতে চেয়েছেন, যার জের ধরে আজো মুসলমান গোটা বিশ্বে সন্ত্রাসী টেররিস্ট বা যুদ্ধবাজ। তাদের শাস্ত্র মতেই রাষ্ট্রের প্রধান হিসাবে তাদের বিচার করতে তিনি ন্যায়ত বাধ্য ছিলেন। তিনি সবদিন তার প্রতিটি কর্মেই সৎ থাকতে চেয়েছেন এবং থেকেছেনও। তিনি কোন সময়ই অন্যধর্মের উপর অযথা সংহারকারী ছিলেন না। তাদের ধর্মগ্রন্থকে তিনি অপমান করতে পারেন না। তাই তাদের বিচার তাদের ধর্মগ্রন্থ হিসাবেই হয়েছে।

এমন এক যুগে দেখা যায় মুসলমানরাই জ্ঞান বিজ্ঞানের প্রকৃত দিশারী ছিল। এই মধ্যযুগীয় মুসলমানদের হাতেই ভূগোল, বিজ্ঞান, পদার্থবিদ্যা, জ্যোতিষশাস্ত্র গৌরবের সাথে তার অতীত ঐতিহ্য আজও প্রচার করে তার প্রামাণ্যতা, যুক্তিভিত্তিকতা; এ সত্য কোন শত্রুও অস্বীকার করতে পারবেনা। কোন সে ক্ষমতার বলে মুসলমান সেই মধ্যযুগে এটি করতে পারলো যখন তারা জাহেলিয়াতের কবর থেকে উঠে দাঁড়িয়েছিল মাত্র। একটু পিছন ফিরে তাকান সচেতনরা; তবে স্মরণ রাখবেন একমাত্র সেখানে সে যুগে কিন্তু কোন ফতোয়া আজকের মত প্রতিষ্ঠা পায়নি। প্রতিকূল পরিবেশেও সে যুগে মানুষ হাতের কাছে পাওয়া ঐশীগ্রন্থের বানী অনুসরণ করে অনুসন্ধিৎসুরা এ বিজয় ছিনিয়ে এনেছে ঠিকই, মানুষ স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে পেরেছে, আল্লাহর পথে জীবনকে উৎসর্গ করেছে, স্বাধীনভাবে অর্জন জমা করেছে। ইসলামের ইতিহাসে এ তথ্যটিও পাওয়া যায় যে, সে সময় যারা ফতোয়াবাজ ছিল খলিফাদের হাতে তাদেরে কিভাবে কঠিন বিচারের সম্মুখিন হতে হত যেটি বর্তমানের সময়টিতে তারা মোটেও এর মুখোমুখি হচ্ছে না। যার ফলে কখনো কখনো জনতার অনাচার থেকে ফতোয়াবাজদের অনাচার বড় হয়ে দাঁড়াচ্ছে। মানুষের প্রধান পাপ সত্য বিমুখীনতা। এর দায় মূলত পুরাপুরি বর্তমান যুগের মুসলমানকেও দেয়া যায় না। এপাপের গুরুভারে সেই পূর্ব যুগের কিছু সংখ্যক অনাচারী কপট শাসকবর্গের সম্মিলিত প্রয়াসের কারণে আজও আমরা পরবর্তীরা দিশেহারা। তারপরও বর্তমান সময়কার জনতাদের উপর ওটুকু দায়িত্ব অবশ্যই বর্তায় প্রকৃত সত্যকে বুঝে নেবার। তাদের বুঝা উচিত তারা কতটুকু অবিচার করে চলেছে তার সঠিক ধর্মের সিলেবাস নামের সেই মূল গ্রন্থটির উপর এবং তার নিজের বিবেকের উপর। রসুলের একটি হাদিস হচ্ছে বিবেকই তোমার শ্রেষ্ঠ অস্ত্র। সাহাবী মোয়াদকে যখন যুদ্ধের জন্য পাঠাবার চিন্তা করা হয় তখন প্রিয় নবীর একটি প্রশ্নের জবাবে সেনাপতির মুখ থেকে এরকম একটি বাণী শুনে তিনি যারপর নাই খুশী হয়েছিলেন। প্রশ্নটি ছিল তিনি কিভাবে সমস্যার সমাধান করবেন? সেনাপতি মোয়াদের জবাবটি ছিল প্রথমে তিনি খুঁজবেন আল্লাহর কুরআনের নির্দেশ সেখানে কিছু না পেলে তিনি দেখবেন রসুলের চলা থেকে কিছু জমা করতে পারেন কি না, তাও যদি না পান তখন তিনি তার বিবেককে অগ্রাধিকার দিবেন।

রেঁনেসা পূর্বযুগে খোদ ইউরোপবাসী গভীর ঘুমে অবচেতন ছিল কিন্তু ইতিহাসে প্রমাণ পাওয়া যায় একটি আলোর ধারা এরও আগে কোথাও জ্বলেছিল মানুষকে উদ্দীপিত করে দিতে কিন্তু সে সময়টিতে এ মুসলিমরাদের চেয়ে বেশী কেউ দক্ষ ছিলনা যে এর মূল্যবান বানী ধরে রাখবার ক্ষমতা রাখত। সে সময়টিতে মুসলমানরা সে শূণ্যস্থান পূরণ করে নিজেদের যোগ্য কর্মকৃতিত্বের বলে। উমাইয়া ও আব্বাসীয় শাসকেরা জ্ঞান বিজ্ঞানের উৎকর্ষতা সাধনে অনেক সুশৃংখল কাজ করে যায়, যার ঋণ কখনো বর্তমান বিশ্ব অস্বীকার করতে পারবে না। এখানে ঐ সময়কার মুসলমান সম্বন্ধে ফিলিপ কে হিট্টির লেখা একটি কলাম আনছি। “আব্বাসীয় যুগের পর বিজ্ঞানের কোন বিভাগেই আর কোন উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয় নাই। আজকের মুসলমানরা কেবল তাদের নিজের বইএর উপর নির্ভর করলে তাদের সেই সুদূর একাদশ শতাব্দীর পূর্বপুরুষদের চেয়ে নীচেই তাদের স্থান হবে। চিকিৎসা, দর্শন, গণিত, উদ্ভিদবিদ্যা, ও অন্যান্য শাস্ত্রে মুসলমানরা একটি নির্দিষ্ট মান পর্যন্ত ওঠে। তারপর যেন মুসলিম জগতের মান স্তব্ধ হয়ে দাঁড়ায়। ধর্ম ও বিজ্ঞানঘটিত অতীত ঐতিহ্যের প্রতি অন্ধভক্তি আরব বুদ্ধিকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করে ফেলেছে; কেবল ইদানীং তারা শৃংখল ভাংতে শুরু করেছে” (আরব জাতির ইতিকথা, পৃষ্ঠা ১৪৩, ফিলিপ কে হিট্টি, অনুবাদে অধ্যক্ষ ইব্রাহিম খাঁ) ।

ইসলামের ইতিহাস ঘাটলেও এ তথ্য পাওয়া যায় যখনই মুসলমান পৌরানিক গল্প, মিথ্যা, সত্য নয় এমন সব বাড়তি অর্জন, নিজেদের অপকর্মে স্থায়ীভাবে তাদের আমলে যোগ করে তারই চর্চা করতে থাকে। তখন থেকেই প্রকৃত পক্ষে প্রকাশ্যে তাদের হতাশার ব্যর্থতার কাল শুরু হতে থাকে। এর আগের বিজয় যুগের অসামান্য কৃতিত্ব বিশ্বকে চমৎকৃত করেছে। মাঝের পথে কিছু ছলবাজদের দ্বারা ধর্মটিতে অনেক ভাঙ্গন ধরে এবং এর অনেক সর্বনাশ হয়। এত কষ্টের ভেতর থেকেও ইসলামের ইতিহাস থেকে গজিয়ে উঠা আবু হানিফাদের মত গুণীজনরা ইসলামের মুমূর্ষু দশাকে জীবন্ত করে তোলেন। অপর পক্ষের কুটিলতা ধর্মটিকে যেভাবে বিদ্ধ করেছে, আহত করেছে ঠিকই তারপরও বিজয় অর্জিত হয়েছে আশাতীতভাবে। এ শৃংখলিত করণের প্রধান অস্ত্র আর কিছু নয় এটি শুধু “ধর্মের নামে বিলি করা ভুল ফতোয়া” । যেদিন থেকে এসব সৃষ্ট হয়ে পালিত হয় ও চর্চিত হয় সে দিন থেকে জড়তা আমাদেরে পেয়ে বসে।

আল্লামা এবনে খাল্লেদুন জগতে সর্বপ্রথম দার্শনিক হিসাবে ইতিহাসের সমালোচনা করেন, মোকাদ্দমা ইতিহাসের এক অনুপম সম্পদ। এর ভূমিকায় তিনি লেখেনঃ “আরবদিগের মধ্যে কোন শাস্ত্রগ্রন্থ বা জ্ঞান বিদ্যমান ছিল না । অসভ্যতা ও মূর্খতায় তারা আচ্ছন্ন ছিল। সৃষ্টিতত্ত্ব, তার পুরা কাহিনী, তার বৈচিত্র ও অন্যান্য বিষয়ে যখন তাদের জানবার দরকার পড়তো তখন তারা আপন প্রতিবাসী ইহুদী ও খ্রীষ্টানদের কাছ থেকে জ্ঞান আহরণ করতো। কিন্তু সে সময় আরবে যে সব ইহুদী বাস করতো, মূর্খতায় তারাও আরবদের সমান ছিল। ঐ শ্রেণীর জনসাধারণের পক্ষে তৌরাৎ সম্বন্ধে যেরূপ এবং যতটা জ্ঞানলাভ করা সম্ভব, তার অতিরিক্ত কিছুই তারা জানতো না।” তিনি আরো বলেন, “আমাদের লেখকগণ ঐ সকল কিংবদন্তি ও গল্প গুজব নকল করে তফসিরের কেতাবগুলিতে ঢুকিয়ে দিয়েছেন। এ সকল গল্পের মূল মূর্খ ও অজ্ঞ মরূপ্রান্তরবাসী ইহুদীদের নিকট থেকে গৃহীত। অথচ যারা তা নকল করছেন, তার সত্যাসত্য তারা পরীক্ষা করেও দেখেন নাই (মোকাদ্দমা এবনে খল্লেদুন)।

যে সকল সাহাবী খ্রীষ্টান ও ইহুদী ধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, তাদের আর অপরের নিকট থেকে এসব গ্রহণের কোন আবশ্যকতা ছিল না। তাদের সংস্কার ও প্রবাদগুলি তাদের সংস্কার ও পৌরানিক কাহিনীগুলি—বহুস্থানে বিকৃত অবস্থায় নব দীক্ষিত মুসলমানদের মধ্যেও বিস্তার লাভ করেছিল। শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া এ প্রসঙ্গে বলেন, “কিন্তু অধিকাংশ লোকই ভ্রম প্রমাদ হতে মুক্তি পেতে পারেন না। ছাহাবীগণের মধ্যে এরূপ লোকও ছিলেন, যারা সময় সময় ভ্রম করতেন, তাদের পরবর্তী সময়েও এই অবস্থা। এই জন্য ছহী আখ্যায় যে সকল হাদিছ সঙ্কলিত হয়েছে তার মধ্যে এরূপ হাদিছ সবও আছে যা ভ্রম বলে পরিজ্ঞাত” (কেতাবুল তাওয়াচ্ছোল-৯৬পৃষ্ঠা) ।

হাজার ফতোয়া প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে যদি একটি কুরআনের আয়াতকে কোনোভাবে অপমান করা হয় তা হলে একজন পরীক্ষকের কাছে সে ছাত্রের রিজাল্ট কি জমা করতে পারে সেটি কি পাঠকেরা ভেবে দেখেছেন? এবার নিজেদের পরিমন্ডলে ফতোয়ার ভুমিকা যদি দেখি তবে আঁতকে উঠতে হয়। আমরা মেয়েরা এসব ব্যাপারে কোন কথাই বলতে পারতাম না যদি ফতোয়া আমাদের অতীতে যেভাবে গাইড করতে শুরু করেছিল আমরা যদি সেভাবে চলতাম। হাত পা গুটিয়ে বসে থাকতাম চারদেয়ালের ভিতরে, না কোন বিদ্যা অর্জন করতাম না আলোর রাস্তা খুঁজে পেতাম। যদিও সেদিন আমাদের সে রাস্তা ফতোয়া বন্ধ করতে পারে নি। আমার মায়ের মুখে শুনেছি সে সময়ে মুসলিম মেয়েদের লেখাপড়ার উপর ছিল প্রচন্ড আপত্তি। যার জন্য আমার নানা তাদেরে গ্রাম থেকে শহরে স্থানান্তরিত করেন শুধু লেখাপড়া করার জন্য। আর আমরাও যে একদম এ আচারে বিদ্ধ হইনি তাও নই। আমরা নিজেদের জীবনেও এর অপপ্রয়োগ হতে দেখেছি আমার নিজের উপর তেমন প্রভাব না ফেললেও আমার সহপাঠি অনেকেই আছেন যারা এ কষ্টের মাঝে তাদের বেদনার কথা আমাকে জানিয়েছেন। সে হিসাবে আমি ভাগ্যবানদের একজন। আমার পূর্বপুরুষের আলোকিত চিন্তাধারা তাদের বিলি করা শিক্ষা আমাকে কিছুটা হলেও আলোর পথ দেখিয়েছে, জীবনকে পরখ করতে শিখিয়েছে। যে বান্ধবীটি তার শিক্ষা চালিয়ে যেতে পারে নি বলে এত আক্ষেপ করেছে আজ যথেষ্ঠ পরিণত বয়সে এসে পিছন ফিরে দেখলে তাদের কথা মনে পড়ে এবং তখন মনে হয় এ বেদনার কথা, এ কষ্টের কথা সবাইকে জানাই চড়া গলায়। আর এ কাজটি তারা করেছে একমাত্র ধর্মের নাম নিয়েই, ধর্মের আচার বলেই তারা এটি প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে। আল্লাহর প্রথম বানী “ইকরা” অর্থাৎ “পড়” যেটি প্রচার করার কথা ছিল তাদের তারা এভাবে ঐশী বাণীর বিরুদ্ধে বেরিকেড তুলে ধরে।

ঐতিহাসিক আন্দালেসির ভল্যুয়ম ১, পৃষ্ঠা ৩৩৪-৩৪৮ পৃষ্ঠাতে যে তথ্যটি পাওয়া যায় সেখানে দেখা যায় শাসকবর্গের শাসন ক্ষমতা দখলের সময়কার অনাচার দেখে বেশ কিছু সংখ্যক সম্ভ্রান্ত মহিলা এসবের জবাব চাইছিলেন স্বয়ং রাষ্ট্রক্ষমতাতে অধিষ্ঠিত শাসক মোয়াবিয়ার কাছে। তখন তাদের সে জবাবে বিব্রত শাসক বার বার বদর, ওহুদ সিফফিন এর উদাহরণ টানার চেষ্টা করছিলেন। এ কথাটি প্রমাণ করে সে সমাজের মেয়েরাও রাজনৈতিক বিতর্কে জবাবদিহিতার দরকার মনে করেছেন যেখানে আজ চৌদ্দশত বছর পরও অনেক শিকলে মেয়েদেরে বেধে রাখা হয়েছে। একটি কথা আছে বেশী টাইট দিতে গেলে রশি ছিড়ে যায়। কিছু দিন আগে শুনা গেল কানাডাতে এক মেয়েকে তার বাবা শাস্তি দিতে গিয়ে মেরে ফেলেছে। এটি কখনোই ইসলাম নয়, এটি একটি দুর্ঘটনা। কিন্তু এরকম একটি দুর্ঘটনা যখন ইসলামের ঘর থেকে হয় তখন বাড়তি চিন্তা হয়। ইউরোপ আমেরিকান সমাজে অজস্র অনাচার হয় হচ্ছে তা নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না, নিছক খবরে স্থান পায়। ইসলামের সদস্যদের কৃত এরকম একটি উদাহরণ খোদ মুসলমানকেও চিন্তায় ফেলে দেয়। আর প্রতিপক্ষ তো একে বাড়তি ধারালো যুক্তি বলে মনের আনন্দে মিডিয়াতে জিনিসটি ছড়ায়। এটি আমাদের সুন্দরকে সত্যকে সবদিকেই বিধ্বস্ত করে। আমাদের অপরিনামদর্শীতার ক্ষতিকর প্রভাবে আমরা কিভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হই সেটি সচেতনরা একটু ভেবে দেখবেন এবং প্রকৃত ইসলাম দরদীরা অবশ্যই সেটি পরখ করবেন। কুরআনের একদল টীকাকার ইহুদী ও খৃষ্টানদিগের পুস্তক পুস্তিকা ও বাচনিক কিংবদন্তিগুলোকে কিরূপ নির্মমভাবে কুরআনের তফসিরে প্রবেশ করিয়ে দিয়েছেন। তার প্রমাণ হিসাবে একদল লোক ইহুদী ও খৃষ্টান দিগের অনুকরণে বলেছেন যে, কোরবানীর জন্য হযরত ইসমাইলকে নহে বরং হযরত ইসহাককে উপস্থাপিত করা হয়েছিল (জাদুল-মাআদ, ১ম খন্ড, ১৪-১৭ পৃষ্ঠা) । আর আমাদের শীতনিদ্রার গভীরতার কারণে আমরা এখনো ঘুমিয়ে আছি। দলে দলে ভাগ হয়ে ধর্মের নাম নিয়ে আমরাই আমাদের ভাইকে মারছি।

কিন্তু নবীর যুগে বা খলিফাদের যুগে বর্তমান সময়কার অনেক কিছুই সে সময় উপস্থিত ছিল না। আর আমাদের সত্যিকারের মুমিনদের সেই আলোকিত যুগকেই অনুসরণ করার কথা। “বক্রপথের যাত্রীরা সাবধান, আল্লাহ তোমাদের সম্বন্ধে গাফেল নন” (সুরা আল ইমরানের ৯৮ আয়াত) । আজকের যুগে দেখা যাচ্ছে সারা বিশ্ব জুড়ে ধর্ম নিয়ে দেশ নিয়ে অনেকেই বক্রপথে চিন্তা ভাবনা করছেন তাদের সবার জন্য এসব আল্লাহর নির্দেশনামা, হুশিয়ারীবাণী সন্দেহ নেই। তাদেরে অবজ্ঞা করে অন্য আরো ছলবাজদের অনুকরন কখনোই ধর্মের অঙ্গ হবার কথা নয়। সেটি একজন ফতোয়াবাজ, রাজনীতিবিদ, এককথায় অপকাজে উৎসাহী সবাইকেই আজ ভাবতে হবে। আমরা তপজপে ব্যস্ত থাকলেও ধর্মের মূল গবেষণাতে নেই, সত্যের পর্যালোচনা থেকে বর্তমানে আমাদের অবস্থান অনেক দূরে। তাই অনেক ভুলকে অনেকেই অজ্ঞতার কারণে মনে করে থাকেন এটিই ধর্ম। এখানে তাদের আন্তরিকতার পরিচয় যদিও পাওয়া যায় কিন্তু সঠিক বিবেককে কাজে না লাগানোর গলদের কারণে প্রকৃত সত্য থাকে বহু দূরে। আল্লাহর কাছে সঠিক সত্যের জন্য সাধনা করতে হবে, দোয়া চাইতে হবে, মধ্যপন্থা সিরাতুল মোস্তাকিমের সহজ সরল রাস্তায় চলবার জন্য প্রতিদিনকার প্রার্থনা যেটি প্রতিটি মুসলিম জনতা নামাজে বহুবার উচ্চারণ করে থাকেন তাকে মনের মাঝে গেঁথে বাস্তবে তারই প্রতিফলন ঘটাতে হবে। তা হলেই আমাদের এবাদত, সালাহ আল্লাহর দরগায় ত্বরায় গিয়ে পৌছাবে এবং আমাদের জন্য ইতিবাচক অর্জন জমা করে আনবে। অন্যথায় আমাদের প্রার্থণা উদ্দেশ্যহীন নিস্ফল প্রয়াস হিসাবে অরন্যে রোদন করেই যাবে।

 

বিশেষ দ্রষ্টব্য: (লেখাটি বাংলাদেশে দৈনিক আমার দেশ থেকে ছাপে ২০১১ সালের ১২ মার্চ। লন্ডন থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক সুরমাতে ১৮-২৪ মার্চ, ২০১১ সংখ্যাতে ছাপে)। এসব লেখা কখনোই পুরোনো হয়না। যুগের প্রয়োজনে এর অবদান সবদিনই মানুষকে জাগিয়ে তুলতে সহায়ক হয়। তাই ২০২০ সালের জুনের ৮ তারিখে লেখাটি আবার আপলোড করলাম আমার ব্লগে। আল্লাহ আমাদের প্রকৃত সিরাতুল মোসতাকিমের সরল সত্যের পথে পরিচালিত করুক।

 

 

 

 

আমরা কি আল্লাহর রমজান করছি?

নাজমা মোস্তফা

কুরআন গ্রন্থটি বিবেকবানদের জমা: শিরোনামের কথাটি খুব নতুনের মত শোনালেও এটি অনেক দিনের পুরানো কথা। আল্লাহ বলেন, “এ গ্রন্থে নিদর্শন রয়েছে বিচার বুদ্ধি থাকা মানুষের জন্য” (২:১৬৪ আয়াত)। মাত্র আমরা আমাদের করোনা ঈদ সারলাম যে যার মত। অদ্ভুত অভিনব মাত্রা যোগ হলো এবারের ঈদে। ঈদ পরপরই নাড়া পরে যায় শাওয়ালের রোজার তাগাদা আসতে থাকে চারপাশ থেকে। অনেক আগে আমার জীবনে এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছিল এই ঈদ পরবর্তী রোজা নিয়ে। যাক সে কথা আর নাড়ছি না। এবারের নাড়া আমার সৌদি প্রবাসী এক বোনের ফেসবুকেও এর তাগাদা আসে। বোনটি আমার খুব প্রিয়। শত ব্যস্ততার মাঝেও মাঝে মাঝে যোগাযোগ মানে কথা হয়। আর বাকী সারা বছরই ইন্টারনেটে এটা ওটা দেয়া নেয়া চলেই। সে তার মত ইসলামের দাওয়াত দিয়ে যাচ্ছে অনেক দিন থেকেই। এবার কেন জানি নাড়তে গেলাম। এর কারণ তাকে আমি জাগিয়ে তুলতে চেষ্টা করলাম। ভালো করলাম কি মন্দ করলাম জানি না। আমার কর্তব্য মনে করেই করলাম। তার ফেসবুকে রমজান পরবর্তী ৬ রোজার উপর যে কমেন্ট করলাম সেটি এখানেও করছি। আমার যুক্তি ছিল, “এসব কথা কুরআন দ্বারা প্রমাণিত নয়। কুরআন দ্বারা প্রমান করা না গেলে তা হাদিস হতে পারে না। প্রতিটি মুসলিমকে কুরআনে ফিরতেই হবে। এ ছাড়া মুসলিমদের সামনে পিছনে উপরে নীচে কোন মুক্তির রাস্তা নেই। পূর্ববর্তী ইহুদী জাতি এসব অপকর্ম করে ধ্বংস হয়েছে, আল্লাহ তাদেরে বলেছেন, এরা গাধার বোঝা বয়ে বেড়িয়েছে (সুরা জুমআহর ৫ আয়াত দ্রষ্টব্য)। মুসলিমদেরে বার বার সাবধান করা হয়েছে মুসলিমরা যেন তা না করে, এ আয়াতই তার প্রমাণ। ইহুদী জাতি এইভাবে তালমুদের মোহে মজিয়া তৌরাতকে বিস্মৃত হইয়াছে (মোস্তফা-চরিত, মোহাম্মদ আকরম খাঁ পৃষ্ঠা ৭৪)।  ধর্মকে বাড়ানোর কমানোর কোন অধিকার কারো নেই। কুরআনের হিসাবে যারা এসব করবে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কাজেই কামনার অনুবর্তী হয়ো না পাছে তোমরা ভ্রষ্ট হও। আর যদি তোমরা বিকৃত করো অথবা ফিরে যাও, তবে নিঃসন্দেহ তোমরা যা করছো আল্লাহ হচ্ছেন তার পূর্ণ ওয়াকিফহাল।” (সুরা নিসার ১৩৫ আয়াত)। “তোমার প্রভুকে ডাকো বিনীত ও গোপনীয়তার সাথে। নিঃসন্দেহ তিনি সীমালংঘনকারীদের ভালোবাসেন না” (সুরা আল আরাফের ৫৫ আয়াত)। বোঝার সুবিধার জন্য এখানে কয়েকটি আয়াত আনলাম। আল্লাহ সবার সুমতি দিক, আর মূল সত্যে অটুট রাখুক। এর প্রতিউত্তরে বোনটি আমার হাদিসের গুরুত্ব বুঝিয়ে জবাব দিল। হাদিস অনুসরণ না করলে যদি আমরা ধ্বংস হয়ে যাই।

শাওয়ালের ছয় রমজান: এর পরের জবাব হিসাবে আমি লিখলাম। “আমি হাদিস অস্বীকার করছি না। কুরআনে যা বলা নেই, সে রকম নির্দেশ হাদিসে আসতে পারে না। নবী এমন কাজ জীবনেও করেন নাই। এমন ধৃষ্ঠতা তিনি কখনোই দেখান নাই। আল্লাহর নির্দেশের বাইরে তিনি কিছুই বাড়তি করেন নাই। পরবর্তী মানুষরা অনেক অনাচার করে কিন্তু নবী সেরকম অনাচার করেন নাই। আল্লাহ কুরআনে নবীকে উদ্দেশ্য করে সাবধান বাণী উচ্চারণ করেছেন আয়াত দ্রষ্টব্য। “সেক্ষেত্রে আমরা নিশ্চয় তোমাকে দ্বিগুণ শাস্তি আস্বাদন করাতাম ইহজীবনে এবং দ্বিগুণ মৃত্যুকালে” (সুরা বনি ইসলাইলের ৭৫ আয়াত)। কুরআন বিচ্যুতির অপকর্ম করলে রসুলের জন্য দ্বিগুণ শাস্তি বরাদ্দ হবে, এককালে নয়, উভয়কালে ইহকাল ও পরকালে। এতে খুব সহজে বুঝা যায় এসব জইফ অর্থে দুর্বল হাদিস সাজানো হয়েছে। ঠিক একই কাজ করেছিল ইহুদীরা পূর্ববর্তী যুগে, যার কারণে তাদের হাত থেকে ধর্মটি ছিনিয়ে নেয়া হয় এবং এক দল নব্য গোত্র মুসলিমদের এটি দেয়া হয়। এসব নীতিতে কড়া থাকতে নবী বার বার সাবধান করে গেছেন। কিন্তু শেষ জামানার মানুষরা এসব ভুলে বসে আছে। এসব সাবধান বাণী কুরআনেও আছে। ইহুদীরা মনের মাধুরী দিয়ে তাদের মনগড়া তালমুদ সাজিয়েছিল। কুরআনে যদি একবারও বলা থাকতো যে তুমি এক মাস+ রোজা করো। সম্ভব হলে একজন পারলে সারা বছরই রোজা করতে পারে কোন অসুবিধা নেই। কিন্তু রসুলের নাম নিয়ে এটি প্রচার করার কোন যুক্তি নেই। উপরের আয়াত পড়ার পর কি মনে হয় রসুল এ কাজটি কখনো করবেন? যদি করতেন তবে তার জন্য দ্বিগুণ শাস্তি বরাদ্দ থাকতো, এটি কুরআনের বাণী। এসব হচ্ছে শেষ জামানায় ইসলাম ধ্বংসের নমুনা। সিলেবাস বাড়ালেই ধর্ম উত্তম হয়ে যায় না। এ জন্যই বলা হয়েছে প্রকৃত মুমিনের রাস্তা খুব কঠিন। সেখানে কোন বাহূল্য বা কমতি কোনটাই সমর্থণীয় নয়। এটি ফুলসিরাতের রাস্তা, সহজ সরল জটিলতামুক্ত। এ জন্যই তার নাম সিরাতুল মোসতাকিম। সুরা জুমার ২৩ আয়াতটি কুরআনের রক্ষাকবচ, পড়ে দেখো।” এরপর দেখলাম আমার মেইলেও সমপর্যায়ের শাওয়ালের রোজার বন্দনায় অনেক মেইল জমা হয়েছে। এটি আমার বোনের ত্রুটি ছিল না। এ আচরণ চলমান সমাজের অর্জন, ইউটিউবে দেখি সারি বাধা সব বন্দনা গেয়ে গেছেন ইউটিউবের ধর্মপ্রচারকরা। ইন্টারনেটের নতুন এ সুযোগে কেউ বসে নেই। ঘরে ঘরে তাদের বাণী পৌছে যাচ্ছে। সঠিক বাণী ছড়াতে পারলে ভালোই ছিল কিন্তু যদি ভুল ম্যাসেজ এভাবে ছড়ায় সেটি ইসলামের জন্য সুখের নয়।

বিচারিক ভাবনা: পরিক্ষক টিচার যদি বলেন তুমি ১০ চ্যাপ্টার পড়বে আর ছাত্র যদি বলে আমি ১২ চ্যাপ্টার পড়বো। স্যার কি খুশী হবেন না বিরক্ত হবেন সেটি আপনাদের ভাবনায় জমা রাখুন। আর যদি ঠিকই ঐ ১০ চ্যাপ্টার পড়ে ছাত্রের দেয়া প্রশ্নোত্তরে টিচার বেশী খুশী হবেন, না ঐ ১০ চ্যাপ্টারের বাইরে আরো প্রশ্নের বাইরে ৫ পৃষ্ঠা বাড়তি লিখে আসলে টিচার বেশী খুশী হবেন। সেটি মানবিক বিচারের ক্ষমতায় টিচাররা বিচার করুন। হাদিসের বরাতে এরকমও বলা হচ্ছে যে, ছয়টি রোজা না করলে বস্তুত প্রকৃত রোজার সওয়াবই পাওয়া যাবে না। কুরআন কোন মহাভারতের গ্রন্থ নয়, বাইবেল নয়, তৌরাত নয় যে যার যা ইচ্ছে তাই যোগ বিয়োগ করতে পারবেন। এটি একটি পরিপূর্ণ সংরক্ষিত অসাধারণ গ্রন্থ যার দ্বিতীয় উদাহরণ দুনিয়াতে নেই। পূর্ববর্তী ঐশীগ্রন্থ সব বিকৃত হয়েছে, শুধু মাত্র এটি ব্যতীত। আল্লাহর কড়া নিরাপত্তায় এটি সংরক্ষিত। এর অনুসারীরা এটি বদলানোর কোন সুযোগ পায় নাই। কিন্তু এর পাশাপাশি এমন ভাবে হাদিস সব রচিত হয়েছে যাতে দেখা যায় কুরআনের বস্তুনিষ্টতা অনেক ক্ষেত্রেই ক্ষুন্ন হয়। এর গুরুত্ব কমাবার বা বাড়াবার অধিকার কাউকে দেয়া হয়নি। ইসলামে এই বাড়ানো কমানোকে বলা হয় বেদআত। আর রসুল বলেছেন, যারা বেদআত করবে তারা জাহান্নামে যাবে। যারা রসুলের নামে মিথ্যাচার করবে তারাও জাহান্নামে যাবে।

নবীর হাদিস ভাবনা ও ইতিহাস: আমরা জেনেছি জীবিত অবস্থায় রসুলের কথা কেউ লিখে রাখলে তিনি বিরক্তি প্রকাশ করেছেন। জবাবে বলেছেন, তোমরা কি করছো আল্লাহর কিতাবের পাশাপাশি আর একটি সংযোজন করতে চাও? তার মানে এসব করতে নিষেধ করেছেন। তারপরও যেসব কথা আবুবকর ওমর আলী(রাঃ)গংরা যৎসামান্য লিখে রেখেছিলেন তা তারা পরবর্তীতে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে বা ভিন্ন উপায়ে ধ্বংস করে দেন। তারা সবচেয়ে বেশী ভয় পান যখন শোনতে পান যদি কেউ নবীর নামে মিথ্যা প্রচার করে তবে তার ঠিকানা নির্ঘাৎ জাহান্নাম। তাই প্রাথমিক যুগের সাহাবীরা এত ভীত ও শংকিত ছিলেন কারণ কুরআনের জন্মের সাথে বিশিষ্ট সাহাবীদের জন্মের ইতিহাস জড়িত ছিল। স্মরণ করার বিষয় সব সাহাবীই কিন্তু বিশেষ মর্যাদার এক কাতারের নন। সেখানে প্রাথমিক যুগের সাহাবীরা নবীর খুব কাছের ত্যাগী সহচর ছিলেন। বিশিষ্টরা জানতেন কুরআন কি আর জাহান্নাম কি? যার জন্য সাথে সাথে ওসব মিথ্যে হাদিস ময়দানে জমতে পারে নাই। বরং ২০০ বছরেরও পর এসব ময়দানের জমা, ততদিনে তারা প্রতিরোধকারীরা গত বিগত। তবে ঐ সময়ও অনেক প্রতারক মক্কা বিজয়ের পর এখানে এসে ঢোকে, যাদের সামনে অন্য কোন রাস্তা খোলা ছিল না। কিছু সংখ্যক আজীবনই ইসলামের শত্রু পক্ষ ছিল। ঐ সব ধূর্তরাই ইসলামের চাঁদোয়ার নিচে অবস্থান শক্ত করে শত্রুতা বহাল রাখে। এরা একদিকে মুসলিম অন্যদিকে মোনাফেক, কুরআন এদের স্বরুপ স্পষ্ট করে রেখেছে। এদের খারাপ অবস্থানের বড় প্রমাণ শিয়া সুন্নী বিভক্তি। এর দায় চতুর্থ খলিফা হযরত আলীরও নয় বা কোন নিবেদিতপ্রাণ মুসলিমেরও নয় কোন ভিন ধর্মীরও নয়; বরং সম্পূর্ণ দায় মুসলিম নামধারী মোনাফিকদের। সেদিন থেকে আজ অবদি মুসলিমদের দিশেহারা অবস্থান! এসব ষড়যন্ত্রীদের হাতেই ধর্ম প্রথম দু’ ভাগ হয়েছে। যারা প্রতিবাদকারী সঠিক মুসলিম ছিলেন তারা আজকের রাজনেতাদের ধর্মনেতাদের মত সেযুগেও নির্যাতীত হয়েছেন। ধুকে ধুকে মরেছেন। সব দিনই শক্তির তলানীতে স্বৈরাচারের কাজ এসব। এভাবে খুব কৌশলে মানুষকে মূল গ্রন্থ থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে।

কুরআন বিরোধী হাদিসের উদাহরণ: কুরআন দ্বারা প্রমান হয় বিবি আয়েশার বিয়ে হয়েছে পরিপূর্ণ বয়সে অপরদিকে হাদিস দ্বারা প্রমাণ করা হয় ৬ বছরে। মুসলিম কয়জন বাবা মা আছেন তার ৬ বছরের মেয়ের বিয়ে দিবেন ? প্রশ্নটি জমা রাখলাম। এসব মিথ্যা হাদিস রচনা করে আল্লাহ, নবী, কনে আয়েশা, তার বাবা আবুবকরসহ এখানের সবাইকে অপমান করা হয়েছে। এটি একটি মিথ্যা হাদিস। ব্যভিচারের শাস্তি হিসাবে মিথ্যা হাদিস দ্বারা নারীদের পাথর ছুড়ে মারার বিধান আনা হয়েছে যা মূলত ইহুদীদের বিধান ছিল। কুরআনে এর সমার্থক পাথর মারার কোন কথা নেই, হাদিস দ্বারা আমরা আল্লাহর বৈরী শক্তি হয়ে দাড়াচ্ছি। উদাহরণ হিসাবে সুরা তওবার ৮০ আয়াতে দেখা যায় আল্লাহ মোনাফেকদের সম্বন্ধে বলেন, “তুমি ওদের জন্য ক্ষমা প্রার্থণা করো অথবা তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থণা না করো, – তুমি যদি তাদের জন্য সত্তুর বারও ক্ষমা প্রার্থণা করো আল্লাহ কখনো ওদের ক্ষমা করবেন না। এটি এই জন্য যে তারা আল্লাহতে ও তার রসুলের প্রতি অবিশ^াস পোষণ করে। আর আল্লাহ দুষ্কৃতিকারী সম্প্রদায়কে পথ প্রদর্শণ করেন না।” এটি গেল কুরআনের ভাষ্য, এরা কিন্তু মুসলিম মোনাফিক এদের অন্তর আল্লাহর কাছে স্পষ্ট। এর উল্টো হাদিস রচনা করা হয়েছে, রসুল বলেছেন তিনি নাকি ঐ দুষ্কৃতিকারীর জন্য সত্তুরের বদলে একাত্তর বার দোয়া করবেন। আপনাদের কি মনে হয় রসুল বেয়াড়া অবাধ্য প্রকৃতির লোক ছিলেন!? যেখানে কুরআনে বার বার বলা হয়েছে তিনি একজন স্বভাব সুন্দর মানুষ। এসব হচ্ছে হাদিসের নামে অতি বাড়াবাড়ি, এ ধারার অসংখ্য হাদিস আছে মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। আর আল্লাহর জন্য ও নবীর জন্য গালির রসদ জমা করে চলেছে। এত এত স্কলাররা ময়দান গরম করেন, আজ থেকে চৌদ্দশত বছর আগে ধর্মটিকে কে বা কারা দু’ভাগ করলো কেউ রা শব্দও করে না। কারণ কি? ঐ দিন থেকেই তো মুসলিমদের ঘুম হারাম হয়ে যাবার কথা ছিল। তাদের এত ঘুমানো কি মানায়? তার সহজ জবাব হচ্ছে মুসলিমরা ক্রমে চেতন হারিয়ে ফেলেছে। এদের তিলে তিলে ধ্বংসের দিকে তাড়িয়ে নিয়ে চলেছে ইবলিস। ভাইকে দিয়ে ভাইকে পেটাচ্ছে। বাড়তি গোলা বারুদ কামান বোমা ছাড়াই ইসলাম ধ্বসের কাজ এভাবে চলছে।ইবনে মাজা ইবনে ওমর হতে বর্ণনা করেন যে, হযরতের বা আবুবকরের ওমরের সময় এইসব গালগল্পের প্রচলন ছিল না। আখেরী জামানায় (পরবর্তী যুগে) মুসলমানগণ ঐসব গালগল্পে মজিয়া ধ্বংস পাইবে, হযরত তারও স্পষ্ট ইঙ্গিত করেন (তাবরানী)। 

প্রশ্নবিদ্ধ টেররিস্টের সঙ্গা: ফেসবুকে একটি ভাই একটি লিস্ট শেয়ার করেছেন ইতিহাসের সব বড় বড় হত্যাকারীরা অমুসলিম, কেউই মুসলিম নন। তারপরও মুসলিমরা টেররিস্ট হয় কেন? তথ্যটি ছিল (১) বুশ ১০ লাখ ৫০ হাজার মুসলিম হত্যা করেও টেররিস্ট হয় না। হিটলার ৬০ লাখ ইহুদী নিধন করেও অপরাধী নয়। জুসেফ স্ট্যালিন ২ কোটি হত্যা করে ও ১ কোটি ৪০ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে অসুস্থ করে হত্যার পরও সে টেররিস্ট হয় না। মুসোলিনী ৪ লাখ হত্যা করেছে, সবাই খৃষ্টান, কিন্তু জঙ্গি হিসাবে চিহ্নিত কেন নয়? মাও সে তুং ১ কোটি ৫০ লাখ হত্যা করেও বৌদ্ধ জঙ্গি কেন নয়? অশোকা একজন হিন্দু ১ লাখ মানুষ হত্যা করেও হিন্দু জঙ্গি কেন নয়? অংসান সূচী লাখ লাখ রোহিঙ্গা হত্যা করে যাচ্ছে, ভারতের মোদি মুসলিম হত্যায় তার রক্ত এমনিতেই রঞ্জিত শতাব্দীর শুরু থেকেই, এখনো চলমান। ফেসবুকে এ প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তারপরও প্রথম বিশ^যুদ্ধ, দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধ, হিরোশিমা নাগাসাকিতে পরমাণু বোমা নিক্ষেপ, অষ্ট্রেলিয়ান আদীবাসী হত্যা, উত্তর দক্ষিণ আমেরিকার রেড ইন্ডিয়ান আদীবাসী হত্যা, সবকটি অপকর্মের সাথে মুসলিম ছাড়া বাকী সম্প্রদায়রা জড়িত থাকলেও কেন মুসলিমদের দিকেই শুধু বুলেট নিক্ষেপ করা হচ্ছে। এ জটিল প্রশ্ন ভাবনার উদ্রেক করার কথা। এ কথা কয়টি বহুদিন থেকে ফেসবুকে এখানে ওখানে ঘুরে বেড়ায়। তারপরও এসব থেকে কি আমরা শিখতে পেরেছি কিছু?

মুসলিমদের অপকর্ম: মুসলিমদের বিরুদ্ধে বাকী দুনিয়া, বোকাদেরে আসামী সাজাতে পেরেছে খুব সহজে। কারণ আমরা নিজেই নিজের ভাই কিলাই। যাদের সেরা হবার কথা তারা তলানীতে কেন? আল্লাহর মূল গ্রন্থ ছেড়ে মানুষ রচিত গ্রন্থ নিয়ে তারা মশগুল। তারা গবেষণাতে নেই, চর্চাতে নেই। অর্থ না বুঝে তপজপ সমাধান নয়। কুরআন বিরোধী কাজকর্ম কেমন করে হয় এখানে? সঠিক পথে থাকলে সারা দুনিয়া সত্যের আলোতে বিস্ফারিত হতে এত দিন লাগার কথা নয়। নবী গত হবার নিকট সময়েই গোটা দুনিয়া আলোর ঝলকানি দেখেছে। ১৪০০ বছরের বেশী সময় পার করেও তারা আত্মবিস্মৃত জাতি আজ কিল ঘুষি থাপ্পড়ের শিকার। কুরআনের মূল্যায়ন না করে সবাই ফতোয়াবাজ। কুরআন বিবৃত করা আল্লাহর কাজ। নবীর মাধ্যমে আল্লাহ এটি বিবৃত করেছেন কুরআনে। প্রাথমিক যুগে কেউ কুরআনের বাইরে ফতোয়াবাজি করলে তাকে বেত্রাঘাত করা হতো। কুরআন ও সত্য ইতিহাস বিমুখতার পাপেই মুসলিমরা মার খাচ্ছে। রসুল পরবর্তী প্রাথমিক যুগের কল্যাণে যে বিজয় সারা দুনিয়াকে আলোকিত করতে থাকে, যার সফল পরিণতিতে ইউরোপে রেনেসার জোয়ার আসে। ইত্যবসরে মুসলিমদের ঘরে খরা শুরু হয়ে যায়। নকল মিথ্যাচারী কিতাব সৃষ্ট অপকর্মে মুসলিম মানস মুখ থুবড়ে পড়ে। অবাক করা তথ্য হচ্ছে বাকীরা জাগরণ আনতে পারলেও শয়তানের তালিয়াতে মুসলমিদের অবাধ বিজয়ের দ্বার রুদ্ধ হয়ে যায় অতি অল্প দিনে। যখন ষড়যন্ত্রীরা সূতা নাতা ঠিক করছে তখন ময়দানের প্রকৃত সাধুরা কারারুদ্ধ হয়ে মরেন। ঠিক যেন আজকের কারাগারে আটককৃত রাজনেতাদের মত। আমরা খবর রাখি নাই, ইমাম আবু হানিফার পরিণতি ওটিই ছিল।

মুসলিমদের ব্যর্থতা: কিন্তু পরবর্তী মুসলিমরা খুব সেটি জানেও না, নাড়েও না, এসব ইতিহাসের তলানীতে পড়ে আছে। আজ মুসলিমরা কুরআন শরিফের বদলে অন্যসব শরিফ নিয়ে ব্যস্ত, যাদু টোনা, তাবিজ কবজ, জিন ভূতের গরম ব্যবসায় ময়দান গরম। যুক্তিহীন অবিজ্ঞানই ধর্ম, যদিও কুরআনই একমাত্র বিজ্ঞানময় বুদ্ধিমানের ধর্ম। আজকে বুদ্ধিমানের চেয়ে বেওকুফের ভিড় এখানে বেশী। এরা আর কত শত বছর পর জাগবে, আল্লাহই ভালো জানে? কুরআনকে তারা দূরে তাকিয়ার উপর বস্তনীতে বেধে রাখে, যাতে এর সুধা পান করা না যায়। সব কৌশল এতে প্রয়োগ করতে ইবলিস কোন কার্পণ্য করে নাই। কথা ছিল অক্ষরে অক্ষরে ওটি হজম করার পালন করার। পৃথিবীর পশ্চাৎপদ জাতি হয় কেন মুসলিমরা?সহজ জবাব, এরা সত্যের সমাদর করে নাই। সঠিক পথে থাকলে তারা শিখরে থাকতো। গভীর অধঃপাতে তারা! ঝাড়ফুক, তুকতাক, যাদু টোনা, মানুষ ঠকানো, জিন ভূতের ব্যবসায় কেমনে কুরআন আসে? কুরআন মানা ও উন্নতির নমুনা কি এসব! গুণে দেখুন চৌদ্দশত + বছর সময়টা খুব কম নয়। ঈসা নবী গত হলে পর মাত্র ৬ শতকের মাথায় আর একজন নবী এসেছেন, তার নাম মুহাম্মদ। ধর্মটি পরিপূর্ণ হলেও ইত্যবসরে চারপাশ আবর্জনায় ভরে উঠেছে। কিন্তু আমরা নির্বিকার। কোন পরিশুদ্ধির কাজে আমরা নেই, জোড়াতালি দিয়ে ধর্ম চলছে পূর্ববর্তী সব বিকৃত ধর্মের সাথে ছন্দ মিলিয়ে। এর ভিন্ন কথা ছিল। এটি সেরাপথ, সেরা ধর্ম, তার আয়োজনও হবে সেরা। সবাই আকৃষ্ট হবে। আজ কেন আমরা অপরকে আকৃষ্ট করার শক্তি হারিয়ে ফেললাম? আমাদের অপরিপক্কতা, ব্যর্থতা কেন আমরা মাপছি না!

সত্যের সাথে মিথ্যে মিশাই: সুরা বাক্কারাহএর (২: ৪২ আয়াত) বিপরীত চলা, মিথ্যা হাদিস রচনা করে প্রথমে অপমান করা হয়েছে আল্লাহকে পরে নবীকে। হাদিস কালেকশনের সময় কথা ছিল যারা মিথ্যা হাদিস রচনাতে ধরা খাবে, তাদের কোন হাদিস গ্রহণযোগ্য হবে না। সেটি কিন্তু শর্তের মাঝে থাকলেও অনুসরণ করা হয়নি। যারা মিথ্যা হাদিসে ধরা খেয়ে মার খেয়েছে পর্যন্ত, তাদের হাদিস বাদ দেয়া হয়নি বরং বার বার নেয়া হয়েছে। স্কলাররাও জোর কদমে আগুয়ান। তারা এক ধারার আত্মবিশ^াসে আছেন যে যাই বলছেন সবই সেরা যদিও কুরআন বিরোধী কথা বলছেন তারপরও মনে করছেন উত্তম বলছেন! এভাবে আমরা মুসলিমরা মিথ্যার মাঝে ডুবে আছি আকন্ঠ। ফতোয়া দিয়ে রেখেছে আল্লাহ, এবং সেটি কুরআন। আজকাল প্রতিটি মানুষই ফতোয়ার মালিক। সুতরাং মুসলিমরা মার খাবে না তো খাবে কে? কুরআন শুধু মুসলিমদের পথ নির্দেশিকা নয়। এটি গোটা বিশে^র পথ নির্দেশিকা। কুরআন সম্বন্ধে আল্লাহ নবীকে নিশ্চিত করেছেন এ গ্রন্থ সম্বন্ধে তুমি সন্দিহান হবে না। এটি পরিপূর্ণ ও ব্যখ্যাকৃত আল্লাহ কর্তৃক। মানুষের ব্যাখার বাইরে এটি সত্য দিয়ে মোড়া (সুরা আল আনামের ১১৫ আয়াত)। এর পরের ১১৭ আয়াতে আল্লাহ বলেন তুমি দুনিয়ার বাসিন্দাদের কথা শুনবে না, ওরা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করবে। তারা অসার বিষয়ের অনুসরণ করে আর আন্দাজের উপর চলে। এখানে ঐ অসার ও আন্দাজের বিষয় থেকে আমাদেরও শিক্ষা নিতে হবে। মূল সত্যে আমাদেরও ফিরতে হবে। এসব আয়াত দ্বারা কুরআন আজো আমাদের জাগানোর বাণী প্রচার করে যাচ্ছে, আমাদের সম্বিত ফিরলে ভালো।

ফতোয়া: ফতোয়া বলছে শাওয়ালের ছয় দিনের রোজা না রাখলে তোমার মূল রমজানই মর্যাদা পাবে না । সুতরাং কোন অবস্থায়ই এটি ছাড় দেয়া উচিত নয়। এটি করলে যে কেউ সারা বছরের রমজানের সওয়াব পেয়ে যাবেন। মনে হচ্ছে সওয়াব বন্টনের নথিটা তারা পেয়ে গেছেন। এটি তাদের আলমারিতেই জমা আছে। অংকটাও খুব সহজ করে বক্তারা করে দিচ্ছেন।  কিভাবে ৩৬০ দিনের হিসাবে নেকীর ভান্ডার ভরে উঠবে। (৩০ X ১০) = ৩০০ + (৬ X ১০)= ৬০, সর্বমোট ৩৬০। অঙ্কিয় বিন্যাসের এই যোগফলে নিজেদের প্রতিভায় নিজেরাই মুগ্ধ!  এসব সূত্র কিন্তু কুরআন নয়, এসব মানুষ রচিত গ্রন্থ হাদিসের অর্জন, সম্পূর্ণ কুরআনের উল্টোকথা, বেয়াড়াকথা। সুরা বাক্কারাহএ রোজার আয়াতে স্পষ্ট কথা এসেছে। আল্লাহ স্পষ্ট করেই বলেন, তোমরা ৩০ দিন রোজা করবে, এটি নির্দেশিত হয়েছে নির্দিষ্ট সংখ্যক দিনের জন্য (১৮৪ আয়াত)। এর পরের আয়াতেই রমজানকে সহজ করে বলা হয় তিনি তোমাদের কষ্ট দিতে চান না (১৮৫, ঐ)। হাদিস বলছে সম্পূর্ণ উল্টো কথা। তার কথায় কষ্ট কোন বিষয় নয়, এক মাস ৩০ দিনও কোন বিষয় নয়। বাড়াতে কমাতে হাদিসের এ প্রবণতা কেন? কার নির্দেশে এসব বাড়তি কমতি হয়েছে, সেটি কি সচেতনরা ভেবে দেখেছেন? (সুরা বাক্কারাহ এর :১৮৩/১৮৪, ১৮৫/ ১৮৬/ ১৮৭ আয়াত) এর উল্টো পথে হাটার এ ধৃষ্ঠতা হাদিস বেত্তারা কিভাবে অর্জন করলেন? আল্লাহর উদ্দেশ্য ছিল শাস্তি দেয়া বা কষ্ট দেয়া নয়, বরং মানুষকে সংযম শিক্ষা দেয়া, আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত নির্দিষ্ট সংখ্যক দিন (১৮৪, ঐ)। বলা হয়েছে ঐ মাসের দেখা পেলেই রোজা রাখবে। এটি খুব উত্তম শারিরীক মানসিক আত্মিক দিকেও উত্তম জমা। এটি তোমাকে (নবীকে) সুপথ দেখাতে সাহায্য করবে। বস্তুত এ আয়াতগুলিতে বলা হয়েছে এটি চরিত্র গঠনমূলক কিছু বিধান যা অনুসরণ করলে স্বভাব সুন্দর নবী ও তার অনুসারীরা আরো বেশী ভদ্র, সুশীল মানুষ হবে, বেয়াড়া নয়। এটি মানুষকে কোন অবাধ্যতা শিখাবে না। দেখা যায় কথায় কথায় ফতোয়াবাজরা সওয়াব বন্টনের একটি রেওয়াজ চালু করেছে, যেন তাদের এ কাজের জন্য নিয়োগ দেয়া হয়েছে। ভালো কাজে দশগুণ পূন্য বলে রেখেছে কুরআন আর বাকী হাদিস দিয়ে বেহেশতের গ্যারান্টি বিলি করা হচ্ছে, দশ গুণের বদলে ১০০ গুণ ৭০০ গুণ ৭০,০০০ গুণও করা হচ্ছে। তাদের এসব গুণ সংখ্যার বেহিসাব বৃদ্ধি দিনে দিনে বাড়ছেই। কমার কোন লক্ষণ নেই। আল্লাহ আমাদের সঠিক পথে পরিচালিত করুক। আমিন।

৩০ মে ২০২০ সাল।

ইবলিস অবিরাম: বিনাশের চেষ্টা, শুরু থেকেই।

নাজমা মোস্তফা

পরীক্ষা পাশ করতে এককালে ৩৩ ছিল মিনিমাম। মিনিমাম পাশের স্বপ্নে এখানে মাত্র ৩৩টি পয়েন্ট আনছি আমরা কিভাবে অধঃপতিত হচ্ছি তা স্পষ্ট করতে। লেখাটি প্রায় দেড় যুগ আগের লেখা। কোথাও ছাপা হয় নাই, আমার আগের অনলাইন সাইট ‘বাতিঘরে’ ও নয়। চলছে রমজান, পেটের ধান্ধা কম, তাই চিন্তাদের খুঁজে আনা। যেভাবে ওয়ায়েজরা সত্য মিথ্যা নিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়েছেন, তাই সেটি সময়েরও দাবী। শুরু থেকে সত্য ধর্মটিকে বিরুদ্ধবাদীদের সাথে প্রচন্ডভাবে লড়তে হয়। গবেষণার প্রেক্ষিতে প্রাপ্ত কিছু তথ্য – আমাদের জগাখিচুড়ী দশার সন্ধানে চিন্তাশীলদের জন্য খোরাক আছে লেখাটিতে –

(১) প্রাথমিক যুগের ঐতিহাসিকগণ যা যখন ঘটেছে শুনেছেন সত্য হোক মিথ্যা হোক তারা তা লিপিবদ্ধ করে যান । প্রাথমিক যুগের নানা প্রকার সামাজিক ও রাজনৈতিক বিপ্লব এবং মুসলমান সমাজের আত্মকলহ ও গৃহযুদ্ধের ভীষণতার মধ্য হতে প্রাচীন ঐতিহাসিকগণ দেশের প্রত্যেক গ্রামের, প্রত্যেক মানুষের মুখে ইতিহাস ও হযরতের জীবনী সম্বন্ধে সঙ্গত অসঙ্গত যে বিবরণটুকু প্রাপ্ত হয়েছেন, তাই লিপিবদ্ধ করে যান। (মোস্তফা চরিত, মোহাম্মদ আকরাম খাঁ, পৃষ্ঠা-৭)

(২) কিন্তু আমরা দৃঢ়তার সাথে বলতে পারি যে, পক্ষপাতশূণ্য ইতিহাস রচনার উপকরণ একমাত্র আমাদের নিকট ব্যতীত জগতের আর কোথাও বিদ্যমান নেই। যার ফলে লেখকগণের ব্যক্তিগত মত, সংস্কার ও বিশ্বাস বহু স্থলে প্রকৃত ইতিহাসকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। তারা যা শুনতে পেয়েছেন তার একটি বা একটুকও ঢেকে রেখে নিজেদের পুস্তকে লিপিবদ্ধ করেন নাই। এমন কি, যা দ্বারা হযরতের চরিত্রে দোষারূপ হতে পারে বা কুরআন সম্বন্ধে সংশয় উপস্থিত হতে পারে তাও তারা পুস্তকে স্থান দিতে কুন্ঠিত হন নাই। (সূত্র-ঐ)

(৩) এসব বেছে বেছে খ্রীষ্টান লেখকগণ নিজেদের পুস্তকে মহানন্দে স্থান দান করেন। এবং ঐ সূত্র ধরে কখনো যুক্তি তোলার চেষ্টা করেন কখনো বা কথার মাঝে আরো বেশী করে ঘোরপ্যাঁচের সৃষ্টি করেন।

(৪) বস্তুত সত্য মিথ্যা, বিশ্বাস্য অবিশ্বাস্য বাছাই করার দ্বায়িত্ব ছিল পরবর্তী লেখকদের। পরবর্তী লেখকরা তা করেন নাই বা হয়তো করা অনাবশ্যক মনে করেছেন। কালে মুসলমান সাহিত্য, ভূগোল, খগোল, দর্শন, বিজ্ঞান, হাদিস, তফসির, ফিকাহ, অছুল, সমস্তের পূর্ণতা যেন চরমভাবে হয়ে গেছে মনে করে সব মেনে নেয়। তারা আর কোন প্রকার সংশোধন, পরিবর্তন, পরিবর্জন, বা পরিবর্ধন সঙ্গত মনে করলো না। (ঐ-সূত্র)

(৬) কালে তারা ভাবতে থাকে এসব করা অন্যায়, যা আছে তাই মানবো। তাই দেখা যায় “আজ একজনকে আল্লাহ এক যেমন বিশ্বাস করতে হয় তেমনি ইহুদীদের অবিশ্বাস্য পুস্তক থেকে প্রাপ্ত ও কিংবদন্তির সুবাদে প্রাপ্ত ৩৩৩৩ হস্ত দীর্ঘ উজ-বেন-ওনকের কেচ্ছাও বিশ্বাস করতেই হবে। তুমি যেমন আল্লাহর ‘আরশ কুর্সিতে’ বিশ্বাস করবে, সেইরূপ তোমাকে বিশ্বাস করতে হবে যে, “কো-কাফ-পাহাড়” (ককেসাস পর্বত) সমস্ত দুনিয়াকে বেষ্টন করে আছে এবং আছমানের প্রান্তগুলি তার উপর স্থাপিত হয়ে আছে, ইত্যাদি। বিশ্বাস না করলে তুমি মুসলমানই থাকতে পারবে না। প্রমাণঃ—“এয়ছাহি কহিল রাবী কেতাবে খবর”। (ঐ গ্রন্থ পৃষ্ঠা ৯)

(৭) উজ-বেক-ওনকের নানা প্রকার আজগুবী গল্প আমাদের ইতিহাস ও তফসিরে লেখা আছে। তার শরীরের দীর্ঘতা ৩৩৩৩ হাত, সমুদ্রে তার হাঁটু পানি, সে সমুদ্রের বড় বড় (সম্ভবতঃ তিমি) মাছগুলিকে সূর্যের গায়ে ঠেসে ধরে কাবাব করে খেত। নূহের বিখ্যাত তুফানের সময় যখন উচ্চতম পর্বতশৃঙ্গের উপর দিয়ে পাহাড়ের মত ঢেউ বয়েছিল সে তুফানে তার মাত্র বুক পানি হয়েছিল। শেষে হযরত মুসা একখানি খুব লম্বা লাঠি নিয়ে লাফ দিয়ে নিজে বহূ উর্ধ্বে উঠে তার পায়ে গোড়ালির উপর আঘাত করেন। এত বড় যে উজ-বেক-ওনক, সেই আঘাতে ৩৫০০ বছর বয়সে তার হালাক হয়ে গেল। জালালুদ্দীন সয়ুতী তার অভ্যাস মত, এটা প্রমাণ করবার জন্যও একটি পুস্তিকা লিখেন। কিন্তু পূর্বকালের বিশ্বস্ত মোহাদ্দেসরা এই গল্পগুলিকে ‘মিথ্যা ও মৌজু’ বলে নির্দেশ করেছেন। এবনে যাওজী বলেছেনঃ “যে মিথ্যাবাদীরা আল্লাহর নামে এরূপ উপকথা রচনা করেছে, তাদের অপেক্ষা সেই সব মুসলমান পন্ডিতের অসম সাহসিকতা অধিকতর আশ্চর্যজনক, যারা এই হাদিছটির প্রকৃত অবস্থা বর্ণনা না করে কোরআনের তফসির প্রভৃতিতে ঢুকিয়ে দিয়েছেন। এটি এবং এটির অনূরূপ বিবরণগুলি ধর্মদ্রোহী, খ্রীষ্টান ও ইহুদীদের রচিত গল্পমাত্র, এবং তারা যে এসকল গল্প রচনা করে নবী ও রসুলদেরে ঠাট্টা বিদ্রুপ করতো, তাতে কোন সন্দেহ নেই। (মাউজুআতে কবির, ৯৭ পৃষ্ঠা)

(৮) মাউজুয়াতে কবিরএ বর্ণিত এই শ্রেণীর মোহাদ্দেসদের অনুমান যে কতো সত্য, তার প্রমাণ হিসাবে নিচের বর্ণিত টি. পি. হিউজএর বর্ণিত তথ্য “Uj—the son of Ug, A giant who is said to have been born in the days of Adam—–. The Og of the Bible, concerning whom as Suyuti wrote a long book taken chiefly from Rabbinic tradition. (Edwal, Gesch 1. 306.) An apocryphal book of Og was condemned by Pope Gelasius. (Dec. V1. 13) Dictionary of Islam—p, 649. অর্থাৎ উজ-একজন উগ এর পুত্র, একটি দৈত্য যার জন্ম হয়েছিল হযরত আদমের সময়ে, – বাইবেলে বর্ণিত উজ্জ, যার সম্বন্ধে সয়ূতী একটি বই রচনা করেন রাবীদের গৎবাধা ধারাবাহিকতা থেকে (তথ্যসূত্র)। এই উজের উপর একটি দ্বিমুখী নিন্দাসূচক গ্রন্থ পোপ গ্যালেসিয়াস কর্তৃক রচিত হয় (সময় ও সূত্র) ডিকশনারী অব ইসলাম পৃষ্ঠা, ৬৪৯) ” উপরে এই বিবরণটিও এই ঘটনার সত্যতা তুলে ধরছে।

(৯) ঠিক এভাবেই প্রাচীন উপকথাও এসব কোন ফাঁকে ঢুকে পড়েছে ধর্মের অলিন্দে। ইসলাম ধর্ম এবং তার প্রবর্তক হযরত মোহাম্মদ(সঃ)কে জগতের সম্মুখে হেয় প্রতিপন্ন করার একমাত্র উদ্দেশ্যে যে সমস্ত লেখক নিজেদের শ্রম ও প্রতিভার অসদ্ব্যবহার করেছেন তারাও এই সত্যটিকে স্পষ্ট ভাষায় স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন। উদাহরণ হিসাবে উইলিয়াম মুইরের উল্লেখ করা যেতে পারে। তিনি তার Life of Mohammad পুস্তকের ভুমিকায় বলেছেনঃ “There is probably in the world no other book which has remained twelve centuries with so pure a text” অর্থাৎ জগতে এরূপ পুস্তক সম্ভবতঃ আর একটিও নেই, (কুরআনের ন্যায়) দীর্ঘ দ্বাদশ শতাব্দী ধরে যার ভাষা সম্পূর্ণ অবিকৃতভাবে সংরক্ষিত হয়ে আসছে।

(১০) বিখ্যাত পন্ডিত Von Hammer বলেনঃ “We hold the Quran to be as surely Mohammad’s word as the Mohamedans hold it to the world of God.” অর্থাৎ মুসলমানরা যেরুপ নিশ্চিতভাবে কোরআনকে আল্লাহর বানী বলে বিশ্বাস করে থাকে, আমরাও ঠিক সেরূপ এটাকে (এই কুরআনকে) নিশ্চিতভাবে মোহাম্মদের বানী বলে বিশ্বাস করে থাকি।”

(১১) ইউরোপীয় লেখকগণের পুস্তকগুলি পাঠ করলে অজ্ঞতা, অসমসাহসিকতা ও গোড়ামিতে তাদের সঠিক অবস্থান নির্ধারণ করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। হিডেনবার্গের প্রফেসর Weil কর্তৃক প্রণীত পুস্তক ১৮৪৩ খ্রীষ্টাব্দে প্রকাশিত হয়। ওয়েল অপেক্ষাকৃত স্বাধীন ও ঐতিহাসিক ভাবসম্পন্ন হলেও কি কারণে জানি না, তার মনে এই সন্দেহ উপস্থিত হয় যে, “কেয়ামত বা মহাপ্রলয়ের ঘটনা ও শেষ বিচার মোহাম্মদের জীবন কালেই অনুষ্ঠিত হবে। এই মর্মের কয়েকটা আয়াত ‘কুরআনে’ ছিল। কিন্তু মোহাম্মদের মৃত্যু হয়ে গেলে যখন দেখা গেল যে, ঐ পদগুলি মিথ্যা হয়ে যাচ্ছে তখন নবীন সদস্য নেতারা কয়েকটি আয়াতের পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করেন। মোহাম্মদও যে মরবেন এবং মৃত্যুর পর আবার তিনি (যিশুর ন্যায় স্বর্গ হতে) ফিরে আসবেন, লিখিত ও মুখস্ত কুরআনগুলিতে এই সব কথা যোগ করে ভক্তগনের বিশ্বাস তারা অক্ষুন্ন রাখবার চেষ্টা করেছিলেন”।

(১২) লিডেন ইউনিভার্সিটির আরবী অধ্যাপক (Professor C.Snouck Hurgronje) সন্নাউক হারগ্রোঞ্জে, গ্রন্থকার একজন গোড়া খ্রীষ্টান, আরবী সাহিত্যে ও ইসলামিক শাস্ত্রাদি অভিজ্ঞতা অর্জন করার জন্য তিনি জীবনভর সাধনা করেছেন। তিনি ছদ্মবেশে কয়েকমাস পর্যন্ত জেদ্দা ও মক্কায় অবস্থান করেন (১৮৮৪-৮৫) এবং হাজিদের সাথে তিনি হজ পর্বও সমাধা করেন। মুসলমান ধর্ম সম্বন্ধে আমেরিকায় তার বক্তৃতাগুলি ১৯১৬ সালের শেষভাগে মুদ্রিত হয়। যখন অধ্যাপক পল ক্যাসানোভা তার প্রথম সংস্করণ এর ৩৯৭ পৃষ্ঠাতে তিনিও ওয়েলএর অন্ধ অনুকরণে কুরআনের দুই আয়াতের বিশ্বস্থতায় সন্দেহ করেন। প্রফেসর হারগ্রোঞ্জ বলেন, Noldeke  আজ হতে ৫০ বৎসর পূর্বে তার Geschichte des Quran নামক পুস্তকে Mohammad et la fin du monde, parts, 1911. ঐ ভিত্তিহীন সন্দেহের মিটমাট করে গিয়েছেন।

(১৩) অধ্যাপক মহাশয় ক্যাসানোভার কথায় আশ্চর্যান্বিত হয়ে বলেন, In the Skeptical times there is very little that is above criticism, and one day or other we may expect to hear Mohammad never existed. The arguments of this can hardly be weaker than those of Casanova against the authenticity of the Qoran. (PS 16-17). অর্থাৎ আমাদের এই সন্দেহবাদের যুগে সমালোচনার অতীত বড় কিছু নাই। এবং একদিন না একদিন আমাদেরে এটাও হয়তো শুনতে হবে যে, কখনও মোহাম্মদ বলে কোন লোকের অস্তিত্বই ছিল না। এর যে যুক্তি, তা কুরআনের প্রামানিকতার বিরূদ্ধে ক্যাসানোভার যুক্তি অপেক্ষা কোন অংশেই দুর্বল হবে না। (১৬-১৭ পৃষ্ঠা)।

(১৪) ডাক্তার স্প্রেঙ্গারের ‘মোহাম্মদ চরিত’ যারা পাঠ করেছেন, তারা জানেন তিনি যে ইসলামের কত বড় শত্রু এবং এটিও সত্য যে তিনি আরবী ভাষায় পন্ডিত ছিলেন। তিনিও স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন যে, “There is no nation, nor has there been any which like them has during twelve centuries recorded the life of every man of letters. If the biographical records of Musalmans were collected, we should probably have accounts of the lives of half a million of distinguished persons.” অর্থাৎ পৃথিবীতে বর্তমান যুগে এমন কোন জাতি নাই, অথবা অতীত যুগেও এমন কোন জাতি ছিল না, যারা মুসলমানদের ন্যায় দীর্ঘ দ্বাদশ শতাব্দীর প্রত্যেক বিদ্বান, সাহিত্যিক ও লেখকদের জীবন চরিত লিপিবদ্ধ করে রাখতে সমর্থ হয়েছে। মুসলমানদের জীবন চরিত সংগৃহীত হলে আমরা খুব সম্ভব পাঁচ লক্ষ ব্যাক্তির জীবন চরিত প্রাপ্ত হতে পারতাম।”

(১৫) তখন খ্রীষ্টান ও ইহুদীদের থেকে রেওয়ায়েৎ গ্রহণও শরা অনুসারে বৈধ ছিল। এতে যে সকল ইহুদী ও খ্রীষ্টান প্রকাশ্যভাবে ইসলামের বিরূদ্ধাচারন করতে সাহসী হয় নাই অথচ তারা মনে মনে ইসলাম সম্বন্ধে যথেষ্ট বিদ্বেষ পোষন করতো তারা তাদের নিজেদের ধর্মে আসক্ত করার জন্য তাদের অনেক টিকা টিপ্পনী প্রচার করতো। উদাহরণ স্বরূপ এরূপ একজন হিসাবে আব্দুল্লাহ-এবন-আমর-এবন-আছের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। বিখ্যাত মোহাদ্দেস ছাখাভী তার সম্বন্ধে বলেনঃ “এরমুক যুদ্ধে ইহুদী ও খ্রীষ্টানদিগের বহু পুস্তক, তার হস্তগত হয়। তিনি সেই সব পুস্তক অবলম্বন করে বহু অজ্ঞাত ঘটনা বর্ণনা করতেন। এমন কি তার কোন কোন শিষ্য অনেক সময় তাকে বলতে বাধ্য হয়েছেন যে, হযরতের হাদিছ বর্ণনা করুন – ঐ সকল কেতাবের বিবরণ বর্ণনা করবেন না।”

(১৬) আল্লামা এবনে খাল্লেদুন জগতে সর্বপ্রথমে দার্শনিক হিসাবে ইতিহাসের সমালোচনা করেন, মোকাদ্দমা ইতিহাসের এক অনুপম সম্পদ। এর ভূমিকায় তিনি লেখেনঃ “আরবদিগের মধ্যে কোন শাস্ত্রগ্রন্থ বা জ্ঞান বিদ্যমান ছিল না। অসভ্যতা ও মূর্খতায় তারা আচ্ছন্ন ছিল। সৃষ্টিতত্ত্ব, তার পুরা কাহিনী, তার বৈচিত্র ও অন্যান্য বিষয়ে যখন তাদের জানবার দরকার পড়তো তখন তারা আপন প্রতিবাসী ইহুদী ও খ্রীষ্টানদের কাছ থেকে জ্ঞান আহরণ করতো। কিন্তু সে সময় আরবে যে সব ইহুদী বাস করতো, মূর্খতায় তারাও আরবদের সমান ছিল। ঐ শ্রেণীর জনসাধারণের পক্ষে তৌরাৎ সম্বন্ধে যেরূপ এবং যতটা জ্ঞানলাভ করা সম্ভব, তার অতিরিক্ত কিছুই তারা জানতো না।” তিনি আরো বলেন,“আমাদের লেখকগণ ঐ সকল কিংবদন্তি ও গল্প গুজব নকল করে তফসিরের কেতাবগুলিতে ঢুকিয়ে দিয়াছেন। আমরা পূর্বেই বলেছি যে, এ সকল গল্পের মূল মূর্খ ও অজ্ঞ মরূপ্রান্তরবাসী ইহুদীদের নিকট থেকে গৃহীত। অথচ তারা যা নকল করছেন, তার সত্যাসত্য পরীক্ষা করেও দেখেন নাই। (মোকাদ্দমা এবনে খল্লেদুন)

(১৭) অতিরঞ্জন-পটু লেখকগনের কৃপায় এবং অতিভক্ত মুসলমানদের কল্যাণে, কালে তাই ইসলামের সর্বাপেক্ষা আবশ্যক, বিশ্বাস্য ও অবশ্য মান্য অংশে পরিণত হয়ে যায়। এই দুরবস্থার শোচনীয় ও পূর্ণ পরিণতি দুই শতাব্দী পূর্ব হতে আরম্ভ হয়েছে। এমনকি আমরা এরূপ অনেক লোকও দেখেছি, যাদের জ্ঞানের সাথে তাদের বিশ্বাসের সামঞ্জস্য নেই। (মোস্তফা চরিত, মোহাম্মদ আকরম খাঁ, পৃষ্ঠা ৬৬)

(১৮) ইহুদী ও খ্রীষ্টানদের বংশগত কিংবদন্তি ও প্রবাদ এবং তাহাদের বিশ্বাস ও সংস্কারগুলি ছাহাবীদের অধিকাংশের জানা ছিল। এ অবস্থায় ছাহাবী ও তাবেয়ীগণ ঐ সকল পুস্তক পুস্তিকায়, নিজেদের পরষ্পরাগত বিশ্বাস ও সংস্কারের এবং স্বদেশে এবং স্বসমাজে প্রচলিত জনশ্রূতি ও কিংবদন্তির উপর নির্ভর করে বহু অজ্ঞাত বিবরণ ও ভাবী ঘটনাদি গল্পচ্ছলে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু কালক্রমে ঘটনা বিপরিত হয়ে দাঁড়ায়। দেখা যায় হযরত ওমর কর্তৃক তৌরাতের নমুনা আনয়ন। (মোস্তফা চরিত, মোহাম্মদ আকরম খাঁ, পৃষ্ঠা ৫৬)

(১৯) যে সকল সাহাবী খ্রীষ্টান ও ইহুদী ধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, তাদের আর অপরের নিকট থেকে এসব গ্রহণের কোন আবশ্যকতা ছিল না। তাদের সংস্কার ও প্রবাদগুলি তাদের সংস্কার ও পৌরানিক কাহিনীগুলি—বহুস্থানে বিকৃত অবস্থায় নব দীক্ষিত মুসলমানদের মধ্যেও বিস্তার লাভ করেছিল। শায়খুল ইসলাম ইমান ইবনে তাইমিয়া এ প্রসঙ্গে বলেন, “কিন্তু অধিকাংশ লোকই ভ্রম প্রমাদ হতে মুক্তি পেতে পারেন না। ছাহাবীগণের মধ্যে এরূপ লোকও ছিলেন, যারা সময় সময় ভ্রম করতেন, তাদের পরবর্তী সময়েও এই অবস্থা। এই জন্য ছহী আখ্যায় যে সকল হাদিছ সঙ্কলিত হয়েছে তার মধ্যে এরূপ হাদিছ সবও আছে যা ভ্রম বলে পরিজ্ঞাত”। (কেতাবুল তাওয়াচ্ছোল-৯৬পৃষ্ঠা)

(২০) সেই সময়কার খ্রীষ্টান লেখকগণ প্রচার করতে থাকেন যে, “আরবগণ মোহাম্মদ নামক একটি পুতুল প্রতিমার পূজা করতো। মোহাম্মদ নিজের জীবনকালে স্বহস্তে এই পুতুলটি নির্মাণ করেন এবং উহাকে অভঙ্গুর করার জন্য একটি পিশাচের সাহায্যে ও যাদুমন্ত্রের দ্বারা উহাতে একটি ভয়ঙ্কর রকমের শক্তি প্রবিষ্ট করিয়ে দেন যে, এই পুতুলটি খ্রীষ্টানদিগের প্রতি এমন আশ্চর্যজনক হিংসা ও ঘৃণার ভাব পোষন করতো যে, তাদের কেহ সাহস করে এই প্রতিমার নিকট যেতে চাইলেই কোন একটা গুরূতর বিপদে পড়তে হতো। এমন কি এটাও কথিত আছে যে, কোন পাখীও উহার উপর দিয়ে উড়ে গেলে সে সঙ্গে সঙ্গে মারা যেত। (History of Charles the Great, ৬-৭ পৃষ্ঠা, T. Rodd কর্তৃক অনুবাদিত (১৮১২) হতে গৃহীত।)

(২১) Father Jerome Dandini তার “A Voyage to Mount Lebanus” গ্রন্থে বলেন, “মোহাম্মদ মুসা নবী অপেক্ষা অধিকতর আশ্চর্যজনক কোন অলৌকিক কান্ড প্রদর্শণ করে নিজেকে তাহা অপেক্ষা বড় নবী বলে প্রতিপন্ন করার জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠেন। এই জন্য তিনি কয়েকটি জলপূর্ণ পাত্র ভূগর্ভে লুকিয়ে রাখেন। কিন্তু কয়েকটি শুকর ঐ স্থানের মাটি খুঁড়ে ফেললে এবং ইহাতে মোহাম্মদের “বুজরূকি” দেখাবার সমস্ত অভিসন্ধিই নষ্ট হয়ে যায়। এর ফলে ক্রোধান্ধ হয়ে তিনি শুকরকে অপবিত্র ও তার মাংসকে নিষিদ্ধ বলে প্রচার করেন। (অষ্টম অধ্যায়)।

(২২) বিখ্যাত খ্রীষ্টান ধর্ম যাজক হেনরী স্মিথ রাণী এলিজাবেথের সময়কার লোক। তিনি স্বনামধন্য Roger of Wendover এর প্রমুখাৎ উল্লেখিত গল্পটির উল্লেখ করেন। “একদা পানোন্মত্ত অবস্থায় মোহাম্মদ তার প্রাসাদে বসে আছেন। এমন সময় তার পুরাতন রোগটির আশংকা করে তিনি খুব তাড়াতাড়ি সেখান থেকে উঠে গেলেন। যাওয়ার সময় সকলকে বলে গেলেন যে, কোন দেবদূতের আহ্বানে তিনি যাচ্ছেন। এ অবস্থায় কেহ যেন তার অনুসরণ না করে, অন্যথায় দেবদূতের কোপে পড়ে তিনি নিধন হবেন। রোগাক্রমনের ফলে মাটিতে পড়ে আঘাতপ্রাপ্ত না হন—এই উদ্দেশ্যে, অতপর তিনি একটা গোবরগাদার উপর উঠে বসেন। সে সময় তিনি সেখানে পড়ে ছটফট করতে থাকেন এবং তার মুখ দিয়ে ফেনা বের হতে লাগলো। এসব দেখে এক পাল শূকর সেখানে ছুটে আসলো এবং তাকে খন্ড বিখন্ড করে ফেলে এবং এরূপে মোহাম্মদের জীবন লীলার অবসান হয়ে যায়। এ সময় শূকরের চিৎকার শুনে তার স্ত্রী ও অন্যান্য পরিজনবর্গ সেখানে ছুটে এসে দেখলেন যে, তাদের প্রভুর অধিকাংশ শূকর দল খেয়ে ফেলেছে। তখন তারা দেহের অবশিষ্টাংশ সংগ্রহ করে সেগুলোকে একটি স্বর্ণ-রৌপ্য খচিত কাঠের পেটিকার মধ্যে স্থাপন করে সকলে একত্রে ঘোষনা করে দিলেন যে, স্বর্গের দেবদূতেরা প্রভুর শরীরের অল্পাংশ মাত্র মর্ত্যবাসীদের জন্য রেখে আনন্দ কোলাহল সহকারে তার অধিকাংশ স্বর্গাধামে নিয়ে চলে গেছে। মুসলমান জাতির শূকরের প্রতি ঘৃণার মূল কারণ ইহাই। (পূর্ববর্তী গ্রন্থ, ১৯ পৃষ্ঠা)

(২৩) কুরআনের একদল টীকাকার ইহুদী ও খ্রীষ্টানদিগের পুস্তক পুস্তিকা ও বাচনিক কিংবদন্তিগুলোকে কিরূপ নির্মমভাবে কুরআনের তফসিরে প্রবেশ করিয়ে দিয়েছেন। তার প্রমাণ হিসাবে একদল লোক ইহুদী ও খ্রীষ্টান দিগের অনুকরণে বলেছেন যে, কুরআনের  জন্য হযরত ইসমাইলকে নহে বরং হযরত এসহাককে উপস্থাপিত করা হয়েছিল। (জাদুল-মাআদ, ১ম খন্ড, ১৪-১৭ পৃষ্ঠা)

(২৪) স্যার উইলিয়াম মূর একজন ভদ্র ও উচ্চপদস্থ ইংরেজ। তার লিখিত Life of Mahomet   বা মোহাম্মদের জীবন চরিত নামক পুস্তকের দুটি সংস্করণ (১৮৫৭ ও ১৮৬১ সালে) প্রকাশিত হয়। এর শেষ সংস্করণ প্রচারিত হওয়ার পর ১৮৭০ খ্রীষ্টাব্দে স্বনামধন্য মহাত্মা সৈয়দ আহমদ সাহেব লন্ডন হতে Essays on the life of Muhammed নামক পুস্তক প্রকাশ করেন। মহাত্মা সৈয়দ বিশেষ করে মূর সাহেবের মিথ্যা ও প্রবঞ্চনা এবং তার উল্লেখিত সূত্রগুলির অকিঞ্চিৎকরতা অকাট্যরূপে প্রকাশ করেন। এরপর ১৮৭৭ খ্রীষ্টাব্দে মূর সাহেবের পুস্তকের এক নতুন সংস্করণ প্রকাশিত হয়। মূর সাহেব কোন গুপ্ত ও গোপনীয় কারণে পূর্ব সংস্করনের আরবী ইতিহাস “Most of the notes, with all the reference to original authorities have been omitted —- throughout amended  (নতুন সংস্করনের ভুমিকা) । পূর্বের সবকিছুই একদম হজম করে দেন। এবং কেনই বা তা সংশোধিত হয়েছে তা সৈয়দ সাহেবের পুস্তকের সাথে মিলিয়ে দেখলে তবে বোঝা সম্ভব। তাই নীরবে সংশোধন করলেও তা প্রকাশ্যে স্বীকার করার সাহস হয় নি (মোহাম্মদ আকরম খাঁ, মোস্তফা চরিত, পৃষ্ঠা, ১৬৯)।

(২৫) হযরত বিশেষ তাগিদ সহকারে বলে যান যে, “সাবধান! খ্রীষ্টানেরা যেরূপ মরিয়মের পুত্র যীশুকে বাড়াতে বাড়াতে অসীম ও নিরাকার “পরম পিতার”আসনে বসিয়ে দিয়েছে। তোমরা যেন আমার সম্বন্ধেও সেরূপ অতিরঞ্জন করো না, আমি তো আল্লাহর একজন দাস ও তার বার্তাবহ আর কিছুই নহি (মোসলেম–মেশকাত-২৮) ।

(২৬) হযরতের শৈশবকালের অবস্থা বর্ণনা কালে মূর, মার্গোলিয়থ প্রভৃতি লেখকরা সবকিছুর মাঝেই একটা নতুনত্বের সন্ধান পান। মূর সাহেব হযরতের মৃগী রোগ প্রমাণ করার জন্য যে হিশামীর (মিথ্যা) বরাত দিয়েছিলেন, সেই হিশামিতেই এই বিবরণ বর্ণিত হয়েছে। মার্গোলিয়থ সাহেব কোন বরাত না দিয়েই বলেন, খাদিজার সহিত বিবাহের সময় খাদিজার বয়স কিছু অধিক ছিল বটে তবে যে ৪০ বৎসর হয় নাই, ইহা নিশ্চিত (মোস্তফা চরিত, ৬৬ পৃষ্ঠা) ।

(২৭) ইতিহাসের বিশুদ্ধতা রক্ষা করাও মুসলমানেরা ধর্মের অঙ্গীভূত বলে মনে করতেন। (বোখারী ও মোসলেমের হাদিছ বর্ণনা ও এছনাদ সংক্রান্ত পরিচ্ছদগুলি দ্রষ্টব্য) তারা প্রথম হতেই যেরূপ বিচক্ষনতা ও সতর্কতা অবলম্বন করেছিলেন জগতে তার তুলনা নেই। অমুসলিম লেখকগণ বিদ্বেষে অন্ধ হয়ে যে সকল মিথ্যা, জাল ও অপ্রামাণ্য হাদিস অবলম্বন করে হযরতের চরিত্রের ও ইসলামের শিক্ষার প্রতি দোষারূপ করে থাকেন, অতি সহজে তার স্বরূপ সন্ধান করা সম্ভব। এর প্রধান সূত্র কুরআন, দ্বিতীয় সূত্র বিশুদ্ধ ও বিশ্বস্থ হাদিছ এবং তৃতীয় সূত্র পরীক্ষিত ঐতিহাসিক বিবরণ। আমাদের তফসির ও ইতিহাসে অনেক বাজেমার্কা ও ভিত্তিহীন গল্পগুজবও বিদ্যমান আছে। পক্ষান্তরে ইহুদী, খ্রীষ্টান, পার্সিক প্রভৃতি জাতির অনেক সংস্কার ও বিশ্বাসও নানা কারণে ঐ সকল পুস্তকে এসে যুক্ত হয়ে গেছে। (ঐ গ্রন্থ, মোহাম্মদ আকরম খাঁ, পৃষ্ঠা ৭৮)

(২৮ ) বলা বাহূল্য যে, মদীনায় ইসলামের এই আশাতীত সফলতা দর্শনে আমাদের পরম বন্ধু খ্রীষ্টান লেখকরা যৎপরোনাস্তি মর্মাহত হলেন। মূর সাহেব একস্থানে বিলাপ করে বলেছেন, “আর তিনটা বৎসর যদি মোহাম্মদ এইরূপ অকৃতকার্য হতেন, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে ইসলামের প্রদীপ নিভে যেত। (ঐ গ্রন্থ ৩১৫ পৃষ্ঠা)

(২৯) সকল যুগের সকল দেশের সকল জাতির সমগ্র ইতিহাস সমস্বরে উত্তর দেয় যে, “পুরোহিত ও যাজক সম্প্রদায়” সত্যের প্রধান বৈরীতা করেছে অতীতেও। তাই কুরআন এর প্রতিবাদে বলে যে এরা আল্লাহকে ত্যাগ করে নিজেদের পীর ফকির এবং যাজক পুরোহিতদেরে খোদা বানিয়ে নিয়েছে। মদীনায় এইরূপ কোন পুরোহিত বা যাজক জাতি ছিল না, কোন বড় দেব মন্দিরও ছিল না, কোন তীর্থস্থান ছিল না। কাজেই মদীনার পৌত্তলিকগণ কোরেশদের ন্যায় ইসলামের নাম শুনে অগ্নিশর্মা হয়ে উঠে নাই।

(৩০) মূর সাহেব বিবি খাদিজা ও আবুতালেবের মৃত্যু বিবরণ লিপিবদ্ধ করার পর বড় আক্ষেপ করে বলেন,  A few more years of similar discouragement, and his chance of success was gone, অর্থাৎ আর কয়েকটা বৎসর মাত্র এইরূপে উৎসাহ ভঙ্গ হলেই মোহাম্মদের কৃতকার্যতার সম্ভাবনা থাকত না। (১১২ পৃষ্ঠা) মুসলমানগণ ও হযরত স্বয়ং নিরাপদে মদীনায় পৌছে যাচ্ছেন এই লক্ষ্য করে মহাত্মা মারগোলিয়থ যারপর নাই আফসোস করে বলছেন, Arabia would have remained pagan, had there be a man in Meccah who could strike a blow; who would act and be ready to accept the responsibility for acting. অর্থাৎ মক্কায় যদি এমন একটা লোক থাকতো, যে মুসলমানদের একটা আঘাত করতে পারতো এবং যে দ্বায়িত্ব গ্রহণ পূর্বক কাজ করতো তা হলে আরব দেশ পৌত্তলিক থেকে যেত (২০৭ পৃষ্ঠা, Mahomed.D.S.Margoliuth, London, 1906).

(৩১) হিজরতের সময়কার সেই স্মরণীয় ঘটনাটিতে মোহাম্মদ (সঃ) আপন সহচরকে বললেন—চিন্তিত হয়ো না, বিষন্ন হয়ো না, আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।(সুরা তওবার ৪০ আয়াত) যখন আবুবকরকে রসুল(সঃ) স্বান্তনা দিচ্ছিলেন এই আয়াতেও তার প্রমাণ বর্তমান। হাদিছেও বোখারী, মোসলেম, তিরমিজীতে এর স্বপক্ষ প্রমাণ বর্তমান। কিন্তু তারা খ্রীষ্টান লেখকেরা দেখলো মৃত্যুর বিভিষিকা দর্শনে ভীত হয়ে তিনি যীশু চিৎকার করতে লাগলেন, ‘প্রভু! তুমি আমাকে কেন ত্যাগ করলে?’ পদে পদে তাদের বাগাড়ম্বর, বাহূল্য অতিরঞ্জন লক্ষ্যনীয় তাদের লেখালেখিতে। মদীনায় হিজরতের পর প্রথম মসজিদের স্থান নির্বাচনের ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে মূর সাহেব তার গ্রন্থে বলছেন, It was a stroke of policy. His residence would be hallowed in the eyes of the people as selected super naturally; while the jealousy which otherwise might arise from the quarter of one tribe being preferred before the quarter of another, would thus received decisive check, (p-180) অর্থাৎ সংক্ষেপে দাড়ায় আপনার গুরূত্ব বৃদ্ধির জন্য তিনি চালাকি দ্বারা গোলযোগ হতে রক্ষা পাওয়ার জন্য মদীনার অবস্থান নির্বাচন সম্বন্ধে এই প্রকার উক্তি করেছেন। ঐ যে কথায় বলে না দুর্জনের ছলের অভাব হয় না

(৩২) জুমআর নামায সম্বন্ধে মারগোলিয়থের  দাবী তিনি এটিকে কাল নির্নয়ের ভ্রম বলে লিখেন যে, The adoption of Friday as a sacred day come later, at the suggestion of a Medinese, and after the relation with the Jews had become satisfactory, (214-page)  কাল নির্নয়ের অছিলায় লেখক বিশেষ চাতুরতার সাথে তার পাঠকদেরে দেখাতে চান যে, প্রথমে ইহুদীদেরে সন্তুষ্ট করার জন্য হযরত তাদের সাব্বাত বা শনিবারকে পবিত্র দিবস বলে গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু মদীনা আগমনের পরে বিরোধের কারণে শুক্রবার উপাসনার দিন সাব্যস্ত হলো। মসজিদ নির্মানের সময় মুসলমানদের সাথে সুর করে ছড়া পাঠের সময় মহানবী ওলট পালট করে ফেলছিলেন (এবন হেশাম ১-১৭৬)। এবনে হেশামে এই তথ্য থাকলেও যদিও এই আবৃতি যে সম্পূর্ণ নির্ভূল ছিল তা বুখারীর হাদিছ থেকেও জানা যায়। কিন্তু এখানেই মূর সাহেবেরা বেশ সূত্র পেয়ে গেলেন। মূর সাহেব এই সুযোগে হযরতের চরিত্রের উপর টেনে নিলেন যে, কবিতা ও ছন্দ সম্বন্ধে তার আদৌ কোন জ্ঞান নেই এটা দিয়ে তিনি তার স্বরচিত কুরআনের ছন্দবদ্ধ রচনার অক্ষমতা বুঝাতে চাচ্ছিলেন। এটা তার অন্য একটা চালাকি ছাড়া আর কিছু নয়।

(৩৩) এতকিছুর পরও একটি সত্যকে অবশ্যই সহজভাবে স্বীকার করতে হবে যে এর মধ্যে কিছু বিচক্ষণ পন্ডিত ব্যক্তি ছিলেন যারা সত্যের মানদন্ডে সঠিকের সমাদর করে গেছেন সর্বযুগেই। ষোড়শ শতাব্দীর শুরু থেকেই শুরু  হয়েছিল পাশ্চাত্যের লেখকদের ইসলামের প্রতি বিষোদগার। কিন্তু এদের মধ্যে ব্যতিক্রম ছিলেন গীবন, হীগিনস, কারলাইল ও ডেভেনপোর্ট। যাদের লেখা পড়লে স্পষ্টত জানা যায় যে, হযরত মোহাম্মদ(সঃ) সম্বন্ধে সত্য উদ্ধার ও অসত্যের প্রতিবাদ করার জন্য তারা চেষ্টার কোন ত্রুটি  করে নাই। এই শ্রেণীর ইংরেজ লেখকগণের সত্যনিষ্ঠা ও সৎসাহসের ফলেই ইসলাম ও মোহাম্মদ সম্বন্ধে পাশ্চাত্য জগতের বহু শতাব্দীর বদ্ধমূল ধারণা ও সংস্কারের ঘোর পরিবর্তন আরম্ভ হয় এবং আমাদের মতে ইউরোপে ইসলাম প্রচারের প্রথম সূচনা হয় এই সময় থেকেই। (তথ্য সূত্র মোস্তফা চরিত, ৯০ পৃষ্ঠা)

এরকম অনেক উদাহরণ আমাদের চারপাশে বর্তমান যাতে দেখা যায় কিভাবে ধর্মটির খিচুড়ীদশা ঘটানো হয়েছে। সম্ভবত শয়তান এ কাজটি তার নিজ দ্বায়িত্বে করেছে। সে এভাবেই তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে যাচ্ছে। মানুষকে সত্য থেকে ফিরিয়ে নিতে এ ধরণের খিচুড়ীদশা ধর্মটির সমূহ সর্বনাশ করেছে। আল্লাহর কালামের জায়গায় রসুলেরও নয় কখনো কখনো দেখা যায় সাহাবাদের নামে অনেক উল্টাসিধা কথা বদল করে সমাজে চালু করা হয়েছে। এ ধরণের কাজ যাদের হাত দিয়েই হোক না কেন এটা শয়তানের পাবন্দী বাড়িয়ে দিয়েছে নির্ঘাৎ। শয়তান বা ডেভিল মহানন্দে আলখেল্লার ভিতর থেকে সমাজটাকে কুরে কুরে খাচ্ছে ঠিক এভাবেই। এ লজ্জা এ সমাজের সচেতন অংশের ব্যর্থতা বৈ আর কিছু নয়! এটাই প্রমাণ করে আমাদের চেতনহীনতা কি পরিমান গভীরতর হতে পারে! কতটুকু আফিংখোর হলে আমরা এমন অধঃপাতে হারিয়ে যেতে পারি। আল-কুরআনে স্পষ্ট নির্দেশের পরও আমরা ইতস্তত করি আল্লাহর কথা শুনবো, কুরআন প্রতিষ্টা করবো নাকি কোথাও থেকে ধার করা কিছু ধারণা এনে ফাঁকতালে ঢুকিয়ে দেব! তাই প্রকারান্তরে দেখা যায় আমাদের হাত দিয়েই শয়তান তার বিজয়ের মালা বদল করে মহানন্দে তার লীলাখেলা চালিয়ে যাচ্ছে। আর আমরা নেশার ঘোরে এমনই আচ্ছন্ন যে সেটুকু উপলব্ধি করার অনূভূতিটুকুনও যেন হারিয়ে ফেলেছি।

মূর, মারগালিয়থদের এসব গাজির পুথি বলতে গেলে শেষ হবার নয়। এবং তাদের সাথে সাথে কিছু সংখ্যক সৎ সন্ধানী লেখকদের উদাহরণ সত্যের এক নির্জলা প্রমাণ। মিথ্যারা কখনোই চক্রান্ত করে টিকতে পারে না। সর্বযুগেই সত্যের জয় অবশ্যম্ভাবী। আমাদের যাদের আজো নিদ কাটে নাই তাদের একটু চেতন ফেরানোর ও চিন্তা করা উচিত এসব ব্যাপার সম্বন্ধে। এ লেখাটি আমি মূর সাহেবের কুৎসার কারণেই লিখছি না শুধু, আমাদের অনেক অপরিনামদর্শিতার গলদ আছে তাই সর্বাগ্রে হোক নিজেদের সংশোধন সেটাই কাম্য। শ্রেষ্ঠ গ্রন্থটি ধারণ করে বসে থেকে আমরা যদি অন্ধত্ব, বোবাত্ব, পঙ্গুত্বের স্বীকার হই, তবে সে দুঃখ সে বেদনা রাখবার জায়গা কোথায়।  কথা ছিল মুসলিমদের এই গুরু দ্বায়িত্ব সঠিক ভাবে পালন করার,  স্মরণ রাখা উচিত – জবাবদিহিতার দায়ও তাদের অতিরিক্ত বটে!

সুসংগ্রহঃ

(ঐশী) গ্রন্থপ্রাপ্তদের মাঝে যারা অবিশ্বাস পোষণ করে তারা এবং মুশরিকরা চায় না যে তোমাদের প্রভূর কাছ থেকে কোন কল্যান তোমাদের প্রতি নাযিল হয়, কিন্তু আল্লাহ তার করূণার জন্য যাকে ইচ্ছা করেন – মনোনীত করেন, আর আল্লাহ অপার কল্যাণের অধিকারী। (সুরা বাক্কারাহএর ১০৫ আয়াত)

তথ্যসূত্র:

(১) “Mahomed”. D.S.Margoliuth, London, 1906

(২) “Life of Mohammad” by Willium Muir.

(৩) Van Hammer 3rd edition 21 26 pages (cross ref Muhammad Akram Kha Mustafa Charit)

(৪) “Mukaddama” by Ibne Khalledun.

(৫) Dr Spranger’s “life of Muhammad”.

(৬) Father Jerome Dandini র “A Voyage to Mount Lebanus”.

(৭) স্যার সৈয়দ আহমদ সাহেবের লিখিত Essays on the life of Muhammed.

(৮) (মোসলেম–মেশকাত-২৮)

(৯) মাউজুয়াতে কবির ।

(১০) (জাদুল-মাআদ, ১ম খন্ড, ১৪-১৭ পৃষ্ঠা)।

(১১) (কেতাবুল তাওয়াচ্ছোল-৯৬পৃষ্ঠা)।

(১২) (History of Charles the Great, ৬-৭ পৃষ্ঠা, T. Rodd কর্তৃক অনুবাদিত (১৮১২) ।

(১৩)Father Jerome Dandini র “A Voyage to Mount Lebanus”।

(১৪) (এবন হেশাম ১-১৭৬)।

(১৫) মোহাম্মদ আকরাম খাঁ লিখিত “মোস্তফা চরিত”।

 

 

সরলে গরল ঢালি

নাজমা মোস্তফা

ইসলাম এ যাবত ধারাবাহিক খন্ডিত বিধানের পর একটি পূরিপূর্ণ বিধান নিয়েই আমাদের মাঝে নাজেল হয়েছে আজ থেকে চৌদ্দশত বছর আগে। তার প্রতিটি কাজ, তার প্রতিটি আচরণে পরিপূর্ণ আকারে আমাদের নবী মোহাম্মদ (সঃ) এর মাধ্যমে সুদীর্ঘ ২৩ টি বছরে সেই বিধান নেমে এসেছে থেমে থেমে, প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনায় উদাহরণ হয়ে তা উজ্জ্বল জীবন্ত বাস্তবতার এক ব্যতিক্রমধর্মী দলিল এই কুরআন তার প্রমাণ হয়ে আছে।

কথা ছিল এই গ্রন্থটিকে আমাদের প্রধান সিলেবাস হিসাবে ধরে নিয়ে প্রতিটি জীবনের ছক আঁকবার। কিন্তু দুঃখ জনক হলেও সত্যি কথাটি হলো আজো পুরাপুরিভাবে আমরা এই গ্রন্থটির সঠিক মূল্যায়ন করতে প্রকৃতপক্ষে অনেকাংশেই ব্যর্থ হয়েছি। এবার আমরা পরবর্তীরা কিভাবে এর থেকে ক্রমশঃ দূরে চলে গেছি তা একটু খতিয়ে দেখলে এ গলদটুকুন খুব সহজেই আঁচ করতে পারবো। আমরা বর্তমান সময়কার বেশীরভাগ মানুষ এখন আর ঐ গ্রন্থ অনুসারে মোটেও চলার প্রয়োজন বোধ করি না। এটি আমাদের বেশীর ভাগের কাছে একটি পুথিগ্রন্থ যা আমরা পালন না করলেও দিনরাত জপে থাকি, আর কিছু না পারলেও এ কাজটি আমরা অনেকেই করি তৃপ্তিভরে।

প্র্রথম নাজেলকৃত কথা হিসাবে “পড়’ কথার নির্দেশ পালন না করলেও আমাদের কর্তাব্যক্তিরা এই আয়াতের বিরূদ্ধেই বেরিকেড তুলেছেন এই সেদিনও। যদিও নারীপুরূষ সবার উপরই এ কথাটি এসেছে তবুও এই নারীশিক্ষা উনাদের কাছে সেদিনও ছিল এক দারূণ অনাচার। রমজানের আগে শবেবরাত হিসাবে যা পালন করা হয় তাও বাস্তবে দেখা যায় প্রকারান্তরে কালের ধারায় গড়ে উঠা আরেক আচার, যার সাথে সঠিক ইসলামের কোন সামঞ্জস্যতা নেই। এটা এক অভিনব সংস্কৃতি বিশেষ করে ঢাকায় যেভাবে এদিন পালন করতে দেখেছি তা রমজানের চেয়ে অনেকের কাছে এ রাতের গুরুত্বই অধিক। ওখানে ঢাকাতে শবেবরাত এবং ঈদপর্ব বেশীর ভাগ জনতাই পালন করতে ব্যস্ত, রমজানের দিকে জনতার নজর বরং কম।

পার্শ্ববর্তী সমাজের কোন আচার কোন ফাঁকতালে এসে ঢুকে পড়েছে আমাদের এই প্রাচ্যদেশীয় এক ব্যতিক্রমী ব্যবস্থা বলে। বাস্তবিকই অনেকে মনে করে থাকেন এ রাত নাকি স্রষ্টার নির্ধারিত সারা বছরের বিলি বন্টনের রাত। সত্যিই যদি তাই হয় তবে বলতে হবে আমাদের জনতা সারা রাত জেগে খুব কম পাওনাই অর্জন করেন। তার চেয়ে দেখা যায় ভিন জাতি গোষ্ঠীর যারা এ রাত ঘুমিয়েই কাটায় তারাই বরং দাওটা মারে ভালই। বাস্তবে ইসলামে প্রতিটি দিনরাতই পূণ্যের এখানে শনি মঙ্গলের কোন পার্থক্য নেই। সব দিনরাতই স্রষ্টার দিন, সব দিনরাতই সমান। একরাতে পার পাওয়ার এ হিসাব কালের ধারায় গড়ে উঠা আরেক অনাচার। ইসলামে শুধু একটি রাতের অতিরিক্ত গুরুত্ব দেয়া হয়েছে সেটি হলো শবে-কদর তার একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনার কারণেই, এই দিন পবিত্র গ্রন্থ আল-কুরআন প্রথম নাজেল হয়। তাই এই রাতটি সহস্র মাসের চেয়েও মূল্যবান বলে এই শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ কোরআনে ইঙ্গিত করা হয়েছে। যার সন্ধানে অনেকেই ইতেকাফ করে থাকেন। রমজানের শেষ দশ রাতের যে কোন একটি রাত এটি হতে পারে তাই অনেকেই এর সন্ধানে তৎপর থাকেন। কিন্তু সঠিক করে বলা নেই যে, এটা কোন রাত তবে এটা অবশ্যই সঠিক শেষ দশরাতের যে কোন একটি রাত।

এখন রমজান মাস চলছে। এই মাসটি নানা দিক দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সন্দেহ নেই। এরকম কোন ব্যবস্থা গোটা এই বিশ্বে আর দ্বিতীয় কোন জাতির মাঝে নেই। অবশ্যই এটি একটি অত্যন্ত ব্যতিক্রমী ব্যবস্থা। কারণ এটা দেখানোর বা প্রদর্শন করার কোন বিষয় নয়। আল্লাহ এবং তার সৃষ্ট বান্দার মাঝে এক অলিখিত চুক্তি এই সময় কার্যকর থাকছে। চরম সংযমের মাধ্যমে সব ধরণের ভোগ থেকে আপন সত্ত্বাকে বাঁচিয়ে রাখা, এবং ঠিক স্রষ্টার নির্দেশ মত তারই নিয়ম অনুসারে সূর্যোদয় থেকে  সূর্যাস্ত পর্যন্ত এই সংযম একই ধারায় কার্যকর। এটার অর্থ এই নয় যে এ দলের ঘরে খাদ্য নেই, অগাধ প্রাচুর্য রেখেও এই সমাজের জনতারা বহুবিধ মঙ্গলার্থে স্রষ্টার নির্দেশে এই অসম্ভব সুন্দর ও ব্যতিক্রমী কাজটি করে চলেছেন। এর সুফল শারীরিক মানসিক আত্মিক বহুধা অর্জণে ভরা। একজন মুমিন তার হৃদয় মন আত্মায় আল্লাহকে হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করে। শুধু তাকে খুশী করতেই তার আদেশ পালন করতে তারা কিছুই খায় না। যাকে জীবনেও দেখে নাই, শুধু শুনেছে আর বিশ^াসে বিঁধেছে, সেটি কি পরিমাণ দৃঢ়, ভাবেন – না হলে একজন রোজা করতেই পারবে না। এটি শুধু উপবাস করা নয়, এটি আত্মার পরিশুদ্ধির ব্যায়াম। একজন ক্ষুধার্তের ক্ষুধা কি হতে পারে সেটি কেউ না জানলেও জানে, একজন রোজাদার। 

এটাই সঠিক ঈমান নির্ধারণের উত্তম মাধ্যম। কারণ একজনের ঈমান না থাকলে পৃথিবীর কোন শক্তি নেই তাকে এই কাজ করায়। তা ছাড়া সে যে কোন জিনিস যে কোন মুহূর্তে লুকিয়ে খেয়েও ফেলতে পারে বাহ্যিক দৃষ্টিতে তাও হয়তো কেউ ধরতেই পারবেন না। কিন্তু এতো কিছুর পরও যে লোকেরা খাচেছ না, সেই বিশ্বাসের মূল্য কত? এবার পবিত্র গ্রন্থ থেকে দু একটি আয়াত এখানে প্রয়োজনে আনছি।

“(এ রমজান বিধিবদ্ধ হচেছ) নির্দিষ্ট সংখ্যক দিনের জন্য। কিন্তু তোমাদের মধ্যে যে কেউ অসুস্থ অথবা সফরে আছে সে সেইসংখ্যক (অন্য দিনগুলিতে পরে স্বাভাবিক অবস্থায়) রোজা রাখবে। আর যারা (বার্ধক্য, দীর্ঘস্থায়ী অসুখ, সারা বছর অবিরত ভ্রমন, গর্ভাবস্থা) এ অতি কষ্টসাধ্য বোধ করে (তাদের জন্য) প্রতিবিধান হলো একজন মিসকিনকে (সমান সংখ্যক দিনের জন্য) খাওয়ানো (বা রোজা ভাঙ্গার দিনগুলোর সমান সংখ্যক নিঃস্বকে একদিনের জন্য খাওয়ানো) কিন্তু যে কেউ স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে ভালো কাজ করে (যেমন মাসের শেষ দিকে ঈদের আনন্দ দানের জন্য ফিতরা আদায় করে) সেটি তার জন্য ভালো। আর যদি তোমরা (বিশেষ কষ্ট সহ্য করেও) রোজা রাখো তবে তোমাদের জন্য অতি উত্তম,—যদি তোমরা জানতে (রোজার মধ্যে আত্মসংযম, নিয়মানুবর্তিতা, ধর্মভীরুতা, ও সদা সতর্কতা অভ্যাসের মাধ্যমে চরিত্র গঠনের কতো না ভালো নিহিত আছে)” (সুরা বাকারাহ এর ১৮৪ আয়াত)।

“রমজান মাস এ মাসে কুরআন নাজেল (শুরু) হয়েছিল, মানব গোষ্ঠীর পথপ্রদর্শক হিসাবে, আর (পূর্ববর্তী কিতাবগুলোর সর্বোত্তম জ্ঞানভান্ডার সহ ৯৮:৩) পথনির্দেশের স্পষ্ট প্রমাণরূপে, আর ফুরকান (অর্থাৎ ভালো মন্দ ও ন্যায় অন্যায় ভেদকারী গ্রন্থ)। কাজেই তোমাদের মেধ্যে যে কেউ (এই রমজান) মাসটির দেখা পাবে সে যেন এতে রোজা রাখে (এবং পানাহার, কামাচার, পাপাচার, পরিহারের দ্বারা সংযম সাধনার ও আত্মশুদ্ধির অভ্যাস করে)। আর যে অসুস্থ বা সফরে আছে সে সেই সংখ্যক অন্য দিনগুলোতে (রোজা রাখবে ২ঃ১৮৪) আল্লাহ তোমাদের জন্য সুবিধা (দিতে) চান, আর তিনি তোমাদের জন্য কষ্টকর অবস্থা চান না, আর (তিনি চান ) তোমরা যেনো (সারা মাসব্যাপী রোজা রেখে) এই সংখ্যা পূর্ণ করো। আর যাতে আল্লাহর মহিমা কীর্তন করো (তোমাদের আত্মসংযম ও আত্মশোধনের মাধ্যমে) যে পথনির্দেশ তিনি দিয়েছেন আর তোমরা যেন কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করো (সুরা বাকারাহ এর ১৮৫আয়াত)।

রমজানের উপর নাজেলকৃত উপরের কথাগুলির সার সংগ্রহ করলে দেখতে পাই কটি কথা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, তা হলো:
(১) অপারগতায় বা প্রয়োজনে রমজান পালনে ব্রতিক্রমী ব্যবস্থাও আছে।
(২) কষ্ট করে হলেও যদি সঠিক সময়ে রোজা করা যায় তবে বেশী ভাল।
(৩) জীবনে চলার পথে যখনই এর সাক্ষাৎ পাবে এর অনুসারীরা যেন তা পালন করে।
(৪) অসুস্থ বা সফরের রোজা পরে করে নিতে হবে। ছাড় দেয়া গেলেও কিন্তু মাফ নেই।
(৫) উপরের ব্যবস্থা কষ্টকর সন্দেহ নেই কিন্তু সুরা বাকারাহ এর ১৮৫ আয়াতেই প্রমাণ আল্লাহ তারপরও অযথা মানুষকে কষ্ট দিতে চান না।
(৬) যে স্বতঃ প্রণোদিত হয়ে ভাল কাজ করবে তা তার জন্য খুবই ভালো।

উপরের এই কয়টি কথা থেকে আমরা এটাই জানলাম যে রমজান এক ব্যতিক্রমী শিক্ষা মানব জীবনের জন্য এক আত্মিক প্রশিক্ষন ব্যবস্থা, শুধুই কষ্ট করানো এর উদ্দেশ্য নয়। মোটকথা এটার সঠিক উদ্দেশ্য মানুষকে সিরাতুল মোস্তাকিমের সঠিক শিক্ষা দেয়া, অন্য কিছু নয়। কিন্তু বাস্তবে আমরা আজ নানা দলে বিভক্ত। গোত্রে গোত্রে বিভক্ত হয়ে এক সত্যকে আমরা এক একজন এক একভাবে নিচিছ। আমাদের মাঝে দেখা যায় একটি বড় পরিবারের সদস্যরাও ক্রমে বিভক্ত হচ্ছেন সমঝোতার বিষয় নিয়ে, বিভেদ লেগে যায় এর বুঝার হেরফেরের জন্য। যদিও আমরা এক আল্লাহ ও এক রসুলের অনুসরনই করছি কিন্তু কার্যত আমরা কেন এত বিভক্ত আমাদের চিন্তায় চেতনায়। মনে হচ্ছে এর প্রধান কারণ আমরা মূল গ্রন্থে নেই বলেই। “নিঃসন্দেহ এটি (-শ্রেষ্ঠ স্বর্গীয় বাণী সম্বলিত এই কুরআন, ৫:৩, ৯৮:৩, সত্য মিথ্যা ও ন্যায় অন্যায়ের) সুমিমাংসাকারী বক্তব্য (১৭: ১২, ৮৯)। আর এটি কোন তামাশার জিনিস নয়”। (সুরা আত-ত্বারিক ১৩ ও ১৪ আয়াত)

সাম্প্রতিকমাসে প্রচারিত এই রমজানে বিভিন্ন জনের বিভিন্ন পত্রিকার পাঠানো তথ্য থেকে কিছু সার তুলে ধরছি যা বর্তমান সময়ে মনে করা হয় ও পালন করা হয়।
(১) তারাবিহএর মাধ্যমে সারা কোরআন সমাপ্ত করা সুন্নত।
(২) এটা আমাদের ধর্মধারীদের বড় বিশ^াসের অংশ।
(৩) এই অপরিসীম কষ্ট করাটাই এই রমজান মাসের উদ্দেশ্য। মানুষকে কষ্ট করার শিক্ষা এটাতে স্পষ্ট।
(৪) বলা হয় তারাবিহ ছাড়া রোজা পরিপূর্ণ নয়। অনেককে বলতে শুনেছি অন্যথায় এটি শূণ্যে ঝুলে থাকে।
উপরে বর্ণিত ধারণার স¤পূর্ণটাই ভ্রান্তির উপর মানুষের মনগড়া কথা। কারণ এটা অবশ্যই কোন রসুলের সুন্নত নয়। আর রমজান উপলক্ষে এই বাড়তি কষ্ট উপরে বর্নিত কুরআন বিরুদ্ধ কথা। রমজান এক তৃপ্তির পাওনা, নিজেদের সৃষ্ট কষ্টের জন্য স্রষ্টাকে দোষ দেয়া সমিচীন নয়।

র্তমান সময়কার প্রেক্ষাপটে বলতে হচেছ ২: ১৮৫ আয়াতের হিসাবে ‘আল্লাহ তোমাদের জন্য কষ্টকর অবস্থা চান না’ বিরোধীতাই করছেন প্রকারান্তরে বেশীরভাগ জনতা। তারাবিহ এবাদতকে বর্তমান সময়ে এমনভাবে ব্যবসা কেন্দ্রিক করা হয়েছে যা এই কয়টি জেনারশেন আগেও এমনটি মোটেও ছিল না, তা অনেকেই বলতে পারবেন। শুনেছি অনেক আলেম বাবারাও এভাবে মসজিদভিত্তিক ফরজ নামাজের মতন গুরুত্ব দিয়ে এই কিছু আগেও ঠিক এভাবে পড়তেন না। তখন অনেকের যুক্তি সৌদিতেও হচেছ। কিন্তু অবশ্যই এটাও স্মরণ করার বিষয় যে, আমাদের প্রধান সিলেবাস মৌলিক নির্দেশনা এসেছে কুরআনে, সৌদি আমাদের আদর্শ নয়।  সৌদ নামে কোন দেশে নবীও আসেন নাই, জাজিরাতুল আরবে নবীর জন্ম মৃত্যু চলা বলা। নবী অত্যন্ত সংযমী চরিত্রবান সুন্দর রুচির মানুষ ছিলেন। সত্যের সাথে মিথ্যে জুড়ে দেয়া আর মিথ্যার কোন বেসাতি তার ছিল না। কুরআনকে ডিঙ্গিয়ে তিনি কোন মনগড়া ব্যাখ্যা দেন নাই।

বেশীরভাগ পরিবারেই দেখা যাচেছ বৃদ্ধ বাবা এই বৃদ্ধাবস্থায়ই যার পর নাই কষ্ট করে রোজার সাথে খতম তারাবিহ, কেউ কেউ তারপরও এর ফাঁকে ফাঁকে শুনা যায় চিল্লাহ করছেন তিন দিনের, সাতদিনের (তাবলিগের অনুকরণে)। এই হলো বৃদ্ধ বাবার অবস্থা আর ঠিক তার পাশেই বেড়ে উঠা ছেলেটা বাবার এই অতিআচারের মাত্রায় বাড়াবাড়ি ভেবে পার্শ্ববর্তী সমাজ ব্যবস্থার প্রতিই আকৃষ্ট হচেছ, আস্তে আস্তে অনেক সন্তান দেখা যায় ধর্ম বিমূুখ হয়ে উঠে। সমাজের এই দুঃসহ অবস্থার মুখোমুখি আজকের বাস্তবতা। ছেলেমেয়ের হাতে অতিরিক্ত পড়ার চাপ, সামাজিকতার চাপ, বন্ধুত্বের হাতছানি তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না বাড়তি দুটি ঘন্টা এক নাগাড়ে এই নামে অপচয় করার। প্রকারান্তরে এখানে উভয়েই বাবা মা ও সন্তানেরা সবাই কম বেশী সত্যচ্যুতির শিকার। এটি যদি অবশ্য করণীয় হতোই তবে সেটি মাত্র দুটি শব্দেই আল্লাহ স্পষ্ট করে কুরআনে দিতেন। ‘তারাবিহ পড়’ বললেই শেষ হয়ে যেত। তাই মানুষ হয়ে খোদার উপর খোদকারী করা মনে হয় মানুষ জনমের জন্য সুখকর নয়। করোনা না আসলে এসব কথা বলার সুযোগও হয়তো হতো না। কিন্তু সত্য সন্ধানীকে সব সময় সত্যের পথেই হাটতে হবে। এ জন্যই বলা হয় সিরাতুল মোসতাকিমের রাস্তা সুক্ষ চুলচেরা বিশ্লেষনের সহজ সরল মধ্যপন্থা। চুলের চেয়েও চিকন ছুরির চেয়েও ধারালো।

বোখারীর বরাতে তারাবিহর জন্ম সংক্রান্ত দলিলে দেখা যায় এই এবাদতটিকে একটি বিদআত আকারে হাদিসেই লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। অনেকের কাছে কথাটি নতুন শোনা গেলেও হযরত ওমরের বরাত দিয়ে একটি হাদিসে এভাবে এসেছে। এর আগে তারাবিহর কোন ইতিহাস নেই। সত্যিকার গবেষনায় দেখা যায় এটা হযরত ওমরের কথার সূত্রে ছুন্নতের সম পর্যায়ে টেনে আনা হয়েছে। এটিও স্মরণ করার বিষয় নবীর সুন্নত কুরআন ডিঙ্গিয়ে হয় না। আর যদি ওমরের সুন্নত পালন করতে বলা হয়, তবে সবার চিন্তাশক্তিকে প্রসারিত করতে হবে। মোহাম্মদ (সঃ) কিভাবে রমজানে রোজা পালন করতেন এই প্রশ্নটি বিবি আয়েশাকে করা হলে তার জবাব ছিল এরকম যে, আপনারা কি কোরআন পড়েন না? আর তার অন্য জবাবটি ছিল এরকম যে, রমজানে এবং গয়র রমজানে তিনি তাহাজ্জুদ নামাজ পড়তেন। এবং বাস্তবিকই বোখারী শরিফে যা বলা হয়েছে তাতে দেখা যায় এটি ওমরের বরাতে যে নামাজ পড়ার কথা আসে সেটিও শেষ রাতের নামাজই ছিল। প্রকৃত পক্ষে তাহাজ্জুদ, যা উনি জীবনের অনেক সময় পালন করেছেন হোক রমজানে অথবা রমজানহীন সময়েও। আর এই তাহাজ্জুদের নামাজ এক বাড়তি ব্যবস্থা তাদের জন্য যারা আল্লাহর অতিরিক্ত নৈকট্য চায়। আপনি চাইলে আপনার জন্যও। বনি ইসরাইল সুরার ৭৯ আয়াতে বলা হয় রাতের কিছু অংশ তাহাজ্জুদ তোমার জন্য, আদায় কর অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসাবে। এতে তুমি মাকামে মাহমুদাতে (উচ্চ প্রশংসিত স্থানে) পৌছতে পারবে। আবার সুরা মোজাম্মেলের ৬ আয়াতে বলা হয়েছে নিশ্চয় এবাদতের জন্য রাত্রিতে উঠা প্রবৃত্তির উচ্চমার্গের সহায়ক ও স্পষ্ট উচ্চারণেরও অনুকুল। এর অর্থ সমাজের শত জটিলতাকে একপাশে ঠেলে তুমি নিশ্চিন্তে তোমার আত্মার পরিশুদ্ধির জন্য এখানে সময় ব্যয় করতে পার। এটি নবীর জন্য অতিরিক্ত জমা।

এতে দেখা যায় আমরা যদি সঠিকভাবে কুরআন অনুসরণ করি এবং রমজানে অতিরিক্ত এবাদতের ইচছা করলে আমরা হাদিস অনুসারে হলেও সেই তাহাজ্জুদই পড়বো এটাই মোহাম্মদ (সঃ) কর্তৃক করণীয় বিধান। তবে তিনি সাধারণের জন্য তা বাধ্যতামূলক করার কোন নির্দেশ দেন নি। আর এই ভয়ে দেখা যায় ঐ হাদিস মোতাবেকই ঐ সময়ে প্রথম দুই / তিন দিন কিছু লোক জমায়েত হয়ে উনার পিছনে নামাজ পড়লেও চতুর্থ দিনে তিনি বের হন নি এই ভয়ে যে শেষে জনতারা এটাকে ফরজের সমান মূল্যায়ন করে তুলবে। এই ঘটনাটাও তাহাজ্জুদেরই ঘটনা। কিন্তু আমাদের অতি উৎসাহীরা এটাকে প্রায় ফরজের সমপর্যায়ে নিয়ে এসেছেন যা নবী মোহাম্মদের কৃত বিধানের বিপরীত সন্দেহ নেই। এখানে প্রকারান্তরে নবীর আশংকাই বাস্তব হয়েছে। মানুষরা এটাকে আজ ঐ পর্যায়েই নিয়ে এসেছে। সুরা বনি ইসরাইলের ৭৯ আয়াতে ও সুরা মোজাম্মেলের ৬ আয়াতে তাহাজ্জুদ নামাজের কথা এসেছে যেটি নবী তার বাড়তি অর্জনের কারণে প্রশান্তির জন্য খোদার নির্দেশ। সম্পূর্ণ অক্ষরজ্ঞানহীন একটি মানুষকে বাড়তি দক্ষতায় বলিষ্ট করতে এসব অর্জন নবীর জন্য অত্যন্ত জরুরী ছিল। আমরা যারা নবীর মত আল্লাহর নৈকট্য চাই তারা সানন্দে ওটি করতে পারি।

জীবনের চরম এক ক্রান্তিকাল আমরা কাটাচিছ। অতি আহার যেমন স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকারক ঠিক তেমনি অপুষ্টি, অনাচার অতি মিতাচার স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকারক। সুস্বাস্থ্য রক্ষা করতে হলে সব সময় একজন সদস্যতে পরিপূর্ণ ডায়েট খেতে হবে। ধর্মেও ঠিক একইভাবে আমাদেরকে সিরাতুল মোসতাকিমের পথে চলতেই বলা হয়েছে আমরা যদি শুধুই ঘোরা পথে চলি, খানাখন্দক চড়াই উৎরাই পার হয়ে চললেই আমাদের লক্ষ্য সুনির্দিষ্ট না হবারই সম্ভাবনা অতিরিক্ত। তাই সিরাতুল মোস্তাকিমের রাস্তা অতিআচারে ও অনাচারে দুটোতেই ক্ষতিগ্রস্থ হবে সন্দেহ নেই। এর লেবেল নির্ধারণ করা আছে শ্রেষ্ঠ গ্রন্থে। আর এই সাবধান বাণী এসেছে আজ থেকে চৌদ্দশত বছর আগে এবং এই সাবধান বাণী হিসাবে স্মরণ করার মত বক্তব্য শ্রেষ্ঠ গ্রন্থে অনেকই আছে।

সত্যিকার বিজ্ঞানময় অতীব সুন্দর বাস্তবধর্মী জীবন্ত প্রাণবন্ত এই ধর্মটিকে বর্তমান ব্যবসায়িক ধর্মীয় সমাজ ব্যবস্থা কুরআন থেকে অনেক দূরে নিয়ে এসেছে। বাস্তব ধারণা বিবর্জিত কাল্পনিক ধ্যান ধারণায় ধর্মটিকে সব দিক থেকে অতিভৌতিক এক কিম্ভুতকিমাকার রূপে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করা হচেছ। সর্ব রোগের সংহার নিরোধকারীরা এক শ্রেণীর সদস্যরা সারা বছরই ওৎ পেতে থাকেন আনাচে কানাচে সর্বত্র তাদের প্রচারে, তারা এটিকে ব্যবসার অঙ্গ হিসাবে ধরে নিয়েছেন। শেষ রাতের এবাদতকে মানুষ ব্যবসায়ীক মোড়ক দেবার জন্য আগ রাতে টেনে এনেছে। যদি তারাবিহ পড়তেই হয় তবে নবীর মতই পড়–ন। শেষ রাতে মনের মাধুরী মিশিয়ে একান্তে আপনি আল্লাহর সান্নিধ্যে সত্য সাধনা করুন। আগ রাতে ঐ নামাজকে টেনে এনে হযরত ওমরের বরাতে হাদিস আকারে প্রচার করে তার মুখ নিসৃত কথাটি ছিল, তোমরা একটি ভালো বিদআত করছো। রসুলের হাদিস ছিল তোমরা বিদআত করবে না, যারা বিদআত করবে তারা জাহান্নামে যাবে। জানতে হবে বিদআত কি? ধর্মের নামে নতুন সংযোজনকে বলা হয় বিদআত। হযরত ওমরের বরাতে বলা হলেও তিনি ঐ বিদআতে সেদিনও যোগ দেন নাই। বোখারীর হাদিসে স্পষ্ট তিনি নিজে মানুষের ঐ জোটবদ্ধ নামাজে যোগ দেন নাই। আজ প্রথম রোজা চলছে বিধায় আমি আজকেই করোনার রাতে জেগে সেটি নতুন করে ব্লগের জন্য রেডী করছি। যদিও এ লেখাটি আজ থেকে ১০ / ১২ বছর আগে নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক দর্পণে এসেছিল।

ধর্মের পূর্ণতার পরও নানান ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ আমরা, এতে লাভের অঙ্কটা আমাদের জমছে কি? দেখা যাচেছ বৃদ্ধ বাবা নাকে মুখে ধর্ম ধর্ম করে আকন্ঠ আত্মাহুতি দিচেছন তার ঠিক পাশে বেড়ে উঠা সন্তানরা বাপের এসব কর্মকান্ডে ভ্রুকুঞ্চিত করে পশ্চিমা ধাচে বেড়ে উঠছে এবং ওদের দিকেই ঝুকে পড়ছে নানান কারণে। তার ধারণায় এই ব্যস্ত জীবনের ধারায় অতি আচার থেকে ওখানে মিতাচারের সন্ধান অনেক লোভনীয়। কিন্তু সঠিক সিরাতুল মোস্তাকিমের রাস্তায় চললে তার কখনোই বিভ্রান্ত হবার চান্স নেই। যুক্তি, বিজ্ঞান, ধর্ম, সত্য সবার একাত্মতা বরং প্রজন্মকে মুগ্ধ করতো, আকৃষ্ট করতো। একজন বৃদ্ধের এবাদত থেকে সঠিক বস্তুনিষ্ট এবাদত একজন যুবকের জন্য বেশী প্রয়োজন। বৃদ্ধ হলে সবাই কম বেশী এবাদত করেন মৃত্যুর বিভীষিকা চোখের সামনেই থাকে হয়তো বা। কিন্তু যদি একজন যুবক সঠিকভাবে সুনির্দিষ্ট কাজটি করতে পারে তবে সেটাই বড় ঈমানদারীর লক্ষণ, বড় পাওনা।

সিলেবাস শুধু বাড়ালেই লেখাপড়ার মানবৃদ্ধি হয় না বরং তাকে অর্থবহ বস্তুনিষ্ট ও বাস্তব জীবনমুখী করে তুলতে পারাই লেখাপড়ার উদ্দেশ্য। তাই অনেক সময় দেখা যায় অনেক লেখাপড়া করেও একজন একটা বিষয় নিয়ে কিছু লিখতে দিলে ব্যর্থ হন এটার কারণ লেখাপড়ার সাথে তার সঠিক একাত্মতা হয় নি, তাই। ধর্মটিও সে রকম যদি আমাদের আত্মায় অন্তরে না মিশে, প্রজন্মের নাক সিটকানো ভ্রুকুঞ্চনের শিকার হয় তবে, তার ভবিষ্যৎ অন্ধকার। শীঘ্রই এমন এক সময় আসবে যখন ধর্ম তার চলার গতি বাস্তবিকই হারিয়ে ফেলবে। আজ অনেকেই এটাকে স্থবির, জড় ও পঙ্গুত্বে আবদ্ধ করে রেখেছেন নানান কার্যকারণে।

ধর্মকে ব্যবসায়িক মোড়কে আবদ্ধ করতে এই কুরআনে নিষেধ করা হয়েছে। কোন আয়াত কেনাবেচার মূল্যে নির্ধারণ করতে হুশিয়ারী জানানো হয়েছে। ধর্ম কোন বিনিময়ের মাধ্যম হতে পারে না। এটা সবার আত্মার খোরাক, বেঁচে থাকার অবলম্বন। এটার কোন ব্যবসায়িক রূপ থাকতেই পারে না। কিন্তু বাংলাদেশের গ্রামগঞ্জ থেকে শুরু করে সর্বত্রই দেখা যায় এই রমজানের মাসে এটা একটা ব্যবসায়িক লেবাসে আকন্ঠ আবৃত যা কুরআনীয় দৃষ্টিতে অবশ্যই গোলমেলে। এটা জনতার উপর চেপে দেয়া এক বাড়তি আচার, যেখানে আল্লাহ মানুষকে কষ্ট দিতে না চাইলেও আজ জনতা একটি বাড়তি আচারের শিকার।

অতিধার্মিকতার নামে বাড়াবাড়ি ও অর্ধামিকতা দুটোই সিরাতুল মোস্তাকিমের বৈরী অবস্থান আর এই দুই রাস্তা থেকে মুমিনকে বিশুদ্ধতার দিকে নিবদ্ধ থাকতেই কুরআনে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে।
(১) “তারা (এদিক ওদিক) দোল খাচেছ এর মাঝখানে—এদিকেও তারা নয়, ওদিকেও তারা নয়, আর যাকে আল্লাহ বিপথে চলতে দেন (হে মুহাম্মদ)! তুমি তার জন্য কখনো পথ পাবে না। (সুরা নিসার ১৪৩ আয়াত) (২)  “তারা ব্যতীত যারা (আন্তরিকতার সাথে) তওবা করে ও শোধরায়, আর আল্লাহকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে, আর তাদের ধর্মকে আল্লাহর জন্য বিশুদ্ধ করে,—তারা তবে মুমিনদের সাথে, (থাকবে) আর শীঘ্রই আল্লাহ মুমিনদের দিচেছন এক বিরাট পুরষ্কার”। (সুরা নিসার ১৪৬ আয়াত)

প্রকৃত সত্য সুন্দর ধর্মটিকে সত্য ও সুন্দরভাবে পালন করতে এবং সুন্দরভাবে ভবিষ্যত প্রজন্মের হাতে আমানত স্বরূপ রেখে যেতে পারাই সঠিক মুমিনের কাজ। সে হিসাবে আমাদের বর্তমান ও আগামী প্রজন্মরা গবেষক মন মানসিকতা নিয়ে যেন ব্যতিক্রমধর্মী এই শান্তির ধর্ম ইসলামকে আত্মায় অন্তরে গ্রহণ করতে পারে এটাই হোক কঠিন যুগসন্ধিক্ষণের এ সময়কার আমাদের সঠিক দিক নির্দেশনা।

One source link can help you: https://www.ittefaq.com.bd/lifestyle/146746/

সুসংগ্রহ:
“আমাদের প্রভু! আর আমাদেরকে তোমার প্রতি মুসলিম (স¤পূর্ণ আত্মসমর্পিত) করে রেখো, আর আমাদের সন্তান সন্ততিদের থেকে তোমার প্রতি মুসলিম উম্মত (তথা চির অনুগত শিষ্য মন্ডলী বানিয়ে রেখো, ২: ১১২; ৩: ১৮) আর আমাদের উপাসনা প্রণালী আমাদের দেখিয়ে দাও, আর আমাদের তওবা কবুল করো; নিঃসন্দেহ তুমি নিজেই (বারবার) তওবা কবুলকারী, অসীম কৃপানিধান। (সুরা বাকারাহ এর ১২৮ আয়াত)

বি দ্রষ্টব্য: আশা করবো উদার মন নিয়ে বিবেকের বিশ্লেষনে সত্যকে সহজভাবে গ্রহণ করবেন। এ লেখা যেন কারো মনে কোন বিভক্তি রেখা না টানে। করোনার এ সংকট সময়ে সবাই ভালো থাকুন সুস্থ থাকুন। সবার জন্য রমজান হোক আশায় ভরা জীবন সাধনা ও প্রাণবন্ত উদ্দীপনার জমা। প্রতিটি মুসলিম নারী পুরুষ এতেকাফ করবেন নিজের মত করে, শবেকদর আমাদের হাতে ধরা দেবে না, সেটি আমরা বলতে পারি না। আমরা আশরাফুল মকলুকাত। আমাদের জন্য আল্লাহর এত সাজগোজ  আল্লাহর সে সাধনা সার্থক করুন। এ আশায় আমার এ বছরের প্রথম শুরুর রমজান। রাত তিনটা। ৪/২৪/২০২০।

Tag Cloud