Articles published in this site are copyright protected.

নাজমা মোস্তফা

“ফতোয়া” শব্দটি সাধারণ অর্থে ধর্ম বিষয়ক অবস্থান নির্ণয় করতেই ব্যবহার করা হয়। এটি মুসলমানেরা তাদের ধর্মের নিয়ম কানুন হিসাবে দরকারে এর ব্যবহার করছেন। এ হিসাবে এর গুরুত্ব অনেক বেশী এবং ধর্মের সিলেবাস বলতে প্রধাণত মূল গ্রন্থটি স্বয়ং আল্লাহর কাছ থেকে এসেছে, সেটি আল কুরআন। সে হিসাবে একমাত্র আল্লাহই হবেন প্রকৃত ফতোয়ার মালিক মোক্তার। ইসলাম অর্থ শান্তি, সালাম বা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ। এই মূল নীতির উপরই ইসলাম সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল। এখানের নবী ছিলেন এ ধর্মটির এক প্রামান্য প্রতিনিধি এ কারণে যে তার মাধ্যমেই এ ধর্মটি আস্তে আস্তে সুদীর্ঘ ২৩ বছরে নাজেল হয়। তিনি ছিলেন এক জীবন্ত বাস্তবতা। তাকে জনতারা প্রধান নির্দেশক বলেই মানতো। তাই সেদিনের নেতা, লিডার বা নির্দেশক বলতে তার অনুসারীরা তাকেই বুঝতো। ইসলামের এ যাত্রা একদম সেদিন থেকেই শুরু হয়নি এটি শুরু হয় সেই প্রথম নবী আদম (আঃ) থেকেই। তাই এটি কোন নতুন ধর্ম নয়, এটি অনেক পুরানো ধর্ম। ধাপে ধাপে এটি আগায় এবং সবার শেষ ভারসন হিসাবে কুরআন আমাদের হাতে এসেছে এর পূর্ণতা নিয়ে মাত্র চৌদ্দশত বছরের কিছু আগে। এ গ্রন্থেই সে পরিপূর্ণতার সে আধুনিকতার সবটুকু বাণীই বিলি করা হয়েছে।

এরকম একজন নবী চলে যাবার পর পূর্বযুগেও দেখা গেছে তার অনুসারীরা অনেক অনাচার করেছে এমন কি সম্পূর্ণভাবে ভুলে গেছে তাদের পূর্ববর্তী সত্যকে এবং সম্পূর্ণ মিথ্যার মাঝে ধর্মকে দাঁড় করিয়ে মিথ্যা রুপরেখায় ধর্মকে সাজিয়ে নিয়েছে। সত্য বাণী এর মাঝে যত তাড়াতাড়ি পারে তারা ভুলে যায়, এটিই সব যুগেরই নীতি। ওদের থেকে আমাদের এ শেষগ্রন্থের ব্যতিক্রম এইটুকু যে এটি কেউ নড়াতে সরাতে বা বদল করতে পারবেনা, যা অতীতে এ কাজটি সবাই করেছে। এরকম একটি খবরের ধারণাতে শয়তান নামের ছলবাজ বেশ বড় একটি ধাক্কা খায়। কুরআন বলে “আর আমার বান্দাদের বলো যে তারা যেন কথা বলে যা সর্বোৎকৃষ্ট। নিঃসন্দেহ শয়তান তাদের মধ্যে বিরোধের উসকানি দেয়। শয়তান মানুষের জন্য নিশ্চয় প্রকাশ্য শত্রু” (বনি ইসরাইলএর ৫৩ আয়াত) তারপরও সে কিন্তু বসে নেই, সেটি কুরআন বলে। সে ব্যাপারে আমাদের তেমন কোন সচেতনতাও নেই। নবীর যুগে নবীই ছিলেন কুরআন প্রচারে নিবেদিত আর নবী মারা যাবার পরও ঐ সময়টিতে কুরআনের বাইরে কাউকে ফতোয়া দিতে দেখা যায়নি। একদম যে কেউ দেয়নি তাও নয়, তবে বড়ই শক্ত প্রহরা ছিল সে সময় তার প্রমাণ পাওয়া যায়, পরিপূর্ণ ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কাছাকাছি সময়টিতে কেউই এসব নিয়ে মোটেও ব্যবসা করতে পারত না। তাছাড়া প্রতিষ্ঠার যুগে আরবে কোরাইশের অত্যাচারে মুসলমানরা কি পরিমাণ যাতনার সময় কাটিয়েছেন তা যারা প্রকৃতই এর ভেতর ঢুকেছেন তারা এর খবর জানেন। তাছাড়া ইসলামের মহান মানবতার বানী, উদারতার চমক খুব অল্প সময়েই ভূগোলের অনেক বিরাট অংশ দখল করে নেয়। চরম অত্যাচারী জাতি আরবের কোরাইশদের করায়ত্বে থাকা গোটা মক্কা বিজিত হয় গর্বের সাথে দর্পের সাথে কোথাও সমস্ত আরবে এক ফোটা রক্তও ঝরেনি, বলা হয় রক্তপাতহীন বিজয়। ইসলাম এরকম একটি ফতোয়াবাজ অত্যাচারী ধর্ম হলে এর বানী এত দ্রুত কোন সময়ই বিরোধীদেরে কাছে টানতো না।

নবী গত হবার পরই ইসলামের শাসনভার পড়ে খলিফাদের হাতে। এরা প্রত্যেকেই ছিলেন সত্যের সৈনিক, তাদের অতন্দ্র প্রহরায় এসব অপরাধ মানুষ যখনই করেছে; একটু বাড়াবাড়ি করলেই কঠিন শাস্তি ভোগ করেছে। যার জন্য সে সময়টিতে এসব মনগড়া ফতোয়া দিতে মানুষ কখনোই উৎসাহ বোধ করতো না। সে সময় যদি কোন বিচারক কোন অন্যায় করতেন তাকেও বেত্রাঘাত করা হত, কঠিন শাস্তি পেতে হত। এটি যেন ছিল সে যুগের এক সহজ নিয়ম। নবম হিজরীতে তামীম নামের একজন খৃষ্টান সন্ন্যাসী, যিনি প্যালেষ্টাইনের অধিবাসী ছিলেন। ইসলাম গ্রহণ করার পর খৃষ্টানদের পুরানো বানোয়াট কাহিনী, জগতের সৃষ্টিতত্ত্ব এবং নবীগণের কেচ্ছা কাহিণী এসব তার নিজের সংস্কার ও বিশ্বাসমত মুসলমানদের মাঝে বর্ণনা করেন। এজন্য হযরত ওমর তাকে দোররা মারার হুকুম দিয়েছিলেন। মসজিদে প্রদীপ জ্বালাবার প্রথাও এই তামীম প্রথম প্রচলন করেন। হযরত ওসমানের শহীদ হবার পর তিনি সিরিয়ায় চলে যান (এসাবা ৮৩৩ নং ও একমাল প্রভৃতি)। এরকম নিরাপত্তায় এদের হাতে সংরক্ষিত একটি ধর্মের নাম ছিল ইসলাম, আল্লাহর ধর্ম। অনেক সময় কাব্য করে বলা হয় যে রাস্তা ছিল চুলের চেয়েও চিকন এবং ছুরির চেয়েও ধারালো, বাস্তবে এ এক সহজ সরল পথ। কবি গোলাম মোস্তফার সুরা ফাতিহার অনুবাদের ভাষায় “সরল সঠিক পূন্য পন্থা মোদেরে দাও গো বলি” কিন্তু ছলবাজের জন্য এটি বড়ই কঠিন, সত্য সাধকদের জন্য সহজ ধর্ম। এবার ধর্মীয় গবেষকদের চোখে পড়া গবেষনাতে পাওয়া কিছু মূল্যবান যুক্তি আনছি।

মোল্লা আলী কারী হানাফি “মউজুয়াতে কবির” পুস্তকে “ওয়াজকারীদের অবস্থা” থেকে সংগৃহীত তখনকার অবস্থা সম্বন্ধে আলোকপাত করা মাত্র কয়টি পয়েন্ট এখানে উদাহরণ হিসাবে আনছি।

(১)        হযরত আবু বকর ও ওমর কারো মুখে কোন হাদিস শুনলে বর্ণনাকারীকে সেই হাদিস সংক্রান্ত অন্য সাক্ষী উপস্থিত করতে আদেশ করতেন।

(২)       অধিকাংশ কথক ও ওয়ায়েজ তফসির ও তার রেওয়ায়েত এবং হাদিস ও তার মর্যাদার ক্রম সম্বন্ধে অজ্ঞ ছিলেন।

(৩)       এদের সম্বন্ধে একটি অসুবিধা এই যে এরা অজ্ঞ জনসাধারণের কাছে এমনভাবে কথা বলে যে, জ্ঞান বুদ্ধির দ্বারা যার মর্ম উদ্ধার করা অসম্ভব। অনেক সময় প্রামাণ্য ও সহী হলেও ঐ সব উক্তি দ্বারা নানা প্রকার বাতিল আকিদা ও ভ্রান্ত বিশ্বাস সৃষ্টি হয়ে যায়।

(৪)       ইমাম আহমদ কৃত মুসনাদে, সহী সনদে, তাবরানীতে ও অন্যান্য বহু হাদিস গ্রন্থে তামীমদারীর ঘটনা বিবৃত হয়েছে। তামীম হযরত ওমরের নিকট ওয়াজের অনুমতি চাইলে প্রথমে তিনি অনুমতি প্রদান করেননি। শেষে তার বিশেষ অনুরোধে, ওমর তাকে একবার মাত্র অনুমতি দিয়েছিলেন। সেই একবার অনুমতি দেয়ার পরই তাকে তা বন্ধ করতে নির্দেশ দেয়া হয় এবং এ কৃত অপরাধের জন্য তাকে শাস্তি দেয়া হয়।

(৫)       আবু দাউদ ও নাসাই পুস্তকদ্বয়ে সহী সনদে বর্ণিত হয়েছে যে, সাহাবীদের সময় খলিফা বা তার নির্বাচিত ব্যক্তিগণ ব্যতীত অন্যের পক্ষে এই প্রকার ওয়াজ করা নিষিদ্ধ ছিল।

(৬)      তাবরানীর এক রেওয়ায়েতে বর্ণিত হয়েছে ইসরাইল বংশীয়রা এই প্রকার পৌরানিক গল্প গুজবে মত্ত হয়ে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে।

(৭)       ইবনে মাজা ইবনে ওমর হতে বর্ণনা করেন যে, হযরতের বা আবুবকর ও ওমরের সময় এই সকল গল্পের প্রচলন ছিলনা। আখেরী জামানায় মুসলমানগণ ঐ সব গল্পে মজে যে ধ্বংস পেতে বসবে, হযরত তারও স্পষ্ট ইঙ্গিত করেছেন (তাবরানী)।

ইহুদী জাতি তালমুদের মোহে মজে তৌরাতকে ভুলে ছিল। এভাবে আজ তারা মূল তৌরাত থেকে বহু দূরে অবস্থান করছে। খৃষ্টানেরা যীশু সংক্রান্ত আজগুবী গল্পগুজবকেই আকড়ে প্রকৃত যীশুকে হারিয়ে ফেলেছে। বর্তমান সময়টিতে ফতোয়া দেশে বিদেশে বিশেষ করে মুসলিম দেশগুলোতে একটি প্রচলিত আইনের মত চেপে বসেছে জনতার উপর। কথায় কথায় জনতাকে ফতোয়া দিতে দেখা যায়। এর সুফল কুফল দুটোই আছে, দু’টোই জনতাকে ভোগ করতে হয়।

ইসলাম আসে আজ থেকে ১৪০০ বছরেরও কিছু আগে। এটি এসেছিল এর আলোতে সবদিক আলোকিত করে দিতে এবং সকল অন্ধকার দূর করে দিতে। কিন্তু এটি ঠিক সেভাবে সঠিকভাবে পালন করা হয়নি। এর প্রধান কারণ মুসলমানরা এমন সব স্ববিরোধী সময় কাটিয়ে এসেছে এবং এখন মনে হয় অনেক অংকেই যেন ভুল রিডিং দিচ্ছে। মনে হচ্ছে কোথাও হয়তো কিছু ঘাপলা হয়েছে। এটি এমন বড় কিছু হয়তো না, তারপরও এটি খুঁজে দেখার কাজটি সঠিকভাবে করতে না পারলে নির্ঘাৎ আমরা গভীর তিমির অন্ধকারেই মিলিয়ে যাব। আর কাজটি সঠিকভাবে করতে পারলে উপকৃত হবারই কথা। সেই গলদ ধরতে পারলে সে শুদ্ধির কাজটিও করে নেয়া যায়। জং ধরা যন্ত্রাংশের মাঝে তেল দিতে হলে অবশ্যই আগে জেনে নিতে হবে কোন পার্টসএ সমস্যা হচ্ছে। একটি গতিশীল জিনিসের নির্ভেজাল গতির জন্য আমাদের কোন ইঞ্জিনে সমস্যা হচ্ছে সেটি আমাদের বিশেষজ্ঞদের অবশ্যই বুঝতে হবে। তারপর চিকিৎসার ব্যবস্থা করা যাবে, হয়তো সামান্য তেলই তাকে মসৃণ করে চলবার গতি ফিরিয়ে দিবে। ইতিহাসের সব কটি পাতা উল্টালেই দেখা যায় সব বেদনা হাসি কান্নার ধারাবিবরণী থরে বিথরে সাজানোই আছে। শুধু আশরাফুল মখলুকাতের সেই সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীবটির সেই মগজটিকে খাটাতে হবে, যা আমাদের সবার সাথেই একটি করে আছে।

খলিফাদের সচেতন যুগ চলে গেলে পরেই শুরু হল আমাদের প্রকৃত যুদ্ধের যুগ। দেখা যায় হাদিস মুসলমানদের এক বিরল সংগ্রহ। কিন্তু এর সাথে সাথে জমা হতে থাকে—জাল হাদিস—আবু হানিফা তার যুগে এর একজন কড়া প্রহরী ছিলেন—-শিয়া——আলী—-সুন্নী—দলাদলি—খারেজী—ফাতেমী—-সুফী—সালাফি—সপ্তদশ ইমামে বিশ্বাসী—-দ্বাদশ ইমামে বিশ্বাসী—-আলাওয়ি—কাদিয়ানী—হাজার তরিকার দলাদলি। এখানের সবকটিই আমাদের ধর্ম ইসলামের খুব জরুর ক্ষতের চিহ্ন। এমন একটি সত্য ধর্মে এসব হতেই পারেনা। এক নবীর এক আল্লাহর, এক গ্রন্থের ধর্মে এসব বিভেদ থাকতেই পারেনা। এখানের আমরা সবাই এক মায়ের সন্তান। এ ব্যাপারে আল্লাহর বক্তব্য হচ্ছে “তাদের মত হয়ো না যারা বিচ্ছিন্ন হয়েছিল ও মতভেদ করেছিল তাদের কাছে সুস্পষ্ট নির্দেশাবলী আসার পরেও। আর এরা এদের জন্য আছে কঠোর যন্ত্রণা” (সুরা আল ইমরানের ১০৪ আয়াত)”। এরকম আয়াত দেখার সাথে সাথে আমাদের সবারই ভয়ের উদ্রেক করার কথা। 

বিভেদের এ ত্রুটি প্রধাণত পূর্বেকার শাসক বর্গের ত্রুটি, এটি মোটেও ধর্মের বা কুরআনের নবীর বা তার সম্মানিত খলিফাদের ত্রুটি কখনোই নয়। এর শুরুটা তারাই করেছে যারা ধর্মকে ভাগ করেছিল। নিজেরা শোষকের আসনে বসেছিল এবং নিবেদিতপ্রাণ ধর্মের সঠিক অনুসারীকে সেদিন তারা কপট শাসনে হত্যা, গুম, বিষপান করিয়ে নিজের পথ পরিষ্কার করে। এসব কখনোই ইসলামের বিজয় যুগের কর্ম নয়। এসব ইসলামের কষ্টের পাতা উল্টালেই এসবের সন্ধান পাওয়া যায়। যদি মানুষ ঐ সঠিক গ্রন্থটির চৌধারে সঠিকভাবে থাকতো তবে তারা অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারত। যেমনটি তারা করেছিল অতীতে ইসলামের প্রাথমিক যুগে। তারপরও এত অনাচার যুগের ফাঁকে ফাঁকেও কিছু অসাধারণ কাজ হয়েছিল যা আজও জগতের বিস্ময় হয়ে আছে, ইউরোপের রেঁনেসা সম্ভব হয়েছিল যুক্তিবাদী বিজ্ঞানমনা মুসলিমদের জীবনধর্মী  কৃতকর্মের জন্য। ইতিহাস বলে মাঝের সময়টিতে মুসলমানরা তাদের চিন্তাকে শৃংখলিত করে ফেলে।

বর্তমানে সচেতন জনতারা গবেষনা, বুদ্ধিবৃত্তিক অনুসন্ধান, সৃষ্টিশীল কাজ, উৎপাদনশীল কাজ যা মানুষের জীবনকে উন্নত করে তার চর্চা করে। এর বিনিময়ে মানুষ সংগ্রাম করে বেঁচে থাকার প্রেরণা পায়। এসবের উপর দক্ষতার কারণেই মানুষ গোটা বিশ্বের যে কোন জায়গার অবস্থান যে কোন সময়ে আগে থেকেই ধারণা করতে পারে। মানুষ আজ উচ্চচাপ নিম্নোচাপ, বাতাসের গতিবেগ বরফ বৃষ্টি ভুমিকম্প, প্রাকৃতিক দুর্যোগ সম্বন্ধে আগে থেকে ধারণা পেয়ে যাচ্ছে। বিজ্ঞানের এ আলোর যুগে এটি বুঝা উচিত যে, এসব কেমন করে হচ্ছে। মানুষ তার সঠিক জ্ঞান বিজ্ঞানকে কাজে লাগিয়েছে বলেই সেই “ইকরা” অর্থাৎ “পড়” কথাটির উপযুক্ত মর্যাদা দান করার জন্যই মানুষ আজ এ পর্যন্ত আসতে পেরেছে। এত কিছুর মূল সূত্র সেই “ইকরা” এবং এর উপর চর্চা চালিয়ে যাওয়া। কুরআন সব সময়ই যুক্তির প্রচার করে, জ্ঞানের প্রচার করে, সঠিক সত্যই তার প্রধান অর্জন। ফতোয়া কিন্তু সব সময় সেটি করছে না কারণ সেটি ক্ষেত্রবিশেষে ধরা পড়ছে কুটিল মানুষের হাতের সাজানো এক মানবিক সৃষ্টি। মানুষের তৈরী “ফতোয়া” কখনোই আল্লাহর কোন বিধান নয়। আমার দোররা লেখাতে আমি দেখিয়েছি কিভাবে একে আল্লাহর বাণীর বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে অনেক সময় অকুরআনীয় জিনিস দেদারসে প্রচার করা হচ্ছে ফতোয়ার মাধ্যমে এতে এটি প্রমাণিত হয় যে এসব দ্বারা শুধু যে ধর্মের বাণী ছড়ানো হচ্ছে সেটি যেমন সঠিক নয়, আবার এসব দ্বারা সঠিক কুরআনেরই প্রতিষ্ঠা হচ্ছে সেটিও সঠিক নয়। কুরআন প্রতিষ্ঠার জন্য সবচেয়ে বেশী দরকার এর উপর আমল করার। আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর এর ভাষ্যে ইহুদীরা নবী মোহাম্মদের কাছে একজন ইহুদী নারী ও পুরুষকে ব্যভিচারের অপরাধী হিসাবে ধরে আনে। তিনি তাদেরে পাথর মেরে মারার হুকুম দেন। (বোখারী ২৩ নং বই হাদিস নং ৪১৩) । যদি তিনি এর বিচার করতেন কুরআনের ভাষ্য মতে তবে অবশ্যই তিনি তাদেরে দোররা মারার নির্দেশ দিতেন। কিন্তু উল্লেখ্য এরা ইহুদীরা ঐ সময়টিতে তারা নিজেরাই ছিল নবী মোহাম্মদ(সঃ) এর জন্য একটি বিষফোঁড়া। আজও অনেকে শান্তির নবীকে শুধু ঐ মদীনার ইহুদীদের কারণে মনে করেন তিনি একজন যুদ্ধবাজ ছিলেন। যদিও এসব প্রকৃত ঘটনা নবীকে কখনোই যুদ্ধবাজ প্রমাণ করেনা। কিছু সংখ্যক ইউরোপীয় পন্ডিতেরা সেটিই দেখাতে চেয়েছেন, যার জের ধরে আজো মুসলমান গোটা বিশ্বে সন্ত্রাসী টেররিস্ট বা যুদ্ধবাজ। তাদের শাস্ত্র মতেই রাষ্ট্রের প্রধান হিসাবে তাদের বিচার করতে তিনি ন্যায়ত বাধ্য ছিলেন। তিনি সবদিন তার প্রতিটি কর্মেই সৎ থাকতে চেয়েছেন এবং থেকেছেনও। তিনি কোন সময়ই অন্যধর্মের উপর অযথা সংহারকারী ছিলেন না। তাদের ধর্মগ্রন্থকে তিনি অপমান করতে পারেন না। তাই তাদের বিচার তাদের ধর্মগ্রন্থ হিসাবেই হয়েছে।

এমন এক যুগে দেখা যায় মুসলমানরাই জ্ঞান বিজ্ঞানের প্রকৃত দিশারী ছিল। এই মধ্যযুগীয় মুসলমানদের হাতেই ভূগোল, বিজ্ঞান, পদার্থবিদ্যা, জ্যোতিষশাস্ত্র গৌরবের সাথে তার অতীত ঐতিহ্য আজও প্রচার করে তার প্রামাণ্যতা, যুক্তিভিত্তিকতা; এ সত্য কোন শত্রুও অস্বীকার করতে পারবেনা। কোন সে ক্ষমতার বলে মুসলমান সেই মধ্যযুগে এটি করতে পারলো যখন তারা জাহেলিয়াতের কবর থেকে উঠে দাঁড়িয়েছিল মাত্র। একটু পিছন ফিরে তাকান সচেতনরা; তবে স্মরণ রাখবেন একমাত্র সেখানে সে যুগে কিন্তু কোন ফতোয়া আজকের মত প্রতিষ্ঠা পায়নি। প্রতিকূল পরিবেশেও সে যুগে মানুষ হাতের কাছে পাওয়া ঐশীগ্রন্থের বানী অনুসরণ করে অনুসন্ধিৎসুরা এ বিজয় ছিনিয়ে এনেছে ঠিকই, মানুষ স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে পেরেছে, আল্লাহর পথে জীবনকে উৎসর্গ করেছে, স্বাধীনভাবে অর্জন জমা করেছে। ইসলামের ইতিহাসে এ তথ্যটিও পাওয়া যায় যে, সে সময় যারা ফতোয়াবাজ ছিল খলিফাদের হাতে তাদেরে কিভাবে কঠিন বিচারের সম্মুখিন হতে হত যেটি বর্তমানের সময়টিতে তারা মোটেও এর মুখোমুখি হচ্ছে না। যার ফলে কখনো কখনো জনতার অনাচার থেকে ফতোয়াবাজদের অনাচার বড় হয়ে দাঁড়াচ্ছে। মানুষের প্রধান পাপ সত্য বিমুখীনতা। এর দায় মূলত পুরাপুরি বর্তমান যুগের মুসলমানকেও দেয়া যায় না। এপাপের গুরুভারে সেই পূর্ব যুগের কিছু সংখ্যক অনাচারী কপট শাসকবর্গের সম্মিলিত প্রয়াসের কারণে আজও আমরা পরবর্তীরা দিশেহারা। তারপরও বর্তমান সময়কার জনতাদের উপর ওটুকু দায়িত্ব অবশ্যই বর্তায় প্রকৃত সত্যকে বুঝে নেবার। তাদের বুঝা উচিত তারা কতটুকু অবিচার করে চলেছে তার সঠিক ধর্মের সিলেবাস নামের সেই মূল গ্রন্থটির উপর এবং তার নিজের বিবেকের উপর। রসুলের একটি হাদিস হচ্ছে বিবেকই তোমার শ্রেষ্ঠ অস্ত্র। সাহাবী মোয়াদকে যখন যুদ্ধের জন্য পাঠাবার চিন্তা করা হয় তখন প্রিয় নবীর একটি প্রশ্নের জবাবে সেনাপতির মুখ থেকে এরকম একটি বাণী শুনে তিনি যারপর নাই খুশী হয়েছিলেন। প্রশ্নটি ছিল তিনি কিভাবে সমস্যার সমাধান করবেন? সেনাপতি মোয়াদের জবাবটি ছিল প্রথমে তিনি খুঁজবেন আল্লাহর কুরআনের নির্দেশ সেখানে কিছু না পেলে তিনি দেখবেন রসুলের চলা থেকে কিছু জমা করতে পারেন কি না, তাও যদি না পান তখন তিনি তার বিবেককে অগ্রাধিকার দিবেন।

রেঁনেসা পূর্বযুগে খোদ ইউরোপবাসী গভীর ঘুমে অবচেতন ছিল কিন্তু ইতিহাসে প্রমাণ পাওয়া যায় একটি আলোর ধারা এরও আগে কোথাও জ্বলেছিল মানুষকে উদ্দীপিত করে দিতে কিন্তু সে সময়টিতে এ মুসলিমরাদের চেয়ে বেশী কেউ দক্ষ ছিলনা যে এর মূল্যবান বানী ধরে রাখবার ক্ষমতা রাখত। সে সময়টিতে মুসলমানরা সে শূণ্যস্থান পূরণ করে নিজেদের যোগ্য কর্মকৃতিত্বের বলে। উমাইয়া ও আব্বাসীয় শাসকেরা জ্ঞান বিজ্ঞানের উৎকর্ষতা সাধনে অনেক সুশৃংখল কাজ করে যায়, যার ঋণ কখনো বর্তমান বিশ্ব অস্বীকার করতে পারবে না। এখানে ঐ সময়কার মুসলমান সম্বন্ধে ফিলিপ কে হিট্টির লেখা একটি কলাম আনছি। “আব্বাসীয় যুগের পর বিজ্ঞানের কোন বিভাগেই আর কোন উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয় নাই। আজকের মুসলমানরা কেবল তাদের নিজের বইএর উপর নির্ভর করলে তাদের সেই সুদূর একাদশ শতাব্দীর পূর্বপুরুষদের চেয়ে নীচেই তাদের স্থান হবে। চিকিৎসা, দর্শন, গণিত, উদ্ভিদবিদ্যা, ও অন্যান্য শাস্ত্রে মুসলমানরা একটি নির্দিষ্ট মান পর্যন্ত ওঠে। তারপর যেন মুসলিম জগতের মান স্তব্ধ হয়ে দাঁড়ায়। ধর্ম ও বিজ্ঞানঘটিত অতীত ঐতিহ্যের প্রতি অন্ধভক্তি আরব বুদ্ধিকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করে ফেলেছে; কেবল ইদানীং তারা শৃংখল ভাংতে শুরু করেছে” (আরব জাতির ইতিকথা, পৃষ্ঠা ১৪৩, ফিলিপ কে হিট্টি, অনুবাদে অধ্যক্ষ ইব্রাহিম খাঁ) ।

ইসলামের ইতিহাস ঘাটলেও এ তথ্য পাওয়া যায় যখনই মুসলমান পৌরানিক গল্প, মিথ্যা, সত্য নয় এমন সব বাড়তি অর্জন, নিজেদের অপকর্মে স্থায়ীভাবে তাদের আমলে যোগ করে তারই চর্চা করতে থাকে। তখন থেকেই প্রকৃত পক্ষে প্রকাশ্যে তাদের হতাশার ব্যর্থতার কাল শুরু হতে থাকে। এর আগের বিজয় যুগের অসামান্য কৃতিত্ব বিশ্বকে চমৎকৃত করেছে। মাঝের পথে কিছু ছলবাজদের দ্বারা ধর্মটিতে অনেক ভাঙ্গন ধরে এবং এর অনেক সর্বনাশ হয়। এত কষ্টের ভেতর থেকেও ইসলামের ইতিহাস থেকে গজিয়ে উঠা আবু হানিফাদের মত গুণীজনরা ইসলামের মুমূর্ষু দশাকে জীবন্ত করে তোলেন। অপর পক্ষের কুটিলতা ধর্মটিকে যেভাবে বিদ্ধ করেছে, আহত করেছে ঠিকই তারপরও বিজয় অর্জিত হয়েছে আশাতীতভাবে। এ শৃংখলিত করণের প্রধান অস্ত্র আর কিছু নয় এটি শুধু “ধর্মের নামে বিলি করা ভুল ফতোয়া” । যেদিন থেকে এসব সৃষ্ট হয়ে পালিত হয় ও চর্চিত হয় সে দিন থেকে জড়তা আমাদেরে পেয়ে বসে।

আল্লামা এবনে খাল্লেদুন জগতে সর্বপ্রথম দার্শনিক হিসাবে ইতিহাসের সমালোচনা করেন, মোকাদ্দমা ইতিহাসের এক অনুপম সম্পদ। এর ভূমিকায় তিনি লেখেনঃ “আরবদিগের মধ্যে কোন শাস্ত্রগ্রন্থ বা জ্ঞান বিদ্যমান ছিল না । অসভ্যতা ও মূর্খতায় তারা আচ্ছন্ন ছিল। সৃষ্টিতত্ত্ব, তার পুরা কাহিনী, তার বৈচিত্র ও অন্যান্য বিষয়ে যখন তাদের জানবার দরকার পড়তো তখন তারা আপন প্রতিবাসী ইহুদী ও খ্রীষ্টানদের কাছ থেকে জ্ঞান আহরণ করতো। কিন্তু সে সময় আরবে যে সব ইহুদী বাস করতো, মূর্খতায় তারাও আরবদের সমান ছিল। ঐ শ্রেণীর জনসাধারণের পক্ষে তৌরাৎ সম্বন্ধে যেরূপ এবং যতটা জ্ঞানলাভ করা সম্ভব, তার অতিরিক্ত কিছুই তারা জানতো না।” তিনি আরো বলেন, “আমাদের লেখকগণ ঐ সকল কিংবদন্তি ও গল্প গুজব নকল করে তফসিরের কেতাবগুলিতে ঢুকিয়ে দিয়েছেন। এ সকল গল্পের মূল মূর্খ ও অজ্ঞ মরূপ্রান্তরবাসী ইহুদীদের নিকট থেকে গৃহীত। অথচ যারা তা নকল করছেন, তার সত্যাসত্য তারা পরীক্ষা করেও দেখেন নাই (মোকাদ্দমা এবনে খল্লেদুন)।

যে সকল সাহাবী খ্রীষ্টান ও ইহুদী ধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, তাদের আর অপরের নিকট থেকে এসব গ্রহণের কোন আবশ্যকতা ছিল না। তাদের সংস্কার ও প্রবাদগুলি তাদের সংস্কার ও পৌরানিক কাহিনীগুলি—বহুস্থানে বিকৃত অবস্থায় নব দীক্ষিত মুসলমানদের মধ্যেও বিস্তার লাভ করেছিল। শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া এ প্রসঙ্গে বলেন, “কিন্তু অধিকাংশ লোকই ভ্রম প্রমাদ হতে মুক্তি পেতে পারেন না। ছাহাবীগণের মধ্যে এরূপ লোকও ছিলেন, যারা সময় সময় ভ্রম করতেন, তাদের পরবর্তী সময়েও এই অবস্থা। এই জন্য ছহী আখ্যায় যে সকল হাদিছ সঙ্কলিত হয়েছে তার মধ্যে এরূপ হাদিছ সবও আছে যা ভ্রম বলে পরিজ্ঞাত” (কেতাবুল তাওয়াচ্ছোল-৯৬পৃষ্ঠা) ।

হাজার ফতোয়া প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে যদি একটি কুরআনের আয়াতকে কোনোভাবে অপমান করা হয় তা হলে একজন পরীক্ষকের কাছে সে ছাত্রের রিজাল্ট কি জমা করতে পারে সেটি কি পাঠকেরা ভেবে দেখেছেন? এবার নিজেদের পরিমন্ডলে ফতোয়ার ভুমিকা যদি দেখি তবে আঁতকে উঠতে হয়। আমরা মেয়েরা এসব ব্যাপারে কোন কথাই বলতে পারতাম না যদি ফতোয়া আমাদের অতীতে যেভাবে গাইড করতে শুরু করেছিল আমরা যদি সেভাবে চলতাম। হাত পা গুটিয়ে বসে থাকতাম চারদেয়ালের ভিতরে, না কোন বিদ্যা অর্জন করতাম না আলোর রাস্তা খুঁজে পেতাম। যদিও সেদিন আমাদের সে রাস্তা ফতোয়া বন্ধ করতে পারে নি। আমার মায়ের মুখে শুনেছি সে সময়ে মুসলিম মেয়েদের লেখাপড়ার উপর ছিল প্রচন্ড আপত্তি। যার জন্য আমার নানা তাদেরে গ্রাম থেকে শহরে স্থানান্তরিত করেন শুধু লেখাপড়া করার জন্য। আর আমরাও যে একদম এ আচারে বিদ্ধ হইনি তাও নই। আমরা নিজেদের জীবনেও এর অপপ্রয়োগ হতে দেখেছি আমার নিজের উপর তেমন প্রভাব না ফেললেও আমার সহপাঠি অনেকেই আছেন যারা এ কষ্টের মাঝে তাদের বেদনার কথা আমাকে জানিয়েছেন। সে হিসাবে আমি ভাগ্যবানদের একজন। আমার পূর্বপুরুষের আলোকিত চিন্তাধারা তাদের বিলি করা শিক্ষা আমাকে কিছুটা হলেও আলোর পথ দেখিয়েছে, জীবনকে পরখ করতে শিখিয়েছে। যে বান্ধবীটি তার শিক্ষা চালিয়ে যেতে পারে নি বলে এত আক্ষেপ করেছে আজ যথেষ্ঠ পরিণত বয়সে এসে পিছন ফিরে দেখলে তাদের কথা মনে পড়ে এবং তখন মনে হয় এ বেদনার কথা, এ কষ্টের কথা সবাইকে জানাই চড়া গলায়। আর এ কাজটি তারা করেছে একমাত্র ধর্মের নাম নিয়েই, ধর্মের আচার বলেই তারা এটি প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে। আল্লাহর প্রথম বানী “ইকরা” অর্থাৎ “পড়” যেটি প্রচার করার কথা ছিল তাদের তারা এভাবে ঐশী বাণীর বিরুদ্ধে বেরিকেড তুলে ধরে।

ঐতিহাসিক আন্দালেসির ভল্যুয়ম ১, পৃষ্ঠা ৩৩৪-৩৪৮ পৃষ্ঠাতে যে তথ্যটি পাওয়া যায় সেখানে দেখা যায় শাসকবর্গের শাসন ক্ষমতা দখলের সময়কার অনাচার দেখে বেশ কিছু সংখ্যক সম্ভ্রান্ত মহিলা এসবের জবাব চাইছিলেন স্বয়ং রাষ্ট্রক্ষমতাতে অধিষ্ঠিত শাসক মোয়াবিয়ার কাছে। তখন তাদের সে জবাবে বিব্রত শাসক বার বার বদর, ওহুদ সিফফিন এর উদাহরণ টানার চেষ্টা করছিলেন। এ কথাটি প্রমাণ করে সে সমাজের মেয়েরাও রাজনৈতিক বিতর্কে জবাবদিহিতার দরকার মনে করেছেন যেখানে আজ চৌদ্দশত বছর পরও অনেক শিকলে মেয়েদেরে বেধে রাখা হয়েছে। একটি কথা আছে বেশী টাইট দিতে গেলে রশি ছিড়ে যায়। কিছু দিন আগে শুনা গেল কানাডাতে এক মেয়েকে তার বাবা শাস্তি দিতে গিয়ে মেরে ফেলেছে। এটি কখনোই ইসলাম নয়, এটি একটি দুর্ঘটনা। কিন্তু এরকম একটি দুর্ঘটনা যখন ইসলামের ঘর থেকে হয় তখন বাড়তি চিন্তা হয়। ইউরোপ আমেরিকান সমাজে অজস্র অনাচার হয় হচ্ছে তা নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না, নিছক খবরে স্থান পায়। ইসলামের সদস্যদের কৃত এরকম একটি উদাহরণ খোদ মুসলমানকেও চিন্তায় ফেলে দেয়। আর প্রতিপক্ষ তো একে বাড়তি ধারালো যুক্তি বলে মনের আনন্দে মিডিয়াতে জিনিসটি ছড়ায়। এটি আমাদের সুন্দরকে সত্যকে সবদিকেই বিধ্বস্ত করে। আমাদের অপরিনামদর্শীতার ক্ষতিকর প্রভাবে আমরা কিভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হই সেটি সচেতনরা একটু ভেবে দেখবেন এবং প্রকৃত ইসলাম দরদীরা অবশ্যই সেটি পরখ করবেন। কুরআনের একদল টীকাকার ইহুদী ও খৃষ্টানদিগের পুস্তক পুস্তিকা ও বাচনিক কিংবদন্তিগুলোকে কিরূপ নির্মমভাবে কুরআনের তফসিরে প্রবেশ করিয়ে দিয়েছেন। তার প্রমাণ হিসাবে একদল লোক ইহুদী ও খৃষ্টান দিগের অনুকরণে বলেছেন যে, কোরবানীর জন্য হযরত ইসমাইলকে নহে বরং হযরত ইসহাককে উপস্থাপিত করা হয়েছিল (জাদুল-মাআদ, ১ম খন্ড, ১৪-১৭ পৃষ্ঠা) । আর আমাদের শীতনিদ্রার গভীরতার কারণে আমরা এখনো ঘুমিয়ে আছি। দলে দলে ভাগ হয়ে ধর্মের নাম নিয়ে আমরাই আমাদের ভাইকে মারছি।

কিন্তু নবীর যুগে বা খলিফাদের যুগে বর্তমান সময়কার অনেক কিছুই সে সময় উপস্থিত ছিল না। আর আমাদের সত্যিকারের মুমিনদের সেই আলোকিত যুগকেই অনুসরণ করার কথা। “বক্রপথের যাত্রীরা সাবধান, আল্লাহ তোমাদের সম্বন্ধে গাফেল নন” (সুরা আল ইমরানের ৯৮ আয়াত) । আজকের যুগে দেখা যাচ্ছে সারা বিশ্ব জুড়ে ধর্ম নিয়ে দেশ নিয়ে অনেকেই বক্রপথে চিন্তা ভাবনা করছেন তাদের সবার জন্য এসব আল্লাহর নির্দেশনামা, হুশিয়ারীবাণী সন্দেহ নেই। তাদেরে অবজ্ঞা করে অন্য আরো ছলবাজদের অনুকরন কখনোই ধর্মের অঙ্গ হবার কথা নয়। সেটি একজন ফতোয়াবাজ, রাজনীতিবিদ, এককথায় অপকাজে উৎসাহী সবাইকেই আজ ভাবতে হবে। আমরা তপজপে ব্যস্ত থাকলেও ধর্মের মূল গবেষণাতে নেই, সত্যের পর্যালোচনা থেকে বর্তমানে আমাদের অবস্থান অনেক দূরে। তাই অনেক ভুলকে অনেকেই অজ্ঞতার কারণে মনে করে থাকেন এটিই ধর্ম। এখানে তাদের আন্তরিকতার পরিচয় যদিও পাওয়া যায় কিন্তু সঠিক বিবেককে কাজে না লাগানোর গলদের কারণে প্রকৃত সত্য থাকে বহু দূরে। আল্লাহর কাছে সঠিক সত্যের জন্য সাধনা করতে হবে, দোয়া চাইতে হবে, মধ্যপন্থা সিরাতুল মোস্তাকিমের সহজ সরল রাস্তায় চলবার জন্য প্রতিদিনকার প্রার্থনা যেটি প্রতিটি মুসলিম জনতা নামাজে বহুবার উচ্চারণ করে থাকেন তাকে মনের মাঝে গেঁথে বাস্তবে তারই প্রতিফলন ঘটাতে হবে। তা হলেই আমাদের এবাদত, সালাহ আল্লাহর দরগায় ত্বরায় গিয়ে পৌছাবে এবং আমাদের জন্য ইতিবাচক অর্জন জমা করে আনবে। অন্যথায় আমাদের প্রার্থণা উদ্দেশ্যহীন নিস্ফল প্রয়াস হিসাবে অরন্যে রোদন করেই যাবে।

 

বিশেষ দ্রষ্টব্য: (লেখাটি বাংলাদেশে দৈনিক আমার দেশ থেকে ছাপে ২০১১ সালের ১২ মার্চ। লন্ডন থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক সুরমাতে ১৮-২৪ মার্চ, ২০১১ সংখ্যাতে ছাপে)। এসব লেখা কখনোই পুরোনো হয়না। যুগের প্রয়োজনে এর অবদান সবদিনই মানুষকে জাগিয়ে তুলতে সহায়ক হয়। তাই ২০২০ সালের জুনের ৮ তারিখে লেখাটি আবার আপলোড করলাম আমার ব্লগে। আল্লাহ আমাদের প্রকৃত সিরাতুল মোসতাকিমের সরল সত্যের পথে পরিচালিত করুক।

 

 

 

 

Tag Cloud

%d bloggers like this: