Articles published in this site are copyright protected.

নাজমা মোস্তফা 

মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত সংগ্রামী জনতাকে ময়দান থেকে সরিয়ে দেবার এজেন্ডা নিয়েছে সরকার ও তার সহযোগিরা। বিগত শতকের শেষ দশক থেকে “এই জিয়া সেই জিয়া নয়” বলে এ প্রজেক্টে হাত দেন ভারত ফেরত মুজিব কন্যা নিজে (রেন্টুর গ্রন্থে প্রকাশ)। সত্যকে অস্বীকার করার এ এজেন্ডায় তিনি দল গড়ে তুলেন আর সমানেই প্রচার করেন আমি আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় পাই না। এটি কি আল্লাহ ভীতির নমুনা? দেশ থেকে গণতন্ত্রের দাগচিহ্ন মুছে দিতে তার জুড়ি মেলা ভার। নিকট সময়ে তাকে মানুষ মিশরের সিসির সাথে তুলনা করছে আর তার প্রধান শত্রু খালেদা জিয়া গণতন্ত্রের পথিকৃত সবদিন, খালেদাকে মুরসীর সাথে তুলনা করা হচ্ছে। মুরসীর এরকম ঘটনা যে তারা ঘটাবে এ শংকা করেছেন অনেকে। সত্যবাদী সক্রেটিস একজন, কিন্তু মধ্যযুগের বিচারকরা প্রকৃত অপরাধী ও ধিকৃত সবদিন। সম্মান ও মর্যাদা সক্রেটিসের ভাগে আজো জমছে। বাংলাদেশে সুরেন্দ্র কুমারসহ আরো বিচারকরা স্পষ্ট করে গেছেন দেশের ভয়ংকর বিচার ব্যবস্থা। ময়দানের বিচারকরা সরকারের গোলাম নাহলে বহিষ্কার তাদের পাওনা। সত্য উন্মোচনকারী সাংবাদিকের ভাগ্যে জমে পলায়ন। যিনি পালাতে জানেন না, তাকে কারারুদ্ধ করা হয় বছরের পর বছর, তাদের পত্রিকায় সিলগালা পড়ে, আইয়ুব সরকারও যত সংযম দেখিয়েছে, তার ছেটেফোঁটাও অবৈধ পথে আসা সরকারে নেই।

সোহেল তাজের ভাগনাকে গুম করে গিলতে না পেরে ছুড়ে দিয়ে অদেখা অধরা গুম হত্যাকারী ময়দানে আবারো স্পষ্ট হলো। এতিমের টাকা চুরি, পেট্রোল বোমা নিক্ষেপের ঘটনা, ২১ আগষ্টের ঘটনায় এতই অস্পষ্টতা ও অসত্য অনাচার জড়িয়ে আছে যে ঐ কটি ঘটনা ছাড়া দেশে কোন বিশৃংখলা ঘটে নাই, সরকার এটি প্রমাণে ব্যস্ত। আর কিছু ঘটলেই তার দায় নেয়ার জন্য খালেদা জিয়া জামায়াত ও তাদের দল জমা আছেই। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাঙ্কসহ শেয়ারবাজার বালিশ কান্ড, কয়গুণ নির্মাণ ব্যয়ের মহামেলা সবই ঢেকে রাখা। কিছুই প্রকাশ করা যাবে না, সত্য বলার নামে মিথ্যার মহামেলা চলছে দেশে। খালেদার মত সত্যকে আটক না করলে উপায় নেই। রুমিনকে সংসদে দেখে তারা যেমনি কাঁপে, খালেদাকে দেখলে কয়গুণ বেশী কাঁপে। সিসি যে কারণে মুরসীর গলাটিপে ধরলেন একই কারণে খালেদাও আক্রান্ত। কারণ তিনি জনপ্রিয়, তিনবারের সঠিক নির্বাচনের বৈধ গণতান্ত্রিক জিতে যাওয়া প্রধানমন্ত্রী। অপরপক্ষে অবৈধ পথ ছাড়া জিতবার উপায় নেই জেনেই এ পথ লুফে নিয়েছে। তারা মুখে আল্লাহ উচ্চারণ করে শুধু স্বার্থ উদ্ধারের জন্য। চুরেও চুরির আগে আল্লাহর নাম নেয়। এরা আল্লাহর সত্যকে বুঝেনি মানে নি, মনে করে অদেখা নাটক।

মুরসীকে কারাগারে পাঠিয়ে বাকীদেরে ফাঁসি দিয়ে হাজার হাজার আসামী না করলে ক্ষমতা ধরা দেয় না। তাই ৫২% ভোটে নির্বাচিত একজন গণতান্ত্রিক প্রেসিডেন্টকে ময়দান থেকে সরাতে চিকিৎসাসেবা না দেয়া, স্লোপয়জনিং এর দিকে ঠেলে দেয়ার সব যুক্তি তার মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করেছে, হিউম্যান রাইটস সহ সচেতনরা শংকা প্রকাশ করেছেন। লাশ না ফেরার দেশে চলে গেছে, তবে সত্যটা জানুন, বিচার হবে এটা নিশ্চিত। একই প্রচেষ্ঠা চলমান আছে খালেদা জিয়ার জন্য। কারণ গণতন্ত্রের জীবন্ত উদাহরণ ময়দানে থাকলে অপকর্মীরা বেকায়দায় পড়ে, তাই একই কায়দা রপ্ত করে এ ধারার অপরাধীরা। ন্যালসন ম্যান্ডেলার মতই কারারুদ্ধ করে গভীর রাতে ভোট সমাধা করাকে যারা বিজয়ের নমুনা ভাবছেন তারা দিশেহারা তো বটেই, ইহ ও পরকালের পথহারা। একটি ইউটিউবে দেখছিলাম শিল্পমন্ত্রী বলছেন, সারা বিশে^ বাংলাদেশ রোল মডেল। এরা মুষ্টিমেয় কয়জন নিজেরাই নিজেদের রাজাগিরির ঢোল পিটায়। স্বাধীনতার প্রায় ৫০ বছরের কাছাকাছি সময়ে গণতন্ত্রকে কবর দিয়ে স্বৈরগণতন্ত্র নামের রোল মডেল বানিয়ে নিজেরাই হাততালি দিচ্ছে। এটিও তাদের মিথ্যাচারের মাত্রাটা বুঝায়। গুটিকয় দেশবিক্রেতা দালালের কাছে দেশটি কি ধরণের কাঁচামাল যা চেটেপুটে লুটে খাওয়া যায়। যদিও প্রধানমন্ত্রী বলছেন এখন লুটার মত টাকা নেই ব্যাঙ্কে। কারণ ইতমধ্যে ব্যংকলুট শেষধাপে। তাই ভিন্ন খাতের দিকেই শিকারীর নজর।

বাংলাদেশের জন্য মুরসী এক অনন্য উদাহরণীয় সাইরেন ধ্বনি। মুরসীর খবর তুরষ্ক প্রকাশ করায় মিসর সরকার তাদের গণমাধ্যম ব্লক করে দেয় (১৮ জুন যুগান্তর)। একই ধারা বাংলাদেশের গণমাধ্যম জিয়া পরিবারের জন্য সব নিষিদ্ধ করে রেখেছে। এসব করে চলেছে বড় সময় থেকে। বিরোধীকে কথা বলতে, মিটিং মিছিল করতে দেয়া হয় না, তৃণমূল থেকে নেতাদের পেছনে শত শত মামলা ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে। অপকর্মীরা যত হাততালিই দিক বৃহত্তর স্বার্থে আত্মত্যাগীরাই শহীদ মর্যাদার অধিকারী, কুরআন বলে যারা সত্যের জন্য মরে তারা শহীদ, এদেরে মৃত বলো না, বরং এরা জীবিত। মুরসি শুধু একজন প্রেসিডেন্টই ছিলেন না, তার অসাধারণ অর্জন ছিল অনেক দিকেই, একজন ইঞ্জিনিয়ার, ইউনিভার্সিটির শিক্ষক, নাসার কাজেও একসময় তিনি জড়িত ছিলেন। মুসলিম ব্রাদারহুডের এ নেতা মিশরের একমাত্র নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারকে প্রথম ধাপে ময়দান থেকে সরায়। আর দ্বিতীয় ধাপে অসুস্থ মানুষটিকে কার্যকর কোন চিকিৎসা না দিয়ে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়, তাদের ভাষাতে এটি রাষ্ট্রীয় হত্যাকান্ড মাত্র। ইখওয়ানুল মুসলেমিন ব্রাদারহুডের জন্ম ১৯২৮ সালে, মুসলিম ব্রাদারহুড মিশরের জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল, স্বৈরশাসকের চক্ষুশূল। এর প্রতিষ্ঠাতা হাসান আল বান্নাকেও হত্যা করা হয়। সিসি আল ফাত্তাহর নেতৃত্বে দলটিকে নিষিদ্ধ করা হয়, শত শত মানুষকে হত্যা ও হাজার হাজার পরিবারকে বিপদে ঠেলে দেয়া হয়। ফেরাউনের দেশ মিশরে আজো ফেরাউনরা সচল। স্বৈর শাসকের সাথে হাত মেলায় সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইসরাইল। মুরসীকে উৎখাতে তারা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার অকাতরে ঢালে । আরব বসন্তের প্রাদুর্ভাবে তারা শংকিত সব সময়। অপরপক্ষে জর্ডান, মরক্কো, তিউনিসিয়া, কুয়েত, ফিলিস্তিন, ও বহু দেশের মানবসেবার নানা কর্মে মুসলিম ব্রাদারহুডের অবদান জ¦লজ্যান্ত। তুরষ্ক কাতার এ অবৈধ সরকারকে সমর্থন দেয়নি। ময়দান থেকে সরিয়ে গণতন্ত্রকে পদদলিত করে ৫০ জনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন নিরব ভূমিকা পালন করে, যা মানবতার কলঙ্ক হয়ে জ¦লছে। মুরসীর এ মৃত্যু আদালত ও শাসনের কলংকজনক অধ্যায়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা বলছে এ মৃত্যু স্বাভাবিক নয়। সরকার ও পুলিশী হেফাজতে তার মৃত্যু হয়।

