Articles published in this site are copyright protected.

লন্ডন থেকে প্রকাশিত  ২০১১ সালের ১৬-২২ সাপ্তাহিক সুরমা পত্রিকার একটি কলাম চোখে পড়ে, লিখেছেন রিটায়ার্ড এয়ার কমোডোর ইসফাক এলাহি চৌধুরী। লেখাটি ছিল একজন সৈনিক জীবনের  অধ্যায় যা আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের সাথে জড়িত। শত্রুর মাঝেও কেমন করে যে বন্ধু লুকিয়ে থাকতে পারে, এটি তার একটি উত্তম গল্প হতে পারে। ১৯৭১ সালের যুদ্ধের সময়, আজো মনে পড়ে মার্চ মাসের সেই মেঘের গুরুগম্ভীর গুড় গুড় আওয়াজের সাথে কেমন করে যে সেদিন মেশিন গানের আওয়াজ একাকার হয়ে যেত। মনে হতো যুদ্ধ যেন লেগেছে আকাশে বাতাসে প্রকৃতিতেও। মেঘের আওয়াজে যুদ্ধের আতঙ্ক যেন আরো বেড়ে যেত। এলাহি চৌধুরীর সেদিনের লেখাটিতে একজন ব্যক্তি সম্বন্ধে কথা উঠে এসেছে, তিনি হচ্ছেন কর্নেল নাদের আলী। যিনি ছিলেন পাকিস্তানের একজন সেনা কর্মকর্তা। তার ভেতর লুকিয়ে ছিল একটি মানবিক সত্য নির্ভর বিচারবুদ্ধিতে বিচক্ষণ একটি মন। ধারণা হয় হয়তো এরকম আরো অনেক সত্ত্বাই সেদিন ঐ সম্মুখ যুদ্ধে যোগদান করে। মনে পড়ে আমার বাবার কাছে শুনেছি তিনি তখন নামে দাগে একজন আসামী ডাক্তার ছিলেন, যাকে সারাক্ষণ পাহারায় রাখা হতো। সম্ভবত তার পেসেন্ট হয়ে আসে একটি মিলিটারী তার বুক পকেটে রাখা ছোট্ট বাচ্চাটির ছবি বের করে দেখায় আর আক্ষেপ করতে থাকে কবে যে যাব বা আদৌ যেতে পারবো কি না সে বেদনার কথাটিও সে ভিনদেশী শত্রুপক্ষের ডাক্তারের কাছে বিলি করে অকপটে। সেদিন যুুদ্ধরত  পশ্চিম পাকিস্তানের অনেক কলেজ ছাত্রও এসব বেদনার কথা উল্লেখ করতো যে তার প্রাথমিক ধারণাও ছিল না, এভাবে জড়িয়ে যাবে যুদ্ধে। পূর্ব পাকিস্তান আসার আগে এটি নাকি তাদের কাছে খোলাসা করা হয়নি।

একজন নাদের আলী, ১০ এপ্রিল থেকে অক্টোবরের প্রথম পর্যন্ত যুদ্ধে জড়িত ছিলেন, জানা যায় পরবর্তীতে তার কাজ থেকে অবসর নিতে তাকে বাধ্য করা হয়। এই যুদ্ধ তার মন মননের উপর বিরুপ প্রভাব ফেলে। তাই ত্বরায় তাকে ফেরত পশ্চিম পাকিস্তানে পাঠানো হয়। সেদিনের ময়দানে একজন সৈনিকের দৃষ্টিতে তার অনেক অপরাধ স্বদলের অন্যদের চোখে ধরা পড়ে কারণ তিনি নিরপরাধের প্রতি গুলি ছুড়তে রাজি ছিলেন না। সে হিসাবে তার অধস্তনকেও তিনি এ অপকর্মটি করতে বাধ সাধেন। তার যুক্তিতে কুলায় নাই যে নিরপরাধকে কেন গুলি ছুড়বো। এরকম পরিস্থিতিতে কি পরিমাণ মনোবল থাকলে একজন এমন দৃঢ়তর পদক্ষেপ রাখতে পারে সেটি ভাবনার বিষয়। অনেকের ইচ্ছা থাকলেও এটি করতে পারবে না। কারণ ঐ ধ্বংসাত্মক কাজ করার জন্যই তারা সেদিন উদ্ধত, সেখানে মমত্ব প্রকাশের সুযোগ ছিল শূন্যের কোঠাতে। তারপরও তার ভেতরের মানুষটি এতই প্রবল ছিল বলেই সে গুলি ছোড়ার আগে তার অপরাধ জানতে চেয়েছে। যখন জার্নালিষ্টরা লন্ডন পালিয়ে গিয়েও নানান খবরাখবর প্রকাশ করছিলেন, এসব খবর জেনে তার বিদগ্ধ মন নিজেকে আরো বড় আসামী হিসাবে চিহ্নিত করতে থাকে। এতে তিনি মনের দিকে আরো বিচলিত হন। যার প্রতিফলন ঘটে তার পরবর্তী জীবনের উপর। অস্ত্র ছেড়ে একদিন কলম হয় তার বন্ধু, কবিতা হয় তার সঙ্গি।

সত্য নির্মম হলেও তাকে প্রকাশ করাই যুগের দাবী। বেশ কিছু দিন থেকে অনেক লেখালেখি পাচ্ছি দেখছি শুনছি যা সচেতন বিবেককে নাড়িয়ে তুলছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের শরিক যোদ্ধা আমরা নিজেরাও। যুদ্ধের অনেক ইতিহাস আমরা চোখে দেখেছি, মোকাবেলা করেছি, মুখে মুখে শুনেছি। সে হিসাবে আমরা নিজেরাই কম বেশী ইতিহাস। আবার অনেক বাস্তবতার খবর যেমন জেনেছি তেমনি অনেক অতিরঞ্জনের খবরও জেনেছি। ভারতের একজন সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবি শর্মিলা বসু এর উপর সাম্প্রতিক কিছু গবেষণার কাজ করে দেখিয়েছেন। তিনি বাস্তব ময়দানে কাজ করে এর উপর তার যুক্তি পেশ করেছেন। শর্মিলা বসু খোদ বসু পরিবারের একজন সচেতন ব্যক্তিত্ব। তাকে একদম অবহেলা করে নাকসিটকে দূরে রাখারও কোন যুক্তি নেই। যদি তার গবেষণালব্ধ কাজে যুক্তি, বিবেচনা সচল থাকে, তবে অবশ্যই তার কাজ ইতিহাসে জায়গা করে নিবে। একে দূরে ঠেলে দেবার ফুরসত থাকবে না। এরকম একজনের কাজকে মূল্য না দেয়ার কোন কারণ নেই, তবে যে বিষয়টি নিয়ে তিনি নাড়াচাড়া করছেন ধারণা হয় এটি চলমান সময়ে অনেকেরই পছন্দ নয়। তাই যুক্তি তথ্য প্রকাশিত হলেও অনেক বিরুপ কথাও শোনা যাচ্ছে।

সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে তিনি একজন ভারতীয়, তার তো এ সম্পর্কীত তথ্য এভাবে দেবার কোন কথা ছিল না। বরং তার দৃষ্টিতে ভারতের স্বার্থকে বড় করে দেখার খাতিরে তার মুখ থেকে এর উল্টোটি বলার যুক্তি খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা অতিরিক্ত ছিল। তারপরও কেন যে তার মুখ থেকে এরকম যুক্তি বের হচ্ছে? ধারণা হয় সাংবাদিক জীবনের গভীর সততার মাঝে কাজকে ছড়িয়ে দেবার মানসেই তাকে এরকম কঠিন যুক্তির একটি কাজ করতে হয়। প্রকৃতই তার কাজটি ভারতের চলমান উল্টো স্রোতের টানে প্রবল টানাপোড়ানের মাঝে পড়েছে। তারপরও কিসের সন্ধানে তিনি এমন একটি কঠিন কাজ করেন, যার জন্য অনেকেই তাকে প্রশংসার দাবীদার করাই সঙ্গত বলে মনে করছেন। এখানের এ দু’জনের কাজের ধারা যেন এক জায়গায় এসে মিলে গেছে দু’জনা মানবতাকেই উচ্চে তুলে ধরেছেন। এদের কাছে কে মরলো বাঁচলো সেটি বড় কথা নয়। এরা নিজ কপট স্বার্থকে বিসর্জন দিয়েও মানুষের সমাজে থেকে মানুষের কথাই চিন্তা করেছে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে। পাকিস্তানের সৈনিকযোদ্ধা নাদের আলী যুদ্ধের ময়দানে আর শর্মিলা বসু গবেষনার ময়দানে কথাগুলি দুটি সময়ে কথা বললেও তাদের এক জায়গার মিল প্রকট, এরা নীতিকে সত্যকে তুলে ধরতে চেয়েছেন।

শর্মিলা বসুর গবেষনাধর্মী কাজটি হচ্ছেডেড রেকনিং: ম্যামরিজ অব দ্যা ১৯৭১ বাংলাদেশ ওয়ার১৯৭১ সালের স্মৃতিচারণ থেকেই উদ্ভুত। তার যুক্তিটি হচ্ছে আজ পর্যন্ত এর উপর তেমন কোন তথ্যবহুল বাস্তব কাজ হয়নি। শুধু কিছু অতিরঞ্জন, বানোয়াট বিকৃত তথ্যকে পূঁজি করে বাড়তি ফায়দা লুটার একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কলকাতার বিখ্যাত সুভাষ বসু পরিবারের মেয়ে শর্মিলা বসু মনে করেন ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের এসব ঘটনাকে অবলম্বন করে আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমেও অতিরঞ্জনের ধারণাকে ছড়িয়ে দেয়া হয়। শুরু থেকেই তিনি অন্য সবার  মতই প্রচলিত ধারণাতেই বিশ্বাসী ছিলেন। ঐ বিশ^াসেই সম্ভবত তিনি কাজে নামেন। যার কারণে তার এর উপর কাজ করার বাসনা জাগে। তার কাজের যুক্তি হচ্ছে তিনি বাংলা ইংরেজীতে প্রকাশিত সব যুক্তি তর্ক লেখা খুটিয়ে খুটিয়ে পড়েছেন। যুক্তি ও সূত্রে পাওয়া সে যুদ্ধে তিনি জড়িতদের ক্ষতিগ্রস্তদের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। যুদ্ধের দুটি পক্ষের সাথেই তিনি এর মোকাবেলাতে খানা খন্দক ঘুরে বেড়িয়েছেন। তার কাজ কোন একতরফা কাজ ছিল না। যদিও এটি প্রকাশের পর অনেকে এর উপর বিরুপ মন্তব্য করতেও শোনা গেছে। মনের মাঝে জেগে উঠা সত্য উদঘাটনের সূত্রে তার এ প্রচেষ্ঠা। যুক্তিতে একদম তৃণমূল পর্যায়ে তিনি খুঁজতে গিয়ে দেখতে পান এর বেশীর ভাগই অতিরঞ্জন, অসত্য ও বানোয়াট প্রচারণা। অনেক তথ্য বিকৃতভাবে প্রচার করা হয় এবং অনেক বাস্তব সত্য তথ্য চেপে যাওয়া হয়। একজন সাংবাদিক হিসাবে তিনি উদাহরণ হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সিবিএস সাংবাদিক লারা লগানের ঘটনাটি তুলে ধরেন। ২০১১ সালের সংগঠিত মিশরের তাহরির স্কোয়ারে আন্দোলনকারীরা বোঝা গেল এরা গণতন্ত্রের জন্য প্রাণ উৎসর্গকৃত। কিন্তু এসব গণতান্ত্রিক সংগ্রামের আড়ালেও কিছু ছলনা লুকিয়ে ছিল, সেটি পরে উন্মোচিত হয়। সেটি হচ্ছে সেখানে সেদিন কিছু নারী সাংবাদিকের উপর ভয়ানক হামলা চালানো হয়। আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম সেটি চেপে গিয়েছিল। কিন্তু লারার সাহসী পদক্ষেপে সে কাহিনী আর চাপা থাকে নি। উল্লাসরত আন্দোলনকারীরা তাকে ধর্ষণ করে, বিকৃত ছবি মোবাইল ফোনে ধারণ করে ও প্রচার  করে। তবে তার ভাষ্য থেকে জানা যায় একদল বোরকা পরিহিত নারীরা তাকে উদ্ধার করে। পরে সৈন্যরা তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের যুদ্ধেও একইভাবে এ দোয়ের টানাপোড়ানের অবস্থান শর্মিলার চোখে ধরা পড়ে।

শর্মিলার কথাকে এপিতে প্রকাশের আগে তিনি অনেক সাংবাদিক বিশেষজ্ঞকে এটি পড়তে দেন, তারা সবাই এর ভূয়শী প্রশংসা করেন। এদের অনেকেই এ সাহসের জন্য অগ্রিম অভিনন্দন জানিয়েছেন। তার যুক্তিটি হচ্ছে একপক্ষের চড়া আওয়াজের নীচে অনেক সত্য চাপা পড়ে আছে। যার জন্য একদল এর প্রকাশে চরম বিরোধীতা করে চলেছে। তারা চায় না এ চেপে রাখা ইতিহাসকে উগলে বের করে দিতে। কারন এর যুক্তি হিসাবে দেখা যাচ্ছে অনেকে না পড়েই এ বইটির বিরুদ্ধে বিরোধীতা করতে কুন্ঠিত হচ্ছেন না। তিনি বলছেন, তারা চাইছে যত কম লোক বইটি পড়বে ততই মঙ্গল। তাই তাদের পক্ষের ঢোলের বাড়ীর আওয়াজ বড় করে দেবার চেষ্টা চলছে। শর্মিলা বলছেন, কেউ কেউ তার কাজটিকে মনে করছেন পাকিস্তানী বাহিনীর সাফাই কাহিনী গাওয়া হচ্ছে। যার বিরুদ্ধে শর্মিলা খুবই সোচ্চার ছিলেন। তিনি এর প্রতিবাদ করে বলেন, এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা কারণ বইটিতে পাকিস্তানী বাহিনীর নির্যাতনের বাস্তব চিত্রও চিত্রিত হয়েছে। তবে তুলনামূলক বিশ্লেষনে প্রকৃত সত্য হয়তো বেরিয়ে এসেছে, যার জন্যই এক পক্ষের আওয়াজ অতিরিক্ত হচ্ছে। তিনি বড় গলায় দাবী করেন যুদ্ধের উপর দু’পক্ষের ভাষ্য নিয়ে তৃণমূল পর্যায় থেকে তথ্য সংগ্রহ করে এমন একটি কাজ এটিই প্রথম। মাত্র দুইজন মার্কিন ইতিহাসবিদ রিচার্ড সিশন ও লিও রোজ ২০ বছর আগে গবেষণাধর্মী একটি বই লিখেছিলেন। “ওয়ার এন্ড সিসেশন: পাকিস্তান, ইন্ডিয়া অ্যান্ড দ্য ক্রিয়েশন অব বাংলাদেশ” নামে বইটিও প্রচলিত ধারণার খন্ডন করেছিল কিন্তু তাদের রচনা সাধারণের কাছে পৌছায় নি, সেটি বিশেষজ্ঞ পর্যায়েই রয়ে গেছে।

শর্মিলা বসুর যুক্তিটি হচ্ছে প্রতিটি গোজামেলের সুষ্পষ্টতা থাকা উচিত। কি কারণে পাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলাদেশের সৃষ্টি হলো। কোন পক্ষের কি ভূমিকা ছিল, এর প্রকৃত কার্যকারণ সম্বন্ধে খোলামেলা আলোচনা হওয়া জরুরী। তাহলে কখনোই একতরফা ইতিহাস রচিত হবে না বরং প্রকৃত সত্য ইতিহাস বের হয়ে আসবে। এ যাবত ত্রিশ লক্ষ শহীদের উপর শেখ মুজিবের তত্ত্বটি বেশ জোরে সোরে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল, যদিও এর বিপক্ষে সচেতন সমাজ থেকে বহু আগেই কিছু হালকা কথা কানে এসেছিল বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠালগ্ন কাল থেকে। পরবর্তীতে বেশিরভাগ পত্রিকা মিডিয়াই ঐ ত্রিশ লাখ তত্ত্বের মাঝেই সচল রাখতে সোচ্চার ছিল। সত্যি কথা বলতে কি আমরা নিজেরা শুনেও না শোনার ভান করে ছিলাম। জানা যাচ্ছে কিছু বুদ্ধিজীবিরা যারা ঐ ত্রিশ লাখের প্রচারণার মাঝেই সাচ্ছন্দ্যবোধ করছিলেন তারা ইদানিং এতদসংক্রান্ত খবরে খুব ক্ষ্যাপেছেন অনেকেই। যার প্রেক্ষিতে সুভাষ বসুর এ উত্তরাধীকারীকে এর জবাব হিসাবে পাকিস্তানের চর বানাতেও কুন্ঠিত হচ্ছেন না। সত্য সময়ে সময়ে বড়ই বিস্বাদ ঠেকে। তারপরও সত্যকে উদ্ভাসিত হওয়াই যুগের নীতি। একে কিছুদিন দাবিয়ে রাখা চলে, তবে চিরদিন দাবিয়ে রাখা যায় না। একদিন না একদিন এর উন্মোচন হবার একটি সুযোগ থেকেই যায়।

একটি লেখাতে দেখলাম  বাংলাদেশের একজন সাংবাদিক তিনি হিসাব দিয়েছেন যে বাংলাদেশের যুদ্ধে যদি ৩০ লক্ষ মানুষকে মরতে হয় তাহলে যুদ্ধ চলেছে সাড়ে আট মাস সে হিসাবে ২৬৬ দিন এবং গড়ে প্রতিদিন গড়ে ১১ হাজারেরও বেশী মানুষকে মরতে হবে। এটি প্রমাণ না হলে এরকম একটি মিথ্যা কখনোই প্রতিষ্ঠা পাওয়া সম্ভব নয়। সে হিসাবে যে কোন বাংলাদেশীই এটি আঁচ করতে পারবেন কার কতজন বন্ধু পরিচিত আত্মীয় বর্গ যুদ্ধে মারা গিয়েছেন। লন্ডন প্রবাসি প্রয়াত সাংবাদিক সিরাজুর রহমানের অনেক লেখাতেও এর উপর যুক্তিনির্ভর কথা উঠে এসেছে। প্রতিটি ব্যাপারে স্বচ্ছতার দরকার। মিথ্যা দিয়ে ছলনা হয় ষড়যন্ত্র হয়, কিন্তু সঠিক বিচার হয় না। তাই আজো শোনা যায় বিচারের বানী নিরবে নিভৃতে কাঁদে। আজকের স্বাধীন দেশেও যেভাবে জনতারা লাশ হচ্ছে গুম হচ্ছে মনে হচ্ছে যুদ্ধ যেন আজো থেমে যায় নি। বরং বহুগুণ তেজে চল্লিশ পার করা সোমত্ত স্বাধীনতা নতুন মোড়কে আহত বিধ্বস্ত ক্ষতবিক্ষত আজো যুদ্ধরত।  চোখ কান খোলা রেখে পরখ করে নিতে হবে কি কারণে কার কারণে কি অপরাধে আজো তারা সর্বহারা, নতুন শতাব্দীর প্রথম যুগটি পার করা যুদ্ধরত দেশের প্রতিটি সচেতন সত্ত্বা। সত্যের সাথে নীতির সাথে কোলাকোলি হচ্ছে সততার  পথেচলা, ছলবাজকে মিথ্যাকে রুখে দাড়ানোও সততার দায়ভার। সবযুগেই একবিংশ শতকেও মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন এটিই। Andolon News | 22 Feb 2016 | মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের একত্রিশ লক্ষ / লাখ : বোললেন শেখ হাসিনা

আজকাল প্রায়ই মুক্তিযুদ্ধের ‘চেতনার নামে’ বিশাল গবেষনাসব দেখছি। সম্প্রতি খালেদা জিয়া ও গয়েশ^র রায় তাদের বক্তব্যতে শহীদের প্রশ্নটি তুলাতে বিভিন্ন মহলে বিশাল মাপের তোলপাড় শুনতে পাচ্ছি। সবদিনই তেতো সত্যকে গিলতে কষ্ট হয়। প্রশ্নের পর প্রশ্ন তোলা হচ্ছে কেন বিজয়ের মাসে এ কথা? জানা যাচ্ছে মুক্তিযোদ্ধা দল আয়োজিত সমাবেশে খালেদা জিয়া এটি উল্লেখ করেন যে শহীদের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক আছে। যুক্তি দেখানো হচ্ছে সত্য হলেও এসব প্রচার করা মানা, কারণ এসব ৪৪ বছর থেকেই প্রতিষ্ঠিত। এর জন্য সুপ্রিম কোর্টের এক আইনজীবী নাকি খালেদা জিয়াকে উকিল নোটিশও পাঠিয়েছেন। এর সূত্র ধরে অনেকেই কয়টি কারণ আঁচ করছেন, জামাতের গন্ধ,  পাকিস্তানের ফাঁদ, লন্ডন সফরের প্রভাব, নাকি মুখ ফসকে বলে ফেলেছেন। এর ফাঁক গলিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন তার স্বামী জিয়াউর রহমান একজন মুক্তিযোদ্ধা ও একজন সেক্টর কমান্ডার ছিলেন, এতে ঐ মুক্তিযোদ্ধারও অপমান হয়েছে। যাক কপাল ভালো তিনি এর ফাঁক গলিয়ে তাদের প্রচারিত রাজাকারকে সেক্টর কমান্ডার হিসাবে অবলীলায় স্বীকার করে নিলেন, কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে এ স্বীকার করাটা তাদের ফ্রেমে বাধাই করে রাখার মত বিষয় এটি। গয়েশ^র রায় বা খালেদা জিয়া কেউই সংখ্যাতত্ত্ব নিয়ে বেশী নাড়েন নাই বরং এর চেয়ে বহু বেশী নাড়া তৈরী করেছেন ভারতের শর্মিলা বসু ও অন্যরা। এবার কথা হচ্ছে প্রকৃত খবরে দেশবাসী অবগত নয় বলেই মনে হচ্ছে। কারণ এ ইস্যুটি মোটেও নতুন নয়, অনেক পুরোনো ইস্যু। আমরা স্বাধীনতার শুরুর সময় থেকেই শুনে আসছি। খালেদা জিয়া যদি লন্ডন থেকে জানেন, তবে সেটিও উনি অনেক পরে জানলেন। বাস্তব কথাটি হচ্ছে, মুখ ফসকে খালেদা জিয়া বলেন নাই, ঐ মুখ ফসকে কথাটি বলেছিলেন শেখ মুজিব নিজে। এবার গণতন্ত্রের বোতল পুরোটাই উল্টে দিতে এ ইস্যুকে হাইলাইট করা হচ্ছে ঘেরাও কর্মসূচি দিয়ে, হামলা মামলা দিয়ে।

সাম্প্রতিক ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ এন্ড এনালাইসিস উইং এর সাবেক অফিসার আর কে যাদব একটি বই প্রকাশ করেন। তাতে তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে “র”এর কৃতিত্ব দেখাতে চান, তার কারণ যা ভারত ৪৪ বছর থেকে ঢেকে রেখেছে। তাই ২০১৫এর বাংলাদেশের বিজয় দিবসে তিনি বাড়তি সরব। যুদ্ধে দুটি পর্যায় ছিল একটি গেরিলা যুদ্ধ আর পরেরটি ভারতের সরাসরি যোগদান। পূর্ব পাকিস্তানের নদীনালাপূর্ণ জলজ পরিবেশে অভিযান করার মত সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষণ তাদের তখন ছিল না। এর আগের ৬২ ও ৬৫ এর পরাজয় মনের মাঝে সচল ছিল। পূর্ব পাকিস্তানের বেশিরভাগ অংশে মুক্তিযোদ্ধারাই চালিয়ে যায় ঐ গেরিলা যুদ্ধ। মেজর জলিলের বইতে এসব অনেক সত্য এসেছে। অতপর মুক্তিযোদ্ধাদের পাশাপাশি মেজর উবানের নেতৃত্বে গড়ে তোলা হয় মুজিব বাহিনী নামে আর এক দল, যারা যুদ্ধে অংশ নেয়ার সুযোগ পায়নি। তার আগেই যুদ্ধ শেষ হয়ে যায়। গোয়েন্দা লেখক যাদবের কৃতিত্বের আদ্যপাঠ জেনে অনুবাদক আমান আব্দুহু মন্তব্য করেছেন এতদিন শুনলাম শেষ তেরদিন ছিল ভারতের যুদ্ধ আর এখন জানলাম পুরোটাই ভারতের যুদ্ধ। বেদনাহত মনে তিনি আরো বলেন, ওদিকে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে মুক্তিযুদ্ধের কিচ্ছাকাহিনীর নামে চাপাবাজির প্রসঙ্গে আজ আমরা আর না যাই। যেভাবে গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের কাপড় খুলে যাচ্ছে মনে হচ্ছে বরং উল্টো এখন জয় বাংলা বলে নিজেদের চোখ ঢাকতে হবে আর কি।” এবার বিচারপতি মানিক ও সারিবাধা সব ঘেরাও কমিটির বক্তারা কি ভারতকে ঘেরাও করতে ছুটবেন নাকি ইতিহাসকে সত্যতার মাপকাঠিতে মূল্যায়ন করবেন নাকি এতদিনের চেপে রাখার আসল কারণটি উদ্ধার করবেন। চেপে রাখার মাঝে কোন সমাধান নেই। সব ষড়যন্ত্রকে শক্ত হাতে সত্য শক্তিতে মোকাবেলা করুন।

ইতিহাসকে কোনভাবেই চাপা দিয়ে রাখা সম্ভব নয়। এটি একদিন না একদিন বের হবেই। কোন কিছুকে চাপা দিয়ে রাখলেই কি মহত কাজ মনে করতে হবে। বরাবরের মত একজন প্রশ্নবিদ্ধ বিচারপতিও ময়দানের মিছিলের সারিতে আগুয়ান। যুক্তির কথাটি হচ্ছে সত্যের স্বার্থে প্রতিটি ক্ষেত্রে কি ধর্মে কি রাজনীতিতে ইতিহাসের উন্মোচন জরুরী। কুরআন বলে “ওহে যারা ঈমান এনেছ! আল্লাহর জন্য দৃঢ় প্রতিষ্ঠাতা হও, ন্যায়বিচারে সাক্ষ্যদাতা হও। আর কোন লোকদলের প্রতি বিদ্বেষ তোমাদের যেন ন্যায়াচরণ না করতে তোমাদের প্ররোচিত না করে। ন্যায়াচরণ করো, এটিই হচ্ছে ধর্মভীরুতার নিকটতর। আর আল্লাহকে ভয়শ্রদ্ধা করো। নিঃসন্দেহ তোমরা যা করছো আল্লাহ তার পূর্ণ-ওয়াকিবহাল” (সুরা আল-মাইদাহএর ৮ আয়াত)। উকিল নোটিশ পাঠানোর বিচারকসহ বাংলাদেশের মুসলিম প্রধান জনতাকে তাদের সিলেবাসের এ সত্যতাকে স্বীকার না করার কোন অবকাশ নেই। সেটি যদি একজন গায়েশ^র রায়ও মেনে চলেন, দ্বিগুণ মাপে ধন্যবাদ তার জরুর পাওনা হয়।

১৯৭১ নিহত বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিলেন মেজর অবঃ কামরুল হাসান,

নাজমা মোস্তফা,   ২৮ ডিসেম্বর ২০১৫।

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

Tag Cloud

%d bloggers like this: