Articles published in this site are copyright protected.

মীরজাফর নামটি তার অতীত কর্মকান্ডে জনমনে একটি কলঙ্কের নাম। কিন্তু এর চেয়ে বড় বড় কলঙ্কিত মীরজাফরেরাও নিশ্চিন্তে সংগোপনে লুকিয়ে আছেন খোলসের ভিতরে, তা স্পষ্ট হওয়াও ইতিহাসের বড় দায়। গবেষণালব্ধ ইতিহাস বলে মুসলিমরা সব সময়ই অতি অসাম্প্রদায়িক, এর বড় কারণ এটি তাদের ধর্মের স্পষ্ট নির্দেশনা। যার প্রেক্ষিতে তারা সব সময়ই মীরজাফরকে আসামী ধরে ধিক্কার দিয়েছে কিন্তু বাকীদের ব্যাপারে এতই নির্লিপ্ত থেকেছে যে, এতেও প্রকৃত সত্যের সাথে অনেক অবিচার করা হয়েছে। যার জন্য ধূর্ত অপরাধী শক্তি ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকেছে সেদিন থেকে আজ অবদি। গবেষণার প্রকৃত ইতিহাস বলে মীরজাফর কিছুটা চক্রান্তকারী হলেও পরমাত্মীয় সিরাজ বিরোধী ও দেশ বিরোধী চক্রান্তে জড়াতে চান নি। এমন কি ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় এ দায় বহাল রাখতে কুরআনের শপথও নিষ্ক্রিয় হয়েছে। চারপাশ থেকে কপট জোটবদ্ধ হিন্দুরা লোভের টোপ ফেলে তাকে ষড়যন্ত্রীদের দলে ভিড়ায়। মীরজাফর যখন এসব চক্রান্তে জড়াতে চাননি তখন উমিচাঁদের জবাব ছিল, আমরা তো সিরাজকে মারছি না। নিজেরাও নবাবী নিচ্ছি না। সিংহাসনে আপনাকেই বসাবো। কারণ আপনাকে ইংরেজসহ আমরা ও বাকী মুসলিম অমুসলিম সবাই শ্রদ্ধার চোখে (?) দেখে। এভাবে অতি লোভের টোপ পেয়ে মীরজাফর উমিচাঁদের বিলি করা জীবনধ্বংসকারী টোপটি গেলেন। এটি সত্য তার ঈমানের গলতি ছিল বলেই তিনি এমন টোপ গিলতে পারলেন। আজও যারা ধর্মকে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করে জাতির সর্বনাশ করছে, এরা সবাই ঐ এক গোষ্ঠী দলের অন্তর্ভূক্ত। এরা মুমিন তো নয়ই, মুসলিমও নয়, এরা মোনাফিক। প্রতিটি জনতার এদের সম্পর্কে ধারণা থাকা দরকার। মানুষের মাঝে এরা তিন গোষ্ঠী আর চতুর্থ আর এক দলের নাম হচ্ছে মুশরিক। যারা আল্লাহর সাথে শিরক করে, অমুসলিমরা তো করেই, এমন কি মুসলিম হয়েও করে। এখানের সবচেয়ে উত্তম দল হচ্ছে মুমিন দল, এরা এক্সেলেন্ট পাওয়া দলের সদস্য।

প্রসঙ্গ একজন রাগীব আলী: প্রধান রিচারপতি সিনহা বাবু প্রায়ই দু চারটে কথা বলে চমক আনতে চান। যেমন ৪০ ভাগ কাজ হয় আর ৬০ ভাগ পকেটে ঢুকে যখন তিনি এটি বলছেন তখন জনগণ সন্দেহ করছে ৯০ ভাগই পকেটে ঢুকছে, না হলে এক মাইল রাস্তা খরচ হতে অন্যদের থেকে দশগুণ বেশী খরচ হয় কেন? দেখা যায়, সরকারী হিসাবে একটি বৈদ্যুতিক ফ্যানের দাম হয় লাখ টাকা! এসব হচ্ছে ভাবমূর্তির লুটপাট বানিজ্য! সারা দেশে এত সব ভয়ঙ্কর অবস্থা চলছে, সে সব বিষয়ে বাংলাদেশ যেনো বোবার ভনিতা করছে। কেন এমন নীরবতা, কারণ মুখ খুলবে যে, তার ময়দানের অধিকার বাতিল হবে, হবে গুম নয়তো খুন। যে বা যারাই দেখছেন অনেক গুণিজনই বলছেন যে সাঈদী নির্দোষ থাকার সার্বিক প্রমাণ থাকার পরও কেন রায় উল্টোমুখি হয় স্কাইপি আদলে। কেন আসামীপক্ষ আইনজীবির জলজ্যান্ত যুক্তি ধোপে টেকে না? বিচারের নামে কেন এসব স্বজ্জ¦নদেরে ভাবিত করে না, বুঝি না। এতদ প্রসঙ্গে সিলেটের একজন রাগীব আলীর মানবিক অনেক কর্মকান্ডের অনেক রেকর্ড বর্তমান থাকার পরও তার বিচার বড় সহজে হয়। মনে হয় সরকারী কোন তকমা তার দলিলে নেই। তিনি বড় বড় ব্যাংক জালিয়াতি লুটপাটের রিজার্ভ চোর নন, শেয়ার চোরও নন, বলা হচ্ছে বিচারে কিছু ত্রুটি তার পেয়েছে। রিজার্ভ চোরদের, শেয়ার চোরদের শুধুই ছাড়, গুম হত্যাকারীরা নিষ্পাপ হয়, ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে। শুধু রাগিব আলী এলাকায় মানবতার সেবায় বিস্তর কর্মকান্ড করার পরও জেলের আসামী, ১৪ বছরের জেল। এই বিচার স্থানীয় অস্থানীয় অনেক মানুষের মনে নানান প্রশ্নের জমা বাড়িয়েছে, বিশেষ করে আঞ্চলিক ময়দানে সচেতন মানুষের মন ও মননে।

সিলেটের তারাপুর চা বাগান নিয়ে বেশ জটিলতা ছিল। সেখানে ৩ হাজার পরিবারকে বাস্তুচ্যুত করা হবে বা হয় কারণ তাদের দোষ এরা রাগীব আলী নামে একজনের কাছ থেকে জায়গা জমি কিনেছিল। কিন্তু সবচেয়ে বড় কথা প্রশাসনের এই এক চোখা নীতি অনেকেই সন্দেহের চোখে দেখছেন কারণ রাগীব আলী কোন জমি বেআইনী দখল করেন নাই বরং তিনি পঙ্কজ কুমার গুপ্তের কাছ থেকে ঐ জমি কিনেছেন। পঙ্কজের পূর্ব পুরুষ কেউ একজন এ জমি কিনেছিলেন বৃটিশ ব্যবসায়ী সি কে হার্ডসন থেকে। এই সি কে হার্ডসন নামের ব্যক্তিটি হচ্ছে বৃটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর পক্ষের একজন বৃটিশ। এই বেনিয়ারা সে সময় ব্যবসার নামে এ দেশ দখল করে রাখে। এটি তখন ছিল আসাম অঞ্চল। উইকিলিক্সে দেখা যায় ঐ সময় সব জায়গার মালিকই ছিল মুসলিমরা। কিন্তু কোম্পানী অশেষ নির্যাতনে কালে রাজ্যহারা মুসলিমদের সম্পদের দখলদারী নেয়। পরবর্তীতে দেশ ত্যাগের হিড়িকের সময় সেটি বৃটিশরা বিক্রি করে দেয় পঙ্কজ কুমারের পূর্ব পুরুষের কাছে। তারাপুরের জমি রাগিব আলী বিক্রি করে আসামী হলে পঙ্কজ কেন ঐ জমি ক্রয় করে আসামী হচ্ছেন না? এসব কথা যুক্তি অনেক ফেসবুকেও আলোচিত হচ্ছে। অতপর দেখা যায় এটি মন্দিরের জন্য দান করা হয়। এতে মূল বিষয় কি দাড়াচ্ছে মুসলিমদের থেকে জোর করে সম্পদ কুক্ষিগত করে সেটি মন্দিরে দিলে সেটি কি সঠিক হয়? এটি গেল রাগিব আলীর জটিলতার এক দিক।

সিলেটের ইতিহাস: উইকিলিক্সএর বরাতে পাওয়া যায় এ অঞ্চলে আর্য যুগ, মুসলিম যুগ, মোগল আমল, বৃটিশ আমল, অতপর পাকিস্তান মুুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ। সিলেট ছিল মূলত আসামের অংশ এখনো তার এক অংশ ভারতের আসাম রাজ্যের অঙ্গীভূত হয়ে আছে। এই যে ধারাবাহিক পর্যায়গুলি এসবে জবর দখল ও জবরদস্তি কাজ করেছে বহুভাবে। ইসলামপূর্ব সময় থেকে চতুর্থ থেকে ষষ্ঠ শতকে গুপ্তবংশ, অতপর শশাঙ্ক নামে একজন স্বল্প সময়ের জন্য শেষে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী পাল রাজবংশ এতদঅঞ্চল শাসন করে। দ্বাদশ শতাব্দীতে সুফি সাধক ত্যাগী মুসলিমদের মারফতে এ অঞ্চলে ইসলাম আসে। সামরিক অভিযান ও যুদ্ধ জয়ের মাধ্যমে শত শত বছরের নির্যাতীত মানুষ ব্যতিক্রমী বিশ^ধর্মের মহতি সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে একে সাদর অভ্যর্থণা জানায়। ১২০৫-১২০৬ খৃষ্টাব্দে ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বখতিয়ার খিলজীর মাধ্যমে রাজা লক্ষণসেনের পলায়নের মাধ্যমে সেন রাজবংশের পতন ঘটে। ষোড়শ শতকে মোগল যুগের আগ পর্যন্ত এ অঞ্চল সুলতান ও ভূস্বামীদের হাতে শাসিত হয়। মোগল যুগেই বাদশাহ জাহাঙ্গিরের নামানুসারে ঢাকার রাজধানীর নাম রাখা হয় জাহাঙ্গিরনগর। ইউরোপীয় বণিকরা আসে পঞ্চদশ শতকের শেষভাগে। ১৭৫৭ খৃষ্টাব্দে বৃটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী পলাশীর ষড়যন্ত্রে এ ভূখন্ড দখলের পর এতদঅঞ্চলের শাসন কুক্ষিগত করে। ঐ ষড়যন্ত্রে বাহ্যত মীরজাফরকে দেখা গেলেও এর পিছনে প্রকটভাবে সচল ছিল হিন্দু বেনিয়া গোষ্ঠী, এ কুটবুদ্ধি চালবাজরা সব সময়ই মীরজাফরকে সামনে দিয়েছে যাতে সাপও মরে আর লাঠিও না ভাঙ্গে। দৃশ্যত তারা স্বজ্ঞানে একজন মুসলিমকে শাসন ক্ষমতা দিতে চায় নি কিন্তু নিজের গা বাঁচাতে মীরজাফরকে কাকতাড়–য়ার মত ব্যবহার করে। এযাবৎ ভারতে মুসলিমদের গৌরবোজ্জল ইতিহাস ঢেকে রাখা হয়েছে প্রচন্ড কৌশলে। এর উত্তম উদাহরণ হিসাবে যুগ যুগ অবধি এই গোলাম আহমাদ মোর্তজার মত লেখকদের লেখাকে অপ্রকাশিত করে রাখাটা এর এক অনন্য উদাহরণ।

ঐ দেশ ধ্বংসে বেনিয়া গোষ্ঠী জগৎশেঠ, উমিচাঁদ, রাজবল্লভ ছিল মূল চালিকা শক্তি। শুরুতে বৃটিশদের এদেশে মসনদ গড়ার সুযোগ করে দেয় এরাই। শুরু থেকে “টাকা যত লাগে এ যাবত দিয়েছি আরো দেব, কোন চিন্তা নেই” টাকারও মালিক মূলতঃ গৌরিসেন। এটি ছিল তাদের মুখের বানী। এরপরই সিরাজের বড় খালা ঘসেটি বেগমকে সিংহাসনের লোভ দেখায়। নবাব সিরাজউদৌলাকে সরাতে তারা ব্যস্ত সময় পার করছিল। ইংরেজ দূত ওয়াটস সেদিন মহিলার ছদ্মবেশে (অবশ্যই বোরখা পরেছিল) পালকী যোগে গোপন সলা পরামর্শে যোগ দেয়। সেদিনও বোরখা অস্ত্রটি এমন এক দেশ বিধ্বংসী ভূমিকা রাখে সেটি মাথায় রাখা উচিত। খুব সহজে যে কোন পুরুষও এটি পরে ছদ্মবেশ ধারণ করতে পারে। সেদিন দখলদার বৃটিশদের অর্থনৈতিক দায় মেটায় জগৎ শেঠ। জগৎ শেঠ মাছের তেলে মাছ ভেজে অর্থের যোগান দেয়। ইতিহাসের সব দায় মীরজাফরের ঘাড়ে একাই চাপিয়ে দিয়ে চালবাজরা থাকে খোলসের আড়ালে। আলীবর্দী খাঁএর কোন পুত্র না থাকাতে নাতি সিরাজুদৌলাই সিংহাসনে বসেন। সিরাজের বিরুদ্ধে হিন্দু-বৃটিশ শক্তি মিলিতভাবে মিথ্যাচারের রং চড়িয়ে ইতিহাস ঢেলে সাজায়, যার কোন সত্য ভিত্তি নেই। সঠিক তথ্য নির্ভর গবেষনাতে এসব ছলচাতুরী ধরা পড়ে। বৃটিশরা হামলে পড়ে পলাশিতে কারণ উমিচাঁদ, রায়দুর্লভ, জগৎশেঠের সাজানো সেনাপতি মীরজাফর হচ্ছে তাদের কাকতাড়–য়া স্বপক্ষ শক্তি। ক্লাইভের সৈন্য মাত্র ৩,০০০ আর সিরাজের সৈন্য ৫০,০০০। যুদ্ধকালীন এই মিলিত হিন্দু-মীরজাফর শক্তি নিষ্কর্মা হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো আর নবাবের সৈন্যরা মরলো যেন আত্মহত্যা করছে তারা। মীর মর্দান সেনাপতির নির্দেশ ব্যতিরেকেই বীরের মত শহীদ হন। তখন অবদি যুদ্ধ কিন্তু সিরাজের অনুকূলে ছিল। ওদিকে মোহনলাল ও ফরাসি মিত্র সিনফ্রে যখন যুগপৎ তৎপর ঠিক তখন অল্প দামে কেনা বিশ^াসঘাতক মীরজাফর যুদ্ধ বন্ধের আদেশ করে। যুদ্ধের চলমান গতি বদলে যায়, সিরাজসহ ভারত পরাজয়ের মালা গলে পরে নেয়। এই হিন্দু ও মীরজাফর শক্তিই বৃটিশদের জয়ের মুকুট পরায়। প্রকৃতপক্ষে এটি যুদ্ধ ছিল না, ছিল একটি জাতির মিথ্যাচারের ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পাতানো খেলা। যুগ যুগ থেকে এসব ইতিহাসের তলায় চাপা দিয়ে রাখা। মুসলমানদের ইতিহাস সব সময়ই গৌরবের ইতিহাস যারা সঠিক ইতিহাস পাঠ করেছেন তারা জানেন। মীরজাফরেরও বহু আগ থেকেই হিন্দু মিলিত শক্তি ছক আঁকছিল। সিরাজ ধ্বংসের যে গোপন বৈঠক হয় সেখানে জগৎশেঠ, রাজা মহেন্দ্ররায় (দুর্লভ রায়), রাজা রামনারায়ণ,  রাজা রাজবল্লভ, কৃষ্ণদাস ও মীরজাফর। এরা সব বৃটিশের অনুগত গোলাম, রাজা টাইটেলও বৃটিশের দান। তাদের একজন জোর গলাতে হিন্দু নবাবের দাবী জানান, কিন্তু কুটবুদ্ধির কৃষ্ণদাস কৌশলে মীরজাফরকেই কোরবানীর বলদ হিসাবে সামনে রাখেন। বাকীরা এ যুক্তিতে এটি মেনে নেন যে অন্য কেউ নবাব হলে হিতে বিপরীত হতে পারে। টাকার যোগানদাতা জগৎশেঠ ভারতের যোদপুরের এক হিন্দু হতদরিদ্র পরিবারের সন্তান। তার পরিবারের একজন হীরানন্দ জঠর জ¦ালায় বঙ্গদেশে এক বৃদ্ধের সেবা করার সুযোগ পান। ঐ বৃদ্ধের মৃত্যুতে তার সম্পদ হীরানন্দের ভাগের জমা। ১৭৫২ খৃষ্টাব্দে বাদশাহ ফররুখ শাহের সময় মুর্শিদ কুলি খাঁর সুপারিশে হীরানন্দকে শেঠ উপাধি দেয়া হয়। তখনকার সময়েও এসব হিন্দু মুসলিম মিলিত শক্তির ঐতিহাসিক উদাহরণ হয়ে ছিল (রিয়াজুস সানাতিন, Stewarts History of Bengal)। ওদিকে মুর্শিদ কুলী খাঁর মৃত্যুর সময় তার টাকাও শেঠদের বাড়ীতে জমা ছিল যার পরিমাণ সাত কোটী টাকা, যা শেঠরা কোনদিনই ফেরত দেয়নি (মুর্শিদাবাদ কাহিনী, ৫৬পৃষ্ঠা, নিখিল চন্দ্র রায়)। এভাবে অপরের হাতিয়ে নেয়া টাকা দিয়েই ব্যাংকার সেজে গোটা দেশ ধ্বংসের কর্মকান্ড চলে শেঠ কুলের মদদে। বৃটিশরা তাদের লেখাতে এটি স্বীকার করে যে, The Rupees of the Hindu banker, equally with the sword of the English colonel contributed to the overthrow of the Mahammedan power in Bengal. (ঐতিহাসিক চিত্র, অক্ষয় কুমার মৈত্র ১ম বর্ষ ১ম সংখ্যায় দ্রষ্টব্য। ইতিহাসের ইতিহাস, গোলাম আহমাদ মোর্তজা, ২৩৬ পৃষ্ঠা)। বাংলার মুসলমান ধ্বংস করতে বৃটিশ সেনাপতির তরবারীর সাথে হিন্দু ধনপতির মিলিত প্রয়াসেই এটি সম্ভব হয়। সিরাজকে হত্যা করার প্রস্তাবটিও জগৎ শেঠের। এরা মিলিতভাবে সিরাজের বিরুদ্ধে অন্ধকুপের হত্যাসহ চরিত্রধ্বংসের অনেক অনেক কলঙ্ক ছড়ায় যা ছিল ইতিহাসের চরম মিথ্যাচার মাত্র। এ মিথ্যাচারে অনেক বাবু হিন্দু লেখকরাও মহানন্দে শরিক হন। সিরাজ বুঝতে পেরেছিলেন মীরজাফর প্রতারণা করতে পারেন তারপরও কেন তাকে বিশ^াস করলেন এর একমাত্র যুক্তিটি হচ্ছে এই মোনাফিক কুরআন হাতে নিয়ে শপথ করেছিল যে দেশ বিধ্বংসী কিছু করবে না। এর জবাব অবশ্যই পরকালের খাতায় জমা রইবে। অনেকে মিথ্যাচারে ভরে দিলেও একজন গিরীশচন্দ্র ঘোষ প্রকৃত সত্য সিরাজকে সঠিক সত্যে উদ্ভাসিত করে নাটক লিখেন যা সকল মিথ্যাচারের মুখে চুনকালি লেপে দেয়। তার নাটক ছিল সকল মিথ্যাচারের স্পষ্ট জবাব। এক সময় ক্লাইভের শঠতার ইতিহাসও স্পষ্ট হলে, সে কলঙ্ক লুকাতে তার শেষ পরিণতিও হয় কলঙ্কজনক মৃত্যুতে। কাপুরুষের মত নিজ কন্ঠে ধারালো ক্ষুর দিয়ে শ^াসনালী কেটে আত্মহত্যার কলঙ্ক দিয়ে নিজেকে সমর্পণ করেন। এসব চাপা দিয়ে রাখা অতীতের অনেক অনেক ইতিহাস জানা যায় গোলাম আহমাদ মোর্তজার “ইতিহাসের ইতিহাস” গ্রন্থ থেকে (২৩২-২৪৬ পৃষ্ঠা)।  কলকাতার দুর্গ নির্মানের ব্যয়ের যোগানদাতা ছিল রায় দুর্লভ, তার ছেলে কৃষ্ণরায়, এরা প্রজা সাধারণের টাকায় নিজেদের মসনদ দৃঢ় করে। অন্যদিকে এই মুসলিমরাই সিপাহী বিদ্রোহের প্রকৃত যোগানদাতা হলেও গালির ভাগই তাদের ঘাড়ে বর্তায় কপটদের কল্যাণে। ওয়াটসাহেবকে সপরিবারে বন্দী করে কাশিমবাজার থেকে মুর্শিদাবাদ আনা হয়, রাজ বল্লভের পুত্র প্রজা নিপিড়নের টাকা পাচার করেন বৃটিশের ঘাটিতে। এ অপরাধেও হলওয়েল, কৃষ্ণদাস, ও উমিচাঁদকে নবাবের কাছে আনা হয়। তারা জানতেন তাদের পাপ প্রানদন্ডের অপরাধে অভিযুক্ত। কিন্তু সিরাজ তাদের ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। এর খেসারত তাকে দিতে হয় জীবন দিয়ে।

এর ১০০ বছর পর ১৮৫৭সালে সিপাহী বিপ্লবের পর কোম্পানীর হাত থেকে সরাসরি বৃটিশ সা¤্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণে আসে। বহুবার দুর্ভিক্ষ, ছিয়াত্তরের মন্বন্তর হয় ১৭৭০ সালে, ৩০ লাখ মানুষ মারা যায়। অতপর ১৯০৫-১৯১১ বঙ্গভঙ্গ হয় এর ফলে রাজধানী ঢাকা কেন্দ্রিক পুর্ববঙ্গ ও আসাম নিয়ে একটি নতুন প্রদেশ গঠিত হয়। সেদিন রবীন্দ্রনাথসহ কলকাতা হিন্দু শ্রেণীর প্রবল বাধার মুখে এটি রদ হয়। ঐ বিভাগ ভাংতেই রচিত হয় সোনার বাংলা গানটি ছিল বাঙ্গলী মুসলিমের জন্য একটি দেশ বিধ্বংসী গান। তারপরও ইতিহাসের বাস্তবতায় ১৯৪৭ সালে আবার পাকিস্তান নামে পুনরায় দেশটি বিভক্ত হয়। কারণ এটি না হয়ে উপায় ছিল না। বর্ণহিন্দুরা যে জাতি বিদ্বেষী খেলা শুরু করেছিল এর সহজ পরিণতি ছিল এটি। নীচবর্ণ হিন্দুও সবদিনই ভারতে মুসলিমদের মত অন্য সব সংখ্যালঘিষ্টের মতই সেখানে নির্যাতীত। বৃটিশ আমলে আসাম ও সিলেট একত্রিত ছিল। দেখা যায় বৃটিশ আমলে এ এলাকায় ইন্ডিয়ান লস্করেরা তাবেদারী শাসন চালাতো। ১৭৭৮ সালে রবার্ট লিন্ডসের অধীনে সিলেট বড় ধরণের বন্যা, ফসলহানিতে বিক্ষুব্ধ সৈয়দ গাদী ও সৈয়দ মাহদী (পীরজাদা নামে পরিচিত)র সাথে লিন্ডসের যুদ্ধ সংগঠিত হয়। তখনও প্রচুর ভারতীয় তস্কর বৃটিশের সাথে যোগ দেয়। ফলে অনেকে সেদিন সিলেট ছেড়ে লন্ডনে চলে যায় ও সেখানে বসতি গড়ে। অতপর ইতিহাসের পালাবদলে দেখা যায় পাকিস্তান সৃষ্টির পূর্বে মাত্র তিনদিন আসাম ও সিলেট একত্রিত ছিল।

সুরমা টাইমসএর বরাতে ১৬ মে ২০১৬ তে দেখা যায় তারাপুর চা বাগান যা বৃটিশ পিরিয়ডে ছিল স্টার টি গার্ডেন (Star Tea Garden) ১৮৯২ সালের ১০ জুন ৭ হাজার টাকায় ৪২২.৯৬ একরের বাগানটি ডব্লিউ আর হার্ডসন বিক্রি করে দেন বৈকুন্ঠ চন্দ্র গুপ্তের কাছে। ১৯১৫ সালের ২ জুলাই বৈকুন্ঠ চন্দ্র জিউ দেবতার নামে বাগানটি উৎসর্গ করেন। তারপর তার  ছেলে রাজেন্দ্র গুপ্ত হন এর সেবায়েত। রাজেন্দ্র গুপ্ত ১৯৮৮ সালের ১৬ই সেপ্টেম্বর পঙ্কজ কুমার গুপ্ত দেবোত্তর সম্পত্তি রক্ষার্থে ইজারার অনুমতি চান ভূমিমন্ত্রণালয়ের কাছে। ১৯৮৯ সালের ১২ই অক্টোবর সে অনুমতি প্রদান করে। ইত্যবসরেই পঙ্কজ কুমার অনুমতি পাবার আগেই ১২লাখ ৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে রাগীব আলীর ছেলে আব্দুল হাইয়ের কাছে পুরো তারাপুর চা বাগান বিক্রির জন্য চুক্তিবদ্ধ হন। এভাবে এ সম্পদ রাগীর আলীর দখলে আসে। মুসলিম অধ্যুষিত সিলেটে বৃটিশ দখলদার হার্ডসনের সাথে বিরোধ লাগে মুসলিমদের। সিলেট আমার নিজের অঞ্চল, তার উপর সেখানের মানুষের প্রতি আমার একটি দুর্বলতা আছে অবশ্যই। মালিক সি কে হার্ডসেনের পর তার ছেলে ডব্লিউ আর হার্ডসন। ঐ ব্যক্তি তখনকার বৃটিশ কোম্পানীর বরাতে আসাতে তার নাম ধাম সবই বর্তমান। এখানে কেন তার নামে গোজামিল করা হলো, এটিও কি কোন চাতুরীর উদ্দেশ্যে কি না, সেটি স্পষ্ট হওয়া জরুরী। এমনকি তখনকার কলকাতা রেজিষ্টারেও এ নামটি লিখা আছে হাডসন, আসামের একজন ডেপুটি কালেকটর হিসাবে হার্ডসন নয় (সূত্র The Asiatic Journal and Monthly Miscellany, Volume 27, পৃষ্ঠা ২০২, লিঙ্ক-https://goo.gl/jTm9OY)।

ওদিকে ব্লগার সুক্ষ্মদর্শী নয়নেরও (নয়ন চ্যাটার্জির) প্রশ্ন হচ্ছে এটি কি কোন উদ্দেশ্যমূলক করা কি না? আদৌ বৈকুন্ঠ চন্দ্র গুপ্ত হাডসনের থেকে এ ব্যক্তি ক্রয় করেছিল কি না? এটিও জানা যায় বৈকুন্ঠ ছিল ঐ চা বাগানের সামান্য কর্মচারী। একজন সাধারণ কর্মচারী ঐ সময় ১৮৯২ সালে এত বিশাল টাকা কোথা থেকে পেল? এখানে কি কোন অতিভৌতিকতা কাজ করেছে কি না, সেটিও পরখ করে দেখা দরকার।  দেখা যায় পঙ্কজ যে কোন কারণেই হোক সব ধরণের সহযোগিতা পেয়ে যাচ্ছে যেখানে রাগীব আলীর জন্য সব দরজা বন্ধ ঘোষিত হয়। তিনি আসামী হলে ঠিক আছে। কিন্তু অন্যরা আসামী নয় তার যুক্তি কি হতে পারে সেটি পরখ না করলে সাঈদীর মতই কাদের মোল্লাহর মতই স্কাইপি রায় হচ্ছে না, সে প্রশ্ন সচেতনের মাঝে থেকেই যাবে। ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৬ তারিখে রাগীব আলীর মালামাল ক্রোকের নির্দেশ দেয় আদালত। পাশাপাশি তাদের বিরুদ্ধে হুলিয়াও জারি হয়। এদিকে জামিনে থাকা পঙ্কজ কুমার গুপ্তকে স্থায়ী জামিন দিয়েছে আদালত। দেবোত্তর সম্পত্তিতে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের মাধ্যমে হাজার কোটি টাকার ভূমি আত্মসাতের কারণে স্মারক জালিয়াতির অভিযোগে রাগীব আলীসহ ৬ জনের বিরুদ্ধে ১০ জুলাই চার্জশিট দাখিল করে পিবিআইএর ১১৭ নং মামলাটি তদন্ত করেন এসআই দিলীপ কুমার নাথ।

তখনকার বৃটিশ ভারতের এক ভুক্তভোগী ডাঃ শুকুরের গ্রন্থ ‘সেতুবন্ধন’ থেকে দুটি প্যারা। কিন্তু আল্লাহর মার বড় মার। এসব ব্যাপারে আল্লাহ কাউকে ক্ষমা করেন না। বাংলার এই নিরীহ মানুষের ভাগ্য নিয়ে যখনই যারা বেঈমানী করেছে হোক তারা দেশের কিংবা বিদেশের, ক্লাইভ উমিচাঁদ জগৎশেঠ রাজবল্লব নন্দকুমার মীরজাফর মীরন ঘসেটি বেগম ভুট্টো মুজিব প্রিয়দর্শিনী কেউ স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করে এই দুনিয়া ছেড়ে বিদায় নিয়ে যেতে পারেননি। আর তাইত দেখি ভারত বিভাগকালীন সময়ের প্রধান কারিগর লর্ড মাউন্টব্যাটেন সেদিন স্ববংশে নিহত হলেন উত্তর সাগরে ভাসমান প্রমোদ তরীতে আইরিশ সন্ত্রাসীদের পাতানো বোমার আঘাতে। ভারত বিভাগকালীন সময়ে লেডী মাউন্টব্যাটেনের কৃত পাপাচার ও পন্ডিত নেহরুর সাথে তার ফষ্টিনষ্টি ও মেলামেশার কথা না বললে ভারত বিভাগের মূল কারণ এবং এ ব্যাপারে প্রধান কর্মকর্তাদের পরিচয় ও তাদের কাজের স্বরুপ একদিন মানুষের স্মৃতি থেকে মুছে যাবে (সেতুবন্ধন ডাঃ এম এ শুকুর, পৃষ্ঠা ৫০-৫১, আগষ্ট ১৯৯২)।

একটি কথা আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি যে, যারা বাংলা তথা পূর্বাচলে মানুষের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছিলেন তাদের সবারই অপঘাত মৃত্যু ঘটেছে। আর্ল মাউন্ট ব্যাটেনও এই পরিণতি থেকে রেহাই পাননি। “ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় ঘসেটি বেগমের প্যালেস রাজনীতির বদৌলতে এদেশ নিজের স্বাধীনতা হারিয়েছিল পলাশীর মাঠে। পলাশী নাটকের সকল চক্রান্তকারীরাই অস্বাভাবিক মৃত্যু বরণ করেছিলেন। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, নবাব সিরাজউদ্দৌলা মুহাম্মদী বেগ কর্তৃক নির্মমভাবে নিহত হয়েছিল, আমিনা বেগম ও ঘসেটি বেগমকে ঢাকার অদূরে বুড়িগঙ্গায় ডুবিয়ে মারা হয়েছিল। মীর জাফর আলী খান এক ধরনের মারাত্মক কুষ্ট ব্যাধিতে মারা যান এবং তার পুত্র মীরণ বজ্রপাতের মাধ্যমে ইহজীবন ত্যাগ করেন। মীর কাসেম আলী খানের মৃতদেহ দিল্লীতে আজমিরি গেইটের নিকটে রাস্তায় পাওয়া গিয়েছিল। রবার্ট ক্লাইভের তৈরী পদক প্রাপ্তদের চুড়ান্ত তালিকায় নিজের নাম দেখতে না পাওয়ায় উমিচাঁদ হৃদক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান। মুঙ্গের দূর্গের শীর্ষ থেকে জগৎ শেঠ ও রায় দুর্লভ মীর কাসেম আলী খান কর্তৃক গঙ্গায় নিক্ষিপ্ত হন। মহারাজ নন্দকুমারকে ওয়ারেন হেস্টিংস এক মিথ্যা মামলার আসামী করে ফাঁসি দেন। নাটকের মূল নায়ক ক্লাইভ স্বয়ং আত্মহত্যা করে মৃত্যু বরণ করেন। পলাশীর বিয়োগান্ত নাটকের নায়ক ও নায়িকাদের জীবনের এটাই ছিল নির্মম পরিণতি। ইতিহাস ইতিহাস, আরব্য রজনী এটা নয়। তাইত দেখি, ১৯৭১ সালের ভারত বাংলাদেশ ও পাকিস্তান নাটকে যে তিন মহারথী প্রধান ভূমিকা পালন করেছিলেন, তাদের তিনজনই ঘাতকের হাতে নিহত হয়েছিলেন। শুধু তাও নয়, এই তিনটি পরিবার আজ এক মহা ত্রাস ও বিভিষিকার শিকার হয়ে পড়েছে। কিন্তু কেন? এরও জবাব দিবে ইতিহাস (সেতুবন্ধন ডাঃ এম এ শুকুর, ৫৬-৫৭)।

নাজমা মোস্তফা, ৩০ জুন, ২০১৭।

Advertisements

Tag Cloud

%d bloggers like this: