Articles published in this site are copyright protected.

ওড়না বিতর্ক: ক্লাস ওয়ানের পাঠ্যসূচিতে ওড়না বিরোধী পক্ষরা খুব ক্ষেপেছে ও- তে কেন ওড়না হবে, কেন ও-তে অন্য কিছু নয়? তাদের কথাতে মেয়েটিকে এ দিয়ে নারী নির্যাতন করা হয়। তবে ওড়না শব্দটি শুধু মেয়ে নয়, ছেলেও শিখবে। এদেশের ছেলেপেলে ওটি বই এ না পড়লেও জানে ও চিনে। একটি মুসলিম অধ্যুষিত দেশে ও – তে ওড়নাই তো হতে হবে। এটি নারী জাতির উপর আল্লাহর স্পষ্ট নির্দেশ। এটি শালীন থাকার একটি প্রাথমিক পদক্ষেপ, সে যে একটি শালীন মেয়ে এটি তার প্রথম চিহ্ন। এখন বাংলাদেশের শিক্ষাবিদরা যদি বলেন এটি হেফাজতের কারসাজি। তাহলে কি বলবেন আল্লাহ হেফাজতের নির্দেশে কুরআন সাজিয়েছেন! জাতির নব্য মেধাবীদের দ্বারা ছাগল গাছে চড়লেও (কথা কম) ওড়না নিয়েই যত টানাটানি করতে দেখি ছলবাজদেরকে। মুক্তির ধ্বজাধারী বিজাতীয় ভাবধারাতে উদ্ভাসিত নারীরা ওড়নাকে নারী ধ্বংসের হাতিয়ার ধরে নিয়ে কলাম লিখছেন। কারণ সাম্প্রতিক ২০১৭ সালে পাঠ্যবইএ অনেক অবান্তর সংযোজন হয়েছে যা যে কোন সচেতনকে শংকিত করে তুলবে। এসব অনাচারকে যারা ধরেছেন তারা শুধু ধর্মের প্রশ্নে নয়, নীতির প্রশ্নেই ধরেছেন। যার প্রেক্ষিতে সরকার তা পুনমুদ্রণ করার উদ্যোগও নেয়, নয়তো চারপাশে হাজার অনাচারে দক্ষ সরকার কখনোই পুনমুদ্রন করতো না। অনেকে ওড়নাকে দেখছেন নারীর গলার ফাঁস হিসাবে, শারমিন শামস, কাওসার আলম নামধারী মুসলিমদের কলামেও বিষোদগার এসেছে। কেউ লিখছেন “ও-তে আড়াই গজি ওড়না মানে বাঙ্গালীর যৌনবস্তু নারীর মুক্তির স্বপ্ন” / কেউ লিখছেন “হঠাও ওড়না বাঁচাও দেশ”, বিক্ষুব্ধ তারা কারণ ওড়না দিয়ে নারীরা তাদের যৌবন ঢেকে রাখার প্রাথমিক সবক পায়। শারমিন লিখেছেন কলকাতার রাজপথে বহু রাত অবদি মেয়েদের অবাধ স্বাধীনতা দেখে তিনি মোহিত ও উৎফুল্ল হয়েছেন।

তার অতি উৎসাহ দেখে আমিও মনে করতে পারছি ৮৪ সালে ভারত ভ্রমনের এক ঘটনা। আমাদের গাড়ীটি সকাল ৯/১০টার দিকে একটি স্কুলের সামনে গিয়ে থামে। আমি গাড়ীতে বসা ছিলাম আমার দু বাচ্চাসহ, দেখছিলাম স্কুলের মেয়েরা সারিবেধে যাচ্ছে। অনেকেই পরেছে সবুজ পেড়ে সাদা শাড়ী ও ব্লাউজ, আর অনেক প্রাপ্ত বয়স্ক মেয়েরা একই সাথে ফ্রক ও হাফপেন্ট পরেছে। যা আমার চোখে শেলের মতই বিঁধে, অর্থাৎ খারাপ লাগে। দেশে ফিরে আসলে আমার এক হিন্দু সহকর্মী খুব উৎসাহ নিয়ে প্রশ্ন রাখেন কেমন দেখলেন ভারত। তার জবাবে আমার খারাপ লাগা বিয়ষটিই তাকে বললাম যা আমাকে বিচলিত করেছিল কারণ যারা শাড়ী পড়েছিল তাদের উপর দিক ছাড়াও পেটপিঠ প্রায় আধহাত বরাবর সবই উদোম খোলা, আর বাকীরা যারা ফ্রক পরেছে তারাও হাফ নেকেড। উপর নীচ সবই খোলা, মাঝখানের কিছু অংশে সভ্যতার দাগ ছিল। সবচেয়ে উৎকট লেগেছিল যে এরা প্রায় সবাই ছিল কালো মেম, সেদিন মন্তব্য করেছিলাম হয়তো সাদা মেম হলে কিছুটা ভালোই লাগতো কিন্তু কালো মেমদেরে আমার চোখে মোটেও ভালো লাগে নাই। মেম হওয়ার কথাটি এ জন্য বলা, মনে হচ্ছিল উদোম হয়ে এখানে বিলেতি মেম হওয়ার একটি প্রয়াস ছিল হয়তো বা। সেদিন একটি ওড়না থাকলেও তাদেরে দেখতে অনেক শোভন লাগতো। এসব হচ্ছে সভ্যতার দাগচিহ্ন, মানুষের বিশাল অর্জন এসব, মানুষ পোশাকহীন হয়েই জন্মায় কালে শালীনতা, সভ্যতা, মানবতা ও পরিশিলিত ধর্মের বদৌলতে মানুষ পশু থেকে উন্নত প্রজাতির রুপ পায়। বাংলাদেশ থেকে আসা আমার অনভ্যস্ত চোখে তা বেখাপ্পাই লাগছিল, বন্যতা মনে হচ্ছিল। এরা ৯৫% মুসলিম দেশে এভাবে অনাচারের লালন করতে চাচ্ছে। ওড়না বিতর্ক যা দেশে তোলা হয়েছে তা কিছু অতি উৎসাহী হিন্দুবাদী জনতাসহ মুক্তমনের নামে কিছু মুসলিম নামধারী বিরোধীরাও ঐ বিতর্কে যোগ দিয়েছে।

হিন্দুধর্ম ও স্তনকর:  আজকে নারীরা ওড়না দিয়ে তাদের শালীনতাকে ঢাকতে পারছেন মার্জিতভাবে। ওড়না বিতর্কের কলাম লেখকদের জানাতে চাই তারা কি জানেন একদিন এই উপমহাদেশে কয়েক শত বছর আগে মেয়েরা উর্ধাংশে কোন কাপড় পরিধান করতে পারতেন না। ভারতের কেরালা অঙ্গরাজ্যে হিন্দুদের “স্তনকর” দিতে হতো। এর প্রধান কারণ “জাতিগত বিভাজন” যা ইসলাম স্বীকার করে না। এটি ছিল হিন্দুদের অনেক বড় দাঙ্গার রসদ, এবং সেটি আজো সচল আছে। সেখানে শুধু ব্রাহ্মণরা ঢেকে রাখার অধিকার পেত। তাও এক টুকরা সাদা কাপড়ে ঢেকে রাখতো মাত্র। বাকী হিন্দুরা ওটি উন্মুক্ত রেখেই চলাফেরা করতো। আর যদি কোন নাদান নীচ বর্ণের হিন্দু ওটি ঢেকে রাখতে চাইতো তবে তার স্তনের সাইজের উপর একটি টেক্স জমা দিতে হতো টাকশালে। ১৮০৩ সালে এক প্রতিবাদী মহিলা ওটি ঢেকে রাখে। যখন টাকশালের লোক টেক্স চাইতে আসে, তিনি ওটি দিতে অস্বীকার করেন। বিনিময়ে অগ্নিমূর্তি সে মেয়ে সেদিন তার স্তনদুটি কেটে পাতায় মুড়ে তাদেরে লাভেমূলে টেক্সসূত্র উপড়ে ফেলে বুঝিয়ে দেয়। এতে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মহিলার মৃত্যু হয়। এর সূত্রে অনেক অনেক দাঙ্গা হয় ভারতে, ১৮৫৯ সালের দাঙ্গা “কাপড়ের দাঙ্গা” নামেও পরিচিতি পায়। হিন্দু শাস্ত্রকারদের কথা ছিল নীচবর্ণের হিন্দুদের বুক ঢেকে রাখা ধর্ম বিরোধী। এ ঘটনার তীব্র কষাঘাতের সূত্রে তারা কিছুটা পথ পায় ও ক্রমে ওটি রহিত হয়। দেখা যায় উনবিংশ শতকের বিশাল সময় জুড়ে (১৮০৩-১৮৫৯) এর প্রচন্ডতা ছিল তার মানে এ অপকর্ম ওখানের বহু শতাব্দী পূর্ব জিইয়ে রাখা অনাচার। কিন্তু ইসলামের কোন মেয়েকে প্রায় দেড় হাজার বছর থেকে কোন দিনই এসব মোকাবেলা করতে হয়নি। যখন মোগলরা ভারতে আসে তাদের মহানুভবতায় অনেক হিন্দুরা বাঁচার পথ খুঁজে পায়। সাথে সাথে হিংসার বশবর্তী হয়ে বর্ণবাদী হিন্দুরা প্রচার করে এরা  ধর্মান্তর করে মুসলিম করে ফেলছে। যার কৌশলী দায় থেকে আজো জাকের নায়েকরা নিস্তার পাচ্ছেন না। বস্তুত ভারতবর্ষ মুসলিম মানসের ঋণ স্বীকার করে না, কিন্তু ঐ ধর্মই তাদের মানব অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে, এটি বলা কোন অতি রঞ্জন নয়।

মনে রাখার  বিষয়, কুরআনে সুস্পষ্ট নির্দেশ ছাড়া কোন অবান্তর কথা নেই। কুরআন বলে, “হে প্রিয় নবী! তারা যেন তাদের বহির্বাস থেকে তাদের উপরে টেনে রাখে। এটিই বেশী ভাল হয় যেনো তাদের চেনা যায় তাহলে তাদের উত্যক্ত করা হবে না। আর আল্লাহ পরিত্রাণকারী অসীম কৃপানিধান। যদি মোনাফেকরা ও যাদের অন্তরে ব্যাধি রয়েছে তারা আর শহরে গুজব রটনাকারীরা না থামে তাহলে আমরা নিশ্চয়ই তোমাকে তাদের উপরে ক্ষমতা দেব, তখন তারা সেখানে তোমার প্রতিবেশী হয়ে থাকবে না অল্পকাল ছাড়া” (সুরা আল আহযাবএর ৫৯/৬০ আয়াত)। বস্তুত এভাবে ৯৫% মুসলিম অধ্যুষিত দেশে শারমিন শামস, কাওসার আলমরা বাস্তবে নারীর সাথে নয়, আল্লাহর সাথে যুদ্ধ ঘোষনা করেছে। সৃষ্টিকর্তার চেয়েও বড় নারী দরদী তারা। অতএব যে কেউ ঈমান আনে ও সৎ কাজ করে তাদের উপরে থাকবে না কোন ভয়ভীতি, আর তারা করবে না অনুতাপ। আর যারা আমাদের নির্দেশাবলীতে মিথ্যারোপ করেছে, শাস্তি তাদের পাকড়াও করবে যেহেতু তারা দুষ্কৃতি করে যাচ্ছিল” (সুরা আল-আনআমএর ৪৮/৪৯)। আল্লাহর বাণীতেই ওড়না বিতর্কের এখানেই শেষ টানছি।

 

নাজমা মোস্তফা

জানুয়ারী ০৭, ২০১৭।

 

Advertisements

Tag Cloud

%d bloggers like this: