Articles published in this site are copyright protected.

ভারতের পার্শ্ববর্তী একটি অঞ্চল কাশ্মীর, এবং তার জনতারা সেখানে খুব একটা প্রশান্তিতে নেই, তা সারা বিশ^ জানে। “কাশ্মীর ভারতের নয়, হাইকোর্টের ঐতিহাসিক রায়”  ১৭ অক্টোবর ২০১৫ তারিখে প্রকাশিত রিপোর্ট। জম্মু কাশ্মীর ভারতের অংশ নয় এমনই ঐতিহাসিক রায় দিয়েছে জম্মু কাশ্মীরের হাইকোর্ট। সংবিধানের ৩৭০ ধারা অনুযায়ী এ ঘোষনা দেয় হাইকোর্ট। বিচারপতি হোসাইন মাসউদ ও রাজ কতোয়ালের যৌথ বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করে। রায়ে বলা হয়, জম্মু কাশ্মীর স্বতন্ত্র রাষ্ট্র। এটি কখনো ভারতের সঙ্গে একীভূত হবে না। এ বিষয়ে হুররিয়াত নেতা শিব্বির আহমদ শাহ বলেন, বিভক্তির আগেও কাশ্মীর ভারতের অংশ ছিল না। এখনো ভারতের অংশ হতে দেবো না (উৎস: জিওটিভি)।

১৯৪৭সালের ১৪ই আগষ্ট আমরা নিজেরা স্বাধীনতা দিবস পালন করেছি পাকিস্তানে আমাদের শৈশব কৈশোর জুড়ে। আমরা জানতাম ১৫ই আগষ্ট ভারতের আর ১৪ আমাদের। কিন্তু এখন জানলাম কোন এক বিশেষ কারণ এর অনেক বছর পর ভারত ২৬ জানুয়ারী ১৯৫০ তাদের প্রজাতন্ত্র দিবস হিসাবে পালন করে। ১৯৪৮ সালের ২১ জুন পর্যন্ত বৃটিশরা বহাল থাকে। হাতে কলমে শিক্ষার একটি প্রভাব খুব কার্যকর বলেই জানি, যাকে বলা হয় প্র্যাকটিকাল ক্লাস করা। এরকম কোন প্র্যাকটিক্যাল ক্লাসের জন্য পন্ডিতরা শিষ্যের আবদারে এক বছর বেশী থাকেন। প্রকৃতপক্ষে প্রায় আড়াই বৎসর পর তারা পুরাপুরি শিক্ষালাভ করে বৃটিশকে বিদায় দেয়। ইত্যবসরে গভর্নর জেনারেল লর্ড মাউন্টব্যাটন ও পরে রাজা ষষ্ঠ জর্জ ঐ শূণ্যস্থানের পন্ডিত হিসাবে বহাল থাকেন। বৃটিশের কবজায় ভারত ছিল পরাধীন, বাকী প্রতিপক্ষরা শত্রুর ভূমিকায় ছিল। ওটি মুসলিম ইতিহাসের দিকে বিচার করলে দেখা যায় বৃটিশ আর মুসলিমরা প্রতিপক্ষ কিন্তু হিন্দুরা সব সময় প্রতিপক্ষ নয়। সময়ে বন্ধু, একত্ব সহযোগিতায় বৃটিশ বন্দনাতে মগ্ন। তারা গাইছে “জনগণ মন অধিনায়ক জয় হে ভারত ভাগ্য বিধাতা!” আর মুসলিম পক্ষ বিদ্রোহে কারাগারে প্রহর কাটায়। মুসলিমরা এক আল্লাহর এবাদত করে যা বাকী বিশে^র শত্রু সবদিন, আজো তার ব্যতিক্রম নয়। বাকি বিশ^ একাধিক প্রভুর মর্যাদাকে সমুন্নত রাখতে সোচ্চার। মূলত বিশে^র গোটা লড়াই এক অদেখা কর্তার অস্তিত্বের লড়াই। ১৯৪৭এর লড়াই ছিল একের অস্তিত্বের লড়াই।

বৃটিশ মাঝখানে এমন এক বন্টনের আয়োজন করে যেখানে যুগ যুগ ব্যাপী ঐ সংঘাত বহাল থাকে। হিন্দু মুসলিমের যুদ্ধ যেন কোনভাবে শেষ না হয়, ওটি টিকে থাক শতাব্দীর পর শতাব্দী। ঐ চক্রান্তে বৃটিশ উৎসাহী থেকেছে। আর বন্টনের নামে হিন্দু মুসলিমকে তার প্রতিপক্ষ মনে করে ধূর্ততার পার্ট প্লে করে গেছে। বাংলার জগৎশেঠ, উমিচাঁদ, রায়বল্লভ এক সূতায় গাথা, এক সৃষ্টিকর্তার বাণী তাদের কোনদিন স্পর্শ করেনি, তাই আদর্শ সুদূর পরাহত। বিশাল ভারতবর্ষ ৫৬২টি রাজা মহারাজা নওয়াব নিজাম নামে ভারতের অঞ্চল রাজ্য ছিল। সেদিন যার যার ইচ্ছামত যে কোন ভাগে যোগ দেয়ার স্বাধীনতা তাদের দেয়া হয়। কাশ্মীর ছিল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ, তাই কাশ্মীর কোনদিকে যাবে সেটি সবার জানা। কিন্তু ধূর্ত বৃটিশ এটি অংকের হিসাবে রেখেই আগে থেকেই রাজা করে রাখে অমুসলিম হরিসিংকে। হরিসিং সাজানো পাতানো নাটক অনুসারে যা করার তাই করে। লর্ড মাউন্টব্যাটন এ কাজে প্রধান ভূমিকায় থাকেন। ঐ ভাগের কিল আজো জমে আছে কাশ্মীরীদের ভাগে। ভারত পাকিস্তান ভেংগে বাংলাদেশ বানাতে আগুয়ান কিন্তু কাশ্মীরীদের ভাগ্যে বাংলাদেশের মত শিকে কখনোই ছিড়ে না, কেন? এসব ক্ষেত্রে জাতিসংঘের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে আছে। ভারতের ইতিহাসে মুসলিম বলির ইতিহাস ভয়ংকর।

কাশ্মীরে ইসলামের আগমনঃ (ইকো অব ইসলাম)। বিশ্বের যে সব জায়গায় প্রচন্ড বিতর্কীত যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে, কাশ্মীর তার একটি। এ দেশটি সম্বন্ধে কিছু তথ্য, কাশ্মীর এখনো ভারতের দখলে। তার আয়তন ২লাখ ২২হাজার বর্গকিলোমিটার। এর দুই তৃতীয়াংশ (এক লাখ ৩৮হাজার বর্গমাইল) জম্মু ও কাশ্মীর নামে পরিচিত। জাতিসংঘ কর্তৃক গণভোট অনুষ্ঠানের মাধ্যমে কাশ্মীরের মর্যাদা নির্ধারণের ফয়সালা দেয়া সত্ত্বেও তাদের আন্দোলনকে জোর পূর্বক দমন করে ভারত কাশ্মীরকে তার করায়ত্ত্ব করে রেখেছে। কাশ্মীরের অবশিষ্ট অংশ আজাদ কাশ্মীর নামে পরিচিত। আজাদ কাশ্মীর নিয়ন্ত্রণ করছে পাকিস্তান। এর আয়তন হচ্ছে ৭৯ হাজার ৭শ’৭৮ বর্গকিলোমিটার। বর্তমানে লাদাখ নামে পরিচিত ৪১ হাজার ৫শ’ কিলোমিটার চীনের দখলে রয়েছে। ১৯৬২ সালে ভারত ও চীনের মধ্যকার যুদ্ধের পর লাদাখ চীনের করায়ত্ত্বে চলে যায়। ভারত অধিকৃত কাশ্মীরের উত্তর ও পূর্বদিকে চীনের অবস্থান। কাশ্মীরের উত্তর পশ্চিমে আফগানিস্তান এবং এর পশ্চিম দিকে রয়েছে পাকিস্তান। নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য কাশ্মীর ভূস্বর্গ হিসাবে পরিচিত। ১৭শ’ শতাব্দীতে ভারতের মোঘল সম্রাট নুরুদ্দিন জাহাঙ্গির তার ফার্সি ভাষায় প্রকাশিত এক কবিতায় বলেন, পৃথিবীতে কোন স্বর্গ থাকলে তা হবে কাশ্মীর। কাশ্মীরের ৯০ শতাংশেরও অধিক লোক হচ্ছে মুসলিম। সৈয়দ আলী হামাদানী নামে পরিচিত একজন ইরানীর প্রচেষ্ঠায় কাশ্মীরে ইসলাম বিস্তার লাভ করে।

সৈয়দ আলী হামাদানী ৭১৪ হিজরীতে হামাদানে জন্মগ্রহণ করেন। এক সময় তৈমূর লং ইরানের ওপর হামলা চালালে তার নিষ্ঠূর শাসন ও হত্যাযজ্ঞের কারণে মানুষের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠে। সৈয়দ আলী হামাদান তার ৭শ’ ছাত্র ও অনুসারীদের সাথে নিয়ে হামাদান থেকে কাশ্মীরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। ইতিহাস সূত্রে জানা যায়, সৈয়দ আলী ইরান থেকে তার ৭শ’ অনুসারী নিয়ে ১৩৭২ খৃষ্টাব্দে কাশ্মীরে আগমন করেন। কাশ্মীরে এসে চার মাস অবস্থান করেন। তখন একজন বড় হিন্দু মাষ্টার ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। তারপর ঐ সূত্রে হিন্দুরা ব্যাপকভাবে ইসলাম গ্রহণ করেন। সৈয়দ আলী নিজেই ৩৭ হাজার হিন্দুকে ইসলামে দীক্ষিত করতে সক্ষম হন। এর পর ক্রমান্বয়ে কাশ্মীরের মানুষ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে থাকে এবং মূর্তি ভেঙ্গে ফেলতে শুরু করেন। এ জন্য কাশ্মীরের লোকেরা তাকে “মূর্তি ধ্বংসকারী ইরানী” নামে আখ্যায়িত করেন। তার মানে এটি নয় যে তার কর্মই ছিল মূর্তি ধ্বংস করা। দেখা যায় মানুষ যখন ধর্মান্তরিত হয়, ধর্মের গভীরে ঢুকতে পারে, তখন এ মূর্তির অসারতা বুঝতে পারে বলেই এর প্রতি আর কোন আকর্ষণ অনুভব করেনা। কিন্তু যারা আজও সেখানে সে মিথ্যার জগতে বসবাস করছে তারা ঐ মূর্তি বিলুপ্তির সকল ব্যর্থতাকে সংকীর্ণ স্বার্থে সব দোষ চাপায় মুসলিমদের ঘাড়ে। সত্যকে গ্রহণ করতে না পারার ঐ ব্যর্থতা থেকে অসত্যের বাহক অনুসারীদের মাঝে জমতে থাকে ঘৃণার পাহাড়, ঐ ঘৃণাই বৃহদাকার ঘৃণার জন্ম দেয়। কাশ্মীর পৃথিবীর ভুস্বর্গ হলেও তার ভাগ্যে নরক যাতনা মোটেও কমছেনা। নীচে আনন্দবাজারের পত্রিকা থেকে পাওয়া কিছু ভারতীয় জনতার চিঠি থেকে পাওয়া যুক্তিকথা।

কাশ্মীর আমাদেরঃ (সম্পাদক সমীপেষু, আনন্দবাজার পত্রিকা, ৫ভাদ্র ১৪০৮, ২১ আগষ্ট ২০০১সাল।) (উল্লেখযোগ্য অংশটুকু মাত্রঃ) শর্মিলা বসুর “ভারত সমাধান চায় না, কাশ্মীরই তো প্রধান সমস্যা”, ১৯/৭ এর লেখাটি পড়ে মনে হয় পাকিস্তানী কোন সংবাদপত্রের লেখা পড়ছি। তিনি লিখেছেন, ‘কাশ্মিরের যে অংশটুকু ভারতের দখলে আছে………….’ আরও লিখেছেন , কাশ্মীরের অবস্থার উন্নতির জন্য যে রাজনৈতিক ও মানবিক পদক্ষেপ একতরফা ভাবেই নেয়া যেত তা বহুদিন ধরেই ভারত নেয়নি। ”………….লেখিকা মনে হয়  কাশ্মীরে গণভোট চান, যে ভোটে হয়তো তারা  স্বাধীন রাষ্ট্র (পাকিস্তানের একটি অঙ্গ রাজ্য)  হিসাবে থাকতে চায় (যা নাকি জঙ্গি সংগঠন গুলোর দাবী)। লেখা শেষ করেছেন এই বলেঃ পাকিস্তানের সঙ্গে কূটনৈতিক সমাধান চায় না ভারত। তা সেই সমাধানটা কি, পরের লেখাতে জানাবেন আশাকরি। — পাকিস্তান ১৯৭১এর বাংলাদেশের জন্মের বদলা হিসাবে কাশ্মীরে যতই ইঙ্গ সংগঠন গুলোকে মদদ দিক আমরা ভারতবাসী হিসাবে বিশ্বাস করি কাশ্মীর ভারতেরই একটি অঙ্গরাজ্য। তা আমরা শেষ পর্যন্ত রক্ষা করবো। কারণ তা না হলে আজ কাশ্মীরে গণ ভোট মেনে নিলে কাল অন্য রাজ্য গুলো থেকেও একই দাবী আসবে। শর্মিলা দেবী পাকিস্তানের মত ভাবলেও আমরা ভারতের মত করে ভাবি। “কাশ্মীর সমস্যা নিয়ে ভারতের এত মাথাব্যথার কি আছে”? (প্রভাত কুমার মাইতি, কলকাতা ৮৯)।

ছেড়ে দেব কেন? “ভারত সমাধান চায় না, কাশ্মীরই তো প্রধান সমস্যা” বক্তব্যটা শর্মিলা বসুর না পারভেজ মুশারফের বুঝতে পারলাম না। লেখিকা বলেছেন,“দমননীতি ও গায়ের জোরে শাসন কায়েম থাকার দিকেই পাল্লা ভারী থেকেছে”। এই কথার উত্তরে বলি পাঞ্জাবের খালিস্তানি বিচ্ছিন্নতাবাদের কথা সেখানেও পাকিস্তানের প্রত্যক্ষ মদদ ছিল। সেখানে আজ অন্য পরিবেশ। সেখানে কিন্তু শেষ কথা ছিল দমন নীতি ও গায়ের জোর। সেখানে যদি ভারত এক তরফাভাবে সব মেনে নিত তাহলে ঐ অংশটুকু চলে যেত (জয়দীপ মাইতি, তমলুক,মেদিনীপুর)।

এক ইঞ্চি জমিও নয়ঃ ভারতীয় নাগরিক হিসাবে এই অপবাদের যেটুকু প্রতিবাদ না করলে প্রায়শ্চিত্য হয় না, কেবল সেটুকু করার জন্যই এই পত্র প্রেরণ। লেখিকা শর্মিলা বসু বলেছেন, “দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক গড়ার বুলিগুলি কেবল কথার কথা।” ভারত কাশ্মীরকে পাকিস্তানের কাছ থেকে কোন দিন ছিনিয়ে নেয় নি। কাশ্মীরের তৎকালীন রাজা ভারতের সঙ্গে অন্তর্ভূক্তি চেয়েছিলেন বলেই তা সম্ভব হয়েছে। এবার আসা যাক সমস্যার মূলে সাধারণ মানুষের মূল সমস্যা কি? ক্ষুধা, বঞ্চনা, অশিক্ষা দারিদ্র বেকারী, না রাজনৈতিক ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি। যদি প্রথমটিই মূল চাহিদা হয় তা হলে প্রমান করার দরকার, ভারত এসব বিষয়ে কোন রকম আগ্রহ না দেখিয়ে শুধুই কাশ্মীরে দমন পীড়ন চালিয়েছে। তবে তার আগে এটাও নিশ্চিত করতে হবে এসব করার জন্য যে পরিকাঠামোর দরকার পাকিস্তান তথা কাশ্মীরের উগ্র পন্থিরা তার কিছু অবশিষ্ট রেখেছে কি না। আর যদি রাজনৈতিক ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি বিস্তারই কাশ্মীর সমস্যার মূল কারণ বলে প্রমাণিত হয়, তা হলে লেখিকার কথাই ঠিক বলে মানতে হবে। এবং কাশ্মীরকে পাকিস্তানের হাতে তুলে দিতে হবে। ইতিপূর্বে ভারত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নতির স্বার্থে চীনের হাতে হাত মিলিয়েছে। তিব্বতের উপর নিয়ন্ত্রণ শিথিল করেছে। গলা ধরে বলেছে, হিন্দি-চীনি ভাই ভাই। পঞ্চশীল নীতিতে শ্রদ্ধা দেখিয়েছে। প্রতিদানে চীন সুযোগ বুঝে ভারতের উপর সীমান্ত সংঘর্ষ চাপিয়ে দিয়েছে।

দেখা যায় পত্র লেখিকা পার্বতীর মতে “একথা ঠিক ভারত শান্তিকামী দেশ(?)। কিন্তু কেউ যদি আমাদের শান্তি প্রয়াসকে দুর্বলতা বলে ভাবে তাহলে কি উচিত নয় ভারতের ঘুরে দাঁড়ানো। প্রতি বছর কাশ্মীর মোটা টাকা খরচ করে বিভিন্ন খাতে ভুর্তূকি দিয়ে কাশ্মীরকে ভারতের অবিচ্ছিন্ন অঙ্গ বলে মেনে নিতে হয়। এর প্রধান কারণ এখানকার ভৌগলিক অবস্থান। এই কাশ্মীর হলো ভারতের ছাদ। এই ছাদের উপর যদি একবার পাকিস্তান নিয়ন্ত্রণ কায়েম করতে পারে তা হলে ভারতের অভ্যন্তরে এক বিস্তৃত এলাকা তার কামান ও ক্ষেপনাস্ত্র পাল্লার মধ্যে চলে যাবে। তখন সমস্যা দাঁড়াবে আরো ভয়াবহ। কিছুটা প্রমাণ দু’বছর আগে কার্গিল যুদ্ধের সময় পেয়েছি। ভৌগলিক অবস্থানগত সুবিধার জন্য পাকিস্তানে একজন সৈন্যের মোকাবেলা করতে ভারতের দশজন সেনাকে প্রাণ দিতে হয়েছে। ভারত যা করছে তা সব অপকর্মের যথা সম্ভব প্রতিরোধ করছে মাত্র (পার্বতী প্রাসাদ চট্টোপাধ্যায়, আউশগ্রাম, বর্ধমান।

বীরেনবাবু লিখেছেন,“স্পষ্টতই ভারত এবং পাকিস্তান দু’দেশকেই তারা আগ্রাসনকারী দেশ হিসাবে দেখেন। তারা অবিভক্ত কাশ্মীর ফিরে পাওয়ার স্বপ্ন দেখেন”। একথা সম্পূর্ণ কল্পনা ভিত্তিক। ‘হুরিয়াত’ বা অন্যান্য উগ্রবাদী  সংগঠনগুলি পাকিস্তানকে আগ্রাসনকারী রাষ্ট্ররুপে দেখে না। পাকিস্তান যখন ‘তস্করের’ মত কারগিল দখল করছিল, কাশ্মীরি উগ্রবাদীরা ছিল নিরব দর্শক। তিনি আরো লিখেছেন স্বাধীনতার জন্য তারা পাকিস্তান কেন, যে কোন দেশের যে কোন সাহায্য নিতে প্রস্তুত। উদাহরণ হিসাবে তারা দেখিয়েছেন নেতাজি সুভাষ বসুকে। তিনি তো ‘ফাশিস্ত’ জার্মানির সাহায্য নিয়েছিলেন বৃটিশকে তাড়াতে। আর সন্ত্রাসবাদ? ভারতের স্বাধীনতার জন্য যারা লড়েছিলেন তাদের বৃটিশ সরকার কি সন্ত্রাসবাদী বলে নি”? কাশ্মীরি উগ্রবাদীরা মানুষ খুন অপহরণ ও সরকারী সম্পত্তি নষ্ট করছে কাশ্মীরকে ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন করে পাকিস্তানকে উপঢৌকন দেয়ার জন্য। (শিবরাম খাঁড়া। কুশুমদা, মেদিনীপুর )

রূঢ় সত্যঃ বীরেন শাসমল মহাশয়ের প্রতিবেদনটির পরিপ্রেক্ষিতে এই পত্র। লেখাটির জন্য শ্রী শাসমলকে জানাই আন্তরিক অভিনন্দন। কাশ্মীর পরিস্থিতিকে অত্যন্ত বাস্তব দৃষ্টিকোন থেকে পর্যালোচনা করার পর তিনি কয়েকটি রূঢ় সত্য প্রকাশ এবং দুঃসাহসিক মন্তব্য করেছেন। তিনি লিখেছেন কাশ্মীরীরা কোনও দিনই ভারতের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসাবে ভাবতে পারেন নি। তারা এটাকে বিতর্কিত ভূখন্ড হিসাবেই মনে করেন। কাশ্মীরীরা ভারত এবং পাকিস্তান উভয় দেশকেই আগ্রাসী হিসাবে দেখে। বস্তুত তার পিছনে যথেষ্ট যুক্তিও আছে। নিরাপত্তার নামে আমাদের সেনাবাহিনী কাশ্মীরে যে সব ব্যবস্থা নিয়েছে এবং যে আতঙ্কের ও অনিশ্চয়তার পরিবেশ সৃষ্টি করেছে, তার বিষদ বিবরণও ওই লেখার মধ্যে আমরা পেয়েছি। আমাদের রাজ্যে যদি ঐ ধরণের ঘটনা ঘটতো, তবে আমাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ভারতপ্রেমীও তা মেনে নিতে পারতো কি না সন্দেহ। শ্রীশাসমলের দুঃসাহসিক মন্তব্যটি হলো এই যে, কাশ্মীরে আমাদের দাদাগিরি অবিলম্বে বন্ধ করা উচিত এবং কাশ্মীরের মানুষকে ডেকে আলোচনায় বসে ব্যাপারটা মিটিয়ে নেয়া উচিত। যে দু’টি সংগত প্রশ্ন তুলে ধরার জন্য এই পত্রের অবতারণা, সেগুলি হলো, ১. জোর করে কোনও ভূখন্ড জয় করা গেলেও সেখানকার মানুষজনের হৃদয় জয় করা যায় কি? তা যদি যেত তবে দৈনিক কুড়ি কোটি টাকা ব্যয় করা সত্ত্বেও কেন কাশ্মীরিরা আমাদের দুশমন বলে মনে করে? কেন তারা চায় আত্ম নিয়ন্ত্রণের অধিকার? ২. আমাদের শরীরের যেমন বিচ্ছেদ্য এবং অবিচ্ছেদ্য দু’রকমের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আছে, ভারতেরও কি সে রকম আছে? কাশ্মীরকে আমরা বলছি অবিচ্ছেদ্য অংশ, কিন্তু সে কোন শরীর? বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধের না দ্বিতীয়ার্ধের ? (সুখেন্দু বসু, উলুবেড়িয়া, হাওড়া।)

উপরের চিঠিগুলোর সূত্রে পাওয়া যায় ভারতীয়দের পক্ষের বিপক্ষের গোপন বাসনা। পত্র লেখিকা পার্বতীর কাছে ভারত যদিও শান্তিকামী দেশ কিন্তু তারপাশে প্রশ্নবোধক চিহ্নটি আমার (নাজমা মোস্তফার)। ভারত কাশ্মীর ছেড়ে দেয়া তো দূরের কথা বরং সে পাকিস্তান ও বাংলাদেশকেও  গ্রাস করতে চায়। ইসরাইল যেমন তওরাতের বর্ণনা অনুযায়ী নীল নদ থেকে ইউফ্রেটিস পর্যন্ত একটি ইহুদী রাষ্ট্র গঠন করতে চায়, ভারতও ঠিক তেমনি রামায়ন ও মহাভারতের দিক নির্দেশনা অনুযায়ী রাম রাজত্ব কায়েম করতে চায়। কল্পিত রাম রাজত্বের সকলেই হবে হিন্দু। ভারতের বিজেপি যেখানে মুসলিমদের অস্তিত্বই স্বীকার করে না সেখানে সে মুসলিমদের স্বাধীন বসবাসের জন্য কাশ্মীর হাতছাড়া করার  চিন্তা করে কি ভাবে? ১৯৪৭ সালে কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ কৌশলগত কারণে পাকিস্তানের জন্ম মেনে নিয়েছিলেন, তবে ভিতরে ভিতরে ছিল তাদের বিরোধীতা। স্পেশাল পাওয়ার এ্যাক্ট অনুযায়ী নিরীহ কাশ্মীরিদের মারার, বন্দী করার, হত্যা করার, মুসলিম মহিলাদের ধর্ষণ করার অবাধ ক্ষমতা দিয়েছে এবং ভারতীয় সৈন্যরাও সেখানে খুন, ধর্ষণ এবং মুসলিমদের ঘর বাড়ী এবং মসজিদ জ্বালানোর অবাধ অধিকার পেয়ে কাশ্মীরের তালিম মোতাবেক এক অবাধ রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস কায়েম রেখেছে। কাশ্মীরের স্বাধীনতা কাশ্মীরিদেরই অর্জন করতে হবে। এপর্যন্ত বিশ্বে যে ক’টি দেশ স্বাধীনতা ভোগ করছে তাদের কাউকে অন্যরা স্বাধীনতা হাতে তুলে দেয় নি, নিজেদেরই স্বাধীনতা অর্জন করতে হয়। ভারত কখনো কাশ্মীরীদের স্বাধীনতা স্বীকার করে নেবে না। পাকিস্তানের পক্ষেও সরাসরি যুদ্ধে কাশ্মীর মুক্ত করা সম্ভব নয়। একমাত্র কাশ্মীরীরাই পারে নিজেদের ভাগ্য নিজেরা গড়তে।

ভারত ইতিহাসে পররাজ্য লোভী হিসাবে দাগ রেখেছে। সিকিম তার এক বড় উদাহরণ, কাশ্মীরকে উদরস্থ করার মানসে একই পায়তারা চালিয়ে যাচ্ছে। সিকিম ছিল বৃটিশের আশ্রিত রাজ্য। ১৯৪৭ সালে ভারত ছেড়ে যাবার সময় সিকিমের মানুষ ভারতের অন্তর্ভুক্ত হতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। যার জন্য নেহরু সিকিমের স্বাধীনতা মেনে নিতে বাধ্য হন। ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা অশোক রায়না তার গ্রন্থ “ইনসাইড স্টোরি অব ইন্ডিয়াস সিক্রেট সার্ভিস”এ এটি প্রকাশ করেন যে, ভারত ১৯৭১ সালেই সিকিম দখল করবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। অতঃপর ১৯৭৫ সালের মে মাসে সিকিমকে আড়মোড় বেধে ভারতের একটি অঙ্গরাজ্য করা হয়। তারপরও এটি জানাজানি কম হয়। জানা যায় ১৯৭৮ সালে প্রধানমন্ত্রী মুরারজি দেশাই সিকিম সম্পর্কে প্রথম মুখ খুলেন।  দেশাই এটিও বলেন এ সিদ্ধান্তটি ছিল ভুল সিদ্ধান্ত। যে সব কর্মচারীরা এখানে যোগদানে বাধ্য হয় তারাও এ যোগদানে বিরুদ্ধ মত পোষন করতেন। সে সর্বনাশ ঘটাতে শক্তি যুগিয়েছিলেন দেশের এক কপট ষড়যন্ত্রী লেন্দুপ দর্জি। ভারত সে দেশের চগিয়াল ও লেন্দুপ দর্জির বৈরী সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে দেশটিতে তার আধিপত্য বিস্তার করে। এভাবে ক্রমে ভারত দেশটির প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র বিভাগের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে তুলে নেয়। ভারতীয় পুলিশ এসে আইনশৃংখলা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত হয়। ঠিক এরকম মুহূর্তে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রকে ইতিহাস থেকে মুছে দিতে আর বিলম্ব করে নাই ভারত। বাইরের বিশে^র অগোচরেই এসব সমাধা করে ভারত তার তৎপরতা চালায়। ভারতের সাংবাদিক সুধীর শর্মা তার ‘পেইন অব লুজিং এ নেশন’ নামে একটি জাতির হারিয়ে যাওয়ার ঘটনা লেখাতে এটি স্পষ্ট করেন যে, এ গোপন সুপ্ত পরিকল্পনা ছিল ভারতের স্বাধীনতার শুরু থেকেই। যা বেশ ঢেকে রাখলেও আর পরবর্তিতে গোপন থাকে নাই। জওহরলাল নেহরু অনেকের সাথে এ নিয়ে আলোচনা করেন যেটি এখন স্পষ্ট।

কাশ্মীরে আফজাল গুরুর ফাঁসি: এবার কাশ্মীরকে দখলে নিতে ভারত তার কসরত চালিয়ে যাচ্ছে। এর অন্তর্নিহিত সত্য যুক্তি স্পষ্ট করতে একজন অরুন্ধতি রায়ের নিবন্ধ থেকে কিছু যুক্তি আনবো যা ছাপিয়েছে আন্তর্জাতিক মাধ্যম ‘গার্ডিয়ান’ ১০ ফেব্রুয়ারী ২০১৩ সালে। “দ্যা হ্যাংগিং অব আফজাল গুরু ইজ এ স্টেইন অব ইন্ডিয়ান ডেমোক্রেসী” অর্থাৎ আফজাল গুরুর ফাঁসি ভারতীয় গণতন্ত্রের জন্য কলঙ্ক নামে। আফজাল গুরু একবিংশ শতকে ভারতের ইতিহাসে কিংবদন্তির এক বিশাল নায়ক এক রেপ্লিকা শত শত মুসলিমের রক্ত তর্পণের এক সিম্বল, এক উদাহরণীয় অনন্য দলিল মাত্র, সংক্ষেপে এর সামান্য চিত্র আঁকছি। ২০০১ সালে ভারতে সংসদ ভবনে হামলার অভিযোগে ফাঁসি হয় কাশ্মীরের স্বাধীনতাকামী নেতা আফজাল গুরুর। রায়ের জটিলতা নিয়ে লিখেন ভারতের খ্যাতিমান ও মানবাধিকার কর্মী ম্যান বুকার পুরস্কারপ্রাপ্তা অরুন্ধতী রায়। তার লেখাতে ভারতের মুখোশ উন্মোচনের প্রকৃত চিত্র ধরা পড়ে। সেদিন শনিবার কাকডাকা ভোরে কঠোর গোপনীয়তার মাঝে এ ফাঁসি কার্যকর করা হয়। ঐ হামলার প্রধান আসামী হওয়াতে ১২ বছর থেকে তিনি বন্দী ছিলেন ঐ তিহার জেলে, যার পাশে তাকে কবর দেয়া হয়। তার পরিবারকে জানানোতে গাফিলতি ধরা পড়ে কারণ সন্ত্রাসী বলে কথা! তবে তারা বলছেন রেজিস্ট্রি ডাকে জানানো হয়েছে। ঐদিন এ ঘটনার পর গোটা হিন্দু ভারতে এক নজিরবিহীন ঐক্য দৃষ্টিগোচর হয়। কংগ্রেস, বিজেপি, মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টি উৎসবে মাতে, টিভি চ্যানেলগুলো পরিবেশন করে ফাঁসির বিজয় উৎসব, চলে মিষ্টি বিতরণ। দিল্লিতে কিছু মেয়ে এর প্রতিবাদে নামলে তাদেরে পিটায় পুলিশ। টিভি ভাষ্যকার ও জনতারা রাস্তায় কাপুরুষের মত উল্লাসে নামে। লেখিকার ধারণা এরা সম্ভবত এটি বুঝতে পেরেছিল যে একটি ভয়ঙ্কর ভুল তারা করেছে। এবার মূল ঘটনাটি একটু পরখ করি। ২০০১ সালের ১৩ ডিসেম্বর ভারতের সংসদ ভবনের গেট দিয়ে প্রবেশ করে ৫জন সশস্ত্র ব্যক্তি গাড়িবোমা হামলা চালায়। তারা আট নিরাপত্তাকর্মী ও এক মালিকে হত্যা করে। পরে বন্দুকযুদ্ধে সব হামলাকারীকে হত্যা করা হয়, তারা ছিল ৫ জন। আসামীদের নাম সবার জানা ছিল। লেখিকা মন্তব্য করেন যে কুখ্যাত দিল্লি পুলিশ স্পেশাল সেল এ দাবী করে যে, তারা আসল পরিকল্পনাকারীকে খুঁজে পেয়েছে। এর সূত্রে ১৫ই ডিসেম্বর দিল্লি থেকে অধ্যাপক এসএআর গিলানি, কাশ্মীরের শ্রীনগর থেকে শওকত গুরু ও তার চাচাতো ভাই আফজাল গুরুকে গ্রেফতার করা হয়। এর পর শওকতের স্ত্রী আফসানা গুরুকেও গ্রেফতার করা হয়। ভারতের গণমাধ্যমে পুলিশের ভাষ্যই প্রচার করা হয়। যুক্তির উদাহরণ হিসাবে ছিল “দিল্লি ইউনিভার্সিটির অধ্যাপকের বাসায় বোমা হামলার পরিকল্পনা, ভার্সিটির ডন ফিদাইনদের পরিচালক, অবসর সময়ে সন্ত্রাসবাদ বিষয়ে ফ্রি লেকচার দিতেন ডন” এসব।

afzal_guru

Source: Wikipedia .

জিটিভি ১৩ ডিসেম্বরের উপর একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করে। এতে দাবী করা হয় সবই পুলিশের তথ্যের উপর ভিত্তি করে তৈরী সত্য কাহিনী। প্রশ্ন উঠে পুলিশি ভাষ্যই যদি সত্য হয়, তবে আদালত কেন? বাজপেয়ী ও আদভানি তথ্যচিত্রের ভূয়সী প্রশংসা করেন। সুপ্রিম কোর্ট এসব প্রচারের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দিতে অস্বীকৃতি জানায়। উল্টো মন্তব্য করে গণমাধ্যম বিচারকদেরে প্রভাবিত করবে না। গিলানি, শওকত, ও আফজালকে একটি দূরতম আদালতে ফাঁসি দেয়ার কিছু আগে তথ্যচিত্রটি প্রচার করা হয়। অবশেষে হাইকোর্টে খালাস পান গিলানি ও আফসান গুরু। সুপ্রিম কোর্টও হাইকোর্টের রায় বহাল রাখে। ২০০৫ সালের আগষ্টের রায়ে সুপ্রিম কোর্ট আফজাল গুরুকে তিনবার যাবজ্জীবন ও দু’বার মৃত্যুদন্ড দেয়। সেদিন বিজেপির নির্বাচনী স্লোগান ছিল দেশ আভি শরমিন্দা হায়, আফজাল আভিভি জিন্দা হায়! এর অর্থ হচ্ছে আফজাল এখনো বেঁচে থাকা আমাদের জাতির জন্য লজ্জা! এ স্লোগানের বাস্তবায়নে চলে মিডিয়ার শক্ত প্রচার। বিজেপির এমপি ও পাইয়োনিয়ার সংবাদপত্রের সম্পাদক চন্দন মিত্র লিখেন, “সেদিন হামলায় সংসদ ভবনে হামলার সন্ত্রাসী ছিলেন আফজাল গুরু। তিনিই প্রথম নিরাপত্তারক্ষীদের গুলি করেন এবং  নিহতদের ছয় জনের মধ্যে তিনজনকেই হত্যা করেন।” যদিও পুলিশের চার্জশিটে আফজাল গুরু সম্পর্কে এমন কথা বলা হয়নি। সুপ্রিম কোর্টও তার রায়ে প্রকাশ করে যে, আফজাল গুরুর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এর পর বলা হয়, ঐ ঘটনায় বিপুল সংখ্যক হতাহত এবং এতে গোটা জাতি আলোড়িত হয়েছে। সমাজের সম্মিলিত বিবেক সন্তুষ্ট হবে যদি অভিযুক্তকে ফাঁসি দেয়া হয়।”

ভারতীয় আদালতে গিলানিকে খালাস ও আফজালকে শাস্তি দেয়ায় তারা বোঝাতে চায় এটি প্রমাণিত যে, বিচার স্বচ্ছ হয়েছে। ২০০২ সালে যখন বিচার শুরু হয় তখন একদিকে ওয়ান ইলেভেনের উন্মত্ততা, আফগানিস্তানের বিজয় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উল্লাস, ঐ বছরের ফেব্রুয়ারীতে গুজরাটে মুসলিম নিধনের গরম সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প, অর ঠিক এরকম একটি সময়ে চলছে ভারতের আদালতে মুসলিম আসামীর বিচার। আসামী তখন হাই সিকিউরিটি সেলে নিঃসঙ্গ বন্দীতের শিকার। কোন আইনজীবি ছিল না, আদালত এক জুনিয়ার আইনজীবি নিয়োগ দিলেও তিনি একবারও ঐ সন্ত্রাসীর সাথে সাক্ষাৎ করেন নি। আসামীর সমর্থণে কোন সাক্ষীকেও হাজির করা হয়নি, রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীদেরও জেরা করা হয়নি। বিচারক মন্তব্য করেন কোনকিছু করার সামর্থ নেই তার। জব্দ করা হয় একটি মোবাইল ফোন ও ল্যাপটপ যদিও এটি সিলগালা করা হয়নি। বিচারের সময় এটিও ফাঁস হয় যে, ল্যাপটপের হার্ডডিস্কে গ্রেফতারের পরও হাত দেয়া হয়েছে। বলা হয় সংসদ ভবনে ঢোকার সময় ভুয়া অনুমতি পত্র ব্যবহার করা হয়েছে এবং আফজাল সব তথ্য মুছে দিয়েছেন। পুলিশের দাবী মোবাইল নাম্বারে হামলাকারীদের সাথে ২০০১ সালের ৪ ডিসেম্বরে যোগাযোগ করেছেন আফজাল। তবে রাষ্ট্রপক্ষের কল রেকর্ডে দেখা যায় সিমটি ২০০১ সালের ৬ নভেম্বরের পর প্রায় এক মাস আগে থেকেই এটি আর চালু ছিল না। পুলিশের গ্রেফতারেও ছিল দুরকম ভাষ্য।  পুলিশ বলছিল গিলানির সহায়তায় তাকে গ্রেফতার করা হয়। তবে পুলিশের রেকর্ড বলে, গিলানিকে গ্রেফতারের আগেই আফজালকে গ্রেফতার করা হয়। হাইকোর্ট একে স্ববিরোধী বললেও বিষয় আর আগায় নাই। এভাবে মিথ্যার পাহাড়ের উপর ভর করে বিচার কাজ রায় হয়, আদালত এসব স্বীকার করলেও পুলিশের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়নি।

Firing at stone-throwers in Indian-administered Kashmir

কাশ্মীর পৃথিবীর ভয়ঙ্কর এক চলমান যুদ্ধক্ষেত্র। কাশ্মীরী ভূখন্ডের খবর জানতে হলে তার বেদনার উৎস মূলে যেতে হবে।  কাশ্মীর এমন একটি পরমাণু যুদ্ধক্ষেত্র যেখানে ভারতের পাঁচ লাখ সৈনিক প্রতি চারজন বেসামরিক নাগরিকের বিপরীতে একজন সৈন্য নিয়োজিত! আবু গ্রাইবের আদলে এখানকার আর্মি ক্যাম্প ও টর্চার কেন্দ্রগুলোই কাশ্মীরীদের জন্য ধর্ম নিরপেক্ষতা ও গণতন্ত্রের বার্তাবাহক। আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের দাবিতে সংগ্রামরত কাশ্মীরীদের জঙ্গি আখ্যা দিয়ে এখন পর্যন্ত ৬৮,০০০ হাজার কাশ্মীরের মুসলমানকে হত্যা করা হয়েছে এবং ১০,০০০ হাজারকে গুম করা হয়েছে। নির্যাতিত হয়েছে আরো অন্তত এক লাখ লোক। আফজালের ঘটনাটি একটি আলাদা ঘটনা নয়। তার মত জেলে হাজার হাজার কাশ্মীরীকে হত্যা করা হয়েছে। এখানের ৬৮, হাজারই একএকজন আফজাল গুরু সন্দেহ নেই। ভারতীয় গণতন্ত্রের সব প্রতিষ্ঠানই আফজাল গুরুকে হত্যায় দাগ রেখেছে। ফাঁসি হয়েছে, লেখিকার শেষ মন্তব্য হচ্ছে, সম্মিলিত বিবেক সন্তুষ্ট হয়েছে নাকি এখনো রক্তের কাপের অর্ধেকটা খালি? সেদিন আফজাল গুরুকে দিয়ে জোর করে পুলিশ তাদের লিস্টের হামলাকারীদের নাম বলতে বাধ্য করায়। বিজেপির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সিন্ধুতে জন্ম নেয়া আদভানি বলেছিলেন, আসামীরা দেখতে পাকিস্তানীদের মত। শুধু মাত্র পুলিশের এসব মিথ্যা রিপোর্টের ভিত্তিতে এ রায় হয়, যাকে সুপ্রিম কোর্ট পরে বাতিল বলে ঘোষনা করেছিল। ঠিক তখন বিজেপি সরকার পাকিস্তান থেকে ভারতের হাইকমিশনারকে প্রত্যাহার করে। এবং পাকসীমান্তে ৫ লাখের মত সৈন্য সমাবেশ করে পারমাণবিক যুদ্ধের হুমকি দেয়। এই ভারতই বাংলাদেশ বিজয়ের জোর দাবীদার, দিনে দিনে এর দাবী আগের চেয়েও একটু বেশী শোনা যাচ্ছে। কিন্তু কাশ্মীরের জন্য ভারত ভুল গণতন্ত্রের মুগুর। এসব ভারতীয় গণতন্ত্রের জ¦লজ¦লে উদাহরণ তাদের প্রায় সব প্রতিষ্ঠানই ওসবে সমর্থণ দিয়ে বাঘনখরের দাগ রেখে চলছে। এটি নির্দ্ধিধায় বলা যায়, তারা শুধু গরুই চিনলো, মানুষকে মানুষের মর্যাদা দিতে শিখলো না। বরং মা গরুকে মানুষের বহু উপরে মর্যাদার আসনে বসাতে তারা একবিংশ শতকেও হাস্যকরভাবে অভ্যস্ত।

রক্তাক্ত কাশ্মীরে ২০১৬ সালের পবিত্র ঈদুল আজহার ঈদের দিনেও কারফিউ (১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৬)। কোথাও ঈদের আনন্দ ইমেজ নেই, কার্ফুতে চারপাশ নীরব নিস্তব্ধ। ভারতীয় সেনাবাহিনী টহল জোরদার করেছে, গত দুইমাসে সেখানে দাঙ্গায় মৃত্যু ঘটেছে ৭৫ জনের। ঈদের দিনে তারা স্বাধীনতাকামী সংগঠনরা পথসভার ডাক দিয়েছিল। তাই কারফিউতে স্তব্ধ কাশ্মীর। গত জুলাইয়ে হিজবুল কমান্ডার বোরহানের মৃত্যুর পরপরই জ¦লে ওঠে স্বাধীনতাকামীদের আগুন। তাতে প্রায় ৮০ জন নিহত ও আহত ৫ হাজারেরও বেশী মানুষ। সেনাবাহিনীর নির্যাতনের জবাব দিতেই ২০১০ সালে বোরহান ও তার ভাই হিজবুলে নাম লেখান। তাদের মূল কাজ ছিল মিডিয়ায় প্রচার চালানো, বোরহানের ফুটবল খেলার ভিডিও মাতিয়ে রেখেছিল কাশ্মীরীদের। বৃটিশ কর্তৃক দেশ ভাগের সময় থেকেই তারা লাগাতার জটিলতায় যুক্ত। দেশের জনগণ মুসলিম হয়েও ভারতের অনুগত হয়, কারণ রাজা ছিলেন হিন্দু রাজা হরি সিং। তার সিদ্ধান্তেই জাতির কপালে লাগাতার হামলা চলমান। সেদিন শর্তে ছিল কাশ্মীরীদের বিশেষ স্বাতন্ত্রতা বজায় থাকবে। যা অতঃপর টিকেনি, ধীরে ধীরে ধ্বসে পড়ে। বরং উল্টো দীর্ঘদিন ধরে সেনাশাসনে দম বন্ধকরা জীবন যাতনায় তাদের গণতান্ত্রিক অধিকারের কবর রচিত হয়েছে। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক “র” প্রধান শহীদ বুরহানের বানীকে কাশ্মীরীদের পক্ষের প্রতীক বলে আখ্যা দিয়েছেন। যাকে ভারতীয় দৃষ্টিতে সন্ত্রাসী গণ্য করা হয়। কিন্তু কাশ্মীরের দৃষ্টিতে তিনি একজন অভিন্ন ও জনপ্রিয় নেতা। তার শাহাদত এখন অগ্নিস্ফুলিঙ্গ হয়ে ফুটছে। এ শহীদ বোরহানই কাশ্মীরীদের কলিজার টুকরা হয়ে স্বাধীনতার মাইল ফলক হয়ে থাকবে।

গুজরাট বাবরী মসজিদের মহানায়ক মোদি ক্ষমতায়, কাশ্মীরীদের ভালো থাকার কথাও নয়। সারা ভারতে চলছে গরুর মাংস ও মুত্রের সংকোচন বিয়োজনের রকমারী বানিজ্য। এর সাথেও জড়িয়ে আছে মুসলিমরা, এরাই নিধনের টার্গেট! পাকিস্তানে জাতিসংঘের স্থায়ী কমিটির সদস্য মালিহা লোদী বলেছেন, পাকিস্তানকে বিশ^ থেকে পৃথক করার ভারতীয় ষড়যন্ত্র বিফল হয়ে গেছে (জিওনিউজ)। তিনি বলেন, জাতিসংঘে পাক-প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফের বক্তব্যের পর ভারতের স্বরুপ বিশে^র জানা হয়ে গেছে। জাতিসংঘের মহাসচিব বানকি মুনও কাশ্মীরের নির্যাতন দেখে আৎকে উঠেছেন (২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৬)। কাশ্মীরের এসব বহুদিনের লাগাতার নির্যাতন চলছে অনবরত, সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের ১২ ব্রিগেড হেড কোয়ার্টারের কাছেই কাশ্মীরের উরি সেনাঘাঁটিকে মাত্র চার স্বাধীনতাকামী বন্দুকধারীর হামলায় ১৮ সেনা নিধন ও আহত প্রায় ৫০ জনের মত। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের বিশ্লেষনে দেখা যায়, বিগত কয়েক মাস ধরে চলা ভারতীয় আগ্রাসনে ফুঁসে উঠছিল কাশ্মীর। ভারত দায়ী করছে পাকিস্তানকে, যেখানে পাকিস্তান এটি অস্বীকার করছে। এর জের ধরে ভারত ও পাকিস্তানের মাঝে চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে, চলছে যুদ্ধের মহড়া। পাকিস্তানের আকাশে উড়তে দেখা গেছে এফ-১৬ যুদ্ধবিমান। চীন, সৌদি ইরান সবাই পাকিস্তানের সাথে কাশ্মীরীদের পক্ষে আসছে। বাংলাদেশের মুসলিম অধ্যুষিত বাংলাদেশীরা দৃশ্যত নির্যাতীত কাশ্মীরীদের পক্ষেই সরব থাকছে। যদিও স্বার্থান্বেষী কপট অবৈধ সরকার তার কপট ক্ষমতা ধরে রাখার নষ্ট স্বার্থে ভারতের জবরদখলী নির্যাতনমূলক কর্মকান্ডকে সমর্থণ করছে এবং স্বাধীনতাকামী কাশ্মীরীদের বিরোধীতা করছে! লজ্জার কথা হচ্ছে এরা যে শোষক পক্ষ, স্বাধীনতার স্বপক্ষ শক্তি নয়, অলক্ষ্যে এটি উল্লেখযোগ্য প্রমাণ দলিল হয়ে থাকছে! ওদিকে পাকিস্তানকে সমর্থণ দিয়েছে ইসলামী সম্মেলন সংস্থা, ওআইসির মহাসচিব আয়াদ আমিন নির্যাতন বন্ধ করে জাতিসংঘের গৃহীত প্রস্তাব অনুযায়ী কাশ্মীর সমস্যার সমাধান করতে আহবান জানান।

কথায় বলে অফিসে বড়কর্তার ধমক খেয়ে এসে অনেকে বউএর উপর ঝাল ঝাড়ে। কর্তাকে যখন  ধমক দিতে পারেন না, তখন বেচারী বউএর উপর চলে এর বিক্রিয়া, এমনটাই ঘটেছে ভারতেরও। পাকিস্তানের ধমক খেয়ে সাথে সাথেই ক্ষেপে উঠে তারা বাংলাদেশ বর্ডারে। ঠিক ঐদিনই কুড়িগ্রামের রৌমারীতে ও ঝিনাইদহের মহেশখালিতে দু’জন বাংলাদেশী খুন করে, মনে হচ্ছে এর বদলা নিল। নিধনের বড় কারণ এই হাসিনা সরকার আসার পর থেকেই তারা এ কাজটি খুব আনন্দে করতে পারছে। রাষ্ট্রপক্ষ কোনই প্রতিবাদ করে না, নীরবে সব সয়ে যায়। কারণ সরকারের দূর্বলতা অনেক বেশী, অনেক সীমাবদ্ধতায় সরকার নড়তে চড়তে অপারগ, এই সুযোগে বিএসএফ মহাবীর। এ কাজটি তারা প্রায় সারা বছরই করছে, এত নির্যাতন সয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ শুধু একটি ভৌতিক মেরুদন্ডহীন সরকার তাদের মাথায় ভুতের মতই চেপে আছে বলে এমনটি সম্ভব হচ্ছে। ভারতের প্রতিবেশী হবে আর ভারত নির্যাতন করবে না, এটি হয় না। এটি ভারতের মজ্জাগত স্বভাবের অংশ। সেখানে বাংলাদেশ আর কাশ্মীরে কোন পার্থক্য নেই।

Kashmir Mass Rape Victims of Indian Soldiers

নাজমা মোস্তফা,   ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৬।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

Tag Cloud

%d bloggers like this: