Articles published in this site are copyright protected.

Archive for February, 2014

বিগত শতকের গুন্ডামী আজ চলচ্চিত্রের “গুন্ডে”

নাজমা মোস্তফা

সম্প্রতি “গুন্ডে” ছবিটি ভারতে তৈরী হয়ে রিলিজ হয়েছে বাংলা ও হিন্দীতে। অভিযোগ উঠেছে ওতে মুক্তিযুদ্ধের অবমাননা করা হয়েছে। আলী আব্বাস জাফর পরিচালিত চলচ্চিত্রটির নাম “গুন্ডে”। চলচ্চিত্রের শুরুর প্রথম ভাগেই হিন্দীতে বলা হয় ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে হিন্দুস্থান ও পাকিস্থানের মধ্যে তৃতীয় যুদ্ধ শেষ হয়। ৯০ হাজার পাকিস্থানী সেনা আত্মসমর্পণ করে আর জন্ম হয় বাংলাদেশ নামের এক নতুন দেশ। নাটকীয়ভাবে ম্যুভিটি সাজানো হয়। ভারতীয় সৈন্যদের কাছে আত্মসমর্পণ চলছে তার পিছনে থাকছে ত্রাণের গাড়ি থেকে রুটি ছুড়ে দেয়া হচ্ছে আর আসন্ন স্বাধীনতার অপেক্ষারত বাংলাদেশী হতভাগারা তা মাটি থেকে কুড়িয়ে খাচ্ছে। ফেসবুকে অনেকে অনেক মন্তব্য করে চলেছেন। মন্তব্যে আসছে এক মাতালের কাছ থেকে আর এক মাতালের কাছে গেছে বাংলাদেশ। প্রকৃতই বাংলাদেশের মানুষকে জাগতে হবে জানতে হবে প্রতিপক্ষের প্রতিটি ষড়যন্ত্র। দরকার ছিল কঠোর প্রতিবাদের কিন্তু মেরুদন্ডহীন গোলামের প্রতিবাদের ক্ষমতা সবদিনই কম। ইত্যবসরে গায়ের জোর মনের জোর সবই গত বিগত। হাসিনার পক্ষে কথায় কথায় পাকিস্থান পাকিস্থান করা যত সহজ, ভারত ভারত করতে ততধিক গলা শুকিয়ে যায়। এটি সাক্ষাৎ বিক্রি হওয়া গোলামীর নমুনা। ইন্টারনেটে এক সদস্য মুক্তিযুদ্ধের দলিল তুলে দিয়ে এর প্রতিবাদ করেছেন। বলেছেন এটি ভারতের প্রতিটি ঘরে ঘরে পৌছে দিতে এবং সবার আগে গুন্ডের পরিচালকের বাসাতে। “ডিভাইড এন্ড রুল” সবযুগে সবদিনই শয়তানির প্রধান অস্ত্র। ইবলিসও ঐ পথে এগিয়েছিল স্রষ্টার ও সৃষ্টির মাঝে বিভেদ আনতে, আদমকে গন্দুম খাইয়ে সে বুঝেয়েছিল স্রষ্টা তাদের শত্রু এবং ইবলিসই আদমের প্রকৃত বন্ধু। বৃটিশরা ঐ কৌশলে এ দেশ শাসন করেছে, মিরজাফর আর হিন্দু শেঠরা ছুটে গেছেন বৃটিশের পা টিপতে দেশ বিকিয়ে দিয়ে। যার পরিণতি ২০০ বছরের গোলামী।

স্বাধীনতার শুরু থেকেই কর্নেল ওসমানী ভারতীয়দের ঐ চক্রান্ত কমবেশী টের পান। প্রতিপক্ষের প্ররোচনাতে তৈরী হয় মুজিব বাহিনী এর উদ্দেশ্য ছিল কর্ণেল ওসমানী ও মুজিব বাহিনীর মাঝে একটি বিভেদ তৈরী করে রাখা। এটি ছিল ডিভাইড এন্ড রুল অস্ত্র  যা ছিল সেদিনের ছলবাজের হাতিয়ার। প্রকৃত নিবেদিতপ্রাণ মুক্তিযোদ্ধাদের কাছ থেকে জানা যায় প্রবাসী সরকারের মাঝে শুধু মাত্র দুইজন ব্যক্তি বাংলাদেশের প্রশ্নে খুবই শক্ত অবস্থানে ছিলেন তারা হচ্ছেন কর্ণেল ওসমানী ও খন্দকার মোশতাক আহমদ। এরা কখনোই চান নাই যে ভারত এখানে এসে যুদ্ধে নাক গলাক। ভারত আমাদের মুক্তিযুদ্ধে সাহায্যকারী হলেও প্রকৃত যুদ্ধ করেছে বাংলার দামাল ছেলেরা। অতীতের কোন যুদ্ধেই পাকিস্থানের সাথে ভারত পেরে উঠেনি, এ সত্য সবার জানা। এমনকি বর্ডারেও বিডিআরের সাথে তারা কুলিয়ে উঠতে পারতো না। দাপটের জবাবে প্রচন্ড থাপ্পড় খাবার পর মাথা নীচু করে তাদের ফেরত যেতে হয়েছে। তাই ঐ ক্ষেদ মেটাতেই ২০০৯ সালে ঐ মেরুদন্ডটি ভেঙ্গে দিতে ঘটানো হয় বিডিআর বিদ্রোহ। কৌশলে সরকারের ছত্রচ্ছায়ায় মেরে ফেলা হয় তার মেধাবীদেরে। বর্তমানের বিজিবি হচ্ছে ক্ষমতাহীন মেরুদন্ডভাঙ্গা গোলাম সরকারের গোলাম বর্ডার পাহারাদার। এদের কোন হুঙ্কারেরও ক্ষমতা নেই, এরা নামে মাত্র বর্ডারের সাক্ষী গোপাল। তাই বলা হচ্ছে তৃতীয় যুদ্ধ প্রথম দুই যুদ্ধে গুট্টা খেয়ে তৃতীয় যুদ্ধ শেষযুদ্ধ নামকরণ করছে তারা যদিও ওটি ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধ। এর প্রকৃত নায়করা হচ্ছে বাংলা মায়ের গেরিলা যোদ্ধারা। সুদীর্ঘ নয় মাসের অবর্ণনীয় দুঃখ দূর্দশার পর এর সার্বিক দিক সামাল দেয় জীবন বাজি রেখে মুক্তিপাগল সেনাপতি, পূর্ব পাকিস্থান প্রত্যাগত সৈন্য ও মুক্তিযোদ্ধারা। “গুন্ডে” ম্যুভিটি একটি জাতির প্রকৃত ইতিহাসকে মুক্তিযোদ্ধার অর্জনকে ছিনিয়ে নিতে এটি ইতিহাসের জলজ্যান্ত প্রতারণার উদাহরণ। ভারত যুদ্ধ শেষের মঞ্চ নাটক যা করলো অনেকটাই অযোগ্য প্রতারক মিরজাফরকে যেভাবে কাঁচকলা দেখিয়েছিল বৃটিশরা সে একই খেল দেখালো বাংলাদেশের সুযোগ্য সম্মানিত বীর সেনাপতি কর্ণেল ওসমানীর প্রতি ভারতীয়রা। সরজমিনে যখন তারা দেখলো বিজয় দ্বারপ্রান্তে, তখনই তারা কর্ণেল ওসমানীকে এড়িয়ে যেতে থাকে। মওলানা ভাসানীর মত নীতিবাগিশদেরে সবদিনই ভারতের ভয়। তাই শুরু থেকেই তার উপর কড়া চোখ রেখে তাকে ভারতে নজরবন্দীর মত করে রাখা হয়। যাদেরে কোন টোপ দিয়ে কেনা যায় না, এরা সবদিনই ছলবাজের জন্য ঘোর বিপদ। এরা ডিভাইড এন্ড রুলের কাঁটা।

আজ বামপন্থীরা হাসিনার সাথে ভাগের মাল অর্জনে ভিড়েছেন যদিও কিন্তু তারা স্বাধীনতা সংগ্রামকে বলতো “কুকুরে কুকুরে লড়াই”। সেহিসাবে বামপন্থীরা সবদিনই উল্টা পথে হেটেছে, আজও এদের কিছুরা জাতিকে তলানীতে নিয়ে যেতে সহযোগীতা দিয়ে যাচ্ছে। যখন গোটা দেশ মুক্তিযোদ্ধাদের নখদর্পনে, তখন ভারতীয় বাহিনীকে অগ্রসর হওয়ার জন্য ব্রিজহেড করে দিচ্ছিল বাংলার দামাল মুক্তিযোদ্ধারা। যার প্রেক্ষিতে তড়িৎ গতীতে তারা ঢাকা পৌছে যেতে পারে মাত্র ১২ দিনে। চব্বিশ বছর অবদি যে সেতু পার হতে ভারতীয়রা অনেক প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হচ্ছিল তারাই অতি অল্পে মাত্র দেড় সপ্তাহে বাজিমাৎ করলো বাংলাদেশের দামাল মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে। দলবাজি ছেড়ে জাতিকে জানতে হবে চিনতে হবে প্রতারকদের চরিত্র ও এর গভীরতা; কতদূর শিকড় গাড়তে পারে। দলমত নির্বিশেষে শত্রু মিত্র চিনে নেয়া বর্তমান সময়ের সবচেয়ে উৎকৃষ্ট কাজ। কে আপনার বুকে ছুরি বসাবে তাকে আপনার চিনে নিতেই হবে, যদি আপনি বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখেন। আর যদি মরেই যেতে চান তবে মরার ভান করেই পড়ে থাকুন। ধরে নিবেন আপনি চির শৃংখলিত, মৃত। এমন শৃংখলে সচেতনরা আতংকিত হয়েছেন, ধরে নিয়েছেন অরক্ষিত স্বাধীনতা পরাধীনতারই নামান্তর।

মূল থেকে আদর্শহীন নেতৃত্বের শিকার হয়ে পড়ে আওয়ামীরা কমবেশী। গোটা দেশ থেকে ভারতে পালিয়ে যাবার সময় এক শ্রেণীর আওয়ামী নেতারা সেদিন থেকেই লুটের বানিজ্যে বাড়তি দক্ষতা নিয়ে জড়িয়ে পড়ে। সারা দেশ থেকে সম্পদ লুটে তারা ভারতে পালিয়ে গিয়েছিল। প্রথমত যুদ্ধের গোটা অর্ধেকটা সময় মুক্তিযুদ্ধ চালিয়েছে প্রধানত পাকিস্থানীদের থেকে ছিনিয়ে নেয়া, ফেলে যাওয়া অস্ত্রশস্ত্রই ছিল প্রাথমিক মুক্তিযোদ্ধাদের প্রথম সম্বল। বাংলাদেশের মূলো দেখিয়ে ভারত বিদেশ থেকে অনেক সহায় সহযোগিতা পায় যদিও, তবে জানা যায় এর অতি ক্ষুদ্র অংশই তারা বাংলাদেশীদের পেছনে খরচ করে। এর গোটামোটা অংশই ঢুকে ভারতের পেটে। এরকম একটি যুদ্ধে ভারতের মত এক দোস্তের ভাগ্য সবদিকেই লাভের মূলো ঝুলতে থাকে। এমনকি মাঝে মাঝে ভারতীয় পক্ষ থেকে মুক্তিযোদ্ধাদেরে বাংলাদেশে লুটপাটের জন্যও পাঠানো হতো যাতে তারা এদেশ লুন্ঠন করে নেয়, যা কোন সময়ই মুক্তিযোদ্ধারা ভাল চোখে দেখে নি। এসব নানান প্রশ্নে ভারতীয় ও মুক্তিযোদ্ধাদের মাঝে বিশ্বাসের দ্বন্ধ সব সময়ই ছিল। কর্ণেল ওসমানীসহ মূল নিবেদিতপ্রাণ মুক্তিযোদ্ধারা দীর্ঘস্থায়ী ও নিজবলে যুদ্ধ চালিয়ে যাবার পক্ষপাতি ছিলেন। কিন্তু ভারতীয় উদ্দেশ্য ও চক্রান্ত সবদিনই ছিল জটিল ও দুরভিসন্ধিভরা।

১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১সালে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে বাংলাদেশের পক্ষে থাকবেন মুক্তিফৌজের কমান্ডার ইন চিফ এবং যৌথ কমান্ডের প্রধান কর্ণেল ওসমানী। তার আমন্ত্রণে মিত্র বাহিনীর কমান্ডার জেনারেল অরোরা স্বাধীন বাংলাদেশে আসবেন। মূল দলিলে যৌথ কমান্ডের তরফ থেকে তাদের শীর্ষ ব্যক্তি কর্ণেল ওসমানীই সাক্ষর করবেন। এটি ছিল সমগ্র জাতির প্রত্যাশা ও প্রকৃত যুদ্ধের সততা ও বাস্তবতা। সেদিন অদৃশ্য শক্তির অঙ্গুলী হেলনে মুক্তিফৌজের সর্বাধিনায়ক কর্ণেল ওসমানীকে ১৬ই ডিসেম্বরের সে ঐতিহাসিক অর্জন থেকে ছিনিয়ে নেবার কৌশলে সেখানে উপস্থিত হতে দেয়া হয়নি। এমন কি ঢাকা কিংবা বড় বড় শহরগুলোতে পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধা সদস্যকে ১৬ই ডিসেম্বরের অনেক পরে ঢুকতে দেয়া হয়। সবই দুরভিসন্ধির অংশ, তাদেরে কৌশলে আটকে রাখা হয় নিজেদের সৈন্যদের কৃতিত্ব জাহির করার জন্য। আজ সুদীর্ঘ চল্লিশ বছরেরও বেশী সময় থেকে প্রকৃত নিবেদিতপ্রাণ মুক্তিযোদ্ধারা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ছেন। তারপরও আজো তারা এর জবাব পান নাই। আজ দেশবাসীকে সব অংক সতর্কভাবেই করতে হবে। আপনারা জানেন কর্ণেল ওসমানীর মত একজন সেনাপতির অর্জনকে বর্তমান দাস সরকার কেন জানি ভালো চোখে দেখে না। এবার নিশ্চয় অনেকে বুঝতে পারবেন ঐ লেন্দুপদর্জি দাস সরকারের নেতিবাচক অবস্থানের মূল কারণ তার “আত্মবিকৃত অবস্থান মাত্র”। তাই এই “গুন্ডে” ছবির প্রকৃত চালবাজ ভারত সরকার, ছবির পরিচালক নন। কর্ণেল ওসমানী চেয়েছিলেন নতুন দেশটির মুক্তিফৌজের সর্বাধিনায়ক হিসাবে তিনিই অভিনন্দন জানাবেন মিত্র বাহিনীর জুনিয়র পার্টনার জেনারেল অরোরাকে। এতে করে বিশ্ব পরিসরে প্রকৃত বাস্তবতাই প্রমাণিত হবে মূলতঃ মুক্তিযোদ্ধারা দেশ স্বাধীন করেছে, যদিও ভারতীয়রা সহায়ক শক্তি হয়ে সাহায্য করেছে। বাংলাদেশীরা কোনদিনই অকৃতজ্ঞ জাতি নয়। তারা সবদিনই এ সহযোগিতাকে সানন্দে স্বীকার করেছে। তাই বলে বন্ধুত্বের নামে লুটেরা ভারতের এত অত্যাচার মুখ বুজে সহ্য করার কোন যুক্তি নেই। যে পাকিস্থানের অনাচার তারা ২৪ বছরও সইলো না তারা কোন আক্কেলে ভারতের অনাচার সইবে? কিন্তু উপরোক্ত ঘটনা ঘটিয়ে ভারত প্রকারান্তরে চৌর্যবৃক্তির অপবাদ নিজের ঘাড়ে তুলে নিল। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ কোন মিথ্যা ইতিহাস নয় যে বিশ্ব এর কিছুই জানে না। এবার যদি ছবির মাঝে তার দ্বিতীয় অর্জন মনে করে থাকে তাতে তাদের অপঅর্জন আরো এক পা বাড়ালো। বিধাতার দরগাহে আরশের অধিপতির কাছে এটি জমা আছেই, তারপরও বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছেও এরকম অনাচারের খবর গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে হবে।   

বিপন্ন এ দেশটিকে স্বাধীনতার নাম নিয়ে কিভাবে শুরু থেকেই আরো বিভৎস অবস্থার সম্মুক্ষিণ হতে হয়েছে এ তার একটু নমুনা মাত্র। এ কষ্টের কথা সুস্পষ্ট হয়েছে একজন মেজরের বাস্তবে পরখ করে দেখা তার সৃষ্টিশীল লেখনীতে, অতিবাস্তব অবস্থানে নিজ চোখে দেখা একজন সৈনিকের দৃষ্টিতে তিনি তা চিত্রায়িত করেছেন। তিনি হচ্ছেন মেজর (অবঃ) এম এ জলিল। তার “অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা” বইতে তিনি বিস্তারিত আলোকপাত করেছেন আমি শুধু কিছু পয়েন্টকে পাঠকের সামনে তুলে ধরবো শুধু এর গভীর সত্যটুকু উপলব্ধি করার জন্য। এর প্রতিটি ধাপ আমাদের নিজেদের চোখেও পরখ করা। আমরা নিজেরাও এর নীরব সাক্ষী। এ লুন্ঠন প্রক্রিয়া আমি ব্যক্তিগতভাবেও দেখেছি কারণ বর্ডার সংলগ্ন আমাদের নিজেদের বাড়ী হওয়ার কারণেও বাড়ীর সামনে দিয়ে ট্রেন বোঝাই বিশাল সাধারণ থেকে কয়েকগুণ লম্বা ট্রেনগুলো দু’পাশের সিগনাল ছোঁয়া মালগাড়ীর বিরাট বহর নিয়ে যাবার সময় সবকটি বগি আগাগোড়া বন্ধ থাকতো। নিজ চোখে দেখেছি দেশের সব সস্পদ কিভাবে লুটেরা ভারতীয়রা জবরদখল করে নিয়ে যায়। স্তম্ভিত হয়ে দেখেছি দিনের পর দিন ষ্টেশনের এ মাথা থেকে ওমাথা অবধি লম্বা টেনের বগিতে ঠাসা সদ্যমুক্ত দেশের মালামাল লুটের নমুনা। আমরা ধারণাও করতে পারতাম না, কি সব যাচ্ছে ঐ বর্ডার পার হয়ে। যখন ঐ মেজরের বইটি পড়ি তখন মনে মনে মিলাই নিজ চোখে দেখা চিত্রগুলো। যুদ্ধ পরবর্তী অতিলোভী বড়দীর এসব অপকর্ম দেখে উপস্থিত সবাই নির্বাক। ঠিক একইভাবে আসার পথে ট্রেনের বগির সবকটি দরজা খোলা থাকতো। বন্ধ থাকলে আমরা মনে করতে পারতাম যে দিদিও কিছু দিয়েছে, লুটেপুটে শুধু নেয়নি, বড়দির কিছু বড়ত্বও দেখিয়েছে। এতে আরো বোঝা যেত বাংলার সব সম্পদ বগলদাবা করে ফেরত খোলা ট্রেনের কম্পার্টমেন্ট তার নাড়িভুড়ি দেখিয়ে দেখিয়ে আবার ঝাকার ঝুম্মুর ঝাকার ঝুম্মুর আওয়াজ করতে করতে ফেরত দেউলিয়া হয়ে আমাদের ষ্টেশন সংলগ্ন বাড়ীটির পাশ দিয়ে ঘটনার দাগ চিহ্ন রেখে পার হয়ে যেত। আমি সিলেটের ভিন্ন বর্ডার সংলগ্ন অবস্থান নিজ চোখে দেখেছি সারাক্ষণ, আর মনের মাঝে কষ্ট পেয়েছি, তখনকার আমরা সব নির্বাক দর্শনার্থীরা। সারা দেশেই এ লঙ্কাকান্ড ঘটেছে। নীচে যশোহর খুলনার একজন মুক্তিযোদ্ধা স্ববাক মেজর জলিলের বক্তব্য থেকে যশোরের অবস্থান সম্বন্ধে হালকা একটু ছোঁয়া আনছি।

 

বাংলাদেশে ভারতীয় বাহিনীর পরিকল্পিত লুন্ঠন: মেজর জলিল।

(১)        ভারতের  সম্প্রসারণবাদী প্রতিক্রিয়াশীল শাসক গোষ্ঠী মুক্তিযুদ্ধের শেষপর্বে সমগ্র মুক্তিযোদ্ধার ভয়ে ভীত হয়েই বাঙালীর স্বাধীনতার গৌরবকে জবরদখলের মধ্য দিয়ে নিজেদের হীন স্বার্থ উদ্ধার করেছে মাত্র। — দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধারা ১৬ই ডিসেম্বরের পরে মিত্র বাহিনী হিসাবে পরিচিত ভারতীয় সেনাবাহিনীকে নব্য স্বাধীন বাংলাদেশের বিভিন্ন সম্পদ মালামাল লুন্ঠন করতে দেখেছে। সে লুন্ঠন ছিল পরিকল্পিত লুন্ঠন সৈন্যদের স্বতস্ফুর্ত উল্লাসের বহিঃপ্রকাশ স্বরুপ নয়। সে লুন্ঠনের চেহারা ছিল বিভৎস – বেপোরোয়া।

(২)       মুক্তিযুদ্ধের নবম সেক্টরের অধিপতি হিসাবে আমি সেই মটিভেটেড লুন্ঠনের তীব্র বিরোধীতা করেছি। সক্রিয় প্রতিরোধও গড়ে তুলতে চেষ্টা করেছি। লিখিতভাবেও এই লুন্ঠনের প্রতিবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী জনাব তাজউদ্দিন, কর্ণেল ওসমানী এবং ভারতীয় পূর্ব অঞ্চলের সর্বাধিনায়ক লেঃ অরোরার কাছে জরুরী চিঠিও পাঠিয়েছি। তাজউদ্দিন সাহেবের পাবলিক রিলেশন অফিসার জনাব আলী তারেকই আমার সেই চিঠি বহন করে কলকাতায় নিয়েছিলেন। ১৭ই ডিসেম্বর রাতেই সেই বিশেষ চিঠিখানা পাঠানো হয়েছিল। খুলনা শহরে লুটপাটের যে তান্ডব নৃত্য চলছে তা তখন কে না দেখেছে। ভারতীয় সেনাবাহিনী কর্তৃক সেই লুটপাটের খবর চারদিক থেকে আসা শুরু করে। পাকিস্থান বাহিনী কর্তৃক পরিত্যক্ত কয়েক হাজার সামরিক বেসামরিক গাড়ী, অস্ত্র, গোলাবারুদসহ আরো অনেক মূল্যবান জিনিসপত্র ট্রাক বোঝাই করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। প্রাইভেট কার পর্যন্ত যখন রক্ষা পায় নি। তখনই কেবল আমি খুলনা শহরে প্রাইভেট গাড়ীগুলো রিকুইজিশন করে খুলনা সাকিঁট হাউস ময়দানে হেফাজতে রাখার চেষ্টা করি। এর পূর্বে যেখানে যে গাড়ী পেয়েছে সেটাকেই পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে সীমান্তের ওপারে।

(৩)       যশোহর সেনানিবাসের প্রত্যেকটি অফিস এবং কোয়ার্টার তন্ন তন্ন করে লুট করেছে। বাথরুমের মিরর এবং অন্যান্য ফিটিংসগুলো পর্যন্ত সেই লুটতরাজ থেকে রেহাই পায়নি। রেহাই পায়নি নিরীহ পথযাত্রীরা। কথিত মিত্র বাহিনীর এই ধরণের আচরণ জনগণকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে তুলেছিল।

(৪)        ভারতীয় বাহিনীর আচরণে আমি বিক্ষুব্ধই হয়ে উঠিনি বরং তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করার পর্যায়ে চলে গেলাম। খুলনার নিউজপ্রিন্ট মিলের রেষ্ট হাউজে অবস্থানরত আমার প্রতিপক্ষ ভারতীয় সেনাবাহিনীর অধিনায়ক মেজর জেনারেল দানবীর সিংকে আমি সতর্ক করে দিয়ে বললাম – দেখা মাত্র গুলির হুকুম দিয়েছি আমি। ভারতীয় সেনাবাহিনীকে লুটতরাজ করা হতে বিরত রাখুন।

(৫)       খুলনা পরিত্যাগ করতে হলে নাকি ভারতীয় সেনাবাহিনী কমান্ডোর হুকুম নিতে হবে এ কথা শোনার পরে ভারতের আসল মতলবখানা আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে উঠল। আমি সেক্টর কমান্ডার হিসাবে ভারতীয় নির্দেশ মেনে চলতে মোটেও বাধ্য ছিলাম না। পাকিস্থান সেনাবাহিনীর ব্যুহ্য ভেঙ্গে দেশ মুক্ত করলাম “ভারতীয় সেনাবাহিনীর নির্দেশ মেনে চলার জন্য নয়। একটি মুক্তিপিপাসু জাতির ভাবাবেগ অনুধাবন করতে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ কেবল চরমভাবে ব্যর্থই হয়নি, বরং অনুধাবন করার সামান্যতম ধৈর্যও প্রদর্শন করেনি তারা। 

(৬)       ভারতীয় বাহিনীর এই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধেও আমি  জনসভাগুলোকে সোচ্চার হয়ে উঠলাম। আমার পরিষ্কার নির্দেশ ছিল পশ্চিম পাকিস্থানে বন্দী স্বাধীন বাংলার স্থপতি জনগণের প্রাণপ্রিয় নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্ত না করা পর্যন্ত বাঙালী জনগণের মুক্তিযুদ্ধ চলতে থাকবে। শেখ মুজিবের হস্তেই কেবল মুক্তিযোদ্ধারা তাদের অস্ত্র সমর্পণ করে দেবে।

(৭)        আমারই সাধের স্বাধীন বাংলায় আমিই হলাম প্রথম রাজবন্দী। ৩১শে ডিসেম্বর বেলা ১০টা সাড়ে দশটায় আক্রমণকারী বাহিনীর হাতে বন্দী হয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার আসল রুপের প্রথম দৃশ্য দেখলাম আমি। ভারতীয় সৈন্যবাহিনীর মদদে বাংলাদেশ স্বাধীন করার অর্থ এবং তাৎপর্য বুঝে উঠতে আমার তখন আর এক মিনিটও বিলম্ব হয়নি।

(৮)       রাত ১২টা ১ মিনিটে যশোর সেনা ছাউনি নতুন বছরের উজ্জীবনী গীতিতে মুখর হয়ে উঠল। নারী-পুরুষের যৌথ কন্ঠের মন মাতানো সঙ্গীত নাচ, হাত তালি ঘুঙুরের ঝনঝনানি, উল্লাস, উন্মাদনা সবই ভেসে আসছিল কর্ণকুহরে। আমার মাটিতে প্রথম নববর্ষেই আমি অনুপস্থিত। — রাতের ঘুটঘুটে সেই অন্ধকারে আমি সেদিন কম্বল জড়িয়েও ঘেমে উঠেছিলাম, শিহরিয়ে উঠেছিলাম পুনঃপুনঃ। স্বাধীনতার সতেরো বছর পরেও আমি নিশ্চিত হতে পারছি না। অন্ধকারে আজো আমি একইভাবে শিহরে উঠি আর যেন শুনতে পাই – “রক্ত দিয়ে এই স্বাধীনতা আনলে তোমরা”!

জাতিকে জানতে হবে তাদের প্রকৃত বাস্তবতা। ৭১এর প্রথম রাজবন্দী মেজর জলিল। সেদিন থেকে আজ অবদি রাজনীতির ভারতীয় দলদাস আওয়ামী নামের দলটি ও তার পরবর্তী বিতর্কিত অজস্র কর্মকান্ড এ জাতিকে বিপন্ন দশাতে নিয়ে পৌছিয়েছে। তাই তাদের চোখে কর্নেল ওসমানী আজ চক্ষুশূল। মেজর জিয়া রাজাকার। ভাসানী আজ অতীতের ফেলনা যার নাম নিতে গলাতে তাদের দম আটকায়। এক কথায় জাতির বৃহত্তর স্বার্থে আজকের চিহ্নিত আওয়ামীরা বাংলাদেশের কেউ নয়, অতীতেও যুদ্ধ চলাকালিন সময়েও তাদের অনেক অপকর্ম ইতিহাস হয়ে আছে। তারপরও জাতির সাধারণ সোনার ছেলেরা সেদিন যুদ্ধ করে বিজয় ছিনিয়ে এনেছে। বাংলাদেশীর মৌলিক আদর্শ বিরোধী আওয়ামীদের প্রকৃত স্বরুপ বুঝে নেবার দিন এসেছে। প্রতারককে চেনার জন্য ৪০ বছর অনেক বড় একটি সময়। প্রতিটি সত্ত্বাকে চিনে নিতে হবে সঠিক দাগচিহ্ন দেখে, সে প্রতিদিনই তার অপকর্মের দাগ রেখে যাচ্ছে। জাতির ঘোর দুর্দিনে ধান্ধাবাজ শত্রু বন্ধু সেজে উপস্থিত হলেও নিজ কপট স্বার্থে নিজের আসল স্বরুপ উন্মোচন হয়ে গেছে। এদেরে চিনতে ভুল করার কোন অবকাশ নেই। তাই আজকের “গুন্ডে” যেন হয় বাংলাদেশীদের মগজের ধোলাই, আসন্ন প্রতিরোধ সংগ্রামের শ্রেষ্ঠ হাতিয়ার।  

 

বি দ্র: লেখাটি বিগত সময়ে বাংলাদেশ সরকারের সিলগালা করার আগে বাংলাদেশে দৈনিক আমার দেশ থেকে ফেব্রুয়ারীর ২৪ তারিখের অনলাইনে ছাপা হয়।

 

লেখার সময়: একুশে ফেব্রুয়ারী ২০১৪ সাল। একুশে ফেব্রুয়ারী ২০১৪ সাল।

বিগত শতকের গুণ্ডামি আজ চলচ্চিত্রের ‘গুণ্ডে’

না জ মা মো স্ত ফা

সম্প্রতি ‘গুণ্ডে’ ছবিটি ভারতে তৈরি হয়ে রিলিজ হয়েছে বাংলা ও হিন্দিতে। অভিযোগ উঠেছে, ওতে মুক্তিযুদ্ধের অবমাননা করা হয়েছে। আলী আব্বাস জাফর পরিচালিত চলচ্চিত্রটির নাম ‘গুণ্ডে’। চলচ্চিত্রের শুরুর প্রথম ভাগেই হিন্দিতে বলা হয়, ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর হিন্দুস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যে তৃতীয় যুদ্ধ শেষ হয়। ৯০ হাজার পাকিস্তানি সেনা আত্মসমর্পণ করে আর জন্ম হয় বাংলাদেশ নামের এক নতুন দেশ। নাটকীয়ভাবে মুভিটি সাজানো হয়। ভারতীয় সৈন্যদের কাছে আত্মসমর্পণ চলছে, তার পেছনে থাকছে ত্রাণের গাড়ি, যা থেকে রুটি ছুড়ে দেয়া হচ্ছে আর আসন্ন স্বাধীনতার অপেক্ষারত বাংলাদেশী হতভাগারা তা মাটি থেকে কুড়িয়ে খাচ্ছে।

ফেসবুকে অনেকে অনেক মন্তব্য করে চলেছেন। মন্তব্যে আসছে এক মাতালের কাছ থেকে আরেক মাতালের কাছে গেছে বাংলাদেশ। প্রকৃতই বাংলাদেশের মানুষকে জাগতে হবে, জানতে হবে প্রতিপক্ষের প্রতিটি ষড়যন্ত্র। দরকার ছিল কঠোর প্রতিবাদের, কিন্তু মেরুদণ্ডহীন গোলামের প্রতিবাদের ক্ষমতা সব দিনই কম। ইত্যবসরে গায়ের জোর মনের জোর সবই গত-বিগত। হাসিনার পক্ষে কথায় কথায় ‘পাকিস্তান, পাকিস্তান’ করা যত সহজ, ‘ভারত, ভারত’ করতে ততোধিক গলা শুকিয়ে যায়। এটি সাক্ষাৎ বিক্রি হওয়া গোলামির নমুনা। ইন্টারনেটে এক সদস্য মুক্তিযুদ্ধের দলিল তুলে দিয়ে এর প্রতিবাদ করেছেন। বলেছেন, এটি ভারতের প্রতিটি ঘরে পৌঁছে দিতে এবং সবার আগে গুণ্ডের পরিচালকের বাসাতে। ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’—সব যুগে সব দিনই শয়তানির প্রধান অস্ত্র। ইবলিসও ওই পথে এগিয়েছিল স্রষ্টার ও সৃষ্টির মাঝে বিভেদ আনতে, আদমকে গন্ধম খাইয়ে সে বুঝেয়েছিল স্রষ্টা তাদের শত্রু এবং ইবলিসই আদমের প্রকৃত বন্ধু। ব্রিটিশরা ওই কৌশলে এ দেশ শাসন করেছে, মিরজাফর আর হিন্দু শেঠরা ছুটে গেছেন ব্রিটিশের পা টিপতে দেশ বিকিয়ে দিয়ে, যার পরিণতি ২০০ বছরের গোলামি।

স্বাধীনতার শুরু থেকেই কর্নেল ওসমানী ভারতীয়দের ওই চক্রান্ত কম-বেশি টের পান। প্রতিপক্ষের প্ররোচনাতে তৈরি হয় মুজিব বাহিনী। এর উদ্দেশ্য ছিল কর্নেল ওসমানী ও মুজিব বাহিনীর মাঝে একটি বিভেদ তৈরি করে রাখা। এটি ছিল ডিভাইড অ্যান্ড রুল অস্ত্র, যা ছিল সেদিনের ছলবাজের হাতিয়ার। প্রকৃত নিবেদিতপ্রাণ মুক্তিযোদ্ধাদের কাছ থেকে জানা যায়, প্রবাসী সরকারের মাঝে শুধু দুই ব্যক্তি বাংলাদেশের প্রশ্নে খুবই শক্ত অবস্থানে ছিলেন। তারা হচ্ছেন কর্নেল ওসমানী ও খন্দকার মোশতাক আহমদ। এরা কখনোই চাননি, ভারত এখানে এসে যুদ্ধে নাক গলাক। ভারত আমাদের মুক্তিযুদ্ধে সাহায্যকারী হলেও প্রকৃত যুদ্ধ করেছে বাংলার দামাল ছেলেরা। অতীতের কোনো যুদ্ধেই পাকিস্তানের সঙ্গে ভারত পেরে ওঠেনি, এ সত্য সবার জানা। এমনকি বর্ডারেও বিডিআরের সঙ্গে তারা কুলিয়ে উঠতে পারত না। দাপটের জবাবে প্রচণ্ড থাপ্পড় খাবার পর মাথা নিচু করে তাদের ফেরত যেতে হয়েছে।

তাই ওই ক্ষেদ মেটাতেই ২০০৯ সালে ওই মেরুদণ্ডটি ভেঙে দিতে ঘটানো হয় বিডিআর বিদ্রোহ। কৌশলে সরকারের ছত্রচ্ছায়ায় মেরে ফেলা হয় তার মেধাবীদের। বর্তমানের বিজিবি হচ্ছে ক্ষমতাহীন মেরুদণ্ডভাঙা গোলাম সরকারের গোলাম বর্ডার পাহারাদার। তাদের কোনো হুঙ্কারেরও ক্ষমতা নেই, তারা নামে মাত্র বর্ডারের সাক্ষী গোপাল। তাই বলা হচ্ছে, তৃতীয় যুদ্ধ। প্রথম দুই যুদ্ধে গুট্টা খেয়ে তৃতীয় যুদ্ধ শেষযুদ্ধ নামকরণ করছে তারা, যদিও ওটি ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধ। এর প্রকৃত নায়করা হচ্ছে বাংলা মায়ের গেরিলা যোদ্ধারা। সুদীর্ঘ নয় মাসের অবর্ণনীয় দুঃখ-দুর্দশার পর এর সার্বিক দিক সামাল দেয় জীবন বাজি রেখে মুক্তিপাগল সেনাপতি, পূর্ব পাকিস্তান প্রত্যাগত সৈন্য ও মুক্তিযোদ্ধারা। গুণ্ডে মুভিটি একটি জাতির প্রকৃত ইতিহাসকে, মুক্তিযোদ্ধার অর্জনকে ছিনিয়ে নিতে ইতিহাসের জলজ্যান্ত প্রতারণার উদাহরণ। ভারত যুদ্ধ শেষের মঞ্চনাটক যা করল, অনেকটাই অযোগ্য প্রতারক মিরজাফরকে যেভাবে কাঁচকলা দেখিয়েছিল ব্রিটিশরা, সে একই খেল দেখালো বাংলাদেশের সুযোগ্য সম্মানিত বীর সেনাপতি কর্নেল ওসমানীর প্রতি ভারতীয়রা। সরেজমিনে যখন তারা দেখল বিজয় দ্বারপ্রান্তে, তখনই তারা কর্নেল ওসমানীকে এড়িয়ে যেতে থাকে। মওলানা ভাসানীর মতো নীতিবাগিশদেরে সব দিনই ভারতের ভয়। তাই শুরু থেকেই তার ওপর কড়া নজর রেখে তাকে ভারতে নজরবন্দি করার মতো করে রাখা হয়। যাদের কোনো টোপ দিয়ে কেনা যায় না, তারা সবদিনই ছলবাজের জন্য ঘোর বিপদ। তারা ডিভাইড অ্যান্ড রুলের কাঁটা।

আজ বামপন্থীরা হাসিনার সঙ্গে ভাগের মাল অর্জনে ভিড়েছেন যদিও কিন্তু তারা স্বাধীনতা সংগ্রামকে বলতেন, ‘কুকুরে কুকুরে লড়াই।’ সে হিসাবে বামপন্থীরা সব দিনই উল্টা পথে হেঁটেছে, আজও তাদের কিছুরা জাতিকে তলানিতে নিয়ে যেতে সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে। যখন গোটা দেশ মুক্তিযোদ্ধাদের নখদর্পণে, তখন ভারতীয় বাহিনীকে অগ্রসর হওয়ার জন্য ব্রিজহেড করে দিচ্ছিল বাংলার দামাল মুক্তিযোদ্ধারা। যার প্রেক্ষিতে তড়িৎ গতিতে তারা ঢাকা পৌঁছে যেতে পারে মাত্র ১২ দিনে। চব্বিশ বছর অবধি যে সেতু পার হতে ভারতীয়রা অনেক প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হচ্ছিল, তারাই অতি অল্পে মাত্র দেড় সপ্তাহে বাজিমাত করল বাংলাদেশের দামাল মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে। দলবাজি ছেড়ে জাতিকে জানতে হবে, চিনতে হবে প্রতারকদের চরিত্র ও এর গভীরতা—কতদূর শিকড় গাড়তে পারে। দলমত নির্বিশেষে শত্রু-মিত্র চিনে নেয়া বর্তমান সময়ের সবচেয়ে উৎকৃষ্ট কাজ। কে আপনার বুকে ছুরি বসাবে তাকে আপনার চিনে নিতেই হবে, যদি আপনি বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখেন। আর যদি মরেই যেতে চান, তবে মরার ভান করেই পড়ে থাকুন। ধরে নেবেন আপনি চিরশৃঙ্খলিত, মৃত। এমন শৃঙ্খলে সচেতনরা আতঙ্কিত হয়েছেন, ধরে নিয়েছেন অরক্ষিত স্বাধীনতা পরাধীনতারই নামান্তর।

মূল থেকে আদর্শহীন নেতৃত্বের শিকার হয়ে পড়ে আওয়ামীরা কম-বেশি। গোটা দেশ থেকে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার সময় একশ্রেণীর আওয়ামী নেতারা সেদিন থেকেই লুটের বাণিজ্যে বাড়তি দক্ষতা নিয়ে জড়িয়ে পড়ে। সারা দেশ থেকে সম্পদ লুটে তারা ভারতে পালিয়ে গিয়েছিল। প্রথমত যুদ্ধের গোটা অর্ধেকটা সময় মুক্তিযুদ্ধ চালিয়েছে মুক্তিযোদ্ধারা। প্রধানত পাকিস্তানিদের থেকে ছিনিয়ে নেয়া ফেলে যাওয়া অস্ত্রশস্ত্রই ছিল প্রাথমিকভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রথম সম্বল। বাংলাদেশের মুলো দেখিয়ে ভারত বিদেশ থেকে অনেক সহযোগিতা পায়, যদিও জানা যায় এর অতি ক্ষুদ্র অংশই তারা বাংলাদেশীদের পেছনে খরচ করে। এর গোটামোটা অংশই ঢোকে ভারতের পেটে। এরকম একটি যুদ্ধে ভারতের মতো এক দোস্তের ভাগ্যে সব দিকেই লাভের মুলো ঝুলতে থাকে। এমনকি মাঝে মাঝে ভারতীয় পক্ষ থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের বাংলাদেশে লুটপাটের জন্যও পাঠানো হতো যাতে তারা এসব এদেশ লুণ্ঠন করে নেয়, যা কোনো সময়ই মুক্তিযোদ্ধারা ভালো চোখে দেখেনি। এসব নানা প্রশ্নে ভারতীয় ও মুক্তিযোদ্ধাদের মাঝে বিশ্বাসের দ্বন্দ্ব সব সময়ই ছিল। কর্নেল ওসমানীসহ মূল নিবেদিতপ্রাণ মুক্তিযোদ্ধারা দীর্ঘস্থায়ী ও নিজবলে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষপাতী ছিলেন। কিন্তু ভারতীয় উদ্দেশ্য ও চক্রান্ত সব দিনই ছিল জটিল ও দুরভিসন্ধিতে ভরা। 

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে বাংলাদেশের পক্ষে থাকবেন মুক্তিফৌজের কমান্ডার ইন চিফ এবং যৌথ কমান্ডের প্রধান কর্নেল ওসমানী। তার আমন্ত্রণে মিত্রবাহিনীর কমান্ডার জেনারেল অরোরা স্বাধীন বাংলাদেশে আসবেন। মূল দলিলে যৌথ কমান্ডের তরফ থেকে তাদের শীর্ষ ব্যক্তি কর্নেল ওসমানীই স্বাক্ষর করবেন। এটি ছিল গোটা জাতির প্রত্যাশা ও প্রকৃত যুদ্ধের সততা ও বাস্তবতা। সেদিন অদৃশ্য শক্তির অঙ্গুলি হেলনে মুক্তিফৌজের সর্বাধিনায়ক কর্নেল ওসমানীকে ১৬ ডিসেম্বরের সে ঐতিহাসিক অর্জন থেকে ছিনিয়ে নেয়ার কৌশলে সেখানে উপস্থিত হতে দেয়া হয়নি। এমনকি ঢাকা কিংবা বড় বড় শহরে পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধা সদস্যকে ১৬ ডিসেম্বরের অনেক পরে ঢুকতে দেয়া হয়। সবই দুরভিসন্ধির অংশ। তাদের কৌশলে আটকে রাখা হয় নিজেদের সৈন্যদের কৃতিত্ব জাহির করার জন্য। আজ সুদীর্ঘ চল্লিশ বছরেরও বেশি সময় থেকে প্রকৃত নিবেদিতপ্রাণ মুক্তিযোদ্ধারা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ছেন। তারপরও আজও তারা এর জবাব পাননি। আজ দেশবাসীকে সব অঙ্ক সতর্কভাবেই করতে হবে।

আপনারা জানেন কর্নেল ওসমানীর মতো একজন সেনাপতির অর্জনকে বর্তমান দাস সরকার কেন জানি ভালো চোখে দেখে না। এবার নিশ্চয়ই অনেকে বুঝতে পারবেন, ওই লেন্দুপদর্জি দাস সরকারের নেতিবাচক অবস্থানের মূল কারণ তার ‘আত্মবিকৃত অবস্থান মাত্র’। তাই এই ‘গুণ্ডে’ ছবির প্রকৃত চালবাজ ভারত সরকার, ছবির পরিচালক নন। কর্নেল ওসমানী চেয়েছিলেন নতুন দেশটির মুক্তিফৌজের সর্বাধিনায়ক হিসেবে তিনিই অভিনন্দন জানাবেন মিত্রবাহিনীর জুনিয়র পার্টনার জেনারেল অরোরাকে। এতে বিশ্বপরিসরে প্রকৃত বাস্তবতাই প্রমাণিত হবে—মূলত মুক্তিযোদ্ধারা দেশ স্বাধীন করেছে, যদিও ভারতীয়রা সহায়ক শক্তি হয়ে সাহায্য করেছে। বাংলাদেশীরা কোনোদিনই অকৃতজ্ঞ জাতি নয়। তারা সব দিনই এ সহযোগিতাকে সানন্দে স্বীকার করেছে। তাই বলে বন্ধুত্বের নামে লুটেরা ভারতের এত অত্যাচার মুখ বুজে সহ্য করার কোনো যুক্তি নেই। যে পাকিস্তানের অনাচার তারা ২৪ বছরও সইল না তারা কোন আক্কেলে ভারতের অনাচার সইবে? কিন্তু উপরোক্ত ঘটনা ঘটিয়ে ভারত প্রকারান্তরে চৌর্যবৃত্তির অপবাদ নিজের ঘাড়ে তুলে নিল। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ কোনো মিথ্যা ইতিহাস নয় যে বিশ্ব এর কিছুই জানে না। এবার যদি ছবির মাঝে তার দ্বিতীয় অর্জন মনে করে থাকে তাতে তাদের অপঅর্জন আরো এক পা বাড়ালো। বিধাতার দরগাহে আরশের অধিপতির কাছে এটি জমা আছেই, তারপরও বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছেও এ রকম অনাচারের খবর গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে হবে। বিপন্ন এ দেশটিকে স্বাধীনতার নাম নিয়ে কীভাবে শুরু থেকেই আরো বিভৎস অবস্থার সম্মুখীন হতে হয়েছে এ তার একটু নমুনামাত্র। ভারতে বিরোধী মুসলিমকে মারার কি খেল চলছে ভিডিওতে দেখেন।

Army-Style Training At A Bajrang Dal Camp In Noida

 

এ কষ্টের কথা সুস্পষ্ট হয়েছে একজন মেজরের বাস্তবে পরখ করে দেখা তার সৃষ্টিশীল লেখনীতে, অতিবাস্তব অবস্থানে নিজ চোখে দেখা একজন সৈনিকের দৃষ্টিতে তিনি তা চিত্রায়িত করেছেন। তিনি হচ্ছেন মেজর (অব.) এম এ জলিল। তার ‘অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা’ বইতে তিনি বিস্তারিত আলোকপাত করেছেন, আমি শুধু কিছু পয়েন্টকে পাঠকের সামনে তুলে ধরব শুধু এর গভীর সত্যটুকু উপলব্ধি করার জন্য। এর প্রতিটি ধাপ আমাদের নিজেদের চোখেও পরখ করা। আমরা নিজেরাও এর নীরব সাক্ষী। এ লুণ্ঠন প্রক্রিয়া আমি ব্যক্তিগতভাবেও দেখেছি, কারণ বর্ডারসংলগ্ন আমাদের নিজেদের বাড়ি হওয়ার কারণেও বাড়ির সামনে দিয়ে ট্রেনবোঝাই বিশাল সাধারণ থেকে কয়েকগুণ লম্বা ট্রেনগুলো দু’পাশের সিগন্যালছোঁয়া মালগাড়ির বিরাট বহর নিয়ে যাওয়ার সময় সবকটি বগি আগাগোড়া বন্ধ থাকত। নিজ চোখে দেখেছি দেশের সব সম্পদ কীভাবে লুটেরা ভারতীয়রা জবরদখল করে নিয়ে যায়। স্তম্ভিত হয়ে দেখেছি দিনের পর দিন স্টেশনের এ মাথা থেকে ওমাথা অবধি লম্বা টেনের বগিতে ঠাসা সদ্যমুক্ত দেশের মালামাল লুটের নমুনা। আমরা ধারণাও করতে পারতাম না, কী সব যাচ্ছে ওই বর্ডার পার হয়ে। যখন ওই মেজরের বইটি পড়ি তখন মনে মনে মিলাই নিজ চোখে দেখা চিত্রগুলো। যুদ্ধপরবর্তী অতি লোভী বড়দির এসব অপকর্ম দেখে উপস্থিত সবাই নির্বাক। ঠিক একইভাবে আসার পথে ট্রেনের বগির সবকটি দরজা খোলা থাকত। বন্ধ থাকলে আমরা মনে করতে পারতাম যে, দিদিও কিছু দিয়েছে, লুটেপুটে শুধু নেয়নি, বড়দির কিছু বড়ত্বও দেখিয়েছে। এতে আরও বোঝা যেত, বাংলার সব সম্পদ বগলদাবা করে ফেরত খোলা ট্রেনের কম্পার্টমেন্ট তার নাড়িভুঁড়ি দেখিয়ে দেখিয়ে আবার ‘ঝাকার ঝুম্মুর ঝাকার ঝুম্মুর’ আওয়াজ করতে করতে ফেরত দেউলিয়া হয়ে আমাদের স্টেশনসংলগ্ন বাড়িটির পাশ দিয়ে ঘটনার দাগচিহ্ন রেখে পার হয়ে যেত। আমি সিলেটের বর্ডারসংলগ্ন অবস্থান নিজ চোখে দেখেছি সারাক্ষণ, আর মনের মাঝে কষ্ট পেয়েছি তখনকার আমরা সব নির্বাক দর্শনার্থীরা। সারা দেশেই এ লঙ্কাকাণ্ড ঘটেছে। নিচে যশোর-খুলনার একজন মুক্তিযোদ্ধা সবাক মেজর জলিলের বক্তব্য থেকে যশোরের অবস্থান সম্বন্ধে হালকা একটু ছোঁয়া আনছি।

বাংলাদেশে ভারতীয় বাহিনীর পরিকল্পিত লুণ্ঠন : মেজর জলিল 

(১) ভারতের সম্প্রসারণবাদী প্রতিক্রিয়াশীল শাসকগোষ্ঠী মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্বে গোটা মুক্তিযোদ্ধার ভয়ে ভীত হয়েই বাঙালির স্বাধীনতার গৌরবকে জবরদখলের মধ্য দিয়ে নিজেদের হীন স্বার্থ উদ্ধার করেছে মাত্র। দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধারা ১৬ ডিসেম্বরের পরে মিত্রবাহিনী হিসেবে পরিচিত ভারতীয় সেনাবাহিনীকে নব্য স্বাধীন বাংলাদেশের বিভিন্ন সম্পদ-মালামাল লুণ্ঠন করতে দেখেছে। সে লুণ্ঠন ছিল পরিকল্পিত লুণ্ঠন, সৈন্যদের স্বতসফুর্ত উল্লাসের বহিঃপ্রকাশস্বরূপ নয়। সে লুণ্ঠনের চেহারা ছিল বিভৎস-বেপোরোয়া।

(২) মুক্তিযুদ্ধের নবম সেক্টরের অধিপতি হিসেবে আমি সেই মটিভেটেড লুণ্ঠনের তীব্র বিরোধিতা করেছি। সক্রিয় প্রতিরোধও গড়ে তুলতে চেষ্টা করেছি। লিখিতভাবেও এই লুণ্ঠনের প্রতিবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন, কর্নেল ওসমানী এবং ভারতীয় পূর্ব অঞ্চলের সর্বাধিনায়ক লে. অরোরার কাছে জরুরি চিঠিও পাঠিয়েছি। তাজউদ্দিন সাহেবের পাবলিক রিলেশন অফিসার আলী তারেকই আমার সেই চিঠি বহন করে কলকাতায় নিয়েছিলেন। ১৭ ডিসেম্বর রাতেই সেই বিশেষ চিঠিখানা পাঠানো হয়েছিল। খুলনা শহরে লুটপাটের যে তাণ্ডব নৃত্য চলছে তা তখন কে না দেখেছে। ভারতীয় সেনাবাহিনী কর্তৃক সেই লুটপাটের খবর চারদিক থেকে আসা শুরু করে। পাকিস্তান বাহিনী কর্তৃক পরিত্যক্ত কয়েক হাজার সামরিক-বেসামরিক গাড়ি, অস্ত্র, গোলাবারুদসহ আরও অনেক মূল্যবান জিনিসপত্র ট্রাকবোঝাই করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। প্রাইভেট কার পর্যন্ত যখন রক্ষা পায়নি। তখনই কেবল আমি খুলনা শহরে প্রাইভেট গাড়িগুলো রিকুইজিশন করে খুলনা সার্কিট হাউস ময়দানে হেফাজতে রাখার চেষ্টা করি। এর আগে যেখানে যে গাড়ি পেয়েছে সেটাকেই পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে সীমান্তের ওপারে।

(৩) যশোর সেনানিবাসের প্রত্যেকটি অফিস এবং কোয়ার্টার তন্ন তন্ন করে লুট করা হয়েছে। বাথরুমের মিরর এবং অন্য ফিটিংসগুলো পর্যন্ত সেই লুটতরাজ থেকে রেহাই পায়নি। রেহাই পায়নি নিরীহ পথযাত্রীরা। কথিত মিত্রবাহিনীর এই ধরনের আচরণ জনগণকে ভীতসন্ত্রস্ত করে তুলেছিল।

(৪) ভারতীয় বাহিনীর আচরণে আমি বিক্ষুব্ধই হয়ে উঠিনি বরং তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করার পর্যায়ে চলে গেলাম। খুলনার নিউজপ্রিন্ট মিলের রেস্ট হাউসে অবস্থানরত আমার প্রতিপক্ষ ভারতীয় সেনাবাহিনীর অধিনায়ক মেজর জেনারেল দানবীর সিংকে আমি সতর্ক করে দিয়ে বললাম — দেখামাত্র গুলির হুকুম দিয়েছি আমি। ভারতীয় সেনাবাহিনীকে লুটতরাজ করা হতে বিরত রাখুন।

(৫) খুলনা পরিত্যাগ করতে হলে নাকি ভারতীয় সেনাবাহিনী কমান্ডোর হুকুম নিতে হবে, এ কথা শোনার পরে ভারতের আসল মতলবখানা আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে উঠল। আমি সেক্টর কমান্ডার হিসেবে ভারতীয় নির্দেশ মেনে চলতে মোটেও বাধ্য ছিলাম না। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ব্যূহ ভেঙে দেশ মুক্ত করলাম ভারতীয় সেনাবাহিনীর নির্দেশ মেনে চলার জন্য নয়। একটি মুক্তিপিপাসু জাতির ভাবাবেগ অনুধাবন করতে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ কেবল চরমভাবে ব্যর্থই হয়নি, বরং অনুধাবন করার সামান্যতম ধৈর্যও প্রদর্শন করেনি তারা।

(৬) ভারতীয় বাহিনীর এই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধেও আমি জনসভাগুলোতে সোচ্চার হয়ে উঠলাম। আমার পরিষ্কার নির্দেশ ছিল, পশ্চিম পাকিস্তানে বন্দি স্বাধীন বাংলার স্থপতি জনগণের প্রাণপ্রিয় নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্ত না করা পর্যন্ত বাঙালি জনগণের মুক্তিযুদ্ধ চলতে থাকবে। শেখ মুজিবের হস্তেই কেবল মুক্তিযোদ্ধারা তাদের অস্ত্র সমর্পণ করে দেবে।

(৭) আমারই সাধের স্বাধীন বাংলায় আমিই হলাম প্রথম রাজবন্দি। ৩১ ডিসেম্বর বেলা ১০টা-সাড়ে ১০টায় আক্রমণকারী বাহিনীর হাতে বন্দি হয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার আসল রূপের প্রথম দৃশ্য দেখলাম আমি। ভারতীয় সৈন্যবাহিনীর মদতে বাংলাদেশ স্বাধীন করার অর্থ এবং তাৎপর্য বুঝে উঠতে আমার তখন আর এক মিনিটও বিলম্ব হয়নি।

(৮) রাত ১২টা ১ মিনিটে যশোর সেনাছাউনি নতুন বছরের উজ্জীবনী গীতিতে মুখর হয়ে উঠল। নারী-পুরুষের যৌথ কণ্ঠের মনমাতানো সঙ্গীত নাচ, হাততালি ঘুঙুরের ঝনঝনানি, উল্লাস, উন্মাদনা—সবই ভেসে আসছিল কর্ণকুহরে। আমার মাটিতে প্রথম নববর্ষেই আমি অনুপস্থিত। … রাতের ঘুটঘুটে সেই অন্ধকারে আমি সেদিন কম্বল জড়িয়েও ঘেমে উঠেছিলাম, শিউয়ে উঠেছিলাম পুনঃপুন। স্বাধীনতার সতেরো বছর পরেও আমি নিশ্চিত হতে পারছি না। অন্ধকারে আজও আমি একইভাবে শিউরে উঠি আর যেন শুনতে পাই, ‘রক্ত দিয়ে এই স্বাধীনতা আনলে তোমরা!’

জাতিকে জানতে হবে তাদের প্রকৃত বাস্তবতা। ’৭১-এর প্রথম রাজবন্দি মেজর জলিল। সেদিন থেকে আজ অবধি রাজনীতির ভারতীয় দলদাস আওয়ামী নামের দলটি ও তার পরবর্তী বিতর্কিত অজস্র কর্মকাণ্ড এ জাতিকে বিপন্ন দশাতে নিয়ে পৌঁছিয়েছে। তাই তাদের চোখে কর্নেল ওসমানী আজ চক্ষুশূল। মেজর জিয়া রাজাকার। ভাসানী আজ অতীতের ফেলনা, যার নাম নিতে গলাতে তাদের দম আটকায়। এক কথায় জাতির বৃহত্তর স্বার্থে আজকের চিহ্নিত আওয়ামীরা বাংলাদেশের কেউ নয়, অতীতেও যুদ্ধ চলাকালেও তাদের অনেক অপকর্ম ইতিহাস হয়ে আছে। তারপরও জাতির সাধারণ সোনার ছেলেরা সেদিন যুদ্ধ করে বিজয় ছিনিয়ে এনেছে। বাংলাদেশীর মৌলিক আদর্শবিরোধী আওয়ামীদের প্রকৃত স্বরূপ বুঝে নেয়ার দিন এসেছে। প্রতারককে চেনার জন্য ৪০ বছর অনেক বড় একটি সময়। প্রতিটি সত্তাকে চিনে নিতে হবে সঠিক দাগচিহ্ন দেখে, সে প্রতিদিনই তার অপকর্মের দাগ রেখে যাচ্ছে। জাতির ঘোর দুর্দিনে ধান্দাবাজ শত্রু বন্ধু সেজে উপস্থিত হলেও নিজ কপট স্বার্থে নিজের আসল স্বরূপ উন্মোচন হয়ে গেছে। তাদের চিনতে ভুল করার কোনো অবকাশ নেই। তাই আজকের ‘গুণ্ডে’ যেন হয় বাংলাদেশীদের মগজের ধোলাই, আসন্ন প্রতিরোধ সংগ্রামের শ্রেষ্ঠ হাতিয়ার।

বিশেষ দ্রষ্টব্য:  ২০১৪ সালের ২৩/২৪ ফেব্রুয়ারী তারিখে এ লেখাটি আমার দেশ অনলাইনে ছাপে।

Halmark Crime Report Bangladesh See Jonotar Kotha ETV Bangladesh YouTube 360p

Tag Cloud