Articles published in this site are copyright protected.

farakka nazma mustafa

ফারাক্কা থেকে টিপাইমুখ : দুটি কষ্টের কবিতা

বাংলাদেশের কথা ভাবতে গেলে আজকাল যেন মনে হয় মাথায় কাজ করে না, ঝিম ধরে থাকে। সেদিন দেশে সুনামগঞ্জে একটি বোনের সঙ্গে কথা হয়। কথা প্রসঙ্গে সে বলছিল কি জানি টিপাইমুখে নাকি বাঁধ দিচ্ছে, আরও কত কি, সব বুঝি বিরান হয়ে যাবে। তার মুখে ছিল হতাশার সুর। তখন চলছিল অগ্রহায়ণ, ধানের মাস। টেলিফোনের ফাঁকে ফাঁকে সে কাজের লোকদের বা কাউকে যেন ধানের কথা বলছিল। আমি বলি, খুব যে ধানের কথা বলছ? তুমি কি ব্যস্ত নাকি? জবাবে সে বলে না আপা, ধান আর কই, পানি তো নেই, সব বিরান। তারপরই টিপাই প্রসঙ্গ এসে যায়। এখনই এই অবস্থা পরে না জানি আরও কত কি হয়? মনে পড়ে বিগত শতকে ফারাক্কা প্রসঙ্গে এরকম এক ইস্যু নিয়ে এক স্কুল শিক্ষিকার সঙ্গে আমার চরম বিতণ্ডা হয়। স্কুল শিক্ষিকা শিক্ষক হলেও অগভীর ছিল তার পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা। তিনি বিষয়টিকে রাজনীতির ঘোরপ্যাঁচ বলে এড়িয়ে গেলেন, আর আমি বলেছিলাম পরে শুনে জেনে পারিপার্শ্বিক ও ভৌগোলিক দৃষ্টিকোণ থেকে, যদিও তার সেটি আরও ভালো জানার কথা, কারণ এটি তার নিজের অঞ্চল। কিন্তু তারপরও তার মাথায় কাজ করেনি। মহিলা ছিলেন ওয়েস্ট ধানমণ্ডি আলী হোসেন উচ্চ বালিকা স্কুলের প্রাইমারি শিক্ষিকা। আমার দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়া ছোট ছেলের শিক্ষয়িত্রী ছিলেন তিনি। অনেক আগে আমার এক বিদেশি ভাই কৌতুক করে বলেছিল, বাংলাদেশ চলছে এমন কিছু নেতৃত্বের জোরে- স্রষ্টা নাকি একটি মানুষের ফর্মা বানিয়ে মাথার বদলে গাছ থেকে নারকেল এনে বসিয়ে দেন। আমার বর্ণিত ওই শিক্ষিকার মাথাও মনে হচ্ছে ওই নারকেলের অনুকরণেই সাজানো হয়েছিল। বেদনার কথাটি হচ্ছে, ওই মহিলার বাড়ি ছিল ওই রাজশাহী অঞ্চলে। তারপরও তিনি সেখানে ভূগোলকে ডিঙ্গিয়ে রাজনীতি দেখেছেন। তার হম্বিতম্বি দেখে আমি চুপ মেরে যাই। যদিও, মনের এ বেদনা চেপে রাখতে না পেরে এর বেশ পরে আমার কষ্টগুলো কবিতা হয়েছে। তার দুটি এখানে, যা ছিল বিগত শতকের শেষ প্রহরের জমা।

স্বাধীনতার শিকল 

দামাল ছেলে দাসখত্ লিখে দেয় নিজের ভূ’ভাগ, মায়ের আঁচল
উমাপতি গ্রাম, বেরুবাড়ী দিয়েও তিনবিঘা করিডোর পাইনি ফেরত।
পরীক্ষামূলক ৪১ দিন চলছে ২৫ বছর, ফারাক্কা ব্যারেজ
বেরুবাড়ী, তালপট্টি, তিনবিঘা, মুহুরীর চর বেদখল
বিএসএফ হত্যা করে সমানে মানুষ, ধরে নেয় গরু, ধর্ষিছে নারী
অর্থ হারিয়েছে নীতি, দেশজুড়ে চোরা কারবারি, অর্থনীতির ভাঙা মেরুদণ্ড
মীর জাফরেরা লাভের অঙ্ক গোলায় তুলতে পারে খুব ক্ষণকাল,
বিশ্বাসহীন পাপে দুনিয়া জাহানে, তারে ধিক্কারে চিরকাল।
রায় দুর্লভদের চক্রান্তে দু’পায়ে বেড়ি, পরাধীনতার শিকল গলায়
কণ্ঠ বাকরুদ্ধ, গোলামির খাতায়, দাসখত লিখে ইতিহাসের পাতায়।
দুইশ’ বছরেও যে জিঞ্জিরে মরচে ধরেও টিকে ছিল গর্বে
প্রতিটি পলাশীর শিকলে আর কতকাল ঝুঝবে জনতা
বারে বারে স্বাধীনতার সূর্যে কেন অমানিশার অন্ধকার
ভয়ে বাড়ে হার্টবিট যা ঘটছে হররোজ, তপ্ত রাজপথ।
যেন ফের ষড়যন্ত্র, রায়দুর্লভ উমিচাঁদ মীর জাফরদের প্রস্তুতিকাল
আর কতবার পলাশীর লাশ হবে বাংলা মায়ের সোনার চাঁদ?
প্রতিবারেই ভাবি স্বাধীনতা এনেছে বাছারা, বাঁচারই সংবাদ।
অপুষ্টিতে ভরা জরাগ্রস্ত শীর্ণ, রক্তহীন শরীরের অপচয়,
কত লাশ চাও স্বাধীনতা তুমি, এ জাতি রক্তহীন বিবর্ণ পাণ্ডুর আজ।
ট্রানশিপমেন্ট যেন এনগেজমেন্ট যৌতুকলোভী স্বামীর
এ যাবত দিয়েছ খুন, ঘুষি, কিল-থাপ্পড়, এসিডের বার
জুটেছে সেই পছন্দ করা ‘বাংলা’ নামের লাল বধূটার।

 

 

 

চেতনহীন জনতা হারিয়েছে শক্তি, নির্বাক যেন মেরুদণ্ডহীন মূর্তি
ক্ষুধার জ্বালায় মাছের দুধের আমিষের স্বপ্ন শুধু কল্পনায়,
কচু লতা ঘেটুতেই তৃপ্তি খোঁজে মোটা চালেই সান্ত্বনা বাঁচার,
আর্সেনিকে অবশ একাংশ পদ্মার ইলিশ আজ ইতিহাসের পাতায়।
ভাগ্যের চাকা খাবি খায়, হতভাগা যেদিকে যায় সাগর শুকায়।
শকুনির দৃষ্টিতে ঘুড়ির লেজের দেশ আমার,
বিরান বালুকায়, শুষেছে মায়ের দুধ শুষ্ক বুকে
ইতিহাস চেখে দেখো, ঘাঁটো অতীতের প্রতিটি পাতা
চোখের ছানি ঝেড়ে, মাছের দৃষ্টিতে বাস্তবের আরশি মেলো।
গোটা দেশে ক্যান্সারসম যাতনা, জনতার সাথে দেশমাতার,
সবাই ক্যান্সার আক্রান্ত কঙ্কালসার বস্তির কামাল,
জিজ্ঞাসে সাহেবেরে এত দৈন্য কেন স্যার,
কেন এত এত ক্যান্সার —-বলবেন স্যার?
হাসপাতালে অঙ্গের দাম অগ্নিমূল্য, জানের দাম তুচ্ছতাচ্ছিল্য
রাস্তায় লুটায় লাশেরা, স্বাধীনতার চলে রজতজয়ন্তী
নতুন লাশেরা পাশ পায় না, চোখে আজ ধূ ধূ মরুভূমি,
অশ্রুহীন আঁখির মানব জীবন যেন শুকানো পদ্মা তুমি।
ওরা কেউ রফিক, সালাম, বরকতের লাশের ভাগ্য না পায়
হতভাগারা মিছিলের শেষে শুধু নাকচাপা দুর্গন্ধ ছড়ায়,
একাত্তর উত্তর যত লাশ পড়েছে রাস্তায়, গলিতে এঁদো ডোবায়,
গোটাকয় স্বাধীনতা জুটাতো জনতায়, এই লাশের বদলায়।

ইতিহাস বিবেকের দাস। আগামীর আলোকিত ভবিষ্যত্ গড়তে পারে তারাই যারা ইতিহাসের মূল্যায়ন সঠিকভাবে করে। স্বাধীনতার এত বছর পার করলেও জাতি কেন শত প্রশ্নের মুখোমুখি আজও? মূলত বিগত শতকে লেখা কবিতাটির মাঝে অনেক না বলা কথা লুকিয়ে ছিল, আগেই বলেছি বাংলাদেশের কথা লিখতে গেলে মাথায় যেন কাজ করে না। কেমন যেন গুলিয়ে যায় সবকিছু। ইন্টারনেটে লেখালেখি করার সুবাদে অনেকেই তর্কে জড়িয়ে পড়েন। তখন এমনও দেখা যায়? রাজনীতির লেখকরা যখন কোনো জবাব দিতে পারে না তখন বলে বসে ‘মায়ের চেয়ে দেখি মাসির দরদ বেশি!’। কথার পিঠে কথা বলা এক জিনিস আর স্বাধীনতা সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস। মা যদি মাসি হয় তাও মন্দ না, তবে কুটিল সত্মা হলে তো আর উপায় নেই। স্বাধীনতার কথাটি প্রকৃত তাদেরই বোঝার কথা যারা এটি পেয়ে হারায় বা যারা এটি পায়নি। এককালে এটি হারিয়েছে এ বাংলার জনতা। ন্যাড়া তো বার বার বেলতলাতে যায় না, সাবধান, বাংলাদেশের মানুষ মাথা বাঁচিয়ে চলো। শক্ত হাতে সব বঞ্চনার হিসাব বুঝে নেয়াই যুক্তির কথা। শীতনিদ্রা কাটিয়ে আড়মোড়া ভেঙে জেগে ওঠ, কথা কও, নিজের হিসাব নিজেই বুঝে লও। বার বার স্বাধীনতার প্রতারকদের থেকে সব হিসাব শক্ত হাতে কষে নাও। ভাগ্যের দোষ না দিয়ে তোমাদের হিসাব, অধিকার, পাওনা তোমরা বুঝে নাও। হতাশায় ভরা পৃথিবীর সুজনদের জন্য আশার আলো—

‘অতএব দুর্বল চিত্ত হয়ো না ও অনুশোচনা করো না, কারণ তোমরাই হবে উচ্চপদস্থ যদি তোমরা বিশ্বাসী হও’। (সুরা আলে-ইমরানের ১৩৮ আয়াত)।

 

Tag Cloud

%d bloggers like this: