Articles published in this site are copyright protected.

নাজমা মোস্তফা

বেশী কথা বলার অবকাশ নেই। অল্প কথায় অনেক বেশী বলতে চাই, মানুষের হাতে সময় কম, পড়ার সময় যেমন নেই, আমার হাতে লেখার সময়ও অল্প। ধর্মের মানদন্ডে সংক্ষেপে অদেখা সমাজে প্রচলিত অশরীরি শয়তানের একটি সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ করছি এ কলামটিতে। ইসলামের যুক্তি হচ্ছে প্রতিটি বিষয় নিয়ে সচেতনকে গবেষনা করতে হবে, আরবীতে তাকে বলা হয় ইজতেহাদ। যদি কেউ সঠিক সিদ্ধান্তে পৌছতে পারে তবে সে বহুবিধ অর্জন জমা করবে, আর যদি সঠিক সিদ্ধান্তে নাও পৌছায়, তারপরও তার সৎ প্রচেষ্ঠার জন্য সে অন্তত কিছু সুফল জমা করবেই। এজন্য প্রতিটি জটিলকে নিয়ে গবেষনা করা আবশ্যক। কিন্তু মনে হয় মানুষ এ খুঁজে দেখার কাজে যথেষ্ট গাফেলতি দেখিয়েছে বলে আজো সেটি স্পষ্ট হয়নি। সবাই একটি অনিশ্চয়তার মাঝে ঘুরপাক খাচ্ছে। “আশরাফুল মকলুকাত” নামের সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব মানুষকে সবাই চিনছেন কিন্তু এদেরই পাশে থাকা আর এক প্রজাতিকে মানুষ একদমই চিনতে পারছে না। আমি ছোটকাল থেকে অতি উৎসাহে ওদের খুঁজে বেড়াচ্ছি। হতে পারে আমার খুঁজে পাওয়াটা ভুল অথবা সঠিক। কিন্তু আমার বিশ্লেষণ ও খুঁজে দেখা বস্তুনিষ্ট চোখে পরখ করে দেখা যুক্তি বিজ্ঞান ও সঠিক গ্রন্থের আলোকে শ্রেষ্ঠ ঐশীগ্রন্থ কুরআন থেকে আহরণ করা যুক্তি থেকে নেয়া। জিন সম্পর্কে এমন সব গালগল্প সমাজে প্রচলিত আছে যার কোন ভিত্তি কুরআনে খুঁজে পাইনি।

জিন শব্দটির অর্থ হচ্ছে অদৃশ্য, গুপ্ত, লুক্কায়িত, আবৃত ইত্যাদি। বাংলা একাডেমী অভিধানে বলা হয়েছে ইসলামী বিশ^াসমত এক ধরণের অদৃশ্য দেহধারী জীব। দৃশ্যতঃ ধর্মটি সচেতন যুক্তি বুদ্ধিসম্পন্ন সৃষ্টির সর্বশ্রেষ্ঠ চক্ষুষ্মানদের জন্য অবতীর্ণ হয়েছে। সে হিসাবে সাধারণের দৃষ্টির আড়ালে রয়ে গেছে আজও অদেখা, গুপ্ত, আবৃত জিন নামের জীবটি। একজন অনুসন্ধানী হিসাবে কুরআনে খুঁজে পাওয়া উপসর্গটির আচরণ থেকে পরখ করলে মনে হয় ঠিকই এদের খুঁজে পেয়েছি। অনেককে প্রশ্ন করেও জানতে পেরেছি তারা মনে করেন শয়তান বা জিন এরা গাছে গাছে উড়ে বেড়ায়। কুরআন হিসাবে কথাটি একদম আগাগোড়া মিথ্যা কথা। বেশীর ভাগ মানুষ না বুঝেই কুরআন মুখস্ত করেন। এর সুর লহরি এতই মুগ্ধকর যে তার তুলনা পাওয়া ভার। তবে ভাবা যায় না এর ভেতরের রসসুধা যে কত অমৃতে ভরা, সেটি যারা এটি প্রতিনিয়ত চষে বেড়ান শুধু তারাই জানেন ভালো। এর রন্ধ্রে রন্ধ্রে লুকিয়ে আছে জ্ঞানের অফুরাণ ভান্ডার। এর উপর সুক্ষ্ম গবেষনা বা পর্যালোচনা সীমিত আকারে হয়েছে বলেই আমাদের দুর্ভোগ কোনভাবেই কাটছে না। কুরআন বলে, “আর প্রতিরক্ষা প্রত্যেক বিরুদ্ধাচারী শয়তানকে। তারা কান পাততে পারে না উর্ধ্ব এলাকার দিকে, আর তাদের দিকে নিক্ষেপ করা হয় সবদিক থেকে- বিতাড়িত, তাদের জন্য রয়েছে নিরবিচ্ছিন্ন শাস্তি” (সুরা সাফফাত ৭/৮/৯ আয়াত)। এরকম একটি আয়াত থাকার পরও সাপ কুকুরের স্বরুপ নেয়া, গাছে গাছে,  আকাশে উড়ে বেড়ানোর মিথ্যাচারী অর্জনে মানুষ বিশ^াসী হয়েছে। যদি সত্যি তাই হতো তবে অন্তত একটি লাইনও এদের এ স্বভাবের  উপর কুরআনে থাকতো। আর একটি আয়াতে দেখা যায় আল্লাহ বলেছেন “তারা আল্লাহর সাথে শরিক করে জিনকে, যদিও আল্লাহ এসবের অনেক উর্ধ্বে, তিনিই তাদের সৃষ্টি করেছেন কিন্তু তারা আল্লাহর সাথে পুত্র কন্যা সম্পর্ক দাঁড় করিয়েছে” (সুরা আল আনআম:১০১ আয়াত)। আর স্মরণ করো! আমরা তোমার কাছে জিনদের একদলকে ঝুঁকিয়ে দিয়েছিলাম (কুটবুদ্ধিসম্পন্ন ভিনদেশীয় ইহুদীদের, ৭২:১) একদলকে ঝুকিয়ে দিয়েছিলাম যারা কুরআন শুনেছিল; তারপর তারা যখন (একে অন্যে) এর সামনে হাজির হল, তারা বললে: “চুপ করো”। তারপর যখন তা (পড়া) শেষ করা হলো, তারা তাদের স্বজাতির কাছে ফিরে গেল সতর্ককারীরূপে (মুসলিম হিসাবে)(সুরা আহকাফএর ২৯আয়াত)। এর পরের আয়াত – তারা বললে: “হে আমার স্বজাতি! নিঃসন্দেহ আমরা এমন এক গ্রন্থ শুনছি যা মুসার পরে অবতীর্ণ হয়েছে, সমর্থণ করছে এর আগে যেটি রয়েছে, আর পরিচালনা করছে সত্যের দিকে ও সহজ সঠিক পন্থার দিকে (সুরা আহকাফ এর ৩০ আয়াত)। বলো (হে মুহাম্মদ!) “আমার কাছে প্রত্যাদেশ করা হয়েছে যে জিনদের একটি দল শুনেছিল (এদের শ্রবনশক্তি বর্তমান) এবং বলেছিল ‘আমরা নিশ্চয় এক আশ্চর্যজনক কুরআন শুনেছি। যা (মানুষকে) সুষ্ঠুপথের দিকে চালনা করে, তাই আমরা তাতে ঈমান এনেছি আর আমরা কখনো আমাদের প্রভুর সাথে কাউকেও শরিক করবো না (সুরা জ্বিনএর ১,২ আয়াত)। “হে জিন ও মানব সম্প্রদায়! তোমাদের কাছে কি তোমাদের মধ্য থেকে রসুলগণ আসেননি যারা তোমাদের কাছে আমার নির্দেশাবলী বর্ণনা করতেন আর তোমাদের সতর্ক করতেন এই দিনটির একত্রিত হওয়া সম্বন্ধে (সুরা আল-আনআমের ১৩১ আয়াত)।” ঐ ধারাবাহিকতায় এখানে আর একটি আয়াত আনছি, “আমরা তোমাকে (মোহাম্মদকে) সমগ্র মানব সমাজ বৈ অন্য কাহারো নিকট সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী ছাড়া প্রেরণ করি নাই কিন্তু অধিকাংশ লোক তা জানে না যে তুমি সমস্ত বিশ^ জগতের জন্য আল্লাহর করুণারুপে আবির্ভূত হয়েছ (সুরা সাবা ২৮ আয়াত)।” উল্লেখ্য আল্লাহ বেশীর ভাগ সময় আমি না বলে বলেছেন আমরা (আরবী ষ্টাইলের সম্মানজনক ব্যবহার), এই শেষের আয়াতই স্পষ্ট করছে এই মানব সমাজের বাসিন্দারাই হচ্ছে মানব সমাজ ও জিন সম্প্রদায়। উপরের আয়াত নির্দেশ করে অনেক জিনেরা অতপর মানুষ হয়েছে তাদের স্বভাবের জিনত্ব পরিত্যাগ করেছে (সুরা আহকাফএর ২৯আয়াত/ সুরা জিনের ১,২ আয়াত দ্রষ্টব্য)। আল্লাহ চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলেছেন “যদি মানুষ ও জিন সম্মিলিত হতো এই কুরআনের সমতূল্য কিছু নিয়ে আসতে, তারা এরকম  কিছুই আনতে পারত না যদিও বা তাদের কেউ কেউ অন্যদের পৃষ্ঠপোষক হতো” (সুরা ইসরার ৮৮ আয়াত)। এ আয়াতেও স্পষ্ট যে এ দু’ দল একসাথেই সকল কর্ম অপকর্ম করে, তারপরও তারা এক হয়েও আল্লাহর চ্যালাঞ্জ মোকাবেলা করতে সক্ষম হবে না। এরপরও আমরা ঐ জিনকে খুঁজে দেখি নি। এরা সব সময়ই আমাদের সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়াচ্ছে।

উপরের আয়াতগুলি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় এদের যেমন কোন অশরীরি দেহ নেই ঠিক তেমনি ঔদ্ধত্য উগ্রতা নষ্টামী ব্যতীত কোন অসাধারণ ক্ষমতা বলেও কিছু তাদের নেই, এদের পরিচয় হচ্ছে এরা বিতাড়িত ও শাস্তিপ্রাপ্ত সদস্য। সাপ কুকুরে পরিণত হবার কোন ক্ষমতাই এরা রাখে না। চিন্তার প্রকাশ থেকে আমরা বলতে পারি পৃথিবীতে বড় মাপে একটি সম্প্রদায় আল্লাহর সাথে সম্পর্ক রাখার দাবী করে। এরা হচ্ছে খৃষ্টান সম্প্রদায় যদিও নবী ঈসা নিজের সম্বন্ধে এ ধারণা বিলি করেন নাই, সেন্ট পোল এ ধারণার জনক। তা ছাড়া আরবের কুরাইশরা তাদের লাত উজ্জাহ ও মানাহ এই তিনকে মনে করতো আল্লাহর কন্যা। তফসিরকারকরা ব্যাখ্যা দিয়েছেন অন্য আয়াতে একদল জিনকে খুঁজে পাওয়া যায় যারা ছিলেন ইহুদী তারা স্বীকার করছে তারা মুসার পরে ঠিক ঐরকম অসাধারণ বানী সমূহ আবারো দ্বিতীয় বারের মত শুনতে পেল। কারণ তারা ইহুদী হওয়াতে তারা জানতোই মুসার গ্রন্থে কি ছিল। এবার নবী মোহাম্মদের কুরআনের বাণী শুনে এটি ছিল তাদের স্বতস্ফুর্ত বহিঃপ্রকাশ। তার মানে দেখা যায় এখানে খৃষ্টান ও ইহুদীদের তথাকথিত অমানবিক উগ্র স্বভাবের, অগ্নিমূর্তি স্বভাবের কারণে তাদেরে জিন বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। যতটুকু আমরা গ্রন্থে ও ধারে কাছে এদের খোঁজ পাই তাদের খুব চেনা চেনা মনে হয়। মনে হয় এরা আমাদেরই বন্ধু স্বজন। মানুষ তৈরীতে আওয়াজদায়ক মাটি লেগেছে। মানে এর মাঝ থেকে আওয়াজ হবে, ধারণা হয় এরা স্বভাবে নরম মাটির মতই, আওয়াজকারী হবে (সুরা আল হিজর ২৬ আয়াত)। তারো আগে জিন সম্প্রদায় সৃষ্টি করা হয়েছে যাদের স্বভাবটা আগুণের মতই হবে, তাই বলা হয়েছে এরা হবে আগুণের তৈরী (সুরা আল হিজর ২৭ আয়াত)। এরা অবাধ্য, বিতাড়িত, জাহান্নামী, পথহারা, অনাচারি। এই উভয় সম্প্রদায়ের উপর অনেক আয়াত খুঁজে পাওয়া যায়। সুরা আর রহমানে দেখা যায় বার বার এ দু’ সম্প্রদায়ের কথা বলা হয়েছে যা দিয়ে এদের খুব সহজে চেনার যুক্তি খুঁজে পাওয়া যায়। আল্লাহ বলেন, আমি তোমাদের ফলফসল, গোছাবিশিষ্ট খেজুর, খোসা ও সুগন্ধিদানাযুক্ত শস্য, ফল ফসলের জোড়ায় জোড়ায় উৎপাদন, ফলমূল, ডালিম এসব অফুরান দিয়েছি। সে সুরাতেই চরিত্রগঠনমূলক উপদেশ হিসাবে ওজনে কম না দিতেও বলা হয়েছে, আর পরক্ষনেই দু’ জনকে উদ্দেশ্য করে উপরের ও পরের কথাগুলো বারে বারে বলা হয়েছে। তার মানে এখানে যারা জিন সম্প্রদায়ের তারাও মানুষকে ওজনে কম দিচ্ছে এবং আল্লাহকে অস্বীকার করে চলেছে অন্য আর সব সাধারণ বিস্মৃত মানুষের মতই। “ফাবিআইয়্যিআলা-ই রাব্বিকুমা তুকাজ্জিবান” (সুরা আর রহমানের ৭৭ আয়াত)। এর অর্থ হচ্ছে সুতরাং তোমাদের প্রতিপালকের কোন অনুগ্রহ তোমরা উভয়ে অস্বীকার করবে?

অধ্যক্ষ ইব্রাহিম খাঁর অনুবাদ করা ঐতিহাসিক গ্রন্থ ‘আরব জাতির ইতিহাস’ মূল লেখক ঐতিহাসিক পি,কে, হিট্টি থেকে জানা যায় আইয়ামে জাহেলিয়াতির যুগে বেদুঈনদের কবিতা দিয়ে বিচার করা হতো। তারা ঐতিহ্যকে লালন করতো এবং আচার অনুষ্ঠানাদিই ছিল তাদের ধর্মের মূল উৎস। তারপরও কখনোই কোন দেব দেবীর প্রতি তাদের প্রকৃত ভক্তির পরিচয় পাওয়া যায় না। তবে বেদুঈনরা বিশ^াস করতো মরুভূমিতে পশু প্রকৃতির কিছু জীব বাস করতো। তাদের মনোজগতের সৃষ্ট দেবদেবী আর জিনের মাঝে পার্থক্য শুধু এটিই ছিল যে দেবদেবীরা মানুষের হিতৈষী আর জিনেরা মানুষের অনিষ্ঠকারী, দুশমন। মরুভূমির অজানা বিভিষিকা ও জীবজন্তুর আতঙ্কেই তারা কল্পনায় এ অশরীরি জীবের ধারণা লালন করতো। দেখা যায় ইসলাম আগমনের পরও এ ধারণা পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়নি, বরং এদের সংখ্যা বেড়ে যায়। কারণ ঐ সময় সমাজ থেকে পৌত্তলিকতাকে সম্পূর্ণ মুছে দেয়া হয় বলে মানুষ ঐ দেবদেবীর স্থানে খুব সহজে জিনদেরে স্থান করে দেয়। ধারণা হয় আজও জনতার অবচেতন মনে ঐ ধারণা সুপ্ত অবস্থায় হলেও থেকে যায়। একইভাবে গ্রামের ঝোপঝাড় যেমন গ্রামের মানুষের মাঝে জিনাতংক বাড়িয়েছে ঠিক ঐভাবেই মরুভূমির বিভিষিকাও মানুষকে এভাবেই আতঙ্কিত করে তুলতো। ইসলাম একটি ঐশ^রিক ধর্ম যেখানে অযৌক্তিক কোন মিথ্যাচারের সুযোগ নেই, থাকা সম্ভব নয়। আর সেখানে এ জিন উপসর্গটি কুরআনেও বারে বারে আলোচিত হওয়াতে সেটি এ ময়দানেও জায়গা খুঁজে পেয়েছে। কিন্তু আশ্চর্য্যের বিষয় হচ্ছে কুরআনের ধারণাতে মানুষ একে লালন করছে না বরং মনে হচ্ছে কুরআনকে এড়িয়ে মানুষ আজো তাদের ধারণাকে ১৪০০ বছর আগের জাহেলিয়াতি ধারণার মাঝেই বিবেককে জমা রেখেছে। বিশেষ করে কিছু সংখ্যক যুক্তিবিহীন ওয়ায়েজকারীরা, মিথ্যে ঝাড়ফুঁকের সংকীর্ণ ভন্ড ব্যবসা তাবিজ বিক্রির কপট স্বার্থে। এদের অপকর্ম নির্দেশ করে এরা নিজেরাই হচ্ছে আল্লাহর বিশ্লেষিত কুরআনের জিন সম্প্রদায়ের অন্তর্ভূক্ত।

শয়তানের কাজ হচ্ছে বিভেদ তৈরী করা। পাঠক চিন্তা করুন! গল্পের ইবলিস কি করেছিল? আদমের কাছে বিভেদের মন্ত্র বিলি করেছিল। ধারণা হয় ঐ জরুরী শুরুর সংবাদটি এ গল্পের মাধ্যমে মানব জাতির কাছে বিলি করা হয়। এ গল্পটি ধর্মীয় জীবনের একটি বড় মাইল ফলক, মানুষকে মনে প্রাণে এর শিক্ষাকে গ্রহণ করতে হবে। এ গল্পটি একটি রুপক গল্প, মানুষের অনাগত জীবনের এক সুক্ষ্ম সতর্ক সংকেত লুকিয়ে ছিল এখানে। সারা জীবনই তাকে ঐ অপশক্তির বিরুদ্ধে কঠিন সংগ্রামরত থেকে সময় পার করতে হবে, আর ঐ অপশক্তি কিয়ামত অবদি মানুষকে ধ্বংস করার সব অপকাজ করে যাবে। এ ম্যাসেজটি বিলি করার উদ্দেশ্যেই ছিল, প্রথমত আল্লাহ কখনোই মানুষের শত্রু নন, শত্রু হচ্ছে ঐ অপশক্তি যে তার স্বরুপে মানব প্রজাতির ধারে কাছে সারা জীবন থেকেছে, থাকছে ও থাকবে এবং সব ধ্বংসে তৎপর থাকবে। সুরা আর রহমানে এটি শুধু স্পষ্ট করা নয়, বরং জীবন্ত উদাহরণ দিয়ে সুষ্পষ্ট করেই বলা হয়েছে মানুষ যা খাবে সে একই ভোগ্যপন্য ঐ পাশের চরিত্রের এরাও খাবে। সে জাহান্নামি হবে কারণ সে সবসময় অপকর্ম করবে, তার জন্য ঐ স্থান নির্ধারণ করে রাখা। তবে মানুষের জন্য দুটি স্থান নির্ধারণ করে রাখা আছে সেটি জান্নাত ও জাহান্নাম। বিবেচক মানুষরা গবেষনার পাঠ থেকে অনেক দূরে অবস্থান করাতে জিন বা শয়তানের সাথে বসবাস করেও তাকে চিনতে আজো সক্ষম হয়নি। কিন্তু এদের চিনে নেয়াটা জরুরী ছিল, প্রতিটি মানুষের অবশ্য কর্তব্য ছিল, ফরজ কাজ ছিল, কারণ এটি কুরআনের সাক্ষাৎ নির্দেশ। এদের থেকে বহুহাত দূরে থাকাই হচ্ছে ঈমানদারী। দেশ সমাজ জীবন রাষ্ট্র দুনিয়া ও আখেরাতের সবকটি অধ্যায়কে পার হওয়ার জন্য এর প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম ছিল, এদের চিনতে পারলে মানুষ সকল বিড়ম্বনা থেকে সহজে উতরে যেতে পারতো। ধর্ম নিজে নিজেই বিভক্ত হয়নি, একে বিভক্ত করেছে শয়তান। কিন্তু আজো আমরা সেই চিহ্নিত শয়তানকে খুঁজে বের করিনি যে কিনা ইসলাম ধর্মকে বিভক্ত করে শিয়া সুন্নী নামে দু’ টুকরো করেছে। অবশ্যই এটি আমাদেরকেই করতে হবে। “আর তাদের মত হয়ো না যারা বিচ্ছিন্ন হয়েছিল এবং মতভেদ করেছিল তাদের কাছে সুস্পষ্ট নির্দেশাবলী আসার পরেও। আর এরা – এদের জন্য আছে কঠোর যন্ত্রণা” (সুরা আল ইমরানের ১০৪ আয়াত)। পরন্তু আমরা যেটা করার সেটি না করে আজো বিভক্তকারীকে স্যালুট দিয়ে একে অন্যকে হত্যা করে চলেছি। কারণ আমরা শয়তানের তালিতে তাল দিয়ে আজো নেচে বেড়াচ্ছি। এর প্রধান কারণ আমরা গাফেল হয়ে চেতনহীন অবয়ব নিয়ে অমানুষের মত টিকে আছি।

মানব সম্প্রদায়কে মনে রাখতে হবে আমরাই হচ্ছি আল্লাহর খলিফা, আশরাফুল মকলুকাত, সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব। আমাদের মাধ্যমেই আল্লাহর কাজ হবে। আল্লাহ নিজে প্রকাশ্য ময়দানে নামবেন না। তার নামার কোন সুযোগ নেই। কারণ আমরাই তার প্রতিনিধি। এটি শুধু ভোটের কথাই নয়, রাজনীতির কথা নয়, এটি ধর্মের কথাও। তাই ধর্ম থেকে রাজনীতিকে বিচ্ছিন্ন করাটাও শয়তানের চাল। ধর্মনিরপেক্ষতাকে আপনাদের উপর চাপিয়ে দেয়াটাও শয়তানের আর একটি চাল। বাংলাদেশের মানুষ মুক্তিযুদ্ধ ঐ সব নীতির উপর করে নাই। ওটি পরবর্তীতে ভারত তাদের নিজের সংবিধানে সংযোজনের আগেই বাংলাদেশের সংবিধানে জবরদখলে চাপিয়ে দেয়। মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের উপর ভিত্তি করে। উপরের এ তিনের একটিও বর্তমান বাংলাদেশে নেই, স্বাধীনতার ৪৭ বছর পরও মানুষ এভাবে ধূর্ত পরাধীনতার অক্টোপাসে বাধা পড়ে গেছে। আপনার জীবনের কোন অধ্যায়েই আপনি নীতিকে পরিহার করতে পারেন না। এই নীতিটাই হচ্ছে মানবতার ধর্ম, তাকে ইসলাম বলেন মানবতা বলেন, সবটাই আল্লাহর প্রেরিত। তিনি পরখ করছেন সবকিছুই, আপনি তাকে দেখছেন না একবারও, কিন্তু তিনি আপনাকে সারাক্ষণ পর্যবেক্ষণ করছেন। আপামর জনসাধারণ দয়া করে এই একটি কথার উপর প্রচন্ড শক্তিতে বিশ^াস রাখবেন দেখবেন আপনারাই হতে পারবেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানব সম্প্রদায়। আমরা যদি আল্লাহর কথা না বলি তবে তার কথা বলার আর কেউ থাকলো না। তার প্রতিপক্ষ বিরোধীপক্ষ হচ্ছে শয়তান বা জিন সম্প্রদায়ভুক্ত যাদের বিচার করার সব ব্যবস্থা পাকাপোক্ত হয়ে আছে গোটা বিশ^ জুড়ে কারণ এরা আল্লাহর চরম অবাধ্য ও বিতাড়িত। ওর প্রতিরোধে প্রকৃত উৎকৃষ্ট মানব সম্প্রদায়কেই সচেষ্ট থাকতে হবে। আল্লাহ বলেন, “তোমরা কি আমাকে বাদ দিয়ে শয়তানের প্রজন্মকেই অভিভাবক মনে করবে? অথচ তারা তোমাদের দুশমন, আর অন্যায়কারীদের জন্য এ বিনিময় কত নিকৃষ্ট” (সুরা আল কাহাফ ৫০ আয়াত)। “যারা কঠিনভাবে ঈমানদার নয়, তারাই শুধু শয়তানের কোপে পড়ে, শয়তানকে অভিভাবক হিসাবে গ্রহণ করে” (সুরা আরাফ ২৭ আয়াত)

 শয়তানের স্বরুপ (নীচে এগারোটি সুরার অনেকগুলি আয়াত দেয়া হলো) : “নিশ্চয়ই শয়তান তোমাদের দুশমন” (সুরা ফাতির আয়াত ৬)। “মানুষের জন্য শয়তান বিশ^াসঘাতক” (সুরা ফুরকান ২৫-২৯ আয়াত)। “শয়তান ওয়াদা করায় ও আশা দিয়ে ভুলায়, ঐ ওয়াদা ধাপ্পাবাজি ছাড়া আর কিছু নয়। এদের ঠিকানা দোজখ, সেখান থেকে মুক্তির কোন উপায় পাবে না” (সুরা নিসার ১১৬-১২২ আয়াত)। “শয়তান তোমাদের চিরশত্রু, তাকে শত্রু হিসাবে গ্রহণ করো। সে মানুষকে জাহান্নামের দিকে প্ররোচিত করে” (সুরা ফাতির ৬-৭ আয়াত)। “বিপথগামীদের যারা শয়তানের পথ অনুসরণ করবে, জাহান্নামই তাদের প্রতিশ্রুত আবাস” (সুরা আল হিজর ৩৯-৪৩ আয়াত)।  “যারা সত্যের উপর বিশ^াস রাখে,  সৎ জীবন যাপন করে তাদের উপর শয়তানের কোন প্রভাব পড়েনা ও শয়তানের কর্তৃত্বও কার্যকর হয়না” (সুরা নহলএর ৯৯ আয়াত)। “(হে মুহাম্মদ!) কর্ণধার হিসাবে আল্লাহই তোমার জন্য যথেষ্ট” (সুরা ইসরা ৬৫ আয়াত)। “শয়তানদের দ্বারাই জাহান্নাম ভর্তি করা হবে” (সুরা আরাফের ১৮ আয়াত)। “শয়তান তার চক্রান্ত দিয়ে মানুষকে সামনে পেছনে ডানে বামে সবদিক থেকে আক্রমণ করবে” (সুরা আল আরাফের ১৭ আয়াত)। “অপব্যয়ীরা হচ্ছে শয়তানগোষ্ঠীর ভাই। আর শয়তান হচ্ছে তার প্রভুর প্রতি বড় অকৃতজ্ঞ” (সুরা বনি-ইসরাইলএর ২৭ আয়াত)। “শয়তান হচ্ছে অধমদের মধ্যেকার” (সুরা আরাফের ১৫ আয়াত)।

উপরে সংক্ষেপে বিতাড়িত শয়তানের কিছু স্বরুপ দেবার চেষ্টা করলাম। এবার মেধা সম্পন্ন মানুষকে নিজেদের জানার ও প্রতিপক্ষ শয়তানকে চেনার জন্য স্পষ্ট করছি কারা এবং কিভাবে শয়তানের কুমন্ত্রণাতে সাক্ষাৎ আক্রান্ত । এদেরেই আল্লাহ শয়তান, জিন, ইবলিস নামে আখ্যায়িত করেছেন। অনেক আগে একবার চোখে পড়েছিল কোন এক হাদিসে যে ইবলিস ছিল ঐ সময়ের একজন কৃষকের নাম। রং চড়িয়ে প্রচার করা হয় শয়তান নাকি বড় ফেরেশতা ছিল, সবই বানোয়াট প্রচার, আল্লাহ কুরআনে বলেন, “ইবলিস শয়তান জিনদের মধ্যেকার” (সুরা কাহফ ৫০ আয়াত)। যারা মিথ্যাবাদী, প্রতারক, সব অপকর্মে সিদ্ধহস্ত, পাপাসক্ত, গোপন কথায় রং চড়ায় ও মিথ্যা প্রচার করে, আল্লাহ বিরোধী কর্মকান্ডে দক্ষ, দুনিয়া ও আখেরাতের পরোয়া করে না, পাপের ও লোভের পথে হাটে, কামনা বাসনার দাসত্ব করে, খারাপ কর্মকান্ডের তাবেদারী করে, শিরক বিদআত করে, যাদের অন্তর কুমন্ত্রণা দেয়, কুধারণায় চলে, মিথ্যা অহংকারী, সৎ কাজে গাফিল, কাজে কর্মে আল্লাহতে অবিশ^াসী, কুপথকেই সৎ পথ মনে করে, কাজেকর্মে বধিরের ভূমিকা পালন করে, চোখ থাকতেও যারা অন্ধ, পথহারাদেরে বন্ধু মনে করে, মিথ্যা শপথ করে, মিথ্যা প্রতিশ্রুতি করে চলে। এ হচ্ছে এদের চেনার মোক্ষম উপায়। “নিঃসন্দেহ আমি- আমি হচ্ছি একজন প্রত্যক্ষ সতর্ককারী (সুরা আল-হিজরএর ৮৯ আয়াত)।”  আর এর ব্যাখ্যা আর কেউ জানে না আল্লাহ ছাড়া। আর যারা জ্ঞানে দৃঢ় প্রতিষ্ঠত তারা বলে —“আমরা এতে বিশ্বাস করি, এসবই আমাদের প্রভুর কাছ থেকে” আর কেউ মনোযোগ দেয় না কেবল জ্ঞানবান ছাড়া” (সুরা আল-ইমরানের ৬ আয়াত)। সবার শেষে আমি আল্লাহর এই সাবধানী সংকেতগুলোকে সাবধানী ম্যাসেজ মনে করে আজকের এ জটিল কলামের ইতি এখানেই টানছি। আল্লাহ আমাদের সঠিক পথে পরিচালিত করুন।

বি দ্রষ্টব্য: উপরের এ বিশ্লেষণ সম্পূর্ণ আমার নিজের। বেশ কয় যুগ থেকে এ নিয়ে অনেক গভীর চিন্তার পর বিশ্লেষনে এটিই আমার মনে হয়েছে। সর্বোপরি আল কুরআনের এ বিশ্লেষণ নির্ধারণ করবে এর প্রকৃত গভীরতা, সাথে চিন্তাশীলদের বাড়তি জমা ও পাঠকের মতামত গুরুত্বপূর্ণ । এখানে আমি খুব সংক্ষেপে কুরআনের আলোকে একটি কলামের মাঝেই বিশাল এ ব্যাপারটি নিয়ে বস্তুনিষ্ঠ ব্যাখ্যা দেবার চেষ্টা করে গেলাম।  ডিসেম্বর ২০১৮ সাল।

এ লেখাটি ২৬ ডিসেম্বর ২০১৮, নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক  “দি রানার” পত্রিকাতে লেখাটি ছেপেছে।

Tag Cloud

%d bloggers like this: