Articles published in this site are copyright protected.

নাজমা মোস্তফা

বাংলাদেশের মানুষ রাজনীতি সচেতন, যদিও বারে বারে কপট নষ্ট রাজনীতির কাছে মার খাচ্ছে। ময়দানে সাধু আর শয়তান যদি লড়েসাধুর নাকানি-চুবানি দশা কমে নাবরং অতি সাধুতার নীরবতায় সেটি বাড়ে। অতি সাধু থাকাও জাতির জন্য বড় সংকট তৈরি করে। স্বাধীনতার পর থেকেই ময়দানে এ জাতি যুদ্ধ থেকেও বড় লড়াই লড়ছে যা তারা অতীতে কখনোই মোকাবেলা করে নাই। যখন বাংলাদেশে ছিলাম তখন একজন খৃষ্টান সম্প্রদায়ের ফ্রিজ মেকানিক ছিলেন তার নাম ছিল পিটার গোমেজ। স্বভাব সুন্দর মানুষটিকে আজো হয়তো অনেকে তার নাম জানবেন। সব সময় বাংলাদেশের রাজনীতির বিতণ্ডা দেখে অকপটে বলতেন আমরা এখন থেকে পাকিস্তান আমলেই ভালো ছিলাম। কারণ পাকিস্তানেও রাষ্ট্র পরিচালনাতে কিছু নীতি নৈতিকতা ছিল যা বর্তমান সময়ে বাংলাদেশে চোখে পড়ে না। ঐ সময়ও দেশে মানুষ নিরাপদ থেকেছেশান্তিতে বসবাস করেছে। আজ স্পষ্ট করবো, কিভাবে নিকট সময়ে রাজনীতিকে কলঙ্কিত করা হয়েছে কিছু চিহ্নিত মিডিয়াতে মনগড়া মিথ্যা প্রচারের মাধ্যমে। সত্যকে স্পষ্ট করা কুরআনের নির্দেশসঙ্গত কারণে এসব স্পষ্ট করা জরুরী।

(১) ভুয়া ভিডিও দিয়ে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে অপপ্রচার করেছেন শেখ হাসিনার উপপ্রেস সচিব আশরাফুল আলম খোকনপ্রচারিত ৩ জুন ২০১৮ তারিখ। ১৯ সেকেন্ডের এই ভিডিওটির শিরোনাম “ম্যাডাম জিয়ার মুখেই শুনুন” নামের ভিডিওতে শোনা যায় খালেদা জিয়া বলছেন, “আপনারা যতই বলেন আন্দোলন আন্দোলনঢাকায় সেভাবে করা সম্ভব হয়নি। এখানে পরিবারের মধ্যে গণ্ডগোল আছে। তারেক রহমানকে তো আপনারা ভালো করেই চেনেনবউ এর সঙ্গেও গণ্ডগোল। বউও চায় ক্ষমতাসেও চায় ক্ষমতা।”

(২) ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭ সালে সংসদে শেখ হাসিনা দাবী করেন জিয়া পরিবারের ১২ মিলিয়ন ডলার পাচারের একটি প্রতিবেদন তার হাতে এসেছে। এর কিছু দিন পর শেখ হাসিনার তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরীর ওয়েবসাইট ওবজারভার ডটকম ও জনকণ্ঠ নামের (প্রশ্নবিদ্ধ পত্রিকা) দাবী করে আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে জিয়া পরিবারের দুর্নীতি নিয়ে একাধিক প্রতিবেদন প্রচার করেছে। তিনি তার ওয়েবসাইটেআরব ভিত্তিক টিভি চ্যানেল গ্লোবাল ইন্টেলিজেন্স নেটওয়ার্ক ও ক্যানাডিয়ান টেলিভিশন দ্য ন্যাশনাল এসব সূত্রের কথা উল্লেখ করেন। জনকণ্ঠও উৎস হিসাবে দুবাই ভিত্তিক টেলিভিশন ও বাংলাদেশ প্রেস অনলাইন এর নাম উল্লেখ করে। ৩০ শে নভেম্বর সোবহান চৌধুরী “খালেদা জিয়ার দুর্নীতি” (Khaleda’s corruption)  শিরোনামে একটি ভিডিও প্রকাশ করেনসূত্র হিসাবে উল্লেখ করেন দুবাই ভিত্তিক টেলিভিশন চ্যানেলটিকে।

(৩) জনকণ্ঠ(?) ৯ ডিসেম্বর ২০১৭ তারিখে একটি খবর ছাপে যে খালেদা ও তারেক সৌদি বিনিয়োগের মুনাফায় জঙ্গী তৎপরতায় যুক্ত থাকলেও ভারত ও সৌদির যৌথ তৎপরতার দুর্নীতি বিরোধী তদন্তে বিভিন্ন দেশের সরকার প্রধানদের জড়িত থাকার প্রমাণ বেরিয়ে এসেছে। উল্লেখ্য খালেদা ও তারেক যথাক্রমে ১২শ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করেছেন যার এক অংশ যেত জঙ্গী অর্থায়নে ও মৌলবাদীদের পৃষ্ঠপোষকতায়।

(৪) সৈয়দ বোরহান কবিরের ‘বাংলা ইনসাইডার’ এসব কাজে অগ্রপথিক। তিনি তার ‘বাংলা-ইনসাইডার ডট কমে’ প্রচার করেন দুর্নীতিতে জিয়া পরিবার বিশ্বে তৃতীয় (১০ অক্টোবর ২০১৭)। প্রথম হলেন পাকিস্তানের মুসলিম লীগের সভাপতি নেওয়াজ শরিফ ৪০০ কোটি ডলারদ্বিতীয় উত্তর কোরিয়ার একনায়ক কিম জং উন আর তৃতীয় বেগম খালেদা জিয়া ২৫০ কোটি ডলার অবৈধ সম্পদ।

(৫) মুখরা প্রধানমন্ত্রী তার চরদের দ্বারা এসব সাজালেও যখন বাংলাদেশের মিডিয়া নীরব ছিল তখন তিনি সাংবাদিকদের উপর বিষোদগার করে বলেন আমরা তন্ন তন্ন করে দেখেছি শুধু দুটি চ্যানেল ও দুটি পত্রিকা নিউজটা করেছে। তার কিছু পালিত সাংবাদিক আছেন যারা সারাক্ষণ টকশো গরম করে রাখেনএটি জাতি দেখে ও জানে। তিনি বাকীদের ঘুষ খাওয়ার খোটা দেনতখন অনলাইন সংবাদ সংস্থা বিডিনিউজ২৪ ডটকম ও সাংবাদিক গোলাম মর্তুজা জবাবে জানান শেখ হাসিনার সূত্রগুলোর প্রকৃত কোন সন্ধান না পাওয়ায় তারা এসব এড়িয়ে গেছেন। তারপরও কিছু পত্রিকা এসব ভুয়া খবর ছাপিয়েছে সরকারী দাপটে। সরজমিনে এমনও দেখা গেছে ইকবাল সোবহান চৌধুরীর ভিডিওতে বক্তার উচ্চারিত কথার সাথে ঠোটের অমিল। তাকে বার বার সূত্রের ঠিকানা দিতে বললেও তিনি নীরব থাকেন। উল্টো আদালতের শরণাপন্ন হবার যুক্তি দেখান। তারা জানে আদালত তাদের মামলাও নেবে নানড়বেও না।

(৬) এসব প্রতিবেদনে তারেককে খুব শক্তভাবে আক্রমণ করা হয়। বলা হয় জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব তারেক রহমান প্রতিটি সরকারী ক্রয় ও নিয়োগে ঘুষ গ্রহণ করতেন। তারেক নিজেই ছিলেন বাংলাদেশের রাজনীতির অস্থিতিশীলতা ও দুর্নীতির যোগানদাতা। দুর্নীতিগ্রস্ত থাকার পরও তত্ত্বাবধায়ক সরকার তাকে মুক্তি দিয়েছে চিকিৎসা করার জন্য। তারেক রহমান বড় বড় ব্যবসায়ীদের হুমকি দিয়ে চাঁদা আদায় করতেনবিদেশী প্রতিষ্ঠান থেকেও তিনি কমিশন আদায় করতেন। এসব ছিল তার নিয়মিত ব্যবসাতারেক ও তার ভাই কোকোর ঘুষ গ্রহণের কথা এসেছে। বিদেশী কোম্পানিকে ডলারে আর দেশী কোম্পানিতে টাকাতে ঘুষ নিতেন। জিয়া অরফানেজ থেকে তিনি ৪১ লাখ ৫০ হাজার ডলার ঘুষ নিয়েছেন। এতে বাংলাদেশ আমেরিকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমেরিকার দৃষ্টিতে মুসলিম মডারেট হিসাবে দেশকে বিনষ্ট করেছে।

(৭) এসব বিনিয়োগের তথ্য কিভাবে সামনে আসলো তার যুক্তি হিসাবে বলা হয় ভারতের সাবেক আইপিএস কর্মকর্তা শান্তানু মুখার্জি তার ৬ ডিসেম্বর তারিখে প্রকাশিত প্রবন্ধে বলেনতারেক রহমান দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত লাখ লাখ ডলার বিভিন্ন দেশে বিনিয়োগ করেছেন। এর এক বড় অংশ বিনিয়োগ করা হয়েছে সৌদি আরব ও পশ্চিম এশিয়ার অন্যান্য দেশে। ভারতের নিরাপত্তা ধ্বংসে তিনি আন্ডারওয়ার্ল্ডের মাফিয়া চক্রে জড়িত থেকে ভারতকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টায় জড়িত। বিএনপি জামাতের সময় থেকেই এরা মৌলবাদ ও সন্ত্রাসকে লালন করে।

(৮) অল্প দামে কেনা সংবাদগুলি দালালদের সাজানো। এ ছাড়াও “খালেদার মানি লন্ডারিং নিয়ে বোমা ফাটালো আন্তর্জাতিক মিডিয়া” (৩০ নভেম্বর ২০১৭বাই অবজারভার বিডি ডট কম)/ আটক সৌদি শাহজাদাদের দুর্নীতির সঙ্গে খালেদা তারেকের নাম? (৩০ নভেম্বর ২০১৭জনকণ্ঠ)/ বিএনপি নেতাদের বিদেশে থাকা সম্পদের তদন্ত চলছে: সংসদে প্রধানমন্ত্রী” (১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭বাংলা ট্রিবিউন)। প্রণব মুখার্জিরা বাংলাদেশে জন্ম নিয়ে কিভাবে এ দেশের কলিজাতে কামড় দিয়ে ভারত

বন্দনা কাজে জড়িত থেকেছেনতা তার গ্রন্থে তিনি নিজেই স্পষ্ট করেছেন। আজ অক্টোবরের ১৪ তারিখে দেখি ভিপি নূরকে ধর্ষক বানাতে শেখ হাসিনার ঐ উপ সচিব আশরাফুল আলম খোকন লাইভে কমেন্ট করে তাকে ধর্ষক বানানোর প্রক্রিয়াতে জড়িত আছেন। যিনি খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মিথ্যায় শক্তদাগে জড়িত।

(৯) ভারত খুব সহজে বাংলাদেশের কিছু মুসলিম মোহাজিরকে তাদের দালাল বলে অপকর্ম করাতোএদের একজন ছিলেন এরশাদ। দালালীতে তাঁর সম্পৃক্ততার অনেক তথ্য প্রমাণ রয়েছে। আর প্রিয়া সাহার মত বেশ কিছু হিন্দুরা গোপনে বা প্রকাশ্যেই দেশবিধ্বংসী কাজ করে চলেছে। এর কারণ এদের দলে ভিড়ানো ভারতের জন্য বেশী সহজ। তারা অনেকে থাকে এ দেশে আর সম্পদ পাচার করে ভারতে। এরা প্রকৃতই নির্বোধসারা জীবন নিজের সাথে, দেশের সাথে প্রতারণা করে গেল। যে কোন মানুষই যারা এসব করছে তারা বিবেকের কাছে চিরস্থায়ী ইহ ও পরকালের আসামী।

লক্ষ্য করলে দেখা যায়, এই তথ্য প্রমাণগুলি সব সময় ভারত বন্দনা ও বাংলাদেশকে জঙ্গি দেশ হিসাবে তুলে ধরতে চেষ্টা চালাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য বিষয়ক উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী সম্পাদিত দ্য ডেইলি অবজারভারে ১ ডিসেম্বর ২০১৭ সালে আরব ভিত্তিক টিভি চ্যানেলের সূত্রে গ্লোবাল ইন্টেলিজেন্স নেটওয়ার্ক (জিআইএন) (এ নামে কোন গণমাধ্যম পাওয়া যায় নি) ও কানাডার টিভি চ্যানেল দ্য ন্যাশনাল এর কথা বলে (ওরকম সংবাদ মাধ্যমও পাওয়া যায়নি। কানাডার টিভি চ্যানেল পাওয়া গেলেও সেখানে খালেদা সংক্রান্ত কোন খবর পাওয়া যায়নি। আমরা জানি ২০০৪ সালের ২১ শে আগস্টের বোমা হামলায় তারেক রহমানকে প্রথমে যুক্ত না করলেও বহু পরে তাকে আসামী করা হয়। ঐ হামলাটিও ছিল হাসিনার মনগড়া সাজানো মানুষ নিধনের ভয়ংকর হত্যাযজ্ঞ। এর উপর প্রামাণ্য লেখাও (https://nazmamustafa.wordpress.com/2015/08/24/একুশে-আগষ্ট-২০০৪-সচেতনের/) আমার ব্লগে (Nazma Mustafa’s Blog) বর্তমান। ১৯৯৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর তারিখে দলবলসহ প্রথমে প্লেনে ও পরে ট্রেনে উত্তরবঙ্গে নির্বাচনী প্রচারণার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। পথে মদন নামে তার এক কর্মচারীর পরামর্শে পিস্তল দিয়ে কয়েক রাউন্ড গুলি করা হয় অন্য কামরাতে ঘুমে ঢলে পড়া সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে। হাস্যরসের মাধ্যমে হাসিনার নির্দেশে প্রচার করা হয় তাকে মারার চেষ্টা করা হচ্ছিল। এভাবে তিনি প্রায়শই বলতেন তাকে ১৯ বার মারার চেষ্টা করা হয়েছে। ঐ ঘটনায় পরদিন হরতাল ডাকা হয়। ঐ সময় এভাবে ১৭৩ দিন হরতাল হয় (আমার ফাঁসি চাইমতিউর রহমান রেন্টুর ৭৩,৭৪,৭৫ পৃ: দ্রষ্টব্য)।

আয়নাবাজিতে খুব দক্ষ অবৈধ পথে আসা এই সরকার। কথায় কথায় সম্মানিত লোকজনকে কটাক্ষ করা, মানুষকে আক্রমণ করে কথা বলা তাঁর স্টাইল। শুনেছি বিদ্যুতের স্লিপে নাকি লেখা থাকে “শেখ হাসিনার উদ্যোগ, ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ”প্রতিবছর প্রশ্ন ফাঁস যে সরকারের অর্জন তারা প্রচার করে “শিক্ষা নিয়ে গড়ব দেশশেখ হাসিনার বাংলাদেশ”। সাংবাদিকরা ধমক খায় নসিহত শুনে “আমি তো পত্রিকা পড়ে দেশ চালাই নাদেশকে ভালোবেসে দেশ চালাইবাবার কাছ থেকে শিখেছি।” অবাক হয়ে ভাবি শেখ মুজিব তার মেয়েকে এসব আয়নাবাজি কি সত্যিই শিখিয়ে গেছেন?

১৪ অক্টোবর ২০২০ সাল।

Tag Cloud

%d bloggers like this: