Articles published in this site are copyright protected.

নাজমা মোস্তফা

এ প্রশ্নবিদ্ধ সরকারের নীতি হচ্ছে কলিজাতে কামড় না পড়লে কোন অবিচারের বিচার করে না। পরপর টানা দুই মেয়াদে মানুষ মরতে মরতে এই অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু বিচার হনুজ দূর অস্ত। অতি সম্প্রতি অনেকেই বলছে কোন বিশেষ কারণে সরকারের কলিজাতে কামড় পড়েছে, তাই শোভন রব্বানীরা আসামীর লিস্টে। সহজে এদের আসামী করা হয় না। অমিত শাহার রুমে আবরারকে মারা হলেও সে কোনভাবেই আসামীর খাতায় উঠে না। এখন এরা ধরা খেলে তারা বলছে উপরের নির্দেশে তারা এসব করেছে। উপরের মাত্রাটা কতটা উপর সেটি আল্লাহই জানে।

গত ৬ অক্টোবর আবরার কিছু চরম সত্য প্রকাশের অপরাধে নিহত হন। দেশবাসীদের কিছু মন্তব্য বিবেকের কথা বলে। যেমন “আবরারের লাশটা গণভবনে পাঠানো যায় না? আবরারের নিথর হাতের আঙ্গলের ফাঁকে থাকবে একটি চিরকুট। তাতে লেখা থাকবে, “হে স্বৈরাচারী, তুমি ক্ষমতাকে ভালোবেসে দেশ দিয়ে দিলে, আর আমি দেশকে ভালোবেসে জীবন দিয়ে গেলাম!” ভারতীয় আগ্রাসন বিরোধী প্রথম শহীদ আবরার। ফেনী নদীকে আবরার নদ করার দাবীও দেখলাম। একজন শেখ হাসিনাকে আবরারের ঘটনায় অতীত ইতিহাস মনে করিয়ে দিয়েছে। ব্লগার রাজিব হত্যার পর হাসিনা রাজিবের বাড়িতে গিয়ে রাজিবের মা বাবাকে বলেছিলেন জামায়াত শিবির একটি সন্ত্রাসী দল এদের রাজনীতি করার কোন অধিকার নেই। জামায়াত শিবিরকে নিষিদ্ধ করা হবে। এখন আবরারের বাড়িতে গিয়ে কেন বলতেছেন না ছাত্রলীগ একটি সন্ত্রাসী দল এদের রাজনীতি করার কোনো অধিকার নেই, ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ করা হবে।

৫২ সালের রফিক সালাম বরকতের লাশের উপর দিয়ে স্বাধীনতার গতিপথ নির্ধারিত হয়। কিন্তু ফেলানীর ঝুলে থাকা লাশ নিস্তব্ধ জাতিকে সম্বিত দিতে ব্যর্থ হলো জাতির উমিচাঁদ ঘষেটি বেগম মিরজাফরদের জন্য। প্রায় ৩০০ বছর থেকে এদের আত্মা মরে নাই, পুরোনো বোতলে নতুন মদের মতই এরা যুগে যুগে সচল থেকে জাতির কলিজাতে কামড় দিয়ে চলেছে। যার জন্য আবরার ১০০% নির্দোষ লাশ শিবির হয়ে ময়দানে হাজিরা দিচ্ছে। ঘটনাটি একটি বিষয় স্পষ্ট করলো নীতির দিকে শিবিররাই বাংলাদেশের পক্ষের শক্তি হলেও যারা এতদিন প্রতারণা করে বলেছে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি তারাই ক্রমে ক্রমে বিরাট দানবে পরিণত হয়ে দেশ বিরোধী নামে স্পষ্ট দাগ রাখছে। সবদিন খুনীরা আদর্শকে ভয় পায়। সব ভালো নীতির কাজ করে শিবির, আর সব খারাপ কাজ করে লীগ। এর কারণ একদল আদর্শের ধ্বজাধারী আর একদল গুম খুন ধর্ষন হত্যা ও মাদকের ধ্বজাধারী।

জাতির মূল অসুখের চিকিৎসা না করলে এসব মৃত্যু বন্ধ হবে না। ধানাই পানাই মার্কা সাময়িক বরখাস্তের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকবে। সিসিটিভির ফুটেজ লুকানোর কসরত করবে। সেন্ট্রির চোখে কিছুই ধরা পড়বে না। মেডিক্যাল রিপোর্টে কোন নির্যাতনের দাগ খুঁজে পাওয়া যাবে না। ভিসিরা রাজনীতির নামে শিক্ষাকে কবজা করে জাতিকে পঙ্গু করে দিবে। কারণ মূল অপকর্মীরা দলবলসহ বহাল তবিয়তে আছে থাকবে। মূল অপকর্মীদের না সরালে রোগের চিকিৎসা হবে না। শুদ্ধি অভিযান চলুক শুধু শোভন রব্বানীদের নয়, সমস্ত জাতির নষ্ট ভাইরাসকে বেছে বেছে পরিষ্কার না করলে এ জাতি ইতমধ্যে মেরুদন্ড হারা আত্মমর্যাদাহীন জাতিতে পরিণত হয়েছে। গোটা দেশকে অন্ধকারে রেখে অনির্বাচিত একটি ১০০% বিতর্কীত সরকার কেন চুক্তিতে সই করে, প্রতিবাদ করলে তাদের পোষা বাহিনী দিয়ে মানুষ মারে। জাতি ওটি জানে, আজ তারা কার কাছে বিচার চাইছে? ডাকাতের কাছে বাটপারের বিচার কি চাওয়া যায়? আরবার হত্যা ভোটের আগের রাতের ঘটনার পুনরাবৃত্তি, সুবর্ণচরের ধর্ষণের পুনরাবৃত্তি, ৫৭ সেনা অফিসার হত্যার মাধ্যমে বিডিআর বিদ্রোহের পুনরাবৃত্তি। প্রতিটি হত্যা মৃত্যুর দায় অবৈধ দখলদারের। সমস্ত জাতি মূলের পানে ছুটুক যদি জান মান নিয়ে বাঁচতে চায়। নয়তো আবরারের মতই সারা জাতিকে পিটিয়ে মারা হবে। কে কোন দল করে সেটি কোন বিষয় নয়। দলমত নির্বিশেষে  এটি আলামত মাত্র, সবাই মরবে, ইহ পরকাল দুই কালই ঝরঝরে হবে। সরকারের এ কলঙ্ক আরবার নদী হয়ে ফেনী নদীর নতুন নামকরণে রাজনীতি, ইতিহাস ভূগোল দখল করে রাখুক। চাপাতী লীগরাও সত্য ইতিহাসের অর্জনে জমা হচ্ছে।

যুগ যুগ অবদি মানুষ এ ইতিহাসের কথা জানবে। সরকারের দাপটিরা এতই সংঘবদ্ধ যে সিসিটিভির ফুটেজও তারা লুকিয়ে ফেলতে পারে, সরাতে পারে মিটাতে পারে, কমাতে পারে। এদের হাতে সিসেম ফাঁকের ভোটচুরি যাদুমন্ত্র। আবরারের লাশ সিড়িতে রেখে টিভিতে খেলা দেখে ছাত্রলীগের খুনীরা। পানি চুক্তিতে সমালোচনা করাতে আবরার হত্যা। পানি পানি চাইতে চাইতে মরেছে কিন্তু ওরা অবৈধপথে ভারতকে পানি দিলেও মরার সময় আবরার এক ফোটা পানি খুঁজেও পায় নাই। শারীরিক মানসিক তিন দফাতে তাকে মারা হয় ২২ জন নামধারী পদবীধারী দানব দ্বারা। এসব ধর্ম যার যার উৎসব সবার করা মদ্যপানের মহড়ার ফলাফল। প্রধানমন্ত্রী গর্ব করে বলেন আমি ছাত্র অবস্থা থেকে এভাবেই রাজনীতি শিখেছি। কিন্তু তার কাছের জনরাই বই লিখে স্পষ্ট করে গেছেন যে ১৯৯৬ সালের আগে তিনি কখনো কোন রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন না (মতিয়ুর রহমান রেন্টুর বই ‘আমার ফাঁসি চাই’ ৯০ পৃষ্ঠা)। ২০১৮ সালে মানুষ ভোট দেয়নি কিন্তু তিনি অকপটে বলে বেড়ান মানুষ ভোট না দিলে বিরোধীরা আমাকে গদিতে থাকতে দিত না। তিনি গদিতে থাকছেন এসব পেটুয়া বাহিনীর দ্বারা যারা পিটিয়ে সারা জাতিকে পঙ্গু অথর্ব করে রাখে। নির্দোষ বিরোধী নেত্রীকে কারাগারে ঢুকিয়ে তার উপর চরম অবিচারের সীমাহীন অনাচার চালায়। বিচার বিভাগও তার অধীনস্ত দাসত্বের শিকার। তার পছন্দের সুপ্রিম কোর্টের একজন প্রধান বিচারপতিও টিকতে পারেন নাই। সেখানে বিরোধী নেত্রীও কারাগারে, স্পষ্টভাষী সম্পাদকেরা বারে বারে কারাগারে গেছেন। সেখানে একমাত্র হলুদ সাংবাদিতা সমর্থনীয় ও পুরষ্কৃত।

সময়ে বিধাতাও বিরাগ হয়। বিধাতা চাইলে আবরারকে জীবিত রেখে দিতে পারতেন বাকী অনেকের মতই। কারণ সারা বছরই এভাবে টর্চার সেলে মানুষ ছাত্রদেরে পিটানো হয়। আর টর্চারের মাঝেও তারা বাঁচে। ফেরাউনের অত্যাচারে যখন নির্যাতীত মিসরবাসী প্রমাদ গুনছিল তখন মিসরে তাদের উদ্ধারকল্পে নবী মুসার জন্ম হয়। নজরুলের ভাষাতে ঘটনাটি কবিতার ছন্দে আনছি।

শুনিয়াছি, ছিল মমির মিসরে সমরাট ফেরাউন,

জননীর কোলে সদ্য প্রসূত বাচ্চার নিত খুন!

শুনেছিল বাণী, তাহারি রাজ্যে তারি রাজপথ দিয়া

অনাগত শিশু আসিছে তাহার মৃত্যু বারতা নিয়া।

জীবন ভরিয়া করিল যে শিশু জীবনের অপমান,

পরের মৃত্যু আড়ায়ে দাঁড়ালে সে-ই ভাবে পেল প্রাণ!

জন্মিল মুসা, রাজভয়ে মাতা শিশুরে ভাসায় জলে,

ভাসিয়া ভাসিয়া সোনার শিশু গো, রাজারই ঘাটেতে চলে।

ভেসে এল শিশু রাণীরই কোলে গো, বাড়ে শিশু দিনে দিনে,

শত্রু তাহারি বুকে চড়ে নাচে, ফেরাউন নাহি চিনে।

এল অনাগত তারি প্রাসাদের সদর দরজা দিয়া,

তখনো প্রহরী জাগে, বিনিদ্র দশ দিক আগুলিয়া!

রসিক খোদার খেলা, তারি বেদনায় প্রকাশে রুদ্র যারে করে অবহেলা।।

এমন সংকট সময়েও বিধাতার কাছে এ জাতির মুক্তির জন্য দোয়া চাইছি।

 বি দ্রষ্টব্য: ১১ই অক্টোবর ২০১৯ তারিখে নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত “দি রানার নিউজ” সাপ্তাহিকের কলামে এটি ছাপে।

Tag Cloud

%d bloggers like this: