Articles published in this site are copyright protected.

১৮৯১ সালে থেকে পূর্ব বাংলায় বসবাস করার কারণে রবীন্দ্রনাথ এক নতুন বিশ্বকে অবলোকন করেন। বাংলাদেশের মানুষ, তার প্রাত্যহিক জীবনযাত্রা, সমাজ, অর্থনীতি, নিসর্গ সবই তার পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে কিঞ্চিত ভিন্ন। পূর্ববঙ্গের মানুষ, প্রকৃতি তার সঙ্গে বিপুল যোগাযোগ তার মনকে মুক্ত করেছিল ক্ষুদ্র গন্ডির বন্ধন থেকে। পূর্ববঙ্গের সুদূর দিগন্ত বিসতৃত প্রকৃতির মুক্ত অঙ্গনে পদার্পণ করে তিনি লোকসাধারণের মধ্যে শাস্ত্রীয় বিধিবহির্ভূত ধর্মের উর্ধ্বে এক সহজ সরল ভক্তিসাশ্রিত মানবিক গুণের পরিচয় পেয়েছিলেন (“রবীন্দ্র মানসে বাউল সাধনার প্রভাব”, ডঃ আব্দুল ওয়াহাব)। লালনও সেখানে প্রভাব ফেলেন সন্দেহ নেই। তাই এখানে রবীন্দ্রনাথ লালনের কাছে ঋণী। তার গানের প্রভাব পড়েছিল বরীন্দ্রনাথের সাহিত্যের পরিসরে। বস্তুত লালন নামের এই ফকিরের নিজের জীবনের ইতিহাসই এক চরম বঞ্চনার ইতিহাস। তিনি জন্মগত একটি জটিল সমাজের পাশাপাশি একটি উদারবাদী সমাজের বাতাসে লালিত হয়েছেন বলে তার জীবনচরিতে জানা যায়। বাস্তবে এক হিন্দু ব্রাহ্মণ পরিবারের ছেলে হলেও বসন্ত আক্রান্ত সহযাত্রীকে তার গোত্রের তীর্থযাত্রী লোকেরা তাকে পথে ফেলে গেলে মুসলমানদের সেবায় তিনি সুস্থ হয়ে উঠেন। মুসলমানদের ছোঁয়া লাগার কারণে তার সমাজ তাকে চিরতরে বিসর্জন দেয়। তার পরিবার বা তার মা বা তার স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও তারা তাদের সন্তানের বা স্বামীর দাবী পেশ করতে পারেনি। যার জন্য লালন পথের ফকির। তার পরবর্তী ইতিহাস মুসলমানদের সান্ন্যিধ্যে বেড়ে উঠা এক লালন ! তার আধ্যাত্মিক গানই নির্দেশ করে তার মূল সুরটি মহামানবের ধর্মের ছোঁয়াই বয়ে বেড়ায়। অনেকে প্রচার করেন লালন মুসলমানও ছিলেন না, হিন্দুও ছিলেননা।

“আমরা জানি মাইকেল মধুসুধন ছেড়া জুতার মত তার পুরাতন জরাগ্রস্ত জীর্ণ ধর্মটি ফেলে দিয়ে খৃষ্টান ধর্মে দিক্ষা নেন। ধর্ম ত্যাগ করেছিলেন মানে এটি নয় যে তিনি দুটি ধর্ম ধারণ করছিলেন। লালনের গান থেকেই আঁচ করা যায় একটি ব্যতিক্রমী অসাধারণ বিকশিত মন তার অন্তরে লুকিয়ে ছিল। যে সমাজ তাকে ছুঁড়ে দূরে ফেলে দিয়েছে তাকে তিনি আজীবন বুকে চেপে ধরে রেখেছেন, এটি যারা প্রচার করে তারা ধর্ম নামের প্রতারক দল ! এর লেজুড় ধরে আরেক দল শুরু করেছে বাউল নামের এক আলাদা সংস্কৃতি যার কতকটা হিন্দুত্ব এবং কতকটা মুসলমানি ঢংএর, সঙ্গে অনেকে জুড়ে দিয়েছেন গাজার চিলিমটিও ! বৈরী পরিবেশ পরিস্থিতির কারণে লালনের ভিন্ন রকম প্রকাশ ! তিনি ছিলেন বিরুপ পরিস্থিতির শিকার এক ব্যতিক্রমী হতভাগ্য বাংলাদেশের সন্তান ! তাকে নকল করে নকল লালন তৈরীর চেষ্টা না করাই সমাজের জন্য মঙ্গল ! তারপরও উল্লেখযোগ্য কথাটি হচ্ছে, সমাজে মুসলমান নামের একটি উদারবাদী সম্প্রদায় ছিল বলে এত বিপর্যয়ের পরও তার একটি জীবন গড়ে উঠে ! ফকিরের জন্যও একটি ডেরা তৈরী হয়েছে ! যার গানে আল্লাহ, নবী মোহাম্মদ, নবী আদমের কথা আছে তাকে মুসলমান নয় বলার কোন যুক্তিই থাকতে পারেনা ! ফকিরের নিজের জীবনটাই ছিল মুমূর্ষ সংস্কারাক্রান্ত হিন্দুত্বের কঙ্কালের উপর প্রতিষ্ঠা পাওয়া মানবতার বিজয় ঘোষনা করা এক প্রচন্ড প্রতিবাদ ! তার প্রতিবাদের প্রতিরোধের বিকাশ ও বিসতৃতি ঘটিয়েছেন তিনি তার স্বরচিত গানের মাঝে, “এলাহি আল মিম গো আল্লাহ বাদশা আলমপনা তুমি”! (একই ধর্ম একই ধারা, নাজমা মোস্তফা, ১০০/১০১ পৃষ্ঠা)”।

তারপরও লালন মুসলিম সমাজে ঠাঁই পেলেও বর্তমানে তাকে নিয়ে যে এক অদভুত দর্শণের উপর কাজ চলছে তার মূল শিকড় খোঁজে পাওয়া মুশকিল। বাড়াবাড়ির অতি উৎসাহে কেউ কেউ প্রচার করছেন বাংলার নবী লালন শাহ এবং কেউ কেউ খুব কৌশলে তার বানীকে একটি ধর্মের বাণী বলে প্রচার করছেন। ঠিক এরকম কিছু অতি উৎসাহী মানুষকে অতীতে দেখা গেছে কবি রবীন্দ্রনাথকেও ঈশ^রের পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। এই কিছুদিন আগেও শেখ মুজিবকে তাদের আওয়ামী লীগের নিজস্ব সাইটেও বাংলার নবী হিসাবে প্রচার করা হয়। মানুষ কতদূর অজ্ঞ হলে এসব করতে পারে, সেটি খুব সহজে অনুমেয়। এরা ধর্মজ্ঞানে চরম অজ্ঞ না হলে এটি করতে পারে না। কিছু নাস্তিক ও বিতর্কীতজনরা সবদিনই বাড়াবাড়ির পর্যায় ঘাটতে উল্টাসিধা অনেক কথাই প্রচার করতে উৎসাহী। দেখা যায় অতীতে নবী রসুলরাও যা প্রচার করেছেন তার সাথে অনেক মিথ্যাচার, অনেক সংযোজন বিয়োজনের প্রমাণ পাওয়া যায়। কিন্তু তারপরও তাদের হাতে আসা ছিল মূল ঐশী বানীসমূহ, যার প্রেক্ষিতে মূল হারাবার শংকাকে উৎরিয়েও সত্যকে খুঁজে নেয়া সম্ভব।

লালন নামের এসব মানুষকে নিয়ে পরবর্তীতে যারা গবেষনা করেছে তারা তাকে কোন পথে নিয়ে গেছে সেটিও দেখার বিষয়। একমাত্র লালন নিজেই জানেন তিনি কি বলতে চেয়েছেন, আর বাকীরা কি বুঝতে চাইছে বা কিভাবে এসব কথামালার ব্যাখ্যা দিচ্ছে। তাই আমি মনি করি তাকে ভিত্তি করে নকল লালনদের সৃষ্টি সমাজকে বিকৃতই করবে। নারী, গাজা, বিকৃত যৌনাচার এসবই তাকে ধ্বসিয়ে দিতে বড় করে সমাজে জায়গা করে দিবে। যা সমাজকে ইতিবাচক না করে নেতিবাচকই করে তুলবে সন্দেহ নেই। আল্লাহ জাতিকে সুপথ দেখাক।

 

নাজমা মোস্তফা,  ০৬ এপ্রিল ২০১৬। ১৭ বছর আগের লেখা কবিতাটি এখানে নীচে সংযোজন করছি।

 

লালনের কুলিনেরা

দেয়ালের ওপাশে যার দৃষ্টি বিধে না, নিদেন পক্ষে মক্ষিকাও না
বুদ্ধির দৌড়ে জুয়েল আইচরা অনেক যায়, যদিও পিঠ দেখে না।
তবুও স্রষ্টায় সাজে তুলনায়, পিছনের পিপিলিকাও দিব্যি পালায়
পিঠে বসা মশাটাও মারতে পারে না যে মানুষ,
স্রষ্টায় একই ফিতায় মাপে, যেন কল্পলোকের যমদূত ।
শারাব পিয়ায়, ভাবে সৃষ্টি স্রষ্টা একই সত্ত্বায়
অহমের অক্টোপাস তাকে গিলে, পথহারাদের নেতা
এ পৃথিবী মানবের জীবনের, – নয় বৈরাগীর, কাল্পনিকের।
হতাশার বৈরাগী লালন ফকির,ব্যতিক্রমী বৃন্তচ্যুত ঝরাফুল
রোগাক্রান্ত ফুলেরা সুবাস ছড়াতে পারে না, মধুকর বসে না
ব্যর্থতার করূণ রাগিনী তার বীণার তারে, হৃদয় কাড়ে ঠিকই
নিত্য নুতন লালনদের রাস্তা আবর্জনার পঁচাডোবা
লালন একজনই জন্মেছে আগাছার মত কালেভদ্রে
প্রকৃতিই গড়ে নেয় দু এক লালন ব্যতিক্রমী সন্তান।
মনগড়া লালন, স্রষ্টার শ্রেষ্ঠ নয় , জন্মানো জঞ্জাল
লালনকে দেখে যারা নিজেরাই লালন সাজে মহাউৎসবে
অসাধু বাবা গড়ে নকল লালনে, অবাস্তব অনাচার
সংসারে সং সাজি ভং ধরি ভাং গিলে, খুঁজে রাস্তা বাঁচার
মানুষেরে বিভ্রান্ত করে পাপের পশরা সাজায় চমৎকার,
সুযোগে শয়তান সাধু সাজে, লালনের ভেক ধরে বার বার।

১৯৯৯ সালের ১৬ই জুন। লালন এক বৃন্তচ্যুত এক মননশীল ব্যক্তিসত্ত্বা । তাকে ধরে সমাজে গড়ে উঠছে এক গোষ্ঠী মানে নকল লালনেরা।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

Tag Cloud

%d bloggers like this: