Articles published in this site are copyright protected.

বাতি সবদিনই চারপাশের অনেক অন্ধকার দূর করতে সক্ষম। বাতি শুধু তার তলানিতে আলো কম দেয় বরং চারপাশ আলোকিত করা বাতির একমাত্র বৈশিষ্ট। ৯০% মুসলিম যদি সঠিকভাবে আলো ছড়াতে পারতো তবে ঐ বাকী ১০% ঐ আলো থেকে অনেক উপকার জমা করতে পারতো, যদি ওখানের উভয় গোষ্ঠী খোলা মনে সত্য সন্ধানে বলিষ্ট উদাহরণ রাখতো। বাংলাদেশের মুসলিমরা অসাম্প্রদায়িক ও উদার এটি যুগে যুগে স্বীকৃত সত্য হয়ে আছে, সেটি শতভাগ স্বীকৃত।  এরা এতই উদার যে তাদের ঘরে কে আগুন দিচ্ছে, কে সব দখলে নিচ্ছে, শিক্ষানীতির যোগান কে দিচ্ছে, কে পাঠ্যপুস্তকে বিতর্ক জমা করছে, কে জাতিকে বিভ্রান্ত করার ম্যান্ডেট নিয়েছে, অতি উদার জাতি তার হিসেবে নেই। আত্মসচেতনহীন জাতি প্রতিটি জীবনের জন্য ভবিষ্যতের জন্য হুমকি, এটি মনে রাখা সময়ের দাবি। উদারতার নামে এত গাফেল হলে চলে না। নয়ন চ্যাটার্জি নামের একটি সাইট দেখিয়েছে কিভাবে দেশাত্মবোধকের নামে বাংলাদেশ দেবী দূর্গার প্রশংসা করে যাচ্ছে বাচ্চাদের বইএ। ক্লাস সিক্স বা মতান্তরে সেভেনের শিক্ষার্থিদের জন্য নির্ধারিত কবিতার আসল নাম ‘মাতৃমূর্তি’ কিনতু প্রতারকচক্র সে নাম পরিবর্তন করে তার নতুন নাম দিয়েছে ‘বাংলাদেশের হৃদয়’। মূল গানটির লেখক রবীন্দ্রনাথ, লেখা হয় ১৯০৫ সালে। আমার চোখে এর তিনটি পরিবর্তনের স্পষ্ট ধারা চোখে পড়ে, যা নামকরণে স্পষ্ট হয়েছে। মূর্তিবন্দনা, মাতৃবন্দনা ও দেশবন্দনা।

durga

Collected from: noyonchatterjee.com

১১ই অক্টোবর ২০১১ তারিখে মানবজমিনের একটি কলাম, “আমার সোনার বাংলা’ মানে অবিভক্ত বাংলা, নিউইয়র্ক টাইমসের মতে ইতিহাসের পরিহাস” (ষ্টাফ রিপোর্টার) নামে লেখাটি ছাপে। “আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি” রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই বাংলা কোন বাংলা? বাংলাদেশের ১ কোটি মানুষ বিশেষ করে স্কুল কলেজের ছেলেমেয়েরা প্রতিদিন আসলে কোন বাংলার গান গাইছে। এ প্রশ্নটি অনেকের মনে বিশেষ করে বর্তমান ৫৮ হাজার বর্গমাইলের স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের মনে একটি আন্দোলন তৈরী করতে পারে। কারণ বিশে^র অন্যতম প্রভাবশালী দৈনিক দি নিউইয়র্ক টাইমস এ বিষয়ে একটি চমৎপ্রদ তথ্য প্রকাশ করেছে। কথাটি উঠেছে সামন্ত সুব্রামিয়ামের একটি লেখাকে উপলক্ষ করে “দেশ ভাগের আগে দেশভাগ”, ৩ অক্টোবর ২০১১। সামন্ত সুব্রানিয়ামরা এত পরে ঘটনার ৪০ বছর পর এসব বলছেন, সেটি আরো আগে তারা বলতে পারতেন। তারা কিনতু এতকাল ভালোই চেপে গেছেন। সেটি করলে হয়তো হতভাগ্য এ দেশবাসীর বেশ উপকার হতো। আজ চল্লিশ বছর পর তারা বেশ আগের গল্পকথা শুনাচ্ছেন। সূত্রে — বৃটিশরা মুসলমানদের অনুভূতি নিয়ে খেললো। ১৯০৪ সালের ফেব্রুয়ারীতে লর্ড কার্জন ঢাকায় বলেছিলেন, ‘ইস্ট বেঙ্গল হওয়ার ফলে মুসলিমরা এমন এক ঐক্যের স্বাদ পাবে যেটা তারা বহু আগে যখন মুসলিম রাজা বাদশার আমলে পেয়েছিল, কলকাতার জনগণ এ দিনটিকে শোক দিবস হিসাবে পালন করবে। কলকাতা শহরে প্রথম বাংলা ভাগের প্রতিবাদে ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি গাওয়া হয়েছিল। ১৯১১ সালে দুই বাংলা পুনরায় একত্রিত হয়েছিল, তবে তা ১৯৪৭ সালে পুনরায় ভাগ হওয়ার জন্য। নিউইয়র্ক টাইমসএর এই নিবন্ধের শেষ বাক্য: ইতিহাসের অনেক পরিহাস। তবে বঙ্গের অন্যতম পরিহাস হলো, ১৯৭১ সালে ইস্ট বেঙ্গল স্বাধীনতা পেল আর তারা কিনা তাদের জাতীয় সঙ্গীত হিসাবে বেছে নিলো আমার সোনার বাংলা প্রথম দশ লাইন। সেটি ছিল রবীন্দ্রনাথের এমন একটি কবিতা, যা অবিভক্ত বাংলার চেতনায় অনুপ্রাণিত।

১৯৯৯ সালের ২৭শে জুলাই “দৈনিক সংগ্রাম” পত্রিকার ‘জহুরী’ কলামে পাওয়া যায় পশ্চিমবঙ্গের এই ‘বাংলা’ নামবদল ঘটনার জটিলতা সে লেখাটিতেও ফুটে উঠেছিল। অনেক তথ্য যুক্তির মন্তব্যে সমৃদ্ধ বিশাল লেখাটির পর শেষের মন্তব্যটি ছিল “এ গান এপার বাংলার মুসলিম জনগোষ্ঠীর স্বার্থের বিরুদ্ধেই রচিত হয়েছিল। ১৯০৫ সালে যে বীজ বপন করা হয়েছিল তা অঙ্কুরিত হতে সময় লেগেছিল বটে, আমরা একে জাতীয় সঙ্গীত হিসাবে গ্রহণ করে সাক্ষ্য দিলাম এপার বাংলা ওপার বাংলা একই বাংলা। এখন আর কিছুই করার নেই। তবে পথ একটাই খোলা আছে, তাদের গান তাদের জন্য ছেড়ে দেয়া। এ গানের বাংলা তাদের বাংলা। আমাদের বাংলা আবহমান কালের বাংলা। এ বাংলার জন্য নতুন গান রচনা করা। বলবেন আমাদেরটা দেশ ওদেরটা প্রদেশ। আমাদেরটা স্বাধীন সার্বভৌম ওদেরটা তা নয়। এসব যুক্তি চলবে না। আমাদের ভূখন্ডটা একসময় একটি দেশের প্রদেশ ছিল, পরে হয়েছে দেশ। নামে নামে জমে টানে। অদূর ভবিষ্যতে প্রদেশের রাহুগ্রাস থেকে কি দেশ বাঁচানো যাবে? এখনি তো গিলে গিলে অবস্থা। এর মধ্যে নাম তো এফিডেবিট করে রাখা হয়েছে। খবরে প্রকাশ পশ্চিমবঙ্গের মূখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি কিছু আগে ওয়েষ্ট বেঙ্গলকে “পশ্চিবঙ্গ” করেছেন। এবার আর ইংরেজীতে ওয়েষ্ট বেঙ্গল লেখা যাবে না। লিখতে হবে ‘পশ্চিমবঙ্গ’। (উপরের কয়েকটি প্যারা টুকে দিলাম নাজমা মোস্তফার ‘একই ধর্ম একই ধারা’ গ্রন্থের, ১০৩-১০৫ পৃষ্ঠা থেকে, প্রকাশকাল জানুয়ারী ২০১২সাল)।

বাংলাদেশ নামের দেশটির সৃষ্টি ছিল গানটির মৃত্যু সংবাদ। পূর্ববর্তী গানের ঠেলাতেও যদি এককদমও এগিয়ে গিয়ে বঙ্গভঙ্গ রদ হয়, সেটির উপর ভ্রুকুটি হেনে পুনরায় বঙ্গভঙ্গ স্থায়ী হয় ১৯৪৭এ এসে। একত্রিকরণের বাংলার স্বাধীনতা ভারতীয় কংগ্রেস কোনদিন চায় নাই। তারা চেয়েছিল হিন্দু আর্যাবর্তের অধীন যুক্ত বাংলাকে। তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তানের সব নির্যাতিত মানুষ সে ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রকে ব্যর্থ করে ভারত থেকে পৃথক হয়ে যায়। অতপর তার পরের ঘটনা বা দুর্ঘটনা ইতিহাসের মানচিত্রে পাকিস্তান পরবর্তিতে বাংলাদেশ নামে দেশটির আবির্ভাব। দেখা যায় এখানের গানের মতই দেশটি তার স্বরুপ পাল্টাতে বাধ্য হয়। অস্তিত্ব রক্ষার্থে এখানের প্রতি জন্মই ইতিহাসের বাস্তবতা। কিনতু ঐ গানটি কি কৌশলে এখানে ঢুকে গেল নেতাহারা যুদ্ধের সংকট সময়ে, কারো সম্মতি ব্যতিরেকে তাকে এরকম সহজভাবে ইতিহাসের বাস্তবতা বলে স্বীকার করার অবকাশ কম। যুদ্ধে জনতারা অনেক গান গেয়েছে, এটিও গেয়েছে। নজরুলের জীবন উদ্দিপ্ত করা গানই বেশী গেয়েছে। “কারার ঐ লৌহ কপাট” এমন বড় এক সংগ্রামী সংগীত, যেন মরা নদীতেও তুফান তুলতো। “জাগো, জাগো অনশন বন্দি ওঠোরে যত, জগতের লাঞ্ছিত ভাগ্যহত জাগো” আমার সোনার বাংলাও মানুষ গেয়েছে, তবে অনেকের মন্তব্য ছিল এটি যুদ্ধের নয়, ঘুম পাড়ানিয়া গান। সামন্ত সুব্রানিয়ামরা জানেন এ গানের মূল সুর ছন্দ কখন কিভাবে সৃষ্টি হয়েছে আমাদের থেকে বেশী।

জাতি হিসাবে বাংলাদেশীদের সত্যিই ‘সরি’ বলার সময় এসেছে। নয়ন চ্যাটার্জি জানতে চেয়েছেন সপ্তম শ্রেণীতে এ মূর্তিবন্দনার গান কেন, এ দেশে কি গানের অভাব? মোটেও না, ধানের দেশ গানের দেশ সুজলা সুফলা এ বাংলাদেশ। “ধন ধান্যে পুস্পে ভরা আমাদের এই বসুন্ধরা, তাহার মাঝে আছে দেশ এক সকল দেশের সেরা। এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি, সকল দেশের সেরা সে যে আমার জন্মভূমি”  আমাদের গানের অভাব নেই। ৯০% মানুষ যদি জানতো ওটি দুর্গাদেবীর সঙ্গীত,  মনে হয় না কেউ ওগান গাইতো। এর কারণ দূর্গাভীতি বা মূর্তিভীতি বা ঘৃণা নয়, এতে তার ঈমান থাকে না। একমাত্র যে অর্জনটুকু নিয়ে ওরা দুনিয়া থেকে বিদায় হবে, সারা দুনিয়ার সহায় সম্পত্তি পিছনে ফেলে রেখে যা নিয়ে সে ফেরত যাবে, ওটিই যদি তার নষ্ট হয়ে যায়, তবে সে কি ভরসাতে বাঁচবে দম ফেলবে? সেদিন ওটি জাতীয় সঙ্গীত না হলে ঐ গানটি থাকতো একটি সাধারণ মাতৃবন্দনা সঙ্গিত হয়ে যা দেবী দূর্গাকে উপলক্ষ করে যার থিমটুকু নেয়া হয়েছিল। এতে দূর্গাদেবীরও মর্যাদা সঠিক জায়গায় থাকতো। বরং একপাল অচ্ছুৎ মুসলিমরা না জেনে দূর্গাদেবীর উপর যে অত্যাচার করেছে তার জন্য তাদের সরি বলা ছাড়া উপায় কই? দেশকে দেবীর আসনে বসিয়ে কবিতাটি লিখা হয়েছিল উগ্র হিন্দুদের জাগিয়ে তুলতে।

ডঃ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীসাহেব, (শিক্ষাবিদ, গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) বিশাল এ কবি সম্বন্ধে বলেন, “ইংরেজ চলে গেল। খন্ডিত বাংলার একাংশ চলে গেলো ভারতবর্ষে, অপর অংশ পাকিস্তানে। বাংলার সংস্কৃতি বিপন্ন হলো উভয় রাষ্ট্রে। এক রাষ্ট্রে হিন্দির গ্রাস, আরেক রাষ্ট্রে উর্দুর। হিন্দির গ্রাস থেকে বঙ্গ সংস্কৃতি মুক্ত হয় নি, কিন্তু উর্দুর গ্রাস থেকে হয়েছে”। (উর্দুকে ঝেড়ে ফেলা গেলেও আজ দুই বাংলায়ই এমনকি যেখান থেকে উর্দু ঝেড়ে ফেলা হয়েছে সেখানেও চলছে হিন্দি গানের রমরমা ব্যবসা, নয় কি? )

জাতীয় সঙ্গীত প্রসঙ্গে সিরাজুল ইসলাম বলেন, “নতুন রাষ্ট্রের জাতীয় সঙ্গীত আক্রান্ত রবীন্দ্রনাথই লিখে দিলেন। এই গান যেন অপেক্ষা করছিল এই রাষ্ট্রের জন্যই। এই ঘটনাকে কি বলবো? এ কি সংস্কৃতির প্রতিশোধ স্বৈরাচারী রাষ্ট্রের উপর?—নজরুল ইসলাম আমাদের আপন জন নিশ্চয়ই। কিন্তু তার গান তো আমাদের জাতীয় সঙ্গীত হয় নি, এমনকি তিনি তো তেমনভাবে কখনো পূর্ববঙ্গে থাকেন নি, যেমনভাবে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন কুষ্টিয়াতে ও শাহজাদপুরে”। (পশ্চিম পাকিস্তানের অনেকেই আমাদের সাথে থেকেছেন তার পরও তাদের আমাদের মাঝে একটা পার্থক্য আমরা খুজে নিয়েছি, এত থাকাথাকির পরও, নয় কি?)

নজরুলের কবিতা থেকেই বোঝা যায় রবীন্দ্রনাথ নজরুলকে বুকে ধরে কপালে চুমো খেয়ে আশীর্বাদ করেছিলেন এবং সম্ভবতঃ “বিদ্রোহীর” আবৃত্তি শোনার পরই “বিদ্রোহী” কবিতার অসাধারণ কাব্য মহিমায় মুগ্ধ হয়েই তিনি নজরুলের অসাধারণ কাব্য প্রতিভার স্তুুতি গেয়েছিলেন। এই ঘটনার পরবর্তী ঘটনা ছিল রবীন্দ্রনাথের নজরুলকে লক্ষ্য করে “আয় চলে আয় রে ধুমকেতু” লেখা ‘Give up hunger strike our literature you’ বলে টেলিগ্রাম করা এবং নজরুলের নামে “বসন্ত” নাটিকা উৎসর্গ করা এবং তার দরবারের রবি ভক্তদের উদ্দেশ্য করে নজরুলের কাব্য সম্বন্ধে বলা “যুগের মনকে যা প্রতিফলিত করে তা শুধু কাব্য নয়, মহাকাব্য” (কবি স্বীকৃতি, পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়, রবীন্দ্রসদন, কলকাতা, ২৫শে মে ১৯৬৯এ প্রকাশিত পুস্তিকা ‘নজরুল জন্মজয়ন্তী’ থেকে গৃহীত।

নজরুল কাব্যের প্রথম প্রকৃত সমালোচক মোহিতলাল মজুমদার। ১৯২০এর আগস্টের ভাদ্র সংখ্যায় মোসলেম ভারতে পত্রাকারে মোহিতলালের এই সমালোচনা প্রকাশিত হয়। মোহিতলাল সে সময়ের অর্থাৎ ১৯২০ এবং তার অনতিপূর্বের বাংলা কাব্যের একটি রুগ্নরুপের পরিচয় দিয়েছেন তার আলোচনায়। তার লেখায় বোঝা যায় বাংলা কবিতার একটি পরিবর্তন তিনি আশা করেছিলেন। সেই পরিবর্তন মোহিতলাল ভেবেছিলেন, মুসলমানরা আনতে পারে তাদের ভিন্ন জাতীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির আমদানী করে। তার প্রতিফলন পরবর্তীতে দেখা যায় তার ভাষায় “মুসলমান লেখকের সকল রচনাই চমৎকার। কিন্তু আমাকে সর্বাপেক্ষা বিস্মিত ও আশান্বিত করিয়াছে তা আপনার পত্রিকার সর্বশ্রেষ্ঠ কবি লেখক হাবিলদার কাজী নজরুল ইসলাম সাহেবের কবিতা”। তিনি আরো বলেন, “বহুদিন কবিতা পড়িয়া এত আনন্দ পাই নাই, এমন প্রশংসার আবেগ অনুভব করি নাই”। ১৯২০এ মোহিতলাল যখন এই কথা বলছেন তখন রবীন্দ্রনাথ তার প্রতিভার শীর্ষে অবস্থান করছেন। বেঁচে আছেন ও লিখছেন কীর্তিমান ছন্দস্রষ্টা সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, লিখছেন যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত, যতীন্দ্রমোহন বাগচী এবং স্বয়ং মোহিতলাল। কিন্তু এ সময়কার জীবিত কবিদের লেখা পড়ে মোহিতলাল আশাহত, বিরক্ত, ক্ষুব্ধ এবং ক্রুদ্ধ। তাই সেদিনের তার সেই লেখাতেই এব্যাপারে বিসতৃত বক্তব্য এসেছে। সংক্ষেপে এখানে:

“কাজী সাহেবের কবিতায় কি দেখিলাম বলিবা? বাঙলা কাব্যের যে আধুনাতন ছন্দঝঙ্কার ও ধ্বনি বৈচিত্রে এক্কালে যুগ্ম হইয়াছিলাম, কিন্তু অবশেষে নিরতিশয় পীড়িত হইয়া যে সুন্দরী মিথ্যা রূপিনীর উপর বিরক্ত বিরক্ত হইয়াছি, কাজী সাহেবের কবিতা পড়িয়া সেই ছন্দ ঝংকার আবার আস্থা হইয়াছে। যে ছন্দ কবিতায় শব্দার্থময়ী কন্ঠ ভারতীয় ভূষণ না হইয়া, প্রাণের আকুতি ও হৃদস্পন্দনের সহরে না হইয়া, ইদানিং কেবলমাত্র শ্রবণ প্রীতিকর প্রাণহীন চারূ চাতুরীতে পর্যবসিত হইয়াছে, সেই ছন্দ এই নবীন কবির কবিতায় তাঁহার হৃদয় নিহিত ভাবের সহিত সুর মিলাইয়া মানবকন্ঠের স্বর সপ্তকের সেবক হইয়াছে। কাজী সাহেবের ছন্দ তাহার স্বতঃউৎসারিত ভাব কল্লোলিনীর অবশ্যম্ভাবী গমনভঙ্গী”।

রবীন্দ্রনাথ (১৮৬১-১৯৪১) সম্পর্কে জসীম উদ্দীন(১৯০৩-১৯৭৬) এর বক্তব্য: “বিরাট বাংলা সাহিত্য আজ সকল বাংলা ভাষীর অমূল্য সম্পদ। তারপর রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে তার আপত্তি তিনি লুকোননি। ‘এদেশের যা কিছু ইউরোপের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে, তাই লইয়া তিনি পসরা সাজাইলেন। এদেশের সব ভাল ভাল লইয়া কবি পাশ্চাত্যের রুচি বদলাইতে চেষ্টা করিলেন না” (জসীম উদ্দীনের প্রবন্ধসমূহ, দ্বিতীয় খন্ড)। বাংলার তিন কবি বিশ্বকবি, বিদ্রোহী কবি, পল্লীকবি এ তিনটি নাম বললেই তিনজন কবির নাম আমাদের চোখে ভেসে উঠে। জসিম উদ্দিন এসেছেন মুসলমান পরিবার থেকে। স্ব সমাজ তিনি কখনোই বিস্মৃত হননি। কিন্তু তার সৃষ্টি সব সময় অসাম্প্রদায়িক। স্বয়ং অগ্রজ পল্লীকবি কালীদাস রায় জসীম উদ্দিন সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন’ “যতীন্দ্রমোহন ও কুমুদরঞ্জন বঙ্গের পল্লী প্রকৃতিকে দেখিয়েছেন হিন্দুর চোখে। শ্রীমান জসীম উদ্দীন বাঙ্গালীর চোখে দেখিয়াছেন অর্থাৎ হিন্দু মুসলমান ঊভয়ের দৃষ্টিতে দেখিয়াছেন” (জসীম উদ্দীনের সাহিত্যে বাংলাদেশের লোকজীবন, আব্দুল মান্নান সৈয়দ, ১০ই জানুয়ারী ২০০৯সাল, দৈনিক আমার দেশ)। এখানে এটুকু শুধুমাত্র উপস্থাপনার একটু সূচনা—বিচার বিবেচনা সবই পাঠকের জমা খাতায় হোক জমা (“একই ধর্ম একই ধারা”, নাজমা মোস্তফার বই থেকে উপরের ৭টি প্যারা )নজরুলের একটি কবিতাই ছিল জাতীয় সংঙ্গীত হিসাবে অনন্যভাবে উত্থিত ও সাজানো। তার পরও তার ছন্দ ঝংকারে পরিপূর্ণ জাতীয় সংগীতটি কারো নজর কাড়ে নি, বরং খুব কৌশলে এসব এড়িয়ে যাওয়া হয়।

সত্যকে কোনদিনও দেখা যায় না, ধরাও বড় কষ্ট, তাই তাকে বাড়তি খুঁজতে হয়। যেখানে দেখিবে ছাই উড়াইয়া দেখ তাই, পাইলেও পাইতে পার অমূল্য রতন। নয়ন চ্যাটাজিকে ইন্টারনেট আমাদের দোয়ারে এনে হাজির করেছে, হাত বাড়ালে অনেকেই পাবেন। যেন বড় মর্মে আঘাত লাগিয়ে তিনি কারেন্টের শক দিয়ে বিশ^ চেতন কর্মে নিয়োজিত। সে হিসাবে তিনি সবার বন্ধু। তবে সংকীর্ণরা সবাই তার শত্রু বোঝা যায়। বাংলাদেশ এখন অন্যের হাতের তলানিতে আত্মবিকৃত অবস্থায় পৌছে গেছে, সেটি তিনি আঁচ করতে পারছেন। এদেশের ৯০% অধ্যুষিত মুসলিমের দেশে পাঠ্যপুস্তকে হিন্দুর পূজা অর্চনা। আমরা বাইরে থাকি, সব বলতেও পারবো না। তারপরও যেদিকে নজর পড়ে কিছু নাড়াচাড়া করি কিনতু সবদিকে তো আর নজর দেয়া সম্ভব হয় না। বড় কবিতায় অনেক কিছুই বলা হয়েছে, নয়ন চ্যাটার্জির সামান্য একটু ইশারা পেয়ে আমি অন্য একটি পোস্ট দিব এর উপর পরবর্তীতে যে দেবী দূর্গা কিনতু পুরো ভারতের দেবী নন। তিনি মূলত বাংলাভাষী হিন্দুর দেবী। কবিতায় দেবীদূর্গার বর্ণনা করে বলা হয়েছে। “ডান হাতে তোর খড়গ জ¦লে, বা হাত করে শঙ্কাহরণ দুই নয়নে সেনহের হাসি, ললাটনেত্র আগুণবরণ ওগো মা তোমার কী মুরতি আজি দেখি রে—- ওগো মা তোমায় দেখে দেখে আঁখি না ফেরে, তোমার দুয়ার আজি খুলে গেছে সোনার মন্দিরে—”। দূর্গাদেবী শুধু ক্লাস সেভেনেই আসন গেড়ে বসে নেই, গোটা দেশ আচ্ছাদন করে অকালনাশিনী দূর্গাজননী ভয়াল রুদ্রমূর্তি ধারণ করে আছেন। যুগে যুগে সঠিক সত্যের বিজয় ঘোষিত হোক কামনায়।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: দিল্লীর রাজপ্রাসাদে সমগ্র ভারতের ইংরেজ নেতা সমরাট পঞ্চম জর্জ স্বর্ণখচিত সিংহাসনে উপবিষ্ট। ঠিক সে সময় কবিতার তোষণ ও তোয়াজে কবি রবীন্দ্রনাথ ঐ সমরাট পঞ্চম জর্জএর প্রশংসা ও স্তুতিবাক্যে পূর্ণ কবিতা লিখে তার পদপ্রান্তে উপহার দেন। আর ঐ স্তুতিগানই ভারতের জাতীয় সংগীত। “জনগণমন অধিনায়ক জয় হে ভারত ভাগ্যবিধাতা”।  ঐ সময়ে কবিতাটি পঞ্চম জর্জকে উপহার দেয়া নিয়ে খবরের কাগজে অনেক সমালোচনা হয়েছে। এসব তথ্য ব্যারিস্টার এম. এ সিদ্দিকীর “ভুলে যাওয়া ইতিহাস” এর ৯৬ পৃষ্ঠাতে আছে। এসব তথ্য পাওয়া যায় গোলাম আহমাদ মর্তুজার (বাজেয়াপ্ত ইতিহাস, পৃষ্ঠা ৩৯)। দেখা যায় যখন বিদ্রোহী কবি নজরুল কারাগারে সময় পার করেন সে সময় রবীন্দ্রনাথ এসব স্তুতিমূলক কাব্য রচনা করে নিজেকে ময়দানে প্রতিষ্ঠিত করেন। ভারতীয় স্বাধীনতার ইতিহাসে এ লজ্জাও কম নয়, বলা চলে পরাধীনতার শিকলপরা কলঙ্কের স্পষ্ট দাগ। 

প্রস্তাবনা: বঙ্গভঙ্গ রদএর উপর লেখা দেশ বিরোধী গানটি কেন বাংলাদেশের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া হলো? গানের মাঝে নেই কোন ভয়ঙ্কর চেতনা, জেগে উঠার বাস্তবতা, বলা চলে এটি ঘুম পাড়ানিয়া গান। গানের মাঝে একদিকে নেই বাংলাদেশ নামটি অন্যদিকে সেখানে আছে বাংলা নামের একটি দেশের কথা, সেটি এখন ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, হয়তো তাদের ঐ গান থেকেই তারা উদ্বুদ্ধ হয়েছে ওটি নিতে। তাদের জিনিস তাদেরে ছেড়ে দেয়া হউক। রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশের জাতীয় কবি নন। জাতীয় কবি নজরুলের গানকে জাতীয় সঙ্গিত করা হউক। পৃথিবীর অনেক দেশই পরবর্তী সময়ে তাদের জাতীয় সঙ্গিত নির্ধারণ করেছে, সেটি বাংলাদেশের বেলায় করতে বাধা কোথায়? নজরুল ছিলেন একাধারে কবি, গল্পকার, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, অনুবাদক, প্রাবন্ধিক, সমালোচক, শিশুসাহিত্যিক, গীতিকার, গীতিলেখা ও গীতিনাট্য রচয়িতা, সুরকার, স্বরলিপিকার, গায়ক, বাদক, সংগীতজ্ঞ, সংগীত পরিচালক, সাংবাদিক, সম্পাদক, পত্রিকা পরিচালক, অভিনেতা, চলচ্চিত্র কাহিনীকার, চলচ্চিত্র পরিচালক। বহু গুণীজনকৃতরা তার গুণে ধন্য ছিলেন, কেউ মনে করতেন তিনি দেবতার বাচ্চা, কেউ মনে করতেন তিনি রবীন্দ্রনাথের চেয়ে উপরে অবস্থান করছেন। এভাবে নজরুল শুধু বারে বারে বই বাজেয়াপ্তের শিকার নন, অনেক ষড়যন্ত্রেরও শিকার।

নাজমা মোস্তফা,   ১২ই ফেব্রুয়ারী ২০১৬ সাল।

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

Tag Cloud

%d bloggers like this: