Articles published in this site are copyright protected.

Archive for July, 2019

এরশাদ ও তার স্বৈর স্বজন হাসিনা

নাজমা মোস্তফা

এরশাদ মুক্তিযুদ্ধ করেন নাই। রাজনীতির বা মুক্তিযুদ্ধের ধারে কাছে না থেকেও এরশাদ ক্ষমতা দখল করেন অন্যায়ভাবে। সেটি জোর করে ধরে রেখে অতপর একজন আপোষহীন নেত্রীর নেতৃত্বে অপারগ হয়ে হাল ছাড়েন নব্ব্ইএর দশকে। সম্প্রতি তিনি মারা গেছেন। ঐ সময় তিনি রংপুরে ছিলেন তারপরও যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে পাকিস্তান চলে যান। পরবর্তীতে ১৯৭৩ সালে পাকিস্তান প্রত্যাগতদের সাথে তিনি দেশে ফিরে আসেন। অতি মাত্রায় কপট অন্যায় ক্ষমতা লোভী এব্যক্তির পছন্দ রাজতন্ত্র।  রাজতন্ত্রের বাকশালী পথ মুজিবেরও শেষ জামানার স্বপ্ন, পরিকল্পনা ধ্যাণ ধারণা ছিল, যে পাপে তাকে সদলে প্রাণ হারাতে হয়। আমরা জানি নষ্টরা ওপথ পছন্দ করে বেশী,  শেখ হাসিনার পছন্দও ঐপথ, তাই আজো স্বাধীনতার প্রায় পঞ্চাশ বছর ছুঁই ছুঁই করছে আজো গণতন্ত্র শুধু কিতাবে গোয়ালে নেই, ময়দানে স্বৈরতন্ত্রই সার। যদিও ৬ই ডিসেম্বর ১৯৯০ সালকে স্বৈরাচার পতন দিবস হিসাবে পালন করা হয়, কিন্তু এর মাঝে ঐ দুই নীতিহীনের বন্ধুত্ব গড়ে উঠে এবং সেটি আমৃত্যু চলমান থাকে। ৮৬এর পাতানো নির্বাচনে এরা দুজন দুইনামে চিহ্নিত হয়। একজন জাতির দেয়া তকমা স্বৈরাচার আর একজন নিজের দেয়া গালি কাঁধে জাতীয় বেঈমান হয়ে আছেন। ২০০৯ সালে হাসিনার ক্ষমতা দখলের পর এরশাদ বলেছিলেন “সেনাবাহিনীর ভূমিকা না থাকলে আওয়ামী লীগ জীবনেও ক্ষমতায় আসতো না  (দৈনিক আমাদের সময়, মার্চ ০৪, ২০০৯), তিনি আরো বলেছিলেন আমি অনেক কিছুই জানি, সময় হলে প্রকাশ করবো। এর মাঝে জাতি অনেক কিছুই জেনেছে। কিন্তু তার আর সময় হয়নি ওটি খোলাসা করার কারণ তাকে মাইনকার চিপায় ঠেসে ধরে রাখা হয়েছিল।

এরশাদ খুনী, তার হাতে রক্তের দাগ তবে তুলনামূলক হাসিনার থেকে অনেক অনেক কম। সময় ১লা জুন ১৯৮১ সাল। বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আব্দুস সাত্তার অফিসে মেজর জেনারেল মঞ্জুর ধরা পড়লে একটি টেলিফোন আসে বঙ্গভবনে, এতে উত্তেজিত এরশাদ রেড টেলিফোনের কাছে ছুটে যান আর একটি নাম্বারে ডায়াল করেন। ও পাশ থেকে বলা হয়, মঞ্জুরকে পুলিশ আটক করেছে। উপস্থিত ময়দানের সাক্ষিরা এরশাদের চতুর বাণীর শ্রোতা “এক্ষুনী তাকে নিয়ে নাও। তারপর পরিকল্পনা মত কাজ করো” বলেই তিনি ত্বরায় টেলিফোন রেখে দেন। জিয়া হত্যার ১২ ঘন্টা পর একটি গল্প আকাশে বাতাসে প্রচার করা হয় যে, লোভী মঞ্জুর এ কাজ করেছে। এ সময় বিদেশী সাংবাদিক লরেন্স ছিলেন ভারতের বিহারে। উৎসাহী লরেন্স তিনদিন পর বেনোপোল সীমান্ত দিয়ে ঢাকায় পৌছেন এবং মাত্র এক সপ্তাহ থেকে তিনি যথেষ্ট রসদ সংবাদ সংগ্রহ করেই ত্বরায় দেশ ছাড়েন কারণ পুলিশের বাধা। এদিকে এরশাদের নেতৃত্বে ঐ সময় বাংলাদেশের ঢাকা রেডিও থেকে ক্রমাগত এটি প্রচার করা হয় যে, মঞ্জুর “খুনী ও বিশ^াসঘাতক”। ভারত থেকে পাওয়া ভারতীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নে এতদসংক্রান্ত অনেক যুক্তিতে হাসিনা এরশাদ জোটবাধা শাসকবর্গের যুক্তি খাপে খাপে মিলে। এরা উভয়েই ধরা খায়। যারা প্রকৃতই ভারতীয় দালালীতে বাংলাদেশ বিরোধী কাজে সরাসরি জড়িত। এরা দলে দলে দেশে সময়ে সময়ে পাকিস্তান পাকিস্তান বলে শুধু চিল্লায়, তাদের ভারতীয় দূর্নাম লুকানোর জন্য। জেনে রাখবেন, এরাই মিরজাফর উমিচাদ রায়দূর্লভের বংশধারা।

বিচারের নামে সেদিন ১৩ জন মুক্তিযোদ্ধাকে ফাঁসি দেয়া হয়। এরকম অভিনব এক এক্সপ্রেস ফিল্ড কোর্ট মার্শাল তাদের কোন আত্মপক্ষ সমর্থণের সুযোগও দেয় নি। বরং জোর করে তাদের দিয়ে বলানো হয় যে, ওটি ছিল একটি অভ্যুত্থান। তাদের ঐ মিথ্যা বলানোর জন্য তাদের প্রহার করা হয়, আঙ্গুল থেকে নখ উপড়ে ফেলা হয়, যৌনাঙ্গ পুড়িয়ে দেয়া হয়। নির্যাতীতরা এত কষ্টের মাঝেও অভিশম্পাদ দিতে কুন্ঠিত হন নাই। এসব চিত্র জুলফিকার আলী মানিকের সাহসী কলামে উঠে এসেছে। ঐ সময় কোন এক অজানা কারণে সরকারী কৌশলীরাও কোন পদক্ষেপ নিতে পারেন নাই। বিকৃত ইতিহাস সৃষ্টিকারীরা যে নষ্ট ইতিহাস গড়তে কি ভয়ংকর দাগ রেখেছে এ তার নমুনা মাত্র।

তথ্যসূত্র: মতিয়ুর রহমান রেন্টুর আমার ফাঁসি চাই গ্রন্থ থেকে:-  ১৯৮২ সালের মার্চের ২৪ তারিখে এই ক্ষমতালোভী জেনারেল এরশাদ জনগণের নির্বাচিত বিচারপতি আব্দুস সাত্তারকে রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে গলা ধাক্কা দিয়ে বের করে দেন। এবং পরদিন একই উপায়ে ঐ বৃদ্ধের বুকে বন্দুক ঠেকিয়ে তাকে রেডিও টেলিভিশনের সামনে এনে পুতুলের আদলে দন্ড হাতে রেডিও টেলিভিশনে নিজের অযোগ্যতা ও তার সরকারের দুর্নীতি – স্বজনপ্রীতি ইত্যাদি কারণ দর্শিয়ে স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ছেড়ে দেবার অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর করতে বাধ্য করেন এই প্রতারক এরশাদ।  এরশাদ দেশে সামরিক আইন জারি করে স্বয়ং হলেন প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক। শেখ হাসিনার গোপন আমন্ত্রণে ও সহযোগিতায় এরশাদ ক্ষমতার মালিক হয়ে জনগণের বুকে জগদ্দল পাথরের মত চেপে বসেন (এরশাদকে ক্ষমতা গ্রহণের আমন্ত্রণ: ঐ গ্রন্থ ৪৬ পৃষ্ঠা)।

৮১ সালের ২৩শে ২৪শে মে টিএসসি তৃতীয় তলাতে কর্ণেল শওকত আলী (আওয়ামী লীগের এমপি, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামী) বলেন, “জিয়াউর রহমান চট্টগ্রাম গেলে —– মেজর জেনারেল মঞ্জুরের নেতৃত্বে জিয়াকে হত্যা করা হবে। এ হত্যাকান্ডের ব্যাপারে হাসিনা অবগত আছেন। কিভাবে এ দখল কাজ চট্টগ্রাম ঢাকাতে সমাধা হবে তার নির্দেশও সেখানে আছে। এরশাদসহ অন্যরা মঞ্জুরের সাথে থাকবেন। জেনারেল মঞ্জুর জিয়াকে হত্যা করেছে। ধূর্ত এরশাদ মঞ্জুরকে ত্বরায় হত্যার নির্দেশ দিয়ে নিজের অপরাধ ঢাকেন। হাসিনাই এরশাদকে জনগণের বুকের উপর বসান। জেল থেকে খালাস পাওয়া এরশাদের দাগী অপরাধীরাই ১৯৯০ সালের ২৭ নভেম্বর ডাঃ মিলনকে হত্যা করে (রাষ্ট্রপতি জিয়া হত্যা: ঐ গ্রন্থ ৪১ পৃষ্ঠা)।

ভারতীয় সানডে পত্রিকার ১৮তম সংখ্যায় প্রকাশিত ‘দি সেকেন্ড ওল্ডেস্ট প্রফেশন’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে প্রকাশিত “৭৫ সালের পর ইন্দিরা গান্ধীর অনুমোদন নিয়ে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে হত্যা করার চক্রান্ত বাস্তবায়নে অগ্রসর হয়। ৮০ সালে ইন্দিরা ক্ষমতা লাভের পর এটি ঘটে, জাতি জানে হাসিনার অনেক অনেক ভোটের ব্যয়ভার বহন করে ভারত। আজ এসব ওপেন সিক্রেট, সচেতনরা জানেন, আগা থেকে গোড়া এ জুটি স্বাধীনতা বিরোধী মিরজাফরগংদের ভূমিকায় নামতে পেরেছে । ঢাকার নিউনেশন পত্রিকায় ২৯ সেপ্টেম্বর ১৯৮৮ তারিখেও এটি প্রকাশিত হয়। তার এ হত্যা সংবাদ প্রথমে আকাশবাণীতে প্রচারিত হয় (ঐ গ্রন্থ ৬৩ পৃষ্ঠা), ঠিক বিডিআর বিদ্রোহের মত যেন একই মঞ্চ নাটক। সেদিনের দুই পলাতক সেনা অফিসার আজো ভারতে বসবাস করছে (শাসছুর রহমান, বাংলাদেশ ভারত সম্পর্ক, সাপ্তাহিক বিচিত্রা, ২২ বর্ষ ৯ সংখ্যা, ২৩ জুলাই, পৃষ্ঠা ৩৭)। জিয়া হত্যার খবর পেয়ে সিলেট থেকে ঢাকা ফেরার সময় শেখ হাসিনা ব্রাহ্মণবাড়ীয়ার সীমান্ত দিয়ে ভারত পাড়ি দেবার সময় সীমান্তরক্ষীদের দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হন। (শওকত মাহমুদ, বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনার ১২ বছর, দৈনিক দিনকাল, ২০/৫/৯৩ সংখ্যা)। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ নয়াদিল্লীস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশনে জানতে চায় শেখ হাসিনাকে গ্রেফতার করা হয়েছে কি না। তার মানে তাকে গ্রেফতারের পক্ষে অনেক যুক্তি ছিল, তাই তারা সন্দেহ করে। জিয়া হত্যার সপ্তাহ দুই আগে শেখ হাসিনা ভারত থেকে বাংলাদেশে আসেন জিয়া হত্যার এজেন্ডা নিয়ে, মজার বিষয় হচ্ছে জিয়াউর রহমানের সহযোগিতায় হাসিনা এদেশে আসেন আর বহুদলীয় গণতন্ত্রের সুযোগ সুবিধা লাভ করেন যা তার বাবা চিরতরে রুদ্ধ করেছিলেন। (প্রয়াত সিরাজুর রহমানের কলামে এর অসংখ্য প্রমাণাদি বর্তমান)।

ডাকাতে ডাকাতে দোস্তি হয় ঠিকই, তারপরও কিছু বৈরীতাও গোপন থাকে। লেঃ জেঃ এরশাদ নামের খাটাশকে (হাসিনার কথামত) হাতের মুঠোয় রাখতে এজেন্ডা প্রাপ্ত শেখ হাসিনা নামকা ওয়াস্তে এক ভুয়া আন্দোলনের পরিকল্পনা হাজির করে রাজনীতির নামে ছাত্র হত্যা করান, তার পরিকল্পনা হলো লাশ লাগবে, তবে শুধু লাশ হলে হবে না, লাশটি হতে হবে এরশাদের পুলিশের হাতে মারা লাশ। টাকা যা লাগে লাগুক। ঐ পথে হাটতে তখন পুলিশের এক (নয়নবন্ড!) কোম্পানী কমান্ডার হাফিজুর রহমান লস্করকে নগদ টাকাতে কেনা হয়। সম্ভবত এসব বিষয়ে শেখ হাসিনা ভারতের প্রশিক্ষণ প্রাপ্তা। একের পর এক এ ধারার অসংখ্য অপরাধ বাংলাদেশে চলমান আছে এবং ঘটে চলেছে। ১৯৯৫ সালে প্রথমে মঞ্জুরের ভাই মঞ্জুর হত্যার বিরুদ্ধে মামলা করেন। এরপর ২০১৫ সাল পর্যন্ত ২২ বার বিচারক পরিবর্তিত হয়েছে (বিতর্কীত  ভাইবোনের কারসাজি!)। বিগত সময়ে একযোগে জেএমবির ৬৩ জেলাতে বোমা হামলা, ২১ আগষ্ট গ্রেনেড হামলা, লগি বৈঠা দিয়ে ময়দানে মানুষ খুন, পেট্রোল বোমা নাটকে বারে বারেই সন্ত্রাসী আওয়ামীরা ধরা খায়, সেক্রেটারিয়েটের দিগম্বর কাহিনীর মত নিকৃষ্ট অশ্লীলতা, বিশ^বিদ্যালয়কে ডাকাতের গ্রাম বানানোর পেছনেও এরা কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। এ সরকারের পালিত সন্ত্রাসীরা বিগত শতকে র্ধষণের সেঞ্চুরী করে প্রকাশ্যে বাহবা কুড়িয়েছে। মানুষ খুন করলে এ সরকার তাদের পুরষ্কৃত করে। ২১ আগষ্ট ২০০৪ সালের গ্রেনেড হামলায় জড়িত ছিল পাশর্^বর্তী দেশ ও আওয়ামী লীগের কতিপয় নেতা (সূত্র: প্রথম আলো, ২১ আগষ্ট, ২০০৮ সাল), এ ছাড়া শত শত গুম খুন নাটকের চলমান প্রক্রিয়া ডিজিটাল গতিতে জাতিকে মৃত্যু কুপের দিকে ছুড়ে দিয়েছে। এর পেছনে এই দুই স্বৈর শাসক ও তাদের সাহায্যকারী বিদেশী শক্তি। এরা কে কত বড় বন্ধু, ও দেশপ্রেমিক সেটি মাপতে না পারা, এ জাতির ৫০ পূর্তির পূর্ব মুহূর্তের আকাশচুম্বী ব্যর্থতা।

উল্লেখ্য এনএসআইর নথিপত্রে জিয়াউর রহমান বা বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধাচারণকারীদের তালিকায় জেনারেল এরশাদের নামও ছিল। ফলে ইত্যবসরে জেনারেল এরশাদ ক্ষমতায় এসে প্রথমেই এনএসআই থেকে হাফিজুর রহমান লস্করকে ঝেটিয়ে বিদেয় করেন। এতে লস্কর এরশাদের উপর ক্ষুব্ধ থাকায় হাসিনার প্রস্তাবে শামিল হন আর হাসিনা এমন বাজপাখিকে খুঁজে বের করেন। শিকারীর নীলনকশা অনুযায়ী পরিকল্পনা হলো ছাত্রদের মিছিলটি কোন রকমে দোয়েল চত্বরে আনলেই হলো, বাকী কাজ আর্মড পুলিশ সামাল দিবে। (৪৮ পৃষ্ঠা)। ১৪ই ফেব্রুয়ারী, ১৯৮৩ সাল।  বসন্ত উৎসব মুখর বিশ^বিদ্যালয়। ১২/১৩ ফেব্রুয়ারীতেই চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয় নগদ অর্থ প্রদান করে স্থানকাল নির্ধারিত হয়। মিছিলটি যেই বাংলা একাডেমী ছেড়ে দোয়েল চত্বর ফেলে আসলেই হাফিজুর রহমান লস্করের আর্মড ফোর্সের গুলি গুড়ম গুড়ম ঠাস ঠাস; মুহূর্তের মাঝে জয়নাল ও জাফর লাশ হয়ে পরলোকে চলে গেল। বিশ^বিদ্যালয়ে নেমে এল শোকের ছায়া। থেমে গেল ফেব্রুয়ারীর বসন্ত উৎসব। ছাত্ররা তাদের নিহত সাথীদের নিয়ে শোকাহত ঐতিহাসিক বটতলায়। বিকেল তিনটায়, নিহত ছাত্রদের লাশ দেখে রুমাল দিয়ে চোখ মুছার ভান করতে করতে নেত্রী শেখ হাসিনা এলাকা ত্যাগ করলেন, পরবর্তী কোন কর্মসূচী ব্যতিরেকে। ইত্যবসরে এরশাদের সাথে যোগাযোগ করে মোচলেকা আদায় করেন যে তিনি কোন কর্মসূচী দেবেন না। এ খবর জানার পর আশ^স্ত হয়ে এরশাদ সরকার সমগ্র বিশ^বিদ্যালয় এলাকায় চারদিকে পুলিশী ও মিলিটারী হামলা চালায়। প্রতিবাদী ছাত্ররা দিকবিদিক দৌড়াতে থাকে আর বেধড়ক মার খায়। চারদিকে পড়ে থাকে জুতা স্যান্ডেল। এভাবে ব্যর্থ হয় জাফর ও জয়নালের আত্মদান (যেন ফের মনে পড়ে ২১ আগষ্টের নিজ দলের আইভি নিধনের পরিকল্পিত রঙ্গমেলা!)। হাসিনা নিজের প্রয়োজনে যে কারো বুকে ছুরি বসাতে কুন্ঠিত নন। লেখক এসব অকপটে স্বীকার করেছেন।

পরের বছর ১৯৮৪ সাল, ঘুরে আসে বসন্ত আবার, আন্দোলনের মাস। ২৮ ফ্রেব্রুয়ারী, ৩০/৪০ জনের এক মিছিল আসবে, জানা গেল সেখানে পেছন থেকে হামলা হবে। যে কয়জন এটি জানে তারা মিছিলের সামনে সামনে থাকে। বিকেল পাঁচটা, যেই মিছিলটি নীমতলী পার হয়ে ফুলবাড়িয়া বাসস্ট্যান্ডে ঢোকে, সাথে সাথেই রায়ট পুলিশ তাদের লরিটি বিদ্যুৎ গতিতে মিছিলের উপর তুলে দিল। পিছনে থাকা সেলিম মুহূর্তে লরির চাকায় পিস্ট হয়ে যায়। বাকী অন্যরা ছিটকে দুপাশে ছড়ায়। দেলোয়ার সোজা প্রাণপণ দৌড়াতে থাকে। মুহূর্তে দেলোয়ারের শরীর চাকার সাথে পিষে মারে রায়ট পুলিশের লরি। ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে অধীর আগ্রহে অর্ডারী লাশের জমার অপেক্ষায় শেখ হাসিনা, খবর শুনে পুলকিত ও আনন্দিত হয়ে বলে উঠেন – সাবাস। যারা মারা গেল তারা বা তাদের স্বজনরা হয়তো আজো জানে না কিভাবে তাদের নয়নের মনিরা এভাবে মারা পড়ছে। সেদিনও তিনি অজ্ঞাত স্থানে চলে যান (পরবর্তী ষড়যন্ত্র করতে)। পরদিন ভোরেও অজ্ঞাত স্থানে বোরখা পরে তিনি অজ্ঞাত লোকের সাথে লং ড্রাইভে যান। এদিকে ছাত্ররা ঐ মৃত্যুগুলো নিয়ে আন্দোলন করতে চাইলে হাসিনা তাদের বাধা দেন। এবং তাদের স্বান্তনা দেন আমাদের মূল শত্রু জিয়া ও তার দল বিএনপি। জিয়া তো শেষ। আর এরশাদ মাত্র বিএনপি থেকে ক্ষমতা দখল করেছে। এখন থেকে আমাদের প্রধান কাজ হবে বিএনপিকে চিরতরে শেষ করে দেয়া। আমরা এরশাদের বিরুদ্ধে সরাসরি যাব না। আমাদের মূল শত্রু বিএনপি, এটি মনে রাখতে হবে। ছাত্ররা সেদিন ভগ্ন হৃদয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়লে তিনি বলেন আবেগাপ্লুত হয়ে লাভ নেই। সময় হলে এদের পরিবারকে পুষিয়ে দেয়া হবে। ছাত্রনেতারা কোন রকম কর্মসূচী ছাড়াই ভগ্ন হৃদয়ে সে স্থান ত্যাগ করে। (৫৩ পৃষ্ঠা, ঐ গ্রন্থ)। হায়রে মোটা মাথার ছাত্র নেতারা, তোমাদের বিবেক কেমন করে এত মরে গেল জানি না! কিসের মোহে ছুটে মরছো। তোমরা কি মানুষ না! আজো প্রার্থণা করি তোমরা শুধু মানুষ হও, আর কিছু না।

আসলো ১৯৮৬ নির্বাচন। এরশাদ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় পাকাপোক্ত অবস্থানে। এর মাঝে নিরবে নিঃশব্দে বেগম জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি উল্লেখযোগ্য একক রাজনৈতিক শক্তিতে প্রতিষ্ঠিত হলো। ষড়যন্ত্র চলছে— টাকার বস্তা আসতে থাকে। মুখ সেলাই করা ৯টি টাকার বস্তা। মাইক্রোবাসে করে আনা বস্তাগুলি ৩২ নম্বরের নীচতলার মাস্টার বাথরুমে রাখা হয়। জরুরী সংবাদ সম্মেলনের ডাক পড়ে ডাঃ কামালসহ অনেকেরই। কেউই এটি আগে জানতেন না, মাত্র চারজন ছাড়া। টাকার বাহক এস আই চৌধুরী / হাসিনা/ এরশাদ আর ডিজিডিএফ ব্রিগেডিয়ার মাহমুদুল হাসান। তখন হাসিনা একদিনও কাল ক্ষেপন করতে রাজী নন। কারণ বিএনপিকে ল্যাং মেরে তাকে নির্বাচনে যেতে হবে। পরদিন ষ্টিলের ওয়ারড্রোব কেনা হলো। আর সেলাই করা বস্তার মাল সামানা ওখানে সাটা হলো। এভাবে জাতির বারোটা বাজার সব প্রক্রিয়া জোরেসোরে চলতে লাগলো। (৫৫ পৃষ্ঠা, ঐ গ্রন্থ)।

দেশ দুই ভাগে বিভক্ত হলো। একভাগ এরশাদের ও হাসিনার পাতানো নির্বাচনে, অন্যভাগ খালেদা ও স্বৈরাচার পতনের ভাগে থাকলো। এ দেশটিতে এ যাবত যা ঘটছে তা ঘটাচ্ছে এসব দেশীয় দালাল যারা কখনোই দেশপ্রেমিক না, বরং এরা দেশ বিধ্বংসী শত্রু। এ দেশের প্রতিটি দুর্যোগ এরা মনের মাধূরী মিশিয়ে সাজায় আর সহজ সরল মানুষকে ভোগান্তিতে ফেলে নিজেরা নিজেদের আখের সামলায়। জনতাকে আবারো মনে করিয়ে দিতে চাই, কিভাবে তারেক জিয়াকে ফাঁসানো হয়েছে মিথ্যা মামলা দিয়ে, এসব তার নমুনা মাত্র। এর উপরও আমার বিস্তারিত লেখা আমার ব্লগে আছে। আপনারা সেটি পড়ে মূল ঘটনা জানতে পারেন। বিগত শতক থেকে কিভাবে রাহুর মত হাসিনা ও এরশাদ এ জাতির ঘাড়ে চেপে বসেছে, সেটি জাতিকে জানতে হবে। এ জাতির সমস্ত দুর্গতির মূলে এ দুই নষ্টের এক হওয়া ষড়যন্ত্রই, জাতিকে জাতির প্রতিটি সদস্যকে হুমকির মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। ।

বাঘ যখন মানুষ খায় তখন তার নেশা বেড়ে যায়, সে বারে বারে মানুষ খেতে উৎসাহী হয়। একই দশা হয়েছে এসব স্বৈরশাসকদের। পরবর্তীতে এভাবে আবার আসলো ১৩ বস্তা টাকা, আগের থেকে ৪ বস্তা বেশী। এসব টাকার রং লাগে না, মুসলিম হয়েও স্বৈরাচাররা কখনোই হালাল হারাম সাদা কালো বুঝে না। টাকা হলেই হয়। টাকা আসছে গুলশানের সেই ব্যবসায়ী এস আই চৌধুরীর মাধ্যমে তিনটি মাইক্রোবাসে ৩২ নম্বরে। আগের জায়গায়ই বস্তা উঠানো হলো। আগে ছিল দশ কোটি টাকা এবার অনুমান পনেরো কোটি টাকা। ঐ টাকার খেলায় হাসিনা জাতির ঘাড়ে এরশাদকে আরো শক্তিশালী হয়ে স্বৈরশাসন চালাবার অঙ্গিকার দিয়ে মাঠে নামালো (ঐ গ্রন্থ, ৫৭ পৃষ্ঠা), এর সাক্ষ্যদাতা মটর সাইকেল আরোহী নিজে, এই ১৫ কোটি টাকার বিষদাঁত আজো জাতির মজ্জা চোষে খাচ্ছে। আজকে ওটি কত হাজার কোটিতে গেছে সেটি বলার অপেক্ষা রাখে না। কারণ আজ সেটি আরো শক্ত হয়ে জাতির ঘাড়ে জগদ্দল পাথরের মতই চেপে বসেছে।

আপনারা সত্য জানুন আর এর সফল পরিণতি নিজ চোখে দেখুন। ওরা এ জাতির ছারপোকা, জেনে বুঝেই জাহান্নামের পথে হেটেছে গদীর লোভে। জেনে রাখুন ওরাই হবে পাথরের ও আগুণের খোরাক কুরআনের হিসাবে। আপনারাই ঐ দেশে সবচেয়ে বড় নির্যাতীত সদস্য, তাই আজকে আপনাদের নিজেদের জন্য দোয়া দাওয়া প্রচার ও সুবিচার সবচেয়ে বেশী প্রয়োজন। আল্লাহ আপনাদের সহায় হোক।

১৫ই জুলাই ২০১৯।

 

বিশেষ দ্রষ্টব্য: এ কলামটি নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক “দি রানার নিউজ” এ ১৯ জুলাই ২০১৯ সংখ্যায় ছাপা হয়।

 

Advertisements

ট্রেনে শেখ হাসিনার মদনীয় হামলার মিথ্যাচার  

নাজমা মোস্তফা 

আজ জুলাই এর এক তারিখ। বিগত ২৪ বছর অর্থাৎ দুই যুগ পূর্ব মিথ্যা সাজানো মামলার রায় হবে মাত্র দুদিন পর ০৩ জুলাই ২০১৯। হয়তো আমার এ কলামটি আসতে পারে পরবর্তী সপ্তাহে, ততদিনে মিথ্যা মামলার মিথ্যা রায় ময়দানে এসে যাবে, বিচারক রুস্তম আলী। ঘটনা ঈশ^রদী, পাবনা আর ভৌতিক মামলার আসামীরা স্থানীয় বিএনপির ময়দানের কর্মীরা। প্রথম আলোর প্রথম জুলাইএর বিবরণে প্রকাশ ১৯৯৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর উত্তরাঞ্চলে দলীয় কর্মসূচিতে শেখ হাসিনা ট্রেনে করে খুলনা থেকে সৈয়দপুর যাচ্ছিলেন। ট্রেনটি ঈশ^রদী প্রবেশের সময় স্থানীয় বিএনপি নেতা-কর্মীরা আতর্কিত গুলি, বোমাবর্ষণ ও হামলা চালান। পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করতে গেলে তারা পুলিশকে লক্ষ্য করে বোমা নিক্ষেপ করেন। বোমার আঘাতে তৎকালীন ম্যাজিস্ট্রেট তোফাজ্জল হোসেন ও পুলিশের কয় সদস্যরা আহত হন। ঐ সময় ঈশ^রদী পুলিশ বাদী হয়ে বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা করে। পরে মামলাটি সিআইডিতে হস্তান্তর করা হয়। তদন্ত শেষে এ মামলার ৫২জনকে আসামী করে আদালতে চূড়ান্ত অভিযোগ দাখিল করা হয়। দীর্ঘ ২৪ বছর ৯ মাস ৯ দিন পর আগামী বুধবার রায়। এদের ৩০ জন আসামী আদালতে হাজির হলে তাদের জামিন বাতিল করে তাদেরে কারাগারে পাঠানো হয়। ৫ জন বিভিন্ন সময় মারা গেছেন। বাকী আসামীরা গতকাল আদালতে হাজির না হলে তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।

একরাশ মিথ্যাচার ও ষড়যন্ত্রে ভরা দেশটির অসংখ্য নাবলা কথা জনসম্মুখে উঠে এসেছে একটি বইএ। বইটির নাম “আমার ফাঁসি চাই” লেখক মুক্তিযোদ্ধা মতিয়ুর রহমান রেন্টু। কিছু প্রশ্ন কিছু কথা: দুশো আড়াইশ পৃষ্ঠার বই, লেখক একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে ছাত্র অবস্থাতেই যুদ্ধে যোগদান করেন ক্লাস নাইনে থাকতেই। অতঃপর ১৯৮১ সালের ১৭ই মে শেখ হাসিনা দেশে ফেরার পরদিন থেকে ১৯৯৭ সালের ১৫ই জানুয়ারী পর্যন্ত ১৬ বছর তিনি হাসিনার সাথে ঘনিষ্টভাবে সম্পর্কীত ছিলেন। তার স্ত্রী নাজমা আক্তার ময়না ১৯৮৮ সাল থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত প্রায় ৯ বছর শেখ হাসিনার অবৈতনিক হাউজ সেক্রেটারী ছিলেন। “১৯৯৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার জননেত্রী শেখ হাসিনা বিমানযোগে যশোর হয়ে খুলনা এসে বিকেলে শহীদ হাদিস পার্কে ভাষন দেন। রাত্রে তার চাচাতো ভাই শেখ নাসেরের বড় ছেলে শেখ হেলালের বাড়ীতে খান ও থাকেন। পরদিন ২৩ সেপ্টেম্বর শুক্রবার সকাল নয়টায় উত্তরবঙ্গের উদ্দেশ্যে ট্রেন যাত্রা শুরু করেন। সাধারণ যাত্রী সহযোগে বেশ লম্বা ট্রেন। ট্রেনের সাধারণ যাত্রীরা জানেও না বা বুঝতে পারছে না হাসিনার সভা করতে যাওয়া এই ট্রেন কবে কখন গন্তব্যে পৌছাবে।

ঠিক নয়টায় ট্রেন ছাড়ে। প্রতি ষ্টেশনেই ট্রেন থামিয়ে সভা চলছে। ট্রেন থেকে নেমে সভাস্থলে সভা করে ফেরত আসতে ১ ঘন্টা সময় লাগছে। এভাবে প্রতি স্টেশনে গড়ে ১ ঘন্টা করে দিন পেরিয়ে রাত নামলো। শেখ হাসিনার ঢাকা থেকে আসা ডজন খানেক সাংবাদিক (তার ভাষায় সাংঘাতিক) সাথে রয়েছে। সবই বিশাল আয়োজন। ট্রেনের শেষের দিকে একটি ভিআইপি স্পেশাল কামরায় বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা, ঐ কম্পার্টমেন্টের সামনে ও পিছনে নেত্রীর নিরাপত্তায় নিয়োজিত স্পেশাল এসবি ব্রাঞ্চ পুলিশের বারো জন সদস্য। তার পরের কম্পার্টমেন্টে সাংবাদিকগণ, এরপর বাকী সব কম্পার্টমেন্টে সাধারণ যাত্রী। এই দীর্ঘ বিলম্বে বাকীদের ত্রাহি মধুসুদন অবস্থা। ছয় ঘন্টার রাস্তা চব্বিশ ঘন্টায়ও না ফুরানোয় পানিসহ সকল খাবার ফুরিয়ে গেলে সাধারণ যাত্রীদের কষ্ট ও দুর্ভোগ সীমাহীন পর্যায়ে পৌছে। তৃষ্ণার্ত ক্ষুধার্ত শিশুদের কান্না ও আহাজারিতে অনেকে গন্তব্যের আগে ট্রেন থেকে নেমে পালিয়ে বাঁচে। অপর দিকে প্রতিটি স্টেশন থেকে অফুরন্ত খাবার ও বিশুদ্ধ পানি (মিনারেল ওয়াটার) পর্যাপ্ত পরিমাণে সরবরাহ করা হয়। সারা দিনে নেত্রী প্রায় কুড়িটির মত রেলস্টেশনে জনসভায় এভাবে ভাষন দেন। রেলস্টেশন ছাড়াও উৎসুক জনতা ট্রেন থামালে সেখানেও তিনি বক্তৃতা করেন এবং সাংবাদিকরা সব লিপিবন্ধ করছেন। রাতের আঁধারে একই বক্তৃতা বার বার শুনতে শুনতে সাংবাদিকদের প্রায় মুখস্ত হওয়ায় শেষ দিকে তারা অনেকেই ট্রেন থেকে নেমে সংবাদ লিপিবদ্ধ করতে যাননি। রাত তখন ১১টা ১৭ মিনিট। ঈশ^রদী পৌছার পূর্ব মুহূর্তে শেখ হাসিনা বলেন, আমি এত যামাই আদরে এদেরে এনেছি আর তারা ঘুমাচ্ছে, এত লোক হচ্ছে আর বক্তৃতা করছি কিছুই তাদের নজরে আসছে না। এসব সাংবাদিকদের ঘুম ভাঙ্গিয়ে আমার জনসভাতে পাঠাও যেন পরদিন সব পত্রপত্রিকায় ভালো নিউজ হয়।  এ সময় শেখ হাসিনার বেতনভুক এক কর্মচারী মদন মোহন দাস বলল, ‘ডাইকা ঘুম ভাঙ্গন লাগবো না। পিস্তল দিয়া কয় রাউন্ড গুলি করলেই সাংঘাতিক গো ঘুম কই যাইব, লাফাইয়া ট্রেন থাইক্যা নীচে পইড়া যাইবো।’ 

আলাউদ্দিনের প্রদীপ পাওয়ার মত সঙ্গে সঙ্গে শেখ হাসিনা তখন তার বাবার ফুফাতো ভাইয়ের ছেলে বাহাউদ্দিন নাসিমকে বললেন, ‘দে দুই রাউন্ড গুলি করে। আর উপস্থিত অন্যদেরে বললেন, তোমরা আমাকে (হাসিনাকে) হত্যার জন্য ট্রেনে গুলি করা হয়েছে বলে সাংঘাতিকদের মাঝে প্রচার করে দেবে।’ ট্রেন ঈশ^রদী প্ল্যাটফর্মে ঢোকার কয়েক মিনিট আগে বাহাউদ্দিন নাসিম ট্রেনের জানলা দিয়ে সাংবাদিকদের কম্পার্টমেন্ট লক্ষ্য করে পিস্তল দিয়ে তিন রাউন্ড গুলি ছুড়লো। গুলির শব্দ শুনে হাসিনার নিরাপত্তায় নিয়োজিত স্পেশাল ব্রাঞ্চের পুলিশরাও ৫-৬ রাউন্ড গুলি করে। এ আওয়াজে পাশের কম্পার্টমেন্টে থাকা সাংবাদিকরা ভয়ে ট্রেনের ভিতরে গড়াগড়ি শুরু করে এবং আমরা (রেন্টুগং) পরিকল্পনামত সাংবাদিকদের কম্পার্টমেন্টে এসে শেখ হাসিনাকে হত্যার জন্য ট্রেনে গুলি করা হয়েছে বলে প্রচার করতে থাকি। ট্রেন ঈশ^রদী প্ল্যাটফর্মে থামলে, ঈশ^রদী রেলস্টেশনের জনসভার মঞ্চ থেকে মাইকে আওয়ামী লীগ সদস্য আমির হোসেন আমু শেখ হাসিনাকে হত্যার জন্য ট্রেনে গুলি করা হয়েছে বলে প্রচার করেন। জাতীয় পত্র পত্রিকায় সংবাদ বের হলে বগুড়া সরকারী সার্কিট হাউসের ভিভিআইপি রুমে বসে শেখ হাসিনাসহ তার সফর সঙ্গীরা (যারা মূল ঘটনা জানে) হাসাহাসি করতে থাকে। এবং হাসাহাসির এক পর্যায়ে গুলির এই ঘটনা নিয়ে হরতাল ডাকার সিদ্ধান্ত হয় (ঐ গ্রন্থ, পৃষ্ঠা ৭৩,৭৪,৭৫)।

সবার শেষে বলতে চাই গুলির মামলার বিচারের সবকিছুর মূলে এই আলাউদ্দিনের প্রদীপসম পাওয়া মদন আর তাদের মদনীয় মিথ্যাচার। এই বইটি এতই গুরুত্বপূর্ণ একটি বই, যা বিগত শতক থেকে শুরু করে এ জাতীর অনেক অনেক মানবসৃষ্ট দুর্ভোগের চিত্র স্পষ্টভাবে তুলে ধরছে। এটি যেকোন বিবেকবান সচেতনকে এ নিয়ে বার বার চিন্তা করতে হবে। আর কিছু না পারলে আপনারা সবাই ইন্টারনেটে সার্চ দিয়ে হলেও বইটি পড়েন ও জানেন দেশের প্রকৃত অবস্থা; দেশ কত অন্ধকারের দিকে ধাবিত হচ্ছে। সুক্ষ্ম গবেষনা বিশ্লেষণ সঠিক দিকদর্শন ও নৈতিক মূল্যবোধ সম্পন্ন আদর্শ ছাড়া মানুষের বাঁচার কোন বাস্তব রাস্তা নেই। সেখানে ঈশ^রদীর বিচারক থেকে ফরিয়াদী আসামী সবাই ধরা পড়বেন, অলরেডী সবাই তালিকায় নাম উঠিয়ে নিয়েছেন, চলমান ঘটনার সময়ই জগত ঈশ^রের খাতায় তা লিপিবদ্ধ হয়ে গেছে, শুধু রায়ের অপেক্ষায়।

লেখকের কথায় প্রকাশ শেষের দিকে সত্য কথা বলার দৃঢ়তা আমাদেরে প্রধানমন্ত্রী ও তার পরিবারের কাছে বিপজ্জনক করে তুলেছিল। ব্যক্তিগতভাবে যিনি অসৎ বেঈমান, মিনকহারাম এবং মুনাফেক তিনি কি রাষ্ট্রীয় বা সমাজ জীবনে সৎ ঈমানদার হতে পারেন। বইটির প্রকাশকের কথা : “৮১ থেকে ৯৭  পর্যন্ত শেখ হাসিনার রাজনৈতিক নেপথ্যের অনেক কাহিনীর বর্ণনা লেখক তার এই গ্রন্থে স্পষ্ট করে দিয়েছেন। এ কথা নিশ্চিত বলা যায় যে, আমার ফাঁসি চাই বইটি পড়লে যে কেউ বিশেষত তরুণ যুবক ছাত্র সম্প্রদায় রাজনৈতিক প্রতারণার হাত থেকে বেঁচে যাবেন।” প্রকাশকের এ কথার সাথে আমিও সচেতনদের একজন হয়ে একাত্বতা প্রকাশ করছি। আল্লাহ জগতের সকল নির্যাতীতের হেফাজত করুক।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: উল্লেখ্য উক্ত লেখার মূল অংশটি নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত ৫ জুলাই ২০১৯ সংখ্যা সাপ্তাহিক “দি রানার নিউজ” মাগাজিন ছেপেছে। কলামটিতে লেখকের বর্ণনাতে এটি খুব স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে কিভাবে একজন গণতান্ত্রিক প্রধানমন্ত্রী তার বিরোধী দলীয় নেত্রীর সাথে আচরণ করেছেন আর অন্যদিকে কিভাবে একজন বর্তমানের বিনাভোটের অবৈধ প্রধানমন্ত্রী একজন বিরোধী নেত্রীর প্রতি অমানবিক হুমকি ধমকির বিধান চালু করেছেন। সেটি বলার অপেক্ষা রাখে না, জাতির জানা। এতে এই দুজনারই আমলনামা স্পষ্ট হয়ে পড়ছে। এখানেও জাতির জন্য অনেক আশা নিরাশার বাণী লুকিয়ে আছে।

রায়ের পর পত্রিকা অবলম্বনে প্রতিক্রিয়া: উক্ত মামলায় ০৩ তারিখের রায়ে ৯ জনের ফাঁসি, ২৫ জনের যাবজ্জীবন আর ১৩ জনের ১০ বছরের কারাদন্ড হয়েছে। এর ভিত্তিতে আরো কিছু কথা না বললেই নয়। সম্পূর্ণ মিথ্যার উপর দাঁড়িয়ে একটি দেশ চলছে, এর অসংখ্য উদাহরণ উপরে নীচে ডানে বামে সবদিকে ছড়িয়ে আছে। বিচার বিভাগ ও পুলিশ বিভাগ উঠবস করে অবৈধ সরকারের কড়া হুকুমে। সাম্প্রতিক সময়ে উত্তম উদাহরণ হিসাবে মানুষ উত্তর কোরিয়ার উদাহরণ টানে। প্রথম আলোর নিউজে এসেছে ঐ সময় মামলা দায়েরের পরে পুলিশ অভিযোগের কোন সাক্ষী না পেয়ে আদালতে ওটি জমা দেয়। তখন আদালত সেটি গ্রহণ না করে মামলাটি সিআইডিতে পাঠায়। পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালে হাসিনা সরকার এসে পুনঃতদন্ত করে ১৯৯৭ সালের ৩ এপ্রিল বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের ৫৭ জনের নামে আবার নতুন অভিযোগপত্র জমা দেয়। ঐ ঘটনার বিবরণ হিসাবে আনা হয় শ্যামল দত্তের ভোরের কাগজের সংবাদ। খবরের শিরোনাম: শেখ হাসিনার ট্রেন যাত্রায় বাধা, গুলি বোমা অর্ধশত আহত। — গোটা শহরে বোমাবাজি চলতে থাকে। আওয়ামী লীগের হাজার খানেক কর্মীর উপর হামলা হয়।

তৎকালীন সরকারের প্রেস নোট: ভোরের কাগজের প্রেস নোটের অভিযোগের কোন সত্যতা পাওয়া যায়নি। খবরটিতে সরকারের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়েছে কিন্তু প্রাথমিক পর্যায়ে এ অভিযোগের কোন সত্যতা পাওয়া যায়নি। ট্রেনটি স্টেশনে পৌছানোর আগে উশৃংখল সমর্থকদের মাঝে কিছু ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া ও পটকা বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়। একই ধারার খবর ছাপে মানবজমিন যে, ১৯৯৬ সালে এর পুনঃতদন্ত হয় এবং নতুনকরে বিরোধীদলের ৫২ জনকে আসামী করা হয়। নয়াদিগন্তও একই ধারার খবর ছাপে। ঘটনার দিন জিআরপি থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম বাদী হয়ে মামলা করেন। সত্যতা না পাওয়ায় এর তিন বছর পর হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর মামলার চার্জসিট দাখিল করে। এর মাঝে ৬ জন ইতমধ্যে মারা যান। বিএনপির সহতথ্য ও গবেষনা সম্পাদক হাবিবুর রহমান হাবিব তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, এটা একটি হাস্যকর মামলা। এতে মৃত্যুদন্ড কি কোন সাজা হওয়ারও কথা নয়। এ রায় পৃথিবীর নজির বিহীন রায় বলে আমি মনে করি। কারণ ঐদিন আমি নিজে আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের যুগ্ম আহবায়ক থাকার কারণে শেখ হাসিনার সফর সঙ্গী ছিলাম। আমি ঐ ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী। এ ঘটনায় মৃত্যুদন্ড বা যাবজ্জীবন হতে পারে না। রায়ের পর আদালত থেকে বের হলে তার উপর হামলাও করা হয় বলে তিনি অভিযোগ করেন। আশা করি বাংলাদেশে শ্যামলদত্ত ছাড়াও মানুষ বাস করেন। ঐ দেশে ঐ সব দেশ বিরোধী গুটিকয় দালাল ছাড়াও যদি কোন পত্রিকা বা কোন সম্পাদক থেকে থাকেন তবে তাদের নিজেদের স্বার্থে ও দেশটির স্বার্থে আপনারা সোচ্চার হন। একজন সত্যসন্ধানী গবেষক লেখক, কলামিস্ট হিসাবে এসব অনাচারের বিরুদ্ধে এ নোংরামির কঠোর প্রতিবাদ জানাচ্ছি ও প্রকৃত সত্য উন্মোচনের  দাবী জানাচ্ছি।

সুসংগ্রহ: “আর যে বিষয়ে তোমার কোন জ্ঞান নেই তার অনুসরণ করো না। নিঃসন্দেহ শ্রবণ শক্তি ও দৃষ্টিশক্তি ও অন্তঃকরণ—এদের প্রত্যেকটিকে তাদের সম্বন্ধে সওয়াল করা হবে (সুরা বনি ইসরাইলের ৩৬ আয়াত)।”

০৩/০৭/২০১৯ তারিখ

https://amarfashichai.blogspot.com/2013/07/amar-fashi-chai-by-motiur-rahman-rentu.html

Tag Cloud