Articles published in this site are copyright protected.

Archive for November, 2015

“আইএসআইএস”এক বিষ ফোঁড়ার নাম

মাত্র এই ১৩ নভেম্বর শুক্রবার রাতে কনসার্ট হলরুমে প্যারিসে বোমা হামলা হলে ভারাক্রান্ত মনে কয়দিন থেকে কষ্টে ছিলাম এ জন্যে যে এসব কেন হচ্ছে বা কেনই বা করা হচ্ছে এবং কে করছে? দেখা যায় মাত্র এর একদিন আগে বৃহস্পতিবারে আত্মঘাতি বোমা হামলায় লেবাননের বৈরুতে ৪৩ জন নিহত ও ২৩০ জন আহত হয়। একজন প্রশ্ন উঠিয়েছেন, কতজন এ ঘটনা জানতে পেরেছে, বা জানতে পারবে? অথচ যখন ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে ১২৮ জন মতান্তরে ১৪০ জন নিহত হলো, আহত ৩৫০। সবাই জানে গোটা বিশ^ই জানছে, মাতম করছে। একসাথে এতগুলো মৃত্যু মাতম চলারই কথা। তবে প্যালেষ্টাইন, লেবানন, সিরিয়ার মৃত্যুর মহড়ায় কেন যুগ যুগ অবধি গভীর নিশীথের নিস্তব্ধতা লক্ষ্য করা যায়। মিডিয়ায় কোন নাড়া তৈরী হয়না, অনেকটা সুনসান নিরবতা। এটি কি নিরপেক্ষ সভ্য সমাজের ন্যায়যুদ্ধের এক বড় বিকার নয়? ইরাক, সিরিয়া, ফিলিস্তিন, লেবানন, আফগানিস্তানে যখন লাগাতার মৃত্যুর মহড়া চলে, তখনও বিশ^ মানবতা কেন মুখ লুকিয়ে বসে থাকে? ঐ নিরবতা নিশ্চয় লজ্জায় নয় বরং উর্বর কপট সভ্যতার দাগচিহ্নের দায়ে ভরা। এভাবে যুগ যুগ থেকে বিশ^কে জঙ্গি তৈরীর কারখানা বানিয়েছে বিশে^র সভ্যসমাজ। বিশ^ মানবতার দরজা কেন এত করেও উন্মত্ত ব্যথিত হয় না? কেন পিন পতন নিস্তব্ধতা এ মৃত্যুপুরিতে এত অচলাবস্তা? কেন কিসের স্বার্থে ক্ষুদ্র এ বিশ^কে এ নারকীয় কারখানার কাঁচামাল হচ্ছে নির্দোষ লাশগুলি? মুমূর্ষ মৃত্যু যাতনায় মানবতা হতাশার মাঝে গোমরে গোমরে মরছে। বলতে দ্বিধা নেই, তারপরও এ বিষফোঁড়া খুব যতেœর সাথে লালন করা হচ্ছে, পরম আদরে অর্থনীতির গোলাঘরে। কোন অবস্থাতে এসব মৃত্যু মানা যাচ্ছে না বলে মুসলিমসহ গোটা বিশ^ সমাজ আজ গগন বিদারী প্রতিবাদে মুখর হয়ে উঠেছে।

Asaduddin Owaisi amp Dr Zakir Naiks Views On Terrorism Latest Speech 2016

উল্লেখ্য, মুখিয়ে উঠেছে প্রতিটি মুসলিম দেশের সদস্যরাও, যাদেরে মনে মনে আসামী ধরে বিকৃত মানবতা সামনে পা ফেলে। পরিকল্পনার স্বপ্ন বহুদূর দীগন্ত জোড়া, দখলি মানচিত্রের স্থিতিই শুধু নয়, বপু আরো বাড়াতে হবে। মুখর প্রতিবাদে মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী মহাথির মোহাম্মদ স্পষ্ট করেই বলেছেন এসবের নেপথ্য নায়ক আসলে কে? তিনি রাখঢাক রাখেন নাই, সভ্যতার ঘোমটা উন্মোচন করে তা স্পষ্ট করেছেন। এটি এমন এক ঐতিহাসিক বাস্তবতা বিষফোঁড়া যাকে কৌশলে ১৯৪৮ সালে “ইসরাইল” নামের রাষ্ট্র সৃষ্টি করা হয়েছে এক নবীর নামানুসারে পবিত্র জেরুজালেম ভ’মিতে। জন্মলগ্ন থেকেই সেখানে রক্তক্ষরণ চলছে, জ¦লছে আগুন। ঐ ইন্ধনে সেদিন থেকেই ওখানে সন্ত্রাস দানা বাঁধতে শুরু করে, অতপর প্রচারে প্রতিষ্ঠা পায়। মহাথিরের মন্তব্য যতদিন অবধি ফিলিস্তিন সমস্যার সমাধান হবে না ততদিন এসব বন্ধ হবে না। প্রতিটি হামলার পরই দেখা যায় আইএস বলে একটি সংস্থা এর বাহাদুরি দাবী করতেও পিছপা হয় না, এবারও তাই। ফ্রান্সও এদেরে দায়ী করছে। ওদিকে ফিদেল ক্যাস্ত্রো কিউবার নেতা বলছেন এর পেছনের নায়ক আমেরিকা ও ইসরাইল। ইসরাইলের গুপ্তচর সংস্থা মোসাদ ও আমেরিকার রিপাবলিকান যুদ্ধবাজ সিনেটর জন ম্যাককেইন এ গোপন খেলায় জড়িত, যারা ইরাকের বিরাট অংশ ও সিরিয়ার প্রায় এক তৃতীয়াংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। এ বক্তব্য একজন পশ্চিমা কুটনৈতিক ইতিবাচক হিসাবে দেখছেন (আইআরআইবি, ১৬ নভেম্বর ২০১৫)। রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট প্রার্থী রিক স্যান্তরাম উল্টো দোষ চাপাচ্ছেন ওবামার রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে ইরাক পরিত্যাগ করাই অপরাধ হয়েছে। ওদিকে প্রাক্তন পেনসিলভেনিয়ার এ সিনেটর (১৯৯৫-২০০৭) বলেন ২০১২ সালে সিরিয়ার সরকারকে উৎখাত করতে সিআইএ প্রথম প্রশিক্ষণ দেয়া হয় আইএসকে জর্দানে (প্রেসটিভি)। নিঃসন্দেহ এসব হামলা মানবজাতীর উপর বড় ধরনের ট্রাজেডি। সবাই যখন আসামী ধরতে ব্যস্ত তখন মিডিয়া দুই এক কাকতাড়ুয়াকে এনে হাজির করছে, দেখা যাচ্ছে। ঠিক ওরকম সময়ে উইকিলিক্সও এ হামলার জন্য দায়ী করেছে আমেরিকা ও তাদের মিত্রকে। তারা বলছে চরমপন্থীকে অস্ত্রশস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দেয়ার ফলই এ হামলা। সিরিয়া ও ইরাক রাষ্ট্রকে ধ্বংস করতে যারা অস্ত্র অর্থ ও প্রশিক্ষণ দিয়ে সাহায্য করছে তাদের বিচারের দাবী উঠেছে। ঠিক এরকম সময়ে ওবামা বলছেন এর জন্য মূলত বুশ দায়ী। বুশই ইরাক ধ্বংসে আইএসএর উত্থান ঘটিয়েছে। ভাইস নিউজকে দেয়া এক বক্তব্যে এমন অভিযোগ করলেন ওবামা, খবর বৃটিশ ইন্ডিপেন্ডেন্টের। অনেকেই ভাবছেন এসব গোটা বিশে^ মুসলিমকে বিপন্ন দশাতে পৌছে দিচ্ছে। এ ছাড়া গোটা বিশে^ দোষ দেয়া হচ্ছে জঙ্গি মানেই মুসলিম । সব গোলার ফসলই কিন্তু ইসলামবিরোধীর গোলাতে উঠছে। নির্দোষ মুসলিমরা শুধু শিলপাটায় গড়াগড়ি খাচ্ছে।

বৃহত্তর ইসরাইল রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন:

গোটা বিশে^ এ হামলার সংবাদে মুখর, এদিকে বেশ চড়াসুরে খবর বেরিয়েছে যে “আএসআইএস মোসাদের হয়ে কাজ করছে”। বৃহত্তর ইসরাইল রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্নে ইসরাইলের এ রোগের বিস্তার। একই স্বপ্নের প্রতিপালনে ভারতে চলছে প্রতিবেশীদের কবজা করার স্মরণকালীন মহামেলা। সাম্প্রতিক সময়ে গড়ে উঠছে “ইন্ডিয়া ইসরাইল যৌথ মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম” (২৬ ফেব্রুয়ারী, ২০১৫, ডিফেন্স নিউজ, নিউ দিল্লী)। খবরের ছড়াছড়ি – ইসরাইল কি সিরিয়াকে ভাংতে তৎপর বৃহত্তর ইসরাইল রাষ্ট্রের জায়নবাদী পরিকল্পনার অংশ হিসাবে? অ্যামি গুডম্যানের সাথে এক সাক্ষাৎকারে আমেরিকার জেনারেল ওয়েসলী ক্লারক (অবঃ) ব্যাখ্যাতে বলেন, বুশ শাসন ২০০৭ সালের ২ মার্চ তারিখে এক পরিকল্পনা করেন কয়টি দেশকে বের করে আনতে এরা হচ্ছে ইরাক, সিরিয়া, লেবানন, লিবিয়া, সোমালিয়া, সুদান ও ইরান, ইউটিউবে তা প্রচারিত। একই ধারার যুক্তি আসে ক্যান ও ক্যাফের ধারণাতে। তিনি হচ্ছেন গালফ ওয়ারের যুদ্ধ ফেরত কর্মকর্তা। ম্যাক্সনিউজ ডট কম “ষ্টুপিড ওয়ার” নামে এর উপর অনেক স্পষ্ট ধারণার খবর প্রচার করে। তিনি বলেন মূল সমস্যা আমাদের ব্যাকইয়ার্ডে। নেতানিয়াহুর ঘৃণার কারণে ইরানকে কসাই খানায় ছুড়ে দেয়া হয়েছে, যেন জবাইএর ভেড়া। তিনি অকপটে প্রকাশ করেন ৯/১১ খেলার গোড়ার কথা। তিনি মুসলিম নন যদিও, এসব যে কোন মুসলিম দ্বারা সংগঠিত হয় নি, এটি তিনিও স্পষ্ট করেন। একই ধারাতে ওটিও ছিল মোসাদের হাতে তৈরী একটি অপারেশন। আজ কমবেশী গোটা বিশে^র সচেতনরাই জানে ঐ ঘটনার গোড়ার কথা। তারপরও দেখা যায় দুনিয়াটা বাস্তবিকই শাসন করছে প্রতারক ধড়িবাজ। তার কথাতে গোটা বিশে^র অর্থ বানিজ্যের প্রতারণার যুক্তিগুলো খুব সুন্দরভাবে ফুটে উঠে। নরম্যান ফিনকেল্সটেইন একজন নিবেদিত মহিলা যিনি তার ডক্টরেট ডিগ্রী অর্জন করেন মধ্যপ্রাচ্য ও  প্যালেস্টাইন ইসরাইল কনফ্লিক্টএর উপর। তারা একযোগে বলছেন এই আইএসআইএস হচ্ছে একটি ইসরাইলি প্রজেক্ট। উল্লেখ্য, প্যারিসের মুসলিম প্রধান এলাকাতে সম্প্রতি এ হামলাটি সংগঠিত হয়। যার প্রেক্ষিতে সেখানের মুসলিমরাও এর উপর ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন।

Greater-Israel-courtesy-of-Isis“ষ্টুপিড ওয়ার” এ এখানের চার অক্ষরের নামটিরও ব্যাখ্যা আসছে। চারটি ইংরেজী অক্ষরের আইএসআইএস = “ইসরাইল সিক্রেট ইনটেলিজেন্স সার্ভিস” এটি এক ভয়ানক কাকতাড়–য়া, এদের বিশ্লেষনে আসে এটি মুসলিমদের কাজ নয়। রিটা কার্টজ নামের এক জায়নবাদীর মেয়ে ঐ সাম্প্রতিক সময়েও বাংলাদেশের হত্যাগুলোতেও এ নাম শুনেছি বারে বারে, তিনি একজন জায়নবাদী স্পাই ও স্পাইএর মেয়ে। ৯/১১ ছিল আমেরিকার এবার ১১/১৩ হচ্ছে ইউরোপিয়ানদের ৯/১১। সারা ইন্টারনেট জুড়ে বুদ্ধিজীবি, লেখক, গবেষক, বিশেষজ্ঞদের থরে বিথরে নিউইয়র্কের মূল নাইন ইলেভেনের পোস্ট মোর্টেম এর প্রমাণ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। আজ আর তা ঢাকা নেই, ওপেন সিক্রেট, খোলা পাতার খেলা, সবার জানা। “বুশেজ ওয়ার” নামের ম্যুভি, ফারেনহাইট ৯/১১ দেখেন নি এমন সচেতন খুজে পাওয়া যাবে খুব কম, যেখানে খুব খোলামেলাভাবে আসামীকে দেখা যায়। এসব শুরুর কথা, এখন হাজার হাজার সাইট আছে এর উপর। আন্তর্জাতিক ডেস্ক থেকে বলা হচ্ছে ফ্রান্সের তদন্তকারীরা খুঁজে পাচ্ছে তিনটি দল জড়িত। একজন অপরাধির পরিচয় পেয়েছে, যার নামে আগে থেকেই অপরাধের অভিযোগ রয়েছে, আরেকজনকে পাওয়া গেছে সিরিয়ান পাসপোটে। এদিকে এর খেসারত হিসাবে মুসলিমরা সবদিকেই শংকার মাঝে প্রহর কাটাচ্ছে। মিডিয়া সব সময়ই এ প্রচারে সোচ্চার থেকেছে, পেছনের পাতা উল্টে দেখলেই তা স্পষ্ট হবে। ৯/১১এ তারা কি করেছিল? সেদিনও মাঠে তারা খুঁজে পায় অপরাধীর পাসপোর্ট নিউইয়র্কের ব্যস্ততম রাস্তাতে। একই খেলা এবারও হয়েছে আসামীর পাসপোর্ট পাওয়া যায়, বোকাদের বোঝাতে আরো কত নাটক উহ্য থেকে যায়। একই বন্দনা সঙ্গিতে নষ্ট মিডিয়া মুখর থেকেছে। আজও তার ব্যতিক্রম হবে কেন? মিডিয়ার দৃষ্টিতে সব সময়ই জঙ্গি মানেই মুসলিম যদিও ধ্বংসযজ্ঞে পাওয়া যায় বেশিরভাগ ইসলাম বিরোধীরাই জড়িত। ইসলাম অর্থই শান্তি সেখানে সন্ত্রাসীর কোন জায়গা নেই। নবীর প্রতিষ্ঠিত ইসলামেও সন্ত্রাসীর কোন জায়গা নেই, কোনকালে ছিলও না। যদি কেউ থাকে তাকে ধরো, বিচার করো। নষ্ট বিচারের সাজানো জমাটিও নষ্ট বিচারকের জমা খাতায় থাকবেই। এর শোধবোধ হবে হয়তো দেরীতে আল্লাহর বিচারপর্বে, তবে বিচার যে হবে এ নিশ্চয়তা প্রকৃত মুসলিমরা ১০০% দিবে।

ইসলাম ধর্মে জোরজবরদস্তি নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছে। এমন সত্য নির্ভর আদর্শের পেছনে বাকী গোটা বিশ^কে অতি তৎপর দেখা যায়। অন্য কোন ধর্মের পেছনে এত তৎপরতা লক্ষ্য করা যায় না। কারণ ইসলাম কখনোই পরের ঘরে ধর্না দিচ্ছে না, যেভাবে বাকীরা ঐ ধর্ণা কাজে তৎপর থাকছে, যার প্রমাণ করতেই এসব হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ। এটি এমন একটি সময় ঘটেছে যখন গোটা ইউরোপ জুড়ে শরণার্থীদের বেকায়দায় পড়তে হচ্ছে। যদি তাই হয়, এ মোসাদের খেলা, তবে তারা শত পার্সেন্ট সার্থক এ ক্ষেত্রে! ৯/১১এর খেসারত হিসাবে কম ধকল যায়নি বিদেশে অবস্থানরত মুসলিমদের উপর দিয়ে, সেটি আবারো দ্বিতীয় দফাতে সংকটের উৎসমূল হয়ে দেখা দিবে। সারা বিশ^ থেকে প্রতিটি মুসলিম নেতা নেতৃরা তাদের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে চলেছেন। গোটা বিশে^ এমন কোন জাতিরাষ্ট্র জানা নেই যারা নাস্তিক বা অধার্মিক। তাহলে যারাই এসব কাজ করছে তারা সন্ত্রাসী সন্দেহ নেই। যেখানে গোটা বিশ^ই আস্তিক, ধর্মের নামে এসব সংঘটনের জবাব কি হতে পারে? হাতের কাছে প্রমাণ পাওয়া যায় ধর্মের নামে ভারতে সংখ্যালঘু ও মুসলিম নিধন হয়, তারপরও তারা জঙ্গি নয় কেন? নবী ঈসাকে ক্রুশে বিদ্ধ করেও ইহুদীরা জঙ্গি নয় কেন? নবী মুসাকে নাস্তিক ফেরাউনের মোকাবেলা করতে হয়েছে, তার অবর্তমানে তার জনতারা সোনার তৈরী গরুর পূজা করেছে। কিছুদিন আগে একটি গবেষনার বহুপূর্ব যুক্তি মিশরে পিরামিডের সূত্র নবী ইউসুফের সময়ের জমা, ওটি সে আমলে শস্য সংরক্ষণের জন্য রচিত, সত্য মিথ্যা এখনো স্পষ্ট নয়। ঐ নবীর পরবর্তী ধারাবাহিকতায় আসা নবী মুসার সময়ে ফেরাউনের লাশ সেখানে সংরক্ষিত পাওয়া যায়, যা স্পষ্ট করে কুরআন, খুঁজে পায় বর্তমান বিজ্ঞান। এটিও ঐশী কুরআনের এক অনন্য দলিল মাত্র, “আমরা উদ্ধার করবো তোমার দেহ, যেন তুমি তোমার পরবর্তীদের জন্য নিদর্শন হয়ে থাক। কিন্তু মানুষের মধ্যের অনেকেই আমাদের নিদর্শন সম্বন্ধে অবশ্যই বেখেয়াল” (১০:৯২)। মাত্র চৌদ্দশত বছর আগে কুরআন এ সত্য প্রকাশ করে, এর আগে কেউ এ কথা বলেনি, এ সত্য প্রকাশ করেনি। সেদিনের ইব্রাহিম (আঃ), মুসা (আঃ), ঈসা (আঃ) সবাই প্রতিটি কৃতকর্মের ভীতি মনে পুষে রাখতেন। প্রতিটি অবিচারের জবাবদিহিতা তাদের মাঝে সব সময় ছিল। তার পরবর্তী অনুসারীদের মাঝে এ দায়বদ্ধতার এত ঘাটতি কেন, এটি মোটেও বোধগম্য নয়। এরা পরবর্তীরা কি আদৌ আল্লাহতে বিশ^াস হারিয়েছে? কুরআন বলে “যাদের তওরাতের ভার দেওয়া হয়েছিল, তারপর তারা তা অনুসরণ করেনি, তাদের দৃষ্টান্ত হচ্ছে গাধার মতো যে গ্রন্থরাজির বোঝা বইছে। কত নিকৃষ্ট সে জাতির দৃষ্টান্ত যারা আল্লাহর নির্দেশাবলী প্রত্যাখ্যান করে। আর আল্লাহ অন্যায়াচারী জাতিকে সৎপথে চালান না” (৬২:৫)। নবী ইউসুফ (আঃ)এর পর থেকে ইহুদীরা নামেদাগে ময়দানে পরিচিত হলেও, সেদিন থেকে এটিও জানা যায় চক্রান্তকারী হিসাবে ঐ নবীর দশভাইকে সাক্ষাৎ জড়িত থাকতে দেখা যায়। তারা কিভাবে তাদের বৈমাত্রেয় শিশু ভাইটিকে কুয়োতে ফেলে দিতেও মনের মাঝে কোন কুন্ঠা বোধ করেনি। এর প্রতিফলন ও এর অধপতন যেন আজো গোটা বিশ^কর্মকান্ডের মাঝে ফুটে উঠছে, ঐ প্রাক্তন অসততা থেকে তারা আজো মুক্ত নয়।

ধর্ম ও ইতিহাস বলে প্রাথমিক ইসলামের শুরুর কাল থেকেই সপ্তম শতাব্দীতেই ইহুদী ষড়যন্ত্রে বারে বারে আক্রান্ত হতে দেখা যায় সেদিনের শান্তির ধর্ম ইসলাম নামের শিশু ধর্মটিকে। অতঃপর ক্রুুসেডের ইতিহাস আবারো স্পষ্ট করে কিভাবে মুসলিম ও ইহুদী উভয়কেই খৃষ্টান জনগোষ্ঠী অমানবিক আচরণে নির্যাতন করে ও হত্যাযজ্ঞ চালায়। এসব কার্যকারণ ইসলাম পূর্ববর্তী ধর্মধারীদের অনেক অমানবিকতার স্বাক্ষর বহন করে আছে। একবিংশ শতাব্দীতেও সে প্রাচীন রোগমুক্তির আজও কোন সম্ভাবনা নেই। জগত সংসারে প্রকৃত পক্ষে ইহুদী খৃষ্টানেরাই প্রথম ধর্মের সত্যে প্রবেশ করে। কালে তাদের অপকর্মের খেসারত হিসাবেই ভিন্ন এক গোষ্ঠী বেদুইনের হাতে এ সত্য স্থানান্তরিত হয়, বিধাতার নির্দেশে। কুরআন এ জটিল বিষয়ও স্পষ্ট করে এবং পরবতী অনুসারীদের প্রতি সাবধানবাণী বিতরণ করে। ঐ গাধার বোঝা বয়ে না বেড়াতে সাবধান বাণী উচ্চারণ করা হয়েছে কিন্তু দেখা যায় কার্যত পরবর্তীরাও তাদের অনুকরণে অনেক ক্ষেত্রেই গাধার বোঝা বয়ে বেড়চ্ছে। ও থেকে মুসলিম ধর্মধারীদের আরো বেশী সাবধান হতে হবে যাতে ঐ একই অপরাধে আসামী হিসাবে তারা আক্রান্ত হওয়ার দায় থেকে মুক্ত হতে পারে। সেদিন প্যারিস সন্ত্রাস ইসলাম ধর্মের সাথে কোনভাবেই মিলে না। এ ধর্ম সহিষ্ণুতার শিক্ষা দেয়, সন্ত্রাসের নয়। এ ধর্ম শান্তির শিক্ষা দেয়, হত্যার নয়। এ ধর্ম আত্মসমর্পণের শিক্ষা নেয়, আত্মবিক্রিত হতে উৎসাহ দেয় না। এ ধর্ম ভাতৃত্বের শিক্ষা দেয়, বিভেদের নয়। এ ধর্মের রাস্তা সহজ সরল, বক্রতা সেখানে সমর্থনীয় নয়। যদিও অনেক রাজনেতারাও খোলা মনে অপরাধ করছে আর ধর্মের ছায়াতলে আশ্রয় চাইছে। এরা ধার্মিক নয়, মুমিনও নয়, এরা মোনাফিক এরা ছলবাজ।

আজ ২২ নভেম্বর এক অভিভাবকের সাথে কথা হয়, তার ছেলেটি পাবলিক স্কুলের ছাত্র। তার টিচার ক্লাসে বলেছেন মুসলিমরা টেররিষ্ট বলে তারা বোমা মেরে মানুষ মারছে কারণ তাদের গ্রন্থ কুরআন এটি করতে নির্দেশ দিয়েছে। ছেলেটি মন খুব খারাপ করে এর জবাব চাইছে তার মায়ের কাছে। মাও বেদনার ভারে এর বিহিত কি হতে পারে জানতে চাইছেন। ছেলেটি কুরআন শিখে ও পড়ে এবং এসব বিশ^াস করেনি যদিও, তবু মায়ের কাছে জবাব চাইছে। সোমত্ত ছেলেরাও ক্ষ্যাপে গিয়ে নানান উল্টাসিধা কথা বলছে কেন মুসলিমরা এসব করছে, কি লাভ এসব করে, আমেরিকার মসজিদে সাইনবোর্ড ঝুলছে “গো বেক ইয়োর হোম ল্যান্ড” ইমিগ্রান্ট মুসলিমদের লক্ষ্য করে নির্দোষ ইউসুফ নবীর পরবর্তী প্রজন্মরা এ প্রতিবাদনামা টাঙ্গিয়ে রেখেছে। সবাই মনে করছে এটি উপযুক্ত কাজই করছে তারা। অবশ্যই মুসলিমকে সত্যনিষ্ট হয়ে প্রকৃত আসামী ধরায় আরো সোচ্চার হতে হবে। যদি কোন মুসলিম এটি করে থাকে গোটা বিশে^র মুসলিমই নিন্দা জানাচ্ছে শুধু হৃদয় মন উজাড় করেই নয়, নির্দোষতার প্রমাণও দেখাচ্ছে।

একই ধারার রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্নে ভারতও একাকার:

বাংলাদেশে গণতন্ত্র মুখ থুবড়ে পড়েছে। জনগণসহ বিবেকবানরা টের পান বহুদিন থেকে এর পেছনে ভারতের শক্ত কলকাঠি নড়েচড়ে। বাংলাদেশ ভারতের প্রতিবেশী হলেও একটি সার্বভৌম স্বাধীন দেশ। ভারতের প্রণব মুখার্জি সম্প্রতি প্রচার করছেন বাংলাদেশ “সমৃদ্ধ গণতন্ত্রের দেশ” যখন গোটা বাংলাদেশ মুমূর্ষ দশা কাটাচ্ছে এক অবৈধ নির্বাচন গিলে খাওয়া প্রতারকক্রের হাতে। সুষ্ঠ নির্বাচন গনতন্ত্রের পূর্বশর্ত। এরকম মেরুদন্ডহীন প্রতিবেশীই ভারতের চাই, যাকে দাসের আদলে উঠবস করানো যাবে, চেটেপুটে খাওয়া যাবে, দাপট বহাল রাখা যাবে, বর্ডারে মানুষ মেরে তক্তা করা যাবে। এ লেখার সময়ই লালমনিরহাটে ২৮ তারিখের খবরের শিরোনাম “দুইদিনে তিনজন নিহত”, বিএসএফ গুলি করে হত্যা করেছে, সমানেই এ ধারার মৃত্যু হচ্ছে ধারাবাহিকভাবে। তারপরও অবৈধ ক্ষমতা ধরে থাকা গণতন্ত্রহীন সরকার কোন প্রতিবাদ করার সাহস রাখে না, যার জন্যই প্রণব বাবুরা এত উৎফুল্ল। নেপাল ভারতের আর এক প্রতিবেশী হিন্দু জাতি সত্ত¦ায় পরিচিত, যদিও তারা ভারতের অধিনস্ত নয়, কিন্তু ভারত সেখানেও ওরকম দখল চাইছে। সম্প্রতি নেপালের প্রধানমন্ত্রী তার এক সাক্ষাৎকারে ভারতের এ কপট আচরণের উপর মন্তব্য করেছেন। ২০০ বছর বৃটিশের গোলামী করে মুক্ত হলেও বৃটিশের ঐ মনোবৃত্তিতে ক্রমেই ভারতের প্রশাসন ঐ খোড়া রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েছে। নেপাল কিন্তু কখনোই কারো গোলামী করে নাই, কারো উপনিবেশ ছিল না। কার্যকারণে দেখা যায় ভারত নেপালকেও ঐ রকম দাসখতে বাধতে চাইছে। কিছু বদ মতলবি নেতাকে হাত করে এসব ঘরভাঙ্গা খেলায় ভারত বাড়তি তৎপর থাকে, এর বহুবিধ প্রমাণ সর্বত্র ছড়িয়ে আছে। প্রতিবেশী বাংলাদেশের বেলায়ও এ দোষে তাদেরে খুব শক্তভাবে দায়ী করা যায়। নেপালের প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভারত চায় নেপালের নামমাত্র স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব থাকবে, বাকীটা থাকবে তাদের নিজেদের দখলে। একই মানসিকতাতে প্রনব মুখার্জি মুমূর্ষ বাংলাদেশে দেখছেন সমৃদ্ধ গণতন্ত্রের বিজয় মেলা। কারণ এর সুযোগ গড়িয়ে তারা দেশটি চেটেপুটে লুটে নিতে পারছেন। একই রোগে আক্রান্ত বিংশ শতকে জন্ম নেয়া ইসরাইলের অন্তরাত্মা ‘মোসাদ’। এর ধারাবাহিকতায় “মোদির নিরাপত্তায় মোসাদ” এ উল্লেখযোগ্য খবরও জমা হিসাবের খাতাকে স্পষ্ট করছে।

ভারত কাশ্মিরীদের জন্য যমদূত হয়ে আছে। বর্ডারে বাংলাদেশীরা সমানেই পাখির মত মরছে সরকারের উদাসীনতার খেসারত হিসাবে। প্রতিবেশীদের সাথে এটি ভারতের আচরণগত জটিলতার বাস্তব প্রকাশ। ঠিক যেন ইসরাইল প্যালেষ্টাইনের জন্য গড়ে উঠা বড় যমদূত। ভারত আর ইসরাইলের কর্মকান্ডের মাঝে মিল অনেক। ঊভয়েই শাস্তির আবাসে বলা চলে স্বর্গভ’মি নামে খ্যাত ভ’মি দখলের প্রতিযোগিতায় জীবন পাত করে চলেছে। ভারত এটি ঠিক করতেই হিমসিম খাচ্ছে কাশ্মির তার বিচ্ছেদ্য অঙ্গ না অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ তা নিয়ে মানুষের জীবনের গোটা কয় যুগ চলে গেল।  তারপরও জনতারা স্বাধীনতার সাধ নিতে উন্মুখ হয়ে আছে। বাংলাদেশেও জঙ্গিদের মারা হচ্ছে লিস্ট ধরে, যাদেরে মারলে প্রকৃত মুসলিমরা ধরা খায়, তাদেরেই মারা হচ্ছে ঠিক প্যারিসের হামলার মতই। আর বর্তমান সরকার ঐ গীত শুনতেই চায়, তার টিকে থাকার জন্য অনেকে মনে করছেন এটি নির্বাচনহারা সরকারের বড় বেশী দরকার, এটি তার সময়ের দাবী।

যারা ধৃত হচ্ছে তাদের চেহারাতে কোন মারাত্মকের ছাপ নেই যদিও, কিন্তু প্রচারে বলা হচ্ছে মারাত্মক। একই আদলে বাংলাদেশেও টিভিতে নিরীহদেরে সাজিয়ে জঙ্গি হিসাবে দেখানো হচ্ছে, অভিযোগ করছেন  সুপ্রিম কোর্ট বারের সভাপতি সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন। তিনি বলেন মূল অপরাধীদেরকে বাদ দিয়ে সাধারণ ও নিরিহ মানুষদেরকে গ্রেপ্তার করায় আসল অপরাধীরা মুখ চেপে হাসছে। বাংলাদেশে এভাবে ক্রসফায়ারের নামে মানুষ হত্যা করা হচ্ছে। গণগ্রেপ্তারের আতংকে মানুষ বিপর্যস্ত সময় পার করছে। যেন আইএসএর জঙ্গি আর বাংলাদেশের জঙ্গিদের রকমফের একই।  ধারণা হয়, উভয়েই শক্তির তলানীতে লালিত পালিত হয়ে ময়দান গরম করে রেখেছে। ইসলামে চরম পন্থা বলে কোন পন্থাই নেই। ইসলাম এক মধ্যপথে চলার নাম। এখানের রাস্তা সহজ সরল। ন্যায়ের কথা নীতির কথা ধৈর্যের কথা এখানে প্রাধান্য পায়। “ওহে যারা ঈমান এনেছ! আল্লাহর জন্য দৃঢ় প্রতিষ্ঠাতা হও, ন্যায় বিচারে সাক্ষ্যদাতা হও, আর কোন লোকদলের প্রতি বিদ্বেষ তোমাদের যেন ন্যায়াচরণ না করতে তোমাদের প্ররোচিত না করে (৫:২)। ন্যায়াচরণ করো, এটিই হচ্ছে ধর্মভীরুতার নিকটতর। আর আল্লাহকে ভয় শ্রদ্ধা করো। নিঃসন্দেহ তোমরা যা করছো আল্লাহ তা অবগত”(৫:৮)। দেখা যায় এ আয়াতে মানুষ হত্যাতে ইসলামপূর্ব ইসরাইলীয়রা অতিরিক্ত হাত দাগিয়েছিল বলেই আল্লাহর আয়াতে রাখঢাক না রেখেই স্পষ্ট করা, “এই কারণবশত আমরা বিধিবদ্ধ করেছিলাম ইসরাইল বংশীয়দের জন্য – যে, যে কেউ হত্যা করে একজন মানুষকে আরেকজনকে (হত্যার অপরাধ) ব্যতীত, অথবা দেশে বিশৃংখলা সৃষ্টি করে, তাহলে সে যেন সমস্ত মানবজাতিকে হত্যা করল। আবার যে কেউ তাকে বাঁচিয়ে রাখে সে যেন তাহলে সমস্ত মানবজাতিকে বাঁচালো। আর নিশ্চয়ই তাদের কাছে আামাদের রসুলগণ এসেছিলেন স্পষ্ট প্রমাণাবলী নিয়ে, কিন্তু তাদের মধ্যের অনেকেই এর পরেও পৃথিবীতে সীমা ছাড়িয়ে চলে।” (৫:৩২)। এটি কোন মানুষের কথা নয়, এটি ঐশীবাণী যা বহুযুগ পূর্ব প্রতিটি সত্য তথ্য স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে। এরা যে আগেও এসব অপকর্মে দক্ষতা অর্জন করেছিল বলেই তাদের (ইসরাইলীদের) নাম উল্লেখ করে এ আয়াতে বর্ণিত হয়েছে। এটিও বলা হচ্ছে তাদের কাছে রসুল আসার পরও তারা সীমা লংঘন করে চলেছে।

ইসলামে যুদ্ধের মাঝেও জীবনের মাঝে সর্বক্ষেত্রে ন্যায়নীতির উপর সব সময় জোর দেয়া হয়েছে যা বর্তমানে আর কোন ধর্মধারীর জমা খাতাতে এরকম স্পষ্ট দেখা যায় না। উপরের ৫:২ ও ৫:৮ আয়াতে দেখা যায় ন্যায়পরায়নতার নামই ধর্ম। যার কোন স্বাক্ষর ক্রুসেডাররা বা ইহুদীরা হিন্দুরা এমনকি সাম্প্রতিক সময়ে বৌদ্ধরাও দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে। মুসলিমের উপর নির্দেশ হচ্ছে “সীমালংঘনকারীকে আল্লাহ পছন্দ করেন না” (২:১৯০) বলা হয়েছে যারা অন্যায়ভাবে যুদ্ধ করে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে । নির্দোষের সাথে যুদ্ধ করার কোন বিধান ইসলামের ধারে কাছেও জমা নেই। (সুরা বাক্কারাহএর ১৯০ আয়াত দ্রষ্টব্য)। কোন অবস্থাতেই অত্যাচারী ব্যতীত কারো সাথে যুদ্ধ চলবে না (২:১৯৩)। তারা যদি আক্রমণ করে একই কায়দায় তোমরাও জবাব দেবে (২:১৯৪)। আল্লাহ মঙ্গলকারীদের ভালবাসেন (২:১৯৫)।

আমেরিকাতে রিপাবলিকার পদপার্থী দাবী করছেন মসজিদ বন্ধ করে দিতে। দেখা যাচ্ছে মুসলিমরা সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত। দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট জানায় গত বছর সবচেয়ে বেশি সন্ত্রাসের শিকার হয়েছে ইরাক। গ্লোবাল টেররিজম ইন্ডেক্সএর তথ্যে দেখা যায় শুধু ইরাকে ৯,৯২৯ জন মানুষ নিহত হয়। এ সংখ্যা যে কোন দেশের চেয়ে বেশি বলে জানায় ইন্সটিটিউট ফর ইকোনোমিক্স এন্ড পিস (আইইপি)। এ রিপোর্টে দেখা যায় বিশে^র পাঁচটি দেশে এসব বেশি ঘটেছে, এর ৭৮% ঘটেছে ইরাক, আফগানিস্তান, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান ও সিরিয়াতে। ৩২,৬৫৮ জন নিহত হয়েছে, অন্য বছর থেকে ৮০% বেশি। নাইজেরিয়ায় এটি খুব বেশি। গত দেড় বছরে এটি ৩০০% বেড়েছে, নিহত হয়েছে ৭,৫১২ জন। গত বছর যে দশটি দেশ এর শিকার হয় এর প্রত্যেকটি দেশই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ট দেশ। শুধু নাইজেরিয়াতে মুসলিম খৃষ্টান বিভক্তি আছে। ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’ এর উপর একটি কলাম ছেপেছে বৃহষ্পতিবার ১৯ নভেম্বর ২০১৫। শিরোনামগুলি আনছি শুধু “আইএসএর শীর্ষ নেতা মোসাদের অনুচর”/ “মুসলিম দেশগুলিই বেশী ক্ষতিগ্রস্ত”/ “আইএসকে অর্থ ও অস্ত্র দিচ্ছে কারা?”/ “কেয়ামতের মিশনে আইএস” ছবিতে বুশ ব্লেয়ার ও ওবামার ছবি কথা বলছে/ “আইএসকে কাঁপাচ্ছে রাশিয়া ও ফ্রান্স”/ “দেশে দেশে প্রত্যাখ্যাত আইএস”। ছয়টি শিরোনামে একটি পাতা জুড়ে বিশাল নিউজ করেছে পত্রিকাটি। খবরের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলি হচ্ছে, মূল আসামী খলিফা বাগদাদি আসলে ইহুদী/ ২০০৪ সাল থেকে সিআইএর সঙ্গে তার ঘনিষ্টতা শুরু/ তাকে টানা ১ বছর প্রশিক্ষণ দিয়েছে মোসাদ/ বুশ ব্লেয়ারের ইরাক হামলার সময় ছদ্মবেশে তিনি সেখানের মসজিদের খতিব ছিলেন। তাদের সাম্প্রতিক হুমকি ওয়াশিংটনে হামলা চালাবে / বলা হচ্ছে সিরিয়া ও ইরাকে যারা হামলা চালাচ্ছে তাদের পরিণতি হবে ফ্রান্সের মত/ প্যারিস হামলার জন্য আমেরিকা  ও তার মিত্রদের দায়ী করেছে উইকিলিক্স। ভ’খন্ড বৃদ্ধির পরিকল্পনা রয়েছে মোসাদের। এসব তথ্য প্রকাশ করে মধ্যপ্রাচ্যের জনপ্রিয় ইন্টারনেট রেডিও আজিয়াল ডটকম। পরে ইরানের গোয়েন্দা সংস্থাও এর সত্যতা স্বীকার করে, এসব প্রকাশিত হয় আরবী পত্রিকা ইজিপ্রেসে। এত কিছুর পরও বলতে হচ্ছে কেন এরা এরকম করছে। কারণ রাজ্য বিস্তারের মত একটি বড় রোগের শিকার এরা। এরা বহু পুরোনো মধ্যযুগ পূর্বেকার “জোর যার মুলুক তার” রোগে আক্রান্ত। এভাবে ক্রমে শিয়া সুন্নী বিরোধও তারা তাদের নিজেদের স্বার্থে উসকে দিচ্ছে। লোভী ভারত ও ইসরাইলের হয়েছে মানচিত্র বৃদ্ধির রোগ, যার পেক্ষিতে তারা তৃতীয় বিশ^যুদ্ধকে দুহাতে ডাকছে, হাতছানি দিচ্ছে যেন পিপিলিকার পাখা উঠছে মরিবার তরে।

সম্প্রতি সুইডেনের অর্থনীতিবিদদের পরিচালিত এক জরিপে বৃটিশ দৈনিক টেলিগ্রাফের বক্তব্যে প্রকাশ বিশে^র অসহিষ্ণু দেশের তালিকায় প্রথমে আছে ভারত এরপর জর্ডান ও তিনে আছে বাংলাদেশ। সহিষ্ণুতার নিদর্শন হিসাবে সদ্য পাওয়া খবর ভারতের মুসলমানদের বাংলাদেশ পাকিস্তানসহ বিশে^র যে কোন জায়গায় চলে যেতে মন্তব্য করেছেন আসাম রাজ্যের গভর্নর পিবি আচার্য। জঙ্গি প্রচারে অসহিষ্ণু বাংলাদেশ সরকার তার মন্ত্রীরা বহুদিন থেকেই জড়িত এ প্রমাণ কাজে কলমে সর্বত্র ছড়িয়ে আছে, ৯০% অধ্যুষিত মুসলিম একটি দেশ, চলছে জঙ্গির খেলা। গোটা বিশে^ নির্দোষ মানুষ মরছে আর জঙ্গিনামা থর থর করে কেঁপে চলেছে। অনেককেই হুমকি দেয়া হচ্ছে, শোনা যায়। সম্প্রতি বাংলাদেশের জনপ্রিয় ট্যাবলয়েড পত্রিকা মানবজমিনের প্রধান সম্পাদককে জেএমবির চিঠি: ‘অতিরঞ্জিত লিখলে পরিণতি ভয়াবহ” (আমাদের সময় ডট কম, ১৮/১১/২০১৫)। বাংলাদেশের বগুড়ায় শিয়া মসজিদের মোয়াজ্জিন নিহত হন ও ইমামসহ কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হন আজ ২৭ নভেম্বর ২০১৫ তারিখে, হামলার দায় স্বীকার করে আইএস (আমারদেশ ২৭ নভেম্বর ২০১৫)। বাংলাদেশের জনতারা যেভাবে সাম্প্রদায়িক হামলা করে না, সে একই ভাবে শিয়া সুন্নীর লড়াই সেখানে কোনদিন গায়ে গতরে বাড়ে নাই। ঐ পরিবেশ সেখানে নেই, জন্মে নাই। নতুন করে বাংলাদেশেও এ কাজ করার একদল ফটকাবাজ তৈরী হচ্ছে, কিছু আগেও এটি হয়ে গেল, পায়ে পায়ে আগাচ্ছে, মনে হয় ঐ একই শক্তির ছায়াতলে এদের লালন করা হচ্ছে, সেখানেও বিভেদের নতুন বিজ পুতা হচ্ছে। এসবের পরিণতি কারো জন্য ভালো জমা নয়, এসব ধ্বংসের জমা। লোভে পাপ, পাপে মৃত্যুই এর পরিণতি।

World trade centre truth-Ram puniyani

নাজমা মোস্তফা,   ২৮ নভেম্বর ২০১৫।

 

 

 

 

 

 

Advertisements

সৌদি গ্যাজেটে প্রকাশিত “মিসরাহ” অরফে “মুতাহ” বিবাহ

সাম্প্রতিক সময়ে পাওয়া সৌদি গ্যাজেটে ২৯ অক্টোবর ২০১৫ তারিখে একটি বিষয় উঠে আসে যা মুসলিম জীবনের সাথে জড়িত। রিয়াদ থেকে প্রচারিত সৌদি গ্যাজেটের লেখাটির শিরোনাম ছিল “আনএ্যাবল টু এফর্ড ম্যারেজ এক্সপেন্সেস, ইয়ং ম্যান গো ফর মিসইয়ার” লেখাটির শিরোনামই ঘটনার বিষয় স্পষ্ট করছে। “মিসইয়ার” এক ধারার বিবাহ ব্যবস্থা যা অনেক সময় অতীতে সৌদিরা তাদের ইসলামপূর্ব সময়ে ব্যবহার করেছে। শোনা যায় আজো কোন কোন জায়গায় সৌদি ও ইরানীরা তা ফলো করছে। এবার কথা হচ্ছে বাস্তব জটিল অর্থনীতি, সামাজিক ও ধর্মীয় অবস্থানে এটি কতটুকু সমর্থণীয়, এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। মক্কা দৈনিকের বরাতে দেখা যাচ্ছে অনেক পুরুষ এতে উৎসাহী হচ্ছেন। পারিবারিক পরামর্শদাতা নাসার আল তুবাইতি এর কারণ হিসাবে ব্যাখ্যা করছেন, যুবকেরা চলমান বিবাহ ব্যয় বহনে অক্ষম এবং মেয়েদের অতিরিক্ত দাবী দাওয়ার প্রেক্ষিতে এ গ্যাপ পূরণ করতে ঐ বিকল্প চিন্তার দরকার পড়েছে। অতীতে আমরা খুব কম হলেও নামটি শুনেছি “মুতাহ” বিয়ে নামে এক অস্থায়ী বিয়ের কথা। এখানের এ দুটি বিয়ে ব্যবস্থা একই ধারার। এতে দায় দায়িত্বের বালাই নেই, এক ধরণের কন্ট্রেক্ট ম্যারেজের মত, এটি একটি শর্তবদ্ধ সাময়িক খন্ডকালীন বিয়ে।

মুসলিমদের নৈতিকতার দরজায় টোকা পড়েছে বলেই এতে অনেক সচেতন ধর্মধারীর নজর কাড়ছে, আমিও তার ব্যতিক্রম নই। রাজতন্ত্রের আদলে গদি জোড়া সৌদির অনেক কাজই বিতর্কীত, এসব ইসলাম নয়। তারা প্রথমেই যে রাজতন্ত্রের ধারণা বহাল রেখেছে এসব ইসলামের বৈরী কাজ। আর সেটি চলছে বহু বড় সময় কাল থেকে। এটি একটি বড় ইশারা হতে পারে আদমকে শয়তান বিভ্রান্ত করবে বলে কুরআন নামের ঐশীগ্রন্থে যে ইশারা রয়েছে এর ফলশ্রুতিতে আমরা এভাবে শুরুর সময় থেকেই আক্রান্ত হচ্ছি। ইসলামে এ ধারার বিয়ের কোন বর্ণনা বাস্তবতা পেতে পারে না। কারণ এরকম ধারনাই কুরআন বিরোধী। মেয়েরা শুধুই কি বাচ্চা পালনের জন্য বা গৃহকর্মের জন্য, তা কিন্তু নয়,  বরং চলমান জীবনে একজন সঙ্গি বা সঙ্গিনী সব ব্যাপারে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিবে। নবী জীবনের ২৫ থেকে ৫৫ অবধি জীবনের একমাত্র সঙ্গিনী ছিলেন বিবি খাদিজা, তিনি কি করেছিলেন? তাকে কি গৃহকোণে বন্দী করে রাখা হয়েছিল?  তিনি তো একজন স্বনামে খ্যাত ব্যবসায়ী মহিলা ছিলেন যিনি “তাহিরা” উপাধিপ্রাপ্তা। সৌদিতে মহিলাকে ড্রাইভ পর্যন্ত করতে দেয়া হতো না বলেই আমরা জানি। যে আল্লাহর প্রথম নির্দেশ ছিল জ্ঞানঅর্জনের। ধারণা মতে তাদের আজ জ্ঞানবিজ্ঞাানের চূঁড়ামনিতে পৌছার কথা কিন্তু তারা আজও জ্ঞান অর্জনের বিরোধী মনোভাবে উজ্জ্বল। অনেক সময় মদ নারীতে অতিরিক্ত আসক্ত। বিবাহ সম্বন্ধে ইসলামের মূল নির্দেশ হচ্ছে এক বিয়ের পক্ষে, ভাষ্যমতে এর উপর শক্ত নির্দেশই টিকে। যা আমাদের বাংলাদেশীরা অনেক বেশী বহাল রাখতে পেরেছে শক্ত হাতে। কিন্তু চলমান সৌদি বাদশাহরা কি করছে? ডজন ডজন বিয়ে করে শত সন্তানের পিতৃত্বের দাবী করে। এ সব কি ইসলাম? এসব হচ্ছে জাহিলিয়াতি আচার। এসব নির্মূল করতেই নবী এ ধরাতে এসেছিলেন। উচিত ছিল এর উপর পরবর্তীদের বাস্তব কাজ করা। ধর্ম ও ইতিহাস বলে অতীতে যারা সোচ্চার হয়েছেন তাদেরে কৌশলে তথাকথিত রাজনেতারা খুন করে ময়দান থেকে সরিয়ে দেয়। আল্লাহর সামাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে দেয়নি। এসব ইবলিস করবেই, এটি আমাদের জানা, ইবলিস আমাদের ঘরে সদর দরজা দিয়েই আমাদের সাথেই ঢোকে, বের হয়, যার জন্য আমরা ধরতে পারি না। আল্লাহ বারে বারে কুরআনে বলেছেন এ হচ্ছে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু। তার মানে তুমি চাইলে তাকে ধরতে পারবে, সে কোন লুক্কায়িত শত্রু নয়, সে আড়ালে নেই।

অতীত ইতিহাস বলে মুতাহ বিবাহের নামে এক জাহিলিয়াতি অনাচার ইসলামপূর্ব যুগে প্রচলিত ছিল। কালে অনেকে ঐ অনাচারকে টেনে এনে ইসলামের পবিত্র অঙ্গণে ঢুকিয়ে দেয়ার প্রয়াস করেছেন, করছেন। বস্তুত তা কুরআন বিরুদ্ধ অনাচার। সুরা নিসার ১৩৬ আয়াতে বলা হয়েছে “ওহে যারা ঈমান এনেছ, বিশ^াস স্থাপন করো আল্লাহতে, তার রসুলে ও তার কিতাবে”। বস্তুত ঐ সময়ের প্রেক্ষাপটও ভিন্ন ছিল; দাসপ্রথা, যুদ্ধবিগ্রহ ও বন্দী নারী পুরুষের বাড়তি সমস্যা ঐ সমাজে প্রচলিত ও বহাল ছিল। এমতাবস্তায় বলা হয়েছে ন্যায়পরায়নতার স্বার্থে ঐ সব এতিম মেয়েকে বিয়ে করা যাবে। তবে একজনকেই কারণ এটি নিশ্চিত একের উর্দ্ধে সমতা বিঘিœত হবেই। আল্লাহর বাণীতে এটিও সুস্পষ্ট যে একজনকেই বিয়ে করবে। এটিই বেশী সঙ্গত (৪:৩)।  এর পর পরই বলা হয়েছে তাদের প্রাপ্য মহরানা আদায় করতে হবে নিঃস্বার্থভাবে। পুরুষকে দেবার মানসিকতায় বিয়ে করতে হবে তবে যদি সঙ্গত কারণে প্রতিপক্ষ কোন ছাড় দেয় স্বেচ্ছাকৃতভাবে, সেটিও সমর্থণীয়। অনেকে জবরদস্তি করে মেয়েদের থেকে মাফ করিয়ে নিতে চান এটি অধর্মাচার, অকুরআনীয় বিচার (৪:৪)। মোটকথা উভয়ের সমঝোতাতে যে কোন ফয়সালা হতে পারে, তবে জবরদস্তি করে কোন কিছু কুরআন সমর্থণ করে না। সব সময় সাক্ষী রেখো, তারপরও সব হিসাব রক্ষণে আল্লাহই সুবিচারক (৪:৬)। কারো সম্পত্তি জবরদস্তি করে ব্যবহার করা যাবে না, সবার প্রতি সদয় ব্যবহার করতে হবে (৪:১৯)। যদি দেখা যায় স্বাধীনা নারী বিয়ে ব্যয়সাধ্য তাহলে এমতাবস্থাতে বিশ^াসিনী দাসীকে বা বন্দিনীদের থেকে স্ত্রীরুপে গ্রহণ করারও অনুমোদন দেয়া হয়েছে। তবে কঠিন কথাটি হচ্ছে কখনোই তাকে মোহরানা ছাড়া বিয়ে করা সমর্থণীয় নয়, এবং ব্যভিচারের জন্যও এটি সমর্থনীয় নয় (৪:২৪)। কম হোক বেশী হোক যার যার সাধ্যমত সেটি নির্ধারিত হবে। ছেলে পক্ষের উপরও অযথা বাড়তি বোঝা চাপিয়ে দেয়ার কোন যুক্তি ইসলাম বা কুরআন সম্মত নয়। ইসলাম একটি জীবন বিধান কারো উপর বাড়তি বোঝা চাপিয়ে দেয়া এর বিধান নয়। এসব প্রেক্ষাপটে বরং দেখা যাচ্ছে মেয়েরা বাড়তি দায়ভার চাপাচ্ছে পুরুষের উপর, তা মোটেও সমর্থণীয় নয়।

তারপরও বিধান দেয়া হয়েছে যার আর্থিক সঙ্গতি নেই, তার জন্যই বিশশসিনী কুমারীদের যারা ডান হাতে ধরা রয়েছে, এখানেও আল্লাহর সেই একই কথা মোহরানা দিবে, ব্যভিচারের জন্য এসব নয়, রক্ষিতারুপেও তা সমর্থণীয় নয়। এটি শুধু তার জন্য যে মনে করে যে সে পাপে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা। আর যদি কেউ ধৈর্য্যধারণ করে, তবে সেটিই বেশী ভাল তার মানে সে ধৈর্য্য ধারণ করতে পারলে তার পুরষ্কার উত্তম হবে। সে ভালটারই অনুসরণ করবে। আল্লাহই ত্রাণকর্তা ও অসীম কৃপানিধান (৪:২৫)। বস্তুত এ আয়াতে বুঝা যায় যারা সত্যিকারের ধৈর্য্যশীল তাদের জন্য ত্রানকর্তা স্বয়ং আল্লাহ, সফলতা তাদের শক্ত পাওনা হয়ে থাকবেই। সৌদি গ্যাজেটের লেখাটিতে দেখা যায় বহুবিবাহ কমে আসছে, এটি লক্ষণ ভালো। তার মানে ধীরে হলেও মানুষ প্রকৃত সত্যে আত্মসমর্পণ করছে। ডিভোর্স বাড়ছে এর কারণ বহুবিধ, সারা বিশে^ই এর উর্ধ্বগতি। মিসরাহ বিয়ে বা মুতাহ বিবাহের নামে ফতোয়াবাজদের এসব ফতোয়া দেখে ভয় লাগে মনে, এরা যে কুরআনকে কম অনুসরণ করছেন, এসব তার প্রমাণ। কুরআনেই শ্রেষ্ঠ ফতোয়া বিলি করা হয়েছে, আল্লাহ স্বয়ং ফতোয়াবাজ হয়ে এর মালিকানাতে প্রতিষ্ঠিত। আল্লাহকে পাশ কাটিয়ে যে বা যারা ফতোয়ার নামে এসব অনাচারকে লালন করছেন তারা প্রকারান্তরে অপকর্মের লালন করছেন। আল্লাহ দ্ব্যর্থহীন ভাষাতে বলেন, তিনি কখনোই বিফল করবেন না কর্মীদের কোন কাজ, তারা পুরুষ হোক বা নারী (৩:১৯৪)। উভয়ের মর্যাদা অভিন্ন আল্লাহর কাছে। আল্লাহর নির্দেশকে ডিঙ্গিয়ে উপরোক্ত ধারণার বিয়ে কখনোই কুরআন সমর্থন করে না। অতীতে ‘মোতাহ’ বিয়ের নামে এক জাহেলিয়াতি অনাচার সমাজে প্রচলিত ছিল। আমরাও শুনেছি বাংলাদেশের কিছু অঞ্চলে নাকি কাজের মৌসুমে মানুষ অস্থায়ী বিয়ে করতো। যদি এসব সত্য হয়, তবে এসব ইবলিসীয় কাজ কুরআনের মাপকাঠিতে টিকে না। ফতোয়ার নামে আজকাল অনেক অনাচারই করা হচ্ছে এসব নেতিবাচক প্রচার থেকে সত্য নির্ভর আল্লাহর বিধানকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। প্রতিটি মুসলিমকে মুমিন হতে হবে। কুরআনের হিসাবে সমাজে সভ্যতাতে এমন কি মুসলিমদের মধ্যেও তিন ধারার মানুষ হবেন এক মুমিন, মোনাফিক, মুশরিক।  মুমিন ছাড়া বাকী দু’দলই নিকৃষ্ট প্রজাতির মানুষ। সত্য ধর্মের ও সত্য গ্রন্থের লালন ও প্রসারই সঠিক পথ নির্দেশিকা। বস্তুত সৌদিকে নয়, রসুলের মারফতে আসা গ্রন্থ কুরআনকে আল্লাহর বানী জেনেই ইসমে আজমের মত কঠিন সত্য নির্ভর যুক্তি বলেই ফলো করতে হবে। এটি এমন একটি ঐশী গ্রন্থ যা এখানের তিন একসূত্রে গেঁথেছে যা এ গাঁথুনির শক্ত ভিত্তি। এর সাথে যার বিরোধ হবে সত্যের সাথে মিথ্যার কোন ফয়সালা হবে না।

উপসংহারে বলতে বাধ্য হচ্ছি কি কারণে আজ চৌদ্দশত বছর পরও জাহেলিয়াতি আচার আমাদের পরিসরে হালকাভাবে হলেও এসে ভিড়েছে। মুতাহ বিবাহ কুরআন বিরোধী একটি অনাচারী ধারা যা ছিল ইসলামপূর্ব সমাজের আচার মাত্র। কিভাবে আজ আলোকিত গ্রন্থ প্রাপ্তির চৌদ্দশত বছর পরও আমরা ঐ পুরাতনকে নষ্টকে খুঁজে পাচ্ছি। কিয়ামতের আগে মানুষ ঐ পূর্বেকার জাহিলিয়াতি যুগের দিকে ফিরে যাবে, এমন ধারার কথা সমানেই আলোচনায় আসে। বর্তমান চলমান সমাজে এমন অনেক অনাচারকে বিজয় মালা পরানো হচ্ছে। যেমন: সমকামিতা, বিবাহ বহির্ভুত জীবন যাপন ব্যবস্থা, এটি প্রতিটি মুসলিমকে জানতে হবে মানতে হবে এসব ইসলাম নয়। এসব কুরআন নামের বস্তুনিষ্ট সিলেবাসের বাইরের অনাচারী ব্যবস্থা। বস্তুত কিভাবে কুরআন বিরুদ্ধ আচরণ এসে আমাদের পবিত্র অঙ্গণে এসে জায়গা করে নিয়েছে, এসব তার বাস্তব উদাহরণ মাত্র। এর প্রধাণ কারণ আমাদের গাফিলতি, ধর্মহীন, প্রকৃত কুরআনজ্ঞানহীন, গবেষনাহীন ধ্যাণধারণা এসবের জন্য দায়ী। গ্রন্থটি বস্তনিতে বেধে উপরের তাকিয়ায় নাগালের বাইরে রেখে দেবার জন্য আসে নাই, বরং এসেছে একে বোঝার জন্য, মানার জন্য, পালন করার জন্য। অনেকে মনে করেন তেলাওয়াত করলেই সকল দায় শেষ। মোটেও নয়, তেলাওয়াতে দায় মাত্র শুরু হয়, শেষ হয় পালনে। আল্লাহ আমাদের সহজ সরল ধর্মটি বোঝার তওফিক দান করুন। আল্লাহ জানেন আমরা পরবর্তীতেও যে এসব অনাচার করবো। তাই আল্লাহর সাবধানবাণীটি স্মরণ করা ছাড়া আর দ্বিতীয় পথ সামনে খোলা নেই। আল্লাহ বলেন, “হে গ্রন্থধারীগণ!  কেন তোমরা সত্যকে মিথ্যার পোষাক পরিয়ে দিচ্ছ, আর তোমরা জেনেশুনে সত্যকে লুকাচ্ছ”? (সুরা আল ইমরানের ৭০ আয়াত)। আল্লাহ আমাদের সত্যকে ধারণ করার তওফিক দান করুন।

 

নাজমা মোস্তফা,   ১৩ নভেম্বর ২০১৫ সাল।

 

মুক্তিযুদ্ধের কথা: “অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা” গ্রন্থ থেকে

স্বাধীনতার শুরু থেকেই সচেতন মুক্তিযোদ্ধাসহ সচেতনরা ক্ষত বিক্ষত হতে থাকেন নানা কারণে। তার প্রমাণ হিসাবে একজন মুক্তিযোদ্ধার লেখা কটি পুরানো পাতা থেকে কিছু তথ্যসূত্র তুলে ধরবো বর্তমান সময়ের পাঠকের জন্য। এরা তারাই যারা না দেখেছে স্বাধীনতা না এর গভীরে ঢুকতে পেরেছে। কখনো সঠিক কখনো অঠিক যুদ্ধের কিছু ছেড়া পাতা থেকে মাঝে মাঝে বিচ্ছিন্ন কিছু জেনেছে মাত্র। আদর্শকে পরম আদরে লালন করতে হয় চাষ করতে হয় এসব আগাছা নয় যে এমনি এমনি জন্মাবে। নেতারা আদর্শের চাষ করতে না পারলেও সেদিন মুক্তিযোদ্ধাদের সম্বল ছিল তার চিরাচরিত গড়ে উঠা পারিবারিক আত্মমর্যাদা ও আদর্শিক মনোবৃত্তি যা তাকে স্বাধীনতার দোর পর্যন্ত নিয়ে যায়। এর বাইরে বাড়তি আর কোন সুনির্দিষ্ট আদর্শের নিয়মে এরা আটকা পড়ে নি।

এরা হচ্ছে শেখ হাসিনার জঙ্গীলীগ  ২০১৭ সাল অবদি দেশটিকে অরক্ষিত করার জবরদখলির প্রমান দেখুন ভিডিওটিতে। তবে অতি অল্প দিনের মধ্যে এসব দাগ চিহ্ন মুছে ফেলার কৌশল জোরালো ভাবে চলছে।  

চল্লিশ পরবর্তী বর্তমান বিশৃংখল সময়ের উদাহরণীয় ঘটনা প্রমান করে ঐ মুক্তিযোদ্ধার বাস্তব উপলব্ধি যে কত সত্য ছিল তা স্পষ্ট। সামান্য উদাহরণ হিসাবে আনছি, মাত্র আজ ২০১২ সালের সেপ্টম্বরের ১১ তারিখের খবরে জানা যায় বাংলাদেশের নিখোঁজ গার্মেন্টস শ্রমিক নেতা আমিনুলের এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে নিউইয়র্ক টাইমস। খবরে প্রকাশ পুলিশের তোলা ছবিতে দেখা যায় আমিনুলের হাটু গেড়ে গুড়ো করে দেয়া হয়েছে এবং তার পায়ের তলা ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে। তার ডান হাটুর নীচে ড্রিল দিয়ে ছিদ্র করা হয়েছে, চিকিৎসকরা বলেছেন। তাকে রক্তাক্ত করে হত্যা করা হয়েছে। বহুদিন থেকে আমিনুলের করুণ ঘটনা শুনছি পত্রিকার পাতাতেই। আর সে দেশের প্রধানমন্ত্রী যিনি সব সময় আসামীদের পক্ষে সাফাই দিয়ে বেড়ান তিনি বলছেন যে, নিরাপত্তা বাহিনীর জড়িত থাকার খবর অসত্য। তিনি কি দেশের নির্যাতীত মানুষের কোন খবর রাখেন? বরং দেখা যায় যারা নির্যাতন করে তাদেরে কি ভাবে সামাল দিবেন তার মূল্যবান সময় সেখানেই ব্যয় করেন। কেমন করে কিসের জোরে তার কর্মীরা এমন সব দক্ষ মারদাঙ্গা কর্মকান্ড করে সারা দেশকে এক বিরান ভূমি বানিয়ে রেখেছে। ছাত্র নামধারী দুর্জনেরা যা করে বেড়াচ্ছে তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা দূর প্রবাস ছোয়, যা আর বলার অপেক্ষায় নেই। এবার কথা হচ্ছে এরা এতসব বীরদাঙ্গার অর্জন করলো কবে কখন, কিভাবে এবং কেন? নিশ্চয় কোন সূত্রে তারা গোল্ড মেডেল অর্জনধারীদের মত এসবে দক্ষতা অর্জন করে চলেছে। জাহান্নামে যাবারও একটি দক্ষতা লাগে। যেমন নানান খবর থেকে ধারণা হয়, এই আমিনুল নামের মানুষটি কোন অবস্থাতেই সেখানে যেতে পারবে না। সমাজ সেবক মানবতাবাদী ধারণায় তার কৃতকর্ম যেন জান্নাত তাকে হাতছানি দিচ্ছে। কিন্তু যে পুলিশ বা ক্যাডার তাকে হত্যা করছে হাত পা গুড়ো করেছে তার জন্য জাহান্নাম প্রস্তুতি নিচ্ছে। খোদ প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রীরা কোথায় যেতে চান তা তাদের কর্মকান্ডই নির্ধারণ করে দিবে বা হয়তো কর্মকান্ডের ফিরিস্তি দেখে আমজনতাও তা বলে দিতে পারবে।

শেখ সেলিম দেশের লাখ লাখ মানুষকে হত্যার হুমকি দিচ্ছেন,তার বিচার হওয়া উচিত’

বিপন্ন এ দেশটিকে স্বাধীনতা পরবর্তী কিভাবে শুরু থেকেই আরো বিভৎস অবস্থার সম্মুক্ষিণ হতে হয়েছে এর কিছু নমুনা সুস্পষ্ট হয়েছে একজন মেজরের বাস্তবে পরখ করে দেখা তার সৃষ্টিশীল লেখনীতে। তার অতিবাস্তব চোখে দেখা একজন আদর্শ সৈনিকের দৃষ্টিতে যা ধরা পড়েছে তাই তিনি উল্লেখ করেছেন। তার বইতে তিনি এর বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন। আমি শুধু কিছু পয়েন্টকে পাঠকের সামনে তুলে ধরলাম শুধু এ সত্যটুকু উপলব্ধি করার জন্য। এর প্রতিটি ধাপ আমাদের নিজেদের চোখেও পরখ করা। আমরা নিজেরাও এর নীরব সাক্ষী। নীচে যে লুন্ঠন প্রক্রিয়ার প্রসঙ্গ এসেছে, আমি ব্যক্তিগতভাবেও দেখেছি কারণ বর্ডার সংলগ্ন আমাদের নিজেদের বাড়ী হওয়ার কারণেও বাড়ীর সামনে দিয়ে ট্রেন বোঝাই বিশাল কয়েকগুণ লম্বা ট্রেনগুলো বর্ডার দিয়ে যাবার সময় সবকটি লগি নিঃছিদ্র বন্ধ থাকতো। আমরা ধারণাও করতে পারতাম না কি সব যাচ্ছে ঐ বর্ডার পার হয়ে। গোটা দর্শণার্থী জনতারা মনের সঙ্গোপনে সবাই বেদনা বোধ করতো কিন্তু কারো কিছু করার ছিল না। উপস্থিত সবাই নির্বাক ছিল। ঠিক একইভাবে আসার পথে সবকটি দরজা খোলা থাকতো। এতে আরো বোঝা যেত বাংলার সব বগলদাবা করে ফেরত খোলা কম্পার্টমেন্ট তার নাড়িভুড়ি দেখিয়ে দেখিয়ে আবার ঝাকার ঝুম্মুর ঝাকার ঝুম্মুর আওয়াজ করতে করতে ফেরত দেউলিয়া হয়ে আমাদের ষ্টেশন সংলগ্ন বাড়ীটির পাশ দিয়ে ঘটনার দাগ চিহ্ন রেখে পার হয়ে যেত। নীচে যশোহর খুলনার বর্ডার সংলগ্ন খবর হলেও আমি ভিন্ন বর্ডার সংলগ্ন অবস্থান নিজ চোখে দেখেছি। তার মানে লুটপাটের এ মহড়া ঐসময় সারা দেশজুড়ে উৎসবের আদলে চলে। দর্শণার্থিরা সেদিন নির্বাক থেকে সারাক্ষণ মনের মাঝে কষ্ট পেয়েছে, আজ ঐ মেজরের কথার সাথে ঐ একই মর্মর ধ্বনি শুনতে পাচ্ছি।

মানুষ তার জীবনে অনেক কিছ্ইু হারায়। যখন ধন জন হারায়, তারপরও তাকে ধৈর্য্য ধরে দাঁড়াবার ইঙ্গিতই সুজনরা ধার্মিকেরা দিয়ে গেছেন কিন্তু যখন কেউ তার মানবিকতা হারায় নৈতিকতা হারায় তখনই সে সর্বস্ব হারাবার পর্যায় পার করে। বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে স্বাধীনতার চল্লিশ বছর পর সব খবরাখবর শুনে মনে হচ্ছে এরা যেন সর্বস্ব হারাবার পথেই এগুচ্ছে। কিন্তু এর কারণ কি? সর্বত্র আদর্শ মানবিকতা হারাবার এ বিজয়মেলা কেন? আদর্শের চাষ কেন ৯০% মুসলিম অধ্যুষিত একটি অঞ্চলে হচ্ছে না বরং উল্টো ফসল ঘরে উঠছে। এমন কোন জায়গা নেই যেখানে ‘এ জাতি এ গ্যাংরিণে আক্রান্ত দশা থেকে মুক্ত’ এটি বলার জো নেই। অভিজ্ঞ ডাক্তারেরা বলেন এটি হলে রক্ষে নেই, পা কেটে ফেলে দিতে হয়। দেশটির জন্ম লগ্নে আমরাই ছিলাম প্রতিটি জলজ্যান্ত ঘটনার অংশিদার। আমরা ছিলাম যুদ্ধের শরিক শক্তি, এটি বলতে কোন দ্বিধা নেই। আমরা তখন তরুণ, মোরব্বিদের মুখেই শুনেছি কিভাবে আদর্শের নষ্টামির সব ভ্রষ্ট চালচিত্র খুব কৌশলে সেদিন থেকে সমাজে ধীরে জায়গা করে নেয়। প্রতিটি ক্ষেত্রে নকলবাজি থেকে শুরু করে সবখানেই আদর্শের হতাশ দশা। আর আজ যেন এর আগ্নেয় বিস্ফোরণ হচ্ছে সবদিকে।

তাছাড়া বর্তমান মন্ত্রীরা এভাবে কেন কথা বলছেন? একজন সরকার প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গির কবির নানক বলছেন ‘প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশকে এবাদত মনে করে পিলখানায় গিয়েছিলাম’। একজন মুসলমান এরকম শিরকী কথা কেন বলছেন? এরকম কথা কোন মুসলমানের মুখে মানায় না, এটি ৯০% মুসলিম অধ্যুষিত একটি শিরকহীন এ ধর্মের গোড়াতেই আঘাত করে। যদিও বিশারদরা এসব নির্মম বাণী আগেই বলে রেখেছেন। চোরা না শুনে ধর্মের কাহিনী, অতি ভক্তি চোরের লক্ষণ। সত্যনিষ্ট বিচারকরা আলামত সূত্র ধরেই ফয়সালাতে পৌছান। মুসলমানের ঈমান একমাত্র অদেখা বিধাতা আল্লাহর সত্যকে বিশ্বাস করে। স্বার্থবাজ রাজনীতি মানুষকে এভাবে দিকহারা অমানুষে পরিণত করছে। যদিও এ ধারার আচরণে ধরা পড়ে এরা বেশির ভাগ নামেই মুসলিম, কাজে মোনাফিক। যদিও বাস্তব আল্লাহর খবরদারীও বেশী দূরে নয়, সামান্য পরে হলেও অবধারিত। আর সেখানে কোন ছাড় দেয়াও হবে না। বালি পরিমান দোষের গুণের বিষয়ও প্রাধাণ্য পাবে। পিলখানা হত্যা মামলার সাক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর সামরিক সচিব মেজর জেনারেল মিয়া মোঃ জয়নুল আবেদিন অস্থায়ী মহানগর দায়রা জজ আদালতে হাজির হয়ে সাক্ষ্য প্রদানকালে বলেন, পরিচয় গোপন করে বিজিবির সাবেক ডিএডি তৌহিদসহ অন্যরা যমুনা ভবনে গিয়েছিলেন। খবরটি জানা যায় ৩ আগষ্ট ২০১২ সালের পত্রিকার রিপোর্টে প্রকাশ। এরই ধারাবাহিকতা সাধু পুরুষদের এমন ধারার এবাদতনামার জবানবন্দি। বর্তমানের এরকম সময়ের প্রেক্ষাপট বিশ্লেষনে এখানে মেজর জলিলের লেখাটি মনের মাঝে গভীর দাগ কাটে বিগত শতকের শেষ দিকে যখন লেখাটি প্রকাশিত হয়। সে লেখা থেকে সংগৃহীত পাঠকের জানার জন্য সামান্য কিছু মাল মসালা। ১৯৮৮ সালে একজন মুক্তিযোদ্ধার বই, এর নাম ছিল “অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা” ৮০ পৃষ্ঠার বইটি ইতিহাস পরিষদ কর্তৃক প্রকাশিত। সেখান থেকে কয়টি পয়েন্ট।

 

majalil(১) তৎকালীন সময়ে কট্টর আওয়ামী লীগার বলে পরিচিত নেতা কর্মীদের মুখে ‘ধর্মনিরপেক্ষতার’ নাম গন্ধও শুনতে পাইনি। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী দামাল তরূণ যুবকদের অধিকাংশই ছিল এদেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের সন্তানসন্ততি।আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পূর্বের ইসলাম আর পরের ইসলামএর মধ্যে হঠাৎ করে এমন কি ঘটে গেল যাতে ইসলামের কথা শুনলেই কোন কোন মহল পাগলা কুকুরের মত খিচিয়ে উঠেন। শেখ মুজিব একদিকে ছাত্র নেতৃত্বের কাছে নতি স্বীকার করে স্বাধীনতার পক্ষে যেমন কাজ করেছেন, ঠিক তেমনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে চেষ্টা করেছিলেন পাকিস্তানকে রক্ষা করতে।

(২) ২৫শে মার্চ রাতের কথা স্মরণ করে অধিকাংশ নেতৃবৃন্দই শিহরে উঠে জবাব দিয়েছেন যে, তাদের নাকি কল্পনায়ও ছিল না পাকিস্তান আলোচনার পথ ত্যাগ করে আক্রমন করবে। অনেকে মার্শাল ল’ জারী হতে পারে পর্যন্ত ধারণা করেছেন।  মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী, পুলিশ, ইপিআর, আনসার, অন্যান্য চাকরীজীবী, ব্যবসায়ী ইত্যাদি মহলের ক্ষেত্রেও এ কথাই প্রযোজ্য। এদের মধ্যে অনেকেই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে নিতান্ত বাধ্য হয়ে প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে, কেউ কেউ করেছে সুবিধা অর্জনের লোভ লালসায়, কেউ করেছে পদ যশ অর্জনের সুযোগ হিসাবে, কেউ করেছে তারুণ্যের অন্ধ আবেগে এবং উচ্ছ্বাসে এবং কতিপয় লোক অংশগ্রহণ করেছে ‘এডভ্যাঞ্চার ইজম’ এর বশে। এসকল ক্ষেত্রে দেশপ্রেম নিষ্ঠা এবং সততারও তীব্র তারতম্য ছিল। কারণ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেও যারা যুদ্ধচলাকালীন অবস্থায় এবং যুদ্ধোত্তরকালে চুরি, ডাকাতি, ধর্ষণ করেছে, অপর বাঙালীর সম্পদ লোপাট করেছে, বিভিন্নরুপ প্রতারণা করেছে, ব্যক্তি শত্রুতার প্রতিশোধ নিয়েছে, তাদের কাছে মুক্তিযুদ্ধের সেই নির্দিষ্ট চেতনা যে সম্পূর্ণভাবেই অজানা ছিল তাতে সন্দেহের কোনই অবকাশ নেই। তবে তাদের মধ্যে মুজিবপ্রীতি ছিল, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কিংবা আদর্শবোধ ছিল না। এ ধরণের লোকসংখ্যাই ছিল অধিক। মুক্তিযুদ্ধের পরে অন্ধ আবেগের বশে বিভিন্নভাবে বাড়াবাড়ি করেছে এবং আজ পর্যন্ত করে চলেছে।

(৩) অস্থানীয় শোষকের স্থানটি যে স্থানীয় শোষক ও সম্পদলোভীদের দ্বারা অতি দ্রুত পূরণ হয়ে যাবে এ বিষয়টি সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের জ্ঞান বা বোধশক্তির বাইরেই ছিল। এ সত্যটি কেবল তারা তখনই অনুধাবন করল, যখন সদ্য স্বাধীন দেশে প্রত্যাবর্তন করে সরাসরি প্রত্যক্ষ করল শাসক আওয়ামী লীগ ও তাদের অন্যান্য অঙ্গ সংগঠনগুলোর মধ্যে ক্ষমতা এবং সম্পদ ভাগাভাগি এবং লুটপাটের দৃশ্য ও মহড়া। অপরদিকে মুক্তিযুদ্ধের সেই সুনির্দিষ্ট চেতনায় যারা সমৃদ্ধ ছিল, তারা যুদ্ধ চলাকালীন অবস্থায়ই উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছিল আওয়ামী লীগের আচার আচরণ দেশে ফিরে কি হবে। মুক্তিযুদ্ধের জনক হিসাবে পরিচিত মরহুম জনাব মুজিব মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সম্পর্কে অবগত থাকলেও সেই চেতনায় তিনি পরিপূর্ণভাবে বিশ্বাসী ছিলেন না বলেই ক্ষমতালাভের পরে তার মধ্যে পরিলক্ষিত হয়েছে মারাত্মক দ্বন্দ্ব এবং অস্থিরতা, যার ফলে তিনি কখনো হয়েছেন রাষ্ট্রপতি আবার কখনো বা দায়িত্ব নিয়েছেন প্রধান মন্ত্রীত্বের। আওয়ামী শীর্ষস্থানীয় নেতৃত্বের মধ্যেও তদ্রুপ পরিলক্ষিত হয়েছে দোদুল্যমানতা এবং সীমাহীন ক্ষমতা লাভের মোহ। তারা সকলেই কেবল ক্ষমতার সখ মিটিয়েছে কারণ মুক্তিযুদ্ধ তাদের কাছে ছিল কেবল ক্ষমতা লাভের হাতিয়ার মাত্র, চেতনার উৎস নয়।

(৪) কমান্ডার মুখার্জী অত্যন্ত সুহৃদ বাঙালী অফিসার। তিনি আমাকে লেঃ জেনারেল জগজিৎ শিং অরোরার কাছে নিয়ে গেলেন। তিনি আমাকে প্রথম সাক্ষাতেই সম্পূর্ণভাবে বিশ্বাস করতে পারলেন না। সাক্ষী প্রমাণ দাবী করলেন আমার। তখনই আমাকে সদ্য ঘোষিত স্বাধীন বাংলা সরকারের প্রধানমন্ত্রী জনাব তাজউদ্দিন এবং সর্বাধিনায়ক কর্ণেল ওসমানী সাহেবের নাম নিতে হয়েছে। উত্তরে জেনারেল ওরোরা সাহেব আমাদের নেতৃবৃন্দ সম্পর্কে যা বাজে মন্তব্য করলেন, তা কেবল মুখেই সদা উচ্চারিত হয়ে থাকে। সোজা ভাষায় তার উত্তর ছিল “ঐ দুটি ব্লাডি ইঁদুরের কথা আমি জানি না, ওদের কোন মূল্য নেই আমার কাছে। অন্য কোন সাক্ষী থাকলে আমাকে বল”। আমার দ্রুত মুক্তি ও মুক্তিযুদ্ধের জন্য অস্ত্র সংগ্রহ করার লক্ষ্যকে সামনে রেখেই আমি পাকিস্তান সেনাবাহিনী সম্পর্কে কিছুটা তথ্য প্রদান করি।

(৫) কলকাতার বালিগঞ্জের আবাসিক এলাকার একটি দ্বিতল বাড়ীতে বসে প্রধানমন্ত্রী তার মন্ত্রীসভা সহকারে (খন্দকার মোশতাক বাদে) নিরাপদে তাস খেলছিলেন দেখে আমি সে মুহূর্তে কেবল বিস্মিতই হইনি, মনে মনে বলছিলাম ‘ধরণী দ্বিধা হও’। ধরণী সেদিন দ্বিধা না হলেও আমি কিন্তু সেদিন থেকেই আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের প্রতি চরমভাবে আস্থাহীন এবং বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছি। যে জাতির নির্বাচিত প্রতিনিধিবৃন্দ জনগণকে যুদ্ধের লেলিহান শিখার মধ্যে নিক্ষেপ করে কোন নিরাপদ আশ্রয়ে বসে বেকার, অলস যুবকদের মত তাস খেলায় মত্ত হতে পারে, সে জাতির দুর্ভাগ্য সহজে মোচন হবার নয়। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের আচরণে এ ধরণের ভুরি ভুরি নমুনা রয়েছে। যুদ্ধকালীন অবস্থায় আরাম আয়েশী জীবনধারা কোলকাতাবাসীদেরকে করেছে হতবাক।

(৬) ভারতীয় কর্তৃপক্ষ মুক্তিযোদ্ধাদেরকে অস্ত্র সরবরাহ করার আগ্রহ প্রদর্শন যা করেছে তার তুলনায় অধিকতর উৎসাহ এবং আগ্রহ প্রদর্শন করেছে তথ্য সংগ্রহ করার ব্যাপারে। বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে অস্ত্র প্রদান নয়, পাকিস্তান সেনাবাহিনী এবং বাংলাদেশ সম্পর্কে জরুরী তথ্য সংগ্রহই ছিল যেন ভারতীয় কর্তৃপক্ষের মূল উদ্দেশ্য। একাত্তরের সেই গভীর বর্ষারত দিনরাতে কোলকাতার অভিজাত রেষ্টুরেন্টগুলোতে বসে গরম কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে হাটু তক কাদাজলে ডুবন্ত মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং শিবিরগুলোতে অবস্থানরত হাজার হাজার তরুণের বেদনাহত চেহারাগুলো তারা একবারও দেখেছে কিনা তা আজো আমার জানতে ইচ্ছা করে।

(৭) মুক্তিযোদ্ধা এবং শরণার্থীদের নামে আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ ভারতের বিভিন্ন সম্পদশালী ব্যক্তি, গোষ্ঠী এবং সংস্থাসমূহ থেকে প্রচুর পরিমাণে অর্থ সম্পদ মালামাল সংগ্রহ করেছেন একথা সকলেরই জানা। কিন্তু সংগৃহীত সাহায্যের যৎকিঞ্চিত ব্যতীত আর কিছুই পৌছেনি মুক্তিযোদ্ধা কিংবা শরণার্থী শিবিরে। সে সংগৃহীত অর্থে ভারতের বিভিন্ন ব্যাংকে আওয়ামী লীগ নেতাদের নামে বেনামে মোটা অংক যে জমা হয়েছিল তার ইতিহাস ভারতীয় কংগ্রেস নেতৃত্বের মোটেও অজানা নয়। — তারাই যখন আবার মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দাবী করেন, তখন ইতিহাস হয়ত বা মুচকি হেসে প্রচন্ড কৌতুক বোধ করে বলে আমার বিশ্বাস। — হানাদার পাক বাহিনীর সুযোগ্য উত্তরসুরী তো একমাত্র তারাই আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ।

(৮) ভারত সত্যি সত্যিই বিশস্ত বন্ধু। তা না হলে আওয়ামী লীগ নেতাদের এতো কুকর্মের খতিয়ান, দোষ ত্রুটি, আয়েবের খবর জেনেও আজ পর্যন্ত সামান্যতম প্রকাশ করেনি এবং সাধ্যমত গোপন রখেই যাচ্ছে – এটা একেবারে কম কথা নয়। নভেম্বরে ভারতীয় সেনাবাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং শিবিরগুলোর দায়িত্ব সরাসরি নিতে চেষ্টা করে। আমার সেক্টরে ততটা সুবিধে করতে না পারলেও কর্তৃপক্ষ ভারতীয় সেনাবাহিনীর অফিসার নিয়োগ করেছিল। ট্রেনিং শিবিরের অস্ত্রগুলোও প্রত্যাহার করে নেয়ার নির্দেশ প্রদান করে। তখনই শুরু হয় বাকবিতন্ডা এবং সম্পর্কের অবনতি ঘটতে আরম্ভ করে। আমি ভারতীয় কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অমান্য করেই অধিকাংশ অস্ত্র বারুদ ক্যাপ্টেন জিয়াউদ্দিন নৌ কমান্ডো নূর মোহাম্মদ বাবুল, ক্যাপ্টেন শাহজাহান ওমর, নৌ কমান্ডার বেগের হাতে তুলে দেই এবং তাদেরকে ভারতীয় ষড়যন্ত্র সম্পর্কেও সজাগ করে দেই।

(৯) বাঙালীর স্বার্থ ছিল ভারতের কাছ থেকে অস্ত্র নিয়ে দেশ মুক্ত করা আর ভারতের স্বার্থ ছিল দেশ মুক্ত করার নামে তার চিহ্নিত শত্রু পাকিস্তানকে দ্বিখন্ডিত করার মধ্য দিয়ে শত্রুপক্ষকে স্থায়ীভাবে দুর্বল করে রাখা এবং মুক্ত বাংলাদেশের উপর প্রাথমিকভাবে খবরদারী করে পরবর্তীতে সময় ও সুযোগমত ভারতের সাথে একীভূত করে নেয়া। এটাকে শুধু কেবল তাদের নিছক স্বার্থ হিসাবে চিহ্নিত করলে ভুল হবে, বরং এটা ছিল তাদের দীর্ঘ দিনের স্বপ্ন।

(১০) যে জাতির নির্বাচিত প্রতিনিধিবৃন্দ জনগণকে যুদ্ধের লেলিহান শিখার মধ্যে নিক্ষেপ করে কোন নিরাপদ আশ্রয়ে বসে বেকার, অলস যুবকদের মত তাস খেলায় মত্ত হতে পারে, সে জাতির দুর্ভাগ্য সহজে মোচন হবার নয়। যুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের আচরণে এ ধরণের ভুরি ভুরি নমুনা রয়েছে। যুদ্ধকালীন অবস্থায় আরাম আয়েশী জীবনধারা কোলকাতাবাসীদেরকে করেছে হতবাক। ভারতে অবস্থানকালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের অনেক কিছুই জানতে চেয়েছিলেন স্বনামধন্য সাহিত্যিক এবং চিত্র নির্মাতা কাজী জহির রায়হান। তিনি জেনেছিলেন অনেক কিছু, চিত্রায়িতও করেছিলেন অনেক দুর্লভ দৃশ্যের। কিন্তু অতোসব জানতে বুঝতে গিয়ে তিনি বেজায় অপরাধ করে ফেলেছিলেন। স্বাধীনতার উষালগ্নেই তাকে সেই অনেক কিছু জানার অপরাধেই প্রাণ দিতে হয়েছে বলে সকলের ধারণা।

(১১) আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার ৩ নম্বর আসামী স্টুয়ার্ড মুজীবেরও ঘটেছিল এই পরিণতি। এই দায়িত্বশীল, নিষ্ঠাবান, তেজোদীপ্ত যুবক স্টুয়ার্ড মুজীব আমার ৯ নম্বর সেক্টরের অধীনে এবং পরে ৮ নং সেক্টরে যুদ্ধ করেছে। তার মত নির্ভেজাল করিতকর্মা একজন দেশপ্রেমিক যোদ্ধা সত্যিই বিরল। প্রচন্ড সাহস ও বীরত্বের অধিকারী স্টুয়ার্ড মুজীব ছিল শেখ মুজীবের অত্যন্ত প্রিয় অন্ধভক্ত। — তাকে দেখেছি বিদ্যুতের মত এক প্রান্ত থেকে অপরপ্রান্তে ছুটাছুটি করতে। কি করে মুক্তিযুদ্ধকে ত্বরান্বিত করা যায়। — মুজীব ভারতে অবস্থিত আওয়ামী নেতার অনেক কুকীর্তি সম্পর্কেই ছিল ওয়াকেফহাল। এতবড় স্পর্ধা কি করে সইবে স্বার্থান্বেষী মহল। তাই স্বাধীনতার মাত্র সপ্তাহ খানিকের মধ্যেই ঢাকা নগরীর গুলিস্তান চত্বর থেকে হ্যাইজ্যাক হয়ে যায় স্টুয়ার্ড মুজীব। এভাবেই হারিয়ে যায় বাংলার আর একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র।

(১২) ভারত মুক্তিযুদ্ধে সকল অস্ত্র দিয়েছে এ কথা সত্য নয়। প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের অর্থেও প্রচুর অস্ত্র ক্রয় করা হয়েছিল। সে অস্ত্র সম্পদ মুক্তিযুদ্ধেরই সম্পদ ছিল। মুক্তিযুদ্ধের সম্পদ ভারতীয় সেনাবাহিনীর হস্তে সমর্পন করার কোনই যুক্তি ছিল না। দুর্বল আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের অসহায় আত্মসমর্পণই ভারতীয় চক্রকে তাদের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়ন করার সুবর্ণ সুযোগ এনে দেয়।

(১৩) মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক কর্র্ণেল ওসমানীর কাছে পাকিস্তানের পরাজিত জেনারেল নিয়াজী আত্মসমর্পণ করলেন না কেন? আত্মসমর্পণের সময় কর্ণেল ওসমানী অনুপন্থিত ছিলেন কেন? আত্মসমর্পণের বেশ কয়েকদিন পরে কর্ণেল ওসমানী ঢাকায় এলেন কেন? এ সময়কাল তিনি কোথায় ক্ষেপন করেছেন? তিনি কি তাহলে সত্যিই কলকাতায় বন্দী ছিলেন? আজো বাংলাদেশের জনমনে নানান প্রশ্নের ভীড় জমছে। এসব প্রশ্নের উত্তর দেশবাসী আওয়ামী লীগের কাছ থেকে প্রত্যাশা করছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব ও ভারতে অবস্থানরত প্রবাসী আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব এ সকল প্রশ্নের জবাব দেয়ার আজ পর্যন্ত কোন তাগিদই বোধ করেনি। মুক্তিযুদ্ধের দীর্ঘ ন’টি মাসের অসীম ত্যাগ তিতিক্ষা এবং আত্মাহুতির মধ্য দিয়ে রচিত বিজয় পর্ব এভাবেই ভারতীয় শাসক চক্র দ্বারা লুন্ঠিত হয়ে যায়। সংগ্রামী, লড়াকু বাঙালী জাতি প্রাণপণ যুদ্ধ করেও যেন বিজয়ী হতে পারল না, পারল কেবল অপরের করুণার বিজয় বোধ দূর থেকে অনুভব করতে। বিজয়ের সরাসরি স্বাদ থেকে কেবল বাঙালী জাতি বঞ্চিত হলো না, বঞ্চিত হলো প্রকৃত স্বাধীনতা থেকেই। সুতরাং সেই বঞ্চনাকারীদের কবল থেকে বঞ্চিতদের ন্যায্য পাওনা আদায় করার লক্ষ্যে আর একটি প্রকৃত মুক্তিযুদ্ধের প্রয়োজন কি এখনও রয়ে যায় নি?

বাংলাদেশে ভারতীয় বাহিনীর পরিকল্পিত লুন্ঠন:

(১৪) ভারতের  সম্প্রসারণবাদী প্রতিক্রিয়াশীল শাসক গোষ্ঠী মুক্তিযুদ্ধের শেষপর্বে সমগ্র মুক্তিযোদ্ধার ভয়ে ভীত হয়েই বাঙালীর স্বাধীনতার গৌরবকে জবরদখলের মধ্য দিয়ে নিজেদের হীন স্বার্থ উদ্ধার করেছে মাত্র। — দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধারা ১৬ই ডিসেম্বরের পরে মিত্র বাহিনী হিসাবে পরিচিত ভারতীয় সেনাবাহিনীকে নব্য স্বাধীন বাংলাদেশের বিভিন্ন সম্পদ মালামাল লুন্ঠন করতে দেখেছে। সে লুন্ঠন ছিল পরিকল্পিত লুন্ঠন সৈন্যদের স্বতস্ফুর্ত উল্লাসের বহিঃপ্রকাশ স্বরুপ নয়। সে লুন্ঠনের চেহারা ছিল বিভৎস – বেপোরোয়া।

(১৫) মুক্তিযুদ্ধের নবম সেক্টরের অধিপতি হিসাবে আমি সেই মটিভেটেড লুন্ঠনের তীব্র বিরোধীতা করেছি। সক্রিয় প্রতিরোধও গড়ে তুলতে চেষ্টা করেছি। লিখিতভাবেও এই লুন্ঠনের প্রতিবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী জনাব তাজউদ্দিন, কর্ণেল ওসমানী এবং ভারতীয় পূর্ব অঞ্চলের সর্বাধিনায়ক লেঃ অরোরার কাছে জরুরী চিঠিও পাঠিয়েছি। তাজউদ্দিন সাহেবের পাবলিক রিলেশন অফিসার জনাব আলী তারেকই আমার সেই চিঠি বহন করে কলকাতায় নিয়েছিলেন। ১৭ই ডিসেম্বর রাতেই সেই বিশেষ চিঠিখানা পাঠানো হয়েছিল। খুলনা শহরে লুটপাটের যে তান্ডব নৃত্য চলছে তা তখন কে না দেখেছে। ভারতীয় সেনাবাহিনী কর্তৃক সেই লুটপাটের খবর চারদিক থেকে আসা শুরু করে। পাকিস্তান বাহিনী কর্তৃক পরিত্যক্ত কয়েক হাজার সামরিক বেসামরিক গাড়ী, অস্ত্র, গোলাবারুদসহ আরো অনেক মূল্যবান জিনিসপত্র ট্রাক বোঝাই করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। প্রাইভেট কার পর্যন্ত যখন রক্ষা পায় নি তখনই কেবল আমি খুলনা শহরে প্রাইভেট গাড়ীগুলো রিকুইজিশন করে খুলনা সারকিট হাউস ময়দানে হেফাজতে রাখার চেষ্টা করি। এর পূর্বে যেখানে যে গাড়ী পেয়েছে সেটাকেই পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে সীমান্তের ওপারে।

(১৬) যশোহর সেনানিবাসের প্রত্যেকটি অফিস এবং কোয়ার্টার তন্ন তন্ন করে লুট করেছে। বাথরুমের মিরর এবং অন্যান্য ফিটিংসগুলো পর্যন্ত সেই লুটতরাজ থেকে রেহাই পায়নি। রেহাই পায়নি নিরীহ পথযাত্রীরা। কথিত মিত্র বাহিনীর এই ধরণের আচরণ জনগণকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে তুলেছিল।

(১৭) ভারতীয় বাহিনীর আচরণে আমি বিক্ষুব্ধই হয়ে উঠিনি বরং তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করার পর্যায়ে চলে গেলাম। খুলনার নিউজপ্রিন্ট মিলের রেষ্ট হাউজে অবস্থানরত আমার প্রতিপক্ষ ভারতীয় সেনাবাহিনীর অধিনায়ক মেজর জেনারেল দানবীর সিংকে আমি সতর্ক করে দিয়ে বললাম – দেখা মাত্র গুলির হুকুম দিয়েছি আমি। ভারতীয় সেনাবাহিনীকে লুটতরাজ করা হতে বিরত রাখুন।

(১৮) খুলনা পরিত্যাগ করতে হলে নাকি ভারতীয় সেনাবাহিনী কমান্ডোর হুকুম নিতে হবে এ কথা শোনার পরে ভারতের আসল মতলবখানা আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে উঠল। আমি সেক্টর কমান্ডার হিসাবে ভারতীয় নির্দেশ মেনে চলতে মোটেও বাধ্য ছিলাম না। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ব্যুহ্য ভেঙ্গে দেশ মুক্ত করলাম “ভারতীয় সেনাবাহিনীর নির্দেশ মেনে চলার জন্য নয়। একটি মুক্তিপিপাসু জাতির ভাবাবেগ অনুধাবন করতে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ কেবল চরমভাবে ব্যর্থই হয়নি, বরং অনুধাবন করার সামান্যতম ধৈর্যও প্রদর্শন করেনি তারা।

(১৯) ভারতীয় বাহিনীর এই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধেও আমি  জনসভাগুলোকে সোচ্চার হয়ে উঠলাম। আমার পরিষ্কার নির্দেশ ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে বন্দী স্বাধীন বাংলার স্থপতি জনগণের প্রাণপ্রিয় নেতা শেখ মুজীবুর রহমানকে মুক্ত না করা পর্যন্ত বাঙালী জনগণের মুক্তিযুদ্ধ চলতে থাকবে। শেখ মুজীবের হস্তেই কেবল মুক্তিযোদ্ধারা তাদের অস্ত্র সমর্পণ করে দেবে।

(২০) আমারই সাধের স্বাধীন বাংলায় আমিই হলাম প্রথম রাজবন্দী। ৩১শে ডিসেম্বর বেলা ১০টা সাড়ে দশটায় আক্রমণকারী বাহিনীর হাতে বন্দী হয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার আসল রুপের প্রথম দৃশ্য দেখলাম আমি। ভারতীয় সৈন্যবাহিনীর মদদে বাংলাদেশ স্বাধীন করার অর্থ এবং তাৎপর্য বুঝে উঠতে আমার তখন আর এক মিনিটও বিলম্ব হয়নি।

(২১) রাত ১২টা ১ মিনিটে যশোর সেনা ছাউনি নতুন বছরের উজ্জীবনী গীতিতে মুখর হয়ে উঠল। নারী-পুরুষের যৌথ কন্ঠের মন মাতানো সঙ্গীত নাচ, হাত তালি ঘুঙুরের ঝনঝনানি, উল্লাস, উন্মাদনা সবই ভেসে আসছিল কর্ণকুহরে। আমার মাটিতে প্রথম নববর্ষেই আমি অনুপস্থিত। — রাতের ঘুটঘুটে সেই অন্ধকারে আমি সেদিন কম্বল জড়িয়েও ঘেমে উঠেছিলাম, শিহরিয়ে উঠেছিলাম পুনঃপুনঃ। স্বাধীনতার সতেরো বছর পরেও আমি নিশ্চিত হতে পারছি না। অন্ধকারে আজো আমি একইভাবে শিহরে উঠি আর যেন শুনতে পাই – “রক্ত দিয়ে এই স্বাধীনতা আনলে তোমরা”!

স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী শক্তি ও ইসলাম:

(২১) আওয়ামী লীগের ৬ দফাকে আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব কখনো স্বাধীনতার আন্দোলন হিসাবে সচেতনভাবে মনে করেনি, কিন্তু দেশের সংগ্রামমুখর জনগণ ৬ দফার আন্দোলনকে এক দফার আন্দোলন হিসাবেই যে গণ্য করত, একথা সত্য। জনগণের কাছে স্বায়ত্বশাসনের দাবীটি স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করার দাবী হিসাবেই বিবেচিত হয়েছে।

(২২) মরহুম জননেতা জনাব আব্দুল হামিদ খান ভাসানী পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠীর ষড়যন্ত্র আগেভাগেই উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছিলেন বলেই ১লা মার্চ তারিখেই তার পল্টন ময়দানের জনসভায় জনগণের কাছে ১ দফা ঘোষনা করেছিলেন। সেই জনসভায় ‘বীর বাঙালী অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর’ এই শ্লোগানটিই প্রাধান্য লাভ করেছিল।

(২৩) মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক, সামাজিক শক্তিসমূহ এবং সংগ্রামী জনগণ উক্ত চেতনা সম্পর্কে মোটেই ওয়াকিফহাল ছিল না। তথাকথিত মুক্তিযুদ্ধের চেতনা লালন করার জন্য সক্রিয় উদ্যোগ কিংবা প্রতিক্রিয়া মুক্তিযুদ্ধের সময়ে ছিল না বলে মুষ্টিমেয় লোকের চেতনাকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হিসাবে পরিচিত এবং গ্রহণ করানোর সকল প্রয়াসই আজ নিস্ফল রুপ ধারণ করেছে। সঠিক এবং আদর্শিক চেতনাহীন ৭১এর যুদ্ধটিই প্রকৃত মুক্তিযুদ্ধের রুপ না নিলেও এটি যে নিঃসন্দেহে জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধের রুপ ধারণ করেছিল এ বিষয়টি দিবলোকের মতই উজ্জ্বল।

(২৪) বিশেষ করে বাংলাদেশের ব্যাপারে প্রতিবেশী দেশ ভারতের হস্তক্ষেপ করাকে তারা স্বাধীনতা নয়, গোলামীরই নতুন এক রুপ হিসাবে বিবেচনা করত। স্বাধীনতা যুদ্ধ বিরোধী বলে যারা পরিচিত তারা সকলেই কমবেশী ভারত বিরোধী হিসাবেই অধিক পরিচিত। এদের ভারত বিদ্বেষী মনোভাব কোন নতুন উপাদান নয়। ভারত বিভক্তির অনেক পূর্ব থেকেই ‘অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস’ এবং ‘মুসলিম লীগ’ এর মধ্যকার তীব্র দ্বন্দ্বের কারণেই ঐ বিদ্বেষ এর বীজ অঙ্কুরিত হতে থাকে।

(২৫) বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সেই বিদ্বেষেরই একটি নতুন বিস্ফোরণ একটি নব সংস্করণ। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে শুরু থেকেই ভারতীয় হস্তক্ষেপ বিদ্যমান ছিল এই সন্দেহে ভারত বিদ্বেষী রাজনৈতিক দলগুলো তাই মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাধারণ মুক্তিযোদ্ধারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ না হয়েও যুদ্ধ করেছে এই লক্ষ্যে ‘যে কোন মূল্যে দেশ স্বাধীন করতে হবে’। যে কোন মূল্যে অর্জিত স্বাধীনতা যে নিজেদের ভোগের বাইরে চলে যেতে পারে এ ধারণা মুক্তিযোদ্ধাদের ছিল না। প্রতিক্রিয়াশীল চক্রের সাহায্য ও সহযোগিতা স্বাধীনতার রুপ ও স্বাদ পাল্টে দেয়, স্বাধীনতা বিনষ্টও করে দেয় এ সচেতনতা সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের ছিল না।

(২৬) আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব এবং ভারতীয় চক্রের মধ্যকার ষড়যন্ত্র সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের জানারও কথা ছিল না। তারা হানাদার বাহিনীকে অত্যাচার করতে দেখেছে, অত্যাচারিত হয়েছে বলে আত্মরক্ষার্থে রুখে দাঁড়াতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে শামিল হয়ে পড়েছে।

(২৭) বাঙালী হয়ে যারা বাঙালীর ঘরে আগুন দিয়েছে, বাঙালী মা বোনদের উপর পাশবিক নির্যাতনে শরীক হয়েছে, অহেতুক হত্যাকান্ড চালিয়েছে তারা যে পক্ষেরই হোক না কেন মানবিক দিক থেকে তারা অপরাধী। অপরাধীদের কোন পক্ষ নেই। অপরাধীদের অবস্থান যেখানেই হোক না কেন, তাদের একমাত্র পরিচয়ই হচ্ছে তারা অপরাধী। অপরাধের বিচার কাম্য- এটা নৈতিক সামাজিক, মানবিক এবং প্রচলিত আইন প্রশাসনেরই দাবী। কোন অপরাধের বিনা বিচারে ক্ষমা প্রদর্শন একটি ক্ষমাহীন অপরাধই বটে। — তাই স্বাধীনতার ১৭ বছর পরেও স্বাধীনতা আজো তেতো, মুক্তিযুদ্ধ আজ বিকৃত এবং বিস্মৃতপ্রায়।

(২৮) দীর্ঘ ৯টি মাস ধরে হানাদার পাকবাহিনী বাংলাদেশের বুকে অবলীলাক্রমে গণহত্যা চালিয়ে ইতিহাসের পাতায় এক জঘন্য অধ্যায় সৃষ্টি করল, তাদেরকে ভারতীয় সেনাবাহিনী কিসের স্বার্থে উদ্ধার করে নিয়ে গেল ভারতে? সেই সকল গণদস্যুদেরকে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে হস্তান্তর করা হল না কেন? যারা মুক্তিযুদ্ধের মৈত্রী বাহিনী হিসাবে বাংলাদেশের দরদী সেজে বাঙালীদেরেকে উদ্ধার করতে এলো তারাই বাঙালীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়া পাকিস্তানী হত্যাকারী বাহিনীকে নিরাপদ আশ্রয়ে উদ্ধার করে নিয়ে বাঙালী প্রেমের পরিচয় দিয়েছে না পাঞ্জাবী প্রেমের পরিচয় দিয়েছে? মুক্তিযুদ্ধের মৈত্রী বাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যাকারীদের প্রতি অতটা দরদী হয়ে উঠার পেছনে কারণটা কি ছিল?

(২৯) একজন সেক্টর কমান্ডার হিসাবে আমি মনে করি মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী পক্ষের বিরুদ্ধে ঢালাও অভিযোগ আনার চেষ্টা না করে যাদের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে, তাদের অবশ্যই বিচার হওয়া প্রয়োজন।

(৩০) ইসলাম অপরাধমুক্ত সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে। ইসলাম শোষণহীন, সাম্যবাদ সমাজ কায়েম করে। ইসলাম পূঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ, আধিপত্যবাদ, বর্ণবৈষম্যবাদ, রাজতন্ত্রসহ সকল ধরণের স্বৈরশাসনের ঘোর বিরোধী। ইসলাম মুক্তি এবং শান্তির এক বিপ্লবী ঘোষনা। স্বাভাবকি কারণেই ইসলাম মুক্তিযুদ্ধ চেতনার পক্ষের শক্তি।

(৩১) আল্লাহ একমাত্র প্রভু এ ঘোষনার মধ্য দিয়ে ইসলাম মূলত মানুষকে স্বাধীন করে দিয়েছে। — এমন একটি জীবন দর্শন যা চূড়ান্ত অর্থেই পরিপূর্ণ, সেই ইসলাম সম্পর্কে যারা অসহিষ্ণু মনোভাব প্রদর্শন করে, তা তারা অজ্ঞতাবশতই করে বলে আমার বিশ্বাস।

(৩২) মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তীকালে ইসলাম এলার্জি শিক্ষিত সমাজের মধ্যে একটি মানসিক ব্যাধির ন্যায় বিরাজ করছে। — স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনতে যারা তথাকথিক ধর্মনিরপেক্ষতার ভুত মাথায় বহন করে এনেছে তারা যেমন ভুল করেছে, ঠিক তেমনি ভুল করেছে স্বাধীনতার বিপক্ষের শক্তিসমূহ, যারা ইসলামকে যে কোন মূল্যে রক্ষা করতে গিয়ে স্বাধীনতাকেই অস্বীকার করে বসেছে।

(৩৩) তাই মুসলিম প্রধান বাংলাদেশের জনগণের স্বাধীনতার প্রকৃত রুপ হতে হবে সাম্রাজ্যবাদ, আধিপত্যবাদ, বর্ণবৈষম্যবাদ, রাজতন্ত্র এবং স্বৈরতন্ত্রমুক্ত ইসলাম।

(৩৪) ইসলাম ভিন্ন বাংলাদেশে বসবাসরত অন্যান্য ধর্মাবলম্বী শতকরা ১০ভাগ মানুষও ধর্মভীরু এবং তারাও ধর্ম সহকারেই স্বাধীনতা এবং মুক্তি কামনা করে। প্রকৃত ইসলামের সাম্যবাদী নীতি এবং ইসলামের ঐতিহ্যবাহী নৈতিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধের সাথে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের কোন বিরোধ তো নেই-ই বরং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের প্রশ্রয় দান ইসলাম তো করেই, অন্যান্য ধর্ম মতেও তদ্রুপ।

(৩৫) বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ মানুষের স্বাধীনতা অর্জনের যুদ্ধ ছিল। ধর্মযুদ্ধ ছিল না। সুতরাং যুদ্ধোত্তরকালে ধর্মের প্রতি উষ্মা কিম্বা কটাক্ষ করার কোন যুক্তিই নেই, থাকতে পারে না। তবুও রয়েছে কেন?

আওয়ামী লীগের চার রাষ্ট্রীয় নীতির ঊৎস:

(৩৬) ৭০এর নির্বাচন অনুষ্টিত হল ৬ দফার ভিত্তিতে। এই ৬ দফার মধ্যে আওয়ামী লীগ গৃহীত ৪ রাষ্ট্রীয় মূলনীতির একটিরও উল্লেখ ছিল না। তাছাড়া নির্বাচনী ইশতেহারে আওয়ামী লীগ আরো উল্লেখ করেছিল যে, তারা ইসলাম ধর্ম বিরোধী কোন আইন কানুনও পাস করবে না। কিন্তু আওয়ামী লীগ ৭২ সনের জানুয়ারীতে ক্ষমতাসীন হওয়ার সাথে সাথেই ইসলামের বিরুদ্ধে অপপ্রচার শুরু করে দেয় এবং গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং জাতীয়তাবাদ নামে রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতি নির্ধারণ করে, যা পরবর্তীতে ’৭২এর রাষ্ট্রীয় সংবিধানেও সন্নিবেশিত করা হয়। এই চার নীতির মূল উৎস কোথায়? কেনই বা উক্ত চার নীতিকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসাবে ঘোষনা করা হলো? এ প্রশ্নগুলোর জবাব জনগণ আজো পায়নি।

(৩৭) দেশের জনগণের কোনরুপ তোয়াক্কা না করেই রাষ্ট্রীয় মূলনীতির মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব জনগণের উপর জবরদস্তিভাবেই চাপিয়ে দিল।

(৩৮) ’৭০এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নির্বোচিত সংসদ সদস্যরা জনগণের ম্যান্ডেট লাভ করেছিল পাকিস্তানের অধীনে। নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশের অধীনে নয়। সুতরাং ’৭২এর  আওয়ামী লীগ কর্তৃক সংবিধান প্রদান নীতিগত দিক দিয়ে মোটেও বৈধ ছিল না। সমগ্র জনগণের স্বতঃস্ফুর্ত অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত হয়। এখানে আরো উল্লেখযোগ্য যে, ’৭০ এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের স্বপক্ষে যারা ভোট প্রদান করেনি, তারাও দেশ মাতৃকার মুক্তির লড়াইএ শরীক হয়েছেন।

(৩৯) কিন্তু যুদ্ধোত্তরকালে আওয়ামী লীগ চরম সংকীর্ণতার পরিচয় দেয় এবং মুক্তিযুদ্ধের জাতীয় রুপকে দলীয় রুপ প্রদানের জন্য বিভিন্নমুখী ষড়যন্ত্রের আশ্রয় নেয়। যার ফলে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী আওয়ামী লীগ বহির্ভুত সকল শক্তি হতোদ্যম হয়ে পড়ে এবং তারা তাদের নবতর আশা আকাংখার বাস্তবায়ন করার সুযোগ থেকে প্রায় সম্পূর্ণভাবেই বঞ্চিত হয়।

(৪০) যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে যখন জাতীয় ঐক্যের সর্বাধিক প্রয়োজন ছিল, ঠিক সেই সময়েই আওয়ামী লীগ একলা চলার নীতি অনুসরণ করার মধ্য দিয়ে জনমত এবং জনগণের আশা আকাঙ্খা পদদলিত করে চলতে থাকে। এসব কারণে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তায় রাতারাতি ভাটা দেখা দেয়। আওয়ামী লীগের যুদ্ধকালীন দুর্নীতি এবং ব্যর্থতা  এবং যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে জনগণের উপর স্বৈরতান্ত্রিক নির্যাতন জনগণ থেকে আওয়ামী লীগকে বিচ্ছিন্ন করার  উপসর্গ সৃষ্টি করে।

(৪১) বস্তুত সেই ভয়ে ভীত আওয়ামী লীগ ’৭২ এ জনগণের ম্যান্ডেট নেয়ার চিন্তা থেকে বিরত থাকে। অথচ সংবিধান রচনার পূর্বেই জনগণের তরফ থেকে নতুন ম্যান্ডেট লাভ করা ছিল অত্যাবশ্যকীয়। অতএব, এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, ’৭২এ আওয়ামী লীগের এমন কোন বৈধ অধিকার ছিল না যাতে করে তারা দেশ ও জাতির উপর একটি মনগড়া সংবিধান আরোপ করতে পারে। তবুও তারা তা জবরদস্তি করেছে। দেশের জনগণের চিৎকার প্রতিবাদ কোন কাজেই আসেনি।

(৪২) এভাবেই যুদ্ধোত্তর বিধ্বস্ত বাংলাদেশের কোটি কোটি বুভুক্ষ মানুষের জন্য অন্নবস্ত্রের পূর্বেই রাষ্ট্রীয় মূলনীতি এসে মাথায় চেপে বসে। এই ৪ মূলনীীত আরোপ করার মধ্য দিয়ে দিল্লীর কর্তারা তাদের মূল লক্ষ্যই স্থির রেখেছে কেবল।

(৪৩) এই হিন্দু ভারত হিন্দু ধর্মের জাত-শ্রেণীভেদের বিপরীতে ইসলামী সাম্যবাদকে যমের মতই ভয় পায়। — ইসলামের সাম্যবাদ নীতি ভারতের নির্ধারিত মানব গোষ্ঠীকে আকস্মিকভাবেই ইসলামের পতাকাতলে সমবেত করতে পারে। বাংলাদেশের ১১ কোটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে ১০ কোটিই হচ্ছে ইসলাম ধর্মের অনুসারী।

(৪৪) বাংলাদেশে বিস্ময়কর শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের দৃষ্টান্ত বিদ্যমান। বাংলাদেশের মাটিতে সাম্প্রদায়িকতা নেই বলেই অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরা কখনই নির্যাতিত কিম্বা সামাজিকভাবে সংকটাপন্নও হচ্ছে না। তেমন একটা কিছু হলেও না হয় আধিপত্যবাদী ভারতীয় চক্র বাংলাদেশের উপর সরাসরি কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার একটা সুযোগ লাভ করত।

(৪৫) বাংলাদেশের উপরে সাংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হলে সামরিক কর্তৃত্ব স্থাপনের তেমন কোন প্রয়োজন পড়বে না। — ধীরে ধীরে ধর্মীয় অনুশাসনের অনুপস্থিতি তরুণ যুবক শ্রেণীকে বেপোরোয়া আরাম আয়েশে ভোগপূর্ণ উচ্ছৃংখল জীবন পদ্ধতির দিকে ঠেলে দিলেই তারা হয়ে পড়বে শিকড়হীন পরগাছার মতন।

(৪৬) ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ ধর্মহীনতারই লেবাস নাম। — মুসলিম তরুণ যুব গোষ্ঠী এই নাস্তিক্যবাদী তত্ত্বে প্রভাবিত হলে তারা স্বেচ্ছায়ই ইসলাম বিদ্বেষী হয়ে উঠবে এবং তাহলেই ভারতীয় শাসকচক্রের গোপন স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়ে যায়। – অর্থাৎ বাংলাদেশের উপর ভারতীয় সাংস্কৃতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ধর্মনিরপেক্ষতাবাদই হচ্ছে ইসমলামের বিরুদ্ধে একটি সুকৌশল ঠান্ডা যুদ্ধ।

(৪৭) স্বাধীন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক চেতনার উৎস হচ্ছে ‘তৌহিদবাদ’, যা ইসলাম ধর্ম ভিত্তিক। অপরদিকে পশ্চিম বাংলার জনগণের সাংস্কৃতিক চেতনার উৎস হচ্ছে ‘পৌত্তলিকতাবাদ’, যা হিন্দু ধর্ম ভিত্তিক। — সবকিছু জেনেশুনেই ভারতীয় শাসকচক্র বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় মূলনীতির ৪র্থ স্তম্ভ হিসাবে ‘বাঙালী জাতীয়তাবাদকে জুড়ে দিয়েছে। উদাহরণ হিসাবে হিন্দুধর্মের লোক হওয়া সত্ত্বেও যখন উচ্চবর্ণ নীচবর্ণ হিন্দু হরিজনকে জীবন্ত অবস্থায় পুড়িয়ে হত্যা করে, সেই উচ্চবর্ণ হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে  মুসলিম বাঙালীদের গ্রহণযোগ্যতা আদৌ থাকতে পারে কি?

(৪৮) বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবি জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই সত্ত্বার সংকট এতই তীব্র রুপ ধারণ করেছে যে, আজ তারা ‘নিজ সত্ত্বা’ প্রকাশে দ্বিধাগ্রস্ত। এ ধরণের আচরণ মুক্তবুদ্ধি কিম্বা কোন বাহাদুরীর লক্ষণ মোটেও নয়, বরং এটা হচ্ছে আত্মপরিচয় দানে হীনমন্যতা এবং আত্ম প্রবঞ্চনার বহিঃপ্রকাশ। সংক্ষেপে রাষ্ট্রীয় চার নীতির ‘পোষ্ট মর্টেম’ এখানেই শেষ।

(৪৯) আওয়ামী লীগ কর্তৃক প্রণীতি বাংলাদেশের ’৭২ এর সংবিধানকে যারা দেশ ও জাতির জন্য পবিত্র আমানত বলে মনে করেন, তাদের কাছে একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে আমার সবিনয় আশ্বাসবাণী দেশ ও জাতির জন্য আপনারা ব্রাহ্মণ্যবাদী ভারতীয় শাসকচক্রের তরফ থেকে যে সকল পবিত্র আমানত ১৯৭১ সন থেকে বহন করে নিয়ে এসেছেন, তার মালিকানা নিয়ে আপনাদের সাথে বাংলাদেশের তৌহিদী জনগণের কোনদিনই প্রতিযোগিতা হবে না।

(৫০) একটি রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা অবুঝের মত কেবল ৪টি স্তম্ভই ধার করলাম, নিরাপদ একটি বাসগৃহ তৈরী করার প্রস্তুতি নিলাম না। দেশের কোটি কোটি নির্যাতিত মানুষ এবং তৌহিদী জনগণ আজ সেই নিরাপদ একটি বাসগৃহই কামনা করে, বিদেশী প্রভুদের কাছ থেকে পাওয়া  স্তম্ভবিশিষ্ট ইমারত নয়।

উপরের এই ৫০টি পয়েন্টের সংগ্রহটুকু মেজর জলিলের বই “অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা”র পাট থেকে খুঁজে পাওয়া কিছু কথা। শুধু তাদের জন্য যারা এ পাটটি নেড়ে চেড়ে দেখার সময় করে উঠতে পারেন নাই।  খুব কৌশলে অনেক কিছুই চাপা দিয়েই রাখা। অনেকেই আজো ঐ লুটপাটে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে। একজন পর্যবেক্ষক হিসাবে বলবো আমার মতে যারা অতিরিক্ত সচেতন ছিল তারা সেখান থেকে ইজ্জত বাঁচাতে ছিটকে বের হয়ে আসে বলতে গেলে প্রায় স্বাধীনতার শুরুর কাল থেকেই এবং অতপর নতুন মেলবন্ধন গড়ে তুলে। আর যারা ঐ লুটপাটে মজা পেয়েছে, তারা অনেকেই আজো সেটি বহাল রেখে চালিয়ে যাচ্ছে। তাছাড়াও ধারণা হয় আরো কিছু সাধু কিছুই বুঝতে না পেরে আবেগের বেশে ঐ নষ্ট লিষ্টের একজন হয়ে আজো তার উপস্থিতি জানান দিচ্ছে। তবে বেশীর ভাগই দেখা যায় কেন যেন এরা বেশীর ভাগ নীতিহীন আদর্শহীন, দম্ভধারী, অপকর্মী, স্বার্থপর, কপট চরিত্রের অধিকারী। নীতির প্রশ্নে তাদের বোঝাপড়ায় বড়ই ঘাটতি। কিন্তু এটি তো বাস্তব, মিরজাফরের সাথে তার স্বদলের কাউকে কোরাস গাইতে শোনা যায় নি, যায় কি? যায় না। কেন যায় না? কারণ সচেতন মানুষ কখনোই আদর্শহীন নষ্টের দলে ভিড়ে নিজের ইজ্জত খোয়াতে চায় না। তাই আজ মিরজাফর আর সিরাজের দু’জনার দু অবস্থান, তা আর ব্যাখ্যার দরকার নেই। সবাই এদেরে মনে মনে জানে, চিনে। ইতিহাস বলে লেন্দুপ দরজীর শেষ কালের সঙ্গি কেউ হয় নি, তার আপন পুত্রকন্যাও তফাতে থেকেছে, কোন দায় নেয়নি।

 

নাজমা মোস্তফা,   লেখার সময়: ২০শে সেপ্টেম্বর ২০১২ সাল।

 

 

 

Tag Cloud