Articles published in this site are copyright protected.

নাজমা মোস্তফা

(লেখাটি অনেক লম্বা ও পুরোনো লেখা ২০০৭ সালের তবে কোথাও প্রকাশ হয়নি, ধৈর্য্য ধরে পড়তে হবে।)।

শিরোনামটি বাংলাদেশের মানুষের কাছে একটি পুরোনো প্রসঙ্গ। এক মেয়ে অতি সম্প্রতি আমার কাছে জানতে চায় তসলিমা সম্পর্কীত কথা। কারণ সে ধরে নেয় এ মানব দরদী মহিলা ধর্মকে গালি দিয়ে অনেকের কাছে মহান কাজ করেছেন। সে নিজেও অনেক সময় তাই মনে করতো। মেয়েটি আমার কাছে ব্যখ্যা চায় আমি সংক্ষেপে তাকে জবাব দেই ই-মেইলে। সে বাংলা পড়তে পারে না। যে কোন জিনিসের প্রশ্ন হলে তার উত্তর দেয়া প্রাসঙ্গিকতার পর্যায়ে পড়ে। এ ক্ষেত্রে তসলিমা প্রসঙ্গ টানার আরেকটি কারণ সেই মেয়ে এর মাঝে একটি কান্ড করে বসেছে সত্য মিথ্যার বোধ হারিয়ে সে মরিচিকার পিছনে ছুটে গিয়েছে। সে ধর্মের বারোটা বাজিয়ে নিজের জীবনকে যুদ্ধের মাঠে নামিয়ে দিয়েছে। ধর্ম ছেড়েছে, ঘর ছেড়েছে, জীবনকে বাজি রেখে সে ডিগবাজী খাচ্ছে। স্বভাবতই আমি তার জীবন নিয়ে উদ্বিগ্ন। আমার এ লেখার এটি একটি বড় কারণ। এটি একটি মাত্র মেয়ের ঘটনা হলেও আজ একেও আমি বড় করে দেখছি। চিন্তার ক্ষেত্রে এটি নিছক ছোট কোন ঘটনা নয়। নয়তো এ পুরোনো কাসুন্দি ঘাটার ইচ্ছে ছিল না মোটেও। শুনেছি তসলিমাও চান সব সময় খবরের লাইম লাইটে থাকতে। কিন্তু নানা কারণে অনেক সময় প্রয়োজনেও পুরোনো কাসুন্দি নাড়তে হয়।

অতি সম্প্রতি প্রথম আলোর ব্যাপারে সারা দেশ জুড়ে যে কার্টুন বিদ্রোহের সংবাদ পাচ্ছি, আবার ‘সাপ্তাহিক ২০০০’ পত্রিকায় দাউদ হায়দারের আত্মজীবনীমূলক রচনা ‘সূতানটি সমাচার’ যেটি প্রকাশের আগেই বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে (মন্দের ভালো)। পত্রিকার মারফতে জানতে পারি অপ্রকাশিত লেখাটিতে নবী মোহাম্মদ(সঃ) এর নাম, রমজান নিয়ে কটাক্ষ, মক্কা শরীফ বা কাবা শরীফকে পতিতালয়ের সাথে তুলনা করা হয়েছে। কার্টুনটি আমি দেখেছি কিন্তু লেখাটি যদি সত্যি এভাবে লেখা হয় তবে মুসলমানদের জন্য এটি অবশ্যই সীমাহীন বেদনার কারণ, এটি স্বীকার্য। সব মিলে মনে হয় তসলিমার সেই খোড়া রোগে এখনো অনেকেই ভুগছেন, নাহলে রমজানের এ সংযমের সময়টিতে ইসলামের শ্রেষ্ঠ পথ প্রদর্শক নবী মোহাম্মদকে নিয়ে রংরস করার কথা ছিল না মোটেও। ‘মোহাম্মদ’ এবং ‘মক্কা’ দুটি একটির সাথে আরেকটি একসূত্রে গাঁথা। এখানে একজন স্বনামধন্য মানুষ এবং একটি স্থানের নাম ঐ ব্যক্তির জন্মের সাথে আসা যুদ্ধের ময়দান। এ এমন এক ব্যক্তি যাকে যুগে যুগে স্কলাররা সম্মানের তালিকায় উঠিয়েছেন তাকে কোন স্পর্ধার বলে হালকা ভাবে দেখছে এরা। তার মানে এটি নয় যে তারা খুব জ্ঞানী বরং এটি প্রমান করে এরা কতটা অসচেতন, সঠিক সত্যের সন্ধানে এরা শতভাগ অন্ধত্বের শিকার, এদের সুচিকিৎসার প্রয়োজন। এবার আমি মাত্র কিছু ঐতিহাসিক ব্যক্তির নাম উল্লেখ করতে চাই যারা এ সম্মানিত জনের ভূয়সী প্রশংসা করে গেছেন। তারা হচ্ছেন জর্জ বার্নার্ড শো, মহাত্মা গান্ধী, প্রফেসর কে এস রামকৃষ্ণ রায়, এস পি স্কট, রেভ বি মার্গালিউথ, এডওয়ার্ড গীবন, স্যার থমাস কার্লাইল, ষ্টেইনলি লেনপুল, রেভারেন্ড বি স্মিথ, এম এইচ হাইন্ডম্যান, হারকিউলস-দ্যা গ্রেট রোমান এম্পায়ার, উইলিয়াম মন্টোগোমারী ওয়াট। এরা অনেক আগের লেখক এবং মোটেও কাঁচা অর্বাচিন নন, এটি নিশ্চয় বর্তমানের হিরোরা অস্বীকার করতে পারবেন না। যারা বর্তমানে হিরো হবার বাসনায় পরিশ্রম করছেন, এরা কি মনে করেন যে বিদ্যায় বুদ্ধিতে তারা জগতসেরা, সবকে ছাড়িয়ে গেছেন। এ বিতর্ক প্রতিযোগিতা তারা নিজেরাই করতে পারেন। বেওকুবের মতো অন্যকে আছাড় দিতে গিয়ে নিজেরা আছাড় খেয়ে উল্টানো একমাত্র অর্বাচিনের পক্ষেই সম্ভব।

অতীতে দেখা গেছে ধর্মকে গালি দিতে বিধর্মী সাম্প্রদায়িক লেখকরা সাহিত্য করেছেন ঠিক এভাবে যে, ঢাকা শহরে খুব বেশী দেখা যায় কাক, কুকুর আর মুসলমান। সাহিত্যের সাধুর কি অসাধু তৎপরতা লেখাটিতে ফুটে উঠেছে যে কোন চিন্তাশীলেরই খুজে পাবার কথা। এখানে কৌশলে মুসলমানকে শুধু কাকের সাথে তুলনা করেই ক্ষান্ত হননি লেখক, পরম নিশ্চিন্তে কুকুরের সাথে তুলনা করে লেখক সাহিত্যিক নিজের অবস্থানও চিহ্নিত করে ফেললেন। মানবিক মর্যাদায় তার মাত্রাটা তিনি এঁকে দিলেন, তাকে এই একটি কর্ম দিয়েই মাপা সম্ভব। কার্টুনের উপর বিদ্রোহ মানলাম কিন্তু কোন ব্যাপারেই অতি বাড়াবাড়ি সীমালংঘনের লক্ষণ, ভালো নয়। সেটিও মনে রেখে চলাই ভালো। কারণ বাড়াবাড়ি আল্লাহরও অপছন্দের রাস্তা। এই রমজান মাসে এটিও স্মরণ রাখলে ভালো। সবারই উচিত আইনের প্রতি সম্মান দেখানো। সঠিক উপায়ে প্রতিবাদ করার অধিকার সবারই আছে, তবে কখনোই বিশৃংখলা করে নয়। আমাদের নবীর শেখানো রাস্তা এসবের ইঙ্গিত দেয় নি কখনোই। শত সমস্যায় জর্জরিত একটি দেশ যেন বাড়তি অসুবিধার মুখোমুখি না হয় সেটিও মাথায় রেখে চলা উচিত। যারা গুড় লাগাতে চাচ্ছে যে কোন বিশৃংখলাই তাদের জন্য আশায় ভরা যদিও অশনি সংকেত। সম্প্রতি গার্মেন্টস নিয়ে যে রংরস শুরু হয়েছে এর সমাধানেও কর্তৃপক্ষের সঠিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। প্রয়োজনে প্রত্যেকের পাওনা সাধ্যমতো সঠিক উপায়ে শোধ করে এর চালিকা শক্তিটুকু টিকিয়ে রাখার উদ্যোগ নিলেই মঙ্গল। সর্বাবস্থায় ‘দেশ সবার উর্ধ্বে’ একথাটি জনতাদের মাথায় রাখতে হবে। কিন্তু অবশ্যই সাবধান থাকা ভালো যে – কে বা কারা কি করতে পারে, কোন সাপ কতটা বিষ ধারণ করছে সেটি অবশ্যই একজন মাঠকর্মীর জানা দরকার।

দেখা গেছে রাজনীতির নামে বছরের পর বছর এসব করেছেন আমাদের সোনার সন্তানেরা, বিশৃংখলা সৃষ্টি করে গাড়ী ভাঙ্গার মতো কাজ যেন নিজের গায়ে নিজে কেরোসিন ঢেলে আগুন দেয়ার মতো কাজ। এসব থেকে দেশবাসীর দূরে সরে দাড়ানো অবশ্যই দরকার। দেখা গেছে এবারেও শ্রমিকরা গাড়ীতে আগুন ধরিয়েছে, দেখে দেখে খারাপ জিনিসটি শিখে নিতে কারোরই বেগ পেতে হয় না। গার্মেন্টএর মালিকের গাড়ীটিও কিন্তু দেশেরই সম্পদ। দুস্কৃৃতিকারী ধরা পড়লেও দুষ্টু ছেলের শাস্তি হচ্ছে কিন্তু জমা করা মালপানিটা যাচ্ছে দেশবাসীর জমা খাতায়। দুস্কৃতিকারীর দৃষ্টিতে দেখলেও সে এ টাকা উড়িয়ে দেয় কারণ অন্যায়ভাবে অর্জিত সম্পদ মঙ্গল আনে না। যে গাড়ীটি ভাঙছে এটি তার নিজেরই দেশের সম্পদ। সুতরাং তাকে গাড়ীটি ভাংতে সবাই একযোগে বাধা দিন। এ বোধটুকু প্রতিটি জনতার অন্তরে জাগাতে সমর্থ হোন। সব লুটেরা ধরা পড়লেও সম্পদ একত্রিত হচ্ছে দেশের জমা খাতায়। রাগ পাপীর উপর দোষীর উপর থাকতে পারে, জিনিসের উপর সম্পদের উপর রাগ, এটি শুধু বোকামীর অর্জন। একমাত্র বুদ্ধিশুদ্ধিহারা পরগাছা যারা, তারা এই হীনমন্য কাজ করে। তারপরও কথা আছে পাপকে ঘৃণা করো, পাপীকে নয়।  নিজের দেশটিকে নিজের একটি পর্ণ কুটির এটি সবার ভাবনায় রাখা জরুরী। কুটিরের ছাদ উড়ে গেলে সব ঝড়ঝাপ্টা নিয়ে বেঁচে থাকা যে দুঃসাধ্য সেটি মাথায় রাখুন। তবে দেখা গেছে সুমতি সব সময় কাজ করেনা, দুর্মতিরই জয় কেন হয় এটিও পরখ করা দরকার।

অনলাইনের একটি ওয়েভসাইট ‘সদালাপে’ আমার গ্রন্থ ‘তসলিমার কলামের জবাব’ বইটি ছিল। আমার মূল বইটিতে ‘র’ সম্পর্কিত বাড়তি অংশটুকু ছিল না কারণ ‘র’এর এই যোগসূত্র আমার আগে জানা ছিল না। বেশ আগে ওখানে একজন মন্তব্য করে এটি উল্লেখ করেন যে আমি আমার লেখাতে তসলিমার ‘র’ সম্পর্কীত বিষয় তেমন খোলাসা করিনি। ঐ খোলাসা করতে অনেক তথ্য আমি জানতে পারি লেখক আবু রুশদ এর লেখা গ্রন্থটিতে। যে কেউ এটি পড়ে নিতে পারেন। আমি ধরে নিয়েছি এটি অনেকেই জানেন তাই ও বিষয়ে বেশী নাড়ি নাই মূল গ্রন্থে ‘র’ সম্পর্কিত তথ্যটি দেই নি। মনে হতে পারে আমার যুক্তি কম। তবে এটি ঠিক কালের ধারায় থলের বিড়াল বেরিয়ে পড়ার সম্ভাবনা থেকে সত্য উন্মোচিত হয়ই, এভাবে মিথ্যা পালায়। স্মরণ করছি আর একটি বই এই ‘র’ সম্পর্কীত সম্প্রতি পুরষ্কার প্রাপ্ত হয়েছে বইটির নাম ‘র এ্যান্ড বাংলাদেশ’ লিখেছেন সাংবাদিক এবং গবেষক জয়নাল আবেদীন। লন্ডন ইন্সটিটিউট অব সাউথ এশিয়া সংক্ষেপে ‘লিসা’ তাকে সম্প্রতি পুরষ্কৃত করে। বইটি লিখা হয় ১৯৯৫ সালে। বইটিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের আগে ও পরে ঐ গোয়েন্দা সংস্থাটির অশুভ গোপন তৎপরতা উন্মোচন করা হয়েছে। বইটিতে শেখ মুজিবুর রহমান এবং জিয়াউর রহমানের হত্যাকান্ডে ইন্ডিয়ার ভূমিকার নেপথ্য কথাও তুলে ধরা হয়েছে। এওয়ার্ড বিষয়ক সাম্প্রতিক খবরটি আমাকে এ তথ্যটি দিতে উদ্বুদ্ধ করে, যদিও বইটি আমার পড়ার সুযোগ হয়নি।

আবু রুশদের বই: এবার আমি এ আর্টিক্যালটিতে লেখক আবু রুশদের লিখিত বাংলাদেশে ‘র’। এ সম্পর্কীত তথ্যাবলী ‘রিচার্স এন্ড এনালাইসিস উইং’ সংক্ষেপে ‘র’ এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন কংগ্রেস নেত্রী ইন্দিরা গান্ধী, এক্ষেত্রে বেছে বেছে কংগ্রেস সমর্থকদেরেই এখানে নেয়া হতো। এটি ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার নাম। প্রায় সমগ্র বিশে^ই এর নেটওয়ার্ক আছে। বিশেষ করে বাংলাদেশসহ উপমহাদেশের ছোট ছোট দেশগুলোর রাজনীতিতে এরা বিশেষভাবে তৎপর। লক্ষ্য করা যায় ৯১ সালের জুন জুলাই মাস থেকেই বাংলাদেশের প্রায় সকল সরকারী, আধাসরকারী প্রতিষ্ঠান, শ্রমজীবি, পেশাজীবি সংগঠনে ব্যাপক অসন্তোষ ও আন্দোলন নাড়া দিয়ে উঠে। একের পর এক শুরু হয় ধর্মঘট, জ¦ালাও পোড়াও ইত্যাদি। এসবের পিছনে সুপ্ত কারণ হিসাবে সে সময় পত্রিকায় প্রকাশিত একটি খবর ছিল এরকম ‘ইতিমধ্যে ‘র’ এজেন্টদের তৎপরতা লক্ষ্যনীয়। তাদের পরিকল্পনার উদ্দেশ্য হলো দেশে এক অস্থির পরিস্থিতি সৃষ্টি করা যাতে সরকার সন্ত্রাস, হরতাল, ধর্মঘট, কর্মবিরতি খুন, ডাকাতি বেড়ে চলে। দৈনিক নাগরিকের ২৭ জানুয়ারী ৯২ সংখ্যায় এক রিপোর্টে জানা যায় সরকারের ভিতরে বাইরে বিভিন্ন স্তরে ৩০ হাজার ‘র’ এজেন্ট তৎপর। মন্ত্রী, এমপি, আমলা, রাজনীতিবিদ. শিল্পপতি, ব্যবসায়ী, বুদ্ধিজীবি, লেখক, কবি সাংবাদিক, সাহিত্যিক, শিল্পী, প্রকাশক, অফিসার, কর্মচারী ইত্যাদি পর্যায়ের লোকজনই শুধু নয় ছাত্র, শ্রমিক, কেরানী, পিয়ন, রিকশাওয়ালা, ঠেলাওয়ালা, পোর্টার, কুলী, টেক্সি ড্রাইভার, ট্রাভেল এজেন্ট, ইন্ডেন্টিং ব্যবসায়ী, সিএন্ডএফ এজেন্ট, নাবিক, বৈমানিক, আইনজীবিসহ বিভিন্ন স্তরে তাদের এজেন্ট সক্রিয় রয়েছে। এ ছাড়া সারা দেশে ছড়িয়ে জালের মত বিস্তার করে আছে ৬০,০০০ ‘র’ এজেন্ট।

ভারতের বন্ধুত্বের আড়ালে শত্রুতা: দেখা যায় ভারতের এক বিরাট সমস্যাই সাম্প্রদায়িক সমস্যা। ভারতীয় ‘র’ তাদের রাজনৈতিক কৌশল হিসাবে তসলিমা নামের ‘ছাই ফেলতে ভাঙ্গা কুলো’ হিসাবে ব্যবহার করেছে। বাংলাদেশে যখন বাবরী মসজিদ ভাঙ্গার প্রতিবাদে সংসদে নিন্দা প্রস্তাব গ্রহণ করা হয় তখন এর জবাবে ভারত বাংলাদেশকে হুমকি প্রদান করে। এরকম হুমকিতে ভারত এটি প্রকাশ করে যে, ‘বাংলাদেশে শত শত মন্দির ধ্বংস হয়েছে, সহিংস ঘটনা ঘটেছে, তাতে ভারত সরকার বাংলাদেশ সরকারের ভবিষ্যত পদক্ষেপের উপর মনোযোগ সহকারে নজর রাখবে। ভারত সরকারের এই নজর রাখার মিথ্যাচারই বর্হিবিশে^ বাংলাদেশকে সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী চিহ্নিত করার পিছনে বিরাট ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে ভারত সরকারের হুমকি প্রদর্শিত হয় ২৩ জানুয়ারী ৯৩ সালে। এর মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় শুরু হয় একুশের বইমেলা। ঐ বারের বইমেলায় প্রকাশিত হয় তসলিমার ‘লজ্জা’। বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নেই, হিন্দুদের উপর যথেচ্ছা নির্যাতন এসব গালগল্পই ছিল ঐ বইএর মূল বিষয়। এতে অবশ্যই সারা বিশে^ বাংলাদেশের ভাবমূর্তি অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বস্তুত এ রকমভাবে সংখ্যালঘু নির্যাতন ভারতে নয়, এটি বাংলাদেশে সংগঠিত হচ্ছে একটি অপরাধ, এটি ‘র’ কৌশলে প্রতিষ্ঠিত করে সার্থকভাবে। এখানে যে কেউ মনে করতে পারেন এটি একটি উপন্যাস কিন্তু এর ভিতরের বক্তব্যকে কৌশলে ঢাল হিসাবে এমনভাবে এমন সময়ে ব্যবহার করে দেশটির বিরুদ্ধে ‘র’ চরম প্রতিশোধ গ্রহণ করে। তাই এরকম কোন মিথ্যাচারী লেখাকে অবলম্বন করে একটি হিংসার ময়দান তৈরী হয়। এসব থেকে জানার শিখার অনেক আছে। জাতি যেন অতীত থেকে শিখে প্রকৃত সত্যটি জেনে সঠিক কাজটি করে। গাড়ি ভাংচুর করে নয়,  চিন্তার ক্ষেত্রে প্রতিটি সচেতনকে এর মূলে প্রবেশ করতে হবে এবং এর বিপক্ষে নিজেদেরকে সেহিসাবে গড়ে তুলতে হবে। প্রতিটি ছাত্রকে, প্রতিটি সুনাগরিককে এর মর্মে প্রবেশ করতে হবে। আত্মায় অন্তরে এর মোকাবেলায় ইস্পাতকঠিন দৃঢ়তা নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। মানুষকে মানবিক মূল্যবোধে গড়ে তুলতে হবে। প্রতিটি প্রশ্নের জবাব খুজে নিতে হবে, প্রতিটি জনতা হবে আগামীর সৈনিক, এসব ষড়যন্ত্রের জবাব একমাত্র দক্ষতা দিয়ে মোকাবেলা করাই সম্ভব। বোমা দিয়ে নয়, যুক্তি দিয়ে, তথ্য দিয়ে, সত্য দিয়ে অসত্যকে রুখে দিতে হবে। অসৎ পথে যে হাটে সে চিরদুর্বল। ‘জোঁকের মুখে চুন’ দেয়ার একটি প্রবাদ সমাজে প্রচলিত আছে, প্রতিটি ক্ষেত্রে ঐ চুন দেয়ার কাজটি করতে হবে সঠিকভাবে।

ধর্মদ্রোহিতারও উপরে তসলিমার দেশদ্রোহিতা:  ঐ তসলিমা ইস্যুতে পরবর্তীতে পাই ঐ ‘র’ সম্পর্কীত অনেক প্রমান প্রতিবেদন। এমনকি ভারতীয় বিশ্লেষকগণ পর্যন্ত তসলিমা নাসরিনের ‘র’ সংশ্লিষ্টতা সম্পর্কীত মন্তব্য প্রকাশ করেন। এদেরই একজন হলেন ভারতের ‘ইন্সটিটিউট অব স্ট্রাটেজিক স্টাডিজের গবেষক অশোক এ বিশ^াস। ৩১ আগষ্ট ৯৪ সংখ্যা ‘দি নিউ নেশন’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘Raw’s Role in Furthering India’s Foreign Policy’ শীর্ষক এক নিবন্ধে মিষ্টার অশোক বিশ^াস উল্লেখ করেন যে, বিএনপি সরকারকে বিশ^ দরবারে সাম্প্রদায়িক, সংখ্যালঘু নির্যাতনকারী হিসাবে চিহ্নিত করার জন্য ‘র’ তসলিমা ইস্যু সৃষ্টি করেছে। তিনি একে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ‘র’ এর অন্যতম বড় সাফল্য বলে মন্তব্য করেন। তার ভাষ্য মতে, এই অনৈতিক তৃতীয় শ্রেণীর লেখিকাকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে কলকাতার প্রচার মাধ্যম। তাকে পুরো আর্থিক সহায়তা দিয়েছে ‘র’এবং ‘র’ খুব ভালভাবেই জানতো যে তসলিমা ইস্যু কিভাবে বাংলাদেশের ভিতরে গোলযোগ সৃষ্টি করবে। পশ্চিমী নারীবাদী সংগঠনসহ ইসলাম বিরোধীদেরে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে উস্কে দেয়ার জন্যই লজ্জাসহ অন্যান্য উগ্র কাজে তসলিমাকে লেলিয়ে দেয়। এর প্রেক্ষিতে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিজেপিসহ অন্যান্য হিন্দু সংগঠনগুলো তসলিমার সমর্থণে এগিয়ে আসে। এছাড়া আনন্দবাজার গোষ্ঠী ব্যাপক কভারেজ দেয় তসলিমাকে। এরা লজ্জাকে প্রমান হিসাবে ব্যবহার করে। এই আনন্দবাজার গোষ্ঠীই পরবর্তীতে তাকে পুরষ্কারে ভূষিত করে। দেখা যাচ্ছে ভারতই তার আশ্রয়স্থল আজো। ১৯৯৯ সালে আবারো তিনি ফিরে যান আনন্দবাজার গ্রুপের ইঙ্গিতে। ২০০০ সালে পুনরায় তিনি ভূষিত হন ‘আনন্দ পুরষ্কারে’। বর্তমানে এই ২০০৭ সালেও তিনি ভারতে সেখানের নব্য নাগরিকত্ব আদায়ে ব্যস্ত।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ধিকৃত বাংলাদেশ: ১৯৯৩-৯৪ সালে ভারতের সর্বত্র বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে মৌলবাদী সংগঠন বিজেপিসহ অপরাপর রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা তসলিমার সমর্থণে মিটিং মিছিল এর আয়োজন করে। তার ‘লজ্জা’ উপন্যাসের হাজার হাজার কপি ছাপিয়ে বিনামূল্যে বিলি করেছে। এ ব্যাপারে কলকাতা থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক ‘কলম’ পত্রিকার ১লা আগষ্ট ৯৩ সংখ্যায় বলা হয় ‘নারী কর্তৃক পুরুষের অবাধ ধর্ষণের প্রবক্তা আনন্দ পুরষ্কার ভূষিতা তসলিমা নাসরিনের সাম্প্রতিক একটি বইএর নাম ‘লজ্জা’। বইটি প্রকাশিত হয়েছে ঢাকা থেকে কিন্তু বিক্রি হয়েছে পশ্চিম বাংলায়। বিজেপি মানসিকতার বুদ্ধিজীবিরা ঝোলা বেগে বয়ে বয়ে বইটি পুশসেল করে বেড়ান। এক শিল্পপতি নাকি বিনামূল্যে বিতরণের জন্য বইটির আগাম কপি কিনে নেন। যাদবপুর বিশ^বিদ্যালয়ের এক ইতিহাসের অধ্যাপক নিজ খরচে বইটির ফটোকপি বিলি করে বেড়িয়েছেন। ‘লজ্জা’ নিয়ে এত মাখামাখি এ কারণে যে বইটিতে বাংলাদেশের মৌলবাদীদের নামে মিথ্যাচারের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। উপন্যাসের নামে দেশের হিন্দুদের খুন, ধর্ষণ, শোষন, নিপীড়ন, হতাশা, বঞ্চনা, গণহত্যা ও মানবেতর জীবনের এক রগরগে বর্ণনা রয়েছে এর ভিতরে। এসব কাজে ভারতের বড় লাভ হয় বারবী মসজিদ ইস্যুর বদলে স্থান করে নেয় তসলিমা ইস্যু। এর সূত্র ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সিএনএন থেকে শুরু করে নিউইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্ট এর মতো প্রভাবশালী পত্রিকাতে তসলিমা নাসরিনের সমর্থণে বাংলাদেশকে একটি মধ্যযুগীয় মৌলবাদী দেশ হিসাবে প্রচারনা চালানো হয়। ঠিক তখনই ‘নিউইয়র্ক টাইমস’ এ তসলিমা নাসরিনের উপর লেখা ‘সেন্সরশিপ বাই ডেথ’ শিরোনামের এক সম্পাদকীয়তে বাংলাদেশকে ধিক্কার জানানো হয়। তসলিমার লজ্জা বইএর নামের অনুকরণে ‘শেম’ শব্দ দিয়ে। ১৩ জুলাই ৯৪ সালে ঐ পত্রিকায় ছবিসহ তিন কলামের শিরোনামে একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। এর ঠিক পরদিন ১৪ জুলাই ৯৪ তারিখে আবার তসলিমাকে লেখা সালমান রুশদীর খোলা চিঠি সম্পাদকীয় পৃষ্ঠায় বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে ছাপে নিউইয়র্ক টাইমস।

বিজেপির ষড়যন্ত্রী হুমকি, অঙ্গরাজ্য করার হুমকি: এদিকে বিদেশী পত্রপত্রিকায় এই ফলাও করে প্রচারিত থাকার পিছনের শক্তিই ছিল ‘র’। এখানের নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক ঠিকানায়ও এসবের উপর এসময়কার খবর ছাপে। সে সময়ে বিজেপির হুমকি ছিল দুই কোটি মুসলমানকে বিতাড়িত করবো এবং বাংলাদেশকে অঙ্গরাজ্য বানাবো। বিজেপি ১৯৯৩-৯৫ সাল পর্যন্ত তসলিমার লজ্জাকে পুজি করে বাংলাদেশ থকে হিন্দু বিতাড়ন ও মুসলমান অনুপ্রবেশের প্রমান দাঁড় করিয়ে কাজ করে। উল্লেখ্য কলকাতা থেকে প্রকাশিত থেকে দৈনিক পত্রিকায় ২৭ সেপ্টেম্বর ৯৩ সংখ্যার এক খবরে বলা হয়, ‘বিজেপি কেন্দ্রে ক্ষমতায় যেতে পারলে এক মাসের ভেতর দুই কোটি মুসলমানকে ভেংগে ভেংগে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়া হবে। দেখা গেছে কখনো শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাসের পিছনে কাজ করেছে ‘র’। বাংলাদেশী ছাত্রছাত্রীদের ভারতে পড়াশুনার একটি ক্ষেত্র সৃষ্টি করতে এর চেয়ে বড় বিকল্প আর অন্য কিছু হতে পারে না। দুই বাংলা একত্রিকরণের একটি বিষয় এর মাঝে কাজ করে এর প্রমানও পাওয়া যায়। নিজের দেশটিকে ঘুড়ির লেজের দেশ মনে করে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা এবং বৃহৎ দেশটির প্রতি তার বাড়তি আকর্ষন লক্ষ্য করা যায় তার লেখাতেই। ১৯৯২, ১৯৯৩, ১৯৯৪ সালে দুই বাংলা একত্রিকরণের উপর ব্যাপক প্রচারণা হয় দুরদর্শনে, পেপারে, অপারের নাটকে নভেলে। বাস্তবতা হচ্ছে ভারতীয় জাতীয়তাবাদ ও হিন্দু জাতীয়তাবাদের মিথ্যা প্রচারণাকে অস্বীকার করে নিপীড়িত বিভিন্ন জাতি দিল্লীর শাসন থেকে মুক্তি চাইছে। যার কারণে নাগা মিজো, অহমিয়, গুর্খা, ঝাড়খন্ড, কাশ্মীর, ও পাঞ্জাবে স্বাধীনতাকামীদের সাথে তাদের নিয়তই লড়তে হচ্ছে। সিকিম গ্রাস করে ২২তম রাজ্য হিসাবে ঘোষনা করা ভারতীয় শাসকদের একটি অপকর্ম সন্দেহ নেই। হায়দ্রাবাদকে পেটে ঢুকিয়েছে। একই লক্ষ্যে ৩১ অক্টোবর ৯৩ তারিখে কলকাতার ‘আনন্দবাজার’ পত্রিকায় একটি ক্রোড়পত্র প্রকাশিত হয় বেশ ঢাকঢোল পিটিয়ে। ঐ ক্রোড়পত্রে এই আত্মবিক্রেতা মহিলার ‘বন্দী আমি; নামে একটি নিবন্ধ ছাপা হয়। সেখানে তিনি অনেক আক্ষেপ প্রকাশের পর লেখেন, ‘আমরা কবে এক হবো, হাঁটবো বনগাঁ থেকে বেনাপোল’। এসব প্রচার প্রচারণা মোটেও বিচ্ছিন্ন কোন ঘটনা ছিল না।

দেশদ্রোহীতায় দাগীরা: দেশের গুরুত্বপূর্ণ দলিল ভারতে পাচার ও রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিঘিœত করার অপরাধে অভিযুক্ত রাজশাহী বিশ^দ্যিালয়ের জেলাশাখার সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব রায় মিন্টু, কৃষি মজুর গয়ানাথ, এবং ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার আয়েজুদ্দিন, কারিতাস কর্মচারী চিত্তরঞ্জন, কেরানী তাপস মিশ্র, উমা রানী, অনুকূল বিশ^াস উল্লেখযোগ্য। এদের অনেকের কাছেই রাষ্ট্রীয় অনেক উল্লেখযোগ্য কাগজপত্র পাওয়া যায়। ২৮ ফেব্রুয়ারী ১৯৯২ সালে ঢাকার জাতীয় যাদুঘরে বিশ^ শান্তি পরিষদ ও বাংলাদেশ শান্তি পরিষদ নামের দুটি সংগঠন আয়োজিত ‘দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে নয়া তাগিদ’ সেমিনারে দুই বাংলা একত্রি করণের উপদেশ ও তাগিদ দেয়া হয়। সে সময় জিটিভিতে ‘ফিরে এলাম’ নামে একটি ধারাবাহিক প্রদর্শিত হয় দীর্ঘদিন ধরে। সহজেই বলা যায় আরো বহু ঘটনাই আছে যা সবকটি ঘটনাই কিন্তু একসূত্রে বাঁধা ঘটনাবলী। বিশ^ শান্তি পরিষদ, আনন্দবাজার, তসলিমা নাসরিন, জিটিভি এসব একই কন্ঠক মালার বিচ্ছিন্ন ফুল মাত্র।

২০০৭ এ সেই পুরোনো খেলা: সম্প্রতি এবারে এই ২০০৭এও শুরু  হয়েছে সেই পুরানো খেলা। সেখানে নন্দীগ্রাম, তসলিমা ইস্যু, একের বদলে অন্য, ইস্যু হলেই হলো একাকার হয়ে কাজ করছে। ভারতের এই লোকচুরি খেলা সাধারণেরা বুঝে কম, তাই চতুরেরা নীতিহীনরা এখেলা খেলতে উৎসাহী। যারা এ খেলার ভিতরে ঢুকবেন তারাই আঁচ করতে পারেন এর কানা মাছি ভোঁ ভোঁ খেলা বাংলাদেশে ‘র’ এর পক্ষে তারাই কাজ করতে উৎসাহ পাবে যার ভিতরে দেশপ্রেমের চেয়ে মরণ কামড় দিতে বেশী উৎসাহ। নয়তো কোন বিবেকবান সত্ত্বা এর ইন্ধনে কাজ করতে পারে না। কোন মুসলিমতো পারেই না, তার ঈমান থাকবে না। এরা আত্মবিকৃত জনতার অংশ, দেশদ্রোহিতার কাজ করছে। নিরপেক্ষতার অবয়বে আঁকা ধর্মে দ্রোহীর ভূমিকা রাখতে গিয়ে এই অপকর্মে  জড়িয়ে এ মহিলা যে নিকৃষ্ট পরিচয় স্পষ্ট করেছেন, তাকে ঘৃণা জানানোর ভাষা জানা নেই। সঙ্গত কারণেই বলি যে মানুষ এত সহজে নিজে বিক্রি হতে পারে, তার মুখে আর ধর্ম নিয়ে শুদ্ধির কাজ মানায় না। যে মিরজাফর জগৎশেঠ উমিচাঁদরা একদিন স্বদেশের বিরুদ্ধে গিয়েছিল শুধু মাত্র নিজের আখের গোছাতে, কিন্তু ইংরেজ তার নিজের জন্য নয়, বরং তার দেশের জন্য এদেশের আম ছালা সবই নিয়ে গেল। এ সোজা অংক বুঝলো না বিশ^াসঘাতকরা, এরা যুগে যুগে মানুষ নামের কলঙ্ক। তবে গালির ভাগ পুরোটাই পড়েছে মিরজাফরের উপর, বাকীরা আজো সরব আছে তাদের অপকর্মে, উপরে ওদের নাম বার বার আসছে। তসলিমা মিরজাফরের যমজ বোন। তার মুখে ধর্মের কথা, নীতির কথা, যেন ভুতের মুখে রাম নাম। যে নিজেই কলংকিত সে কোন সাহসে ধর্মের কথা শুদ্ধির কথা বলতে পারে। এত নিকৃষ্ট একটি দানব এ দেশে জন্মেছে মনে হতেও ঘৃণায় অন্তর গুলিয়ে উঠে। আমি তার বিরুদ্ধে বিগত শতকে বই লিখেছি, কোথাও তাকে আমি সামান্যতম কটু কথা বলি নাই। আজই প্রথম আমি নিজেকে সংযত রাখতে না পেরে কিছু শক্ত কথা বললাম।

অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ: এদের জীবন পুরোটাই ব্যর্থ, এতদিন তাকে অন্তত মানুষ মনে হতো। এর পর তাকে মানুষ মনে করার কোন অবকাশ নেই। বাংলাদেশের মানুষ যে কত ভালো এত করার পরও বাংলাদেশে কোন হিন্দু নির্যাতন নেই কোন গুজরাট কখনোই ঘটেনি। এরকম ঘটনা ঘটুক সেটি কেউ চায়ওনা। মোদির ভারত এখানে রচিত হোক এটি কারো কাম্য নয়। তারপরও দেখা যায় কথায় কথায় কৌশলে অনেকেই গুজরাটের প্রসঙ্গ টেনে উত্তরটি নিজে নিজেই দিয়ে দেন বলে বসেন, বাংলাদেশে যে হিন্দু নিধন হচ্ছে! জবাবটা ইতিহাসের পাতায় জমা থাক। ক্রুসেডের বদনাম খুব কৌশলে দিয়ে দেন প্রতিপক্ষের বক্তারা মুসলিমদের উপর। কিন্তু যারা সঠিকভাবে ক্রুসেডের ভিতরে ঢুকবেন একমাত্র তারাই বলতে পারবেন কোথাকার জল কোথায়, কতটুকু গড়িয়েছিল। ইতিহাস ছিল বলেই রক্ষা। তার স্বযতেœ রক্ষিত সংগ্রহই উত্তর জমা করে  রেখেছে খুব সন্তর্পনে। আর একজন নিরব দর্শক সব পর্যবেক্ষণ করছে এই ভরসা। যদিও জন্মান্ধ তসলিমার ঐ সত্যে মানা না মানাতে কিছু যায় আসে না। চোরা না শোনে ধর্মের কাহিনী।

কটি স্পষ্ট কথা: প্রকাশ্যে অপ্রকাশ্যে বর্তমান সময়টিতে অনেকেই মুসলমানদের উপর বেজায় ক্ষ্যাপা দেখা যায় কারণটি যে কি হতে পারে তা সঠিকভাবে বোধের মাঝে আসে না। টেররিস্ট নামের গালির ভার মুসলমান বয়ে বেড়াচ্ছে, তবে দিনে দিনে ঐ মিথ্যাচারের ইমেজে ফিকে রংএর প্রলেপও পড়ছে। অনেকের দুরভিসন্ধি প্রকাশ্য দিবালোকে বেরিয়ে পড়ছে। টেররিস্টের চুলোয় আগুন দিতে এখন আর মানুষ আগের মতো ছুটে আসতে পারছেন না, এমনকি টুইনটাওয়ারের বছরপূর্তি অনুষ্ঠানেও জনতার টান কমছে, কেন? এ কেনোর নিশ্চয়ই একটি উত্তর আছে, নিশ্চয় বিনা কারণে নয়। অনেকে এরকমও বলছেন এবার আসলেও আর আগামীতে আসবো না। সত্য আর মিথ্যা দূরীভূত হলে বহুধারার মিলন মেলা এই আমেরিকার মানুষ চলার পথে আরো সহজ রাস্তা খুজে পাবে, এটি ঠিক। যাক সে অন্য ইতিহাস, একটি বলতে আরেকটি টানতে চাচ্ছিনা। তবে মুসলিমদের প্রতি হিংসার একমাত্র কারণ হচ্ছে তাদের ফজলি আম হওয়া। তাই সবাই ঐ গাছে ঢিল মারে। শেওরা গাছে কেউ ঢিল মারে না, সে কথাটি আমি কলামের জবাবেও বলেছি। উদারমনা মুসলিমরা এসব এড়িয়ে গেছে সবদিন। ভারত সংকীর্ণতায় মানুষের বদলে দানবীয় অর্জনের বাহূল্যে ভরা। ইন্দিরা গান্ধী যদি নিজ দেশে এভাবে বিবেকহীনদের লেলিয়ে তুলেন তবে তাকে নিয়েও ইতিহাসে শ্রদ্ধার বদলে অন্য কিছু জমা হবে, নিকৃষ্ট অর্জন তারও জমবে। নষ্ট মিথ্যাকে পুরস্কৃত করা মানে দানবের পক্ষে মাস্তি করা। এরাই তারা যাদের নিজের লজ্জাবোধ শিকেয় তুলে রেখে অন্যকে জ্ঞান দিতে আসে। গুজরাটের অপকর্মের জমা, সাম্প্রতিক মানচিত্রে চৌর্যবৃত্তির খতিয়ান রেখে তারা মনের মাধুরী দিয়ে সর্বত্র মানুষের আদালতকে পাশবিকতায় পরিবর্তিত করছে কিসের অহংকারে। এ লজ্জা বাংলাদেশের ছিল না, বাবরী মসজিদ ভেঙ্গে, কাশ্মীরের মুসলিমদের উপর অন্যায় নির্যাতন করে, গুজরাটের নির্দোষ ২০০০-৩০০০ মুসলিম খুন করে নিজের লজ্জার দুর্গন্ধে আকাশ বাতাস কলুষিত করে রেখেছে ভারত, ওসব ঢাকবে কি দিয়ে? তাদের বর্ণবাদী ভগবান কি  দৃষ্টিহীন অন্ধ, তিনি কি এসব বিচার করবেন না বলেই মনে হয়? জবাব দিতে হবে বাংলাদেশের হিন্দুদেরকেও। ঘি খাবো ননী খাবো আর কিলের ভাগ নিবে শুধু মিরজাফর একা। তাই কি হয়? আপনাদের বিবেক কি বলে, আপনাদেরেও জিজ্ঞেস করছি, সত্যটা চড়া গলাতে বলতে শিখুন, যেটি আপনারা সচরাচর করেন না। আহারে ভারত নিজের অপকর্মে লজ্জা পায় না, আর তসলিমার লেখাতে লজ্জায় একদম লাল!

পুরষ্কারের কি বাহারী নমুনা! এওয়ার্ড ও সাহিত্য, গবেষনা, মানুষকে মর্যাদাবান করে সন্দেহ নেই। সালমান রুশদীর এরকম একটি খবরে অনেকেই বিচলিত হয়েছেন। যোগ্যতার ভিত্তিতে নাইটহুড প্রাপ্তির বিরল সম্মান পেয়েছিলেন সালমান রুশদী, অপকর্ম করে যদি পুরষ্কার পাওয়া যায় তো ভালোই। তসলিমাও পেয়েছেন। কিন্তু অপকর্ম করেও যখন দানবেরা ওসব ছাই ভস্ম পায় তখন কি আর সে সম্মান মনে প্রশান্তি দিতে পারে? হয়তো নীতিহীনদের পারে। এরা এমন সব মানুষ যারা দুনিয়াতে অশান্তির দাগ রেখে বড় মাপের অশান্তি সৃষ্টি করেছে। কথা বলার ওজুহাতে স্বাধীনতার নামে মিথ্যাচার করবে ষড়যন্ত্র করবে অন্যের গুটি হয়ে দেশ বিরোধী কাজ করবে সেটি মানা যায় না। ধিক্কারই তাদের জীবনের জমা। কথা বলতে পারা সবার জন্মের অধিকার। তাই বলে একজন সম্মানিতকে অসম্মান করায় পুরষ্কার পাওয়া নীচতার পরিচয় দেয়, এ অপরাধের গভীরতা মাপার কোন যন্ত্র আবিস্কৃত হয়নি। এসব ঘটনা সভ্যতা মাপার ব্যারোমিটার অবশ্যই। সর্বাবস্থায় মুসলিমদের জন্য ধৈর্য্যই উত্তম মহৌষধ। তবে চেতনহীনতার কোন সুযোগ এখানে নেই। এখানের প্রতিটি সদস্যকে সচেতন থাকতে হবে, বিবেককে কড়া পাহারায় রেখে সিদ্ধান্তে অটল থাকতে হবে। সামান্য কারণেই অধৈর্য্য না হয়ে সাহসের সাথে প্রতিটি প্রতিকূলতা পার হয়ে মানবতাকে উপরে তুলে ধরে আত্মসম্মান নিয়ে বেঁচে থাকাই মানব জীবনের সার্থকতা।

এওয়ার্ডের আড়ালকথা: বৃটেনের বিখ্যাত ডেইলী মেইলের কলামিস্ট মিজ রুথ ডাডলি এয়ার্সএর উক্তি, ‘তিনি সালমান রুশদীর সেই বুকার প্রাইজ পাওয়া বইটি বহু চেষ্টা করে ৫০ পাতাও পড়তে পারেন নাই। কারণ হিসাবে উল্লেখ করেন এটি পাঠ যোগ্য কোন সাহিত্যই নয়। একই রকম বক্তব্য পাওয়া যায় স্যাটানিক ভার্সেসের উপরও। তিনি উল্লেখ করেন এটি একটি উস্কানী মূলক গ্রন্থ ছাড়া আর কিছুই নয়। এক কথায় সাম্প্রতিক উপাধীর নেপথ্যে কাজ করে বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী ব্লেয়ারের কৃতকর্মের সাক্ষর। খুব সহজেই এখানেও যুদ্ধবাজ মিঃ ব্লেয়ারকে ওজন নেয়ার আরেক সহজ অংক ধরা পড়ে। বৃটেনের হাউস অব কমন্সের ঝ্যাক স্ট্র একই রকম মন্তব্য রাখেন, ‘আমি তার কোন বই পড়ে শেষ করতে পারি নি। তার বই আমার কাছে কঠিন মনে হয়’ (তথ্যটি দি টাইমস ও ডেইলী মেইল অবলম্বনে)। সভ্যতার মানদন্ডে বিচার যে কিভাবে হচ্ছে, সেটি বোঝা ভার। এমনভাবে যে একজন কেমন করে একজনকে আক্রমণ করে গালাগাল অপকর্ম করেও পুরষ্কৃত হওয়া যায়। এভাবে ক্রসেড ক্রমে যুদ্ধের রুপ নেয় যদিও অনেকের চোখে হয়তো এটি ছিল মানবতার সেবা, হয়তো কারো চোখে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা। এরা যারা অতি অল্পেই সাহিত্যে সভ্যতায়, লাইম-লাইটে উঠে আসতে পারছে এই একটি কঠিন মিথ্যা বলতে পারার জন্যই মনে হয়। কখনো মনে হয় বর্তমান সভ্যতা মিথ্যাকে পছন্দ করে অতিরিক্ত। দেখা যায় এত প্রমাণ প্রতিবেদনের মাঝেও মিথ্যা তার অবস্থান করে নেয় ঠিকই। এটি কিভাবে সম্ভব হয়, স্বভাবতই এ প্রশ্নের উত্তর হলো এর পেছনে শক্ত মিথ্যার শক্তিশালী যোগানদাতার কারণেই এটি সম্ভব হয়, মিথ্যা সত্যের মতোই জীবন্ত হয়ে উঠে।

তারপরও বলতে হয় আজকের বিশ্ব ইসলাম আতঙ্কে ভুগছে, কিন্তু কেন? একটি টার্গেট করা ধর্মকে গালি দিতে পারার বাড়তি ক্রেডিটের কারণে অনেকে পুরষ্কৃত হচ্ছেন, সাথে সাথে পরিচিতি বেড়ে গেল, খবরের শিরোনাম হওয়া গেল, অনেক প্লাস পয়েন্ট অবশ্যই। তারপরও তাদের বাকী সবটুকুই হতাশার, আশার জমা কিছু নেই। সত্যের উপর ভর করা বিজ্ঞানীর আবিষ্কার ইতিবাচক ফল নিয়ে আসে সন্দেহ নেই কিন্তু মিথ্যার সাথে সন্ধি করে যারা বিজয় ছিনিয়ে আনে তাদের এ ঠুনকো পাওনা অতি অল্পেই তাসের ঘরের মতো ভেঙ্গে যাবেই। বরং অনাচারীদের অপকর্ম সত্যকে প্রতিষ্ঠা করতে উৎসাহ যোগায়। কখনো কি মনে হয় এসব কিছু সত্য ধর্মের বিপক্ষে যাচ্ছে? মোটেই না। বরং তাদের অপকর্ম ধর্মটির জন্য ইতিবাচক অবদান যোগাড় করছে বেহিসাবে। মানুষের কাছে সুস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে সত্য আর মিথ্যা, সাদা আর কালো, আলো আর অন্ধকার। মনে হচ্ছে সত্য যুগ খুব কাছেই।

কলামটি লেখার সময় ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০০৭।

 

বি দ্রষ্টব্য: লেখাটি নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক দি রানার নিউজে ০১/০১//২০২০ এ ছাপা হয়েছে।

Tag Cloud

%d bloggers like this: