Articles published in this site are copyright protected.

নাজমা মোস্তফা

পড়শি বলা হয় তাকে যে সবচেয়ে কাছে থাকে, আপদে বিপদে সাহায্যকারী, মূল্যবান নিকট প্রতিবেশী। অনেক শাস্ত্রেই পড়শির মান মর্যাদা অনেক। তার ডাকে সাড়া দিতে হয়, তার সাথে ভালো ব্যবহার করতে হয়। প্রয়োজনে নিজের খাবারটাও তাকে শেয়ার করতে হয়, নাহলে ধর্ম টিকে না। কিন্তু দাদাবাবুদের ধর্মে ওসবের মূল্যায়ন কেন জানি এত নীচে নেমে গেছে যে বলার মত না। পড়শির আচরণ বিতর্কীত হলে জীবন অরক্ষিত হয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে।

১৩ জুলাই ২০১৯ রয়টার্সের একটি খবর “কাশ্মীরে হিন্দু বসতি স্থাপনের পরিকল্পনা বিজেপির”। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ কাশ্মীরে হিন্দু সংখ্যা বাড়াতে এ প্রয়াস। কাশ্মীর উপত্যকা ভারত ও পাকিস্তান উভয়ই দাবী করে। এ নিয়ে দুবার যুদ্ধও হয়। সেখানে ৭০ লাখ মানুষের মাঝে ৯৭% মুসলিম। হাজার হাজার ভারতীয় সৈন্য তাদের সামাল দিতে ব্যস্ত। গত তিন দশকে ৫০ হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। হিন্দু পুনর্বাসনের এজেন্ডা বিজেপির বহুদিনের স্বপ্ন। এ অঞ্চলের স্বাধীনতাকামীরা এটাকে ফিলিস্তিন অঞ্চলে ইসরাইলী বসতির সাথে তুলনা করছে। সঙ্গত কারণে পরিস্থিতি গরম হচ্ছে পুলিশের তৎপরতা বেড়েই চলেছে। মুসলিমদের উপর খড়গও বাড়ছে। স্বাধীনতাকামী হুররিয়াতের ওমর ফারুকি বলেন, এসব করে এ উপত্যকাকে হত্যা করা হবে।

দেখা গেছে অতীতেও সংকীর্ণতার উদাহরণ রেখেছে সমাজের নামী দামীরাও। মুসলিম প্রধান কাশ্মীরে হিন্দু বসতি স্থাপন করে শায়েস্তা করার মত একই ধারার প্রবণতা রবীবাবুও এককালে দেখিয়েছিলেন। শিয়ালদহ জমিদারী এলাকায় যেখানে প্রায় সব প্রজাই মুসলিম সেখানে গরু কুরবানী নিষিদ্ধ করা এবং একতরফা খাজনা বাড়িয়ে তা আদায়ে ব্যর্থ হয়ে সেখানে নমশুদ্র প্রজাপত্তন করেছিলেন খোদ রবীন্দ্রনাথ নিজে (বাংলা একাডেমীর ত্রৈমাসিক উত্তরাধিকার ১৩৯৩ দ্রষ্টব্য), এসবে কি তার বিশাল মনের উদার সুকর্মের কোন প্রমাণ ফুটে? বরং বলা যায় এরাই বিজেপির মতই বড়দাগের আসামী, এ যাবৎ তোষের ঐ আগুনে এরা যুগে যুগে তা দিয়ে গেছে। মুসলিম বিদ্বেষী অসংখ্য প্রমাণ কবির লেখনীতে জমা আছে। তবে কৌশলে আজকাল ওসব চেপে রাখা। পূর্ব বাংলার মুসলিমরা যাতে শিক্ষিত হতে না পারে সেজন্য ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় সৃষ্টির বিরোধীতা করতে একের পর এক ১৮ বার স্মারক লিপি দেয়ার নেতা আর গড়ের মাঠের বিশাল প্রতিবাদ সভার সভাপতি রবীবাবু। বাংলাদেশের মানুষগুলো অতিরিক্ত অসাম্প্রদায়িক যার জন্য তারা ঘোলের জল বেশী খাচ্ছে। অকারণে অতি ভক্তি কোন ভালো গুন নয়। ইতিহাস বিমুখীনতা ইতিহাস না জানা বড় অপরাধ, এসব জাতিকে সুপথ না দেখিয়ে পথহারা করে।

রবীন্দ্রনাথ ছিলেন কট্টরপন্থী এক সাম্প্রদায়িক মানুষ যাদের কুটিল নেতৃত্বের কারণে ভারত আজ অবদি তুষের আগুণে পুড়ছে। কিন্তু মিথ্যার দালাল নষ্টরা মানুষকে বিভ্রান্তির পথে ঘুরায় সত্যকে চাপা দেয়, মিথ্যায় রসদ জোগায় সবদিন। দুর্গন্ধ ঢেকে রাখলেও আগুনের হলকা আজও বহাল, প্রমাণ হয়ে মানুষের রক্ত গঙ্গা বইছে। এই বিজেপি কর্মকান্ড ঐ একসূত্রে বাঁধা গাটছড়ার আর এক নাম। এরা কবিতায় বড় কবি হলেও ময়দানে সুকর্মে ভয়ংকর কৃপণ। আজও ঐ ধারাবাহিকতা চলমান; সংকীর্ণ অমানবিক, অনুদার, সাম্প্রদায়িক, কুটিল আচরণ ধন্য তারা। যেখানে মুসলিম লেখক কবি সাহিত্যিকরা দার্শণিক সমাজপতিরা ওটি শিখেনি বলেই তাদের আচরণ সবদিন উদার মানবিক।

কাটাতারের বেড়া ডিঙ্গিয়ে নানা কৌশলে ঠিকই অস্ত্র আসছে (১৪ জুলাই, মানবজমিন)। যদিও ফেলানীরা আটকে যায়, গুলি খায়, বিচার পায় না। স্বাধীনতার দাসসুলভ খেসারত এসব। সীমান্তের গরীব ভারতীয়রা অল্প টাকায় এসব অস্ত্র কারবারীদের হাতে পৌছে দেয়। অস্ত্র প্রস্তুতের জন্য গড়ে উঠেছে ছোট ছোট কারখানা, অল্প টাকাতেই অল্প দামের প্রতিবেশী চোষার ব্যবসা চলছে। কাঁটাতারের বেড়া যেন বলছে সব বাংলাদেশীরা চোর বাটপার, সীমান্তের ওপারে যারা থাকেন সব সাধু। তাদের এ ছলনার সাজগোজ সুর সুর করে চলে যায় অপরাধীর হাতে, এসব হচ্ছে সোনাবন্ধুর স্বাধীনতা নামের কারসাজি। এভাবে দুধকলা দিয়ে সাপ পোষে দেশটির মজ্জা চোষে খাচ্ছে, ইয়াবা গেলাচ্ছে, ফেনসিডিল, পাতার বিড়ি আর কি চাই যত ধরণের ধ্বংসাত্মক জীবন বাজি রাখা অপদার্থ সবই গিলছে বাংলাদেশীরা। ভারত এটি কেন করছে এর মূল কারণ এরা নীতির বদলে চলে চানক্য তালে, যত পার শোষন নির্যাতন চালিয়ে যাও আর নিজের আখের গোছাও। আল্লাহর ভয় কম, হয়তো তাদের ভরসা তেত্রিশ কোটি দেবদেবীরা তাদের সামাল দিবে। কিন্তু ইসলামে অপরাধীর জন্য কোন ছাড় নেই। আল্লাহর বেটাবেটি কেউ নেই, দেবদেবীও নেই। শুধু এ কারণেই মুসলিমদের বড় পার্সেন্ট অসাম্প্রদায়িক, নিজের ভয়ঙ্কর পরিণতি গুণে নিজেরা শংকিত হয়। আর বাকীরা যারা শুধু নামে মুসলিম কাজে মোনাফিক, মোনাফিকের ঈমান নড়বড়ে তাই পাপ করে উৎসাহ নিয়ে। মুমিন, মুসলিম, মুনাফিক এরা তিন ধারায় চিহ্নিত। মুমিনরা উৎকৃষ্ট, মোনাফিকরা নিকৃষ্ট।

সাগরে বাংলাদেশী জেলেদের মাছ ধরা বন্ধ, দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ভারতীয়রা (১৩ জুলাই ২০১৯, নয়া দিগন্ত, শরণখোলা, বাগেরহাট সংবাদদাতা)। অন্যের সম্পদে একমাত্র ডাকাতের ভাগ থাকে। কোন সুস্থ জাতি মানুষের এটি ভাবা সুস্থতার লক্ষণ নয়। ভারত মূর্তিপূজক জাতি হলেও একজন নিরব দ্রষ্টা যে সব অবলোকন করছেন সেটি আস্তিক মূর্তিপূজক সবার জানা। ফেসবুকে গরুর গোশত খাওয়ার ছবি দেয়ায় ভারতে মুসলিম যুবকের ওপর হামলা, (নয়াদিগন্ত, ১৩ জুলাই ২০১৯)। তার মানে ভারত এমন অদ্ভুত গণতন্ত্রের দেশ যেখানে একজন মুসলিম নাগরিক আল্লাহর নির্দেশিত পথে খাবার খাওয়ার অনুমতিও তার নেই। এ ধারার খবর প্রায়ই দৃষ্টিগোচর হয়। এটি করে বাংলাদেশে হিন্দুদের পূজা পার্বন বন্ধ করে দেয়ার ম্যাসেজ কি তারা বিলি করছে? তাদের বার বার ভাবা উচিত মহান বাংলাদেশীরা কত সহনশীল ও উন্নত আচরণধন্য, যেন ধৈর্য্যের হিমালয় এরা।

হিন্দু মুসলিম এ দুটি ধর্ম নিয়ে স্বাধীনতার আগে থেকেই ভারতীয় উগ্রবাদীরা দাঙ্গাবাজ। সম্প্রতি বয়সে কিছু বড় ছেলেরা ছোটদের কাছ থেকে তাদের খেলার ক্রিকেট ব্যাট কেড়ে নেয় এবং ‘জয় শ্রীরাম” শ্লোগান দিতে অস্বীকার করলে ঐ ব্যাট দিয়েই তাদের মারা হয়, এতে কয়েকজন ছাত্রের মাথা ফেটে যায়। কথা হচ্ছে এতে কি ধর্মে শ্রীরামের বিজয় লাভ হয়? ভারত কেন যেন তার সংকীর্ণতাকে পরিহার করতে পারে না, লজ্জাস্কর ভাবে ধরা খায়, বারে বারে। অপরাধের দাগী আসামীরা ময়দান চষে মজা নিচ্ছে। দেখা যায় এসব হচ্ছে মানুষের পাশবিক আচরণ। ট্রেনে উঠে জয় শ্রীরাম বলে দলবেধে যাত্রীদের মারধর করা, উত্তপ্ত বীরভূমের বাতাসপুর স্টেশন, উত্তপ্ত হয় মুর্শিদাবাদের কান্দি। তারা চায় তাদের অনুমোদিত ভোগ্যপণ্য মুত্র গোবর এসব মুসলিমরা খাবে আর শ্রীরামের গানা গাইবে! এর নাম কি ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র? বকধার্মিক মোদির সরকার হিন্দু ধর্মকেও কবরস্থ করছে। ভারতের খান্ডওয়া নামক জায়গায় গরু বহনের অভিযোগে ২৪ জনের একটি দলকে হেনস্থা করা, কান ধরে উঠবস করানো ও জোর করে ‘গো মাতা কি জয়’ বলানো। মুসলিমদের পরকাল থাকলেও পরজন্ম যেমন নেই, কীট পতঙ্গ গরু ছাগল হওয়ার সুযোগও তাদের নেই। স্বভাবতই গরু তাদের উৎকৃষ্ট প্রাণিজ খাদ্য এবং সেটি বিধাতা প্রদত্ত। কিন্তু মোদির ভারতে বিধাতাও প্রশ্নবিদ্ধ!

বলা হয় ভারত একটি গণতন্ত্রী রাষ্ট্র। বাংলাদেশের গণতন্ত্র ভারতের সহযোগিতায় সেই কবে চুলায় গেছে। ভারত সবদিনই প্রতিবেশী গঞ্জনাকারী হিসাবে নামকরা অবস্থানে আছে। বছর কয় আগে ভারতের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং সংসদে এটি ষ্পষ্ট করেন যে, তাদের প্রথম সংবিধানে সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা ছিল না। পরে ভারতের স্বাধীনতার ২৯ বছর পর ১৯৭৬ সালে তাদের সংবিধানের ৪২তম সংশোধনীর মাধ্যমে সেটি সংযোজন করা হয়। এ হচ্ছে তাদের ধর্মনিরপেক্ষতার নমুনা। মনে রাখার বিষয় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ কোনদিনও ধর্মনিরপেক্ষতার খোলসে হয়নি। প্রায়শ অনেককে বলতে শুনি মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে ধর্মনিরপেক্ষতার উপর, এটি একটি চরম মিথ্যা কথা। মুক্তিযুদ্ধে ধর্ম কোন ফ্যাক্টর ছিল না। এটি মূলত ছিল পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান এ দুয়ের ভাগাভাগির লড়াই। পাকিস্তানীদের সাথে বিরোধ ছিল অর্থনৈতিক বিরোধ, ধর্মের কোন বিরোধ এদের মাঝে ছিল না। কিন্তু কৌশলী ইন্দিরা সেটি এ দেশের ঘাড়ে ষড়যন্ত্রের নামে যুক্ত করে দেন ১৯৭২ সালে, নিজ দেশ ভারতেরও চারবছর আগে। এসব ষড়যন্ত্রের সূতা নাতা সচেতনকে সবদিন ভাবায়। সাম্য, ন্যায়পরায়ণতা, মানবিক মর্যাদা এসব ছিল মুক্তিযুদ্ধের মূল নীতি। যদিও ভারতীয় অনুকরণের ধর্মনিরপেক্ষতা হচ্ছে ইন্দিরার চাপিয়ে দেয়া নীতি যার কঠোর প্রতিবাদ করে গেছেন মুক্তিযোদ্ধা মেজর জলিল তার গ্রন্থে। সচেতনের জন্য থরে বিথরে রসদও জমা আছে সেখানে। মেজর জলিল নিজে ছিলেন প্রথম রাজনৈতিক বন্দী, প্রথম বিজয় দিবসে বুঝতে পারেন স্বাধীনতার মর্মজ¦লা কত বিভৎস ও ভয়ংকর হয়ে জাতির জন্য অপেক্ষা করছে। দূরদৃষ্টির অধিকারী ঐ মুক্তিযোদ্ধার লেখা বইটির নামকরণই দেশটির বর্তমান অবস্থা স্পষ্ট করে ম্যাসেজ বিলি করে যাচ্ছে, বইটির নাম “অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা” ।

২০ ই জুলাই ২০১৯।

 

 

 

Advertisements

Tag Cloud

%d bloggers like this: