Articles published in this site are copyright protected.

এদের ইতিহাসটি জানা সময়ের দাবী: বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে সংকটপূর্ণ অঞ্চলগুলোর একটি প্যালেস্টাইন অরফে ফিলিস্তিনের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলীয় গাজা উপত্যকা, যেখানে মানুষের অধিকার পদদলিত করে নিরীহ নিরপরাধকে হত্যা করা হচ্ছে বড় সময় থেকে। চারদিক থেকে অবরুদ্ধ করে প্রতিনিয়ত সামরিক হামলা চালাচ্ছে ইসরাইলী বাহিনী। গাজার নিরস্ত্র মানুষগুলো জানে না কি তাদের অপরাধ। ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকার আয়তন মাত্র ৩৬০ বর্গ কিলোমিটার হলেও এখানকার জনসংখ্যা প্রায় ১৪ লাখ, জনবহুল অঞ্চল। মিশরের সাথে গাজার ১১ কিলোমিটার দীর্ঘ যৌথ সীমান্ত রয়েছে। কিন্তু ১৯৬৭ সালে ছয় দিনের যুদ্ধে বর্ণবাদী ইসরাইল ঐ সীমান্ত দখল করে নিয়েছে।

এ অবরোধ গত কয়েক বছর ধরে বজায় থাকলেও ২০০৮ সালের গত ০৫ সেপ্টেম্বর থেকে তা আরো কঠোর করা হয়। ক্রসিং পয়েন্টগুলোতে আগে যেখানে খাদ্য ও ঔষধ সামগ্রি নিয়ে দৈনিক এক হাজার লরি গাজায় প্রবেশ করতো এখন সেখানে মাত্র দু-একটি লরিকে গাজায় প্রবেশের সুযোগ দেয়া হচ্ছে। যে পানির অপর নাম জীবন সেই বিশুদ্ধ পানি এখন নেই বললেই চলে। ইসরাইল পানি বিশুদ্ধকরণ পদার্থের সরবরাহ আটকে দেয়ায় অপরিশোধিত পানি খেয়েই তাদেরকে জীবন ধারণ করতে হয়েছে। আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থা অক্সফামের প্রতিনিধি গাজা সফরে গিয়ে বিস্মিত হয়েছেন। তিনি গাজায় যে কোন সময় গণমৃত্যুর আশংকা প্রকাশ করেছেন। গাজার এই ভয়াবহ পরিস্থিতি সম্পর্কে বিশ্বের মানুষ যাতে না জানতে পারে, সে লক্ষ্যে জায়নবাদী ইসরাইল কোন সাংবাদিককে সেখানে প্রবেশ করতে দেয়নি। সাংবাদিকদের প্রবেশে বাধা দেয়ার কারণে খোদ ইসরাইলের সুপ্রিম কোর্টেই এরই মাঝে একটি মামলা হয়েছে। গাজার ৮০ শতাংশ মানুষ দরিদ্র সীমার নীচে বসবাস করছে এবং বেকারত্বের হারও ৬৫ শতাংশের উপরে। জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই হাজার সালের পর থেকে ২০১২ পর্যন্ত গাজায় ইসরাইলী অবরোধের কারণে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে গাজার ক্ষতি হয়েছে এক হাজার ছয়শ’ কোটি ডলার।

Free the oppressed people of Palestine!

 

প্রথম গণঅভ্যুত্থান: ১৯৮০ সালে ফিলিস্তিনে প্রথম গণঅভ্যুত্থান শুরু হয়। ইসরাইলসহ পাশ্চাত্যের দেশগুলোর দৃষ্টিতে হামাস ও ফিলিস্তিনীদের সবচেয়ে বড় অপরাধ হলো, দখলদারকে স্বীকৃতি না দেয়া। ইরাক ও আফগানিস্তানে লাখ লাখ মানুষকে নির্মমভাবে হত্যার কাজ কতটুকু সভ্য উদারতার নিদর্শন! বিগত শতকের সবচেয়ে দুঃখজনক ও লোমহর্ষক ঘটনা হচ্ছে বিশ্ব জায়নবাদীচক্র ও তাদের পশ্চিমা পৃষ্টপোষকদের মাধ্যমে ফিলিস্তিন জবরদখল। ফিলিস্তিনের জনগণের উপর চলছে গণহত্যা, জুলুম ও নির্যাতন। কথায় কথায় ফিলিস্তিনী জনগণকে যখন তখন দল বেধে পাখির মত গুলি করে মারা হচ্ছে, নিরপরাধকে ধরে নিয়ে জেলখানায় নিক্ষেপ করা হচ্ছে, বাড়িঘর বুলডোজার দিয়ে ভেঙ্গে দিচ্ছে, কৃষিজমির ফসল নষ্ট করা হয়েছে। জাতিসংঘকে ব্যবহার করে বৃহৎ শক্তিগুলো জাতিগোষ্ঠীর অধিকার পদদলিত করেছে। পাশ্চাত্য ও ইহুদীবাদীদের মিলিত চক্র ফিলিস্তিনী জনগণের ঐতিহাসিক ও ন্যায়সঙ্গত অধিকার উপেক্ষা করে ফিলিস্তিন জবরদখল ও ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিষয়টিকে স্বীকৃতি দেয়। ইউরোপীয়রা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তাদের মাধ্যমে ইহুদীদের যে ক্ষতি হয়েছিল, ফিলিস্তিনী ভূখন্ডে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তা পৃুষিয়ে দিয়েছে। আমাদের দেশে একটি আঞ্চলিক শ্লোক প্রচলিত যে, “হাওরের গরু আর মামা শ^শুরের দান” দানকর্তা মামা শ্¦শুর ময়দান থেকে ভাগ্না বউকে দান স্বরুপ গরু দিয়ে দেন। একই অবৈধ কাজ করেছে বৃটিশ বনাম ইউরোপীয় মোড়লরা।

ফিলিস্তিনের উপর অবরোধ আরোপ: ফিলিস্তিনের পার্লামেন্ট নির্বাচনে হামাসকে নির্বাচিত করায় ঐ অপরাধে ইসরাইলীরা গাজা উপত্যকার উপর অবরোধ আরোপ করে খাদ্য ও জ্বালানী সরবরাহসহ সব ধরণের সাহায্য প্রেরণ বন্ধ করে দেয়। সেই সাথে মজলুম ফিলিস্তিনী জনগণের উপর চলে চরম নির্যাতন অভিযান। আকাশ ও ভূমিপথে তাদের পাশবিক হামলায় শহীদ হন হাজার হাজার ফিলিস্তিনী। উসমানী সামাজ্যের খেলাফত পতনের মাধ্যমে মুসলিম জগতের গৌরব অস্তমিত হয়। মধ্যযুগীয় বর্বর যুগকে পিছনে ফেলে পাশ্চাত্য উন্নতির পথে অতিক্রম কালে বিশ্বশান্তি ও ন্যায়বিচারের দিকে না গিয়ে বরং বিশ্বে নিজের আধিপত্য বিস্তারের দিকেই অতিরিক্ত মনোযোগী ছিল। এর সূত্রে ১৮৯৭ সালে সুইজারল্যান্ডের ব্যাল শহরে হ্যাঙ্গেরিয়ান থিওডোর হ্যারজলের নেতৃত্বে এবং বৃটিশ পুঁজিপতিদের পৃষ্টপোষতকায় প্রথম ইহুদীবাদী মতাদর্শের জন্ম হয়। ইহুদীবাদী মতবাদের প্রতিষ্ঠাতা ও জনক বলে পরিচিত থিওডোর হ্যারজল ব্যাল-সম্মেলন শেষ হওয়ার পর তার “ইহুদী সরকার” বইএ লেখেন, “আমি ব্যালে ইহুদী রাষ্ট্রের বীজ বপন করেছি। তবে এ মূহূর্তে এ কথা শুনলে বিশ্বের মানুষ হাসবে। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে না হলেও আগামী পঞ্চাশ বছরের মধ্যে বিশ্বে একটি ইহুদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবেই।”

ধর্মীয় নয়, রাজনৈতিক ইসরাইল: এভাবেই ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে ধর্মীয় নয়, বরং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এর আত্মপ্রকাশ ঘটে। হ্যারজল তার বর্ণবাদী দর্শনের প্রতি মানুষের সহানুভূতি আদায়ের জন্য সুকৌশলে সেমেটিক এহুদী ধর্মের সাথে তার মতবাদকে জুড়ে দেন। ফিলিস্তিনের বাইতুল মোকাদ্দাসে এহুদীদের একটি পবিত্র পাহাড়ের কথা উল্লেখ করে সে দাবী করে, বিশ্বের সকল ইহুদীকে ঐ পবিত্র ভুমিতে ফিরে আসতে হবে। এরপর আরো এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে প্রচার করা হয় যে ইহুদীদের জন্য ফিলিস্তিনে একটি রাষ্ট্র গঠন করা হলেই কেবল ইহুদীদেরকে তাদের পবিত্র ভুমিতে একত্রিত করার সুযোগ সৃষ্টি করা যাবে। এখানে মজার কথা হল, ধর্মের কথা বলে থিওডর হ্যারজল ইহুদীদের জন্য আবাসভূমি নির্মানের কথা বললেও তার বা তার সহযোগী নেতাদের ধর্মের একক স্রষ্টার প্রতি কোন বিশ্বাস ছিলনা। ইহুদীধর্মসহ সকল ঐশী ধর্মের মূল এক সৃষ্টিকর্তার ব্যাপারে তারা সন্দেহ পোষন করতো। অর্থাৎ এক কথায় ধর্মের প্রতি তাদের কোন বিশ্বাস ছিলনা। ইহুদী নেতারা তাদের ধর্মাবলম্বীদের একটি ধর্মীয় জনগোষ্ঠী হিসাবে না দেখে একটি সাধারণ জাতিগোষ্ঠী বলে মনে করতো। নিজেরা ধর্মে বিশ্বাসী না হলেও ফিলিস্তিন ভূখন্ডের উপর তাদের ঐতিহাসিক অধিকার রয়েছে বলে দাবী করে। তাদের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ফিলিস্তিনে ইহুদীদেরে জড়ো করে একটি রাষ্ট্রের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়া। এরই মধ্যে তাদের প্রবক্তাদের মধ্যে “ইসরাইল যাঙ্গুইলের” মত নেতারা বাইতুল মোকাদ্দাসে অবস্থিত ইহুদীদের পবিত্র পাহাড় ‘সাহইউন’কে বাদ দিয়েও ইহুদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা উত্থাপন করে। নেতাদের উদ্দেশ্য ছিল ইহুদী রাষ্ট্র শুধু বাইতুল মোকাদ্দাস তথা ফিলিস্তিনেই যে হতে হবে এমন কোন কথা নয়। এই দৃষ্টিভঙ্গির অনুসারীরা ইহুদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য প্রথমে আর্জেন্টিনা, ইরাক, গ্রীস, মিশর, উগান্ডা, কঙ্গো, মোযাম্বিক, লিবিয়া ও এ্যাঙ্গোলাকে বাছাই করে। এসব দেশের কোন একটিতে ইহুদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য তারা ব্যাপক জরীপ ও অনুসন্ধান চালায়। কিন্তু কোথাও সুবিধা করতে পারে নাই।

১৯০৪ সালে থিওডর হ্যারজলের মৃত্যু পর্যন্ত এর ইন্ধনে কাজ চলে। উসমানী সামাজ্য চলাকালীন ফিলিস্তিনকে তারা ইহুদী রাষ্ট্র বানাবার প্রস্তাবে খলিফার অস্বীকৃতির কারণে ঐ সময় ব্যর্থ হয়। অতঃপর উপরে বর্নিত স্থানগুলোকে লক্ষ্যবস্তু চিহ্নিত করেও ব্যর্থ হয়। অন্য সব দেশের ব্যাপারে একই ধরণের প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হওয়ার পর ইহুদীবাদী নেতৃবৃন্দ বৃটিশ সরকারের সহযোগিতায় খেলাফতের অবর্তমানে যে কোন মূল্যে ফিলিস্তিনকেই ইহুদী রাষ্ট্র হিসাবে প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেয়। ঠিক এরকম একটি সময় শুরু হয়ে যায় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। ইহুদী লেখক ও গবেষক নাহুম সাকুলু এ সম্পর্কে বলেছেন, “একটি রাজনৈতিক ও পূঁজিবাদী মতবাদ হিসাবে ইহুদীবাদের জন্ম হয়েছিল এবং অর্থ ও ক্ষমতালিপ্সা ছিল এই মতবাদের প্রবক্তাদের প্রধান লক্ষ্য। কিন্তু এই অশুভ লক্ষ্য চরিতার্থ করার জন্য তারা মুখে ধর্মের দোহাই দেয় এবং ইহুদী ধর্মাবলম্বীদের জন্য একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রচার চালায়”। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সেনাবাহিনী যখন দুভাগে বিভক্ত হয়, ঠিক তখনই ইহুদীবাদীরা নতুনভাবে কুটনীতিতে প্রবেশ করে। সেদিনও তারা নিজের অস্তিত্ব ঘোষনা করার পরও একটি ইহুদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্র তৈরী করতে পারেনি। সর্ববৃহৎ উপনিবেশবাদী সূর্য্য না ডোবা দেশ বৃটেনের সাহায্য প্রার্থণা করে।

বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর উসমানী সামাজ্য ও তার মিত্র শক্তি জার্মান বৃটিশ বাহিনীর সামনে অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়ে। এই সুযোগে ইহুদীবাদী আন্দোলন বৃটিশ পৃষ্ঠপোষকতায় তার প্রথম তীরটি মুসলিম বিশ্বের কেন্দ্রবিন্দু ফিলিস্তিনের বুকে নিক্ষেপ করে। আন্তর্জাতিক সমাজ ইহুদীবাদী আন্দোলনকে স্বীকৃতি দেয়। প্রথম মহাযুদ্ধে উসমানিয়া সাম্রাজ্যের পতন ঘটে এবং প্রথমবারের মত ফিলিস্তিন ভুখন্ডে ইহুদীবাদীদের আনাগোনা শুরু হয়। এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপ মহাদেশের মিলনস্থল বলে পরিচিত কৌশলগত অঞ্চল মধ্যপ্রাচ্যে একটি ঘাটি স্থাপন করার স্বপ্ন বৃটেন দীর্ঘদিন ধরে লালন করছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে চুড়ান্ত মূহূর্তে আরব দেশগুলো উসমানিয়া সামাজ্য থেকে স্বাধীন হয়ে যাওয়ার সংকল্প নিয়ে তূর্কী বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করে, বৃটিশরা আরবদেরে সহায়তা করে। এরই ফাঁকে বৃটিশ সরকার আরব ভূখন্ড বৃটেন ও ফ্রান্সের মধ্যে ভাগ বাটোয়ারা করে আরবদের বুকে প্রথম আঘাত হানে। ১৯১৭সালে নভেম্বরের ২ তারিখে তৎকালীন বৃটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর্থার জেমস বালফোর ইহুদীবাদীদেরকে লেখা এক পত্রে ফিলিস্তিনী ভূখন্ডে একটি ইহুদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি ঘোষনা করেন। এভাবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পুরোটা সময় জুড়ে বৃটিশ সরকার মধ্যপ্রাচ্যের তেল ভান্ডারগুলোর উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি ইহুদী অর্থনৈতিক সমর্থণ লাভের কাজে ইহুদীবাদীদের ব্যবহার করে। তৎকালীন বৃটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী বালফোর বৃটিশ ইহুদী ধনকুবের লর্ড রেচিল্ডকে লেখা ঐতিহাসিক পত্রে বলেছিলেন, “আমি অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে, ইহুদীবাদীদের লালিত বাসনা চরিতার্থ করার লক্ষ্যে বৃটিশ সরকারের মন্ত্রীসভায় একটি বিল পাশ করা হয়েছে। বৃটিশ সাম্রাজ্য ফিলিস্তিনে ইহুদীদের জন্য একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ইচ্ছে পোষন করছে এবং ইহুদীবাদীদের এ স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য লন্ডন সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে। —বৃটিশ সরকারের এ সিদ্ধান্তের কথা ইহুদীবাদী ইউনিয়নকে জানালে লন্ডন আপনার কাছে চিরকৃতজ্ঞ থাকবে”। বালফোরের ঐ চিঠি প্রকাশিত হওয়ার পর বৃটিশ বিমান বাহিনী রাশিয়াসহ পূর্ব ইউরোপের যেসব দেশে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ইহুদী বসবাস করতো, সেসব দেশে হাজার হাজার কপি বিমান থেকে বিলি করে। তবে নিঃসন্দেহে বালফোরের ঐ ঘোষণা ছিল সকল আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লংঘন। এদিকে ফিলিস্তিনের অধিকাংশ জনগণ আরব হওয়ার কারণে তাদেরকে বাদ দিয়ে সেখানে একটি ইহুদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব ছিলনা। এর ভুখন্ড, কৃষিজমি, স্কুল কলেজ, অফিস, আদালত ও দোকানপাটসহ পুরো অবকাঠামো ছিল ফিলিস্তিনী জনগণের এবং এ বিষয়টি উপেক্ষা করা সহজ ছিলনা।

সভ্য দুনিয়ার নিকৃষ্ট কাজ: যার জন্য মুসলিম জনগণের সংখ্যা হ্রাস করে ইহুদী জনসংখ্যা বৃদ্ধির আশু প্রয়োজন দেখা দেয়। এ কারণে ইহুদীবাদী সহযোগিতায় বৃটিশ সেনারা ফিলিস্তিনী জনগণের উপর গণহত্যা ও তাদের অবকাঠামো ধ্বংসের কাজে হাত দেয়। যার ফলে ফিলিস্তিনের মত একটি জাতিকে ধ্বংস করতে এবং সেখানে একটি ইহুদী রাষ্ট্রের পত্তন করতে চরম বর্বরোচিত ও পাশবিক প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যায়। ১৯১৮ থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত ইহুদীবাদী ও বৃটিশ সেনাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ফিলিস্তিনী জনগণকে হত্যা ও তাদের ভূমি অবৈধভাবে দখল করার কাজ চলে। পাশা পাশি সারা বিশ্ব থেকে লাখ লাখ ইহুদী অভিবাসীকে এনে ফিলিস্তিনী জনগণের তৈরী করা বসতবাড়ীতে উঠিয়ে দেয়া হয়। যে সব ফিলিস্তিনীকে হত্যা করা সম্ভব হয়নি, তাদেরকে ফিলিস্তিন থেকে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে তাড়িয়ে দেয়া হয়। এভাবে ফিলিস্তিনের জনসংখ্যা বিন্যাসে ব্যাপক পরিবর্তন এনে সেখানে একটি ইহুদী সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী তৈরী করা হয় এবং বিশ্বের বুকে প্রথম ইহুদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়। যার কোন মানবিক ব্যাখ্যা জগতের সামনে নেই। সভ্য দুনিয়ার এ উদাহরণ বর্তমান বিশে^র সবচেয়ে বড় নিকৃষ্ট কাজ।

ফিলিস্তিনের উপর বৃটেনের কর্তৃত্ব ১৯১৮ সালে ফিলিস্তিন ভুখন্ডে বৃটিশ সেনাদের অনুপ্রবেশের মাধ্যমেই শুরু হয়েছিল। ফিলিস্তিনের উপর বৃটিশদের এই উপনিবেশ তিন দশক স্থায়ী হয়েছিল। ঐ তিন দশক ছিল ফিলিস্তিনের ইতিহাসে সবচেয়ে কালো অধ্যায়। মাত্র ৩০ বছরে (১৯১৮ – ১৯৪৮) সাল পর্যন্ত সময়ে ফিলিস্তিনের সকল রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবকাঠামো সম্পূর্ণরুপে ধ্বংস করে দেয়। সারা বিশ্ব থেকে বিশেষ করে পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো থেকে ইহুদীদেরকে উন্নত জীবন যাপনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ফিলিস্তিনে নিয়ে আসতে থাকে। সেই সাথে অত্যন্ত নির্মম কায়দায় ফিলিস্তিনী জনগণকে তাদের মাতৃভূমি থেকে বিতাড়নের প্রক্রিয়া চলে। ইহুদীবাদীরা ফিলিস্তিনী জনগণকে তাদের বাড়ীঘর থেকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয়। তারা ফিলিস্তিনীদেরকে নিজেদের সাজানো সংসার থেকে একটি সূতা পর্যন্ত নিতে দেয় নি। যে সব ফিলিস্তিনী বাড়ীঘর ও সহায় সম্বল চিরদিনের জন্য ইহুদীদের কাছে রেখে দিয়ে চলে যেতে অস্বীকৃতি জানায়, তাদেরকে নির্দয়ভাবে হত্যা করা হয়। বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড জর্জ বলেন, “যে কোন উপায়ে ফিলিস্তিনে ইহুদীদেরকে সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠীতে পরিণত করতে হবে, যাতে সেখানে একটি ইহুদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা যায়”। বৃটিশ সরকারের ঐ ঘোষনা সরকারের দীর্ঘমেয়াদী নীতিতে পরিণত হয়। এভাবে সারা বিশ্ব থেকে লাখ লাখ ছিন্নমূল ইহুদীকে ফিলিস্তিনী ভূখন্ডে এনে জড়ো করা হয়।

জায়নবাদী ইহুদী বৃদ্ধির নমুনা: ১৯০৫ – ১৯১৪ সাল পর্যন্ত ফিলিস্তিনে ইহুদীদের সংখ্যা ছিল মাত্র কয়েক হাজার। কিন্তু ১৯১৪ সাল থেকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ১৯১৮ সাল পর্যন্ত বৃটিশদের সহযোগিতায় ফিলিস্তিনে ইহুদীদের সংখ্যা ২০,০০০ এ উন্নীত হয়। ১৯১৯ – ১৯২৩ সংখ্যা ৩৫ হাজারে পৌছে যায়। ১৯৩১ সালে প্রায় ৫গুণ বৃদ্ধি পেয়ে ১ লাখ ৮০,০০০এ পৌছায়। ১৯৪৮ সালে সেখানে ইহুদীদের সংখ্যা ৬ লাখে উন্নীত হয়। বৃটিশ উপনিবেশবাদী সরকার ফিলিস্তিনের জমি বাজেয়াপ্ত করে সেখানে ইহুদী বসতি নির্মাণের জন্য ইহুদীবাদী এজেন্সীগুলোকে দায়িত্ব দেয়। বৃটিশদের সহযোগিতায় তারা প্রথম দশকেই রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবকাঠামো গড়ে তোলে। ফিলিস্তিনী জনগণের শিল্প, সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক অবকাঠামো বৃটিশ ও ইহুদীবাদী পূঁজিপতিদের সহায়তায় ধ্বংস করে দেয়া হয়। এ সময়ে ফিলিস্তিনী জনগণের অনেক স্থানীয় শিল্প ও পেশা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়। পাশাপাশি ইহুদীবাদীদের পছন্দসই পেশা ও শিল্প সেখানে চালু করা হয় এবং দ্রুত এগুলোর প্রসার ঘটতে থাকে। ইহুদীদেরে ফিলিস্তিনে পুঁজি বিনিয়োগের আমন্ত্রণ জানানো হয় এবং তাদেরে নানা রকম সুযোগ সুবিধা দেয়া হয়। ১৯৩২ থেকে ১৯৪১ পর্যন্ত পশ্চিমা দেশগুলোর প্রায় ২৫ হাজার পূঁজিপতি তাদের সকল পুঁজি নিয়ে ফিলিস্তিনে পাড়ি জমায়। ১৯৩৬ ও ১৯৩৭ সাল অর্থাৎ এই দুই বৎসরে ফিলিস্তিনে ইহুদীবাদীরা ৫ হাজার কলকারখানা স্থাপন করে। গুরুত্বপূর্ণ সরকারী পদগুলোতে বৃটিশ ইহুদীদেরে নিয়োগ দেয়। ফিলিস্তিনের শত শত স্কুল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়সহ শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে তারা নিজেদের করায়ত্বে নিয়ে আসে। বৃটিশ সেনাঘাটিগুলোতে ইহুদীবাদী মিলিশিয়াদের প্রশিক্ষণ দেয়।

নির্যাতনের জন্য ইসরাইলের জঙ্গি হাগানাহ সৃষ্টি: ঐ সময়ই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করার জন্য ১৯১৮ সালে বৃটেনের সহযোগিতায় গুপ্ত ইহুদী বাহিনী “হাগানাহ” গঠিত হয়, ইহুদীবাদীদের অবৈধ রাষ্ট্র তৈরীর কাজে । ফিলিস্তিনী জনগণের বাড়ীঘর ও ক্ষেতখামার দখল করে তাদেরকে ফিলিস্তিন থেকে বিতাড়িত করা, গণহত্যা, এবং বাজার ও রাস্তাঘাটসহ জনসমাবেশস্থলে বোমা বিস্ফারণ ঘটিয়ে ফিলিস্তিনীদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করে তাদের বিতাড়নের কাজ ত্বরান্বিত করা ছিল হাগানাহ বাহিনীর কাজ। অতপর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভোটাভোটির মাধ্যমে ফিলিস্তিনকে দ্বিখন্ডিত করা সংক্রান্ত ১৮১ নম্বর প্রস্তাব গৃহীত হয়।—মজার ব্যাপার হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে অধিকাংশ বিষয়ে মতপার্থক্য থাকলেও ফিলিস্তিন প্রসঙ্গে তারা এক হয়ে যায়। দুটি দেশই ফিলিস্তিনী জনগণের বিপক্ষে এবং ইহুদীবাদীদের পক্ষে ভোট দান করে। জাতিসংঘের এই চরম অন্যায় ও অবিচারমূলক প্রস্তাবের বিরুদ্ধে আরব দেশগুলোর প্রতিনিধিরা তীব্র প্রতিবাদ জানান। জাতিসংঘের অবিচারমূলক সিদ্ধান্ত হিসাবে ফিলিস্তিনকে দু’ভাগে ভাগ করা হয়। ফিলিস্তিনী জনগণের নিজেদের ভূখন্ড হওয়া সত্ত্বেও তাদেরকে ফিলিস্তিনের মাত্র ৪৫ শতাংশ ভূভাগ দেয়া হয় এবং বাকী ৫৫ ভাগ ইহুদীবাদীদের জন্য ছেড়ে দেয়া হয়। ১৯৮৭সালের ২৯শে নভেম্বর তেলআবিব ও বাইতুল মোকাদ্দাসে অনেক আনন্দ ফূর্তির সাথে সাথে পশ্চিমাদের দেয়া ৩০ লাখ ডলার অর্থ দিয়ে ইহুদীবাদী গুপ্ত বাহিনীর জন্য বন্দুক, ট্যাঙ্ক, গোলাবারুদ ও জঙ্গীবিমান কেনা হয়। এ সময় গোপনে ইহুদীবাদীদের নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে অস্ত্র নির্মাণ কারখানার কাঁচামাল সংগ্রহ করে অধিকৃত ফিলিস্তিনে পাঠাতে থাকে।

এদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটি বৃহৎ শক্তিরুপে আত্মপ্রকাশ করে। যদিও অতীতে বৃটিশরা সহযোগিতা দিয়েছিল কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তারা ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ইহুদীরা মার্কিনীদের দিকে ঝুকে পড়ে। ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বর মাসে বৃটিশ সরকার ঘোষনা করে যে ১৯৪৮ সালের ১৫ই মে ফিলিস্তিন থেকে তার উপনিবেশ তুলে দেয়া হবে। সাথে সাথে ইসরাইলীরা জোর কদমে তাদের ইহুদী রাষ্ট্র গঠনের কাজ শুরু করে দেয়। ফিলিস্তিনের জনগণের বিরুদ্ধে একের পর এক সন্ত্রাসী হামলায় শত শত মানুষ নিহত হয়। এসব হামলার ফলে জনগণ মৃত্যু অথবা মাতৃভূমি ছেড়ে পলায়ন, এ দুটির একটি বেছে নিতে বাধ্য হয়। এ সময় ইহুদী বাহিনী “হাগানাহ”র সদস্যরা রাত্রিবেলায় নিঃশব্দে ফিলিস্তিনী গ্রামগুলোতে প্রবেশ করতো। তারা ফিলিস্তিনের বাড়ীঘরের আশেপাশে ডিনামাইট পেতে রাখতো। এরপর কাঠের তৈরী দরজা জানালায় দাহ্য পদার্থ ঢেলে দিয়ে আগুন ধরিয়ে দিত যাতে আগুনে পুড়ে এবং ডিনামাইট বিস্ফোরণের ফলে নিহত ফিলিস্তিনীদের আর কোন অস্তিত্ব পৃথিবীর বুকে না থাকে। ফিলিস্তিনীরা কোন কিছু বুঝে উঠার আগেই নিজেদের ঘরবাড়ীর মধ্যেই জ্বলে পুড়ে অঙ্গার হয়ে যেত। ফিলিস্তিনের “দির ইয়াসিন” গ্রামের কুখ্যাত গণহত্যা উদাহরনীয়। এভাবে ইহুদীবাদীরা হত্যা ও ত্রাস সৃষ্টির মাধ্যমে লাখ লাখ ফিলিস্তিনীকে তাদের মাতৃভূমি ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য করে।

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শুরু হওয়ার সাথে সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটি নব্য শক্তি হিসাবে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে আত্মপ্রকাশ করে। বৃটেন ও ফ্রান্স সামরিক দিক দিয়ে দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ফলে মধ্যপ্রাচ্যের উপনিবেশ ধরে রাখার জন্য মার্কিনীরা এ সুযোগ নেয়। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শিল্প বিশেষ করে অস্ত্র কারখানাগুলোর মালিকরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অস্ত্র যোগান দিয়ে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়ে গিয়েছিল। ঐ যুদ্ধ শেষ হলে তারা তখন আরো দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের সন্ধান করছিল। এদিকে তখন পর্যন্ত মধ্য প্রাচ্যের তেল সম্পদ বৃটিশদের দখলে ছিল। যুদ্ধের শুরুতে মার্কিন কোম্পানীগুলো কেবলমাত্র শতকরা ১০ ভাগের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিল, যুদ্ধ শেষে তার ৪২ভাগ তেলের খনি মার্কিনীদের কর্তৃত্বে চলে যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর কাল থেকে সৌদি আরবে নতুন নতুন তেল খনি আবিষ্কৃত হয়। মার্কিন কোম্পানীগুলিও সাথে সাথে আরবদের সাথে এসব তেল উত্তোলন ও তা বিক্রির ব্যাপারে দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি করে ফেলে। ফলে এসব নিয়ে বৃটিশ ও মার্কির্নীদের মাঝে টানাপোড়ান শুরু হয়। ফিলিস্তিনের কর্তৃত্ব লাভের আশায় ১৯৪৬সালে তৎকালীর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান ও তার উপদেষ্টারা একটি কমিটি গঠন করে ফিলিস্তিন প্রসঙ্গে ব্যাপক গবেষনা চালায়। মার্কিন সরকার যখন যুক্তরাষ্ট্রে বসে এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, তখন ইহুদী সন্ত্রাসীগোষ্ঠীগুলি ফিলিস্তিন থেকে বৃটিশ সেনাদের বিতাড়িত করার লক্ষ্যে “গুরু মারা বিদ্যা”র অনুকরণে তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী হামলা শুরু করে। তারা ফিলিস্তিনে বৃটিশ সরকারী অফিসে বোমা হামলা চালায়। বৃটিশ সেনাকর্মকর্তাদের হত্যার পাশাপাশি বৃটিশ সেনাদের চলাচলের সড়ক ও ব্রিজগুলো ডিনামাইট দিয়ে গুড়িয়ে দেয়। বৃটিশ উপনিবেশএর শেষের দিকে লন্ডনের সাথেও তাদের বিরোধ বাধে। এর প্রধাণ কারণ বিশ্বের বিভিন্ন স্থান থেকে কয়েক লক্ষ ইহুদীর ফিলিস্তিন খূখন্ডে আসার বিষয়টিকে শেষ দিকে বৃটেনের সমর্থণ না করার কারণে ইহুদীবাদীরা বৃটিশদের বিরুদ্ধে এসব হামলা চালায়। বৃটিশরা যখন দেখে যে তাদের নিয়ন্ত্রণ বৃটিশদের হাত থেকে ইহুদীদের হাতে চলে যাচ্ছে ঠিক তখনই এ আশংকায় লন্ডন ফিলিস্তিনে লাখ লাখ ইহুদীকে আসতে দেয়ায় বিরোধিতা করেছিল। এই ফাঁকে বৃটিশরা ফিলিস্তিন থেকে চলে যাবার পর তাদের দেয়া প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ইহুদীবাদীরা নিরস্ত্র ফিলিস্তিনী জনগণের উপর ঝাপিয়ে পড়ে। কয়েক মাসের মধ্যে ইহুদীবাদীদের হাতে হাজার হাজার ফিলিস্তিনী নিহত হয়, আজও দির ইয়াসির এ ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের স্মৃতি বহন করছে।

আন্তর্জাতিক রেড ক্রসের প্রতিনিধি জ্যাক ডুরিনিয়া সেই সময় ইরগুণের পাশবিক হত্যাকান্ড সস্পর্কে এক প্রতিবেদনে বলেছিলেন, “দির ইয়াসির গ্রামের জনগণের উপর চালানো গণহত্যায় ফিলিস্তিনী নারীদের পেট বিদীর্ণ করা হয় এবং শিশুদের গলা কেটে তাদের মস্তক আলাদা করে ফেলা হয়। এছাড়া ফিলিস্তিনী জনগণের বাড়ীঘর আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়া হয়। রেডক্রস কর্মীরা ধ্বংসস্তুপের মধ্যে  মানুষের শরীরের টুকরো টুকরো অংশ এবং বিভিন্ন কুপের মধ্যে থেতলে যাওয়া মানবদেহ খুঁজে পায়। গোটা গ্রাম ভয়াবহ মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়। ফিলিস্তিনী নারী, পুরুষ ও শিশুদের পাশবিক কায়দায় হত্যা করার পর বোমা মেরে তাদের শরীর খন্ডবিখন্ড করে ফেলা হয়েছিল”। মার্কিন ও ইউরোপীয় মিত্রদের পাঠানো অস্ত্র ও জঙ্গিবিমানের সাহায্যে সশস্ত্র ইহুদীবাদীরা ফিলিস্তিনী গ্রাম ও শহরগুলোতে ঝাপিয়ে পড়ে। ডেভিড বেন গোরিওন ইসরাইলের প্রাথমিক প্রতিষ্ঠাতা ও প্রথম প্রধানমন্ত্রী এ সম্পর্কে পরবর্তীতে স্বীকার করেন, জাতিসংঘ অন্যায়ভাবে যে পরিমাণ ভূমি ইহুদীবাদীদেরকে দিয়েছিল, তার চেয়েও বেশী ভূমি দখল করার উদ্দেশ্যে ঐ হামলা চালানো হয়েছিল। ফিলিস্তিনী জনগণকে বিতাড়নের মাধ্যমে স্থানীয় অধিবাসীমুক্ত একটি ভূমি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা ছিল তাদের এ বর্বোরোচিত কাজের মূল উদ্দেশ্য। ১৯৪৮সালের ২৪শে এপ্রিল গোরিওন বাইতুল মোকাদ্দাসের এক বিজয় উৎসবের ঘোষনা: “আমরা একটি ইহুদী সরকার গঠনের দ্বারপ্রান্তে পৌছে গেছি”। গোরিওনের ঐ ঘোষনার উদ্দেশ্য ছিল জাতিসংঘে ফিলিস্তিনকে বিভক্ত করার বিষয় নিয়ে যে দীর্ঘ বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল, তার অবসান ঘটিয়ে বিশ্বকে জানানো। এটা বুঝানোর চেষ্টা করা যে, ইহুদী রাষ্ট্র গঠনের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। অবশেষে ১৯৪৮সালের ১৪ই এপ্রিল ফিলিস্তিন থেকে সর্বশেষ বৃটিশ সেনার চলে যাবার মুহূর্তে ডেভিড বেন গোরিওন আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরাইল নামক একটি অবৈধ রাষ্ট্র গঠনের ঘোষনা দেন। তার ঐ ঘোষনার মাত্র ১৫ মিনিটের মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিয়ে গোরিওনের কাছে বার্তা পাঠান। এর পরপরই সমাজবাদী সোভিয়েত ইউনিয়নও বিশ্বের সর্বপ্রথম ইহুদী রাষ্ট্র ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেয়। এভাবে অবৈধ একটি দেশকে বৈধতার টেগ লাগানো হয়।

নিজেদের অবস্থা পাকা করতে তারা “প্রত্যাবর্তন” আইন পাশ করে। ইহুদীদেরকে পূর্ণ নাগরিকত্ব প্রদানের ব্যবস্থা রাখা হয়। গণহত্যার হাত থেকে বেঁচে যাওয়া দশ লাখ ফিলিস্তিনীকে তাদের আবাস ভুমি থেকে বিতাড়িত করা হয়। ফিলিস্তিনীরা শরণার্থী হয়ে পার্শ্ববর্তী আরব রাষ্ট্রগুলোতে আশ্রয় নেয়ার পর ইহুদীবাদী সরকার ফিলিস্তিনীদের পতিত বাড়ী অধিগ্রহণ করে তা অভিবাসন গ্রহণকারী ইহুদীদের মধ্যে বন্ঠন করে দেয়। এভাবে ইসরাইল প্রতিষ্ঠার তিন বৎসরের মাঝে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ১০ লাখ ইহুদী অর্থাৎ যে পরিমাণ ফিলিস্তিনীকে বিতাড়িত করা হয় সেই পরিমাণ ইহুদীরা এসে বসতি গড়ে তোলে। এ সম্পর্কে ১৯৬০ এর দশকের ইসরাইলী প্রধানমন্ত্রী গোল্ডমেয়ারের উক্তি ছিল, “সে সময় ফিলিস্তিনে কোন মানুষই ছিলনা, যাদেরকে বিতাড়িত করে আমরা তাদের দেশ দখল করবো। কারণ আমরা এই ভুখন্ডে আসার আগেই ফিলিস্তিনীদেরকে তাড়িয়ে দেয়া হয়েছিল।”

১৯৪৮- ১৯৪৯ মাত্র এক বছরে ফিলিস্তিনের ৪৩২টি গ্রাম ধ্বংস করে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়া হয়। যারা মাটির মায়ার মাটি কামড়ে পড়েছিলেন, তাদেরে বিতাড়নের শ্রেষ্ঠ উপায় হিসাবে নবগঠিত সরকারের উপপ্রধানমন্ত্রী ঈগল এ্যালেন বলেন, “ফিলিস্তিনে থেকে যাওয়া হাজার হাজার মুসলমানকে বিতাড়িত করার লক্ষ্যে একটি উপায় বের করা জরুরী হয়ে পড়েছিল। স্থানীয় পরিষদগুলোর ইহুদী প্রধানদেরকে এই গুজব ছড়িয়ে দিতে বলা হয় যে, হুলেহ অঞ্চলের সকল গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়া হবে। এ গুজব ছড়িয়ে পড়ার পর হাজার হাজার ফিলিস্তিনী তাদের বাড়ীঘর ছেড়ে পালিয়ে যায়। এভাবে আমাদের পরিকল্পনা সহজেই বাস্তবায়িত হয়”। ইসরাইল প্রতিষ্ঠার ঘোষনা দেয়ার পর মিশর, ইরাক, সিরিয়া, লেবানন ও জর্দান থেকে আরব সেনারা ফিলিস্তিনের দিকে মার্চ করে। ফলে প্রথম আরব ইসরাইল যুদ্ধের সূচনা হয়।

জাতিসংঘের বিতর্কীত ভূমিকা: ঐ যুদ্ধে আরব সেনাবাহিনী প্রথমে ফিলিস্তিনের বিশাল ভুমি ইহুদীবাদীদের থেকে দখল করে নেয়। এক পর্যায়ে তারা ইসরাইলকে নিশ্চিহ্ন করে দেবার অবস্থায় চলে যায়। কিন্তু ইহুদীবাদীদের প্রতি মার্কিন সরকারের সমর্থন এবং আন্তর্জাতিক চাপের মুখে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের হস্তক্ষেপে ১৯৪৮ সালের ২ জুন আরব ও ইসরাইল সেনাদের মধ্যে এক যুদ্ধ বিরতি হয়। ঐ যুদ্ধ বিরতি মাত্র এক সপ্তাহ স্থায়ী ছিল। অন্যদিকে সদ্য প্রতিষ্ঠিত ইসরাইলের প্রতি পশ্চিমা অর্থনৈতিক ও সমরাস্ত্র সাহায্যের ঢল নামে। জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধ বিরতি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ছয় দিনের মাথায় ইসরাইলী বাহিনী পশ্চিমা সহায়তা নিয়ে যুদ্ধ বিরতি লংঘন করে আরব বাহিনীর নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে হামলা চালায়। এ সময় যুদ্ধ বিরতির কারণে আরব বাহিণী সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত ছিল। ফলে খুব অল্প সময়ের মধ্যে ইসরাইলের বিজয়ের মাধ্যমে ঐ যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে। এ যুদ্ধে ইসরাইল জাতিসংঘের যে ভূমি পেয়েছিল, তার চেয়েও অনেক বেশী ভূখন্ডের উপর জবরদখল প্রতিষ্ঠা করে। ইহুদীবাদী সেনারা নতুন করে দখলীকৃত ফিলিস্তিনী ভূখন্ডের অধিকাংশ গ্রামকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়। এ সময় ফিলিস্তিনী জনগণসহ আরবরা ইসরাইলের সাথে অসম যুদ্ধে লিপ্ত হয়। অবশেষে কয়েকমাস যুদ্ধ ও সহিংসতার পর ১৯৪৯ সালের জানুয়ারী মাসে পুনরায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘ আরবদেরকে দ্বিতীয়দফা যুদ্ধবিরতিতে বাধ্য করে। ঐ যুদ্ধ বিরতির ফলে ফিলিস্তিন বাহ্যত শান্ত হয়। কিন্তু এর ভিতরে থেকে যায় ছাই চাপা আগুন।

১৯৬৭ সালের ৬ দিন ব্যাপী আরব-ইসরাইল যুদ্ধকে উভয়পক্ষের মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক ও ব্যাপকভিত্তিক যুদ্ধ বলে মনে করা হয়। ঐ যুদ্ধের উদ্দেশ্য বেন গোরিওন মনে করতেন, ইহুদীবাদী সেনারা যতখানি ভূখন্ড দখল করতে পারবে, সে পর্যন্ত ইসরাইলের সীমানা বিসতৃত হবে। কাজেই ইসরাইলের সীমানা চারদিকে বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে ১৯৬৭ সালের ৫ই জুন ইসরাইল, মিশর, সিরিয়া জর্দান ও ইরাকের বিমানবন্দরগুলোতে একযোগে হামলা চালায় এবং ঐ অকস্মাৎ হামলায় সামরিক দিক দিয়ে ঐ চার আরব দেশের ব্যাপক ক্ষতি হয়। আরব দেশগুলো ইসরাইলী  হামলা প্রতিরোধ করলে উভয় পক্ষের মাঝে যুদ্ধ বেধে যায় এবং যুদ্ধের প্রথম কয়েকদিন বিমান হামলা করে ইসরাইলি আরব দেশগুলোর ব্যাপক ক্ষতি করে। স্থলযুদ্ধেও ইসরাইল মার্কিন সামরিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে মিশরের সিনাই মরুভূমি, সিরিয়ার গোলান মালভূমি, জর্দান নদীর পশ্চিম তীর, বাইতুল মোকাদ্দাসের পূর্ব অংশ এবং গাজা উপত্যকা দখল করে নেয়। দখলদার ইহুদীদের মতে জাতিসংঘ গোটা ফিলিস্তিন তাদেরকে না দিয়ে ঐ ভূখন্ড দ্বিখন্ডিত করে যে ভুল করেছিল, ৬৭ সালের যুদ্ধের মাধ্যমে সে ভুল সংশোধিত হয়েছে। গোলান মালভূমির কৌশলগত অবস্থান বিশেষ করে বৈরুত ও দামেস্কের সাথে এর সংযোগ থাকায় ইহুদীবাদীরা ফিলিস্তিন জবরদখলের শুরু থেকে ঐ মালভূমি জবরদখলের সুযোগ খুঁজতে থাকে। উল্লেখ্য জুন মাসের যুদ্ধে ইসরাইল এক ঢিলে দুই পাখি শিকার করে। অধিকাংশ ঐতিহাসিক ও আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ মনে করেন, জাতিসংঘ একবার ১৯৪৭ সালে ফিলিস্তিনী ভূখন্ড দ্বিখন্ডিত করে সেখানকার মুসলিম জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে চরম অবিচার করেছিল। এরপর সংস্থাটি ১৯৬৭ সালে ২৪২ নম্বর প্রস্তাব পাশের মাধ্যমে ফিলিস্তিনী জনগণের অধিকার হরণের দ্বিতীয় ঐতিহাসিক ভুল ও অন্যায় করে। কার্যত এটি করে শতকরা ৮০ভাগ ফিলিস্তিনী ভূখন্ডকে বৈধভাবে ইসরাইলকে দিয়ে দেয়া হয়, যার পরিমাণ ১৯৪৭ সালের জাতিসংঘের প্রস্তাবেই ছিল ৫৫ ভাগ। আজো এই একবিংশ শতাব্দীতেও ইহুদীবাদীদের এই সরকার ও ফিলিস্তিনী জনগণ মধ্যপ্রাচ্যের সকল সংকটের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে। এত সারিবাধা অন্যায় অবিচার যে বিশ^ কর্তার দৃষ্টিতেও ধরা পড়েছে, সেটি আশা করছি পরবর্তী লেখাতে আনবো। ইহুদীরা না ইসরাইলীয় না সেমেটিক/ জায়নবাদী ইহুদীরা নবী ইব্রাহিমের নয়, হিটলারের অনুসারী হিসাবে প্রমাণিত

নাজমা মোস্তফা, (১০ আগষ্ট ২০১৬)।

 

 

 

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

Tag Cloud

%d bloggers like this: