Articles published in this site are copyright protected.

স্বাধীনতার শুরু থেকেই সচেতন মুক্তিযোদ্ধাসহ সচেতনরা ক্ষত বিক্ষত হতে থাকেন নানা কারণে। তার প্রমাণ হিসাবে একজন মুক্তিযোদ্ধার লেখা কটি পুরানো পাতা থেকে কিছু তথ্যসূত্র তুলে ধরবো বর্তমান সময়ের পাঠকের জন্য। এরা তারাই যারা না দেখেছে স্বাধীনতা না এর গভীরে ঢুকতে পেরেছে। কখনো সঠিক কখনো অঠিক যুদ্ধের কিছু ছেড়া পাতা থেকে মাঝে মাঝে বিচ্ছিন্ন কিছু জেনেছে মাত্র। আদর্শকে পরম আদরে লালন করতে হয় চাষ করতে হয় এসব আগাছা নয় যে এমনি এমনি জন্মাবে। নেতারা আদর্শের চাষ করতে না পারলেও সেদিন মুক্তিযোদ্ধাদের সম্বল ছিল তার চিরাচরিত গড়ে উঠা পারিবারিক আত্মমর্যাদা ও আদর্শিক মনোবৃত্তি যা তাকে স্বাধীনতার দোর পর্যন্ত নিয়ে যায়। এর বাইরে বাড়তি আর কোন সুনির্দিষ্ট আদর্শের নিয়মে এরা আটকা পড়ে নি।

এরা হচ্ছে শেখ হাসিনার জঙ্গীলীগ  ২০১৭ সাল অবদি দেশটিকে অরক্ষিত করার জবরদখলির প্রমান দেখুন ভিডিওটিতে। তবে অতি অল্প দিনের মধ্যে এসব দাগ চিহ্ন মুছে ফেলার কৌশল জোরালো ভাবে চলছে।  

চল্লিশ পরবর্তী বর্তমান বিশৃংখল সময়ের উদাহরণীয় ঘটনা প্রমান করে ঐ মুক্তিযোদ্ধার বাস্তব উপলব্ধি যে কত সত্য ছিল তা স্পষ্ট। সামান্য উদাহরণ হিসাবে আনছি, মাত্র আজ ২০১২ সালের সেপ্টম্বরের ১১ তারিখের খবরে জানা যায় বাংলাদেশের নিখোঁজ গার্মেন্টস শ্রমিক নেতা আমিনুলের এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে নিউইয়র্ক টাইমস। খবরে প্রকাশ পুলিশের তোলা ছবিতে দেখা যায় আমিনুলের হাটু গেড়ে গুড়ো করে দেয়া হয়েছে এবং তার পায়ের তলা ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে। তার ডান হাটুর নীচে ড্রিল দিয়ে ছিদ্র করা হয়েছে, চিকিৎসকরা বলেছেন। তাকে রক্তাক্ত করে হত্যা করা হয়েছে। বহুদিন থেকে আমিনুলের করুণ ঘটনা শুনছি পত্রিকার পাতাতেই। আর সে দেশের প্রধানমন্ত্রী যিনি সব সময় আসামীদের পক্ষে সাফাই দিয়ে বেড়ান তিনি বলছেন যে, নিরাপত্তা বাহিনীর জড়িত থাকার খবর অসত্য। তিনি কি দেশের নির্যাতীত মানুষের কোন খবর রাখেন? বরং দেখা যায় যারা নির্যাতন করে তাদেরে কি ভাবে সামাল দিবেন তার মূল্যবান সময় সেখানেই ব্যয় করেন। কেমন করে কিসের জোরে তার কর্মীরা এমন সব দক্ষ মারদাঙ্গা কর্মকান্ড করে সারা দেশকে এক বিরান ভূমি বানিয়ে রেখেছে। ছাত্র নামধারী দুর্জনেরা যা করে বেড়াচ্ছে তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা দূর প্রবাস ছোয়, যা আর বলার অপেক্ষায় নেই। এবার কথা হচ্ছে এরা এতসব বীরদাঙ্গার অর্জন করলো কবে কখন, কিভাবে এবং কেন? নিশ্চয় কোন সূত্রে তারা গোল্ড মেডেল অর্জনধারীদের মত এসবে দক্ষতা অর্জন করে চলেছে। জাহান্নামে যাবারও একটি দক্ষতা লাগে। যেমন নানান খবর থেকে ধারণা হয়, এই আমিনুল নামের মানুষটি কোন অবস্থাতেই সেখানে যেতে পারবে না। সমাজ সেবক মানবতাবাদী ধারণায় তার কৃতকর্ম যেন জান্নাত তাকে হাতছানি দিচ্ছে। কিন্তু যে পুলিশ বা ক্যাডার তাকে হত্যা করছে হাত পা গুড়ো করেছে তার জন্য জাহান্নাম প্রস্তুতি নিচ্ছে। খোদ প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রীরা কোথায় যেতে চান তা তাদের কর্মকান্ডই নির্ধারণ করে দিবে বা হয়তো কর্মকান্ডের ফিরিস্তি দেখে আমজনতাও তা বলে দিতে পারবে।

শেখ সেলিম দেশের লাখ লাখ মানুষকে হত্যার হুমকি দিচ্ছেন,তার বিচার হওয়া উচিত’

বিপন্ন এ দেশটিকে স্বাধীনতা পরবর্তী কিভাবে শুরু থেকেই আরো বিভৎস অবস্থার সম্মুক্ষিণ হতে হয়েছে এর কিছু নমুনা সুস্পষ্ট হয়েছে একজন মেজরের বাস্তবে পরখ করে দেখা তার সৃষ্টিশীল লেখনীতে। তার অতিবাস্তব চোখে দেখা একজন আদর্শ সৈনিকের দৃষ্টিতে যা ধরা পড়েছে তাই তিনি উল্লেখ করেছেন। তার বইতে তিনি এর বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন। আমি শুধু কিছু পয়েন্টকে পাঠকের সামনে তুলে ধরলাম শুধু এ সত্যটুকু উপলব্ধি করার জন্য। এর প্রতিটি ধাপ আমাদের নিজেদের চোখেও পরখ করা। আমরা নিজেরাও এর নীরব সাক্ষী। নীচে যে লুন্ঠন প্রক্রিয়ার প্রসঙ্গ এসেছে, আমি ব্যক্তিগতভাবেও দেখেছি কারণ বর্ডার সংলগ্ন আমাদের নিজেদের বাড়ী হওয়ার কারণেও বাড়ীর সামনে দিয়ে ট্রেন বোঝাই বিশাল কয়েকগুণ লম্বা ট্রেনগুলো বর্ডার দিয়ে যাবার সময় সবকটি লগি নিঃছিদ্র বন্ধ থাকতো। আমরা ধারণাও করতে পারতাম না কি সব যাচ্ছে ঐ বর্ডার পার হয়ে। গোটা দর্শণার্থী জনতারা মনের সঙ্গোপনে সবাই বেদনা বোধ করতো কিন্তু কারো কিছু করার ছিল না। উপস্থিত সবাই নির্বাক ছিল। ঠিক একইভাবে আসার পথে সবকটি দরজা খোলা থাকতো। এতে আরো বোঝা যেত বাংলার সব বগলদাবা করে ফেরত খোলা কম্পার্টমেন্ট তার নাড়িভুড়ি দেখিয়ে দেখিয়ে আবার ঝাকার ঝুম্মুর ঝাকার ঝুম্মুর আওয়াজ করতে করতে ফেরত দেউলিয়া হয়ে আমাদের ষ্টেশন সংলগ্ন বাড়ীটির পাশ দিয়ে ঘটনার দাগ চিহ্ন রেখে পার হয়ে যেত। নীচে যশোহর খুলনার বর্ডার সংলগ্ন খবর হলেও আমি ভিন্ন বর্ডার সংলগ্ন অবস্থান নিজ চোখে দেখেছি। তার মানে লুটপাটের এ মহড়া ঐসময় সারা দেশজুড়ে উৎসবের আদলে চলে। দর্শণার্থিরা সেদিন নির্বাক থেকে সারাক্ষণ মনের মাঝে কষ্ট পেয়েছে, আজ ঐ মেজরের কথার সাথে ঐ একই মর্মর ধ্বনি শুনতে পাচ্ছি।

মানুষ তার জীবনে অনেক কিছ্ইু হারায়। যখন ধন জন হারায়, তারপরও তাকে ধৈর্য্য ধরে দাঁড়াবার ইঙ্গিতই সুজনরা ধার্মিকেরা দিয়ে গেছেন কিন্তু যখন কেউ তার মানবিকতা হারায় নৈতিকতা হারায় তখনই সে সর্বস্ব হারাবার পর্যায় পার করে। বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে স্বাধীনতার চল্লিশ বছর পর সব খবরাখবর শুনে মনে হচ্ছে এরা যেন সর্বস্ব হারাবার পথেই এগুচ্ছে। কিন্তু এর কারণ কি? সর্বত্র আদর্শ মানবিকতা হারাবার এ বিজয়মেলা কেন? আদর্শের চাষ কেন ৯০% মুসলিম অধ্যুষিত একটি অঞ্চলে হচ্ছে না বরং উল্টো ফসল ঘরে উঠছে। এমন কোন জায়গা নেই যেখানে ‘এ জাতি এ গ্যাংরিণে আক্রান্ত দশা থেকে মুক্ত’ এটি বলার জো নেই। অভিজ্ঞ ডাক্তারেরা বলেন এটি হলে রক্ষে নেই, পা কেটে ফেলে দিতে হয়। দেশটির জন্ম লগ্নে আমরাই ছিলাম প্রতিটি জলজ্যান্ত ঘটনার অংশিদার। আমরা ছিলাম যুদ্ধের শরিক শক্তি, এটি বলতে কোন দ্বিধা নেই। আমরা তখন তরুণ, মোরব্বিদের মুখেই শুনেছি কিভাবে আদর্শের নষ্টামির সব ভ্রষ্ট চালচিত্র খুব কৌশলে সেদিন থেকে সমাজে ধীরে জায়গা করে নেয়। প্রতিটি ক্ষেত্রে নকলবাজি থেকে শুরু করে সবখানেই আদর্শের হতাশ দশা। আর আজ যেন এর আগ্নেয় বিস্ফোরণ হচ্ছে সবদিকে।

তাছাড়া বর্তমান মন্ত্রীরা এভাবে কেন কথা বলছেন? একজন সরকার প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গির কবির নানক বলছেন ‘প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশকে এবাদত মনে করে পিলখানায় গিয়েছিলাম’। একজন মুসলমান এরকম শিরকী কথা কেন বলছেন? এরকম কথা কোন মুসলমানের মুখে মানায় না, এটি ৯০% মুসলিম অধ্যুষিত একটি শিরকহীন এ ধর্মের গোড়াতেই আঘাত করে। যদিও বিশারদরা এসব নির্মম বাণী আগেই বলে রেখেছেন। চোরা না শুনে ধর্মের কাহিনী, অতি ভক্তি চোরের লক্ষণ। সত্যনিষ্ট বিচারকরা আলামত সূত্র ধরেই ফয়সালাতে পৌছান। মুসলমানের ঈমান একমাত্র অদেখা বিধাতা আল্লাহর সত্যকে বিশ্বাস করে। স্বার্থবাজ রাজনীতি মানুষকে এভাবে দিকহারা অমানুষে পরিণত করছে। যদিও এ ধারার আচরণে ধরা পড়ে এরা বেশির ভাগ নামেই মুসলিম, কাজে মোনাফিক। যদিও বাস্তব আল্লাহর খবরদারীও বেশী দূরে নয়, সামান্য পরে হলেও অবধারিত। আর সেখানে কোন ছাড় দেয়াও হবে না। বালি পরিমান দোষের গুণের বিষয়ও প্রাধাণ্য পাবে। পিলখানা হত্যা মামলার সাক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর সামরিক সচিব মেজর জেনারেল মিয়া মোঃ জয়নুল আবেদিন অস্থায়ী মহানগর দায়রা জজ আদালতে হাজির হয়ে সাক্ষ্য প্রদানকালে বলেন, পরিচয় গোপন করে বিজিবির সাবেক ডিএডি তৌহিদসহ অন্যরা যমুনা ভবনে গিয়েছিলেন। খবরটি জানা যায় ৩ আগষ্ট ২০১২ সালের পত্রিকার রিপোর্টে প্রকাশ। এরই ধারাবাহিকতা সাধু পুরুষদের এমন ধারার এবাদতনামার জবানবন্দি। বর্তমানের এরকম সময়ের প্রেক্ষাপট বিশ্লেষনে এখানে মেজর জলিলের লেখাটি মনের মাঝে গভীর দাগ কাটে বিগত শতকের শেষ দিকে যখন লেখাটি প্রকাশিত হয়। সে লেখা থেকে সংগৃহীত পাঠকের জানার জন্য সামান্য কিছু মাল মসালা। ১৯৮৮ সালে একজন মুক্তিযোদ্ধার বই, এর নাম ছিল “অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা” ৮০ পৃষ্ঠার বইটি ইতিহাস পরিষদ কর্তৃক প্রকাশিত। সেখান থেকে কয়টি পয়েন্ট।

 

majalil(১) তৎকালীন সময়ে কট্টর আওয়ামী লীগার বলে পরিচিত নেতা কর্মীদের মুখে ‘ধর্মনিরপেক্ষতার’ নাম গন্ধও শুনতে পাইনি। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী দামাল তরূণ যুবকদের অধিকাংশই ছিল এদেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের সন্তানসন্ততি।আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পূর্বের ইসলাম আর পরের ইসলামএর মধ্যে হঠাৎ করে এমন কি ঘটে গেল যাতে ইসলামের কথা শুনলেই কোন কোন মহল পাগলা কুকুরের মত খিচিয়ে উঠেন। শেখ মুজিব একদিকে ছাত্র নেতৃত্বের কাছে নতি স্বীকার করে স্বাধীনতার পক্ষে যেমন কাজ করেছেন, ঠিক তেমনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে চেষ্টা করেছিলেন পাকিস্তানকে রক্ষা করতে।

(২) ২৫শে মার্চ রাতের কথা স্মরণ করে অধিকাংশ নেতৃবৃন্দই শিহরে উঠে জবাব দিয়েছেন যে, তাদের নাকি কল্পনায়ও ছিল না পাকিস্তান আলোচনার পথ ত্যাগ করে আক্রমন করবে। অনেকে মার্শাল ল’ জারী হতে পারে পর্যন্ত ধারণা করেছেন।  মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী, পুলিশ, ইপিআর, আনসার, অন্যান্য চাকরীজীবী, ব্যবসায়ী ইত্যাদি মহলের ক্ষেত্রেও এ কথাই প্রযোজ্য। এদের মধ্যে অনেকেই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে নিতান্ত বাধ্য হয়ে প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে, কেউ কেউ করেছে সুবিধা অর্জনের লোভ লালসায়, কেউ করেছে পদ যশ অর্জনের সুযোগ হিসাবে, কেউ করেছে তারুণ্যের অন্ধ আবেগে এবং উচ্ছ্বাসে এবং কতিপয় লোক অংশগ্রহণ করেছে ‘এডভ্যাঞ্চার ইজম’ এর বশে। এসকল ক্ষেত্রে দেশপ্রেম নিষ্ঠা এবং সততারও তীব্র তারতম্য ছিল। কারণ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেও যারা যুদ্ধচলাকালীন অবস্থায় এবং যুদ্ধোত্তরকালে চুরি, ডাকাতি, ধর্ষণ করেছে, অপর বাঙালীর সম্পদ লোপাট করেছে, বিভিন্নরুপ প্রতারণা করেছে, ব্যক্তি শত্রুতার প্রতিশোধ নিয়েছে, তাদের কাছে মুক্তিযুদ্ধের সেই নির্দিষ্ট চেতনা যে সম্পূর্ণভাবেই অজানা ছিল তাতে সন্দেহের কোনই অবকাশ নেই। তবে তাদের মধ্যে মুজিবপ্রীতি ছিল, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কিংবা আদর্শবোধ ছিল না। এ ধরণের লোকসংখ্যাই ছিল অধিক। মুক্তিযুদ্ধের পরে অন্ধ আবেগের বশে বিভিন্নভাবে বাড়াবাড়ি করেছে এবং আজ পর্যন্ত করে চলেছে।

(৩) অস্থানীয় শোষকের স্থানটি যে স্থানীয় শোষক ও সম্পদলোভীদের দ্বারা অতি দ্রুত পূরণ হয়ে যাবে এ বিষয়টি সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের জ্ঞান বা বোধশক্তির বাইরেই ছিল। এ সত্যটি কেবল তারা তখনই অনুধাবন করল, যখন সদ্য স্বাধীন দেশে প্রত্যাবর্তন করে সরাসরি প্রত্যক্ষ করল শাসক আওয়ামী লীগ ও তাদের অন্যান্য অঙ্গ সংগঠনগুলোর মধ্যে ক্ষমতা এবং সম্পদ ভাগাভাগি এবং লুটপাটের দৃশ্য ও মহড়া। অপরদিকে মুক্তিযুদ্ধের সেই সুনির্দিষ্ট চেতনায় যারা সমৃদ্ধ ছিল, তারা যুদ্ধ চলাকালীন অবস্থায়ই উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছিল আওয়ামী লীগের আচার আচরণ দেশে ফিরে কি হবে। মুক্তিযুদ্ধের জনক হিসাবে পরিচিত মরহুম জনাব মুজিব মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সম্পর্কে অবগত থাকলেও সেই চেতনায় তিনি পরিপূর্ণভাবে বিশ্বাসী ছিলেন না বলেই ক্ষমতালাভের পরে তার মধ্যে পরিলক্ষিত হয়েছে মারাত্মক দ্বন্দ্ব এবং অস্থিরতা, যার ফলে তিনি কখনো হয়েছেন রাষ্ট্রপতি আবার কখনো বা দায়িত্ব নিয়েছেন প্রধান মন্ত্রীত্বের। আওয়ামী শীর্ষস্থানীয় নেতৃত্বের মধ্যেও তদ্রুপ পরিলক্ষিত হয়েছে দোদুল্যমানতা এবং সীমাহীন ক্ষমতা লাভের মোহ। তারা সকলেই কেবল ক্ষমতার সখ মিটিয়েছে কারণ মুক্তিযুদ্ধ তাদের কাছে ছিল কেবল ক্ষমতা লাভের হাতিয়ার মাত্র, চেতনার উৎস নয়।

(৪) কমান্ডার মুখার্জী অত্যন্ত সুহৃদ বাঙালী অফিসার। তিনি আমাকে লেঃ জেনারেল জগজিৎ শিং অরোরার কাছে নিয়ে গেলেন। তিনি আমাকে প্রথম সাক্ষাতেই সম্পূর্ণভাবে বিশ্বাস করতে পারলেন না। সাক্ষী প্রমাণ দাবী করলেন আমার। তখনই আমাকে সদ্য ঘোষিত স্বাধীন বাংলা সরকারের প্রধানমন্ত্রী জনাব তাজউদ্দিন এবং সর্বাধিনায়ক কর্ণেল ওসমানী সাহেবের নাম নিতে হয়েছে। উত্তরে জেনারেল ওরোরা সাহেব আমাদের নেতৃবৃন্দ সম্পর্কে যা বাজে মন্তব্য করলেন, তা কেবল মুখেই সদা উচ্চারিত হয়ে থাকে। সোজা ভাষায় তার উত্তর ছিল “ঐ দুটি ব্লাডি ইঁদুরের কথা আমি জানি না, ওদের কোন মূল্য নেই আমার কাছে। অন্য কোন সাক্ষী থাকলে আমাকে বল”। আমার দ্রুত মুক্তি ও মুক্তিযুদ্ধের জন্য অস্ত্র সংগ্রহ করার লক্ষ্যকে সামনে রেখেই আমি পাকিস্তান সেনাবাহিনী সম্পর্কে কিছুটা তথ্য প্রদান করি।

(৫) কলকাতার বালিগঞ্জের আবাসিক এলাকার একটি দ্বিতল বাড়ীতে বসে প্রধানমন্ত্রী তার মন্ত্রীসভা সহকারে (খন্দকার মোশতাক বাদে) নিরাপদে তাস খেলছিলেন দেখে আমি সে মুহূর্তে কেবল বিস্মিতই হইনি, মনে মনে বলছিলাম ‘ধরণী দ্বিধা হও’। ধরণী সেদিন দ্বিধা না হলেও আমি কিন্তু সেদিন থেকেই আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের প্রতি চরমভাবে আস্থাহীন এবং বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছি। যে জাতির নির্বাচিত প্রতিনিধিবৃন্দ জনগণকে যুদ্ধের লেলিহান শিখার মধ্যে নিক্ষেপ করে কোন নিরাপদ আশ্রয়ে বসে বেকার, অলস যুবকদের মত তাস খেলায় মত্ত হতে পারে, সে জাতির দুর্ভাগ্য সহজে মোচন হবার নয়। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের আচরণে এ ধরণের ভুরি ভুরি নমুনা রয়েছে। যুদ্ধকালীন অবস্থায় আরাম আয়েশী জীবনধারা কোলকাতাবাসীদেরকে করেছে হতবাক।

(৬) ভারতীয় কর্তৃপক্ষ মুক্তিযোদ্ধাদেরকে অস্ত্র সরবরাহ করার আগ্রহ প্রদর্শন যা করেছে তার তুলনায় অধিকতর উৎসাহ এবং আগ্রহ প্রদর্শন করেছে তথ্য সংগ্রহ করার ব্যাপারে। বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে অস্ত্র প্রদান নয়, পাকিস্তান সেনাবাহিনী এবং বাংলাদেশ সম্পর্কে জরুরী তথ্য সংগ্রহই ছিল যেন ভারতীয় কর্তৃপক্ষের মূল উদ্দেশ্য। একাত্তরের সেই গভীর বর্ষারত দিনরাতে কোলকাতার অভিজাত রেষ্টুরেন্টগুলোতে বসে গরম কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে হাটু তক কাদাজলে ডুবন্ত মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং শিবিরগুলোতে অবস্থানরত হাজার হাজার তরুণের বেদনাহত চেহারাগুলো তারা একবারও দেখেছে কিনা তা আজো আমার জানতে ইচ্ছা করে।

(৭) মুক্তিযোদ্ধা এবং শরণার্থীদের নামে আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ ভারতের বিভিন্ন সম্পদশালী ব্যক্তি, গোষ্ঠী এবং সংস্থাসমূহ থেকে প্রচুর পরিমাণে অর্থ সম্পদ মালামাল সংগ্রহ করেছেন একথা সকলেরই জানা। কিন্তু সংগৃহীত সাহায্যের যৎকিঞ্চিত ব্যতীত আর কিছুই পৌছেনি মুক্তিযোদ্ধা কিংবা শরণার্থী শিবিরে। সে সংগৃহীত অর্থে ভারতের বিভিন্ন ব্যাংকে আওয়ামী লীগ নেতাদের নামে বেনামে মোটা অংক যে জমা হয়েছিল তার ইতিহাস ভারতীয় কংগ্রেস নেতৃত্বের মোটেও অজানা নয়। — তারাই যখন আবার মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দাবী করেন, তখন ইতিহাস হয়ত বা মুচকি হেসে প্রচন্ড কৌতুক বোধ করে বলে আমার বিশ্বাস। — হানাদার পাক বাহিনীর সুযোগ্য উত্তরসুরী তো একমাত্র তারাই আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ।

(৮) ভারত সত্যি সত্যিই বিশস্ত বন্ধু। তা না হলে আওয়ামী লীগ নেতাদের এতো কুকর্মের খতিয়ান, দোষ ত্রুটি, আয়েবের খবর জেনেও আজ পর্যন্ত সামান্যতম প্রকাশ করেনি এবং সাধ্যমত গোপন রখেই যাচ্ছে – এটা একেবারে কম কথা নয়। নভেম্বরে ভারতীয় সেনাবাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং শিবিরগুলোর দায়িত্ব সরাসরি নিতে চেষ্টা করে। আমার সেক্টরে ততটা সুবিধে করতে না পারলেও কর্তৃপক্ষ ভারতীয় সেনাবাহিনীর অফিসার নিয়োগ করেছিল। ট্রেনিং শিবিরের অস্ত্রগুলোও প্রত্যাহার করে নেয়ার নির্দেশ প্রদান করে। তখনই শুরু হয় বাকবিতন্ডা এবং সম্পর্কের অবনতি ঘটতে আরম্ভ করে। আমি ভারতীয় কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অমান্য করেই অধিকাংশ অস্ত্র বারুদ ক্যাপ্টেন জিয়াউদ্দিন নৌ কমান্ডো নূর মোহাম্মদ বাবুল, ক্যাপ্টেন শাহজাহান ওমর, নৌ কমান্ডার বেগের হাতে তুলে দেই এবং তাদেরকে ভারতীয় ষড়যন্ত্র সম্পর্কেও সজাগ করে দেই।

(৯) বাঙালীর স্বার্থ ছিল ভারতের কাছ থেকে অস্ত্র নিয়ে দেশ মুক্ত করা আর ভারতের স্বার্থ ছিল দেশ মুক্ত করার নামে তার চিহ্নিত শত্রু পাকিস্তানকে দ্বিখন্ডিত করার মধ্য দিয়ে শত্রুপক্ষকে স্থায়ীভাবে দুর্বল করে রাখা এবং মুক্ত বাংলাদেশের উপর প্রাথমিকভাবে খবরদারী করে পরবর্তীতে সময় ও সুযোগমত ভারতের সাথে একীভূত করে নেয়া। এটাকে শুধু কেবল তাদের নিছক স্বার্থ হিসাবে চিহ্নিত করলে ভুল হবে, বরং এটা ছিল তাদের দীর্ঘ দিনের স্বপ্ন।

(১০) যে জাতির নির্বাচিত প্রতিনিধিবৃন্দ জনগণকে যুদ্ধের লেলিহান শিখার মধ্যে নিক্ষেপ করে কোন নিরাপদ আশ্রয়ে বসে বেকার, অলস যুবকদের মত তাস খেলায় মত্ত হতে পারে, সে জাতির দুর্ভাগ্য সহজে মোচন হবার নয়। যুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের আচরণে এ ধরণের ভুরি ভুরি নমুনা রয়েছে। যুদ্ধকালীন অবস্থায় আরাম আয়েশী জীবনধারা কোলকাতাবাসীদেরকে করেছে হতবাক। ভারতে অবস্থানকালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের অনেক কিছুই জানতে চেয়েছিলেন স্বনামধন্য সাহিত্যিক এবং চিত্র নির্মাতা কাজী জহির রায়হান। তিনি জেনেছিলেন অনেক কিছু, চিত্রায়িতও করেছিলেন অনেক দুর্লভ দৃশ্যের। কিন্তু অতোসব জানতে বুঝতে গিয়ে তিনি বেজায় অপরাধ করে ফেলেছিলেন। স্বাধীনতার উষালগ্নেই তাকে সেই অনেক কিছু জানার অপরাধেই প্রাণ দিতে হয়েছে বলে সকলের ধারণা।

(১১) আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার ৩ নম্বর আসামী স্টুয়ার্ড মুজীবেরও ঘটেছিল এই পরিণতি। এই দায়িত্বশীল, নিষ্ঠাবান, তেজোদীপ্ত যুবক স্টুয়ার্ড মুজীব আমার ৯ নম্বর সেক্টরের অধীনে এবং পরে ৮ নং সেক্টরে যুদ্ধ করেছে। তার মত নির্ভেজাল করিতকর্মা একজন দেশপ্রেমিক যোদ্ধা সত্যিই বিরল। প্রচন্ড সাহস ও বীরত্বের অধিকারী স্টুয়ার্ড মুজীব ছিল শেখ মুজীবের অত্যন্ত প্রিয় অন্ধভক্ত। — তাকে দেখেছি বিদ্যুতের মত এক প্রান্ত থেকে অপরপ্রান্তে ছুটাছুটি করতে। কি করে মুক্তিযুদ্ধকে ত্বরান্বিত করা যায়। — মুজীব ভারতে অবস্থিত আওয়ামী নেতার অনেক কুকীর্তি সম্পর্কেই ছিল ওয়াকেফহাল। এতবড় স্পর্ধা কি করে সইবে স্বার্থান্বেষী মহল। তাই স্বাধীনতার মাত্র সপ্তাহ খানিকের মধ্যেই ঢাকা নগরীর গুলিস্তান চত্বর থেকে হ্যাইজ্যাক হয়ে যায় স্টুয়ার্ড মুজীব। এভাবেই হারিয়ে যায় বাংলার আর একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র।

(১২) ভারত মুক্তিযুদ্ধে সকল অস্ত্র দিয়েছে এ কথা সত্য নয়। প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের অর্থেও প্রচুর অস্ত্র ক্রয় করা হয়েছিল। সে অস্ত্র সম্পদ মুক্তিযুদ্ধেরই সম্পদ ছিল। মুক্তিযুদ্ধের সম্পদ ভারতীয় সেনাবাহিনীর হস্তে সমর্পন করার কোনই যুক্তি ছিল না। দুর্বল আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের অসহায় আত্মসমর্পণই ভারতীয় চক্রকে তাদের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়ন করার সুবর্ণ সুযোগ এনে দেয়।

(১৩) মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক কর্র্ণেল ওসমানীর কাছে পাকিস্তানের পরাজিত জেনারেল নিয়াজী আত্মসমর্পণ করলেন না কেন? আত্মসমর্পণের সময় কর্ণেল ওসমানী অনুপন্থিত ছিলেন কেন? আত্মসমর্পণের বেশ কয়েকদিন পরে কর্ণেল ওসমানী ঢাকায় এলেন কেন? এ সময়কাল তিনি কোথায় ক্ষেপন করেছেন? তিনি কি তাহলে সত্যিই কলকাতায় বন্দী ছিলেন? আজো বাংলাদেশের জনমনে নানান প্রশ্নের ভীড় জমছে। এসব প্রশ্নের উত্তর দেশবাসী আওয়ামী লীগের কাছ থেকে প্রত্যাশা করছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব ও ভারতে অবস্থানরত প্রবাসী আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব এ সকল প্রশ্নের জবাব দেয়ার আজ পর্যন্ত কোন তাগিদই বোধ করেনি। মুক্তিযুদ্ধের দীর্ঘ ন’টি মাসের অসীম ত্যাগ তিতিক্ষা এবং আত্মাহুতির মধ্য দিয়ে রচিত বিজয় পর্ব এভাবেই ভারতীয় শাসক চক্র দ্বারা লুন্ঠিত হয়ে যায়। সংগ্রামী, লড়াকু বাঙালী জাতি প্রাণপণ যুদ্ধ করেও যেন বিজয়ী হতে পারল না, পারল কেবল অপরের করুণার বিজয় বোধ দূর থেকে অনুভব করতে। বিজয়ের সরাসরি স্বাদ থেকে কেবল বাঙালী জাতি বঞ্চিত হলো না, বঞ্চিত হলো প্রকৃত স্বাধীনতা থেকেই। সুতরাং সেই বঞ্চনাকারীদের কবল থেকে বঞ্চিতদের ন্যায্য পাওনা আদায় করার লক্ষ্যে আর একটি প্রকৃত মুক্তিযুদ্ধের প্রয়োজন কি এখনও রয়ে যায় নি?

বাংলাদেশে ভারতীয় বাহিনীর পরিকল্পিত লুন্ঠন:

(১৪) ভারতের  সম্প্রসারণবাদী প্রতিক্রিয়াশীল শাসক গোষ্ঠী মুক্তিযুদ্ধের শেষপর্বে সমগ্র মুক্তিযোদ্ধার ভয়ে ভীত হয়েই বাঙালীর স্বাধীনতার গৌরবকে জবরদখলের মধ্য দিয়ে নিজেদের হীন স্বার্থ উদ্ধার করেছে মাত্র। — দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধারা ১৬ই ডিসেম্বরের পরে মিত্র বাহিনী হিসাবে পরিচিত ভারতীয় সেনাবাহিনীকে নব্য স্বাধীন বাংলাদেশের বিভিন্ন সম্পদ মালামাল লুন্ঠন করতে দেখেছে। সে লুন্ঠন ছিল পরিকল্পিত লুন্ঠন সৈন্যদের স্বতস্ফুর্ত উল্লাসের বহিঃপ্রকাশ স্বরুপ নয়। সে লুন্ঠনের চেহারা ছিল বিভৎস – বেপোরোয়া।

(১৫) মুক্তিযুদ্ধের নবম সেক্টরের অধিপতি হিসাবে আমি সেই মটিভেটেড লুন্ঠনের তীব্র বিরোধীতা করেছি। সক্রিয় প্রতিরোধও গড়ে তুলতে চেষ্টা করেছি। লিখিতভাবেও এই লুন্ঠনের প্রতিবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী জনাব তাজউদ্দিন, কর্ণেল ওসমানী এবং ভারতীয় পূর্ব অঞ্চলের সর্বাধিনায়ক লেঃ অরোরার কাছে জরুরী চিঠিও পাঠিয়েছি। তাজউদ্দিন সাহেবের পাবলিক রিলেশন অফিসার জনাব আলী তারেকই আমার সেই চিঠি বহন করে কলকাতায় নিয়েছিলেন। ১৭ই ডিসেম্বর রাতেই সেই বিশেষ চিঠিখানা পাঠানো হয়েছিল। খুলনা শহরে লুটপাটের যে তান্ডব নৃত্য চলছে তা তখন কে না দেখেছে। ভারতীয় সেনাবাহিনী কর্তৃক সেই লুটপাটের খবর চারদিক থেকে আসা শুরু করে। পাকিস্তান বাহিনী কর্তৃক পরিত্যক্ত কয়েক হাজার সামরিক বেসামরিক গাড়ী, অস্ত্র, গোলাবারুদসহ আরো অনেক মূল্যবান জিনিসপত্র ট্রাক বোঝাই করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। প্রাইভেট কার পর্যন্ত যখন রক্ষা পায় নি তখনই কেবল আমি খুলনা শহরে প্রাইভেট গাড়ীগুলো রিকুইজিশন করে খুলনা সারকিট হাউস ময়দানে হেফাজতে রাখার চেষ্টা করি। এর পূর্বে যেখানে যে গাড়ী পেয়েছে সেটাকেই পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে সীমান্তের ওপারে।

(১৬) যশোহর সেনানিবাসের প্রত্যেকটি অফিস এবং কোয়ার্টার তন্ন তন্ন করে লুট করেছে। বাথরুমের মিরর এবং অন্যান্য ফিটিংসগুলো পর্যন্ত সেই লুটতরাজ থেকে রেহাই পায়নি। রেহাই পায়নি নিরীহ পথযাত্রীরা। কথিত মিত্র বাহিনীর এই ধরণের আচরণ জনগণকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে তুলেছিল।

(১৭) ভারতীয় বাহিনীর আচরণে আমি বিক্ষুব্ধই হয়ে উঠিনি বরং তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করার পর্যায়ে চলে গেলাম। খুলনার নিউজপ্রিন্ট মিলের রেষ্ট হাউজে অবস্থানরত আমার প্রতিপক্ষ ভারতীয় সেনাবাহিনীর অধিনায়ক মেজর জেনারেল দানবীর সিংকে আমি সতর্ক করে দিয়ে বললাম – দেখা মাত্র গুলির হুকুম দিয়েছি আমি। ভারতীয় সেনাবাহিনীকে লুটতরাজ করা হতে বিরত রাখুন।

(১৮) খুলনা পরিত্যাগ করতে হলে নাকি ভারতীয় সেনাবাহিনী কমান্ডোর হুকুম নিতে হবে এ কথা শোনার পরে ভারতের আসল মতলবখানা আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে উঠল। আমি সেক্টর কমান্ডার হিসাবে ভারতীয় নির্দেশ মেনে চলতে মোটেও বাধ্য ছিলাম না। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ব্যুহ্য ভেঙ্গে দেশ মুক্ত করলাম “ভারতীয় সেনাবাহিনীর নির্দেশ মেনে চলার জন্য নয়। একটি মুক্তিপিপাসু জাতির ভাবাবেগ অনুধাবন করতে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ কেবল চরমভাবে ব্যর্থই হয়নি, বরং অনুধাবন করার সামান্যতম ধৈর্যও প্রদর্শন করেনি তারা।

(১৯) ভারতীয় বাহিনীর এই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধেও আমি  জনসভাগুলোকে সোচ্চার হয়ে উঠলাম। আমার পরিষ্কার নির্দেশ ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে বন্দী স্বাধীন বাংলার স্থপতি জনগণের প্রাণপ্রিয় নেতা শেখ মুজীবুর রহমানকে মুক্ত না করা পর্যন্ত বাঙালী জনগণের মুক্তিযুদ্ধ চলতে থাকবে। শেখ মুজীবের হস্তেই কেবল মুক্তিযোদ্ধারা তাদের অস্ত্র সমর্পণ করে দেবে।

(২০) আমারই সাধের স্বাধীন বাংলায় আমিই হলাম প্রথম রাজবন্দী। ৩১শে ডিসেম্বর বেলা ১০টা সাড়ে দশটায় আক্রমণকারী বাহিনীর হাতে বন্দী হয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার আসল রুপের প্রথম দৃশ্য দেখলাম আমি। ভারতীয় সৈন্যবাহিনীর মদদে বাংলাদেশ স্বাধীন করার অর্থ এবং তাৎপর্য বুঝে উঠতে আমার তখন আর এক মিনিটও বিলম্ব হয়নি।

(২১) রাত ১২টা ১ মিনিটে যশোর সেনা ছাউনি নতুন বছরের উজ্জীবনী গীতিতে মুখর হয়ে উঠল। নারী-পুরুষের যৌথ কন্ঠের মন মাতানো সঙ্গীত নাচ, হাত তালি ঘুঙুরের ঝনঝনানি, উল্লাস, উন্মাদনা সবই ভেসে আসছিল কর্ণকুহরে। আমার মাটিতে প্রথম নববর্ষেই আমি অনুপস্থিত। — রাতের ঘুটঘুটে সেই অন্ধকারে আমি সেদিন কম্বল জড়িয়েও ঘেমে উঠেছিলাম, শিহরিয়ে উঠেছিলাম পুনঃপুনঃ। স্বাধীনতার সতেরো বছর পরেও আমি নিশ্চিত হতে পারছি না। অন্ধকারে আজো আমি একইভাবে শিহরে উঠি আর যেন শুনতে পাই – “রক্ত দিয়ে এই স্বাধীনতা আনলে তোমরা”!

স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী শক্তি ও ইসলাম:

(২১) আওয়ামী লীগের ৬ দফাকে আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব কখনো স্বাধীনতার আন্দোলন হিসাবে সচেতনভাবে মনে করেনি, কিন্তু দেশের সংগ্রামমুখর জনগণ ৬ দফার আন্দোলনকে এক দফার আন্দোলন হিসাবেই যে গণ্য করত, একথা সত্য। জনগণের কাছে স্বায়ত্বশাসনের দাবীটি স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করার দাবী হিসাবেই বিবেচিত হয়েছে।

(২২) মরহুম জননেতা জনাব আব্দুল হামিদ খান ভাসানী পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠীর ষড়যন্ত্র আগেভাগেই উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছিলেন বলেই ১লা মার্চ তারিখেই তার পল্টন ময়দানের জনসভায় জনগণের কাছে ১ দফা ঘোষনা করেছিলেন। সেই জনসভায় ‘বীর বাঙালী অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর’ এই শ্লোগানটিই প্রাধান্য লাভ করেছিল।

(২৩) মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক, সামাজিক শক্তিসমূহ এবং সংগ্রামী জনগণ উক্ত চেতনা সম্পর্কে মোটেই ওয়াকিফহাল ছিল না। তথাকথিত মুক্তিযুদ্ধের চেতনা লালন করার জন্য সক্রিয় উদ্যোগ কিংবা প্রতিক্রিয়া মুক্তিযুদ্ধের সময়ে ছিল না বলে মুষ্টিমেয় লোকের চেতনাকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হিসাবে পরিচিত এবং গ্রহণ করানোর সকল প্রয়াসই আজ নিস্ফল রুপ ধারণ করেছে। সঠিক এবং আদর্শিক চেতনাহীন ৭১এর যুদ্ধটিই প্রকৃত মুক্তিযুদ্ধের রুপ না নিলেও এটি যে নিঃসন্দেহে জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধের রুপ ধারণ করেছিল এ বিষয়টি দিবলোকের মতই উজ্জ্বল।

(২৪) বিশেষ করে বাংলাদেশের ব্যাপারে প্রতিবেশী দেশ ভারতের হস্তক্ষেপ করাকে তারা স্বাধীনতা নয়, গোলামীরই নতুন এক রুপ হিসাবে বিবেচনা করত। স্বাধীনতা যুদ্ধ বিরোধী বলে যারা পরিচিত তারা সকলেই কমবেশী ভারত বিরোধী হিসাবেই অধিক পরিচিত। এদের ভারত বিদ্বেষী মনোভাব কোন নতুন উপাদান নয়। ভারত বিভক্তির অনেক পূর্ব থেকেই ‘অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস’ এবং ‘মুসলিম লীগ’ এর মধ্যকার তীব্র দ্বন্দ্বের কারণেই ঐ বিদ্বেষ এর বীজ অঙ্কুরিত হতে থাকে।

(২৫) বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সেই বিদ্বেষেরই একটি নতুন বিস্ফোরণ একটি নব সংস্করণ। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে শুরু থেকেই ভারতীয় হস্তক্ষেপ বিদ্যমান ছিল এই সন্দেহে ভারত বিদ্বেষী রাজনৈতিক দলগুলো তাই মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাধারণ মুক্তিযোদ্ধারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ না হয়েও যুদ্ধ করেছে এই লক্ষ্যে ‘যে কোন মূল্যে দেশ স্বাধীন করতে হবে’। যে কোন মূল্যে অর্জিত স্বাধীনতা যে নিজেদের ভোগের বাইরে চলে যেতে পারে এ ধারণা মুক্তিযোদ্ধাদের ছিল না। প্রতিক্রিয়াশীল চক্রের সাহায্য ও সহযোগিতা স্বাধীনতার রুপ ও স্বাদ পাল্টে দেয়, স্বাধীনতা বিনষ্টও করে দেয় এ সচেতনতা সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের ছিল না।

(২৬) আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব এবং ভারতীয় চক্রের মধ্যকার ষড়যন্ত্র সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের জানারও কথা ছিল না। তারা হানাদার বাহিনীকে অত্যাচার করতে দেখেছে, অত্যাচারিত হয়েছে বলে আত্মরক্ষার্থে রুখে দাঁড়াতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে শামিল হয়ে পড়েছে।

(২৭) বাঙালী হয়ে যারা বাঙালীর ঘরে আগুন দিয়েছে, বাঙালী মা বোনদের উপর পাশবিক নির্যাতনে শরীক হয়েছে, অহেতুক হত্যাকান্ড চালিয়েছে তারা যে পক্ষেরই হোক না কেন মানবিক দিক থেকে তারা অপরাধী। অপরাধীদের কোন পক্ষ নেই। অপরাধীদের অবস্থান যেখানেই হোক না কেন, তাদের একমাত্র পরিচয়ই হচ্ছে তারা অপরাধী। অপরাধের বিচার কাম্য- এটা নৈতিক সামাজিক, মানবিক এবং প্রচলিত আইন প্রশাসনেরই দাবী। কোন অপরাধের বিনা বিচারে ক্ষমা প্রদর্শন একটি ক্ষমাহীন অপরাধই বটে। — তাই স্বাধীনতার ১৭ বছর পরেও স্বাধীনতা আজো তেতো, মুক্তিযুদ্ধ আজ বিকৃত এবং বিস্মৃতপ্রায়।

(২৮) দীর্ঘ ৯টি মাস ধরে হানাদার পাকবাহিনী বাংলাদেশের বুকে অবলীলাক্রমে গণহত্যা চালিয়ে ইতিহাসের পাতায় এক জঘন্য অধ্যায় সৃষ্টি করল, তাদেরকে ভারতীয় সেনাবাহিনী কিসের স্বার্থে উদ্ধার করে নিয়ে গেল ভারতে? সেই সকল গণদস্যুদেরকে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে হস্তান্তর করা হল না কেন? যারা মুক্তিযুদ্ধের মৈত্রী বাহিনী হিসাবে বাংলাদেশের দরদী সেজে বাঙালীদেরেকে উদ্ধার করতে এলো তারাই বাঙালীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়া পাকিস্তানী হত্যাকারী বাহিনীকে নিরাপদ আশ্রয়ে উদ্ধার করে নিয়ে বাঙালী প্রেমের পরিচয় দিয়েছে না পাঞ্জাবী প্রেমের পরিচয় দিয়েছে? মুক্তিযুদ্ধের মৈত্রী বাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যাকারীদের প্রতি অতটা দরদী হয়ে উঠার পেছনে কারণটা কি ছিল?

(২৯) একজন সেক্টর কমান্ডার হিসাবে আমি মনে করি মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী পক্ষের বিরুদ্ধে ঢালাও অভিযোগ আনার চেষ্টা না করে যাদের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে, তাদের অবশ্যই বিচার হওয়া প্রয়োজন।

(৩০) ইসলাম অপরাধমুক্ত সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে। ইসলাম শোষণহীন, সাম্যবাদ সমাজ কায়েম করে। ইসলাম পূঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ, আধিপত্যবাদ, বর্ণবৈষম্যবাদ, রাজতন্ত্রসহ সকল ধরণের স্বৈরশাসনের ঘোর বিরোধী। ইসলাম মুক্তি এবং শান্তির এক বিপ্লবী ঘোষনা। স্বাভাবকি কারণেই ইসলাম মুক্তিযুদ্ধ চেতনার পক্ষের শক্তি।

(৩১) আল্লাহ একমাত্র প্রভু এ ঘোষনার মধ্য দিয়ে ইসলাম মূলত মানুষকে স্বাধীন করে দিয়েছে। — এমন একটি জীবন দর্শন যা চূড়ান্ত অর্থেই পরিপূর্ণ, সেই ইসলাম সম্পর্কে যারা অসহিষ্ণু মনোভাব প্রদর্শন করে, তা তারা অজ্ঞতাবশতই করে বলে আমার বিশ্বাস।

(৩২) মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তীকালে ইসলাম এলার্জি শিক্ষিত সমাজের মধ্যে একটি মানসিক ব্যাধির ন্যায় বিরাজ করছে। — স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনতে যারা তথাকথিক ধর্মনিরপেক্ষতার ভুত মাথায় বহন করে এনেছে তারা যেমন ভুল করেছে, ঠিক তেমনি ভুল করেছে স্বাধীনতার বিপক্ষের শক্তিসমূহ, যারা ইসলামকে যে কোন মূল্যে রক্ষা করতে গিয়ে স্বাধীনতাকেই অস্বীকার করে বসেছে।

(৩৩) তাই মুসলিম প্রধান বাংলাদেশের জনগণের স্বাধীনতার প্রকৃত রুপ হতে হবে সাম্রাজ্যবাদ, আধিপত্যবাদ, বর্ণবৈষম্যবাদ, রাজতন্ত্র এবং স্বৈরতন্ত্রমুক্ত ইসলাম।

(৩৪) ইসলাম ভিন্ন বাংলাদেশে বসবাসরত অন্যান্য ধর্মাবলম্বী শতকরা ১০ভাগ মানুষও ধর্মভীরু এবং তারাও ধর্ম সহকারেই স্বাধীনতা এবং মুক্তি কামনা করে। প্রকৃত ইসলামের সাম্যবাদী নীতি এবং ইসলামের ঐতিহ্যবাহী নৈতিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধের সাথে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের কোন বিরোধ তো নেই-ই বরং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের প্রশ্রয় দান ইসলাম তো করেই, অন্যান্য ধর্ম মতেও তদ্রুপ।

(৩৫) বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ মানুষের স্বাধীনতা অর্জনের যুদ্ধ ছিল। ধর্মযুদ্ধ ছিল না। সুতরাং যুদ্ধোত্তরকালে ধর্মের প্রতি উষ্মা কিম্বা কটাক্ষ করার কোন যুক্তিই নেই, থাকতে পারে না। তবুও রয়েছে কেন?

আওয়ামী লীগের চার রাষ্ট্রীয় নীতির ঊৎস:

(৩৬) ৭০এর নির্বাচন অনুষ্টিত হল ৬ দফার ভিত্তিতে। এই ৬ দফার মধ্যে আওয়ামী লীগ গৃহীত ৪ রাষ্ট্রীয় মূলনীতির একটিরও উল্লেখ ছিল না। তাছাড়া নির্বাচনী ইশতেহারে আওয়ামী লীগ আরো উল্লেখ করেছিল যে, তারা ইসলাম ধর্ম বিরোধী কোন আইন কানুনও পাস করবে না। কিন্তু আওয়ামী লীগ ৭২ সনের জানুয়ারীতে ক্ষমতাসীন হওয়ার সাথে সাথেই ইসলামের বিরুদ্ধে অপপ্রচার শুরু করে দেয় এবং গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং জাতীয়তাবাদ নামে রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতি নির্ধারণ করে, যা পরবর্তীতে ’৭২এর রাষ্ট্রীয় সংবিধানেও সন্নিবেশিত করা হয়। এই চার নীতির মূল উৎস কোথায়? কেনই বা উক্ত চার নীতিকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসাবে ঘোষনা করা হলো? এ প্রশ্নগুলোর জবাব জনগণ আজো পায়নি।

(৩৭) দেশের জনগণের কোনরুপ তোয়াক্কা না করেই রাষ্ট্রীয় মূলনীতির মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব জনগণের উপর জবরদস্তিভাবেই চাপিয়ে দিল।

(৩৮) ’৭০এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নির্বোচিত সংসদ সদস্যরা জনগণের ম্যান্ডেট লাভ করেছিল পাকিস্তানের অধীনে। নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশের অধীনে নয়। সুতরাং ’৭২এর  আওয়ামী লীগ কর্তৃক সংবিধান প্রদান নীতিগত দিক দিয়ে মোটেও বৈধ ছিল না। সমগ্র জনগণের স্বতঃস্ফুর্ত অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত হয়। এখানে আরো উল্লেখযোগ্য যে, ’৭০ এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের স্বপক্ষে যারা ভোট প্রদান করেনি, তারাও দেশ মাতৃকার মুক্তির লড়াইএ শরীক হয়েছেন।

(৩৯) কিন্তু যুদ্ধোত্তরকালে আওয়ামী লীগ চরম সংকীর্ণতার পরিচয় দেয় এবং মুক্তিযুদ্ধের জাতীয় রুপকে দলীয় রুপ প্রদানের জন্য বিভিন্নমুখী ষড়যন্ত্রের আশ্রয় নেয়। যার ফলে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী আওয়ামী লীগ বহির্ভুত সকল শক্তি হতোদ্যম হয়ে পড়ে এবং তারা তাদের নবতর আশা আকাংখার বাস্তবায়ন করার সুযোগ থেকে প্রায় সম্পূর্ণভাবেই বঞ্চিত হয়।

(৪০) যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে যখন জাতীয় ঐক্যের সর্বাধিক প্রয়োজন ছিল, ঠিক সেই সময়েই আওয়ামী লীগ একলা চলার নীতি অনুসরণ করার মধ্য দিয়ে জনমত এবং জনগণের আশা আকাঙ্খা পদদলিত করে চলতে থাকে। এসব কারণে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তায় রাতারাতি ভাটা দেখা দেয়। আওয়ামী লীগের যুদ্ধকালীন দুর্নীতি এবং ব্যর্থতা  এবং যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে জনগণের উপর স্বৈরতান্ত্রিক নির্যাতন জনগণ থেকে আওয়ামী লীগকে বিচ্ছিন্ন করার  উপসর্গ সৃষ্টি করে।

(৪১) বস্তুত সেই ভয়ে ভীত আওয়ামী লীগ ’৭২ এ জনগণের ম্যান্ডেট নেয়ার চিন্তা থেকে বিরত থাকে। অথচ সংবিধান রচনার পূর্বেই জনগণের তরফ থেকে নতুন ম্যান্ডেট লাভ করা ছিল অত্যাবশ্যকীয়। অতএব, এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, ’৭২এ আওয়ামী লীগের এমন কোন বৈধ অধিকার ছিল না যাতে করে তারা দেশ ও জাতির উপর একটি মনগড়া সংবিধান আরোপ করতে পারে। তবুও তারা তা জবরদস্তি করেছে। দেশের জনগণের চিৎকার প্রতিবাদ কোন কাজেই আসেনি।

(৪২) এভাবেই যুদ্ধোত্তর বিধ্বস্ত বাংলাদেশের কোটি কোটি বুভুক্ষ মানুষের জন্য অন্নবস্ত্রের পূর্বেই রাষ্ট্রীয় মূলনীতি এসে মাথায় চেপে বসে। এই ৪ মূলনীীত আরোপ করার মধ্য দিয়ে দিল্লীর কর্তারা তাদের মূল লক্ষ্যই স্থির রেখেছে কেবল।

(৪৩) এই হিন্দু ভারত হিন্দু ধর্মের জাত-শ্রেণীভেদের বিপরীতে ইসলামী সাম্যবাদকে যমের মতই ভয় পায়। — ইসলামের সাম্যবাদ নীতি ভারতের নির্ধারিত মানব গোষ্ঠীকে আকস্মিকভাবেই ইসলামের পতাকাতলে সমবেত করতে পারে। বাংলাদেশের ১১ কোটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে ১০ কোটিই হচ্ছে ইসলাম ধর্মের অনুসারী।

(৪৪) বাংলাদেশে বিস্ময়কর শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের দৃষ্টান্ত বিদ্যমান। বাংলাদেশের মাটিতে সাম্প্রদায়িকতা নেই বলেই অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরা কখনই নির্যাতিত কিম্বা সামাজিকভাবে সংকটাপন্নও হচ্ছে না। তেমন একটা কিছু হলেও না হয় আধিপত্যবাদী ভারতীয় চক্র বাংলাদেশের উপর সরাসরি কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার একটা সুযোগ লাভ করত।

(৪৫) বাংলাদেশের উপরে সাংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হলে সামরিক কর্তৃত্ব স্থাপনের তেমন কোন প্রয়োজন পড়বে না। — ধীরে ধীরে ধর্মীয় অনুশাসনের অনুপস্থিতি তরুণ যুবক শ্রেণীকে বেপোরোয়া আরাম আয়েশে ভোগপূর্ণ উচ্ছৃংখল জীবন পদ্ধতির দিকে ঠেলে দিলেই তারা হয়ে পড়বে শিকড়হীন পরগাছার মতন।

(৪৬) ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ ধর্মহীনতারই লেবাস নাম। — মুসলিম তরুণ যুব গোষ্ঠী এই নাস্তিক্যবাদী তত্ত্বে প্রভাবিত হলে তারা স্বেচ্ছায়ই ইসলাম বিদ্বেষী হয়ে উঠবে এবং তাহলেই ভারতীয় শাসকচক্রের গোপন স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়ে যায়। – অর্থাৎ বাংলাদেশের উপর ভারতীয় সাংস্কৃতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ধর্মনিরপেক্ষতাবাদই হচ্ছে ইসমলামের বিরুদ্ধে একটি সুকৌশল ঠান্ডা যুদ্ধ।

(৪৭) স্বাধীন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক চেতনার উৎস হচ্ছে ‘তৌহিদবাদ’, যা ইসলাম ধর্ম ভিত্তিক। অপরদিকে পশ্চিম বাংলার জনগণের সাংস্কৃতিক চেতনার উৎস হচ্ছে ‘পৌত্তলিকতাবাদ’, যা হিন্দু ধর্ম ভিত্তিক। — সবকিছু জেনেশুনেই ভারতীয় শাসকচক্র বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় মূলনীতির ৪র্থ স্তম্ভ হিসাবে ‘বাঙালী জাতীয়তাবাদকে জুড়ে দিয়েছে। উদাহরণ হিসাবে হিন্দুধর্মের লোক হওয়া সত্ত্বেও যখন উচ্চবর্ণ নীচবর্ণ হিন্দু হরিজনকে জীবন্ত অবস্থায় পুড়িয়ে হত্যা করে, সেই উচ্চবর্ণ হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে  মুসলিম বাঙালীদের গ্রহণযোগ্যতা আদৌ থাকতে পারে কি?

(৪৮) বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবি জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই সত্ত্বার সংকট এতই তীব্র রুপ ধারণ করেছে যে, আজ তারা ‘নিজ সত্ত্বা’ প্রকাশে দ্বিধাগ্রস্ত। এ ধরণের আচরণ মুক্তবুদ্ধি কিম্বা কোন বাহাদুরীর লক্ষণ মোটেও নয়, বরং এটা হচ্ছে আত্মপরিচয় দানে হীনমন্যতা এবং আত্ম প্রবঞ্চনার বহিঃপ্রকাশ। সংক্ষেপে রাষ্ট্রীয় চার নীতির ‘পোষ্ট মর্টেম’ এখানেই শেষ।

(৪৯) আওয়ামী লীগ কর্তৃক প্রণীতি বাংলাদেশের ’৭২ এর সংবিধানকে যারা দেশ ও জাতির জন্য পবিত্র আমানত বলে মনে করেন, তাদের কাছে একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে আমার সবিনয় আশ্বাসবাণী দেশ ও জাতির জন্য আপনারা ব্রাহ্মণ্যবাদী ভারতীয় শাসকচক্রের তরফ থেকে যে সকল পবিত্র আমানত ১৯৭১ সন থেকে বহন করে নিয়ে এসেছেন, তার মালিকানা নিয়ে আপনাদের সাথে বাংলাদেশের তৌহিদী জনগণের কোনদিনই প্রতিযোগিতা হবে না।

(৫০) একটি রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা অবুঝের মত কেবল ৪টি স্তম্ভই ধার করলাম, নিরাপদ একটি বাসগৃহ তৈরী করার প্রস্তুতি নিলাম না। দেশের কোটি কোটি নির্যাতিত মানুষ এবং তৌহিদী জনগণ আজ সেই নিরাপদ একটি বাসগৃহই কামনা করে, বিদেশী প্রভুদের কাছ থেকে পাওয়া  স্তম্ভবিশিষ্ট ইমারত নয়।

উপরের এই ৫০টি পয়েন্টের সংগ্রহটুকু মেজর জলিলের বই “অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা”র পাট থেকে খুঁজে পাওয়া কিছু কথা। শুধু তাদের জন্য যারা এ পাটটি নেড়ে চেড়ে দেখার সময় করে উঠতে পারেন নাই।  খুব কৌশলে অনেক কিছুই চাপা দিয়েই রাখা। অনেকেই আজো ঐ লুটপাটে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে। একজন পর্যবেক্ষক হিসাবে বলবো আমার মতে যারা অতিরিক্ত সচেতন ছিল তারা সেখান থেকে ইজ্জত বাঁচাতে ছিটকে বের হয়ে আসে বলতে গেলে প্রায় স্বাধীনতার শুরুর কাল থেকেই এবং অতপর নতুন মেলবন্ধন গড়ে তুলে। আর যারা ঐ লুটপাটে মজা পেয়েছে, তারা অনেকেই আজো সেটি বহাল রেখে চালিয়ে যাচ্ছে। তাছাড়াও ধারণা হয় আরো কিছু সাধু কিছুই বুঝতে না পেরে আবেগের বেশে ঐ নষ্ট লিষ্টের একজন হয়ে আজো তার উপস্থিতি জানান দিচ্ছে। তবে বেশীর ভাগই দেখা যায় কেন যেন এরা বেশীর ভাগ নীতিহীন আদর্শহীন, দম্ভধারী, অপকর্মী, স্বার্থপর, কপট চরিত্রের অধিকারী। নীতির প্রশ্নে তাদের বোঝাপড়ায় বড়ই ঘাটতি। কিন্তু এটি তো বাস্তব, মিরজাফরের সাথে তার স্বদলের কাউকে কোরাস গাইতে শোনা যায় নি, যায় কি? যায় না। কেন যায় না? কারণ সচেতন মানুষ কখনোই আদর্শহীন নষ্টের দলে ভিড়ে নিজের ইজ্জত খোয়াতে চায় না। তাই আজ মিরজাফর আর সিরাজের দু’জনার দু অবস্থান, তা আর ব্যাখ্যার দরকার নেই। সবাই এদেরে মনে মনে জানে, চিনে। ইতিহাস বলে লেন্দুপ দরজীর শেষ কালের সঙ্গি কেউ হয় নি, তার আপন পুত্রকন্যাও তফাতে থেকেছে, কোন দায় নেয়নি।

 

নাজমা মোস্তফা,   লেখার সময়: ২০শে সেপ্টেম্বর ২০১২ সাল।

 

 

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

Tag Cloud

%d bloggers like this: