Articles published in this site are copyright protected.

নাজমা মোস্তফা

(পূর্ব প্রকাশের পর) (৩)

ইতিহাস বলে ভারতের বাহির থেকে আগত আর্যরা ককেসাস পর্বত পার হয়ে মেসোপটেমিয়া ও এশিয়া মাইন থেকে আর্যদের আগমন। কেউ কেউ মধ্য এশিয়ার বদলে পূর্ব ইউরোপকে আর্যদের আদিবাস কেন্দ্র বলেন (সূত্র: বিনয় ঘোষ, ভারতজনের ইতিহাস, পৃষ্ঠা ৭০)। সিন্ধু নদীর অববাহিকায় যে সভ্যতার বিকাশ ঘটে তাই সিন্ধু সভ্যতা। হিন্দু কোন ধর্মের নাম নয় বরং সভ্যতার নাম। ভারতের আদিবাসী দ্রাবিড়। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় দেখা গেছে ইসলাম ও মুসলিমদের বিষয়ে অতীতেও নানা বই পুস্তক প্রবন্ধ নাটক চলচিত্র সংবাদপত্র প্রচার মাধ্যম রেডিও টিভির মাধ্যমে ভুল ম্যাসেজ ছড়ানো হয়েছে। কৌশলে দেখানো হয়েছে ভারতীয় মুসলিমরা বিদেশী, এরা মিত্র নয় বরং শত্রু আর বাকী সবাই স্বদেশী। ভারতীয় মুসলিমদের রচিত ইতিহাস ও বাস্তবতাকে খোদ রবীন্দ্রনাথ বলেছেন বিদেশী মুসলমান রচিত এসব মিথ্যা ইতিহাস (সূত্র: লেখক আবু ফাতেমা মোহাম্মদ ইসহাক)। এই দেশী বিদেশী মারপ্যাচে ভারতের জনতাকে পথহারা করতে প্রচার মাধ্যম, ইতিহাস সংবাদ, সাহিত্য, লেমটন লেকচার, এসব মাধ্যমকে হাতিয়ার হিসাবে নেয়া হয়। সং¯ৃ‹তিবানরা বৃটিশ তোষণে কার্পণ্যতা দেখান নি। যারা ভারতের সম্পদ লুটে নিয়ে অন্যত্র নিজেদের দেশকে সমৃদ্ধ করে তারা বরণীয় পূজনীয় হয় আর যারা নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়ে ভারতের মাটিতে নিজের ও প্রজন্মের একমাত্র ঠিকানা গড়ে সত্য প্রতিষ্ঠায়; সকল প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে সত্য ও সুন্দরের জন্য আল্লাহর আদেশ মেনে লড়ে যায় তারাই বিদেশী, ভারতে মোদিরা আজো ভাবে তাই। তারা মুসলিমদের ধ্বংস চায়। বাকী সব আর্যদের (?) জন্য দরজা খোলা, শুধু মুসলিমদের জন্য তালা ঝোলা। সেই বৃটিশ নির্গমনের পর থেকে আজো ভারত মুসলিমদের সাথে একতরফা বিমাতাসুলভ আচরণে তারা দক্ষ। এরাই একমাত্র সংখ্যালঘু দল যাদের অবদানে অর্জনে ঋণে ভারত আকন্ঠ নিমজ্জিত। মানবিকতা মাপার স্কেল তাদের অনেক ক্ষেত্রেই বিলুপ্ত। অকৃতজ্ঞতা একটি নিকৃষ্ট আচরণ, বিধাতার দৃষ্টিতে এটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সাম্প্রতিক ও নিকট অতীতে ভারতের মুসলিমরা আজো পরাধীন, বলাটা ভুল নয়। 

মিথ্যা অপশক্তিকে চিহ্নিত করে যদি সত্য স্পষ্ট হয়, সেটি কি সত্যের অপরাধ? ন্যায়ের ঝান্ডা হাতে মিথ্যার বিনাশে এই মুসলিমরা নিজের জীবনের সাথে ভারতের জীবনকে একসূত্রে গেঁথেছেন বলেই তারা ৭০০ বছরেরও বেশী এ দেশ শাসন করে তারাই সত্য সৈনিক, পথের দিশারী, স্বাধীনতার স্বপক্ষ শক্তি, স্বদেশী। বাকীরা বেশ বড়মাপে শোষক, নির্যাতনকারী সত্যবিনাশি মিথ্যার প্রতিষ্ঠাকারী। মূল সত্য শক্তিকে হটিয়ে দিতে বাকীরা কি করেছেন ইতিহাস দিয়ে সেটি পরখ করেন। ইতিহাসবিদ আমীর আলী বলেন, “মুসলমানগণ ইংরেজী শিক্ষার প্রয়োজন উপলব্ধি করার আগেই সরকারী অফিসের দ্বার তাদের জন্য রুদ্ধ হয়। (এস, এ রশিদ, ন্যাশনাল মহামেডান এসোসিয়েশন, ১৭-১৯)। ১৮৬৯ সালে ‘দূরবীণ’ নামের কলকাতার একটি ফার্সি সংবাদপত্র লিখে, “ছোটবড় সকল সরকারী পদ মুসলিমদের থেকে কাড়িয়া নেয়া হয় এবং অন্য সম্প্রদায়কে বিশেষ করে হিন্দুদেরে দেয়া হয়।” এ পত্রিকা আরো প্রকাশ করে সুন্দরবনের কমিশনার তার অফিসে শুধু হিন্দু প্রার্থীর দরখাস্ত আহবান করেন (হান্টার, প্রাগুক্ত, ১৫৯-১৬৭)। হান্টারের মন্তব্য ছিল, চাকরি ক্ষেত্রে মুসলিমদেরে এমনভাবে বাদ দেয়া হয় যে, কলকাতার অফিসগুলোতে চাপরাশি, কলম মেরামতকারী, এসব ব্যতীত অন্য কোন কাজে মুসলিমরা নেই বললেই চলে (সূত্র: ঐ)। ১৮৭১ সালে কলকাতার একটি বড় অফিসে খোঁজ নিলে জানা যায় সেখানে মুসলিমদের ভাষা পড়তে পারে এমন একজন লোকও নেই (এম এ রশিদ ২০-২৩)। আমীর আলী বলেন, গত বিশ বছর যাবত মুসলিমরা আগ্রাণ চেষ্টা করেও চাকরীতে দ্বার রুদ্ধ করে রাখায় তারা ঢুকতে পারে না। যদি কেউ সৌভাগ্যক্রমে ঢুকে তবে তা রক্ষা করাই তার জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ তাকে তাড়াবার জন্য অফিসে ষড়যন্ত্র চলতে থাকে (এম এ রশিদ ২৫-২৬)। ভাবতে অবাক লাগে সে মাটিতে আম জনতার মাঝেও বিবেক সম্পন্ন হিন্দুর উপস্থিতি কম; কোন বিশেষ কারণে মানবিক হিন্দুর সংখ্যা সবদিন অল্প। এটি সবাই স্বীকার করবেন তাদের এ প্রকৃতি আঁচ করতে পারে চতুর বৃটিশরা। তাই তারা হয় বৃটিশের দেশবিধ্বংসী সহযোগী। দেশ মাতৃকার সাথে প্রতারণায় তারা বড় মাপে ধরা খায়।