আশংকা জাগছে মনে, মিসরের মত বাংলাদেশও কি আর একটি শহীদী মৃত্যুর অপেক্ষায় সময় পার করছে? মুরসী নবী মুসার কয়েক হাজার বছর পরে জন্মেও ঐদেশে এক নিরব প্রতিবাদী মৃত্যু দিয়ে অপরাধীদের কপালে কলঙ্ক তিলক এঁকে গেলেন। কায়রোর এক ভাড়া বাসাতে নিতান্ত সাদাসিধে জীবন যাপন করতেন এ সাধু পুরুষ। খাশোগী হত্যাকান্ডের নায়ক ও মূল কারিগর সৌদি যুবরাজ সালমান প্রকাশ্য দাগে চিহ্নিত হয়ে আছেন। অপরাধীকে চিনতে হাজার হাজার দাগের কি দরকার পড়ে? কুরআন তো প্রকাশ্যভাবে এদের স্বরুপ স্পষ্ট করে দেখিয়ে দিয়েছে। এরা কারা, এদের সহজ পরিচয় এরা সবদিন সাধুদের প্রকাশ্য শত্রু। কারাগারে মুরসি একটি কুরআন শরিফ চাইলে তারা দিতে বাধা দেয়। তখন মুরসীর জবাব ছিল তারা কি জানে না আমি ৩০ বছর আগে পবিত্র কুরআন মুখস্ত করেছি। কুরআন মুরসীর অন্তরে খোদাই করেই রাখা। একটি ইচ্ছে ছিল আল্লাহর কালামটি একটু ছুঁয়ে দেখা। মুসলিম নামধারী অনেক শাসক আছে যারা ধর্মের বাস্তব অভিজ্ঞতা জ্ঞানের চরম অজ্ঞতা ও ঘাটতি নিয়েই দেশ চালায়, গুম খুনের রাজত্ব চালায়, হারাম হালালের তোয়াক্কা না করে জাহান্নামের রসদ ঢক ঢক করে গিলে। মুরসী এদের থেকে অনেক অনেক উপরে অবস্থান করতেন। প্রধাণত এ আত্মত্যাগী মানুষটির অন্তরে সত্যের উপলব্ধি আঁচ করতে পেরেই বিরোধীরা তাকে জব্দ করে। কিন্তু সত্যকে কি এত সহজে মুছে দেয়া সম্ভব? এক মুরসী গত হলে লক্ষ মুরসীরা জেগে উঠতে কতক্ষণ? কারণ সত্যকে চিরদিন দাবিয়ে রাখা যায় না। সত্যের জন্ম হয় এক অদেখা সূত্র থেকে।

রোমানরা যখন ঈসা নবীকে শূলে চড়াতে চায় তখন সাধু নবী ঈসার প্রতি দরদী রোমান গভর্নর পিলেট তাকে জনরোষ থেকে বাঁচাতে রোমান চক্রান্তকারীদের কাছে একটি অপশন ছুড়ে দেন। একটি চিহ্নিত ডাকাতকে এনে হাজির করেন এই বলে যে, তোমরা চাইলে এই ডাকাত বারাব্বাসকে শূলে চড়াতে পার আর বিনিময়ে এই ব্যক্তিকে ছাড় দিতে পারি। রোমান ধর্মযাজকসহ জনতা ঐ সাধুরই শুলে বিদ্ধ মরণ চাইলো আর এমন সুযোগে ঐ ডাকাত মুক্ত হয়ে গেল। এটি হচ্ছে দু হাজার বছর আগের মধ্যযুগীয় সমাজের বিচারব্যবস্থা। আজকের যুগে বাংলাদেশও ঐ সব অপরাধের মাঝে ভয়ংকরভাবে আটকে আছে। সেখানে দেখা যায় কয় বারের খুনী অপরাধীরা যামাই আদর পায় জামিন পায়, অপরাধী মন্ত্রীরা সংসদে রাজা উজির মারে। কিন্তু খালেদা জিয়ার মত একজন শ্রদ্ধেয়া মহিলা যার বাচনিক অর্জন থেকে প্রতিটি সংযত আচরণ ও মর্যাদায় তিনি সব দিনই সাধারণের উপরে এক অনন্য উদাহরণ। এতিমের টাকা মারার তার কোন চিহ্নও নেই, বরং তা বেড়ে কয় গুণ হয়েছে।

সব যুগেই চক্রান্তকারীদের স্বরুপ কিন্তু এক। অপরাধীরা সব সময় এক লাইনে থাকে, একজন আরেকজনকে প্রশ্রয় দেয়। কারণ একজন আরেকজনের দোসর। সৌদি কি স্বার্থে সিসি আল ফাত্তাহএর সাথে গাটছড়া বাঁধে, শক্তিমানরা কেন সেখানে কারণ এদের স্বার্থ এক। পাকা রাধুনীর মত হাড়ির ভাত একটি টিপেই বুঝে নিন বাস্তবতা। কি কারণে কেন এবং কারা সোহেল তাজের ভাগনাকে তারাকান্দার বটতলা এলাকায় চোখ বাধা সৌরভকে গাড়ী থেকে ছুড়ে পালালো। এদের সৎ সাহস নেই বলেই এরা রাতের আঁধারে ভোট চুরি করে, মানুষ গুম খুন করে জঙ্গিগীত গেয়ে সব সাধুর নামে মিথ্যাচার করে, পেট্রোল বোমা ছুড়ে সাধুর নামে অপবাদ ছড়ায়। কিছুই লুকানো নেই। কে বা কারা পেট্রোল বোমা ছুড়ছে সব প্রমান ময়দানে, শুধু মিডিয়াকে চাপের মুখে রেখে মধ্যযুগের মতই বাংলার মুসাদেরে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ক্ষমতান্ধ ফেরাউন।

সুসংগ্রহ: “তাদের অন্তরে ব্যারাম, তাই আল্লাহ তাদের জন্য ব্যারাম বাড়িয়ে দিয়েছেন; আর তাদের জন্য ব্যথাদায়ক শাস্তি, যেহেতু তারা মিথ্যা বলে চলেছে” (সুরা বাক্কারাহ এর ১০ আয়াত)। “ওহে যারা ঈমান এনেছ! সম্পূর্ণরুপে আত্মসমর্পণে দাখিল হও। আর শয়তানের পদচিহ্ন অনুসরণ করোনা। নিঃসন্দেহে সে তোমাদের জন্য প্রকাশ্য শত্রু” (সুরা বাক্কারাহ ২০৮ আয়াত)।

লেখার তারিখ ২০ জুন ২০১৯সাল।

এ লেখাটি নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক পত্রিকা “দি রানার নিউজ” ২৮ জুন, ২০১৯ এ ছাপা হয়েছে।

Advertisements

Tag Cloud

%d bloggers like this: