Articles published in this site are copyright protected.

সিকিম একটি বহুজাতিক অধিবাসী অঞ্চল। মূলত সেখানে প্রধান তিনটি জনগোষ্ঠীর বাস—লেপচা, ভুটিয়া ও সেরপা। লেপচারাই এখানের মূল বাসিন্দা, যার জন্য দেখা যায়, লেপচারা অন্যদের তুলনায় তাদের মৌলিক আচার ধরে রাখতে বেশি উৎসাহী । জানা যায়, লেপচা ও ভুটিয়ার বড় অংশ ৭০ শতাংশেরও বেশি জনতা নেপালি। এরাই সেখানের বড় গোষ্ঠীর জনতা। সিকিম হিমালয়ের পূর্বে অবস্থিত একটি অঞ্চল। পৃথিবীর তৃতীয় উচ্চতম পর্বতশৃঙ্গের নিচে প্রাকৃতিক লীলাভূমি হিসেবে ছড়িয়ে থাকা একটি অঞ্চল। নেপাল, ভুটান ও ভারতের কাছ ঘেঁষে খনিজ সম্পদে ভরপুর প্রাণিবিদ্যা ও জীববিদ্যার উপকরণে সমৃদ্ধ অঞ্চলটি ১৯৫৮-৬০ সিকিম গেজেটের হিসাবে ৭২৯৯ স্কয়ার কিলোমিটার বিস্তৃত। সামপ্রতিক ২০১১ সালের ১৮ সেপ্টেম্বরে একটি ভূমিকম্পের উত্পত্তিস্থল ছিল সেটি। সে কারণেও সিকিম চিন্তার দুয়ারে নাড়া দেয় নতুন করে। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৬ দশমিক ৮। পুরো ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সম্পন্ন হতে এমনিতেই কিছু সময় লাগে এবং দেখা যায়, যতই সময় যায় ততই ক্ষতির পরিমাণ বাড়ে। বাংলাদেশও এ কম্পনে দুলে উঠে উল্লেখযোগ্য একটি সময়, যা এ যাবত্কালীন সব ভূমিকম্পনের সময়কে ছাড়িয়ে গেছে। এ একটি আগাম সতর্ক সংকেত দেশবাসীর জন্য। আগাম প্রস্তুতি হিসেবে সঙ্কটের সম্মুখীন হলে সবাইকে মনে মনে প্রস্তুতি নিতে হবে। যদি এমন হয় তখন কী কী করতে হবে। তাছাড়া বাংলাদেশ মানচিত্রের দেশটিও এরকম সিকিমীয় মানচিত্রিক ভূকম্পনের শিকার হচ্ছে বলে মনে করছেন অনেক বিশেষজ্ঞ। পার্শ্ববর্তী বন্ধু রাষ্ট্রের বর্ডার ইস্যুর সঙ্গে আরও নানান আচারে একের পর এক বিদ্ধ হচ্ছে দেশটি।

mapofindiaবহুদিন থেকে মনের গোপন কোণে সিকিম চিন্তার রাজ্যে সুপ্ত হয়েছিল, ভূকম্পন যেন সে মনের নাড়াকে সামনে নিয়ে আসে। অতীত থেকে, ইতিহাস থেকে মানুষ শেখে। এটি খুব সহজ শিক্ষা, অন্যের দুর্যোগ দেখে ঠেকেও মানুষ শেখে। সিকিমের মানচিত্রের কিছু জমা ইতিহাসের পাতায় জমে আছে, সচেতনরা সেখান থেকে খোরাক জমা করতে পারেন, রিখটার স্কেল ছাড়াও অনেক ভূকম্পনের মাত্রাও আঁচ করতে পারেন। বাংলার পলাশীর প্রান্তর তার অধিবাসীদের জন্য অনেক বেদনার উপাচার সংগ্রহ হিসেবে জমিয়ে রেখেছে। কেমন করে এককালে স্বাধীন এ অঞ্চলের মানুষ পরাধীনতার শিকল পরেছিল। তার সবক’টি সূত্রকথা ছলনা, মীর জাফরি প্রক্রিয়া। সেটি কী ছিল, কেমন ছিল তা জানার জন্য আছে ইতিহাস। ইতিহাস নিয়ে অনেক ধামাচাপা হয়েছে যুগে যুগে, আজও হচ্ছে। তবে প্রকৃতই ধামাচাপা দেয়ার যুগ মনে হচ্ছে আজ বাসি হয়েছে। ইন্টারনেটের বদৌলতে সাজানো সত্য-মিথ্যা সবই গবেষণা করলে মূল সত্য ধরা পড়বেই। মনে হয় একে এড়িয়ে যাওয়ার ফুরসত খুব কম। সে হিসেবে বলা চলে, এ বুঝি সত্য যুগের নমুনা।

৬ এপ্রিল ১৯৭৫, সকালবেলা। রাজা পালডেন থনযুপ নামগয়াল সবে নাশতা শেষ করেছেন, তখনই শুনলেন রাজপ্রাসাদ অঙ্গনে গোলাগুলির আওয়াজ। দৌড়ে গেলেন জানালার ধারে। যা দেখলেন তা তিনি বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। ভারতীয় সেনারা তার প্রাসাদ রক্ষীদের আক্রমণ করেছে। চোখের সামনে মাত্র ৩০ মিনিটের নাটকীয় অপারেশনে তার এক উনিশ বছরের রক্ষীর জীবনের বিনিময়ে রাজা পালডেন সিংহাসন হারালেন। সেই সঙ্গে অবসান হলো ৪০০ বছরের রাজতন্ত্র এবং হারিয়ে গেল পৃথিবীর বুক থেকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। আর তা পরিণত হলো প্রতিবেশী ভারতের একটি প্রদেশে। জাতিসংঘে একটু গুঞ্জন হলো। বিশ্বের কেউ টুঁ শব্দও করল না। কারণ হিসাবে বলা হলো, দেশটি গণতন্ত্র পেয়েছে, যদিও তা আর একটি দেশের অঙ্গ হিসেবে। তা ছাড়া আরও যুক্তি দেখানো হলো দেশটির জনগণই স্বাধীনতা চায়নি, চেয়েছে ভারতের সঙ্গে মিশে যেতে। কিন্তু জানা যায়, লেপচা ও ভুটিয়ারা জনতার বড় অংশ, তারা চ্যাগল সাম্রাজ্যে সুখী ছিল।

উল্লেখ্য, চীন আজও ইন্ডিয়ার এ আগ্রাসনকে মেনে নিতে পারেনি, তারা স্বীকৃতি দেয়নি। কোনো রাষ্ট্র প্রশ্ন না তুললেও বিশ্লেষক, গবেষক ও বিদগ্ধজনরা তখন এবং এখনও অনেক প্রশ্ন তুলেছেন, যার সঠিক জবাব কখনও মেলেনি। এসব বিশ্লেষকের মধ্যে রয়েছেন এক ভারতীয় সাংবাদিক সুধীর শর্মা। একটি জাতির হারিয়ে যাওয়ার বেদনা (পেইন অব লুজিং এ নেশন) শিরোনামে এক চমৎকার প্রতিবেদনে সিকিমের ষড়যন্ত্র, বিশ্বাসঘাতকতা ও হটকারিতার ইতিহাস বর্ণনা করে সিকিমের বিদায়ের কাহিনী লিখেছেন তিনি। মন্তব্য করেছেন, এমনটি যে হবে তার চেষ্টা শুরু হয়েছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিদায়ের লগ্ন থেকেই। এমনকি ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওয়াহেরলাল নেহরু এক কথোপকথনে সাংবাদিক ও কূটনীতিবিদ কুলদীপ নায়ারকে এর ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। পরিকল্পনা বাস্তবায়নে মিলেছিল নেপথ্যে ইন্ধনকারী একজন মীর জাফররুপী কাজী লেন্দুপ দরজি। ভারতের নেতারা ক্লাইভের ভূমিকায় ছিলেন। তবে এখানে স্লোগান ছিল গণতন্ত্রায়ণ, সংখ্যালঘুর ক্ষমতায়ন এবং রাজতন্ত্রের অবসান। তবে ফলাফল সেই একই। প্রভুর পরিবর্তন! গণতন্ত্র, ক্ষমতায়ন সবই হলো। শুধু জনগণ তার স্বাদ অনুভব করতে পারল না। আসলে সব কর্মকাণ্ডের মূলে ছিল নিয়ন্ত্রণ ও দখল। গদিচ্যুত হওয়ার তিন দিন পর রাজা পালডেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে একটি চিঠি লিখেছিলেন।

‘আমি বাকরুদ্ধ হয়েছি তখনই যখন ভারতীয় বাহিনী সিকিম আক্রমণ করল। (প্রাসাদের) ৩০০ এর কম গার্ডের ওপর আক্রমণ চালানো হলো। অথচ এরা ভারতীয় দ্বারা শিক্ষাপ্রাপ্ত এবং তারা ভারতীয় অস্ত্রে সজ্জিত ও ভারতীয় অফিসার দ্বারা পরিচালিত। সিকিমরা ভারতীয়দের কমরেড ভাবে। এ আক্রমণ গণতান্ত্রিক ভারতের সবচেয়ে ন্যক্কারজনক দিন’ কথাটি তিনি বড় দুঃখে লিখলেন। রাজা পালডেন হয়তো এমন করুণ পরিণতিকে অন্যদিকে মোড় দেয়াতে পারতেন, যদি তিনি আর একটু স্মার্ট হতেন। লিখেছেন বি এস দাশ। তার সিকিম সাগা বইতে মি. দাশ লিখেছেন, যদি রাজা আর একটু বুদ্ধির সাহায্যে তার কার্ডটি খেলতেন তাহলে অবস্থা অন্যরকম হতো। দাশ সিকিমে ভারতীয় পলিটিক্যাল অফিসার ছিলেন যখন গ্যাংটকের পতন ঘটে। ভারতীয় পলিটিক্যাল অফিসার অর্থে তিনিই প্রকৃত ক্ষমতাধারি ব্যক্তি ছিলেন ১৯৫০ সালের সিকিম ভারত চুক্তি অনুযায়ী। দাশ লিখেছেন, ‘সিকিমকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন ভারতের প্রতিরক্ষার খাতিরে, আমরা সে লক্ষ্যেই কাজ করে যাচ্ছিলাম।’

অথচ রাজা পালডেন বুঝতেই পারেননি ভারতীয় উদ্দেশ্য। তিনি ভাবতেন, জওয়াহেরলাল নেহরু ও এম কে গান্ধীসহ সব বড় নেতা তার পরম শুভানুধ্যায়ী।

পালডেনের সেক্রেটারি ক্যাপ্টেন সোনম ইয়ংডো লিখেছেন, রাজা তার ভয়ঙ্কর স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি যে, ভারত কখনও তার ছোট রাজ্যকে দখল করে নেবে। অথচ এমনটি হবে এবং এর জন্য একটি মাস্টার প্লান প্রস্তুত। সে কথা চীন ও নেপাল সিকিমের রাজাকে জানিয়েছিল। ১৯৭৪ সালে নেপালের রাজার অভিষেকের সময় রাজা পালডেন কাঠমান্ডুতে যান। সেখানে নেপাল, চীন ও পাকিস্তানের নেতারা রাজা পালডেনকে তিনটি হিমালয়ান রাজ্যকে নিয়ে ভারতের মাস্টার প্ল্যানের কথা বলেছিলেন। নেপাল সাপ্তাহিক ম্যাগাজিনের সম্পাদক সুধীর শর্মা লিখেছেন, চীনের ডেপুটি প্রধানমন্ত্রী রাজা পালডেনকে গ্যাংটকে না ফেরার পরামর্শ দেন এ জন্য যে, এ মাস্টার প্ল্যানের প্রথম শিকার হবে সিকিম। অন্য দুটির জন্য রয়েছে আরও জটিল পরিকল্পনা। পালডেন এ কথা বিশ্বাস করতে পারেননি। শর্মা লিখেছেন, রাজা পালডেন ভারতকে তার সবচেয়ে বড় সুহৃদ মনে করতেন। কেননা তার সেনাবাহিনী প্রাসাদরক্ষী এবং তার শাসনতন্ত্র নির্মাণ ও পরিচালনা ভারতই করত। তিনি তাদের বললেন, আমার সেনাবাহিনী কেমন করে আমার বিরুদ্ধে লড়বে? তাছাড়া রাজা পালডেনকে ভারতীয় সেনাবাহিনীর অনারারি মেজর জেনারেলের পদমর্যাদা দেয়া হতো। নেহরুও বলেছিলেন, এমন ছোট দেশ দখল করার প্রয়োজন নেই (১৯৬০ সালে কুলদীপকে নেহরু বলেছিলেন, টেকিং এ স্মল কান্ট্রি লাইক সিকিম বাই ফোর্স উড বি লাইক শুটিং এ ফ্লাই উইথ এ রাইফেল)। অথচ তার কন্যা মাত্র ১৫ বছর পর ‘জাতীয়’ স্বার্থের কথা বলে সত্যিই সেই মাছিকে হত্যা করলেন। তবে দখলের বীজ নেহরুই বুনেছিলেন। সিকিমের রাজতন্ত্রের পতনের লক্ষ্যে সিকিম ন্যাশনেল কংগ্রেস (এসএনসি) গঠনে তিনিই উৎসাহ জুগিয়েছিলেন।

এসএনসির নেতা লেন্দুপ দরজির গণতন্ত্রের সংগ্রামকে ধীরে ধীরে এগিয়ে নিয়ে যায় প্রথমত নামগয়াল পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য। আসলে কাজী ও নামগয়াল ছিল একে অন্যের শত্রু। এই বিভেদকে ভারত কাজে লাগায় তার মাস্টার প্ল্যানের অংশ হিসেবে। ক্যাপ্টেন ইয়ংজু লিখেছেন—‘ভারতীয় সামরিক বাহিনীর সদস্যরা বেসামরিক পোশাকে রাজার বিরুদ্ধে গ্যাংটেকের রাস্তায় মিছিল, আন্দোলন ও সন্ত্রাস করত।’ এমনকি লেন্দুপ দরজি নিজেই শর্মাকে বলেছেন, ‘ভারতের ইনটেলিজেন্স ব্যুরোর লোকেরা বছরে দু-তিনবার আমার সঙ্গে দেখা করত কীভাবে আন্দোলন পরিচালনা করা যাবে—সেসব বিষয় জানার জন্য। তাদের একজন এজেন্ট তেজপাল সেন ব্যক্তিগতভাবে আমাকে অর্থ দিয়ে যেত এ আন্দোলন পরিচালনার জন্য। এ অর্থ দিয়ে রাজনৈতিক সন্ত্রাস পরিচালিত হতো। শর্মা লিখেছেন, এই সিকিম মিশনের প্রধান চালিকাশক্তি ছিল ভারতের ১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং (সংক্ষেপের)। এর ডাইরেক্টর অশোক রায়না, তার বই ইনসাইড র : দ্য স্টোরি অব ইন্ডিয়ান সিক্রেট সার্ভিস—এ বাংলাদেশ অধ্যায়সহ সিকিমের বিষয় বিস্তারিত জানিয়েছেন। রায়না লিখেছেন, ভারত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ১৯৭১ সালেই সিকিম দখল করে নেয়া হবে। সে লক্ষ্যে সিকিমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা সৃষ্টির জন্য আন্দোলন, হত্যা, রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি ইত্যাদি করা হচ্ছিল। এখানে হিন্দু নেপালি ইস্যুকে বড় করে বিভক্তি সৃষ্টির চেষ্টায় সফলতা আসে। দরজির সঙ্গে এসব সাক্ষাত্কার রেকর্ড হয়ে আছে। ভারতের ‘র’ নামের এই সংস্থাই মূলত মিশন সিকিমের মূল হোতা। এটি ১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠা পায় এবং মাত্র তিন বছরে পাকিস্তান নামের একটি দেশকে ভেঙ্গে টুকরো করে দেয় এবং একটি নতুন দেশ বাংলাদেশের সৃষ্টি করে। আগ্রাসনের মাঝে সিকিম দখল করা তাদের এরকম আর একটি সার্থক প্রচেষ্টা ছিল। প্রতিবেশী দুটি দেশে এ রকম চাল চেলে দুটি ক্ষেত্রেই তারা চরমভাবে সফল হয়েছে।

গ্যাংটক পোস্টের সম্পাদক সিডি রাই বলেছেন, ‘সিকিমের নেপালি বংশোদ্ভূত সমপ্রদায়ের মধ্যে দৃঢ়ভাবে ছড়ানো গেল যে, সিকিমের বৌদ্ধ রাজা তাদের নির্যাতন, নিষ্পেষণ করছেন। সুশীল ও এলিটরা এক হয়ে ভাবতে শুরু করল, বৌদ্ধ রাজার নির্যাতনের চেয়ে আমাদের ভারতীয় হয়ে যাওয়াই ভালো।’ বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারীরা অনেকে ধারণা রাখেন, এরা মানবতাবাদী। অহিংসা পরম ধর্ম। কিন্তু তারপরও সেখানে তিনি বৌদ্ধ হলেও ছিলেন রাজা এবং সে রাজত্ব থেকে তাকে মুছে দেয়ার ভালো যুক্তি হয়ে ভারতের চাণক্যনীতি এখানে কাজ করেছিল। ক্যাপ্টেন সেনাম ইয়ংডো দাবি করেছেন, সিকিমে রাজার বিরুদ্ধে লেন্দুপের আন্দোলন ছোট ছিল এবং তা হয়েছে সম্পূর্ণভাবে ভারতের অর্থানুকূল্যে। তার মতে, ভারত ‘ডাবল গেম’ খেলছিল। একদিকে রাজাকে আশ্বস্ত করছিল যে তার সিংহাসন নিরাপদ এবং তিনি সঠিক পথে আছেন। অন্যদিকে লেন্দুপকে অর্থ ও লোকবল দিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যেতে বলা হয়, যাতে দেশের অধিকাংশ লোককে রাজার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে এক সারিতে আনা যায়। এর ফলে ১৯৭৪ সালের নির্বাচনে লেন্দুপের এসএনসি পার্টি ৩২ সিটের ৩১টিই লাভ করেছিল। এর আগে দিল্লির চাপে রাজা ত্রিপক্ষীয় আলোচনায় একটি সমঝোতায় আসতে বাধ্য হন। ৮ মে ১৯৭৩ সালে অনুষ্ঠিত এ মিটিংয়ে উপস্থিত ছিলেন ভারতীয় পররাষ্ট্রসচিব কেওয়াল সিংহ এবং ভারত সমর্থিত তিনটি পার্টি সিকিম ন্যাশনাল পার্টি, সিকিম ন্যাশনাল কংগ্রেস ও জনতা কংগ্রেস। রাজা এগ্রিমেন্ট স্বাক্ষর করতে বাধ্য হন। এর আগের মাসে এক নাগাড়ে ১০ দিন আন্দোলন চলে গণতন্ত্রের সপক্ষে।

মজার কথা, এই হাজার হাজার আন্দোলনকারীকে গ্যাংটকের পালজোর স্টেডিয়ামে আটকে রেখে ইন্দিরা গান্ধী জিন্দাবাদ স্লোগান উঠাতে বাধ্য করা হয়। এ আন্দোলনের শেষ দিন ভারত বি এস দাশকে পলিটিক্যাল অফিসার হিসেবে নিযুক্তি দিলে সিকিমের তিন পার্টি আন্দোলন উঠিয়ে নেয়। এর কয়েক দিন আগে রাজার কাছে খবর এসেছিল এ তিন পার্টির জয়েন্ট অ্যাকশন (জেএসি) কমিটি ১৫ হাজার মানুষের এক কর্মী বাহিনী নিয়ে সংখোলা থেকে গ্যাংটকের দিকে এগোচ্ছে। ভীত রাজা ভারতের সাহায্য চাইলেও এদিকে জেএসিও ইন্দিরা গান্ধীর কাছে টেলিগ্রাম পাঠাল তাদের কর্মকাণ্ডের ফিরিস্তি দিয়ে এবং এর সঙ্গে সিকিমে হস্তক্ষেপের আবেদন জানালো। এরপর ভারতের জন্য সিকিমে হস্তক্ষেপ করার বিরুদ্ধে আর কোনো বাধাই রইল না। অর্থাত্ ভারতের তিন দশকের পরিকল্পনা, অর্থ ব্যয় এবং আনুষঙ্গিক কর্মকাণ্ড সার্থক হলো। বিশ্লেষকরা তাদের লেখনীতে এসব তথ্য তুলে ধরেছেন।

নির্বাচনে জিতে ২৭ মার্চ, ১৯৭৫ প্রথম কেবিনেট মিটিংয়ে প্রধানমন্ত্রী লেন্দুপ দরজি রাজতন্ত্র বিলোপের এবং রেফারেন্ডামের সিদ্ধান্ত নিলেন। চারদিন পর সারা দেশের ৫৭টি স্থান থেকে ফলাফল এলো। জনগণ রাজতন্ত্র বিলোপের পক্ষে। কৃষিমন্ত্রী কেসি প্রধান অবশ্য বলেছেন, পুরো ব্যাপারটাই সাজানো। ভারতীয় সেনাবাহিনী বন্দুকের মুখে ভোটারদের `হ্যাঁ ভোট দিতে বাধ্য করেছিল। অনেক লেখক বলেছেন, রাজা পালডেন তার রাজত্বের প্রথমদিকে নেহরুর নির্দেশে রাজতন্ত্র বিলোপের লক্ষ্যে তথাকথিত গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ধাক্কা দিল্লির সহায়তায় উের গেলেন। তখন দিল্লিকে পরম সুহৃদ ভাবতে থাকলেন। তাই চীন বলল, ‘যদি ভারতীয় বাহিনী তাকে আক্রমণ করে, তাদের সাহায্য চাইলে ভারত সীমান্তে চীন ও পাকিস্তানের সেনা সমাবেশ ঘটিয়ে ভারতীয় আগ্রাসন বন্ধ করা যাবে। সুধীর শর্মা লিখেছেন, রাজা পালডেন যখন বুঝতে পারলেন তখন আর কিছুই করার ছিল না। অবশ্য অনেকেই সিকিমের এ বিপর্যয়ের জন্য রানী এবং লেন্দুপের স্ত্রীকে খানিকাংশে দায়ী করে থাকে। তবে বিশ্লেষকরা এ মতকে আমলে নেননি।

হিমালয়ের পাদদেশের তিনটি রাজ্যের ‘প্রটেক্টরেট’ অবস্থানকে সে দেশের ক্ষমতাবানরা মেনে নিয়েছিল। তবে ভারতের ক্রমবর্ধমান চাপ তিনটি দেশকে ক্রমেই একে অন্যের কাছে নিয়ে আসতে থাকলে ইন্দিরা গান্ধী প্রমাদ গোনেন। তাই পরিকল্পনাকে একটু পরিবর্তন করেন। কাঠমান্ডু পোস্টে ৩ জুন ১৯৯৭ ‘ভুটানিজ সিন্ড্রোম’ নামে এক নিবন্ধে প্রচলিত ধারণা যে, সিকিমে নেপালি ভারতীয়রা সব ঘটনার জন্য দায়ী। তা সত্য নয় বলতে গিয়ে দাবি করা হয়, তিনটি দেশের অভ্যন্তরীণ গোলযোগের জন্য ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার এবং তাদের অর্থ ও তাদের কিছু বশংবদ দায়ী। কাজী লেন্দুপ দরজির নেতৃত্বে এ বশংবদরা পরবর্তীকালে ঘটনা বিপরীতমুখী করতে চাইলেও তা সম্ভব হয়নি। লেন্দুপ দরজি ও তার বিদেশি স্ত্রীকে কালিমপং—এ অবশিষ্ট জীবনের তিন দশক দেশবাসীর নিন্দা, ঘৃণা এবং ভারতের অবহেলার বোঝা বয়ে বেড়াতে হয়। কাজী লেন্দুপ এক সাক্ষাত্কারে সুধীর শর্মাকে বলেন, আমি ভারতের জন্য এত করলাম, এমনকি দেশটিও দিয়ে দিলাম। তার প্রতিদানে তারা আমায় এত অবহেলা করল। কাজ হয়ে গেলে পর ভারত কীভাবে তাকে ছুড়ে দেয়, সে বেদনার কথা লেন্দুপ শর্মাকে জানান। প্রথমে তাকে লাল গালিচা সংবর্ধনা দেয়া হতো। কিন্তু কাজ ফুরালে দেখা যায় লেন্দুপকে সপ্তাহের পর সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হতো একটি সাক্ষাত্কারের জন্য, যেন দ্বিতীয় শ্রেণীর নেতা। এ যেন কাজের সময় কাজি আর কাজ ফুরালে পাঁজি।

অনেকেই বলেছেন, সিকিমের ব্যাপারে ভারত ১৯৭১ সালের লক্ষ্য পরিবর্তনের কারণ বিশ্বপরিস্থিতি এবং প্রতিবেশী দেশের চলমান ঘটনাবলী। তাই এ সময় সিকিমে আন্দোলনের ধারাকে বেগবান রাখতে হয়েছে শুধু। সুধীর শর্মার মতে, বাংলাদেশের ১৯৭১ সালের অভ্যুদয় এবং ১৯৭৪ সালে ভারতের পারমাণবিক অস্ত্রের সাফল্যের কারণে দিল্লিকে আর তার ইমেজের ব্যাপার নিয়ে ভাবতে হয়নি। সে সিকিম দখল করে নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয়। বিশেষ করে ভুটানের জাতিসংঘের সদস্যপদ প্রাপ্তি এই সিদ্ধান্তকে ত্বরান্বিত করতে সাহায্য করে। ভুটানের জাতিসংঘের সদস্য প্রাপ্তিকে ভারতের সহজভাবে না নিয়ে উপায় ছিল না। স্বাধীন বিশ্বে বিশেষ করে নিরপেক্ষ বলয়ের নেতৃত্বে এমনকি তার গণতান্ত্রিকতার দাবিতে চিড় ধরত। বাংলাদেশকেও তাকে সাহায্য করতে হয় স্বাধীনতাকামী হিসেবে। তার একটিই ভয় ছিল, বাংলাদেশ ও ভুটানকে অনুসরণ করে যদি সিকিম জাতিসংঘের সদস্যপদ দাবি করে। ইন্ডিয়ার এ আগ্রাসনকে চীন মেনে নেয়নি। তবে দেখা যায়, বিবিসির বরাতে একটি শর্তে তারা তা মেনে নেয়ার অঙ্গীকার করে। ২৪ জুন ২০০৩ বিবিসি নিউজে বলা হয়, ইন্ডিয়া যদি তিব্বতের ওপর চীনের কর্তৃত্ব স্বীকার করে, তবে তারা সিকিমকে মানতে পারে। নয়তো কোনো অবস্থাতে এ আগ্রাসনকে তারা মেনে নেবে না।

মালয় কৃষ্ণধর ছিলেন ভারতের সাবেক ইনটেলিজেন্স ব্যুরোর একজন জয়েন্ট ডাইরেক্টর। তার একটি সুস্পষ্ট অভিমত ছিল সে (লেন্দুপ দরজি) না থাকলে সিকিম কখনোই ভারতের অংশ হতে পারত না|কাজি লেন্দুপ ছিলেন একজন নেপালি বংশোদ্ভূত। কৃষ্ণধর দিল্লির চাতুর্যের প্রামাণ্যতা বিশেষ করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে, তার যুবক বয়স থেকেই তিনি লক্ষ্য করে আসছেন বলে মন্তব্য করেন। ১৯৭৫ সালে অন্যায়ভাবে কংগ্রেস বিশেষ করে সঞ্জয় গান্ধী দরজিকে বাধ্য করে তার পার্টিকে ইন্ডিয়ার জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে মিশিয়ে দিতে। কাজী প্রথমে কিছু ইতস্তত করলেও সরকার ও তার সহযোগীরা তাকে এ কাজে বাধ্য করে, যার জন্য জনতা পার্টির সঙ্গে তাকে মিশে যেতে হয়। খুব অল্প সময়ের মাঝে তার আধিপত্য শূন্যতে নেমে আসে। ১৯৮০ সালে ইন্দিরা গান্ধীর ক্ষমতা দখলের পর তিনি আক্ষেপ করছিলেন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাত্কারের। কিন্তু তাকে একটি ডাস্টবিনের ময়লা কাগজের মতো ছুড়ে ফেলা হয়। ওই সময়ের চিত্র মালয় কৃষ্ণধর তার লেখনীতে তুলে ধরেন। তার কথাতে এই সেই লেন্দুপ দরজি যিনি কাঞ্চনজঙ্ঘার মতো এরকম একটি মূল্যবান রত্ন তার পরবর্তী পরিবেশ পরিস্থিতির কারণে ওদের হাতে তুলে দিতে বাধ্য ছিলেন। মালয় কৃষ্ণধর দরজিকে ওপরে তুলে ধরতে চেয়েছেন এবং ভারত সরকারকে তার মর্যাদা দিতে উৎসাহ দিয়ে গেছেন তার লেখনীতে।

এদিকে নেপালেও রাজতন্ত্রের অবসান ঘটেছে ঠিক একই পদ্ধতিতে। যদিও দেশটি টেকনিক্যালি এখনও স্বাধীন। তবে এখানে সাত পার্টির জোট ও মাওবাদীরা সর্বতোভাবে দিল্লির ওপর নির্ভরশীল। ইংরেজি আদ্যাক্ষর হিসেবে অনেকে এর নাম দিয়েছে ‘স্প্যাম’ (সেভেন পার্টি অ্যালায়েন্স অ্যান্ড মাওইন্ট) গত নির্বাচনের আগে গিরিজা প্রসাদ কৈরালার নেপাল কংগ্রেস ও সিপিএম ইউএমএল দিল্লিতে গিয়ে তাদের কর্মপদ্ধতি প্রণয়ন করলে বিশ্লেষকরা বলেন, এটা আর একটি সিকিম সিনড্রোম, যেখানে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের কর্মপদ্ধতির সিদ্ধান্ত নিতে স্বদেশ ভূমিকে ব্যবহার করে না। তারা বলেন, এই ‘স্প্যাম’ পলিটিক্যাল অলিগার্কি বা রাজনৈতিক অভিজাততন্ত্র পছন্দ করে, জনগণের গণতন্ত্র নয়। ঠিক একই লক্ষ্য দিল্লিরও। তারা জনগণ নয়, রাজনৈতিক দলের আনুগত্য কামনা করে। তারা প্রতিটি রাজনৈতিক দলে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় লাইন অব ইনহেরিটেন্স রাখে। একটির পতন হলে অন্যটি সে স্থান পূরণ করে। একজন ভুটানি বিশ্লেষক কাঠমনডু পোস্টে সমপ্রতি এক নিবন্ধে সতর্ক করেছেন এই বলে যে, বর্তমানের ভুটান নেপালের রাজনৈতিক গোলযোগ যদি ঠাণ্ডা মাথায় সমাধানের চেষ্টা না করে, তাহলে এটি ভুটানিজ সিনড্রোম হবে এবং এর পরিণতি হবে সিকিমের মতো। লেখক আরও বলেছেন, গত ছয় দশকের নানা কর্মপন্থায় আঞ্চলিক, আন্তর্জাতিক, দেশীয় ষড়যন্ত্র ও হটকারিতায় যে কর্মকাণ্ড চলছে, তা বিরতিহীন। এসব কর্মকাণ্ড সমগ্র অঞ্চলকেই এক কাতারে আনবে, যদি এখনই এসব কর্মপন্থায় সংযুক্ত নটনটীরা সতর্ক না হয়। পরিণামে সবাই হবে কাজী লেন্দুপ দরজি, যার পার্টি ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে একটি সিটও পায়নি। যদিও মাত্র ৫ বছর আগে তারা পার্লামেন্টে ৩২ সিটের ৩১টি সিট দখল করেছিল। ইতিহাস তাকে আঁস্তাকুড়ে ফেলে দিলে, ভুটানিজ সিনড্রোমের লেখক সতর্ক করে দিলেন। ৪০০ বছরের পুরনো একটি ইতিহাসের সমাপ্তি এভাবেই ঘটে। এভাবেই লেন্দুপ দরজি তার মাতৃভূমিকে ভারতের কাছে তুলে দেন।

বিশাল মানচিত্রের দেশ ভারত প্রতিবেশীর প্রতি কী করছে বা করতে পারছে, এ তার উত্তম উদাহরণ মাত্র।
সামন্ততন্ত্র থেকে বেরিয়ে এসে গণতন্ত্রের ছায়াতলে ঢুকতে পারলে সেটি প্রগতির কথাই বলত। লেন্দুপ সেটি করতে পারতেন। কিন্তু যখন ব্যক্তির লোভ, পদের লোভ বড় হয়ে দেখা দেয়, তখন আর কোনো ফয়সালাই মুক্তির পথ বাতলে দিতে পারে না। ‘দি ইল্লিগ্যাল অকুপেশন অব সিকিম বাই ইন্ডিয়া—থার্টিফাইভ ইয়ার্স অব অপ্রেশন’ অর্থাৎ ‘সিকিমে ভারতের অন্যায় আগ্রাসন—৩৫ বছরের নির্যাতন’ কলামটি ছাপে ২০০৯ সালের অক্টোবরের ১৭ তারিখে মইন আনসারী। ৩৪ বছর আগে যখন ভারতীয় সেনারা সিকিমের রাজধানী গ্যাংটকে তাদের কর্তৃত্ব চালায় তখন গোটা বিশ্বের সচেতন অংশ ঘুমিয়ে ছিল এবং সে দিন থেকে সবাই ঘুমিয়ে আছে। যেখানে তিব্বতের কারণে দেখা যায় পশ্চিমের অনেক বিবেচনা কাজ করে, সেখানে এই নিরীহ জাতি গোষ্ঠীর মানুষের জন্য কারও কোনো চেতনা নেই, কোনো বিতণ্ডা নেই, যার ফলাফল ভারত তার উদরে ঢুকিয়ে নিল। ব্যারিস্টার মুনশি তার বইয়ে এ বিষয়টি অনেক আগেই আলোচনা করে সুস্পষ্ট করে বলেছেন যে, এটি ‘র’ এর কাণ্ড। গোটা বিশ্ব ভুলে গেছে সিকিমের কথা। দক্ষিণ তিব্বতের কিছু অংশ কেমন করে দিল্লি দখল করে নিল তার ব্যাপারেও বিশ্বের কারও দায় নেই। ভুটানের ভাগ্যেও হয়তো তাই অপেক্ষা করছে। ভারতের এ ক্ষুধার যেন নিবৃত্তি নেই। প্রতিবেশীর প্রতি ভারতের এরকম নীতির একটি ফয়সালা হওয়া উচিত। দিল্লির এটা শেখা উচিত যে আগ্রাসনের কোনো শোধ নেই। একটি নিরীহ শান্তিপ্রিয় জাতিকে এভাবে তারা কুক্ষিগত করে রেখেছে। ভারত তার ৪৫০ মিলিয়ন দলিতকে এবং নিম্ন বংশোদ্ভূত মানুষকে অস্পৃশ্য বলে দূরে ঠেলে রেখেছে। বিভিন্ন ধরনের অর্থনৈতিক বন্ধনে তাদের বেঁধে রাখা হয়েছে। সিকিম তার মূল পরিচিতি ও তার স্বকীয় স্বাধীনতা হারিয়েছে। কঠোর ব্রাহ্মণ্যবাদের যাঁতাকলে বৌদ্ধ অনুসারীরা আজ বেয়নেটের মুখে নির্বাক।

ভারত সরকার অবশ্য সিকিম দিয়ে দেয়ার ২৭ বছর পর লেন্দুপ দরজিকে ‘পদ্মভূষণ’ পদবি দেয় এক অনাড়ম্বর পরিবেশে সান্ত্বনা হিসেবে ২০০২ সালে এবং ১৯৭৪ সালে সিকিম সরকার তাকে ‘সিকিম রত্ন’ পুরস্কারে ভূষিত করেছে। এরকম প্রাপ্তির পরও লেন্দুপ ও তার স্ত্রী এলিসা কালিংপনে তাদের জীবনের শেষ সময় কাটান চরম গ্লানিময় অনুতাপের মাঝে। ১৯৯০ সালে তার স্ত্রীর মৃত্যুর পর লেন্দুপ একাকী বসবাস করতে বাধ্য হন। তার কোনো ছেলেপেলে বা কোনো আত্মীয়স্বজন তার দায়-দায়িত্ব নেয়নি। জনতার ঘৃণা, ক্ষোভ ও বেদনার ঘোর কাটাতে তিনি তার নিজেকে লজ্জাজনক মৃত্যুর দিকেই ঠেলে দেন। অতঃপর পরিপূর্ণ ১০৩ বছর বয়সে তার মৃত্যু হয়। বলা হয়ে থাকে এ মূল নাটক মঞ্চস্থ করতে লেন্দুপের দুই স্ত্রী কম-বেশি জড়িত ছিলেন। ফার্স্ট লেডি হওয়ার স্বপ্নে বিভোর এ নারীরা ক্ষমতাকেই বড় করে দেখেছেন। এ লড়াইয়ে চ্যাগল রাজা ও কাজী লেন্দুপের লড়াইই মুখ্য ছিল না। এর মাঝে ইতিহাসের আরেক উল্লেখযোগ্য নারী এসে হাজির হন তিনি হলেন ভারতের ইন্দিরা গান্ধী। এই তিন নারীর কোপে পড়ে সিকিম আজ এক অনন্য উদাহরণ হয়ে ইতিহাসের সাক্ষী গোপাল হয়ে আছে। এ ইতিহাস থেকে শেখার অনেক কিছুই আছে, তবে যদি সচেতন জাতিরা বাঁচতে চায় এবং মিথ্যা ছলনার সাজানো ভেড়ার ঘরে ঢুকতে না চায়, চোখ-কান খোলা রেখে পর্যালোচনা করলে সিকিমের ভূমিকম্পসহ ‘পেইন অব লুজিং এ নেশন’ মানচিত্রের অনেক লুকানো বেদনা উন্মোচন করতে সক্ষম হবেন। এতে সত্যও উন্মোচিত হবে এবং নিজের অস্তিত্বও বিপন্ন-দশা থেকে মুক্তি পাবে।

 

নাজমা মোস্তফা,  Published in Amar Desh, September 25, 2011 (Re post)

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

Tag Cloud

%d bloggers like this: