Articles published in this site are copyright protected.

মুক্তিযোদ্ধা মেজর জলিল, নবম সেক্টর কমান্ডার ছিলেন, তার লেখা গ্রন্থ (অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা) র আলোকে এটি পয়েন্ট দিয়ে লেখা।

নাজমা মোস্তফা

আওয়ামী লীগের চার রাষ্ট্রীয় নীতির ঊৎস: 

 (১) ৭০এর নির্বাচর অনুষ্টিত হল ৬ দফার ভিত্তিতে। এই ৬ দফার মধ্যে আওয়ামী লীগ গৃহীত ৪ রাষ্ট্রীয় মূলনীতির একটিরও উল্লেখ ছিল না। তাছাড়া নির্বাচনী ইশতেহারে আওয়ামী লীগ আরো উল্লেখ করেছিল যে, তারা ইসলাম ধর্ম বিরোধী কোন আইন কানুননও পাস করবে না। কিন্তু আওয়ামী লীগ ৭২ সনের জানুয়ারীতে ক্ষমতাসীন হওয়ার সাথে সাথেই ইসলামের বিরুদ্ধে অপপ্রচার শুরু করে দেয় এবং গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং জাতীয়তাবাদ নামে রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতি নির্ধারণ করে, যা পরবর্তীতে ’৭২এর রাষ্ট্রীয় সংবিধানেও সন্নিবেশিত করা হয়। এই চার নীতির মূল উৎস কোথায়? কেনই বা উক্ত চার নীতিকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসাবে ঘোষনা করা হলো? এ প্রশ্নগুলোর জবাব জনগণ আজো পায়নি। 

 (২) দেশের জনগণের কোনরুপ তোয়াক্কা না করেই রাষ্ট্রীয় মূলনীতির মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব জনগণের উপর জবরদস্তিভাবেই চাপিয়ে দিল। 

(৩) ’৭০এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নির্বোচিত সংসদ সদস্যরা জনগণের ম্যান্ডেট লাভ করেছিল পাকিস্তানের অধীনে। নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশের অধীনে নয়। সুতরাং ’৭২এর  আওয়ামী লীগ কর্তৃক সংবিধান প্রদান নীতিগত দিক দিয়ে মোটেও বৈধ ছিল না। সমগ্র জনগণের স্বতঃস্ফুর্ত অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত হয়। এখানে আরো উল্লেখযোগ্য যে, ’৭০ এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের স্বপক্ষে যারা ভোট প্রদান করেনি, তারাও দেশ মাতৃকার মুক্তির লড়াইএ শরীক হয়েছেন। 

(৪) কিন্তু যুদ্ধোত্তরকালে আওয়ামী লীগ চরম সংকীর্ণতার পরিচয় দেয় এবং মুক্তিযুদ্ধের জাতীয় রুপকে দলীয় রুপ প্রদানের জন্য বিভিন্নমুখী ষড়যন্ত্রের আশ্রয় নেয়। যার ফলে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী আওয়ামী ণীগ বহির্ভুত সকল শক্তি হতোদ্যম হয়ে পড়ে এবং তারা তাদের নবতর আশা আকাংখার বাস্তবায়ন করার সুযোগ থেকে প্রায় সম্পূর্ণভাবেই বঞ্চিত হয়। 

(৫) য়ুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে যখন জাতীয় ঐক্যের সর্বাধিক প্রয়োজন ছিল, ঠিক সেই সময়েই আওয়ামী লীগ একলা চলার নীতি অনুসরণ করার মধ্য দিয়ে জনমত এবং জনগণের আশা আকাঙ্খা পদদলিত করে চলতে থাকে। এসব কারণে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তায় রাতারাতি ভাটা দেখা দেয়। আওয়ামী লীগের যুদ্ধকালীন দুর্নীতি এবং ব্যর্থতা  এবং যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে জনগণের উপর স্বৈরতান্ত্রিক নির্যাতন জনগণ থেকে আওয়ামী লীগকে বিচ্ছিন্ন করার  উপসর্গ সৃষ্টি করে। 

(৬) বস্তুত সেই ভয়ে ভীত আওয়ামী লীগ ’৭২ এ জনগণের ম্যান্ডেট নেয়ার চিন্তা থেকে বিরত থাকে। অথচ সংবিধান রচনার পূর্বেই জনগণের তরফ থেকে নতুন ম্যান্ডেট লাভ করা ছিল অত্যাবশ্যকীয়। অতএব, এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, ’৭২এ আওয়ামী লীগের এমন কোন বৈধ অধিকার ছিল না যাতে করে তারা দেশ ও জাতির উপর একটি মনগড়া সংবিধান আরোপ করতে পারে। তবুও তারা তা জবরদস্তি করেছে। দেশের জনগণের চিৎকার প্রতিবাদ কোন কাজেই আসেনি। 

(৭) এভাবেই যুদ্ধোত্তর বিধ্বস্ত বাংলাদেশের কোটি কোটি বুভুক্ষ মানুষের জন্য অন্নবস্ত্রের পূর্বেই রাষ্ট্রীয় মূলনীতি এসে মাথায় চেপে বসে। এই ৪ মূলনীতি আরোপ করার মধ্য দিয়ে দিল্লীর কর্তারা তাদের মূল লক্ষ্যই স্থির রেখেছে কেবল। 

(৮) এই হিন্দু ভারত হিন্দু ধর্মের জাত-শ্রেণীভেদের বিপরীতে ইসলামী সাম্যবাদকে যমের মতই ভয় পায়। — ইসলামের সাম্যবাদ নীতি ভারতের নির্ধারিত মানব গোষ্ঠীকে আকস্মিকভাবেই ইসলামের পতাকাতলে সমবেত করতে পারে। বাংলাদেশের ১১ কোটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে ১০ কোটিই হচ্ছে ইসলাম ধর্মের অনুসারী। 

(৯) বাংলাদেশে বিস্ময়কর শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের দৃষ্টান্ত বিদ্যমান। বাংলাদেশের মাটিতে সাম্প্রদায়িকতা নেই বলেই অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরা কখনই নির্যাতিত কিম্বা সামাজিকভাবে সংকটাপন্নও হচ্ছে না। তেমন একটা কিছু হলেও না হয় আধিপত্যবাদী ভারতীয় চক্র বাংলাদেশের উপর সরাসরি কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার একটা সুযোগ লাভ করত। 

(১০) বাংলাদেশের উপরে সাংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হলে সামরিক কর্তৃত্ব স্থাপনের তেমন কোন প্রয়োজন পড়বে না। — ধীরে ধীরে ধর্মীয় অনুশাসনের অনুপস্থিতি তরুণ যুবক শ্রেণীকে বেপোরোয়া আরাম আয়েশে ভোগপূর্ণ উচ্ছৃংখল জীবন পদ্ধতির দিকে ঠেলে দিলেই তারা হয়ে পড়বে শিকড়হীন পরগাছার মতন। 

(১১) ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ ধর্মহীনতারই লেবাস নাম। — মুসলিম তরুণ যুব গোষ্ঠী এই নাস্তিক্যবাদী তত্ত্বে প্রভাবিত হলে তারা স্বেচ্ছায়ই ইসলাম বিদ্বেষী হয়ে উঠবে এবং তাহলেই ভারতীয় শাসকচক্রের গোপন স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়ে যায়। – অর্থাৎ বাংলাদেশের উপর ভারতীয় সাংস্কৃতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ধর্মনিরপেক্ষতাবাদই হচ্ছে ইসমলামের বিরুদ্ধে একটি সুকৌশল ঠান্ডা যুদ্ধ। 

(১২) স্বাধীন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক চেতনার উৎস হচ্ছে ‘তৌহিদবাদ’, যা ইসলাম ধর্ম ভিত্তিক। অপরদিকে পশ্চিম বাংলার জনগণের সাংস্কৃতিক চেতনার উৎস হচ্ছে ‘পৌত্তলিকতাবাদ’, যা হিন্দু ধর্ম ভিত্তিক। — সবকিছু জেনেশুনেই ভারতীয় শাসকচক্র বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় মূলনীতির ৪র্থ স্তম্ভ হিসাবে ‘বাঙালী জাতীয়তাবাদকে জুড়ে দিয়েছে। উদাহরণ হিসাবে হিন্দুধর্মের লোক হওয়া সত্ত্বেও যখন উচ্চবর্ণ নিুবর্ণ হিন্দু হরিজনকে জীবন্ত অবস্থায় পুড়িয়ে হত্যা করে, সেই উচ্চবর্ণ হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে  মুসলিম বাঙালীদের গ্রহণযোগ্যতা আদৌ থাকতে পারে কি? 

(১৩) বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবি জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই সত্ত্বার সংকট এতই তীব্র রুপ ধারণ করেছে যে, আজ তারা ‘নিজ সত্ত্বা’ প্রকাশে দ্বিধাগ্রস্ত। এ ধরণের আচরণ মুক্তবুদ্ধি কিম্বা কোন বাহাদুরীর লক্ষণ মোটেও নয়, বরং এটা হচ্ছে আত্মপরিচয় দানে হীনমন্যতা এবং আত্ম প্রবঞ্চনার বহিঃপ্রকাশ। সংক্ষেপে রাষ্ট্যীয় চার নীতির ‘পোষ্ট মর্টেম’এখানেই শেষ। 

(১৪) আওয়ামী লীগ কর্তৃক প্রণীতি বাংলাদেশের ’৭২ এর সংবিধানকে যারা দেশ ও জাতির জন্য পবিত্র আমানত বলে মনে করেন, তাদের কাছে একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে আমার সবিনয় আশ্বাসবাণী দেশ ও জাতির জন্য আপনারা ব্রাহ্মণ্যবাদী ভারতীয় শাসকচক্রের তরফ থেকে যে সকল পবিত্র আমানত ১৯৭১ সন থেকে বহন করে নিয়ে এসেছেন, তার মালিকানা নিয়ে আপনাদের সাথে বাংলাদেশের তৌহিদী জনগণের কোনদিনই প্রতিযোগিতা হবে না। 

(১৫) একটি রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা অবুঝের মত কেবল ৪টি স্তম্ভই ধার করলাম, নিরাপদ একটি বাসগৃহ তৈরী করার প্রস্তুতি নিলাম না। দেশের কোটি কোটি নির্যাতিত মানুষ এবং তৌহিদী জনগণ আজ সেই নিরাপদ একটি বাসগৃহই কামনা করে, বিদেশী প্রভুদের কাছ থেকে পাওয়া স্তম্ভ বিশিষ্ট ইমারত নয়। 

https://www.youtube.com/watch?v=99i2DzPIypU, = যেভাবে ‘র’ এর খপ্পরে পড়েছিলেন শেখ মুজিব, দেখুন. || #eliashossain ||

Tag Cloud

%d bloggers like this: