Articles published in this site are copyright protected.

নাজমা মোস্তফা

প্রকাশিকাঃ

নাজমা মোস্তফা

প্রচ্ছদঃ এহতেশাম মোস্তফা,

বইটির প্রচ্ছদ উপরে আমার বুক্স আইকনে আছে।

৬২/সি ইউনিভার্সিটি কোয়ার্টার

নীলক্ষেত ঢাকা- ১০০০

ফোন ৮৬৯৬৩৯

প্রকাশকালঃ জুলাই ১৯৯৬ ইং

কম্পিউটার কম্পোজঃ অপূর্ব কম্পিউটার।

মুদ্রণেঃ অপূর্ব প্রিন্টার্স

১৯০, এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা।

ফোনঃ ৮৬৩১১৩

মূল্য ৬০.০০ টাকামাত্র।

সূচীপত্র:

(১) কুসংস্কারের জঞ্জালে জ্বলছি মোরা (ক)

(২) কুসংস্কারের জঞ্জালে জ্বলছি মোরা (খ)

(৩) নির্বাচিত কলামের নির্যাতিত নারী

(৪) ইসলামের ইজ্জত ইরানের নারী

(৫) পাশ্চাত্যে নারী

(৬) অনেকের চোখে

(৭) ভারতে মিশ্র বিয়ের প্রস্তাব

(৮) যুক্তির মাধ্যমে মুক্তির অন্বেষায়

(৯) তসলিমার তমসার তন্দ্রা কি কাটবে?

(১০) ভিন্ন সম্প্রদায়ের মনিষীদের দৃষ্টিতে

(১১) সংকীর্ণতার গন্ডিতে বাধা ধর্মের মহানুভবতা

(১২) ইসলামে বিয়ে 

(১৩) উত্তরাধিকারের গ্যাড়াকলে নাসরিন

(১৪) রসুল(সঃ)এর বিয়ে

(১৫) ইসলামের পর্দায় তসলিমার লজ্জা

(১৬) পর্দার আয়াত

(১৭) তসলিমা নাসরিনের উত্থানের নেপথ্যে কিছু তথ্য

(১৮) শিকড়ের সন্ধানে

(১৯) ইসলামপূর্ব জগতের অবস্থা

(২০) উপসংহার

উৎসর্গ:

যারা আমায় তিল তিল করে গড়ে তুলেছেন, সত্যের দীপশিখা জ্বালিয়ে জীবনকে উপলব্ধি করতে শিখিয়েছেন, সেই পরম শ্রদ্ধেয় বাবা-মা এর প্রতি উৎসর্গ করলাম আমার এই প্রয়াসটুকু। আমার সুকর্মের অংশীদার তারাও। আল্লাহ তাঁদের অনন্ত জীবন মহাআনন্দের করুক। আজ বাস্তবের সংকীর্ণতার বাইরে তাদের বসবাস। জীবনের অনেক হতাশার রাস্তায় আলো জ্বালতে আজীবন প্রাণান্তর প্রচেষ্টা চালিয়েছেন এই দুই জোড় মানিক আমার। স্রষ্টার আপনার হোন, আদরের হোন, সম্মানের অংশীদার হোন আমার বাবা-মা।

ভূমিকা :

     ধর্মের মৌলিক জিনিসকে অবজ্ঞা করে সমাজের নানান ত্রুটি বিচ্যুতিই ধর্মের অঙ্গ হিসাবে সমাজের সর্বত্র অনাচার হয়ে ছড়িয়ে আছে আর আমাদের সমাজপতিরা তার প্রতিবাদ না করে বরং প্রতিপালনই করে থাকেন। সে কারণেই আজ এসব তসলিমাদের আবির্ভাব। যুগে যুগে ধর্মের নামেই অধর্মের সৃষ্টি হয়েছে, আর এ অধর্মের অনাচারকে ঠেকাতে এগিয়ে এসেছে কঠিন হাতে এক শান্তির ধর্ম-ইসলাম।

     ইসলামকে নিয়েও ব্যবসা কম হয় নি, এখনও হচেছ, হয়তো আরও হবে। তবু অবশ্যই এই শান্তির ধর্ম প্রতিষ্ঠিত হবে সারা বিশ্বময়-এ কুরআনেরই ভাবষ্যদ্বানী।

     তসলিমা এবং তারই সহযোগী বেশ কিছু বিশেষ ব্যক্তিত্বের নাস্তিকতার জবাব এই গ্রন্থখানি। সে হিসাবে তাদের অনেক ভুল, বিভ্রান্তির জবাবে আমার এ সামান্য প্রয়াসটুকু যেন তসলিমাসহ গোটা বিশ্বের হতাশার মাঝে আলোর সঞ্চার ঘটায় এ আকাঙখা রেখেই এ লেখার উপস্থাপনা।

     নাসরিনের ভাষায় ইসলাম একটি বিতর্কিত বাজে উপাখ্যান। যার প্রতিবাদ করতে বসেই আমার এ বই লেখা। তাই এ উপাখ্যান যে বাজে নয়, তা প্রমাণ করতে অবশ্য আরো আরো গুণীজনদের সাহায্য সহযোগিতা আমাকে প্রমাণ স্বরূপ খাড়া করতে হয়েছে। যার কারণে অনেক সময় অনেক বিজ্ঞ জনের জ্ঞানগর্ভ কথা ও তথ্য সংগ্রহ করেছি আমার বক্তব্যকে আরো বস্তুনিষ্ট ও জোরালো করার জন্যই।

     তাছাড়া আলহাজ্জ ডাঃ জহুরুল হকের ‘সহজ সঠিক বাংলা কুরআন’ থেকে তসলিমার বিতর্কিত বেশ কিছু আয়াতের বাংলা তরজমা সুবিন্যস্তভাবে দেয়ার চেষ্টা করেছি। তাছাড়া আরো আরো তরজমা থেকেও আমি উদ্ধৃতি টেনেছি। ডাঃ হকের তরজমা কিছুটা বিশ্লেষণধর্মী হওয়াতে পাঠকের বুঝার সুবিধার্থে আমি এটার সাহায্য নিয়েছি। ‘নির্বাচিত কলামের’ প্রতিটি আয়াত যেগুলোকে নিয়ে নাসরিন খেলো কথাবার্তা বলেছেন তা আমি অবশ্যই এখানে এনেছি। তাছাড়া বিয়ে, তালাক, পর্দা ও উত্তরাধিকারের নানান ত্রুটি বিচ্যুতি তুলে ধরার কারণে কুরআনের দৃষ্টিতে পাঠকের কাছে এসব কিছুর একটা ধারণা দেয়ার জন্য আমি অনেক সময় যথেষ্ট সংখ্যক কুরআনের উদ্ধৃতি টানতে বাধ্য হয়েছি।

     আমার এ লেখা শুধু তসলিমার প্রতিবাদ করাই মুখ্য উদ্দেশ্য নয়, আমার মূল লক্ষ্য আমার দেশের উঠতি তরুণ তরুণীর আশায়ভরা অনাগত ভবিষ্যত; যার দিকে আমরা তাদের সুন্দর জীবনের জন্য উন্মুখ হয়ে আছি। বিজয় স্মরণীর মাঠের গত বইমেলার ‘মন্তব্য পুস্তিকাতে’ আমার দেশের তরুণদের কিছু মন্তব্য আমাকে বেদনাহত করে যার ফলশ্রুতিতে আমি আরো বেশী করে অনুপ্রাণিত হই বইটি লেখার কাজে হাত দিতে। তাই আমার টার্গেট তসলিমা নন, বরং আগত প্রজন্ম। প্রগতির নামে গতিহীনতার শিকার যেন না হয় আমাদের প্রজন্ম। বিভ্রান্ত যুক্তির মানদন্ডে প্রকৃত যুক্তির মাপকাঠিতে বিচার করার বোধ তাদের মাঝে বিকাশ লাভ করুক, এই কামনায় আমার এ প্রয়াসটুকু শুধু তাদের জন্য। খুব স্বল্প সময়ের আয়োজনে আমার এ লেখার প্রথম সংস্করণে ত্রুটি বিচ্যুতি থাকা স্বাভাবিক। আমি আশা করি আপনাদের সুবিবেচনাই আমার মূল্যায়নের মাপকাঠি হবে। আল্লাহ হাফিজ।

নাজমা মোস্তফা।

প্রথম চ্যাপ্টার:

কুসংস্কারের জঞ্জালে জ্বলছি মোরা

((১ – ক), (২ – খ), (৩), (৪), (৫)

     এখন সন্ধ্যে পেরিয়ে রাতের শুরুটা হয়েছে মাত্র। আগামীকাল আমার ছোট ছেলের এস, এস, সি পরীক্ষা। সন্ধ্যের নাস্তাটা সেরে চুলোয় ভাত চড়িয়ে এসে বসেছি কাগজ কলম নিয়ে। মাঝে মাঝে আঁকিবুকি দিই ঠিকই, কিন্তু কোনো বই লেখার কাজে হাত দিতে পারবো এত তাড়াতাড়ি চিন্তা করিনি।

     আজ আমার আব্বা বেঁচে নেই। কিন্তু লিখতে বসেছি এ কথাটি শুনলে আব্বা বড্ড খুশী হতেন। তিনি ডাক্তার ছিলেন কিন্তু ডাক্তারীর পাশাপাশি নেশা ছিল তাঁর অনেক: রাজনীতি, সমাজনীতি, ধর্মনীতি এসবের সমান্তরালে লেখালেখির হাত তাঁর সচল ছিল। তাঁর পাঁচ ছ’টা বই তিনি জীবিতাবস্থায়ই প্রকাশ করে যান আবার পান্ডুলিপি আকারেও বাংলা ও ইংরেজী বই লিখে রেখে গেছেন, যেগুলো এখনও প্রকাশিত হয় নি। মাত্র বছর গড়িয়ে এলো আমার বাবা অনন্ত যাত্রা করেছেন। তিনি সব সময় আমাদেরে কুরআনের আলোকে দিক নির্দেশনা দেয়ার চেষ্টা করতেন। কুরআনের প্রথম নির্দেশনা `ইকরা’ অর্থাৎ`পড়’ আয়াতটির উপর উনি সবচেয়ে গুরুত্ব দিতেন এবং আমাদেরেও স্মরণ করিয়ে দিতেন:

     `পড়ো! আর তোমার প্রভু (যিনি লেখাপড়ার মাধ্যমে মানুষকে সম্মান ও মর্যাদা দিয়ে থাকেন, আর তোমাকেও নিরক্ষরতা সত্ত্বেও বিশ্বের শ্রেষ্ঠ জ্ঞান দান করতে চুড়ান্ত মর্যাদার আসনে বসাতে যাচেছন)। যিনি শিক্ষা দিয়েছেন কলমের সাহায্যে (কাজেই এই কালি কলমের জোরে, তলোয়ারের জোরে নহে, কুরআনের বানী প্রচারের কঠোর জিহাদ চালিয়ে তুমি দুনিয়ার মানুষকে শিক্ষিত তথা জ্ঞানীগুনী বানিয়ে তোলো ২৫: ৫২)।’

    `যিনি শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে (এমন সব জিনিস) যা সে জানতোই না (২:৩১-৩৩ আর কুরআনের প্রথম প্রত্যাদিষ্ট এই পাঁচটি আয়াতে নিহিত বানীতে তোমার স্রষ্টার পরিচয় ও শিক্ষার গুরুত্ব সম্মন্ধে সম্যক জ্ঞানলাভের মাধ্যমে মানুষের পূর্ণবিকাশ ও মনুষ্যত্বলাভ ঘটবে; কাজেই খৃষ্টান ধর্মমতানুযায়ী অজ্ঞানতার মধ্যেই ধার্মিকতা বিদ্যমান, জেনে ২:১৬-১৭, এমন ধারণা সম্পূর্ণ ভুল) (সুরা আলাক ৩-৪-৫)।“

     লেখা ছাড়া শুধু পড়া মানুষকে ঈস্পিত লক্ষ্যে পৌছায় না। মনে পড়ে অনেক আগে সুমন নামের একটা ছেলে আমাকে প্রায়ই বলতো, লিখতে, তখন আমার বড় ছেলেটা তিন চার বছরের মাত্র। নিজে সব সময়ই নিজের পড়া, সংসার, বাচচা-কাচচা এসব নিয়ে এত ব্যস্ত থাকতাম যে তার কথার কেন পাত্তাই দেই নি।

     তিন চার দিন আগে তসলিমা নাসরিনের কলকাতা থেকে প্রকাশিত `নির্বাচিত কলাম’ বইটি পড়লাম। অনেক দিন থেকেই আমার বড় ইচছা ছিল তাঁর বই পড়ার। খন্ড খন্ড পড়া হলেও কিন্তু বই পড়ার সময় ও সুযোগ এর আগে আর হয়ে উঠেনি। বইটা পড়া অবধি মনে হচেছ আমি কিছু একটা লিখবো, সেটা আমার বিবেকের তাড়না মাত্র। আমি নিজে একদম আনাড়ি, ঐ বললাম না, আঁকিবুকি করেছি মাত্র, -কিন্তু বই লেখার এমন দুঃসাহস আমার এর আগে আর কস্মিনকালেও ঘটেনি। মনে পড়ছে ইংরেজীতে একটি কথা আছে `Every event must have a cause” অর্থাৎ প্রত্যেক জিনিসেরই একটা কার্যকারণ আছে। তাই আমার এই দুর্ঘটনা অনেকটা ঐ গ্রন্থ পাঠের সুবাদেই।

     আমি একজন মেয়ে-মানুষ, নাসরিনের ভাষায় যাকে নিয়ে রয়েছে এক বিরাট প্রশ্নবোধক চিহ্ন?

     তসলিমার ভাষাতে “তবে কি এই-ই সত্য যে নারীর না মরে মুক্তি নেই?” আমি নারী হিসাবে নিজেকে এত হেয় মনে করিনা, কারণ  আমি মনে করি আমি সৃষ্টি জগতের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি, আশরাফুল মখলুকাত। পুরুষ শাসিত সমাজের সর্বক্ষেত্রেই বাড়াবাড়ি, উশৃংখলতা, পক্ষপাতিত্ব, একদর্শীতা কম বেশী অবশ্যই রয়েছে। তাই বলে বিংশ শতাব্দীর এই ঝলমলে নিয়ন আলোর ঝলকানীর মাঝে নারীর মরে মুক্তি পাওয়ার কোন অবকাশ আমি দেখি না।

      বইটা পড়তে যেয়ে তার ভালমন্দ দুটো দিকই আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। শিশুকাল থেকে আজ অবধি সমাজের নানান ত্রূটি-বিচ্যুতি, বৈষম্য লেখিকার মন ও মগজে অনুরণন তুলেছে এবং এসব দ্বন্ধকে ঘিরেই তার অন্তরে এক ধরণের বিদ্রোহী মনোভাবের প্রকাশ ঘটেছে, অনেক ক্ষেত্রে তা প্রশংসার  দাবীদার। লেখিকার ‘নির্বাচিত কলামের’ শুরুতেই পাই, বারো তেরো বছরের একটি ছেলে জলন্ত সিগারেট লেখিকার হাতে চেপে ধরে, যখন তার বয়স আঠারো-উনিশ। ‘মেয়েরা গাছে উঠলে গাছ মরে যায়’ মা এর এই সতর্কবাণীর কারণে লেখিকা তার দুরন্ত কৈশোরে ফলবতী বৃক্ষে চড়তে বাধাগ্রস্থ হয়েছেন। হাজার বছরের স্তুপীকৃত কুসংস্কার, অশিক্ষা এসব ধর্মশিক্ষা নয়। ধর্ম মানুষের জন্য এসেছে, মানুষ ধর্মের জন্য আসেনি। এখানে মানুষই প্রধান, ধর্ম তার নিয়ন্ত্রক যন্ত্র মাত্র।

মেয়েরা গাছে উঠলে গাছ মরে যায়।

খালি কলস দেখা অমঙ্গলের লক্ষণ।

শনি মঙ্গলবারে যাত্রা নাস্তি।

পেঁচা ডাকলে বিপদের আশংকা।

চিরুণী পড়লে কুটুম্ব আসে।

     আমি খুব বেশী আর কুসংস্কারের উদ্ধৃতি টানতে পারছি না, কারণ আমি নিজে খুবই মুক্ত পরিবেশে মানুষ হয়েছি যেখানে কোন অজ্ঞানতা, কোন কুসংস্কার কখনোই শিকড় বিস্তার করতে পারেনি। আমার বাবা-মা দুজনাই ছিলেন ইসলামী চিন্তাধারার ধারক ও বাহক। তাই একদিকে মায়ের নির্দেশনা অন্যদিকে বাবার সুচিন্তিত কুসংস্কারমুক্ত মন সবসময় আমাকে যোগ্য দিকনির্দেশনা দিতে সাহায্য করতো, আর তাই আমি শিশুকাল থেকেই সমাজের এই কালো চ্যাপ্টারের মোকাবেলা করে আসছিলাম যুক্তি ও বিজ্ঞান দিয়ে। আমার এক খালাতো বোন অন্তঃসত্ত্বা, একদিন তার বাড়ী বেড়াতে গেলাম; বয়সে সে আমার সামান্য ছোট ছিল। যাক, আমাকে দেখে সে প্রায় কাঁদো কাঁদো হয়ে তার জন্য দোয়া চাইতে খুব করে অনুরোধ করলো।

ঘটনাটা ঘটেছে এই যে, সে হাতে মেহেদী পরেছে আর তার দুই তিন মাস পরই তার বাচচা হবে, তা দেখে পাশের বাসার খালাম্মা তাকে খুব ধমকে দিয়েছেন যে, কেনো সে বাপের বাড়ী বেড়াতে গিয়ে মেহদী পরে এসেছে। তিনি রায় দিয়েছেন যে তার পেটের সন্তান তার এই হাতের মতই চিত্রা হরিণের রূপ নিয়ে জন্মাবে। এই ভয়ে তার এই কান্না। আমি যতদূর পারি স্বান্তনা দিলাম এবং মহিলার যুক্তির অসারতা বুঝাতে চেষ্টা করলাম।

     পরবর্তীতে আমার তিনবার সিজারিয়ান অপারেশন হয়েছে এবং এই তিনবারই আমি দু’হাতে মেহেদী রাঙ্গিয়ে অপারেশন থিয়েটারে গিয়েছি। আমার ডাক্তাররা আমাকে নিয়ে হাসিঠাট্টাও কম করেননি যে আমাদের পেসেন্ট খুবই রসিক। এত বিপদের দিনেও তার রসের কমতি নেই। আর আমার এ খালাতো বোনের সুন্দর ফুটফুটে মেয়ে শাহজালাল ইউনিভার্সিটিতে এবার ইকোনোমিক্স-এ অনার্স পড়ছে। সে চিত্রা হরিণ মোটেও হয় নি। আর আমার দু’ছেলের একজন ডাক্তারী পড়ছেন আর আরেকজন এবার এস, এস, সি পরীক্ষা দিচেছন। আর সর্বশেষের অপারেশনের সন্তান ঢাকা মেডিকেলের গাইনীর ডাঃ কোহিনূরের আন্ডারে ডাক্তারদের অবহেলার কারণে মারা যায় আমার পেটে থাকা অবস্থায়। আমি সব সময় ডাক্তারকে বলছিলাম আমার অপারেশন করে নিতে কারণ আমার আগের দু’টোই সিজারিয়ান অপারেশন, কিন্তু আমার সব কিছু ভালো বলে ডাক্তারেরা গা করলেন না। পরে রাগের মাথায় তাঁদেরে খুনী বলেও গালি দিয়েছি। ডাঃ এজাজ বলে এক ভদ্রলোক ছিলেন আমার গালাগাল শুনেও আমায় স্বান্তনা দিয়েছেন। ডাঃ কোহিনূরকে আমি কড়া কথা বলবো ঠিক করেছিলাম কিন্তু পারিনি শেষ পর্যন্ত যখন শুনলাম তিনি নিঃসন্তান।

     “ইন্নাল্লাহা মা’আস্ সা’বিরিন।“

      ধৈর্য্যধারীর সাথে আল্লাহ আছেন। তাই ধৈর্য্য ধারণই আমার জন্য উত্তম ঠিক করলাম। ঘটনাটিতে আমার বাবাও ক্ষেপে গিয়েছিলেন কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমরা ধৈর্য্য ধারণ করেছি। কিন্তু আমার ছেলের মৃত্যুর জন্য দায়ী ছিল ডাক্তারের গাফিলতি, আমার হাতের মেহেদী কক্ষনো নয়। আর ছেলে মানে একদম পুতুলের মত হয়েছিল, শুনেছি সবার কাছে, আমাকে দেখতে দেয়া হয় নি।

      ইসলাম এমন এক আলো যেখানে বিজ্ঞানের সাথে তার কোন দ্বন্ধ নেই। বিজ্ঞান মানেই বিশেষ জ্ঞান। আর ইসলাম জ্ঞানের উৎকৃষ্ঠ ভান্ডার। বিজ্ঞান ও ইসলাম ভাইবোনের মত, এ দুই ভান্ডারের কর্তৃত্ব তো একজনের হাতেই।

      আমারই এক প্রতিবেশিনী মিসেস বিশ্বাস সতেরো-আঠারো বছরের সংসার জীবন ঘাটলেও স্বামী আজ অবধি তার মুখপানে ভালো করে তাকায়নি। আর ঘরের ছেলে ঘরেও উঠে নি। উড়নচন্ডির মত সে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদের জুটিতে কোনদিনও ভাবের আদান-প্রদান হয় নি। কিন্তু শাস্ত্রের অগ্নি সাক্ষী করে ওদের বিয়ে হয়েছে। মহিলার বাবা গতায়ু আর বিয়ের সাক্ষী অগ্নি, সুতরাং এ বিয়ের নাকি আর কোন পরিণতি নেই, কোন সমাধান নেই। যার কারণে বিচ্ছেদ অসম্ভব। আমি আক্ষেপ করে দিদিকে বলেছিলাম, “দিদি! কি আফসোস, যার জন্য সারা জীবন সিঁথিতে সিঁদুর এঁকে থাকলেন, থাকবেন, থাকছেন- সে একটি বারের জন্যও আপনার মুখপানে ফিরে তাকালো না।” উত্তরে দিদি বলেছিলেন, `এ ধর্মে আচার আছে ভাই, বিচার নেই।’ কথাটা আজো আমি ভুলতে পারি নি।

      ধর্মের দেয়া মেকি শিকলে মিঃ বিশ্বাস নিজের বিয়ে নিয়ে বড়ই বিপাকে আছেন। মিঃ বিশ্বাস বলেছিলেন, `হিন্দু ধর্ম একখানি স্রোতহীন ধর্ম। এ ধর্মে কোন গতিশীলতা নেই। এ ধর্মে মুক্তির রাস্তা নেই।’ সারা জীবন স্বামী-স্ত্রী হিসাবে নাম সই করে যেতে হবে যদিও কাজে কর্মে কোনই সম্পর্ক নেই দু’জনাতে। সমাজের এমনি সব আচার-অনাচার কুসংস্কারের বিরূদ্ধেই চ্যালেঞ্জ স্বরূপ এসেছিলেন একখানি অস্ত্র নিয়ে সেই মহামানব, শুধু মুসলমানের নবী হয়ে নয়, বিশ্ব মানবের অবতাররূপে, মুক্তিদাতারূপে। তিনিই বিশ্বনবী হযরত মোহাম্মদ মোস্তফা(সঃ)। এ ব্যপারে কুরআন কি বলে দেখুন।

      “আমি তো তোমাকে সমগ্র মানব জাতির প্রতি সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করেছি কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না” (সুরা সাবা: ২৮ আয়াত)।

      হিন্দু ধর্মে শুদ্রদেরে ধর্মগ্রন্থ পাঠের অধিকার দেয়া হয় না। এটা নাকি ব্রাক্ষ্মণের একার সম্পত্তি। আসলে হিন্দু, বৌদ্ধ, খৃষ্টান, মুসলমান, জৈন পারসিক বলে কোন কথা নয়, সবই এক স্রষ্টার সৃষ্টি। সকল মিথ্যার অবসান ঘটিয়ে সত্যের বিজয় কেতন উড়াবার মিছিলে সবাই এক হোন। সত্যের পতাকাতলে সবাই সমবেত হোন। দলিত মথিত করে ফেলুন সমস্ত অন্যায়ের পাপাচারের বেড়াজাল। শুধুমাত্র টিকে থাকুক নির্জলা সত্যটুকু।

     আজও আমাদের সমাজে, পরিবারে সর্বত্র আমাদের পূর্ব পুরুষদের নানান কুসংস্কার, নানান অনাচার আমাদের রক্তের সাথে মিশে আছে। বিচিত্র কি, আমারই পূর্ব পুরুষ হয়তো বা মঙ্গলঘন্টা বাজিয়ে স্থানে স্থানে শক্তির পূজা করেছিলেন – কখনো সূর্যকে, কখনো চন্দ্রকে, কখনো গরু, সাপ, গাছ, পাহাড়কে। সে হিসাবে আজকের শক্তিপূজকদের উচিত ফ্রিজ, টেলিভিশন, এয়ার কন্ডিশনার, কম্পিউটার, রোবটকে পূজা দেয়ার। কারণ এসবের শক্তির কাছে সাধারণ মানুষের বিদ্যাবুদ্ধি হার মানে। আর এই সব শক্তি পূজকদের ব্যাপারে আল্লাহ কি বলেন, দেখুন –

     “যারা তাদের প্রতিপালককে অস্বীকার করে তাদের উপমা তাদের কর্মসমূহ ভষ্মসদৃশ যা ঝড়ের দিনে বাতাস প্রচন্ড বেগে উড়িয়ে নিয়ে যায়। যা তারা উপার্জন করে তার কিছুই তারা কাজে লাগাতে পারে না। এটাতো ঘোর বিভ্রান্তি” (সুরা ইব্রাহিম: ১৮আয়াত)।

     “যারা কুফরি করে তাদের কর্ম মরুভূমির মরীচিকাসদৃশ, পিপাসার্ত যাকে পানি মনে করে থাকে, কিন্তু সে তার নিকট উপস্থিত হলে দেখবে তা কিছুই নয়” (সুরা নূর: ৩৯আয়াত)।

     প্রত্যেক জিনিসই তার মূল্যবোধের মাধ্যমে ভালমন্দরূপে গ্রহনীয় হওয়া উচিত। ইসলামে কোন কালেই ধর্মে জোর জবরদস্তী স্বীকৃত নয়। যারা ইসলামকে বুঝতে চেষ্টা করে না বা বুঝতে চায় না তাদেরকে আল-কুরআনে কাফেরুন বলা হয়েছে। কাফেরুন অর্থ সেই সব লোক যারা নিজেদেরকে আড়াল করে রাখে অর্থাৎ ইসলামের পরিভাষায় যারা ইসলামের কাছ থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখে বা নিজেদেরকে লুকিয়ে রাখে।

     পড়ার উপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন নাসরিনের বাবা, কিন্তু আফসোস নাসরিনের জন্য! শত ফুল থেকে মধু আহরণ করে মৌমাছি অবশেষে মৌচাক গড়ে তোলে। সব ধর্মের নির্যাস ঘেটে যদি সামান্যতম মধু মতাদর্শ বা দিক নির্দেশনা তিনি সমাজকে দিতে পারতেন বা নিজেও গ্রহণ করতে পারতেন তবে তার সাহিত্যিক জীবন ও মানব জীবন ধন্য হত। একটা আগাগোড়া জগাখিচুড়ী চিন্তাধারার ধারক তিনি, না ঘরকা, না ঘাটকা।

     মানুষের জীবন শৈশব, কৈশোর, যৌবন, বার্ধ্যক্য এই চারটি ধাপের সম্মিলিত সোপান। তিনি শুধু তৃতীয় ধাপটিকে লাভে-লোকসানে উসুল করার তাগাদায় ব্যস্ত থেকেছেন। আর জীবনের বাকী ধাপগুলোকে বিড়ম্বনার মাঝে ফেলে দিয়েছেন। তার উদ্দাম স্বাধীনতার ফসল হবে অজস্র জারজ সন্তান, উশৃংখল কৈশোর, মদোন্মত্ত যৌবনদীপ্ত স্বাধীনতা আর মৃত্যুর বিভীষিকার মাঝে পড়ে থাকা হতাশার বার্ধ্যক্য। এই হলো তার আদর্শের পরিণতি।

    “যে দেশের অধিকাংশ নারীই বস্ত্রহীনতায় ভোগে, সে দেশে কাপড়ের উপর কাপড় পরিধান দৃষ্টিকটু তো ঠেকেই, বৈষম্যের ব্যবস্থাগুলোও আরো বেশী প্রকট হয়।’

     নাসরিনের উপরোক্ত বক্তব্যটা আসলেই কি সঠিক? অর্থনৈতিক পুষ্টিতে ভরপুর পাশ্চাত্যের অফুরন্ত প্রচুর্যের ভেতরে নারীদেহের কাপড়ের স্বল্পতা কি এটাই প্রমাণ করেনা যে, প্রাচুর্যে ভরা সভ্যতাতেও কাপড়ের ক্রাইসিস অত্যন্ত প্রকট? পাশ্চাত্যের মহিলারা শরীরের উপর নীচের প্রায় উদোম রেখে মাঝখানে একটা কিছু পরে সভ্যতার চিহ্ন বহন করে বেড়ান। আর হতদরিদ্র দেশে আমাদের কাপড়ের এমনই স্বল্পতা দেখা দেয়নি যে, স্রষ্টার নির্দেশ পালন করার জন্য একখানি স্কার্ফ, ওড়না বা চাদরের বাজেট আমরা যোগান দিতে পারবো না। পাশ্চাত্য সভ্যতার দেশে দেখা যায় কাপড় না পরা বা প্রায় উলঙ্গ থাকাটাও এক ধরণের গ্ল্যামার বলেও দিব্যি চালানো যায়। আমাদের তসলিমা এসবের হাতছানিতে এই মেকী গ্ল্যামারের গ্লানিতে তার উৎকৃষ্ট সংস্কৃতিকে অবজ্ঞা করে মেকি জিনিসটাকে বড় করে দেখেছেন বলেই তার মাঝে এই ব্যাল্যান্সএর ব্যাপারটা সঠিক দিকদর্শন পায়নি। চিরটা কাল তিনি ভেবে আসছেন যে তিনি প্রচন্ড নির্যাতিতা। আসলে উন্নত অনুন্নত উভয় সমাজেই ভিন্ন আকারে নারীরা পন্য আকারে ব্যবহৃত হচ্ছে। কারোর কপড়ের সল্পতা কারো মনের দৈন্যতায় উভয়েই আক্রান্ত উন্নত মন মানসিকতার অভাবে। 

বিশেষ দ্রষ্টব্য: ‘তসলিমার কলামের জবাব’ গ্রন্থটি এখানে অধ্যায় হিসাবে ধাপে ধাপে দিব। দুই যুগ আগে ছাপা হওয়া বইটির ভূমিকা, সূচি ও প্রথম অধ্যায়সহ আনুসাঙ্গিক শুরুর সবটাই দিলাম। সূচিরও আগে শুরুতে আমার দেশের অনেক দাগ লেগে আছে, তাই দিলাম।। বইএর বাকীটাও ধাপে ধাপে আসবে।

চ্যাপ্টার দুই:

কুসংস্কারের জঞ্জালে জ্বলছি মোরা (খ)

আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলীয় নেত্রী মাথায় কাপড় দেয়াতে নাসরিনের বেজায় আপত্তি। আজীবন আপনার মা-চাচী সবাই মাথায় কাপড় দিলেন আর আজকের আধুনিকা নাসরিন নিজের মাথাকে উলঙ্গ রেখে পুরুষের সাথে সমতা আনার চেষ্টা করছেন। রাজনীতির কারণে যদি নেত্রীরা মাথার কাপড় দেন, তবে মুসলিম হিসাবে আমিও খুশী হবোনা। তবে আমার বিশ্বাস প্রতিটি মুসলিম নারীরই স্রষ্টার নির্দেশ পালন করার নিমিত্তে মাথায় কাপড় তোলা উচিত।

এই তো কিছুদিন আগে মনে পড়ে এক বিয়ের জলসা থেকে ফিরছিলাম আমরা ছ’জন মহিলা। পাঁচ জনার মাথাই খোলা ছিল, ব্যতিক্রম ছিলাম আমি। হঠাৎ করে এর মধ্যে এক মহিলা বলে উঠলেন, “ভাবী আপনার এমন সুন্দর মুখখানা ঢেকে রেখেছেন কেন?” বস্তুতঃ আমি বাইরে সব সময়ই মাথায় স্কার্ফ বা একটা হেড কাভারিং ব্যবহার করে থাকি। আরো অনেক কথার মাঝে মহিলার কথাও হারিয়ে যায়। বিয়ের আনন্দ জলসা থেকে ফেরার পথে আমি উপস্থিত সবার মাথা খোলা দেখে মহিলার প্রশ্নের কোন প্রত্যুত্তর করিনি। তবে একান্তে ঐ মহিলাকে আমার কিছু স্পষ্ট কথা বলার প্রয়োজন ছিল। কারণ জীবনের একটি চরম সত্য কথা হয়তো তিনি জানেন না বলেই এসব ব্যাপারে রসিকতা করতে পেরেছেন। মেয়েদের হেড কাভারিং বা মাথা ঢাকা আল্লাহর দেয়া স্পষ্ট নির্দেশ। যদি কেউ এটা অমান্য করে তবে সে স্রষ্টাকেই অমান্য করলো।

পুরুষ শাসিত সমাজের কারো রক্তচক্ষুর ভয়ে আমি আমার আঁচল মাথায় চড়াই নি। এ আমার দাসীর চিহ্ন নয়। আমি মানুষ, স্রষ্টার শ্রেষ্ঠ জীব আমি। স্রষ্টার প্রতিনিধিত্ব করাই আমার কাজ। আর আমার মাথার আঁচল আমার পরিচয় বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দিচ্ছে যে আমি আল্লাহ ছাড়া কাউকে পরোয়া করি না। শুধু মাত্র আল্লাহকে পরোয়া করি বলেই মাথায় আমার বিজয়ের চিহ্ন। পৃথিবীর যে কোন জনপদে যে কোন প্রত্যন্ত অঞ্চলে আমাকে দেখলে যে কেউ বুঝতে পারবে আমি প্রতিনিধিত্ব করছি এক জনেরই, সে আর কেউ নয়, আল্লাহ।

কিন্তু আফসোস! নাসরিন আপনার কোন চিহ্ন নেই। আপনাকে দেখে বুঝার উপায় নেই যে আপনার পরিচয় কি? শত মুখে বলছেন এ দেশে আপনার যোগ্য একটা পুরুষও জন্মায় নি। তাও আবার এরি মধ্যে তিন তিন জন পুরুষকে মাড়িয়ে এসেছেন; একজন তো ইহধাম ছেড়ে চলেও গিয়েছেন। যাক এ ব্যাপারে আপনার কথায় ও কাজে যথেষ্ট মিল অমিল দুই-ই আছে।

আপনার বাবা-মায়ের লড়াইয়েও আপনার বাবাই সম্ভবতঃ পুরুষ মানুষ তো তাই জিতেছেন। আপনার মা রান্না শেখাতে তাগাদা দিতেন আর আপনার বাবা পড়ার তাগাদা দিতেন। বুঝা যায় আপনি রান্না শেখেননি, শুধু পড়তে শিখেছেন। তবে আপনার বাবা আপনার পড়ার ব্যাপারে তৃপ্ত হতে পেরেছেন এমন কথা আমি পাইনি এ পর্যন্ত। আপনার বাবা-মা সম্ভবত দু’জন দুমেরুর মানুষ। তাই দুজনেই সংসার করলেও দুজনাই একা।

আপনার বিতর্কিত কিছু কলামের উপর আমি আপনাকে তথ্যগত ধারণা দেয়ারই চেষ্টা করবো। অনেক জায়গায় আপনি নামাজ নিয়ে খেলো কথাবার্তা বলতে পেরেছেন কারণ নামাজের মর্ম আপনি অন্তর থেকে উপলব্ধি করতে পারেননি। ইসলামে আসলে কোন ধরণের পূজাই স্বীকৃত নয়, তা পীর পূজাই হোক, আর মূর্তি পূজাই হোক, কবর পূজাই হোক আর মাজার পূজাই হোক। মৌল ইসলামে একমাত্র আল্লাহর একত্বই স্বীকৃত। এখানে আর কোন ইলাহ নেই। পীর, পুরোহিত, তাবিজ, কবজ যে সবের উপর আপনি ধিক্কার দিয়েছেন, ওগুলো ইসলামের জিনিস নয়।

আর নামাজ মুসলমানের এমন একটা ধর্মানুষ্ঠান যেখানে আমার আর আমার স্রষ্টার মধ্যে কোন প্রতিবন্ধকতা নেই। আমার স্রষ্টাকে ধরতে হলে মন্ত্রী মিনিস্টারের দরবারে দৌড়াতে হয়না, পীর পুরোহিতের বাড়ী লাইন দিতে হয়
না। আমার পর্ণ কুটিরে বসেই আমি তাঁর সথে যোগাযোগ করতে পারি, এটাই আমার উত্তম মাধ্যম। তাছাড়াও দাঁড়িয়ে, শুয়ে, বসে সর্বাবস্থায় আমি স্রষ্টার সাহায্য চাইতে পারি। আমি মেয়ে হয়েও পারি, এর জন্য কোন পুরুষকেও আমার ধরতে হয় না, আমি একাই একশ।

হাবিবুল্লাহ নামক ছেলের সাথে আপনি বন্ধুত্ব করতে চেয়েছেন আজীবন, কিন্তু হাবিবুল্লাহর প্রেমের ডাকে আপনি মর্মাহত হয়েছেন। ঘৃণায় তাকে ফিরিয়ে দিয়েছেন। তবে আপনি স্বীকার করেছেন যে ছেলে মেয়েতে আসলে বন্ধুত্ব হয় না। আপনারা পাঁচ বছর এক সঙ্গে পড়েছেন, চলেছেন। হাবিবুল্লাহ কখনো আপনার আঙ্গুল স্পর্শ করার লোভ করেনি। হাবিবুল্লাহ ফেরেশতা ছিলেন কি না জানি না। তবে আজকাল আর হাবিবুল্লাহদের মত এরকম ফেরেশতা খুব একটা দেখা যায় না।

আজকাল আপনাদের নব্য কালচারের জোয়ারে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে যে জোড়ায় জোড়ায় ঢলাঢলি করে চলে বেড়ান, তা রাস্তাঘাটে লজ্জা শরমের মাথা খেয়ে পাশ্চাত্যের বাতাস লাগানো বুঝি? নব্য শহুরে কালচারের মাঝে নিজেকে বিকিয়ে দেয়ার মানেই কি আধুনিকতা? উশৃংখলতার মাঝেই কি জীবনের সার্থকতা? লাগামহীন উচছলতাই কি স্বাধীনতা? সোহরাওয়ার্দির চত্বরে হাঁটতে যান, রমনা পার্কে ধানমন্ডি লেকের ধারে দেখে আসুন আগত প্রজন্ম কেমন নেশাখোর হয়ে পড়ে আছে প্রেমের মদিরতায়; নিজের বয়সের কাছে তারা পিছলে পড়ছে। অনাগত সুন্দর ভবিষ্যৎটাকে প্রেম প্রেম খেলা খেলে জীবনকে বিষিয়ে তুলছে। সামনে তার অফুরন্ত জীবন ভান্ডার উন্মুক্ত।

আপনারা সতীদাহ প্রথা, বাল্য বিবাহের কথা বলছেন, খুব সুখের কথা, এসব প্রথা সমাজকে পঙ্গু করে রাখে, কোমর সোজা করে দাঁড়াতে দেয়নি ঠিকই। কিন্তু পাশাপাশি সমাজে নারীপুরুষের সমতার নামে বেহায়াপনার যে ডাক দিয়ে যাচ্ছেন তাতে উঠতি কৈশোর, যৌবন বিপন্ন অবস্থার সম্মুখিন হচ্ছে। নষ্ট কৈশোর, নষ্ট যৌবন দিয়ে একটা ছেলেমেয়ের জীবনকে হত্যা করার এমন কোন ষড়যন্ত্র কোন সাহিত্যিকের থাকা উচিত নয়। এ দেশের আলো বাতাসে আমরা লালিত। আমাদের ঋণ কখনো শোধ হবার নয়। আমাদের কর্ম দিয়েই আমাদের ঋণ শোধ করতে হবে।

আমার দু’খানা ছেলে মাত্র। জগত জোড়া লক্ষ লক্ষ ছেলে, কোটি কোটি মেয়ে লাঞ্ছনার হাত থেকে রক্ষা পাক, দিশেহারা জীবন-তরণীর উত্তাল উন্মত্ততার মাঝেও নিজের দিশা ঠিক করে নিতে ওরা সচেষ্ট হোক। ওরা সার্থক মানুষ হোক, ওরা সার্থক প্রেমিক হোক, ওরা আদর্শের ধারক হোক। আমার দেশের ছেলে-মেয়েরা যদি সঠিক আদর্শ চিহ্নিত করে নিজের ভালোমন্দ স্থির মস্তিষ্কে ঠিক করতে পারে তবে ইনশাআল্লাহ, এ গোটা বিশ্ব জয় করতে তাদের থোড়াই পরোয়া করতে হবে।

নাসরিনের কিছু কিছু ক্ষেত্রে যথেষ্ট যুক্তিবাদী কথাবার্তা আমার মত যুক্তিবাদী মানুষকে আকৃষ্ট করলেও অনেক ক্ষেত্রে আমার মনকে প্রতিবাদীও করে তুলেছে। বিভিন্ন ধর্মের অসারতার যে ছবি তিনি তুলে ধরেছেন তার ভূমিকা আমরাও ইতিহাস ঘাটলে পাই, সর্বোপরি শ্রেষ্ঠ ধর্ম ইসলাম সম্পর্কে কিছু বাড়াবাড়ি বা বুঝার কমতিই সম্ভবতঃ তাকে এমন ইসলাম বিদ্বেষী করে তুলেছে।

তাই আমি সব সময়ই চেষ্টা করবো তথ্য ভিত্তিক কিছুটা ধারণা দিতে। আমি তার ঘুম ভাঙ্গানোর চেষ্টা করবো আর আমার দেশের ভাইবোনদের, ছেলেমেয়েদের কাছে আমি যতটুকু বুঝেছি ততটুকু তুলে ধরার চেষ্টা করবো। তবে জেগে যদি কেউ ঘুমানোর ভান করে তবে তার ঘুম ভাঙ্গানো যায় না। যদি কেউ বুঝেও না বোঝার ভান করে তবে আমার বলার কিছুই থাকবে না। তবে আমার প্রয়াসটুকু রইলো মাত্র। জগতের, সমাজের, আমার দেশের, গোটা বিশ্বের ভালো আমি চাই। কারো ক্ষতি করা, কারো অমঙ্গল করা আমার ইচছা নয়। পুরুষ নারীতে কোন বৈষম্য স্রষ্টা সৃষ্টি করেনি, করেছে মানুষ। আর পুরুষ আমার সর্বনাশ করেছে বলে আমিও তার সর্বনাশ করবো এ বোধ আমার নেই। আমি উত্তম হতে চাই কারণ আমার পরিচয় ‘আশরাফুল মখলুকাত’। আমার পরিচয় পুরুষ নারীতে নয়। “তুমি অধম তাই বলিয়া আমি উত্তম হইবো না কেন?” এই নীতিতেই আমি বিশ্বাসী।

পীরতন্ত্র, কবরপূজা, মাজারপূজা সম্বন্ধে নানান কুসংস্কারের অনেক প্রশ্নের মুখোমুখি আপনি দাঁড়িয়ে। এসব কক্ষনো ইসলামে স্বীকৃত নয়। এ সম্বন্ধে বেশ কয়েকটি কুরআনের আয়াতের উদ্ধৃতি আমি নীচে দিচ্ছি। পীরতন্ত্র, শিরকী প্রথার বিরুদ্ধে কুরআন কি বলে দেখুন –

“নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমা করবেন না যে তাঁর সাথে কাউকে শরীক করবে (এই জন্য নয় যে তিনি দেবদেবীর প্রতি ঈর্ষাপরায়ন, বরং এর কারণ এই যে, এতে মানুষের মর্যাদা যার পর নাই ক্ষুন্ন হয়, কেন না আল্লাহ মানুষকে তার প্রতিনিধিরূপে দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন, ২:৩০ এবং সারা বিশ্ব জগতকে সৃষ্টি করেছেন মানুষেরই সেবার জন্য ১৪:৩৩, কাজেই মানুষ যদি মনিব হয়ে চাকরের কাছে জী হুজুর করে, সাহেব হয়ে গোলামকে কুর্নিশ করে, রাজা হয়ে প্রজার পায়ে মাথা ঠেকায় তবে এর চেয়ে লন্ডভন্ড কান্ড আর কি হতে পারে?), আর তাছাড়া আর সব (ভুলভ্রান্তি পাপাচার) তিনি ক্ষমা করেন যার জন্য (উপযুক্ত বিবেচনায়) তিনি ইচছা করেন। আর যে কেউ আল্লাহর সাথে শরিক করে সে তাহলে উদ্ভাবন করেছে বিরাট পাপ (তথাপি আল্লাহর সাথে পাল্লা দেবার পরেও তারা যদি অনুতাপ করে ও নিজেদের জীবনধারা সংশোধন করে নেয় তবে আল্লাহর করুণার দ্বার রয়েছে সদা উন্মুক্ত” (সুরা নিসার ৪৮, ১১৬ আয়াত)।

“(হে মুহাম্মদ!) তুমি কি তাদের (পীর ফকির ও সাধু সন্ন্যাসীদের) দিকে চেয়ে দেখোনি যারা (আর তাদের মুরিদ শিষ্য-সাগরেদদের থেকে তাবেদারী দাবী করে ২৯: ১২)? না, (আল্লাহকে তাদের ব্যবসার পণ্য করার জন্য ও লোককে ধাপ্পা দিয়ে ফুঁক ও থুক দেয়া পানি খাইয়ে এবং তাবিজ কবজ বিলিয়ে লোকঠকানো ধান্ধা ফাঁদার জন্য তারা পবিত্র তো নয়ই, বরং) আল্লাহ পবিত্র করেন (নির্ভেজালভাবে তাঁরই প্রতি অনুগত বান্দাদের) যাদের তিনি পছন্দ করেন (অতএব বিশুদ্ধ জল পেতে চাইলে নোংরা খাল-বিল-ডোবা প্রভৃতির ন্যায় ধাপ্পাবাজদের খপ্পরে না পড়ে, ৩৯:৩, বরং সোজা ঝরনার উৎস স্থলে চলে যাওয়াই শ্রেয় ২৯:৬৯)। আর (যারা এই সব দালাল তূল্য লোকদের খপ্পর এড়িয়ে সোজা আল্লাহর শরণাপন্ন হয়) তাদের প্রতি অন্যায় করা হবে না খেজুর বিচির পাতলা আবরণ পরিমাণেও” (সুরা নিসার ৪৯আয়াত)।

“আর যারা অবিশ্বাস করে (এবং পীর ফকির ও সাধু সন্নাসী সেজে বেহেশত দুযখের কন্ট্রাকটরি করে) তারা যারা (আল্লাহ ও রসুলের প্রতি) বিশ্বাস করেছে তাদের বলে: (আমাদের মুরিদ শিষ্য হয়ে) আমাদের পথ অনুসরণ কর, তাহলে আমরা (পরকালে) তোমাদের পাপ বহন করবো (এবং বেহেশতে সিট রিজার্ভ করে ঢুকিয়ে দেব)।” বস্তুতঃ তারা তো ওদের পাপের থেকে কিছুরই ভারবাহক হবে না (কেন না তাদের নিজেদের পাপের বোঝায় তাদের ঘাড় ভেঙ্গে যাচেছ, আর কারোর ঘাড়েই তো দুটো মাথা থাকে না, তাই প্রত্যেককেই নিজ নিজ বোঝা নিজের মাথায় বইতে হবে, ৬:১৬৫) নিঃসন্দেহ (যারা অন্যের পাপের ঝুড়ি বওয়ার ঝুট ওয়াদা করে কুলি মজুরের ন্যায় পয়সা কামাতে দ্বিধা করে না) তারাই মিথ্যাবাদী” (সুরা আনকাবুত ১২ আয়াত)।

“আর তারা তাদের (পাপের) বোঝা অবশ্যই বইতে, আর তাদের (আপন) বোঝার সঙ্গে (তাদের চেলাদের) অন্য বোঝাও (তাদের বইতে হবে, কেননা তারাই তো শিষ্যদের আল্লাহর বন্দেগীর নামে তাদের তাবেদারীতে নিয়োগ করে ওদের পাপের ঝুড়ি ভারী করে দিয়েছিল, ১৬:২৫) আর কিয়ামতের (শেষ বিচারের) দিনে তাদের অবশ্যই প্রশ্ন করা হবে যে (মিথ্যা পীর মুরশিদি ও সন্নাসগিরি) তারা উদ্ভাবন করেছিল সে সম্বন্ধে” (সুরা আনকাবুত এর ১৩ আয়াত)।

“যারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে (মিথ্যা দেবদেবী, ভন্ড পীর ফকির ও সাধু সন্নাসী, অন্ধ বিশ্বাস থেকে উদ্ভুত উদ্ভট আচার অনুষ্ঠানে, ঝাড় ফুঁক তথা তাবিজ কবচ ও গ্রহরত্নের উপর ভরসা ও আস্থা স্থাপনের দ্বারা ঐসব নিরর্থক বিষয়বস্তুর ন্যায়) অন্য অভিভাবক গ্রহণ করে (২৫:৪৩) তাদের উপমা হচেছ মাকড়সার দৃষ্টান্তের ন্যায়, সে নিজের জন্য (নানান ধরণের পরিকল্পনা করে ও নকশা কেটে) ঘর বানায়, অথচ নিঃসন্দেহ সবচেয়ে ঠুনকো বাসা হচেছ মাকড়সারই বাসা, যদি তারা জানতো (যে বুদ্ধি বিবেচনাহীন লোকের অন্ধ বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে যারা কুসংস্কারের মায়াজাল বোনে নির্বোধ লোকদের তাতে জড়াতে চায় তাদের ক্রিয়াকলাপ ইসলামের দুর্বার অগ্রগতির প্রথম আঘাতেই মাকড়সার জালের ন্যায় ছিঁড়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে)” (সুরা আনকাবুত এর ৪১আয়াত)।


তৃতীয় চ্যাপ্টার:

‘নির্বাচিত কলামের’ নির্যাতিত নারী

 

নাসরিনের নির্বাচিত কলামের সবচেয়ে আলোচিত পয়েন্ট এই নির্যাতিত নারী। শুরুতে জলন্ত সিগারেটের আঘাতে পোড় খাওয়া দেহের বেদনার ক্ষোভ দিয়েই লেখিকা নিরীহ নারীদের নির্যাতনের ইতিহাস থরে বিথরে বলে গেছেন। নাসরিনের মত নাজমাও তো নারী, তাই স্বভাবতই স্বজাতির বেদনায় আমি অবশ্যই মর্মাহত।

আলো আর অন্ধকার, শিক্ষা-অশিক্ষা, কুশিক্ষা-সুশিক্ষা সবই দিন রাতের মত একে অন্যের প্রতিপক্ষ হয়ে আছে। তবে নারী নির্যাতনের জন্য নাসরিন শুধুমাত্র দায়ী করেছেন পুরুষ শাসিত সমাজের সমাজপতিদের, পুরুষদের। আমাদের সমাজের বঞ্চনার জন্য শাসিতের একনায়কত্ব অনেকাংশে দায়ী বটে, তবে এটিই একমাত্র কারণ বলে আমি মনে করি না। অশিক্ষা, কুশিক্ষা আর অন্ধকারের সাথে যাদের বসবাস তারা তো বারে বারে হোঁচট খাবেই।

শিক্ষার আলোই নারীকে মুক্তি দেবার একমাত্র বাহন। এটাই আমার বিশ্বাস। বৈদিক যুগ,শতপথ ব্রাক্ষ্মণ, তৈত্তিরীয় সংহিতা, ঐতরেয় ব্রাক্ষ্মণ, বশিষ্ট ধর্মসূত্র, আপাস্তম্ভ ধর্মসূত্র, বৃহদারণ্যক উপনিষদ, মৈত্রায়নী, সংহিতা ইত্যাদি থেকে নানান উদ্ধৃতি দিয়ে লেখিকা নারী জনমের অসারতা তুলে ধরেছেন গ্রন্থটির ছত্রে ছত্রে।

লেখিকার ভাষায় শকুনি, নেউল, ছুঁচো, কুকুর, শুদ্র ও নারীর মধ্যে শাস্ত্র কোনো পার্থক্য করে নি। শাস্ত্র করে নি বলে সমাজও করে নি। বৈদিক ভারতবর্ষ নারীকে মানুষ বলে স্বীকৃতি দেয় নি। খৃষ্টপূর্ব দ্বাদশ শতকের সমাজ নারীকে যতটুকু অসম্মান করেছে, তিন হাজার বছরও বর্তমান খৃষ্টাব্দের সমাজ ভিন্ন কৌশলে ভিন্ন ব্যবস্থায় নারীকে একই রকম অসম্মান করে যাচ্ছে।

লেখিকা তার নির্বাচিত কলামের পনেরো পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেন, “মেয়েদের কোরান শিক্ষা দেওয়া হতো স্বামীর মঙ্গলের জন্য যেন সে দোওয়া দুরুদ পড়তে পারে।”

সাহিত্য সৃষ্টি করার নামে মিথ্যার বেসাতি করা তো কোন সাহিত্যিকের কাজ নয়। কোন ব্যাপার সম্বন্ধে সঠিক ধারণা না নিয়ে কোন কথা বললে উপস্থিত চমক আনা যায় হয়তো বা, কিন্তু তা কোন আদর্শ স্থাপন করতে পারে না। আপনার এই ঠুনকো কথাটা কেমন করে কুরআন উড়িয়ে দিচেছ দেখুন –

“আর যে কেউ কোনো ত্রুটি বা পাপ অর্জন করে, তারপর (উদর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপিয়ে) এর দ্বারা দোষারূপ করে নির্দোষকে (১২:৭০), সে তাহলে নিশ্চয়ই বহন করেছে কলঙ্কারোপের ও স্পষ্ট পাপের বোঝা” (সুরা নিসার ১১২ আয়াত)।

এখানে পুরুষ নারী বলে কোন কথা নেই। প্রত্যেককে প্রত্যেকেরই বোঝা বহন করতে হবে। একের পাপ অন্যে খন্ডানোর কোন জালিয়াতি সিস্টেম কুরআনে নেই। সব সময় কুরআনের সত্যতাকে প্রকাশ করার স্পষ্ট নির্দেশ কুরআনে আছে। ধর্মকে নিয়ে ব্যবসা না করতেও কুরআনই হুশিয়ারি উচচারণ করেছে। ‘স্বামীর পায়ের নীচে স্ত্রীর বেহেশত’ বলে কোন প্রমাণ কুরআন হাদিসে নেই। বরং নারীর সম্মানার্থে হাদিসের উদ্ধৃতি আছে “মায়ের পায়ের তলায় সন্তানের বেহেশত।” আপনারা শোনা কথাকে, পৌরানিক গালগল্পকে ব্যবসায়িক কথাকে ইসলামের অঙ্গীভূত করবেন না। ইসলাম অর্থ শান্তি, নির্জলা সত্যের মাঝেই তার প্রকাশ। নানী দাদীদের উপকথা অন্য ধর্মের কথা হতে পারে, ইসলামের নয়।

“অশিক্ষিত মানুষ ভাল মন্দ শিক্ষা নেয় ধর্ম থেকে।” নাসরিনের ৬৯ পৃষ্ঠায় নির্বাচিত কলামের উপরোক্ত কথাটি অবশ্যই আনন্দেরই কথা। ইসলাম এমনই একটা ধর্ম যেখানে শিক্ষিত, অশিক্ষিত সকল মুসলমানই ইসলাম জানে এবং মানে। জ্ঞানের স্বল্পতার কারণে হলেও তারা ধর্মকে জানার প্রয়াস চালায় যেটা আর কোন ধর্মে দেখা যায় না। এরা যদি সুশিক্ষিত হতো, শিক্ষার আলো পেতো তবে অন্তত: নিশ্চয়ই আপনাদের মত মন মানসিকতার লোক ইসলামের বারোটা বাজানোর জন্য তৎপর হতে পারতেন না। আর এসব স্বল্পশিক্ষিতদের মনগড়া তথ্য দিয়ে সমাজটাতে ধস নামানোর প্রয়াসও করতেন না।

কলেজ পাঠকালীন সময়ে আমরা সহপাঠিরা হোস্টেলে অবসরে ধর্মালোচনা করতাম, এর উদ্দ্যোক্তা আমরা ২/৩ জন মুসলমান মেয়েই ছিলাম। কোনো সাম্প্রদায়িকতা নয়, সর্ব ধর্মের সবাই সবার কথা বলতাম। এখানে হিন্দু মুসলমান ও খ্রীষ্টান এই তিন পক্ষেরই প্রতিনিধিরা থাকতো। দেখা যেত কার্যত: মুসলমান মেয়েরাই ধর্ম সম্বন্ধে অনেক কিছুই বলছে কিন্তু কোন হিন্দু মেয়ে কোন গল্প বা তথ্যভিত্তিক কথা বলতে পারতো না, আর খ্রীষ্টান মেয়েদের পক্ষে লুসি গাবিল নামে আমার এক সহপাঠিনী তার ধর্মের অনেক কথাই বলতো। এ রকম ঘটনায় হিন্দু মেয়েরা লজ্জা পেত। ওরা বলতো, “কি জানি বাবা, তোরা জন্মেই ধর্মচর্চা শুরু করে দিস্, আমরা ওসব পারলে শেষ বয়সে মৃত্যুর আগে আরতি, অর্চনা, উপবাস যা পারি করে যাব, এখন এসব আমাদের মাথায় নেই।” শেষ পর্যন্ত উপস্থিত সভার মনোয়ারা নামের আমাদের এক সহপাঠিনী সে রামায়ণ, মহাভারত পড়েছিল। সে হিন্দুদের পক্ষ থেকে ওসব গ্রন্থের কিছু গালগল্প বলে আমাদের শোনাতো। তাছাড়া আমরা আঞ্চলিক কথাবার্তা নিয়েও আলোচনা করতাম। এক এক অঞ্চলের এক এক ভাষা আমাদের দারুণ আনন্দের খোরাক যোগাত।

নাসরিনের ৮৫ পৃষ্ঠাতে লেখা, “ধর্ম নারীকে অমানুষে পরিণত করে, ধর্ম নারীকে করে পুরুষের ক্রিতদাসী।” আবার ১১২ পৃষ্ঠায় “বিভিন্ন সম্প্রদায়ে বিবাহিত, অবিবাহিত ও বিধবা নারীর সজ্জা বিভিন্ন রকম। নারী এয়োতির চিহ্ন বহন করে, হাতে শাঁখা, সিঁথিতে সিঁদুর, নাকে নোলক, গায়ে গয়না, কাতান বেনারসি পরে নারী প্রমাণ করে সে বিবাহিত। বিধবা বা বিপতœীক এর মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্যের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিধবার গা থেকে যাবতীয় অলংকার খুলে ফেলতে হবে। বিধবার পরিধেয় বস্ত্র হবে কাফনের মত সাদা, অন্য এক সম্প্রদায়ে বিধবার আমিষ খাওয়ার বিধান নেই, বিধবা মাছ মাংস, ডিম-দুধ খেতে পারবে না। কিন্তু বিপত্নীক পুরুষের জন্য কিছুই বাধা নয়, তাকে নিরাভরণ এবং নিরামিষাশী হতে হয় না।”

উপরের প্রত্যেকটি অপলাপ মুসলিম ছাড়া অন্য অনেক সম্প্রদায়ের ধর্মের অঙ্গ বলে পালন করা হয়। এসব কোন বিধানই ইসলামের অঙ্গ নয়। ইসলামে কোন বিধবা যদি সাদা কাপড় পরে তা তার নিজের অভিরুচী, ধর্মীয় নির্দেশ নয়। বৃটেনের রানীও বিয়ের পোশাকে কফিনের মত সাদা ড্রেস পরে শব সেজে থাকেন। ইসলাম কোন মেয়েকে বিধবা সেজে কৃচ্ছতা পালন করতে বলেনি। প্রয়োজনে ইদ্দত পালন করার পর সে তার গতিশীল জীবনের চিন্তা করতে পারে, নতুন জীবনের জন্য স্বামী নির্বাচন করতে পারে, এ অধিকার তার আছে। ইসলামে বধুকে শাখা, সিঁদুর, গয়না, কাতান, বেনারসি দিয়ে বিবাহিতার প্রদর্শনী করার কোন বিধান নেই। কারো ইচ্ছে হলে কাতান বেনারসি সে পরতে পারে, তাকে আটকাবার কোন শক্তিও কারো নেই। মৌল ইসলাম এক গাদা সংস্কারের জঞ্জাল নয়, ইসলাম চির মুক্ত, চির নবীন, চির সুন্দর ও আধুনিক।

ইসলামে বিয়ে ও তালাক প্রসঙ্গে বিরুদ্ধবাদীরা মনে করে ইসলামী সমাজে পুরুষরা ইচছামত চারটি বিয়ে করতে পারে এবং যখন ইচছা স্ত্রীকে ত্যাগ করতে পারে। অথচ কুরআন মজিদে আল্লাহপাক বলেছেন, “তোমরা যতক্ষণ স্ত্রীদের মধ্যে সমতা ও ইনসাফ কায়েমের ব্যাপারে নিশ্চিত না হবে ততক্ষণ একের অধিক বিয়ে করবে না।” আয়াতের শেষাংশে বলেছেন যে, “আমি জানি, তোমরা স্ত্রীদের মধ্যে সুবিচার করতে পারবে না।”

অজ্ঞতার সুযোগে ইসলামকে নিয়ে অনেকেই ব্যবসা করেছে, যার যার মনগড়া তথ্য দিয়ে অনেকেই ইসলামকে কলুষিত করেছে। যুদ্ধবিগ্রহে লিপ্ত আরব পুরুষরা প্রায়ই ঐ সময় যুদ্ধে নিহত হয়, এতে লক্ষণীয় ঐ সময় পুরুষের স্বল্পতা প্রকট ছিল। ইসলাম সব সময়ই সমতা ও ইনসাফের ভিত্তিতে এক বিয়েরই পক্ষপাতি। আর অনেক পুরুষরা এ আয়াতের বিকৃত ব্যাখ্যা দিয়ে সমাজে অনাচারের মাত্রা বাড়িয়ে তুলেছেন সত্য, সে ত্রুটি সমাজেরই ত্রুটি, সমাজের মানুষের ত্রুটি, ইসলামের নয়।

আর তালাক এমন একটি বিধান যাকে অজ্ঞ লোকেরা নির্যাতনের হাতিয়ার বলে চালিয়ে সমাজের পরিবশেকে বিষিয়ে তুলেছে, বিজ্ঞানের অনেক আবিষ্কারে প্রয়োগের ক্ষেত্রে আশীর্বাদ অভিশাপ দুটোই যেমন কুড়ানো যায়। প্রয়োগকর্তা যদি নিজের খেয়াল খুশি মত এটা দিয়ে হিরোসিমা নাগাসাকিদের উপরে তান্ডব ক্রিয়া চালিয়ে যায় তবে এটি নিশ্চিত এর অপপ্রয়োগই এর হতাশার কারণ। আমার আগের আলোচিত মিসেস বিশ্বাসের সমাজ তাকে এরকম একটি বিধান উপহার দিতে পারে নাই বলে আজীবন আপন স্বামীর ঘরে অভিনয় করে তাকে মেকী লোকের স্ত্রী সেজে নাটকের যবনিকার জন্যে অপেক্ষা করে যেতে হয়। এ ছাড়া তার বাঁচার রাস্তা নেই। ইসলাম মুক্ত ও আধুনিক চিন্তার ধারক। এসব ব্যতিক্রমী দৈব দূর্ঘটনায় এটা প্রয়োগ করারই বিধান দেয়া হয়েছে।

তালাক সম্বন্ধে কু’রআনের সুরা বাক্বারাহ ২৩০, ২৩১, ২৩২, ২৩৪ ও ২৩৬ আয়াতের বিস্তারিত বর্ণনা আমি নিচে দেয়ার প্রয়োজন বোধ করছি।

“তারপর (উল্লেখিত প্রক্রিয়ায় দুইবার বৈবাহিক চুক্তি নিয়ে তালাক ও পূণর্মিলনের চেষ্টা চালানোর পরেও) যদি সে (তৃতীয়বার) তাকে তালাক দেয় তবে সন্দেহাতীতভবে এটা প্রমাণিত হয়ে যায় যে, এ বিবাহ চুক্তি টিকবে না, তাই) এরপর সে (নারী) তার জন্য বৈধ হবে না যে পর্যন্ত না সে অন্য স্বামীকে (ঠিকঠিক) বিবাহ করে। এখন যদি সেই স্বামীও (নতুন স্বামী বাধ্য হয়ে) তাকে তালাক দিয়ে দেয় (অবশ্য হীন ও ঘৃণ্য ‘হালালাহ’ করার জন্য নয়, যার দ্বারা আল্লাহর ধিক্কার পড়ে, যে তা করে ও যার জন্য তা করা হয় তাদের উভয়ের উপরে, তির (৯:২৫) তাহলে (দ্বিতীয় বিবাহ ভেঙ্গে যাওয়ায় প্রথম জোড়ার যদি জ্ঞানোদয় হয় ও নিজেদের দোষত্রুটি সংশোধন করে আবার জুড়ি বাধতে আগ্রহী হয়, তবে কদাচিৎ প্রয়োজন হওয়া এমন বিরল ক্ষেত্রে) তাদের উভয়ের অপরাধ হবে না যদি তারা পরষ্পরের কাছে (পুনরায় বৈবাহিক চুক্তিতে) ফিরে আসে, যদি তারা বিবেচনা করে যে তারা (এখন বনিবনাও করে) আল্লাহর গন্ডির মধ্যে (বৈবাহিক সম্পর্কে বহাল রেখে) থাকতে পারবে। আর এগুলো হচেছ আল্লাহর নির্দেশিত সীমা তিনি সুস্পষ্ট করে দেন সেই লোকদের জন্য যারা (বিধি নিষেধ সম্বন্ধে) জানে” (সুরা বাক্বারাহ ২৩০ আয়াত)।

“আর যখন (তোমাদের) স্ত্রীদের তালাক দাও, আর তারা তাদের ইদ্দত (বা অপেক্ষাকাল, ২:২২৮) পূর্ণ করে, তারপর হয় তাদের রাখবে সদয়ভাবে (পুনরায় বিয়ে করে), নয় তাদের (তোমাদের ঘরবাড়ী থেকে যাবার জন্য ৬৫:১,২) মুক্তি দেবে সদয়ভাবে, তাদের মহরানা ও দেনা পাওনা যথযথভাবে মিটিয়ে দিয়ে, ২:২২৯; ৬০:১০)। আর তাদের আটকে রেখো না (তোমাদের অধীনে ছলচাতুরি বা জবরদস্তি করে) ক্ষতি করার জন্য (তাদের উপর কোনো প্রকার আক্রোশ মেটাতে বা তোমাদের থেকে মুক্তি আদায়ের জন্য মহরানা পরিত্যাগে তাদের বাধ্য করতে। যার ফলে তোমরা (বিধি নিষেধের) সীমা লংঘন করবে; আর যে তাই করে সে নিশ্চয় তার নিজের প্রতি অন্যায় করে। আর (ঝুটমুট তালাক দেয়া, প্রতি তালাকে সালিশীর ব্যবস্থা না করা, বা “হালালাহ” র ন্যায় মেকী বিবাহ প্রচলনের দ্বারা) আল্লাহর প্রত্যাদেশকে তামাশার বস্তু করে নিও না; আর স্মরণ করো তোমাদের উপরে আল্লাহর নিয়ামত ও তোমাদের কাছে যা তিনি অবতরণ করেছেন কিতাব (যথা কুরআন) ও (তার মধ্যে থাকা) হিকমত (জ্ঞান বিজ্ঞান) সম্পর্কে, যার দ্বারা তিনি তোমাদের উপদেশ দিচেছন (যাতে তোমরা সব ব্যাপারে সঠিক পথ অবলম্বন করতে পার)। আর আল্লাহকে ভয়ভক্তি করবে, আর জেনে রেখো নিঃসন্দেহ আল্লাহ সবকিছু সম্পর্কে সর্বজ্ঞাতা” (সুরা বাক্বারাহ ২৩১ আয়াত)।

“আর যখন তোমরা স্ত্রীদের (প্রথম বা দ্বিতীয় দফায়, ২:২২৯) তালাক দাও, আর তারা তাদের ইদ্দত বা প্রতিক্ষাকাল ২:২২৮) পূর্ণ করে, তখন তাদের বাধা দিও না তাদের (আগেকার) স্বামীদের (সরাসরি) বিয়ে করতে (বা ফ্যাঁকড়া তুলো না তদের হীন ও ঘৃন্য ‘হালালাহ’র ন্যায় আগে অন্য পুরুষকে বিয়ে করতে), যদি তারা নিজেদের মধ্যে রাজী হয় সঙ্গতভাবে (পুনরায় সংসার করতে)। এইভাবে এর দ্বারা (অর্থাৎ কুরআনের চিরসুন্দর বানী দ্বারা) উপদেশ দেয়া হচ্ছে তাকে তোমাদের মধ্যে যে আল্লাহতে ও শেষ (বিচারের) দিনে ঈমান আনে। এইটি তোমাদের জন্য (অজ্ঞানতার দিনের হালালাহর চেয়ে) অধিকতর পরিচ্ছন্ন ও পবিত্রতর। আর আল্লাহ (ভালমন্দ সব) জানেন অথচ তোমরা জানো না” (সুরা বাক্বারাহ ২৩২ আয়াত)।

“আর তোমাদের মধ্যে যারা মারা যায় ও রেখে যায় স্ত্রীদের, তারা (স্ত্রীরা) নিজেদের অপেক্ষায় রাখবে চারমাস ও দশ (মৃত স্বামীর প্রতি শোক ও সম্মান দেখানোর জন্যে, আর ইতিমধ্যে গর্ভ হবার কোন লক্ষণ প্রকাশ পায় কিনা দেখতে, ২:১২৮; ৬৫:৪)। তারপর তারা যখন তাদের সময়ের মোড়ে পৌঁছে যায় তখন তোমাদের কোনো অপরাধ হবে না যা (বৈবাহিক আলাপ আলোচনা ও সম্বন্ধ) তারা নিজেদের জন্য করে ন্যায়সঙ্গতভাবে। আর তোমরা যা কর সে সম্বন্ধে আল্লাহ ওয়াকিফহাল” (সুরা বাক্বারাহ ২৩৪ আয়াত)।

“তোমাদের অপরাধ হবে না যদি তোমরা তালাক দাও স্ত্রীদের যাদের এখনও তোমরা (সহবাসের জন্য) স্পর্শ করো নি বা দেয় (মহরানা) যাদের জন্য ধার্য করো নি। আর (এহেন অবস্থাতেও) তাদের জন্য (ভরণ পোষণের) ব্যবস্থা করো ধনবানের ক্ষেত্রে তার সামর্থ্য অনুসারে ও অভাবীর ক্ষেত্রে তার সামর্থ অনুসারে (ভরণ পোষণের) ব্যবস্থা হবে পুরোদস্তুরভাবে। সৎকর্মীদের জন্য (এটি) একটি কর্তব্য” (সুরা বাক্বারাহ ২৩৬ আয়াত)।

“কিন্তু যদি তোমরা তাদের তালাক দাও তাদের স্পর্শ করার আগে এবং ইতিমধ্যে দেয় (মোহরানা) তাদের জন্য ধার্য করে ফেলেছ, (তাদের প্রাপ্য হচ্ছে) যা ধার্য করেছ তার অর্ধেক, যদি না তারা মাফ করে দেয় (তাদের প্রাপ্য অর্ধেকের কোন অংশ) অথবা তারা (স্বামীরা) দাবী মাফ করে দেয় যাদের হাতে রয়েছে বিবাহ গ্রন্থি (আর তাই স¤পূর্ণ মোহরানাই যদি স্ত্রীদের দিয়ে দেয়) আর যদি (স্বামীরা) দাবী ছেড়ে দেয় তবে তা ধর্মপরায়নতার অধিকতর নিকটবর্তী, আর তোমাদের পর®পরের মধ্যে (দান উপহারের মাধ্যমে) সদয়তা ভুলে যেয়ো না। নিঃসন্দেহ তোমরা যা করো আল্লাহ তার দর্শক” (সুরা বাক্বারাহ ২৩৮ আয়াত)।

“আমাদের দেশে নামাজ রোজা ধর্মোৎসব ইত্যাদি বেশ ঘটা করে পালন করা হয় কিন্তু ধর্মগ্রন্থ এবং নানা ধর্মীয় পুস্তক সম্পর্কে বিশদ কোনো আলোচনা হয় না, যা হওয়া উচিত। ধর্মচর্চা সঠিকভাবে হলেই দেশশুদ্ধ ধর্মব্যবসার পসার যেমন কমবে, তেমনী ধর্মীয় কুসংস্কারাচছন্ন মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে হ্রাস পাবে”। নির্বাচিত কলামের ১৬৯ পৃষ্ঠার উক্ত বক্তব্যটির “ধর্মগ্রন্থ সম্বন্ধে আলোচনা হয় না” কথাটি সঠিক নয়। নাসরিনের সাথে আমার আপত্তি আমার ধর্মগ্রন্থ নিয়েই, যা কোন মানুষ লেখেনি, যে গ্রন্থে কোন লেখকের নাম নেই। যে গ্রন্থ দাবী করা হয় ঐশীগ্রন্থ যা স্রষ্টার বা আল্লাহর প্রেরিত। আর অবশ্যই এর চর্চা আরো বেশী বাড়লে সমস্ত মেকি সভ্যতা, কুসংস্কারকে এ পৃথিবী ছেড়ে মঙ্গলগ্রহে বা অন্য কোথাও আশ্রয় নিতে হবে। এ গ্রন্থের চর্চা বৃদ্ধি হলে আমি নিজেও খুশী হতাম আর সুষ্ঠুভাবে চর্চা করলে ভারতের প্রখ্যাত ডক্টর শিবশক্তি সরুপজী মহারাজ ধর্মাচার্য্য আদ্যশক্তিপাঠ এর ন্যায় ইসলাম উদ্দিন (নও মুসলিম হিসাবে নতুন নামকরণ) নাম নিয়ে তার চিরাচরিত জঞ্জালের ভান্ডার ফেলে মুক্তির অন্বেষায় ছুটে আসতো জগতের সমস্ত সর্বহারার দল।

আমাদের রসুল মোহাম্মদ (সঃ) দৃশ্যতঃ কোন বিদ্যাপিঠে বিদ্যালাভ করেন নাই তবে মেধা ও মননে বিদ্যা ও বুদ্ধিতে জগতে শ্রেষ্ঠত্বের অবদান রেখেছিলেন। সবচেয়ে আশ্চর্য্যরে বিষয় কোন মানুষ তার শিক্ষক ছিল না। তিনি স্রষ্টা কর্তৃকই শিক্ষিত হয়েছিলেন, এই স্বশিক্ষিত মানুষটি দশ সহ¯্র সৈন্য নিয়ে মক্কা বিজয় করেছিলেন তলোয়ার দিয়ে নয়। এই অস্ত্রখানি দিয়ে যা আজকের আলোচ্য বিষয়, তা আল-কুরআন। নাসরিনের হৃদয় উৎসারিত নানান প্রতিবাদের তোপের মুখে আমিও কোন তলোয়ার নিয়ে আসি নি। আমার হাতেও সেই অস্ত্রখানি যা দিয়ে আমি আপনার শত বঞ্চনার জবাব দেবার আশা পোষণ করছি।

নির্বাচিত কলাম বইটির ১৬৮ পৃষ্ঠায় আপনি নাসরিন বলেছেন, “নারীকে সবচেয়ে বেশী অমার্যাদা করেছে ধর্ম এবং কোন ধর্মই নারীকে মানুষের সম্মান দেয় নি।”

তুলনামূলক ধর্মীয় চর্চা (ঈড়সৎধৎধঃরাব ংঃঁফু ড়ভ ৎবষরমরড়হ) যদি আপনি সঠিকভাবে করতেন তবে অবশ্য দিশা আপনার পাবার কথা ছিল। আপনার চর্চাতে গলদ আছে নির্ঘাৎ, নয়তো সত্য মিথ্যা আলো অন্ধকার আপনি বুঝতে পারেন না, নাকি বুঝেও না বুঝার ভান করে থাকেন। অনেক ধর্মেই নারীকে তুুচ্ছার্থে ব্যবহার করেছে ঠিকই কিন্তু ইসলামই নারীকে প্রকৃত মর্যাদা দিয়েছে।

শিশুকালে একটা গল্প শুনেছিলাম দুই পড়শিতে তাদের গরু নিয়ে ঝগড়া লেগেছে। উপায়ান্তর না দেখে দু’জনে ছুটলো এক অল্পশিক্ষিত হুজুরের কাছে। এই হুজুর নামধারী লোকটা ছিল একটা ফটকাবাজ লোক। লোকটা কুরআনের আয়াত দিয়ে বোকা পড়শিদের বুঝালো ‘কুরআনের ব্যাখ্যা দিয়ে যে আল্লাহতায়ালা স্বয়ং কুরআনেই বলেছেন, “হাজা বালাদাল আমিন।” অর্থাৎ এটা আমিন মৌলভীর বলদ। বস্তুতঃ ঐ ফটকাবাজ লোকটার নামও ছিল আমিন। বাস্ বলদটা আমিন মৌলভীর ভাগে পড়লো। আসলে এই আয়াতটা সুরা আত্তীনের তিন নাম্বার আয়াত, এখানে মক্কা নগরীকে নিরাপত্তার কেন্দ্র হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে। বালাদ অর্থ নগর কিন্তু এই ফটকাবাজ মৌলভী বালাদকে বলদ বলে চালিয়ে দিল। গল্পের দুই বোকা পড়শি ফিরে গেল। ওই হুজুর নির্ঘাৎ একটা জোচেচার ছিল এবং তার অন্তরে কোন খোদাভীতি মোটেও ছিল না। সে ছিল একজন ইসলামের, কুরআনের শত্রু।

আপনারা অনেকেই যা ধর্ম নয় তাই ধর্ম বলে চালিয়ে দিলেই তো আর সেটা ধর্মের অঙ্গ হবে না। কুরআনের ব্যাখ্যাকে সঠিকভাবে না নিয়ে নিজেদের মনগড়া তথ্য দিয়ে কুরআনকে গ্রহণ করলে কোনদিনই সত্যের নাগাল পাবেন না। আর কঠিন সত্যকে আহরণ করতে হলে সঠিকভাবে তার চর্চা করতে হবে। যারা কুরআনকে সত্যের কষ্টি পাথরে যাচাই করে সঠিকভাবে কুরআনকে ধারণ করতে পারে নি তাদের প্রতি ইঙ্গিত করে কবি নজরুল গেয়েছেন।

“হায় তোতাপাখি —-
ফল বহিয়াছ, পাও নিক রস, হায়রে ফলের ঝুড়ি
লক্ষ বছর ঝর্ণায় ডুবে রস পায় নাকো নুড়ি”।

সেই নজরুলেরই ভাষায় বলি,

“গাহি সাম্যের গান
বিশ্বে যা কিছু চির কল্যাণকর
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী
অর্ধেক তার নর”।

আল্লাহ বলেন—“ভ্রুন পুরুষ বা নারী যাই হোক একটিতে রূপ নেবার পর তাতে রূহ বা আত্মার সঞ্চার হয়”। আল্লাহতায়ালা বলেছেন, “অতপর তিনি তা থেকে সৃষ্টি করেন যুগল নর ও নারী।”

নারী মূল্যায়ন সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, “শপথ রাতের, যখন সে আচ্ছন্ন করে, শপথ দিবসের যখন তা আবির্ভূত হয় এবং শপথ তাঁর যিনি নর ও নারী সৃষ্টি করেছেন” (সুরা লায়ল ১-৩ আয়াত)।

নারী ও পুরুষ দুজনই মানুষ। সেই মানুষকে আল্লাহ বলেন, “শপথ মানুষের এবং তাঁর যিনি মানুষকে সুঠাম করেছেন, তারপর তাকে তার অসৎকর্ম ও সৎকর্মের জ্ঞান দান করেছেন” (সুরা শামস ৭-৮ আয়াত)।

চেষ্টা সাধনা, অধ্যয়ন গবেষণার মাধ্যমে মানুষকে ইহকাল ও পরকালীন মুক্তির উপায় আহরণের ইঙ্গিত দিয়েছেন আল্লাহ “প্রত্যেকেই ভেবে দেখুক আগামীকালের জন্য সে কি অগ্রিম পাঠিয়েছে” (সুরা হাশর ১৮ আয়াত)।

“নিশ্চয়ই আমি নষ্ট করে দিই না তোমাদের মধ্য থেকে কোন আমলকারীর আমলকে সে পুরুষ হোক অথবা নারী, তোমরা আসনে এক ও অভিন্ন” (সুরা আল-ইমরানের ১৯৫আয়াত)।

“যে ভালো কাজের সুপারিশ করবে সে তা হতে অংশ পাবে। আর যে খারাপ কাজের সুপারিশ করবে, সেও তা হতে অংশ পাবে” (সুরা নিসার ৮৫ আয়াত)।

উপরের পাঁচ ছয়টা কুরআনের উদ্ধৃতিতে ইসলামে নারীকে কিরুপ দৃষ্টিতে দেখা হয় তা নিশ্চয় পাঠকের বুঝতে অসুাবিধা হবার কথা নয়। নারী সম্পর্কে অনেকের ভুল ভ্রান্তির প্রতিবাদ স্বরুপ কুরআনের যে দৃপ্ত অঙ্গিকার তা উপরোক্ত এ সব কটি আয়াতে স্পষ্ট স্বাক্ষর রাখার যোগ্যতা রাখে।

কোথাও কি মনে হয় নাসরিন, যে স্রষ্টা নিজেও পুরুষ? আপনি আপনার বাবার কথামত আজীবন পড়লেন কিন্তু সত্য উদঘাটন করতে পারলেন না বলে বড়ই আফসোস হয়। তবে আমার বিশ্বাস সত্যিই যদি আপনি “ইকরা” কথাটির উপর গুরুত্ব দিয়ে থাকেন সত্যের নাগাল আপনি একদিন পেতেও পারেন কারণ আল্লাহর মূলমন্ত্র তো আপনার হাতে আছে, এ মন্ত্রের রহমতে হয়তো বা আপনার এ হতাশায় ভরা জীবন আশার আলো পেতেও পারে। আমরা ইসলামের নারীরা এমনিই মুক্ত। যতটুকু বন্দীত্ব তা আসল নয়, সব মেকী। ইসলামকে গ্রহণ করতে না পারার, না বুঝার গঞ্জনা মাত্র । তাই তো আমাদের মরে মুক্তি পাওয়ার কোন প্রয়োজনই নেই।

ইসলামে নারীর অবস্থান সম্পর্কে ঢাকাস্থ ইরানী রাষ্ট্রদূতের পত্নী মাসুমেহ বায়াত সম্প্রতি এক সেমিনারে বাংলাদেশের মজলুম নারীদের উপর এক বক্তব্য রাখেন যার সামান্য সংগ্রহ আমি উল্লেখ করছি। “মানুষের আসল পরিচয় ও ব্যক্তিত্ব তার আত্মার সাথে, নারী ও পুরুষ আত্মার দিক থেকে অভিন্ন। পার্থক্য শুধু বাহ্যিক গড়ন ও যোগ্যতা। ইসলামের দৃষ্টিতে নারী ও পুরুষের সম্পর্ক হৃদ্যতাপূর্ণ, অথচ পাশ্চাত্য নারী ও পুরুষকে পরষ্পরের বিরুদ্ধে সংঘাতে ঠেলে দিয়েছে।

তিনি বলেন, “পর্দা প্রগতির অন্তরায় নয়। তার অর্থ এও নয় যে, ইসলাম নারীকে ঘরের কোনায় আবদ্ধ রাখতে চায়। পর্দার অর্থ যদি নারীর ঘরের কোনে বসে থাকা হতো তাহলে পর্দার হুকুম ও আল্লাহ দিতেন না। কেন না নারীর ঘরে বসাই বিধান হলে পর্দার হুকুমের কোন প্রয়োজন ছিল না। তিনি বলেন, তিন বছরের অধিককাল বাংলাদেশে অবস্থান করে যে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছি তা হলো এখানকার মুসলিম মহিলারা সত্যিই মজলুম। মজলুম এই অর্থে যে, তাদের ইসলামের সঠিক জ্ঞান দেয়া হয় না যে জন্য তরুণ সমাজ ইসলাম থেকে দূরে সরে যাচেছ।

আল্লাহপাক আমাদের পুরুষদেরকে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের হুকুম দিয়েছেন। তারা তা না করে বিয়ের পিছনে পড়ে তার জন্য ইসলামের দোহাই পাড়ে।

সমাজে নারী ও পুরুষের অবস্থাকে আমরা মানবদেহে প্রাণ ও মস্তিষ্কের সঙ্গে তুলনা করতে পারি। উভয়ের সহযোগিতায় মানব জীবনের অস্তিত্ব সম্ভব। এর একটি অকেজো হলে অপরটিও অচল হতে বাধ্য। আবার প্রাণ ও মস্তিষ্কের মধ্যে একটিকে অপরটির উপর প্রাধাণ্য দিতে গেলে বিপত্তি ঘটবে। অনুরূপভাবে উভয়টি একই কাজ করতে গেলেও জীবন অচল হয়ে পড়বে। মানব সমাজে নারীকে মস্তিষ্কের সাথে তুলনা করলে পুরুষের অবস্থান প্রাণ ও আত্মার মত অথবা পুরুষ মস্তিষ্ক এবং নারী প্রাণ ও আত্মা। উভয়ের গুরুত্ব ও অধিকার সমান কিন্তু দায়িত্ব ও অবস্থান ভিন্ন। তিনি আরো বলেন, “ইসলামের সাথে মুসলিম মহিলার স¤পর্ক মাটির সাথে গাছের সম্পর্কের মত। গাছকে শিকড় উপড়িয়ে মাটি থেকে স্বাধীন ও মুক্ত করতে চাইলে তার অস্তিত্ব বিপন্ন হবেই। অনুরুপভাবে মুসলিম মহিলাকে ইসলামী আদর্শ থেকে বিচিছন্ন করার চেষ্টা করা হলে তার অস্তিত্বের দর্শনই বিপন্ন হয়ে পড়বে।”

আল-কুরআনে নারীদের সম্মানে ‘নিসা অর্থাৎ নারী’ বলে একটা সুরা নাজিল হয়েছে। উক্ত সুরাতে নারীদের ব্যাপারে খুব সুন্দরভাবে বিস্তৃত বর্ণনা এসেছে। জীবনের সকল সরল ও জটিল অধ্যায় যা সব নারীকেই বাস্তব জীবনে মোকাবেলা করতে হয়।

নিচে নারীর উপর কয়টি কুরআনের উদ্ধৃতি

“তারা স্ত্রীরা তোমাদের অঙ্গাবরণ এবং তোমরাও তাদের অঙ্গাবরণ, তাদের প্রতি তোমাদের যেমন অধিকার রয়েছে তোমাদের প্রতিও তাদের তেমনি অধিকার আছে” (সুরা নিসা)।

“আর যে কেউ ভালো ভালো কাজ করে, পুরুষ হোক বা নারী আর সে মুমিন হয়, (কারণ মুমিনরাই আল্লাহর আদেশ নির্দেশ উপদেশ সঠিকভাবে পালন করে থাকে), এরাই তবে বেহেশতে প্রবেশ করবে আর তাদের অন্যায় করা হবে না খেজুর বিচির খোসা পরিমানেও” (সুরা নিসার ১২৪ আয়াত)।

“নিশ্চয়ই (লেভ ১২:২-৫, ২য় ক্রনি ৮:১১, ১ম সামু১৮:২১, এক্লে ৭:২৬ এর বর্ণনানুযায়ী নারী পাপের প্রতীক না হয়ে বরং আল্লাহতে আত্মসমর্পণকারী) মুসলিম পুরুষ ও মুসলিম নারী (২:১১২) এবং মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী (২:১১২) এবং মুমিন পুরুষ ও অনুগত নারী, সত্যনিষ্ঠ পুরুষ ও মুমিন নারী এবং অনুগত পুরুষ ও সত্যনিষ্ঠ নারী আর অধ্যবসায়ী পুরুষ ও অধ্যবসায়ী নারী, আর বিনয়ী পুরুষ ও বিনয়ী নারী আর দানশীল পুরুষ ও দানশীল নারী, আর রোজাদার পুরুষ ও রোজাদার নারী, আর নিজেদের আব্রুরক্ষাকারী পুরুষ ও(আব্রু) রক্ষাকারী নারী আর আল্লাহকে বহুলভাবে স্মরণকারী পুরুষ ও (তেমন) স্মরণকারী নারী— আল্লাহ এদের সকলের জন্য ব্যবস্থা করেছেন (ভুলভ্রান্তি ও পদস্থলন থেকে) পরিত্রাণ ও এক বিরাট প্রতিদান” (সুরা আল-আহযাব: আয়াত ৩৫)।

“যে ব্যক্তি স্বীয় আত্মাকে কুপ্রবৃত্তি হতে বিরত রেখেছে নিশ্চয়ই বেহেশতই তাহার শান্তিনিকেতন” (সুরা নাজেয়াত ৪০-৪১ আয়াত)।

ইসলামের ইজ্জত ইরানের নারী

‘নারী’ নামক এই দুই অক্ষরের একটি বিদ্রোহী সত্তা সমস্ত বইটিতে আলোড়নের ঝড় তুলেছে। কিন্তু অনেক সময় নাসরিনের বইটিতে অনেক উল্টাসিধা বক্তব্যও আছে। তার ১০৭ ও ১১৯ পৃষ্ঠায় নির্বাচিত কলামে এক মুখে দুই কথার প্রকাশ ঘটে। কিছুদিন আগে আমাদের বাংলাদেশে মহা সারম্ভরে ‘মুনির’ নামের এক বিকৃত মানসিকতার পুরুষের ফাঁসিতে অপমৃত্যু ঘটে। উল্লেখ্য পরকিয়া প্রেমিক মুনির নিজ স্ত্রী শারমিন রীমাকে ভ্রমণরত অবস্থায় পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে। খুকু নামের একটা নষ্টা মেয়েও এ ঘটনার সাথে জড়িত ছিল। যাক্ খুকু যত নষ্টই হোক সে আদালতে রেহাই পায় কিন্তু নষ্ট মুনিরের সেদিন ফাঁসি হয়। সমস্ত জাতি এ ঘটনা প্রত্যক্ষ করে।

মেয়েদের অর্থ উপার্জনের মানে এই নয় যে, পরিবারের ভরন-পোষণের দায়িত্ব তাদের। মেয়েরা যে অর্থ উপার্জন করবে তা তাদের নিজস্ব। সেই অর্থ স্বাধীনভাবে খরচ করার অধিকার তার রয়েছে। এই অর্থ পরিবারের জন্য খরচ করতে সে বাধ্য নয়। মেয়েদের অর্থনৈতিক স্বাচছন্দ্য সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অগ্রগতি সাধনে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। ইসলামী সমাজের অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে নারী পুরুষের সহযোগিতা জাতীয় সুখ ও সমৃদ্ধিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ইরানের নেতা নি¤œলিখিত নীতিমালার ভিত্তিতে নারী স্ব^াধীনতার ব্যাখ্যা উপস্থাপনা করেছেন।
(১) ইসলাম ও নারী স্বাধীনতার সমন্বয়।
(২) নারী স্বাধীনতার মূল উৎস হলো ইসলাম। মানব ইতিহাসে নারী স্বাধীনতার প্রতি ইসলামের যে অবদান তার কোন তূলনা নেই। ইসলামে নারী জাতিকে দাসত্বের শৃংখল থেকে মুক্ত করে ব্যক্তিত্ব ও মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
(৩) মানব ইতিহাসে নারী মুক্তির একমাত্র সহায়ক মতাদর্শ হলো ইসলাম।
(৪) অভিভাবকত্বের দৃষ্টিকোণ থেকে পুরুষের চেয়ে নারীর মর্যাদা।
(৫) সমাজে শিক্ষিত নারীর অবস্থান।
(৬) ইসলাম পুরুষের চেয়ে নারীকে বেশী মর্যাদা দিয়েছে; তাদের অধিকার বেশী স্বীকার করেছে। নারীরও ভোটাধিকার রয়েছে। ব্যবসা বানিজ্যেও তারা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে। তারা যেমন নির্বাচন করতে পারে তেমনি নির্বাচিত হতে পারে। ইসলাম নারী পুরুষ উভয়কেই কর্তৃত্বের অধিকার দিয়েছে। নারী পুরুষের মধ্যে যদি কোন পার্থক্য থেকে থাকে তাহলে তা প্রাকৃতিক কারণে। ইসলাম নারীদের যেসব স্বাধীনতায় বাধা দেয় তার ফলে আসলে নারী অনৈতিকতা ও যৌন অপরাধ থেকে মুক্তি পায়। এভাবে ইসলাম নারী জাতিকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করে।

মেয়েদের অর্থ উপার্জনের মানে এই নয় যে, পরিবারের ভরন-পোষণের দায়িত্ব তাদের। মেয়েরা যে অর্থ উপার্জন করবে তা তাদের নিজস্ব। সেই অর্থ স্বাধীনভাবে খরচ করার অধিকার তার রয়েছে। এই অর্থ পরিবারের জন্য খরচ করতে সে বাধ্য নয়। মেয়েদের অর্থনৈতিক স্বাচছন্দ্য সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অগ্রগতি সাধনে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। ইসলামী সমাজের অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে নারী পুরুষের সহযোগিতা জাতীয় সুখ ও সমৃদ্ধিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ইরানের নেতা নি¤œলিখিত নীতিমালার ভিত্তিতে নারী স্ব^াধীনতার ব্যাখ্যা উপস্থাপনা করেছেন।
(১) ইসলাম ও নারী স্বাধীনতার সমন্বয়।
(২) নারী স্বাধীনতার মূল উৎস হলো ইসলাম। মানব ইতিহাসে নারী স্বাধীনতার প্রতি ইসলামের যে অবদান তার কোন তূলনা নেই। ইসলামে নারী জাতিকে দাসত্বের শৃংখল থেকে মুক্ত করে ব্যক্তিত্ব ও মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
(৩) মানব ইতিহাসে নারী মুক্তির একমাত্র সহায়ক মতাদর্শ হলো ইসলাম।
(৪) অভিভাবকত্বের দৃষ্টিকোণ থেকে পুরুষের চেয়ে নারীর মর্যাদা।
(৫) সমাজে শিক্ষিত নারীর অবস্থান।
(৬) ইসলাম পুরুষের চেয়ে নারীকে বেশী মর্যাদা দিয়েছে; তাদের অধিকার বেশী স্বীকার করেছে। নারীরও ভোটাধিকার রয়েছে। ব্যবসা বানিজ্যেও তারা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে। তারা যেমন নির্বাচন করতে পারে তেমনি নির্বাচিত হতে পারে। ইসলাম নারী পুরুষ উভয়কেই কর্তৃত্বের অধিকার দিয়েছে। নারী পুরুষের মধ্যে যদি কোন পার্থক্য থেকে থাকে তাহলে তা প্রাকৃতিক কারণে। ইসলাম নারীদের যেসব স্বাধীনতায় বাধা দেয় তার ফলে আসলে নারী অনৈতিকতা ও যৌন অপরাধ থেকে মুক্তি পায়। এভাবে ইসলাম নারী জাতিকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করে।

পাশ্চাত্যে নারী:

আবার নির্বাচিত কলামের ৯৯ পৃষ্ঠায় নাসরিন একটি সুন্দর গল্প ফাঁদেনÑ
“এদেশে চিকিৎসকরা সুযোগ পেলে ইরান চলে যান। আমার বেশ ক’জন চিকিৎসক বন্ধু ইরান থেকে ফিরে এসে ওখানকার গল্প বলেছেন। তারা যে কথাটি সবচেয়ে বেশী বলেন তা হলো ইরানী মেয়েরা পা থেকে মাথা অবধি ঢেকে রাখে বটে তবে চিকিৎসকের কাছে অসুখ দেখাতে এসে নিজে থেকেই পুরো কাপড় খুলে উলঙ্গ হয়ে শুয়ে পড়ে। চিকিৎসকরা পরীক্ষা করে ওদের শরীরে বিশেষ কোন অসুখ খুঁজে পান না। ওদের অসুখ আসলে মনে। চার দেয়ালে অবদ্ধ থাকা মেয়েগুলো আসলে বেরুতে চায়, তাই অসুস্থতার ছুতোয় ওরা বেরিয়ে পড়ে। মূলতঃ বের হওয়াই ওদের উদ্দেশ্য। এবং বিদেশী মানুষ পেলে ওরা দেশী নিয়ম ভেঙ্গে মনের অসুখ দূর করে।”

“আমার চিকিৎসক বন্ধুরা ইরানী মেয়েদের শরীরের বড় প্রশংসা করেন। কড়ে আঙ্গুলে ব্যথার কথা বলে পুরো উলঙ্গ হয়ে যাওয়া মেয়েদের গা টিপে টিপে দেখতে হয় আর কোথাও ব্যথা আছে কি না, না হলে ওরা বড় রাগ করে। পরাধীনতা মানুষকে অসুস্থ করে, বিকৃত করে, মন এবং শরীরকে পঙ্গু করে” (১০০ পৃষ্ঠা, নির্বাচিত কলাম)।

লেখিকার স্বপেশার বন্ধুরা বিদেশে ডাক্তারী করার নামে নারীদের নাড়ীটেপার যে গল্প শোনালেন তা অবশ্যই ভাববার বিষয়। বিশ্ব এখন আর বিশাল নয়। মায়ের কাছে মামার বাড়ীর গল্প লেখিকা ভালই আমাদের শোনালেন। তা আমি ভাবতে পারি না কোন সুস্থ চিকিৎসক কি কড়ে আঙ্গুলে ব্যথার নামে রোগীর কথাতে পুরো শরীর টিপে দিতে রাজি হবে? আর যদি কোন চিকিৎসক রাজি হয় তাকে কি সুস্থ বলা যাবে? আরেকখানি দুঃখ আমার প্রতিপক্ষ লেখিকা যেখানে খুকুর জন্য কুম্ভিরাশ্রু ফেলতে ফেলতে প্রাণান্তর সেখানে এরকম ঘটনায় এই ইরানী মেয়েটার জন্য একটু চোখের জলও ফেলতে পারলেন না? কেন? ওহ! সে পর্দার ভিতর ছিল বলে, নাকি তার ধারে কাছে ইসলামের গন্ধ ছিল বলে, হয়তো বা।

আমাদের দেশ মুসলিম প্রধান একটি দেশ। এ দেশে কত খুকু কত লিমার জন্ম হচ্ছে যারা জারজ সন্তান দিয়ে দেশটা ছেয়ে দিতে চায় সে রকম একখানা নষ্ট মেয়ে ইরান দেশে পাওয়া গেলে কি সমস্ত ইরান নষ্ট হয়ে যায়! আর আমার বিশ্বাস এ গল্পখানি বিকৃত ডাক্তারদের নিজেদের বিকৃতিরই বহিঃপ্রকাশ কারণ উনারা আবার ইরানী মেয়েদের শরীরের বড়ই প্রশংসা করেন। তাছাড়া ইরানী মেয়েরা বন্দী নয়। পর্দা পালন করে বলেই তারা সর্বক্ষেত্রে নিজেদের যোগ্যতা মতন কাজ করে যাচেছ।

“অসুস্থতুার ছুঁতোয় ওরা বেরিয়ে পড়ে।” ইরান সম্বন্ধে লেখিকার ধ্যান ধারণা নেই বলেই এমন সত্যের অপলাপ মিশ্রিত কথা তিনি বলতে পেরেছেন। নাসরিন, আপনার দৃষ্টিতে নষ্ট ইরান আসলেই কি নষ্ট? ইরানের কিছু তথ্য নিচে দিলাম, পাঠক আপনারাই বিচার করবেন-

ইসলামী সংস্কৃতি ও নারীর সামাজিক মর্যাদার উপর ইমাম এর নেতৃত্বের প্রভাব ছিল অসাধারণ। ইরানে মহিলাদের মর্যাদা সংরক্ষিত হবার পর মহিলারা সর্বোচচ সাফল্য অর্জনের লক্ষ্যে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচেছ। ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সংবিধানের ৩, ২১, ২৮, ৪৩ ধারায় নারীর সম্মান ও মর্যাদার কথা লিপিবদ্ধ আছে। এই সংবিধান বলে ইরানের পুরুষের মত নারীরাও সমান অধিকার ভোগ করে থাকে। স¤পূর্ণ ইসলামী নীতিমালার ভিত্তিতে ইরানে মহিলাদের সার্বিক কর্মকান্ড পরিচালিত হচ্ছে। সমসাময়িক কালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম খোমেনী এর বলিষ্ঠ নেতৃত্বের ছোঁয়ায় ইরানের নারী সমাজ বিশ্বের মুসলিম নারী সমাজের আদর্শ হিসাবে নিজেদের অবস্থানকে সৃদৃঢ় করতে সক্ষম হয়েছে।

হযরত ফাতেমা জোহরা এর আদর্শ ও অনুপ্রেরণা ইসলামী বিপ্লব বিজয়ে ইরানী নারীদের অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে। শুধু ইরানে নয়, সারা বিশ্বের নারী সমাজের আদর্শ হিসাবে হযরত ফাতেমা জোহরা এর আদর্শ অনুপম। একজন নারী হিসাবে এবং সর্বগুণে গুণান্বিতা একজন মানুষ হিসাবে হযরত ফাতেমা জোহরা ছিলেন অতুুলনীয়া। খোদার বিশেষ অনুগ্রহ লাভে তিনি ধন্য ছিলেন। তিনি স্বয়ং মহানবী (সঃ) কর্তৃক প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত হন।

ইমাম খোমেনী (রাঃ) বিভিন্ন ক্ষেত্রে শিক্ষা গ্রহন যেমন—পরীক্ষামূলক বিজ্ঞান, শিল্প-সংস্কৃতি, সাহিত্য, দর্শন, ধর্মতত্ত্ব, মরমীবাদ ও তাফসীর এসব বিষয়ের শিক্ষা লাভের উপরই মুসলিম নারীর নৈতিক ও আধ্যাত্মিক ভূমিকায় জোর দেওয়া হয়। পরিবারে নারীর আদর্শ মা ও স্ত্রীর ভূমিকা সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ভূমিকার বিরোধী নয়, বরং সহায়ক। পরিবারের আদর্শ মা, স্ত্রীই পারে সমাজে আদর্শ নারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে। তাই ইরানী পরিবারে নারীদের সাংস্কৃতিক শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ইসলামী বিপ্লবে নারীদের সাহস, আত্মত্যাগ, ধার্মিকতা, দৃঢ় প্রত্যয় ছিল অসাধারণ। পুরুষের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ইরানের নারীরা ইসলামী বিপ্লবের গতিকে ত্বরান্বিত করতে কার্যকরী ভূমিকা পালন করেছেন। ইরানে উৎপাদন, বন্টন, ব্যবহার ও ব্যবসায়ে মুসলিম নারীর অধিকার রয়েছে। তারা ইচছা করলে পুরুষদের মত ব্যবসা বানিজ্যও করতে পারে। বিভিন্ন শিল্প, কৃষি, প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনায় নারীদের মালিক হবার অধিকার রয়েছে। মোট কথা, মুসলিম সমাজে নারীদের পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক স্বাধীনতা রয়েছে।


পাশ্চাত্যে নারীদেরকে পুরুষের মত সমান অধিকার দিতে গিয়ে আসলে নারীকে মর্যাদাহীন করে তাকে নিছক প্রদর্শনী ও ভোগ্যপন্যে পরিণত করা হয়েছে। অথচ নারীও সম্মানিত মানুষ। তাদেরও মর্যাদা লাভের অধিকার রয়েছে। পাশ্চাত্যের এই বর্ধিত বস্তুবাদিতা এবং জোরালো আত্মকেন্দ্রিক অহংবোধের ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে মহিলাদের কাছে স্বামী ও সন্তানদের স্থান হচ্ছে খুব কম এবং কখনো একেবারেই হচ্ছে না। শিশুদের লালন পালনে অত্যন্ত নিষ্ঠা ও সময় দরকার এবং এব্যাপারে সুফল ও সাফল্য পাওয়া যায় দীর্ঘকাল পরে। এর অর্থ সন্তান লালন পালনের ধৈর্য ও সহনশীলতা আবশ্যক। পশ্চিমা সমাজে এই ধৈর্য কোন জোরালো উপাদান নয়, সেখানে যা জোরালো তা হলো মহিলাদের ব্যক্তিত্ব এবং রুঢ় অর্থে অহংবোধ। এর ফলে পারিবারিক কাঠামো ভেঙ্গে গেছে এবং পরিবারে পুরুষের ভূমিকায় ধস নেমেছে।

ইউরোপীয় মহিলাদের মধ্যে এখন খুব হালকা মানসিকতার বিস্তার ঘটছে। কেন না, পশ্চিমা সমাজে বহু রকমের হালকা ও অর্থহীন ব্যাপারে মহিলাদের ব্যস্ততা ও অনুশীলনের দরুণ তাদের মধ্যে কোন স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গি ও সংকট সমাধানোপযোগী মানসিকতা গড়ে উঠছে না। যা কিছু তাদের কাছে আধুনিক ও নতুন মনে হয়, সেটিই তাদের কাছে চমৎকার মনে হয়। এমন কি তা কোন যৌক্তিক বা বুদ্ধিবৃত্তিক বিষয় না হলেও। যেমন: কুকুর, গাড়ী, ও চিত্রতারকাদের প্রতি আকর্ষণ। একদল স্বার্থপর পশ্চিমা মহিলা সন্তান লাভের উদ্দেশ্যে পুরুষের সাথে স¤পর্ক কামনা করলেও স্বামী গ্রহণের ধারনা নাকচ করে দিয়েছে। কেন না তারা মনে করে সন্তান হলো পুতুলের মত এবং তার মালিক কেবল তারাই। এখানে স্বামী বা সন্তানের পিতা হিসাবে কারো উপস্থিতি থাকলে সে সন্তানের অংশীদারিত্ব দাবী করবে আবশ্যিকভাবে। এই নীতি অনুশীলনের মাধ্যমে তারা পিতাদের সন্তানের অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে এবং সন্তানকে বঞ্চিত করছে পিতৃ¯েœহ ও অধিকার থেকে। উভয়ের প্রতিই এ এক বিরাট বে-ইনসাফী।

৮৫শতাংশ আমেরিকান মনে করে তারা খৃষ্টান। বাস্তবে কিন্তু খুব কমই ধর্মানুসারী পাওয়া যাবে। কিছু খৃষ্টান দাবী করে যে খৃষ্টধর্মের শিক্ষা অনুসারে সকল মানুষের জীবন পবিত্র এবং গর্ভপাত হত্যাকান্ডের শামিল। অন্যরা মনে করে খৃষ্টধর্মে নারীর অধিকারের সম্মান জানানো হয়েছে। নারী তার নিজ শরীরকে যা ইচ্ছা তাই করতে পারে। কিছু লোক মনে করে খৃষ্টধর্ম সমকামিতার বিরোধী, আর কিছু লোক মনে করে সমকামিতায় কোন দোষ নেই। এরা সমকামিদের বিবাহ উৎসব পালন করে থাকে। পাশ্চাত্যে ইহুদী ধর্মের অবস্থা তদ্রƒপ। এদের কেউ কেউ চরম উদার নীতিবাদে বিশ্বাসী। আবার কেউ কেউ নানা রকম আচার অনুষ্ঠান নিয়ে ব্যস্ত।

যুক্তরাষ্ট্রের শহরগুলোতে দুর্নীতি সন্ত্রাস ক্রমেই বৃদ্ধি পাচেছ। সরকারী নীতি বলছে যে, এসব নিয়ন্ত্রণের জন্য পর্যাপ্ত কর্মী বাহিনীর অভাব। কিন্তু নৈতিক বিপর্যয় যে মারাত্মক আকার ধারন করেছে তা সকলেই স্বীকার করছে। কিছু কিছু বুদ্ধিজীবি মত প্রকাশ করছেন যে, এই নৈতিক অবক্ষয়ের কারণ হলো উদার নৈতিক মতাদর্শ। কিছু সংখ্যক রাজনৈতিক, দার্শনিক, উদারনৈতিক দর্শনের বিরুদ্ধে বই পুস্তকও রচনা করেছেন। ম্যাকিনটায়ার তার গ্রন্থে ধর্মের প্রতি প্রত্যাবর্তনের আহবান জানিয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্র তার নাগরিকদের নৈতিক মূল্যবোধ উপস্থাপনে অক্ষম হয়ে পড়েছে। এই সমাজ নিদারুণভাবে হতাশাগ্রস্থ। দেশের উদারনৈতিক ভিত্তি সমাজের এই ভঙ্গুর পরিস্থিতিতে প্রয়োজনীয় নৈতিক নেতৃত্ব দিতে অক্ষম। তারপরও আশা করার কারণ রয়েছে। অপরাধ ও অনৈতিকতার সমস্যা যতই প্রকট হয়ে উঠছে ততই জনগন উদারনীতিবাদের অসারতা বুঝতে পারছে। জনগন এখন নতুন মূল্যবোধের সন্ধান করছে। মানুষ ধর্মের প্রতি আবারো মুখ ফেরাচেছ, বিভিন্ন ধর্মীয় বই পুস্তক ও পত্র পত্রিকা প্রকাশ পাচ্ছে। প্রাচ্যদেশীয় ধর্মীয় চিন্তাধারার প্রতিও মানুষের আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। অনেক আমেরিকানের মন এখন আধ্যাত্মিক প্রশান্তির জন্য আকুলি বিকুলি করছে। ইসলাম ধর্মের প্রতিও মানুষের দৃষ্টি আকৃষ্ট হচ্ছে। এখন আমেরিকানদের জন্য সময় এসেছে ইসলামের কৃতিত্ব সমূহের প্রতি নজর দেওয়া, ইসলামকে ভালোভাবে অধ্যয়ন করা।

Tag Cloud

<span>%d</span> bloggers like this: