Articles published in this site are copyright protected.

Archive for May, 2016

বাংলাদেশে তামাক-বিরোধী আন্দোলন

 ডাঃ এম, এ শুকুর (মরহুম)

(প্রবন্ধটি ৩০ শে মার্চ, ১৯৮১ ইংরেজীতে দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল)।

ধূমপান বিরোধী আন্দোলন পৃথিবীতে অনেক আছে। কিন্তু আমাদের এই আন্দোলন কার্যতঃ একটি তামাক বিরোধী অভিযান। শুরু থেকেই আমরা তামাক গাছের ক্ষতিকর দিকটা বিবেচনা করে, গাছটিকে একটি নির্দিষ্ট সময় সীমার মধ্যে ধরাপৃষ্ঠ থেকে উপড়ে ফেলে দেবার স্বপক্ষে জনমত গড়ে তোলার জন্য সমাজ দেহে প্রচলিত যাবতীয় অন্যায়, অনাচার, অসাম্য, অজ্ঞানতা, অশিক্ষা, কুশিক্ষা ও শোষণ বঞ্চনার প্রকৃত কার্যকারণ খুঁজে নিয়ে এর প্রতিবিধানের উপায় খুঁজছিলাম। এই হিসাবে আমাদের এই আন্দোলন শুধু একক, অনন্য বা অসাধারণই নয়, বরং একটি নজিরবিহীন ঘটনা।

শুরুতে গ্রামীন পরিবেশে জন্ম নিলেও বর্তমানে এটি একটি সমাজ সংস্কারমূলক জাতীয় প্রতিষ্ঠান। এর কেন্দ্রীয় কমিটিতে দেশের সকল অঞ্চলের জ্ঞানী-গুণী, চিন্তাবিদগণের সমাবেশ ঘটেছে। আমরা ১৯৮০সালের ৩০ শে মার্চ তারিখে বাংলাদেশ ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বায়তুল মোকাররমস্থ মিলনায়তনে ধূমপানের বিরুদ্ধে একটি সেমিনার ডেকেছিলাম। এই সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন পি, জি, হাসপাতালের পরিচালক প্রফেসর নুরুল ইসলাম। প্রফেসর ইসলাম তার ভাষণে ধূমপানকে একটি মারাত্মক সামজিক ব্যাধি বলে অভিহিত করে এই আন্দোলনকে দেশের অনাচে কানাচে ছড়িয়ে দিবার জন্য উপদেশ দান করেন। তদবধি তারই পৃষ্ঠপোষতকার “তামাক বিরোধী আন্দোলন, বাংলাদেশ” প্রচার অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে।

গত ১৮ই জানুয়ারী ১৯৮১ ইংরেজীতে, বাংলাদেশ বহূমুত্র সমিতির হলরুমে ধূমপানের বিরুদ্ধে আমরা আবারও একটি সেমিনার ডেকেছিলাম। উক্ত সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধান পৃষ্ঠপোষক প্রফেসর নুরুল ইসলাম। বকতৃতা করেন প্রেসিডেন্ট সাবেক উপদেষ্টা ও বহূমুত্র সমিতির সভাপতি ডাঃ মুহাম্মদ ইব্রাহিম, বক্ষরোগ বিশেষজ্ঞ ও এডিনবরা রয়েল কলেজ অব ফিজিসিয়ানের সভাপতি স্যার জন ক্রফটন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ধূমপান নিরোধক কমিটির পরিচালক ডাঃ এলিন ক্রফটন, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট বার সমিতির সদস্য এডভোকেট আমিরুল ইসলাম এবং আরো অনেকে।

স্যার জন ক্রফটন ও মিসেস এলিন ক্রফটন উভয়ে এই অভিমত ব্যক্ত করেন যে, বাংলাদেশ তামাক বিরোধী আন্দোলনের মত এমন সুসংগঠিত আন্দোলন আর কোথাও নেই। তাই এই আন্দোলনকে সারা বিশ্বের সর্বত্র ছড়িয়ে দেবার স্বপক্ষে সুপারিশ করেন। সেমিনারের পর পরই এতদসংক্রান্ত খবরাদিসহ ধূমপান সম্বন্ধে তথ্যবহুল বহু প্রবন্ধ বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়েছে। আমরা এর জন্য সংশ্লিষ্ট সংবাদপত্র ও সাংবাদিকগণকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

সভায় উপস্থিত বিভিন্ন বক্তা ও অনুপস্থিত প্রবন্ধকারগণ ধূমপায়ীদেরকে ধূমপান পরিত্যাগ করার জন্য আহবান জানিয়ে বলেন যে, ধূমপান ছাড়তে পারলে আমরা সুস্বাস্থ্য ও অধিকতর সুস্থিতি সহকারে আরো অধিক দিন বাঁচতে পারবো। তারা আরো বলেন যে, ধূমপানে কোন উপকার নেই। পরন্তু, এটি সর্বপ্রকার ক্যান্সার, প্যাপটিক-আলসার, ব্রঙ্কাইটিস, বার্জাস, হাঁপানীসহ অধিকাংশ দূরারোগ্য রোগের প্রকোপ ও প্রসার ঘটায়।

ডাঃ মুহাম্মদ ইব্রাহিম তার উদ্বোধনী ভাষণে ধূমপানের ক্ষতিকর দিক সমূহ তুলে ধরেন এবং দেশের প্রতিটি গ্রামে গঞ্জে শহরে এই অভিযানকে ছড়িয়ে দেবার জন্য বিভিন্ন প্রচার মাধ্যম ও চলতি সভার উদ্যোক্তাগণের প্রতি আহবান জানান।

স্যার জন ক্রফটন বলেন, অপেক্ষাকৃত গরীব ও অনুন্নত দেশসমূহে মহামারীর আকারে ধূমপানের প্রসার ঘটছে। পক্ষান্তরে উন্নত দেশসমূহে ধূমপায়ীর সংখ্যা ক্রমশঃ কমে আসছে। তিনি বিভিন্ন চিত্র প্রদর্শনের মাধ্যমে বলেন যে, বৃটেনের চিকিৎসকগণ সার্বিকভাবে ধূমপান বর্জন করেছেন। এর ফলে মৃত্যুর হার সেখানে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ কমে গেছে।

ডাঃ এলিন ক্রফটন বলেন, ধূমপান এমন একটি নেশা যা ধূমপায়ী থেকে অধূমপায়ী, বড় থেকে ছোট এমনকি কিশোরদের মাঝে প্রতিনিয়ত মহামারীর আকারে বিস্তার লাভ করছে। তিনি উন্নয়নশীল দেশে ব্যাপক ধূমপানের জন্য অশিক্ষা ও অল্প শিক্ষাকেই দায়ী করেন। তার মতে ডাক্তার, জনস্বাস্থ্য বিভাগ, শিক্ষক, সংবাদপত্র, রাজনীতিক ও সমাজ নেতৃবৃন্দ ধূমপান বিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন।

সভাপতির ভাষণে প্রফেসর নুরুল ইসলাম বলেন, এদেশে ধূমপানের ব্যাপক প্রসারের জন্য ডাক্তার, শিক্ষক, রাজনীতিবিদ ও সমাজসেবীরাই দায়ী। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, আমাদের দেশে প্রচলিত ধর্মীয় অনুশাসন ও উন্নত মানের সামাজিক মূল্যবোধ ধূমপানের কু-অভ্যাস বন্ধ করার জন্য অত্যন্ত সহায়ক হবে। তিনি দেশের সকল চিকিৎসক, সাংবাদিক ও সমাজ নেতৃবৃন্দকে এ ব্যাপারে এগিয়ে আসার জন্য অনুরোধ জানান।

চিকাগোয় অবস্থিত আমেরিকান মুসলিম মিশনের সদস্য বর্তমানে আলাবামা মসজিদের ইমাম আলাউদ্দিন শাহবাজ বিশ্বনবী মুহাম্মদ (সঃ) এর উদধৃতি উল্লেখ করে বলেছেন যে, প্রতিটি নেশাদ্রব্য হল খমর এবং প্রতিটি খমর হচ্ছে হারাম। তার মতে, যেহেতু নিকোটিন একটি জঘন্যতম নেশাদ্রব্য এ কারণে তামাক ও তামাক থেকে প্রস্তুত সকল বস্তুই হারাম ও পরিত্যাজ্য। আমাদের উপরোক্ত সেমিনারের পর পর দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক আজাদ দৈনিক সংগ্রাম ও বিচিত্রায় সম্পাদকীয় বের হয়েছে।

গত ২১শে জানুয়ারী তারিখে “ধূমপান নিষেধ” – এই শিরোনামে দৈনিক ইত্তেফাকে যে সম্পাদকীয় ছাপা হয়েছে, তাতে আছে এতদিন ধর্মীয় দৃষ্টিকোন থেকে ধূমপান বন্ধের চেষ্টা হয়েছে, এখন স্বাস্থ্যগত ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি ক্ষতিকর বিবেচিত হলে এবং সরকারী প্রচারযন্ত্র ও সংস্থার মাধ্যমে সর্বত্র এর বর্ণনা করা হলে ধূমপানের প্রসার রোধ করা সম্ভব।

দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকায় “ধূমপান ও ভয়াবহ পরিণাম” এই শিরোনামে জনাব জুলফিকার আহমদ কিসমতি সাহেবের লেখা একটি সুদীর্ঘ প্রবন্ধ ছাপা হয়েছে ২০শে জানুয়ারী, ১৯৮১ ইং তারিখে। প্রবন্ধকার লিখেছেনঃ আমার বিশ্বাস, অন্যান্য বিষয়ের প্রচারের ন্যায় ধূমপানের অপকারিতা ব্যাপকভাবে প্রচারিত হলে এবং এই সঙ্গে উদভুত সমস্যাবলী যেমন, বিড়ি-সিগারেট কারখানার কর্মচারীগণকে অন্য শিল্পকর্মের সুযোগ দান ও তামাকের ক্ষেতসমূহে অন্য কোন অর্থকরী ফসল উৎপাদনের ব্যবস্থা নিলে আমাদের দেশ থেকে ক্ষতিকর এই অভ্যাসটি দূরীভুত হতে পারে।

বিচিত্রা : ১৯৮১ সালের ২৩শে জানুয়ারীতে প্রকাশিত সংখ্যায় সেমিনারে ডাঃ (মিসেস) এলিন ক্রফটনের বকতৃতার বরাত দিয়ে লিখেছেনঃ উন্নয়নশীল দেশে যে পরিমাণ তামাকের চাষ হয়, তার এক চতুর্থাংশ বিদেশে রফতানী হয়। বাকীটা দেশের জনসাধারণের ব্যবহারে লাগানো হয়। সরকার রাজস্ব বাড়াতে সিগারেট শিল্পকে উৎসাহিত করছেন, অথচ সত্যিকার অর্থে এই রাজস্ব বাড়ানোর জন্য জনগনের স্বাস্থ্য কি পরিমাণ নষ্ট হচ্ছে তা বিবেচনা করা হয় না।

প্রফেসর নুরুল ইসলাম সাহেবের বক্তব্যের পুনরুল্লেখ করে আবারও বলবো, আমরা মুসলমান। আমাদের ধর্মীয় অনুশাসন ও সামাজিক বিধি বিধানে ধূমপানের কোন স্থান নেই। পরন্তু আমাদের ধর্মে ইছরাফ বা অপচয় অত্যন্ত নিন্দনীয়। তাই অন্য কোন দেশে বা অন্য কোন সমাজে সার্বিকভাবে ধূমপান বন্ধ করা সম্ভব না হলেও, এখানে এই দেশে তা খুবই সম্ভব।

সম্প্রতি নোবেল পুরষ্কার বিজয়ী প্রফেসর আব্দুস সালাম বলেছেন, বিজ্ঞান বা বিশেষ জ্ঞান যার নেই তাকে আ’লিম বলা যায় না। আমরাও চাইঃ ন্যায়, সত্য, সাম্য ও বিজ্ঞানের জয়যাত্রাকে সহজ করে আনার জন্যে, শিরক, বেদআত, অজ্ঞানতার অবসান হোক। এই উপমহাদেশের প্রায় সর্বত্র শিরক, বেদআত ও অজ্ঞানতার এই পর্বত প্রমাণ নিগড়কে ভাঙতে হলে এ যাবত অজানা কুরআনী সত্য সমূহকে খুঁজে বের করতেই হবে।

কুরআনের একটি সুরা বা অধ্যায়ের নাম “দুখান” দুখানের আভিধানিক অর্থ ধূঁয়া, খরা বা দুর্ভিক্ষআখেরী জামানায় ধূঁয়া যে একদিন মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক স্বাস্থ্য, ভৌগলিক পরিবেশ, রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন এমনকি, মানব সভ্যতার স্থায়িত্বের জন্য বিপজ্জনক হয়ে পড়তে পারে এবং এই অবস্থায় শেষ পর্যন্ত মুমিনের জয় ও সত্য প্রত্যাখ্যানকারীদের বিপর্যয় নেমে আসবে এরই সুস্পষ্ট ইঙ্গিত ছিল উপরোক্ত সুরার বিভিন্ন আয়াতের মাঝে। এই সুরার ৪৩ ও ৪৪ নং আয়াতে একটি গাছের নামোল্লেখ করে বলা হয়েছে –

“নিশ্চয় জাককুম বৃক্ষ,

(হবে) পাপীদের খাদ্য,

উহা ফুটন্ত পানির মত তাদের পাকস্থলীকে

দহন করবে, এবং তাদের জন্য নরক গমনের

পথ সহজ করে দেবে।”

কি সুন্দর ভবিষ্যদ্বানী। ধূমপানসহ তামাকের অন্যান্য উপকরণ যে তামাকখোরদের পাকস্থলীসহ গোটা অন্ননালীর সর্বত্র অর্থাৎ মুখ গহ্বর থেকে গুহ্যদ্বার পর্যন্ত শ্লৈষ্মিক ঝিল্লিকে কিভাবে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে তেঁতিয়ে দিয়ে পেপটিক আলসার ও ক্যানসার সৃষ্টি করে থাকে, এর প্রকৃত খবর চিকিৎসকরাই জানেন সবচেয়ে বেশী।

উপরোক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে এবং আমার সারা জীবনের সাধনা, অনুসন্ধান পর্যালোচনা ও গবেষণা-লব্ধ অভিজ্ঞান থেকে বলছি, কুরআনে বর্ণিত এই অভিশপ্ত গাছটি তামাক ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না। আপনি যদি মুমিন হোন অথবা এর কোনটি না হয়েও মানুষের সার্বিক কল্যাণে বিশ্বাসী হোন, তবুও বলুন, এমন বিষ ঝরানো বিষবৃক্ষটিকে পরিত্যাগ করা উচিত নয় কি?

অত্যন্ত আশা ও আনন্দের কথা এই যে, যে সময় ধূমপান ও তামাকের ক্ষতিকর দিক সম্বন্ধে মানুষের জ্ঞান ছিল অত্যন্ত সীমিত, তখনো আমাদের আলীম সমাজ একে ‘মকরুহ-তাহরিমী’ বা হারামের মত ঘৃণিত জিনিস বলে ঘোষণা করেছেন। আজ যখন এ ব্যাপারে সারা বিশ্বের সকল চিকিৎসক, সমাজসেবী, সাংবাদিক ও জ্ঞানী-গুণী চিন্তাবিদরা নতুনতর তথ্যাদি উপস্থাপন করছে, সেখানে আমাদেরকেও এ ব্যাপারে সমস্ত অস্পষ্টতা পরিহার করে তামাক ও তামাকজাত দ্রব্যাদিকে হারাম বলে প্রত্যাখ্যান করা উচিত। এর ফলে আমরা এমন এক অনন্য, অসাধারণ ও অনুকরণযোগ্য আদর্শিক সমাজ গড়ে তুলতে পারি, যা আগামী দিনের পৃথিবীর সকল মানুষকে পথের দিশা দিতে সক্ষম হবে।

এই প্রেক্ষিতে আমি দেশের সকল চিকিৎসক, সাংবাদিক, স্কুল কলেজ মাদ্রাসা ও বিশ্ব বিদ্যালয়ের সকল ছাত্র শিক্ষক, মসজিদের ইমাম ও সমাজনেতৃবৃন্দসহ সকল চিন্তাশীল মানুষকে ধূমপান ও তামাক বর্জনের ব্যাপারে এগিয়ে আসার জন্য আহবান জানাচ্ছি।

ধূমপান বর্জন করা কি সম্ভব?

ডাঃ এম, এ শুকুর

(এই প্রবন্ধটি দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকায় ১৯৮৩ ইংরেজী সালের ২রা এবং ৩রা এপ্রিল প্রকাশিত)।

উপরোক্ত প্রশ্নের জবাবে যে কেউ হয়তো বলবেন, এটা সম্ভব হবে না কেন? কিন্তু যে যাই বলেন না কেন, কাজটি মোটেও সহজ নয়। “তামাক বিরোধী আন্দোলন, বাংলাদেশ” – এর একজন একনিষ্ঠ কর্মী হিসাবে আমি ধূমপান নিরোধের ব্যাপারে গত এক যুগ ধরে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত আছি। আমি আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই বলছি যে ধূমপান বর্জন করা অসম্ভব নয় বটে, তবে কাজটি অত্যন্ত কঠিন। একজন ধূমপায়ীর পক্ষে ধুমপান ছেড়ে দেবার মত কঠিন কাজ সম্ভবতঃ আর নেই।

ধূমপান কিংবা তামাকের পাতা খাওয়া মানুষের দৈহিক ও আত্মিক ক্ষতির কারণ হওয়া সত্ত্বেও এবং এর মাঝে কোন উপকার নেই – এ কথা প্রমাণিত হওয়ার পরও এই বদ অভ্যাস ত্যাগ করা এত কঠিন কেন, এর পিছনে এমন কি রহস্য লুক্কায়িত আছে; কি কি ব্যবস্থাদি গ্রহণ করা হলে সার্বিকভাবে গোটা মানব জাতিকে এই বিষক্রিয়াজাত অকল্যাণের হাত থেকে বাঁচানো যেতে পারে, তারই উপায় উদ্ভাবনের প্রচেষ্ঠায় আমার আজকের এই প্রতিবেদন।

আজকের পৃথিবীতে ধূমপান বিরোধী অভিযান সর্বত্রই আছে। তবু বলে রাখা প্রয়োজন যে, “তামাক বিরোধী আন্দোলন, বাংলাদেশ” – একটি অনন্য, অসাধারণ এবং কিছুটা ব্যতিক্রমধর্মী আন্দোলন। আমরা রোগের গোড়া ধরে আঘাত হানতে চাচ্ছি। তাই, তামাক গাছকে এই শতাব্দী শেষ হওয়ার আগেই – অর্থাৎ ২০০০ সালের মধ্যে সমূলে উপড়ে ফেলে দেবার প্রস্তাব দিয়েছি।

বাংলাদেশ বিশ্বের মধ্যে একটি দরিদ্রতম দেশ। ধূমপানের ব্যাপারে নেপালের পরেই বাংলাদেশের স্থান। এর কিছু বাস্তব কারণ আছে। যে সব কারণসমূহ এখানে ধূমপায়ীর সংখ্যা বৃদ্ধিতে সাহায্য করছে, তা হচ্ছেঃ সীমাহীন দারিদ্র, নিরক্ষরতা, পরনির্ভর অর্থনীতি এবং আদর্শহীন সমাজ ব্যবস্থা। বিগত এক দশকে দেশে কিছু সংখ্যক লোকের হাতে মাত্রাতিরিক্ত পয়সা এসেছে। যার  ফলে সমাজের সর্বস্তরে, এমনকি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পবিত্র অঙ্গনসমূহে ও নীতি নৈতিকতার নিদারুণ অবক্ষয় ঘটছে। কার্যত দেখা যায় যে, শিক্ষক, প্রশাসক, চিকিৎসক এবং সমাজ নেতাদের অনেকেই ধূমপানকে মাছ ভাতের চেয়েও অধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। উঠতি পূঁজিপতিরা দামী নামী সিগারেট ব্যবহারকে তাদের সম্মান, প্রতিপত্তি ও আভিজাত্যের পরিচায়ক বলে মনে করেন।

তথাপি বলব, ধূমপান কিংবা তামাকের পাতা চিবিয়ে খাওয়ার এই মহড়া সমাজের একক একটি সমস্যা মাত্র নয়। সমাজ জীবন আজ অন্যান্য আরো আরো অনেক প্রকার নেশা, দুর্নীতি, কুসংস্কার তথা শিরক, বেদআত, অজ্ঞানতায় টইটুম্বুর হয়ে আছে। তাই ধূমপানসহ এসব অনাচার থেকে সমাজকে বাঁচাতে হলে একটি বিপ্লবাত্মক কর্মসূচীর প্রয়োজন আছে যা শুধু যে ধূমপানের মত কুঅভ্যাসের মূলোৎপাটন করবে তাই নয়, বরং একই সাথে সর্বপ্রকার অন্যায়- অবিচার, অশিক্ষা-কুশিক্ষা, শোষণ -বঞ্চনাসহ প্রতিটি নেশা, দুর্নীতি, কুসংস্কার তথা শিরক বেদআত, অজ্ঞানতার অবসান ঘটবে।

তামাক এমন একটি গাছ, যার মাঝে কোন কল্যাণকর উপাদান নেই অথচ দুরারোগ্য রোগ সৃষ্টিতে এবং দুর্নীতি ও চোরাচালানের প্রসারের ব্যাপারে এর জুড়ি আর নেই। কিন্তু আশ্চর্য এই যে, কোন জন্তু জানোয়ার এর ফুল ফল কান্ড খায় না বা এর ধারে কাছেও যায় না। অথচ নরনারী নির্বিশেষে গোটা মানব জাতি এর জন্য মাতোয়ারা। অন্য কথায়, এর মত রহস্যময় গাছ পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি আর নেই।

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা “দুই হাজার সালের মধ্যে সকলের জন্য স্বাস্থ্য” কামনা করেছেন। আমি বিভিন্ন পত্রিকায় বিবৃতি প্রকাশের মাধ্যমে আগেও বলেছি, আর আজও বলছি যে, তামাক ও তামাকজাত দ্রব্যাদির চাষ ও ব্যবহারকে এভাবে অবাধে চলতে দিলে এসব পরিকল্পনা কিছুতেই সফল হতে পারেনা। এ জন্যে “তামাক বিরোধী আন্দোলনে, বাংলাদেশ” এর সভাপতি হিসাবে সংশ্লিষ্ট সবাইকে কিছু বাস্তব পদক্ষেপ নেবার জন্য আহবান জানাচ্ছি এবং এই প্রেক্ষিতে কিছু বাস্তব প্রস্তাব রাখতে চাই।

প্রস্তাবসমূহ:

১। তামাক ও ধূমপান যে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে হারাম ও পরিত্যাজ্য, এ সম্বন্ধে যাবতীয় দ্বিধা-দ্বন্ধ-সংশয়ের অবসান হতে হবে এবং এ ব্যাপারে প্রকৃত তথ্য ও তত্ত্বাবলী জনসাধারণকে জানিয়ে দিতে হবে।

২। পীর-ওলি-বুজুর্গ (?) তাবলীগ-জামাতের সদস্যবৃন্দ, মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন ও মাদ্রাসার শিক্ষকগণকে ধূমপান এবং তামাক বিরোধী আন্দোলনের পক্ষে সোচ্চার হতে হবে।

৩। চিকিৎসক মাত্রই জানেন যে, ধূমপান অধিকাংশ ক্রনিক ও দূরারোগ্য রোগের অন্যতম কারণ, অথচ শতকরা ৯০ জন চিকিৎসককে দেখা যায় যে, তারা এক হাতে প্রেসক্রিপশন লিখছেন এবং অন্য হাতে সিগারেট খাচ্ছেন। কথা ও কাজের মাঝে বিদ্যমান এসব অসামঞ্জস্যতা বন্ধ হতে হবে এবং সকল চিকিৎসককে ধূমপান বর্জনের ব্যাপারে এগিয়ে আসার জন্যে আহবান জানাতে হবে।

৪। প্রাথমিক স্তর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সকল স্তরে “ধূমপান বিরোধী সেল” গড়তে হবে এবং শিক্ষক ও শিক্ষয়িত্রীগণকে এ ব্যাপারে জেহাদী স্পিরিট নিয়ে এগিয়ে আসার জন্য আহবান জানাতে হবে।

৫। রেডিও, টেলিভিশন ও পত্র পত্রিকায় ধূমপানের পক্ষে বিজ্ঞাপন দান বন্ধ করে দিতে হবে।

৬। “সিগারেট ও বিড়ি স্বাস্থ্যহানি ও মৃত্যু ঘটায়” এই কথা বা তার সমার্থক কথা বিড়ি ও সিগারেটের প্রতিটি প্যাকেটে বড় বড় অক্ষরে লিখে দিতে হবে।

৭। আমরা দেখেছি, সাবেক পার্লামেন্টে পুরুষ সদস্যদের মাঝে শতকরা ৯৯ জন ধূমপায়ী ছিলেন। নেশাগ্রস্ত মানুষ দিয়ে জন-কল্যাণ হতে পারে না। তাই আমাদের প্রস্তাবঃ আগামীতে এরুপ যে কোন জনপ্রতিনিধিত্বমূলক নির্বাচনে ধূমপায়ীদের নির্বাচন বন্ধ করে দিতে হবে।

৮। দেশে ধূমপান ও ধূমপায়ীদের মাত্রা ও সংখ্যাবৃদ্ধির ব্যাপারে কালো টাকার একটি বিশেষ প্রভাব আছে। এ ব্যাপারে শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত উপরতলার কর্তা ব্যক্তিরাই প্রধান ভূমিকা পালন করে থাকেন। এই অবস্থার পরিবর্তন আনতে হলে দেশের শাসনতন্ত্রে এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট ব্যবস্থাদি নিতে হবে এবং প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ ও পদোন্নতির সময় উপযুক্ততা বিবচনায় অধূমপায়ীদেরকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

ইদানিং প্রায় প্রতিটি মুসলিম দেশে এমন কি, অন্যান্য দেশেও ইসলামী শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পক্ষে ও বিপক্ষে কথা উঠেছে। ইসলামী আদর্শে আদর্শিক সত্য-নির্ভর সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হলে, প্রতিটি অকল্যাণকর ও নীতি বিগর্হিত কাজকে পরিহার করতে হবে। এ কারণে আমাদের দাবী হচ্ছে, ধুমপানসহ প্রতিটি নেশা, দুর্নীতি, কুসংস্কার তথা শিরক, বেদআত্ – অজ্ঞানতার অবসান ঘটাতে হবে। এ ব্যাপারে আমরা দেশের সকল শিক্ষক-ছাত্র-চিকিৎসক-প্রশাসক-ওলামায়ে কেরাম ও সকল স্তরের সমাজ নেতৃবৃন্দকে এগিয়ে আসার আহবান জানাচ্ছি।

কার্যতঃ শিক্ষক, চিকিৎসক ও ওলামায়ে কেরাম উদবুদ্ধ না হলে এই আন্দোলন সত্যিকার অর্থে সফল হতে পারে না। একথা অনস্বীকার্য যে, তারা এগিয়ে আসেননি বলেই ধূমপান বিরোধী আন্দোলন বাংলাদেশের জনমনে এ যাবত কোন কার্যকরী প্রভাব ফেলতে পারেনি।

পরিশেষে বলতে চাই, তামাকের গাছ ও ধূমপানের মূল রহস্য সম্বন্ধে আমাদের হাতে এমন আরো কিছু তথ্য ও তথ্যাবলী আছে, যা পরবর্তী প্রবন্ধে প্রকাশ পাবে বলে আশা করছি।

নিষিদ্ধ বৃক্ষ

ডাঃ এম, এ শুকুর

ইদানিং পত্র পত্রিকায় ধুমপানের বিপদ সম্বন্ধে জোর আলোচনা চলছে। এসব আলোচনা থেকে এটাই জানা যাচ্ছে যে, উন্নত দেশের বিভিন্ন দেশে ধূমপানের পরিমাণ ও ধূমপায়ীর সংখ্যা ক্রমেই কমে আসছে, অথচ তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নকামী দেশসমূহে ধূমপানের মাত্রা ও ধূমপায়ীর সংখ্যা হু হু করে বাড়ছে। উপরন্তু উন্নত বিশ্বের জন্য প্রস্তুত সিগারেটে যেখানে কম পরিমাণে নিকোটিন ও তামাক  আলকাতরা বা Tobacco-tar দেয়া হয়। তৃতীয় বিশ্বের মানুষের জন্য প্রস্তুত সিগারেটে অধিক মাত্রার নিকোটিন ও তামাক আলকাতরা মিশানো হয়ে থাকে। এভাবে রোগ জ্বরা ও বার্ধক্য সৃষ্টিকারী বিষে পরিমাণ বেশী দিয়ে তৈরী সিগারেট খেতে দিয়ে, অনুন্নত বিশ্বের মানুষকে আরো অধিক সংখ্যায় রোগাক্রান্ত করার চক্রান্ত চলছে।

এইভাবে বহু-জাতিক কোম্পানীসমূহ সিগারেট বিক্রি করে উন্নয়নশীল বিশ্বের দরিদ্র জনগোষ্ঠির কাছ থেকে কোটি কেটি টাকা ছিনিয়ে নিচ্ছে এবং দ্বিতীয়তঃ এর ফলে সৃষ্ট রোগের চিকিৎসার অজুহাতে ততোধিক টাকা মুনাফা করার ওছিলায় এখানে ঔষধ বিক্রির বাজার তৈরী করা হচ্ছে। পরিণামে খাদ্য-বস্ত্র, ঔষধ, পথ্য, জ্বালানী, শিল্প ও বানিজ্যের মত বিষয়ে আমাদেরকে পরনির্ভর করে রাখার জন্য এ হচ্ছে আর একটি আন্তর্জাতিক চক্রান্ত।

বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ হওয়া সত্ত্বেও খাদ্যের দিক থেকে ঘাটতি অঞ্চল। প্রতিবছর আমাদেরকে ১০ থেকে ১৫ লাখ টন খাদ্য দ্রব্য আমদানী কর্তে হয়। এর ফলে আমাদের আয় ও অর্থনীতি বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে পারছে না। ধীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যাবে যে, এই ঘাটতি এমনভাবে সৃষ্টি করে রাখা হয়েছে, যাতে আমরা কিছুতেই স্বনির্ভর হতে না পারি। এদেশে প্রায় এক লাখ একর জমিতে তামাকের চাষ হয়। এই বিরাট পরিমাণ কৃষিজমি তামাকের চাষে ব্যাপৃত রেখে, খাদ্য ঘাটতির ব্যাপারটিকে আরো জটিল করে তোলা হয়েছে। অথচ পত্র পত্রিকায় প্রকাশ যে, তামাক চাষীরাও তাদের কৃষি পণ্যের ন্যায্য মূল্য পায়না বা পাচ্ছেনা। মাঝখানে টাউট বাটপার ও ফাড়িয়ারাই এর সমস্ত মুনাফা লুটে নেয়। তাই তামাক চাষ মূলতঃ তামাক চাষীর জন্য একটি পন্ডশ্রম মাত্র।

তাই আমরা যদি তামাককে আমাদের জীবন থেকে সম্পূর্ণভাবে বাদ দিতে পারি, আমরা যদি উপরোক্ত এই এক লাখ একর জমিতে তামাকের চাষ না করে খাদ্যশস্য উৎপাদন করতে পারি। আমরা যদি আমাদের সমস্ত চাষযোগ্য জমিতে মান্ধাতার আমলের চাষ ব্যবস্থার পরিবর্তে যান্ত্রীক চাষাবাদ করে উৎপন্ন শস্যের পরিমাণ বাড়াতে পারি। আমরা যদি আমাদের জাতীয় জীবনে নতুনতর আদর্শ সৃষ্টি করে তামাক ও ধূমপানসহ সর্বপ্রকার নেশা দুর্নীতি ও কুসংস্কার বর্জন করতে পারি, তবে আমাদের ব্যক্তিগত ও জাতীয় জীবনে যুগান্তর আসতে বাধ্য। তবে এও ঠিক যে এসব কথা বলা যত সহজ তার বাস্তবায়ন করাটা ততো সহজ নয়। কিন্তু যতই কঠিন হোক না কেন আমাদের বাঁচার তাগিদেই আমাদেরকে এর বাস্তবায়ন করতেই হবে।

যে কোন রোগ তা সংক্রামক হোক, মহামারী হোক, জীবানুঘটিত হোক কিংবা নাই হোক, তাকে নির্মূল করতে হলে এর কার্যকারণ খুঁজে পেতে হয়। সুতরাং ধূমপানসহ তামাকের ক্ষতি থেকে মুক্তি পেতে হলেও, এর পিছনে বিদ্যমান প্রকৃত রহস্যটি কি তা খুঁজে দেখতে হবে।

আজকের দিনে সারা বিশ্বের শিক্ষিত জনসমষ্টির প্রায় সকলেই জানেন যে, তামাক কিংবা ধূমপানের মাঝে কোন কল্যাণকর উপাদান নেই। অথচ তামাক ও তামাকজাত দ্রব্যাদির ব্যবহারজনিত পাপ ও ক্ষতি থেকে পেপ্টিক আলসার, ক্যান্সার, ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিস, বার্জার্স, চামরা প্রভৃতি অসংখ্য দুরারোগ্য রোগের উৎপত্তি হয়। এছাড়া ধুমপান হচ্ছে প্রশাসনিক দুর্নীতি, নৈতিক অবক্ষয় এবং চোরাচালানের পক্ষে একটি প্রধান উপলক্ষ। কিন্তু এত সত্ত্বেও এমন একটি ক্ষতিকর বস্তুকে বর্জন করা অনেকের পক্ষেই সম্ভব হচ্ছে না। একারণে ‘তামাক বিরোধী আন্দোলন, বাংলাদেশ’ এর কর্মীবৃন্দ তাদের কর্মধারা শুধু মাত্র ধূমপান বিরোধী বক্তব্যের মাঝেই সীমাবদ্ধ রাখেনি। বরং ২০০০ সালের মধ্যে তামাকের গাছটিকে ধরাপৃষ্ঠ থেকে সমূলে উপড়ে ফেলে দেবার সুস্পষ্ট প্রস্তাব দিয়েছে। এই প্রেক্ষিতে, ধূমপান ও তামাক যে কিভাবে পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষকে এমন একটি ক্ষতিকর কু-অভ্যাসের দাস বানিয়েছে এবং এর পিছনে লুক্কায়িত মূল রহস্যটা কি, এ সম্বন্ধে আমাদের উদঘাটিত কিছু তথ্য ও তত্ত্বাবলী তুলে ধরার চেষ্টা করব।

আমরা জানি ধূমপান দুরারোগ্য রোগের উৎপত্তি ঘটায়, ধূমপান আমাদের অর্থনৈতিক দুর্গতির একটি প্রধান কারণ, ধূমপান এদেশের প্রশাসনিক দুর্নীতির একটি শক্তিশালী উৎস এবং আন্তরাষ্ট্রীয় চোরাচালানের একটি বিশেষ অবলম্বন। কিন্তু এসব কথা এতদঞ্চলের ধূমপায়ী জনতার কাছে এযাবত বিশেষ কোন প্রভাব ফেলতে পারেনি। কিন্তু আমরা দেখেছি, “ধূমপান বা তামাকের পাতা খাওয়া হারাম ও পরিত্যাজ্য” কিন্তু “ধূমপান আমাদের ঈমান ও আমলের জন্য ক্ষতিকর” এরুপ কথা আমাদের শ্রোতৃবর্গকে দারুণভাবে বিচলিত করে থাকে। এসব যুক্তি ইদানিং আমাদের ধূমপান বিরোধী প্রচার অভিযানে অত্যন্ত কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে। কার্যতঃ ধূমপান ও তামাক গাছের সাথে এযুগের মানুষের সুখশান্তি ও নিরাপত্তা, এমনকি বিশ্বশান্তি যে কতটা নির্ভরশীল তা অনেকের কাছে বোধগম্য নয়।

আমি মনে করি, তামাকের চাষ বিক্রি ও শিল্পায়নকে এভাবে অবাধে চলতে দিলে এর দ্বারা আগামী অর্ধ-শতাব্দীর মাঝে গোটা মানব সভ্যতাই ধ্বংস হয়ে যেতে পারে, কার্যতঃ পরমাণু অস্ত্রের ব্যবহার ছাড়াই। মোট কথা, মানুষের দেহ-মন ও আত্মার উপরে তামাকের গাছ যে কিভাবে সৃষ্টির শুরু থেকে সভ্যতার শেষ পর্যায় পর্যন্ত তার ধ্বংসলীলা চালিয়ে যাচ্ছে তারই কিছু হদিস প্রমাণ নিয়ে আমার আজকের এই প্রতিবেদন।

দিনটি ১৯৭৪ সালের ১৩ই আগষ্ট, শুক্রবার। ঐ দিন বিকালে ‘নেদুকুবি’ অর্থাৎ নেশা-দুর্নীতি-কুসংস্কার বিরোধী আন্দোলন’ এর কর্মীবৃন্দ উদ্যোগে বাংলাদেশ ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বায়তুল মোকাররমস্ত মিলনায়তনে ধূমপানের উপর একটি সেমিনার আহুত হয়েছিল। শ্রোতা হিসাবে আমিও সেখানে উপস্থিত ছিলাম।

সমাপ্তিপর্বে সভার উদ্যোক্তাগণ উপস্থিত শ্রোতামন্ডলীর কাছ থেকে প্রশ্নাবলী আহবান করেছিলেন। জনৈক প্রশ্নকর্তা বলেন যে, ধূমপান বা তামাক যদি এতই ক্ষতিকর হয় তবে তা সৃষ্টি করা হলো কেন? কার্যতঃ তিনি এর মাধ্যমে জানতে চাইছিলেন যে, এর মাঝে কি এমন রহস্য লুক্কায়িত আছে, যার ফলে এত অকল্যাণকর হওয়া সত্বেও মানুষ পয়সা খরচ করে এই বিষ খায়? কিন্তু আশ্চর্য এই যে, সেদিন সেই শারদ-সন্ধ্যায় কেউই উপরোক্ত প্রশ্নের জবাব দেননি বা দিতে পারেন নি।

প্রশ্নটি আমাকে ভাবিত করেছিল। তদঃবধি, আমি এই রহস্যের মূল খুঁজে পেতে প্রয়াসী হয়েছিলাম এবং বিভিন্ন বই-পুস্তক ও শাস্ত্রবাণী পাঠ ও পর্যালোচনা করেছি। এদেশে এবং বিদেশে বিভিন্ন জ্ঞানী-গুণী চিন্তাবিদগণের সাথে এ সম্বন্ধে আলাপ আলোচনা করেছি। এর ফলে আমি শেষ পর্যন্ত এই অজানা প্রশ্নের জবাব খুঁজে পেতে সক্ষম হয়েছিলাম।

এমন ক্ষতিকারক গাছটি কেন সৃষ্টি করা হল, এর জবাব আমি কুরআনের মাঝেই খুঁজে পেয়েছিলাম। কুরআনের একটি আয়াতে একটি অভিশপ্ত গাছের উল্লেখ আছে। বলা হয়েছে যে, গাছটিকে মানুষের পরীক্ষার জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছে। এর অর্থ, যারা এই গাছের ফল, ফুল ও পাতা খাবে, তারাই হবে জালিম বা ক্ষতিগ্রস্ত। পক্ষান্তরে, যারা এই গাছকে পরিহার করে চলবে বা চলতে পারবে, তাদের জীবন হবে শান্তিময়। আয়াতটি দেখুন –

১৭ : ৬০ “স্মরণ কর, আমি তোমাকে বলেছিলাম যে, তোমার প্রতিপালক মানুষকে পরিবেষ্টন করে আছেন। (অর্থাৎ মিরাজ সংক্রান্ত ঘটনা) আমি তোমাকে দেখিয়েছিলাম তা এবং কুরআনে উল্লেখিত অভিশপ্ত বৃক্ষ কেবল মানুষের পরীক্ষার জন্যই। আমি ওদেরকে ভীতি প্রদর্শন করি, কিন্তু এটি তাদের তীব্র অবাধ্যতা বৃদ্ধি করে।”

আমার পক্ষে এ ব্যাপারে উদ্বেলিত হওয়ার আরো যে কারণটি ছিল তা হ’ল এই যে, আল্লাহপাক এই বিশ্বে কোন কিছুই অকারণে সৃষ্টি করেন না। কেননা, আল্লাহ বলেন, “মা খালাক্ক তা হাযা বা-তিলা” সুতরাং তামাকের মত এমন ক্ষতিকর জিনিসের সৃষ্টি রহস্যের প্রকৃত কার্যকারণ না জানা পর্যন্ত আমার মনে শান্তি ছিল না। তাই আমি আনন্দের সাথে বলতে পারি যে, আমি এই রহস্যময় গাছের পরিচয় নির্ধারণে সফল হয়েছি।

অনেকেই জানেন, কুরআন ও বাইবেলে একটি গাছের উল্লেখ আছে। সৃষ্টির শুরুতে সৃষ্টিকর্তা হযরত আদম (আঃ) ও তার সঙ্গীনিকে এই গাছটি দেখিয়ে তাদেরকে এর ধারে কাছে যেতে বারণ করেছিলেন বরং এটি ছিল স্রষ্টার প্রথম আদেশ-তথা সর্বপ্রথম নিষেধবাণী। আয়াতটি হ’ল, ২ : ৩৫ “এবং আমি বলেছিলাম হে আদম, তুমি এবং তোমার স্ত্রী এই বাগানে বসবাস কর এবং যেখান থেকে ইচ্ছা আহার কর। কিন্তু এই গাছের নিকটেও যাইওনা, নচেত তোমরা জালিমদের মধ্যে গণ্য হবে।”

এখানে এই আয়াতের মাধ্যমে বিশ্বস্রষ্টা গোটা মানব সমাজকে এই গাছ থেকে কোন কিছু খেতে, এমনকি এর ধারে-কাছেও যেতে বারণ করেছিলেন এবং গেলে কি হবে তাও বলে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, “ফাতাকুন্না মিনাজ্জালেমিন” – অর্থাৎ, যারা এই আদেশ লংঘন করবে তারা জালিমদের মাঝে গণ্য হবে। কিন্তু আশ্চর্য এই যে, এ শুধু হযরত আদম (আঃ) বা তার সঙ্গিনীর কথাই নয়, বরং অল্প কিছু সংখ্যক মানুষ ছাড়া গোটা মানবজাতি এই ঐশী আদেশকে অগ্রাহ্য করেছে এবং ফলে তারা নিজ দেহ মন ও আত্মার প্রতি, আত্মীয় পরিজনদের প্রতি, পাড়া-প্রতিবেশীদের প্রতি, এমন কি, সমাজ ও রাষ্ট্রসহ বৃহত্তর মানবগোষ্ঠীর কল্যাণের পরিপন্থী জুলুম চালিয়ে যাচ্ছে।

আর এ শুধু কুরআনেরই কথা নয়, বাইবেলেও এর সমার্থক কথা আছে। ওল্ড টেষ্টামেন্ট বা তৌরাতের সৃষ্টিতত্ত্ব সম্বন্ধে বাইবেলের যে অংশকে জেনেসিস্ বা আদিপুস্তক বলা হয় তাতে আছে “সদাপ্রভু ঈশ্বর আদমকে বললেন, তুমি এই বাগানের সমস্ত গাছ থেকে আহার কর। কিন্তু ভাল ও মন্দের জ্ঞানদানকারী এই জ্ঞানবৃক্ষের ফল খাবে না। কেননা যদি তা খাও তবে তোমরা নিশ্চয় মরে যাবে” (জেনেসিস ২ : ১৬, ১৭)।

কিন্তু আশ্চর্য এই যে, এত সুন্দর ও সুস্পষ্ট বর্ণনা ও ভবিষ্যদ্বাণী থাকা সত্বেও মানুষ আজো গাছটিকে চিনে নিতে পারেনি এবং কার্যতঃ এই অপরিচিতি ও অজ্ঞতার কারণে, অজান্তে এমন একটি ক্ষতিকর গাছের ফল, ফুল ও পাতা খেয়ে মানুষ তাদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবন ও পরিবেশকে বিষিয়ে তুলেছে।

লক্ষণীয় এই যে, বাইবেলের ভাষ্যকারগণ এই গাছের পরিচয় প্রদানে একান্তই নীরব। পক্ষান্তরে, কুরআনের ভাষ্যকারগণ এ ব্যাপারে যথেষ্ট চিন্তা-ভাবনা করেছিলেন এবং এই প্রেক্ষিতে তারা প্রায় এক ডজন গাছের নাম উল্লেখ করেছেন। কিন্তু এই সবই ছিল তাদের অনুমানভিত্তিক। যুক্তি, বিবেক বা বিজ্ঞানের সামঞ্জস্যতা তাতে ছিল না।

অধিকাংশ তফসিরকারক এই গাছটিকে গম বা গনদুম, আনজির, তানজির বা আঙ্গুর বলে অভিহিত করেছেন। আমি এরুপ প্রায় দুই ডজন তফসির দেখেছি। এদের প্রায় প্রত্যেকটিতেই তফসিরকারকগণ এসব আয়াতের ভাষ্য রচনায় বিশেষ কোন যুক্তিপূর্ণ ভাষ্য দিতে পারেননি। তবে এমন দু’খানি তফসিরগ্রন্থ দেখেছি, যা ছিল একান্তই ব্যতিক্রম। এই দু’জন তফসিরকারক কিছু ভিন্ন কথা বলেছেন। এদের একজন হলেন মুহাম্মদ তাহের – যিনি কলকাতা জামিয়া আলিয়ার অধ্যাপক এবং দ্বিতীয়জন মরহুম মওলানা মুহাম্মদ আকরম খাঁ। এরা দুজনেই তাদের তফসিরগ্রন্থে একথা অকপটে স্বীকার করেছেন যে, তারা গাছটিকে চিনতে পারেন নি। তাদের এ সরল স্বীকারোক্তি এ ব্যাপারে পরবর্তী চিন্তাবিদগণের কাজকে সহজ করে দিয়েছে। আমি নিজেও এ ব্যাপারে আমার নিজের কাজে বা গবেষনায় তা থেকে অনুপ্রেরণা লাভ করেছি।

আমি এই গাছের পরিচয় নির্ধারণে যথেষ্ট চিন্তা-ভাবনা ও অনুসন্ধান চালিয়েছি এবং শেষ পর্যন্ত এই সিদ্ধান্তে পৌছেছি যে, কুরআন ও বাইবেলে বর্ণিত এই গাছটি তামাকেরই গাছ; আমার এই অভিমতের সমর্থনে আমি অনেকগুলি প্রবন্ধ লিখেছি। প্রবন্ধগুলি ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ও সাময়িকীতে “নিষিদ্ধ বৃক্ষ” ও Forbidden Tree এই শিরোনামে ছাপা হয়েছে। আমার ভয় ছিল, হয়তো বা আমার এই অভিমতের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ আসতে পারে। কিন্তু আনন্দের কথা এই যে, এর বিরুদ্ধে কোন চ্যালেঞ্জ আসেনি বরং তা’ বিপুলভাবে সমর্থিত হয়েছে।

এ ব্যাপারে আরো কিছু কথা আছে। কুরআন ও বাইবেলের কিছু সংখ্যক ভাষ্যকার বলেছেন যে, আদমের সৃষ্টি নাকি বেহেশতে হয়েছিল। তারা বলেন যে, বর্ণিত গাছটি বেহেশতেরই গাছ। তাই তাদের মতে যেহেতু এটি বেহেশতের গাছ, সুতরাং এখানে এই পৃথিবীতে তাকে খুঁজে পাওয়ার তো কথাই নয়। কিন্তু ব্যাপারটি আদৌ তা নয়।  হযরত আদম (আঃ) শুরু থেকেই মর্ত্যবাসী জীব। কুরআনে আছে “ইন্নি যা’ইলুন ফিল আরদি খলিফাহ্” – অর্থাৎ আল্লাহপাক শুরুতেই ফেরেশতাগণকে ডেকে আদমকে তার খলিফা বা প্রতিনিধি হিসাবে “ফিল-আরদ” অর্থাৎ পৃথিবীতে পাঠানোর কথা ঘোষনা করেছিলেন। উক্ত ঘোষনায় আল্লাহপাক “ফিল-আরদ” বলেছেন, “ফিল জান্নাত” বলেন নি। তাই আমিও বলি, হযরত আদম পৃথিবীতে এসেছিলেন, কার্যতঃ আল্লাহপাকের একান্ত ইচ্ছায় এবং সুনির্ধারিত পরিকল্পনার মাধ্যমে। যারা বলেন, আদমকে প্রথমে বেহেশতে সৃষ্টি করা হয়েছিল এবং পরে গনদুম বা গম খাওয়ার অপরাধে শাস্তি হিসাবে এই ভুলের প্রায়শ্চিত্য করার জন্য এখানে এসেছিলেন, তা সত্য নয়। এসব যুক্তিহীন, অবাস্তব ও আজগুবী কথা বাইবেলের হলেও হতে পারে, কুরআনের নয়। এবং তফসিরকারকরা হয়তো বা বাইবেলের ভাষ্যের অনুকরণে কুরআনের ভাষ্য রচনার সময় এগুলো আমদানী করেছিলেন।

আমার এই অভিমতের স্বপক্ষে আরো একটি ঘটনা ঘটেছিল, যা আমার এই অভিমতকে খুবই জোরদার করেছিল। মদিনার মসজিদে নববীর এক অংশকে “রিয়াজুল জান্নাহ” বা “বেহেশতের টুকরা” বলে অভিহিত করা হয়। আমি ১৯৭২ সালে হজ্জ পালনার্থে সৌদি আরব গিয়েছিলাম এবং ১৯৭৩ সালের জানুয়ারীতে মদীনায় যাই। সেখানে মদীনার সেই জাগতিক বেহেশতে ৫টি পিলারের গোড়ায় অন্ততঃ ৪০টি স্থানে আমি একটি গাছের চিত্রকারুকার্য দেখেছিলাম। গাছগুলি ছিল তামাকেরই গাছ। আমি সেই মহিমান্বিত স্থানে এ গাছকে এভাবে থাকতে দেখে চমকে উঠেছিলাম। রুপকভাবে বলতে গেলে আমিও বলতে পারি হ্যাঁ, আমিও বেহেশতে গিয়েছিলাম এবং সেখানে এই গাছটিকে দেখে এসেছি।

এই ঘটনা, এ ব্যাপারে আমাকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করেছিল। এর ফলে আমার মনে এই বিশ্বাস আরো দৃঢ়ভাবে হয়েছিল যে, কুরআন ও বাইবেলে বর্ণিত এই গাছটি তামাকের গাছ ছাড়া আর কিছুই নয়। কার্যতঃ সমস্ত প্রাণীকূল স্রষ্টার দেয়া এই নিষেধকে মেনে নিয়েছিল। মানুষ ছাড়া আর কোন জন্তু জানোয়ার এই গাছের ধারে কাছে যায় না বা তার ফল ফুল পাতা খায় না। আমি এবার পরীক্ষার্থে দুটি তামাকের গাছ এনে আমার সবজি বাগানের এক কোণায় লাগিয়েছিলাম। ২/৩ মাস ধরে প্রত্যহ বহুবার সেখানেও গিয়েছি, কিন্তু তামাকের ফুলে কোন পোঁকা মাকড় বা সাধারণ পতঙ্গকে বসতে দেখিনি, যেন তারা সেটি এড়িয়ে যাচ্ছে। কার্যতঃ এর একমাত্র ব্যতিক্রম হলো মানুষ, যারা নিজেরা এই ঐশী আদেশের লঙ্ঘন করে নিজেরাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

পরন্তু কুরআনে বর্ণিত এই গাছটি মানুষের দেহ ধারণের উপযোগী কোন খাদ্যবস্তু ছিল না। বরং এ ছিল একটি ধিকৃত কুখাদ্য। তাইত কুরআন বলে যে, যে ব্যক্তি তা খাবে সে জালিমদের মধ্যে গণ্য হবে। চিন্তা করে দেখুন, ধূমপায়ীগণ কিভাবে নিজেদের দেহমন ও আত্মার প্রতি, আত্মীয় পরিজনদের প্রতি, দেশ, জাতি ও সমাজের প্রতি এমনকি বিশ্ব মানবের কল্যাণের প্রতি হুমকি সৃষ্টি করে ধ্বংসাত্বক জুলুম চালিয়ে যাচ্ছে। এর দ্বারা নিজের, সমাজের ও দেশের গোটা অর্থনীতিকে, সুস্বাস্থ্যকে ও নীতিনৈতিকতাকে পুড়িয়ে ছারখার করে দিচ্ছে।

বাইবেলে আছে, “এই গাছের নিকটে যেও না, নচেত তোমরা মরেই যাবে। কি সুন্দর শাস্ত্রবাণী। এই গাছের অর্থ্যাৎ তামাকের পাতা খেয়ে মানুষ ক্যানসার, পেপটিক আলসার, বার্জার্স, ক্ষয়-কাশ ও অন্যান্য বহুবিধ রোগে ভুগে ধুকে ধুকে মরছে – এ কথা অনেকেই তলিয়ে দেখে না।

বাইবেলে জেনেসিস দ্বিতীয় অধ্যায় ১৬ ও ১৭ নম্বর বাণীতে এ ব্যাপারে অতি সুন্দরভাবে বর্ণনা দেয়া আছে। গাছটিকে এখানে ‘জ্ঞানবৃক্ষ’ The Tree of Knowledge বলা হয়েছে। কিন্তু সে জ্ঞান কোন্ জ্ঞান বা কিসের জ্ঞান? কার্যত আমরা এই গাছ ও তার ব্যবহার জনিত কুফল থেকে সত্য ও মিথ্যা, ন্যায় ও অন্যায় এবং ভাল ও মন্দের পরিচয় পেতে পারি; অর্থাৎ সত্য-সাম্য-ন্যায় ও বিজ্ঞানের ভিত্তিতে একটি সুখী সুন্দর শান্তিময় পৃথিবী গড়ে তোলার ব্যাপারে এই গাছটি হতে পারে আমাদের ভাল ও মন্দের একটি মূল্যবান প্রতিকী পরিচায়ক বা সার্থক অর্থে A tree of knowledge with a definite knowledge of good and evils কার্যতঃ এই গাছের প্রতি মানুষের আবেগ ও অবজ্ঞার উপরে নির্ভর করে আগামী দিনের পৃথিবীতে সুনাগরিক ও সাধারণ নাগরিকের মধ্যে সীমারেখা নির্ধারণ করা যেতে পারে।

বস্তুতঃ এমন অদভুত ও রহস্যময় যে গাছ, যার ক্ষতিকর দিক সম্বন্ধে চিন্তাশীল মানুষ মাত্রই আজ ভীত ও সন্ত্রস্ত যে গাছ ও তার উপকরণসমূহ আজকের মানুষের অধিকাংশ রোগ যন্ত্রণার প্রধান কারণ। যে গাছ এ যুগের মানুষের অর্থনৈতিক দুর্গতি, প্রশাসনিক দুর্নীতি ও আন্তঃরাষ্ট্রীয় চোরাচালানের জন্য বিশেষভাবে দায়ী, এ সম্বন্ধে কুরআন যদি আগাগোড়া নীরব থেকে যেত, তাতে কুরআন ও কুরআনীয় সত্য সমূহের সার্বজনীনতা ও সর্বকালীনতা সম্বন্ধে প্রশ্ন উঠতে পারতো। তাই এ যুগের মানুষ যদি কুরআনে ও বাইবেলে বর্ণিত সেই নিষিদ্ধ গাছটিকে খুঁজে পেতে সক্ষম হয়, তাতে বিশ্ব স্রষ্টার মহাত্ম্য অথবা কুরআনের সম্মান তাতে বিন্দুমাত্রও ক্ষুন্ন হবে না। পরন্তু, এ যুগের মানুষ যে জ্ঞান ও গরিমায় সকল যুগের মানুষকে ছাড়িয়ে যাবে, এ হচ্ছে তারও একটি প্রমান।

কুরআন এমন একখানি মহাগ্রন্থ, যার মাঝে এখনো এমন অনেক অসংখ্য অনাবিষ্কৃত তথ্য ও তত্ত্বাবলী লুক্কায়িত আছে, যার গবেষণা ও আবিষ্কার সৃষ্টির শেষ দিন পর্যন্ত চলতে পারে। তাই কুরআনীয় সত্য সম্বন্ধে এভাবে কিছু তথ্য ও তত্ত্বাবলী আবিষ্কৃত হওয়ার খবরে কারো চমকে উঠার কোন কারণ নেই।

তদুপরি ‘নিকোটিন’ একটি নেশা উদ্দীপক বস্তু। কুরআনের ভাষায় নেশা জাতীয় বস্তুকে ‘খমর’ বলা হয় এবং ‘খমর’ মাত্রই হারাম ও পরিত্যাজ্য। এরুপ একটি হারাম ও ক্ষতিকর জিনিস খাওয়া কোন মানুষের পক্ষেই সমীচীন নয়।

এছাড়াও কুরআনের একটি মশহুর আয়াত হচ্ছে “ইন্নাল মুবাজ্-জিরিনা কা-নু ইখ্ ওয়ানাশ্ শায়াতীন”। অর্থাৎ অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই। তামাকজাত দ্রব্যাদির ব্যবহার যে ইছরাফ বা অপচয় – এ সম্বন্ধে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই।

তাই প্রতিটি সুনাগরিকের পক্ষে ধূমপানসহ সর্ব প্রকার নেশা, দুর্নীতি ও কুসংস্কার বর্জন করা উচিত। এক কথায় আগামী দিনের পৃথিবীতে যারা নেতৃত্ব দিতে আসবেন তাদের কাজে কর্মে চলায় বলায়, খাদ্য ও পানীয় নির্বাচনে কুরআন ও বাইবেলে বর্ণিত এই নিষিদ্ধ গাছটি সম্বন্ধে পরিপূর্ণ জ্ঞান থাকবে এটাই কাম্য।

( উল্লেখ্য তিনটি লেখাই ডাঃ এম এ শুকুরের লিখিত ও সম্পাদিত “ধুমপানে বিষপান” বই থেকে নেয়া হয়েছে)।

বিশ^ তামাকমুক্ত দিবসে, তামাক বিরোধী আন্দোলন, বাংলাদেশ এর প্রতিষ্ঠাতা  ডাঃ এম এ শুকুরের পর পর তিনটি কলাম এ ব্লগে পাবলিশ করা হলো। (৩১ মে ২০১৭) 

 

Advertisements

শিয়া-সুন্নী

shia_sunni-outlookafganistan.net

দিকে দিকে  শুনো রানৈ রানৈ বাজিছে সানৈ ,

ঢাল তলোয়ার গুলাগুলি সার — মারণাস্ত্র মার মার

আদর্শেরী আশায় ভেরী খন্ডে খন্ডে ভেঙ্গে চুরমার

শ্রেষ্ঠ বাণী ভাংছে জানি উঠছে হাহাকার।

গোটা বিশ্ব পরিবারে আমরা সবাই

মুসলিম যারা তারা সে পরিবারের বড় ভাই

আদম, ইব্রাহিম, নূহ, মুহাম্মদ, ঈসা মুসারা

সারি বাধা সব মিছিলে, একই দালানের দহলিজে।

ওরে হতভাগা মুসলে হায়ান,

ওটা বুঝি তোদের কমর্, সেরা প্রমাণ!

বিশ্বাসীর শিষ্য হয়ে শিয়া সুন্নী বিভেদ গড়ো

একে অন্যে কতল করো, তওবা করো আজ সবাই

শিয়া না মোরা সুন্নী না মোরা, মোরা যে মুসলমান!

পথের ভিখারী করেছে যারা তারা তো মুসলে হায়ান!

সত্য থেকে আজ কক্ষচ্যুত বিচ্যুত মোরা

আমি যদি হই সুন্নী, আমার আহমদ ছিল কি রে?

কি শিয়া! কি সুন্নী! কি মুমিন মুসলমান?

এ বিভেদ কেন মোদের ঘরে শয়তানী ফরমান!

মোরা ইব্রাহিমের, আদমের সন্তান।

মুসলমানের ঘরে আগুন, দেখলে যারা খুশি হয় দ্বিগুন

সেই হনুমানে লেজের আগুন ছড়ায় সবার ছাদে

বিশ্ব মুসলিম আজ পড়েছে, সেই সে কঠিন ফাঁদে।

আজ কেন হেতা হানাহানি, ভুল বুঝাবুঝি

ভাই এ ভাই এ কেন মন কষাকষি

চলো ভেঙ্গে চলি যত বিভেদের বেড়াজাল,

ফাতেমী, ওহাবী, খারেজী যত জন্মানো জঞ্জাল।

এক করি সব, খন্ড খন্ড রব ভুলে যাই সব পাপ পরিতাপ

নিংগাড়ি আজি বের করি বাণী যা নিয়ে এসেছে মরূতে মুহাম্মদ!

পিয়াবো সেথায় যে মদিরা মোরা অমৃতজানি,

ফেলে দেবো ছুঁড়ে জন্মানো সব আগাছার খণি,

মক্কা বিজয় করবো ফের,

বকর, ওমর, আলী ওসমান হবো মোরা

শিয়া সুন্নীর গোলামী করে নি কভু তারা।

তাদের মোরা ইসলামেরই সেরা জানি

সত্য তাদের তন্ত্র ছিল মন্ত্র ছিল কুরআনখানি

দীক্ষা নেব নতুন করে, আজ সবাই

কুরবানেরই করাতে পাপ করবো কেটে জবাই।

জমানো জঞ্জাল যত মিলেমিশে অবিরত

বিদায় করবো, বিনাশ করবো ধরবো সঠিক পথ।

ঈশ্বর পুত্র যেমনি দেবে না জবাব শিষ্যের ডাকে

চার খলিফা থাকবে দূরে, শিয়া সুন্নী পড়বে পাঁকে

ধিক্কার দেবে শেষ ময়দানে, চার খলিফাসহ মুহাম্মদে।

এই বুঝি ছিল শেষ পরিনাম, হাসান – হোসেন দিয়েছিল প্রাণ?

সত্যেরে আর করিসনে করিসনে করিসনে অপমান!

“শিয়া সুন্নী দ্বন্ধে মুসলিম বিশ^ ভাঙ্গনের ঝুকিতে: এরদোগান”

খবরের শিরোনামটি মনকে নাড়া দেয় অতীতের মত আজ আবারো।

মুসলিম বিশে^র জন্য আল্লাহর হেফাজতই শুধু নয়, মুক্তির পথ খুঁজতে হবে তার অনুসারীদেরকে।

আর ঐ সঠিক নির্দিষ্ট পথেই হাটতে হবে, নয়তো ঘোর অন্ধকার সামনে পেছনে সবদিকে।

নির্মল ইসলামের মাঝে “শিয়া সুন্নী” একটি জটিল দূরারোগ্য অসুস্থতার নাম। একে শিকড় শুদ্ধ উপড়ে ফেলতে হবে। কালের অবগাহনে গড়ে উঠা এ এক বাড়তি জঞ্জাল যা আমাদের ক্ষতি ছাড়া লাভ করে নি। মাত্র দুটি আয়াত আনছি নষ্ট কৃতকর্মের উদাহরণ হিসাবে যা নির্দেশ করে আমরা ঘোর অন্ধকারে পতিত হয়ে আছি।

স্মরণ করুন “আর তাদের মত হয়ো না যারা বিচ্ছিন্ন হয়েছিল আর মতভেদ করেছিল তাদের কাছে সুস্পষ্ট নির্দেশাবলী আসার পরেও। আর এরা – এদের জন্য আছে কঠোর যন্ত্রণা” (সুরা আল ইমরানের ১০৪ আয়াত)

“নিঃসন্দেহ যারা তাদের ধর্মকে বিভক্ত করেছে এবং বিভিন্ন দল হয়ে গেছে। তাদের জন্য তোমার (মুহাম্মদের) কোন দায়দায়িত্ব নেই। নিঃসন্দেহ তাদের ব্যাপার আল্লাহর কাছে। তিনিই এরপরে তাদেরে জানাবেন যা তারা করে চলতো” (সুরা আন আমের ১৬০ আয়াত)

ইসলাম ও প্রতিপক্ষ/ জিহাদ জঙ্গি / জয়ের আমলনামা / সরকার দাপটে বিরোধীরা কোপে/ লাশের দেশ বাংলাদেশ

 

প্রসঙ্গ অনেক, এক দুইটি নয়, উপরে মোট নয়টি টপিক, সংক্ষেপে টাচ করতে চাই। মানুষ মরছে, খুন হচ্ছে বুলেটে নয়, চাপাতির কোপে, প্রাসঙ্গিক এ নাটকে শ্লোগানের বাণী ‘আল্লাহু আকবর’। একদিকে ইসলাম অন্যদিকে নাস্তিক বনাম ভিনধর্ম, সংখ্যালঘু, মুক্তমনা, সমকামী, ব্লগার, চাঁদোয়ার তলানীতে লুকানো প্রতিপক্ষ। এখানে মূলত দুটি পক্ষ এক পক্ষ ইসলাম আর বাকীরা ভিন প্রতিপক্ষ। ইসলামকে বলা হয় মহামানবের ধর্ম, সেখানে কোন নাস্তিককে বিধর্মীকে খুন করার কোন বিধান নেই। সেখানের বিধান সূত্রে যার যার মাতানুসারে ধর্ম পালন করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। নিকট বা অতীতের কোন বস্তুনিষ্ট ইতিহাসও এর স্বপক্ষে কোন তথ্য বিলি করে না। যারা এসব শক্তির তলে সাজাচ্ছে তারা কর্মকালে “আল্লাহ মহান” শ্লোগান দিতে ভুল করছে না এটি প্রচারে আসছে। তার মানে ম্যাসেজ দেয়া হচ্ছে আল্লাহর দলই এসব খুণের অপকর্ম করছে। যে বা যারাই এটি সাজাক, পরোক্ষে এটি আল্লাহর উপরই দোষ চাপাচ্ছে। সরকারী পক্ষ থেকে একসুরে বলা হচ্ছে এ হত্যা করছে তারা যারা দেশকে অস্থিতিশীল, অর্থনৈতিক অগ্রগতিসহ, সরকারকে ব্যর্থ করতে চায়, এরা উগ্র মৌলবাদী উগ্র জঙ্গিগোষ্ঠী। সরকার এ যাবত বছরের পর বছর থেকেই গণতন্ত্র মুছে দিয়ে স্বৈরশাসকের ভূমিকায় নিজেরাই ব্যর্থতার পাট প্লে করে চলেছে। শক্তির দাপটে চাঁদাবাজি, হত্যা, গুম খুনসহ সন্ত্রাসী ভূমিকার কোন কমতি নেই। জঙ্গির পার্ট, পেট্রোলবোমা, লগি বৈঠা, ইয়াবা বানিজ্যসহ ভোট ছিনতাই, অস্ত্রের মহড়াতে পাড়া মহল্লার চারপাশ মুখরিত। এত করেও সরকার বা তার দলবল পরিবার কেউই জঙ্গি নয়। মিডিয়াতে ব্যবহৃত একটি জিহাদী ছবিতে দেখি আরবীতে লেখা রয়েছে আল্লাহ, রসুল ও মুহাম্মদ। সাতটি মাথা লাল কালো চেক কাপড়ের আরবী গামছা মোড়া। হাতগুলি দেখলে মনে হবে মেয়েলি হাত। যে হাত হয়তো রান্ধতেও জানে চুল বান্ধতেও জানে! যে বা যারাই এটি মিডিয়াতে ছাড়উক, কেমন জানি খটকা লাগলো তাই দিলাম। এসব ঢাকনাধারীরা কেমন করে দেশ উল্টে দিবে, যাদের মুষ্টিবদ্ধ হাতে একটু মাসলও নেই। এরা কোন মন্ত্রবলে নিজের জীবনকে বিপন্ন করছে? বিচিত্র কি হয়তো এরা কেউই মুসলিমও নয়। মূলত প্রকৃত মুসলিমরা এভাবে এটি করতে পারে না। ভিডিওতে যুক্তিরা কথা বলে। শেখ হাসিনা ও জয়ের কারণে বাংলাদেশ সারা দুনিয়াতে জঙ্গি রাষ্ট্র হিসাবে পরিচিতি পায়।  

শেখ হাসিনা এবং জয়ের কারণে বিশ্বে বাংলাদেশ জঙ্গি রাষ্ট্র হিসাবে চিহ্নিত

জিহাদ জঙ্গি কথাটির অপব্যবহার রোধে মুসলিমদেরেই এগিয়ে আসতে হবে। ইতিহাসে প্রমান পাওয়া যায় মানবতাবাদি মুসলিমরা সুকর্ম করেও কপটদের থেকে নিন্দার জমা সংগ্রহ করেছে বহুবেশী। যখন প্রতিপক্ষ এর অমোঘ সত্যের মোকাবেলা করতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয় তখন নিন্দার মহামেলা নিয়ে হাজির হয় ময়দানে, যা আজো চলছে। যবন, ম্লেচ্ছ, পাতকী, পাষন্ড, পাপাত্মা, দুরাত্মা, দুরাশা, নরাধম, নরপিশাচ, বানর, নেড়ে, দেড়ে, ধেড়ে, এঁড়ে, অজ্ঞান, অকৃতজ্ঞ এসব মুসলিমদের প্রতি ভারতবর্ষে ব্যবহৃত হয়েছে। বিশ^ধর্ম দাবীদার ধর্মের মহৎ বানীতে প্রচলিত ও প্রচারিত জিহাদের অপব্যাখ্যা স্পষ্ট করা জরুরী, সময়ের দাবী। মাত্র ২০ বছরের মধ্যে হযরত মুহাম্মদ (সঃ) এর মৃত্যুর পর পরই সিরিয়া, প্যালেস্টাইন, মিসর ও ইরানে ইসলাম ছড়িয়ে পড়ে। এরপর পূর্ব দিকে ব্যবসার সুবাদে ভারতের উপকুলেও মুসলিম কর্তৃক প্রথম (৬৩৬-৬৩৭ খৃঃ) হযরত ওমরের খেলাফতকালেই ভারতে প্রথম অভিযান হয়েছিল। ইতিহাসের অনবদ্য গ্রন্থ “ফাতহুল বুলদান” থেকে জানা যায় যে, খলিফা হযরত ওমরের সময় ওসমান নামের একজন ভারত সীমান্তে আগমন করেন, অতপর দেবল বা করাচিও অধিকৃত হয়।

নবী মুহাম্মদের মৃত্যুর ৮০ বৎসর পর পরই আরবরা ভারতের পশ্চিম সীমান্তে সিনধু অধিকার করে। বালাজুরীর বর্ণনা মতে, উমাইয়া বংশের খলিফা আল ওয়ালিদ আফ্রিকায় ঐ সময় ইসলামের বানী পৌছান। স্পেন বিজয় হয় তারিকের নিতৃত্বে। ডঃ ঈশশরী প্রসাদের মতেও হিন্দুস্থানের প্রথম বিজয়ী তুর্কী নয়, বরং আরব জাতি। এভাবে মুসলিমদের জীবন ধারণ করে বাঁচার জন্য ছিল ব্যবসা আর মানবতার বানী ছড়িয়ে দিতে বিশ^ধর্ম ইসলাম ছিল অন্তরের সুপ্ত প্রেরণা। আল্লাহর বাণী প্রচারে জঙ্গি বা জীবন হত্যা করার কোন আবেদন, বানী, আয়োজন সেখানে ছিল না, ওসব ছিল সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। ওটি প্রয়োগ করলে তারা ১০০% ব্যর্থ হতেন। মানবতার বাণীর মহামেলা দেখে তখনকার মধ্যযুগীয় অবয়বে গড়ে উঠা তথাকথিত নির্যাতীত বিশ^ নতুন ইসলাম ধর্মটি পরম আদরে লুফে নিজের মাঝে জায়গা করে দেয়। এ উদারতা মানবতা, ভাতৃত্ববোধই ইসলাম বিজয়ের মূলমন্ত্র। বলা যায় নবী মোহাম্মদের হাতে আসা এ ধর্মের বিস্তার এত দ্রুত সংগঠিত হয়। ইতিহাস প্রমাণ যার জন্ম সব নবীর শেষ প্রচারক তিনি। বর্তমানে ভুল প্রচারে জঙ্গির আদলে জিহাদের আদলে এটি প্রচারিত হয়নি বলেই এরা এত বিজয় জমা করতে পেরেছিলেন এত অল্প দিনের মাঝে। আজন্ম মুসলিমরা অনুক্ষণ জিহাদ করেছে তাদের নিজের নফসের সাথে, অসততার সাথে, মিথ্যার সাথে, ছলনার সাথে। খুন হত্যা ধর্ষন নয়, কঠিন মনোবলে সততার মানদন্ডে চলাই ছিল তাদের শ্রেষ্ঠ জিহাদ। গোটা বিশ^ আজ মূল ইসলাম থেকে বহু  দূরে মিথ্যার মাঝে বিচরণ করছে, যা ভয়াবহ মিথ্যা ছাড়া আর কিছু নয়, যার জন্য গোটা বিশ^ আজও পথহারা। এ কৌশলে কোন দিনও মুসলিম নিধন সম্ভব হবে না, বরং এরা জাগবেই, এটি ঐশ^রিক সত্য কথা!

ভারতবর্ষে বৃটিশ ও হিন্দুদের মিলিত প্রয়াসে মূল সত্যকে পাশ কাটিয়ে বিকৃতভাবে মুসলমানকে ভিন্ন দৃষ্টিতে নকল আদলে সৃষ্টি করা হয়, যার ফলে শতাব্দীর পর শতাব্দী ভুল ইতিহাস সৃষ্টির প্রমান অসংখ্য। এর ফাঁক গলিয়েও সময়ে সময়ে সত্য উন্মোচিত হয়েছে, ইতিহাস সাহিত্যে মিথ্যার সিলমোহর লেপে দেয়া হয়েছে প্রতিটি মন থেকে মননে, আজও তা চলমান আছে। ইতিহাসে মুসলিমদের পরিচিতি সুষ্পষ্ট। সংক্ষেপে “এরা অধ্যবসায়ী, কর্মক্ষম, বর্ধিষ্ণু, দেখতে এরা অবয়বে সুগঠিত ও বলিষ্ঠ, এদের ন্যায় পরিশ্রমী জাতি ভারতবর্ষে আর দ্বিতীয়টি দৃষ্ট হয় না, সাহসিকতায় প্রসিদ্ধ, আরবীয় ধর্ম মতে দীক্ষা এদের প্রধান কর্ম। এরা শ্মশ্রু (গোঁফ দাঁড়ি) ধারণ করে, কেটে ছেটে রাখে, মাথায় টুপি দেয়। স্বভাবে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন (বিশ^কোষ ১৪:৬১৭ পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য)। বাংলাদেশের মুসলিমরা ঐ ধারারই উত্তরসুরি। মুসলিমকে ভিন্ন রুপ দিতে আজকাল অদ্ভুত সব কৌশলী নাটক সাজানো হচ্ছে যার অংশ হিসাবে শক্তির তলানীতে এসব করা হচ্ছে। এসব কোন প্রকৃত ধর্মধারীর কাজ নয়, এসব হচ্ছে নষ্ট কৌশলীর কাজ, যারা চায় দেশটির জনতাকে কপট স্বার্থে কোপাতে বলি দিতে।

 

ব্যংক লুটে দেশ বিপন্ন, তার চেয়েও বিপন্ন সরকার প্রধানের পুত্র জয়, যার জন্য দুই স্বনামধন্য সাংবাদিক শফিক রেহমান ও মাহমুদুর রহমান চলমান রিমান্ডে, তারাও বিপদের চূঁড়ামনিতে। শুনেছি রাজবন্দীকে সম্মানের সাথে রাখার কথা, তারা তো চোর ডাকাত নন। কিন্তু সরকার কি তা পালন করছে, মনে হয় না? ওয়াশিংটন হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের এশিয়ান স্টাডিজ সেন্টারের আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা সম্প্রতি  বাংলাদেশ সরকারের উদ্দেশ্যে কিছু মন্তব্য করেন যা তার বিরুদ্ধে যায়। উল্লেখ্য সরকারের গণতন্ত্রহীনতা, সমালোচনা সহ্য করার ক্ষমতা হারিয়ে যাওয়া, পুলিশী রাজনীতিকরণ ও বিচার ব্যবহারের নামে অপব্যবহার হচ্ছে। তাদের পরামর্শ হচ্ছে এ ক্ষেত্রে সংকট মোকাবেলাতে বিরোধী দলকে এগিয়ে আসতে হবে। অতীতে প্রমাণ পাওয়া যায় এখানের বিচারে “ট্রুথ ইজ নো ডিফেন্স”রেখেও ২০১০সালে মাহমুদুর রহমানকে ৭ মাসের জেল দেয়া হয়। এভাবে বিচারের আগেই বছরের পর বছর তিনি কারাভোগে আছেন বছরের পর বছর থেকে। প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের পরের আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের লেখা ও সুরেন্দ্র কুমার সিনহার সম্পাদনাতে গত ১৩ আগষ্ট বিচারক রায়টি পাঠ করেন। আজকে ৪ মেতে দেখি ফের রিমান্ডে, অসুস্থ মাহমুদুর রহমানের শরীরে ভাংগনের ছাপ স্পষ্ট। আদালতের স্পষ্ট আদেশ থাকা সত্ত্বেও হাইকোর্টের নির্দেশণা মানা হয়নি। তিনি গুরুতর অসুস্থ, ডাক্তার তাকে পরীক্ষা করে হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠানোর পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু পুলিশ আদালত ভয়ংকর স্বরুপে নেমেছে, মনে হয় পণ করেছে মরন না হওয়া পর্যন্ত দেশের মানুষকে এভাবে কষ্ট দিবে। অনেক আসামী কারাগারে নিহত হচ্ছেন এদের মৃত্যুবার্ষিকীও পালিত হচ্ছে, সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগের আঙ্গুলও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ওদিকে পুলিশ বলছে অভিজিত (প্রচারে কখনো মুক্তমনা কখনো নাস্তিক) এর খুনীরা পালিয়ে গেছে বিদেশে। খুণীর পরিবার থেকে বলা হচ্ছে যারা প্রকৃত দোষী তাদের ৫ জনের ছবি ও ভিডিও ফুটেজও ছিল কিন্তু তারা গ্রেফতার হয়নি। তাদের এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে, কিছু নির্দোষকে ধরে নাটক চলছে, যা করা হচ্ছে তা দুঃখজনক ও হাস্যকর। কোপাকোপিতে প্রায়ই সরকার দলীয়রা নিজেদের মাঝেও হামলাতে জড়িয়ে খবরের শিরোনাম হচ্ছে। কিন্তু তারা কখনোই জঙ্গি বা জিহাদের লিস্টে নেই, বরং বিরোধীরাই সব সময়ই পুলিশী হামলার এ কোটা দখল করে আছেন। বাংলাদেশের পুলিশ সাজানো লিস্ট ধরে আসামী ধরে।

সব কিছু ছাপিয়ে জয় এখন বাংলাদেশের হিরো, আসামী বয়োবৃদ্ধ সম্মানিতজনরা। একটি প্রতিবেদনে দেখি ২০০৭এর ১৭ই জুনে বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত “আমাদের সময়” পত্রিকায় এই হিরোর উপর কিছু খবর এসেছিল। জয়ের নামে মাতাল হয়ে অতিরিক্ত গতিতে গাড়ী চালানো, অবৈধ অস্ত্র রাখার অপরাধ, মামলা, রাডার ডিটেকশন ডিভাইসের অবৈধ ব্যবহার, এসব অপকর্মে জরিমানাসহ কারাবরণের খবর এসেছে। ১৯৯৮ সালের ১৪ জুন টেক্সাসের টারান্ট কাউন্টিতে গ্রেফতার ও উপরোক্ত অপরাধে ১২০ দিনের কারাবাস, ২৪ মাসের প্রোবেশন এবং ৫০০ ডলার জরিমানার আদেশ হয়। এর আগে ফেব্রুয়ারীর ০৬, ২০০৬ ভার্জিনিয়ার হ্যানোভার কাউন্টিতে জয় গ্রেফতার হন। ঐবার একদিনের হাজতবাস ও জরিমানা হয়। তারো আগে মার্চ ১৯, ২০০০ সালে ভার্জিনিয়ার ফেয়ারপ্যাক্স কাউন্টিতে জয় গ্রেফতার হোন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাকে ৩০ দিনের সাসপেন্ডেড কারাবাস সঙ্গে ১২ মাসের প্রোবেশন ও ৪০০ ডলার জরিমানা করা হয়। এ ছাড়া এপ্রিল ২৯, ২০০১ ভার্জিনিয়া রাপাহ্যানোক কাউন্টিতে এবং মে ২০, ২০০৪ আরলিংটন কাউন্টিতে বেপোরোয়াভাবে গাড়ী চালানোর দায়ে অভিযুক্ত হন। তার মা সরকার ক্ষমতায় আসার পর পরই তার ব্যবসা শুরু হয়। জয়ের ব্যবসার খবর হিসাবে আসছে টেক্সাস ভিত্তিক ইনফোলিংক ইন্টারন্যাশনাল (নভেম্বর ৯৮ থেকে আগষ্ট ২০০১) এবং নোভা বিডি ইন্টারন্যাশনাল এলএলসি (মে ৯৮ থেকে আগষ্ট ২০০১)এর সঙ্গে। সমুদ্রতল দিয়ে ক্যাবল প্রজেক্টে নোভা বিডি ইন্টারন্যাশনালের মাধ্যমে তার সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল SEAMEWE – 8  এর সঙ্গেও। মাহবুব রহমান নামের একজনের সাথে জয় টাইকো কম্যুনিকেশনের (ইউএসএ) সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। ২০০৫এর মার্চে ওয়াজেদ কনসাল্টিং ও সিম গ্লোবাল সার্ভিস নামের আরো দুটো কোম্পানীর প্রতিষ্ঠা হয় তখনকার সরকারের ক্ষমতা চলে যাবার পর। এভাবে তার একাধিক বাড়ী ও বিরাট অংকের হিসাব এসেছে।

 

একই অবস্থা তার বোনের হিসাবেও পাওয়া যায়। সায়মা ওয়াজেদ হোসেন (পুতুল) এর স্বামী খন্দকার এম হোসেনও যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবসা শুরু করেন। কয়েক বছরের মাঝে ব্যবসা গুটিয়েও ফেলেন। উল্লেখযোগ্য ব্যবসা ছিল বাংলাদেশ মেটাল এন্ড পাইপস ট্রেডিং কর্পোরেশন, সোনালী ইনকর্পোরেশন, ডগস হোলসেল ইনক, আফসানা ইনক এবং জাম্পি কর্পোরেশন। যুক্তরাষ্ট্রে পুতুল ও তার স্বামীর যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছে তিনটি বিলাসবহুল বাড়ী। এসব বাড়ীর বাজার মূল্য দেড়লাখ থেকে তিনলাখ ডলার মূল্যের (নিউজবিডিসেভেনডটকমে) বিস্তারিত এসেছে। নিকট সময়ে জয় কন্সট্রাকশনের নামে দেশেও এসব ঘাপলাবাজির খবর শিরোনামে এসেছে। একই ওয়েভ এড্রেসে প্রবীণ আইনজীবী ব্যারিষ্টার রফিকুল হক এর বরাতে বলেন (বুধবার ০৪ মে, ২০১৬) যে, “জয়ের যে পরিমাণ টাকা আছে তা দিয়ে ২০টা পদ্মাসেতু হবে। তিনি আরো বলেন, আমেরিকান গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই সম্প্রতি সজিব ওয়াজেদ জয়ের ১০টি একাউন্টের খোঁজ পেয়েছে, সেখানে যে পরিমাণ টাকা আছে তা আমেরিকার বড় মাপের ব্যবসায়ীদেরও নেই, জয় তো আমেরিকায় কোন ব্যবসা করে না, এত টাকা এল কোথা থেকে? চারপাশের পর্যবেক্ষণ ও মন্তব্যগুলি কোনটাই হেলাফেলার মত নয়। স্পষ্টভাষী দ্য নিউএজএর সম্পাদক নূরুল কবির যুক্তি দেখিয়ে বলেছেন, বর্তমানের হত্যাকান্ডের পেছনে সরকারের হাত রয়েছে।

ইতিমধ্যে খুন হওয়া অভিজিত ও দিপনের বাবা এর সপক্ষে র‌্যাব পুলিশে ঘেরা সরকারের অনেক বিতর্কীত অর্জনও স্পষ্ট করে দেখিয়েছেন। পুলিশ কর্মকর্তারা এটি প্রচারও করেছেন যে সরকারকে তারা টিকিয়ে রেখেছে। তিনি বর্তমানের সরকারকে আইয়ুব খানের সরকারের সাথে একাত্ম হওয়ার নজিরও উপস্থাপন করে দেখিয়েছেন। মানবাধিকার নেত্রী সুলতানা কামাল বলেছেন, সরকার এমন জুলুম শুরু করেছে যে মানুষ কথা বলতেও ভয় পাচ্ছে। সরকারের পক্ষশক্তি ভারতের আনন্দবাজারও সম্প্রতি বলছে, বাংলাদেশের পুলিশের কন্ঠে রাজনৈতিক নেতার সুর। ব্যাংক লুটের এত বড় ক্ষতির পরও প্রধানমন্ত্রী বলছেন, অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়বে না, যেন ও কিছু না, মশার কামড়, সাধু সাংবাদিক শফিক মাহমুদুরদের কথা বলে তাদের কারাগারে নিয়ে আসল অপরাধ অপকর্মের সব লুটের ক্ষত ভুলে যাও। প্রধানমন্ত্রী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীরা প্রচার করছেন, সারাদেশে গুপ্তহত্যা খালেদাই করছেন। তবে মুখ ফসকে হলেও অজান্তে সত্য বেরিয়ে পড়াই প্রকৃত সত্যের নীতি,লক্ষ্য করুন।

প্রধানমন্ত্রী বলেছেন যারা পেট্রোল বোমা ছুঁড়েছে, তারাই এসব গুপ্ত হত্যা ঘটাচ্ছে। কথাটি যদি তাই হয় তবে বিভিন্ন নিউজের বরাতে অসংখ্য প্রমাণ বর্তমান যে সরকারের ছাঁ পোষা বাহিনী প্রেট্রোল বোমা মেরে মানুষকে ঝাঝরা করেছে, যার কষ্টে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি তোয়াক্কা না করেই ফুঁসে উঠেন সেদিন হাসপাতালে ভুক্তভোগী গীতা রাণী। উপজেলা নির্বাচনে আ.লীগ প্রার্থীর প্রচারণায় আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহৃত হচ্ছে, সাদা পাঞ্জাবী ছবি পেছনে অস্ত্রসহ (০৪ মে, ২০১৬, আমারদেশ)। লিখিত অভিযোগে আসে দুইদিন থেকে মাইক্রোবাসে ও মোটরসাইকেলে নির্বাচনী অস্ত্রের মহড়া চলছে। তারা বলছে এসব লাইসেন্সধারী অস্ত্র, নিরাপত্তার স্বার্থে তারা অস্ত্র নিয়ে ঘুরছে। সরকার ও তার দলের লোকেরা এত অনিরাপদ হয়ে গেছে বাংলাদেশে, যদিও এত করেও ভোটে বাক্স ভরছে। বাংলাদেশের সংবিধানে চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার কথা থাকলেও বাস্তবে সেটি ময়দান থেকে সম্পূর্ণ মুছে গেছে সরকারের স্বরচিত কর্মকান্ডে। বিচারকদের অপসারণ করার সংসদীয় ক্ষমতাও কবজা করতে চাচ্ছে সরকার। যার ধারাবাহিতায় ০৫ মেতে ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ও সংবিধান পরিপন্থী রায় দেয় হাইকোর্ট। সরকার পক্ষ এতে ক্ষুদ্ধ, তারা আপিল করার হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। আইনমন্ত্রী আনিসুল হক হুমকি দিচ্ছেন গণতন্ত্রহীনতা সহ্য করা হবে না। জানি না আইনমন্ত্রী কি গণতন্ত্রের কোন নতুন ডিজিটাল সূত্র আবিষ্কার করেছেন কি না? এভাবে সারা দেশকে মৃত্যুপুরি বানিয়ে রাজতন্ত্রের পাটাতনে দাঁড়িয়ে তারা গণতন্ত্রের অতিভৌতিক স্বপ্ন রচনা করে চলেছেন।

নারায়ণগঞ্জে এখন উসমানী সম্রাজ্যের শাসন চলছে …ডক্টর তুহিন মালিক

নাজমা মোস্তফা,  ৫ এপ্রিল ২০১৬সাল।

Tag Cloud