Articles published in this site are copyright protected.

নাজমা মোস্তফা

আজকের কলামের নামটি আমি ধার নিয়েছি একজনের  বই থেকে, রাজনীতি সচেতন এ ব্যক্তির লিখিত গ্রন্থ থেকে কিছু তথ্য দিয়েই লেখাটি সাজাবো। সাম্প্রতিক সময়ে  দেশে কিছু মানুষ যে দেশবিরোধী ভূমিকায় নেমেছে তাতে চারপাশ মুখরিত। সেখানে প্রিয়াসাহা একা নন, ঐ এক লাইনে ইসকন সংগঠনের ছাউনিতে দেশে মুসলিম ধর্মান্তকরণের কাজ চলছে জোরেসোরে প্রকাশ্য ময়দানে। সারা দেশে এদের অসংখ্য সংগঠন গোপনে ও প্রকাশ্যে মুসলিমদের বিরুদ্ধে আকাম কুকাম চালিয়ে যাচ্ছে। শিশুদের খাদ্য বিতরণের মাধ্যমে প্রকাশ্যে হরিবল, জয় শ্রীরাম হরেকৃষ্ণ হরে হরে হরেরাম বন্দনাও চালাচ্ছে। পীযুষ বন্দোপাধ্যায়, রানাদাস গুপ্ত, রামেন্দু মজুমদার, সুভাষ সিংহ, এসকে সিনহা এরা সবাই এমনভাবে এসব রাজনীতিকে প্রভাবিত করেছেন যা অনেক বিতর্কীত অবস্থানকে স্পষ্ট করছে। আজকের বাংলাদেশে হিন্দু বনাম ছাত্রলীগ নেতারাও সন্ত্রাসীতে আগুয়ান, লীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষে গুলাগুলিতে অসংখ্য আহত নিহত। ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামলদত্তকেও অনেক সময় বিতর্কীত অবস্থানে দেখা যায়। ৯৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বরের বরাতে হাসিনা হত্যার মিথ্যা হামলা সংবাদও ঐ পত্রিকাই বিলি করে। ইতিহাস বলে অতীতে একটি গোপন সংগঠনের সাথে জড়িত ছিলেন চিত্তরঞ্জন সুতার ও কালিদাস বৈদ্য, তখন তাদের উদ্দেশ্য ছিল পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার কৌশলে জড়িত থাকা। পুনরায় বঙ্গভূমি আন্দোলন নামে বাংলাদেশকে বিচ্ছিন্ন করা ও ভাঙ্গার আর এক কৌশলে তারা জড়িত। ৭১ সালে যুদ্ধ চলাকালীন সময়েই তিন সংখ্যালঘু নেতা আওয়ামী ছত্রচ্ছায়ায় ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরার কাছে বাংলাদেশকে ভারতের অংশ করে রাখার আবদার রাখেন। (হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর সাক্ষাৎকার, জনাব মাসুদুল হক লিখিত বাংলাদেশের স্বাধীনতা র এবং সিআইএর ভূমিকা)। উল্লেখযোগ্য বিষয়টি হচ্ছে ঐ সময় সরকার জেনেও কোন ব্যবস্থা নেয়নি এমন কি জনাব চৌধুরী এটিও উল্লেখ করেন যে, তারা চেয়েছিল বাংলাদেশকে সিকিম বানাতে। এবার বুঝেন এরা কি ধারার দেশপ্রেমিক! এরা ভারতীয় সংবিধানের চারনীতিতেই বিশ^াসী থেকেছে, ভারতপন্থী হাসিনার আওয়ামী লীগকে ভারত নগদে কিনে, ভোটের খরচ জোগায়। আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের আত্মসচেতনহীন দল, একদিন যারা পাকিস্তানের ও বাংলাদেশের আন্দোলনের শিকড়ে ছিল কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ থেকে অনেকটা পথহারা।   

ভারত ৭১ সালে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারকে গোপন সাত দফা চুক্তিতে বাধ্য করে। কথিত আছে ঐ চুক্তিতে স্বাক্ষর দেয়ার পর তৎকালীন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম অজ্ঞান হয়ে যান। এরপর ৭২ সালের মার্চে পঁচিশ বছর মেয়াদী চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যার নামকরণ করা হয় মৈত্রী চুক্তি যাকে জনগণ পর্যবেক্ষণ করেছে গোলামী চুক্তি নামে। ৭৪ সালের ১৬ মের সীমানা চুক্তি লংঘন করে ভারত আঙ্গোরপোতা বেরুবারী দখল করে রাখে। ৭৫এর পট পরিবর্তনের পর শান্তিবাহিনী তৈরী করা ও বঙ্গভূমি আন্দোলন সবই এক উদ্দেশ্যে তৈরী করা হয় র এর ইঙ্গিতে। এই র গঠনের মাত্র তিন বছরের মাথায় এ দেশকে ভেঙ্গে বাংলাদেশ অপারেশনের মাধ্যমে খুব কৌশলে দু টুকরো করে ।

কাশ্মীরে ভয়ংকর অবস্থা চলছে। তাদের দেশে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়া হয়েছে সর্বত্র যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। অনুচ্ছেদ ৩৭০ বাতিল করেছে অনুচ্ছেদ ৩৫ কেড়ে নেয়া হয়েছে, সবকিছু হয়েছে গোপনে গোপনে। যেন একটি সংসার ভাঙ্গার মতই হঠাৎ করেই খুঁড়িয়ে চলা বিধ্বস্ত সংসারটির মাথায় বজ্রাঘাত করা হলো। পুরো কাশ্মীর এখন এক জিন্দা কারাগার। ঢাকাতে এক কাশ্মীরী ছেলের মুখের বয়ান শুনছিলাম সে বলছে প্রতিদিন ভারতীয় সৈন্যরা হাজারেরও বেশী মহিলাকে ধর্ষণ করছে। বিগত শতকে রচিত নিজ জন্মভূমি ফেলে আসা এক পাকিস্তানী + বাংলাদেশীর লেখনী থেকে চিন্তাশীলদের জন্য কিছু খন্ডিত তথ্য তুলে ধরছি। বইটির নাম সত্যম সুন্দরম, লেখক ডাঃ এম এ শুকুর। 

তার বইএর একটি অধ্যায়ের নাম ছিল ভারতের ভাগ্যাকাশে শতাব্দীর দুর্গ্রহ: “স্বধর্মে নিধনং শ্রেয়, পরধর্ম ভয়াবহ” এই মহাবাক্যটি ভারতবর্ষের ধর্ম ও সংস্কৃতির রক্ষাকবচ হিসাবে সার্থকভাবে কাজ করেছে এবং শতাব্দীর পর শতাব্দীব্যাপী বাইরের সত্যকে হয় রুখে দাঁড়িয়েছে, নয় আপনার মধ্যে আত্মস্থ করেছে। আপন রক্ষণশীল ব্যবস্থা ও দার্শনিক শক্তিতে বাইরের প্রভাবকে আটকে রাখতে সক্ষম হয়েছে। সে যে শুধু বাইরের সত্যকে রুখেছে তাই না বরং ভেতরের দ্রোহকেও নিস্তেজ করে দিতে সক্ষম হয়েছে। বিশে^র ধর্ম জগতে এই কথার বিপরীতে আর একটি কথা আছে – লা ইকরাহা ফিদ্বিন – অর্থাৎ ধর্মে জোর জবরদস্তি নাই, কারণ সত্য ও মিথ্যার সীমারেখা সুস্পষ্ট।

গরু একটি চতুষ্পদ জন্তু, মানুষের অতি উপকারী জীব। পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ এর মাংস খায়। এই ভারতবর্ষেও প্রাচীন মহাভারতের যুগে পর্যন্ত গোমাংসের প্রচলন ছিল। এমনকি কোন বিশিষ্ট অতিথির আগমনে গোবৎসের মাংস প্রদান অত্যন্ত সম্মানজনক বলে গণ্য হত। পন্ডিত জওহরলাল নেহরু লিখিত Discovery of India বা ভারত আবিষ্কার বইএর ১০৮ পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য। “The eating of beef previously countenanced, is later absolutely prohibited. In the Mahabharath there are references to beef or veal being offered to honored guests” পৃথিবীর অধিকাংশ দেশে এটি প্রচলিত খাদ্য। যদিও খাদ্যাখাদ্যের বিচার সব সমাজেই আছে। কোন কোন জাতি এ ব্যাপারে বিচারহীন। এরা সাপ, ব্যাঙ, শিয়াল, কুকুর যাবতীয় জীবজন্তু জীবিত এমন কি মৃতও ভক্ষণ করে। নিজ ইচ্ছা অনুসারে খাদ্য গ্রহণের স্বাধীনতা সকলেরই থাকার কথা। একমাত্র সামাজিক স্বাস্থ্য হানির কারণ ব্যতীত অন্যের সেখানে বাধা দেয়ার কোন যুক্তি নেই। এবং এইভাবে বাধাদান মানুষের মৌলিক অধিকার তথা স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের সামিল। এদেশে যেদিন থেকে গরুকে দেবতা জ্ঞান করা হয়েছে সেদিন থেকে এটি অতি উপকারী প্রাণী সময়ে সময়ে মানুষের নিরাপত্তার জন্যে হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই  অমানুষিক সমাজ চিত্রই সেদিন শাহজালাল নামে এক ফকিরকে করেছিল মর্মাহত ও উদ্বেলিত।

অনেকে বলে থাকেন মুসলিমরা তরবারীর জোরে সত্য প্রচার করেছে। আত্মরক্ষার জন্য তরবারীর প্রয়োজন অনস্বীকার্য। এর প্রয়োজন চিরদিন ছিল চিরদিন থাকবে। কিন্তু মহাসত্যের শাণিত যুক্তির তরবারী  তাদেরে যে অসীম শক্তিধরের শক্তিতে শক্তিমান করেছিল তার সামনে মিথ্যা ঘুনেধরা কুযুক্তির অনুশাসন টিকে থাকতে পারে না। অতীতেও যেমন পারেনি, ভবিষ্যতেও পারবে না। ধাতব তরবারী মিথ্যাকে সাময়িক আশ্রয় দিতে পারে কিন্তু চিরকাল মিথ্যাকে জিইয়ে রাখা সম্ভব নয়। পৃথিবীতে গোটা মানব জাতির জন্য এক একান্নবর্তী পরিবারের কল্পনা করতে আজ মানুষ বাধ্য হচ্ছে। এবং এই প্রথম পৃথিবীকে “এক পৃথিবী এক জাতি এক সংস্থা” হিসাবে মেনে নিতে প্রস্তুতি নিচ্ছে। সামগ্রিকভাবে মানুষের কল্যান তথা বিশ^ শান্তি আজ আর একক প্রচেষ্ঠায় সম্ভব নহে।

এই শতাব্দীর প্রারম্ভে স্বাধীনতা উত্তর মিশরের জাতীয়নেতা জগলুল পাশা যে উদার মন নিয়ে সংখ্যালঘুদের মনে নিরাপত্তার আশ^াস দেন দুর্ভাগ্যক্রমে ভারতবর্ষে তেমন মনোভাবের একান্ত অভাব ছিল। আমাদের নেতৃবৃন্দের উভয় পক্ষই সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গির উপরে উঠতে সক্ষম হয়নি। ১৯৩৭ থেকে ১৯৪০ পর্যন্ত সময়ে ভারতীয় রাজনীতিতে যে ধর্মচাঞ্চল্য আসে তাতে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস এবং নিখিল ভারত মুসলিম লীগ দুটি শক্তিশালী প্রতিদ্বন্ধী দলরুপে  প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ১৯৪০ সনে লাহোরে অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগ কাউন্সিল অধিবেশনে ভারতের পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তে স্বাধীন সার্বভৌম পৃথক রাষ্ট্র গঠনের দাবীতে প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। ইতিমধ্যে ইউরোপ তথা সারা বিশ^ জুড়ে দ্বিতীয় বিশ^ সমরের দাবানল ছড়িয়ে পড়ে।

এই সময় ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসে বিপুল ভোটাধিক্যে সভাপতি নির্বাচিত হন সুভাষ চন্দ্র বোস। কিন্তু এই নির্বাচন কংগ্রেস হাই কমান্ডের মনঃপুত না হওয়ায় সুভাষকে পদত্যাগ করতে হয়। ভারত উপমহাদেশে গণতন্ত্র একাধিক বার বঙ্গ বিরোধে পর্যবসিত হয়েছে। এই দুঃখজনক ঘটনা তারই এক জলন্ত দৃষ্টান্ত। সুভাষ একই সময়ে ইংরেজ শাসক ও কংগ্রেস নেতৃত্বের কোপে পতিত হন। কিন্তু আগুনকে ছাইচাপা দিয়ে রাখা যায়না। তিনি সবার চোখে ধুলো দিয়ে বিদেশে পলায়ন করেন। এখানে জার্মানী ও পরে জাপান থেকে ভারতের বাইরে অবস্থানরত ভারতীয়দের সাহায্যে তিনি আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠন করে বৃটিশের বিরুদ্ধে সক্রিয় সামগ্রিক বিদ্রোহ শুরু করেন। যুদ্ধে ভারতবর্ষ স্বাভাবিকভাবে ইংরেজের পক্ষে জড়িয়ে পড়ে। মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে কংগ্রেস ১৯৪২ সনে “ভারত ছাড়” আন্দোলন আরম্ভ করে। ভারত সরকার মিঃ গান্ধীসহ অধিকাংশ কংগ্রেস নেতাকে গ্রেফতার করে নেয়।

হিরোসিমা ও নাগাসাকিতে আনবিক বোমা নিক্ষিপ্ত হয় এবং জাপান আত্মসমর্পণ করে। জাপানের সক্রিয় সাহায্যে প্রতিষ্ঠিত আজাদ হিন্দ বাহিনী স্বাভাবিক ভাবেই পর্য্যুদস্ত হয় এবং বার্মা ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পরিব্যাপ্ত হাজার হাজার আজাদ হিন্দ সৈন্য ইংরেজের হাতে বন্দী এবং বিচারের জন্য স্বদেশে আনীত হয়। নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বোস এক বিমান দুর্ঘটনায় নিহত হন (?)। সেদিন ঐ মিথ্যা প্রচার করা হয় কিন্তু (আজ আমরা জানছি তিনি সেদিন নিহত হন নাই, ওটি ছিল ভারতীয় আর এক চানক্য চাল)। ভারত গগনের এক অতি উজ্জল তারকা এভাবে ঝরে গেল নিভৃতে রাজনীতির অঙ্গন থেকে চিরদিনের জন্য।

সুভাষ বোস ছিলেন ভারতীয় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক মহান দূত। বসু পরিবার চিরদিন তাদের অসাম্প্রদায়িকতার জন্য খ্যাত কিন্তু সর্বভারতীয় রাজনীতিতে তারা কোনদিন পাত্তা পায়নি। ভারত বিভাগের দাবী মূলতঃ মুসলিম লীগের,পাঞ্জাব ও বঙ্গবিভাগের দাবী কংগ্রেসের। মোটকথা ভাগাভাগির ব্যারিষ্টারী প্রতিযোগিতায় একে অপরকে টেক্কা দিয়ে ১৯৪৭সনের ১৪ই আগষ্ট মধ্য রাত্রিতে পাকিস্তান ও ভারত নামে দুইটি স্বাধীন রাষ্ট্র জন্মলাভ করে। রহস্যজনক হলেও সত্য ঐ রাত্রি ছিল “লায়লাতুল কদর” অত্যাশ্চর্য্য সৃষ্টি রহস্যের রাত্রি এটি। এই রাত্রির মহিমা ত্রিশ সহস্র রাত্রির চেয়েও শুনেছি শ্রেয়। ঘটনা পরষ্পরার সমন্বয়ে এতে কি রহস্য ছিল জানি না। আমরা ইতিহাসের নীরব দর্শক মাত্র। গত দুই হাজার বৎসরের মধ্যে ভারতবর্ষ অন্তত চারবার একত্রিত হয়েছে এবং বারে বারে খন্ডিত হয়েছে। ভবিষ্যতের খবর কারো জানার কথা নয়। জিন্নাহ প্রথম জীবনে খাঁটি কংগ্রেস কর্মী ছিলেন। ১৯৪০ সনে ভারত বিভাগের প্রস্তাব মূলতঃ কোন ব্যক্তির নয়, ওটি ছিল নিখিল ভারত মুসলীম লীগ কাউন্সিলের। প্রস্তাবটি উত্থাপন করেছিলেন শেরে বাংলা ফজলুল হক এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দি প্রমুখ বহু ভারতীয় জননেতার আহবান এই প্রস্তাবে ছিল। গোলটেবিল বৈঠকে গৃহীত তার বলিষ্ট নীতি এবং উপরোক্ত মুসলিম সর্বদল সম্মেলনে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলি বাস্তবায়নের জন্য মিঃ জিন্নাহর আন্তরিক প্রচেষ্টার ফলে তিনি ভারতীয় মুসলিমদের এক বৃহদাংশের মনে এমন প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হন যে ১৯২৯ থেকে ১৯৪৮ সনে তার মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত সুদীর্ঘ ২০ বৎসর তিনি এই উপমহাদেশের মুসলিম সমাজে একমাত্র ভরসাস্থল বলে বিবেচিত হয়েছেন।

যে শক্তি সুভাষ বোসের মত জননেতার ব্যক্তিত্বকে সহ্য করতে পারে নি, সেই শক্তিই পারেনি ফজলূল হকের প্রতিভার স্বীকৃতি দিতে। সেদিন ভারতের পূর্বাঞ্চলে এক আঞ্চলিক মানব গোষ্ঠীর স্বায়ত্ত্বশাসন সহ তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার লাভের সম্ভাবনাকে সুনজরে দেখতে না পারায় এর অদূরদর্শী পরিণাম হিসাবে নেতৃবৃন্দকে গ্রুপিং প্ল্যান প্রত্যাখ্যানে প্ররোচিত করে ভারত বিভাগকে অবধারিত করে তুলেছিল। উদোরপিন্ডি ভুদোর ঘাড়ে ফেলে কোন লাভ নেই, ইতিহাস একদিন এর নিরপেক্ষ বিচার অবশ্যই করবে। ইতিহাস পাঠককে বলতে শুনেছি, মতিলাল নেহরু যদি ১৯২৯ সনে জিন্নাহর চৌদ্দদফাকে মেনে নিতে পারতেন, তৎকালীন ভারতীয় মুসলিমদের মনে সংখ্যাগুরুর ভীতি দূরীকরনে তা সার্থক ভাবে কার্যকরী হত। ঠিক সেইভাবে কেবিনেট মিশনের গ্রুপিং প্ল্যানকে নাকচ করে দিয়ে তারই পুত্র নেহরু ভারত বিভাগকে অবধারিত করে দিয়েছিলেন এরই দুই দশক পরে। পাকিস্তান রাষ্ট্র ভেঙ্গে খান খান হয়ে গেল। সুক্ষ্মভাবে দেখলে শুধু পাকিস্তান নয়, বিশে^র প্রতিটি মুসলিম রাষ্টে এই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চরম অভাব। গণতন্ত্রের অবমাননার কারণেই সারা মুসলিম জাহান আজ বিধাতার অভিশাপে অভিশপ্ত।

বেদ:-

অধিকাংশ হিন্দুই বিশ^াস করেন যে বেদ প্রত্যাদিষ্ট শাস্ত্র। বেদের শিক্ষায় পৌত্তলিকতা বা দেবদেবী ছিল না, দেব মন্দিরও ছিল না। বৈদিক যুগে আর্যরা কৃষিজীবি ছিল। জীবন সম্বন্ধে তারা খুব সক্রিয় ছিল। তারা পরকালে বিশ^াস করত এবং একেশ^রবাদী ছিল। নাস্তিকতা, বহুদেববাদ এমন কি অদ্বৈতবাদ পরবর্তী যুগের সৃষ্টি। অনেকের মতে ভারতীয় সংস্কৃতিতে পুতুল পূজার আমদানী হয় গ্রীস থেকে। পুতুল বা প্রতীক পূজার সম্পূর্ণ বিরোধী ছিল বৈদিক বা আর্যধর্ম। ভারতীয় আদিম অধিবাসীদের মধ্যে যদিও পুতুল বা প্রতীক পূজার প্রচলন ছিল তথাপি এটি ব্যাপক ছিল না। বৌদ্ধধর্ম প্রথমতঃ পৌত্তলিকতার ঘোর বিরোধী ছিল। কিন্তু কালে গ্রীক চিত্রকলা এবং সুন্দর দেবমূর্তি সমূহ ভারতীয় চিন্তার রাজ্যে প্রভাব বিস্তার করে। পরিণামে ভারতবাসীরা পূজা পার্বন আর দেবমূর্তিকে এমনভাবে গ্রহণ করেছে যে আজ পুরোহিত আর দেবমূর্তিকে বাদ দিলে কোন কিছু হয়তো অবশিষ্ট থাকবে না।

খৃষ্ট জন্মের প্রায় ৮০০ বছর আগে ভারতীয় চিন্তাধারাকে সমন্বয়ের চেষ্টা করা হয়েছে এতে। পরিণামে এই উপনিষদই বৌদ্ধমত এবং বেদান্তদর্শনের অদ্বৈতবাদের সূচনা করেছিল। এভাবে কালে ভারতে বুদ্ধ ধর্মের স্বাভাবিক মৃত্যুতে মূলতঃ কোন অস্বাভাবিকতা ছিল না। একটু ভাবলেই অবাক হতে হয় যে কি অদ্ভুত ভাবে মন্দির, কুলগুরু, দীক্ষামন্ত্র, এরা সবাই মিলে হিন্দু জাতিটিকে বাঁচিয়ে রেখেছে। —- এ দেশের মাটিরই এমন গুণ, যিনিই এসে ভগবানের একটু খবর দিলেন, তিনিই ভগবান হয়ে গিয়ে মন্দিরে মন্দিরে পূজিত হতে লাগলেন। তিনি যা দিতে এসেছিলেন তা তোমরা গ্রহণ করলে কি না, তার উপদেশকে জটিল কুটিল গ্রন্থিল ব্যাখ্যার গুরুভারে অতলে তলিয়ে দিলে, এর কোন হিসাব নিকাশও হল না। —-যুগের প্রয়োজনে যুগে যুগে দেবতার সৃষ্টি হয়েছিল। আজ আবার যুগের প্রয়োজনেই বহু দেবতার বিদায় নেবার সময় হয়ে এসেছে। ওঁঙ্কার থেকে উৎপত্তি হয়েছে কোটি কোটি দেবতার, আবার সেখানেই হবে নিষ্পত্তি। আর্য্যরা মূলতঃ একেশ^রবাদী ছিল, তারা দেবদেবী বা মূর্তিপূজক ছিল না। তাই এটি সহজেই অনুমেয় যে পরবর্তীদের দ্বারা বেদের সত্য শিক্ষায় মিথ্যার প্রলেপ দেয়া হয়েছে। জগতের কোন প্রাচীন শাস্ত্রই এবম্বিধ কারসাজি থেকে রেহাই পায়নি, বেদও তার ব্যতিক্রম নয়।

আধুনিক জগতে সর্বাধিক উচ্চারিত যে তিনটি নীতি আদর্শ তা হচ্ছে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্ম নিরপেক্ষতা। জোট-নিরপেক্ষতাই হউক আর ধর্ম-নিরপেক্ষতাই হোক আদতে সর্বত্র নিরপেক্ষতার অভাব পরিদৃষ্ট। একারণেই আজ জাতির জীবনেও মুনাফিকী আবশ্যক ভাবে পরিত্যাজ্য। ধর্ম বর্ণ গোত্র ও ভাষা যেন কোন নাগরিকের অনিরাপত্তা এবং অন্য নাগরিকের বিশেষ সুবিধা ও সুযোগের কারণ না হয়। রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রযন্ত্র যদি ধর্ম বর্ণ গোত্র ও ভাষার দ্বারা প্রভাবিত হয় তবে সেই রাষ্ট্র কিছু সংখ্যক মানুষের সহজ আবাস রুপে গণ্য হতে পারে না। বাংলার মানুষের সরলতা, হৃদয়ের উষ্ণতা ও ভাব প্রবণতাকে অন্যেরা গ্রহণ করেছে আমাদের জাতীয় দুর্বলতা হিসাবে। ফলে গত এক হাজার বছর ধরে এদেশের মানুষ শুধু পরের বেগারই খেটেছে, হাসি হাসি কথার আড়ালে তারা কোনদিন চিনতে পারে নি তাদের বন্ধুবেশী শোষককে।

অধিকার সচেতন জনতা এই শাসন শোষণ বঞ্চনার বিরুদ্ধে যখনি সংগ্রাম শুরু করেছে উপনিবেশবাদিরা তখন এসব আন্দোলনকে দাবিয়ে দিতে চাইছে তাদের আভ্যন্তরীন সমস্যার অজুহাত তোলে। দেখা যায় ষড়যন্ত্রী রাষ্ট্রই আবার অন্যত্র অন্য জনপদে মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে সোল্লাসে গর্বভরে দলিত মথিত করে চলে যায়। সুষ্পষ্ট নীতি আদর্শের অভাব আজ সর্বত্র তীব্রতর। সাম্প্রতিক কালের বিশ^ময় অশান্তির একটি মূল কারণ এই রাজনৈতিক আদর্শহীনতা। আজকের পৃথিবীতে মানুষ একবিশ^ গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। অথচ একদিকে তুমি একবিশ^ গঠনের মহান মন্ত্র আওড়াবে, অন্যদিকে আভ্যন্তরীন সমস্যার জিকির তুলে মানুষের স্বাধীনতা হরণ করবে, ভবিষ্যত পৃথিবী তোমার এই সাধু শয়তানি খেলা মেনে নেবে কেন? তাই জনগণের অকল্যাণে যাতে গণতন্ত্র ব্যবহৃত না হয়, সেজন্য আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার সহ মানুষের সার্বিক সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করে নিতেই হবে আগামী দিনের মানুষকে।

স্রষ্টাকে যে স্বীকার করেনা তাকে কাফির বলব না বরং কাফির তাকেই বলব যেজন সত্যকে অস্বীকার করেছে এবং অন্যায় অত্যাচারে মানুষকে জর্জরিত করে মানবতাকে পর্যুদুস্ত করেছে। স্রষ্টার আদালতে তার কি হবে জানিনা তবে মানুষের যদি কোন সত্যিকার আদালত থাকে তবে তাকে সেখানে আসামীর কাটগড়ায় দাঁড়াতেই হবে। উপরের অংশটি ডাঃ এম এ শুকুরের গ্রন্থ থেকে খন্ডিতভাবে টুকে নেয়া ।

(লেখাটির রচনাকাল ৮ আগষ্ট ২০১৯ সাল)।

নিউইয়র্ক ভিত্তিক দি রানার নিউজ এ কলামটি ছাপা হয় ১৬ আগষ্ট ২০১৯ তারিখে।

Advertisements

Tag Cloud

%d bloggers like this: