Articles published in this site are copyright protected.

নাজমা মোস্তফা

পরীক্ষা পাশ করতে এককালে ৩৩ ছিল মিনিমাম। মিনিমাম পাশের স্বপ্নে এখানে মাত্র ৩৩টি পয়েন্ট আনছি আমরা কিভাবে অধঃপতিত হচ্ছি তা স্পষ্ট করতে। লেখাটি প্রায় দেড় যুগ আগের লেখা। কোথাও ছাপা হয় নাই, আমার আগের অনলাইন সাইট ‘বাতিঘরে’ ও নয়। চলছে রমজান, পেটের ধান্ধা কম, তাই চিন্তাদের খুঁজে আনা। যেভাবে ওয়ায়েজরা সত্য মিথ্যা নিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়েছেন, তাই সেটি সময়েরও দাবী। শুরু থেকে সত্য ধর্মটিকে বিরুদ্ধবাদীদের সাথে প্রচন্ডভাবে লড়তে হয়। গবেষণার প্রেক্ষিতে প্রাপ্ত কিছু তথ্য – আমাদের জগাখিচুড়ী দশার সন্ধানে চিন্তাশীলদের জন্য খোরাক আছে লেখাটিতে –

(১) প্রাথমিক যুগের ঐতিহাসিকগণ যা যখন ঘটেছে শুনেছেন সত্য হোক মিথ্যা হোক তারা তা লিপিবদ্ধ করে যান । প্রাথমিক যুগের নানা প্রকার সামাজিক ও রাজনৈতিক বিপ্লব এবং মুসলমান সমাজের আত্মকলহ ও গৃহযুদ্ধের ভীষণতার মধ্য হতে প্রাচীন ঐতিহাসিকগণ দেশের প্রত্যেক গ্রামের, প্রত্যেক মানুষের মুখে ইতিহাস ও হযরতের জীবনী সম্বন্ধে সঙ্গত অসঙ্গত যে বিবরণটুকু প্রাপ্ত হয়েছেন, তাই লিপিবদ্ধ করে যান। (মোস্তফা চরিত, মোহাম্মদ আকরাম খাঁ, পৃষ্ঠা-৭)

(২) কিন্তু আমরা দৃঢ়তার সাথে বলতে পারি যে, পক্ষপাতশূণ্য ইতিহাস রচনার উপকরণ একমাত্র আমাদের নিকট ব্যতীত জগতের আর কোথাও বিদ্যমান নেই। যার ফলে লেখকগণের ব্যক্তিগত মত, সংস্কার ও বিশ্বাস বহু স্থলে প্রকৃত ইতিহাসকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। তারা যা শুনতে পেয়েছেন তার একটি বা একটুকও ঢেকে রেখে নিজেদের পুস্তকে লিপিবদ্ধ করেন নাই। এমন কি, যা দ্বারা হযরতের চরিত্রে দোষারূপ হতে পারে বা কুরআন সম্বন্ধে সংশয় উপস্থিত হতে পারে তাও তারা পুস্তকে স্থান দিতে কুন্ঠিত হন নাই। (সূত্র-ঐ)

(৩) এসব বেছে বেছে খ্রীষ্টান লেখকগণ নিজেদের পুস্তকে মহানন্দে স্থান দান করেন। এবং ঐ সূত্র ধরে কখনো যুক্তি তোলার চেষ্টা করেন কখনো বা কথার মাঝে আরো বেশী করে ঘোরপ্যাঁচের সৃষ্টি করেন।

(৪) বস্তুত সত্য মিথ্যা, বিশ্বাস্য অবিশ্বাস্য বাছাই করার দ্বায়িত্ব ছিল পরবর্তী লেখকদের। পরবর্তী লেখকরা তা করেন নাই বা হয়তো করা অনাবশ্যক মনে করেছেন। কালে মুসলমান সাহিত্য, ভূগোল, খগোল, দর্শন, বিজ্ঞান, হাদিস, তফসির, ফিকাহ, অছুল, সমস্তের পূর্ণতা যেন চরমভাবে হয়ে গেছে মনে করে সব মেনে নেয়। তারা আর কোন প্রকার সংশোধন, পরিবর্তন, পরিবর্জন, বা পরিবর্ধন সঙ্গত মনে করলো না। (ঐ-সূত্র)

(৬) কালে তারা ভাবতে থাকে এসব করা অন্যায়, যা আছে তাই মানবো। তাই দেখা যায় “আজ একজনকে আল্লাহ এক যেমন বিশ্বাস করতে হয় তেমনি ইহুদীদের অবিশ্বাস্য পুস্তক থেকে প্রাপ্ত ও কিংবদন্তির সুবাদে প্রাপ্ত ৩৩৩৩ হস্ত দীর্ঘ উজ-বেন-ওনকের কেচ্ছাও বিশ্বাস করতেই হবে। তুমি যেমন আল্লাহর ‘আরশ কুর্সিতে’ বিশ্বাস করবে, সেইরূপ তোমাকে বিশ্বাস করতে হবে যে, “কো-কাফ-পাহাড়” (ককেসাস পর্বত) সমস্ত দুনিয়াকে বেষ্টন করে আছে এবং আছমানের প্রান্তগুলি তার উপর স্থাপিত হয়ে আছে, ইত্যাদি। বিশ্বাস না করলে তুমি মুসলমানই থাকতে পারবে না। প্রমাণঃ—“এয়ছাহি কহিল রাবী কেতাবে খবর”। (ঐ গ্রন্থ পৃষ্ঠা ৯)

(৭) উজ-বেক-ওনকের নানা প্রকার আজগুবী গল্প আমাদের ইতিহাস ও তফসিরে লেখা আছে। তার শরীরের দীর্ঘতা ৩৩৩৩ হাত, সমুদ্রে তার হাঁটু পানি, সে সমুদ্রের বড় বড় (সম্ভবতঃ তিমি) মাছগুলিকে সূর্যের গায়ে ঠেসে ধরে কাবাব করে খেত। নূহের বিখ্যাত তুফানের সময় যখন উচ্চতম পর্বতশৃঙ্গের উপর দিয়ে পাহাড়ের মত ঢেউ বয়েছিল সে তুফানে তার মাত্র বুক পানি হয়েছিল। শেষে হযরত মুসা একখানি খুব লম্বা লাঠি নিয়ে লাফ দিয়ে নিজে বহূ উর্ধ্বে উঠে তার পায়ে গোড়ালির উপর আঘাত করেন। এত বড় যে উজ-বেক-ওনক, সেই আঘাতে ৩৫০০ বছর বয়সে তার হালাক হয়ে গেল। জালালুদ্দীন সয়ুতী তার অভ্যাস মত, এটা প্রমাণ করবার জন্যও একটি পুস্তিকা লিখেন। কিন্তু পূর্বকালের বিশ্বস্ত মোহাদ্দেসরা এই গল্পগুলিকে ‘মিথ্যা ও মৌজু’ বলে নির্দেশ করেছেন। এবনে যাওজী বলেছেনঃ “যে মিথ্যাবাদীরা আল্লাহর নামে এরূপ উপকথা রচনা করেছে, তাদের অপেক্ষা সেই সব মুসলমান পন্ডিতের অসম সাহসিকতা অধিকতর আশ্চর্যজনক, যারা এই হাদিছটির প্রকৃত অবস্থা বর্ণনা না করে কোরআনের তফসির প্রভৃতিতে ঢুকিয়ে দিয়েছেন। এটি এবং এটির অনূরূপ বিবরণগুলি ধর্মদ্রোহী, খ্রীষ্টান ও ইহুদীদের রচিত গল্পমাত্র, এবং তারা যে এসকল গল্প রচনা করে নবী ও রসুলদেরে ঠাট্টা বিদ্রুপ করতো, তাতে কোন সন্দেহ নেই। (মাউজুআতে কবির, ৯৭ পৃষ্ঠা)

(৮) মাউজুয়াতে কবিরএ বর্ণিত এই শ্রেণীর মোহাদ্দেসদের অনুমান যে কতো সত্য, তার প্রমাণ হিসাবে নিচের বর্ণিত টি. পি. হিউজএর বর্ণিত তথ্য “Uj—the son of Ug, A giant who is said to have been born in the days of Adam—–. The Og of the Bible, concerning whom as Suyuti wrote a long book taken chiefly from Rabbinic tradition. (Edwal, Gesch 1. 306.) An apocryphal book of Og was condemned by Pope Gelasius. (Dec. V1. 13) Dictionary of Islam—p, 649. অর্থাৎ উজ-একজন উগ এর পুত্র, একটি দৈত্য যার জন্ম হয়েছিল হযরত আদমের সময়ে, – বাইবেলে বর্ণিত উজ্জ, যার সম্বন্ধে সয়ূতী একটি বই রচনা করেন রাবীদের গৎবাধা ধারাবাহিকতা থেকে (তথ্যসূত্র)। এই উজের উপর একটি দ্বিমুখী নিন্দাসূচক গ্রন্থ পোপ গ্যালেসিয়াস কর্তৃক রচিত হয় (সময় ও সূত্র) ডিকশনারী অব ইসলাম পৃষ্ঠা, ৬৪৯) ” উপরে এই বিবরণটিও এই ঘটনার সত্যতা তুলে ধরছে।

(৯) ঠিক এভাবেই প্রাচীন উপকথাও এসব কোন ফাঁকে ঢুকে পড়েছে ধর্মের অলিন্দে। ইসলাম ধর্ম এবং তার প্রবর্তক হযরত মোহাম্মদ(সঃ)কে জগতের সম্মুখে হেয় প্রতিপন্ন করার একমাত্র উদ্দেশ্যে যে সমস্ত লেখক নিজেদের শ্রম ও প্রতিভার অসদ্ব্যবহার করেছেন তারাও এই সত্যটিকে স্পষ্ট ভাষায় স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন। উদাহরণ হিসাবে উইলিয়াম মুইরের উল্লেখ করা যেতে পারে। তিনি তার Life of Mohammad পুস্তকের ভুমিকায় বলেছেনঃ “There is probably in the world no other book which has remained twelve centuries with so pure a text” অর্থাৎ জগতে এরূপ পুস্তক সম্ভবতঃ আর একটিও নেই, (কুরআনের ন্যায়) দীর্ঘ দ্বাদশ শতাব্দী ধরে যার ভাষা সম্পূর্ণ অবিকৃতভাবে সংরক্ষিত হয়ে আসছে।

(১০) বিখ্যাত পন্ডিত Von Hammer বলেনঃ “We hold the Quran to be as surely Mohammad’s word as the Mohamedans hold it to the world of God.” অর্থাৎ মুসলমানরা যেরুপ নিশ্চিতভাবে কোরআনকে আল্লাহর বানী বলে বিশ্বাস করে থাকে, আমরাও ঠিক সেরূপ এটাকে (এই কুরআনকে) নিশ্চিতভাবে মোহাম্মদের বানী বলে বিশ্বাস করে থাকি।”

(১১) ইউরোপীয় লেখকগণের পুস্তকগুলি পাঠ করলে অজ্ঞতা, অসমসাহসিকতা ও গোড়ামিতে তাদের সঠিক অবস্থান নির্ধারণ করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। হিডেনবার্গের প্রফেসর Weil কর্তৃক প্রণীত পুস্তক ১৮৪৩ খ্রীষ্টাব্দে প্রকাশিত হয়। ওয়েল অপেক্ষাকৃত স্বাধীন ও ঐতিহাসিক ভাবসম্পন্ন হলেও কি কারণে জানি না, তার মনে এই সন্দেহ উপস্থিত হয় যে, “কেয়ামত বা মহাপ্রলয়ের ঘটনা ও শেষ বিচার মোহাম্মদের জীবন কালেই অনুষ্ঠিত হবে। এই মর্মের কয়েকটা আয়াত ‘কুরআনে’ ছিল। কিন্তু মোহাম্মদের মৃত্যু হয়ে গেলে যখন দেখা গেল যে, ঐ পদগুলি মিথ্যা হয়ে যাচ্ছে তখন নবীন সদস্য নেতারা কয়েকটি আয়াতের পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করেন। মোহাম্মদও যে মরবেন এবং মৃত্যুর পর আবার তিনি (যিশুর ন্যায় স্বর্গ হতে) ফিরে আসবেন, লিখিত ও মুখস্ত কুরআনগুলিতে এই সব কথা যোগ করে ভক্তগনের বিশ্বাস তারা অক্ষুন্ন রাখবার চেষ্টা করেছিলেন”।

(১২) লিডেন ইউনিভার্সিটির আরবী অধ্যাপক (Professor C.Snouck Hurgronje) সন্নাউক হারগ্রোঞ্জে, গ্রন্থকার একজন গোড়া খ্রীষ্টান, আরবী সাহিত্যে ও ইসলামিক শাস্ত্রাদি অভিজ্ঞতা অর্জন করার জন্য তিনি জীবনভর সাধনা করেছেন। তিনি ছদ্মবেশে কয়েকমাস পর্যন্ত জেদ্দা ও মক্কায় অবস্থান করেন (১৮৮৪-৮৫) এবং হাজিদের সাথে তিনি হজ পর্বও সমাধা করেন। মুসলমান ধর্ম সম্বন্ধে আমেরিকায় তার বক্তৃতাগুলি ১৯১৬ সালের শেষভাগে মুদ্রিত হয়। যখন অধ্যাপক পল ক্যাসানোভা তার প্রথম সংস্করণ এর ৩৯৭ পৃষ্ঠাতে তিনিও ওয়েলএর অন্ধ অনুকরণে কুরআনের দুই আয়াতের বিশ্বস্থতায় সন্দেহ করেন। প্রফেসর হারগ্রোঞ্জ বলেন, Noldeke  আজ হতে ৫০ বৎসর পূর্বে তার Geschichte des Quran নামক পুস্তকে Mohammad et la fin du monde, parts, 1911. ঐ ভিত্তিহীন সন্দেহের মিটমাট করে গিয়েছেন।

(১৩) অধ্যাপক মহাশয় ক্যাসানোভার কথায় আশ্চর্যান্বিত হয়ে বলেন, In the Skeptical times there is very little that is above criticism, and one day or other we may expect to hear Mohammad never existed. The arguments of this can hardly be weaker than those of Casanova against the authenticity of the Qoran. (PS 16-17). অর্থাৎ আমাদের এই সন্দেহবাদের যুগে সমালোচনার অতীত বড় কিছু নাই। এবং একদিন না একদিন আমাদেরে এটাও হয়তো শুনতে হবে যে, কখনও মোহাম্মদ বলে কোন লোকের অস্তিত্বই ছিল না। এর যে যুক্তি, তা কুরআনের প্রামানিকতার বিরূদ্ধে ক্যাসানোভার যুক্তি অপেক্ষা কোন অংশেই দুর্বল হবে না। (১৬-১৭ পৃষ্ঠা)।

(১৪) ডাক্তার স্প্রেঙ্গারের ‘মোহাম্মদ চরিত’ যারা পাঠ করেছেন, তারা জানেন তিনি যে ইসলামের কত বড় শত্রু এবং এটিও সত্য যে তিনি আরবী ভাষায় পন্ডিত ছিলেন। তিনিও স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন যে, “There is no nation, nor has there been any which like them has during twelve centuries recorded the life of every man of letters. If the biographical records of Musalmans were collected, we should probably have accounts of the lives of half a million of distinguished persons.” অর্থাৎ পৃথিবীতে বর্তমান যুগে এমন কোন জাতি নাই, অথবা অতীত যুগেও এমন কোন জাতি ছিল না, যারা মুসলমানদের ন্যায় দীর্ঘ দ্বাদশ শতাব্দীর প্রত্যেক বিদ্বান, সাহিত্যিক ও লেখকদের জীবন চরিত লিপিবদ্ধ করে রাখতে সমর্থ হয়েছে। মুসলমানদের জীবন চরিত সংগৃহীত হলে আমরা খুব সম্ভব পাঁচ লক্ষ ব্যাক্তির জীবন চরিত প্রাপ্ত হতে পারতাম।”

(১৫) তখন খ্রীষ্টান ও ইহুদীদের থেকে রেওয়ায়েৎ গ্রহণও শরা অনুসারে বৈধ ছিল। এতে যে সকল ইহুদী ও খ্রীষ্টান প্রকাশ্যভাবে ইসলামের বিরূদ্ধাচারন করতে সাহসী হয় নাই অথচ তারা মনে মনে ইসলাম সম্বন্ধে যথেষ্ট বিদ্বেষ পোষন করতো তারা তাদের নিজেদের ধর্মে আসক্ত করার জন্য তাদের অনেক টিকা টিপ্পনী প্রচার করতো। উদাহরণ স্বরূপ এরূপ একজন হিসাবে আব্দুল্লাহ-এবন-আমর-এবন-আছের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। বিখ্যাত মোহাদ্দেস ছাখাভী তার সম্বন্ধে বলেনঃ “এরমুক যুদ্ধে ইহুদী ও খ্রীষ্টানদিগের বহু পুস্তক, তার হস্তগত হয়। তিনি সেই সব পুস্তক অবলম্বন করে বহু অজ্ঞাত ঘটনা বর্ণনা করতেন। এমন কি তার কোন কোন শিষ্য অনেক সময় তাকে বলতে বাধ্য হয়েছেন যে, হযরতের হাদিছ বর্ণনা করুন – ঐ সকল কেতাবের বিবরণ বর্ণনা করবেন না।”

(১৬) আল্লামা এবনে খাল্লেদুন জগতে সর্বপ্রথমে দার্শনিক হিসাবে ইতিহাসের সমালোচনা করেন, মোকাদ্দমা ইতিহাসের এক অনুপম সম্পদ। এর ভূমিকায় তিনি লেখেনঃ “আরবদিগের মধ্যে কোন শাস্ত্রগ্রন্থ বা জ্ঞান বিদ্যমান ছিল না। অসভ্যতা ও মূর্খতায় তারা আচ্ছন্ন ছিল। সৃষ্টিতত্ত্ব, তার পুরা কাহিনী, তার বৈচিত্র ও অন্যান্য বিষয়ে যখন তাদের জানবার দরকার পড়তো তখন তারা আপন প্রতিবাসী ইহুদী ও খ্রীষ্টানদের কাছ থেকে জ্ঞান আহরণ করতো। কিন্তু সে সময় আরবে যে সব ইহুদী বাস করতো, মূর্খতায় তারাও আরবদের সমান ছিল। ঐ শ্রেণীর জনসাধারণের পক্ষে তৌরাৎ সম্বন্ধে যেরূপ এবং যতটা জ্ঞানলাভ করা সম্ভব, তার অতিরিক্ত কিছুই তারা জানতো না।” তিনি আরো বলেন,“আমাদের লেখকগণ ঐ সকল কিংবদন্তি ও গল্প গুজব নকল করে তফসিরের কেতাবগুলিতে ঢুকিয়ে দিয়াছেন। আমরা পূর্বেই বলেছি যে, এ সকল গল্পের মূল মূর্খ ও অজ্ঞ মরূপ্রান্তরবাসী ইহুদীদের নিকট থেকে গৃহীত। অথচ তারা যা নকল করছেন, তার সত্যাসত্য পরীক্ষা করেও দেখেন নাই। (মোকাদ্দমা এবনে খল্লেদুন)

(১৭) অতিরঞ্জন-পটু লেখকগনের কৃপায় এবং অতিভক্ত মুসলমানদের কল্যাণে, কালে তাই ইসলামের সর্বাপেক্ষা আবশ্যক, বিশ্বাস্য ও অবশ্য মান্য অংশে পরিণত হয়ে যায়। এই দুরবস্থার শোচনীয় ও পূর্ণ পরিণতি দুই শতাব্দী পূর্ব হতে আরম্ভ হয়েছে। এমনকি আমরা এরূপ অনেক লোকও দেখেছি, যাদের জ্ঞানের সাথে তাদের বিশ্বাসের সামঞ্জস্য নেই। (মোস্তফা চরিত, মোহাম্মদ আকরম খাঁ, পৃষ্ঠা ৬৬)

(১৮) ইহুদী ও খ্রীষ্টানদের বংশগত কিংবদন্তি ও প্রবাদ এবং তাহাদের বিশ্বাস ও সংস্কারগুলি ছাহাবীদের অধিকাংশের জানা ছিল। এ অবস্থায় ছাহাবী ও তাবেয়ীগণ ঐ সকল পুস্তক পুস্তিকায়, নিজেদের পরষ্পরাগত বিশ্বাস ও সংস্কারের এবং স্বদেশে এবং স্বসমাজে প্রচলিত জনশ্রূতি ও কিংবদন্তির উপর নির্ভর করে বহু অজ্ঞাত বিবরণ ও ভাবী ঘটনাদি গল্পচ্ছলে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু কালক্রমে ঘটনা বিপরিত হয়ে দাঁড়ায়। দেখা যায় হযরত ওমর কর্তৃক তৌরাতের নমুনা আনয়ন। (মোস্তফা চরিত, মোহাম্মদ আকরম খাঁ, পৃষ্ঠা ৫৬)

(১৯) যে সকল সাহাবী খ্রীষ্টান ও ইহুদী ধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, তাদের আর অপরের নিকট থেকে এসব গ্রহণের কোন আবশ্যকতা ছিল না। তাদের সংস্কার ও প্রবাদগুলি তাদের সংস্কার ও পৌরানিক কাহিনীগুলি—বহুস্থানে বিকৃত অবস্থায় নব দীক্ষিত মুসলমানদের মধ্যেও বিস্তার লাভ করেছিল। শায়খুল ইসলাম ইমান ইবনে তাইমিয়া এ প্রসঙ্গে বলেন, “কিন্তু অধিকাংশ লোকই ভ্রম প্রমাদ হতে মুক্তি পেতে পারেন না। ছাহাবীগণের মধ্যে এরূপ লোকও ছিলেন, যারা সময় সময় ভ্রম করতেন, তাদের পরবর্তী সময়েও এই অবস্থা। এই জন্য ছহী আখ্যায় যে সকল হাদিছ সঙ্কলিত হয়েছে তার মধ্যে এরূপ হাদিছ সবও আছে যা ভ্রম বলে পরিজ্ঞাত”। (কেতাবুল তাওয়াচ্ছোল-৯৬পৃষ্ঠা)

(২০) সেই সময়কার খ্রীষ্টান লেখকগণ প্রচার করতে থাকেন যে, “আরবগণ মোহাম্মদ নামক একটি পুতুল প্রতিমার পূজা করতো। মোহাম্মদ নিজের জীবনকালে স্বহস্তে এই পুতুলটি নির্মাণ করেন এবং উহাকে অভঙ্গুর করার জন্য একটি পিশাচের সাহায্যে ও যাদুমন্ত্রের দ্বারা উহাতে একটি ভয়ঙ্কর রকমের শক্তি প্রবিষ্ট করিয়ে দেন যে, এই পুতুলটি খ্রীষ্টানদিগের প্রতি এমন আশ্চর্যজনক হিংসা ও ঘৃণার ভাব পোষন করতো যে, তাদের কেহ সাহস করে এই প্রতিমার নিকট যেতে চাইলেই কোন একটা গুরূতর বিপদে পড়তে হতো। এমন কি এটাও কথিত আছে যে, কোন পাখীও উহার উপর দিয়ে উড়ে গেলে সে সঙ্গে সঙ্গে মারা যেত। (History of Charles the Great, ৬-৭ পৃষ্ঠা, T. Rodd কর্তৃক অনুবাদিত (১৮১২) হতে গৃহীত।)

(২১) Father Jerome Dandini তার “A Voyage to Mount Lebanus” গ্রন্থে বলেন, “মোহাম্মদ মুসা নবী অপেক্ষা অধিকতর আশ্চর্যজনক কোন অলৌকিক কান্ড প্রদর্শণ করে নিজেকে তাহা অপেক্ষা বড় নবী বলে প্রতিপন্ন করার জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠেন। এই জন্য তিনি কয়েকটি জলপূর্ণ পাত্র ভূগর্ভে লুকিয়ে রাখেন। কিন্তু কয়েকটি শুকর ঐ স্থানের মাটি খুঁড়ে ফেললে এবং ইহাতে মোহাম্মদের “বুজরূকি” দেখাবার সমস্ত অভিসন্ধিই নষ্ট হয়ে যায়। এর ফলে ক্রোধান্ধ হয়ে তিনি শুকরকে অপবিত্র ও তার মাংসকে নিষিদ্ধ বলে প্রচার করেন। (অষ্টম অধ্যায়)।

(২২) বিখ্যাত খ্রীষ্টান ধর্ম যাজক হেনরী স্মিথ রাণী এলিজাবেথের সময়কার লোক। তিনি স্বনামধন্য Roger of Wendover এর প্রমুখাৎ উল্লেখিত গল্পটির উল্লেখ করেন। “একদা পানোন্মত্ত অবস্থায় মোহাম্মদ তার প্রাসাদে বসে আছেন। এমন সময় তার পুরাতন রোগটির আশংকা করে তিনি খুব তাড়াতাড়ি সেখান থেকে উঠে গেলেন। যাওয়ার সময় সকলকে বলে গেলেন যে, কোন দেবদূতের আহ্বানে তিনি যাচ্ছেন। এ অবস্থায় কেহ যেন তার অনুসরণ না করে, অন্যথায় দেবদূতের কোপে পড়ে তিনি নিধন হবেন। রোগাক্রমনের ফলে মাটিতে পড়ে আঘাতপ্রাপ্ত না হন—এই উদ্দেশ্যে, অতপর তিনি একটা গোবরগাদার উপর উঠে বসেন। সে সময় তিনি সেখানে পড়ে ছটফট করতে থাকেন এবং তার মুখ দিয়ে ফেনা বের হতে লাগলো। এসব দেখে এক পাল শূকর সেখানে ছুটে আসলো এবং তাকে খন্ড বিখন্ড করে ফেলে এবং এরূপে মোহাম্মদের জীবন লীলার অবসান হয়ে যায়। এ সময় শূকরের চিৎকার শুনে তার স্ত্রী ও অন্যান্য পরিজনবর্গ সেখানে ছুটে এসে দেখলেন যে, তাদের প্রভুর অধিকাংশ শূকর দল খেয়ে ফেলেছে। তখন তারা দেহের অবশিষ্টাংশ সংগ্রহ করে সেগুলোকে একটি স্বর্ণ-রৌপ্য খচিত কাঠের পেটিকার মধ্যে স্থাপন করে সকলে একত্রে ঘোষনা করে দিলেন যে, স্বর্গের দেবদূতেরা প্রভুর শরীরের অল্পাংশ মাত্র মর্ত্যবাসীদের জন্য রেখে আনন্দ কোলাহল সহকারে তার অধিকাংশ স্বর্গাধামে নিয়ে চলে গেছে। মুসলমান জাতির শূকরের প্রতি ঘৃণার মূল কারণ ইহাই। (পূর্ববর্তী গ্রন্থ, ১৯ পৃষ্ঠা)

(২৩) কুরআনের একদল টীকাকার ইহুদী ও খ্রীষ্টানদিগের পুস্তক পুস্তিকা ও বাচনিক কিংবদন্তিগুলোকে কিরূপ নির্মমভাবে কুরআনের তফসিরে প্রবেশ করিয়ে দিয়েছেন। তার প্রমাণ হিসাবে একদল লোক ইহুদী ও খ্রীষ্টান দিগের অনুকরণে বলেছেন যে, কুরআনের  জন্য হযরত ইসমাইলকে নহে বরং হযরত এসহাককে উপস্থাপিত করা হয়েছিল। (জাদুল-মাআদ, ১ম খন্ড, ১৪-১৭ পৃষ্ঠা)

(২৪) স্যার উইলিয়াম মূর একজন ভদ্র ও উচ্চপদস্থ ইংরেজ। তার লিখিত Life of Mahomet   বা মোহাম্মদের জীবন চরিত নামক পুস্তকের দুটি সংস্করণ (১৮৫৭ ও ১৮৬১ সালে) প্রকাশিত হয়। এর শেষ সংস্করণ প্রচারিত হওয়ার পর ১৮৭০ খ্রীষ্টাব্দে স্বনামধন্য মহাত্মা সৈয়দ আহমদ সাহেব লন্ডন হতে Essays on the life of Muhammed নামক পুস্তক প্রকাশ করেন। মহাত্মা সৈয়দ বিশেষ করে মূর সাহেবের মিথ্যা ও প্রবঞ্চনা এবং তার উল্লেখিত সূত্রগুলির অকিঞ্চিৎকরতা অকাট্যরূপে প্রকাশ করেন। এরপর ১৮৭৭ খ্রীষ্টাব্দে মূর সাহেবের পুস্তকের এক নতুন সংস্করণ প্রকাশিত হয়। মূর সাহেব কোন গুপ্ত ও গোপনীয় কারণে পূর্ব সংস্করনের আরবী ইতিহাস “Most of the notes, with all the reference to original authorities have been omitted —- throughout amended  (নতুন সংস্করনের ভুমিকা) । পূর্বের সবকিছুই একদম হজম করে দেন। এবং কেনই বা তা সংশোধিত হয়েছে তা সৈয়দ সাহেবের পুস্তকের সাথে মিলিয়ে দেখলে তবে বোঝা সম্ভব। তাই নীরবে সংশোধন করলেও তা প্রকাশ্যে স্বীকার করার সাহস হয় নি (মোহাম্মদ আকরম খাঁ, মোস্তফা চরিত, পৃষ্ঠা, ১৬৯)।

(২৫) হযরত বিশেষ তাগিদ সহকারে বলে যান যে, “সাবধান! খ্রীষ্টানেরা যেরূপ মরিয়মের পুত্র যীশুকে বাড়াতে বাড়াতে অসীম ও নিরাকার “পরম পিতার”আসনে বসিয়ে দিয়েছে। তোমরা যেন আমার সম্বন্ধেও সেরূপ অতিরঞ্জন করো না, আমি তো আল্লাহর একজন দাস ও তার বার্তাবহ আর কিছুই নহি (মোসলেম–মেশকাত-২৮) ।

(২৬) হযরতের শৈশবকালের অবস্থা বর্ণনা কালে মূর, মার্গোলিয়থ প্রভৃতি লেখকরা সবকিছুর মাঝেই একটা নতুনত্বের সন্ধান পান। মূর সাহেব হযরতের মৃগী রোগ প্রমাণ করার জন্য যে হিশামীর (মিথ্যা) বরাত দিয়েছিলেন, সেই হিশামিতেই এই বিবরণ বর্ণিত হয়েছে। মার্গোলিয়থ সাহেব কোন বরাত না দিয়েই বলেন, খাদিজার সহিত বিবাহের সময় খাদিজার বয়স কিছু অধিক ছিল বটে তবে যে ৪০ বৎসর হয় নাই, ইহা নিশ্চিত (মোস্তফা চরিত, ৬৬ পৃষ্ঠা) ।

(২৭) ইতিহাসের বিশুদ্ধতা রক্ষা করাও মুসলমানেরা ধর্মের অঙ্গীভূত বলে মনে করতেন। (বোখারী ও মোসলেমের হাদিছ বর্ণনা ও এছনাদ সংক্রান্ত পরিচ্ছদগুলি দ্রষ্টব্য) তারা প্রথম হতেই যেরূপ বিচক্ষনতা ও সতর্কতা অবলম্বন করেছিলেন জগতে তার তুলনা নেই। অমুসলিম লেখকগণ বিদ্বেষে অন্ধ হয়ে যে সকল মিথ্যা, জাল ও অপ্রামাণ্য হাদিস অবলম্বন করে হযরতের চরিত্রের ও ইসলামের শিক্ষার প্রতি দোষারূপ করে থাকেন, অতি সহজে তার স্বরূপ সন্ধান করা সম্ভব। এর প্রধান সূত্র কুরআন, দ্বিতীয় সূত্র বিশুদ্ধ ও বিশ্বস্থ হাদিছ এবং তৃতীয় সূত্র পরীক্ষিত ঐতিহাসিক বিবরণ। আমাদের তফসির ও ইতিহাসে অনেক বাজেমার্কা ও ভিত্তিহীন গল্পগুজবও বিদ্যমান আছে। পক্ষান্তরে ইহুদী, খ্রীষ্টান, পার্সিক প্রভৃতি জাতির অনেক সংস্কার ও বিশ্বাসও নানা কারণে ঐ সকল পুস্তকে এসে যুক্ত হয়ে গেছে। (ঐ গ্রন্থ, মোহাম্মদ আকরম খাঁ, পৃষ্ঠা ৭৮)

(২৮ ) বলা বাহূল্য যে, মদীনায় ইসলামের এই আশাতীত সফলতা দর্শনে আমাদের পরম বন্ধু খ্রীষ্টান লেখকরা যৎপরোনাস্তি মর্মাহত হলেন। মূর সাহেব একস্থানে বিলাপ করে বলেছেন, “আর তিনটা বৎসর যদি মোহাম্মদ এইরূপ অকৃতকার্য হতেন, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে ইসলামের প্রদীপ নিভে যেত। (ঐ গ্রন্থ ৩১৫ পৃষ্ঠা)

(২৯) সকল যুগের সকল দেশের সকল জাতির সমগ্র ইতিহাস সমস্বরে উত্তর দেয় যে, “পুরোহিত ও যাজক সম্প্রদায়” সত্যের প্রধান বৈরীতা করেছে অতীতেও। তাই কুরআন এর প্রতিবাদে বলে যে এরা আল্লাহকে ত্যাগ করে নিজেদের পীর ফকির এবং যাজক পুরোহিতদেরে খোদা বানিয়ে নিয়েছে। মদীনায় এইরূপ কোন পুরোহিত বা যাজক জাতি ছিল না, কোন বড় দেব মন্দিরও ছিল না, কোন তীর্থস্থান ছিল না। কাজেই মদীনার পৌত্তলিকগণ কোরেশদের ন্যায় ইসলামের নাম শুনে অগ্নিশর্মা হয়ে উঠে নাই।

(৩০) মূর সাহেব বিবি খাদিজা ও আবুতালেবের মৃত্যু বিবরণ লিপিবদ্ধ করার পর বড় আক্ষেপ করে বলেন,  A few more years of similar discouragement, and his chance of success was gone, অর্থাৎ আর কয়েকটা বৎসর মাত্র এইরূপে উৎসাহ ভঙ্গ হলেই মোহাম্মদের কৃতকার্যতার সম্ভাবনা থাকত না। (১১২ পৃষ্ঠা) মুসলমানগণ ও হযরত স্বয়ং নিরাপদে মদীনায় পৌছে যাচ্ছেন এই লক্ষ্য করে মহাত্মা মারগোলিয়থ যারপর নাই আফসোস করে বলছেন, Arabia would have remained pagan, had there be a man in Meccah who could strike a blow; who would act and be ready to accept the responsibility for acting. অর্থাৎ মক্কায় যদি এমন একটা লোক থাকতো, যে মুসলমানদের একটা আঘাত করতে পারতো এবং যে দ্বায়িত্ব গ্রহণ পূর্বক কাজ করতো তা হলে আরব দেশ পৌত্তলিক থেকে যেত (২০৭ পৃষ্ঠা, Mahomed.D.S.Margoliuth, London, 1906).

(৩১) হিজরতের সময়কার সেই স্মরণীয় ঘটনাটিতে মোহাম্মদ (সঃ) আপন সহচরকে বললেন—চিন্তিত হয়ো না, বিষন্ন হয়ো না, আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।(সুরা তওবার ৪০ আয়াত) যখন আবুবকরকে রসুল(সঃ) স্বান্তনা দিচ্ছিলেন এই আয়াতেও তার প্রমাণ বর্তমান। হাদিছেও বোখারী, মোসলেম, তিরমিজীতে এর স্বপক্ষ প্রমাণ বর্তমান। কিন্তু তারা খ্রীষ্টান লেখকেরা দেখলো মৃত্যুর বিভিষিকা দর্শনে ভীত হয়ে তিনি যীশু চিৎকার করতে লাগলেন, ‘প্রভু! তুমি আমাকে কেন ত্যাগ করলে?’ পদে পদে তাদের বাগাড়ম্বর, বাহূল্য অতিরঞ্জন লক্ষ্যনীয় তাদের লেখালেখিতে। মদীনায় হিজরতের পর প্রথম মসজিদের স্থান নির্বাচনের ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে মূর সাহেব তার গ্রন্থে বলছেন, It was a stroke of policy. His residence would be hallowed in the eyes of the people as selected super naturally; while the jealousy which otherwise might arise from the quarter of one tribe being preferred before the quarter of another, would thus received decisive check, (p-180) অর্থাৎ সংক্ষেপে দাড়ায় আপনার গুরূত্ব বৃদ্ধির জন্য তিনি চালাকি দ্বারা গোলযোগ হতে রক্ষা পাওয়ার জন্য মদীনার অবস্থান নির্বাচন সম্বন্ধে এই প্রকার উক্তি করেছেন। ঐ যে কথায় বলে না দুর্জনের ছলের অভাব হয় না

(৩২) জুমআর নামায সম্বন্ধে মারগোলিয়থের  দাবী তিনি এটিকে কাল নির্নয়ের ভ্রম বলে লিখেন যে, The adoption of Friday as a sacred day come later, at the suggestion of a Medinese, and after the relation with the Jews had become satisfactory, (214-page)  কাল নির্নয়ের অছিলায় লেখক বিশেষ চাতুরতার সাথে তার পাঠকদেরে দেখাতে চান যে, প্রথমে ইহুদীদেরে সন্তুষ্ট করার জন্য হযরত তাদের সাব্বাত বা শনিবারকে পবিত্র দিবস বলে গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু মদীনা আগমনের পরে বিরোধের কারণে শুক্রবার উপাসনার দিন সাব্যস্ত হলো। মসজিদ নির্মানের সময় মুসলমানদের সাথে সুর করে ছড়া পাঠের সময় মহানবী ওলট পালট করে ফেলছিলেন (এবন হেশাম ১-১৭৬)। এবনে হেশামে এই তথ্য থাকলেও যদিও এই আবৃতি যে সম্পূর্ণ নির্ভূল ছিল তা বুখারীর হাদিছ থেকেও জানা যায়। কিন্তু এখানেই মূর সাহেবেরা বেশ সূত্র পেয়ে গেলেন। মূর সাহেব এই সুযোগে হযরতের চরিত্রের উপর টেনে নিলেন যে, কবিতা ও ছন্দ সম্বন্ধে তার আদৌ কোন জ্ঞান নেই এটা দিয়ে তিনি তার স্বরচিত কুরআনের ছন্দবদ্ধ রচনার অক্ষমতা বুঝাতে চাচ্ছিলেন। এটা তার অন্য একটা চালাকি ছাড়া আর কিছু নয়।

(৩৩) এতকিছুর পরও একটি সত্যকে অবশ্যই সহজভাবে স্বীকার করতে হবে যে এর মধ্যে কিছু বিচক্ষণ পন্ডিত ব্যক্তি ছিলেন যারা সত্যের মানদন্ডে সঠিকের সমাদর করে গেছেন সর্বযুগেই। ষোড়শ শতাব্দীর শুরু থেকেই শুরু  হয়েছিল পাশ্চাত্যের লেখকদের ইসলামের প্রতি বিষোদগার। কিন্তু এদের মধ্যে ব্যতিক্রম ছিলেন গীবন, হীগিনস, কারলাইল ও ডেভেনপোর্ট। যাদের লেখা পড়লে স্পষ্টত জানা যায় যে, হযরত মোহাম্মদ(সঃ) সম্বন্ধে সত্য উদ্ধার ও অসত্যের প্রতিবাদ করার জন্য তারা চেষ্টার কোন ত্রুটি  করে নাই। এই শ্রেণীর ইংরেজ লেখকগণের সত্যনিষ্ঠা ও সৎসাহসের ফলেই ইসলাম ও মোহাম্মদ সম্বন্ধে পাশ্চাত্য জগতের বহু শতাব্দীর বদ্ধমূল ধারণা ও সংস্কারের ঘোর পরিবর্তন আরম্ভ হয় এবং আমাদের মতে ইউরোপে ইসলাম প্রচারের প্রথম সূচনা হয় এই সময় থেকেই। (তথ্য সূত্র মোস্তফা চরিত, ৯০ পৃষ্ঠা)

এরকম অনেক উদাহরণ আমাদের চারপাশে বর্তমান যাতে দেখা যায় কিভাবে ধর্মটির খিচুড়ীদশা ঘটানো হয়েছে। সম্ভবত শয়তান এ কাজটি তার নিজ দ্বায়িত্বে করেছে। সে এভাবেই তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে যাচ্ছে। মানুষকে সত্য থেকে ফিরিয়ে নিতে এ ধরণের খিচুড়ীদশা ধর্মটির সমূহ সর্বনাশ করেছে। আল্লাহর কালামের জায়গায় রসুলেরও নয় কখনো কখনো দেখা যায় সাহাবাদের নামে অনেক উল্টাসিধা কথা বদল করে সমাজে চালু করা হয়েছে। এ ধরণের কাজ যাদের হাত দিয়েই হোক না কেন এটা শয়তানের পাবন্দী বাড়িয়ে দিয়েছে নির্ঘাৎ। শয়তান বা ডেভিল মহানন্দে আলখেল্লার ভিতর থেকে সমাজটাকে কুরে কুরে খাচ্ছে ঠিক এভাবেই। এ লজ্জা এ সমাজের সচেতন অংশের ব্যর্থতা বৈ আর কিছু নয়! এটাই প্রমাণ করে আমাদের চেতনহীনতা কি পরিমান গভীরতর হতে পারে! কতটুকু আফিংখোর হলে আমরা এমন অধঃপাতে হারিয়ে যেতে পারি। আল-কুরআনে স্পষ্ট নির্দেশের পরও আমরা ইতস্তত করি আল্লাহর কথা শুনবো, কুরআন প্রতিষ্টা করবো নাকি কোথাও থেকে ধার করা কিছু ধারণা এনে ফাঁকতালে ঢুকিয়ে দেব! তাই প্রকারান্তরে দেখা যায় আমাদের হাত দিয়েই শয়তান তার বিজয়ের মালা বদল করে মহানন্দে তার লীলাখেলা চালিয়ে যাচ্ছে। আর আমরা নেশার ঘোরে এমনই আচ্ছন্ন যে সেটুকু উপলব্ধি করার অনূভূতিটুকুনও যেন হারিয়ে ফেলেছি।

মূর, মারগালিয়থদের এসব গাজির পুথি বলতে গেলে শেষ হবার নয়। এবং তাদের সাথে সাথে কিছু সংখ্যক সৎ সন্ধানী লেখকদের উদাহরণ সত্যের এক নির্জলা প্রমাণ। মিথ্যারা কখনোই চক্রান্ত করে টিকতে পারে না। সর্বযুগেই সত্যের জয় অবশ্যম্ভাবী। আমাদের যাদের আজো নিদ কাটে নাই তাদের একটু চেতন ফেরানোর ও চিন্তা করা উচিত এসব ব্যাপার সম্বন্ধে। এ লেখাটি আমি মূর সাহেবের কুৎসার কারণেই লিখছি না শুধু, আমাদের অনেক অপরিনামদর্শিতার গলদ আছে তাই সর্বাগ্রে হোক নিজেদের সংশোধন সেটাই কাম্য। শ্রেষ্ঠ গ্রন্থটি ধারণ করে বসে থেকে আমরা যদি অন্ধত্ব, বোবাত্ব, পঙ্গুত্বের স্বীকার হই, তবে সে দুঃখ সে বেদনা রাখবার জায়গা কোথায়।  কথা ছিল মুসলিমদের এই গুরু দ্বায়িত্ব সঠিক ভাবে পালন করার,  স্মরণ রাখা উচিত – জবাবদিহিতার দায়ও তাদের অতিরিক্ত বটে!

সুসংগ্রহঃ

(ঐশী) গ্রন্থপ্রাপ্তদের মাঝে যারা অবিশ্বাস পোষণ করে তারা এবং মুশরিকরা চায় না যে তোমাদের প্রভূর কাছ থেকে কোন কল্যান তোমাদের প্রতি নাযিল হয়, কিন্তু আল্লাহ তার করূণার জন্য যাকে ইচ্ছা করেন – মনোনীত করেন, আর আল্লাহ অপার কল্যাণের অধিকারী। (সুরা বাক্কারাহএর ১০৫ আয়াত)

তথ্যসূত্র:

(১) “Mahomed”. D.S.Margoliuth, London, 1906

(২) “Life of Mohammad” by Willium Muir.

(৩) Van Hammer 3rd edition 21 26 pages (cross ref Muhammad Akram Kha Mustafa Charit)

(৪) “Mukaddama” by Ibne Khalledun.

(৫) Dr Spranger’s “life of Muhammad”.

(৬) Father Jerome Dandini র “A Voyage to Mount Lebanus”.

(৭) স্যার সৈয়দ আহমদ সাহেবের লিখিত Essays on the life of Muhammed.

(৮) (মোসলেম–মেশকাত-২৮)

(৯) মাউজুয়াতে কবির ।

(১০) (জাদুল-মাআদ, ১ম খন্ড, ১৪-১৭ পৃষ্ঠা)।

(১১) (কেতাবুল তাওয়াচ্ছোল-৯৬পৃষ্ঠা)।

(১২) (History of Charles the Great, ৬-৭ পৃষ্ঠা, T. Rodd কর্তৃক অনুবাদিত (১৮১২) ।

(১৩)Father Jerome Dandini র “A Voyage to Mount Lebanus”।

(১৪) (এবন হেশাম ১-১৭৬)।

(১৫) মোহাম্মদ আকরাম খাঁ লিখিত “মোস্তফা চরিত”।

 

 

Tag Cloud

%d bloggers like this: