Articles published in this site are copyright protected.

লুৎফুন্নাহার লতা আক্ষেপ করেছেন তার ফেইসবুকে মেয়েরা হিজাব করেছে দেখে। একটি ছবিও সেটে দিয়েছেন সাথে যেখানে পাঁচটি মেয়ে বসে আছে চার জনের মাথায় কাপড় দেয়া আর একজনের নেই। তার মনের গভীর বেদনা তিনি প্রকাশ করেছেন, হয়তো তিনি দেশের বাইরে কোথাও থাকেন। তিনি চাননা আর দেশে তার মরা লাশ ফিরুক। তিনি সিদ্ধার্থকে বলে রেখেছেন যেখানে মরবেন সেখানেই যেন তাকে মাটিচাপা দেয়া হয়, তার সখ শুধু একটি শিউলির চারা যেন লাগানো হয় তার কবরের উপর। তার এত কষ্টের কারণটি হচ্ছে বাঙ্গালীর সংস্কৃতিতে কালিপা লেপন দেখে তার এত কষ্ট বার বার তিনি স্বাধীনতার উদাহরণ টানছেন। মনে হচ্ছে লতা আমার থেকে বয়সে অনেক ছোট হবেন, হয়তো যুদ্ধ তিনি শুনেছেন দেখেন নাই। আমরা যুদ্ধ দেখা মোকাবেলা করা ময়দানের সৈনিক। মুক্তিযুদ্ধে লতারা কষ্ট পেলে আমাদের বরং তার চেয়ে বহু বেশী কষ্ট পাওয়ার কথা। আমরাও কঠিন কষ্টে সময় পার করছি যখন দেখি একটি মুক্তিযুদ্ধকে চেতনা চেতনার নামে ব্যবসায়িকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। যখন একজন মুক্তিযোদ্ধা মেজর জলিলের বইটি পড়ি আর বর্তমান শাসনের কোন অংকের সাথেই অংক মেলাতে পারি না। একজন বঙ্গবীর আতাউল গণি ওসমানীকে জাতি সম্মান দিতে ভুলে গেছে। একজন ভাসানী স্মৃতির পাতা থেকে বিলুপ্ত একদিন যারা ময়দানের সচেতন জনতার জলজ্যান্ত সৈনিক ছিলেন। তাদের কথা জাতির এক অংশ কেন জানি ভুলতে চায়। তখন আমরা কুকড়ে লজ্জায় একটু হয়ে যাই। প্রকৃত মুক্তিযুদ্ধের অপমান করে যখন ইয়াহইয়া সরকারের অনুকরণে দেশে বাকশাল তৈরী হয়ে যায় আমাদেরই অনেক দিনের জমা করা শ্রদ্ধার ভান্ড একদম কেমন করে জানি সেদিন উল্টে যায় পুরোটাই। আমরা মুষড়ে আছি সেদিন থেকে যুদ্ধ দেখা, যুদ্ধে বেড়ে উঠা সচেতন জনতারা। কষ্টে আমি একা নই, জাতীর বৃহদাংশই কপট কষ্টের মাঝে কালাতিপাত করে মরছে মরেছে সামনে আরো মরবে।

মনে হয় ঐ কষ্টেই স্বাধীনতার এত পরও উপরের ক্যাপশনের মেয়েরা ঐ ছলনাকে স্বচ্ছ দৃষ্টিতে পরখ করতে চায়, ছলনা চায়না। সংস্কৃতির নামে মিথ্যাচারের সমাজ চায় না। বর্তমান বিশে^র সমাজের অসংলগ্ন আচরণ মিথ্যাচার খুন ধর্ষণ সবকিছু দেখে মনে হয় ওতেই তারা বাঁচার পথ খুঁজে নিয়েছে। রবীন্দ্র পূজারী তসলিমার অতি আস্ফালনে তারা ঐ পথ ধরেছে। তারপরও তারা মানুষ খুন করে বেড়াচ্ছে না। যেভাবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ শক্তি খুনের পেট্রোলবোমার গুমের চাঁদাবাজির প্রশ্নফাঁসের স্বর্গরাজ্য বানিয়ে রেখেছে দেশটিকে, কয়লার ময়লা দিয়ে সুন্দরবনকে ঢেকে দিতে চায়, আপনার মত বিবেচক মন কি ওতেও বিক্ষুব্ধ হয় নাকি হয়না? মনে হয় তেমন হয় না। কারণ আপনারা প্রকৃত যুদ্ধ দেখেননি, জানেন না প্রকৃত মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। আপনার আরো অনেক জানা বাকী। কোন দেশে থাকেন জানি না, তবে আমরা বর্তমানে এমন এক দেশে থাকি, চাইলেও শিউলি ফুলের অর্ডার দিতে পারবো না, কারণ শিউলি এদেশে আমি এখনো দেখিনি। শীত শুরুতেই সব পাতা ঝরে যায়, মরার ভান করে পড়ে থাকে। আর পৃথিবীর যেখানেই থাকি শিউলি না হলেও একটি স্বাভাবিক মৃত্যুর স্বপ্ন সবার মতই দেখি । আপনার স্বপ্ন মনে হচ্ছে কেমন যেন একপেশে সংকীর্ণ স্বপ্ন হয়ে গেছে। বাংলাদেশের বেশীর ভাগ মানুষ সুফি দরবেশ থেকে ইসলামে প্রবেশ করলেও ইসলামের মূল ইসলামে ঢুকতে পেরেছে অনেক কম। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে এক মুসলিম শিক্ষকের মুখে জেনেছিলাম তার পূর্বপুরুষের দু একজনা গ্রামে পূর্ব ধারাবাহিকতায় এখনো সর্পপূজা করেন।

আমার পুর্বপুরুষ ছিলেন শিরকের পাদপিঠ ভারতের বাসিন্দা, সেখানের ভিন্ন সমাজের মূল্যবোধ থেকে নিজ সংস্কৃতিকে মর্যাদা দিতে তৎপর থাকাই ছিল তাদের আদর্শের এক বড় পদক্ষেপ। ঐ সময় প্রতাপী মুসলিমরা মঞ্চ থেকে হারিয়ে গেলেও মানুষের মন থেকে হারিয়ে যায় নি। পূর্ব পুরুষের কাছে  থেকে পাওয়া সংস্কৃতিকে আকড়ে ধরে শত অনাচারের অচ্ছুৎ শাসিত সমাজের ভ্রুকুটির পরও নিজের সংস্কৃতিকে নিজের মতই আত্মায় অন্তরে ধারণ করার প্রয়াস ছিল লক্ষ্য করার মত। পাকিস্তান সৃষ্টি করার স্বপ্নে বিভোর থেকে আমার ডাক্তারী পড়া ছাত্র বাবা সারা দিন পাগলের মত একটি মুক্ত ভূমির জন্য মানুষের দোয়ারে দোয়ারে ঘুরেছেন। সেদিন তিনি পাকিস্তানের জিন্নাহকে সমর্থন করতে সুযোগ পেলেই মানুষের দোয়ারে ছুটে যেতেন। কংগ্রেস সমর্থক অনেক মোল্লা মুনশিরা ভুল বুঝে মানুষকে বোঝাতো ঐ জিন্নাতকে ভোট দিবে না। বোকা মানুষকে অল্প কথায় বোঝানো হতো জিন্নাহ মানে জিন্নাত। আমার বাবাকে সব সময় বলতে শুনেছি এ লোকটি এমন একজন মানুষ যাকে কখনোই পয়সা দিয়ে কেনা যায় নি। মায়ের মুখে শুনেছি জিন্নাহ যখন ভারতের শিলংএ আসেন তখন তারা সম্ভবত স্কুল থেকেই অভিবাদন জানাতে মিছিলে অংশ নেন। বাবার এসব অনেক গল্প শুনেছি আমি আমার ফুফুর কাছে। পরবর্তীতে বাংলাদেশ মুহূর্তে কোনভাবেই আমার বাবাকে কেউ বুঝাতে পারলো না, সারা ভারত জুড়ে আমার বাবার বন্ধু স্বজনরা ছিলই, কিন্তু আমার বাবার এক কথা ছিল, ওখানে ফিরে যাব না। যেখান থেকে একদিন পরম বেদনায় পিতৃভূমি পেছনে রেখে সামনের দিকে এসেছি, ওখানে ফিরবো না। পূর্ব পাকিস্তানে আসা ওটি ছিল ধর্মের কারণেই নতুন আবাসের সন্ধান, ওটি ছিল আমার বাবার কাছে একটি হিজরত। তার কথা ছিল মরতে হয় মরবো, এ মাটিতেই মরবো, ভারতে নয়। যার জন্য পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের লিডার হওয়া সত্ত্বেও তখনকার মাঠের অপর সাগরেদদের লুটপাটের মহড়াও আমার বাবাকে চরম ব্যথিত করে তোলে। নষ্ট ও ভ্রষ্ট পথে চলা সবদিনই পরিত্যাজ্য সেটি শেষদিন অবধি মেনে গেছেন। তাই ৭১এর এমন সংকট সময়ে তিনি দেশত্যাগ না করে বরং একখানি কুরআন শরিফ হাতে তুলে নেন। পরম সংকট মুহূর্তে বিশাল বড় হাকালুকি হাওর সাতরে পাড়ি দিয়েছেন, এক হাতে উঁচু করে ধরা ছিল তার সেই কুরআন শরিফ। শত বিপদে আর পরবর্তী জীবনে ওটি কাছ থেকে সরান নাই সব সময় থাকতো তার টেবিলের উপরে। তার ডিসপেন্সারিতে তিনি রোগী নিয়ে বসেছেন, সাথে থেকেছে তার ঐ সাংস্কৃতিক দিকদর্শণ বাতানোর ঐ একটি মাত্র পাথেয় দর্শন।

ইসলামের পক্ষে কথা বললেই আওয়ামী লীগ জঙ্গী বলে

 

মুক্তিযুদ্ধের মানচিত্র ছিল আমাদের অন্তরে গাঁথা কষ্টের জমা। লুৎফুন্নাহার লতা আপনার মত মুক্তিযুদ্ধ আর তার ইতিহাসকে এত সহজভাবে মেলাতে পারি না বলে বড়ই কষ্টে সময় পার করছি। পাকিস্তান গড়ে উঠেছিল ভারতবর্ষের  নির্যাতিত মুসলিমদের বাঁচার জন্য একটি স্বতন্ত্র আবাস হিসাবে। যাতে তারা হিন্দুর নিস্পেষন থেকে মর্যাদা নিয়ে বাঁচতে পারে। বর্ণহিন্দুর অত্যাচারে  ভারতেও নি¤œবর্ণের হিন্দুরা সবদিনই যাতার তলে সময় পার করে। মুসলিম বা সংখ্যালঘুরা কোনদিনও তাদের দৃষ্টিতে মানুষ নয়, পশুরও অধম। তারা সবদিন মনে করে এরা গরুরও অধম, মূল আদর্শ রেখে যে মেকী সংস্কৃতি নিয়ে আপনি বড়াই করছেন সেখানে আপনি অচ্ছুৎ। বাংলাদেশের সংস্কৃতি কখনোই হিন্দুর সংস্কৃতি নয়। ৯০% ৯৫% মুসলিম জনতার সংস্কৃতি গড়ে উঠে দেড় হাজার বছরেরও আগে আরবের ধূসর মরূভমিতে একজন মহানায়কের আবির্ভাবে। দেখা গেছে যুগে যুগে মূর্তিপূজকের ঘরেই জন্ম নেয়া নবীরা মূর্তির অসারতা বুঝতে পেরে এর বলয় থেকে বের হয়ে আসেন। তারা মূর্তিপূজাকে চিরদিনের জন্য জলাঞ্জলি দিয়ে একটি ন্যায়বাদি আদর্শ সমাজ গড়ে তুলেন। নবী মোহাম্মদও তাই করেছিলেন। পাকিস্তান সৃষ্টির ইতিহাস ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমদের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয় যেখানে গরুর মাংস ভক্ষণের জন্য আখলাকদের কতল করা যাবে না। কথায় কথায় আজো ভারতের সংকীর্ণ সংস্কৃতির বাহকদেরে তার দেশের অনাদিকাল থেকে বসবাসরত মুসলিম নাগরিককে লাত্থি মেরে তাড়িয়ে দেবার হুমকি দিতে শোনা যায়, দাঁড়িওয়ালা টুপিওয়ালাদের কোনঠাসা করতে দেখা যায়। ঐ মৃদু রোগ সাম্প্রতিক বাংলাদেশেও ছোঁয়াচে রোগের মত ভিড়েছিল বলেই শুনেছি। মুসলিম অধ্যুষিত দেশে এরকম কোন হুমকি কোনদিনও কোন মুসলিম জনতা দিতে পারে না তার উন্নত রুচিবোধে গড়া ধর্ম দর্শনের কারণে।

পাকিস্তানের মূল যুদ্ধ ছিল পরস্পরের সম্পদ বন্টনে ভাগাভাগির লড়াই। সেদিন বানরের পিঠা ভাগের সুযোগে মধ্যসত্ত¦লোভী পুরো যুদ্ধই হাইজ্যাক করে নেয় তার কপট স্বার্থে। যুদ্ধের একদম শেষ মুহূর্তে আমাদের বিজেতাদের বিজয় ছিনিয়ে নিতে সেদিন রুখে তুলে দেয়া হয় বেরিকেড, ময়দান থেকে সরিয়ে রাখা হয় যুদ্ধের প্রকৃত মহানায়কদেরে। যার কোপানলে পড়ে দেশটি আবারও স্বাধীনতার অর্জন গোলাতে তুলতে ব্যর্থ হয়, যার দাগ চারপাশে ছড়িয়ে আছে। আপনাদের অনিসন্ধিৎসু মন কখনোই সত্যানুসন্ধানে নেই। অন্যের হাতের নকল গড়া ইতিহাসেই আপনারা সন্তুষ্ট। দেশপ্রেমিকের ভূমিকা এভাবে কখনো গড়ে উঠে না, এটি দালালের কপটের অপকর্ম মাত্র। আজকের এমন সঙ্গিন মুহূর্তে  আপনাদের দায় ছিল ঐ নষ্ট স্বাধীনতার বলয় থেকে দেশটি উদ্ধারে ঝাপিয়ে পড়া। ৭১এ আপনারা ছিলেন না, কিন্তু আজকের এ বিপর্যয়ে কেন দেশরক্ষায় আপনারা সংস্কৃতিবানরা অবদান রাখতে বারে বারেই শূণ্যতে ঘোরাফেরা করছেন, ব্যর্থ হচ্ছেন। বরং দেশ বিক্রির দিকে আপনাদের নজর বেশী ঘনিষ্ট। আল্লাহ প্রকৃত নির্যাতিত ও দেউলিয়া দেশবাসীর সহায় হোক। কিভাবে সেই প্রত্যক্ষ যুদ্ধকে ময়দান থেকে লুটে নেয়া হয়, এসব কষ্টের ভার আজো আমাদের ভাবায়। যখন দেখি সারা দেশে চলছে, হিরোইন, ইয়াবার মহামেলা, সীমান্ত ঘিরে গড়ে উঠা প্রতিবেশী রাষ্ট্রের ফেনসিডিল ব্যবসার পসরা, ফেলানীরা মরে পাখির আদলে প্রতিটি দিন আমরা সুস্থির থাকতে পারি না, আমাদের ভাবায়। বাংলাদেশের ৯০% মুসলিম যোদ্ধা জনতার মুক্তিযুদ্ধের পাওনা হিসাবে এসব মেনে নেয়া যায় না। আর বাকী ১০% তারাও বাংলাদেশী, আমরা তাদের কথা ভুলি নাই, তারা আমাদেরই। কষ্ট লাগে আপনি শুধু একা নন, সংস্কৃতির বলয়ে থাকা কিছু জনেরা কেন অতিরিক্ত প্রশ্নবিদ্ধ, এরা কি দেখে কম বুঝে কম? কেন ওসব দেখেও না দেখার ভান করে পড়ে আছেন?

বিপদের সাইরেন শুনলে নেশাগ্রস্ত ছাড়া বাকীরা জেগে উঠে বলেই জানি, আপনাদের অন্তরের সচেতন কি জেগে নেই, সেকি ঘুমিয়ে? তাকে জাগিয়ে তুলুন! দরকারে পড়–ন, জানুন, সত্যের সাথে বোঝাপড়া করুন! সত্যের মোকাবেলা করুন! মিথ্যাকে চিরদিনের মত বিতাড়িত করুন ময়দান থেকে। আপনার কাছে ঐ মেয়েদের থেকে বড় টর্চ লাইট থাকলে তা দিয়ে তাদেরে আরো বেশী আলোকিত করে তুলুন যেন তারা অন্ধকারেও পথ চলতে পারে। তাদের বন্ধু হোন, শত্রু ভেবে অচ্ছুৎ ভেবে তাদেরে ঘৃণায় দূরে ছুঁড়ে দেবেন না। মনে হয় তারা আলোর খুঁজে বেরিয়েছে, তাদেরে সহযোগিতা দিন।

নাজমা মোস্তফা, ২৯  জানুয়ারী ২০১৬।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

Tag Cloud

%d bloggers like this: