Articles published in this site are copyright protected.

Archive for September, 2015

২০১৫ এর লাশের মিছিলে হজ বিপর্যয়

ঈদের দিন মসজিদে নামাজে গিয়ে প্রথম শুনতে পাই এ বিপর্যয় সংবাদ মসজিদের ইমামের মুখে। একই সাথে চমকে উঠি ও সাথে সাথে চিন্তিত হয়ে পড়ি। কারণ মাত্র দু’দিন আগে আমার মামাতো বোন আমাকে টেলিফোন করে জানায় যে, “আপা হজ্জ্বে যাচ্ছি, দোয়া রেখো।” সে সৌদিতেই থাকে। ওটি ছিল তার তৃতীয় বড় হজ¦। সেখানে সে ঈদের নামাজেই আমি উৎকন্ঠিত হয়ে উঠি। বাসায় এসে তাকে কল করি সাথে সাথে জবাব আসে “দ্যা নাম্বার ইজ নট ইন সার্ভিস”। এমন একটি রেসপন্স পেয়ে আরো বেশী চিন্তিত হয়ে পড়ি। অগত্যা কি আর করা, তাদের বাচ্চাদের কাছে মেইল করলে তার বড় ছেলে ত্বড়িত জবাব দেয় ও তাদের ভালো থাকা বিষয়ে আমাকে নিশ্চিন্ত করে। আপাতত তার চিন্তা মাথা থেকে সরলেও বাকী শত হাজার মুসলিমের চিন্তা নিয়েই ইন্টারনেট চষে বেড়াচ্ছি আজ কয়দিন। ঘটনাটি কি?  ঈদের দিনই শুনেছি ৭১৭জন নিহত হাজির খবর। সৌদি এটি দাবী করলেও ২৬ সেপ্টম্বরের খবরে প্রকাশ ইরান দাবী করছে ২,০০০। সমালোচনার মুখে দাঁড়ানো বাদশাহ সালমান এ ব্যাপারে নতুন সংস্কারের কথাও বলছেন। জানা যায় ইরানের ১৩১জন হাজির মৃত্যু ছাড়াও নিখোঁজ রযেছেন ৩৬৫জন। হজ ব্যবস্থাপনা ওআইসির হাতে ছেড়ে দেয়ার দাবী জানিয়েছে ইরান। সব দেশই উৎকন্ঠার সময় পার করছে। কথা উঠছে কেন এ বিপর্যয়? ময়দান থেকে যা জানা যাচ্ছে, হজ কমিটির প্রধান খালেদ আল ফয়সল দায়ী করছেন আফ্রিকান নাগরিকসহ কিছু হাজি দলকে দোষী মনে করছেন, যারা তাড়াহুড়া করছিলেন, যার জন্য বিপর্যয় হয়। শুক্রবার দেশটির রাষ্ট্রীয় আল-অ্যারাবিয়া টেলিভিশনে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন, কিন্তু কেন তাদের দায়ি করছেন তার কোন সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দেননি। গ্রান্ড মুফতি বলছেন, এতে মানুষের হাত নেই, এ নিয়ে হজ ব্যবস্থাপনা কমিটিকে দায়ী করা যাবে না।

Hajj-770x470একবিংশ শতকের যুক্তির এ যুগে গ্রান্ড মুফতির এমন যুক্তি সচেতনরা মানবে কেন? যারা হজ্জে¦ যান বা এর মোকাবেলা করেন তারা ভালো করেই জানেন মানুষ সম্পূর্ণ ভিন্ন রকম মন মানসিকতা নিয়েই হজে¦ গমন করে। সেখানে ইচ্ছাকৃত বিশৃংখলা সৃষ্টির সুযোগ অনেক কম। এসব খোড়া যুক্তি মাননসই নয় বলেই ধারণা হচ্ছে, কিন্তু অজানা ভিন্ন রকমের বিরাট বিপর্যয় ছাড়া সেখানে এত মানুষের আত্মাহুতি কখনো সম্ভব নয়। যখন ইরান থেকে প্রতিবাদ আসতে থাকে তখন এটিও শোনা যায় যে ইরানীদের কারণে এ বিশৃংখলা ঘটে। পরষ্পর কাদা ছোঁড়াছোড়ি না করে সত্যের কাছে সমর্পন করাই প্রকৃত নীতি হওয়া উচিত। আজ একটি ভিডিও চিত্র দেখছিলাম, বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রীর ছত্রচ্ছায়াতে কিভাবে লুটপাটের মহামেলা চলছে, এসব নিয়ে যখন তদন্তদল একজন আসামীর কাছে যায়, তখন আসামী বলেন ভাই আমি মাত্র কাল হজ্জ্ব করে ফিরলাম। তদন্তদল অনেক যুক্তি প্রমাণের রসদ নিয়েই হাজির হয়েছে, কিন্তু তিনি হজ্জ্বের দোহাই দিয়ে সব অপরাধের বৈতরণী পার পেতে চাচ্ছেন। বেওকুফেরা এভাবে অজায়গায় কু জায়গায় এনে ধর্মকে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করে।

ইরানের মিডিয়া ও আরো অনেকের যুক্তিতে জোর দাবী উঠেছে, হাজিরা যখন শয়তানের প্রতীকী স্তম্ভে পাথর মেরে চলে যান, তখন হঠাৎ করেই দুটি সড়ক বন্ধ থাকায় ভিড় এড়াতে বা স্থান ত্যাগ করতে ব্যর্থ হন হজ¦যাত্রীরা। এ হচ্ছে বিপর্যয়ের একটি বড় কারণ। আর পাথর মারতে আসা হজ¦যাত্রীদের এক মুখী চলাচলের একটি রাস্তাকে হঠাৎ করে দ্বিমুখী করা হয়। যার কারণে এত অল্প পরিসরে এটি সামাল দেয়া সম্ভব হয়নি। এবার কথা হচ্ছে এসব কেন করা হলো?  সেটিও জানা যায় যে, সৌদি প্রিন্সের ঐ পথে যাতায়াতের কারণেই তা দ্বিমুখী করা হয়। অভিযোগ আরো উঠেছে সৌদি রাজপুত্র সালমান মিনা অঞ্চলে ২০০ সেনা ও ১৫০ জন পুলিশসহ বিশাল গাড়ি বহর নিয়ে ঢোকার পর হঠাৎ হজ¦যাত্রীদের রাস্তার উল্টোদিকে ফিরতে থাকার কারণে এবং আগে থেকে সমন্বয় না করে কয়েকটি সড়ক হঠাৎ বন্ধ করে দেয়ায় এ বিপর্যয় ঘটে।

ইসলামকে দেখতে হবে কুরআনের আলোকে, সৌদির আলোকে নয়। এ সৌদিতেই এককালে জাহেলিয়াতির প্রচার প্রসার ছিল আর তা ধর্মের ছায়াতলেই হয়েছে। তথাকথিত কুরাইশরা যারা একদিন আল্লাহর পূজাও আরাধনা করতো, কালে তারাই হয়ে পড়ে মূর্তিপুজক জাতি। তাদের পূর্ব পুরুষ ছিলেন নবী ইব্রাহিমের ছেলে নবী ইসমাইলের বংশধারা। তারা কালে একেশ^রবাদীতা ছেড়ে শিরকের পথে গিয়ে মূর্তিপূজক হয়ে পড়ে। ক্রমে আল্লাহ ছেড়ে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে লাত উজ্জাহ ও মানাহ নামের নিজেদের মনগড়া আল্লাহর পৌনে এক গন্ডা কন্যাদের নিয়ে, যার কোন অস্তিত্বও নেই, ভিত্তিও নেই। সেদিন এর সাথে যুক্ত হয় সর্বমোট ৩৬০ মূর্তি। এটিও জানা যায় সেদিনের সেসব মূর্তির মাঝে নবী ইব্রাহিম (আঃ)এর মূর্তিও ছিল। একই দিনের খবরে দেখি মিশরে কারাবন্দি ব্রাদারহুড নেতা বাদিকে মারধর করে সে দেশের নিরাপত্তা বাহিনীর এক সদস্য। মিশরের মানবাধিকার সংস্থা (ইসিআরএফ) আরো জানায় আরেক ব্রাদারহুড নেতা মোহাম্মদ বেলতাগিকেও একইদিনে মারধর করা হয়। বলা বাহুল্য উভয় নেতার বিচার চলছে। বিচার চলাকালিন একজন নিরাপত্তা কর্মী বাদির শরীরে এক কাপ পানি নিক্ষেপ করে। এর প্রতিবাদ করলে এর জবাবে মারধর করে হাতকড়া পরিয়ে পুলিশ ভ্যানে তোলা হয়। এ ছাড়া ব্রাদারহুডের তৃতীয় আরেক নেতাকেও একই সময় মারধর করা হয়। উল্লেখ্য ২০১৩ সালের জুলাই মাসে বন্দুকের নলের মাথায় ইসলামপন্থী সরকারকে হটিয়ে ক্ষমতা দখলের পর ৮০ বছরের পুরানো আধুনিক ও গণতান্ত্রিক ইসলামী ব্রাদারহুড নেতাকর্মীদের উপর সাম্প্রতিক সময়ে ভয়াবহ এ নিপীড়ন চলছে। একই দিনে পত্রিকাতে দেখি ভারতে বিজেপি নেত্রীর মন্তব্য: “নিরীহ পশু নয়, নিজ সন্তানদের (অর্থে) পুত্রকে কুরবানি দিক মুসলিমরা” (সুত্র জি নিউজ)। বলিদান হিন্দুদের অতি সাধারণ এক রীতি। কিন্তু মুসলিমের প্রসঙ্গ উঠলে তারা বদলে যায়। কারণ অতীতে আমরা দেখেছি গুজরাটের ঘটনাতে গরু কুরবানীর চেয়ে তারা মানুষ কুরবানীতে বেশী স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে।

সারা বিশ^ থেকেই সবাই সমবেদনা জ্ঞাপন করছেন আবার বিরুদ্ধবাদী অনেকেই তথ্য প্রযুক্তির এ যুগে আনন্দের প্লাবন বইয়ে দিচ্ছেন। মন্তব্য করছেন মুসলমানরা হাটতেও জানে না, ঢলে ঢলে পড়ে। চার্লি হেবদো এই সেদিনও সুখে হোক আর দুঃখেই হোক কার্টুন এঁকেছেন আয়লানের দুর্ঘটনাকে নিয়ে। আয়লান কুরদি হচ্ছে সেই তিন বছরের সিরিয়ান শিশুটি যে সারা বিশে^ নাড়া তৈরী করেছে। সে ভূমধ্যসাগর পাড়ে মৃত অবস্থায় রিফিউজি ক্রাইসিসের এক জ¦লজ্যান্ত উদাহরণ হয়ে বিশে^র নজর কেড়েছে (২ সেপ্টেম্বর ২০১৫)।  চার্লি হেবদো তার কাটূর্নে এ সত্যকে স্পষ্ট করেছেন যে, ছবিতে খৃষ্টান ঈসার আদলে এক সাধুর পানির উপর দিয়ে হেটে যাওয়া আর মুসলিম আইলান দু পা উল্টে মারা যায় সাগরবক্ষে, ছবিতে তাই সুস্পষ্ট হয়। যখন জানতে পারি এসব কার্টুন মুসলিমের কষ্ট আরো বাড়িয়ে দিয়েছে তখন খুঁজে ছবিটি দেখি। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না, পানির উপর দিয়ে হেটে যাওয়া সাধু কিন্তু বাস্তবে মুসলিমদেরই একজন নবী ঈসা। আর ডুবে মরা ঐ আয়লানও ঐ নবীরই পরবর্তী প্রজন্মের একজন। এমন চিত্র দর্শণে খোদ নবী ঈসার মনেও অনেক কষ্ট জমা হবে, এতে কোন সন্দেহ নেই।

খবরে প্রকাশ এর মধ্যে সৌদি আরবের হজ কমিটির প্রধান যুবরাজ মোহাম্মদ বিন নায়েফ ইতিমধ্যেই তদন্ত শুরু করে তা প্রকাশের আশ^াস দিয়েছেন। জানা যায় ঐদিন ছিল প্রচন্ড গরম। হাজিদের জন্য বিভিন্ন স্থানে পানির ব্যবস্থা থাকে আমরা জানি, তবে সেদিন পানির কিছু সংকট হাজিদের চোখে ধরা পড়ে সম্ভবত অতিরিক্ত গরমের কারণে। ঐ সময় উপর থেকে হেলিকপ্টারেও পানি ছিটানো হয়। অতিরিক্ত গরমও মানুষকে ব্যতিব্যস্ত করে তোলে। অনেক সময়ই এরকম ঘটনা ঘটছে। অতীতে ২০০৬ সালে মিনা উপত্যকাতে পদদলিত হয়ে মারা যান ৩৬০ জন যাত্রী। সেদিনও ঐ জায়গায়ই অতিরিক্ত ভীড়ে এ দুর্ঘটনা ঘটে। ঐ বছর আট তলা ধ্বসে ৭৩ জন মারা যান হজে¦র পূর্বে। এর দু বছর আগে মিনাতে ২৪৪ জন সংঘর্ষে মারা যান। ঐ সময় হজে¦র শেষ দিনেও এর জের ধরে পরে আহত হন কয়েকশত যাত্রী। ২০০১এ হজে¦র শেষ দিনে নিহত হন ৩৫জন যাত্রী। আর সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে ১৯৯০ সালে, একটি সুড়ঙ্গ পথে অতিরিক্ত ভীড়ে পদদলিত হয়ে নিহত হন কমপক্ষে ১৪২৬ যাত্রী। এবার বাংলাদেশী হাজীদের মধ্যে ২৬ জনের মৃত্যু ও ৯৮ জন নিখোঁজ থাকার সংবাদ পাওয়া গেছে। হয়তো ক্রমে এ সংখ্যারও ওদল বদল হবে।  সর্বশেষ খবর হিসাবে মনে হচ্ছে নিহতের সংখ্যা ১৩০০, আহতের সংখ্যা ১৫০০, দায়ী রাজপুত্রের গাড়ী বহর।

crmosque.comসৌদি সরকার অনেক সমালোচনার মুখোমুখি হয়ে কঠিন সময় পার করছে। ২৯ সেপ্টেম্বরের এক খবরে প্রকাশ সৌদি নেতৃত্ব পরিবর্তন আনার আহবান জানালেন এক সিনিয়র প্রিন্স। সৌদির এক সিনিয়র প্রিন্স তার দেশের নেতৃত্বে পরিবর্তন আনার আহবান জানিয়েছেন। তেলের মূল্যের ক্রমবর্ধমান পতন ও মক্কায় গত সপ্তাহের এ বিপর্যয়ের পর এ আহবান। তবে তিনি গণমাধ্যমে নাম প্রকাশ করতে রাজি হন নি। ব্রিটেনের দৈনিক গার্ডিয়ান এ খবর জানিয়েছে। সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠাতা আব্দুল আজিজ ইবনে সৌদের নাতি এই পত্রিকাকে বলেছেন, সৌদি রাজ পরিবারের মধ্যে কোন্দল চলছে এবং জনগণও সরকারের উপর রাজা সালমানের উপর সন্তুষ্ঠ নয়। সালমান গত জানুয়ারী মাসে ক্ষমতা গ্রহণ করেছেন। তার কথামত দুটি খোলা চিঠির বরাতে রাজ্য স্থিতিশীল অবস্থায় নেই, রাজার ছেলে সালমানই রাজ্য চালাচ্ছেন। তার চারজন বা পাঁচজন চাচা এসব চিঠি নিয়ে আলোচনাতে বসবেন। তারা তাদের বহু ভাতিজাকে নিয়ে একটি পরিকল্পনা প্রণয়ন করছেন এবং ওতে আশা করছেন দরজা খুলে যাবে। দ্বিতীয় প্রজন্মের অনেকেই উদ্বিগ্ন। গোত্রীয় নেতারাসহ সব শ্রেণীর জনগণও খুব চাপ দিচ্ছে এ বিষয়ে। প্রকৃতপক্ষে বাদশাহর পুত্র মোহাম্মদ বিন সালমানই দেশটির রাজত্ব চালাচ্ছেন (সূত্র রেডিও তেহরান) (দি এক্সপ্রেস ট্রিবিউন)। । সোমবার ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস জানায়, তেলের দর ৫০ শতাংশ হ্রাস পাওয়ায় সৌদি সরকার এর মধ্যে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ থেকে অন্তত ৭ হাজার কোটি ডলার তুলে নিয়েছে। বর্তমানের বাদশাহ আসার পর থেকেই প্রশাসনিক ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। ইয়েমেনের সাথে যুদ্ধ ও ইসলামিক ষ্টেট (আইএস) এর মুখে দেশটির নিরাপত্তাও হুমকির মুখে।

উল্লেখ্য, বাদশাহকে ক্ষমতা থেকে সরানোর আহবান জানানো প্রিন্সের নাম নিরাপত্তার স্বার্থে প্রকাশ করা হয়নি। এ যুক্তিতেই এটি সুস্পষ্ট যে এখানে চলছে ক্ষমতার নষ্ট লড়াই। পারিবারিক কোন্দলের ফাঁক গলিয়ে রাজতন্ত্র পাকাপোক্ত করার এ নষ্ট প্রয়াসকে শিকড় শুদ্ধ উপড়ে ফেলে দিতে হবে কারণ মূল থেকেই এসব ইসলাম বিরোধী অপকর্ম। সব যুগেই অপকর্মীরা ক্ষমতার জোরে ধরাকে সরাজ্ঞান করেছে ও এসব অপকর্ম চালিয়ে গেছে, সৌদিরাও তার ব্যতিক্রম নয়। ইতিহাস বলে তারাই জাজিরাতুল আরবকে সৌদি আরবে রুপান্তরিত করেছে এবং অনেক জাহিলিয়াতি অনাচারের সূত্র সন্ধান করলে আজো পাওয়া যায়। ইসলামের জন্মভ’মিতে এসব পরিণতি মেনে নেয়া বিবেকবান মুসলিমের পক্ষে কষ্টকর। একবিংশ শতকের এ কঠিন সময়ে খোদ ইসলামের জন্মভ’মিই যদি মুক্ত না হয়, তবে বাকী মুসলিম বিশ^ কেমন করে মুক্তির রাস্তা খুঁজে পাবে? সিরাতুল মোস্তাকিম নামধারী শ্রেষ্ঠ প্রজাতির এ সঠিক রাস্তা ভিন্ন মুসলিমের বাঁচার আর কোন পথ নেই, নয়তো আল্লাহর কঠিন আজাবের আশংকা থেকেই যায়। অনেক সময় ক্ষমতার ছত্রচ্ছায়ায় ধরা খাওয়া সব অবিচারই প্রকাশ্য জবাবদিহিতার জরুর দাবিদার। চৌদ্দশত বছর আগের জাজিরাতুল আরবের জাহেল কুরাইশরা কোন নীতির ধার ধারতো না, অনাচার জোর যার মূলক তার ছিল তাদের নীতির ভিত্তি। জাহেলিয়াতের যুগে তারা আল্লাহর বিধান ছেড়ে তাদের স্বরচিত রাস্তা তৈরী করেছে। খৃষ্টানেরা যেমন পোপের বদৌলতে তৈরী করেছে আল্লাহর একমাত্র সন্তান, একইভাবে কুরাইশরা তৈরী করেছে আল্লাহর তিনমাত্র কন্যা সন্তান। ইসলাম এমন এক জীবন বিধান যেখানে চলমান জীবনের সব মানবিক সুন্দরতাই ধরা পড়ে। এখান থেকে কেউ ছিটকে বেরিয়ে গেলে বা খন্ডিত হয়ে পড়লে এর পরিপূর্ণ মর্যাদা লঙ্ঘিত হয়।

সূত্র হিসাবে বাংলাদেশে সময় টিভির বরাতে ৩০ সেপ্টেম্বরের খবরে প্রকাশ, হাজিরা বলেন প্রিন্সএর জন্য পুলিশের ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের কারণেই এ দূর্ঘটনা ঘটে। দেশের যারা তদারকির দায়িত্বে থাকেন তাদের অব্যবস্থাপনাতে হাজিরা ব্যথিত হৃদয়ে মনের কষ্টের কথা জানান। উপরোক্ত আলোচনা থেকে মনে হচ্ছে দেশটির শাসকদলের মাঝে ক্ষমতার লড়াই চলছে। এরা বহু যুগ অবধি ইসলামের নাম নিয়ে যা করে চলেছে তাদের বেশকিছু কাজের সাথে, ইসলামের দূরতম যোগও নেই। শিরক ইসলামে নিষিদ্ধ, এটি পাপের সেরা। এর গোড়া কাটতে গিয়ে যেভাবে তারা বাড়াবাড়ির রাস্তা ধরেছে সেটিও গ্রহণযোগ্য নয়। তারা ইসলামের প্রতিটি ঐতিহাসিক স্থাপনার উপর হামলে পড়েছে। এটি যেন ইতিহাস থেকে ইসলামকে নিশ্চিহ্ন করারই সামিল। ইসলামের কুরআনীয় নির্দেশ হচ্ছে সারা বিশ^ ঘুরে ঘুরে আল্লাহর সৃষ্ট এ দুনিয়ার প্রকৃত অবস্থানসহ অতীত বর্তমান দেখায় উৎসাহ দেয়া হয়েছে। মানুষকে ভ্রমণ করে সত্য অনুসন্ধান করতে বলা হয়েছে। বলা হয়নি সব সত্যকে ইতিহাস থেকে মুছে দিতে। এই সেদিনও তারা মদীনার মসজিদে নববীকে পর্যন্ত নিশ্চিহ্ন করতে উৎসাহী থেকেছে। গণতন্ত্রের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে ইসলামই জাহেলিয়াত জাতিকে সুপথ দেখায়। মদীনার সনদ তারই পথিকৃত যেখানে সবার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। জনগণের অমতে একদিনও কোন খলিফা গদিতে থাকতে পারেন না।

এর জের ধরে বাড়তি লাই পেয়ে ছোট দেশগুলিও ক্রমাগত অনাচারের মাঝে আকন্ঠ ডুবে জাহেলিয়াতির প্রসার ঘটিয়ে চলেছে। ইসলাম কোন সময়ই অনাচারী রাজতন্ত্রের বা পরিবারতন্ত্রের অনুমোদন করে নাই। সেটি যদি করতো তবে  ইসলামে খলিফা নির্ধারণের ভিন্ন রাস্তা রচিত হতো। নবীর জীবদ্দশাতেই সাহাবী আবুবকরের ইমামতিতে নামাজ পড়ানো হয়। এটি ছিল যোগ্যতার পরিপক্কতার ভিত্তিতে পরবর্তী খলিফা নির্ধারণের ইঙ্গিত মাত্র। ইসলামের নাম নিয়ে সৌদি অনেক কিছুই করেছে করছে, যা কোন সময়ই ইসলাম অনুমোদন করে না। সেখানে জনগণের মতামতের ভিত্তিতে দেশ পরচিালনার কথা, সেখানে বহু ভাতিজার মতামতের ভিত্তিতে দেশ পরিচালিত হবার কোন নির্দেশ নেই। দেশের জনগণই দেশের প্রাণ, ভাতিজারা নন। বলা হচ্ছে যুবরাজ বলা হচ্ছে প্রিন্স। চৌদ্দশত বছর আগেই প্রিয়নবী মোহাম্মদ মোস্তফা (সঃ) এর মারফতে আনিত গ্রন্থ কুরআন দ্বারা এ রাস্তা বন্ধ করা হয়ে গেছে। আজো সারা বিশে^ মুসলিমরা এসব ভুল রাস্তাকে অনুসরণ করছে কিন্তু নবী মোহাম্মদ (সঃ) এসেছিলেন এসব স্বৈরাচারী রাস্তা চিরদিনের জন্য বন্ধ করে দিতে। প্রিয়নবী গত হবার পর খুব কৌশলে সেটি পুনরায় চালু করে দেয় পরবর্তী কপট স্বৈরশাসকরা।

বাংলাদেশের শত শত মানুষ সে দেশে কাজ করে আমরা তাদের থেকে জেনেছি ব্যক্তিগতভাবে শাসকদের অনাচারের বিষয়ে কথা বলার অনুমোদন সেখানে নেই। কোন কথা বললে জান কবজ করা হয়। এসব কি ইসলাম? এসব গল্প শুনলে আমাদের পিলে চমকাতো! গোটা বিশে^ ইসলামের নাম নিয়ে আজ আল্লাহর জায়গাতে তার প্রতিপক্ষের রাজত্ব চলছে, খোদ আরবের মানচিত্রে, ইসলামের জন্মভূমিতে। যার বদৌলতে নিপীড়নে অত্যাচারে আজো গোটা বিশে^ মুসলিমরা মুমূর্ষ সময় পার করছে, এর দায় পবিত্র ধর্মের ঘাড়ে না পড়লেও বহুভাগে সৌদির ঘাড়ে পড়ে। তারা নাকি বিয়ে করে অগুণতি, সন্তান সন্ততি শত শত। কিন্তু ইসলাম প্রকৃতপক্ষে এক বিয়ের পক্ষেই কথা বলে।  ব্যতিক্রম থাকলেও ঐ একের উপরই ইসলামের বিবেচনা। গোটা বিশে^র মুসলিমরা তাদের মত নয় কেন? তাদের এসব সীমাহীন অপকর্ম আজ ইসলামকে অনেক ক্ষেত্রে বিতর্কীত করে তুলেছে। এসব নষ্ট নীতির কোন ভিত্তি ইসলামে নেই। রসুলের বিদায় হজে¦র ভাষন অনুসারে ইসলামের নীতি হচ্ছে একজন নাককাটা কাফ্রি কৃতদাসও যদি যোগ্য হয় তাহলে তারও যথাযোগ্য সম্মান দিতে হবে। প্রয়োজনে তাকে শাসক নির্বাচন করতেই ইসলামের নির্দেশ। রসুলের যুগে দাসপ্রথা সে সমাজে প্রচলিত ছিল, কিন্তু ইসলামের মহানুভবতার সামনে তা টিকতে পারে নি। আজকের মুসলিমরা নিশ্চয় জানেন ঐ কালো চামড়ার কৃষ্ণকালো বেলাল কাবার উপরে উঠার সাহস নিয়ে আজান দেন। এটি সহজেই অনুমেয়, সেদিন মর্যাদায় বেলাল কাবার চূড়ামনিতে স্থানলাভ করেন। তার সম্মানের মাত্রাটা আঁচ করুন।

খলিফা হজরত ওমরের গল্প ইসলাম সম্বন্ধে কি বলে? তার শাসনামলে সেদিন ইসলামের নারীরা এতই সোচ্চার ছিলেন যে তারাও প্রতিবাদ করতেন উঁচূগলাতে। যদিও ইতিহাস বলে, কালে মেয়েদের আবারো কৌশলের শিকল পরিয়ে দেয়া হয়। গণিমতের মাল প্রাপ্তির পর পরবর্তীতে যখন উপস্থিত ময়দানে একজন নারী দেখতে পান যে, ঐ কাপড়ে তার পরিবারের কারো একটি ড্রেস হয়নি কিন্তু দেখা যায় হযরত ওমর ঐ একই কাপড়ের একটি ড্রেস তৈরী করতে পেরেছেন। ঐদিন ঐ প্রতিবাদী উপস্থিত জনতার ময়দানে মহিলা নিঃসংকোচে এর ব্যাখ্যা দাবি করেন। তখন হযরত ওমর এক ব্যাখ্যা দানে বাধ্য ছিলেন এবং এর ব্যাখ্যা ছিল যে, ঐ দিন তিনি ও তার পুত্র দুটি কাপড় পান যার কারণে দুটি হওয়াতে তিনি একটি ড্রেস বানাতে সক্ষম হন। এ হচ্ছে ইসলাম। কই ইসলাম তো বলে না যে, সেদিন হযরত ওমর ঐ নারীকে শাস্তি দিয়েছিলেন বা কিছ! বরং শোনা যায় পরম নিশ্চিন্তে ঐ ইসলামের সৌন্দর্যকে জনসমক্ষে তোলে ধরতেই উচ্চকন্ঠ ছিলেন তিনি। কোন সাহসে এ সৌদি পরিবার নিজেকে শাহজাদা, যুবরাজ বা প্রিন্স অখ্যায়িত করেন? এর সূত্র বা সিলসিলা কি? নবী মোহাম্মদ তো কোনকালেও যুবরাজ ছিলেন না, প্রিন্সও না, শাহজাদাও না। তিনি ছিলেন আব্দুল্লাহর পুত্র মোহাম্মদ। তিনি বলতেন আমাকে ভয়ের কিছু নেই আমি আব্দুল্লাহর পুত্র মোহাম্মদ।

 

ঐ দিনের এসব ঘটনার পর এবার বিক্ষুব্ধ সাধারণ হাজিরা কমেন্ট করেন ২৩ লাখ হাজির ম্যানেজমেন্ট করার সামর্থ তাদের নেই। এত লোকের ভিসা দেয়া ঠিক না। রাজার ছেলে আসাতে গেট বন্ধ করে দেয়। এতে মানুষের উপর পড়ে মানুষ মারা গেছে। ঐ রাস্তার একটি অংশে গর্তের মত ছিল। ঐ গর্তে কয়েকজন পড়ে যায়। হাজিরা বলেছেন যেভাবে তাস সাজিয়ে রাখলে পড়ে যায়, সে একইভাবে যেন সারিবদ্ধ তাসের সারিরা লাশ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। হাজিরা সরজমিনে দেখেছেন খালি লাশ আর লাশ। গ্রান্ড মুফতি বলছেন এ নিয়ে কাউকে কিছু বলা যাবে না। এটি আল্লাহর কাজ! বিচিত্র কি হয়তো বা দুনিয়ার অনাচারি বান্দাদের অতি অনাচারে ক্ষুব্ধ বিধাতার এ বিক্ষুব্ধ প্রকাশের জুৎসই প্রতিবাদ, অবশ্যই গ্রান্ড মুফতিরা এ দায় এড়িয়ে যেতে পারবেন না! ইসলামের বিচার সবার জন্য সমান। এখানে একজন কাফ্রির লাশ আর প্রিন্সের লাশের মাঝে কোন পার্থক্য নেই। যদিও আজকের জাহেলিয়াতি তারই স্বাক্ষর রেখে মিনার প্রাঙ্গন রক্তরঞ্জিত করে লাশের মিছিল সাজিয়েছে।

অনেকে এবারের ঘটনাকে অবলম্বন করে শিয়া ও সুন্নীর বিভেদকে উস্কে দিতে চাচ্ছেন। হতে পারে অবস্থার প্রেক্ষিতে এখানে শিয়া অধ্যুষিত ইরানের হাতে কিছু মশলা এসে পড়েছে। প্রতিপক্ষের হাতে মশলা তুলে দিলে এটি একজন নিবেই, এ সহজ অংক সৌদি সরকারের মাথায় আগে থেকে জমা রাখলে ভালো হতো। দুর্ঘটনা সংঘটিত হবার পর বিনা প্রমাণে নিজেকে বাঁচাতে অপর নির্দোষকে আক্রমন করার যুক্তি দেউলিয়াত্বের প্রমাণ মাত্র। ২৫ সেপ্টেম্বরের খবরে প্রকাশ ভারতের লক্ষেèৗতে প্রথমবারের মত একসঙ্গে শিয়া সুন্নীরা ঈদের জামাত করতে যাচ্ছে। সেখানে ১ লাখ ২৫ হাজার শিয়া এবং এর প্রায় ৫ গুণ সুন্নী বাস করেন। ইন্টারনেট ভিত্তিক এস২এস সংস্থা এ আয়োজনের উদ্যোগ নেয়। উভয় সম্প্রদায়ই ধর্মের মৌলিক পাঁচটি বিধান মেনে চলে। এতে কোন বিতন্ডা নেই, বহুযুগ পূর্ব কৃত্রিম বিভাজন ভুলে গিয়ে দুই সম্প্রদায় এক কাতারে দাঁড়িয়েছে। টাইমস অব ইন্ডিয়ার খবরে বলা হয়, ঐ নামাজে ইমামতি করবেন একজন সুন্নী ইমাম। এটিই ইসলামের মৌলিক বিধান। ধর্মকে বিভক্ত করার দায় একমাত্র কপট ধর্মধারীদের, কখনোই এ দায় নবী মোহাম্মদ (সঃ) বা ইসলামের ঘাড়ে সমর্পিত হবে না। এটি কুরআনের আল-ইমরানের ১০৪ আয়াত দ্বারা সুস্পষ্ট করা হয়েছে যারা এ বিভেদ ঘটাবে তারা কঠোর আজাবের সম্মুক্ষীন হবে। যদিও গাফিল মুসলিমরা সে সূত্রকে অবহেলা করে দেড় হাজার বছর অবধি এ বিরোধ জিইয়ে রেখেছে, ধর্মের যত না কারণে তার চেয়ে বহু বেশী রাজনৈতিক কারণে।

বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থে প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সাঃ) এর বর্ণনা শেষ পর্ব ৪ আলোচক ডাঃ জাকির নায়েক (Bangla)

 

আজকের এ সঙ্গিন মূহুর্তে অতি অল্প কিছু প্রস্তাবনা রাখছি। প্রয়োজনে এ জটিল বিষয়টিতে মুসলিম বিশে^র সহযোগিতায় উৎসাহী হতে হবে। ইসলামকে সংকীর্ণতা থেকে বেরিয়ে মহতের দিকে যেতে হবে। প্রয়োজনে ওআইসি এর সম্মিলিত সমাধানের দিকে গিয়ে সবার মতামতের মূল্য দিতে হবে। মানুষকে বার বার হজে¦র প্রতি উদ্বুদ্ধ করার প্রবণতা থেকে সরে আসতে হবে। আমাদের প্রিয় নবী একবারই মাত্র হজ¦ করেন। বাকী সারা বছরই মানুষ ঘুরে ঘুরে ওমরাহ হজ¦ করছেন। এটি জীবনে একবারই করার বিধান। কারো টাকা ও সুযোগ থাকলেই তাকে কেন শুধু ওটিই করতে হবে। প্রতিটি সুকর্মই মানুষের আমলনামাতে ইতিবাচক হয়ে থাকবে। আমি এমন মানুষকেও পেয়েছি যাদের সামর্থ নেই হজ¦ করার, কিন্তু ঐ সব নেকী জড়িত ছওয়াবের গল্প শুনে তাদের জীবনে হজ¦ করতে না পারার আহাজারির শেষ নেই। এরকম অবস্থা কখনোই ইসলামের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। হজে¦র মহানুভবতা আঁচ করার মত অনেক গল্পই ধর্মের ভান্ডারে জমা আছে, অনেক অনেক মহৎ কাজ করেও একজন ঐ অর্জন জমা করতে পারেন। গোটা বিশে^র মুসলিমরা বা জনতারা কতভাবেই না বঞ্চনার শিকার তার কোন সমাধানের চিন্তা কেন সচেতনের মাথায় খেলে না। ইসলামের এবাদত যদি মন মানসিকতার পরিবর্তন না ঘটায়, মানুষকে মহৎ না করে তবে ঐ এবাদতের মূল্য অতিঅল্প। সংকীর্ণ চিন্তা দিয়ে বিধাতাকে টলানো যাবে বলে মনে হয় না। হজের সময় একটি জিনিস আমার চোখে পড়েছে সাধারণত আমাদের এশিয়ান জনতারা নবীজির মাজারের কাছাকাছি গেলে উতলা হয়ে উঠেন। অনেকে মনে করেন, নবীজি তাদেরে দেখছেন, অনেকে বলেন জিন্দানবী। ইসলাম এ ধারার কোন সংবাদ অন্তত কুরআন বিলি করে না। কুরআন এসবের ঘোর বিরোধী। তাই বলবো ধর্মটিকে জানতে একবার নয় বার বার কুরআনের কাছে ছুটে যান। বাঁচবার রাস্তা মুক্তির সব সোপান ওখানেই লুকিয়ে আছে। আল্লাহ হাফেজ।

 

নাজমা মোস্তফা,  ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৫।

Advertisements

Tag Cloud