Articles published in this site are copyright protected.

Archive for December, 2015

বাংলাদেশ : মুক্তিযুদ্ধ, শহীদ,ষড়যন্ত্রে ঘেরা একটি দেশ

বেশ ক বছর আগে লন্ডন সূত্রে প্রকাশিত খবরে এসেছে যে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ২৬৯,০০০ মানুষ নিহত হয়েছে (দ্যা টাইমস অব ইন্ডিয়া, ২০ জুন, ২০০৮)। মনে হচ্ছে সিরাজুর রহমানের কথাই বাস্তবতা পেয়েছে। প্রয়াত সিরাজুর রহমানের প্রকাশিত যুক্তিকে সব সময়ই স্পষ্ট সত্য বলেই মনে হয়েছে। যতই নাড়া পড়ছে উল্টেপাল্টে সত্য উঁকিঝুকি দিয়ে বেরিয়ে পড়ছে। ‘র’এর সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা এস কে যাদবের লেখায় বলা হয় ভারত এসব লুকিয়ে রেখেছে। কেন ভারত এসব লুকালো, এটি আমাদের মত হাবাগোবা ময়দানে যুদ্ধ দেখা জনতার মনে নানা প্রশ্ন উদিত হতেই পারে। আমরা রাতে ঘুমিয়ে থেকেও মুক্তিযুদ্ধের ষ্টেনগানের ও দিনের ঝলমলে আলোতেও মর্টারের আওয়াজ পেয়েছি, ময়দানে পাকিস্তানী সৈন্য দেখেছি, কোন “র” দেখিনি। মিঃ যাদব গর্ব বোধ করছেন ২০১৫ সালের ডিসেম্বরের বিজয়ের মাসে দ্বিগুণ তেজে। কিন্ত আমরা ঠিক সেটি ওভাবে মেনে নিতে পারছি না। তারা তাদের কুটিল কপট হীন ষড়যন্ত্রঘেরা অপকর্মের কাছে নিদেন পক্ষে বিবেকের কাছেও প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছেন না, বরং বিজয়বোধ করছেন একটি ঘর ভাংতে পেরেছেন ঐ উল্লাসে। কিন্ত স্পষ্ট কথাটি হচ্ছে ওটি ছিল প্রতারণা, ষড়যন্ত্র, নীতিহীনতা। যতই চানক্য পন্ডিতের খাতাতে গোটা গোটা লেখা থাকুক, অমানবিক নীতিহীনতা কাপুরুষের অর্জনমাত্র, বীরের নয়। বৃটিশরা মুসলিমদের আদর্শকে এড়িয়ে যেতে চেয়েছে, তাই ষড়যন্ত্রের জন্য বেছে নিয়েছে উমিচাঁদ রায়দুর্লভদেরে। হাতের কাছে পেয়েছে তাগড়া লেন্দুপ দর্জির আদলে মিরজাফরকে। আজো মুসলিমদের মাঝে মুনাফিকের কোন কমতি নেই। কুরআনে বলা আছে এরা তিন ভাগের মানুষ মুমিন, মুশরিক ও মোনাফিক। একমাত্র মুমিনরাই সুপথের পথিক, বাকীরা বাতিলের দলে এক পা বাড়া। বেশীরভাগ হিন্দুরা মনে প্রাণে মুসলিম বিদ্বেষী, সীমা ছাড়িয়েও একটু বেশী। এ ক্ষেত্রে নীতিনৈতিকতার মানদন্ডে তারা বেশ পিছিয়ে।

নীচে চারটি প্যারা টুকছি (নাজমা মোস্তফার ‘একই ধর্ম একই ধারা’ প্রকাশিত জানুয়ারী ২০১২সাল, ৯৮/৯৯/৯৬ পৃষ্ঠা)। কংগ্রেসের পয়তাল্লিশ বছরের শাসনামলেই ভারতে ২০ হাজারেরও বেশী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছে। ভারতীয় নেতৃবৃন্দের কাছে গণতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতা ছিল একটা মুখোশ মাত্র। সেই মুখোশ আজ সম্পূর্ণভাবে খসে পড়েছে। ভারত এখন একটা পুরাপুরি হিন্দু রাজ্য হতে চলেছে। কাজী নজরুল ইসলামের মত অসাম্প্রদায়িক কবি বাংলা সাহিত্যে আর কে আছেন? তারপরও তিনি ভারতের শিক্ষাব্যবস্থা থেকে নির্বাসিত। নেহরু তার “ডিসকভারী অব ইন্ডিয়া” বইতে দক্ষিণ এশিয়াব্যাপী হিন্দু সভ্যতার প্রভাব বলয় সৃষ্টির আবেগে আচ্ছন্ন মনোভাব ব্যক্ত করেছেন। উক্ত বইতে তিনি ভারতের কালচার বুঝিয়েছেন পুরোপুরি হিন্দু সভ্যতা।জওহরলাল নেহরু বাবরী মসজিদে নামাজ বন্ধ করেছিলেন, নরসীমা রাও মসজিদটি ধ্বংস করেছিলেন। এরা সকলেই মুসলমানদের শত্রু মনে করে। কেউ প্রকাশ্যে কেউ গোপনে। হিন্দু নেতৃবৃন্দের মুসলিম বিদ্বেষী আচরণে অতিষ্ঠ হয়েই এককালের নেত্রী সরোজিনী নাইডু যাকে  “হিন্দু মুসলমানের মিলনের দূত” নামে আখ্যায়িত করেছিলেন সেই কায়দে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, এলাহাবাদের এক ছাত্র সভায় বলতে বাধ্য হয়েছিলেন যে, “If for uplifting the social, economic and political standards of the Mussalman’s of India, I am branded a communalist. I assure you gentleman, that I proud to be a communalist”.  অর্থাৎ ভারতীয় মুসলমানের সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক মান উন্নয়নের কথা বললে কেউ যদি আমাকে সাম্প্রদায়িক বলে, ভদ্রমহোদয়গণ সেই রকম সাম্প্রদায়িক হয়ে গর্ববোধ করবো”।

 শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৮১ তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে সরকারকে

আই আর এস এর সহযোগী দল শিবসেনার সর্বাধিনায়ক বালঠাকরে, তিনি বর্তমান ভারতীয় রাজনীতির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, তিনি তার দলীয় মুখপাত্র “মর্মিক” এর এক সংখ্যায় স্বগর্বে বলেছিলেন, “হিটলারই আমার আরাধ্য দেবতা, আমার গুরু, আমার আইডল”। তিনি “টাইম” পত্রিকার সংবাদদাতার সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “এটা আমার মাতৃভূমি। এখানে শরিয়ত চলবে না। এটা হিন্দু রাষ্ট্র, এখান থেকে ওরা চলে যাক, না গেলে লাথি মেরে ভাগিয়ে দিব। ওরা যদি ইহুদীর মত আচরণ করে, তাহলে নাৎসি জার্মানীতে ইহুদীরা যে ব্যবহার পেয়েছে, এখানেও তাই পাবে। তা নিয়ে এত কথার কি আছে?” (আয়ার দানিশের কলাম থেকে, ১২ই আগষ্ট, ১৯৯৯, দৈঃ সংগ্রাম)

“কংগ্রেস কখনো পার্টিশন মেনে নেয় নি তবে কখনো কখনো পরিস্থিতির চাপে বা ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছু মেনে নিতে হয়। আমরা ভারত বিভাগ মেনে নিয়েছি শুধু মাত্র বাংলা ও পাঞ্জাবের বিভাগের শর্তে কারণ এ পথেই আমরা অখন্ড ভারত ফিরে পাব”। নেহরুর এই চিঠিটা আশরাফ উদ্দিন সাহেবের ছেলে জনাব জামালূদ্দিন চৌধুরী তার “রাজ বিদ্রোহী আশরাফ উদ্দিন” বইএর শেষ মলাটে ছেপেছেন। কিন্ত শিয়ালদহ জমিদারী এলাকায় যেখানে প্রায় সকল রায়তই মুসলমান, সেখানে গরু কোরবানী নিষিদ্ধ করা কিম্বা একতরফা খাজনা বাড়িয়ে মুসলিম প্রজাদের প্রতিরোধের মুখে তা আদায় করতে ব্যর্থ হয়ে তাদের শায়েস্তা করার জন্য তাদের গ্রামে (নমশুদ্র) প্রজাপত্তন নিশ্চয়ই কোনও উদার অসাম্প্রদায়িকতার প্রমাণ বহন করে না” (রবীন্দ্রনাথের সূত্রে পাওয়া: বাংলা একাডেমীর ত্রৈমাসিক উত্তরাধিকার ১৩৯৩)  ডঃ আহমদ শরীফ সাম্প্রদায়িক হিন্দু সম্পর্কে লিখেছেন, “বাংলার হিন্দু কেবল হিন্দুর কল্যানেই করলো আত্মনিয়োগ। স্কুল, কলেজ, পত্র-পত্রিকা, সভা-সমিতি, সাহিত্য, শিল্প, ব্যবসা বানিজ্য, শাস্ত্রশোধন, সমাজ সংস্কার, দানধর্ম, চাকরি মজুরী, এমনকি সরকারের আবেদন নিবেদনও করতো কেবল হিন্দুর জন্য ও হিন্দুর স্বার্থে। কিন্ত বাস্তব ক্ষেত্রে হিন্দু মুসলিম যে গাঁয়ে গঞ্জে কেবল পাশাপাশি বাস করে না, অভিন্ন হাটে ঘাটে, মাঠে ঘাটে, বেচা কেনায়, লেন-দেন, সহযোগিতায় ও প্রতিদ্বন্ধিতায় যে অবিচ্ছেদ্য – এ সত্য এ সময়কার ভাব চিন্তা, কর্মে ও আচরণে অনুপস্থিত (আহমদ শরীফ, প্রত্যয় ও প্রত্যাশা, ঢাকা ২৫শে বৈশাখ ১৩৮৬, পৃষ্ঠা ৪৪)। উপরের যুক্তিগুলি এজন্যই আনলাম মুসলিমদের জন্য একটি ভূখন্ডের প্রয়োজন ছিল, ঐ সময়ের সংকীর্ণ হিন্দু ভারতের প্রেক্ষাপটে গড়ে উঠা অস্তিত্বের দাবী। ঐ সময় রবিবাবুসহ হিন্দু জমিদার ও বাবুশ্রেণীর কাজ ছিল মুসলিমদের অগ্রগতিকে সর্বোতোভাবে রুখে দেয়া। আজো স্পষ্ট চোখে পড়ে কিভাবে ভারতের হুমকির মুখে বাংলাদেশ নামের অসাম্প্রদায়িক একদল জনগোষ্ঠীসহ ভারতের মুসলিমরা।

পাকিস্তান নামের দেশটিতে একদিন আমরা জাতীয় সঙ্গিত গেয়েছিলাম, সেদিন কোন ক্ষেদ ছিল না পূর্বপাকিস্তানীদের মনে। সম্প্রতি পাওয়া কায় কাউস নামের একজনের ফেইস বুক সুত্রের হালকা টাচ এখানে আনছি (তথ্যসূত্র: মুনীর চৌধুরী, সৈয়দ শামসুল হক, রফিকুল ইসলামের প্রকাশিত রণাঙ্গন, ১৯৬৬, পৃষ্ঠা ৪-১২৮)। স্বাধীনতাপূর্ব পাকিস্তান আমলে ১৯৬৫র পাকভারত যুদ্ধের পর উল্লেখিত লেখকরা পশ্চিম পাকিস্তানের রণাঙ্গনের পরিদর্শনরত। শিয়ালকোট, রাওয়ালপিন্ডি ও লাহোরের সংলগ্ন ভুখন্ডে সেপ্টেম্বরের ৬ তারিখ থেকে ২৩ তারিখ পর্যন্ত একটানা যুদ্ধ বাঁধে। তারপর আন্তর্জাতিক উদ্যোগে যুদ্ধ বিরতি আরোপিত হয়। কেউ অস্ত্র সংবরণ করে, কেউ গোপনে গোপনে প্রস্তুতি চালায় চুক্তিভঙ্গের। যে রণাঙ্গণে এখন একটি কৃত্রিম প্রশান্তি বিদ্যমান। সেখানে আমরা ক’জন, যারা যোদ্ধা নই, লেখক মাত্র পরিদর্শনে গিয়েছিলাম। ছম্ব থেকে শিয়ালকোট, শিয়ালকোট থেকে বাদিয়ান, বাদিয়ান থেকে চাবিন্দা, চাবিন্দা থেকে কাসুর। এক একটি করে রণপূণ্যভ’মি পরিদর্শন করেছি। যুদ্ধে প্রতিটি দিনের রক্তাক্ত ইতিহাস, পাকিস্তানের বীর সেনানীর শৌর্য ও বুদ্ধিমত্তার ইতিহাস। সারা শহরে বিদ্যুতের মত ছড়িয়ে পড়েছে এ সংবাদ। ক্রুদ্ধ হয়ে উঠেছে জাতি। কী দুঃসাহস এই পররাজ্য লোভী হিং¯্র বর্বর ভারতের। একে একে হায়দ্রাবাদ, জুনাগড়, মানতাদাড়, গোয়া দখল করে কাশ্মীরের জনসাধারণের প্রতি দেয়া ওয়াদা খেলাপ করে পায়ের নীচে তাদের পিষে মারার ঘৃণ্য আয়োজন করেও ক্ষুধা মেটেনি ভারতের। সে এখন পাকিস্তানের পবিত্র ভ’মিতে তার নখর বিদ্ধ  করেছে।

দুপুর দেড়টার দিকে — অভুতপূর্ব দৃশ্য। নিঃশ^াস রুদ্ধ করে, ক্রোধ প্রশমিত করে হাতের মুঠো শক্ত করে রেডিও সেটের চার পাশে দাঁড়িয়ে পড়েছে পথচারী, কুলি, মজুর, ব্যবসায়ী, কেরাণী. অফিসার, ছাত্র, শিক্ষক। যে যে কাজে আছে, সব এই মুহুর্তে তুচ্ছ হয়ে গেছে। কান পেতে রয়েছে কখন প্রেসিডেন্ট কথা বলবেন। বেজে উঠলো জাতীয় সঙ্গীত – পঞ্চাশ একশ দু’শ করে লোক দাঁড়িয়ে আছে। অফিসে সেদিন অফিসারের কামরায় তিল ধারণের জায়গা নেই। বাড়ীতে বাড়ীতে রান্না ফেলে মা বোনেরা হলুদ মাখা হাতে রেডিও সেটের সামনে এসেছেন। যে ছোট্ট ছেলেটা খেলা ছাড়া আর কিছু বোঝে না- সেও বড়দের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে উৎকর্ণ হয়ে। প্রেসিডেন্টের কন্ঠ শোনা গেল “আমার প্রিয় দেশবাসী, আজ দশ কোটি পাকিস্তানীর জন্য অগ্নি পরীক্ষার সময় এসেছে।” জনতা শুনলো পাকিস্তানের ওপরে ভারতের অতর্কিত আক্রমণের কথা। মুহূর্তে রচিত হয়ে গেল জ¦লন্ত ইতিহাস। যখন প্রেসিডেন্ট বললেন, “লাহোরের নির্ভীক বীর জনসাধারণ সর্বপ্রথম শত্রুর মোকাবেলা করার সুযোগ পেয়েছে। শত্রুদের চরম আঘাত হানতে পেরেছে বলে ইতিহাসের পাতায় তাদের নাম অমর হয়ে থাকবে।” আর তার পরমূহুর্তেই প্রেসিডেন্ট উচ্চারণ করলেন –পাকিস্তানের দশ কোটি মানুষের হৃদয়েলা ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহএই ধ্বনি স্পন্দিত। ভারতের কামান চিরতরে স্তব্ধ না করা পর্যন্ত দশ কোটি পাকিস্তানী বিশ্রাম গ্রহণ করবে না। উচ্চারণের সাথে সাথে যেন একটি ইন্দ্রজাল ঘটে গেল। এক মুহূর্তে পাকিস্তানের প্রতিটি মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়ে গেল। তাদের বাহু হয়ে উঠলো বজ্র, প্রতিরোধে এক একটি মানুষ হয়ে উঠলো বীর সৈনিক। সে প্রতিরোধ চূর্ণ করে এমন শক্তি বুঝি আজো পৃথিবীতে জন্ম গ্রহণ করেনি। ভাষন শেষে আবারো বেজে উঠে জাতীয় সঙ্গীত, জনতারা অনড়। এর প্রতিটি ধ্বনি যেন ডাক দিচ্ছেজাগো, জাগো, জাগোবলছে, “এগিয়ে যাও, আমি তোমার স্বদেশ, আমি তোমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছি, আমাকে রক্ষা করো, শত্রুকে আঘাত হানো। সেদিন এক কঠিন স্বজাত্য চেতনা, স্বদেশ প্রেরণা, আর দুর্জয় সাহস তাদের প্রত্যেককে উন্নততর এক একটি সজীব মানুষে পরিণত করে দিয়ে গেছে, ৬ই সেপ্টেম্বর।

বাদিয়ানের কোন এক অগ্রবর্তী এলাকা। খেমকারানের পথে আমাদের সেখানে নিয়ে যাওয়া হলো। এ অঞ্চলের সেনাপতি ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন – এই এলাকার পূর্ব পাকিস্তানী বীর যোদ্ধাদের সঙ্গে দেখা সাক্ষাতের। উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করছিলেন তিনি। বলছিলেন, “এই বীরেরা এখানে না থাকলে, এই খন্ড যুদ্ধের ফলাফলটাই হয়তো অন্য রকম হয়ে যেত”। পূর্ব পাকিস্তানের এ সুনাম যে কতটা বিসতৃত হয়েছে- এ ক’দিনে তার একটা প্রমাণ। আজ জওয়ান এবং অফিসারদের মধ্যে কথাবার্তায় শখ করে বাংলা শব্দ ব্যবহার একটা স্মার্টনেস হিসাবে গণ্য হচ্ছে। আর যারা ভাংগা ভাংগা উচ্চারণে বাংলা ভাষার পুরো একটা বাক্য আওড়াতে পারেন বা কোন গান কি কবিতার লাইন আওড়াতে পারেন – তাদের তো কথাই নেই, তারা রীতিমত ঈর্ষার পাত্র অন্যান্যদের কাছে। হঠাৎ শুনি চাবিন্দার এক অফিসারের অনভ্যস্ত উচ্চারণে তিনি আবৃত্তি করে উঠলেন – ‘পাগলা মনটারে তুই বাঁধ’।

কাছে আসতেই আর সন্দেহ রইল না, সেই অতি চেনা – লজ্জিত হাসি, সংকোচ, সেই নাতিদীর্ঘ শরীর, পুরোনো তামার পয়সার মত গায়ের রং, চারদিকের শ্যামল সবুজের সংগে একেবারে এক হয়ে যাওয়া চেহারা চলন। জিজ্ঞেস করলাম, বাড়ী কোথায়? উত্তর এলো কুমিল্লা। আরো এল অনেকে। তাদের কেউ যশোহরের, কেউ বরিশালের, নোয়াখালির, ঢাকার, ময়মনসিংহের। পার্বত্য চট্টগ্রামের সন্তান বৌদ্ধ মেজরের সাথে আলাপ করে এটাই মনে হল যে, দেশের ডাকে পাকিস্তানের সব সম্প্রদায় সব ভাষাভাষী মানুষ একভাবে সাড়া দিয়েছে। শত্রুকে তো তারা হটিয়ে দিয়েছেই, সেই সঙ্গে সবাই উপলব্ধি করেছে, প্রমাণ করেছে শুধু কথায় নয়, কঠিন বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিরহংকার কর্মনীতির ভেতর দিয়ে যে, আমরা পাকিস্তানী – আমরা একজাতি, একপ্রাণ- একই আদর্শে উদ্বুদ্ধ বিচিত্র ধর্ম, ভাষা, রক্তের দশ কোটি মানুষ। সাতদিন ধরে ঘুরে বেড়িয়েছি। এমন একটা যুদ্ধের সম্পূর্ণ ছবি মনের মধ্যে তুলে নেয়ার জন্যে হয়তো যথেষ্ট নয়; কিন্ত চোখ ছিল সজাগ, মন ছিল তৃষ্ণার্ত- তাই এই সাতদিনে যতটুকু সংগ্রহ করেছি তা হয়তো একটা সারা জীবনের অভিজ্ঞতার সমান। প্রতিটি যোদ্ধাকে নিয়ে বীরগাঁথা রচিত হতে পারে, প্রতিটি ঘটনা হতে পারে পূর্ণাঙ্গ একটি নাটক বা উপন্যাস। এর এক একটি মুহূর্ত হতে পারে কবিতা, যে কোন রণাঙ্গন হতে পারে সৃষ্টির বিসতৃত পটভূমি। আমাদের ইচ্ছা আছে, একদিন এ নিয়ে বড় কিছু লিখব। কেউ নাটক, কেউ গল্প, কেউ উপন্যাস, কেউ কবিতা, কেউ আঁকবো ছবি। ইচ্ছে আছে, সেদিন হয়তো এই যুদ্ধের অভিজ্ঞতাকে একটা মানবিক দলিলে রুপান্তরিত করতে পারবো আমাদের সীমিত সাধ্য অনুযায়ী।

যুগের চড়ায় শুনিহুনায়েন বদরেরআরাব আবার,

মনে হয় এরা সেই মোজাহিদ ইসলামের অগ্নি জমানার,

ইহাদের শৌর্যবীর্যে পাকভূমি রচিয়াছে নীড় আপনার;

ইহাদের বক্ষপুটে ধ্বনিতেছে রসুলের মহান পয়াম;-

¦লন্তস্ফুলিঙ্গ এই পূর্ব পাকিস্তানী জনে জানাই সালাম (তথ্যসূত্র, )

সৈয়দ শামসুল হককে কমবেশী সবাই চিনেন। একদিন তিনি ছিলেন ঐ পূর্ব পাকিস্তানের বাসিন্দা। তার রচনাতে কি খুঁজে পাওয়া যায়, কোন বৈরীতা? বিবেচনা পাঠকের জন্য জমা রাখা।

“১৯৪৭ সালে খাজা নাজিম উদ্দিন, শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মত মুসলিম লীগ নেতারা সেটি বুঝেছিলেন। ফলে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান  মিলে অখন্ড পাকিস্তান গড়া ছাড়া তাদের সামনে আর কোন পথ ছিল না। ভারতের মুসলিমরা জানে মুসলিম হওয়ার জ¦ালা কত গভীর ছোঁয়, আজও একবিংশ শতকেও মানুষ বিদগ্ধ সময় পার করছে। ওটি না হলে সহজ হিসাবে বাংলাদেশের এতদঅঞ্চল ভারতের পদতলে কাশ্মীরী আদলের পরিণতি পেতো ১৯৪৭ সাল থেকেই। সেদিনের পূর্ব বাংলা মাউন্ট ব্যাটনের ভাষায় ছিল (রুরেল স্লাম) গ্রাম্য বস্তি, ঐ বস্তির দায়ভার পাকিস্তানের ঘাড়ে না নেয়ার যুক্তি দেখিয়েছিলেন তিনি (মাউন্টব্যাটন পেপারস, ১৯৪৭)। নীতির প্রশ্নে বৃটিশরাও মুসলিমদের এড়িয়ে চলতো, সেদিনও রাজকার্যে মুসলিম রাজনায়করা তাদের চৌহদ্দিতেও ছিল অনুপস্থিত। শুধু সেদিনই নয়, আজও ধর্মনিরপেক্ষ ভারত এর ব্যতিক্রম নয়। মনে হয় আমাদের দেশের নিকট সময়ের রাজলোভীরা ইতিহাসের পাট নাড়ে কম, পড়ে কম, শুধু ক্ষমতাই বুঝে, এরা বাস্তবিকই লোভী, এর বাইরে এদের কোন দ্বিতীয় পরিচয় নেই। মুজিব সব সময় বড় গলায় বলে এসেছেন তিনি আগরতলা ষড়যন্ত্র করেন নি। পশ্চিম পাকিস্তানীরা মিথ্যা মামলায় তাকে জড়িয়েছে। বড় নেতা হলেও তিনি মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছেন, আজ এটি দিবালোকের মত স্পষ্ট। সিরাজুর রহমান প্রশ্ন রেখেছিলেন কিসের লোভে তিনি এ কাজ করলেন? ভাবতে লজ্জা লাগে, অবাক লাগে এরাই আমাদের নেতা, যাদের কাছে নিজের স্বার্থের বাইরে জাতীয় স্বার্থের মূল্য বড় অল্প। যতই দিন যাচ্ছে ততই আমাদের গর্বের পাহাড় ক্ষীন থেকে ক্ষীনতর হয়ে আসছে!

জনতার কথা ০১ ১২ ১৩(অবরোধে রাজনৈতিক সহিংসতায় প্রতিদিনই সাধারণ মানুষ মারা যাচ্ছে, মতামত)

সৃষ্টি করা হয় রক্ষীবাহিনী, ত্রাস সৃষ্টিকারী বাহিনী, “র”এর তত্তাবধানে জেনারেল উবানের নেতৃত্বে গড়ে উঠা বাহিনী বাংলাদেশে যাতে যুদ্ধের মূল বাহিনী মুক্তিযোদ্ধের গেরিলা যোদ্ধারা মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে না পারে, হয় পায়ের নীচে গড়াগড়ি দিবে নয়তো নির্মূল করা হবে। “স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন ১৯৭১ সালের অক্টোবর মাসে অস্থায়ী প্রবাসী সরকারের ভারতপন্থী অংশের সম্মতিতে ‘র’ এর ড্রাফট অনুযায়ী গোপন সাত দফা চুক্তি সাক্ষরিত হয়। এ চুক্তিটির সাতটি শর্ত একটি স্বাধীন দেশের জন্য এতটাই অবমাননাকর যে ভাবতেও অবাক লাগে। কিভাবে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ চুক্তি সম্পাদনে সায় দিয়েছিলেন? অবশ্য অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি জনাব সৈয়দ নজরুল ইসলাম চুক্তি সাক্ষরের পর মূর্ছা যান। সেদিন গোপন সাতদফার আওতায়ই আমাদের সেনাবাহিনীর দফারফা করে। উল্লেখ্য, স্বাধীনতা যুদ্ধের এক পর্যায়ে চিত্তরঞ্জন সুতার কালিদাস বৈদ্যসহ মোট তিনজন সংখ্যালঘু আওয়ামী লীগ নেতা ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে বাংলাদেশকে ভারতের অংশ করে রাখার প্রস্তাব রাখেন। আশ্চর্যজনক ব্যাপার হলো, পরে জনাব হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী বাংলাদেশ সরকারকে বিষয়টি অবহিত করলেও তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এবং জনাব চৌধুরীরর মতে তারা কিছু সংখ্যালঘু নেতা চেয়েছিলেন বাংলাদেশকে সিকিম বানাতে” (হুমায়ুন রশিদ চৌধুরীর সাক্ষাৎকার বাংলাদেশেআগ্রাসী গুপ্তচরবৃত্তির স্বরুপ সন্ধান, আবু রুশদ, পৃষ্ঠা ৪৯/৫০)। তাই ভারতীয় সংবিধানের চার মূলনীতিতে বিশ^াসী আওয়ামী লীগ  হচ্ছে ভারতপন্থী বা প্রোইন্ডিয়ান দলগুলির মধ্যে “র”এর ঘনিষ্ট জন (দৈনিক ইনকিলাব, ৫ মে, ’৯০ সংখ্যা)। সরকারের ইন্ধন ঐ সিকিমীয় তালবোলে ভরা ছিল বলেই সরকার চুপ ছিল, এটি স্পষ্ট। যেদিন এ হতভাগাদেরে চার নীতি দিয়ে কৌশলীবেড়া দেয়া হয়, সেদিন ভারতের নিজেদেরও চার নীতি ছিল না। কত ভয়ানক ছিল একবিংশ শতকের এ দাসপ্রথা!

বাংলাদেশের ভেতরের সবাই দেশপ্রেমিক নয়, প্রকৃত দেশপ্রেমিক কে সেটি আজ এ শতকের বিরাট প্রশ্ন? অন্তত একটি দল এরা বাংলাদেশের বৈরী নীতির অনুসারী, বিদেশের দালাল। এরা দলবাজরা নিজেরাও জানে না কিভাবে তারা লেন্দুপ দর্জির গোলামে পরিণত হয়েছে। যুগ যুগ অবদি এরা ইতিহাসের কলঙ্কে নিক্ষিপ্ত হবে। মোনাফিকের স্থান কি ধর্মে কি রাজনীতিতে খুবই খারাপ ধিক্কার জনক স্থানে তাদের অবস্থান, ইহ ও পরকালে। আটশ বছর আগে যে দরবেশ নিয়ামত উল্লাহ ভবিষ্যদ্বাণী করে বলেছিলেন যেঅতপর একজন মুসলমান (নামধারী) নেতার উদ্ভব হবে, যিনি বিজাতীয় চক্রান্তে প্রভাবিত হয়ে তার স্বদেশ স্বজাতির সর্বনাশ ডেকে আনবেন এবং এই ঘটনাটি ঘটবে দুই ঈদের মধ্যবর্তী সময়ে”  সেতুবন্ধন, ডাঃ এম শুকুর, ৪৯ পৃষ্ঠা) উপরোক্ত ঘটনা দরবেশের কথামতই ঘটেছে আর নামধারী মুসলিম নেতার কৃত সর্বনাশের ফসল আজকের বাংলাদেশ।  “১৯৭১ সালের পর ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ও সেনাকর্মকর্তারা দক্ষিণ এশিয়াসহ অষ্ট্রেলিয়ার জলসীমা পর্যন্ত ভারতের আধিপত্য কায়েমের মাস্টার প্ল্যান তৈরী করে। প্রতিবেশী বাংলাদেশ, ভুটান, নেপাল, শ্রীলংকা, মালদ্বীপ ও পাকিস্তানের অভ্যন্তরে বিভিন্ন সমস্যা সৃষ্টির কৌশল গ্রহণ করে। মাঠে নামিয়ে দেয় ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’কে। উপরোক্ত দেশগুলোর মধ্যে মালদ্বীপ ও ভুটানের কোন স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি নেই। এরা ভারতীয় বাজারের ক্রেতা। বাকী দেশগুলোর মধ্যে পাকিস্তান একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বি হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। চট্টগ্রাম জুম্ম শরাণার্থী কল্যাণ সমিতির এককালীন সভাপতি উপেন্দ্রলাল চাকমা ১৯৯১ সালে অন্যান্য শান্তিবাহিনী নেতাদের সাথে মতভেদ দেখা দেয়ার পর বলে ফেলেন যে, শান্তিবাহিনীর নেতৃত্ব মূলতঃ ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার হাতে ন্যস্ত” (গ্রন্থ, পৃষ্ঠা ৫৩/৫৭)

আজ যেখানে ভারতের গোয়েন্দা বাহিনীর এস কে যাদবরা বাহাদুরী অর্জন করতে চাচ্ছেন, এতদিনের চেপে রাখা ইতিহাসকে নিজেদের বাহাদুরী বলে প্রচার করতে চাচ্ছেন, যতটুকু জানছি তাতেই মনে হচ্ছে এসব যে কত লজ্জার বিষয় কোন ব্যক্তি, নেতা, দেশ, জাতি সবার জন্য। এসব কোন বাহাদুরীর বিষয় নয়। যে লজ্জা সামান্য হলেও ভারত বুঝতে পেরেছিল বলেই নীবর ভ’মিকা পালন করে গেছে। হঠকারীতার মাঝে, ছলনার মাঝে, মেরুদন্ড বিক্রি করে দেবার মাঝে, অসৎ অনৈতিক পথে হাটা কোন বিজয়ে অহঙ্কার করার কিছু থাকে না। মনে হয় এতদিন যা আমরা ভুল ভাবে জেনে মেনে এসেছি, সেটি ভারতসহ আমাদের ঐসব নেতারাও ঐ অহঙ্কার ধরে রাখতে পারবে না। কিয়ামত পর্যন্ত মুসলিম অধ্যুষিত ৯০% অধিবাসী বাংলাদেশীরা এর উপর বিধাতার দরগাহে এর বিচার চাইতে কসুর করবে না। মনের ভার লাঘব করতে আরো কিছু ঐতিহাসিক সত্য তথ্য যোগ করছি।

একটি কথা আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি যে, যারা বাংলা তথা পূর্বাচলে মানুষের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছিলেন তাদের সবারই অপঘাত মৃত্যু ঘটেছে। আর্ল মাউন্ট ব্যাটেনও এই পরিণতি থেকে রেহাই পাননি। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় ঘসেটি বেগমের প্যালেস রাজনীতির বদৌলতে এদেশ নিজের স্বাধীনতা হারিয়েছিল পলাশীর মাঠে। পলাশী নাটকের সকল চক্রান্তকারীরাই অস্বাভাবিক মৃত্যু বরণ করেছিলেন। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, নবাব সিরাজউদ্দৌলা মুহাম্মদী বেগ কর্তৃক নির্মমভাবে নিহত হয়েছিল, আমিনা বেগম ঘসেটি বেগমকে ঢাকার অদূরে বুড়িগঙ্গায় ডুবিয়ে মারা হয়েছিল। মীর জাফর আলী খান এক ধরনের মারাত্মক কুষ্ট ব্যাধিতে মারা যান এবং তার পুত্র মীরণ বজ্রপাতের মাধ্যমে ইহজীবন ত্যাগ করেন। মীর কাসেম আলী খানের মৃতদেহ দিল্লীতে আজমিরি গেইটের নিকটে রাস্তায় পাওয়া গিয়েছিল। রবার্ট ক্লাইভের তৈরী পদক প্রাপ্তদের চুড়ান্ত তালিকায় নিজের নাম দেখতে না পাওয়ায় উমিচাঁদ হৃদক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান। মুঙ্গের দূর্গের শীর্ষ থেকে জগৎ শেঠ রায় দুর্লভ মীর কাসেম আলী খান কর্তৃক গঙ্গায় নিক্ষিপ্ত হন। মহারাজ নন্দকুমারকে ওয়ারেন হেস্টিংস এক মিথ্যা মামলার আসামী করে ফাঁসি দেন। নাটকের মূল নায়ক ক্লাইভ স্বয়ং আত্মহত্যা করে মৃত্যু বরণ করেন। পলাশীর বিয়োগান্ত নাটকের নায়ক নায়িকাদের জীবনের এটাই ছিল নির্মম পরিণতি। ইতিহাস ইতিহাস, আরব্য রজনী এটা নয় (সেতুবন্ধন, ডাঃ এম শুকুর, পৃষ্ঠা ৫৬/৫৭, প্রকাশকাল ১৯৯২, ১লা এপ্রিল)

তাইত দেখি, ১৯৭১ সালের ভারত বাংলাদেশ ও পাকিস্তান নাটকে যে তিন মহারথী প্রধান ভূমিকা পালন করেছিলেন, তাদের তিনজনই ঘাতকের হাতে নিহত হয়েছিলেন। শুধু তাও নয়, এই তিনটি পরিবার আজ এক মহা ত্রাস ও বিভিষিকার শিকার হয়ে পড়েছে। কিন্তু কেন? এরও জবাব দিবে ইতিহাস কিন্ত আল্লাহর মার বড় মার। এসব ব্যাপারে আল্লাহ কাউকে ক্ষমা করেন না। বাংলার এই নিরীহ মানুষের ভাগ্য নিয়ে যখনই যারা বেঈমানী করেছে হোক তারা দেশের কিংবা বিদেশের, ক্লাইভ, উমিচাঁদ, জগৎশেঠ, রাজবল্লব, নন্দকুমার, মীরজাফর, মীরন, ঘসেটি বেগম, ভুট্টো, মুজিব, প্রিয়দর্শিনী কেউ স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করে এই দুনিয়া ছেড়ে বিদায় নিয়ে যেতে পারেননি। আর তাইত দেখি ভারত বিভাগকালীন সময়ের প্রধান কারিগর লর্ড মাউন্টব্যাটেন সেদিন স্ববংশে নিহত হলেন উত্তর সাগরে ভাসমান প্রমোদ তরীতে আইরিশ সন্ত্রাসীদের পাতানো বোমার আঘাতে। ভারত বিভাগকালীন সময়ে লেডী মাউন্টব্যাটেনের কৃত পাপাচার পন্ডিত নেহরুর সাথে তার ফষ্টিনষ্টি মেলামেশার কথা না বললে ভারত বিভাগের মূল কারণ এবং ব্যাপারে প্রধান কর্মকর্তাদের পরিচয় তাদের কাজের স্বরুপ একদিন মানুষের স্মৃতি থেকে মুছে যাবে ( গ্রন্থ, ৫০/৫১ পৃষ্ঠা)

আশ্চর্য এই যে, এইভাবে ঐশী পরিকল্পনার মাধ্যমে যে ভূখন্ডকে কম্প্যুটারাইজড করে আনা হয়েছিল, তাকে চূর্ণিত করে দেবার জন্য যেসব কুচক্রীরা দিল্লী ও সিমলায় দৌড়াদৌড়ি করে তাদের নিজেদের নীল নকশা অনুযায়ী ভারতবর্ষকে ভাগ বন্টন করে, পরে র‌্যাডক্লিফ রোয়েদাদকেও নিজেদের সুবিধার্থে বদলে নিয়েছিলেন। তারা হচ্ছেন আর্ল মাউন্ট ব্যাটেন, লেডি মাউন্ট ব্যাটেন, তাদের কন্যা প্যামেলা (যিনি তখনো মিস ছিলেন), জওয়াহেরলাল নেহরু, স্যার সিরিল র‌্যাডক্লিফ, শ্রীমতি ইন্দিরা এবং ত্রিপুরার মহারাজার দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী স্বয়ং। এরা সবাই হচ্ছেন অভিশপ্ত। অভিশপ্ত বলছি একারণে যে, ওদের অধিকাংশই অপঘাতে মৃত্যুর শিকার হয়ে আগুণে পুড়ে ভস্মীভূত হয়ে গেছেন। উল্লেখ্য যে উত্তর সাগরে ভাসমান প্রমোদ তরীতে ভ্রমণরত অবস্থায় আইরিশ সন্ত্রাসীদের পাতানো বোমার আগুণে জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিলেন আর্ল মাউন্ট ব্যাটেন, লেডি মাউন্ট ব্যাটেন, প্যামেলা, প্যামেলার স্বামী এবং প্যামেলার শিশু সন্তানরা। শ্রীমতি ইন্দিরা নিহত হয়েছিলেন দিল্লীতে এবং তৎপুত্র সঞ্জয় মরেছিলেন আসমানে। (সেতুবন্ধন, ডাঃ এম এ শুকুর, ৬৫/৬৬ পৃষ্ঠা)।

কার্যত, রহস্যঘন এই ঘটনার পিছনে ঐশী পরিকল্পনা কাজ করে যাচ্ছিল। তাই বলবো যে, ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগষ্ট দিল্লী ও করাচীতে যে নাটক অভিনীত হয়েছিল এবং তা ১৯৭১ সালে ১৬ই ডিসেম্বর এখানে এই ঢাকায় যে, নাটকের পট পরিবর্তন হল, তার ‘শেষের পৃষ্ঠা’ আজো লেখাই হয়নি। সুতরাং এই নাটকের শেষের পাতায় কি আছে তা দেখতে হলে, আমাদের আরো কিছু দিন অপেক্ষা করতেই হবে। মিঃ জিন্নাহ বলেছিলেনঃ “No power on earth can undo Pakistan, it has come to stay”. কিন্ত শেষ পর্যন্ত চব্বিশ বছর যেতে না যেতে Supreme power on heaven and earth এর ইশারায় পাকিস্তান ভেঙ্গে দু’টুকরো হয়ে গেল।  কিন্ত কেন তা হল এবং এর পিছনে আরো কি কি আছে, তা আমাদের কারোরই জানা নেই।কবির ভাষায় বলতে গেলে বলবো যে,

ধ্বংস দেখে ভয় কেন তোর প্রলয় নুতন সৃজন বেদনআসছে নবীন জীবন ধারা অসুন্দরে করতে ছেদন” (সেতুবন্ধন , ৩১/৩২পৃষ্ঠা)।

নাজমা মোস্তফা, ৩১ ডিসেম্বর ২০১৫।

 

তথ্যসূত্র:

১. দ্যা টাইমস অব ইন্ডিয়া, (জুন ২০, ২০০৮)।

২. “একই ধর্ম একই ধারা” নাজমা মোস্তফা

৩. (আয়ার দানিশের কলাম থেকে কয়টি তথ্য, ১২ই আগষ্ট, ১৯৯৯, দৈঃ সংগ্রাম)

৪. (আহমদ শরীফ, প্রত্যয় ও প্রত্যাশা, ঢাকা ২৫শে বৈশাখ ১৩৮৬, পৃষ্ঠা ৪৪)।

৫. (তথ্যসূত্র: মুনীর চৌধুরী, সৈয়দ শামসুল হক, রফিকুল ইসলামের প্রকাশিত রণাঙ্গন, ১৯৬৬, পৃষ্ঠা ৪-১২৮)।

৬. (হুমায়ুন রশিদ চৌধুরীর সাক্ষাৎকার ও বাংলাদেশে ‘র’ আগ্রাসী গুপ্তচরবৃত্তির স্বরুপ সন্ধান, আবু রুশদ, পৃষ্ঠা ৪৯/৫০)।

৭. (দৈনিক ইনকিলাব, ৫ মে, ’৯০ সংখ্যা)।

৮. (সেতুবন্ধন, ডাঃ এম এ শুকুর, প্রকাশকাল ১৯৯২ ১লা এপ্রিল)

 

Advertisements

মুক্তিযুদ্ধে শহীদের প্রশ্নবিদ্ধ সংখ্যা ও কিছু গভীর কথা

লন্ডন থেকে প্রকাশিত  ২০১১ সালের ১৬-২২ সাপ্তাহিক সুরমা পত্রিকার একটি কলাম চোখে পড়ে, লিখেছেন রিটায়ার্ড এয়ার কমোডোর ইসফাক এলাহি চৌধুরী। লেখাটি ছিল একজন সৈনিক জীবনের  অধ্যায় যা আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের সাথে জড়িত। শত্রুর মাঝেও কেমন করে যে বন্ধু লুকিয়ে থাকতে পারে, এটি তার একটি উত্তম গল্প হতে পারে। ১৯৭১ সালের যুদ্ধের সময়, আজো মনে পড়ে মার্চ মাসের সেই মেঘের গুরুগম্ভীর গুড় গুড় আওয়াজের সাথে কেমন করে যে সেদিন মেশিন গানের আওয়াজ একাকার হয়ে যেত। মনে হতো যুদ্ধ যেন লেগেছে আকাশে বাতাসে প্রকৃতিতেও। মেঘের আওয়াজে যুদ্ধের আতঙ্ক যেন আরো বেড়ে যেত। এলাহি চৌধুরীর সেদিনের লেখাটিতে একজন ব্যক্তি সম্বন্ধে কথা উঠে এসেছে, তিনি হচ্ছেন কর্নেল নাদের আলী। যিনি ছিলেন পাকিস্তানের একজন সেনা কর্মকর্তা। তার ভেতর লুকিয়ে ছিল একটি মানবিক সত্য নির্ভর বিচারবুদ্ধিতে বিচক্ষণ একটি মন। ধারণা হয় হয়তো এরকম আরো অনেক সত্ত্বাই সেদিন ঐ সম্মুখ যুদ্ধে যোগদান করে। মনে পড়ে আমার বাবার কাছে শুনেছি তিনি তখন নামে দাগে একজন আসামী ডাক্তার ছিলেন, যাকে সারাক্ষণ পাহারায় রাখা হতো। সম্ভবত তার পেসেন্ট হয়ে আসে একটি মিলিটারী তার বুক পকেটে রাখা ছোট্ট বাচ্চাটির ছবি বের করে দেখায় আর আক্ষেপ করতে থাকে কবে যে যাব বা আদৌ যেতে পারবো কি না সে বেদনার কথাটিও সে ভিনদেশী শত্রুপক্ষের ডাক্তারের কাছে বিলি করে অকপটে। সেদিন যুুদ্ধরত  পশ্চিম পাকিস্তানের অনেক কলেজ ছাত্রও এসব বেদনার কথা উল্লেখ করতো যে তার প্রাথমিক ধারণাও ছিল না, এভাবে জড়িয়ে যাবে যুদ্ধে। পূর্ব পাকিস্তান আসার আগে এটি নাকি তাদের কাছে খোলাসা করা হয়নি।

একজন নাদের আলী, ১০ এপ্রিল থেকে অক্টোবরের প্রথম পর্যন্ত যুদ্ধে জড়িত ছিলেন, জানা যায় পরবর্তীতে তার কাজ থেকে অবসর নিতে তাকে বাধ্য করা হয়। এই যুদ্ধ তার মন মননের উপর বিরুপ প্রভাব ফেলে। তাই ত্বরায় তাকে ফেরত পশ্চিম পাকিস্তানে পাঠানো হয়। সেদিনের ময়দানে একজন সৈনিকের দৃষ্টিতে তার অনেক অপরাধ স্বদলের অন্যদের চোখে ধরা পড়ে কারণ তিনি নিরপরাধের প্রতি গুলি ছুড়তে রাজি ছিলেন না। সে হিসাবে তার অধস্তনকেও তিনি এ অপকর্মটি করতে বাধ সাধেন। তার যুক্তিতে কুলায় নাই যে নিরপরাধকে কেন গুলি ছুড়বো। এরকম পরিস্থিতিতে কি পরিমাণ মনোবল থাকলে একজন এমন দৃঢ়তর পদক্ষেপ রাখতে পারে সেটি ভাবনার বিষয়। অনেকের ইচ্ছা থাকলেও এটি করতে পারবে না। কারণ ঐ ধ্বংসাত্মক কাজ করার জন্যই তারা সেদিন উদ্ধত, সেখানে মমত্ব প্রকাশের সুযোগ ছিল শূন্যের কোঠাতে। তারপরও তার ভেতরের মানুষটি এতই প্রবল ছিল বলেই সে গুলি ছোড়ার আগে তার অপরাধ জানতে চেয়েছে। যখন জার্নালিষ্টরা লন্ডন পালিয়ে গিয়েও নানান খবরাখবর প্রকাশ করছিলেন, এসব খবর জেনে তার বিদগ্ধ মন নিজেকে আরো বড় আসামী হিসাবে চিহ্নিত করতে থাকে। এতে তিনি মনের দিকে আরো বিচলিত হন। যার প্রতিফলন ঘটে তার পরবর্তী জীবনের উপর। অস্ত্র ছেড়ে একদিন কলম হয় তার বন্ধু, কবিতা হয় তার সঙ্গি।

সত্য নির্মম হলেও তাকে প্রকাশ করাই যুগের দাবী। বেশ কিছু দিন থেকে অনেক লেখালেখি পাচ্ছি দেখছি শুনছি যা সচেতন বিবেককে নাড়িয়ে তুলছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের শরিক যোদ্ধা আমরা নিজেরাও। যুদ্ধের অনেক ইতিহাস আমরা চোখে দেখেছি, মোকাবেলা করেছি, মুখে মুখে শুনেছি। সে হিসাবে আমরা নিজেরাই কম বেশী ইতিহাস। আবার অনেক বাস্তবতার খবর যেমন জেনেছি তেমনি অনেক অতিরঞ্জনের খবরও জেনেছি। ভারতের একজন সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবি শর্মিলা বসু এর উপর সাম্প্রতিক কিছু গবেষণার কাজ করে দেখিয়েছেন। তিনি বাস্তব ময়দানে কাজ করে এর উপর তার যুক্তি পেশ করেছেন। শর্মিলা বসু খোদ বসু পরিবারের একজন সচেতন ব্যক্তিত্ব। তাকে একদম অবহেলা করে নাকসিটকে দূরে রাখারও কোন যুক্তি নেই। যদি তার গবেষণালব্ধ কাজে যুক্তি, বিবেচনা সচল থাকে, তবে অবশ্যই তার কাজ ইতিহাসে জায়গা করে নিবে। একে দূরে ঠেলে দেবার ফুরসত থাকবে না। এরকম একজনের কাজকে মূল্য না দেয়ার কোন কারণ নেই, তবে যে বিষয়টি নিয়ে তিনি নাড়াচাড়া করছেন ধারণা হয় এটি চলমান সময়ে অনেকেরই পছন্দ নয়। তাই যুক্তি তথ্য প্রকাশিত হলেও অনেক বিরুপ কথাও শোনা যাচ্ছে।

সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে তিনি একজন ভারতীয়, তার তো এ সম্পর্কীত তথ্য এভাবে দেবার কোন কথা ছিল না। বরং তার দৃষ্টিতে ভারতের স্বার্থকে বড় করে দেখার খাতিরে তার মুখ থেকে এর উল্টোটি বলার যুক্তি খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা অতিরিক্ত ছিল। তারপরও কেন যে তার মুখ থেকে এরকম যুক্তি বের হচ্ছে? ধারণা হয় সাংবাদিক জীবনের গভীর সততার মাঝে কাজকে ছড়িয়ে দেবার মানসেই তাকে এরকম কঠিন যুক্তির একটি কাজ করতে হয়। প্রকৃতই তার কাজটি ভারতের চলমান উল্টো স্রোতের টানে প্রবল টানাপোড়ানের মাঝে পড়েছে। তারপরও কিসের সন্ধানে তিনি এমন একটি কঠিন কাজ করেন, যার জন্য অনেকেই তাকে প্রশংসার দাবীদার করাই সঙ্গত বলে মনে করছেন। এখানের এ দু’জনের কাজের ধারা যেন এক জায়গায় এসে মিলে গেছে দু’জনা মানবতাকেই উচ্চে তুলে ধরেছেন। এদের কাছে কে মরলো বাঁচলো সেটি বড় কথা নয়। এরা নিজ কপট স্বার্থকে বিসর্জন দিয়েও মানুষের সমাজে থেকে মানুষের কথাই চিন্তা করেছে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে। পাকিস্তানের সৈনিকযোদ্ধা নাদের আলী যুদ্ধের ময়দানে আর শর্মিলা বসু গবেষনার ময়দানে কথাগুলি দুটি সময়ে কথা বললেও তাদের এক জায়গার মিল প্রকট, এরা নীতিকে সত্যকে তুলে ধরতে চেয়েছেন।

শর্মিলা বসুর গবেষনাধর্মী কাজটি হচ্ছেডেড রেকনিং: ম্যামরিজ অব দ্যা ১৯৭১ বাংলাদেশ ওয়ার১৯৭১ সালের স্মৃতিচারণ থেকেই উদ্ভুত। তার যুক্তিটি হচ্ছে আজ পর্যন্ত এর উপর তেমন কোন তথ্যবহুল বাস্তব কাজ হয়নি। শুধু কিছু অতিরঞ্জন, বানোয়াট বিকৃত তথ্যকে পূঁজি করে বাড়তি ফায়দা লুটার একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কলকাতার বিখ্যাত সুভাষ বসু পরিবারের মেয়ে শর্মিলা বসু মনে করেন ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের এসব ঘটনাকে অবলম্বন করে আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমেও অতিরঞ্জনের ধারণাকে ছড়িয়ে দেয়া হয়। শুরু থেকেই তিনি অন্য সবার  মতই প্রচলিত ধারণাতেই বিশ্বাসী ছিলেন। ঐ বিশ^াসেই সম্ভবত তিনি কাজে নামেন। যার কারণে তার এর উপর কাজ করার বাসনা জাগে। তার কাজের যুক্তি হচ্ছে তিনি বাংলা ইংরেজীতে প্রকাশিত সব যুক্তি তর্ক লেখা খুটিয়ে খুটিয়ে পড়েছেন। যুক্তি ও সূত্রে পাওয়া সে যুদ্ধে তিনি জড়িতদের ক্ষতিগ্রস্তদের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। যুদ্ধের দুটি পক্ষের সাথেই তিনি এর মোকাবেলাতে খানা খন্দক ঘুরে বেড়িয়েছেন। তার কাজ কোন একতরফা কাজ ছিল না। যদিও এটি প্রকাশের পর অনেকে এর উপর বিরুপ মন্তব্য করতেও শোনা গেছে। মনের মাঝে জেগে উঠা সত্য উদঘাটনের সূত্রে তার এ প্রচেষ্ঠা। যুক্তিতে একদম তৃণমূল পর্যায়ে তিনি খুঁজতে গিয়ে দেখতে পান এর বেশীর ভাগই অতিরঞ্জন, অসত্য ও বানোয়াট প্রচারণা। অনেক তথ্য বিকৃতভাবে প্রচার করা হয় এবং অনেক বাস্তব সত্য তথ্য চেপে যাওয়া হয়। একজন সাংবাদিক হিসাবে তিনি উদাহরণ হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সিবিএস সাংবাদিক লারা লগানের ঘটনাটি তুলে ধরেন। ২০১১ সালের সংগঠিত মিশরের তাহরির স্কোয়ারে আন্দোলনকারীরা বোঝা গেল এরা গণতন্ত্রের জন্য প্রাণ উৎসর্গকৃত। কিন্তু এসব গণতান্ত্রিক সংগ্রামের আড়ালেও কিছু ছলনা লুকিয়ে ছিল, সেটি পরে উন্মোচিত হয়। সেটি হচ্ছে সেখানে সেদিন কিছু নারী সাংবাদিকের উপর ভয়ানক হামলা চালানো হয়। আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম সেটি চেপে গিয়েছিল। কিন্তু লারার সাহসী পদক্ষেপে সে কাহিনী আর চাপা থাকে নি। উল্লাসরত আন্দোলনকারীরা তাকে ধর্ষণ করে, বিকৃত ছবি মোবাইল ফোনে ধারণ করে ও প্রচার  করে। তবে তার ভাষ্য থেকে জানা যায় একদল বোরকা পরিহিত নারীরা তাকে উদ্ধার করে। পরে সৈন্যরা তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের যুদ্ধেও একইভাবে এ দোয়ের টানাপোড়ানের অবস্থান শর্মিলার চোখে ধরা পড়ে।

শর্মিলার কথাকে এপিতে প্রকাশের আগে তিনি অনেক সাংবাদিক বিশেষজ্ঞকে এটি পড়তে দেন, তারা সবাই এর ভূয়শী প্রশংসা করেন। এদের অনেকেই এ সাহসের জন্য অগ্রিম অভিনন্দন জানিয়েছেন। তার যুক্তিটি হচ্ছে একপক্ষের চড়া আওয়াজের নীচে অনেক সত্য চাপা পড়ে আছে। যার জন্য একদল এর প্রকাশে চরম বিরোধীতা করে চলেছে। তারা চায় না এ চেপে রাখা ইতিহাসকে উগলে বের করে দিতে। কারন এর যুক্তি হিসাবে দেখা যাচ্ছে অনেকে না পড়েই এ বইটির বিরুদ্ধে বিরোধীতা করতে কুন্ঠিত হচ্ছেন না। তিনি বলছেন, তারা চাইছে যত কম লোক বইটি পড়বে ততই মঙ্গল। তাই তাদের পক্ষের ঢোলের বাড়ীর আওয়াজ বড় করে দেবার চেষ্টা চলছে। শর্মিলা বলছেন, কেউ কেউ তার কাজটিকে মনে করছেন পাকিস্তানী বাহিনীর সাফাই কাহিনী গাওয়া হচ্ছে। যার বিরুদ্ধে শর্মিলা খুবই সোচ্চার ছিলেন। তিনি এর প্রতিবাদ করে বলেন, এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা কারণ বইটিতে পাকিস্তানী বাহিনীর নির্যাতনের বাস্তব চিত্রও চিত্রিত হয়েছে। তবে তুলনামূলক বিশ্লেষনে প্রকৃত সত্য হয়তো বেরিয়ে এসেছে, যার জন্যই এক পক্ষের আওয়াজ অতিরিক্ত হচ্ছে। তিনি বড় গলায় দাবী করেন যুদ্ধের উপর দু’পক্ষের ভাষ্য নিয়ে তৃণমূল পর্যায় থেকে তথ্য সংগ্রহ করে এমন একটি কাজ এটিই প্রথম। মাত্র দুইজন মার্কিন ইতিহাসবিদ রিচার্ড সিশন ও লিও রোজ ২০ বছর আগে গবেষণাধর্মী একটি বই লিখেছিলেন। “ওয়ার এন্ড সিসেশন: পাকিস্তান, ইন্ডিয়া অ্যান্ড দ্য ক্রিয়েশন অব বাংলাদেশ” নামে বইটিও প্রচলিত ধারণার খন্ডন করেছিল কিন্তু তাদের রচনা সাধারণের কাছে পৌছায় নি, সেটি বিশেষজ্ঞ পর্যায়েই রয়ে গেছে।

শর্মিলা বসুর যুক্তিটি হচ্ছে প্রতিটি গোজামেলের সুষ্পষ্টতা থাকা উচিত। কি কারণে পাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলাদেশের সৃষ্টি হলো। কোন পক্ষের কি ভূমিকা ছিল, এর প্রকৃত কার্যকারণ সম্বন্ধে খোলামেলা আলোচনা হওয়া জরুরী। তাহলে কখনোই একতরফা ইতিহাস রচিত হবে না বরং প্রকৃত সত্য ইতিহাস বের হয়ে আসবে। এ যাবত ত্রিশ লক্ষ শহীদের উপর শেখ মুজিবের তত্ত্বটি বেশ জোরে সোরে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল, যদিও এর বিপক্ষে সচেতন সমাজ থেকে বহু আগেই কিছু হালকা কথা কানে এসেছিল বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠালগ্ন কাল থেকে। পরবর্তীতে বেশিরভাগ পত্রিকা মিডিয়াই ঐ ত্রিশ লাখ তত্ত্বের মাঝেই সচল রাখতে সোচ্চার ছিল। সত্যি কথা বলতে কি আমরা নিজেরা শুনেও না শোনার ভান করে ছিলাম। জানা যাচ্ছে কিছু বুদ্ধিজীবিরা যারা ঐ ত্রিশ লাখের প্রচারণার মাঝেই সাচ্ছন্দ্যবোধ করছিলেন তারা ইদানিং এতদসংক্রান্ত খবরে খুব ক্ষ্যাপেছেন অনেকেই। যার প্রেক্ষিতে সুভাষ বসুর এ উত্তরাধীকারীকে এর জবাব হিসাবে পাকিস্তানের চর বানাতেও কুন্ঠিত হচ্ছেন না। সত্য সময়ে সময়ে বড়ই বিস্বাদ ঠেকে। তারপরও সত্যকে উদ্ভাসিত হওয়াই যুগের নীতি। একে কিছুদিন দাবিয়ে রাখা চলে, তবে চিরদিন দাবিয়ে রাখা যায় না। একদিন না একদিন এর উন্মোচন হবার একটি সুযোগ থেকেই যায়।

একটি লেখাতে দেখলাম  বাংলাদেশের একজন সাংবাদিক তিনি হিসাব দিয়েছেন যে বাংলাদেশের যুদ্ধে যদি ৩০ লক্ষ মানুষকে মরতে হয় তাহলে যুদ্ধ চলেছে সাড়ে আট মাস সে হিসাবে ২৬৬ দিন এবং গড়ে প্রতিদিন গড়ে ১১ হাজারেরও বেশী মানুষকে মরতে হবে। এটি প্রমাণ না হলে এরকম একটি মিথ্যা কখনোই প্রতিষ্ঠা পাওয়া সম্ভব নয়। সে হিসাবে যে কোন বাংলাদেশীই এটি আঁচ করতে পারবেন কার কতজন বন্ধু পরিচিত আত্মীয় বর্গ যুদ্ধে মারা গিয়েছেন। লন্ডন প্রবাসি প্রয়াত সাংবাদিক সিরাজুর রহমানের অনেক লেখাতেও এর উপর যুক্তিনির্ভর কথা উঠে এসেছে। প্রতিটি ব্যাপারে স্বচ্ছতার দরকার। মিথ্যা দিয়ে ছলনা হয় ষড়যন্ত্র হয়, কিন্তু সঠিক বিচার হয় না। তাই আজো শোনা যায় বিচারের বানী নিরবে নিভৃতে কাঁদে। আজকের স্বাধীন দেশেও যেভাবে জনতারা লাশ হচ্ছে গুম হচ্ছে মনে হচ্ছে যুদ্ধ যেন আজো থেমে যায় নি। বরং বহুগুণ তেজে চল্লিশ পার করা সোমত্ত স্বাধীনতা নতুন মোড়কে আহত বিধ্বস্ত ক্ষতবিক্ষত আজো যুদ্ধরত।  চোখ কান খোলা রেখে পরখ করে নিতে হবে কি কারণে কার কারণে কি অপরাধে আজো তারা সর্বহারা, নতুন শতাব্দীর প্রথম যুগটি পার করা যুদ্ধরত দেশের প্রতিটি সচেতন সত্ত্বা। সত্যের সাথে নীতির সাথে কোলাকোলি হচ্ছে সততার  পথেচলা, ছলবাজকে মিথ্যাকে রুখে দাড়ানোও সততার দায়ভার। সবযুগেই একবিংশ শতকেও মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন এটিই। Andolon News | 22 Feb 2016 | মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের একত্রিশ লক্ষ / লাখ : বোললেন শেখ হাসিনা

আজকাল প্রায়ই মুক্তিযুদ্ধের ‘চেতনার নামে’ বিশাল গবেষনাসব দেখছি। সম্প্রতি খালেদা জিয়া ও গয়েশ^র রায় তাদের বক্তব্যতে শহীদের প্রশ্নটি তুলাতে বিভিন্ন মহলে বিশাল মাপের তোলপাড় শুনতে পাচ্ছি। সবদিনই তেতো সত্যকে গিলতে কষ্ট হয়। প্রশ্নের পর প্রশ্ন তোলা হচ্ছে কেন বিজয়ের মাসে এ কথা? জানা যাচ্ছে মুক্তিযোদ্ধা দল আয়োজিত সমাবেশে খালেদা জিয়া এটি উল্লেখ করেন যে শহীদের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক আছে। যুক্তি দেখানো হচ্ছে সত্য হলেও এসব প্রচার করা মানা, কারণ এসব ৪৪ বছর থেকেই প্রতিষ্ঠিত। এর জন্য সুপ্রিম কোর্টের এক আইনজীবী নাকি খালেদা জিয়াকে উকিল নোটিশও পাঠিয়েছেন। এর সূত্র ধরে অনেকেই কয়টি কারণ আঁচ করছেন, জামাতের গন্ধ,  পাকিস্তানের ফাঁদ, লন্ডন সফরের প্রভাব, নাকি মুখ ফসকে বলে ফেলেছেন। এর ফাঁক গলিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন তার স্বামী জিয়াউর রহমান একজন মুক্তিযোদ্ধা ও একজন সেক্টর কমান্ডার ছিলেন, এতে ঐ মুক্তিযোদ্ধারও অপমান হয়েছে। যাক কপাল ভালো তিনি এর ফাঁক গলিয়ে তাদের প্রচারিত রাজাকারকে সেক্টর কমান্ডার হিসাবে অবলীলায় স্বীকার করে নিলেন, কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে এ স্বীকার করাটা তাদের ফ্রেমে বাধাই করে রাখার মত বিষয় এটি। গয়েশ^র রায় বা খালেদা জিয়া কেউই সংখ্যাতত্ত্ব নিয়ে বেশী নাড়েন নাই বরং এর চেয়ে বহু বেশী নাড়া তৈরী করেছেন ভারতের শর্মিলা বসু ও অন্যরা। এবার কথা হচ্ছে প্রকৃত খবরে দেশবাসী অবগত নয় বলেই মনে হচ্ছে। কারণ এ ইস্যুটি মোটেও নতুন নয়, অনেক পুরোনো ইস্যু। আমরা স্বাধীনতার শুরুর সময় থেকেই শুনে আসছি। খালেদা জিয়া যদি লন্ডন থেকে জানেন, তবে সেটিও উনি অনেক পরে জানলেন। বাস্তব কথাটি হচ্ছে, মুখ ফসকে খালেদা জিয়া বলেন নাই, ঐ মুখ ফসকে কথাটি বলেছিলেন শেখ মুজিব নিজে। এবার গণতন্ত্রের বোতল পুরোটাই উল্টে দিতে এ ইস্যুকে হাইলাইট করা হচ্ছে ঘেরাও কর্মসূচি দিয়ে, হামলা মামলা দিয়ে।

সাম্প্রতিক ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ এন্ড এনালাইসিস উইং এর সাবেক অফিসার আর কে যাদব একটি বই প্রকাশ করেন। তাতে তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে “র”এর কৃতিত্ব দেখাতে চান, তার কারণ যা ভারত ৪৪ বছর থেকে ঢেকে রেখেছে। তাই ২০১৫এর বাংলাদেশের বিজয় দিবসে তিনি বাড়তি সরব। যুদ্ধে দুটি পর্যায় ছিল একটি গেরিলা যুদ্ধ আর পরেরটি ভারতের সরাসরি যোগদান। পূর্ব পাকিস্তানের নদীনালাপূর্ণ জলজ পরিবেশে অভিযান করার মত সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষণ তাদের তখন ছিল না। এর আগের ৬২ ও ৬৫ এর পরাজয় মনের মাঝে সচল ছিল। পূর্ব পাকিস্তানের বেশিরভাগ অংশে মুক্তিযোদ্ধারাই চালিয়ে যায় ঐ গেরিলা যুদ্ধ। মেজর জলিলের বইতে এসব অনেক সত্য এসেছে। অতপর মুক্তিযোদ্ধাদের পাশাপাশি মেজর উবানের নেতৃত্বে গড়ে তোলা হয় মুজিব বাহিনী নামে আর এক দল, যারা যুদ্ধে অংশ নেয়ার সুযোগ পায়নি। তার আগেই যুদ্ধ শেষ হয়ে যায়। গোয়েন্দা লেখক যাদবের কৃতিত্বের আদ্যপাঠ জেনে অনুবাদক আমান আব্দুহু মন্তব্য করেছেন এতদিন শুনলাম শেষ তেরদিন ছিল ভারতের যুদ্ধ আর এখন জানলাম পুরোটাই ভারতের যুদ্ধ। বেদনাহত মনে তিনি আরো বলেন, ওদিকে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে মুক্তিযুদ্ধের কিচ্ছাকাহিনীর নামে চাপাবাজির প্রসঙ্গে আজ আমরা আর না যাই। যেভাবে গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের কাপড় খুলে যাচ্ছে মনে হচ্ছে বরং উল্টো এখন জয় বাংলা বলে নিজেদের চোখ ঢাকতে হবে আর কি।” এবার বিচারপতি মানিক ও সারিবাধা সব ঘেরাও কমিটির বক্তারা কি ভারতকে ঘেরাও করতে ছুটবেন নাকি ইতিহাসকে সত্যতার মাপকাঠিতে মূল্যায়ন করবেন নাকি এতদিনের চেপে রাখার আসল কারণটি উদ্ধার করবেন। চেপে রাখার মাঝে কোন সমাধান নেই। সব ষড়যন্ত্রকে শক্ত হাতে সত্য শক্তিতে মোকাবেলা করুন।

ইতিহাসকে কোনভাবেই চাপা দিয়ে রাখা সম্ভব নয়। এটি একদিন না একদিন বের হবেই। কোন কিছুকে চাপা দিয়ে রাখলেই কি মহত কাজ মনে করতে হবে। বরাবরের মত একজন প্রশ্নবিদ্ধ বিচারপতিও ময়দানের মিছিলের সারিতে আগুয়ান। যুক্তির কথাটি হচ্ছে সত্যের স্বার্থে প্রতিটি ক্ষেত্রে কি ধর্মে কি রাজনীতিতে ইতিহাসের উন্মোচন জরুরী। কুরআন বলে “ওহে যারা ঈমান এনেছ! আল্লাহর জন্য দৃঢ় প্রতিষ্ঠাতা হও, ন্যায়বিচারে সাক্ষ্যদাতা হও। আর কোন লোকদলের প্রতি বিদ্বেষ তোমাদের যেন ন্যায়াচরণ না করতে তোমাদের প্ররোচিত না করে। ন্যায়াচরণ করো, এটিই হচ্ছে ধর্মভীরুতার নিকটতর। আর আল্লাহকে ভয়শ্রদ্ধা করো। নিঃসন্দেহ তোমরা যা করছো আল্লাহ তার পূর্ণ-ওয়াকিবহাল” (সুরা আল-মাইদাহএর ৮ আয়াত)। উকিল নোটিশ পাঠানোর বিচারকসহ বাংলাদেশের মুসলিম প্রধান জনতাকে তাদের সিলেবাসের এ সত্যতাকে স্বীকার না করার কোন অবকাশ নেই। সেটি যদি একজন গায়েশ^র রায়ও মেনে চলেন, দ্বিগুণ মাপে ধন্যবাদ তার জরুর পাওনা হয়।

১৯৭১ নিহত বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিলেন মেজর অবঃ কামরুল হাসান,

নাজমা মোস্তফা,   ২৮ ডিসেম্বর ২০১৫।

 

গণতন্ত্র কি গাছে ধরে, না খায়?

8aগণতন্ত্র এমন এক তন্ত্র যা বর্তমান বিশ্বের গণমানুষের বেশি পছন্দের নাম। এ তন্ত্রটি গোটা সমাজের মানুষের কথা ভাবে, তাদের মতের ওপর চলে এবং তাদের দ্বারাই পরিচালিত হয়। অনেকে ভুলভাবে মনে করে থাকেন, গণতন্ত্র বুঝি ইসলামের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বস্তুত ইসলামই গণতন্ত্রের শিকড় কথা, গণতন্ত্রই এর মূল বাণী। ইসলাম একটি জীবন বিধান বলেই এটি তাদের জীবনের রুটিনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে লেগে থাকা এক বিধান। জনতার স্বীকৃতিতেই একজন জননেতা নির্বাচিত হবেন ও পদত্যাগ করবেন। যে মুহূর্তে জনতার সমর্থন তিনি হারিয়ে ফেলবেন, তার সেখানে থাকার কোনো অধিকার নেই, এটিই ইসলামের নীতি। বর্তমান মধ্যপ্রাচ্যের দিকে তাকালে অনেকে মনে করতে পারেন সেখানে কেন স্বৈরতন্ত্রের অতিরিক্ত হালচাল। ইতিহাস বলে, এ কপট শাসন কূটকৌশলের নামে বহু আগে থেকে সেখানে রাজনীতির ময়দানে অপকর্ম বলেই আজ অবধি শক্তিশালী অবয়বে টিকে ছিল, যা ইদানীং আরব স্প্রিং বা আরব বসন্তের ঝড়ে ভেঙে পড়ছে। গণতন্ত্রের মূল প্রবক্তা আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সা.)। পবিত্র কোরআনে ও বাইবেলে একটি পাথরের উল্লেখ পাওয়া যায়, তাকে বলা হয় কালোপাথর বা হাজরে আসওয়াদ, যেটি মক্কার কাবা শরীফে আজও আছে। পরে সেই একই স্থানে যখন গৃহ সংস্কারের প্রয়োজন পড়ে তখনও দেখা যায় সবাই এর সমাদর করত এর ঐতিহাসিক যোগসূত্রের জন্য। এটি নবী ইব্রাহিম (আ.)-এর জীবনের সঙ্গে জড়িত এক উপাদান। অনেক নবীকে এই যোগসূত্রের জন্যই মুসলিমরা একে সবদিনই সম্মান করে, তবে কখনোই এ সম্মান পূজার উদ্দেশ্যে করা হয়নি।

যখন আরবের কুরাইশরা মনস্থ করে কাবাগৃহের পুনঃনির্মাণের, তখনই কিন্তু বিতণ্ডা বাঁধে কে সেই মর্যাদাবান কালো পাথরকে সরাবে। সব গোত্রই উদগ্রীব সেটি সরাতে। এই বিতণ্ডা তখন ঘোর বিপদের যুদ্ধরূপ ধারণ করে। এভাবে চারদিন কেটে গেলে পর যখন অস্ত্র হাতে প্রতিপক্ষরা উন্মাদপ্রায় জটিল অবস্থানে, এমন সময় কুরাইশ নেতা শ্মশ্রুমণ্ডিত বৃদ্ধ আবু উমাইয়া সবাইকে আশ্বস্ত করে একটি ফয়সালার কথা বললেন। ফয়সালাটি হচ্ছে—‘যে আজ সকালে সবার আগে কাবা গৃহে প্রবেশ করবে তার ওপরই এর মীমাংসার ভার দেয়া হবে।’ নেতার ওই নির্দেশকে সমাধান হিসেবে নিয়ে সেদিন সবাই যখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল, ঠিক তখনই অকস্মাত্ তাদের সবার প্রিয় ব্যক্তিত্ব আল-আমিনের আবির্ভাব হয় কাবা প্রাঙ্গণে। সহসা সবার কণ্ঠে আনন্দধ্বনি উচ্চারিত হয়। আরব জাতি তাদের এমন একজনের সততায় মুগ্ধ হয়ে তাকে ‘আল-অমিন’ বলেই সম্বোধন করত। চারিত্রিক সৌন্দর্যের জন্যই তাকে এমন সম্বোধন করা হতো তার ছোটবেলা থেকেই। ‘আল-আমিন’ অর্থাত্ বিশ্বাসী, আর ওই আগত জন ছিলেন মুহাম্মদ (সা.)। সে সময় তিনি তাদের কাছ থেকে এ জটিল বিষয় জেনে বিচক্ষণতার সঙ্গে প্রত্যেক গোত্রের একজন করে দলপতি হিসেবে প্রতিনিধি নির্বাচন করেন। এবার তিনি একটি চাদরে নিজে ওই পাথরটি স্থাপন করে প্রতি গোত্রের গোত্রপতিকে ওই চাদরের কোণে তুলে ধরে স্থানান্তরের নির্দেশ দেন এবং যথাস্থানে গেলে পরে তিনি নিজে সেটি সঠিক স্থানে স্থাপন করেন। এতে তখনকার আরবরা এক মহাসঙ্কট থেকে মুক্ত হতে পেরে তাকে লোকেরা আস্-সাদেক বা সত্যবাদী বলে সম্বোধন করতে থাকে। তাছাড়া ওই কালোপাথর সরানোর ঘটনাতেই গণতন্ত্র লুকিয়ে ছিল কিনা, পাঠকরা লক্ষ্য করুন। গণতন্ত্র মানে সবার সমান অধিকার নিশ্চিত করা। পরবর্তী সময়ে বয়স চল্লিশ হলে পরে আল্লাহ তালার কাছ থেকে তার ওপর নবুয়তির আদেশ আসে। ধর্ম বলে, ইতিহাস বলে তিনি একদিনের জন্যও ওই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ থেকে বিচ্যুত হননি।

শেখ হাসিনা এবং তার দলের আধিপত্য দ্রুত শেষ হবে

 

বাংলাদেশ একটি মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল, সেখানে সেটি কি বর্তমান সময়ে রক্ষিত হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে? কথায় কথায় প্রধানমন্ত্রী বলছেন, ‘অন্য গণতান্ত্রিক দেশের পথ অনুসরণ করে এদেশে নির্বাচন হবে।’ গণতন্ত্রের উদাহরণ হিসেবে বলছি, ‘বস্তুত বিরোধী দল নয়াপল্টনে সমাবেশের অনুমতি পায়নি।এসব হচ্ছে ভুল গণতন্ত্রের পথচলা। সম্পাদক, নেতানেতৃত্বের ডাণ্ডাবেড়ি পরানো, কথায় কথায় হুমকিধমকি দেয়া, রিমান্ডে নেয়ার নামে শারীরিক, মানসিক আত্মিক নির্যাতন চালানো কি গণতন্ত্রের নমুনা? বলা চলে রাজনীতির প্রাসাদ ক্ষমতা কুক্ষিগত করার জন্য এমন কিছু বাকি নেই যা করা হচ্ছে না। বিরোধী দল সম্মেলন করতে চাইলে সব যোগাযোগ মাধ্যম অচল করে দেয়া হয়। হোটেলরেস্তোরাঁ বন্ধ রাখা হয়। শত আপদেবিপদেও দেশের মানুষ মুখ খুলতে পারবে না। সভাসমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। তারা বলছেন, খোলা ময়দানে সভা করার অনুমতি দেয়া হবে না। যেখানে তারা গেলে পরে প্রায় দু দিন হরতাল করে দেশ অচল করা ছিল নীতির অংশ কিন্তু বিরোধী দল হলে সবই হতে হবে একতরফা। গণতন্ত্রের মুখে প্রচারিতএকের বদলে দশটি লাশ ফেলা’, ‘লগি বৈঠার তাণ্ডবেদেশ অচল করে তোলা এসব কি গণতন্ত্রের বুলি বলে মনে হয়? গোটা দেশে একদল গুণ্ডা লালন করে পুলিশ র্যাবের ছায়ায় সন্ত্রাসীদের লালনপালনে আজও প্রতিদিনের প্রতিটি পত্রিকার পাতাই রঞ্জিত হয়ে থাকে রক্তের নদীতে। বিগত সাড়ে চার বছরের শাসনামলে শত শত নিরপরাধ মানুষের মৃত্যু, যেন শক্তিমানের দৃষ্টিতে স্বাভাবিকের চেয়েও স্বাভাবিক কিছু! মাসের পর মাস শাহবাগীরা গণজাগরণ মঞ্চ করার আশকারা পায়, ওতে সরকারের নিপুণ হাতের পরশ পড়ে। কিন্তু হেফাজতিরা একরাতও পার করতে পারেন না। এসব কি গণতন্ত্রের না একতরফা স্বৈরতান্ত্রিক নমুনা, গোটা বিশ্বই এসব পর্যবেক্ষণ করছে।

এ সরকারের গোটা শাসনামলেই গণতন্ত্রের লণ্ডভণ্ড দশা। বিমানবন্দর থেকে জিয়ার নাম মুছে দেয়া হলো। গভীর রাতে পাল্টে ফেলা হলো সাইনবোর্ড। বিমানবন্দরে পাবলিক উইং কমান্ডার সাইদুর রহমান জানান, রাত সাড়ে আটটার দিকে বাংলা, ইংরেজি আরবি সাইনবোর্ড পরিবর্তনের কাজ শুরু করা হলো। রাতের মধ্যেই নতুন সাইনবোর্ড লাগানো শেষ হবে। রাত একটার পর নিয়ন সাইন ওঠানোর কথা। উল্লেখ্য, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে এর নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়। বিমানবন্দরটি রাষ্ট্রপতি জিয়ার উদ্বোধন করার কথা ছিল কিন্তু তার আগেই তিনি শাহাদত বরণ করেন। বিচক্ষণদের লেখাতে এসেছে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ভারত থেকে ফেরার ১৩ দিনের মাথায় তিনি নিহত হন। প্রধানমন্ত্রীকে জিয়াই উদ্যোক্তা হয়ে ভারত থেকে দেশে ফেরত নিয়ে আসেন।  তত্কালীন রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আব্দুস সাত্তার বিমানবন্দরের উদ্বোধন করেন। এই মহান নেতার প্রতি কোটি কোটি মানুষের ভালোবাসা ও আবেগের প্রেক্ষাপটে জিয়াউর রহমানের নামে বিমানবন্দরটির নামকরণ করা হয়। প্রধানমন্ত্রী একজন মহত্ মানুষকে সম্মান দিতে কেন এত কৃপণ হলেন? বরং তিনি বড় গলাতে বলেছেন বিএনপিকে শিক্ষা দেবার জন্য এটি করা হয়েছে। একইভাবে ‘আমার দেশ’ নামের পত্রিকাটিকে তিনি বেশ একহাত দেখিয়ে দিলেন। এসব কাজ যে গণতন্ত্রের ময়দানে নেতিবাচক কাজ হয়, তারা ওই ধান্ধাতে নেই। বাস্তবিকই এতে গণতন্ত্রের কবর রচিত হয়। তথ্যমন্ত্রী অকপটে চতুরতার সঙ্গে মিথ্যা বলছেন যে, পত্রিকা প্রকাশে কোনো বাধা নেই। কিন্তু বাস্তবে সেখানে সিলগালা লেপে দেয়া হয়েছে, নতুন আবেদন ও এসবি ক্লিয়ারেন্স ছাড়া বিকল্প প্রেসেও ‘আমার দেশ’ ছাপতে দেয়া হচ্ছে না। ডজনের উপরে সম্পাদকরা একজন নির্দোষ সম্পাদকের মুক্তি ও তার প্রেস খুলে দেয়ার দাবি করছেন, মিডিয়ার উপর এসব অনাচারের বিচার চাচ্ছেন, কিন্তু গণতন্ত্র মরার ভান করে পড়ে আছে। বিশিষ্টজনরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রীই সংলাপের সম্ভাবনা নষ্ট করছেন, ওই তত্পরতাতেই তিনি ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। রাজনীতির ওই ‘গণতন্ত্র’ শব্দটির অর্থ, ব্যাখ্যা আরও মনোযোগের সঙ্গে আয়ত্তে আনা সময়ের দাবি। কে পরীক্ষাতে পাস করল আর কে ফেল করল তার চিন্তা না করে সরকারের নিজের স্ক্রিপ্টের দিকে নজর দেয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। কথা হচ্ছে ওই বিমানবন্দরের নাম পরিবর্তনের জন্য সরকারের প্রায় ১৪শ’ কোটি টাকা খরচ করতে হয়েছে। সারা বিশ্বে এ পরিবর্তন আনতে এ খরচ হয়। এ টাকা দিয়ে এমন গরিব দেশে কতটুকু করা যেত তা একটু ভাবুন জনগণ। এসব হচ্ছে একবিংশ শতকের ডিজিটাল বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ধারার নমুনা! এসব কৃতকর্মের জন্য সরকারের মোটাদাগে নম্বর কাটা যাবার কথা।

27 May 2016 | সঠিক পথে নেই বাংলাদেশ : ব্রিটিশ এমপিদের উদ্বেগ

এমন কোনো সেক্টর নেই যেখানে হতাশা বিরাজ করছে না। পদ্মা সেতুর রাঘববোয়ালরা দুর্নীতিতে বিদেশে ধরা খেলেও দেশে তাদের বিশিষ্ট চোরদেরে আসামির লিস্টেও তোলা হচ্ছে না। বরং উল্টো প্রচার করা হয়েছে এরা পূত-পবিত্রজন, এদের গায়ে আঁচড় লাগতে নেই! কারণ এ দেশ বর্তমানে গোটা বিশ্বের বাইরে নীতির বাইরে অবস্থান করছে। সবাই ধারণা করছে এর গভীরের কারণ আরও গভীরে প্রোথিত, যা উন্মোচন করলে প্রধানের গায়ে ছিটকে কাদা লাগে। যার কারণেই ওই বিশিষ্ট জনদের পবিত্রতার সিলগালা লাগিয়ে প্রচার করতে সরকার তত্পর। এত নাড়াচাড়ার পরও কেমন করে এসব মন্ত্রী পবিত্র থাকেন, দুর্গন্ধে বিদেশেও টেকা দায়! বিস্মিত বিশ্বব্যাঙ্কও বলছে, দুদকের এজাহারে চার প্রভাবশালীর নাম থাকা উচিত ছিল। বস্তুত ওই আত্মপ্রচারী গণতন্ত্রী সরকার ওই অনুচিত কাজটি করেছে ফাঁকা বুলি নীতির ধারক হয়ে। তথ্যমন্ত্রী ও ডিসির মিথ্যাচারে সাংবাদিকরাও গোষ্ঠীবদ্ধ হয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন যে, গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে উপহাসে পরিণত করেছে সরকার। ক্ষমতাকে আঁকড়ে থাকার রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েছে সরকার, লাজ-লজ্জা সব বিসর্জন দিয়ে হলেও অপকর্ম জেনেও অপকর্ম করছে। আর সঙ্গের দলবাজ মন্ত্রীরা ওই তালিতে হাততালি দিয়ে বেড়াচ্ছেন। মাহমুদুর রহমানের মুক্তির দাবিতে সারা দেশে জনতা সোচ্চার, বাগেরহাটে ১৩১ আইনজীবীর বিবৃতি কিন্তু সরকার কুম্ভকর্ণের ঘুম দিচ্ছে, এসব ধারার নষ্ট গণতন্ত্রই বাংলাদেশে বহাল রয়েছে। সংসদে এমপি গোলাম মোস্তফা বলতে গেলে সরকারকে হুমকি দিয়েছেন, ‘‘মাহমুদুর রহমানকে মুক্তি দিন, নয়তো পালানোর পথ পাবেন না’। তিনি বলেন, সরকার গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না, ছাত্রলীগ যুবলীগের কোপে চাপাতির কোপে সারাদেশ ক্ষতবিক্ষত। সারাদেশে একই সুরআওয়ামী লীগ বিশ্বচোরস্বৈরতন্ত্র ব্যতিরেকে কোনো গণতান্ত্রিক সরকার এটি করতেই পারে না। দৈনিক আমার দেশ, সাথে দিগন্ত টিভি, ইসলামিক টিভি, সাগররুনি, ইলিয়াস, আমিনুল, চৌধুরী আলম সবাই সরকারের স্বৈরাচারী অপকর্মের কুফলের শিকার। শুুধু এরাই নয় আরো সারিবাধা উদাহরণ হয়ে আছে শত শত।  একই দাবি সংবাদপত্রের কালো দিবসে সিএমইউজের আলোচনায় এসেছে। যে অর্থমন্ত্রী কথায় কথায় ‘রাবিশ’ আর ‘বোগাস’ ছাড়া মনে হয় বোঝেন কিছু কম, এবার তারও মাথা নড়ছে, বলছেন সিটি নির্বাচনের ফলাফল এটি অশনি সংকেত!

এরই মাঝে শক্তির দাপটে করা হয়েছে বিরোধী দলকে শায়েস্তা দিতে সন্ত্রাসবিরোধী আইন। এমনিতেই পুলিশের হাতে বিপুল ক্ষমতা, যে পুলিশের ক্ষমতার দাপটে এর মাঝেই মানুষ রক্তেলাল। গণতন্ত্রের কবর দিয়ে এবার হবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের মাধ্যমে সরকারের ইচ্ছার ষোলকলা পূর্ণ করা। সিটি করপোরেশন মেয়র নির্বাচনে গো-হারা হেরেছে যদিও সরকার পক্ষ, তারপরও তারা খুশি। কারণ যে অপকর্ম তারা করেছে তারা জানে আরও নিচে ধস তাদের নামার কথা। খবরে প্রকাশ, তাই বলে তারা একদমই ধোয়া তুলসীপাতা হয়ে যায়নি, মানুষের স্বভাবস্বরূপ সহজে বদলায় না। এ নির্বাচনেও পুলিশ ও র্যাবকে যথারীতি ব্যবহার করতে তারা কসুর করেনি। এ দুটি বাহিনীর বিরুদ্ধেও সন্ত্রাসীদের মতো কর্মতত্পর হতে অভিযোগ উঠেছে বহুদিন থেকে। এবারের সিটি নির্বাচনেও তাদের তত্পরতা লক্ষ্য করা গেছে। ১৮ দলের শত শত ভোটারকে তারা ভোটকেন্দ্রেও ঘেঁষতে দেয়নি, এসব অভিযোগকে এড়িয়ে যাওয়া ঠিক নয়। আর এটি তাদের জন্য খুবই বাস্তব একটি ঘটনা। ভোট কেন্দ্রের চৌহদ্দি থেকেও এরা অনেককে বের করে দিয়েছে। র্যাব পুলিশকে দাড়িওয়ালা টুপিওয়ালা কাউকে দেখলে ব্যবস্থা নিতে দেখা গেছে। খুলনায় ১০ জন দাড়ি টুপিওয়ালাকে র্যাব আটক করে, তারা ভোটকেন্দ্রে যেতে পারেননি। এমন কি র্যাবের হাতে নির্যাতিত হয়ে একজন ইসলামী আন্দোলনের কর্মী মারাও গেছেন। তাদের সামনেই আওয়ামী ক্যাডাররা ব্যালটবাক্স ছিনতাই করে নিয়ে গেছে। পরে সে বাক্সই উদ্ধার হয়েছে। ওই ফাঁকের সময়ে সিলমারা ব্যালটে ভরে দেবার সুযোগ তারা কাজে লাগিয়েছে।  তাই হিসাবের অনুপাতে তারা অনেক বেশি ভোট পেয়েছে। তাই হেরেও তাদের খুশি থাকার কথা।

তারপরও প্রধানমন্ত্রীর মুখে তত্ত্বাবধায়ক সহনশীল হচ্ছে না। উপরন্তু দম্ভ প্রকাশিত হচ্ছে যে, তাদের মতো একটি বিচারিক দল ক্ষমতাতে ছিল বলেই নাকি এত ভালো নির্বাচন পেয়েছে দেশবাসী। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই তত্ত্বাবধায়ক মানতে রাজি নয়। এখানেই বাকিদের শঙ্কিত হবার কথা লুকিয়ে আছে। কেন তিনি সেটি মানছেন না? এতদিনে কারণটি দেশবাসী ভালো করেই জেনে গেছে। তারপরও শঙ্কা আর কমছে না, এবার ‘শ্যাম রাখি না কুল রাখি’। গণতন্ত্রের কবর রচনা করলে সবদিকেই মহামরণ অপেক্ষা করে স্বৈরাচারী শাসকের জন্য। প্রধানমন্ত্রী জোর গলায় প্রচারে নেমেছেন এবার প্রমাণ হয়ে গেছে, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন দানের সরকারের বিরল কৃতিত্ব। বিজিতরা অতীতের প্রতিপক্ষের মতো সূক্ষ্ম কারচুপি আর স্থূল কারচুপি বলেনি বলেই প্রতিপক্ষ শুদ্ধ হয়ে গেল এমন মনে করার কি কোনো কারণ আছে? সরকার বলছে এবার প্রমাণ হয়ে গেছে যে, এ দেশে আর অসাংবিধানিক সরকারের প্রয়োজন নেই। তাহলে নাকি নির্বাচন হবে না। এটিও এক বড় চাল। শেষের খেলটাতে যে এরা নীতি নৈতিকতার অল্প যেটুকু বাকি রেখেছে ওটুকু পুরোটাই জলাঞ্জলি দেবে সেটি আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এটি তাদের এসব আচারে সুস্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে। নইলে সহজ সমাধানের মূলে যেতে এত নাকে-কানে খত কেন? এখনো প্রধানমন্ত্রী স্বপ্নে আছেন পরের বার যদি র্যাব, পুলিশ, যুব, ছাত্রলীগ দিয়ে পার পাওয়া যায়! নিরাশার আঁধারে ওটুকুই ভরসা, দুর্জনের সহজে সুমতি হয় না। নেত্রী বলছেন আমরা চাই বাংলাদেশে এমন একটি ব্যবস্থা নিয়ে আসা যেখানে নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ হবে। এরকম একটি রাজনীতির কথা ও বাস্তবতার মাঝের গ্যাপটি যে কত বড় সেটি ভুক্তভোগীরাই জানেন। দেশবাসী এ অঙ্ক চোখ বন্ধ করেই কষতে পারেন, এটি কোনোদিনও হবে না। যতদিন এখানের ছলবাজ মানুষ ও সন্ত্রাসীগুলো মন ও মননে শুদ্ধ হবে না ততদিনে এসব সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। অবাধ নির্বাচন চাইলে, সবার জন্য সমান নীতি হলে মাহমুদুর রহমান আর দিগন্ত টিভি ইসলামিক টিভি খাঁচাতে থাকত না। বনের পাখি বনেই বাস করত। আপনারা মিথ্যা বুলি দিয়ে আর বোকাদের ঘুম পাড়ানিয়া গান শোনাতে যাবেন না। মনে হয় ওই মনভোলানো গান আর ওরা গিলবে না। এটি ঠিক রাজনীতির গুণ্ডারা নিতান্ত ঠেকায় পড়াতে এবার কিছু লগিবৈঠাতে ধার দেয়ার সুযোগ পেয়েছে কম, বুঝতে পেরেছে এবার রক্ষা নেই, মানুষ জেগে উঠেছে। তাছাড়া চট্টগ্রামে গুণ্ডামি করতে গিয়ে এরা মাত্র কিছুদিন আগে শত শত উত্তমমধ্যম খেয়েছে জনসাধারণের হাতে, ওসব ছিল নিজেদের আক্কেল সেলামির খোদায়ী দণ্ড। 

বলা আছে, ‘চোরের দশ দিন সাধুর এক দিন’। যেমন আজকাল অনেক জায়গাতেই মন্দির ভাঙতে গিয়ে তারা ধরাও খেয়েছে, এর কারণ মানুষ জেগে উঠেছে। মানুষ যদি সঠিক ও সত্ থাকে, অনেক দুর্যোগই তারা এড়াতে পারবে। আর ধূর্তরা, ছলবাজরা, অপকর্মধারীরা ভেতরে বাইরে সবদিকেই মার খাবে, এটিই বাস্তব জীবনের নীতি। কিন্তু শর্ত হচ্ছে বাস্তবিকই জনতাকে সত্ ও তত্পর থাকতে হবে। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় সাংবাদিক সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব জার্নালিস্ট (আইএফজে) মন্তব্য করে পত্রিকা ‘আমার দেশ’ বন্ধ করার যে অজুহাত সরকার ব্যাখ্যা করছে তাতে বাংলাদেশের জনতাদের দ্বিমত লক্ষণীয়। সরকারের যুক্তিকে তারা মানতে পারছে না। সরকার বেআইনিভাবে পত্রিকা বন্ধ ও তার সম্পাদককে গ্রেফতার করেছে। এসবই রাজনৈতিক খেলা, কোনো পেশাদারি ত্রুটি এটি নয়। বাংলাদেশ সংবিধানের ৩৯(২)(খ) অনুচ্ছেদে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত থাকলেও বাস্তব বড়ই করুণ কথা বলছে। অধিকারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী জানুয়ারি ২০০৯ থেকে ৩০ এপ্রিল ২০১৩ পর্যন্ত ১২ সাংবাদিক নিহত, ৫৭৮ আহত, ২১১ লাঞ্ছিত, ৭৪ জন হামলার শিকার, ৮ জন গ্রেফতার, ৩ জন অপহৃত, ২ জন নির্যাতিত, ২৫৯ জন হুমকির শিকার হয়েছেন। এর আগেও মাহমুদুর রহমানকে নয় মাস আটক করে রাখা হয়। এসব হচ্ছে বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের নমুনা। যে সরকার কথায় কথায় গণতন্ত্রের বুলি আওড়ায়, কেউ কেউ আবার বলেন গণতন্ত্রের মানসকন্যা। এরা বুঝে বলেন নাকি না বুঝেই বলেন আল্লাহই মালুম!

দোষ প্রমাণ হওয়ার আগেই অপরাধীর সূত্রে ফাঁসির গান গাওয়া এসব কোন ধরনের গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার আদব? কোনো ভিডিও ফুটেজে ও কোনো সাক্ষ্য গ্রহণে প্রমাণ না হলেও গায়ের জোরে এসব বহাল করার নীতি এসব কোন গণতন্ত্রের নমুনা? বিচারের ফটক থেকে সাক্ষ্যকে ধরে নিয়ে এসব ঘটনার পূর্বাপর কোনো সুবিচার না করা এসব কোন গণতন্ত্রের নীতি? তাই সরকারকে আগে শিখতে হবে গণতন্ত্র কী, সেটি জানা ও মানা। তারপর নাহয় অনুসরণের পালা। এটি নিশ্চয় গাছে ধরে না। মাটিতে না হলেও এর চাষ করতে হবে প্রতিটি মন ও মননে, আচারে আচরণে। বিরোধীদলীয়রা সংবাদ সম্মেলন করছে যে, ‘তথ্যমন্ত্রীর বক্তব্য প্রতারণামূলক কারণ বন্দুকের জোরে ‘আমার দেশ’-এর প্রেস বন্ধ রেখেছে সরকার। নতুন আবেদন ও এসবি ক্লিয়ারেন্স ছাড়া বিকল্প প্রেসেও আমার দেশ ছাপতে দেয়া হচ্ছে না।’ এসবই কি নব্য ২০১৩-এর গণতন্ত্রের নমুনা? হেফাজতিরা অবস্থান করলে রাতের আঁধারে তাদের গুলি করে মারা হয়। বলা হয়েছে একজনকেও মারা হয়নি। কিন্তু শাপলা চত্বরে গণহত্যা নিয়ে মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বলছে নিহত ২০২ জনের নাম জেনেছে হেফাজত।  এসবই কি গণতন্ত্রের স্বরূপ দর্শন? কোনো স্বাধীন দেশে হত্যা-গুমের এমন হিড়িক পড়ার কথা নয়। আর যখন তা সরকারের ছত্রচ্ছায়ায়ই হয় তখন ওই সরকারকে মাপা খুব কঠিন হওয়ার কথা নয়। এটি অতি অল্পেই প্রমাণ করে সবদিক থেকেই সরকার সুশাসন চালাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। সে অপকর্ম প্রতিরোধ না করেই বরং অপকর্মের জোগান দিয়ে গেছে। বহুভাবে অপকর্ম রোধ করা যায়। এক. নিজেদের অপকর্ম সামাল দিয়ে প্রতিপক্ষের অপকর্মের প্রতিরোধ করে। আর অন্যটি হচ্ছে নিজেরা অপকর্ম করে প্রতিপক্ষের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে দিয়ে তরণী বেয়ে যাওয়া আজকের দিনে বড়ই কঠিন। ভিডিও ফুটেজের জামানা। নিজেরা যদি কোরআন শরিফে আগুন দিয়ে বলেন যে হেফাজতিরা দিয়েছে, ওদিকে ভিডিও ফুটেজও কথা বলছে। তারপরও কেন অনুসন্ধান ব্যতিরেকে একতরফা আস্ফালন? আল্লামা শফীও এর ওপর অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন এ জন্য যে, কেন দোষীকে ফুটেজ দেখে ধরা হলো না। সত্যিকারের গণতন্ত্র হলে সরকারের ঘরের সব আসামিকেও জেলে পুরতে হবে। বিরোধীরা নিষ্পাপ হলেও তারা আসামি, আর সরকারের ডাকাতও আউলিয়া দরবেশ। বিগত কয় বছরের ডজন ডজন গুম-হত্যা হিমাগারে, কেন? এসব নড়ে না, ফাইল নড়ে না, কোনো অগ্রগতি হয় না। এসব ডিজিটাল গণতন্ত্রেরই নমুনা!

জনতার কথা ২৯ ১০ ১৩শেখ হাসিনা এবং বেগম খালেদা জিয়ার টেলিফোন কথোপকথন নিয়ে মানুষের ভাবনা)

আইন বহির্ভূত হত্যা করার অধিকার রাষ্ট্রের নেই। কিন্তু মহা আনন্দে রাষ্ট্র তা করে চলেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের আহ্বান ছিল ‘গণহত্যা তদন্তে স্বাধীন কমিশন গঠন’ করার। সরকার মতিঝিলকে রক্তের সাগর বানিয়েছিল। আন্তর্জাতিক সংবাদেও এরকম খবর আসছে। জজ গ্যালওয়েরাও প্রতিবাদী হয়েছেন, জানিয়েছেন এরা ইসরাইলি বর্বরতাকেও হার মানিয়েছে। দেশের মেধাবীরা রাস্তাতে লাশ হচ্ছেন। ড. ইউনূসরা দাবি করছেন, ‘ক্রীতদাস নয়, মানুষ হিসাবে বাঁচতে চাই।’ একজন নোবেল অর্জনধারীর এরকম একটি কথার মাঝে অনেক জবাব লুকিয়ে আছে। কেন তিনি আজ এরকম অবহেলার শিকার? হেফাজতিকে ধ্বংস করতে দেড় লক্ষাধিক গোলাবারুদ ব্যবহার করা হয়। কোনো সভ্য রাষ্ট্রে বিদ্যুত্ বন্ধ করে এসব কী ধরনের গণতন্ত্র চর্চার নমুনা, জানতে ইচ্ছে করে! ‘দুর্নীতি তদন্ত রিপোর্ট করবে না সংসদীয় কমিটি’ এসব চাপা দেয়া থাকবে। শুধু করবে চল্লিশ বছর আগের বিচার কিন্তু আজকের বিচার হবে মনে হয় পরবর্তী চল্লিশ পার হলে পর। এদের এখন বিচার হলে এরা ফাঁপরে পড়বেন। তাই চল্লিশ পার করতে পারলে ওরা বেঁচে যাওয়ার একটি অবকাশ তৈরি হবে। কারণ তখন তো তারা বেশিরভাগই মারা যাবেন। যে রকম আজ নির্দোষকে যুদ্ধাপরাধের আসামি করতেই সরকার বেশি তত্পর। যুদ্ধাপরাধী নিজের স্বজন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বা এরকম কেউ হলেও এরা সাধু আর বিরোধী দলের কেউ হলে রাজাকার, ধরো মারো ফাঁসি দাও। বিয়াল্লিশ বছর পর অপকর্মধারী লাশেরা চলে যাওয়ার পর এই যুদ্ধাপরাধ ইস্যু নিজেই এক রাজনৈতিক অনাচার ছাড়া আর কিছু নয়। তারপরও যদি এতে কোনো সদিচ্ছা থাকত তাহলে তারা ১৯৯৬ সালেই সেটি করতে পারত, কিন্তু তাও অনেক দেরি, ২৫ বছর পর। তখনও মনে হয়নি, কারণ তখন তো মউজে দিন গেছে, দহরম মহরম চলেছে, চলেছে দোস্তি রাজনীতির খেলা। এসব হচ্ছে সুবিধাবাদী রাজনীতির সংসদীয় গণতন্ত্র! এখানে বর্তমানের নীতি হচ্ছে শক্তিমানের কোনো বিচার হবে না, সব মামলা উঠিয়ে নেয়া হবে। আমার নয় শুধু তোমার মানে প্রতিপক্ষের বিচার বরাদ্দ থাকবে। আমার ছেলের বিচার নেই, বিচার হবে তোমার ছেলের। গণতন্ত্রের নীতি হচ্ছে আসামি হলে দুজনকেই ডান্ডাবেড়ি দেয়াই আইনের নীতি, তবে বিচারের আগে নয়।

শেয়ার লুটপাট, ব্যাঙ্ক জালিয়াতি, হলমার্ক জালিয়াতি, সব চুপ, প্রকাশ করা যাবে না। এসব বিষয়ে খোদ অর্থমন্ত্রীর তুচ্ছতাচ্ছিল্য-জড়িত যুক্তি লক্ষ্য করা গেছে। যার সম্পদ তাকে লুকিয়ে এ কী ধরনের গণতন্ত্র, এসব জনগণ কেন জানবে না। কোথায় কোন চুক্তি হয় বিদেশির সঙ্গে তাও সব আড়ালে আবডালে। দেশটি যেন কারও বাবার মৌরসী স্বত্ব! ভয় হচ্ছে, কিছু চুক্তিতে কি বাংলাদেশকে চিরকালের গোলাম বানানো হয়েছে? হতভাগ্য জনতা তাও জানে না। সরকারের অতি চাতুরিতে গণতন্ত্রের ফাঁকা বুলির নিচে তা চাপা পড়ে গেছে। অতীতে ’৭১-এর স্বাধীনতার সঙ্গে সঙ্গে ২৫ বছরের গোলামি চুক্তির শিকল সবার অগোচরে দেশবাসীকে পরিয়ে দেয়া হয়। এবার যদি তার চেয়েও গুরুতর কিছু করা হয়ে থাকে, তবে ভয়ঙ্কর সে শিকল ভাঙার খেলায় জনতাকে অবশ্যই সোচ্চার হতে হবে। স্বৈরাচারকে টিকিয়ে দিতে কেমন করে অতীতে গণতন্ত্রের নেত্রী বলতে পারলেন, ‘আই এম নট আনহ্যাপীি।’ যারা স্বৈরাচারকে সমর্থন দেবে তারা ‘জাতীয় বেইমান’ বলে মাত্র ক’দিনের মধ্যে তিনি কেমন করে ওই স্বৈরাচারকে সমর্থন করে বেইমানের তকমা সখ করে নিজেই গলে পরে নিলেন। এতেই বুঝা যায় কত দূরদৃষ্টির অভাব এদের আচরণে লক্ষণীয়। হাঁড়ির ভাত সবকটি টিপে দেখে না মেয়েরা, একটি ভাত দিয়েই টেস্ট করে নেয় ভাত হয়েছে কিনা? একইভাবে মানুষকে টেস্ট করতে বার বার পরীক্ষার দরকার নেই। তার অতীত বর্তমানই তার আমলনামা। এ দিয়েই ভবিষ্যত্ নির্ধারণ হওয়াই যুক্তির কথা। যারা সেটি করতে পারে না, এরা বার বার মার খেতে থাকবে। এদের মাথা তুলে দাঁড়াবার ফুরসত বড়ই কম। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও মতিঝিল গণহত্যার বিচার দাবি করেছে। সরকার শুধু গণতন্ত্রের স্বপ্নই দেখে জেগে ও ঘুমিয়ে, কিন্তু বাস্তবে গণতন্ত্রের ‘গ’তেও নেই। এসব বিষয় সব দলের জনতাকেই সূক্ষ্মভাবে বিবেচনা করা উচিত। এ দেশ কোনো দলের নয়, এটি গোটা দেশবাসীর। ন্যায় যারা করবে তারাই যেন সমাদৃত হয়। নয়তো ইহকাল পরকালেও আল্লাহর দরবারে পার পাবার কোনোই ফুরসত দেখছি না।

‘দুর্নীতি দমন ইস্যুতে ৯ বছর ধরে প্রত্যাশিত সূচক অর্জন করতে পারেনি বাংলাদেশ’ যার জন্য বাংলাদেশ বহুল প্রত্যাশিত যুক্তরাষ্ট্রের চ্যালেঞ্জ অ্যাকাউন্টির (এমসিএ) আওতায় সহযোগিতা পাওয়ার জন্য অযোগ্য বিবেচিত হচ্ছে। আদর্শের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা ধর্মে ৯০% মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলের জন্য এটি বড়ই লজ্জার কথা। গত নয় বছরের সব স্কোরবোর্ডেই বাংলাদেশ সরকারের দুর্নীতি দমনে পাওয়া অর্জনকে লাল কালিতে দেখানো হয়েছে। এসবই বর্তমানের নষ্ট গণতন্ত্রের বাস্তব ফল প্রকাশের নমুনা। কেউ কেউ বলছেন, সরকারের দায়িত্বশীলদের মানসিক চিকিত্সার দরকার। এদের কারণে সারা জাতি আজ কারারুদ্ধ, অবর্ণনীয় অবস্থার শিকার। অসুস্থ বাংলাদেশ আজ শারীরিক, মানসিক, আত্মিক, ভৌগোলিক, সামাজিক, ধর্মীয়, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক সব ধরনের পঙ্গুত্বের শিকার। সমাজ বিনির্মাণের সুচিকিত্সকরা স্ট্যাথো নিয়ে উঠে দাঁড়ান। বাংলাদেশীর প্রাণপ্রিয় ভূমি সবুজের এই দেশটিকে গণতন্ত্রের বাস্তবসম্মত ডোজটি দিয়ে বাঁচান। ১৬ কোটি মানুষের ভাগ্য নিয়ে যে ছিনিমিনি খেলা শুরু হয়েছে, সচেতনের ছোঁয়াতে এটি চিরকালের জন্য বন্ধ হোক, জনতা বাস্তবিকই জেগে উঠুক।

 

নাজমা মোস্তফা, December 24, 2015. 

বাংলাদেশের কলিজাতে কামড়: লাশের মিছিলে জিয়া ও মঞজুর

নাজমা মোস্তফা,  ১০ই ডিসেম্বর ২০১৫ সাল

উপরের এ দুটি মৃত্যু কোন অকস্মাৎ ঘটনা নয়। ছলবাজদের হাতে পর পর সাজানো নাটকের অংশ মাত্র, আজ পাঠকের সামনে তুলে ধরবো। জিয়া হত্যার পর পরই তড়িঘড়ি মঞ্জুরকে হত্যাকারী হিসাবে প্রচার করা হয়, এটি ছিল এরশাদীয় কৌশল। বহু যুগ পূর্ব অপকর্মে কপটদের ঢেকে রাখা পাট প্রকাশ করেন লরেন্স লিফশুলৎজ (এপ্রিল ২৩ ২০১৪, প্রথম আলো)। বীরউত্তম খেতাবপ্রাপ্ত মোঃ আবুল মঞ্জুর সেনানিবাসে সামরিক হেফাজতে রহস্যজনকভাবে নিহত হন ১৯৮১ সালের ১লা জুনে। সেনাবাহিনীর তিনি ২৪তম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেধাবী দক্ষ কর্মকর্তা হিসাবে সুপরিচিত ছিলেন। একই ধারাবাহিকতায় এর আগে ৩০শে মে অপর মেধাবী জিয়াউর রহমানকে ময়দান থেকে মুছে দেয়া হয়। শুরু থেকেই স্বৈরশাসক এরশাদ নানান অভিযোগের সুরে ছলের নাটক করতে থাকেন। সত্য সন্ধান করতে হলে পাঠককে সত্য সূত্র ধরেই সন্ধানী দৃষ্টিতে পথ মাপতে হবে। জিয়া হত্যার ১২ ঘন্টার পর একটি মিথ্যা গল্প আকাশে বাতাসে প্রচার করা হয় যে, লোভী মঞজুর এ কাজ করেছে। সংশ্লিষ্ট যারা মঞজুরের খুব কাছে ছিলেন, কোনভাবেই এ গোজামেলে গল্প বিশ^াস করতে পারছিলেন না। তারা দেখেছেন জিয়া হত্যায় উৎকন্ঠিত মঞজুরের হতাশ দশা। ঐ সময় ঘটনাক্রমে বিদেশী সাংবাদিক লরেন্স ছিলেন ভারতের বিহারে। তিনদিন পর কলকাতা হয়ে বেনোপোল সীমান্ত দিয়ে ঢাকায় ফেরেন, তিনি টের পান ঢাকায় প্রকৃত গরম খবর সেনাদের মাধ্যমে ছাড়াচ্ছে। সেনারা বাতাসে ছড়ানো গল্প বিশ^াস করছে না। মাত্র এক সপ্তাহ ঢাকায় থেকে যথেষ্ট সংবাদ জোগাড় করা হলে লরেন্স ঢাকা ত্যাগে বাধ্য হন কারণ পুলিশের বাধা।

সেনাসূত্র অনুযায়ী জিয়া হত্যার পর মঞজুর যে এর কিছুই জানতেন না, তার সাক্ষ্যদাতা হিসাবে অনেকেই ময়দানের সাক্ষি হয়ে ঐ উৎকন্ঠায় মঞজুরের সাথেও শরিক ছিলেন। এদিকে এরশাদের নেতৃত্বে ঐ সময় বাংলাদেশের ঢাকা রেডিও থেকে ক্রমাগত এটি প্রচার করা হয় যে মঞজুর “খুনি ও বিশ^াসঘাতক”। তবে মঞজুর ধারণা করেছিলেন যে, ঢাকা গ্যারিসনে অবস্থানরত তার শত্রুরা, বিশেষত এরশাদ ও সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার ডিজিএফআইয়ের মেজর জেনারেল মহব্বত জান চৌধুরী জিয়াউর রহমানের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে তাকে খতম করে দিবে, এ সন্দেহ তার মনে জাগে। এসব মানতে না পেরে এ সময় বিরোধী দলীয় উপনেতা মহিউদ্দিন আহমেদ পুলিশের স্ববিরোধী বক্তব্যে বিচারের আগে মঞজুরকে দোষী করার কি যুক্তি থাকতে পারে তা জানতে চান, সূত্র: (কনফিউশন ওভার এ কিলিং, লরেন্স লিফশুলৎজ, ফার ইস্টার্ন ইকোনমিক রিভিউ, ১০ জুলাই ১৯৮১)।  ১৯৯৫ সালে হত্যাকান্ডের ১৪ বছর পর মঞ্জুরের ভাই মনসুর আহমেদ নিজেদের জীবনের শংকাকে পাশ কাটিয়ে অবশেষে জেনারেল এরশাদ ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে বীর মুক্তিযাদ্ধা ও বীরউত্তম মঞজুর হত্যা সংঘটনের অভিযোগে মামলা করেন এবারই প্রথম। আবুল মনসুরের করা মামলার কেইস নাম্বার ছিল “পাঁচলাইশ পিও ২৩”, তারিখ ২৮-২-৯৫ আপ ৩০২ বিপিসি। ইতমধ্যে ধড়িবাজ স্বৈরশাসক এরশাদ এক দশক পার করেছে। ১৯৭১এ বাকী মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধের ময়দানে থাকলেও এরশাদ কিন্তু পাকিস্তানে ছিলেন।

শহীদ জিয়ার হত্যাকান্ডের মূলনায়ক কে তা এই ভিডিও দেখলেই স্পস্ট হয়ে যাবেন

 

অপরাধ সংগঠিত হবার এত পর হলেও ভাইএর মামলা কিন্তু হাটে নাই বরং তারো দুই দশক পর আজ মামলা সামান্য নড়ছে, শমভুক গতিতে। উল্লেখ্য ১০ ফেব্রুয়ারী সেশন জজ হোসনে আরা আকতারের এই মামলার রায় ঘোষণা করার কথা ছিল। তাকে আকষ্মিকভাবে সরিয়ে দেয়া হয় অজ্ঞাত ইশারায়, আসেন খন্দকার হাসান মাহমুদ ফিরোজ। এ ভৌতিক রদবদলই বলতে পারবে কোথা থেকে চক্রান্তের কলকাঠি নড়ছে। আসামী জানে কিভাবে তাকে কোন পথে হাটতে হবে সব সূতানাতা ঠিক করেই এরা জাতির মজ্জা চুষে খাচ্ছে। এ দেশ স্বাধীন হতে পারে নি, হয়েছে শুধু স্বৈরাচার বদল, ইয়াহইয়ার বদলে এরশাদ পাকিস্তান বদলে হয়েছে পাপিস্তান। ১৯ বছর ধরে চলছে এভাবে ঐ মামলার গোজামিল খেলা। এর সূত্র ধরে ২০১৩ সালের নভেম্বরে বিচারক হোসনে আরা আক্তার সরকারী কৌসুলি আসাদুজ্জামান খানকে প্রকাশ্যে সমালোচনা করেন। আর এক সরকারী কৌসুলি আবুল কাশেম খান ২ ফেব্রুয়ারী গণমাধ্যমকে বলেন ১৯৯৫ সালের পর থেকে ২২ বার বিচারক পরিবর্তিত হয়েছে। এসব জটিল মামলা সাধারণত একজনই ভালো সামাল দিতে সক্ষম কিন্তু যাতে এটি আগাতে না পারে, তাই এসব ব্যবস্থা এসেছে আসামীর স্বার্থে। জিয়া, মঞজুর, তাহের এরা বীরউত্তমধারী যেখানে এরশাদ অমুক্তিযোদ্ধা শূণ্য রসগোল্লা। মুক্তিযুদ্ধের সময়ও তিনি পাকিস্তানে সময় পার করেন বরং বাকীরা সে দেশ থেকে ফেরত এসে মুক্তিযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। এর মাঝে বিগত ৩৩ বছরে একজনও মঞজুর হত্যার আসামী মঞ্চে আবির্ভুত হননি। চট্টগ্রামের তৎকালীন জেলাপ্রকাশক জিয়াউদ্দিন চৌধুরী ১৯৮১ সালের উপর একটি বই লিখেন “দ্য অ্যাসাসিনেশন অব জিয়াউর রহমান অ্যান্ড ইটস আফটারম্যাথ” নামে এবং ঐ হত্যাকে তিনি “দ্বিতীয় খুন” আখ্যা দেন। লেখক এখানের দুই খুনের ব্যাপারে অনেক কিছুই জেনেছেন। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারেও ২০০৬ সালে মইন স্বীকার করেন এখনো তাকে কেউ এসব নিয়ে প্রশ্ন করে নি, যদিও তিনি বইএ এসব প্রকাশ করেছেন। সংগঠক তো জানে ঘটনার সব দাগ তার জানা, তাই প্রশ্ন করার দায় নেই। মইন তার বইতে এটি স্পষ্ট করেছেন যে, এরশাদ ও তার সহযোগিরাই মঞজুর হত্যার কারিগর। তিনি তার বেদনার কথাটি প্রকাশ করেন যে আজো তদন্তকারীরা কেউই তার কাছে কখনোই এ ব্যাপারে কিছু জানতে চায়নি। জিয়া হত্যার পর জিয়াউদ্দিন চৌধুরী তার বইএর একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেন যাতে দেখা যায় মঞজুর ৪৮ ঘন্টা পর্যন্ত একজনের সাথে ফোনালাপ করেছেন, লেখক তখন অনেক পর তার গবেষনার ফসল হিসাবে লরেন্স থেকে জানতে পারেন কে ছিলেন অপর পাশের ব্যাক্তিটি। সাংবাদিক লরেন্স পরে এটি জেনেছেন ব্যক্তিটি ছিলেন মেজর জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরী, যাকে মঞজুর বিশ^াস করতেন।

জেনারেল এরশাদ ও জেনারেল মহব্বত জান চৌধুরী অমুক্তিযোদ্ধা ও পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অংশ ছিলেন। সে স্বৈরশাসক মুক্তিযুদ্ধ না করে উল্টো প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদেরে হত্যা করে ক্রমে সেনাবাহিনীর পুরোটাই দখলে নেয়। মঞজুরের আলাপ যে মইনের সাথে হয়েছিল তা মইনই প্রকাশ করেন সাংবাদিক লরেন্সের কাছে। এসব প্রকাশিত হয় তার লিখিত বই “এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য: স্বাধীনতার প্রথম দশক” বইটিতে। বইটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ সন্দেহ নেই, পাঠকরা পেলে পড়তে ভুলবেন না, দেখবেন এরশাদের নোংরামি কতদূর গভীরে প্রথিত। সেদিন জিয়াউদ্দিন এসবে প্রকাশিত দাপ্তরিক এরশাদীয় তথ্যাবলীতে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। এরশাদ ও মইনের তর্কযুদ্ধও সে বইটিতে স্থান পেয়েছে। ঠিক তখনই মইন বুঝতে পেরেছিলেন এসব মঞজুরকে ময়দান থেকে সরানোরই চাল। সারা দেশ জুড়ে প্রচার চালানো হয় মঞজুরের বিরুদ্ধে ঘৃণ্য অপপ্রচার। এরা ক্ষমতালোভী অমুক্তিযোদ্ধা, এজন্য কথায় কথায় মুক্তিযোদ্ধার নামে লড়াই করতে উৎসাহী, এরা প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদেরে কখনোই সহ্য করতে পারে না। সাংবাদিক লরেন্সএর লেখাতে পাই মাত্র একটি গুলিতেই ঢাকা থেকে আসা ব্যাক্তি কর্তৃক মঞজুরকে ময়দান থেকে পরিষ্কার করা হয়(২৩ এপ্রিল ২০১৪)।

ফল্স ফ্ল্যাগ সম্বন্ধে আভাস পেলাম এখানে। এটি বিদেশে প্রচলিত একটি গোপন আধা সামরিক অপারেশন। এসব অপারেশন হয় যখন একের দায় চাপানো হয় অন্যের উপরে। এরকম ফল্স ফ্ল্যাগের যোগসাজসের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনাকারীকে আড়াল করে ফেলা হয়। জানা যায় ১৯৩৩ সালে রাইখস্টাগ অগ্নিকান্ড বা ১৯৬৪ সালে টনকিন উপসাগরের ঘটনায় মানুষ ও গণমাধ্যমকে ধোঁকা দেবার জন্য এই ফল্স ফ্ল্যাগ কৌশল হিসাবে ব্যবহার করা হয়। এরশাদ ও মহব্বত জান যা ঘটিয়েছেন তা যেন এরকমই কিছু, একটি ডাহা মিথ্যাচার ছাড়া আর কিছু নয়। তাই জীবিত মঞজুর এরশাদের পথের কাঁটা, মৃত্যু না হলে তার সমস্ত গোপন অভিসার প্রকাশ হয়ে পড়তো। তাই তড়িঘড়ি পথের কাঁটা সরিয়ে ফেলতে হয়। ক্ষমতায় বসে সামরিক বাহিনীর সব স্তর থেকে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সামরিক কর্মকর্তা ও সৈনিকদের অপসারণ করে অমুক্তিযোদ্ধা অদক্ষ সামরিক শাসনের খপ্পরে পড়ে দেশ। এরাই বর্তমান বাংলাদেশের প্রকৃত উদ্ধারকারী, ইতিহাস বিকৃতকারী। জেনারেল মইনুল হোসেনের বইএ এসব প্রকাশিত হয় যে, সেদিন ঘটনায় বেঁচে যাওয়া দুইজন গার্ড রেজিমেন্টের সদস্যকে সার্কিট হাউস থেকে তুলে নিয়ে হুশিয়ার করে মুখ বন্ধ রাখতে বলা হয়। যাতে কোনভাবেই যেন মঞজুরের কাছে ঘটনার মূল কোন খবর না পৌছায়। ঐ দিন অনেকটা ২০০৯এর বিডিআর বিদ্রোহের আদলে ছক সাজানো হয়। বর্ডারে ভারতীয় বাহিনী সেদিনও প্রস্তুত ছিল। জিয়া হত্যার দিনও ভারতীয় বাহিনী বর্ডারে প্রস্তুত ছিল, আমরা পরবর্তীতে তারও সূত্র পাব। এরশাদের ছড়ানো গুজব ছিল যে, মঞজুর বিক্ষুব্ধ জনতার হাতে খুন হন। কিন্তু এটি একাধিক সাক্ষ্যে প্রমান যে, মাত্র এক গুলিতে মঞজুরের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়, বিক্ষুব্ধ একঝাক গুলিতে নয়। দুটি গুলির দরকার পড়েনি। ডাক্তারী রিপোর্টও তাই বলছে।

সেদিন ঝড়ের রাতে জিয়া সার্কিট হাউসে ঘুমিয়ে ছিলেন। ভোর চারটার দিকে জুনিয়র অফিসাররা দু’ভাগে ভাগ হয়ে প্রথমে সার্কিট হাউসে রকেট লাঞ্চার নিক্ষেপ করে। পরে একটি গ্রুপ গুলি করে করে ঝড়ের বেগে সার্কিট হাউসে ঢুকে। জিয়া শব্দ শুনে বের হন। কয়জন অফিসার তাকে ঘিরে দাঁড়ান। ঐ সময় কর্ণেল মতিউর রহমান মাতাল অবস্থায় টলতে টলতে ‘জিয়া কোথায়, জিয়া কোথায়’ বলে সিড়ি বেয়ে উপরে উঠে গজ খানেক দূর থেকেই সামনে তার চায়নিজ স্টেনগানের পুরো এক ম্যাগাজিন মানে ২৮টি গুলি করে। অন্তত ২০টি বুলেট তার শরীর ঝাঝরা করে। তখন দু’ একজন চিৎকার দিয়ে উঠেন, তার সাথে সাথেই লাশ মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। ১৯৯১ সালে থাইল্যান্ডে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত থাকা অবস্থায় এ লেখক সাংবাদিক ঢাকায় এলে এসব ঘটনা আরো দুজনসহ প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকেও অবহিত করেন। কিন্তু অসীম ধৈর্যশীল এ সম্মানী মহিলাকে আমরা কোনদিনও এসব নিয়ে উচ্চবাচ্য করতে দেখি নাই, ধৈর্য্যই যেন তার সম্বল। অপর পক্ষের নেত্রীর কি আস্ফালন, কটুবাক্য উচ্চারণের দক্ষতায় যে কত গভীরে পৌছতে পারেন তা বলার দরকার নেই, জাতির জানা। প্রথম থেকেই জিয়াকে হত্যা করার পর, এক পরিকল্পনার ভেতর আর এক পরিকল্পনা করে রাখা হয়।

সে সময় জিয়া হত্যার পর দিনই সাংবাদিক লরেন্স মঞজুরের সাথে কথা বলে প্রায় নিশ্চিত ছিলেন যে, মঞজুর এতে জড়িত নন। জনতারা হয়তো এটি মনে করতে পারবেন, অত্যন্ত ধৈর্যশীল খালেদা একবার এরশাদের সম্পৃক্ততার কথা এক জনসভাতে প্রকাশ করেন। মঞজুর হত্যার বিচারের দীর্ঘসূত্রতা ও ১৯৮১ সালের মাত্র দু’সপ্তাহের ভয়ংকর বিচারের পরিণতিতে সেদিন ১৩ জন কর্মকর্তাকে ফাঁসি দেয়া হয়। যারা ছিল দেশের প্রকৃত মুক্তিযুদ্ধের লড়াকু যোদ্ধা, তাদেরে এভাবে ময়দান থেকে সরিয়ে দেয়া হয়। জিয়ার শাহাদতের মাত্র এক মাসের মধ্যে অভিনব ‘এক্সপ্রেস’ ফিল্ড কোর্ট মার্শাল সকল আত্মপক্ষ সমর্থণের সব সুযোগ বাতিল করে স্বৈরাচারী অপকর্মে শক্ত দাগ রাখে। সেদিন জোর করে তাদেরে দিয়ে বলানো হয় যে ওটি ছিল তাদের অভ্যুত্থান। সেদিন মিথ্যে স্বীকারোক্তি আদায় করার জন্য তাদের প্রহার করা হয়, আঙুল থেকে নখ উপড়ে ফেলা হয়, যৌনাঙ্গ পুড়িয়ে দেয়া হয়। জুলফিকার আলী মানিক তার সাহসী বইএ এসব ঘটনার বর্ণনা তুলে ধরেন। নির্যাতনের পরেও তারা সাহসিকতার সাথে নির্যাতনকারীদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অভিসম্পাদ করেন। উল্লেখ্য, যে কোন কারণেই হোক সরকারী কৌসুলীরা মইনের গ্রন্থের অনুকুলে সত্যানুসন্ধান করতে পারে নাই। বিকৃত ইতিহাস সৃষ্টিকারীরা যে কত ভয়ঙ্কর! এ তার উদাহরণ!

25 August 2015 শেখ মুজিব হত্যায় এরশাদ জড়িত

এক প্রত্যক্ষদশীর সাক্ষাৎ পান ঐ সাংবাদিক, তার পাওয়া সোর্স নিজে চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টে ঐ হত্যার একজন সাক্ষী বলে দাবী করেন। মেজর মঞজুরকে তিনি ব্যক্তিগতভাবে জানতেন, চিনতেন। বন্দী হিসাবে আনার পর তিনি তাকে চিনতে পারেন। ফটিকছড়ির একটি গ্রামে মঞজুর শান্তিপূর্ণভাবে পুলিশের হাতে ধরা দেন। পরে তাকে হাটহাজারী থানার সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। এক উর্ধতন সামরিক কর্মকর্তা আসেন ঢাকা থেকে বলেন, তিনি এসেছেন তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য। এ কর্মকর্তাও ঐ সোর্সের পরিচিত। সেখানের উপস্থিত সবাই তাকে চিনতেন। সোর্স তাকে মঞজুরের কক্ষে ঢুকতেও দেখেন। কিছু পরেই সোজা বের হয়ে ঐ ব্যক্তি ঢাকা চলে যান। অতপর লেখকের সে সোর্স মঞজুরের কক্ষে প্রবেশের সুযোগ পান এবং দেখেন যে, মঞজুর নিহত। তাকে হত্যা করা হয়েছে। হত্যাকারীর নামটি প্রকাশ না করলেও এটি ঐ বিদেশী সাংবাদিকের জানা। সরকারের জন্য এটি একটি চ্যালেঞ্জ হলেও উপস্থিত পরিস্থিতিতে সোর্সের বিপদ নিয়েও আশংখা থেকে যায়। উল্লেখ্য সেদিন মেজর মঞজুরকে কোন জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় নি। তার উদ্দেশ্যই ছিল তাকে খুন করা আর তিনি সেটি এক গুলিতেই সমাধা করেন। এ সাংবাদিক লরেন্স লিফশুলৎজ দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিনিধি ছিলেন। তিনি দ্য গার্ডিয়ান, লে মদঁ দিপ্লোমাতিক, দ্য নেশন (নিউইয়র্ক) ও বিবিসির পক্ষে কাজ করেছেন। একই সূত্রে গাথা এবার আরো কিছু পাওয়া সূত্রের উল্লেখ জরুরী মনে করেই আনছি।

“এই জিয়া সেই জিয়া নয়” একটি কলামের শিরোনাম। “যদি ভালভাবে প্রচার করতে পার, এই জিয়া স্বাধীনতার ঘোষক জিয়া নয়, তাহলে দেখবে একদিন মানুষ এটাই বিশ^াস করবে” শেখ হাসিনা হিটলারের তথ্য উপদেষ্টা গোয়েবলস এর থিওরী অনুসরণ করতে বলেন” (আমার ফাঁসি চাই, মুক্তিযোদ্ধা মতিউর রহমান রেন্টু, পৃষ্ঠা ৪১)। সময়টি লক্ষ্য করুন, “৮১ সালের ২৩/২৪ মে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের টিএসসির তিন তলার সেমিনার কক্ষে ৭১ ও ৭৫এর যোদ্ধাদের এবং সেনাবাহিনীর প্রাক্তন সদস্যদের গোপন ও জরুরী বৈঠক বসে। এই বৈঠকে কর্ণেল শওকত আলী মুক্তিযোদ্ধা রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউর রহমান বীর উত্তমকে হত্যার পরিকল্পনা এবং হত্যাকালীন ও হত্যা পরবর্তী সময়ে করণীয় সম্পর্কে অবহিত করেন। কর্ণেল শওকত আলী বলেন, জিয়াউর রহমান চট্টগ্রাম গেলে চট্টগ্রামের জিওসি মেজর জেনারেল মঞজুর বীর উত্তম এর নেতৃত্বে জিয়াকে হত্যা করা হবে এবং এই হত্যাকান্ডের ব্যাপারে সভানেত্রী শেখ হাসিনা অবহিত আছেন। সভানেত্রী আমাদেরকে এই হত্যাকান্ডে সহায়তা ও ভূমিকা রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। বলা হয় শেখ হাসিনা দেশের বাইরে (ভারতে) থাকতেই এ বিষয়ে অবহিত আছেন। কর্ণেল শওকত আলী জিয়া হত্যাকান্ডে ও হত্যা পরবর্তী সময়ে আমাদের করণীয় সম্পর্কে বলেন যে, হত্যাকান্ডের সময় আমাদের চট্টগ্রাম ও ঢাকায় থাকতে হবে। আমাদের যারা চট্টগ্রামে থাকবে তাদের দায়িত্ব হবে জেনারেল মঞজুরের কাছ থেকে অস্ত্র নিয়ে ঢাকায় চলে আসা এবং ঢাকায় যারা থাকবে তাদের দায়িত্ব হবে চট্টগ্রাম থেকে আসা অস্ত্র নিয়ে ঢাকায় রেডিও টেলিভিশনসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। যখনই জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামে যাবেন তখনই তাকে হত্যা করা হবে। কর্ণেল শওকত আরো বলেন, জিয়া হত্যা সংগঠন পর্যন্ত সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল এইচ এম এরশাদসহ অন্যান্য জেনারেলগণ এবং রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের গার্ড রেজিমেন্টের কর্নেল মাহফুজুর রহমান অভ্যুত্থানের নেতা জেনারেল মঞজুরের সাথে থাকবেন।

কিন্তু যেই মুহূর্তে হত্যা সংগঠিত হবে তখন থেকেই দ্বন্ধ শুরু হবে। — জনগণের ভোটে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আব্দুস সাত্তার হয়ে যান সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল এরশাদের নাচের পুতুল (ঐ, পৃষ্ঠা ৪৪)। শেখ হাসিনা সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল এইচ এম এরশাদকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের পূর্ণাঙ্গ আমন্ত্রণ জানাতে থাকেন। ৮২ সালের ২৪ তারিখে জেনারেল এরশাদ বিনা বাধায় বিনা বাক্যে জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আব্দুস সাত্তারকে ভবন থেকে গলা ধাক্কা দিয়ে বের করে দেন এবং পরের দিন আবার কলার ধরে নিয়ে এসে রেডিও টেলিভিশনে নিজের অযোগ্যতা ও তার সরকারের দুর্নীতি স্বজনপ্রীতি ইত্যাদি কারণে স্বেচ্ছায় সেনাবাহিনী প্রধান এরশাদের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর করে তিনি বিদায় নিলেন, তাকে এ মর্মে ভাষন দিতে বাধ্য করে। অশীতিপর বৃদ্ধ রাষ্ট্রপতি প্রাণভয়ে বিদায় নিলেন। এরশাদ দেশে সামরিক আইন জারি করে নিজেকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ঘোষনা করেন। শেখ হাসিনার গোপন আমন্ত্রণে এরশাদ সর্বময় ক্ষমতার মালিক হয়ে জগদ্দল পাথরের ন্যায় জনগণের বুকে চেপে বসলো”(ঐ, ৪৬ পৃষ্ঠা)।

“৩০শে মে ৮১ তে জিয়াউর রহমান নিহত হলে এনএসআইএর কর্মকর্তাগণ জিয়া বা বিএনপি সরকারের আমলে তৈরী করা সমস্ত নথিপত্র পুড়িয়ে ফেলতে চায়। ঠিক ঐ মুহূর্তে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সাত্তার অধিষ্ঠিত হন অর্থাৎ তিনি অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হলেও মূলত ক্ষমতা চলে যায় এরশাদের হাতে” (ঐ, ৪৭ পৃষ্ঠা)।  “শেখ হাসিনা ছাত্রদেরে বলেন, আমাদের চিরশত্রু জিয়াউর রহমান এবং তার দল বিএনপি। জিয়া তো শেষ। জেঃ এরশাদ বিএনপির কাছ থেকে মাত্র কিছু দিন হলো ক্ষমতা দখল করেছে। আমাদের এখন প্রধান কাজ বিএনপিকে চিরতরে শেষ করে দেয়া” (ঐ, ৫৩ পৃষ্ঠা)। “ব্রিগেডিয়ার মাহমুদুল হাসান জেনারেল এরশাদের পক্ষ থেকে ব্যক্তিগতভাবে শেখ হাসিনাকে নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করার অনুরোধ করেন এবং নির্বাচনী সকল ব্যয়ভার বহন করার প্রতিশ্রুতি দিলে শেখ হাসিনা আন্দোলনের অংশ হিসাবে নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করার পক্ষে মত দেন” (ঐ, ৫৪ পৃষ্ঠা)। “শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমাদের সময় নেই, তাড়াতাড়ি করতে হবে। খালেদা জিয়া এবং তার দল বিএনপিকে ল্যাং মেরে নির্বাচনে যেতে হবে” (ঐ, ৫৫ পৃষ্ঠা)।  ষড়যন্ত্রের পাওনা “নির্বাচনে যাওয়ার আগের নয় বস্তায় দশ কোটি টাকা ছিল। আর এখন তের বস্তায় পনর কোটি টাকা। —হাসিনা জনতার সমস্ত আশা আকাঙ্খা জলাজঞ্জি দিয়ে নীরবে নিঃশব্দে চুপিসারে স্বৈরাচারী জেনারেল এরশাদের পার্লামেন্টে যোগ দিলেন এবং এরশাদের পার্লামেন্টের বিরোধী দলীয় নেত্রী হলেন” (ঐ, ৫৭ পৃষ্ঠা)। “শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগ কর্মীদের বলে দেবে তারা যেন আন্দোলন আন্দোলন খেলা করে, কিন্তু আন্দোলন যেন না করে। অর্থাৎ আন্দোলনের সাথে থেকে আন্দোলনের পিঠে ছুরি মারতে হবে। ম্যাডামকে (খালেদা জিয়া) ব্যর্থ করে করে ঘরে বসিয়ে দিতে হবে, আর যাতে রাজনীতির নাম না নেয়” (ঐ, ৫৮ পৃষ্ঠা)। “জেনারেল এরশাদ ছাত্রনেতাদের ক্রয় করার জন্য শত কোটি টাকা খরচ করলো এবং জেলখানা থেকে দাগী অপরাধীদের ছাড়িয়ে এনে কোটি কোটি টাকা আর অস্ত্র দিয়ে আন্দোলন দমানোর ব্যবস্থা করলো। এই দাগী অপরাধীরাই ১৯৯০ সালের ২৭ শে নভেম্বর ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় লাইব্রেরীর পূর্ব দক্ষিণ কোনায় দূর থেকে গুলি করে ডাঃ মিলনকে হত্যা করলো” (ঐ, ৫৯ পৃষ্ঠা)। “১৯৯১ এর ২৭ শে ফেব্রুয়ারী শুধু বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে নয়, উপমহাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে এক নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত স্থাপন করে নর নারী নির্বিশেষে জনগণ হাসতে হাসতে নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করলো। খালেদা জিয়া ও তার দল নির্বাচনে বিজয়ী হলেন। —হাসিনা বলতেন, বেগম জিয়া সরকার গঠন করলে আমি এক মিনিটও খালেদা জিয়াকে সুস্থ থাকতে দেব না” (ঐ গ্রন্থ, ৬১ পৃষ্ঠা)।

এবার আর একটি বইএর সাহায্য নেব। লেখক আবু রুশদ এর লেখা “বাংলাদেশে ‘র’। “গভীর সংকটে জেগে উঠার সময়” লেখাটি বেশ ক’বছর আগের লেখা, ওতে এ বইএর সামান্য ছোঁয়া ছিল। “১৯৭১ সালের পর ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ও সেনা কর্মকর্তারা দক্ষিণ এশিয়াসহ অষ্ট্রেলিয়ার জলসীমা পর্যন্ত ভারতের একাধিপত্য কায়েমের মাস্টার প্ল্যান তৈরী করে। — বাংলাদেশ, ভুটান, নেপাল, শ্রীলংকা, মালদ্বীপ ও পাকিস্তানের অভ্যন্তরে বিভিন্ন সমস্যা সৃষ্টির কৌশল গ্রহণ করে। মাঠে নামিয়ে দেয় ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’কে। উপরোক্ত দেশগুলোর মধ্যে মালদ্বীপ ও ভুটানের কোন স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি নেই। এরা ভারতীয় বাজারের ক্রেতা। বাকী দেশগুলোর মধ্যে পাকিস্তান একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে” (ঐ গ্রন্থ,৫৩ পৃষ্ঠা)। “ইন্দিরা গান্ধীর এক প্রশ্নের জবাবে জিয়া কাওকে উল্লেখ করে মন্তব্য করেন যতটুকু না আমি জানি, তার থেকে এই ভদ্রলোক বেশি জানেন আমার দেশ কিভাবে চলছে। — জে. জিয়া পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে ভারতীয় বলয়ের বাইরে এসে চীন, পাকিস্তান ও মুসলিম দেশগুলার সাথে দৃঢ় সম্পর্ক গড়ে তুলেন। বিদেশী নীতির এই কৌশলের কারণেই বাংলাদেশে ভারতের সামরিক আগ্রাসন প্রস্তুতি নেবার পরও পিছিয়ে যেতে বাধ্য হয়। — মুজিব আমলে ভারতের সাথে ২৫ বছর মেয়াদী মৈত্রী চুক্তিতেও অধীনতামূলক বহু ধারা সংযোজিত ছিল। — জেনারেল জিয়ার জাতীয়তাবাদী দর্শন ভারতেকে সবচেয়ে বেশী বিচলিত করে তোলে, তাই ‘র’ জিয়া প্রশাসনকে বিশৃংখল করে তোলার পদক্ষেপ গ্রহণ করে” (ঐ, ৫৪, ৫৫ পৃষ্ঠা)। এর সূত্র ধরে গোটা দেশে শান্তিবাহিনী, বঙ্গভ’মি অন্দোলন, সশস্ত্রবাহিনীতে অভ্যুত্থান সংগঠনের চেষ্টা করাসহ হরতাল, ভাংচুর, সংখ্যালঘু ইস্যু সৃষ্টি এসবেই ভারতের শক্ত হাত কাজ করে। সাথে ভারতীয় দালালেরা এতে শক্ত ভূমিকা পালন করে। উপরোক্ত বিকৃত রুচির শাসকবর্গ কোনদিনও বাংলাদেশের রাজনীতি করেনি।

আজো মায়ার টানে এরশাদ ভারতে ছুটে যান। মায়ার টান থাকা ভাল তবে দালালীর টান বড়ই বিপদজ্জনক। “ভারতীয় ‘সানডে’ পত্রিকার ১৮তম সংখ্যায় প্রকাশিত দি সেকেন্ড ওল্ডেস্ট প্রফেশন” শীর্ষক এক প্রতিবেদনে প্রকাশিত “৭৫ সালের পর ইন্দিরা গান্ধীর অনুমোদন নিয়ে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে হত্যা করার চক্রান্ত বাস্তবায়নে অগ্রসর হয়। — ৮০ সালে ইন্দিরা গান্ধী নির্বাচনে বিজয়ী হবার পর বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট জিয়া নিহত হন। ‘র’এর তৎকালীন প্রধান কাশ্মীরী ব্রাহ্মণ আর এস কাও ও সহকারী প্রধান শঙ্কর নায়ার জিয়া হত্যার চক্রান্ত করেন” (ঐ গ্রন্থ, ৫৯ পৃষ্ঠা)। এ লক্ষ্যে আওয়ামী লীগকে যে কোন উপায়ে ক্ষমতায় বসানো ছিল ভারতের লক্ষ্য, হাসিনার নির্বাচনী ব্যয়ভার ভারতকে বহন করার খবর বারে বারে প্রকাশিত হয়েছে। ঢাকার নিউ নেশন পত্রিকায় ২৯ সেপ্টেম্বর ১৯৮৮ তারিখে এ খবর প্রকাশিত হয় যে, ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরার অনুমোদনক্রমে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে হত্যার রহস্যজনক ষড়যন্ত্র করা হয় এবং তাকে নিষ্ঠ’রভাবে হত্যা করা হয়। — হত্যা সংবাদ প্রথম আকাশবাণীতে প্রচারিত হয়” (ঐ, ৬৩ পৃষ্ঠা)। সেদিনের ঘটনায় জড়িত দুই পলাতক সেনা অফিসার আজো ভারতে বসবাস করছেন (শামছুর রহমান, বাংলাদেশ ভারত সম্পর্ক, সাপ্তাহিক বিচিত্রা, ২২ বর্ষ ৯ সংখ্যা, ২৩ জুলাই ৯৩/৮ শ্রাবণ, ১৪০০, পৃষ্ঠা ৩৭)। “জিয়াউর রহমান হত্যাকান্ডের খবর পেয়ে সিলেট থেকে ঢাকা ফেরার সময় শেখ হাসিনা ব্রাহ্মণবাড়ীয়ার সীমান্ত দিয়ে পাড়ি দেয়ার সময় সীমান্তরক্ষী কর্তৃক বাধাপ্রাপ্ত হন” (শওকত মাহমুদ, বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনার ১২ বছর, দৈনিক দিনকাল, ২০/৫/৯৩ সংখ্যা)। “হত্যাকান্ডের একদিন পূর্বে ভারত বাংলাদেশ সীমান্তে অতিরিক্ত সৈন্য মোতায়েন করে। ২ জুন ৮১ তারিখে আকাশবাণী পরিবেশিত সকাল ৭টা ৫৫ মিনিটের খবরে এটি প্রচারিত হয়। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ নয়াদিল্লীস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশনে জানতে চান যে, শেখ হাসিনাকে গ্রেফতার করা হয়েছে কি না। এর মাত্র ১৩ বা ১৭ দিন আগে ভারত থেকে শেখ হাসিনা ঢাকাতে ফেরত আসেন স্বয়ং জিয়াউর রহমানের সহযোগিতায়, এতদ সংক্রান্ত উপরের অনেক যুক্তি সিরাজুর রহমানের কলামেও পাওয়া যায়।

ভারত থেকে ভারতীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নে এতদসংক্রান্ত সকল দাগে উপরে বাংলাদেশী হাসিনা-এরশাদ জোটবাধা শাসকবগের্র যুক্তি খাপে খাপে মিলে। যারা প্রকৃতই ভারতীয় দালালিতে বাংলাদেশ বিরোধী কাজে সরাসরি জড়িত। এরা সুরঞ্জিতগংদের সাথে পাকিস্তান পাকিস্তান করে চিৎকার দেয় শুধু ভারতের দুর্গন্ধ ঢেকে রাখার জন্য। এরাই মিরজাফর, উঁমিচাদ, রায়দুর্লভের বংশধারা। দেখা যায় মঞজুরের জড়িত থাকার নাম কর্ণেল শওকত আলীরও জানা, ঘটনার ৬/৭ দিন আগে থেকেই ঐ নাম জড়িয়ে শওকত ও হাসিনা তার ছাত্রনেতাদের গাইড করার প্রমান পাওয়া যায়। আমার ফাঁসি চাই বইটির লেখক দাবী করেন ১৯৮১ সালের ১৭ই মে শেখ হাসিনা দেশে আসার পর থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত প্রায় ১৬ বছর লেখক শেখ হাসিনার অলিখিত কনসালটেন্ট ছিলেন। লেখকের স্ত্রী নাজমা আক্তারী ময়না ১৯৮৮ সাল থেকে ১৯৯৭সাল পর্যন্ত  ৯ বছর শেখ হাসিনার অবৈতনিক হাউজ সেক্রেটারী ছিলেন। প্রায় ৩০টি ছবি সম্বলিত অনেক তথ্যাবলীর ফটোকপিসহ বইটির ছত্রে ছত্রে অতীতের ঘটে যাওয়া বাংলাদেশের প্রতিটি দুর্ভোগের এক নীল নকশা, যা ঘটেছে হাসিনার নীল হাত দিয়ে। ছবি ছাড়া ১৪০ পৃষ্ঠার বই এটি। আফসোস লাগে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর দেশটির আত্মহত্মার এ পোর্টমোর্টেম রিপোর্ট দেখে আত্মা কেঁপে কেঁপে উঠে! এত অনাচার দেখেও অনেকের মত নীরব থাকার অপরাধে প্রথমে লেখক তার নিজের জন্য ফাঁসি দাবী করেন। তাই বইটির নাম হয়েছে, “আমার ফাঁসি চাই”। বইটি হাসিনা সরকারের প্রধানমন্ত্রীত্বের সময়ই ছাপানো হয়, লেখক এটি এ যুক্তি দেখান যে, তিনি যখন সত্য প্রকাশ করছেন, তখন ঐ সরকারের সামনেই এটি প্রকাশ করবেন, লুকোচুরি তার পছন্দ নয়। অতঃপর সরকার এটি কোনভাবে ব্যান্ড করে দেয়। ঠিক ঐ সময় নিয়তি আমাকে এক কপি দান করে। তাই বেদনার ভার কমাতে এখানে মাত্র কটি লাইন জুড়ে দিলাম। আমি মনে করি বইটির প্রতিটি ছত্রই যেন কথা বলছে, সত্য উন্মোচন করছে, যেন এক কিয়ামত দেখা। ভিডিওটি দেখতে পারেন।

জিয়া হত্যাকাণ্ডের পর আখাউড়া সীমান্ত দিয়ে শেখ হাসিনা বোরকা পড়ে পাল

 

এরা কেন মাওলানা ভাসানীকে, কর্ণেল ওসমানীকে, জিয়াউর রহমানকে, সাইফুর রহমানকে, তাজউদ্দিনগংসহ ডঃ ইউনুসকেও সইতে পারে না, এ তাদের সহজাত রোগ বালাই, ক্যান্সারিক আদলের ভাইরাস হয়ে জাতিকে পঙ্গু করে রেখেছে। এদের কারণেই মুসলিমদের কুরআন আজ জঙ্গি বইএর নামে পরিচিতি অর্জন করছে। যুদ্ধাপরাধের নামে নিরপরাধ প্রতিপক্ষকে ফাঁসানোর খেলায় দাগ রাখছে। এদের কারণেই মাহমুদুর রহমানের মত একজন দেশপ্রেমিক আজ বন্দিশিবিরে। ফখরুল ইসলাম, শওকত মাহমুদ, রিজভী, মান্না, সালাহ উদ্দিনরা বন্দিত্বের শিকার। প্রতিটি আদর্শধারী সৎ মানুষই এদের শত্রু, কারণ সততার সাথে পাল্লা দেবার যোগ্যতা এরা হারিয়েছে, এ যোগ্যতা তাদের নেই। এরা দেশবিরোধী দেশদ্রোহী দালালের দল। তাই সব সাধুরা, মুক্তিযোদ্ধারা তাদের কাছে অচ্ছুৎ। আসলে তারাই ধড়িবাজ, দানব, দালাল, প্রকৃত ইতিহাস তাদেরে আস্তাখুঁড়ে ছুড়ে দিবে, কালের কলঙ্কিত জায়গাই তাদের আবাস। উপরের আলোচনাতে এটি স্পষ্ট যে নেতৃস্থানীয় আওয়ামীরা, ছাত্রনেতারা, নেতারা এসব অপকর্মের খবর জানে। তারা ঐ নেত্রীর কথামতই আচরণ করে চলেছে। এ জন্যই এরা আদর্শের অনুকরণ অনুসরণ করতে শিখে নি। এরা আইয়ামে জাহেলিয়াতিতে আকন্ঠ ডুবে আছে। দুঃখ সেইসব সোনার ছেলেদের জন্য যারা একটি সঠিক মুক্তিযুদ্ধের এত মর্মর ধ্বনি শুনেও কিছু রপ্ত করতে পারলো না। ৭১ পরবর্তী প্রজন্মরা স্বাধীনতা রক্ষায় দেশবিরোধীর ভূমিকা রেখে গেলে, এর চেয়ে দুঃখ আর কি হতে পারে? এ সহজ অংক বোঝার মত বোধ ঐ সব তরুণদের কেন হলো না? তারা তাদের তারুণ্যকে দাসত্বের শিকলে বেধে দিতে কেন উৎসাহী হলো, একজন আত্মবিক্রিত লেন্দুপ দর্জির ব্যক্তি স্বার্থের চক্রান্তে পড়ে? এ কেনর জবাব কেন তারা খুঁজে না? বর্তমানের নেপালের কাছ থেকে আজকে বাংলাদেশীদের শিখবার আছে অনেক কিছু। তারাই মেরুদন্ড শক্ত রাখার যুদ্ধে অবদান রাখতে যা করতে পারছে, ওটি আওয়ামী দলদাসরা এর বিন্দু বিসর্গও করতে অপারগ। ভবিষ্যতে মানুষ ঐ দলটির নাম নিতে মিরজাফরের মতই শংকা ও লজ্জা বোধ করবে, সন্দেহ নেই!

 

সূত্র:

(১) লরেন্স লিফশুলৎজ (এপ্রিল ২৩ ২০১৪, প্রথম আলো)।

(২) কনফিউশন ওভার এ কিলিং, লরেন্স লিফশুলৎজ, ফার ইস্টার্ন ইকোনমিক রিভিউ, ১০ জুলাই ১৯৮১

(৩) মইনুল ইসলাম চৌধুরীর “এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য: স্বাধীনতার প্রথম দশক”।

(৪) জিয়াউদ্দিন চৌধুরী  “দ্য অ্যাসাসিনেশন অব জিয়াউর রহমান অ্যান্ড ইটস আফটারম্যাথ”, ১৯৮১ সাল।

(৫) আমার ফাঁসি চাই, মুক্তিযোদ্ধা মতিউর রহমান রেন্ট, প্রকাশকাল ১৯৯৯সাল।

(৬) গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক প্রধানদের কথা, বাংলাদেশে ‘র’, আগ্রাসী গুপ্তচরবৃত্তির স্বরুপ সন্ধান, আবু রুশদ, ২০০১।

(৭) “ভারতীয় ‘সানডে’ পত্রিকার ১৮তম সংখ্যায় প্রকাশিত দি সেকেন্ড ওল্ডেস্ট প্রফেশন”।

(৮) শামছুর রহমান, বাংলাদেশ ভারত সম্পর্ক, সাপ্তাহিক বিচিত্রা, ২২ বর্ষ ৯ সংখ্যা, ২৩ জুলাই ৯৩/৮ শ্রাবণ, ১৪০০, ৩৭পৃষ্ঠা।

(৯) শওকত মাহমুদ, বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনার ১২ বছর, দৈনিক দিনকাল, ২০/৫/৯৩ সংখ্যা)।

১০ই ডিসেম্বর ২০১৫ সাল

প্রগলভ স্বৈরাচাররা দুর্গন্ধ ঢাকতে ব্যস্ত

ppপ্রতি বছর ৬ই ডিসেম্বরকে স্বৈরাচার পতন দিবস হিসাবে পালন করা হয়। ৯০এর দশকে সেদিনের চিহ্নিত স্বৈরাচার ছিলেন এরশাদ। যদিও আগে পরেও স্বৈরাচার বারে বারে এসেছে, বাসা গেড়েছে, আছে বহাল তবিয়তে, মাথায় কাঁঠাল ভেঙ্গে খাচ্ছে। তারাই গণতন্ত্র নামের গিলাফের নিচে এতদিন থেকে খেলা চালিয়ে গিয়ে নানান কথামালা দিয়ে নিজেদের ধুয়ো তুলসি পাতা করতে চাইছে। একজন বলছে কোথায় তোমাদের গণতন্ত্র? এরা স্বভাব বদলায় না, বদলাতে পারে না। কথায় বলে ‘কয়লা ধুলেও ময়লা যায় না’। ইয়াহইয়ার অনুকরণে জাতিকে কলা দেখিয়ে গজিয়ে উঠা স্বাধীনতা পরবর্তী বাকশাল, এরশাদ এক পথে হাটা পথিক। নব্বইএর দশকে নূর হোসেন, জাফর, জয়নাল, দেলোয়ারের লাশ স্বৈরাচার বিধ্বংসী খেলার দাগেভরা। এসব লাশও জমে অনাগত অপেক্ষারত স্বৈরাচারের পরিকল্পনার পথ ধরে। কিভাবে এখানে অর্ডারী লাশ জায়গা করেছিল, তা জাতির সচেতনরা জানেন না, এমন নয়। না জানলে একদিন জানাবার কিছু সূত্র দেব। কারণ জাতিকে কানা করে রাখা হয়েছ, তাই আজ অনেক ক্ষেত্রেই চোখ থাকতে অন্ধ জাতি।  আজকের প্রগলভতা হচ্ছে অপকর্মে জাহাজ ডুবি ঘটিয়ে করে হাবাগোবা সাজার নাটকীয় প্রয়াস, ভিন্ন মাত্রার ছলচাতুরী! সহজ অংকে দন্ডধারীরা ওপথেই হাটছে, স্বৈরাচারে দাগী অপরাধী হয়ে আছে, নাম নিয়েছে “পদ্মলোচন” পদ্মের মত চোখ কিন্তু জাতে কানা। মুক্তিযুদ্ধে অনভিজ্ঞ মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রী মোজাম্মেল হক বলেন, মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরা কেন বিএনপি করে, এটি মানা যায় না। নিউইয়র্কের হিউম্যান রাইটস ফোরামের পরিসংখ্যান অনুসারে গত দশ বছরে ৯০০ বাংলাদেশিকে বিএসএফ হত্যা করে। মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের রেকর্ড অনুযায়ী ২০০০ সালের ১ জানুয়ারী থেকে গত ২০১২ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ১০৬৪ জন বাংলাদেশি নাগরিককে হত্যা করেছে বিএসএফ। পাকিস্তানকে ভারত যত কেয়ার করে বাংলাদেশকে তার ছিটেফোঁটাও করে না। স্বৈরাচারের কোন মেরুদন্ড থাকে না। সম্প্রতি স্বৈরাচার এরশাদ মেরুদন্ড খুঁজে বেড়াচ্ছেন আর প্রমান করতে চাচ্ছেন তিনি সাধু। চলমান স্বৈরাচারি মন্ত্রীরা এসবের কোন খোঁজ রাখেন বলে মনে হয় না। মন্ত্রী ওটিও ভুলে আছেন যে, বিএনপির নেতাই মুক্তিযোদ্ধার শিকড় সূত্র। মন্ত্রীর মাথায় বর্তমান বাংলাদেশ অনুপস্থিত। বন্ধু আর শত্রু যারা চিনে না, তারাই সময়ের সেরা হতভাগা।

তারা ভিন দেশের চিন্তায় সময় পার করে। “ভারতের সম্মতি ছাড়া ভুটান থেকে জলবিদ্যুত কেনা যাবে না” খবরটি তাদের মগজে খেলে না, বরং মগজ বিএনপি নামের ভাইরাসে আক্রান্ত। এর বড় কারণ বিএনপি সবদিনই মিরজাফরের বদলে সিরাজের ভ’মিকাতে নেমেছে। প্রকৃত বাংলাদেশের রাজনীতি করছে যার জন্য বাড়তি উৎকন্ঠা, তাই মুখের কথা সব পাগলের প্রলাপ। “আন্তঃনগর সংযোগ প্রকল্পে শুকিয়ে যাবে বাংলাদেশের নদনদী” ফারাক্কা তারা দেখে না, টিপাইমুখ তাদের ঘাড়ের উপর সাটা। তারপরও তারা অবোধ শিশুর মত ছেলে খেলার গল্প শোনায়। সামনে সিংগাপুর মালয়েশিয়া! পড়ছি ডঃ তুহিন মালিকের “সমগ্র বাংলাদেশ মাত্র এক রুপি!” ২০১৫তে বাংলাদেশ ছাড়া এত বেওকুফ আর কোন জাতি আছে বলে জানি নি। বুঝতে চায় না দেশের প্রকৃত সমস্যা কোথায়? তাদের জং ধরা মনের চেতন আজ মৃত। তারা মোটা গলায় বলতে ব্যস্ত “জিয়াকে আর সাবেক রাষ্ট্রপ্রধান বলা যাবে না”। আজকের বাংলাদেশের সমস্যা কি জিয়াকে রাষ্ট্রপতি বলা? তারচয়ে ভালো হয় ঐ নাম বদলে নতুন নাম রেখে দিক তারা, তবে আকিকা করতে হবে, তখন কেউ আর ঐ নাম মুখে আনবে না। এরশাদের মন খারাপ “জিয়ার সাথে কেন তাকে এক পাল্লায় ফেলা?” স্বৈরাচার বোনের জন্য কি কম করেছে স্বৈরাচার ভাই? হত্যা গণধর্ষন গনগ্রেফতার অতীতের সব রেকর্ড আজ উচ্চ অর্জনে ভরা! মামলা ওয়ারেন্ট ছাড়া ধড়পাকড় চলছে দেখে মন্ত্রীর গলা “পুলিশ এ করবে না তো কি চুমো দেবে?” এরা কি কথা বলতেও ভুলে গেলো, না কথা শিখেই নি, আল্লাহ মালুম। সম্প্রতি ২১ আগষ্টের গ্রেনেড হামলার বিচারের সাক্ষ্যদাতা আওয়ামী কাজী জাফর উল্লাহ যুক্তিতে বলছেন তিনি একজন যুবককে গ্রেনেড ছুড়তে দেখেছেন, তিনি আজো আহত ঐ গ্রেনেডের আঘাতে, সাক্ষির যুক্তিতে এটি করেছে হাওয়া ভবন। ঘটনার সময় আমরাও ময়দানে না থাকলেও কাছেই ছিলাম, ভাবনায় পড়েছি। এর উপর ভেবেছি, কাজ করেছি। যার জমা আমার “২১ আগষ্ট ২০০৪ সচেতনের সন্দেহ সন্ত্রাসীর দিকে”, লেখাটির দিকে পাঠককে একটু বাড়তি নজর দিতে অনুরোধ করবো। দেখতে পারবেন কিভাবে স্বৈরাচার চাঁদোয়ার নিচে, যেন দেখা যায়!

জনতার কথা ২৪.০৭.১৩(জয় বলছেন আওয়ামী লীগ আবার ও ক্ষমতায় আসছে; তার কাছে খবর আছে) somehow it was erased from the field.  

Khandokar Abdur Rashid words

 

এরশাদ যে সাক্ষাৎ মঞ্জুর হত্যায় জড়িত, তা ধানাই পানাই এরশাদ আজো লুকোতে ব্যস্ত, কারণ চোরের মনেই তো পুলিশ পুলিশ!  লরেন্স লিফশুলৎজ ফার ইস্টার্ণ ইকোনমিক রিভিউ এর দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিনিধি ছিলেন। তিনি একমাত্র বিদেশী সাংবাদিক যিনি মঞজুর হত্যা মামলায় ২৫ মার্চ ১৯৯৫ সিআইডিকে দেয়া এর স্বপক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন যা এর মাঝে পত্রিকাতে প্রকাশিত হয়েছে (২৩এপ্রিল ২০১৪, প্রথম আলো)। সেখানে ছিল এয়ার ভাইস মার্শাল সদরুদ্দিনের সাক্ষ্য। যেখান থেকে এটি স্পষ্ট যে মেজর জেনারেল মঞজুরকে জিয়া হত্যায় ফাঁসানোর একটি পরিকল্পনার কথা জানা যায়। যুক্তিতে এটি স্পষ্ট মঞ্জুর কখনোই জিয়া হত্যায় জড়িত নন। সময় ১লা জুন ১৯৮১ সাল। বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে, বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আব্দুস সাত্তার অফিসে মেজর জেনারেল মঞজুর ধরা পড়লে একটি টেলিফোন আসে এতে উত্তেজিত এরশাদ রেড টেলিফোনের কাছে ছুটে যান আর একটি নাম্বারে ডায়াল করেন। ও পাশ থেকে বলা হয়, মঞজুরকে পুলিশ আটক করেছে। উপস্থিত ময়দানের সাক্ষিরা এরশাদের চতুর বাণীর   শ্রোতা “এক্ষুনি তাকে নিয়ে নাও। তারপর পরিকল্পনা মত কাজ করো” বলেই তিনি ত্বরায় টেলিফোন রেখে দেন। তখন সাক্ষি বলেন, জেনারেল এরশাদ আপনি কোন পরিকল্পনার কথা বলছেন, আমি কি জানতে পারি? এতে তিনি আরো উত্তেজিত হয়ে বলেন, এয়ার চিফ, আপনি কিছুই বোঝেন না, তিনি বলেন, আমি কি বুঝি না বুঝি, আপনার কাছ থেকে জানতে হবে না”। সাক্ষি তখন বিচারপতি সাত্তারের আশ^াস চাইলে তিনি তা দিয়েছিলেন, বলেছিলেন বিচার করা হবে। পরদিন ২রা জুন। ভোর রাত দেড়টা দুইটার দিকে উইং কমান্ডার কামাল, ডিরেক্টর এয়ার ইন্টেলিজেন্স টেলিফোনে মেজর জেনারেল মঞজুরের হত্যার খবর দেন। সকাল ছয়টা সাতটার দিকে সাক্ষি এরশাদ সাহেবকে টেলিফোন করে বলেন,“এরশাদ সাহেব আপনারা জেনারেল মঞজুরকে মেরে ফেললেন”।

মরণ কি আপনাদেরে কোন কালেই স্পর্শ করবে না স্বৈরশাসক এরশাদ, কি মনে হয়! মৃত্যুর দড়ি, কিয়ামতের জবাবদিহিতা, শেষ বিচারের বাস্তবতা তো অন্তত সাক্ষাৎ যমের মতই ঝুলছে, যতই খেলা ঢেলা করেন। কি কারণে পেট্রোল বোমা ছোড়া সরকারকেও এরশাদ জেনেও ঢেকে রাখে, দেলোয়ার গাড়ী চাপায় মরে হাসিনার কপট বাহিনীর দ্বারা, তাও আজ দিবালোকের মত স্পষ্ট। সেদিনের মিছিলের জাফর দেলোয়াররা মঞজুরের মতই অর্ডারী লাশ, এটি জেনেও এরশাদকে রেখে ঢেকে কথা বলতে হয় আসল সত্য প্রকাশ করেন না কারণ তারা মাসতুতো ভাই। এসব কারণেই তাদের দুজনাতে এত একাত্বতা! যিনি খুন করেন তাকে কাছ থেকে মাত্র একটি গুলি ছুড়তে হয়। জিয়া হত্যার মাত্র তিন দিনের মাথায় এ ঘটনা ঘটে। তিনি নিহত হন উচ্চ পদস্থ সেনা কর্মকর্তার হাতে, পরিকল্পনা মাফিক যিনি ছুটে যান ঢাকা থেকে। মার্কিন সাংবাদিক লরেন্স লিফশুলৎজের দীর্ঘ অনুসন্ধানে পাওয়া এখানের সংক্ষিপ্ত সংগ্রহ। পরে একসময় পারলে এর উপর বিস্তারিত কিছু কাজের ইচ্ছা রইল মনে। যিনি গুলি করেন তাকে অনেকেই নিজ চোখে দেখেছেন, অনেকেই তাকে নামে দাগে চিনতেন বলেও প্রকাশিত হয়েছে। মঞজুরকে যেখানে রাখা হয় সেখানে ঐ ব্যক্তি ঢোকে কর্ম সিদ্ধির পর সাথে সাথে ঢাকাতে প্রত্যাবর্তন করেন। অতপর মৃত সনাক্ত হয়। মিলিটারী ডাক্তারও একই খবর প্রচার করেন যে একজন ঢাকা থেকে এসে আদেশ পালন করে সাথে সাথে ফিরে যান। এত কিছু জানার পরও আদালত যদি নিরব ভূমিকা পালন করে, তবে সবার জানা উচিত, বিধাতা মরে নাই মরবে না, জানা কথাটি স্মরণ করিয়ে দিতে চাই শুধু। যিনি গুলি করেছেন তার দোষ অনেক হালকা, কারণ তিনি কথার আদেশ পালন করতে বাধ্য, অবাধ্য হলে হয়তো তিনিও পরবর্তী মঞজুর হতেন। কিন্তু তাকে সুযোগ দেয়া উচিত যাতে প্রকৃত সত্য প্রকাশিত হয়। তিনি যদি দেশের বাইরেও থাকেন, তার যেন সে সুযোগ হয় প্রকৃত সত্য প্রকাশের, এ আশায় বুক বেধে রইলাম। জানা যায় মুক্তিযোদ্ধা হতভাগা মঞজুরের পরিবার আজো দেশের বাইরে, দেশ স্বাধীন করে তারা নিজেরাই আজ পরাধীন। মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রী কি এসব খবর রাখেন, জানতে ইচ্ছে করে? এ স্বৈরাচাররা কখনোই মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয় নি, এরাই পাকিস্তান ফেরত ভারতীয় বাহুল্যে ক্ষমতা দখল করে বেছে বেছে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাকে ময়দান থেকে চিরকালের জন্য সরিয়ে দেয়। এ হচ্ছে একটি স্বাধীন দেশের প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের ইতিহাস!

কোন এক অজানা কারণে উচ্চ আদালত বেশ কয়েক বছর আগে মেজর জেনারেল আব্দুল লতিফ ও লেফটেনেন্ট কর্ণেল শামসুর রহমানের বিচারিক প্রক্রিয়ার উপর স্থগিতাদেশ জারি করেন। ঘটনার মূল সাক্ষিদেরে তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়। উর্ধতন কর্মকর্তাদের মৃত্যুর হুমকি দেয়া হয়। যখন মামলাটি চলছিল তখন এটর্নি জেনারেল আমিনুল ইসলাম যিনি মামলাটিতে গতি এনেছিলেন, হঠাৎ হৃদক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান (?)। সেদিন থেকে বিগত ১৯ বছর ধরে নানান প্রশ্নের আড়ালে বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদছে। এর ফাঁক গলিয়ে আসামীরা হাফ ছেড়ে যেন বাঁচেন এবং একই ধারাতে আজ অবদি প্রগলভ আচরণ বহাল আছে। সচেতন পাঠকরা দেখতে পারেন, (মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুর হত্যাকান্ড, প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার, ২২-২৫ ফ্রেব্রুয়ারী ২০১৪)। সবশেষে বলছি বিচারপতিরাও সাবধান! একদিন আপনারাও মরবেন, এসব অপরাধে গোটা বিচার বিভাগই আসামীর খাতাতে নাম লেখাবে, যদি বিন্দু পরিমান অবিচার তারা করে। আল্লাহর প্রকৃত বিচারের আদলে যেন ইহ ও পরকালে এদের সবার ধ্বংস নির্ধারিত হয়, এ কামনায়। আমরা জানি এসব কামনারও দরকার পড়বে না, নিখূঁত বিচারের জমা পাওনা তাদের জন্য শেষ বিচারে অবশ্যই মোটাদাগে চিরন্তনভাবে সংরক্ষিত ও অবধারিত।

নাজমা মোস্তফা,  ৬ই ডিসেম্বর ২০১৫

সাহিত্যে সতিত্বহানীতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

আমার এ ব্লগে সব কষ্টকেই আমি জমা করতে চাই। প্রতিবেশীদের মত সাম্প্রদায়িক হুজুগে বাংলাদেশ কখনোই আক্রান্ত নয়। যদিও মিথ্যাচারে কিছু চক্রান্তকারীরা ঐ মিথ্যে সুর তোলার ব্যর্থ প্রয়াস করেন মাঝে মাঝে, যা ধোপে টেকে না। বিদ্রোহী কবি নজরুলকেও এককালে অনেক গালাগাল দিয়েছে আমাদের চুলচেরা বিশ্লেষনকারী ধর্মবাহকরা। এর কারণ হয়তো হিন্দু নারীর পানি গ্রহণই তাদেরে ঐ আচরণে উদ্বুদ্ধ করে বেশী। ভারতে গরুর মাংস ভক্ষণের জন্য মানুষ খুন করার ধৃষ্টতা ধর্মের নামে চলছে, সেখানে তারা এ কবিকে বা তার স্ত্রী প্রমিলাকে খুন করে নাই, তবে নজরুলকে একহাত নিতে তারা “কাফির” নামটি সেটে দিতেও কসুর করেনি। কাফের অর্থ ইসলামের পরিভাষাতে যারা ইসলামের সত্য থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখে বা লুকিয়ে রাখে। দেখা যায় সমাজের কিছু ভাগ্যবানেরা সবদিনই এটি অর্জন করেছেন, যদিও তারা এ নামে মানানসই নন। নজরুল, ইকবাল, মওদুদী এরা অনেক ক্ষেত্রে অনেক ভালো মুসলিম হয়েও এ অর্জনের অধিকারী হয়েছেন। বাংলাদেশে অনেকেই রবীন্দ্র পূজাতে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে চলেছেন। কেউ বলছেন ঈশ^র, কেউ বলছেন রবীধর্ম (নবুয়তি দিতে চেয়েছেন) কিন্তু ভারত গবেষকরা নজরুল সম্বন্ধে বলছেন ভারত দুখু মিয়াকে না পারে গিলতে না পারে উগলে দিতে। তার স্বপক্ষে প্রতিবেদনটি দেখুন।

ডাউন লোডের দু এক দিনের মাঝেই প্রায়ই লিংকগুলি মুছে দেয়া হচ্ছে। বাস্তবতা এখানেই নীচে।

চুরুলিয়া – Churuliya – কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মস্থান

ভারতে লাইন বাধা মুসলিম খানরা ঐ মানচিত্রে দেশের সুনামে কাজ করে চলেছেন যদিও তারা ধর্মের পরিচিতির মূখ্য ভুমিকায় নন, ভিন্ন মাত্রায় তারা মোটাদাগে পরিচিত। বরাবরের মত এবারো তাদের সব পরিচিতি ছাপিয়ে বার বার বুদ্বুদ হয়ে ভাসছে তাদের মূল ধর্ম পরিচিতি। ২০১২ সালে আমার একটি বই বাংলাদেশের বই মেলাতে আসে বইটির নামএকই ধর্ম একই ধারা লেখাটিতে আমি এটিই ফুটিয়ে তুলতে চেষ্টা করেছি, কিভাবে যুগ যুগ অবধি বিশ্রষ্টা ধর্মের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে চলেছেন একই ধারাতে, আর আমরা মানুষরা কিভাবে ভিন্ন ভিন্ন নামে নিজেদের মাঝে বিভেদ সৃষ্টি করে চলেছি। যুক্তিগুলো উপস্থাপন  করতে বইটিতে প্রায় ৪০০এর উপর তথ্যসূত্র এসেছে। সেখানে পৃথিবীর বড় বড় প্রচারিত ধর্ম সূত্রসহ আলোচনায় এসেছে। ধর্ম ধারণের এতপরও আমরা বহুদূর পিছিয়ে আছি নিজেদের অপরিনামদর্শীতার কারণে। সেখানে ঐ অপরাধে ভারতের জনগণ সনাতন  ধর্মের দাবীদার হলেও সবদিনই আচরণে কপট মানসিকতার শিকার, তাদের বেশিরভাগ আচরণই বিতর্কের জমা বাড়ায়। গুজরাট বলেন, বাবরি মসজিদ বলেন, আর আখলাক হত্যাই বলেন, তাদের লেখকরা প্রকাশ করছেন ওখানে সংখ্যালঘুরা এতই নির্যাতীত যে, গরু বরং সে দেশে তার চেয়ে অনেক বেশী নিরাপদ। এ চিন্তায় বেশ আগে থেকেই আক্রান্ত হয়ে এর কারণ সন্ধানে কিছু সূত্র প্রাপ্ত হয়েছি। আমি মনে করি এসব হত্যাকারী অপরাধের জন্য দায়ীরা বড় আসনে বসলেও অপরাধের দায় তাদের ঘাড়ে বড় মাপেই বর্তায়। সচেতন সমাজ তা চেপে গলাধকরণ করে বসে আছে, যা ঠিক নয়। এটি অজানা জনতার সাথে এক ধরণের প্রতারণা।

সম্প্রতি ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং সংসদ অধিবেশনে এটি স্পষ্ট করেন যে, প্রথম সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা সমাজতন্ত্র ছিল না। অতপর সাবেক প্রধানমন্ত্রী জরুরী অবস্থা জারি করে ১৯৭৬ সালে (ভারতের স্বাধীনতার ২৯ বছর পর) সংবিধানের ৪২তম সংশোধনির মাধ্যমে ধর্মনিরপেক্ষতা সমাজতন্ত্র যোগ করেন। উল্লেখ্য হিসাবে দেখা যায় কৌশলী ভারত জোর করে আওয়ামী ষড়যন্ত্রীদের মাধ্যমে তার নিজ দেশের প্রয়োগের আগেই বাংলাদেশের ঘাড়ে যুক্তি চাপিয়ে দেয় ১৯৭২ সালে(বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরের বছর), তার আগে এর নামগন্ধও ছিল না। এর কিছু বিসতৃত আলোচনা মুক্তিযোদ্ধা মেজর জলিলের “অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা” গ্রন্থে খুব স্পষ্ট করেই আলোচিত হয়েছে। ধর্ম নিরপেক্ষ ভারতের সংবিধান সম্বন্ধে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি কে, আর নারায়ন অতীতে বলেছেন, “ভারতের সংবিধানের পবিত্রতা আমরা রক্ষা করতে পারি নি। আমরা সংবিধান ভঙ্গ করেছি”। ভারতীয় সংবিধানের ২৫ অনুচ্ছেদে স্পষ্ট ভাষায় প্রত্যেকের নিজ নিজ ধর্ম পালন ও প্রচারের স্বকীয় স্বাধীনতার কথা উল্লেখ থাকলেও আজ ভারতের সংবিধান কিছু কট্টরপন্থী হিন্দু নামধারী সংকীর্ণদের হাতে জিম্মি দশা কাটাচ্ছে। দাঙ্গাহাঙ্গামার জন্য জাতিতে গোষ্ঠীতে, উচ্চ বর্ণ নিচ বর্ণের এক কুরুক্ষেত্রের মাঠ ভারত, বিশেষ করে মুসলিম নিধনের জন্য এটি একটি উত্তম রণক্ষেত্র বটে!

পাশাপাশি হিন্দু ও মুসলমান দুটি সমাজ ব্যবস্থার লোক আমরা বাংলাদেশেও বহুদিন থেকে বসবাস করে আসছি ভাই বোনের মতই। আমার শিশুকালের নিজেরও বেশীরভাগ সহপাঠীই ছিল হিন্দু। সবাই দলবেধে আমাদের বাসায় আসতো, যেত, খেতো। কোন বৈষম্য তেমন টের পেতাম না, তবে প্রথম এটা টের পেয়েছিলাম যখন আদরের বান্ধবীকে তারা অতি যতনে দাওয়াত করে নিয়ে গিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু তাদের গোটা বাড়ীর ছোটবড় সবার অতি আদরের ডাক্তার বাবুর নয়নের মা-মনিকে যখন তারা বারান্দায় বসতে দিল। তখনই আমার মাথায় এক প্রচন্ড হোঁচট অনুভব করি, যদিও আমি নিতান্ত শিশুই ছিলাম। আমার বান্ধবীদের মায়া মমতার কোনই কমতি ছিল না। সেদিন জল খাবারের আয়োজন হিসাবে যে যা পারে এনে হাজির করে ঠিকই। কিন্তু তবু কোথায় যেন একটি কাঁটা বিধে থাকে এবং সেটি আমার অন্তরে আজও আমাকে পীড়া দেয়।

উপরোক্ত প্রসঙ্গে সন্ধান করতে গিয়ে দেখা যায় যদিও আমাদের সাধারণ জনতারা হিন্দুই হোক আর মুসলমানই হোক নিতান্তই গো বেচারা প্রকৃতির বিধায় এবং তেমন সচেতন নই বলে আমরা আজও সঠিকভাবে ধরতে পারিনি যে এসবের মূল কারণ কি? কেন আমাদের দাঁতে এত বিষ? আমরা হিংস্র জীব নই, যদিও তবু কেন এত ভয়ংকর ক্ষুধা, হিংস্রতা আমাদের আচরণে? আমরা তো মিলে মিশেই কাটিয়েছি। যার যার ধর্ম যার যার মতনই পালন করেছি, তবু কেন আমাদের মাঝে সাপে নেউলে সতিনী সম্পর্ক? আজ মনে হয় এর বিজ কিভাবে রোপন করা হয়েছে পরম যতনে , যার জন্য এটি তোষের আগুণের মতই দিকি দিকি জ¦লছে নিরবধি। এর মূলে যারা তারা একদম সাধু পুরুষ সেজে বসে আমাদের রক্তে নিজেরা (¯œান) সিনান সমাপান্তে মহা তৃপ্তিপূর্ণ ভান্ডে ডুবে আছে সম্মানে, প্রপ্তিতে, পূর্ণতায় সকল ব্যর্থতা, দায়, হতাশা আর শূণ্যতা আমাদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে তারা আজ বরণীয়, পূজনীয় সমাজে সভ্যতায়।

সর্বাগ্রে আমি দেখাতে চাই সাহিত্যে কেমন করে সতিত্বহানী করা হয়েছে। এ শুধু আমার চোখে পড়েছে বলেই আমি শুধু তা পাঠকের সামনে তুলে ধরছি, এটি ঠিক নয়। সাহিত্য সংস্কৃতি এমন একটি মাধ্যম যাতে যে কোন যুগের মানস চিত্রের ছায়া সাহিত্যের দর্পনে ধরা পড়ে। সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস ঘাটলে অতীত জীবনের নানান চিত্র যে কোন বর্তমানেও ফুটিয়ে তোলা সম্ভব। ভারতবর্ষের বঙ্কিম সাহিত্যের সহিত অনেকেই পরিচিত। বঙ্কিম চন্দ্রের সাহিত্যে অনেক মুসলিম বিদ্বেষ সাক্ষাৎ চোখে পড়েছে সব সচেতনের কাছেই। ধর্মের বিষ বাষ্পের সাথে সাথে যদি কেউ সাহিত্যের বিষ বাষ্প ছড়াতে ব্যস্ত থাকে, তবে স্বভাবতই উক্ত অঙ্গনের আগুন দ্বিগুন তেজে জ্বলতে থাকবে যুগ যুগ ব্যাপী। কারণ সাহিত্য একদিনের জন্য বা ক্ষণিকের জন্য সৃষ্ট কোন উপাদেয় প্রসাদ নয়। এটা যুগ যুগ ব্যাপী এর স্বাদ এর বিস্বাদ সমাজকে আলোড়িত করার ক্ষমতা অবশ্যই রাখে।

রবীন্দ্রনাথ আমাদের কাছে অনেক বড় মাপের কবি। এটা মাপ না নিয়েই আমরা অনায়াসে বলতে পারছি। কেউ কবিগুরু, বিশ্বকবি, শ্রেষ্ঠ কবি, অজস্র ভূষণে আমরা সমানেই তাকে ভূষিত করে চলেছি। এমন কি অনেককে তোষামোদি করতে করতে তাকে ঈশ্বরের সমতূল্য বলতেও শোনা গেছে। আজ তাকেও এ প্রসঙ্গে এনে দাঁড় করাবো কারণ সাহিত্যের অনেক ঋণ তার ঘাড়েও পড়ে।  আর এ শুধু আমি নয়, অতীতে যারা দাঁড় করিয়েছেন তাদের কথা, তথ্য আমি এখানে তুলে ধরবো শুধু সত্য সন্ধানের খাতিরে, আমার প্রধান কাজটি হচ্ছে তুলে ধরা। হতে পারে এতে অনেক বিদগ্ধ জন ক্ষুব্ধ হতে পারেন, কিন্তু আমার করার কিছু নেই। বলা যায় আমি এতদিন অনেক কিছুই জানতাম না, তাই নতুন করে জানার পর আজকের এই পুরান ঘটনার উপস্থাপনা। একটি বই হাতের কাছে পাই লেখক আবু ফাতেমা মোহাম্মদ ইসহাক , ১লা  অক্টোবর ১৯৬৯ প্রথম সংস্করণ। বইটিতে লেখক অনেক বেদনার কথা তুলে ধরেছেন কেমন করে সাহিত্যের বিষ আমাদের ভিতরে জিইয়ে রাখার কাজটি করা হয়েছে খুব কৌশলে। যার খেসারত হিসাবে আজ অবধি ওখানে গুজরাটের চারপাশে আগুণ। আগুণ জ্বালাতে সবাই সিদ্ধহস্ত, মোদির সরকারও পিছিয়ে নেই, নিবানোর জনতা সবদিনই অল্প। নিচে শুধু পাঠকের জন্য সংক্ষেপে কিছু পয়েন্ট, যদিও গোটা বইয়ে বিসতৃত আলোচনা এসেছে।

(১) পশ্চিম  বঙ্গ নিবাসী রবীন্দ্র সাহিত্যের গবেষক কাজী আব্দুল ওদুদ সাহেব বলেছেন, পরবর্তীকালে অবশ্য এমন সময় রবীন্দ্রনাথের চিন্তায় এসেছিল যখন প্রায় বঙ্কিমচন্দ্রের ধরণের হিন্দু জাতীয়তাবাদী তিনি হয়ে পড়েছিলেন”। তিনি আজীবন সাম্প্রদায়িক লোকদের সাথেই বেশী উঠাবসা করেছেন ও তাদের শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন। তবে বঙ্কিম চন্দ্রের সাম্প্রদায়িক উগ্রতা তার মধ্যে ছিল না—এ কথা কতকটা বলা যায়।

(২) তবে একথাও স্মরণযোগ্য যে, উগ্র সাম্প্রদায়িকতার চেয়ে সুক্ষ সাম্প্রদায়িকতার ফল সুদূর প্রসারী এবং এর জ্বালা দীর্ঘতর।

(৩) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক শ্রী গণেশ চন্দ্র বসু মুসলিম ছাত্রদেরে প্রায়ই বলতেনঃ বঙ্কিমের বই পড়ে তোমরা বঙ্কিমচন্দ্রকে যেভাবে গালিগালাজ করো, প্রকৃত রবীন্দ্রনাথকে যদি উদঘাটন করা যায়, তাহলে তোমরা তাকে কী ভাষায় কী ভাবে যে গালি দেবে, বুঝে উঠতে তো পারছি না

(৪) কবি আল মাহমুদের “তারা কাঁদে না ধ্বংস হয়ে যায় তবু কাঁদে না” নামের কলামটি থেকে একজন লেখক শিব নারায়ন রায় সম্বন্ধে বলেন নাস্তিক্য ধারার এ লেখক যৌবনে তিনি রবীন্দ্রনাথের ঈষৎ সমালোচনা করেছিলেন বলে বাস্তুচ্যুত হন। ফলে সারাজীবন তিনি অষ্ট্রেলিয়ায় কাটান। মেলবোর্ণ ইউনিভার্সিটিতে একটি ডিপার্টমেন্টাল হেড হিসাবে দীর্ঘ দিন কাজ করেন। কলকাতার লোকেরা তাকে কোনদিনই সহ্য করতে পারতো না। প্রসঙ্গটি উত্থাপিত হয় তার অতি সাম্প্রতিক ২০০৮এ তার মৃত্যু সংবাদকে অবলম্বন করে।

(৫) দাদা জ্যেতিরিন্দ্র নাথের আদর্শেই রবীন্দ্রনাথ এগারো বছর বয়সে “পৃথ্বিরাজের পরাজয়” নামে এক বীর রসাত্মক কাব্য রচনা করেন। কবি এ সম্পর্কে তার জীবন স্মৃতিতে বলেন, “তৃণহীন কঙ্কর শয্যায় বসিয়া রৌদ্রের উত্তাপে পৃথ্বীরাজের পরাজয় বলিয়া একটি বীর রসাত্মক কাব্য লিখিয়াছিলাম”। এটাও মুসলমানদের বিরুদ্ধে উদগীরণ করা হয়।

(৬) রবীন্দ্রনাথের ভ্রাতা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ যেসব নাটক লিখেছেন, তন্মধ্যে “সরোজিনী নাটক” “অশ্রুমতি”, ও “স্বপ্নময়ী” নাটকের উল্লেখ করা যায়। ডক্টর নীলিমা ইব্রাহিম বলেন, “সরোজিনী নাটক প্রকাশ্যে ইসলাম বিদ্বেষ প্রকাশ করলো। পরধর্ম অসহিষ্ণুতা সভ্যরূচি বিগর্হিত। একই উদ্দেশ্যে অনুপ্রাণিত হয়ে ১৮৭৯ খৃঃ জ্যোতিরিন্দ্র নাথ “অশ্রুমতি” নাটক প্রকাশ করেন।অশ্রুমতি নাটকেও মুসলিম বিদ্বেষ প্রচারিত হয়েছে। অশ্রুমতির শিক্ষাদান স¤পর্কে প্রতাপ বলছেন, “মহর্ষি, তুমি ওদের ভাল করে শিখিও; যে সব গাথাতে রাজপুত বীরত্বের গুণকীর্তন ও মুসলমানদের নিন্দাবাদ আছে সেইসব গাথা ওর কন্ঠস্থ করিয়ে দিও”। (বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত, দ্বিতীয় সংস্করণ—৩৭১ পৃষ্ঠা)

(৭) উপরোক্ত নাটকদ্বয়ের বিষয়বস্তু থেকে আমরা বুঝতে পারছি যে, মুসলিম বিজয়ের বিরুদ্ধ শেষ বিদ্রোহী রানা প্রতাপ হলেন সেদিনের ঠাকুরবাড়ীর আরাধ্য বীর। সরোজিনী নাটকের অপর নাম “চিতোর আক্রমণ”। ইংরেজ ১৮৭৫ সানের ৩০শে নভেম্বর নাটকটি প্রকাশিত হয়। ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায় “প্রবাসী” আশ্বিন কার্তিক ১৩৫৪ সংখ্যায় প্রকাশিত তার “জ্যোতিরিন্দ্রনাথ” প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন যে, সরোজিনী বা চিতোর আক্রমণ নাটকের অন্তর্গত রাজপুত ললনাদের চিতারোহণের গীতটি রবীন্দ্রনাথের রচিত। জ্যোতিরিন্দ্র নাথের জীবন স্মৃতিতে এর উল্লেখ রয়েছে। চিতারোহনের গীতটি হচ্ছে নি¤œরুপ।

জ্বল জ্বল চিতা দ্বিগুণ দ্বিগুণ

পরাণ সপিঁবে বিধবা বালা ।

জ্বলুক জ্বলুক চিতার আগুণ,

জুড়াবে এখনি প্রাণের জ্বালা।

শোনরে যবন শোনরে তোরা

যে জ্বালা হৃদয়ে জ্বালালি সবে

সাক্ষী রইলেন দেবতা তার

এর প্রতিফল ভুগিতে হবে।

(সাহিত্য পত্রিকা শীত সংখ্যা, ১৩৬৯)

(৮) জোড়া সাঁকোর ঠাকুর বাড়ীও ইসলাম তথা মুসলমান বিদ্বেষ হিন্দু জনসাধারণের মধ্যে বেশ ভাল করেই প্রচার করেছে। এই একই উদ্দেশ্য প্রণোদিত হয়ে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ স্বপ্নময়ী নাটকটিও রচনা করেন। ডক্টর নীলিমা ইব্রাহিম এই “স্বপ্নময়ী নাটকের আলোচনা করতে যেয়ে বলেছেন,  যে ঐতিহাসিক কাহিনীকে অবলম্বন করে এ নাটকখানি রচিত হয়েছে, তার বিষয়বস্তুর সত্যনিষ্ঠা থেকেও নাট্যকার বিচ্যুত হয়েছেন। তাছাড়া, স্পষ্টতই এ নাটকে নাট্যকার পরধর্ম অসহিষ্ণুতার পরিচয় দিয়েছেন”। (সাহিত্য পত্রিকা বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, শীত সংখ্যা, ১৩৬৯, পৃষ্ঠা ১৮৯)

(৯) বাংলাদেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অসাম্প্রদায়িক বামপন্থী বুদ্ধিজীবি সাহিত্যিক গোলাম সামদানী কোরায়শী ময়মনসিংহে ব্যাপক ইসলাম প্রচার সম্পর্কে বলেন,  “এগার সিন্ধুর দুর্গের সম্মুখে মানসিংহের সঙ্গে ঈসা খাঁর ইতিহাসখ্যাত বিখ্যাত সেই যুদ্ধ ও সন্ধি স্থাপিত হয়। ভগ্ন তরবারীর প্রতি বীরোচিত সৌজন্যের যে পরিচয় ঈসা খাঁ রেখে গেছেন তা ময়মনসিংহবাসীর সম্মুখে এক অত্যুজ্জল আদর্শ হিসাবে বিরাজ করছে। — হত্যার বৈধ সুযোগ পাওয়া সত্ত্বেও বাঙ্গালী বীর হত্যা করেন নি, তাই বিশ্বের বীরশ্রেষ্ঠদের অন্যতম তিনি। মোগল সেনাপতি আফজাল খাঁর সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধের সাহস না থাকায় কাপুরুষ শিবাজী আপস আলোচনার নাম করে তাঁবুতে ডেকে এনে নিরস্ত্র আসহায় অবস্থায় আতর্কিত আক্রমণ করে আফসার খাঁকে হত্যা করেছিলেন। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর “সোনার বাংলা” রচয়িতা বাঙ্গালী বীর ঈসা খাঁকে ফেলে মারাঠা দস্যু শিবাজীকে নিয়ে কবিতা লিখলেন এবং প্রমাণ করলেন বিশ্বকবি হলেও মূলত তিনি হিন্দুদেরই কবি” (ময়মনসিংহের সাহিত্য ও সংস্কৃতি: গোলাম সাদমানী কোরায়শী : জেলা বোর্ড ময়মনসিংহ ১৯৭৮, পৃষ্ঠা ৯, ভারতে মুসলিম হত্যা, ইফতেখার রসুল জর্জ, পৃষ্ঠা ৮৩)।

(১০) বিশিষ্ট সাহিত্যিক আবু জাফর শামসুদ্দিন “সমাজের ঝড়ো পাখি বেনজীর আহম্মদ” গ্রন্থে হিন্দু নেতাদের দৃষ্টিভঙ্গির আভাস দিয়েছেন। “কাছারির বিপরীত দিকে ঢাকা ন্যাশনাল মেডিক্যাল স্কুলের বিরাট প্রাঙ্গণ। সেখানে বিশাল চন্দ্রতাপের নীচে নিখিল বঙ্গীয় অথবা নিখিল ভারতীয় হিন্দু মহাসভার সম্মেলন হচ্ছে। খুব সম্ভব ১৯২৮ সালের অথবা ২৯ সালের প্রথম দিককার কথা ঠিক মনে করতে পারছি না। সম্মেলন উপলক্ষে শহরে জোর প্রচারণা চলছিল। —- এক বন্ধুর কাছ থেকে ধুতি জোগাড় করলাম। বিকেলে দুজনে গেলাম সভায়। ডক্টর মুঞ্জে এবং এনসি কেলেভরি উভয়েই উগ্র সাম্প্রদায়িকতাবাদী বকতৃতা দিলেন। দুজনের মধ্যে কোন একজন আজ এতকাল পর ঠিক মনে করতে পারছি না বলেছিলেন যে, মুসলমানরা যদি এদেশে থাকতে চায় তাহলে হিন্দু জাতীর সঙ্গে লীন হয়ে থাকতে হবে। নতুবা সাতশ বছর বসবাসের পর মুসলমানরা স্পেন হতে যেভাবে বিতাড়িত হয়েছিল আমরাও তাদেরকে সেভাবেই আরব সাগর পার করে দেব” (সমাজের ঝড়ো পাখি বেনজীর আহম্মদ, আবু জাফর শামসুদ্দিন) (ভারতে মুসলিম হত্যা, ইফতেখার রসুল জর্জ, পৃষ্ঠা ৮৩৮৪)

(১১) পাকিস্তান প্রচারকদের মধ্যে আজাদ পত্রিকা অগ্রগণ্য। হিন্দুরা স্বভাবতই আজাদের উপরই সবচেয়ে বেশী বিক্ষুব্ধ। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গেই কলিকাতায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধে। পনের দিন যেতে না যেতেই ২রা সেপ্টেম্বর রাত্রে “আজাদ” অফিস গুন্ডাদের দ্বারা আক্রন্ত হল। ফলে ৩রা সেপ্টেম্বর ‘আজাদ’ বের হতে পারে নি” (প্রাগুক্ত)। পাকিস্তান সৃষ্টির পিছনে এসব ছিল ইতিহাসের জলজ্যান্ত করুণ বাস্তবতা। মরহুম আবুল আহমদ বলেন, – “এদের বিশ্বাস করতে পারলেন না মরহুম হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। ভারতে রয়ে যাওয়া মুসলমানদের রক্ষার জন্য মরহুম হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগষ্টের পর পরই ভারত ত্যাগে রাজী হলেন না। —তিনি শুধু নিজের জীবন বিপন্ন করে কলিকাতার হিন্দু দাঙ্গাকারীদের উদ্যত খড়গের সামনেই গলা বাড়িয়ে দেন নি, তিনি উভয় রাষ্ট্রের মাইনরিটি রক্ষার জন্য ‘মাইনরিটি চার্টার ও রচনা করেছিলেন” (প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ২৭০-২৭১)।

(১২) অনুরূপভাবে দাক্ষিনাত্যের লোকমান্য তিলক হিন্দুর জাতীয়তাবোধ জাগ্রত করার জন্য রাণা প্রতাপ ও শিবাজীর মাতৃমন্ত্রে দীক্ষা নিতে হিন্দুদের আহবান জানালেন এবং “শিবাজী উৎসব” এর আয়োজন করলেন। তিলক Anti cow killing societyর প্রতিষ্ঠা করলেন। তিলকের আহবান জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ীতে এসেও দোলা দিল। রবীন্দ্রনাথ লিখলেন “জয়তু শিবাজী” ও “শিবাজী উৎসব” কবিতাদ্বয়। প্রথমটিতে দিলেন সুর দ্বিতীয়টিতে দিলেন স্বর। এতে বাঙ্গালী হিন্দুদেরে মাতিয়ে তুললো। (রবীন্দ্রনাথ, হিন্দুধর্ম ও হিন্দু জাতীয়তাবাদ, আবু ফাতেমা মোহাম্মদ ইসহাক, ১০ পৃষ্ঠা, ১৯৬৯ প্রথম সংস্করন।) মুসলমানদের কাছে শিবাজী অশিক্ষিত, অসভ্য অমার্জিত দস্যুনায়ক। আর তিলক রবীন্দ্রনাথের কাছে শিবাজী ভারতের জাতীয় বীর।

(১৩)দস্যুনায়ক শিবাজীকে ভারতীয় হিন্দুদের জাতীয় বীর রূপে প্রণতি প্রশস্তি জানাবার জন্য রবীন্দ্রনাথ সকল হিন্দুকে আহবান জানিয়েছেন। শুধু তাই নয় শিবাজীর মন্ত্রে দীক্ষা ও শপথ নেবার জন্য বলেছেন, “এক ধর্ম রাজ্য হবে এ ভারতে এ মহাবচন- করিব সম্বল”।

“শিবাজী উৎসব” কবিতায় শিবাজীকে “রাজতপস্বী বীর” বলে সম্মোধন করেছেন। শিবাজী যে দস্যু নায়ক বা তস্কর এ কথা কবি কিছুতেই মানতে রাজী নন। কবির মতে শিবাজীর দস্যু বৃত্তির বা তস্করবৃত্তির ইতিহাস সে বিদেশীর রচিত মিথ্যা ইতিহাস। তাই তিনি লিখেছেন—

“বিদেশীর ইতিবৃত্ত দস্যু বলি করে পরিহাস

অট্টহাস্য রবে,

তব পূণ্য চেষ্টা যত তস্করের নিস্ফল প্রয়াস

এই জানে সবে।

অয়ি ইতিবৃত্ত কথা, ক্ষান্ত করো মুখর ভাষণ।

ওগো মিথ্যাময়ী,

তোমার লিখন ‘পরে বিধাতার অব্যর্থ লিখন

হবে আজি জয়ী”।

এখানে মুসলিম যুগের ভারতীয় মুসলমান কর্তৃক লিখিত ইতিহাসকে কবি বিদেশীর রচিত ইতিহাস বলেছেন এবং বিদেশী মুসলমান রচিত সে মিথ্যাময়ী ইতিবৃত্তের উপর ভারত বিধাতার অব্যর্থ লিখন জয়ী হবে বলে কবি সুনিশ্চিত হয়েছেন, বঙ্কিম চন্দ্রও তাই বলতেন। তারপর কবি শিবাজীকে সম্মোধন করে বলে যাচ্ছেন—

“হে রাজ তপস্বী বীর, তোমার সে উদার ভাবনা

বিধির ভান্ডারে

সঞ্চিত হইয়া গেছে, কাল প্রভু তার এক কণা

পারে হরিবারে?

তোমার সে প্রাণোৎসর্গ, স্বদেশ লক্ষ্মীর পূজাঘরে

সে সত্য সাধন,

কে জানিত, হয়ে গেছে চির যুগ যুগান্তর তরে,

ভারতের ধন”।

কবির মতে শিবাজীর সাধনাই ভারতের চিরন্তন সাধনা।

(১৪) অধ্যাপক হীরেন মুখার্জীও বলেনঃ “ভবানীপূজা, “বীরাষ্টম”, “গণপতিউৎসব”, গঙ্গা¯œানের পর “রাখিবন্ধন” ইত্যাদি ছিল তখনকার আনন্দ অনুপ্রেরণা। এমনকি মহারাষ্ট্রে লোকমান্য তিলকের নেতৃত্বে যে স্বাদেশিকতা জেগে উঠেছিল, গো-রক্ষা ও প্লেগের টিকা গ্রহণে ধর্মগত আপত্তি নিয়ে যার পত্তন, সেই স্বাদেশিকতার সঙ্গে বাংলার স্বদেশী আন্দোলনের মৈত্রী বন্ধন সুদৃঢ় করার জন্য শিবাজী উৎসবের প্রবর্তন হল।

“এক ধর্মরাজ্য পাশে খন্ড চিহ্ন বিক্ষিপ্ত ভারত

বেধে দিব আমি”

শিবাজীর এ কথা স্মরণ করে রবীন্দ্রনাথ রাজতপস্বী বীরকে প্রণতি জানালেন। মুসলমান বাঙ্গালী হলেও তার মন কবির প্রশস্তিকে গ্রহণ করতে পারলো না (হিন্দু মুসলিম, পৃষ্ঠা ২০/২২)। সে সময় রবীন্দ্রনাথের ভাগ্নী সরলা দেবী প্রতিষ্ঠা করলেন “বীরাষ্ঠমী মেলার আর রবীন্দ্রনাথ প্রতিষ্ঠা করলেন “রাখীবন্ধন” অনুষ্ঠানের, হিন্দুদের ঐক্যের জন্য।

(১৫) রবীন্দ্রনাথের “সতি” নাটিকা ও গল্প “দুরাশা”য় সতী নাটিকায় ধর্মের প্রতি যেমন উল্লেখযোগ্য উদারতা ফুটে উঠেছে তেমনি দুরাশাতে মুসলমান তথা ইসলামের প্রতি বিদ্বিষ্ট চিন্তা মানসেরও পরিচয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এখানে তিনি বঙ্কিমচন্দ্রের সাক্ষাৎ শিষ্য। তাছাড়াও কবির আরো কয়েকটি গল্প ও কবিতায় মুসলমানদের প্রতি “যবন” ও “ম্লেচ্ছ” প্রভৃতি শব্দের অপপ্রয়োগ ও ইচ্ছা করে বিকৃত চরিত্র সৃষ্টি মুসলমানদের বেদনার কারণ হয়ে রয়েছে।

(১৬) শুধু তাই নয়, টডের “রাজস্থানের” কাহিনী অবলম্বন করে মুসলিম বীরের প্রতি জঘন্য রসিকতা করে “হোরিখেলা” কবিতা লিখেছেন। সে যুগে বহু সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে এই “হোরিখেলা” কবিতার নৃত্যরূপ প্রদর্শিত হতো। ফলে হিন্দু জনসাধারণের মধ্যে মুসলিম বিদ্বেষ নতুন করে দানা বেঁধে উঠতো।

(১৭) “রীতিমত নভেল”, “দুরাশা” গল্পে কবি মুসলিম বিদ্বেষ নগ্নভাবে প্রকাশ করেছেন। “দুরাশা” গল্পে শুধু মুসলিম বিদ্বেষই প্রকাশ করেন নি, হিন্দু ধর্মেরও প্রচার করেছেন। উদাহরণ হিসাবে—গল্পের নায়িকা নওয়াবজাদী নূর-উন-নিসাকে কবি ইচ্ছা করেই মুসলিম সমাজ ও ইসলাম ধর্মের প্রতি বীতশ্রদ্ধ, পিতা নওয়াব কাদের খাঁর প্রতি অশ্রদ্ধেয়া, বিশেষ করে হিন্দু ধর্ম ও হিন্দু সংসারের প্রতি অত্যধিক আকৃষ্টা করে তুলেছেন। কবি নওয়াবজাদী নূর-উন-নিসার মুখ থেকে বের করেছেন, “আমার হিন্দু দাসীর নিকট হিন্দু ধর্মের সমস্ত আচার ব্যবহার, দেবদেবীর সমস্ত আশ্চর্য কাহিনী, রামায়ণ মহাভারতের সমস্ত ইতিহাস তন্ন তন্ন করিয়া শুনিতাম। শুনিয়া সেই অন্তঃপুরের প্রান্তে বসিয়া হিন্দু জগতের এক অপরূপ দৃশ্য আমার মনের সম্মুখে উদঘাটিত হইত। মূর্তি, প্রতিমূর্তি, শঙ্খ, ঘন্টাধ্বনি, স্বর্গচূড়া খচিত দেবালয়, ধুপ ধুনার ধুম, অগুরূ চন্দন মিশ্রিত পুষ্প বাঁশির সুগন্ধ, যোগী সন্যাসীর অলৌকিক ক্ষমতা, ব্রাক্ষ্মণের অমানুষিক মহাত্ম্য, মানুষ ছদ্মবেশধারী দেবতাদের বিচিত্র লীলা, সমস্ত জড়িত হইয়া আমার নিকট এক অতি পুরাতন, বিস্তীর্ণ, অতি সুদূূর অপ্রাকৃত মায়ালোক সৃজন করিত, আমার চিত্ত যেন নীড়হারা পাখীর ন্যায় প্রদোষকালের একটি প্রকান্ড প্রাচীন প্রাসাদের কক্ষে কক্ষে উড়িয়া উড়িয়া বেড়াইত। হিন্দু সংসার আমার বালিকা হৃদয়ের নিকট একটি পরম রমনীয় রূপ কথার রাজ্য ছিল”।

(১৮) “দুরাশা”য় কবি এখানেই থামেন নি, “বিশ্বাসঘাতক পিতার গৃহ আমার নিকট নরকের মত বোধ হইল” যখন নায়ক কেশর লালের অচেতন দেহে যমুনার জল এনে নওয়াবজাদী বার কয়েক সিঞ্চন করে চেতনা ফিরিয়ে আনলেন এবং বললেন, “আরও জল দিব”? নায়কের জবাব “কে তুমি?” উত্তরে “অধীনা আপনার ভক্ত সেবিকা, নওয়াব গোলাম কাদের খাঁর কন্যা”। নায়ক সিংহের মত গর্জন করে উঠলেন, “বেঈমানের কন্যা বিধর্মী। মুত্যুকালে যবনের জল দিয়া তুই আমার ধর্ম নষ্ট করিলি?” কবির এইরূপ চরিত্র চিত্রন ইচ্ছাকৃত ও সাম্প্রদায়িক মনোভাব থেকে সৃষ্ট।

(১৯) “হোরিখেলা”তেও আমরা তার এই বিদ্বিষ্ট মনোভাবের পরিচয় পাই। এটি একটি ঐতিহাসিক কাহিনী নিয়ে রচিত। রাজস্থানের অন্যতম রাজা ছিল “কোটা”। কোটার রাজা কনডুন সিংহের পুত্র ছিল ভোনস্ত সিংহ। পাঠান বীর কেশর খাঁর সঙ্গে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে কোটার রাজ পরিবার কেতুনে আশ্রয় নেয়। এই পরাজয়ের প্রতিশোধের জন্য কোটারের হিন্দু সভাসদেরা বিশ্বাসঘাতকতার আশ্রয় নেয়। তারা পাঠান বীর কেশর খাঁকে দাওয়াত দিয়ে এনে একে একে সবাইকে হত্যা করে। এই ঘটনার একটি রসিকতা পূর্ণ বিকৃত রূপ টডের রাজস্থানে রয়েছে। কেতুনের হিন্দু যুবকেরা রাণী সেজে ও রাণীর শতেক দাসী সেজে কেশর খাঁর সঙ্গে হোরিখেলাতে প্রস্তুত থাকেন। এই বিকৃত গল্প অবলম্বনে রবীন্দ্রনাথ হিন্দু রাজপুতদের গৌরব গাথা রূপায়িত করেছেন “হোরিখেলা”য়। সংক্ষেপে ক’টি ছত্র—-রাণীকে এমনি হালে দেখে কেশর খাঁ বলে উঠলেন,

“তোমারি পথ চেয়ে

দু’টি চক্ষু করেছি প্রায় কানা।”

জবাবে রাণী বললেন, “আমারও সেই দশা।”

এমনি সময় রাণীর “একশো সখা হাসিয়া বিবশা।”

“পাঠান পতির ললাটে সহসা

মারেন রাণী কাসার থালাখানা

রক্ত ধারা গড়িয়ে পড়ে বেগে

পাঠান পতির চক্ষু হলো কানা।”——

“যে পথ দিয়ে পাঠান এসেছিল

সে পথ দিয়ে ফিরলো নাকো তারা

কেতনপুরে বকুল বাগানে কেশর খাঁএর খেলা হলো সারা।”

সে যুগে এই কবিতাটি প্রায় সময়ই স্কুল কলেজের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে কথা চিত্রে প্রকাশ করা হতো এবং নৃত্যের অপূর্ব ভঙ্গিতে নানা তাল গোল পাকিয়ে মুসলমানদের হত্যা করার দৃশ্য দেখানো হতো। হিন্দুরা তা দেখে খুব খুশী হত, আর মুসলমানেরা মুখ ভার করে গভীর বেদনা নিয়ে বের হয়ে আসতো।

(২০) “বন্দীবীর” কবিতাটিও কবির বিদ্বিষ্ট মনের পরিচয় বহন করেছে। শিখ জাতিকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করার স্বপ্ন থেকেই এই কবিতার সৃষ্টি। কবিতার বিষয়বস্তু হচ্ছে, দিল্লীর বাদশাহ ফররোখ শিয়ারের রাজত্বকালে পাঞ্জাবে “বান্দা” নামক এক ধর্মান্ধ শিখ বহু মুসলিম নারী ও শিশুকে হত্যা করে। বাদশাহ তা শুনে তাকে লোকজন দিয়ে ধরিয়ে দিল্লীতে নিয়ে আসেন। কাজীর বিচারে তার মৃত্যুদন্ড হয়। এই মৃত্যুদন্ডের ভয়াবহতা নিয়েই “বন্দীবীর” কবিতাটি লিখিত। উল্লেখ্য কবি তার এই কবিতায় বান্দার মৃত্যুদন্ডের কারণ ও মুসলিম নারী শিশুদের নৃশংসভাবে হত্যার কথা বিশ্লেষণ করেন নি, এমনকি আকারে ইঙ্গিতেও তা উল্লেখ করেন নি। কবিতাটিতে শিখদের উপর মুসলমানদের নির্যাতনের মর্মান্তিক কাহিনী ফুটিয়ে তুলেছেন। উদ্দেশ্যমূলক না হলে এই কবিতার পূর্বাপর ঘটনার উল্লেখ কবি নিশ্চয় করতেন। এখানে খুনী বান্দাকে ধরে আনার জন্য বাদশাহ প্রেরিত লোকদের সঙ্গে শিখদের যুদ্ধ বর্ণনা লক্ষ্য করা যায়। কবি বর্ণনা করেছেন—

“মোগল শিখের রণে

মরণ আলিঙ্গণে

কন্ঠ পাকড়ি ধরিল আঁকড়ি,  দুইজনা দুইজনে

দংশন ক্ষত শ্যেন বিহঙ্গ যুঝে ভুজঙ্গ-সনে।

সেদিন কঠিন রণে

‘জয় গুরূজীর’ হাকে শিখবীর সুগভীর নিঃস্বনে।

মত্ত পাগল রক্ত পাগল ‘দীন দীন’ গর্জনে।”

মোগল শিখের এই যুদ্ধে কবি শিখদের “দংশন ক্ষত শ্যেন বিহঙ্গ” অর্থাৎ ক্ষত বিক্ষত বাজপাখী এবং মুসলিম মোগলদেরে “ভুজঙ্গ” অর্থাৎ কেউটে সাপ বলে অভিহিত করেছেন। শুধু তাই নয়, মুসলিম মোগলদেরে কবি “মত্ত পাগল রক্ত পাগল”—- এই বিশেষণে বিশেষিতও করেছেন। “বন্দীবীর” কবিতাটিতে কবি ধর্মান্ধ শিখ নায়ক বন্দা যে খুনী, বহু নৃশংস হত্যাকান্ডের জন্য সর্বোতোভাবে অপরাধী তার কোন উল্লেখ করেন নি। বরং তিনি মুসলিম মোগলেরা যে শিখদের উপর জুলুমকারী তা বিশেষভাবে বর্ণনা করেছেন এবং এই জুলুমের ভয়াবহতা এবং শিখদের গভীর নিষ্ঠার সঙ্গে আত্মত্যাগের কাহিনী অত্যন্ত দক্ষতার সহিত চিত্রিত করেছেন।

“বান্দার দেহ ছিড়িল ঘাতক সাড়াশি করিয়া দগ্ধ।

স্থির হয়ে বীর মরিল, না করি’ একটি কাতর শব্দ।

দর্শক জন মুদিল নয়ন, সভা হল নিস্তব্ধ।”

সে যুগে এই কবিতার দৃশ্য চিত্রও প্রদর্শিত হত। এসবের বড় বড় তৈল চিত্র তৈরী করে হিন্দু শিখ জনসভায়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, ম্যাজিক লন্ঠন সহযোগে বক্তৃতা দিয়ে দেখানো হত। এভাবেই মুসলিম বিদ্বেষ ছড়ানো হত। তাদের নিজ হাতে চিত্রিত এসব সাহিত্যই ভারতের সাম্প্রদায়িকতায় ইন্ধন যুগিয়েছে।

(২২) অধ্যাপক মুহাম্মদ ইসহাক এম, এ তার “সংস্কৃতি ও সমাজ প্রবন্ধে নিজেকে উপরোক্ত কবিতা দুটির সাম্প্রদায়িক ভূমিকার প্রত্যক্ষদর্শী বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি কলকাতার বৌ-বাজার স্ট্রীটে হিন্দু জনসভার অফিসে নিজ চোখে “বন্দীবীরের” বহু দৃশ্যের তৈল চিত্র দেখেছেন এবং “হোরিখেলার” নৃত্যরূপ বহু সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তা প্রত্যক্ষ করেছেন। দেশ বিভাগের পরও কোন কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিচিত্রানুষ্ঠানে “বন্দীবীর” ও “হোরিখেলা” কবিতাদ্বয়ের আবৃত্তি দেবার প্রয়াস লক্ষ্য গোচর হয়েছে। এমনও দেখা গিয়েছে সম্বিৎহারা মুসলমান এমনিভাবে নিজঘরে স্বজাতির নামে মিথ্যা কলঙ্ক কাহিনীর আবৃত্তি এবং দৃশ্যচিত্র ও নৃত্যরূপ নিজ চোখে দেখেছে, নিজ কানে শুনেছে। কোন কথা বলেনি, প্রতিবাদ করে নি।

(২৩) মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঘৃণা গালিসূচকযবন ম্লেচ্ছশব্দ দুটি কবি তার লেখায় কিভাবে রূপ দিয়েছেন তার দুএকটি নজিরও এখানে পেশ করছি। কবি লিখেছেন

“বলিতে পার কাহার প্রতাপে এই অগণিত যবন সৈন্য প্রচন্ড বাত্যাহত অরণ্যানীর ন্যায় বিক্ষুব্ধ হইয়া উঠিল? কাহার বজ্র মন্দ্রিত র্হ র্হ বোম্ বোম্ শব্দে তিন লক্ষ ম্লেচ্ছ কন্ঠের “আল্লাহু আকবার” ধ্বনি নিমগ্ন হইয়া গেল?”(রীতিমত নভেল—গল্পগুচ্ছ) আবার অন্যত্র—-

“চলেছি করিতে যবন নিপাত

যোগাতে যমের খাদ্য”। (“বিচারক” কথা ও কাহিনী )

(২৪) রবীন্দ্রনাথের “কথা ও কাব্য” গাথাটির কথাই ধরা যাক। তাতেও তিনি যে ভারত বর্ষের চিত্র অঙ্কন করেছেন সে ভারতবর্ষে মুসলমান কিংবা মুসলমান আদর্শের কোন স্থান নেই। “কথা কাব্যের” অন্তর্ভূক্ত হয়েছে রবীন্দ্রনাথের শ্রেষ্ঠ ভিক্ষা, প্রতিনিধি, ব্রাহ্মণ, মস্তক বিক্রয়, পূজারিণী, পরিশোধ, সামান্য ক্ষতি, মূল্য প্রাপ্তি, নগর লক্ষ্মী, অপমানবর, স্বামীলাভ, স্পর্শমণি, বন্দীবীর, মানী, প্রার্থণাতীত, দান, রাজবিচার, গুরুগবিন্দ, শেষ ভিক্ষা, নকল গড, হোরিখেলা, বিবাহ, বিচারক, পণরক্ষা, এই সব বিশিষ্ট কবিতা। এসব কবিতা সম্পূর্ণভাবে মুসলিম বিবর্জিত হিন্দু ভারতীয় জীবনের জয়গান। তাকে এদিক থেকে হিন্দু ভারতীয় রেঁনেসার কবি বলা যায়।

(২৫) কিন্তু মুসলিম ভারত কিংবা মুসলিম বঙ্গের ত্যাগ, মহত্ত্ব ও গৌরব কথা কবির চিন্তায় নেই কিংবা কবি সেইদিকে ফিরে তাকাতেও চান নি। তবে এড়াতে না পেরে দু’এককথা টডের সত্য মিথ্যা ও আজগুবি কাহিনীপূর্ণ বই “রাজস্থান” দেখে বলেছেন যা মুসলমানদেরে বেদনা দিয়েছে বহুক্ষেত্রে। তাও আবার ভারতীয় হিন্দুর গৌরবগাথা রচনা প্রসঙ্গে মুসলমানদেরে হেয় প্রতিপন্ন করার ইচ্ছা থেকেই বলেছেন। এ প্রসঙ্গে রবীন্দ্র গবেষক কাজী আব্দুল ওদুদ বলেন,  “সেই ভারতীয়তার রূপদান করতে গিয়ে প্রাচীন হিন্দু সভ্যতা ও সংস্কৃতির বহু মনোরম চিত্রও তিনি অঙ্কিত করেছেন, তার সেই সব সৃষ্টি হিন্দুকে শুধু আনন্দিতই করেনি, গর্বিতও করেছে। দ্বিতীয়তঃ মুসলিম সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রতি রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতিগত বিরূপতা না থাকলেও এমনকি অল্পাধিক অনুরাগ সত্ত্বেও, সেই সভ্যতা ও সংস্কৃতি সম্বন্ধে তিনি প্রায় মৌনীই রয়েছেন তার সুদীর্ঘ সাহিত্যিক জীবনে” (শাশ্বত বঙ্গ, পৃষ্ঠা ৬০)। এসব কর্মকান্ডে ভারতবাসীকেও হিন্দুকে করেছে বহুগুণ বেশী দাঙ্গাপ্রবণ ও ভয়ঙ্কর হিংসার অনল জাগিয়ে রেখেছে যুগ যুগ ব্যাপী।

(২৬) এস ওয়াজেদ আলী কান্টাবও বলেছেন, “রবীন্দ্রনাথের ভারত অর্থে হিন্দু ভারতের কথাই বলেছেন ও বুঝেছেন, ভিক্টোরিয়ান স্বাধীন চিন্তাকে তিনি হিন্দু দর্শনের সাহায্যে চালাবার চেষ্টা করেছেন। হিন্দু ভদ্র শ্রেণীর জীবনই তার সাহিত্যের প্রধান উপজীব্য হয়েছে” (ভবিষ্যতের বাঙ্গালী, পৃষ্ঠা ৮২-৮৩)।

(২৭) একবার তিনি ত্রিপুরার মহারাজা রাধা কিশোর মানিক্যের কাছে লিখেছিলেন, “হিন্দুর যথার্থ গৌরব কি এবং হিন্দুর উন্নতি সাধনের প্রকৃত পথ কোন দিকে বঙ্গ দর্শনে তাহাই সম্যক আলোচিত হইলে আমি চরিতার্থ হইব। হিন্দুত্ব কি, তাহাই আমি ক্রমশঃ দেখাইতেছি এবং সেই সঙ্গে এ কথাও জানাইতেছি যে, যূরোপীয় সভ্যতায় যাহাকে ন্যাশনাল মহত্ত্ব বলে তাহাই মহত্ত্বের একমাত্র আদর্শ নহে। আমাদের বিপুল সামাজিক আদর্শ তাহা অপেক্ষা অনেক বৃহৎ ও উচ্চ ছিল” (চিঠিপত্র, রবীন্দ্রনাথ, পৃষ্ঠা ১৩৩)।

(২৮) হিন্দু লেখকগণ বাংলা ভাষায় রচিত পাঠ্য পুস্তক থেকে শুরু করে নাটক, কাব্য উপন্যাসাদিতে যখন জঘন্যভাবে মুসলিম বিদ্বেষ ও হিন্দু জাতীয়তাবাদ প্রচার করে চলছিলেন, তখন মুসলিম সাহিত্যিকগণ কবি রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টি আকর্ষণ করছিলেন এই নীচ প্রচারণার প্রতি। রবীন্দ্রনাথ তখন বলে দিয়েছিলেন, “মুসলমান গ্লানিপূর্ণ বলে আমরা আপন সাহিত্য বর্জন করতে পারি না। মুসলমানদের স্বতন্ত্র সাহিত্য গড়িয়া লওয়া উচিত”। এই স্পষ্ট উক্তির মাঝেই রয়ে গেছে মুসলিম স্বাতন্ত্রের তথা পাকিস্তান দাবীর বীজ যদিও কবি উষ্মা প্রকাশ করে তা বলেছেন। পাকিস্তান আন্দোলনকালে বেঁচে থাকলে হয়তো তিনি এমনতরো আরো দু’ চারটা কথা বলে যেতেন (লেখক আবু ফাতেমা মোহাম্মদ ইসহাক)।

(২৯) মুসলমান সংস্কৃতির শ্রেষ্ঠ আদর্শের দিকে কখনো তিনি দৃষ্টিপাত করেন নি। তার মৃত্যুর বছর চারেক আগে ইংরেজী ১৯৩৬ সনে কলকাতা টাউন হলে সাম্প্রদায়িক বাটোয়ারার প্রতিবাদ কল্পে অনুষ্ঠিত হিন্দু জনসভায় তার নেতৃত্ব গ্রহণ ও তার প্রদত্ত ভাষণ। অনগ্রসর ও বহু বিষয়ের পশ্চাৎপদ সংখ্যা গরিষ্ঠ মুসলমান সমাজের শিক্ষিত ছেলেদের সংখ্যানুপাতে সরকারী চাকুরীতে নিয়োগের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন, সেই আন্দোলনের পৌরোহিত্য করেছেন রবীন্দ্রনাথ। সাম্প্রদায়িক মনোভাব নিয়ে সংখ্যা গরিষ্ঠ মুসলমানদের ন্যায্য দাবীর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন তিনি। টাউন হলের জনসভায় কবি যে ভাষণ দান করেছিলেন তা সাম্প্রদায়িক নেতারা রচনা করে দেন নি নিশ্চয়ই।

(৩০) তিনি তার ভাষণে বলেছিলেন, “প্রভুর খানার টেবিলের নীচে নিক্ষিপ্ত খাদ্য টুকরার জন্য যে কোলাহল উত্থিত হইয়াছে, ইহা সমর্থন করায় শুধু যে নীচতা আছে তাহা নয়, উহা চারিত্রিক দৌর্বল্যেরও পরিচায়ক। অথচ তার ভাষণের প্রারম্ভে তিনি বলেছেন, “শাসন কার্য পরিচালনায় যোগ্যতার অপহ্নব করিয়াও গবর্ণমেন্ট যে সরকারী চাকুরীতে কর্মচারী নিয়োগে ক্রমাগত বৈষম্য করিয়া চলিয়াছেন আমরা তাহা নির্বাকভাবে প্রত্যক্ষ করিতেছি।” কবি ও কবির সম্প্রদায় কতটুকু নির্বাক ছিলেন এই ব্যাপারে তার নজির টাউন হলের এই জনসভা ও কবির প্রদত্ত ভাষণ। ভাষণে আরো বলেন, “সাম্প্রদায়িক বাটোয়ারার প্রস্তাব যে দিন উত্থাপিত হয়, সেই দিন হইতেই আমাদের প্রদেশ বিক্ষুব্ধ হইয়া পড়িয়াছে। ঔদার্য এবং সহযোগিতার উপর প্রতিষ্ঠিত সমাজ বিপন্ন হইয়া পড়িয়াছে। ইতিমধ্যেই আমাদের সাহিত্যের ধ্বংসোন্মত্ততা আত্মপ্রকাশ করিয়া আমাদের ভাষাকে আক্রমণে উদ্যত হইয়াছে” (কবির ভাষণটি ১৯৩৭ সানের “মাসিক মোহাম্মদ” থেকে উদধৃত)।

(৩১) এখানে প্রশ্ন জাগে কবির এই যে বলা —এই যে কথা তা তবে কিসের জন্য ছিল? কোন উচ্চ মহামানবতার ও চারিত্রিক শান্তির পরিচয় দিতে কবি সাম্প্রদায়িক জন সভার নেতৃত্ব গ্রহণ করেছিলেন? সে কি সেই নিক্ষিপ্ত খাদ্য টুকরার অধিকাংশটা যাতে মুসলমানদের পাত্রে যেয়ে না পড়ে, তজ্জন্য দেশব্যাপী আন্দোলন ও ভারত সচিবের কাছে আবেদন নিবেদন করার মধ্যে ছিল না? কবির স্ব সমাজ যদি ঔদার্য ও সহযোগিতার উপর প্রতিষ্ঠিতই থাকতো তবে কবির নেতৃত্বে এ আন্দোলন করার কী দরকার ছিল? তখনকার সময়ে হিন্দু লেখকগণ কর্তৃক রচিত পাঠ্য পুস্তক, নাটক, নভেলাদির মাধ্যমে মুসলিম সংস্কৃতি ও আদর্শ বিরোধী প্রচারণার বিরুদ্ধে মুসলমানদের প্রতিবাদ মুখর দেখেই কবি তাদের সাহিত্যের ভাষা ভাব ও বিষয়বস্তু মুসলমান কর্তৃক আক্রমনোদ্যত হচ্ছে মনে করে নিলেন। কবির এ মনোভাব বহুবার মুসলমানদের কাছে পীড়াদায়ক বিবেচিত হয়েছে (আবু ফাতেমা মোহাম্মদ ইসহাক)।

(৩২) কবি রবীন্দ্রনাথ অমিয় চক্রবর্তীকে লিখেছিলেন, “আমাদের দুর্ভাগ্য দেশে সম্প্রতি রাষ্ট্র ব্যবস্থায় মুসলমান কর্তৃত্বের উপলক্ষে সাহিত্যে সাম্প্রদায়িক শাসনের যে নতুনত্ব রূদ্রমূর্তি ধরলো তার উপরে সোভিয়েট বা নাজি শাসন যদি চালানো যায় তা হলে তো নৌকা ডুবি হবে। এখন তো কর্তাদের আমলে আমার রচনা এখানে ওখানে মুসলমানি ছুরির খোঁচা খায়, তার নাকের সামনে তর্জ্জনীও উঠে” (প্রবাসী —১৩৪৬ অমিয় চক্রবর্তীকে লেখা পত্রাংশ)।

(৩৩) কবির এই সাম্প্রদায়িক মনোভাব কবির উপরে সাম্প্রদায়িক অন্যান্য হিন্দু নেতাদের প্রভাব বিস্তারের ফল নয়। মূলতঃ চিন্তার ক্ষেত্রে মানসিক দ্বন্ধ ও বিদ্বেষের জন্যই কবি সকল সময় সাম্প্রদায়িক গন্ডী বিমুক্ত হয়ে কথা বলতে পারেন নি। শান্তি নিকেতনের আবহাওয়া সাম্প্রদায়িকতামুক্ত নয়। রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের মতো সাম্প্রদায়িক লোক আজীবন শান্তিনিকেতনের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রয়ে গেছেন (মাসিক প্রবাসী ১৩৪৮ পৌষ সংখ্যা)।

(৩৪)  বৌদ্ধ, হিন্দু, মারাঠা, রাজপুত, শিখদের আদর্শ, আত্মত্যাগ মহত্ত্ব তার কাব্যের বিষয়বস্তু হতে পারলো কিন্তু শুধু পারল না ভারতীয় মুসলমানদের মহত্ত্ব, দেশপ্রেম, আত্মত্যাগের কাহিনী। রবীন্দ্রনাথ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে নিয়ে কবিতা লিখতে পারলেন কিন্তু মুহাম্মদ মহসীনকে নিয়ে কবিতা লিখতে পারলেন না। অহল্যা বাঈকে নিয়ে সুন্দর কবিতা সৃষ্টি করলেন কিন্তু সুলতানা রিজিয়াকে নিয়ে কোন কবিতা সৃষ্টি করতে পারলেন না। বৌদ্ধ, শিখ, হিন্দু, সাধুসন্তদের সাধনার আত্মত্যাগের কাহিনী নিয়ে কবিতায় ছোট গল্প লিখতে পারলেন কিন্তু খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী, নিজাম উদ্দিন আউলিয়া, শাহজালাল প্রমুখ মুসলিম তাপসদের নিয়ে কবিতায় গল্প লিখতে পারলেন না (আবু ফাতেমা মোহাম্মদ ইসহাক) তারপরও মুসলমান সম্প্রদায়ের জনতারা তাকে উদার চিত্তে গ্রহণ করেছেন এবং এর আড়ালে উদার মাহানুভবতার সন্ধান পেয়েছেন।

ডাউন লোডের দু এক দিনের মাঝেই লিংকগুলি মুছে দেয়া হচ্ছে। বাস্তবতা এখানেই নীচে।

দুই বিঘা জমি খুব সুন্দর একটি কবিতা আবৃতি

Bangla Kobita Dui Bigha Jomi by Rabindra Nath Tagore

 

আমি জীবনেও ভাবি নি এরকম একটি লেখাও আমাকে একদিন দাঁড় করাতে হবে নানা মুনির নানা তথ্য ঘেটে। অনেক সংগৃহীত তথ্যে মনে হয় আমার আত্মা জড়িয়ে যাচ্ছিল, কলম থমকে যাচ্ছিল, সংগৃহীত লেখা তথ্য আলেখ্য বিশ্বাস হচ্ছিল না, মনে হচ্ছিল যেন আমি কোন অবিশ্বাস্যলোকের কথা বলে যাচ্ছি। যাকে সবচেয়ে সম্মানের পাদপীঠে অকুন্ঠ চিত্তে ঠাঁই দিয়েছি যার মুখের ভাষাকে, ছন্দকে আমরা আমাদের প্রাণের সঙ্গীত, জাতীয় সঙ্গীত করেছি তারা কিনা সংঘবদ্ধ হয়েই সমানেই অশ্লীল ভাষায় আমার স্বজাতিকে সম্মোধন করেছে। যাকে জনতারা এত মান এত মর্যাদা দিল, যার প্রতি একটি কটুবাক্য উচ্চারণ করে নি আর সেই তারাই কোন মানসিকতার দাসত্বে তার চারপাশের হাজার কোটি মুসলমানকে ম্লেচ্ছ, যবন বলে ডাকতে পারলে, তাদের মুখে আটকালো না? এটি সোহাগের ডাক ছিলনা, এটি ছিল বিদিষ্ট মনের বহিঃপ্রকাশ। আমি সেই যবনের বাচ্চা, আমি সেই ম্লেচ্ছের বাচ্চা নিদারুণ কষ্টে আজ বহুযুগ জনমের কষ্টের পুরানো কথা নতুন করে বলে গেলাম। কবিতার গভীর সত্যকে অস্বীকার করতে পারি না। তাই পাঠকের জন্য ঐ মর্মস্পর্শী কবিতাটি এখানে ভিন্নভাবে সংযোজন করি।

বিধি সত্যিই বাম!
এই ছিল মোর ঘটে,
তুমি মহারাজ সাধু হলে আজ
আমি আজ ‘ম্লেচ্ছ যবন’ বটে!

 

ডঃ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীসাহেব, (শিক্ষাবিদ, গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) বিশাল এ কবি সম্বন্ধে বলেন, “ইংরেজ চলে গেল। খন্ডিত বাংলার একাংশ চলে গেলো ভারতবর্ষে, অপর অংশ পাকিস্তানে। বাংলার সংস্কৃতি বিপন্ন হলো উভয় রাষ্ট্রে। এক রাষ্ট্রে হিন্দির গ্রাস, আরেক রাষ্ট্রে উর্দুর। হিন্দির গ্রাস থেকে বঙ্গ সংস্কৃতি মুক্ত হয় নি, কিন্তু উর্দুর গ্রাস থেকে হয়েছে”। (উর্দুকে ঝেড়ে ফেলা গেলেও আজ দুই বাংলায়ই এমনকি যেখান থেকে উর্দু ঝেড়ে ফেলা হয়েছে সেখানেও চলছে হিন্দি গানের রমরমা ব্যবসা, নয় কি? )

সৃষ্টিকর্তার দেয়া বিধান মাফিক ধর্মকে বাধতে গিয়ে কিভাবে এসব বড় সমাজপতিরা একতার বদলে বিভক্তির জয়গান গেয়েছিলেন। সংকীর্ণতার কাহিনীসব পাথর চাপা দিয়ে রাখা, যা বাস্তবে দুর্গন্ধ ছড়ায়। কিন্তু বিধাতার কঠোর নির্দেশ হচ্ছে, সত্যকে মিথ্যার সাথে এক করে দিয়ো না, এতে সত্যের অপমান হয়, সত্য কষ্ট পায়। রবীন্দ্রনাথ বড় কবি হলেও সংকীর্ণ মানসিকতা পরিহার করতে বড়মাপে ব্যর্থ হয়েছেন। এর অপর পিঠে মুসলিম লেখকদের অসাম্প্রদায়িকতা একটি উল্লেখযোগ্য পাওয়া। কি নজরুল কি শহীদুল্লাহ, কি জসিমউদ্দিন, বন্দে আলি মিয়া, গোলাম মোস্তফা, এরা কেমন করে অসাম্প্রদায়িক আচরণে ধন্য! কারণ তারা যে ধর্মটি ধরে দাঁড়িয়েছেন সেখানে এসব নিষিদ্ধ, বাতিল। কিন্তু বড় কবি হয়েও এত অভিযোগ কেন তার আমলনামাতে? কারণ এটি তার ধর্মের জমা, নয়কি? যার ধারাবাহিকতায় আজ একবিংশ শতকেও মোদিরা আকন্ঠ ডুবে আছেন, রক্তের হোলি খেলাতে মজেছেন, গলা ডুবিয়ে এ কাজ করছেন। মুসলমানরা প্রতিবাদ করে না বলে আজ উল্টো অভিযোগের পাহাড় হিমালয়সম, কোনভাবেই এ দায় তাদের ঘাড়ে পড়ে না, তারপরও গোটা বিশ^ তাদেরেই মিথ্যে অভিযোগের পাহাড়ে ঠেলে দিচ্ছে। মুসলিমদের চেতনহীনতা, মুখ বুজে পড়ে থাকার কথা ছিল না, উচিত ছিল ঐ সুরকে উচ্চে তুলে পরাধীনতার শিকল ভাংগা কবির কষ্টের সাথে নিজের কষ্টের একাত্মতা প্রকাশ করা।

বন্ধু গো আর বলিতে পারি না, বড় বিষ ¦ালা এই বুকে।

দেখিয়া শুনিয়া ক্ষেপিয়া গিয়াছি, তাই যাহা আসে কই মুখে।

রক্ত ঝরাতে পারি না তো একা,

তাই লিখে যাই রক্তলেখা,

বড় কথা বড় ভাব আসে নাকো মাথায়, বন্ধু বড় দুখে!

অমর কাব্য তোমরা লিখিও, বন্ধু, যাহারা আছ সুখে!

পরোয়া করি না, বাঁচি বা না বাঁচি যুগের হুজুগ কেটে গেলে।

মাথার উপরে জ¦লিছেন রবি, রয়েছে সোনার শত ছেলে।

প্রার্থণা করো, যারা কেড়ে খায় তেত্রিশ কোটি মুখের গ্রাস,

যেন লেখা হয় আমার রক্ত লেখায় তাদের সর্বনাশ।

(আমার কৈফিয়ত, শ্রেষ্ঠ নজরুল, পৃষ্ঠা ৭২/৭৩)।

 

নাজমা মোস্তফা,  ২ ডিসেম্বর ২০১৫ সাল।

 

২০১৭ সালের সংযোজন: আজ দেখলাম একটি প্রতিবাদনামা অনেক সচেতনের অনলাইন সাইটে যেখানে রবীন্দ্রনাথের কবিতা দুই বিঘা জমিসহ অতিরিক্ত বাগাড়ম্বরে ভরা প্রচারধর্মী রবীন্দ্রনাথকে পাঠ্যবই থেকে বাদ দেয়ার দাবী করা হয়েছে যার উপর চারিত্রিক গলতি দৃষ্টিগোচর হচ্ছে। । তারা যুক্তি হিসাবে দেখাচ্ছেন, কয় বছর আগে সুপ্রীম কোর্টের একটি রায়ে (আপিল নাম্বার ১২৮ এর ২১১২) সিনিয়র জাস্টিস বিচারপতি শরফুদ্দিন চাকলাদার তার ১৫ ও ১৬ নাম্বার পৃষ্ঠায় প্রকাশ করেন যে, রবীন্দ্রনাথ ঢাকায় আসতেন এবং বুড়িগঙ্গা নদীতে নৌকা নোঙর করতেন প্রসিদ্ধ গঙ্গাজলীর (বিশাল পতিতালয়ের ঠিকানা) বিপরীতে এবং লিখতেন “বাংলার বধু বুকে তার মধু”। উল্লেখ্য, এ বছর ২০১৭ সালের অষ্টম শ্রেনীর পাঠ্যবইএ সাহিত্য কণিকার ৭৮ পৃষ্ঠায় দুই বিঘা জমি কবিতাটি এসেছে এবং সেখানেও এসেছে ঐ ছন্দময় সংযোজনটি “বুক ভরা মধু, বঙ্গের বধু।” ঐ সব প্রতিবাদকারীরা জোর গলাতে বলছেন রবীন্দ্রনাথের পারিবারিক ব্যবসা ছিল পতিতালয়ের ব্যবসা। তার দাদার শুধু কলকাতায়ই ছিল ৪৩টি পতিতালয় (তথ্যসূত্র: সতীশচন্দ্র চক্রবর্তী সম্পাদিত, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের আত্মজীবনী, ১৯৬২, পৃষ্ঠা ৩৫৮-৬০; কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকা, ২৮ শে কার্তিক ১৪০৬, রঞ্জন বন্দোপাধ্যায়)।

উদাহরণ হিসাবে আবুল আহসান চৌধুরী রচিত ‘অবিদ্যার অন্তঃপুরে, নিষিদ্ধ পল্লীর অন্তরঙ্গ কথকথা” বইএ পাওয়া যায় বেশ্যাবাজি ছিল বাবু (হিন্দু) সমাজের সাধারণ ঘটনা। নারী আন্দোলনের ভারত পথিক রাজা রামমোহন রায়ের রক্ষিতার গর্ভে তার একটি পুত্রও জন্মে। রবীন্দ্রনাথের ভাই জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর পতিতা সুকুমারী দত্তের প্রেমে মত্ত ছিলেন। রবীন্দ্রনাথের মতই শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ও নিয়মিত পতিতালয়ে গমন করতেন। যার খেসারত হিসাবে রবীন্দ্রনাথের সিফিলিস আক্রান্ত হওয়ার খবর তার জীবদ্দশাতেই “বসুমতি” পত্রিকাতে প্রকাশিত হয়েছিল।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: সর্বশেষ সংযোজনটি জরুরী মনে করেই করি। কারণ অনেক হিন্দু ঘেষা বৌদ্ধ ও নাস্তিককে অতীতে এ লড়াই করতে দেখেছি যে নবী মোহাম্মদ (সঃ) থেকেও রবীধর্ম বলে কিছু প্রচার করলে নাকি ভালো হতো।  সবচেয়ে বেদনার কথাটি হচ্ছে মুসলিমরা অসচেতন ও অতিরিক্ত অসাম্প্রদায়িক থাকার কারণে অন্যের বিষফলকে অমৃত জেনেই অন্দর মহলে জায়গা করে দিয়েছে, দিচ্ছে আর নিজের বিশাল অর্জনকে না জেনে অবজ্ঞা করেছে, করছে। রবীন্দ্রনাথ যদি প্রকৃতই সচেতন হয়ে ঐ সমাজে কাজ করে যেতেন তবে ভারত বর্ষের আগুণ এভাবে একবিংশ শতাব্দী অবদি তোষের আগুণে পুড়তো না। গুজরাট বাবরী মসজিদসহ হাজার হাজার দাঙ্গার সমারোহ হতো না। এর সমূহ দায় দুধের উপরে ভেসে থাকা এসব সরলোভীদের ঘাড়েই বড়মাপে বর্তায়। এসব অপকর্মের দায় থেকে এ বড় কবির নিস্তার পাবার কোন সুযোগ নেই।

নাজমা মোস্তফা, ১৬ই জানুয়ারী ২০১৭, নতুন সংযোজন শেষের প্যারা।

 

Tag Cloud