এরকম অবস্থায় একবার মুসলিমরা চাকরীর দাবী জানালে রবীন্দ্রনাথের জবাব ছিল “প্রভুর খানার টেবিলের নীচে নিক্ষিপ্ত খাদ্য টুকরার জন্য যে কোলাহল উত্থিত হইয়াছে, ইহা সমর্থণ করায় শুধু যে নীচতা আছে তাহা নয়, উহা চারিত্রিক দৌর্বল্যেরও পরিচায়ক (কবির ভাষণ থেকে, ১৯৩৭ সালের ‘মাসিক মোহাম্মদ’ থেকে উদ্ধৃত)। পাঠক লক্ষ্য করেন রবীন্দ্রনাথ বৃটিশকে প্রভু মানলেও মুসলিমদেরে কুকুরের মত নীচ পশু প্রজাতির বলে অপমান করেছেন তার ভাষণে এবং সেই কুকুর স্বভাবের মানুষগুলোর চারিত্রিক দুর্বলতাও প্রশ্নবিদ্ধ পরিচয় বলে প্রকাশ করেছেন। একদিনের চেতন সম্পন্ন মুসলিম জাতির ক্রমাগত চেতনহীন অবস্থানের জন্য এসব স্পষ্ট করা দরকার, সময়ের দাবী। হিন্দুরা সমষ্টিগতভাবে বৃটিশের ঐ হিংসা পরায়নতাকে বগলদাবা করে নিয়েছে। কারণ বৃটিশরা এটি বুঝতে পেরেছে যে মেরুদন্ড বাঁকা হিন্দুরা তাদের সহযোগী, এদের হাত দিয়ে কোন বিপর্যয় ঘটবে না বরং এই স্বাধীনচেতা মুসলিমরাই তাদের জন্য অশনিসংকেত। উভয় সম্প্রদায়কে বিচ্ছিন্ন করতে ডিভাইড এন্ড রুলসহ বাকী সব অস্ত্র সচল রেখেছে। এসব কারণে হিন্দুরা আগাগোড়া বৃটিশের অনুগত থেকেছে, তারা নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে নির্যাতীত হয়েও পরাধীনতার শিকল গলে পরে দলিত হয়ে থেকেছে। মূলত বর্ণ হিন্দুরা কলে কৌশলে সাহিত্য রাজনীতি ও ক্ষমতায়নে কপটতার স্বাক্ষর রেখেছে। এদের কারণেই এদেশে বৃটিশ শাসন প্রায় ২০০ বছর বিলম্বিত হয়। এজন্যই হাজার হাজার মুসলিম সত্য সৈনিকরা ফাঁসিতে ঝুলে ইহ ও পরকাল দুই জাহানে বিরাট অর্জন জমা করে দেশপ্রেমের অসাধারণ অর্জন জমা করতে পেরেছেন।

প্রায়ই মানুষকে ইসলাম নিয়ে কটাক্ষ করতে শুনি, ইসলাম নাকি জীবনে কোন কিছুই করে নাই, তলোয়ারবাজি সন্ত্রাসী ছাড়া। ছলবাজরা স্বীকার না করলেও যুগের প্রকৃত মনীষারা সত্য প্রকাশ করে গেছেন। “আরবের ভিতর দিয়েই মানুষ জগতে তার আলো ও শক্তি সঞ্চয় করেছে, —– ল্যাটিন জাতি দিয়ে নয়” বলেছেন মিঃ জি সি ওয়েলস। এভাবে পৃথিবীর এক প্রাপ্ত থেকে অন্যপ্রান্ত সত্যের আলোতে বিকশিত হয়েছে। অপকর্ম করতে নয় নিজের নিরাপত্তার জন্য তলোয়ারের প্রয়োজন অস্বীকার করার নয়। তবে মোদির ভারতের মত নির্দোষের উপর তলোয়ারবাজি ইসলাম সমর্থণ করে না। অপকর্মে ঢেকে রাখা সত্য বিবেককে জাগ্রত করতে কিছু সত্য প্রকাশ করতেই হয়। একজন নির্দোষ মানুষ হত্যাকে কুরআনে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যেন গোটা মানব সম্প্রদায়ের হত্যার সমান অপরাধ (সুরা মায়েদার ৩২ আয়াত দ্রষ্টব্য)। শত মিথ্যার জবাব হিসাবে এ তথ্যবহুল গ্রন্থটি একটি অনবদ্য প্রমাণ। “1001Inventions – The enduring Legacy of Muslim Civilization by Salim T.S.Al-Hassani, Chief Editor (national Geographic)”। বিজ্ঞানের প্রায় প্রতিটি বিভাগই আলোকিত করেছে মুসলিমরা। এখানে ১০০১টি আবিষ্কারের কথা উল্লেখিত হয়েছে।

তন্ত্রমন্ত্র নয়, গবেষনা দিয়ে অতীত ইতিহাস বিচরণ করে প্রথম বাণীর অনুসরণে পড়েন লিখেন সন্ধান করেন, নিশ্চিত প্রকৃত সত্য ধরা পড়বে। রসায়ন, ওষুধ বিজ্ঞান, ভূগোল, কম্পাস, মানচিত্র, সমুদ্র বিদ্যা, যুদ্ধ কৌশল সর্বত্রই মুসলিমদের জয়জয়াকার। একটি কলামে এত কথা স্পষ্ট করা প্রায় অসম্ভব। তবুও আমার ক্ষুদ্র প্রচেষ্টাকে পাঠকেরা গবেষনার সামান্য উপাত্ত সূত্র মনে করতে পারেন। ২৭৫টি গবেষনা পুস্তক রচয়িতা একজন আল কিন্দি, ৮৬০ সনে মুসলিম বিজ্ঞানীরা একশত রকমের যন্ত্র তৈরীর নিয়ম ও ব্যবহার নিয়ে গ্রন্থ তৈরী করেছেন। ৬০ জন মুসলিম ভূগোলবিদ পৃথিবীর প্রথম মানচিত্র অংকন করেন। কম্পাস, কাঁচ, লবন, পারদ, গন্ধক, আর্সেনিক আবিষ্কারও তাদের কাজ। অনেকেই জানেন গণিত বিশারদ ওমর খৈয়াম, নাসিরুদ্দিন তুসি, আবু সিনাদের মত অসংখ্যরা বহু বহু অর্জনে ময়দান আলোকিত করে রেখেছেন। হাজ্জাজ ইবনে মাসার ও হুনায়ুন ইবনে ইসহাক মানমন্দিরের প্রথম আবিষ্কারক পৃথিবীর প্রথম মানমন্দিরও মুসলিমদের হাতে ৭২৮ খৃ:, দ্বিতীয়টি ৮৩০ খৃ: জন্দেশপুরে, তৃতীয়টি বাগদাদে চতুর্থটি দামেস্কে (চেপে রাখা ইতিহাস, গোলাম আহমাদ মর্তোজা, পৃষ্ঠা ২২)। দেখা যায় নবী গত হওয়ার ১০০ বছর পূর্তির আগেই এমন অসাধারণ অর্জন জমা শুরু হয়ে যায়। স্বভাবতই জানতে চাইবেন এটি কেন কিভাবে হয়? কুরআনের প্রথম শব্দ যেটি নাজেল হয় সেটি ছিল “পড় এবং কলমের সাথে”। তার মানে পড়া ও লেখাই ছিল আল্লাহর প্রথম নির্দেশ। তাই মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে শুরু হয় গ্রন্থ রচনা করা, গ্রন্থাগার গড়া, মসজিদই ছিল প্রথম শিক্ষাকেন্দ্র, সাথে ধর্ম গড়ে দেয় পরিবারিক শৃংখলা। অতপর শুরু হয় মাদ্রাসা, মহাবিদ্যালয়, বিশ^বিদ্যালয় স্থাপন। সেদিনের মুসলিম মেয়েরা এমন কি তৎকালীন দাসীরাও অনেক বিদুষী সম্মানিতা ছিলেন কারণ তারা কবর থেকে উদ্ধারপ্রাপ্তা মুক্ত স্বাধীন জনতার অংশ। অল্প কথায় বিজ্ঞানের বিকাশের শুরুটা মুসলিমদের হাতে, আর এ বিজয়ের মূল কারণ অলৌকিক গ্রন্থ কুরআন ও তার পথনির্দেশ মানা দক্ষ মুসলিমদের আত্মায় অন্তরে ঐ সত্যকে গ্রহণ বরণ ও পালন। স্বভাবতই প্রশ্ন আসবে আজ মুসলিমদের কি হলো, প্রশ্নটি জমা রাখুন আমরা আসবো সেখানে আমাদের ব্যর্থতা আমাদের খুঁজতেই হবে। আমরা খুঁজবো। মনের মাঝে শুধু একটি আশা পুতে রাখুন আমরাই হবো আ’লা যদি আমরা সত্যবিমুখ না হই।

“শার্লেমেন ও তার লর্ডরা যখন নাম দস্তখত করতে শিখছিলেন, তখন আরব পন্ডিতেরা আরাস্তুর (এরিস্টটল) এর গ্রন্থ অধ্যয়নে ব্যস্ত ছিলেন। কর্ডোভার বিজ্ঞানীরা সতেরোটি বিরাট লাইব্রেরী নিয়ে গবেষণা করতেন। তার একটি লাইব্রেরীর বইএর সংখ্যা ছিল ৪ লক্ষ। সে পন্ডিতেরা যখন পরম আরামদায়ক গোসলখানা ব্যবহার করতেন তখন অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে শরীর ধোয়াকে এক ভয়ংকর অনাচার বলে বিবেচনা করা হতো। “আরব জাতির কাহিনী আমাদের কাছ এত গুরুত্বপূর্ণ এর কারণ, এর মূলে আছে এমন এক মহান ধর্ম প্রবর্তকের সাধনার কথা যিনি নিরাকারের উপাসনায় পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ  তিনজন ধর্ম সাধকদের মাঝে তৃতীয় ও আধুনিকতম অবস্থানে এবং তাঁর ধর্ম ইহুদী ও খৃষ্টানের সাথে সম্পৃক্ত” (আরব জাতির ইতিকথা, পৃষ্ঠা ৪, ফিলিপ কে হিট্টি, অনুবাদে অধ্যক্ষ ইব্রাহিম খাঁ)।

মুসলমানদের প্রত্যক্ষ প্রভাবেই ইউরোপে সরকারী গোসলখানা প্রবর্তিত হয় (ঐ ২১৬ পৃ:)।  ইসলামের বিজয় কতকটা ছিল একটি ভাষার বিজয় – একটি গ্রন্থের ভাষার বিজয় । কবিতা প্রিয়তাই ছিল বেদুইনদের একমাত্র সাংস্কৃতিক সম্পদ। সেদিনে কবিরাই ছিলেন মরু সমাজের প্রেস এজেন্ট ও সাংবাদিক (ঐ, ২৩ পৃ:)। — কবিতা আরবের পাবলিক রেজিষ্টার (ঐ, ২৪ পৃ:)—ঐ আমলে আরবে কুরআনই প্রথম গদ্যগ্রন্থ ছিল এবং আজো আদর্শ গদ্যগ্রন্থের আসনে প্রতিষ্ঠিত রয়েছে (৪১ পৃ:)। নামাজের ময়দানই ইসলামের প্রথম ড্রিলের ময়দান (৪৫পৃ:)— কুরআনই আল্লাহর শেষ প্রত্যাদেশ, সমস্ত মোজেজার মধ্যে কুরআন শ্রেষ্ঠতম মোজেজা (৪৩ পৃ:)” (ঐ)। চিকিৎসা বিজ্ঞানের একজন আধুনিক ফরাসী ঐতিহাসিক বলেন, হুনাইন নবম শতাব্দীর শ্রেষ্ঠতম মানুষ ছিলেন। তিনি ছিলেন সুদক্ষ অনুবাদকও। শাসক আল মামুন তার অনুদিত গ্রন্থ ওজন করে তাকে সেই পরিমাণ সোনা দিতেন। দুটি বস্তু চিকিৎসক হুনাইনকে কাজে উৎসাহ দিত। প্রথমতঃ ধর্ম, তাই শত্রুরও উপকার করা উচিত বলে মানতেন। দ্বিতীয়তঃ বন্ধুর জন্য তো আরো বেশী করা কর্তব্য মনে করতেন (ঐ গ্রন্থ ১১০/১১১ পৃ:)। মিঃ গীবন বলেছেন, আরবরা বিধর্মীদের গ্রন্থাদি বিনষ্ট করা পছন্দ করতেন না। তাদের ধর্মীয় নীতি এটি সমর্থণ করে না। (দ্র: গ্রন্থাগারের ইতিহাস মধ্যযুগ, শামসুল হক, ৩২ পৃষ্ঠা)। সর্বাপেক্ষা বিশুদ্ধ বক্তার মুখ ও মস্তিষ্ক নিঃসৃত বাণী লিখে সংগ্রহ করেছিলেন আবু আমর ইবনুল আ’লা যা একটি ঘরের ছাদ পর্যন্ত ঠেকে গিয়েছিল (এনসাইক্লোপেডিয়া অব ইসলাম ভল্যুয়ম ১, পৃ: ১২৭)। 

প্রথম ইসলাম গ্রহণকারী যুবক বালক পরিণত বয়সে চতুর্থ খলিফা হযরত আলী (রা:) প্রশাসন, বিদ্রোহ দমনে খুবই ব্যস্ত সময় পার করেছেন। এরপরও তার আমলে কুফার জামে মসজিদ জ্ঞানকেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। দেশ বিদেশের ছাত্ররা জ্ঞানার্জনের জন্য ছুটে যেতেন। আলী স্বয়ং ছিলেন অধ্যক্ষ (সূত্র: মুজীবুর রহমানের লেখা ‘হযরত আলী পুস্তকের ৩৬০ পৃ:, ছাপা ১৯৬৮)। উমাইয়া আমলে রাজতন্ত্রের নামে অপশক্তি ঢুকলেও ইসলামের জ্ঞানলব্ধ কাজ থেমে থাকে নাই। এ আমলেই ব্যাকরণ, ইতিহাস, স্থাপত্য বিদ্যার কাজ এগিয়ে চলে। উমাইয়া আমল হচ্ছে উন্নতির যুগ ‘ডিমে তা দেয়ার যুগ’ (সূত্র: হিস্ট্রি অব দ্যা আরবস, ২৪০ পৃ:)। যদিও রাজতন্ত্রের এ পরিণতি পরবর্তিতে সুখকর হয়নি। নবীর গঠনতন্ত্র বিরোধী এ খাদ ইসলামকে সার্বিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

খলিফা মামুনের বিরাট গ্রন্থাগারের লাইব্রেরিয়ান ছিলেন মুহাম্মদ ইবনে মুসা আল খাওয়ারিজমী, প্রথম বিজগণিতের জন্মদাতা, শ্রেষ্ঠ গণিতজ্ঞ। পড়া লেখা ও পর্যটনে তিনি দক্ষতার সাথে কুরআনকে অনুসরণ করেছেন। কিতাবুল হিন্দ নামের গ্রন্থে তিনি শূণ্যের অপরিসীম মূল্য তোলে ধরেন, এই শূণ্যের জন্মদাতাও তিনি। খলিফার অনুরোধে তিনি আকাশের মানচিত্র আঁকেন, পঞ্জিকার জন্ম দেন। সরকার উপাধি দেয় ‘সাহিব আলজিজ’ নামে (সূত্র: সমরেন্দ্রনাথ সেনের লেখা বিজ্ঞানের ইতিহাস, ২য় খন্ড, পৃ: ১২৬, ১৩৬৪) ও (‘চেপে রাখা ইতিহাস’ গোলাম আহমাদ মর্তোজা)।

১৩২৭ সালে একজন দূর ভ্রমণকারী বাগদাদে আসেন আর তিনি দেখতে পান যে, শহরের পশ্চিম অংশের তেরটি বাড়ীর প্রতিটিতে দুই হতে তিনটি ব্যাপকভাবে সজ্জিত গোসলখানা আছে। এবং প্রত্যেক গোসলখানায় গরম ও ঠান্ডা পানির ব্যবস্থা আছে। (১১৭ পৃষ্ঠা, আরব জাতির ইতিকথা গ্রন্থ)। নবী বলতেন বিজ্ঞানের দুই শাখা ধর্ম শাস্ত্র ও চিকিৎসা শাস্ত্র। তারাই প্রথম ঔষধ বিক্রেতার দোকান স্থাপন করে। প্রথম ফার্মাকোপিয়ার মূল তারাই। খলীফা আল মামুনের আমলেই ফার্মেসীওয়ালাদের (ঔষধ মিশ্রণকারী) একটি পরীক্ষা পাস করতে হতো। চিকিৎসককেও পরীক্ষা দিতে হতো। একটি অনাচার ধরা পড়ায় ৯৩১ সালে একজন সুবিখ্যাত চিকিৎসককে খলিফা হুকুম দেন যে, উক্ত চিকিৎসক বাকী সমস্ত চিকিৎসককে পরীক্ষা করবেন এবং কেবল উপযুক্ত ব্যক্তিদেরই সনদ দেবেন। ঐ সময় বাগদাদে ৮৬০ জনের উপর চিকিৎসক এ পরীক্ষায় পাশ করেন। এভাবে রাজধানী হাতুড়ে ডাক্তারদের হাত থেকে বেঁচে যায়। চিকিৎসকরা রোজ জেলখানাও পরিদর্শন করতেন। জনতার স্বাস্থ্যরক্ষায় এমন ব্যবস্থা ঐ সময় জগতে আর কোথাও ছিল না। নবম শতাব্দীর শুরুতে হারুনুর রশিদ পারস্যের আদেশে মুসলিম জগতে প্রথম হাসপাতাল হয়। এর অল্প দিনের মাঝে মুসলিম দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ৩৪টি হাসপাতাল গড়ে উঠে। মুসলিম হাসপাতালে নারীদের জন্য আলাদা বিভাগ ও ডিসপেনসারী থাকতো। কোন কোন হাসপাতালে থাকতো ডাক্তারী বইএর লাইব্রেরী ও চিকিৎসা শিক্ষাদানের সুযোগ (ঐ গ্রন্থ ১৩২/১৩৩ পৃষ্ঠা)।

আল রাজী (৮৬৫-৯১৫ সালে) কেবল মুসলিম জগতে নয়, সমস্ত মধ্যযুগের একজন মৌলিক চিন্তাবিদ, ও শ্রেষ্ঠ চিকিৎসাবিদদের অন্যতম ছিলেন। কথিত আছে হাসপাতালের স্থান নির্ধারণ করতে তিনি বিভিন্ন স্থানে মাংসের টুকরো টাঙ্গিয়ে রাখতেন। যে টুকরোতে কম পচন ধরতো সেখানে তিনি চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপন করার নির্দেশ দিতেন। সার্জারিতে তাকেই সিটনের আবিস্কারকর্তা বলা হতো। আরব চিকিৎসা শাস্ত্রে আল রাজীর পরেই ইবনে সীনার ক্যানন গ্রন্থ বিশ^কোষসম সে যুগের চিকিৎসা শাস্ত্রের শীর্ষে অবস্থান করতো এবং ইউরোপে পাঠ্য পুস্তক হয়ে  ছিল। এভাবে ইসলামই ইউরোপকে আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গির দিকে নিয়ে যায় দ্বাদশ থেকে সপ্তদশ শতাব্দী পর্যন্ত। পাশ্চাত্য জগতের চিকিৎসা বিজ্ঞানে এ গ্রন্থই পথ প্রদর্শক হিসাবে ছিল। ডাক্তার উইলিয়াম ওসলারের ভাষায়, “এ গ্রন্থটি অন্য যে কোন গ্রন্থের চেয়ে দীর্ঘতর সময় মেডিক্যাল বাইবেল হিসাবে টিকে ছিল”(ঐ গ্রন্থ ১৩৩/১৩৪/১৩৫ পৃষ্ঠা)। 

(চলবে)

লেখার সময়: ৬ ডিসেম্বর ২০১৯।

 

বি দ্রষ্টব্য: লেখাটি নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত ‘দি রানার নিউজ’ সাপ্তাহিকে ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯ সংখ্যায় ছাপা হয়।

Tag Cloud

%d bloggers like this: