Articles published in this site are copyright protected.

আমার এ ব্লগে সব কষ্টকেই আমি জমা করতে চাই। প্রতিবেশীদের মত সাম্প্রদায়িক হুজুগে বাংলাদেশ কখনোই আক্রান্ত নয়। যদিও মিথ্যাচারে কিছু চক্রান্তকারীরা ঐ মিথ্যে সুর তোলার ব্যর্থ প্রয়াস করেন মাঝে মাঝে, যা ধোপে টেকে না। বিদ্রোহী কবি নজরুলকেও এককালে অনেক গালাগাল দিয়েছে আমাদের চুলচেরা বিশ্লেষনকারী ধর্মবাহকরা। এর কারণ হয়তো হিন্দু নারীর পানি গ্রহণই তাদেরে ঐ আচরণে উদ্বুদ্ধ করে বেশী। ভারতে গরুর মাংস ভক্ষণের জন্য মানুষ খুন করার ধৃষ্টতা ধর্মের নামে চলছে, সেখানে তারা এ কবিকে বা তার স্ত্রী প্রমিলাকে খুন করে নাই, তবে নজরুলকে একহাত নিতে তারা “কাফির” নামটি সেটে দিতেও কসুর করেনি। কাফের অর্থ ইসলামের পরিভাষাতে যারা ইসলামের সত্য থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখে বা লুকিয়ে রাখে। দেখা যায় সমাজের কিছু ভাগ্যবানেরা সবদিনই এটি অর্জন করেছেন, যদিও তারা এ নামে মানানসই নন। নজরুল, ইকবাল, মওদুদী এরা অনেক ক্ষেত্রে অনেক ভালো মুসলিম হয়েও এ অর্জনের অধিকারী হয়েছেন। বাংলাদেশে অনেকেই রবীন্দ্র পূজাতে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে চলেছেন। কেউ বলছেন ঈশ^র, কেউ বলছেন রবীধর্ম (নবুয়তি দিতে চেয়েছেন) কিন্তু ভারত গবেষকরা নজরুল সম্বন্ধে বলছেন ভারত দুখু মিয়াকে না পারে গিলতে না পারে উগলে দিতে। তার স্বপক্ষে প্রতিবেদনটি দেখুন।

ডাউন লোডের দু এক দিনের মাঝেই প্রায়ই লিংকগুলি মুছে দেয়া হচ্ছে। বাস্তবতা এখানেই নীচে।

চুরুলিয়া – Churuliya – কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মস্থান

ভারতে লাইন বাধা মুসলিম খানরা ঐ মানচিত্রে দেশের সুনামে কাজ করে চলেছেন যদিও তারা ধর্মের পরিচিতির মূখ্য ভুমিকায় নন, ভিন্ন মাত্রায় তারা মোটাদাগে পরিচিত। বরাবরের মত এবারো তাদের সব পরিচিতি ছাপিয়ে বার বার বুদ্বুদ হয়ে ভাসছে তাদের মূল ধর্ম পরিচিতি। ২০১২ সালে আমার একটি বই বাংলাদেশের বই মেলাতে আসে বইটির নামএকই ধর্ম একই ধারা লেখাটিতে আমি এটিই ফুটিয়ে তুলতে চেষ্টা করেছি, কিভাবে যুগ যুগ অবধি বিশ্রষ্টা ধর্মের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে চলেছেন একই ধারাতে, আর আমরা মানুষরা কিভাবে ভিন্ন ভিন্ন নামে নিজেদের মাঝে বিভেদ সৃষ্টি করে চলেছি। যুক্তিগুলো উপস্থাপন  করতে বইটিতে প্রায় ৪০০এর উপর তথ্যসূত্র এসেছে। সেখানে পৃথিবীর বড় বড় প্রচারিত ধর্ম সূত্রসহ আলোচনায় এসেছে। ধর্ম ধারণের এতপরও আমরা বহুদূর পিছিয়ে আছি নিজেদের অপরিনামদর্শীতার কারণে। সেখানে ঐ অপরাধে ভারতের জনগণ সনাতন  ধর্মের দাবীদার হলেও সবদিনই আচরণে কপট মানসিকতার শিকার, তাদের বেশিরভাগ আচরণই বিতর্কের জমা বাড়ায়। গুজরাট বলেন, বাবরি মসজিদ বলেন, আর আখলাক হত্যাই বলেন, তাদের লেখকরা প্রকাশ করছেন ওখানে সংখ্যালঘুরা এতই নির্যাতীত যে, গরু বরং সে দেশে তার চেয়ে অনেক বেশী নিরাপদ। এ চিন্তায় বেশ আগে থেকেই আক্রান্ত হয়ে এর কারণ সন্ধানে কিছু সূত্র প্রাপ্ত হয়েছি। আমি মনে করি এসব হত্যাকারী অপরাধের জন্য দায়ীরা বড় আসনে বসলেও অপরাধের দায় তাদের ঘাড়ে বড় মাপেই বর্তায়। সচেতন সমাজ তা চেপে গলাধকরণ করে বসে আছে, যা ঠিক নয়। এটি অজানা জনতার সাথে এক ধরণের প্রতারণা।

সম্প্রতি ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং সংসদ অধিবেশনে এটি স্পষ্ট করেন যে, প্রথম সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা সমাজতন্ত্র ছিল না। অতপর সাবেক প্রধানমন্ত্রী জরুরী অবস্থা জারি করে ১৯৭৬ সালে (ভারতের স্বাধীনতার ২৯ বছর পর) সংবিধানের ৪২তম সংশোধনির মাধ্যমে ধর্মনিরপেক্ষতা সমাজতন্ত্র যোগ করেন। উল্লেখ্য হিসাবে দেখা যায় কৌশলী ভারত জোর করে আওয়ামী ষড়যন্ত্রীদের মাধ্যমে তার নিজ দেশের প্রয়োগের আগেই বাংলাদেশের ঘাড়ে যুক্তি চাপিয়ে দেয় ১৯৭২ সালে(বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরের বছর), তার আগে এর নামগন্ধও ছিল না। এর কিছু বিসতৃত আলোচনা মুক্তিযোদ্ধা মেজর জলিলের “অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা” গ্রন্থে খুব স্পষ্ট করেই আলোচিত হয়েছে। ধর্ম নিরপেক্ষ ভারতের সংবিধান সম্বন্ধে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি কে, আর নারায়ন অতীতে বলেছেন, “ভারতের সংবিধানের পবিত্রতা আমরা রক্ষা করতে পারি নি। আমরা সংবিধান ভঙ্গ করেছি”। ভারতীয় সংবিধানের ২৫ অনুচ্ছেদে স্পষ্ট ভাষায় প্রত্যেকের নিজ নিজ ধর্ম পালন ও প্রচারের স্বকীয় স্বাধীনতার কথা উল্লেখ থাকলেও আজ ভারতের সংবিধান কিছু কট্টরপন্থী হিন্দু নামধারী সংকীর্ণদের হাতে জিম্মি দশা কাটাচ্ছে। দাঙ্গাহাঙ্গামার জন্য জাতিতে গোষ্ঠীতে, উচ্চ বর্ণ নিচ বর্ণের এক কুরুক্ষেত্রের মাঠ ভারত, বিশেষ করে মুসলিম নিধনের জন্য এটি একটি উত্তম রণক্ষেত্র বটে!

পাশাপাশি হিন্দু ও মুসলমান দুটি সমাজ ব্যবস্থার লোক আমরা বাংলাদেশেও বহুদিন থেকে বসবাস করে আসছি ভাই বোনের মতই। আমার শিশুকালের নিজেরও বেশীরভাগ সহপাঠীই ছিল হিন্দু। সবাই দলবেধে আমাদের বাসায় আসতো, যেত, খেতো। কোন বৈষম্য তেমন টের পেতাম না, তবে প্রথম এটা টের পেয়েছিলাম যখন আদরের বান্ধবীকে তারা অতি যতনে দাওয়াত করে নিয়ে গিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু তাদের গোটা বাড়ীর ছোটবড় সবার অতি আদরের ডাক্তার বাবুর নয়নের মা-মনিকে যখন তারা বারান্দায় বসতে দিল। তখনই আমার মাথায় এক প্রচন্ড হোঁচট অনুভব করি, যদিও আমি নিতান্ত শিশুই ছিলাম। আমার বান্ধবীদের মায়া মমতার কোনই কমতি ছিল না। সেদিন জল খাবারের আয়োজন হিসাবে যে যা পারে এনে হাজির করে ঠিকই। কিন্তু তবু কোথায় যেন একটি কাঁটা বিধে থাকে এবং সেটি আমার অন্তরে আজও আমাকে পীড়া দেয়।

উপরোক্ত প্রসঙ্গে সন্ধান করতে গিয়ে দেখা যায় যদিও আমাদের সাধারণ জনতারা হিন্দুই হোক আর মুসলমানই হোক নিতান্তই গো বেচারা প্রকৃতির বিধায় এবং তেমন সচেতন নই বলে আমরা আজও সঠিকভাবে ধরতে পারিনি যে এসবের মূল কারণ কি? কেন আমাদের দাঁতে এত বিষ? আমরা হিংস্র জীব নই, যদিও তবু কেন এত ভয়ংকর ক্ষুধা, হিংস্রতা আমাদের আচরণে? আমরা তো মিলে মিশেই কাটিয়েছি। যার যার ধর্ম যার যার মতনই পালন করেছি, তবু কেন আমাদের মাঝে সাপে নেউলে সতিনী সম্পর্ক? আজ মনে হয় এর বিজ কিভাবে রোপন করা হয়েছে পরম যতনে , যার জন্য এটি তোষের আগুণের মতই দিকি দিকি জ¦লছে নিরবধি। এর মূলে যারা তারা একদম সাধু পুরুষ সেজে বসে আমাদের রক্তে নিজেরা (¯œান) সিনান সমাপান্তে মহা তৃপ্তিপূর্ণ ভান্ডে ডুবে আছে সম্মানে, প্রপ্তিতে, পূর্ণতায় সকল ব্যর্থতা, দায়, হতাশা আর শূণ্যতা আমাদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে তারা আজ বরণীয়, পূজনীয় সমাজে সভ্যতায়।

সর্বাগ্রে আমি দেখাতে চাই সাহিত্যে কেমন করে সতিত্বহানী করা হয়েছে। এ শুধু আমার চোখে পড়েছে বলেই আমি শুধু তা পাঠকের সামনে তুলে ধরছি, এটি ঠিক নয়। সাহিত্য সংস্কৃতি এমন একটি মাধ্যম যাতে যে কোন যুগের মানস চিত্রের ছায়া সাহিত্যের দর্পনে ধরা পড়ে। সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস ঘাটলে অতীত জীবনের নানান চিত্র যে কোন বর্তমানেও ফুটিয়ে তোলা সম্ভব। ভারতবর্ষের বঙ্কিম সাহিত্যের সহিত অনেকেই পরিচিত। বঙ্কিম চন্দ্রের সাহিত্যে অনেক মুসলিম বিদ্বেষ সাক্ষাৎ চোখে পড়েছে সব সচেতনের কাছেই। ধর্মের বিষ বাষ্পের সাথে সাথে যদি কেউ সাহিত্যের বিষ বাষ্প ছড়াতে ব্যস্ত থাকে, তবে স্বভাবতই উক্ত অঙ্গনের আগুন দ্বিগুন তেজে জ্বলতে থাকবে যুগ যুগ ব্যাপী। কারণ সাহিত্য একদিনের জন্য বা ক্ষণিকের জন্য সৃষ্ট কোন উপাদেয় প্রসাদ নয়। এটা যুগ যুগ ব্যাপী এর স্বাদ এর বিস্বাদ সমাজকে আলোড়িত করার ক্ষমতা অবশ্যই রাখে।

রবীন্দ্রনাথ আমাদের কাছে অনেক বড় মাপের কবি। এটা মাপ না নিয়েই আমরা অনায়াসে বলতে পারছি। কেউ কবিগুরু, বিশ্বকবি, শ্রেষ্ঠ কবি, অজস্র ভূষণে আমরা সমানেই তাকে ভূষিত করে চলেছি। এমন কি অনেককে তোষামোদি করতে করতে তাকে ঈশ্বরের সমতূল্য বলতেও শোনা গেছে। আজ তাকেও এ প্রসঙ্গে এনে দাঁড় করাবো কারণ সাহিত্যের অনেক ঋণ তার ঘাড়েও পড়ে।  আর এ শুধু আমি নয়, অতীতে যারা দাঁড় করিয়েছেন তাদের কথা, তথ্য আমি এখানে তুলে ধরবো শুধু সত্য সন্ধানের খাতিরে, আমার প্রধান কাজটি হচ্ছে তুলে ধরা। হতে পারে এতে অনেক বিদগ্ধ জন ক্ষুব্ধ হতে পারেন, কিন্তু আমার করার কিছু নেই। বলা যায় আমি এতদিন অনেক কিছুই জানতাম না, তাই নতুন করে জানার পর আজকের এই পুরান ঘটনার উপস্থাপনা। একটি বই হাতের কাছে পাই লেখক আবু ফাতেমা মোহাম্মদ ইসহাক , ১লা  অক্টোবর ১৯৬৯ প্রথম সংস্করণ। বইটিতে লেখক অনেক বেদনার কথা তুলে ধরেছেন কেমন করে সাহিত্যের বিষ আমাদের ভিতরে জিইয়ে রাখার কাজটি করা হয়েছে খুব কৌশলে। যার খেসারত হিসাবে আজ অবধি ওখানে গুজরাটের চারপাশে আগুণ। আগুণ জ্বালাতে সবাই সিদ্ধহস্ত, মোদির সরকারও পিছিয়ে নেই, নিবানোর জনতা সবদিনই অল্প। নিচে শুধু পাঠকের জন্য সংক্ষেপে কিছু পয়েন্ট, যদিও গোটা বইয়ে বিসতৃত আলোচনা এসেছে।

(১) পশ্চিম  বঙ্গ নিবাসী রবীন্দ্র সাহিত্যের গবেষক কাজী আব্দুল ওদুদ সাহেব বলেছেন, পরবর্তীকালে অবশ্য এমন সময় রবীন্দ্রনাথের চিন্তায় এসেছিল যখন প্রায় বঙ্কিমচন্দ্রের ধরণের হিন্দু জাতীয়তাবাদী তিনি হয়ে পড়েছিলেন”। তিনি আজীবন সাম্প্রদায়িক লোকদের সাথেই বেশী উঠাবসা করেছেন ও তাদের শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন। তবে বঙ্কিম চন্দ্রের সাম্প্রদায়িক উগ্রতা তার মধ্যে ছিল না—এ কথা কতকটা বলা যায়।

(২) তবে একথাও স্মরণযোগ্য যে, উগ্র সাম্প্রদায়িকতার চেয়ে সুক্ষ সাম্প্রদায়িকতার ফল সুদূর প্রসারী এবং এর জ্বালা দীর্ঘতর।

(৩) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক শ্রী গণেশ চন্দ্র বসু মুসলিম ছাত্রদেরে প্রায়ই বলতেনঃ বঙ্কিমের বই পড়ে তোমরা বঙ্কিমচন্দ্রকে যেভাবে গালিগালাজ করো, প্রকৃত রবীন্দ্রনাথকে যদি উদঘাটন করা যায়, তাহলে তোমরা তাকে কী ভাষায় কী ভাবে যে গালি দেবে, বুঝে উঠতে তো পারছি না

(৪) কবি আল মাহমুদের “তারা কাঁদে না ধ্বংস হয়ে যায় তবু কাঁদে না” নামের কলামটি থেকে একজন লেখক শিব নারায়ন রায় সম্বন্ধে বলেন নাস্তিক্য ধারার এ লেখক যৌবনে তিনি রবীন্দ্রনাথের ঈষৎ সমালোচনা করেছিলেন বলে বাস্তুচ্যুত হন। ফলে সারাজীবন তিনি অষ্ট্রেলিয়ায় কাটান। মেলবোর্ণ ইউনিভার্সিটিতে একটি ডিপার্টমেন্টাল হেড হিসাবে দীর্ঘ দিন কাজ করেন। কলকাতার লোকেরা তাকে কোনদিনই সহ্য করতে পারতো না। প্রসঙ্গটি উত্থাপিত হয় তার অতি সাম্প্রতিক ২০০৮এ তার মৃত্যু সংবাদকে অবলম্বন করে।

(৫) দাদা জ্যেতিরিন্দ্র নাথের আদর্শেই রবীন্দ্রনাথ এগারো বছর বয়সে “পৃথ্বিরাজের পরাজয়” নামে এক বীর রসাত্মক কাব্য রচনা করেন। কবি এ সম্পর্কে তার জীবন স্মৃতিতে বলেন, “তৃণহীন কঙ্কর শয্যায় বসিয়া রৌদ্রের উত্তাপে পৃথ্বীরাজের পরাজয় বলিয়া একটি বীর রসাত্মক কাব্য লিখিয়াছিলাম”। এটাও মুসলমানদের বিরুদ্ধে উদগীরণ করা হয়।

(৬) রবীন্দ্রনাথের ভ্রাতা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ যেসব নাটক লিখেছেন, তন্মধ্যে “সরোজিনী নাটক” “অশ্রুমতি”, ও “স্বপ্নময়ী” নাটকের উল্লেখ করা যায়। ডক্টর নীলিমা ইব্রাহিম বলেন, “সরোজিনী নাটক প্রকাশ্যে ইসলাম বিদ্বেষ প্রকাশ করলো। পরধর্ম অসহিষ্ণুতা সভ্যরূচি বিগর্হিত। একই উদ্দেশ্যে অনুপ্রাণিত হয়ে ১৮৭৯ খৃঃ জ্যোতিরিন্দ্র নাথ “অশ্রুমতি” নাটক প্রকাশ করেন।অশ্রুমতি নাটকেও মুসলিম বিদ্বেষ প্রচারিত হয়েছে। অশ্রুমতির শিক্ষাদান স¤পর্কে প্রতাপ বলছেন, “মহর্ষি, তুমি ওদের ভাল করে শিখিও; যে সব গাথাতে রাজপুত বীরত্বের গুণকীর্তন ও মুসলমানদের নিন্দাবাদ আছে সেইসব গাথা ওর কন্ঠস্থ করিয়ে দিও”। (বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত, দ্বিতীয় সংস্করণ—৩৭১ পৃষ্ঠা)

(৭) উপরোক্ত নাটকদ্বয়ের বিষয়বস্তু থেকে আমরা বুঝতে পারছি যে, মুসলিম বিজয়ের বিরুদ্ধ শেষ বিদ্রোহী রানা প্রতাপ হলেন সেদিনের ঠাকুরবাড়ীর আরাধ্য বীর। সরোজিনী নাটকের অপর নাম “চিতোর আক্রমণ”। ইংরেজ ১৮৭৫ সানের ৩০শে নভেম্বর নাটকটি প্রকাশিত হয়। ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায় “প্রবাসী” আশ্বিন কার্তিক ১৩৫৪ সংখ্যায় প্রকাশিত তার “জ্যোতিরিন্দ্রনাথ” প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন যে, সরোজিনী বা চিতোর আক্রমণ নাটকের অন্তর্গত রাজপুত ললনাদের চিতারোহণের গীতটি রবীন্দ্রনাথের রচিত। জ্যোতিরিন্দ্র নাথের জীবন স্মৃতিতে এর উল্লেখ রয়েছে। চিতারোহনের গীতটি হচ্ছে নি¤œরুপ।

জ্বল জ্বল চিতা দ্বিগুণ দ্বিগুণ

পরাণ সপিঁবে বিধবা বালা ।

জ্বলুক জ্বলুক চিতার আগুণ,

জুড়াবে এখনি প্রাণের জ্বালা।

শোনরে যবন শোনরে তোরা

যে জ্বালা হৃদয়ে জ্বালালি সবে

সাক্ষী রইলেন দেবতা তার

এর প্রতিফল ভুগিতে হবে।

(সাহিত্য পত্রিকা শীত সংখ্যা, ১৩৬৯)

(৮) জোড়া সাঁকোর ঠাকুর বাড়ীও ইসলাম তথা মুসলমান বিদ্বেষ হিন্দু জনসাধারণের মধ্যে বেশ ভাল করেই প্রচার করেছে। এই একই উদ্দেশ্য প্রণোদিত হয়ে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ স্বপ্নময়ী নাটকটিও রচনা করেন। ডক্টর নীলিমা ইব্রাহিম এই “স্বপ্নময়ী নাটকের আলোচনা করতে যেয়ে বলেছেন,  যে ঐতিহাসিক কাহিনীকে অবলম্বন করে এ নাটকখানি রচিত হয়েছে, তার বিষয়বস্তুর সত্যনিষ্ঠা থেকেও নাট্যকার বিচ্যুত হয়েছেন। তাছাড়া, স্পষ্টতই এ নাটকে নাট্যকার পরধর্ম অসহিষ্ণুতার পরিচয় দিয়েছেন”। (সাহিত্য পত্রিকা বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, শীত সংখ্যা, ১৩৬৯, পৃষ্ঠা ১৮৯)

(৯) বাংলাদেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অসাম্প্রদায়িক বামপন্থী বুদ্ধিজীবি সাহিত্যিক গোলাম সামদানী কোরায়শী ময়মনসিংহে ব্যাপক ইসলাম প্রচার সম্পর্কে বলেন,  “এগার সিন্ধুর দুর্গের সম্মুখে মানসিংহের সঙ্গে ঈসা খাঁর ইতিহাসখ্যাত বিখ্যাত সেই যুদ্ধ ও সন্ধি স্থাপিত হয়। ভগ্ন তরবারীর প্রতি বীরোচিত সৌজন্যের যে পরিচয় ঈসা খাঁ রেখে গেছেন তা ময়মনসিংহবাসীর সম্মুখে এক অত্যুজ্জল আদর্শ হিসাবে বিরাজ করছে। — হত্যার বৈধ সুযোগ পাওয়া সত্ত্বেও বাঙ্গালী বীর হত্যা করেন নি, তাই বিশ্বের বীরশ্রেষ্ঠদের অন্যতম তিনি। মোগল সেনাপতি আফজাল খাঁর সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধের সাহস না থাকায় কাপুরুষ শিবাজী আপস আলোচনার নাম করে তাঁবুতে ডেকে এনে নিরস্ত্র আসহায় অবস্থায় আতর্কিত আক্রমণ করে আফসার খাঁকে হত্যা করেছিলেন। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর “সোনার বাংলা” রচয়িতা বাঙ্গালী বীর ঈসা খাঁকে ফেলে মারাঠা দস্যু শিবাজীকে নিয়ে কবিতা লিখলেন এবং প্রমাণ করলেন বিশ্বকবি হলেও মূলত তিনি হিন্দুদেরই কবি” (ময়মনসিংহের সাহিত্য ও সংস্কৃতি: গোলাম সাদমানী কোরায়শী : জেলা বোর্ড ময়মনসিংহ ১৯৭৮, পৃষ্ঠা ৯, ভারতে মুসলিম হত্যা, ইফতেখার রসুল জর্জ, পৃষ্ঠা ৮৩)।

(১০) বিশিষ্ট সাহিত্যিক আবু জাফর শামসুদ্দিন “সমাজের ঝড়ো পাখি বেনজীর আহম্মদ” গ্রন্থে হিন্দু নেতাদের দৃষ্টিভঙ্গির আভাস দিয়েছেন। “কাছারির বিপরীত দিকে ঢাকা ন্যাশনাল মেডিক্যাল স্কুলের বিরাট প্রাঙ্গণ। সেখানে বিশাল চন্দ্রতাপের নীচে নিখিল বঙ্গীয় অথবা নিখিল ভারতীয় হিন্দু মহাসভার সম্মেলন হচ্ছে। খুব সম্ভব ১৯২৮ সালের অথবা ২৯ সালের প্রথম দিককার কথা ঠিক মনে করতে পারছি না। সম্মেলন উপলক্ষে শহরে জোর প্রচারণা চলছিল। —- এক বন্ধুর কাছ থেকে ধুতি জোগাড় করলাম। বিকেলে দুজনে গেলাম সভায়। ডক্টর মুঞ্জে এবং এনসি কেলেভরি উভয়েই উগ্র সাম্প্রদায়িকতাবাদী বকতৃতা দিলেন। দুজনের মধ্যে কোন একজন আজ এতকাল পর ঠিক মনে করতে পারছি না বলেছিলেন যে, মুসলমানরা যদি এদেশে থাকতে চায় তাহলে হিন্দু জাতীর সঙ্গে লীন হয়ে থাকতে হবে। নতুবা সাতশ বছর বসবাসের পর মুসলমানরা স্পেন হতে যেভাবে বিতাড়িত হয়েছিল আমরাও তাদেরকে সেভাবেই আরব সাগর পার করে দেব” (সমাজের ঝড়ো পাখি বেনজীর আহম্মদ, আবু জাফর শামসুদ্দিন) (ভারতে মুসলিম হত্যা, ইফতেখার রসুল জর্জ, পৃষ্ঠা ৮৩৮৪)

(১১) পাকিস্তান প্রচারকদের মধ্যে আজাদ পত্রিকা অগ্রগণ্য। হিন্দুরা স্বভাবতই আজাদের উপরই সবচেয়ে বেশী বিক্ষুব্ধ। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গেই কলিকাতায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধে। পনের দিন যেতে না যেতেই ২রা সেপ্টেম্বর রাত্রে “আজাদ” অফিস গুন্ডাদের দ্বারা আক্রন্ত হল। ফলে ৩রা সেপ্টেম্বর ‘আজাদ’ বের হতে পারে নি” (প্রাগুক্ত)। পাকিস্তান সৃষ্টির পিছনে এসব ছিল ইতিহাসের জলজ্যান্ত করুণ বাস্তবতা। মরহুম আবুল আহমদ বলেন, – “এদের বিশ্বাস করতে পারলেন না মরহুম হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। ভারতে রয়ে যাওয়া মুসলমানদের রক্ষার জন্য মরহুম হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগষ্টের পর পরই ভারত ত্যাগে রাজী হলেন না। —তিনি শুধু নিজের জীবন বিপন্ন করে কলিকাতার হিন্দু দাঙ্গাকারীদের উদ্যত খড়গের সামনেই গলা বাড়িয়ে দেন নি, তিনি উভয় রাষ্ট্রের মাইনরিটি রক্ষার জন্য ‘মাইনরিটি চার্টার ও রচনা করেছিলেন” (প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ২৭০-২৭১)।

(১২) অনুরূপভাবে দাক্ষিনাত্যের লোকমান্য তিলক হিন্দুর জাতীয়তাবোধ জাগ্রত করার জন্য রাণা প্রতাপ ও শিবাজীর মাতৃমন্ত্রে দীক্ষা নিতে হিন্দুদের আহবান জানালেন এবং “শিবাজী উৎসব” এর আয়োজন করলেন। তিলক Anti cow killing societyর প্রতিষ্ঠা করলেন। তিলকের আহবান জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ীতে এসেও দোলা দিল। রবীন্দ্রনাথ লিখলেন “জয়তু শিবাজী” ও “শিবাজী উৎসব” কবিতাদ্বয়। প্রথমটিতে দিলেন সুর দ্বিতীয়টিতে দিলেন স্বর। এতে বাঙ্গালী হিন্দুদেরে মাতিয়ে তুললো। (রবীন্দ্রনাথ, হিন্দুধর্ম ও হিন্দু জাতীয়তাবাদ, আবু ফাতেমা মোহাম্মদ ইসহাক, ১০ পৃষ্ঠা, ১৯৬৯ প্রথম সংস্করন।) মুসলমানদের কাছে শিবাজী অশিক্ষিত, অসভ্য অমার্জিত দস্যুনায়ক। আর তিলক রবীন্দ্রনাথের কাছে শিবাজী ভারতের জাতীয় বীর।

(১৩)দস্যুনায়ক শিবাজীকে ভারতীয় হিন্দুদের জাতীয় বীর রূপে প্রণতি প্রশস্তি জানাবার জন্য রবীন্দ্রনাথ সকল হিন্দুকে আহবান জানিয়েছেন। শুধু তাই নয় শিবাজীর মন্ত্রে দীক্ষা ও শপথ নেবার জন্য বলেছেন, “এক ধর্ম রাজ্য হবে এ ভারতে এ মহাবচন- করিব সম্বল”।

“শিবাজী উৎসব” কবিতায় শিবাজীকে “রাজতপস্বী বীর” বলে সম্মোধন করেছেন। শিবাজী যে দস্যু নায়ক বা তস্কর এ কথা কবি কিছুতেই মানতে রাজী নন। কবির মতে শিবাজীর দস্যু বৃত্তির বা তস্করবৃত্তির ইতিহাস সে বিদেশীর রচিত মিথ্যা ইতিহাস। তাই তিনি লিখেছেন—

“বিদেশীর ইতিবৃত্ত দস্যু বলি করে পরিহাস

অট্টহাস্য রবে,

তব পূণ্য চেষ্টা যত তস্করের নিস্ফল প্রয়াস

এই জানে সবে।

অয়ি ইতিবৃত্ত কথা, ক্ষান্ত করো মুখর ভাষণ।

ওগো মিথ্যাময়ী,

তোমার লিখন ‘পরে বিধাতার অব্যর্থ লিখন

হবে আজি জয়ী”।

এখানে মুসলিম যুগের ভারতীয় মুসলমান কর্তৃক লিখিত ইতিহাসকে কবি বিদেশীর রচিত ইতিহাস বলেছেন এবং বিদেশী মুসলমান রচিত সে মিথ্যাময়ী ইতিবৃত্তের উপর ভারত বিধাতার অব্যর্থ লিখন জয়ী হবে বলে কবি সুনিশ্চিত হয়েছেন, বঙ্কিম চন্দ্রও তাই বলতেন। তারপর কবি শিবাজীকে সম্মোধন করে বলে যাচ্ছেন—

“হে রাজ তপস্বী বীর, তোমার সে উদার ভাবনা

বিধির ভান্ডারে

সঞ্চিত হইয়া গেছে, কাল প্রভু তার এক কণা

পারে হরিবারে?

তোমার সে প্রাণোৎসর্গ, স্বদেশ লক্ষ্মীর পূজাঘরে

সে সত্য সাধন,

কে জানিত, হয়ে গেছে চির যুগ যুগান্তর তরে,

ভারতের ধন”।

কবির মতে শিবাজীর সাধনাই ভারতের চিরন্তন সাধনা।

(১৪) অধ্যাপক হীরেন মুখার্জীও বলেনঃ “ভবানীপূজা, “বীরাষ্টম”, “গণপতিউৎসব”, গঙ্গা¯œানের পর “রাখিবন্ধন” ইত্যাদি ছিল তখনকার আনন্দ অনুপ্রেরণা। এমনকি মহারাষ্ট্রে লোকমান্য তিলকের নেতৃত্বে যে স্বাদেশিকতা জেগে উঠেছিল, গো-রক্ষা ও প্লেগের টিকা গ্রহণে ধর্মগত আপত্তি নিয়ে যার পত্তন, সেই স্বাদেশিকতার সঙ্গে বাংলার স্বদেশী আন্দোলনের মৈত্রী বন্ধন সুদৃঢ় করার জন্য শিবাজী উৎসবের প্রবর্তন হল।

“এক ধর্মরাজ্য পাশে খন্ড চিহ্ন বিক্ষিপ্ত ভারত

বেধে দিব আমি”

শিবাজীর এ কথা স্মরণ করে রবীন্দ্রনাথ রাজতপস্বী বীরকে প্রণতি জানালেন। মুসলমান বাঙ্গালী হলেও তার মন কবির প্রশস্তিকে গ্রহণ করতে পারলো না (হিন্দু মুসলিম, পৃষ্ঠা ২০/২২)। সে সময় রবীন্দ্রনাথের ভাগ্নী সরলা দেবী প্রতিষ্ঠা করলেন “বীরাষ্ঠমী মেলার আর রবীন্দ্রনাথ প্রতিষ্ঠা করলেন “রাখীবন্ধন” অনুষ্ঠানের, হিন্দুদের ঐক্যের জন্য।

(১৫) রবীন্দ্রনাথের “সতি” নাটিকা ও গল্প “দুরাশা”য় সতী নাটিকায় ধর্মের প্রতি যেমন উল্লেখযোগ্য উদারতা ফুটে উঠেছে তেমনি দুরাশাতে মুসলমান তথা ইসলামের প্রতি বিদ্বিষ্ট চিন্তা মানসেরও পরিচয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এখানে তিনি বঙ্কিমচন্দ্রের সাক্ষাৎ শিষ্য। তাছাড়াও কবির আরো কয়েকটি গল্প ও কবিতায় মুসলমানদের প্রতি “যবন” ও “ম্লেচ্ছ” প্রভৃতি শব্দের অপপ্রয়োগ ও ইচ্ছা করে বিকৃত চরিত্র সৃষ্টি মুসলমানদের বেদনার কারণ হয়ে রয়েছে।

(১৬) শুধু তাই নয়, টডের “রাজস্থানের” কাহিনী অবলম্বন করে মুসলিম বীরের প্রতি জঘন্য রসিকতা করে “হোরিখেলা” কবিতা লিখেছেন। সে যুগে বহু সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে এই “হোরিখেলা” কবিতার নৃত্যরূপ প্রদর্শিত হতো। ফলে হিন্দু জনসাধারণের মধ্যে মুসলিম বিদ্বেষ নতুন করে দানা বেঁধে উঠতো।

(১৭) “রীতিমত নভেল”, “দুরাশা” গল্পে কবি মুসলিম বিদ্বেষ নগ্নভাবে প্রকাশ করেছেন। “দুরাশা” গল্পে শুধু মুসলিম বিদ্বেষই প্রকাশ করেন নি, হিন্দু ধর্মেরও প্রচার করেছেন। উদাহরণ হিসাবে—গল্পের নায়িকা নওয়াবজাদী নূর-উন-নিসাকে কবি ইচ্ছা করেই মুসলিম সমাজ ও ইসলাম ধর্মের প্রতি বীতশ্রদ্ধ, পিতা নওয়াব কাদের খাঁর প্রতি অশ্রদ্ধেয়া, বিশেষ করে হিন্দু ধর্ম ও হিন্দু সংসারের প্রতি অত্যধিক আকৃষ্টা করে তুলেছেন। কবি নওয়াবজাদী নূর-উন-নিসার মুখ থেকে বের করেছেন, “আমার হিন্দু দাসীর নিকট হিন্দু ধর্মের সমস্ত আচার ব্যবহার, দেবদেবীর সমস্ত আশ্চর্য কাহিনী, রামায়ণ মহাভারতের সমস্ত ইতিহাস তন্ন তন্ন করিয়া শুনিতাম। শুনিয়া সেই অন্তঃপুরের প্রান্তে বসিয়া হিন্দু জগতের এক অপরূপ দৃশ্য আমার মনের সম্মুখে উদঘাটিত হইত। মূর্তি, প্রতিমূর্তি, শঙ্খ, ঘন্টাধ্বনি, স্বর্গচূড়া খচিত দেবালয়, ধুপ ধুনার ধুম, অগুরূ চন্দন মিশ্রিত পুষ্প বাঁশির সুগন্ধ, যোগী সন্যাসীর অলৌকিক ক্ষমতা, ব্রাক্ষ্মণের অমানুষিক মহাত্ম্য, মানুষ ছদ্মবেশধারী দেবতাদের বিচিত্র লীলা, সমস্ত জড়িত হইয়া আমার নিকট এক অতি পুরাতন, বিস্তীর্ণ, অতি সুদূূর অপ্রাকৃত মায়ালোক সৃজন করিত, আমার চিত্ত যেন নীড়হারা পাখীর ন্যায় প্রদোষকালের একটি প্রকান্ড প্রাচীন প্রাসাদের কক্ষে কক্ষে উড়িয়া উড়িয়া বেড়াইত। হিন্দু সংসার আমার বালিকা হৃদয়ের নিকট একটি পরম রমনীয় রূপ কথার রাজ্য ছিল”।

(১৮) “দুরাশা”য় কবি এখানেই থামেন নি, “বিশ্বাসঘাতক পিতার গৃহ আমার নিকট নরকের মত বোধ হইল” যখন নায়ক কেশর লালের অচেতন দেহে যমুনার জল এনে নওয়াবজাদী বার কয়েক সিঞ্চন করে চেতনা ফিরিয়ে আনলেন এবং বললেন, “আরও জল দিব”? নায়কের জবাব “কে তুমি?” উত্তরে “অধীনা আপনার ভক্ত সেবিকা, নওয়াব গোলাম কাদের খাঁর কন্যা”। নায়ক সিংহের মত গর্জন করে উঠলেন, “বেঈমানের কন্যা বিধর্মী। মুত্যুকালে যবনের জল দিয়া তুই আমার ধর্ম নষ্ট করিলি?” কবির এইরূপ চরিত্র চিত্রন ইচ্ছাকৃত ও সাম্প্রদায়িক মনোভাব থেকে সৃষ্ট।

(১৯) “হোরিখেলা”তেও আমরা তার এই বিদ্বিষ্ট মনোভাবের পরিচয় পাই। এটি একটি ঐতিহাসিক কাহিনী নিয়ে রচিত। রাজস্থানের অন্যতম রাজা ছিল “কোটা”। কোটার রাজা কনডুন সিংহের পুত্র ছিল ভোনস্ত সিংহ। পাঠান বীর কেশর খাঁর সঙ্গে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে কোটার রাজ পরিবার কেতুনে আশ্রয় নেয়। এই পরাজয়ের প্রতিশোধের জন্য কোটারের হিন্দু সভাসদেরা বিশ্বাসঘাতকতার আশ্রয় নেয়। তারা পাঠান বীর কেশর খাঁকে দাওয়াত দিয়ে এনে একে একে সবাইকে হত্যা করে। এই ঘটনার একটি রসিকতা পূর্ণ বিকৃত রূপ টডের রাজস্থানে রয়েছে। কেতুনের হিন্দু যুবকেরা রাণী সেজে ও রাণীর শতেক দাসী সেজে কেশর খাঁর সঙ্গে হোরিখেলাতে প্রস্তুত থাকেন। এই বিকৃত গল্প অবলম্বনে রবীন্দ্রনাথ হিন্দু রাজপুতদের গৌরব গাথা রূপায়িত করেছেন “হোরিখেলা”য়। সংক্ষেপে ক’টি ছত্র—-রাণীকে এমনি হালে দেখে কেশর খাঁ বলে উঠলেন,

“তোমারি পথ চেয়ে

দু’টি চক্ষু করেছি প্রায় কানা।”

জবাবে রাণী বললেন, “আমারও সেই দশা।”

এমনি সময় রাণীর “একশো সখা হাসিয়া বিবশা।”

“পাঠান পতির ললাটে সহসা

মারেন রাণী কাসার থালাখানা

রক্ত ধারা গড়িয়ে পড়ে বেগে

পাঠান পতির চক্ষু হলো কানা।”——

“যে পথ দিয়ে পাঠান এসেছিল

সে পথ দিয়ে ফিরলো নাকো তারা

কেতনপুরে বকুল বাগানে কেশর খাঁএর খেলা হলো সারা।”

সে যুগে এই কবিতাটি প্রায় সময়ই স্কুল কলেজের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে কথা চিত্রে প্রকাশ করা হতো এবং নৃত্যের অপূর্ব ভঙ্গিতে নানা তাল গোল পাকিয়ে মুসলমানদের হত্যা করার দৃশ্য দেখানো হতো। হিন্দুরা তা দেখে খুব খুশী হত, আর মুসলমানেরা মুখ ভার করে গভীর বেদনা নিয়ে বের হয়ে আসতো।

(২০) “বন্দীবীর” কবিতাটিও কবির বিদ্বিষ্ট মনের পরিচয় বহন করেছে। শিখ জাতিকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করার স্বপ্ন থেকেই এই কবিতার সৃষ্টি। কবিতার বিষয়বস্তু হচ্ছে, দিল্লীর বাদশাহ ফররোখ শিয়ারের রাজত্বকালে পাঞ্জাবে “বান্দা” নামক এক ধর্মান্ধ শিখ বহু মুসলিম নারী ও শিশুকে হত্যা করে। বাদশাহ তা শুনে তাকে লোকজন দিয়ে ধরিয়ে দিল্লীতে নিয়ে আসেন। কাজীর বিচারে তার মৃত্যুদন্ড হয়। এই মৃত্যুদন্ডের ভয়াবহতা নিয়েই “বন্দীবীর” কবিতাটি লিখিত। উল্লেখ্য কবি তার এই কবিতায় বান্দার মৃত্যুদন্ডের কারণ ও মুসলিম নারী শিশুদের নৃশংসভাবে হত্যার কথা বিশ্লেষণ করেন নি, এমনকি আকারে ইঙ্গিতেও তা উল্লেখ করেন নি। কবিতাটিতে শিখদের উপর মুসলমানদের নির্যাতনের মর্মান্তিক কাহিনী ফুটিয়ে তুলেছেন। উদ্দেশ্যমূলক না হলে এই কবিতার পূর্বাপর ঘটনার উল্লেখ কবি নিশ্চয় করতেন। এখানে খুনী বান্দাকে ধরে আনার জন্য বাদশাহ প্রেরিত লোকদের সঙ্গে শিখদের যুদ্ধ বর্ণনা লক্ষ্য করা যায়। কবি বর্ণনা করেছেন—

“মোগল শিখের রণে

মরণ আলিঙ্গণে

কন্ঠ পাকড়ি ধরিল আঁকড়ি,  দুইজনা দুইজনে

দংশন ক্ষত শ্যেন বিহঙ্গ যুঝে ভুজঙ্গ-সনে।

সেদিন কঠিন রণে

‘জয় গুরূজীর’ হাকে শিখবীর সুগভীর নিঃস্বনে।

মত্ত পাগল রক্ত পাগল ‘দীন দীন’ গর্জনে।”

মোগল শিখের এই যুদ্ধে কবি শিখদের “দংশন ক্ষত শ্যেন বিহঙ্গ” অর্থাৎ ক্ষত বিক্ষত বাজপাখী এবং মুসলিম মোগলদেরে “ভুজঙ্গ” অর্থাৎ কেউটে সাপ বলে অভিহিত করেছেন। শুধু তাই নয়, মুসলিম মোগলদেরে কবি “মত্ত পাগল রক্ত পাগল”—- এই বিশেষণে বিশেষিতও করেছেন। “বন্দীবীর” কবিতাটিতে কবি ধর্মান্ধ শিখ নায়ক বন্দা যে খুনী, বহু নৃশংস হত্যাকান্ডের জন্য সর্বোতোভাবে অপরাধী তার কোন উল্লেখ করেন নি। বরং তিনি মুসলিম মোগলেরা যে শিখদের উপর জুলুমকারী তা বিশেষভাবে বর্ণনা করেছেন এবং এই জুলুমের ভয়াবহতা এবং শিখদের গভীর নিষ্ঠার সঙ্গে আত্মত্যাগের কাহিনী অত্যন্ত দক্ষতার সহিত চিত্রিত করেছেন।

“বান্দার দেহ ছিড়িল ঘাতক সাড়াশি করিয়া দগ্ধ।

স্থির হয়ে বীর মরিল, না করি’ একটি কাতর শব্দ।

দর্শক জন মুদিল নয়ন, সভা হল নিস্তব্ধ।”

সে যুগে এই কবিতার দৃশ্য চিত্রও প্রদর্শিত হত। এসবের বড় বড় তৈল চিত্র তৈরী করে হিন্দু শিখ জনসভায়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, ম্যাজিক লন্ঠন সহযোগে বক্তৃতা দিয়ে দেখানো হত। এভাবেই মুসলিম বিদ্বেষ ছড়ানো হত। তাদের নিজ হাতে চিত্রিত এসব সাহিত্যই ভারতের সাম্প্রদায়িকতায় ইন্ধন যুগিয়েছে।

(২২) অধ্যাপক মুহাম্মদ ইসহাক এম, এ তার “সংস্কৃতি ও সমাজ প্রবন্ধে নিজেকে উপরোক্ত কবিতা দুটির সাম্প্রদায়িক ভূমিকার প্রত্যক্ষদর্শী বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি কলকাতার বৌ-বাজার স্ট্রীটে হিন্দু জনসভার অফিসে নিজ চোখে “বন্দীবীরের” বহু দৃশ্যের তৈল চিত্র দেখেছেন এবং “হোরিখেলার” নৃত্যরূপ বহু সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তা প্রত্যক্ষ করেছেন। দেশ বিভাগের পরও কোন কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিচিত্রানুষ্ঠানে “বন্দীবীর” ও “হোরিখেলা” কবিতাদ্বয়ের আবৃত্তি দেবার প্রয়াস লক্ষ্য গোচর হয়েছে। এমনও দেখা গিয়েছে সম্বিৎহারা মুসলমান এমনিভাবে নিজঘরে স্বজাতির নামে মিথ্যা কলঙ্ক কাহিনীর আবৃত্তি এবং দৃশ্যচিত্র ও নৃত্যরূপ নিজ চোখে দেখেছে, নিজ কানে শুনেছে। কোন কথা বলেনি, প্রতিবাদ করে নি।

(২৩) মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঘৃণা গালিসূচকযবন ম্লেচ্ছশব্দ দুটি কবি তার লেখায় কিভাবে রূপ দিয়েছেন তার দুএকটি নজিরও এখানে পেশ করছি। কবি লিখেছেন

“বলিতে পার কাহার প্রতাপে এই অগণিত যবন সৈন্য প্রচন্ড বাত্যাহত অরণ্যানীর ন্যায় বিক্ষুব্ধ হইয়া উঠিল? কাহার বজ্র মন্দ্রিত র্হ র্হ বোম্ বোম্ শব্দে তিন লক্ষ ম্লেচ্ছ কন্ঠের “আল্লাহু আকবার” ধ্বনি নিমগ্ন হইয়া গেল?”(রীতিমত নভেল—গল্পগুচ্ছ) আবার অন্যত্র—-

“চলেছি করিতে যবন নিপাত

যোগাতে যমের খাদ্য”। (“বিচারক” কথা ও কাহিনী )

(২৪) রবীন্দ্রনাথের “কথা ও কাব্য” গাথাটির কথাই ধরা যাক। তাতেও তিনি যে ভারত বর্ষের চিত্র অঙ্কন করেছেন সে ভারতবর্ষে মুসলমান কিংবা মুসলমান আদর্শের কোন স্থান নেই। “কথা কাব্যের” অন্তর্ভূক্ত হয়েছে রবীন্দ্রনাথের শ্রেষ্ঠ ভিক্ষা, প্রতিনিধি, ব্রাহ্মণ, মস্তক বিক্রয়, পূজারিণী, পরিশোধ, সামান্য ক্ষতি, মূল্য প্রাপ্তি, নগর লক্ষ্মী, অপমানবর, স্বামীলাভ, স্পর্শমণি, বন্দীবীর, মানী, প্রার্থণাতীত, দান, রাজবিচার, গুরুগবিন্দ, শেষ ভিক্ষা, নকল গড, হোরিখেলা, বিবাহ, বিচারক, পণরক্ষা, এই সব বিশিষ্ট কবিতা। এসব কবিতা সম্পূর্ণভাবে মুসলিম বিবর্জিত হিন্দু ভারতীয় জীবনের জয়গান। তাকে এদিক থেকে হিন্দু ভারতীয় রেঁনেসার কবি বলা যায়।

(২৫) কিন্তু মুসলিম ভারত কিংবা মুসলিম বঙ্গের ত্যাগ, মহত্ত্ব ও গৌরব কথা কবির চিন্তায় নেই কিংবা কবি সেইদিকে ফিরে তাকাতেও চান নি। তবে এড়াতে না পেরে দু’এককথা টডের সত্য মিথ্যা ও আজগুবি কাহিনীপূর্ণ বই “রাজস্থান” দেখে বলেছেন যা মুসলমানদেরে বেদনা দিয়েছে বহুক্ষেত্রে। তাও আবার ভারতীয় হিন্দুর গৌরবগাথা রচনা প্রসঙ্গে মুসলমানদেরে হেয় প্রতিপন্ন করার ইচ্ছা থেকেই বলেছেন। এ প্রসঙ্গে রবীন্দ্র গবেষক কাজী আব্দুল ওদুদ বলেন,  “সেই ভারতীয়তার রূপদান করতে গিয়ে প্রাচীন হিন্দু সভ্যতা ও সংস্কৃতির বহু মনোরম চিত্রও তিনি অঙ্কিত করেছেন, তার সেই সব সৃষ্টি হিন্দুকে শুধু আনন্দিতই করেনি, গর্বিতও করেছে। দ্বিতীয়তঃ মুসলিম সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রতি রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতিগত বিরূপতা না থাকলেও এমনকি অল্পাধিক অনুরাগ সত্ত্বেও, সেই সভ্যতা ও সংস্কৃতি সম্বন্ধে তিনি প্রায় মৌনীই রয়েছেন তার সুদীর্ঘ সাহিত্যিক জীবনে” (শাশ্বত বঙ্গ, পৃষ্ঠা ৬০)। এসব কর্মকান্ডে ভারতবাসীকেও হিন্দুকে করেছে বহুগুণ বেশী দাঙ্গাপ্রবণ ও ভয়ঙ্কর হিংসার অনল জাগিয়ে রেখেছে যুগ যুগ ব্যাপী।

(২৬) এস ওয়াজেদ আলী কান্টাবও বলেছেন, “রবীন্দ্রনাথের ভারত অর্থে হিন্দু ভারতের কথাই বলেছেন ও বুঝেছেন, ভিক্টোরিয়ান স্বাধীন চিন্তাকে তিনি হিন্দু দর্শনের সাহায্যে চালাবার চেষ্টা করেছেন। হিন্দু ভদ্র শ্রেণীর জীবনই তার সাহিত্যের প্রধান উপজীব্য হয়েছে” (ভবিষ্যতের বাঙ্গালী, পৃষ্ঠা ৮২-৮৩)।

(২৭) একবার তিনি ত্রিপুরার মহারাজা রাধা কিশোর মানিক্যের কাছে লিখেছিলেন, “হিন্দুর যথার্থ গৌরব কি এবং হিন্দুর উন্নতি সাধনের প্রকৃত পথ কোন দিকে বঙ্গ দর্শনে তাহাই সম্যক আলোচিত হইলে আমি চরিতার্থ হইব। হিন্দুত্ব কি, তাহাই আমি ক্রমশঃ দেখাইতেছি এবং সেই সঙ্গে এ কথাও জানাইতেছি যে, যূরোপীয় সভ্যতায় যাহাকে ন্যাশনাল মহত্ত্ব বলে তাহাই মহত্ত্বের একমাত্র আদর্শ নহে। আমাদের বিপুল সামাজিক আদর্শ তাহা অপেক্ষা অনেক বৃহৎ ও উচ্চ ছিল” (চিঠিপত্র, রবীন্দ্রনাথ, পৃষ্ঠা ১৩৩)।

(২৮) হিন্দু লেখকগণ বাংলা ভাষায় রচিত পাঠ্য পুস্তক থেকে শুরু করে নাটক, কাব্য উপন্যাসাদিতে যখন জঘন্যভাবে মুসলিম বিদ্বেষ ও হিন্দু জাতীয়তাবাদ প্রচার করে চলছিলেন, তখন মুসলিম সাহিত্যিকগণ কবি রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টি আকর্ষণ করছিলেন এই নীচ প্রচারণার প্রতি। রবীন্দ্রনাথ তখন বলে দিয়েছিলেন, “মুসলমান গ্লানিপূর্ণ বলে আমরা আপন সাহিত্য বর্জন করতে পারি না। মুসলমানদের স্বতন্ত্র সাহিত্য গড়িয়া লওয়া উচিত”। এই স্পষ্ট উক্তির মাঝেই রয়ে গেছে মুসলিম স্বাতন্ত্রের তথা পাকিস্তান দাবীর বীজ যদিও কবি উষ্মা প্রকাশ করে তা বলেছেন। পাকিস্তান আন্দোলনকালে বেঁচে থাকলে হয়তো তিনি এমনতরো আরো দু’ চারটা কথা বলে যেতেন (লেখক আবু ফাতেমা মোহাম্মদ ইসহাক)।

(২৯) মুসলমান সংস্কৃতির শ্রেষ্ঠ আদর্শের দিকে কখনো তিনি দৃষ্টিপাত করেন নি। তার মৃত্যুর বছর চারেক আগে ইংরেজী ১৯৩৬ সনে কলকাতা টাউন হলে সাম্প্রদায়িক বাটোয়ারার প্রতিবাদ কল্পে অনুষ্ঠিত হিন্দু জনসভায় তার নেতৃত্ব গ্রহণ ও তার প্রদত্ত ভাষণ। অনগ্রসর ও বহু বিষয়ের পশ্চাৎপদ সংখ্যা গরিষ্ঠ মুসলমান সমাজের শিক্ষিত ছেলেদের সংখ্যানুপাতে সরকারী চাকুরীতে নিয়োগের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন, সেই আন্দোলনের পৌরোহিত্য করেছেন রবীন্দ্রনাথ। সাম্প্রদায়িক মনোভাব নিয়ে সংখ্যা গরিষ্ঠ মুসলমানদের ন্যায্য দাবীর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন তিনি। টাউন হলের জনসভায় কবি যে ভাষণ দান করেছিলেন তা সাম্প্রদায়িক নেতারা রচনা করে দেন নি নিশ্চয়ই।

(৩০) তিনি তার ভাষণে বলেছিলেন, “প্রভুর খানার টেবিলের নীচে নিক্ষিপ্ত খাদ্য টুকরার জন্য যে কোলাহল উত্থিত হইয়াছে, ইহা সমর্থন করায় শুধু যে নীচতা আছে তাহা নয়, উহা চারিত্রিক দৌর্বল্যেরও পরিচায়ক। অথচ তার ভাষণের প্রারম্ভে তিনি বলেছেন, “শাসন কার্য পরিচালনায় যোগ্যতার অপহ্নব করিয়াও গবর্ণমেন্ট যে সরকারী চাকুরীতে কর্মচারী নিয়োগে ক্রমাগত বৈষম্য করিয়া চলিয়াছেন আমরা তাহা নির্বাকভাবে প্রত্যক্ষ করিতেছি।” কবি ও কবির সম্প্রদায় কতটুকু নির্বাক ছিলেন এই ব্যাপারে তার নজির টাউন হলের এই জনসভা ও কবির প্রদত্ত ভাষণ। ভাষণে আরো বলেন, “সাম্প্রদায়িক বাটোয়ারার প্রস্তাব যে দিন উত্থাপিত হয়, সেই দিন হইতেই আমাদের প্রদেশ বিক্ষুব্ধ হইয়া পড়িয়াছে। ঔদার্য এবং সহযোগিতার উপর প্রতিষ্ঠিত সমাজ বিপন্ন হইয়া পড়িয়াছে। ইতিমধ্যেই আমাদের সাহিত্যের ধ্বংসোন্মত্ততা আত্মপ্রকাশ করিয়া আমাদের ভাষাকে আক্রমণে উদ্যত হইয়াছে” (কবির ভাষণটি ১৯৩৭ সানের “মাসিক মোহাম্মদ” থেকে উদধৃত)।

(৩১) এখানে প্রশ্ন জাগে কবির এই যে বলা —এই যে কথা তা তবে কিসের জন্য ছিল? কোন উচ্চ মহামানবতার ও চারিত্রিক শান্তির পরিচয় দিতে কবি সাম্প্রদায়িক জন সভার নেতৃত্ব গ্রহণ করেছিলেন? সে কি সেই নিক্ষিপ্ত খাদ্য টুকরার অধিকাংশটা যাতে মুসলমানদের পাত্রে যেয়ে না পড়ে, তজ্জন্য দেশব্যাপী আন্দোলন ও ভারত সচিবের কাছে আবেদন নিবেদন করার মধ্যে ছিল না? কবির স্ব সমাজ যদি ঔদার্য ও সহযোগিতার উপর প্রতিষ্ঠিতই থাকতো তবে কবির নেতৃত্বে এ আন্দোলন করার কী দরকার ছিল? তখনকার সময়ে হিন্দু লেখকগণ কর্তৃক রচিত পাঠ্য পুস্তক, নাটক, নভেলাদির মাধ্যমে মুসলিম সংস্কৃতি ও আদর্শ বিরোধী প্রচারণার বিরুদ্ধে মুসলমানদের প্রতিবাদ মুখর দেখেই কবি তাদের সাহিত্যের ভাষা ভাব ও বিষয়বস্তু মুসলমান কর্তৃক আক্রমনোদ্যত হচ্ছে মনে করে নিলেন। কবির এ মনোভাব বহুবার মুসলমানদের কাছে পীড়াদায়ক বিবেচিত হয়েছে (আবু ফাতেমা মোহাম্মদ ইসহাক)।

(৩২) কবি রবীন্দ্রনাথ অমিয় চক্রবর্তীকে লিখেছিলেন, “আমাদের দুর্ভাগ্য দেশে সম্প্রতি রাষ্ট্র ব্যবস্থায় মুসলমান কর্তৃত্বের উপলক্ষে সাহিত্যে সাম্প্রদায়িক শাসনের যে নতুনত্ব রূদ্রমূর্তি ধরলো তার উপরে সোভিয়েট বা নাজি শাসন যদি চালানো যায় তা হলে তো নৌকা ডুবি হবে। এখন তো কর্তাদের আমলে আমার রচনা এখানে ওখানে মুসলমানি ছুরির খোঁচা খায়, তার নাকের সামনে তর্জ্জনীও উঠে” (প্রবাসী —১৩৪৬ অমিয় চক্রবর্তীকে লেখা পত্রাংশ)।

(৩৩) কবির এই সাম্প্রদায়িক মনোভাব কবির উপরে সাম্প্রদায়িক অন্যান্য হিন্দু নেতাদের প্রভাব বিস্তারের ফল নয়। মূলতঃ চিন্তার ক্ষেত্রে মানসিক দ্বন্ধ ও বিদ্বেষের জন্যই কবি সকল সময় সাম্প্রদায়িক গন্ডী বিমুক্ত হয়ে কথা বলতে পারেন নি। শান্তি নিকেতনের আবহাওয়া সাম্প্রদায়িকতামুক্ত নয়। রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের মতো সাম্প্রদায়িক লোক আজীবন শান্তিনিকেতনের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রয়ে গেছেন (মাসিক প্রবাসী ১৩৪৮ পৌষ সংখ্যা)।

(৩৪)  বৌদ্ধ, হিন্দু, মারাঠা, রাজপুত, শিখদের আদর্শ, আত্মত্যাগ মহত্ত্ব তার কাব্যের বিষয়বস্তু হতে পারলো কিন্তু শুধু পারল না ভারতীয় মুসলমানদের মহত্ত্ব, দেশপ্রেম, আত্মত্যাগের কাহিনী। রবীন্দ্রনাথ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে নিয়ে কবিতা লিখতে পারলেন কিন্তু মুহাম্মদ মহসীনকে নিয়ে কবিতা লিখতে পারলেন না। অহল্যা বাঈকে নিয়ে সুন্দর কবিতা সৃষ্টি করলেন কিন্তু সুলতানা রিজিয়াকে নিয়ে কোন কবিতা সৃষ্টি করতে পারলেন না। বৌদ্ধ, শিখ, হিন্দু, সাধুসন্তদের সাধনার আত্মত্যাগের কাহিনী নিয়ে কবিতায় ছোট গল্প লিখতে পারলেন কিন্তু খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী, নিজাম উদ্দিন আউলিয়া, শাহজালাল প্রমুখ মুসলিম তাপসদের নিয়ে কবিতায় গল্প লিখতে পারলেন না (আবু ফাতেমা মোহাম্মদ ইসহাক) তারপরও মুসলমান সম্প্রদায়ের জনতারা তাকে উদার চিত্তে গ্রহণ করেছেন এবং এর আড়ালে উদার মাহানুভবতার সন্ধান পেয়েছেন।

ডাউন লোডের দু এক দিনের মাঝেই লিংকগুলি মুছে দেয়া হচ্ছে। বাস্তবতা এখানেই নীচে।

দুই বিঘা জমি খুব সুন্দর একটি কবিতা আবৃতি

Bangla Kobita Dui Bigha Jomi by Rabindra Nath Tagore

 

আমি জীবনেও ভাবি নি এরকম একটি লেখাও আমাকে একদিন দাঁড় করাতে হবে নানা মুনির নানা তথ্য ঘেটে। অনেক সংগৃহীত তথ্যে মনে হয় আমার আত্মা জড়িয়ে যাচ্ছিল, কলম থমকে যাচ্ছিল, সংগৃহীত লেখা তথ্য আলেখ্য বিশ্বাস হচ্ছিল না, মনে হচ্ছিল যেন আমি কোন অবিশ্বাস্যলোকের কথা বলে যাচ্ছি। যাকে সবচেয়ে সম্মানের পাদপীঠে অকুন্ঠ চিত্তে ঠাঁই দিয়েছি যার মুখের ভাষাকে, ছন্দকে আমরা আমাদের প্রাণের সঙ্গীত, জাতীয় সঙ্গীত করেছি তারা কিনা সংঘবদ্ধ হয়েই সমানেই অশ্লীল ভাষায় আমার স্বজাতিকে সম্মোধন করেছে। যাকে জনতারা এত মান এত মর্যাদা দিল, যার প্রতি একটি কটুবাক্য উচ্চারণ করে নি আর সেই তারাই কোন মানসিকতার দাসত্বে তার চারপাশের হাজার কোটি মুসলমানকে ম্লেচ্ছ, যবন বলে ডাকতে পারলে, তাদের মুখে আটকালো না? এটি সোহাগের ডাক ছিলনা, এটি ছিল বিদিষ্ট মনের বহিঃপ্রকাশ। আমি সেই যবনের বাচ্চা, আমি সেই ম্লেচ্ছের বাচ্চা নিদারুণ কষ্টে আজ বহুযুগ জনমের কষ্টের পুরানো কথা নতুন করে বলে গেলাম। কবিতার গভীর সত্যকে অস্বীকার করতে পারি না। তাই পাঠকের জন্য ঐ মর্মস্পর্শী কবিতাটি এখানে ভিন্নভাবে সংযোজন করি।

বিধি সত্যিই বাম!
এই ছিল মোর ঘটে,
তুমি মহারাজ সাধু হলে আজ
আমি আজ ‘ম্লেচ্ছ যবন’ বটে!

 

ডঃ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীসাহেব, (শিক্ষাবিদ, গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) বিশাল এ কবি সম্বন্ধে বলেন, “ইংরেজ চলে গেল। খন্ডিত বাংলার একাংশ চলে গেলো ভারতবর্ষে, অপর অংশ পাকিস্তানে। বাংলার সংস্কৃতি বিপন্ন হলো উভয় রাষ্ট্রে। এক রাষ্ট্রে হিন্দির গ্রাস, আরেক রাষ্ট্রে উর্দুর। হিন্দির গ্রাস থেকে বঙ্গ সংস্কৃতি মুক্ত হয় নি, কিন্তু উর্দুর গ্রাস থেকে হয়েছে”। (উর্দুকে ঝেড়ে ফেলা গেলেও আজ দুই বাংলায়ই এমনকি যেখান থেকে উর্দু ঝেড়ে ফেলা হয়েছে সেখানেও চলছে হিন্দি গানের রমরমা ব্যবসা, নয় কি? )

সৃষ্টিকর্তার দেয়া বিধান মাফিক ধর্মকে বাধতে গিয়ে কিভাবে এসব বড় সমাজপতিরা একতার বদলে বিভক্তির জয়গান গেয়েছিলেন। সংকীর্ণতার কাহিনীসব পাথর চাপা দিয়ে রাখা, যা বাস্তবে দুর্গন্ধ ছড়ায়। কিন্তু বিধাতার কঠোর নির্দেশ হচ্ছে, সত্যকে মিথ্যার সাথে এক করে দিয়ো না, এতে সত্যের অপমান হয়, সত্য কষ্ট পায়। রবীন্দ্রনাথ বড় কবি হলেও সংকীর্ণ মানসিকতা পরিহার করতে বড়মাপে ব্যর্থ হয়েছেন। এর অপর পিঠে মুসলিম লেখকদের অসাম্প্রদায়িকতা একটি উল্লেখযোগ্য পাওয়া। কি নজরুল কি শহীদুল্লাহ, কি জসিমউদ্দিন, বন্দে আলি মিয়া, গোলাম মোস্তফা, এরা কেমন করে অসাম্প্রদায়িক আচরণে ধন্য! কারণ তারা যে ধর্মটি ধরে দাঁড়িয়েছেন সেখানে এসব নিষিদ্ধ, বাতিল। কিন্তু বড় কবি হয়েও এত অভিযোগ কেন তার আমলনামাতে? কারণ এটি তার ধর্মের জমা, নয়কি? যার ধারাবাহিকতায় আজ একবিংশ শতকেও মোদিরা আকন্ঠ ডুবে আছেন, রক্তের হোলি খেলাতে মজেছেন, গলা ডুবিয়ে এ কাজ করছেন। মুসলমানরা প্রতিবাদ করে না বলে আজ উল্টো অভিযোগের পাহাড় হিমালয়সম, কোনভাবেই এ দায় তাদের ঘাড়ে পড়ে না, তারপরও গোটা বিশ^ তাদেরেই মিথ্যে অভিযোগের পাহাড়ে ঠেলে দিচ্ছে। মুসলিমদের চেতনহীনতা, মুখ বুজে পড়ে থাকার কথা ছিল না, উচিত ছিল ঐ সুরকে উচ্চে তুলে পরাধীনতার শিকল ভাংগা কবির কষ্টের সাথে নিজের কষ্টের একাত্মতা প্রকাশ করা।

বন্ধু গো আর বলিতে পারি না, বড় বিষ ¦ালা এই বুকে।

দেখিয়া শুনিয়া ক্ষেপিয়া গিয়াছি, তাই যাহা আসে কই মুখে।

রক্ত ঝরাতে পারি না তো একা,

তাই লিখে যাই রক্তলেখা,

বড় কথা বড় ভাব আসে নাকো মাথায়, বন্ধু বড় দুখে!

অমর কাব্য তোমরা লিখিও, বন্ধু, যাহারা আছ সুখে!

পরোয়া করি না, বাঁচি বা না বাঁচি যুগের হুজুগ কেটে গেলে।

মাথার উপরে জ¦লিছেন রবি, রয়েছে সোনার শত ছেলে।

প্রার্থণা করো, যারা কেড়ে খায় তেত্রিশ কোটি মুখের গ্রাস,

যেন লেখা হয় আমার রক্ত লেখায় তাদের সর্বনাশ।

(আমার কৈফিয়ত, শ্রেষ্ঠ নজরুল, পৃষ্ঠা ৭২/৭৩)।

 

নাজমা মোস্তফা,  ২ ডিসেম্বর ২০১৫ সাল।

 

২০১৭ সালের সংযোজন: আজ দেখলাম একটি প্রতিবাদনামা অনেক সচেতনের অনলাইন সাইটে যেখানে রবীন্দ্রনাথের কবিতা দুই বিঘা জমিসহ অতিরিক্ত বাগাড়ম্বরে ভরা প্রচারধর্মী রবীন্দ্রনাথকে পাঠ্যবই থেকে বাদ দেয়ার দাবী করা হয়েছে যার উপর চারিত্রিক গলতি দৃষ্টিগোচর হচ্ছে। । তারা যুক্তি হিসাবে দেখাচ্ছেন, কয় বছর আগে সুপ্রীম কোর্টের একটি রায়ে (আপিল নাম্বার ১২৮ এর ২১১২) সিনিয়র জাস্টিস বিচারপতি শরফুদ্দিন চাকলাদার তার ১৫ ও ১৬ নাম্বার পৃষ্ঠায় প্রকাশ করেন যে, রবীন্দ্রনাথ ঢাকায় আসতেন এবং বুড়িগঙ্গা নদীতে নৌকা নোঙর করতেন প্রসিদ্ধ গঙ্গাজলীর (বিশাল পতিতালয়ের ঠিকানা) বিপরীতে এবং লিখতেন “বাংলার বধু বুকে তার মধু”। উল্লেখ্য, এ বছর ২০১৭ সালের অষ্টম শ্রেনীর পাঠ্যবইএ সাহিত্য কণিকার ৭৮ পৃষ্ঠায় দুই বিঘা জমি কবিতাটি এসেছে এবং সেখানেও এসেছে ঐ ছন্দময় সংযোজনটি “বুক ভরা মধু, বঙ্গের বধু।” ঐ সব প্রতিবাদকারীরা জোর গলাতে বলছেন রবীন্দ্রনাথের পারিবারিক ব্যবসা ছিল পতিতালয়ের ব্যবসা। তার দাদার শুধু কলকাতায়ই ছিল ৪৩টি পতিতালয় (তথ্যসূত্র: সতীশচন্দ্র চক্রবর্তী সম্পাদিত, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের আত্মজীবনী, ১৯৬২, পৃষ্ঠা ৩৫৮-৬০; কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকা, ২৮ শে কার্তিক ১৪০৬, রঞ্জন বন্দোপাধ্যায়)।

উদাহরণ হিসাবে আবুল আহসান চৌধুরী রচিত ‘অবিদ্যার অন্তঃপুরে, নিষিদ্ধ পল্লীর অন্তরঙ্গ কথকথা” বইএ পাওয়া যায় বেশ্যাবাজি ছিল বাবু (হিন্দু) সমাজের সাধারণ ঘটনা। নারী আন্দোলনের ভারত পথিক রাজা রামমোহন রায়ের রক্ষিতার গর্ভে তার একটি পুত্রও জন্মে। রবীন্দ্রনাথের ভাই জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর পতিতা সুকুমারী দত্তের প্রেমে মত্ত ছিলেন। রবীন্দ্রনাথের মতই শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ও নিয়মিত পতিতালয়ে গমন করতেন। যার খেসারত হিসাবে রবীন্দ্রনাথের সিফিলিস আক্রান্ত হওয়ার খবর তার জীবদ্দশাতেই “বসুমতি” পত্রিকাতে প্রকাশিত হয়েছিল।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: সর্বশেষ সংযোজনটি জরুরী মনে করেই করি। কারণ অনেক হিন্দু ঘেষা বৌদ্ধ ও নাস্তিককে অতীতে এ লড়াই করতে দেখেছি যে নবী মোহাম্মদ (সঃ) থেকেও রবীধর্ম বলে কিছু প্রচার করলে নাকি ভালো হতো।  সবচেয়ে বেদনার কথাটি হচ্ছে মুসলিমরা অসচেতন ও অতিরিক্ত অসাম্প্রদায়িক থাকার কারণে অন্যের বিষফলকে অমৃত জেনেই অন্দর মহলে জায়গা করে দিয়েছে, দিচ্ছে আর নিজের বিশাল অর্জনকে না জেনে অবজ্ঞা করেছে, করছে। রবীন্দ্রনাথ যদি প্রকৃতই সচেতন হয়ে ঐ সমাজে কাজ করে যেতেন তবে ভারত বর্ষের আগুণ এভাবে একবিংশ শতাব্দী অবদি তোষের আগুণে পুড়তো না। গুজরাট বাবরী মসজিদসহ হাজার হাজার দাঙ্গার সমারোহ হতো না। এর সমূহ দায় দুধের উপরে ভেসে থাকা এসব সরলোভীদের ঘাড়েই বড়মাপে বর্তায়। এসব অপকর্মের দায় থেকে এ বড় কবির নিস্তার পাবার কোন সুযোগ নেই।

নাজমা মোস্তফা, ১৬ই জানুয়ারী ২০১৭, নতুন সংযোজন শেষের প্যারা।

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

Tag Cloud

%d bloggers like this: