Articles published in this site are copyright protected.

নাজমা মোস্তফা
এককালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বলা হতো বলে শুনেছি। এরপর স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে একে ডাকাতের গ্রাম বলতেও শুনেছি। এখন দেখছি গোটা দেশই ডাকাতের হাতে জিম্মি হয়ে আছে। ৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ এর রাতে বাংলাদেশ ব্যাংক ডাকাতি হয়। অসংখ্য অঘটনের পর এ কাজটি মাত্র এক ধাপ ডাকাতি। এ ধারার অসংখ্য ডাকাতির নমুনা দেশে চলমান আছে। এটি ঘটানো হয় সাইবার হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে ঠিক এমন সময়, যখন এর মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশ, আমেরিকা ও ফিলিপাইনে সরকারী ছুটি কার্যকর ছিল। যার জন্য হ্যাকাররা একটি বাড়তি সময় পায়। রিজার্ভ চুরির কথা অনেকেই অনেক কিছু জেনেছেন। সম্প্রতি মেজর দেলোয়ারের ইউটিউবে প্রকাশিত বক্তব্য থেকেও জাতি আবারো জানলো রাকেশ আস্থানা গুটি চালকে পাকাপোক্ত করার উত্তম হাতিয়ার ছিল । এটি অনেকেই জানতেন, তার আচরণে অনেক আপত্তিকর অবস্থান লক্ষ্য করা গেছে। তারপরও মেজর দেলোয়ারের বলাটা বাড়তি দলিল হয়ে রইলো। রাকেশ আস্থানা হাসিনাপুত্র জয়ের বন্ধু। কয় দিন পর পর জয় ফেইসবুকে এটা ওটা চমক লাগানো কথা লিখেন। ২০১৮ সালের ২৩ মে “The Diplomat” ম্যাগাজিনে একটি কলাম লিখেন যার শিরোনাম ছিল, “Bangladesh: ‘Disappeared’ Reappear All the Time”। এখানে তিনি বলতে চেয়েছেন বাংলাদেশে একটিও গুমের ঘটনা ঘটেনি। সব মিথ্যা, বানোয়াট, রূপকথা ও গালগল্প মাত্র। তার ভাষায় বিরোধীরা সব অপরাধী হওয়াতে তারা লুকিয়ে থাকে এবং সফল পুলিশরা তা খুঁজে বের করতে সমর্থ হয়। এই পুলিশ বাহিনী এতই দক্ষ যে জাতিসংঘ নাকি যার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। জয় তার মা অবৈধ প্রধানমন্ত্রীর মতই মুখর।

কিছু খবরের শিরোনাম : যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির মামলা খারিজ (২৩ 

মার্চ ২০১৯)। একে একে অবসরে যাচ্ছেন সন্দেহভাজনরা (৪ ফেব্রুয়ারি বণিকবার্তা)। দশটি কেলেঙ্কারিতে ২২,৫০২ কোটি টাকা লোপাট (৯ ডিসেম্বর ২০১৯)। বাংলাদেশ ব্যাংকের অদক্ষতা ও অবহেলাতে অর্থচুরি (১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯ প্রথম আলো)। শীর্ষ আট কর্মকর্তা দায়ী (১৪ জানুয়ারি ২০১৯ যুগান্তর)।Bangladesh Bank heist was state sponsored: US official (31 March 2018) এটি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় রিজার্ভ চুরি: এফবিআই ১০ মার্চ ২০১৮) নয়া দিগন্ত। রিজার্ভ চুরির হোতারা বাংলাদেশ ব্যাংকের ভিতরেই আছে (২৩ মার্চ ২০১৮) বিবিসি বাংলা। রিজার্ভ চুরির সাথে জড়িতরা চিহ্নিত (৮ নভেম্বর ২০১৭) যুগান্তর। রিজার্ভ চুরির হোতারা ভারতে (২৮ অক্টোবর ২০১৭) দৈনিক আমাদের সময়। রাকেশ আস্থানার উপস্থিতির রহস্য ভাংতে পারছে না সিআইডি (২৪ জুলাই ২০১৭) বণিক বার্তা। বিশেষজ্ঞদের অভিমত: ব্যাংকিং খাতে লুটপাটে সহযোগিতা করছেন অর্থমন্ত্রী (৪ জুন ২০১৭) সম্পাদক ডটকম। সবার শেষে একটি কলাম ছাপা হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির দায়ে ফিলিপিন্স ব্যাংক কর্মকর্তার কারাদণ্ড, বাংলাদেশে এই মামলার অগ্রগতি কতদূর? (১০ জানুয়ারি ২০১৯) বিবিসি বাংলা।

এর সুবাদে ডঃ ফরাস উদ্দিনের তদন্ত প্রতিবেদন বলে গভর্নর আতিউর রহমান গর্হিত কাজ করেছেন রিজার্ভ চুরির ঘটনাকে চেপে রেখে। চুরি হয় ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার। তদন্তে আট কর্মকর্তাকে অপকর্ম, গাফিলতি ও অবহেলার জন্য দায়ী করা হয়েছে বলে শোনা যায়। আমরা অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিতের বরাতে শুনেছি যে, এসব প্রকাশ করা হবে না। গণমাধ্যমে বিভিন্নভাবে তাদের নাম প্রকাশিত হলেও অপরাধীরা বহাল তবিয়তে কর্মরত আছেন, বরং অনেকের পদোন্নতি হয়েছে। ২০১৫ সালের আগস্ট-অক্টোবর থেকেই সুইফটটি অরক্ষিত করে রাখা হয়। সম্প্রতি তদন্ত প্রতিবেদনটির মূল অংশ যুগান্তরের হাতে

আসাতে কিছুটা জানা গেল। রিজার্ভ চুরিতে অন্তত দুইজন কর্মকর্তা সম্পর্কে গভীর সন্দেহ রয়েছে। ৭ ফেব্রুয়ারি ডেপুটি গভর্নর আবুল কাশেমকে জানানো হলে তিনি সরকারকে অবহিত করতে লিখিত দেন। তারপরও গভর্নর আতিউর রহমান এ নিয়ে কঠোর গোপনীয়তা রক্ষার নির্দেশ দেন। ঐ সময় আমরা গভর্নরের মুখে শুনেছি তিনি বলেছেন যে, প্রথমেই বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীকে জানালে তিনি এটি চেপে রাখতে বলেন। সুইফটের নিরাপত্তা বেষ্টনী সরিয়ে ফেলা হয় ২০১৫ থেকেই, আগেই বলেছি। গণমাধ্যমে পরবর্তীতে প্রকাশিত হয়, যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির মামলা খারিজ হয়ে যায়। নিউইয়র্কের ম্যানহাটন সাউদার্ন ডিসট্রিক্ট কোর্ট গত ২০ মার্চ বাংলাদেশ পর্যাপ্ত তথ্য প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি বিধায় এটি খারিজ করে।

২০১৬ সালের ৫ ও ৬ ফেব্রুয়ারি (শুক্র ও শনিবার) ছিল বাংলাদেশের সাপ্তাহিক ছুটি। ৬ ও ৭ ফেব্রুয়ারি নিউইয়র্কের সাপ্তাহিক ছুটি, আর ৬, ৭ ও ৮ ফেব্রুয়ারি ফিলিপাইনের সাপ্তাহিক ছুটি ও চীনা নববর্ষের সাপ্তাহিক ছুটি। ফরাস উদ্দিন কমিটির প্রতিবেদন কোন কারণে অকার্যকর থেকেছে। অনেকটাই বিডিআর বিদ্রোহের মত এই ঘটনারও তদন্ত রিপোর্ট গোপন রাখার প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। উল্লেখ্য গত দশ বছরে ব্যাংকিং খাতে ১০টি বড় কেলেঙ্কারির ঘটনায় ২২ হাজার ৫০২ কোটি টাকা গচ্চা দিতে হয়েছে। এসব ঘটেছে সরকারী ব্যাংক সমূহে। সোনালী ব্যাংকের হল-মার্ক দিয়ে শুরু হলেও জনতা ব্যাংকে বড় ধ্বস নামে। এভাবে বেসিক ব্যাংক, ফারমার্স ব্যাংকের অনিয়ম আর দুর্নীতির ঘটনা অনেক লাগাতার দুর্ভোগের সাথে জড়িয়ে থাকা বাংলাদেশ, উন্নয়নের জারিজুরি। প্রশ্ন হচ্ছে বিডিআর বিদ্রোহ নাম দিয়ে বিডিআর ধ্বংসের যে বিশাল ঘটনা সংগঠিত হয়েছে, তারপর আর এ সরকারকে বিশ্বাস করার কিছু নেই। একের পর এক দুর্ঘটনা এসব প্রশ্নকে বাড়তি যুক্তি হিসেবে সামনে নিয়ে

আসছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে গভর্নর আতিউর রহমানের গোপনীয়তা এবং বিষয়টিকে ধামাচাপা দেয়ার কসরত হিসাবে দেশবাসীকে না জানিয়ে ঐ সময়ই তার ভারত ভ্রমণ জাতিকে আরও স্তম্ভিত করেছে। সবচেয়ে আশ্চর্যের কথা হলো, এমন দুর্ভোগেও বাংলাদেশ ব্যাংক আভ্যন্তরীণ কোন তদন্ত কমিটি গঠন বা বিভাগীয় কোনো উদ্যোগ নেয়নি। ফিলিপিনের কিছু কর্মকর্তা বিশ্বাস করেন, যারা এ অপরাধের সূচনা করেছিল তারা বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভেতরের লোক। সিআইডি বলছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন অনেকেই শুধু গাফেল ছিলেন না, বরং ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থেকে সরাসরি অপরাধেও জড়িত। নাম প্রকাশ না করেও একজন কর্মকর্তা বলেন, উচ্চ পর্যায়ের অনেকেই জড়িত। এদের অপরাধ তদন্তেও ধরা পড়েছে, আসামী ধরা পড়লে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ফেঁসে যাবেন। দৈনিক আমাদের সময় বলেছে, চুরির মূল হোতারা ভারতে অবস্থান করছেন। বিশ্বস্ত সূত্রের বরাতে ব্রিটিশ ডেইলি মেইল অনলাইন এক প্রতিবেদনে তা প্রকাশ করেছে। এরা অর্থ হাতিয়ে নেয়ার জন্য এক বছরেরও বেশী সময় থেকে একাধিক ব্যক্তির পরিকল্পনাতে ছক করে তা বাস্তবায়ন করে (২৮ অক্টোবর ২০১৭)।

অনেকে প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিচার চায়। এ সরকারের কাছে কিসের বিচার? সে নিজেই অপরাধী। সচেতনদের ধারণা সরকার নিজেই মেজর সিনহাকে মেরেছে, সাগর-রুনিকে হত্যা করেছে, বিডিআর বিদ্রোহের নামে বিডিআরকে ধ্বংস করেছে। সরকার অবৈধ পথে এসেছে, উদ্দেশ্য গদি ধরে রাখা আর ঐসব কাজ সমাধা করা। খালেদা জিয়া একজন গৃহবধূ থেকে অসাধারণ অর্জন দিয়ে তার রাজনীতির ময়দানকে আলোয় আলোয় ভরিয়ে দিতে পেরেছেন বলেই হাসিনার মনের জ্বালা দ্বিগুণ থেকে বহুগুণ। সদিচ্ছা থাকলে মানবিকতার চাষ করলে এই মুজিব কন্যাও জনতার বুকে স্থায়ী আসন গাড়তে পারতেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য তার। মিথ্যায় মিথ্যায় তার রাজনীতির শুরু থেকে শেষ। অতীতে তিনি রাজনীতিতে কখনোই ছিলেন না। জাতি জানেন সব। তারপরও তিনি বলেন তিনি নাকি ইডেন কলেজেই ছাত্রলীগের নেত্রী ছিলেন। এসব যে মিথ্যাচার ছিল সেটিও মুক্তিযোদ্ধা রেন্টুর গ্রন্থে স্পষ্ট। আর যারা ময়দানে আছেন তারা কি সত্যটা জানেন না? নিজের ডাকাতি ঢাকতে সারাক্ষণ প্রতিপক্ষকে এতিমের টাকা চোর, এতিমের টাকা চোর বলে লাফালাফি করে নিজের ডাকাতদের উপঢৌকন ঘুষ দিয়ে সামলাবার আপ্রাণ চেষ্টা করেন। কিভাবে ভৌতিক দানবরা ইলিয়াস আলী, সালাউদ্দিন, চৌধুরী আলমদের মত শত শত রাজনৈতিক কর্মীকে গুম করে? অবৈধ প্রধানমন্ত্রীর বুদ্ধিলোপ পাবার এসব বুদ্ধি কিভাবে তার মগজে ঢুকলো? এটি ঠিক, অনেক দিন থেকে বাংলাদেশে রামরাজত্ব কায়েম রাখতে পেরেছেন মুজিবকন্যা হাসিনা। পারবেন কি আজীবন এটি টিকিয়ে রাখতে? তার বিবেক কেমন করে এত অধঃপাতে নামলো? আর বর্তমানে চরম ধ্বংসের শেষ অপেক্ষার সময় পার হচ্ছে। তার পরিচয় তিনি নিজে, হিংসার এক কুশপুত্তলিকা। তার প্রতিটি কথাই হিংসার বাণী ছড়ায়, এর জবাব তিনি নিজেই ব্যতিক্রমী উদাহরণ। অপকর্মকারিরা বার বার অপকর্ম করে। হয়তো এর কারণ এরা শিখে না সৎকর্ম কি? অবস্থার প্রেক্ষিতে ক্রুদ্ধ হাসিনার একমাত্র যুক্তি ঐ একটাই; জাতিকে কেন জিয়াউর রহমান একবার নয়, বরং বার বার উদ্ধার করতে ময়দানে! এ জাতির উদ্ধার হওয়া দেখতে তারা অভ্যস্ত নয়, তারা বিড়ম্বনা চায়। হাসিনার সহোদররা শেখ কামাল শেখ জামালরা অস্ত্র হাতে ময়দান গরম করে রাখতেন। ধারণা হয়, ওদের দাপট বহাল থাকলে এতদিনে দেশ অতল গহ্বরে নিপতিতই হতো। চরম হিংসুটে মানসিকতায় শেখ হাসিনার সব কাজের বড় কাজ দেশের সবচেয়ে প্রথম ও প্রধান যোগ্য পরিবারকে ডাকাত বানাতেই হবে। তার পরিবারের সদস্যরা বহির্বিশ্বে কারাগারের আসামী হয়ে সময় পার করছে। বাংলাদেশের মিডিয়া এসব সত্য প্রকাশের অধিকার হারিয়েছে। তারপরও ঐ প্রধানমন্ত্রীর টনক নড়ে না। এবারও ৪৮ বছরের সমান ব্যাংকঋণ এ বছরই নেবে সরকার (৬ মার্চ ২০২০) সূত্র: দেশ রূপান্তর। তারপরও কি জোটবদ্ধ ডাকাতদের হাত থেকে এ জাতির শেষ রক্ষা হবে? বাংলাদেশের ৯০% মুসলিমরা আল্লাহর উপর ভরসা হারাতে পারে না। তাই এসব ফেরাউনের অত্যাচারে যুগে যুগে দেশ-সমাজ পতিত হয়েছে, তারপরও মানুষ মাথা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে, মুক্তির স্বপ্ন দেখেছে। আজও তার ব্যতিক্রম হবে কেন? মানুষ বাঁচবার আশায় বুক বেধে আছে।

Tag Cloud

%d bloggers like this: