Articles published in this site are copyright protected.

দোররা

অতি সম্প্রতি প্রতিটি বিবেকের দরজায় কড়া নেড়ে গেল কিশোরী হেনা। এসব বেশকিছু ভুলভাবে উপস্থাপিত ইস্যু মুসলমান সমাজের মেয়েদের বিপদের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে বার বার। ফতোয়ার নামে কিছু অসচেতন ব্যক্তি ধর্মের নামে যা করছেন তা রীতিমত অধর্মের পর্যায়ে পড়ছে। আর প্রতিটি ক্ষেত্রেই পুরুষ পক্ষ দায়ী হলেও শাস্তির ভাগ বর্তায় শতভাগ মেয়ের ওপর। অনেক প্রত্যক্ষদর্শী বলছেন, এরা চলনে-বলনে সাধারণ মোল্লা-মুনসীর পর্যায়েও পড়ে না। যাই হোক, গ্রামের মাতব্বর সেজে তারা দাবি করছেন, তারা ধর্মের মালিক-মোক্তার। দেখা যায়, একজন নির্যাতিত মেয়ে একাধারে সমাজের অসত্ প্রকৃতির লোকের দ্বারা একবার ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সমাজের ফতোয়াবাজদের দ্বারা দ্বিতীয়বার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এটি বহুদিন থেকে হচ্ছে, হয়েছে, হয়তো আরও হবে। এখানে এ মেয়েটিকে যে দুটি পক্ষই নির্যাতন করছে, আমরা যারা মুসলামান তারা জানছি এবং মানছি যে তাদের দুজনার শাস্তিই ইহকালে না হলেও পরকালে তা অবধারিত। আর ইহকালীন কোর্টেও তাদের জন্য উপযুক্ত শাস্তির বিধান রাখা উচিত। কিন্তু দেখা যায়, অনেক সময় বিচারের নামে হয় কিছু প্রহসন।

যারা এসব ফতোয়া বিলি করছেন তারা যদি সঠিক বিষয়টি বুঝতেন তবে তারা সত্যিই ভয় পেতেন। তারা বুঝতে পারেন না বলে ভয়ও পান না। দেখা যায়, সূরা নিসায় শুধু অভিযোগকারীদের চারজন সাক্ষী উপস্থিত করার আদেশ দেয়া হয়েছে। পক্ষান্তরে সূরা নূরে বলা হচ্ছে যে, ‘অভিযোগকারী যদি চারজন প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী দ্বারা নিজের অভিযোগ যথাযথভাবে প্রমাণিত করতে না পারে, তবে প্রত্যেক অভিযোগকারীর প্রতি ৮০ দোররার দণ্ড বিধান করতে হবে। অধিকন্তু কোনো বিচার ক্ষেত্রে এসব অভিযোগকারীর সাক্ষ্য কস্মিনকালেও গৃহীত হতে পারবে না, তওবা না করা পর্যন্ত।’ আল্লাহর উপরোক্ত নির্দেশ যারা মান্য করবে না এবং পাশ কাটিয়ে মনগড়া ব্যাখ্যা দেবে তাদের শাস্তি অবধারিত, শুধু সময়ের ব্যাপার মাত্র। যেখানে মিথ্যা অভিযোগকারীর জন্য শাস্তির বিধান দেয়া হয়েছে, সেখানে মিথ্যা বিচারকেরও শাস্তি কি কম হবে বলে মনে হয়? এরা প্রকারান্তরে ধর্মের নামে কোরআনকে পাশ কাটিয়ে কোরআনের অবমাননা করছেন, প্রকৃতই অধর্মের কাজ করছেন।

দুঃখের বিষয় হচ্ছে, অপরাধ নির্মূলকারীরাই বাড়তি অপরাধ করছেন। বস্তুত তারা যে এ ব্যাপারে কত অজ্ঞ, প্রকৃত ধর্ম থেকে কত দূরে অবস্থান করছেন সেটি তারা বুঝতে পারলে মঙ্গল। সেটি তারা একটু চোখ-কান খোলা রাখলেই বুঝতে পারতেন। তারা এ যাবত ধর্মটি জপতেই ব্যস্ত থেকেছেন। বেশ আগে নূরজাহানের ইস্যুটিকে কেন্দ্র করে সিলেটের ছাতকছড়াতে এরকম বীভত্স একটি অঘটন ঘটে, যেটি খুব প্রচারে আসে। আবার প্রায় সময়ই বাংলা পত্রিকায় নারী নির্যাতনের নানা ধরনের খবর দৃষ্টিগোচর হয়। বিগত শতকের শেষভাগে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র এসব অপকর্মের ওপর সেঞ্চুরি করার সাহস দেখায়। যথার্থই মেধা বিকাশের কী অপরিসীম ধৃষ্ঠতা! বস্তুত সমাজের প্রতিটি সাধারণ মানুষেরই এর ওপর স্বচ্ছ ধারণা থাকা দরকার, এর ধর্মীয় প্রকৃত নির্দেশনাও তার জানা দরকার। বস্তুত এ ধর্মটি সব ব্যাপারে স্বচ্ছতা নিয়েই গর্বের সঙ্গে টিকে আছে ১৪০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে। তার সুস্পষ্ট নির্দেশনা তার প্রচারিত গ্রন্থেই বর্তমান। এটির সমাধানে পৌঁছতে কোনো সময়ই একজন প্রকৃত ধর্মধারীর বেগ পাওয়ার কথা নয়। কারণ প্রতিটি ঘরেই কোরআন গ্রন্থের কপি বর্তমান। যে কেউ সেটি পরখ করে যাচাই করে নিতেও পারেন। কোরআন ধর্মগ্রন্থটি এসেছে মানুষের চলার সরল-সঠিকের দিকদর্শন নিয়ে, কিন্তু এর চর্চা সঠিক না হওয়াতে সমাজে অনেক অনাচার এসে ঠাঁই করেছে মহা আয়েশে। আমরা একে চরম মমতায় বস্তনীতে বেঁধে তাকিয়ার অনেক উপরে রেখে পালিয়ে বাঁচি। মানুষ বিস্তর লেখাপড়া করলেও এর প্রকৃত সূত্র সঠিকতা থেকে দূরে থেকেছে বহু বেশি। একমাত্র শুধু তোতাপাখির মতো না বুঝে জপতেই ব্যস্ত থেকেছি। বরং সেটিকে আত্মায়-অন্তরে ধারণ করতে হবে, সর্বোপরি সেটি পালন করতে হবে। সেটিই ধর্মের সঠিক নির্দেশনা, পালন করতে হলে তাকে বোধের ভেতরে ঠাঁই দিতে হবে। ধর্মের এ গুরুত্বপূর্ণ বিভাগটিকে বলতে গেলে সমাজে পিছিয়েপড়া এক গোত্রের লোকসংখ্যার হাতে তুলে দিয়ে শিক্ষিত জনেরা শুধু ধর্মের বিরুদ্ধে বিষোদগার করতেই ব্যস্ত। মায়ের সবচেয়ে অপদার্থ ছেলেটিকে মাদ্রাসার জন্য বরাদ্দ রাখা হয়। মানুষ যা ধারণ করে সেটিই তার ধর্ম। সে যদি মাদ্রাসায় না পড়ে তবে সে ধর্মের তেমন কিছুই জানে না। এটি কেন হচ্ছে? বাংলাদেশের অনেক পরিবারই আছে, ধর্মের কোনো ধারও ধারে না, শুধু নামে মুসলমান। বাল্যকালে আমার এক স্যারের ভাষাতে এরা হচ্ছে গরু খাওয়া মুসলমান। ঈদের সদায় নিয়ে ব্যস্ত, যদিও ব্যক্তিগত পর্যায়ে রোজার কোনো গুরুত্বই সে জানে না। তাদের ছেলেপেলেরা ধর্মের কোনো খবরই জানার সুযোগ পায় না।

বিশ্বাস কি জিনিস সুবহানআল্লাহ এত সুন্দর উদাহারন By Dr Zakir Naik

 

আমরা পরিপূর্ণ ধর্মের আগমনের ১৪০০ বছরের বেশ পরও নিজেরা গাফেল বলেই মনে হচ্ছে ধর্মের গোড়াতে ঢুকতে পেরেছি যথেষ্ট কম। আমাদের প্রকৃত সিলেবাসই কোরআন। আমরা সব সময়ই যত জপি তত কিন্তু পালন করি না। এটি যেন জপলেই শেষ। পালন করার গরজ কম। কিন্তু সেটিই হওয়ার কথা ছিল বেশি। আমরা বিজয় গর্বে সবাই বলি, আমরা ইমাম আবু হানিফার অনুসারী। কিন্তু কেউই বলতে পারব না আবু হানিফা কে ছিলেন, কী ছিলেন, কী করতেন। বস্তুত আমাদের পূর্বপুরুষেরা তার কাছেই বেশি যুক্তির মাপ পেয়েছিলেন বলেই ধারণা হয়, মুসলিম জগতের বড় গোষ্ঠী মানুষই তার অনুসারী। কিন্তু তার প্রকৃত অনুসরণটিও আজ প্রশ্নবিদ্ধ। অতীতে তাকেও ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার কসরত করা হয়েছে, ইতিহাস তাই বলে।

তথাকথিত শাসকবর্গের প্রতাপের আড়ালে সঠিকভাবে বিচারকার্য করতে পারবেন না বলে ইমাম আবু হানিফা বিচারকের পদ নিতেও রাজি ছিলেন না। এই সাধু ব্যক্তি সব সময়ই শাসকবর্গের ঘৃণার শিকার হয়েছেন, এর কারণ তিনি তাদের সহযোগিতা দেননি। কারণ তারা এটি ভালো করেই আঁচ করতে পারে যে এ ব্যক্তি এ সমাজের সম্মানিত একজন। সবাই তাকে সমীহ করে এবং মানে। তার কথার মূল্য তাদের শাসকবর্গের চেয়ে বেশি ছিল বলেই তারা তাকে কিনতে চেয়েছিল। কিন্তু এ কাজটি সে সময়কার শাসকেরা করতে সমর্থ হয়নি। এ মূল্যবান ব্যক্তিটিকে কখনোই চড়া দামেও কেনা যায়নি। এটিই ছিল তার অপরাধ। সব সময়ই একজন উলেমাকে ইমামকে শাসকেরা অল্প দামে কিনে নিয়েছে এবং তাদের ফর্মা মত ধর্ম সাজিয়ে প্রচার করতে বাধ্য করেছে। কিন্তু ইমাম আবু হানিফার বেলায় মোটেও তা কাজে লাগাতে পারেনি বলেই তাদের আক্রোশের ও ক্ষোভের শেষ ছিল না। তার জীবনীগ্রন্থে এসব ঘটনা লিপিবদ্ধ আছে।

এরাই ইসলামের সত্য সাধক। এরা বিচারকের পদ পেয়েও ভয় পেয়েছেন এ কারণে যে, শাসকবর্গের শোষণ-নীতির কারণে তারা সুষ্ঠু বিচার করতে পারবেন না। এই ভয়েই এত বড় পদ পেয়েও একে অবহেলায় দূরে ঠেলে দিয়েছেন। আর আমাদের ফতোয়াবাজরা দেখা যায় এসব মিছে কোরআনবিরোধী কাজ করতেও ভয় পাচ্ছেন না। অনাচারকে লালন-পালন করতে এখানে কেউই ভয় পাচ্ছে না। দেখা যায়, দুবার দু’রকম রিপোর্ট আসে ময়নাতদন্তে। এমন ধারার ময়নাতদন্তের দরকারই বা কী? যারা এসব কাজ করছে এদের জন্য কঠোর শিক্ষণীয় শাস্তির দরকার, যাতে আর কোনো মানুষের জীবন নিয়ে এরা ছিনিমিনি খেলতে না পারে। সম্প্রতি একটি খবরে দেখলাম, ‘মৌলভীবাজারে সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ : জন্মদিন পালনের চাঁদা না পেয়ে মিথ্যা হিল্লা বিয়ের ফতোয়াবাজির মামলা সাজানো হয়।’ ভুলে গেলে চলবে না, শয়তান তার অপকর্মের থাবা মানুষের মাধ্যমেই চালায়। কীভাবে বহুরূপী শয়তান সব ক্ষেত্রেই তার মাথাটি ঠিকই ঢুকাতে পারছে, এসবই তার প্রামাণ্য উদাহরণ। এর সূত্র ধরে আর একটি বিধান পাথর মারা, যা মূলত ইসলাম ধর্মের কোনো বিধানই নয়। পবিত্র কোরআনের কোথাও এমন ধারার কোনো শাস্তির বিধান নেই। তাও দেখা গেছে বার বার এ ধর্মের মানুষকে আহত করছে। নিচের বর্ণনাতে এর ওপর কিছু আলোকপাত করছি।

পাথর মারার বিধান মুসলমানের নয়, এটি ইহুদিদের বিধান :
ঘটনার স্বচ্ছতার জন্য আমি কিছু অতীতের দিকে ফিরে যাচ্ছি। ১২ নভেম্বর ২০০২ সালে ‘ঐ ধর্ষণকারী এখন কোথায়?’ শিরোনামের একটি লেখা পত্রিকায় ছাপা হয় যেখানে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই ছাত্রটির সন্ধানই ছিল ইঙ্গিতের বিষয়। এর জবাবে সৈয়দ হাম্মাদ মহাখালী, ঢাকা থেকে ‘ঘটনায় কিছু ভুল ছিল’ নামে হজরত ওমরের ছেলের তথ্যের ওপর একটি লেখা ছাপে ২৬ নভেম্বর তারিখের যাযাদি সংখ্যায়। লেখকের হজরত ওমরের এ তথ্যের ওপর এবং ‘ইসলামে অপরাধের মাত্রা পাথর মারার বিধান কী পুরুষ কী নারীদের জন্য নির্ধারণ করা’ বলে যা প্রচার করেন, তার ওপরও আমি দুটি কথা বলতে চেয়ে লেখাটি সে সময় যাযাদিতে পাঠিয়েছি যদিও সেটি আর পরে ছাপেনি। সেখান থেকে এখানে কিছু সংযোজন করছি।

ফতোয়ার নামে অনেকে অনেক অনাচার ইসলামের নামে করেছেন, এই কিছুদিন আগেও যা নিয়ে আমাদের দেশে অনেক তোলপাড় হয়ে গেছে। প্রকৃতপক্ষে অনেকেই কোরআনের তোয়াক্কা না করে অনেক বানোয়াট কথাকে ইসলামের নামে চালিয়ে দিয়ে অনাচার লালন করে বেড়াচ্ছেন। আর এ ব্যর্থতার দায় আমাদের নিজেদের গবেষণাহীনতা, কোরআনজ্ঞানহীনতা, বিজ্ঞানহীনতা, যুক্তিহীনতা ও বিবেকহীনতা। সর্বোপরি বিশ্বধর্মের দাবিদার সুমহান ধর্মের মাধুর্যকে মর্যাদা দিতে আমাদের ফতোয়া বিলিকারী অনেকেই ব্যর্থ হয়েছেন।

সব পাপের বিচারকর্তা স্রষ্টা নিজেই। কিছু কিছু পাপের বিচারের বিধান নির্ধারণ করা হয়েছে, আমাদের শ্রেষ্ঠ গ্রন্থটিতে হারাম এবং হালালের নির্দেশ দেয়া আছে। এতে মদ, শূকর, মাদকদ্রব্য, রক্ত, জুয়া খেলা, আল্লাহ ছাড়া অন্য নামে যবেহকৃত জীব, জবেহবিহীন আঘাতপ্রাপ্ত মরা জীব এসব নিষিদ্ধ; এর জন্য কোনো শাস্তি আমার জানা নেই; ওসব হারাম, মুসলমান সে কারণে এটা থেকে সব সময় দূরে থাকেন, সেটাই বিধান। হজরত ওমরের ছেলেকে শাস্তি হিসেবে বেত্রাঘাত করা হয়েছিল। শাস্তি দেখে আঁচ করা যায় তার পাপ কোনটা ছিল। স্মরণ করার বিষয়, তাকে কিন্তু পাথর মারা হয়নি। উপরে বর্ণিত বক্তার মতো যাদের এ ব্যাপারে পাথর মারার এই ভুল ধারণা বিদ্যমান, তাদের এই ধারণাকে স্বচ্ছ করে দিতে কোরআনের কয়টি আয়াত নিচে আনছি : (উল্লেখ্য, হজরত ওমরের ছেলে একই অপরাধে দোষী হওয়ায় বাবার হাতে বেত্রাঘাতেই তার মৃত্যু হয়)। কোরআনে নির্দিষ্ট করে দেয়া ব্যভিচারের শাস্তি ১০০ বেত্রাঘাত।

. ‘আর ব্যভিচারের ধারেকাছেও যেও না, নিঃসন্দেহে তা একটি অশ্লীলতা, আর এটি এক পাপের পথ’ (সূরা বনি ইসরাইলের ৩২ আয়াত)।  . ‘ব্যভিচারিণী ব্যভিচারী তাদের দুজনের প্রত্যেককে (গুনে গুনে) একশবেত্রাঘাতের চাবুক মার (অবশ্য পিঠে, পিঠের ছাল তোলার চেয়ে লোকের সামনে অবমাননা করার প্রতি অধিক জোর দেবে, তবে ইহুদিদের বিধান অনুযায়ী পাথর মেরে মেরে ফেলার কথা ভাববে না : ১৫) আর আল্লাহর বিধান পালনে তাদের প্রতি অনুকম্পা যেন তোমাদের পাকড়াও না করে, যদি তোমরা আল্লাহতে আখেরাতের দিনে (কর্মফল প্রাপ্তি সম্পর্কে) বিশ্বাস করো (তবে যদি কোনো সতী সাধ্বী ধর্ষিতা হয় তবে শাস্তি পাবে ধর্ষণকারী, নিরপরাধীদের ওপর শাস্তি বর্তাবে না) আর মুমিনদের একটি দল যেন তাদের শাস্তি দেখতে পায় (যাতে ধর্ষকরা ধরনের সমাজবিরোধী পাপাচারকে ভয় করে চলে, : ২৫)’ (সূরা আন নূরের আয়াত) উপরে তফসিরকারক ব্যাখ্যাতে এটি উল্লেখ করেছেন কিন্তু যদি কোনো তফসিরকারক সেটি সুস্পষ্ট নাও করেন এটি কমন সেন্সের ব্যাপার; যে নির্দোষ, তাকে একজন নির্যাতন করল, তাকে কেন শাস্তি পেতে হবে—এ সাধারণ বুদ্ধিটুকু যে খরচ করতে পারে না সে আবার বিচারক হয় কেমনে, ফতোয়া দেয়ার অধিকারী হয় কেমনে? আমাদের দেশের একজন অশিক্ষিত রিকশাচালককেও এ বিচারের ভার দিলে সেও এ ভুল করবে বলে মনে হয় না।

আবার সূরা নিসার ২৫ আয়াতে দেখা যায়, এদের দুজনকে প্রয়োজনে অল্প শাস্তি দেবে যদি তারা তওবা করে এবং সত্যিকার অনুতপ্ত হয়। তারপর বলা হচ্ছে, নিঃসন্দেহে আল্লাহ বার বার ফেরেন, অসীম কৃপানিধান। উপরের দুটি আয়াতেই এটা স্পষ্ট যে, এদের শাস্তি কোরআনে যেভাবে বরাদ্দকৃত তা স্রষ্টা কর্তৃক নির্ধারিত, কারও মনগড়া ব্যাখ্যা এখানে অচল। ক’বছর আগের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এ অপরাধে সেঞ্চুরি করা ছাত্রের শাস্তি আরও বহুগুণ বেশি হতে পারে কারণ সে শুধু ধর্ষকই নয়, সে এটা দিয়ে সমাজে ধর্ষক সন্ত্রাসীর ধারা আনতে চেয়েছে, সে এসবের ওস্তাদ। স্রষ্টা তার সৃষ্টির প্রতি খুবই দয়ালু সন্দেহ নেই; কিন্তু (৩) সূরা নূরের ২ আয়াতে দেখা যায়, আল্লাহ খুব কঠোরভাবে বিচারকদের শর্তবদ্ধ করেই যেন বলছেন, যদি তোমরা শেষ বিচার মানো তবে ওদের প্রতি অনুকম্পা দেখাবে না, কিন্তু তারপরও দেখা যাচ্ছে ক্ষেত্রবিশেষে যদি তারা অনুতপ্ত হয় তবে তাদের জন্য অল্প শাস্তি রাখ। স্রষ্টার দেয়া এই অনুকম্পা না দেখানোর হুশিয়ারিই হজরত ওমরকে এত কঠোর করেছিল; স্রষ্টার সত্যিকারের সৈনিক হিসেবে তার দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল সবার জন্য সমান বিচারের দিকে। এটি মূল কোরআনীয় বিধান। কিছু হাদিস থেকে পাথর মারার বিধানকে প্রশ্রয় দেয়া হয়েছে। যে ধারার কোনো কথা কোরআনে নেই, সেটিকে হাদিস দ্বারা প্রমাণের কোনো সুযোগ নেই। কোরআনের বিরুদ্ধে যায় এমন কোনো কর্ম, আদেশ-নির্দেশ, উপদেশ কখনোই হাদিস হতে পারে না। হাদিস আমাদের দ্বিতীয় সূত্র গ্রন্থ। হাদিসকে সব সময় হতে হবে প্রথম গ্রন্থ কোরআনের সাহায্যকারী বিবরণ।

‘আমার দেশ’ পত্রিকার ২১ ফেব্রুয়ারি তারিখের এক কলামে দেখি, নিকট অতীতের বেদনার এ ভার কমাতে কথাশিল্পী ইমদাদুল হক মিলন একটি বেশ বড় মাপের উপন্যাস তৈরি করছেন। সমাজকে সচেতন করতে এভাবে সাহিত্যিকরা যুগে যুগে কঠিন পদক্ষেপ নিয়েছেন। এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী হয় সব সময়। দেখা যাচ্ছে এটি বিভিন্ন ভাষাতেও অনূদিত হতে যাচ্ছে। এর গভীরে ঢুকলেই যে কোনো সচেতনের বোঝা উচিত, মানুষ কী পরিমাণ পাষাণ হতে পারলে এ কাজটি করতে পারে। বস্তুত ঘটনাই বলে দেয়, মেয়েটি যে কী পরিমাণ নির্দোষ ছিল। হতভাগী নূরজাহানের প্রথম স্বামী নিরুদ্দেশ হয়ে গেলে মসজিদের কোনো এক প্রভাবশালী মৌলানা তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। কিন্তু বাবা এই বয়স্ক লোকের সঙ্গে বিয়ে না দিয়ে তাকে মোতালেব নামের এক যুবকের সঙ্গে বিয়ে দেন। এ অপরাধে এ বিয়ে বৈধ নয় এ জিগির তুলে তাকে পাথর ছুড়ে মারা হয়। এতে করে নূরজাহানের নতুন স্বামীকেও দেয়া হয় একই শাস্তি। তার বাবাকে করা হয় বেত্রাঘাত। এ অপমান সইতে না পেরে সে রাতেই নূরজাহান আত্মহত্যা করে। ওই মাওলানা যদি সত্যিই এ মেয়েটিকে এরকম প্রস্তাব পাঠিয়ে থাকেন তবে তাকেও এরকম শাস্তির জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। এরকম একটি নির্দোষ মেয়েকে হত্যা করে তিনি যে কী অপরাধ করেছেন, নিচের আয়াতই তার ফলাফল নির্দেশ করে দেবে।

কোরআনে আল-মাইদাহ সূরার ৩২ আয়াতে দেখা যায়,  – একটি মানুষকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা যেন গোটা মানবজাতিকে হত্যা করার শামিল। আবার একটি মানুষকে রক্ষা করাও যেন গোটা মানবজাতিকে রক্ষা করার সমান কাজ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশে প্রায় প্রতিটি ফতোয়াই দেখা যাচ্ছে অন্যায়ের ওপর দাঁড়িয়ে অপকর্মের সীমানা ডিঙ্গানোর অপরাধে অপরাধী। অনেক ধর্মধারী নিজেও জানেন না আসলে কোন বিধান সত্যিকারভাবে প্রযোজ্য। অনেকে মনে করে থাকেন, ধর্মের দায় যাদের ঘাড়ে চাপানো হয়েছে এর রায় শুধু তারাই দেবেন। এরকম একটি ধর্মের রায় যে কোনো সচেতন ব্যক্তিই দিতে পারেন, তবে অবশ্যই তাকে কিছুটা পরিপক্কতা অর্জন করতে হবে। যুগে যুগে দেখা গেছে ইমামরাও সঠিক দিকদর্শন না দিয়ে শাসক সম্প্রদায়ের চালের গুটি হয়ে কাজ করেছেন। বস্তুত ইসলাম সবচেয়ে সহজ-সরল ধর্ম। অতীতের ধর্মগুলো অনেকাংশে কঠিন বলেই এটিকে সহজ-সরল ধর্ম বলা হয়েছে। বাড়তি কিছু জটিলতা আমরা নিজেরাই যোগ করে নিয়েছি, নিজেরা অজ্ঞ বলেই। তাদের (ইহুদীদের) গ্রন্থে এ পাপের শাস্তি বরাদ্দ আছে পাথর মারা, কিন্তু কোরআনে সেরকম কোনো কথা নেই। আর আমাদের পরবর্তী অসচেতনরা দেখা গেছে অনেক কিছুই না বুঝে কখনো খৃষ্টানদের কখনো ইহুদিদের অনেক যুক্তি-কুযুক্তি ঢুকিয়ে দিয়েছেন নিজেদের পবিত্র অঙ্গনে। নবী ইব্রাহিম যখন তার বাবা আজরের অগ্নিপূজার ও মূর্তিপূজার বিরুদ্ধে সোচ্চার হন তখন বাপ তাকে কঠোর শাসানি দেন। তার শাসানির খবর আমরা জানতে পেরেছি তাদের গ্রন্থ থেকে নয়, আমাদের গ্রন্থ থেকেই।

সূরা মরিয়মের ৪৬ আয়াতে (১৯ : ৪৬) ইব্রাহিমের বাবা তাকে পাথর ছুড়ে মেরে ফেলার হুমকি দেন। সে (আজর) বলল, “হে ইব্রাহিম, তুমি কি আমার উপাস্যদের থেকে বীতশ্রদ্ধ? তুমি যদি না থামো তবে তোমাকে আমি নিশ্চিত পাথর ছুড়ে মেরে ফেলব; আর তুমি আমার থেকে এই মুহূর্তে দূর হয়ে যাও’| এরকম শাস্তির বিধান সে সময়কার বিধান হলেও আধুনিক ইসলাম এসব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। নিজেরা সচেতন না থাকলে যে কোনো প্রহরে যে কোনো সংস্কার-কুসংস্কার, আচার-অনাচার পার্শ্ববর্তী সমাজ থেকে অনায়াসে এসে নিজেদের নির্মল পবিত্র অঙ্গন আচ্ছন্ন করতে পারে, এ ব্যাপারে আমাদেরে সচেতন থাকতে বার বার নবী মোহাম্মদ (সা.) তাগাদা দিয়ে গেছেন। কিন্তু পরবর্তীকালে এ তাগাদার মর্যাদা অনেকটাই বজায় রাখা হয়নি। রাখা যে হয়নি এসবই তার প্রকৃত প্রমাণ। খৃষ্টান ইহুদীয় বিধান এসে সুরসুর করে ইসলামের পবিত্র অঙ্গনে বেশ আয়েশে মানুষের বিশ্বাসে ঠাঁই করে নিয়েছে। সব ঝেড়ে-বেছে প্রকৃত সত্যটি নিয়ে অগ্রসর হোন। নিজের প্রকৃত ধর্মের প্রকৃতই মর্যাদা করুন। তাহলে কোনো সালমান রুশদি, কোনো তসলিমা নাসরিন মহাপবিত্র এ ধর্মের গোড়া ধরে নাড়া দেয়ার সাহস কোনোদিনও পাবে না।

এটি ছাপে দৈনিক আমারদেশ ০৩ মার্চ ২০১১ তারিখে।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

Tag Cloud

%d bloggers like this: