Articles published in this site are copyright protected.

নাজমা মোস্তফা

প্যারোলে জামিন বিক্রি হচ্ছে বাংলাদেশে। যদিও ক্রেতা নেই, বিক্রেতা চাইছেন প্যারোল দিতে। ৭৬ বছর বয়স্ক একজন তিন বারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে দরকষাকষি চলছে। বহুদিন থেকে যেচে যেচে বাদিপক্ষ বলে “প্যারোল নেবে গো” যদিও অধিকার না পাওয়া বঞ্চিতের দাবী এটি নয়। বিবাদিপক্ষ দয়া চান না, চান তার ন্যায্য পাওনা। এসব হতাশার কথা একবিংশ শতকে বাংলাদেশ শাসক বর্গের ইতিহাসে দাগ চিহ্ন হয়ে থাকবে। সরকার প্রধান দেশে ১০ টাকার টিকিট কেটে মানুষকে গোলক ধাঁধায় ফেলে পরক্ষণেই ছুটে যান বিদেশে চিকিৎসা নিতে। পক্ষান্তরে খালেদা জিয়া কোন সময়ই দেশের চিকিৎসায় হতাশ নন, তবে তার আবদার তার নিজস্ব চিকিৎসক ও হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়া,  যেখানে তিনি স্বচ্ছন্দ্য বোধ করেন। কিন্তু কোন এক অদৃশ্য কারণে এটি দিতে প্রতিপক্ষ নারাজ। এখানেই লুকিয়ে আছে গভীর শংকা, বিশ^াসহীনতা ও অপতৎপরতা। তাকে যেতে হবে সরকারের পছন্দের হাসপাতালে, যেখানে যেতে ডায়বেটিকসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত অসুস্থ খালেদা জিয়া স্বচ্ছন্দ্য বোধ করছেন না। এটি এমন একটি দেশ যেখানে তিনবারের প্রধানমন্ত্রীকেও উপযুক্ত মর্যাদা দেয়ার দরকার বোধ করে না মধ্য রাতের ভোটে জেতা সরকার। কিন্তু একজন সাধারণ নাগরিকেরও জামিন পাওয়ার মৌলিক অধিকার কেড়ে নেয়া  সরকারের জন্য শোভন কাজ নয়। মানুষ বা জাতি যখন মানবিকতা থেকে দূরে থাকে তখন মানুষ হিসাবে তাদের আর গর্ব করার কিছু থাকে না। এ মানসিকতায় জামিনের প্রশ্নে ভিন্ন ভাষায় প্রতিপক্ষের জবাব ‘নো কম্প্রোমাইজ’। কথাটি আদালতের কথা নয়, রায়ও নয়, এটি সরকারের মুখ নিঃসৃত প্রগলভ সংলাপ। অন্যদিকে নিজ দলের অপরাধীকে এরেস্ট না করে অপরাধীকে নজরদারীতে রেখে মন্ত্রীদের জবাব হচ্ছে ওয়েট এন্ড সি। এরা এতই দাপটি যে তাকে ধরতে সরকার সময় নেয়। সচেতনরা বলছেন দেশবিধ্বংসী চুক্তিগুলো দেশবাসীর কাছ থেকে আড়াল করার জন্যই এতসব চলমান মঞ্চনাটক, দৃষ্টি ঘোরাতে ট্রেনিং প্রাপ্তরা একই পথে হাটে। সব রসুনের কোয়ার মতই সব ডাকাত এক ধারায় প্রশিক্ষণ রপ্ত করে। প্রতারণার শেষ কৌশল জাতিকে বুড়ো আঙ্গুল দেখানো।

আল্লাহর হাতে অসীম ক্ষমতা, তারপরও আল্লাহ তার অধিনস্তের উপর অসীম নমনীয়, না চাইতেই আমরা রোদ বৃষ্টি আকাশ বাতাস সুজলা সুফলা সমৃদ্ধ ধনে দানে ধন্য হয়েছি। কিন্তু এত অর্জনের পরও উদ্ধত ফেরাউন নমরুদরা এর ব্যতিক্রম, উদারতায় মানবিকতায় এরা সবদিন কৃপণ। যুগে যুগে এভাবে ধরাকে সরাজ্ঞান করে শিরোপা নিয়ে দুই জাহানে তাদের নিজেদের ক্ষতি জমা করেছে। মুজিব পরবর্তী আওয়ামী লীগের ক্ষমতা দখল বেশীরভাগই প্রশ্নবিদ্ধ অথবা অবৈধ। কিছু মানুষ বোকার মত তাদের বিশ^াস করেছে, পরক্ষণেই বার বার ঠকেছে। এটি তার দলের চারপাশের ধারেকাছের পরিবারসহ গোটা জাতির বেশীর ভাগের ভালো করেই জানা। এ শংকাতেই তারা অবাধ ভোটে ভয় পায়, সাহস হারায়, আগের রাতে ভোট সারে। সাগরচুরি চাঁদাবাজি ধাপ্পাবাজির সব খানাখন্দক এদের ভিতর বাইরের খবর বারে বারেই ঘরের সাগরেদরাই খোলাসা করে গেছে। এবার সর্বশেষ ক্যালেঙ্কারীর নামে বিভিন্ন প্রকল্পের নামে মেডিক্যালের বই, ক্লিনারের বেতন, ঢেউটিন, রেলওয়েতে হরিলুট, বালিশ, পর্দা, বৈদ্যুতিক ক্যাটলী, বৈদ্যুতিক চুলা, রেফ্রিজারেটর, ওয়াশিং মেশিন, ড্রেসিং টেবিল, খাট. মেট্রেস, তোষক, সোফা, চেয়ারসহ ডাইনিং টেবিল, ভ্যাকুয়াম মেশিন, এসব প্রজেক্টে লাখ লাখ নয়, কোটি কোটি টাকার লুটপাট বানিজ্য উন্নয়নের জোয়ার হয়ে আছড়ে পড়ছে ময়দানে। সরকারের দাপটে মিডিয়া কত আর চেপে রাখবে। ফেসবুক ইউটিউবের যুগ, সারা উন্নয়নের বাটপারি জোয়ার হয়ে ভাসছে। এখানে হাজার লক্ষের কোন বিষয় নেই সাকূল্যে পেট ভরাতে সব কোটি কোটি টাকার কারবার। রাস্তার কংক্রীট হাতের ঠেলাতে উঠে আসছে, রডের বদলে বাঁশের বুনটে করা সেতু ধ্বসে পড়ে মানুষ মরছে। একটি বালিশ প্রকল্প ভবনের উপর উঠাতে এক হাজার টাকা, একটি বৈদ্যুতিক কেটলী উঠাতে ৩,০০০ টাকা, একটি ওয়াশিং মেশিন ভবনে উঠাতে ৩০,০০০ টাকা ধরা হয়েছে। লুটপাট কাহাকে বলে এটি কত প্রকার ও কি কি, এসব প্রশ্ন বেকুব হয়ে যাওয়া জাতির সামনে উদাহরণ হয়ে ঝুলছে। এরা যদি মাছ ভাত না খেয়ে স্বর্ণ খেত তবে তাদের এসব লুটপাটের যুক্তি মানা যেত। মানুষের এ ক্ষুধা, মৃত্যুক্ষুধা হয়ে সরকারকে উলংগ করে দিচ্ছে, একবার নয় বারে বারে।

শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ১১টি ভয়ংকর বড়সড় মামলা সরকারী আদেশে সরিয়ে নেয়া হয়েছে, তার লিস্টটা দেখলে আর টাকার পরিমাপ জানলে আপনাদের আত্মা শুকিয়ে যাওয়ার কথা। (১) নাইকো দুর্নীতি (২) মিগ ২৯ বিমানক্রয়ে দূর্নীতি (৩) কোরিয়ান ফ্রিগেট ক্রয়ে দূর্নীতি (৪) মেঘনা ঘাট বিদ্যুৎকেন্দ্র দূর্নীতি (৫) খুলনায় বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে ঘুষ গ্রহণ (৬) টুঙ্গীপাড়া স্মৃতিসৌধ নির্মাণে দুর্নীতি (৭) আজম জে চৌধুরীর ঘুষ গ্রহণ (৮) কাজী তাজুল ইসলামের ঘুষ গ্রহণ (৯) নূর আলীর নিকট থেকে ঘুষ গ্রহণ (১০) বেজপায় লবিস্ট নিয়োগে ঘুষ গ্রহণ (১১) নভো থিয়েটার নির্মাণে দুর্নীতি। পরিসর কমাতে আমি মোট টাকার সংখ্যাটি শুধু আনছি ১৪,৮৬২ কোটি টাকা। খালেদা জিয়া জিয়াউর রহমানের অনুদানের টাকা ব্যঙ্কে রাখলে সেটি কয়গুণ হয়, ২ কোটি হয়েছে ৬ কোটি মতান্তরে ৮ কোটি। এই অপরাধে তিনবারের প্রধানমন্ত্রীকে এরকম শাস্তি দিয়ে জামিন অযোগ্য করে রাখছে সরকার। ইয়াাসির আরাফাতকে স্লো পয়জনিংএর অভিযোগ উঠে তার মৃত্যুর পর, এর অনেক প্রমাণও পাওয়া যায়। একই কসরত কি এখানেও চালানো হচ্ছে, এ শংকা অনেকেই করছেন। আমরা জানি হিংসা মানুষকে ধ্বংস করে দেয়। তাই এটি শুধু খালেদাকেই ধ্বংস করছে না, বরং এসব কর্মকান্ডে হাসিনাসহ গোটা দেশই ধ্বংস হচ্ছে হয়েছে ধারণা হয় আরো হবে।

ভারতে গিয়ে সম্প্রতি বরাবরের মত অনেক দিয়ে এসেছেন, কিছু আনতে পারেন নাই। এসব দেনা পাওনা সম্পূর্ণ তার নিজের লাভ ক্ষতির উপর নির্ভর করে হয়। কারো মতামতের তোয়াক্কা করেন না, এসব প্রকাশও করেন না। কেউ বলেছে মূলা এনেছেন। এটিও তারা জানতে চাচ্ছে সত্যি কি তিনি মূলা আনতে পেরেছেন? আত্মপ্রচারে পারদর্শী প্রধানমন্ত্রী ভয়েস অব আমেরিকাতে গিয়ে বলে এসেছেন যেখানে দুর্নীতি সেখানেই অভিযান। সম্প্রতি শেখ হাসিনা বলেছেন নেতা হওয়ার আগে মানুষ হন। কথাগুলি খুবই সুন্দর কিন্তু ওটি কি তিনি পালন করেন? যে সব মামলাতে হাসিনা খালেদাকে ঘোলের জল খাওয়াচ্ছেন তার থেকে বহু বহু গুণ অপরাধে আক্রান্ত তিনি নিজে। রসুলের একটি হাদিসে এটি বর্ণিত হয়েছে একজন অতিরিক্ত মিষ্টি ভোক্তা তার কাছে বুদ্ধি নিতে আসে। নবীর নিজেরও ছিল খুব মিষ্টির প্রতি আসক্তি, তিনিও মিষ্টি পছন্দ করতেন। তার উত্তরটি ছিল যে এর পরিমাণ কমালে ভালো। কিন্তু রসুল নিজে মিষ্টি পছন্দ করতেন তাই তিনি জবাব দিতে কিছু সময় নেন। আগে নিজে মিষ্টি খাওয়া কমান এর পর উপদেশ বিলি করেন। কিন্তু দেখা যায় আমাদের সমাজে যারা অপকর্ম করে তারাই বেশী উপদেশ বিলি করে আত্মপ্রচার চালায়। এসব শুনলে মানুষের হতবাক হওয়া ছাড়া আর উপায় থাকে না। তার কথার সাথে উল্লেখিত লিস্টটি মিলিয়ে দেখলে দেশবাসী কি মন্তব্য করবেন সেটি আল্লাহই জানে ভালো। কিন্তু রসুলের নীতি অনুসারে আগে নিজের জীবনে প্রতিফলন করে তারপর উপদেশ বিলি বন্টন করলে সেটি সুস্থ রুচির পরিচয় বহন করে। সমস্ত জাতির একটি অধিকার আছে প্রতিটি যৌক্তিক অযৌক্তিক ইস্যুতে কথা বলার। ইসলামে একেই বলা হয়েছে জেহাদ। সত্য বলা, সত্য প্রচার করা, পালন করা মুসলিমদের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব ও কর্তব্য। তারা দেড় হাজার বছর থেকে এর প্রাকটিস করলে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জাতিতে পরিণত হতো।

অসুস্থ খালেদা জিয়ার জন্য সারা জাতি নিজেদের উদ্যোগে প্রাণ খোলে দোয়া করেন। তিনি নিজের কোন কাজই করতে পারছেন না। এটি খুবই কষ্টকর একটি সময়, যে কোন মানুষের জীবনেই এটি আসতে পারে। জাতির মুখে “আমার নেত্রী আমার মা জেলে থাকতে দেব না’ ‘জেলের তালা ভাংবো, খালেদা জিয়াকে আনবো’ ইহ ও পরকালে অর্জিত নিঃস্বার্থ দোয়া পাওয়া একজন মানুষের জীবনের সব চেয়ে বড় পাওনা। এটি সবার ভাগ্যে জোটে না। অনেকে মরেও সেটি পায় না। তিনি জীবিত অবস্থায় দেশবাসীর কাছ থেকে যে সম্মান পেলেন তার তুলনা হয় না। ধারণা হয় প্রতিটি বঞ্চিত নির্যাতীত মানুষের দোয়ার জরুর পাওনাদার খালেদা জিয়া। সবার শেষে অদেখা বিধাতার দেয়া একটি বাণীকে স্মরণ করছি। আল্লাহ অহংকারী মানুষকে বলেন, “আর মানুষের প্রতি তোমার চিকুব ঘুরিয়ে নিও না, আর পৃথিবীতে গর্বভরে চলাফেরা করো না। নিঃসন্দেহ আল্লাহ প্রতিটি উদ্ধত অহংকারীকে ভালবাসেন না (সুরা লুকমানএর ১৮ আয়াত)।

লেখার তারিখ = ০৪ অক্টোবর ২০১৯।

বি দ্র: লেখাটি নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত ‘দি রানার নিউজ’ সাপ্তাহিকে শুক্রবার ১১ই অক্টোবর ২০১৯ সংখ্যাতে ছাপে।

Tag Cloud

%d bloggers like this: