Articles published in this site are copyright protected.

Archive for February, 2018

বিবি আয়েশার বিতর্কিত বিয়ে

নাজমা মোস্তফা

(এ লেখাটি ২০০৫ সালে পাঠকদের জন্য লিখেছিলাম কিছু নাস্তিকদের সাথে বিতন্ডা করতে গিয়ে এটি ছিল আমার ঐ সময়ের জমা। ইন্টারনেটে বিভিন্ন সাইটে সেটি ঐ সময় ছাপাও হয়েছে। আজ ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারীর ৩ তারিখে কেন যেন মনে হলো আমার ব্লগে এটি দেয়া জরুরী ছিল, দুঃখিত এজন্য যে কোনভাবে এটি দেয়া হয়নি। অনেককে এসব বিষয় নিয়ে বিতর্ক করতে দেখি এবং অনেক ইসলামের সেবকরাও অনেক জটিলকে সত্য মনে করে মিথ্যার মাঝে ঝুলে আছেন, হয়তো এতে অনেকের বিষয়টিও স্পষ্ট হবে। সম্প্রতি বাংলাদেশে একজন ইমাম ধর্ম ত্যাগ করেছেন। তিনি ধরে নিয়েছেন এ ধর্মটি মিথ্যাধর্ম ও মিথ্যার মাঝে এটি টিকে আছে। ইমাম হলেও উনার চিন্তার প্রসার খুব অল্প হওয়াতেই ধারণা হয় তিনি পথ হারিয়েছেন।)

বিবি আয়েশার বিয়ের এই জটিলতার ব্যাপারে সাধারণ পাঠকের জন্য জরুরী মনে করেই বিষয়টির উপর আলোকপাত করে আমি একটু বিসতৃত ব্যাখ্যা দিচ্ছি। হাদিস আমাদের দ্বিতীয় ধর্মীয় সূত্রগ্রন্থ। কিছু সংখ্যক জটিলতা আমাদের ধর্মে গজিয়েছে যার বেশীর ভাগ সৃষ্ট হয়েছে এই দ্বিতীয় সূত্রের সুবাদে। দেখা যায় প্রকৃত সত্য থেকে এর বক্তব্যের মাঝে একটু দূরত্ব সৃষ্ট হয়ে গেছে। উদাহরণ দিতে গেলে অনেক উদাহরণ দেয়া সম্ভব। উদাহরণ হিসাবে এখানে এরকম একটি দেয়া হলো। এ কথাটিতেই প্রকৃত একটি সত্য তথ্য লুকিয়ে আছে যে এটি বেশ কিছু উদাহরনের একটি উদাহরণ মাত্র। নবী মুহাম্মদ (সঃ) এর বিয়ে ছিল বিরুদ্ধবাদীদের এক চরম মুখরোচক অধ্যায়। এসব বিয়ে ঘটিত অনেক জটিলতার একটি হচ্ছে বিবি আয়েশার বিয়ে নিয়ে বিরুদ্ধবাদীরা নানান মন্তব্য করে বেশ স্বাচ্ছন্দ বোধ করেন। আমাদের নিজেদের অনেকে প্রকৃত সত্য না জানার কারণে এসবের পিছনেই বিরুদ্ধবাদীদের সাথে ইন্ধন দিয়ে যান বোকার মত। এরা হচ্ছেন একদল অতিভক্ত আস্তিক নামধারী ব্যক্তি যারা না বুঝে ধর্মটিকে পালন করতেই বেশী উৎসাহী। এরা অনেক সময় যুক্তি দেখালেও সেটি গ্রহণ করতে ইতস্তত বোধ করেন। কারণ এদের অনেকেই আবার অন্ধকারে থাকতেই বেশ স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন, সত্যে তাদের যথেষ্ট অনীহা। আরেকদল হলো যারা আল্লাহকে দেখে না বলে বিশ্বাস করে না, এরা নাস্তিক। অনেক সময় দেখা  যায় এদের এ দু’দলের কাজে কর্মে যথেষ্ট মিলও বর্তমান। এদের দু’দলেরই সত্য গ্রহণে দারুন অনীহা। কারণ তাদের একমাত্র কাজই হলো সত্যের বিরুদ্ধাচারণ করা, শত যুক্তি দেখালেও তারা সহজে যুক্তি মেনে নিবে না। আমার কাজটি শুধু তাদের জন্য যারা যুক্তিকে, নীতিকে সমাদর করেন, পছন্দ করেন। যাদের উদ্দেশ্য শুধু সত্য জানা, ঘোলা জলে মাছ শিকার নয়, তাদের জন্য আমার এ নিবেদন।

হাদিসের সূত্রে অনেকেই বিবি আয়েশার বিয়ের বয়স নিয়ে এক জটিল ধারণার জন্ম দিয়েছেন। যুক্তি ও বিজ্ঞান সব দিনই জটিলতা কমিয়ে দিয়েছে, এটিই সত্য প্রচারের সহজ সূত্র। আমি আগেই উল্লেখ করেছি যে, হাদিস যে রকম অনেক সময় জটিলতা সৃষ্ট করেছে আবার অনেক সময় এ হাদিসই আবার এই জটিলতা খোলাসা করেও দিয়েছে। এটি প্রায় প্রতিটি কঠিন জটিল বিষয়ের বেলায় প্রজোয্য বলেই আমি মনে করি। কিছু হাদিস ঘাটলে দেখা যায় আয়েশার বিয়ে একদম শিশু বয়সে হয়েছে আবার কিছু হাদিসে দেখা যায় এ তথ্য আর ধোপে টেকে না। প্লাসে মাইনাসে মাইনাস হয়ে যায়, যুক্তিগুলি আমি নিচে দিচ্ছি। পাঠকের অবগতির জন্য বলছি আমি ধরে নিচ্ছি যুক্তির হিসাবে একটি ভ্রান্ত হাদিসকে অপসারণ করতে একটি কুরআনীয় যুক্তিই যথেষ্ট। তার উপরও আমি অনেকগুলি যুক্তিই প্রদর্শন করবো সেই শক্তিশালী শ্রেষ্ঠ অস্ত্র কুরআনসহ তফসিরের সূত্রও বর্ননাতে আসছে। তবু একজন ছিটগ্রস্ত ব্যক্তি হয়তো হাদিসকেই বড় করে দেখতে চাইবে। তার মানে এটিও নয় যে সে খুব হাদিসের ভক্ত। সে মূলত সত্যের শত্রু। সে লড়তে লড়তে আজ এক ক্লান্ত পথিক। আমাদের বিভ্রান্ত করার জন্য ইবলিসের শর্তই ছিল যে, সব ধরণের কৌশল সে অবলম্বন করবে শেষ ঘন্টা বাজার আগ পর্যন্ত। তাই ইবলিসের কর্ম কান্ড দেখে কারোরই বিভ্রান্ত হওয়ার কিছু নেই।

যুক্তি দিয়ে, তথ্য দিয়ে যে কোন গবেষক অনেক ভুলের উপর কাজ করতে পারেন, ইসলামে এটি অত্যন্ত সমাদৃত। এটিই ইজতেহাদ। কথা ছিল এ ইজতেহাদের উপর কঠোর কাজ করে যাওয়া কিন্তু আমরা কালে আমাদের এই ঐহিহ্যটুকু হারিয়ে ফেলি। ইজতেহাদের আড়ালে জ্ঞানের এক বিশাল পাওনা লুকিয়ে আছে। জ্ঞান বা যুক্তি দ্বারা আমরা এ শ্রেণীর হাদিসগুলি আবার বাছাই করে ফেলতে পারি (ফওজুল কবির, মোহাম্মদী প্রেস, ৪১ পৃষ্ঠা)। সত্যি কথা বলতে কি, কালে এ ইজতেহাদের উপর উৎসাহ কমিয়ে দেয়াতে এরি ফাঁকে এখানে জমা হয়েছে অনেক অনাচার। নিচে বিবি আয়েশার বিয়ের উপর ভিত্তি করে আমি কিছু যুক্তি পেশ করছি, আশা করি এটি আমাদের অনেক ভ্রান্তি ঘোচাতে সাহায্য করবে। শুরুতেই এটি আমাদের জানার বিষয় যে অদভুত এই ফিকশন গল্পের মূল উদ্যোক্তা একজন হাদিসবেত্তা হিসাম-ইবন-উরওয়া, একই সাথে তার বিশ্বস্ততার ও অবিশ্বস্ততার প্রমাণ দুই বর্তমান। তার প্রধান কারণ বয়সের জটিলতা। জীবনের প্রথম সময়ে তার কাজে বিশ্বস্ততার ছাপ উৎকৃষ্ট মাপেই ছিল যার প্রমাণ বর্তমান কিন্তু পরবর্তী জীবনে তার জটিলতার উদাহরণও বর্তমান।

(১)        প্র্রথমেই একটি উদাহরণ দেয়ার প্রয়োজন বোধ করছি। শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া এ প্রসঙ্গে বলেন, “কিন্তু অধিকাংশ লোকই ভ্রম প্রমাদ হতে মুক্তি পেতে পারে না। সাহাবীদের মধ্যে এরুপ লোকও ছিলেন, যারা সময় সময় ভ্রম করতেন, তাদের পরবর্তী সময়েও একই অবস্থা। সেজন্য সহি আখ্যায় যে সব হাদিস সংকলিত হয়েছে তার মধ্যেও এরুপ হাদিসেরও সন্ধান পাওয়া যায় যা ভ্রম বলেই মনে হয়” (কেতাবুল তাওয়াচ্ছোল – ৯৬ পৃষ্ঠা)। স্মরণযোগ্য একটি কথা সাহাবীরা নবী নন। ইতিহাসে অনেক সাহাবীর অনেক ভ্রান্তির কথা আমরা অবগত হয়েছি। এখানে একটি হাদিসের উদাহরণ দিব যা অনেকের জানার মাঝেই পড়বে। হাদিস কিভাবে গোজামিল তৈরী করতে পারে সেটিই এ উদাহরণ দেয়ার উদ্দেশ্য। আনাছ, আয়েশা ও এবন আব্বাস বলছেন, “হযরত ৪০ বৎসর বয়সে নবী হয়ে, ১০ বৎসর মক্কায় অবস্থান করে হিজরত করেন। এবং মদীনায় আরো দশ বৎসর অবস্থান করার পর নবুয়তের ২০ সনে, ৬০ বৎসর বয়সে পরলোক গমন করেন। (বোখারী ১৮-১০৯, মোসলেম ২-২৬০ পৃষ্ঠা)। হযরতের ২০ বৎসর নবুয়ত, মক্কায় ১০ বৎসর অবস্থান এবং ৬০ বৎসর বয়সে পরলোক গমন এ তিন কথাই ভুল। তিনি মক্কায় ১৩ বৎসর অবস্থান করে হিজরত করেন। এবং ২৩ বৎসর নবী জীবন কাটানোর পর ৬৩ বৎসর বয়সে পরলোক গমন করেন। এটি ঐতিহাসিক সত্য। বোখারী ও মুসলিমের কথিত রাবিগণ কর্তৃকই এটি বর্ণিত হয়েছে। এ সম্বন্ধে অধিক প্রমাণের আবশ্যক নেই। কারণ বোখারী ও মোসলিমের বর্ণিত এ দুটি পরষ্পর বিরোধী উভয় বিবরণই যে সত্য হতে পারে না, এ বিবরণ যে ভুল এটি সবাই এক বাক্যে স্বীকার করবেন। এখানেও দেখা যাচ্ছে হাদিসের সনদ সঠিক থাকলেও মূল হাদিসটি ভুল (মোস্তফা চরিত, মোহাম্মদ আকরম খাঁ, পৃষ্ঠা ৩০)।

(২)       আয়েশার হাদিসটি ব্যক্ত করেন হিসাম ইবন উরওয়া নামের একজন হাদিসবক্তা যিনি তার বাবার সূত্রে হাদিসটির উপর বক্তব্য রাখেন। সর্বোপরি একজন, দুইজন বা তিনজন এ ধরনের তথ্য দিতে পারতেন এটিই ছিল স্বাভাবিক। সব চেয়ে আশ্চর্য হলো এরকম তথ্য কেন সমসাময়িক মদীনায় বসবাসকারী আর কারো কাছ থেকে জানা গেল না বা আর কারো এ বিষয়টি জ্ঞাত ছিল না কেন? যেখানে হিসাম তার জীবনের প্রথম ৭১ টি বছর ঐ মদীনাতেই কাটান। মূল সূত্র আসে ইরাকের এক ব্যক্তির সূত্র হিসাবে যখন তিনি পরবর্তী জীবনে মদীনার পর ওখানে বসবাস করেন। মদীনার জনতাদের একজন সর্বজন সম্মানিত মালেক ইবন আনাস স্বয়ং এ ব্যাপারে কোন মন্তব্য দিলেন না। মালিক ইবন আনাস তেহজিবুল তেহজিব নামের নবী জীবনের উপর লেখা সেই সুবিখ্যাত বইতে হিসামের অনেক কাজের ঘোর বিরোধীতা করেন। যা পরবর্তী অনেক কাজের এটি একটি, তিনি ওখানের ইরাকীদের সূত্রে প্রাপ্ত হয়ে প্রচার করেন। “তিনি (হিসাম) তার কাজে খুবই বিশ্বস্ত ছিলেন, তার বর্ণনা বিশ্বস্ততার দাবী রাখে, “সে সব কাজ তিনি ইরাক যাবার আগে বর্ণনা করেছেন” (তেহজিব উল তেহজিব, ইবন হাজার আল আসকালানি, দ্বার-আহইয়া-আল-তুরাথ-আল-ইসলামি, ১৫ শতাব্দী, ভল্যু. ১১, পৃষ্ঠা ৫০)। মালিক ইবন আনাস হিসামের ঐ সব কাজের বিরোধীতা করেন যা তিনি ইরাকীদের সূত্রে ব্যক্ত করেন (তেহজিব-উল-তেহজিব, ইবন হাজার আসকালানি, দ্বার-ইয়াহইয়া-আল-তুরাথ-আল-ইসলামী, ভল্যু. ১১, পৃষ্ঠা ৫০)। “মিজানুল আইতিদাল” নামের অন্য আরেকটি বই যেখানে নবী মুহাম্মদের জীবন চরিত চিত্রিত হয়েছে, বলা হয়, যখন তিনি বৃদ্ধ হন, হিসামের স্মরণ শক্তি খুব খারাপভাবে মোড় নেয়। তিনি স্মরণ শক্তি জনিত ত্রুটিতে ভোগেন (মিজানুল-আইতিদাল, আল-জাহবি, আল-মাকতাবাতু-আল-আতরিয়াহ, শেখুপুরা, পাকিস্তান, ভল্যু. ৪, পৃষ্ঠা ৩০১)। ইরাকে বসবাসরত হিসামের স্মরণশক্তি ত্রুটিযুক্ত হওয়ার প্রমাণ থাকায় এ ক্ষেত্রে হিসামের ভাষ্যটি ত্রুটিযুক্ত হওয়ার যথেষ্ট প্রমাণ এখানেই বর্তমান।

(৩)       পরবর্তীতে আমরা পাই তাবারীর মতে, হিসাম ইবন উরওয়া, ইবন হাম্বল, ও ইবনে সাদের মতে আয়েশার ৭ বছরে বাগদান হয় এবং ৯ বছরে তিনি স্বামীগৃহে যান। তাবারীর অন্য হাদিসে লক্ষ্য করা যায় “আবুবকরের চারটি সন্তানই দুই স্ত্রীর সূত্রে প্রাক-ইসলামিক পিরিয়ডে জন্মলাভ করেন” (তারিকুলুমাম ওয়াল মামলুক, আল তাবারী (মৃত্যু ৯২২), ভল্যু. ৪ পৃষ্ঠা ৫০, এরাবিক, দারাল-ফিকর, বাইরুত, ১৯৭৯)। যদি তাবারীর মত অনুসরণ করা হয় তবে এটিও টিকে না কারণ তার হিসাবে আয়েশার জন্ম প্রাক ইসলামী পিরিয়ডে হলে তার এক বয়স হয় আবার তার অন্য হাদিসে দেখা যায় ভিন্ন কথা। সে মতে আয়েশা ৬২০ সালে তার বাগদান হয় এবং ৬২৪সালে তার সাংসারিক জীবন শুরু হয় যাতে এটি প্রমাণিত হয় যে তিনি ৬১৩ সালে জন্ম নেন। ৬১০ সালে কোরআন নাজেল হয় এবং এর মাত্র তিন বছর পর ৬১৩ সালে তিনি জন্ম নেন। এক মুখে দু কথা হওয়াতে এক বিরাট গোজামিল এখানেও লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

(৪)       ইবন হাজারের মতে, “ফাতেমা কাবা শরিফে জন্ম নেন ঐ সময় কাবা পুননির্মান করা হচ্ছিল, যখন নবী মুহাম্মদ ছিলেন ৩৫ বছরের। ফাতেমা আয়েশার থেকে ৫ বছরের বড় ছিলেন (আল-ইসাবাহ-ফি-তামিজিলসাহাবা, ইবন-হাজার-আল-আসকালানি, ভল্যু. ৪, পৃষ্ঠা ৩৭৭, মাকতাবাতুল-রিয়াদা-আল-হাদিসা, আল-রিয়াদ ১৯৭৮)। হাজারের মতে আয়েশার জন্ম হয় যখন নবীর বয়স হয় ৪০ বছর। যদি আয়েশার বিয়ে হয় নবীর ৫২ বছরে, তাহলে আয়েশার বিয়ে হয় ১২ বছরে। এখানেও দেখা যায় হাজার, তাবাদ-আন-ইবন হিসাম ও ইবনে হাম্বলের বক্তব্য পরষ্পর বিরোধী। এভাবে দেখা যায় হাজার, ইবনে কাসির, আব্দাল রাহমান ইবন আবি জোন্নাদ এর মতে আয়েশার বয়স হওয়া উচিত ছিল ১৯ বা ২০ বছর। ইবন হাজার একবার উল্লেখ করেন তার বয়স ১২ বছর কিন্তু পরবর্তীতে অন্যত্র তিনি ব্যাখ্যা দেন তার বয়স ১৭ বা ১৮ বছরের। তাহলে কোনটি সঠিক ১২ না ১৮? তার চেয়ে বরং এটি বলাই যুক্তিযুক্ত যে ইবন হাজারও এ বক্তব্যের ভিত্তিতে বিশ্বস্ততা হারিয়েছেন।

(৫)       আরবী মাসের হিসাব চাঁদের হিসাবে নেয়া হয় যেখানে অন্য সব মাসের হিসাব নেয়া হয় সূর্যের হিসাবে। এতেও অনেক সময় হিসাবের মাঝে একটি পার্থক্য এসে থাকে। একদল কখনো বলছেন সে সময়ে আয়েশার বয়স ছিল সাত, আরেকদল বলছেন এ সময় তার বয়স ছিল সতেরো। কেউবা বলছেন ওটি ছিল ১৯ বা ২০।

(৬)      যেখানে পরষ্পর বিরোধী এত হাদিস কোন ঐশী গ্রন্থ নয়, এটি মানুষের রচিত গ্রন্থ। এতে কিছু ভুল ত্রুটি থাকতেই পারে। তবে হ্যাঁ, আমাদের সচেতনদের জন্য এটি একটি নিয়ম থাকা উচিত যে আমরা এসবের একটি সঠিক জবাব চাইবো। যারা অহেতুক একটি বিশৃঙ্খলা তৈরী করতেই চায় তারা কখনোই কোন যুক্তি মানবে না। কারণ যুক্তি মেনে নেয়া মানেই তাদের হেরে যাওয়া এবং আঘাত করার জন্য তাদের হাতের এই একমাত্র মোক্ষম অস্ত্রটি হাতছাড়া হয়ে যাওয়া। এ যাবত এই একটি শক্ত গ্যাপ ধরে নিয়ে বিরুদ্ধবাদীরা তাদের আক্রোশ ঝেড়েছে  সাধ্য মতন। তাই স্বভাবতই এ যুক্তি তাদের সইবে না, সময়ে সময়ে বিতন্ডা করার এই মহা সুযোগ তারা কখনোই হাতছাড়া করতে চাইবে না। প্রতিটি হাদিস যাচাই করতে আমাদের পরিবেশ পরিস্থিতির উপরও নজর দেয়া জরুরী। প্রমাণ আছে অনেক খারাপ উদ্দেশ্যেও অনেকেই হাদিস সংকলন করেছেন। “এর মধ্যে সবচেয়ে ক্ষতিকর সে সব পরহেজগার দল, যারা নিজেদের খেয়াল অনুসারে সদ্দুদ্দেশ্যে মিথ্যা হাদিস জাল করে নিয়েছে” (এবনুছ-ছালাহ, ৪৪)। ইতিহাসে প্রমাণ পাওয়া যায় ইমাম আবু হানিফা এ ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোরতা অবলম্বন করেন এবং এ সবের বিরুদ্ধে অনেক সচেতনমূলক কাজ করে গেছেন যার কারণেও তাকে অনেক নির্যাতন পোহাতে হয়।

(৭)       তফসির-ইবনে-কাসির এবং আরো কিছু বক্তার মতে, আসমা, আয়েশার চেয়ে দশ বছরে বড় ছিলেন (আল-বিদায়া-ওয়াল-নিহায়া, ইবন কাসির, ভল্যু ৮, পৃষ্ঠা ৩৭১, দ্বার-আল-ফিকর-আল-আরাবি, আল-জিজআ ১৯৩৩)। আল্লামা-ইবনে-হাজার আসকালানী এবং আরো সব ঐতিহাসিকদের মতে আসমা মারা যান ৭৩/৭৪ হিজরী সালে তার ১০০ বছর বয়সে (আল-বিদায়া-ওয়াল নিহায়া, ইবন কাসির, ভল্যু. ৮, পৃষ্ঠা ৩৭২, দ্বার-আল-ফিকর-আল-আরাবি, আল-জিজআ ১৯৩৩)। ইবন-হাজার-আল-আসকালানির মতে “তিনি (আসমা) ১০০ বছর বেঁচেছিলেন এবং ৭৩ অথবা ৭৪ হিজরীতে মারা যান। সে হিসাবে হিজরতে বা মদীনায় যাবার সময়কার হিসাবে আসমার বয়স হবে (১০০-৭৩) = ২৭ বছর। প্রায় ঐতিহাসিকদের মতে আসমা, আয়েশার থেকে ১০ বছরের বড়, এ হিসাবেও দেখা যায় হিজরতের সময় আয়েশার বয়স ছিল (২৭-১০)=১৭ বছর অথবা ১৮ বছর। তার বৈবাহিক জীবন শুরু হয় তার দুই বছর পর তার মানে (১৭+২) (১৮=২) =১৯ অথবা ২০ বছরে।

(৮)       মুসলিমের এক হাদিসে আমরা পাই আয়েশা বদর যুদ্ধে যোগদান করেন (তথ্যসূত্রঃ কিতাবুল জিহাদ-ওয়াল-সিয়ার,বাব-কারাহিয়াতিল-ইসতিআনা-ফিল-খাজওই-বিকাফির)। আয়েশা যখন বদর যাত্রার কথা বর্ণনা করেন একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে সে যাত্রায়, “যখন আমরা সাজারাহতে পৌছাই” উক্ত বক্তব্যেই প্রমাণ আয়েশা ঐ দলের মাঝে ছিলেন। অন্যত্র বোখারীতে পাওয়া যায় বদর ও ওহুদের যুদ্ধে (কিতাবুল জিহাদ ওয়াল সিয়ার, বাব খাজউইল-নিসাওয়া ক্কিতালিহিন্না মাআল রিজাল) যোগদানের প্রমাণ পাওয়া যায়। আনাস রিপোর্ট করেন যে, ওহুদের যুদ্ধের দিন আমি দেখেছি আয়েশা এবং উম্মি সুলাইম, তারা তাদের কাপড় তুলে ধরেন চলার সুবিধার জন্য।” এ ঘটনাতেও প্রমাণিত হয় যে আয়েশা ওহুদের যুদ্ধে যোগদান করেন (কিতাবুল মাগাজি, বাবা খাজওয়াতিল খান্দাক ওয়া হিয়াল আহজাব)। এখানে ইবনে ওমর বলেন যে, নবী কখনোই ওহুদ যুদ্ধে যোগদান করতে আমাকে দেননি কারণ সে সময় আমার চৌদ্দ বছর বয়স ছিল। কিন্তু খন্দকের যুদ্ধে যখন আমি ১৫ বছরে পৌছাই নবী আমাকে যুদ্ধে যোগদানের অনুমতি দেন। এতেও বোঝা যাচ্ছে যে ১৫ বছরের নীচের কারো যুদ্ধে যোগদানের অনুমতি ছিল না। উপরের সব কটি হিসাবে এটি সুস্পষ্ট যে, এ সময় আয়েশার বয়স ছিল ১৫ বছরের বেশী। যদি বদরের সময় তার বয়স হয় ৬ অথবা ৭ অথবা ৯ তাহলে কিভাবে তিনি বদরের যুদ্ধে যোগদান করেন। তারপরও আমরা পাই ওহুদ যুদ্ধের বর্ণনাতে “একদিকে মোসলেম কুল-জননী বিবি আয়েশা প্রমূখ মহিলাগণ, আদর ভালোবাসা ও করূণার সাক্ষাৎ প্রতিমূর্তিরূপে আহত ও মৃত্যুর সাথে লড়াইরত সৈনিকগণের নিকট উপস্থিত হয়ে তাদের সেবা করছিলেন, তাদের শুষ্ক কন্ঠে পানি দিচ্ছিলেন (বোখারী – মাগাজী)। অন্যত্র আমরা পাই বিবি আয়েশা প্রভৃতি মুসলিম মহিলাগণের সহিত ওম্মে-আমারা শুশ্রƒষাকারিণীরুপে সমরক্ষেত্রে উপস্থিত হয়ে, আহত সৈনিকগণকে পানি সরবরাহ এবং তাদেরে অন্যান্য প্রকার সেবা শুশ্রুষা করছিলেন” (মোস্তফা চরিত, মোহাম্মদ আকরম খাঁ, পৃষ্ঠা ৪৪৩ ও ৪৪১)। উল্লেখিত যুদ্ধাবস্থায় তিনি এত দ্রুত কেমন করে তার বালিকাত্ব ঘোচাতে পারলেন সেটি কি চিন্তার বিষয় নয়? হিজরত সংঘটিত হয় ৬২২, বদর ৬২৪ এবং ৬২৫ হিজরীতে  ওহুদের যুদ্ধ সংঘটিত হয়।

(৯)       সাধারণ হিসাবে আমরা জানি আয়েশা হিজরতের ৮ বছর আগে জন্ম নেন। এ জানাও এই সব হাদিস থেকেই। কিন্তু বোখারীর অন্য তথ্যে কিতাবুল তাফসিরের রিপোর্টে দেখা যায় আয়েশা বলছেন, “আমি একজন বালিকা ছিলাম” যখন সুরা আল-ক্কামার রচিত হয় (সহি বোখারী, কিতাবুল তাফসির, বাবা-ক্কাউলিহি-বালআল-সাআতু-মাওইদুহুম-ওয়াল-সাআতু-আদহা-ওয়া-আমার)। সুরা ক্কামার ৫৪ নম্বর সুরাটি নাজেল হয় হিজরতের কয়েক বছর আগে (দি বাউনটিজ কুরআন, এম. এম. খাতিব, ১৯৮৫)। তার মতানুসারে এটি নাজেল হয় ৬১৪ হিজরীতে। যদি আয়েশা ৯ বছরে সংসারে ঢোকেন তবে তিনি সে সময় কোলের বাচ্চা। যখন আল-ক্কামার নাজেল হয়, আয়েশা সে সময় যে কোলের বাচ্চা ছিলেন না বরং তিনি একটি ভাল মাপের বালিকাই ছিলেন যাকে আরবীতে বলা হতো “জারিয়াহ”। এর অর্থ বুঝায় খেলার বয়সের বালিকা (লেইনস আরবী ইংরেজী অভিধান হিসাবে)। “সাবিয়াহ” মানে শিশু তিনি সাবিয়াহ ছিলেন না, তিনি ছিলেন “জারিয়াহ”। হিসাব মতে এটি হবার কথা সম্ভবতঃ ৬-১৩ বছরের বয়সের যখন সুরা ক্কামার নাজেল হয়। এখানের হিসাবেও দেখা যায় যে তার বিবাহের বয়স ১৪-২১ বছরের মাঝেই হওয়ার সম্ভাবনা বেশী কারণ এ ঘটনাটি তার বিয়ের আগের, পরের নয়।

(১০) আরবী ভাষার ব্যবহার হিসাবেও আমরা কিছু যুক্তি পেয়ে যাই। আহমদ ইবন হাম্বলের মতে, খাদিজার মৃত্যুর পর যখন খাওলাহ নামের এক মহিলা নবী মুহাম্মদের কাছে আয়েশার বিয়ের প্রস্তাব পাড়ছিলেন। সে সময় খাওলাহ বিনত হাকিম নবীর একজন মহিলা অনুসারী তার পছন্দ মতো পাত্রীর প্রস্তাবই পাড়েন ঠিক এভাবে, “আপনি একজন পাত্রীকে পছন্দ করতে পারেন যে বিবাহযোগ্যা হয়েছে”। যখন নবী ঐ পাত্রীর নাম জানতে চান তখন খাওলাহ আয়েশার নাম ব্যক্ত করেন। এসব ক্ষেত্রে যে বা যারা আরবী ভাষাটি জানেন তারা ভাল করেই জানেন “বিকর” এ শব্দটি কখনোই কোন অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুর জন্য বা নয় বছরের বাচ্চার জন্য ব্যবহার হয় না। এটি একমাত্র তার জন্যই ব্যবহার হয়েছে যে এরি মাঝে বিবাহযোগ্যা (তাইয়্যিবা) হয়ে উঠেছে। তা হলে তিনি বলতেন “জারিয়াহ” খেলার বয়সী শিশু মেয়ে। “বিকর” শুধু ব্যবহার হয় একজন প্রাপ্ত বয়ষ্ক অবিবাহিত মেয়ের বেলায়, যার এখনও বিয়ে হয় নি, সদ্য বিবাহযোগ্যা ঠিক যেমন করে ইংরেজীতে ব্যবহার হয়ে থাকে “ভার্জিন” (মুসনাদ আহমদ ইবন হাম্বল, ভল্যু. ৬, পৃষ্ঠা ২১০, আরবী-দার-আহইয়া-আল-তুরাথ-আল-আরাবি, বেইমো)। এখান থেকেও এটি প্রমাণিত হচ্ছে যে, তিনি এ সময়ে ছিলেন বিবাহযোগ্যা একজন মহিলা।

(১১) যে ভাবে পুতুল খেলার মেয়েকে কনে সাজানো হয়েছে কিন্তু ইতিহাসের বাস্তবতা হচ্ছে ঐ সময় মুসলিম আবু বকরের মেয়ের বিয়ে ঠিক হয়েই ছিল। কিন্তু উভয় পক্ষ গড়িমসিতে কারণ তাদের ধর্ম বদল হয়েছে। বর্তমান সময়ের একজন আইনজ্ঞ, ভ্রমণ লেখক, লেখক ও সাংবাদিক গবেষক শাহাদাত কাদরী এ বিষয়ের উপর আলোকপাত করেন এবং এসব গালগল্প সাজানো হয় নবী মারা যাবার কয়েক শতাব্দী পর (উইকিপিডিয়া, কাদরী, শাহাদাত (২০১২) হেভেন অন আর্থ , Farrar Straus,  Giroux, p-30, ফেরার স্ট্রাউস, জিরাউক্স, পৃষ্ঠা ৩০)। রাজনৈতিক জটিলতাকে অবলম্বন করে এ বিষয়টি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সাজানো হয়। আয়েশা অনেক গুণসম্পন্ন মেয়ে ছিলেন, তার বুদ্ধিমত্তা, বিচক্ষণতা, সাহিত্যিক মূল্যবোধে গড়া, ঘোড়া ও উট পরিচালনার দক্ষতায় তৎকালীন আরব সমাজে গর্ব করার মত বৈশিষ্ঠ্য তার ছিল।

(১২) আমরা জানি যে বিবি আয়েশা একজন হাদিসবেত্তা। এখানেও একজন চিন্তাশীলের জন্য বেশ কিছু খোরাক বর্তমান, এ রকম একটি শিশু বাচ্চাকে কিভাবে হাদিসবেত্তা হিসাবে গ্রহণ করা যায়? পরবর্তী বিতন্ডার ইতিহাস ঘাটলে আয়েশাকে বালিকা প্রমাণ করাতে একদলের অতি উৎসাহ সন্দেহ করার মতো। উপরের সব তথ্যই এটির সমাধানে পৌছতে আমাদেরে সাহায্য করবে। সাথে সাথে বিরূদ্ধ চিন্তার অনুসারীরা এর নিচে তা দিয়ে গেছেন যার প্রমাণ আজো বর্তমান।

(১৩) যখন বিবি আয়েশাকে বিয়ে করা হয় তখন নবী মুহাম্মদের জীবনে এক কঠিন সঙ্গীন মুহূর্ত  উপস্থিত। খাদিজা বিগত, ঘরে তার সমোত্ত মেয়েরা, এমন অবস্থায় এসব মেয়েদের দেখা শোনা করার জন্য অন্তত এমন একজনের দরকার যে অন্তত এদের সঙ্গ দিতে পারে। সে দিন নবীর সোমত্ত মেয়েদের সামলাবার জন্য নিশ্চয় তিনি একটি পুতুল খেলার শিশু নিয়ে আসেন নি, যে নিজেই সমস্যা সৃষ্টি করবে, সমাধান নয়। আর আশেয়াকে পছন্দ করার পিছনে কি কোনই যুক্তি ছিল না? আয়েশা বুদ্ধিমতি ছিলেন, ধী শক্তির অধিকারী ছিলেন যা তার এই গুরুত্বপূর্ণ পদটির জন্য ইতিবাচক ছিল। এসব গুণাবলির বিকাশ লাভ একদম শিশুকালে সম্ভব নয়। এর জন্য একটি ভালো মাপের সময়েরও দরকার।

(১৪) যুদ্ধই হোক, সন্ধিই হোক, বিবাহই হোক, নবী মুহাম্মদের জীবনের প্রতিটি ঘটনা খুবই বাস্তব যুক্তিসম্মত অঙ্কীয় ধারণার মাঝে বিকাশ লাভ করেছে, সেখানে এমন এক বেখাপ্পা ঘটনা কখনোই ঘটতে পারে না।

(১৫) আরেকটি তথ্য আয়েশার ৬ বছর বয়সে বিয়ে যেটি ৯ বছর বয়সে মাত্র বাস্তবতা পায়। এটি আমরা সহি বোখারীতে পাই। এই হাদিসটির ব্যাপারে একটি বিশেষ কারণে সন্দেহ উদ্রেকের সুযোগও আছে কারণ এখানে একজন বক্তা কুফার অধিবাসী, ঐ সময়টিকে শিয়া-সুন্নী জটিলতাও ধর্মে এসে জমা হতে থাকে। একদল কুফাবাসী ছিল হুসেনের কারবালার শক্ত চক্রান্তকারী। শিয়া মতবাদ অবলম্বনে কিছু চক্রান্তকারীরা সব সময়ই আয়েশা থেকে ফাতেমার বিষয়াদিকে বেশী গুরুত্ব দিয়ে গেছেন। এটিও একটি রাজনৈতিক জটিলতা যেটি কৌশলবাজদের এক চাল। সত্য ধর্মটির মাঝে বিভেদ তৈরীতে বিরুদ্ধবাদীদের ইন্ধনে সৃষ্ট কোন শয়তানি চাল এটি ছিল না, তা মনে করার কোনই কারণ নেই। অনেকের কাছে আয়েশার হাদিসকে অবজ্ঞা করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়, যাদের দৃষ্টিতে এই পুঁচকে মেয়ে আবার হাদিস ব্যক্ত করবে কি? তার উপর তো মেয়ে মানুষ! ইসলাম নারীকে পূর্ণ মর্যাদা দিলেও অনেক পুরুষের এটি মানতে অনেক সময় কষ্ট হয়। এটি অবশ্যই একটি কঠিন সত্য কথা। আমরা এ খবরও প্রাপ্ত হয়েছি যে, এই মাত্র কিছু আগেও আমাদের পূর্বাঞ্চলের বেশ কিছু জনতা বিবি আয়েশার হাদিসকে যথাযোগ্য মর্যাদা দেবার দরকার মনে করতেন না। তবে ইদানিং অনেকেই সেটি কাটিয়ে উঠতে পেরেছেন। হিসাম ইবনে উরওয়ার বিরুদ্ধে অবিশ্বস্ত হাদিসের প্রমাণ আমরা পেয়েছি।

(১৬) এবার শ্রেষ্ঠ গ্রন্থের আলোকে আমরা পাই সুরা নিসার ৫ ও ৬ আয়াতে বর্ণিত হয়েছে কিভাবে এতিমের অধিকার সংরক্ষণ করতে হবে। একজন ধর্মানুরাগীর কি করা উচিত একজন এতিমের জন্য। তার অধিকার সংরক্ষণে অপর পক্ষের কি কর্তব্য হতে পারে এবং কিভাবে সেটি হবে? “আর অবোধদেরে দিয়ে দিও না তোমাদের সম্পত্তি যা আল্লাহ তোমাদের জন্য অবলম্বন স্বরূপ করেছেন। আর তা থেকে তাদের খাওয়াও ও তাদের পরাও; আর তাদের বলো ভালোভালো কথা (অর্থাৎ সদুপদেশ, সুপরামর্শ ও সুশিক্ষা দাও)” (সুরা নিসার ৫ আয়াত)। আবার “আর এতিমদের পরীক্ষা করে দেখবে যে পর্যন্ত না তারা বিবাহ বয়সে উপনীত হয়; তারপর যদি তাদের মধ্যে বিচার বুদ্ধি দেখতে পাও তবে তাদের ধন সম্পত্তি তাদের হস্তে অর্পণ করো…” (সুরা নিসার ৬ আয়াত)। উপরের আয়াতে একজন এতিম শিশুর প্রতি একজন সচেতনের উপর কি নির্দেশ দেয়া হয়েছে সেটি লক্ষ্য করবার মতো। কখনোই বলা নেই ছলে বলে একটি বিয়ের ব্যবস্থা করে আপদ বালাই বিদায় করতে। বরং বলা যে তাদের বিবাহের বয়স পর্যন্ত তাদের সুষ্ঠভাবে দেখাশোনা করো। যেখানে একজন এতিমের উপর স্রষ্টা এমন বিধান রাখলেন সেখানে একজন আবু বকরের মেয়ের উপর আল্লাহ জগতের ভিন্ন এক নিয়ম জারি করেছিলেন এটি কি কোন যুক্তিপূর্ণ কথা বলে মনে হয়? তার উপর বিবি আয়েশা মোটেও এতিম ছিলেন না, দরিদ্র ঘরের মেয়েও ছিলেন না। পিতামাতা হারালেও একজন এতিমের উপর বাকীদের নির্দেশ হলো তার দিকে নজর রাখা, তার সম্পত্তির দেখা শোনা করা, তাকে খাওয়ানো, পরানো, তাকে শিক্ষিত করে গড়ে তোলা এবং সেটি আজীবনের জন্য নয়, তার বিয়ের বয়স পর্যন্ত এটি করতে বলা হয়েছে, ছেলে হোক বা মেয়ে হোক। আবু বকর এবং নবী মুহাম্মদ এ রকম একটি কুরআন বিরূদ্ধ কাজ করেছেন বলে কি মনে হয়? শুধু মাত্র কুরআনের সম্মানেই তারা এটি করতে পারেন না। ইবনে হাম্বল (মোসনাদ আহমদ ইবন হাম্বল, ভল্যু ৬, পৃষ্ঠা ৩৩ এবং ৯৯) দাবী করেন যে নয় বছরের আয়েশা ঘোড়া নিয়ে খেলতে পারেন কিন্তু একজন দ্বায়িত্বশীল স্ত্রীর ভূমিকা পালন করা অসম্ভব। এ সব ভ্রান্তি থেকে আমাদের সরে আসা উচিত অবশ্যই। যদিও কিছু নাস্তিকেরা, ও কিছু অতিভক্ত অসচেতন আস্তিকেরা এ ভ্রান্তির মাঝে জড়িয়ে এক বিতিকিচ্ছিরি কান্ড ঘটাতে চাইছেন। কুরআনের নির্দেশ হলো একজন ছেলে মেয়েকে সুশিক্ষিত করে গেড়ে তোলা। আবুবকর তখনকার সময়ের একজন সচেতন বাবা সন্দেহ নেই। যার বিবেক সমাজকে ঘোর দুর্দিনে পথ দেখিয়েছে তার সে সচেতন বিবেক তার মেয়ের জন্য এরকম একটি অনাচার করতে পারেই না। এসব অনাচার করেছে তারাই যারা এসব পরবর্তীতে সাজিয়েছে। যদি খাওলাহ নামের সেই মহিলা এরকম কোন অবিবেচক প্রস্তাব রাখতেন তাহলে তারা দুজনাই এটির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে উঠতেন, সেটিই স্বাভাবিক। কারণ তারা দুজনাই ছিলেন কুরআন, ইসলাম প্রতিষ্ঠায় নিবেদিতপ্রাণ।

(১৭) ইসলামী বিবাহে কিছু শর্ত জরুরী। একজন মেয়ের বা ছেলের বিয়েতে তার সম্মতি থাকতে হবে (মিসকাত, মাসাবিআহ, অনুবাদে জেমস রবিনসন, ভল্যু ১, পৃষ্ঠা ৬৬৫)। একজন মহিলার বিবাহের স্বীকৃতি বিবাহের একটি পূর্বশর্ত। সাত বছরের মেয়ের স্বীকৃতির কোন আইনগত ভিত্তি নেই। উদাহরণ হিসাবে মিশরের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে, ১৯২৩ সালে মুসলিম মিশরের বিবাহ মতে ১৬ বছরের নীচে কোন মেয়ে এবং ১৮ বছরের নীচে কোন ছেলে বিয়ে করতে পারতো না। মুসলিম প্রধান একটি দেশেও বাল্য বিবাহ নিষিদ্ধ। ৮ বছর পর ১৯৩১ সালে শরিয়া কোর্ট এই নীতি অনুসরণ করে (উইম্যান ইন মুসলিম ফ্যামিলি ল’, জন এসপোসিটো, ১৯৮২) তারপরও আমরা পাই কিছু হাদিসে এসব জিনিস এসে ঢোকেছে। কুরআনের সাথে অসামঞ্জস্য হাদিস বাতিলযোগ্য, এটি হাদিসের একটি প্রধান সূত্র। আরবী রীতি অনুসারেও এটি ধোপে টিকে না। হিসাম ইবন উরওয়া তার উপরোক্ত বক্তব্যে যথাযোগ্য বিশ্বস্ততা টিকিয়ে রাখতে ব্যর্থ হয়েছেন। অন্যান্য সব বিশেষজ্ঞরা যেমন মালিক ইবন আনাস তার লেখাতে ফুটিয়ে তোলেন হিসামের হাদিসের অগ্রহণযোগ্যতার যুক্তি। (উল্লেখ্য, “আয়েশা কি ছয় বছরের একজন কনে ছিলেন? পুরোনো উপকথার উন্মোচন” নামে টি. ও. শানাভাস নামের একজন লেখক একটি আর্টিক্যাল ছাপেন, মিনারাত, মার্চ ১৯৯৯, আবার দ্বিতীয় সংস্করণ- ভল্যু ২৪, ইস্যু ৭, জুলাই / আগষ্ট ২০০২, পৃষ্ঠা ৩৫-৩৮)। লেখক শানাভাসের সাথে আমিও এক বাক্যে স্বীকার করছি আয়েশার বিয়ে একটি গল্প, উপকথা, এক মুখরোচক আলোচনা বিরূদ্ধবাদীদের জন্য আশার খড়কুটো। প্রকৃত মুসলমানদের এ ধরণের চিন্তা ভাবনা থেকে যথেষ্ট দূরে সরে থাকাই উচিত।

লক্ষ্য করবেন পাঠকেরা আমি আমার লেখাতে বোখারী, মুসলিমসহ যথেষ্ট তথ্য, যুক্তি অবশ্যই দিয়েছি, সর্ব্বোপরি এর স্বপক্ষে কুরআনের যুক্তিও বর্তমান। কারণ সেটিই আমাদের প্রধান অবলম্বন।  যারা ঘোলা জলে মাছ শিকার করতে চাইছে তারা তাদের কাজ করবেই। শত যুক্তি দেখালেও তারা এটি করবে। কারণ এটিই তাদের জীবনের একমাত্র সাধনা। যখন তারা এ মহান পুরুষটিকে, ইসলামকে কোন ভাবেই কাবু করতে পারেনি তখন এ রকম দু একটি বিষয় নিয়ে তারা তাদের সারা জীবনের সব ক্রোধ, ক্ষোভ, আক্রোশ জমা রেখেছে। বিবি আয়েশার বিয়ে, বিবি জয়নবের বিয়ে বিরুদ্ধবাদীদের বেঁচে থাকার অনেক বড় অবলম্বন। এসব তথ্যকে অবলম্বন করে তারা বাঁচবার আশায় খড়কুটোর মতো তুলে ধরে যদিও তাদের সে আশা ইহকালেও সফল হবার নয়। ধর্মের ভিতরে লুক্কায়িত সব উপকথা যে সব কালের ধারায় এখানে এসে মহীরুহের মতো আস্তানা গেড়েছে। তার সব জটিলতা আমাদেরকেই দূর করতে হবে। যদি ধর্মটি মিথ্যার উপর প্রতিষ্ঠিত হতো তবে সেটি আমরা চাইলেও করতে পারতাম না। এসবই প্রমাণ করে সত্য ধর্মের মূল যে কত শক্ত ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। সত্যের জয় সুনিশ্চয়। মিথ্যার ঠাই এখানে হবার কথা নয়। যদিও বা কালের ধারায় এখানে অনেক মিথ্যা এসে আসন পেতে বসেছে, এসব ভ্রান্ত চিন্তা চেতনাকে এখান থেকে অবশ্যই বিদায় নিতে হবে। এ থেকে যত তাড়াতাড়ি বেরিয়ে আসতে পারবো আমরা ততোই আমাদের মঙ্গল। আল্লাহ আমাদের সহায় হোক।

 

মূল লেখা: ১লা সেপ্টেম্বর ২০০৫।

Advertisements

বিচারের নামে অদেখা বিচারককে দয়া করে ভুলে যাবেন না

নাজমা মোস্তফা

লেখালেখি করি কারো বাহবা পাওয়ার জন্য নয়। তবে সত্যকে উন্মোচন করার বাসনা থেকেই কলম ধরেছিলাম, তাই আজো মনে করি সত্যের উন্মোচনই একজন লেখকের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। দেখা যায় সবাই নামে মুসলিম কিন্তু কাজে অনেকেই মিথ্যার আশ্রয় নেন খেয়ালে বেখেয়ালে। যখনই এ ধারার কাজ একজন মুসলিম করবেন বুঝে নিতে হবে তার ঈমানের মাঝে গলতি আছে। ধর্মীয় কথা বলতে এক শ্রেণীর মানুষ প্রচার করেন যে ক্রমাগত অপরাধের জন্য কাঁদতে থাক আর মাপ চাইতে থাক। তাহলে এক সময় সব পাপ থেকে তুমি মুক্তি পেয়ে যাবে। এসব হচ্ছে গোজামেলে বানোয়াট ধর্ম চিন্তা। একজন মুমিন মুসলিমকে সাধনা করতে হবে আমি মিথ্যাচারে যাব না। পাপের পথে হাটবো না, সে চেষ্টাই যদি তার না থাকে তবে সে কেমন মুমিন মুসলিম? ঈমানদারের কাঁদার দরকার কম, কারণ সে ঈমানে বলিয়ান একজন, অপরাধ থেকে থাকবে শত যোজন দূরে। তার জন্য এসব নাটকের ভনিতার দরকার বা গরজ কম।  এসব কাজ হচ্ছে অপরাধির, যে সারাক্ষণ দেশ জাতির অপরাধের মানসে গুটি চালান দেয়। এ কাজটি তাকেই করতে হবে, তবে তার মেকী কান্নায় কোন ফল বয়ে আনবে না। কুরআনের যুক্তির সুক্ষ বিশ্লেষণ করলে এটি স্পষ্ট হয়। ইবলিসদের সব দোয়ারে সিল পড়ে থাকবে কারণ তারা  অপকর্ম করা চিহ্নিত দলের সদস্য। বাংলাদেশে যা হচ্ছে বছরের পর বছর এসবকে অপকর্ম ছাড়া আর কিছু বলার ফুরসত নেই। একজন মুসলিম হিসাবে কালোকে কালো, সাদাকে সাদা বলা ঈমানের অংশ জেনেই প্রতিটি কাজ করেছি। আমার ব্লগে জটিল বিষয়ের উপর শতেরও উপরে লেখা জমে আছে, ধর্ম ও রাজনীতির জটিলকে সহজ করা ও সত্য প্রকাশ করাই আমার কাজের অংশ। সজ্ঞানে আমি যদি কখনো মিথ্যাকে প্রশ্রয় দেই, সে মিথ্যার ভার আমার কাঁধেই বর্তাবে। ধর্মের জটিলতার কষ্ট যেমন আমাকে কষ্ট দেয় একইভাবে রাজনীতির কষ্টও আমাকে ভয়ংকরভাবে পীড়া দেয়। তসলিমাকে জবাব দিব বলে কলমটি তুলে নিয়েছিলাম, এখন দেখি সারা দুনিয়া জোড়া অনাচারের বিচরণ, তবে অতিরিক্ত ধর্ম ও রাজনীতিতে। এ দুটি ক্ষেত্রেই খুব কৌশলে এঁটো মিশিয়ে দেয়া হয়েছে । যখন ছোট ছিলাম আমার দাদীর কাছে শুনেছিলাম তাদের গ্রামে নাকি এক লোক তার মেয়েকে মেরে ফেলে, পাশের বাড়ীর লোকটিকে ফাঁসাবে বলে। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস সে প্রমাণ করতে পারে নি যে, মেয়েটিকে প্রতিবেশী মেরেছে। সম্ভবত ঐ সময় দেশে বিচার ব্যবস্থা ইতিবাচক ছিল বলেই অনাচার প্রমাণ করা সহজ হয়নি। বাংলাদেশে আজকাল সবাই একযোগে বলছে এখানে ধারে কাছের সময়ে বিচারের উপর ভরসা করার কোন যুক্তি নেই। তারপরও মানুষের সঠিক ভরসা একমাত্র আল্লাহর উপর। আদম যখন গন্দুম খেয়েছিলেন শয়তানের প্ররোচনাতে, আল্লাহ মাফ করেছেন আদমকে কিন্তু ইবলিসকে কখনোই মাপ করেন নি বরং বিতাড়িত করেছেন এবং তাকে জাহান্নামি চিহ্নিত করেছেন, সে হচ্ছে পথহারা, শয়তানের দোসর, সে অধঃপাতেই যাবে। তারপরও কথা থেমে নেই, তারও শক্ত বিচার বরাদ্দ আছে।

কমবেশী অনেকেই জানেন ২০০৪ সালের ২১ আগষ্টের মূল ঘটনাটি কিভাবে ঘটেছে এবং কিভাবে পরে সাজানো হয়েছে। এসবের উপর অসংখ্য যুক্তি, তথ্য, কথা চারপাশে ছড়িয়ে আছে। আমার নিজেরই এর উপর লেখা আছে, শত শত মানুষ এসব পড়েছে, আমি  চাইলেও তা সংক্ষেপ করতে পারি না। কারণ জটিল বিষয় স্পষ্ট করতে হলে কিছু ব্যাখ্যার দরকার পড়ে। কথা হচ্ছে পৃথিবীতে এমন কি কেউ আছে যে বা যারা তাদের অপকর্ম ঢেকে রাখতে পারবেন? না, ঐ স্বপ্ন না দেখাও ভালো। একমাত্র নাস্তিক যে সে এটি ভাবতে পারে, কারণ সে বোকার স্বর্গেই অন্ধকারে বসবাস করে। এখানে কয়টি কথা আজকের পত্রিকাগুলো থেকে নিয়েছি বাংলাদেশে অনৈতিক মন্ত্রীদের নীতিহীন কথা। ক্ষমতাধর বানিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল বলেন, নির্বাচনকালীন বর্তমান সরকারই রাষ্ট্র পরিচালনা করবে। কাদের হানিফ, নাসিম এসব মন্ত্রীদের কথা হচ্ছে  বিএনপি সন্ত্রাস ও নৈরাজ্য ছড়ানোর পায়তারা করছে। নাশকতা করে নির্বাচন ঠেকানো যাবে না। বিএনপির কোন সমর্থণ নেই। পরাজয় নিশ্চিত জেনে বিএনপি নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করছে। দেশের পরিস্থিতি জানেন দেশবাসী ভালোই, তারপরও দেশবাসীকে প্রতারণা করতে এসব আবোলতাবোল বকছে সরকারসহ তাদের মন্ত্রীরা। লাখ লাখ কোটি কোটি সমর্থণের ঠেলাতে সরকার ও তার মন্ত্রীরা ভয়ের চোটে একমাত্র পুলিশী রাষ্ট্র বানিয়ে উল্টাসিধা বুলি আওড়াচ্ছেন।

চলমান সময়ে বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া শত শত ঘটনার মতই ২০০৪ সালের ঐ ঘটনাতে ২৪টি জ্যান্ত মানুষ যখন মরলো তাদের আত্মার আহাজারিতে কর্মকর্তাদের গোষ্ঠী শুদ্ধ যে একদিন  ধ্বসে পড়বে, সেটি কি একবারও মাথাতে খেলে না? কারবালার প্রান্তরে যে নবী বংশ ইমাম হুসেনকে সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে হত্যা করা হলো আসামীরা কি পার পেয়ে যাবে বলে মনে হয়?  হোক সেটি চৌদ্দশত বছরেরও আগেকার কথা। না, ঐ ইবলিসরা কখনোই পার পাবে না, পার পেতে পারে না। সূত্র মতে আমরা জানি ২০০৪ সালের ঘটনাটির পর পরই বিএনপি সরকারই এর সুষ্ঠ বিচারের জন্য মামলা করেছিল। দেশীয় স্থানীয় তদন্তের পাশাপাশি এফবিআই এবং ইন্টারপোলকে সম্পৃক্ত করেছে যেন প্রকৃত দোষীকে আইনের সামনে মোকাবেলা করা হয়। তখন কিন্তু বিদেশী সংস্থাকে উপাত্ত বিলি করে নি বিরোধীদল আওয়ামী লীগ, এটি সবার জানা। বুলেটপ্রুফ মার্সিডিজ গাড়ীটি পর্যন্ত তারা ধ্বংস করে দিয়েছে বলে ওটিও ঢাকা পড়ে যায়। ঐ সময়ে বিএনপি সরকার ছিল মাত্র দুই বছর আর পরবর্তী সাত বছরে ছয়বার তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন করা হয়েছে। বর্তমানের রায়ে প্রথম দিকের বিএনপি জামাতের জোট সরকারের কোন প্রতিবেদন দাখিল হয়নি এবং পরবর্তীতে মামলাকে প্রভাবিত করার অভিযোগ এসেছে বার বার। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ বলেন (অনেক পরে হলেও) তারেক রহমানকে জড়ানোর কারণে মামলার রায়টি প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। কারণ তারেকের বিরুদ্ধে কোন সাক্ষ্য প্রমাণ নেই। তারপরও সাজা বহাল রাখা হয়েছে। এর আগে এফবিআই এবং ইন্টারপোলের তদন্তেও তারেক রহমানের নাম আসে নি, এমনকি সম্পূরক চার্জশিটেও নেই। ঐ সময় আমরাও ময়দানে দেশটিতে হাজির ছিলাম। খুব গুরুত্ব দিয়ে খুটিয়ে খুটিয়ে বিভৎস এ ঘটনাটি পর্যবেক্ষণ করেছি। এটি ঠিক নয় যে, বিএনপি এর তদন্তে দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছে। অনেকে বলেন বিএনপি জজ মিয়া নাটক করেছে আজকে এর জবাব দিয়েছেন তাদের এডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী (১২ অক্টোবর)। তিনি এর ব্যাখ্যা দেন তৎকালীন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এটি করেছে। রাজকাহন অনুষ্ঠানে তিনি এ ব্যাখ্যা দেন। তিনি এটিও স্পষ্ট করেন যে, এ ন্যাক্কারজনক মামলার সুষ্ঠ তদন্ত বিএনপিও চেয়েছে কিন্তু ঐ অনেক পথ পাড়ি দিয়ে ১৪ বছর পর এর এমন এক বিচার হয়েছে যে চারদিক থেকেই এর বিরুদ্ধে শোরগোল উঠেছে। ৫০১জন চিকিৎসক বলেছেন এটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত রায়।  কারাগার থেকেও মামলার আসামী হওয়ার নজির আজকের পত্রিকাতেও দেখলাম। ১৯ জনের ফাঁসি, ১৯ জনের যাবজ্জীবন, এবং ১১ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেয়া হয়েছে। অসংখ্য অব্যক্ত প্রশ্নের জবাব ছাড়াই বিচার হল একদম খালেদা জিয়ার এতিমের টাকা চুরির মামলার আদলে। তারেক যদি সব পরিকল্পনা করেই থাকেন তবে তাকে কেন ফাঁসি দেয়া হচ্ছে না? যাবৎজীবন দিচ্ছেন, তার মানে তাকে মিথ্যা মামলাতে ফাঁসানো হচ্ছে কাদের মোল্লার মতই, সবাইকে মনে রাখতে হবে সবাইকেই মরতে হবে। তবে কোন নির্দোষ যাতে শাস্তি না পায় সেটি হচ্ছে প্রকৃত সুবিচারের শর্ত।

মৃত প্রয়াত সুরঞ্জীতও বলে গেছেন এসব হচ্ছে রাজনৈতিক মামলা। কালে ভদ্রে দু একজনের মুখ দিয়ে আসল কথা বের হয়ে যায়। আজ সংবাদপত্রের সূত্রে প্রকাশ ১২ অক্টোবর ২০১৮ জাফরউল্লাহ চৌধুরীর হাসপাতালের পাশে আইন শৃংখলা বাহিনী চারপাশ ঘিরে রাখে এমনভাবে যে তিনি তার হাসপাতাল থেকে বের হতে পারেন নাই। ঐ দিন বিকালে তাদের একটি বৈঠক করার কথা ছিল সেটি রুধবার জন্যই কি সরকার এ কাজটি করলো? যার জন্য বাধ্য হয়ে আয়োজকরা ঐ দিনের বৈঠক বাতিল করেন। অনেক পরে ওরা সরে গেলে তিনি হাসপাতাল থেকে তার বাসাতে ফিরে যান। আজকেরই খবর আদালত থেকে ছাড়া পেয়ে একজন আসামী ছাত্রদল নেতা যার বিরুদ্ধে দেড়শতাধিক মামলা রয়েছে রবিউল ইসলাম নয়ন ছাড়া পেয়ে গেট থেকেই ধৃত হন সাদা পোশাকে কারিগররা তাকে মটরসাইকেল থেকে মাইক্রোবাসে তোলে নিয়ে যায় এবং যোগাযোগ করলে তারা এসব অস্বীকার করে। এসব হচ্ছে আইনের দেশ উন্নয়নের দেশ নীতির দেশ বাংলাদেশের কর্মকান্ড। ঐ দেশে নিশ্চয়ই বিধাতা আল্লাহ অবসরে যান নাই, সবই পরখ করছেন। যার যত ইচ্ছে মারেন মামলা দেন, তবে নির্ঘাৎ মনে রাখবেন সময় কথা বলবে। অদেখা বিধাতা ঠিক সময়েই নড়েচড়ে বসে। তার অংক বড়ই জটিল। এটি সব কর্মকর্তাদের মাথায় রাখা উচিত।  আমার কয় বছর আগের লেখাতে এসব স্পষ্ট করেছি, তাই বার বার এককথা বলে লাভ নেই। আমার ব্লগে আছে লেখাটির নাম হচ্ছে “বিএনপি সরকার পতনের লক্ষে একুশে আগষ্ট ২০০৪, সচেতনের সন্দেহ প্রতিষ্ঠিত সন্ত্রাসীর দিকে!”। বিশাল ঘটনা, বিশাল লেখা, বিশাল সব যুক্তিরা। লেখাটি পড়লে সম্ভবত অনেকের মগজ ঝালাই হয়ে যাবে। মানুষ যে দুনিয়াতে কি করতে পারে, সেটি বুঝতে সহজ হবে।

এফবিআইকে গাড়ী চেক করতে কেন দেয়া হলো না? / মুক্তাঙ্গন থেকে সরে গিয়ে ১ ঘন্টার নোটিশে কেন স্থান বদল করা হলো? তারেক রহমানের মেধা কি এতই তুখোড় যে রেকি ছাড়াই ২৪ জনকে খতম করে তারা পালালো, কেউ ধরা পড়লো না?  তারেকের নাম আগে কেন আসে নাই? আজ আওয়ামী সন্ত্রাসীরা নিজের দলেরসহ সব মানুষ মেরে তক্তা করে দেয়, তারা সেদিন কেন এত সুবোধ বালকের পার্ট নিল? মুফতি হান্নান যেসব আওয়ামী নেতাদের কথা বলে গেলেন তারা কেন বিচারের মুখোমুখি হন না? হাছিনা কি যুক্তিতে আইভিকে বার বার ট্রাকে উঠতে বলছিলেন?  তিনি কি জানতেন যে, ট্রাকটি নিরাপদ থাকবে। আইভিসহ যে ২৪জন নিহত হলো, আহত হলো আরো শত শত। যে এসব সাজিয়েছে রাজনৈতিকভাবে হলেও সে বুকে হাত দিয়ে বলুক সে উৎরে যাবার কথা কি ভাবছে। আর যারা এর ইন্ধনে তালিয়া বাজাবেন তারাও কি পার পেয়ে যাবেন?  সিনহাবাবুসহ বিচারকরা যুদ্ধপরাধীদের নামে যে উদ্ভট বিচার করেছেন তার নামে যতটুকু অবিচার হয়েছে তার থেকে প্রতিটি মানুষকে নিজের বিচারের জন্য প্রস্তুত থাকার কথা মনে করে দিতে চাই। কারণ সবার উপরে আর একজন নিরপেক্ষ বিচারক যিনি বুঝেন না আওয়ামী লীগ, বিএনপি অথবা জামায়াতে ইসলাম, তিনি বুঝেন শুধু নীতি নৈতিকতা। আমি তার কথাই বলছি। আপনারা মুসলিমরা তার উপরই ঈমান এনেছেন।  তাকে শক্ত করে ধরে রাখুন। ঈমানটা মরার আগে এভাবে হারাবেন না প্লিজ। আমার এ লেখাটি সমাজের প্রতিটি ব্যক্তি মানুষকে উপলক্ষ করেই বলছি। আসল আদালতকে এড়িয়ে যাবার কোনই ফুরসত হবে না। বেশী দিন তো লাগলো না, সিনহা বাবু এর মাঝেই ধরা খেলেন। একদিন যাদের ইন্ধনে মানুষ নাচে তারাও খুব শীঘ্রই ধরাও খায়। এসবই কি প্রমাণ করে না একজন নিরপেক্ষ বিচারকের নিরব উপস্থিতি?

গড়ে একজন মানুষ বাঁচে মাত্র ১০০ বছর, তার বেশী নয়। তারপরও তাদের এত আস্ফালন এত অনাচার মনে হয় তারা যেন জীবনেও মরবে না। এ রকম অনাচার অদেখা বিধাতা করলে মানা যেত। কিন্তু মানুষরা কেমন করে এসব অনাচার করে, বুঝি না। দৃষ্টির আড়ালে বিধাতা কথা বলে না কিন্তু সময়ে নড়েচড়ে, ঘটমান ঘটনা ঠিকই ঘটায়। এটাই তার কথা বলা। একক ¯্রষ্টা বিধাতা আল্লাহ দৃষ্টিহারা নন, নির্বিকার নন। তার প্রকাশ ভঙ্গি স্বতন্ত্র, আমাদের মত নয়। তাকে স্মরণ করে মনে রাখার নামই হচ্ছে ঈমান। একজন ঈমানদার কখনোই মিথ্যার বেসাতি করতে পারেন না। যদি করেন তবে আপনি ফেল ব্যর্থ ঈমানহারা একজন। আপনার ইহজীবন পরজীবনের লাইসেন্স পাবার সম্ভাবনা কম। নয়তো আপনিই সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব। আপনার নামটি খোদাই করা চিরস্থায়ী খাতাতে উঠাতে পারেন। তবে শর্ত হচ্ছে আপনাকে প্রকৃত সত্যের গোলামী করতে হবে জন্ম থেকে মৃত্যু আজীবন। সত্য সত্য তার পরও সত্য, যেখানে মিথ্যার কোন বেসাতি চলবে না।

১২ই অক্টোবর ২০১৮।

পুনশ্চ: এ লেখাটি সাজিয়েছি ১২ অক্টোবর ২০১৮। কিন্তু হয়তো ব্লগে দিতে হলে আমাকে সাজানোর সুবিধার জন্য অন্য আগের একটি তারিখ ব্যবহার করতে হবে যাতে লেখাটি আমার লেখার লিংকসমূহের মোট ডাটা কলামের নীচের দিকে থাকে। এ লেখাটি নিউইয়র্ক ভিত্তিক সাপ্তাহিক পত্রিকা রানারে ২০১৮ সালের ১৮ই অক্টোবরে ছাপা হয়েছে।

Tag Cloud