Articles published in this site are copyright protected.

Archive for April, 2008

গুজরাটের রক্ত: ভারতবর্ষের গর্ব না কলঙ্ক?

ভারতবর্ষ বিশাল একটি দেশ, সাম্প্রদায়িকতার এক উৎকৃষ্ট লালনাগার। অতি অহংকারী দাম্ভিক উচ্চবর্ণের হাতে নিুবর্ণের অচছূৎ সমাজের সব চূৎমার্গ গোষ্ঠীসহ ম্লেচছ মুসলমান শিখ নাগা কুুকি এককথায় যারা হিন্দু নন তারাই সময়ে সময়ে এই দলনে আত্মাহুতি দিয়েছেন। স্বসমাজের মানুষের প্রতি এরকম হিংস্রতা উচ্চবর্ণকে সম্ভ্রান্ত করে নি বরং পশুর এককাতারে নামিয়ে দিয়েছে। সম¯ত বিশ্ববাসির কাছে তো বটেই, স্রষ্টা ঈশ্বর গড আল্লাহ যার সৃষ্ট এই শিখ, হুন, নাগা, কুকি অচ্ছুৎসহ মুসলমান সবাই অন্ততঃ ঈশ্বরের সন্তান নাকি এরা ঈশ্বরহীন কোন ভিন সম্প্রদায়? ঐ ক্ষেত্রে ঈশ্বরের জবাবটা কি হবে তা কি ভেবে দেখেছেন উচ্চ বর্ণের ভাগ্য বিধাতারা। প্রতিটি ধর্মেই ভালো মন্দ কমবেশী আছেই এই থাকাটাও স্বাভাবিক। কিন্তু ধর্মে যদি এতো অমানবিক হিংস্রতা থাকে যাতে পশুত্বেরও অপমান হয় স্বজাতির অচ্ছুৎ থেকে শুরূ করে স্বসমাজের ভিন জাতি গোষ্ঠীর সবাই অচ্ছুৎ। এই ধারণাই ঐ ধর্মটিকে মানুষের ধর্মের মর্যাদাহানি করেছে। এটা কোন ধর্মই হতে পারে না, মানুষের ধর্মে থাকবে মানবিকতা। যে ধর্মে এটা থাকবে না এটা মানুষের ধর্ম হতে পারে না।

GUJARAT MASSACRE by Dr Zakir Naik YouTube

ভারতের মোট জনসংখ্যার একশ’ কোটির মধ্যে প্রায়modi-timeline-train-slide-NRJS-superJumbo চৌদ্দ কোটিই মুসলমান এবং সেই তথাকথিত উচ্চবর্ণের দেশ চালাবার দক্ষতাধারীরা ১০কোটির বেশী না। বৌদ্ধ, খৃষ্টান, নাগা, কুকি, খাসিয়া এবং উপজাতিদের বাদ দিলে সেদেশে নি¤œবর্ণের হিন্দুই বড় অংশ। যাদের ঘরে রাস্তার নেড়ে কুকুরও অস্পৃশ্য নয় কিন্তু নি¤œ বর্ণের স্বজাতি ঢুকলেও আপত্তি আছে। তার জন্য নাকি প্রায়শ্চিত্ত করে দোষণ মুক্ত হতে হয়। আর সময়ে এরাই ঢাল হয়ে এদের সব অপকর্মের যোগান দিতে হয় এই অস্পৃশ্য অংশকে, তখন তারাই নিধিরাম সরকার। এ ধর্ম মূলত আচার সর্বস্ব ধর্ম। অনেক অনাচারও এখানে সমাদরে লালিত হয়।

এখানে নারীরা শুদ্রানী। সব সময় নি¤œবংশদ্ভুত। শাস্ত্র নেড়েচেড়ে দেখার অধিকার তাদের নেই। ব্রাহ্মনেরা সেই অধিকার নিজেরাই হরণ করেছেন। এ ধর্মের এত গভীরে না ঢোকলেও শিশুকাল থেকে এই দুই সম্প্রদায়ের লোকেরা আমরা একসাথে বেড়ে উঠেছি বিধায় অনেক অনাচারের খবরই আমাদের জানা। নানান অপকর্মের মাঝে উল্লেখযোগ্য হলো সতিদাহ প্রথা, বাল্যবিবাহ, বিধবা বিবাহ নিষিদ্ধ এসব। স্ত্রীর নিশ্চিত স্বর্গ প্রাপ্তির আশায় জীবন্ত স্ত্রীকে দগ্ধ করার এমন পৈশাচিক রেওয়াজ এই ধর্মের অলিন্দে মহা উৎসাহে পালিত হত। অতি সম্প্রতি পয়ষট্টি বছরের বৃদ্ধা গুট্টুবাই এর ভাগ্যে স্বর্গ লাভের আশায় সত্তুর বছরের বৃদ্ধ স্বামী মল্লু নাইয়ার সাথে জলন্ত চিতায় আত্মাহুতি দিয়ে আবারও সতীত্ব রক্ষায় পুরানো ধর্মের বাহাদুরি বাড়ে। এ লজ্জা বর্তমান বিশ্বের চরম নৈরাশ্যজনক এক অধ্যায়। এর জবাব কোন অভিধানে পাওয়া যাবে না।

তারপরও অনেককে বারে বারেই এই ধর্ম নিয়ে আস্ফালন করতে দেখা যায়। ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর বিধবা বিবাহ প্রচলন করলেও এখনও এসমাজে এসবে পূর্ববর্তী ধারণাই বহাল রাখার উপর জোর দেয়া হয়। বিধবা হলে আর তার আমিষ খাওয়া নিষেধ। এই সুবাদে শাšত শিষ্ট লক্ষ্মি বউটিকেও আক্ষেপ করতে শুনেছি আমিষহীন থাকতে হয় গোটা পরিবারে। কারণ তা নইলে এই এক চুৃলোতে বিধবার রান্না অচল। সব ধোয়া মোছা করে তবে যদি রান্না হয় তাই ওরকম সখ হলে মাসে বছরে দু’একদিন আমিষ খাওয়া চলে, তার বেশী নয়। আর কোন সন্তানাদি হলে তো উপায় নেই, আবার পেটের রোগী হলেও রক্ষা নেই। এসব ভুক্তভোগীদের থেকে শুনা কথা। মোটকথা মনে হয় এ ধর্মের অলিন্দে যেন কোন আলো, যুক্তি কখনোই প্রবেশ করেনি। সব চেয়ে বড় কথা কোন জায়গায় সংস্কার করতে হলে সব সময় নিজেদের মধ্যে থেকে আন্দোলন শুরূ করতে হয়, প্রতিবাদ করতে হয় এবং তা করার জন্য সৎ সাহস থাকতে হবে। এরা স্বজাতির এবং ভিন জাতির উপর যে অনৈতিকতা চাপিয়ে রেখেছে তা দিয়ে কি কখনো কোন সংস্কার করা সম্ভব। আর এসব চাপিয়ে রাখা মানে নিজেরা আরো অন্ধকারে ডুবে থাকা।

বেশ কিছুদিন আগে ভারতের বিতর্কীত লেখক সালমান রূশদীর “ভারতের রক্তে ধর্মের বিষ” বলে একটি লেখা অনুবাদ করেন প্রমিথ হোসেন। রূশদী নিজে একজন ভারতীয় তার ভাষায়, আগুণে পোড়া শিশুটির বাহু কালো হয়ে গেছে, ছোট ছোট আঙ্গুল বেঁকে মুঠিতে পরিণত হয়েছে। এই ছবিতেই ফুটে উঠেছে গুজরাটের আহমেদাবাদে সংঘটিত মানব বুহ্যৎসবের নিদর্শন। ভারতীয় বিশেষত্বের একটা অংশ হলো শিশু হত্যা। এছাড়াও ১৯৮০র দশকে আসামের নেলিতে বাপক গণহত্যা, ১৯৮৪ সালে মিসেস গান্ধি নিহত হলে শিখ শিশুদের হত্যা করা হয়েছিল। প্রত্যেক ঘটনায় জীবন্ত শিশুদের গায়ে কেরাসিন ঢেলে আগুন লাগিয়ে দেয়া হয়, অথবা তাদের গলা কাটা হয় অথবা ভারী কাঠের মুগুর দিয়ে স্রেফ পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়।

ভারত এক দশক ধরে হিন্দু মুসলমানের রক্তক্ষরণের ভিতর দিয়ে গেলেও অসংখ্য মানুষ এ নিয়ে ক্রোধ, লজ্জা অথবা বিরক্তি প্রকাশ করে নি। পুলিশ প্রধানরা ভারতের সাধারণ নাগরিকদের রক্ষা করতে অনিচ্ছুক। ধর্মের দোহাই দিয়ে তারা তাদের লোকদের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন যে, এই লোকদেরও অনূভূতি আছে, আর সাধারণভাবে সমগ্র জাতির মত এরাও একই আবেগে কাতর। ইতিমধ্যে ভারতের রাজনৈতিক প্রভুরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার গতানুগতিক মিথ্যা স্বান্তনা দেয়ার চেষ্টা করেছে। ভারতের বিভিষিকাময় সাম্প্রদায়িক হত্যাযজ্ঞের ভয়ংকর দিকটা হল আমরা এতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। এটা প্রায়ই ঘটে অবার থেমে যায়। জীবন এখানে এমনই। সময়ের বেশী অংশে ভারতে বিশ্বের বৃহত্তম ধর্ম নিরপেক্ষ গণতন্ত্র বিরাজ করে, আর যদি সেখানে ধর্মীয় উন্মাদনার ধোঁয়া ওঠে, তাহলে ঐ ধোঁয়ায় গণতান্ত্রিক মানচিত্রটি আমরা ঢেকে দিতে পারি না।

গোধরায় ট্রেন বোঝাই ভি এইচ পি সক্রিয়বাদিদের ওপর ভয়ংকর হামলার ঘটনা হিন্দু চরমপšী’দের হাতে খড়গ হয়ে উঠে। (স্মরণীয় এই গোধরায় ১৯৪৭সালে দেশভাগের সময় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় ট্রেন বোঝাই হিন্দু-মুসলিম হত্যার ঘটনা ঘটোছিল) । অযোধ্যায় ধ্বংস করে দেওয়া মসজিদের স্থানে একটা হিন্দু মন্দির নির্মাণ করতে ভিএইচপি বদ্ধপরিকর। গোধরায় সাম্প্রদায়িক হত্যাযজ্ঞ ঘটেছে ওই সূত্র থেকেই। আর বোকার মত নিন্দনীয়ভাবে বিয়োগান্তকরূপে ভারতের মুসলমানেরাও বদ্ধ পরিকর হয়েছে তাদের প্রতিরোধ করতে।

উপরে এতক্ষণ আমরা দেখলাম সালমান রূশদীর আলোকে গোধরা। ভারতের এই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশে এবার কোন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয় নাই। গুজরাটের দাঙ্গার পরপরই সরকার সে ধরণের কোন ঘটনা যাতে না ঘটে তার জন্য সতর্ক থাকে। এ কৃতিত্বের দাবীদার বাংলাদেশ বহুগূণ বেশী ভারত থেকে, তা সবদিনই স্বীকৃত সত্য। ভারতের দাঙ্গার একটি ছক আমাদের খুব অল্পেই এই পশুত্ব চর্চার চিত্রটা বুঝিয়ে দিতে সক্ষম।

লন্ডন থেকে প্রকাশিত পাক্ষিক ইম্পেক্ট ইন্টারন্যাশনেলএর প্রকাশিত এই সা¤প্রদায়িক দাঙ্গার ছকটি আমাদের আলোচ্য বিষয়টির জন্য উপযুক্ত প্রমাণপঞ্জি।

ভারতে মুসলিম বিরোধী দাঙ্গা

বছর       দাঙ্গার সংখ্য          বছর       দাঙ্গার সংখ্যা

১৯৪৭-৫২                              ১৯৬৯    ৫৯৯

১৯৫৪     ৮৩        ১৯৭০     ৫২১

১৯৫৫    ৭২           ১৯৭১     ৩২১

১৯৫৬    ৭৪           ১৯৭২      ২৪০

১৯৫৭     ৫৫          ১৯৭৩    ২৪২

১৯৫৮   ৪১           ১৯৭৪     ২৪৮

১৯৬০    ২৬          ১৯৭৫     ২০৫

১৯৬১    ৯২           ১৯৭৬    ১৬৯

১৯৬২    ৬০         ১৯৭৭      ১৮৮

১৯৬৩   ৬১          ১৯৭৮    ২৩০

১৯৬৪    ১১৭০     ১৯৭৯     ৩০৪

১৯৬৫    ৮৪৯      ১৯৮০   ৪২৭

১৯৬৬   ১৩৩      ১৯৮১    ৩১৯

১৯৬৭    ২২০        ১৯৮২    ৪৭৪

১৯৬৮   ৩৪৬      ১৯৮৩   ৫০০

(Impact International 8-21 June 1984, London)

পরিসংখ্যানটি ভারতের স্বরাষ্ট্র মšত্রণালয়ের বার্ষিক রিপোর্টে প্রকাশিত। এতে ১৯৪৭-৫৩সালের তথ্য পাওয়া যায় নি। তবে এই কয় বছর যে দাঙ্গা হয়েছে তার প্রমাণ পাওয়া যায়। ভারত স্বাধীনতা পায় ১৫ই আগষ্ট আর ১৬ই আগষ্ট থেকে শুরূ হয়ে যায় দাঙ্গা।

Gujarat Riots (Godhra incident): A forgotten story (Report of Dr. V. N Sehgal)

 

কলকাতার দেশ পত্রিকার লেখা সুমন চট্টোপাধ্যায়ের আলোকে, কৃষি ও শিল্প দুয়ের নিরিখেই সবচেয়ে সমৃদ্ধ দক্ষিণ গুজরাটেই কেন বারবার সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। যাকে গোল্ডেন করিডোর বলা হয়ে থাকে। গুজরাটে মুসলিমদের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার মাত্র ৯শতাংশ হলেও তাঁদের মধ্যে একটা উল্লেখযোগ্য অংশ ধনী ও সম্ভ্রান্ত। অপরদিকে হিন্দুত্বের কারবারিদের সামাজিক সমর্থনের ভিতটাও অনেক পাকাপোক্ত। এ রাজ্য স¤পর্কে এক ভাষ্যকারের কথায়, “প্রবাসী স¤পন্ন গুজরাটিরা যত বেশী করে হিন্দুত্বের দিকে পা বাড়িয়েছেন ততই বেশী করে তার প্রভাব পড়েছে তাদের জন্মভূমিতে”। অতএব যদি বলা যায় হিন্দু এজেন্ডা বা হিন্দুত্বের ধ্বজাধারীরা সবচেয়ে কার্যকর ‘ল্যাবরেটরিতে’ পর্যবসিত হয়েছে।

উল্লেখ্য এ বছর ফেব্রƒয়ারীর আগেই গোটা দেশ থেকে হিন্দুত্ব শিবির থেকে যে প্রচার পত্রটি বিলি করা হয়েছিল তাতে মুসলিমদের সামাজিক ও আর্থিক বয়কট করার ডাক দেওয়া হয়েছিল প্রকাশ্যেই। “আপনারা এদের বয়কট করূন। কোন হিন্দু যেন কোনও হিন্দু মালিকানাধীন কর্মক্ষেত্রে যেন মুসলিমরা চাকরি না পায়”। ভোক্তভোগীরা বলছেন, “এই এলাকায় হিন্দুরা কোনও জিনিস মুসলিমদের কাছে বিক্রি করছেন না”। ইতিমধ্যে এ ধরণের বয়কট চালু হয়ে গেছে”। মুসলিম বাসিন্দারা বলছেন তারা আর কাজে ফিরতে পারছেন না তাদের জায়গায় মালিকেরা হিন্দুদেরে কাজ দিয়ে দিয়েছে।

বাস্তবিকই এ ধারা খুব একটা নতুন নয়। তার কিছু বর্ণনা উদ্ধৃত করছি। ভারতে দেখা যায় মুসলমান আমলে শিক্ষা-দীক্ষায় তারা উন্নত ছিল। তারা শিক্ষাকে ধর্মের অঙ্গ মনে করতো। সম্রাট আকবরের শিক্ষা বিষয়ক আইন হতে সে যুগের শিক্ষার উন্নত মান সম্বন্ধে আভাস পাওয়া যায়। এই আইনে বলা হয় “প্রত্যেক বালকের পক্ষে নীতিজ্ঞান, অংক, কৃষি, পরিমাপ-বিদ্যা, রাসায়ন, ও ইতিহাসে জ্ঞান অর্জন করা উচিত। এই সব জ্ঞান ক্রমশঃ আয়ত্ব করা যেতে পারে”। আবুল ফজল লিখেছেন,“এই আইনের ফলে বিদ্যালয়গুলি নতুনভাবে আলোকিত হয় এবং মাদ্রাসাগুলি উজ্জ্বল আলোকে উদ্ভাসিত হয়ে উঠে”।

জেনারেল শ্লীমান মোগল যুগের শিক্ষার মানের প্রশংসা করে লিখেছেন “ভারতীয় gujarat_riot_2002_20100412মুসলমানদের মধ্যে শিক্ষার যেরূপ প্রসার হয়েছে পৃথিবীর খুব কম সম্প্রদায়ের মধ্যেই সেরূপ হয়েছে। তাদের মধ্যে যে ব্যক্তি কুড়ি টাকা মাহিনার চাকুরী করে সে তার পুত্রের জন্য সাধারণতঃ প্রধানমšত্রীর পুত্রের সমান শিক্ষার ব্যবস্থা করে। আমাদের দেশের যুবকগণ ব্যাকরণ, তর্র্কশাস্ত্র ইত্যাদি যে সকল বিষয় গ্রীক ও ল্যাটিন ভাষার মাধ্যমে শিক্ষা নেয় সেগুলি তারা আরবী ও ফার্সি ভাষায় আয়ত্ব করে। অক্সফোর্ড হতে যুবকগণ সদ্য যে জ্ঞান নিয়ে বের হয়ে আসে মুসলমান যুবক সাত বছরে সে জ্ঞান আহরণ করে মাথায় শিরস্ত্রাণ পরিধান করে। সে অনর্গল সক্রেটিস, এরিষ্টটল, প্লেটো, হিপোক্রেটিস, গেলেন ও ইবনে সিনা সম্বন্ধে আলোচনা করতে পারে”। উইলিয়াম হান্টারও একথা স্বীকার করেছেন।

এডাম মুসলমানদের শিক্ষা পদ্ধতির ও মুসলমান শিক্ষকের প্রশংসা করেছেন এবং বলেছেন যে, হিন্দু বিদ্যালয়ের পাঠ্যতালিকা অপেক্ষা আরবী-ফার্সী বিদ্যালয়ের পাঠ্যতালিকা বেশী ফলপ্রদ ও সাধারণ জ্ঞানের উপযোগী ছিল এবং শিক্ষায় ও বিদ্যাবুদ্ধিতে হিন্দু শিক্ষকগণ অপেক্ষা মুসলমান শিক্ষকগণ যোগ্যতর ছিল। এডাম মন্তব্য করেন, যদি বাঘা, বোহার, চাঙ্গারিয়া ও মুর্শিদাবাদের মাদ্রাসাগুলি ভালভাবে পরিচালিত হত তা হলে এরা উচ্চমানের শিক্ষাকেন্দ্রে উন্নীত হত। (জেনারেল লং, ১১১-১৬, ৪৮-৭৩, ২১৫-৩২৭)।

সৈন্যবাহিনী, রাজস্ব, বিচার ও অন্যান্য শাসন বিভাগ মুসলমানদের ঈশ্বর্যের উৎস ছিল। কো¤পানীর শাসনকালে তাহাদেরে এই সব উৎসপথ রূদ্ধ হয়ে যায়। (হান্টার, ইন্ডিয়ান মুসলমানস, ৩;১৪৩)। ১৮৫১সাল পর্যšত মুসলমান উকিলদের সংখ্যা হিন্দু ও ইংরেজ উকিলদের মিলিত সংখ্যার সমান ছিল। সেই সময় ইংরেজী ও ফার্সি ভাষায় বুৎপন্ন ইংরেজ ও হিন্দুর সংখ্যা খুব কম ছিল। ১৮৫২ হইতে ১৮৬৮সালের মধ্যে ২৪০জন ভারতীয়কে চাকুরীতে নিয়োগ করা হয়। ইহাদের মধ্যে হিন্দু ছিল ২৩৯ জন এবং মুসলমান ছিল ১ জন। সরকারী অফিসগুলোতে কচিত মুসলমান দেখা যাইত। (রামগোপাল, ইন্ডিয়ান মুসলমানস, পৃষ্টা ২৭) ।

হান্টার মন্তব্য করেছেন যে, চাকুরী ক্ষেত্রে মুসলমানদেরে এরূপ সর্বোতোভাবে বাদ দেয়া হয়েছে যে, কলিকাতার অফিসগুলিতে চাপরাশী, কলম মেরামতকারী প্রর্ভতি নি¤œতম পদগুলি ব্যতীত অন্য কোনো পদে মুসলমান নাই বলিলেই চলে।  হান্টার মন্তব্য করেন যে একশত বৎসর পূর্বে উচচ রাজপদগুলি মুসলমানদের একচেটিয়া ছিল। কিন্তু ১৮৫৭সালে কলিকাতার একটি বড় অফিসে খোঁজ নিয়ে জানা যায় যে, সেখানে মুসলমানদের ভাষা পড়িতে পারে অনুরূপ একজনও লোক নাই”। (হান্টার, প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা ১৫৯-১৬৭)।

১৮৮২খৃষ্টাব্দে ভারতবর্ষের কলকাতা অফিসসহ মফস্বল অঞ্চলের এক স্বারকলিপিতে মুসলমানদের শোচনীয় সংখ্যাল্পতার প্রতি লর্ড রিপনের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। উল্লেখ্য ঐ হিসাব মাফিক দেখা যায় মোট ১০৮০ জন খৃষ্টান, ৮৫০ জন হিন্দু ৭৭ জন মুসলমান, সর্বমোট ২০০৭ জনের এক তালিকায়। আমীর আলী বলেন, গত বিশ বৎসর যাবৎ মুসলমানগণ যোগ্যতা লইয়া চাকরিতে ঢুকিতে আপ্রাণ চেষ্টা করিতেছে; কিন্তু ভিন্ন সম্প্রদায়ের লোকগণ প্রত্যেক সরকারী চাকুরীর দ্বার রূদ্ধ করিয়া রাখায় তাহাদের পক্ষে কোন অফিসে প্রবেশ করা অসম্ভব হইয়া পড়িয়াছে। যদি সৌভাগ্যক্রমে কোন মুসলমান চাকুরী পায়, তাহা হইলে ইহা রক্ষা করাও তাহার পক্ষে কঠিন হইয়া পড়ে, কারণ তখন তাহাকে তাড়াবার জন্য অফিসে ষড়যন্ত্র চলতে থাকে। (এস এ রশিদ, ২৫-২৬। এম এ রহিমের “বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস” গ্রন্থ থেকে )।

এমতাবস্থায় মুসলমান জমিদারদেরও অবস্থা খারাপ হইয়া পড়ে। হিন্দু জমিদারগণ তাহাদের সম্প্রদায়ের জন্য স্কুল স্থাপন করেছেন। পূর্ব বাংলার কোন হিন্দু জমিদার তাহাদের জমিদারীতে স্কুল স্থাপন না করে পশ্চিম বাংলায় হিন্দু এলাকায় স্কুল স্থাপন করেন। ঠাকুর পরিবার এবং আরো অনেক হিন্দু জমিদারের পূর্ব বাংলায় জমিদারী ছিল। তাহারা কলকাতা ও পশ্চিম বাংলায় বাস করতেন এবং সেখানকার লোকের শিক্ষার জন্য অর্থ ব্যয় করতেন। তাহারা পূর্ব বাংলায় নিজেদের জমিদারীর প্রজাদের শিক্ষার জন্য অর্থ ব্যয় করেন নাই। কোন কোন জমিদার শিক্ষার বিরোধী ছিলেন, কারণ তাহারা মনে করতেন যে, প্রজাগণ শিক্ষিত হইলে জমিদারীতে তাহাদের কতৃত্ব দূর্বল হয়ে পড়বে। (এম আলী. বেঙ্গলী রিয়েকশন টু খ্রীষ্টান ২০৬)।

এডাম তখনকার সরকারেরও সমালোচনা করেন। সরকার মহসিনের ওয়াকফ সম্পত্তি আসল উদ্দেশ্যে ব্যবহার না করে অন্যভাবে ব্যবহার করে। ১৮০৬সালে ধর্মপ্রাণ মহসিন মুসলমানদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে ব্যবহারের জন্য দান করে যান। এই ফান্ডের টাকায় কলেজ স্থাপন হয় ছাত্র ভর্তি এবং ছাত্র বেতনের কারণে অর্থনৈতিক মেরূদন্ডে ভেঙ্গে পড়া মুসলমানরা এখান থেকেও কোন ফায়দা পায় নাই। সরকার কর্তৃক মহসিন ফান্ডের অপব্যবহারের সমালোচনা করিয়া হান্টার লিখেছেন, “এই আত্মসাতের অভিযোগ সম্বন্ধে আলোচনা বড়ই কষ্টদায়ক, কারণ এই অভিযোগ অগ্রাহ্য করা অসম্ভব”।(হান্টার, ১৭৩-৭৫) অনুরূপভাবে চট্টগ্রামে মীর এহিয়ার দানও মুসলমানদের জন্য কোন অর্থবহ হয় নাই। (এম, এ রহিমের “বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস” গ্রন্থ থেকে)।

কয়টি মাস আগে ভারতের বাঙ্গালোরে যে রাষ্ট্রীয় সেবক সংঘের তিন দিন ব্যাপী সম্মেলন হয়ে গেল তার শেষ দিনের একটি প্রস্তাব ছিল এরকম “মুসলমানদেরকে বুঝতে হবে যে তাদের নিরাপত্তা হিন্দুদের উপর নির্ভরশীল। যদিও জোর গলায় বলা হয় যে ভারতের সংবিধান ধর্ম নিরপেক্ষ তার উজ্জ্বল উদাহরণ এসব কি? রাষ্ট্রীয় সেবক সংঘ সব দিনই ভারতকে একটি হিন্দু রাষ্ট্র বানানোর তালেই আছে।

অতএব ২৭ ফেব্রƒয়ারী গোধারায় অযোধ্যা ফেরত কর সেবকরা ট্রেনে অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কেন গুজরাটে প্রত্যাঘাতের লেলিহান আগুণ হিন্দুত্ববাদীদের পক্ষে জ্বালিয়ে দেওয়া সহজ হয়েছেল এবং কেন পুলিশ ও প্রশাসন একেবারেই নিষ্ক্রিয় ছিল তা বুঝতে মোটেই অসুবিধা হয় নি। কেন না গত পাঁচ-ছয় বছর ধরে স্বযতেœ এবং নিপুণ পরিকল্পনা মতো এর জমিটা তৈরী করেছিলেন হিন্দুত্ববাদীরা। উপরের এই কথাটি ছিল সুমন চট্টোপাধ্যায়ের। কিন্তু আমার কাছে মনে হচেছ এর বিষ মাত্র চার-পাঁচ বছর আগের বিষ নয়, এর বিষ বহু পুরানো। ঐ গুজরাটের ঘটনায় আমার নিজের আত্মাও কেঁপে উঠে কারণ ভাগ্যিস আমার পূর্ব পুরূষ বেশ আগেই বুঝতে পেরেছিলেন তার প্রজন্মের স্বাভাবিক শ্বাস প্রশ্বাস নিয়ে বেঁচে থাকার জন্য এ আবাসভূমি উপযুক্ত নয়। তাই আজ অন্ততঃ এরকম এক নরক যাতনার সমূহ সম্ভাবনা থেকে আমি তো বেঁচেছিই আমার প্রজন্মও বেঁেচে গেছে কিন্তু আৎকে উঠি তাদের জন্য যারা এখনও আমাদের অন্যরা যারা ওখানে আজও মার খেয়ে বিবর্ণ বাঁচা বাচছেন নয়তো মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছেন।

নাজমা মোস্তফা, (উপরোক্ত লেখাটি যায়যায়দিন ৩রা সেপ্টেম্বর, ২০০২ সংখ্যায় ছাপে।)

Advertisements

Tag Cloud