Articles published in this site are copyright protected.

নাজমা মোস্তফা

এরশাদ মুক্তিযুদ্ধ করেন নাই। রাজনীতির বা মুক্তিযুদ্ধের ধারে কাছে না থেকেও এরশাদ ক্ষমতা দখল করেন অন্যায়ভাবে। সেটি জোর করে ধরে রেখে অতপর একজন আপোষহীন নেত্রীর নেতৃত্বে অপারগ হয়ে হাল ছাড়েন নব্ব্ইএর দশকে। সম্প্রতি তিনি মারা গেছেন। ঐ সময় তিনি রংপুরে ছিলেন তারপরও যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে পাকিস্তান চলে যান। পরবর্তীতে ১৯৭৩ সালে পাকিস্তান প্রত্যাগতদের সাথে তিনি দেশে ফিরে আসেন। অতি মাত্রায় কপট অন্যায় ক্ষমতা লোভী এব্যক্তির পছন্দ রাজতন্ত্র।  রাজতন্ত্রের বাকশালী পথ মুজিবেরও শেষ জামানার স্বপ্ন, পরিকল্পনা ধ্যাণ ধারণা ছিল, যে পাপে তাকে সদলে প্রাণ হারাতে হয়। আমরা জানি নষ্টরা ওপথ পছন্দ করে বেশী,  শেখ হাসিনার পছন্দও ঐপথ, তাই আজো স্বাধীনতার প্রায় পঞ্চাশ বছর ছুঁই ছুঁই করছে আজো গণতন্ত্র শুধু কিতাবে গোয়ালে নেই, ময়দানে স্বৈরতন্ত্রই সার। যদিও ৬ই ডিসেম্বর ১৯৯০ সালকে স্বৈরাচার পতন দিবস হিসাবে পালন করা হয়, কিন্তু এর মাঝে ঐ দুই নীতিহীনের বন্ধুত্ব গড়ে উঠে এবং সেটি আমৃত্যু চলমান থাকে। ৮৬এর পাতানো নির্বাচনে এরা দুজন দুইনামে চিহ্নিত হয়। একজন জাতির দেয়া তকমা স্বৈরাচার আর একজন নিজের দেয়া গালি কাঁধে জাতীয় বেঈমান হয়ে আছেন। ২০০৯ সালে হাসিনার ক্ষমতা দখলের পর এরশাদ বলেছিলেন “সেনাবাহিনীর ভূমিকা না থাকলে আওয়ামী লীগ জীবনেও ক্ষমতায় আসতো না  (দৈনিক আমাদের সময়, মার্চ ০৪, ২০০৯), তিনি আরো বলেছিলেন আমি অনেক কিছুই জানি, সময় হলে প্রকাশ করবো। এর মাঝে জাতি অনেক কিছুই জেনেছে। কিন্তু তার আর সময় হয়নি ওটি খোলাসা করার কারণ তাকে মাইনকার চিপায় ঠেসে ধরে রাখা হয়েছিল।

এরশাদ খুনী, তার হাতে রক্তের দাগ তবে তুলনামূলক হাসিনার থেকে অনেক অনেক কম। সময় ১লা জুন ১৯৮১ সাল। বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আব্দুস সাত্তার অফিসে মেজর জেনারেল মঞ্জুর ধরা পড়লে একটি টেলিফোন আসে বঙ্গভবনে, এতে উত্তেজিত এরশাদ রেড টেলিফোনের কাছে ছুটে যান আর একটি নাম্বারে ডায়াল করেন। ও পাশ থেকে বলা হয়, মঞ্জুরকে পুলিশ আটক করেছে। উপস্থিত ময়দানের সাক্ষিরা এরশাদের চতুর বাণীর শ্রোতা “এক্ষুনী তাকে নিয়ে নাও। তারপর পরিকল্পনা মত কাজ করো” বলেই তিনি ত্বরায় টেলিফোন রেখে দেন। জিয়া হত্যার ১২ ঘন্টা পর একটি গল্প আকাশে বাতাসে প্রচার করা হয় যে, লোভী মঞ্জুর এ কাজ করেছে। এ সময় বিদেশী সাংবাদিক লরেন্স ছিলেন ভারতের বিহারে। উৎসাহী লরেন্স তিনদিন পর বেনোপোল সীমান্ত দিয়ে ঢাকায় পৌছেন এবং মাত্র এক সপ্তাহ থেকে তিনি যথেষ্ট রসদ সংবাদ সংগ্রহ করেই ত্বরায় দেশ ছাড়েন কারণ পুলিশের বাধা। এদিকে এরশাদের নেতৃত্বে ঐ সময় বাংলাদেশের ঢাকা রেডিও থেকে ক্রমাগত এটি প্রচার করা হয় যে, মঞ্জুর “খুনী ও বিশ^াসঘাতক”। ভারত থেকে পাওয়া ভারতীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নে এতদসংক্রান্ত অনেক যুক্তিতে হাসিনা এরশাদ জোটবাধা শাসকবর্গের যুক্তি খাপে খাপে মিলে। এরা উভয়েই ধরা খায়। যারা প্রকৃতই ভারতীয় দালালীতে বাংলাদেশ বিরোধী কাজে সরাসরি জড়িত। এরা দলে দলে দেশে সময়ে সময়ে পাকিস্তান পাকিস্তান বলে শুধু চিল্লায়, তাদের ভারতীয় দূর্নাম লুকানোর জন্য। জেনে রাখবেন, এরাই মিরজাফর উমিচাদ রায়দূর্লভের বংশধারা।

বিচারের নামে সেদিন ১৩ জন মুক্তিযোদ্ধাকে ফাঁসি দেয়া হয়। এরকম অভিনব এক এক্সপ্রেস ফিল্ড কোর্ট মার্শাল তাদের কোন আত্মপক্ষ সমর্থণের সুযোগও দেয় নি। বরং জোর করে তাদের দিয়ে বলানো হয় যে, ওটি ছিল একটি অভ্যুত্থান। তাদের ঐ মিথ্যা বলানোর জন্য তাদের প্রহার করা হয়, আঙ্গুল থেকে নখ উপড়ে ফেলা হয়, যৌনাঙ্গ পুড়িয়ে দেয়া হয়। নির্যাতীতরা এত কষ্টের মাঝেও অভিশম্পাদ দিতে কুন্ঠিত হন নাই। এসব চিত্র জুলফিকার আলী মানিকের সাহসী কলামে উঠে এসেছে। ঐ সময় কোন এক অজানা কারণে সরকারী কৌশলীরাও কোন পদক্ষেপ নিতে পারেন নাই। বিকৃত ইতিহাস সৃষ্টিকারীরা যে নষ্ট ইতিহাস গড়তে কি ভয়ংকর দাগ রেখেছে এ তার নমুনা মাত্র।

তথ্যসূত্র: মতিয়ুর রহমান রেন্টুর আমার ফাঁসি চাই গ্রন্থ থেকে:-  ১৯৮২ সালের মার্চের ২৪ তারিখে এই ক্ষমতালোভী জেনারেল এরশাদ জনগণের নির্বাচিত বিচারপতি আব্দুস সাত্তারকে রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে গলা ধাক্কা দিয়ে বের করে দেন। এবং পরদিন একই উপায়ে ঐ বৃদ্ধের বুকে বন্দুক ঠেকিয়ে তাকে রেডিও টেলিভিশনের সামনে এনে পুতুলের আদলে দন্ড হাতে রেডিও টেলিভিশনে নিজের অযোগ্যতা ও তার সরকারের দুর্নীতি – স্বজনপ্রীতি ইত্যাদি কারণ দর্শিয়ে স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ছেড়ে দেবার অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর করতে বাধ্য করেন এই প্রতারক এরশাদ।  এরশাদ দেশে সামরিক আইন জারি করে স্বয়ং হলেন প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক। শেখ হাসিনার গোপন আমন্ত্রণে ও সহযোগিতায় এরশাদ ক্ষমতার মালিক হয়ে জনগণের বুকে জগদ্দল পাথরের মত চেপে বসেন (এরশাদকে ক্ষমতা গ্রহণের আমন্ত্রণ: ঐ গ্রন্থ ৪৬ পৃষ্ঠা)।

৮১ সালের ২৩শে ২৪শে মে টিএসসি তৃতীয় তলাতে কর্ণেল শওকত আলী (আওয়ামী লীগের এমপি, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামী) বলেন, “জিয়াউর রহমান চট্টগ্রাম গেলে —– মেজর জেনারেল মঞ্জুরের নেতৃত্বে জিয়াকে হত্যা করা হবে। এ হত্যাকান্ডের ব্যাপারে হাসিনা অবগত আছেন। কিভাবে এ দখল কাজ চট্টগ্রাম ঢাকাতে সমাধা হবে তার নির্দেশও সেখানে আছে। এরশাদসহ অন্যরা মঞ্জুরের সাথে থাকবেন। জেনারেল মঞ্জুর জিয়াকে হত্যা করেছে। ধূর্ত এরশাদ মঞ্জুরকে ত্বরায় হত্যার নির্দেশ দিয়ে নিজের অপরাধ ঢাকেন। হাসিনাই এরশাদকে জনগণের বুকের উপর বসান। জেল থেকে খালাস পাওয়া এরশাদের দাগী অপরাধীরাই ১৯৯০ সালের ২৭ নভেম্বর ডাঃ মিলনকে হত্যা করে (রাষ্ট্রপতি জিয়া হত্যা: ঐ গ্রন্থ ৪১ পৃষ্ঠা)।

ভারতীয় সানডে পত্রিকার ১৮তম সংখ্যায় প্রকাশিত ‘দি সেকেন্ড ওল্ডেস্ট প্রফেশন’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে প্রকাশিত “৭৫ সালের পর ইন্দিরা গান্ধীর অনুমোদন নিয়ে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে হত্যা করার চক্রান্ত বাস্তবায়নে অগ্রসর হয়। ৮০ সালে ইন্দিরা ক্ষমতা লাভের পর এটি ঘটে, জাতি জানে হাসিনার অনেক অনেক ভোটের ব্যয়ভার বহন করে ভারত। আজ এসব ওপেন সিক্রেট, সচেতনরা জানেন, আগা থেকে গোড়া এ জুটি স্বাধীনতা বিরোধী মিরজাফরগংদের ভূমিকায় নামতে পেরেছে । ঢাকার নিউনেশন পত্রিকায় ২৯ সেপ্টেম্বর ১৯৮৮ তারিখেও এটি প্রকাশিত হয়। তার এ হত্যা সংবাদ প্রথমে আকাশবাণীতে প্রচারিত হয় (ঐ গ্রন্থ ৬৩ পৃষ্ঠা), ঠিক বিডিআর বিদ্রোহের মত যেন একই মঞ্চ নাটক। সেদিনের দুই পলাতক সেনা অফিসার আজো ভারতে বসবাস করছে (শাসছুর রহমান, বাংলাদেশ ভারত সম্পর্ক, সাপ্তাহিক বিচিত্রা, ২২ বর্ষ ৯ সংখ্যা, ২৩ জুলাই, পৃষ্ঠা ৩৭)। জিয়া হত্যার খবর পেয়ে সিলেট থেকে ঢাকা ফেরার সময় শেখ হাসিনা ব্রাহ্মণবাড়ীয়ার সীমান্ত দিয়ে ভারত পাড়ি দেবার সময় সীমান্তরক্ষীদের দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হন। (শওকত মাহমুদ, বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনার ১২ বছর, দৈনিক দিনকাল, ২০/৫/৯৩ সংখ্যা)। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ নয়াদিল্লীস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশনে জানতে চায় শেখ হাসিনাকে গ্রেফতার করা হয়েছে কি না। তার মানে তাকে গ্রেফতারের পক্ষে অনেক যুক্তি ছিল, তাই তারা সন্দেহ করে। জিয়া হত্যার সপ্তাহ দুই আগে শেখ হাসিনা ভারত থেকে বাংলাদেশে আসেন জিয়া হত্যার এজেন্ডা নিয়ে, মজার বিষয় হচ্ছে জিয়াউর রহমানের সহযোগিতায় হাসিনা এদেশে আসেন আর বহুদলীয় গণতন্ত্রের সুযোগ সুবিধা লাভ করেন যা তার বাবা চিরতরে রুদ্ধ করেছিলেন। (প্রয়াত সিরাজুর রহমানের কলামে এর অসংখ্য প্রমাণাদি বর্তমান)।

ডাকাতে ডাকাতে দোস্তি হয় ঠিকই, তারপরও কিছু বৈরীতাও গোপন থাকে। লেঃ জেঃ এরশাদ নামের খাটাশকে (হাসিনার কথামত) হাতের মুঠোয় রাখতে এজেন্ডা প্রাপ্ত শেখ হাসিনা নামকা ওয়াস্তে এক ভুয়া আন্দোলনের পরিকল্পনা হাজির করে রাজনীতির নামে ছাত্র হত্যা করান, তার পরিকল্পনা হলো লাশ লাগবে, তবে শুধু লাশ হলে হবে না, লাশটি হতে হবে এরশাদের পুলিশের হাতে মারা লাশ। টাকা যা লাগে লাগুক। ঐ পথে হাটতে তখন পুলিশের এক (নয়নবন্ড!) কোম্পানী কমান্ডার হাফিজুর রহমান লস্করকে নগদ টাকাতে কেনা হয়। সম্ভবত এসব বিষয়ে শেখ হাসিনা ভারতের প্রশিক্ষণ প্রাপ্তা। একের পর এক এ ধারার অসংখ্য অপরাধ বাংলাদেশে চলমান আছে এবং ঘটে চলেছে। ১৯৯৫ সালে প্রথমে মঞ্জুরের ভাই মঞ্জুর হত্যার বিরুদ্ধে মামলা করেন। এরপর ২০১৫ সাল পর্যন্ত ২২ বার বিচারক পরিবর্তিত হয়েছে (বিতর্কীত  ভাইবোনের কারসাজি!)। বিগত সময়ে একযোগে জেএমবির ৬৩ জেলাতে বোমা হামলা, ২১ আগষ্ট গ্রেনেড হামলা, লগি বৈঠা দিয়ে ময়দানে মানুষ খুন, পেট্রোল বোমা নাটকে বারে বারেই সন্ত্রাসী আওয়ামীরা ধরা খায়, সেক্রেটারিয়েটের দিগম্বর কাহিনীর মত নিকৃষ্ট অশ্লীলতা, বিশ^বিদ্যালয়কে ডাকাতের গ্রাম বানানোর পেছনেও এরা কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। এ সরকারের পালিত সন্ত্রাসীরা বিগত শতকে র্ধষণের সেঞ্চুরী করে প্রকাশ্যে বাহবা কুড়িয়েছে। মানুষ খুন করলে এ সরকার তাদের পুরষ্কৃত করে। ২১ আগষ্ট ২০০৪ সালের গ্রেনেড হামলায় জড়িত ছিল পাশর্^বর্তী দেশ ও আওয়ামী লীগের কতিপয় নেতা (সূত্র: প্রথম আলো, ২১ আগষ্ট, ২০০৮ সাল), এ ছাড়া শত শত গুম খুন নাটকের চলমান প্রক্রিয়া ডিজিটাল গতিতে জাতিকে মৃত্যু কুপের দিকে ছুড়ে দিয়েছে। এর পেছনে এই দুই স্বৈর শাসক ও তাদের সাহায্যকারী বিদেশী শক্তি। এরা কে কত বড় বন্ধু, ও দেশপ্রেমিক সেটি মাপতে না পারা, এ জাতির ৫০ পূর্তির পূর্ব মুহূর্তের আকাশচুম্বী ব্যর্থতা।

উল্লেখ্য এনএসআইর নথিপত্রে জিয়াউর রহমান বা বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধাচারণকারীদের তালিকায় জেনারেল এরশাদের নামও ছিল। ফলে ইত্যবসরে জেনারেল এরশাদ ক্ষমতায় এসে প্রথমেই এনএসআই থেকে হাফিজুর রহমান লস্করকে ঝেটিয়ে বিদেয় করেন। এতে লস্কর এরশাদের উপর ক্ষুব্ধ থাকায় হাসিনার প্রস্তাবে শামিল হন আর হাসিনা এমন বাজপাখিকে খুঁজে বের করেন। শিকারীর নীলনকশা অনুযায়ী পরিকল্পনা হলো ছাত্রদের মিছিলটি কোন রকমে দোয়েল চত্বরে আনলেই হলো, বাকী কাজ আর্মড পুলিশ সামাল দিবে। (৪৮ পৃষ্ঠা)। ১৪ই ফেব্রুয়ারী, ১৯৮৩ সাল।  বসন্ত উৎসব মুখর বিশ^বিদ্যালয়। ১২/১৩ ফেব্রুয়ারীতেই চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয় নগদ অর্থ প্রদান করে স্থানকাল নির্ধারিত হয়। মিছিলটি যেই বাংলা একাডেমী ছেড়ে দোয়েল চত্বর ফেলে আসলেই হাফিজুর রহমান লস্করের আর্মড ফোর্সের গুলি গুড়ম গুড়ম ঠাস ঠাস; মুহূর্তের মাঝে জয়নাল ও জাফর লাশ হয়ে পরলোকে চলে গেল। বিশ^বিদ্যালয়ে নেমে এল শোকের ছায়া। থেমে গেল ফেব্রুয়ারীর বসন্ত উৎসব। ছাত্ররা তাদের নিহত সাথীদের নিয়ে শোকাহত ঐতিহাসিক বটতলায়। বিকেল তিনটায়, নিহত ছাত্রদের লাশ দেখে রুমাল দিয়ে চোখ মুছার ভান করতে করতে নেত্রী শেখ হাসিনা এলাকা ত্যাগ করলেন, পরবর্তী কোন কর্মসূচী ব্যতিরেকে। ইত্যবসরে এরশাদের সাথে যোগাযোগ করে মোচলেকা আদায় করেন যে তিনি কোন কর্মসূচী দেবেন না। এ খবর জানার পর আশ^স্ত হয়ে এরশাদ সরকার সমগ্র বিশ^বিদ্যালয় এলাকায় চারদিকে পুলিশী ও মিলিটারী হামলা চালায়। প্রতিবাদী ছাত্ররা দিকবিদিক দৌড়াতে থাকে আর বেধড়ক মার খায়। চারদিকে পড়ে থাকে জুতা স্যান্ডেল। এভাবে ব্যর্থ হয় জাফর ও জয়নালের আত্মদান (যেন ফের মনে পড়ে ২১ আগষ্টের নিজ দলের আইভি নিধনের পরিকল্পিত রঙ্গমেলা!)। হাসিনা নিজের প্রয়োজনে যে কারো বুকে ছুরি বসাতে কুন্ঠিত নন। লেখক এসব অকপটে স্বীকার করেছেন।

পরের বছর ১৯৮৪ সাল, ঘুরে আসে বসন্ত আবার, আন্দোলনের মাস। ২৮ ফ্রেব্রুয়ারী, ৩০/৪০ জনের এক মিছিল আসবে, জানা গেল সেখানে পেছন থেকে হামলা হবে। যে কয়জন এটি জানে তারা মিছিলের সামনে সামনে থাকে। বিকেল পাঁচটা, যেই মিছিলটি নীমতলী পার হয়ে ফুলবাড়িয়া বাসস্ট্যান্ডে ঢোকে, সাথে সাথেই রায়ট পুলিশ তাদের লরিটি বিদ্যুৎ গতিতে মিছিলের উপর তুলে দিল। পিছনে থাকা সেলিম মুহূর্তে লরির চাকায় পিস্ট হয়ে যায়। বাকী অন্যরা ছিটকে দুপাশে ছড়ায়। দেলোয়ার সোজা প্রাণপণ দৌড়াতে থাকে। মুহূর্তে দেলোয়ারের শরীর চাকার সাথে পিষে মারে রায়ট পুলিশের লরি। ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে অধীর আগ্রহে অর্ডারী লাশের জমার অপেক্ষায় শেখ হাসিনা, খবর শুনে পুলকিত ও আনন্দিত হয়ে বলে উঠেন – সাবাস। যারা মারা গেল তারা বা তাদের স্বজনরা হয়তো আজো জানে না কিভাবে তাদের নয়নের মনিরা এভাবে মারা পড়ছে। সেদিনও তিনি অজ্ঞাত স্থানে চলে যান (পরবর্তী ষড়যন্ত্র করতে)। পরদিন ভোরেও অজ্ঞাত স্থানে বোরখা পরে তিনি অজ্ঞাত লোকের সাথে লং ড্রাইভে যান। এদিকে ছাত্ররা ঐ মৃত্যুগুলো নিয়ে আন্দোলন করতে চাইলে হাসিনা তাদের বাধা দেন। এবং তাদের স্বান্তনা দেন আমাদের মূল শত্রু জিয়া ও তার দল বিএনপি। জিয়া তো শেষ। আর এরশাদ মাত্র বিএনপি থেকে ক্ষমতা দখল করেছে। এখন থেকে আমাদের প্রধান কাজ হবে বিএনপিকে চিরতরে শেষ করে দেয়া। আমরা এরশাদের বিরুদ্ধে সরাসরি যাব না। আমাদের মূল শত্রু বিএনপি, এটি মনে রাখতে হবে। ছাত্ররা সেদিন ভগ্ন হৃদয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়লে তিনি বলেন আবেগাপ্লুত হয়ে লাভ নেই। সময় হলে এদের পরিবারকে পুষিয়ে দেয়া হবে। ছাত্রনেতারা কোন রকম কর্মসূচী ছাড়াই ভগ্ন হৃদয়ে সে স্থান ত্যাগ করে। (৫৩ পৃষ্ঠা, ঐ গ্রন্থ)। হায়রে মোটা মাথার ছাত্র নেতারা, তোমাদের বিবেক কেমন করে এত মরে গেল জানি না! কিসের মোহে ছুটে মরছো। তোমরা কি মানুষ না! আজো প্রার্থণা করি তোমরা শুধু মানুষ হও, আর কিছু না।

আসলো ১৯৮৬ নির্বাচন। এরশাদ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় পাকাপোক্ত অবস্থানে। এর মাঝে নিরবে নিঃশব্দে বেগম জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি উল্লেখযোগ্য একক রাজনৈতিক শক্তিতে প্রতিষ্ঠিত হলো। ষড়যন্ত্র চলছে— টাকার বস্তা আসতে থাকে। মুখ সেলাই করা ৯টি টাকার বস্তা। মাইক্রোবাসে করে আনা বস্তাগুলি ৩২ নম্বরের নীচতলার মাস্টার বাথরুমে রাখা হয়। জরুরী সংবাদ সম্মেলনের ডাক পড়ে ডাঃ কামালসহ অনেকেরই। কেউই এটি আগে জানতেন না, মাত্র চারজন ছাড়া। টাকার বাহক এস আই চৌধুরী / হাসিনা/ এরশাদ আর ডিজিডিএফ ব্রিগেডিয়ার মাহমুদুল হাসান। তখন হাসিনা একদিনও কাল ক্ষেপন করতে রাজী নন। কারণ বিএনপিকে ল্যাং মেরে তাকে নির্বাচনে যেতে হবে। পরদিন ষ্টিলের ওয়ারড্রোব কেনা হলো। আর সেলাই করা বস্তার মাল সামানা ওখানে সাটা হলো। এভাবে জাতির বারোটা বাজার সব প্রক্রিয়া জোরেসোরে চলতে লাগলো। (৫৫ পৃষ্ঠা, ঐ গ্রন্থ)।

দেশ দুই ভাগে বিভক্ত হলো। একভাগ এরশাদের ও হাসিনার পাতানো নির্বাচনে, অন্যভাগ খালেদা ও স্বৈরাচার পতনের ভাগে থাকলো। এ দেশটিতে এ যাবত যা ঘটছে তা ঘটাচ্ছে এসব দেশীয় দালাল যারা কখনোই দেশপ্রেমিক না, বরং এরা দেশ বিধ্বংসী শত্রু। এ দেশের প্রতিটি দুর্যোগ এরা মনের মাধূরী মিশিয়ে সাজায় আর সহজ সরল মানুষকে ভোগান্তিতে ফেলে নিজেরা নিজেদের আখের সামলায়। জনতাকে আবারো মনে করিয়ে দিতে চাই, কিভাবে তারেক জিয়াকে ফাঁসানো হয়েছে মিথ্যা মামলা দিয়ে, এসব তার নমুনা মাত্র। এর উপরও আমার বিস্তারিত লেখা আমার ব্লগে আছে। আপনারা সেটি পড়ে মূল ঘটনা জানতে পারেন। বিগত শতক থেকে কিভাবে রাহুর মত হাসিনা ও এরশাদ এ জাতির ঘাড়ে চেপে বসেছে, সেটি জাতিকে জানতে হবে। এ জাতির সমস্ত দুর্গতির মূলে এ দুই নষ্টের এক হওয়া ষড়যন্ত্রই, জাতিকে জাতির প্রতিটি সদস্যকে হুমকির মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। ।

বাঘ যখন মানুষ খায় তখন তার নেশা বেড়ে যায়, সে বারে বারে মানুষ খেতে উৎসাহী হয়। একই দশা হয়েছে এসব স্বৈরশাসকদের। পরবর্তীতে এভাবে আবার আসলো ১৩ বস্তা টাকা, আগের থেকে ৪ বস্তা বেশী। এসব টাকার রং লাগে না, মুসলিম হয়েও স্বৈরাচাররা কখনোই হালাল হারাম সাদা কালো বুঝে না। টাকা হলেই হয়। টাকা আসছে গুলশানের সেই ব্যবসায়ী এস আই চৌধুরীর মাধ্যমে তিনটি মাইক্রোবাসে ৩২ নম্বরে। আগের জায়গায়ই বস্তা উঠানো হলো। আগে ছিল দশ কোটি টাকা এবার অনুমান পনেরো কোটি টাকা। ঐ টাকার খেলায় হাসিনা জাতির ঘাড়ে এরশাদকে আরো শক্তিশালী হয়ে স্বৈরশাসন চালাবার অঙ্গিকার দিয়ে মাঠে নামালো (ঐ গ্রন্থ, ৫৭ পৃষ্ঠা), এর সাক্ষ্যদাতা মটর সাইকেল আরোহী নিজে, এই ১৫ কোটি টাকার বিষদাঁত আজো জাতির মজ্জা চোষে খাচ্ছে। আজকে ওটি কত হাজার কোটিতে গেছে সেটি বলার অপেক্ষা রাখে না। কারণ আজ সেটি আরো শক্ত হয়ে জাতির ঘাড়ে জগদ্দল পাথরের মতই চেপে বসেছে।

আপনারা সত্য জানুন আর এর সফল পরিণতি নিজ চোখে দেখুন। ওরা এ জাতির ছারপোকা, জেনে বুঝেই জাহান্নামের পথে হেটেছে গদীর লোভে। জেনে রাখুন ওরাই হবে পাথরের ও আগুণের খোরাক কুরআনের হিসাবে। আপনারাই ঐ দেশে সবচেয়ে বড় নির্যাতীত সদস্য, তাই আজকে আপনাদের নিজেদের জন্য দোয়া দাওয়া প্রচার ও সুবিচার সবচেয়ে বেশী প্রয়োজন। আল্লাহ আপনাদের সহায় হোক।

১৫ই জুলাই ২০১৯।

 

বিশেষ দ্রষ্টব্য: এ কলামটি নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক “দি রানার নিউজ” এ ১৯ জুলাই ২০১৯ সংখ্যায় ছাপা হয়।

 

Tag Cloud

%d bloggers like this: