Articles published in this site are copyright protected.

(এ লেখাটি লেখা হয়েছিল আজ থেকে বেশ কটি বছর আগে। ঘটনার দুই যুগেরও বেশী সময় পর কোন এক সুযোগে এর মূল অংশটি পড়বার সুযোগ আমার হয়েছিল ২০০৪ সালের ৭ই আগষ্ট আমেরিকায় যখন সিলেট উইম্যান্স কলেজের প্রাক্তন প্রিন্সিপাল শ্রদ্ধেয়া হুসনে আরা আপা এক শুভেচ্ছা সম্মেলনে ‘আমরা তার ছাত্রিরা কেমন আছি’ জানতে চাইলেন। ঠিক সে মূহূর্তে এটি আমার উপস্থাপনার বিষয় হয়েছিল।)

ঠিক দুই যুগ আগের ঘটনা। আমরা তখন সিলেট উইমেন্স কলেজে হোষ্টেলের নিতান্ত ভদ্র শান্ত সভ্য ছাত্রীগোষ্ঠী। হোষ্টেলে নিয়ম কানুনের যথেষ্ট কড়াকড়ি। কর্তৃপক্ষসহ সব অভিভাবকরাই যথেষ্ট সচেতন ও নিশ্চিন্ত থাকেন কলেজের নিরাপত্তাজনিত ব্যবস্থাদির জন্য। সে সময় হোসনেআরা আপা কলেজের প্রিন্সিপাল, স্বাধীনতার আকাশ রক্তিম হয়ে উঠছে মাত্র। কলেজটি সরকারীকরণ তখনও হয় নি। নানান সমস্যা সে সময় লেগেছিল। মাঝে মাঝে কোন কোন পেপারে বেশ মজাদার সমস্যা ঘটিত কোন তথ্য ছাপলে আর রক্ষা নেই। পরদিনই আপার সামনে সবাইকে জবাবদিহি হতে হতো, এ জন্য যে এ কম্মটা কে করেছে? আপার স্থির বিশ্বাস এ আমাদেরই অপকর্ম। এ বিশ্বাসের বশবর্তী হয়ে তার খেসারত হিসাবে আমাদেরও অনেক তিরস্কার পেতে হত। পরে অবশ্য আপা বুঝিয়ে দেয়ার চেষ্টা করতেন যে লেখাপাড়ার জন্য আমরা অনেক ভালই আছি; আমাদের আগের আপারা আরো কত কষ্ট করে গেছেন।

যাক্ পুরানো জমিদার আমলের মূল বিল্ডিং-এই আমরা থাকতাম। সবার মাঝে সম্প্রীতি ছিল আমাদের যথেষ্ট, যা আজকাল চিন্তাও করা যায় না। বড়রা ছোটদের প্রতি যথেষ্ট দ্বায়িত্বশীল এবং ছোটরা সব সময়ই বড়দেরে সমীহ করে চলতেন। মেট্রন খালাম্মা, মাহমুদা বু, আবুলের মা আর গণিভাই এরাই মূলতঃ হোষ্টেলের সদস্য যারা আমাদের থাকা খাওয়াসহ সমূহ দ্বায়িত্বে জড়িত। গণিভাই বাজার সদাই করতো। তা ছাড়াও একজন অভিভাবকের  মতোও ছিল।  আমরা গণিভাইকে তুমি করেই সম্মোধন করতাম। আজ মনে পড়ছে বাড়ী কোথায়, কোন গ্রামে, কোন দিন জিজ্ঞাসা করি নি। তবে বড্ড মায়াবি স্ব^ভাবের, সদালাপী ও কর্তব্য পরায়ণ এক সৎ ব্যক্তি, এতে কোন হেরফের নেই।

অসুখ বিসুখ হাট বাজারে গণিভাই-ই আমাদের সম্বল। নাদুস নুদুস মেদবহুল শক্ত সামর্থ স্বাস্থ্যের অধিকারী গণিভাই এর ব্যস্ততার শেষ নেই। শ’খানেক বোনের একমাত্র ভাই দায়িত্বের কোন শেষ নেই। কখনো কাউকে নালিশ করতে শুনি নি গণিভাই এর কোন খারাপ দিক নিয়ে। টাকা পয়সা থেকে শুরু করে সবদিকেই আমাদের জন্য গণিভাই অসম্ভব বিশ্বস্থ। রাত দশটা বাজলেও হয়তো আমরা পড়ছি বা গল্প করছি, জানালায় দাড়িয়ে আমাদের কুশল নিতে গণিভাই এর ভুল হতো না।

সেবার মনে পড়ে মুখচোরা লাজুক আমি আমার ভিজিটর লিষ্টের বাইরে কারো সাথে দেখা করার জন্য আমি বাধ্য নই। এক ভদ্রলোক খুলনার কোথায় কোন সুযোগে নাকি আমাকে চেনেন। এবার আমায় দেখা করতে হবে। গণিভাই এসে বলে আপনার ভিজিটর আমি তাকিয়ে দেখি এ লোককে জীবনে দেখেছি বলে মনে পড়ে না আমিও এমন বেখাট্টা যে বের হই নি, বেচারা ফিরে যেতে বাধ্য হন। গণিভাই এর সে কি কসরত আমাকে নিয়ে যাবে। কত নিরাপত্তা দিচ্ছিল আমায়, আমি কাছে থাকবো। আপনি দু’ কথা বলে চলে আসবেন। আপনার কোন ভয় নেই, হেন তেন। আমি তবুও যাই নি কারণ আমি স্থির জানতাম এ লোককে আমি মোটেও চিনি না। শেষে শুনেছি আমারই এক ক্লাসমেটের চাচীর নাকি ভাই হয়, সে একদিন ঐ মেয়ের চাচীর সাথে এসেছিল, দূর থেকে সে একদিন আমায় দেখেছে তাই দ্বিতীয় দিন পরিচয় পাকা করতে এসেছিল। যাক তাও সে পাকা খবরখানিও পরে সেই গণিভাই আবার আমার কাছে সাপ্লাই করে।

মনে পড়ে একদিন রাতের খাবার মেনুতে কই মাছের ঝোল। এই কই মাছটা আগে আমার পছন্দের বাইরের বস্তুই ছিল। আজকাল আবার পছন্দ করি। কারণ কাটা বাছার দক্ষতা বেশ বেড়েছে। ঐ কাটাই আমার কষ্টের কারণ, মনে হতো এ যেন এক বিশাল কাজ। কথায় আছে না যেখানে বাঘের ভয়, সেখানেই রাত হয়। ঠিকই ঐ গল্পের  বকের দশা আমারও, একটা কাটা আটকে গেল আমার গলাতে। কোন অবস্থায়ই কাটা বেরুতে চায় না। কত শুকনো ভাত খেলাম অনেক কসরত চললো। এবার তো দু’চোখ দিয়ে টস টস পানি পড়ছে; ভয়ে একাকার, মনে জাগছে ভয়, মোটেও ঢোক গিলতে পারছি না। সবার আগে জাগছে মরণের ভয়। এখন চিন্তা করি এতো তুচ্ছ ব্যাপার কিন্তু তা আমার কাছে মোটেও তুচ্ছ ব্যাপার ছিল না। হঠাৎ গণিভাই এসে হাজির। সর্ব কাজের কাজি লোকটা এতক্ষণে যেন আশার আলো নিয়ে আসলো। সমানেই বলতে থাকে, আপা কোন চিন্তা নেই, এই যাব আর আসবো ; একটা টেবলেট বা পুরিয়া দেব দেখবেন খেলা ফাইনাল, আপনার কাটা গায়েব আপনি নিশ্চিন্তে থাকেন।

এদিকে সব দিকে বেশ হুলোস্থূল পড়ে গেছে আমাদের নিজেদের মাঝেই। ‘রাণী’ নামের আমাদের এক সহপাঠী তার বিজ্ঞানের যন্ত্রপাতির একটি অস্ত্র মানে ‘ফরসেফ’ এনে ঠিক বাঘের ভঙ্গিমায় বকের গলা থেকেই কাটা বের করার কসরত চালালো অবশেষে। কি যে বিজয়ের আনন্দ সে দিন আমার সব সহপাঠিদের। ‘রাণী’ নামের বাঘিনীর বিজয়ে আমিও আনন্দিত আর এই ফাঁকে আনন্দের ঠেলায় তারা আমাকে কোলে করে রুমে নিয়ে আসে বিজয় ধ্বনি দিতে দিতে। সে দিনের ঘটনা আমি অন্তত জীবনেও ভুলবো না। এদিকে আমি কিন্তু উদ্ধার পেয়ে যাই গণিভাই আসার আগেই। গণিভাই এসে শুনতে পায় যে, তার সারসিনী বোনটি বাঘিনী বোনের  কৌশলে রেহাই পেয়েছে সেই বিপদ থেকে।

সেবার থার্ড ইয়ারে উঠেছি, আমরা তখন বেশ সিনিয়র। হঠাৎ করে কারো মাথায় একটা নতুন এক্সপেরিমেন্টের ভুত চাপে। কার মাথায় ভুত প্রথমে ভর করে তা প্রথমে বলতে পারবো না। তবে কেউ একজনা প্রস্তাব করে আর অন্যরা সমর্থণও করে নেয়। কিছু একটা করতে চান উনারা সবাই একজোট হয়ে । কোথাও বেড়াতে যাওয়া বা এরকম একটা কিছু, এমনিতে তো  খুব কড়াকড়ি। মনে পড়ে সেবার খুব মজা করে একটা গ্রুপ ছবি আমরা হেষ্টেলের সবাই দলবেধে ষ্টুডিওতে গিয়ে তুলে আসি। ছবিটা খুবই প্রশংসা কুড়িয়েছে সবারই। পরদিন আমরা শ্রীপুরে পিকনিকে যাব ছবিতে সবার শ্রীপুরে পিকনিকে যাবার প্রস্তুতির ব্যাপারে আয়োজনের গল্পে মেতেছিলাম, সে ফাঁকেই ছবির পোজ নেয়া হয়, তাই ছবিটাতে যথেষ্ট স্বাভাবিকতা ছিল বলে ছবিটা সবাই পছন্দ করে। তাই দেখে আমাদের সেকেন্ড ইয়ারের ছোট আপামনিরাও ছবি তোলেন বেশ একটু প্রতিযোগী মনোভাব নিয়ে। তারা মনে মনে এত সাজ সাজ আয়োজন করতে লাগলো এ যেন হুলোস্থুল ব্যাপার। তাদের স্বপ্ন একটাই যে বড় আপাদের থেকে আমরা আরো সুন্দর ছবি তুলবো। সাথে নেয়া হলো টি পার্টির আয়োজন কারণ তারা ঠিক করলো একটা টি পার্টির আদলেই তারা ছবিটা  সাজাবে।

সেখানে টি পার্টির ব্যবস্থায় সবাই পোজ দিল। তাদের এক মেয়ের ছোটভাইও সাথে গেল। সে ছবির কথা আজো মনে আছে একারণে যে সবাই তো নিজেরা নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত আর এদিকে পিচ্চি ভাইটি চুপচাপ শান্ত হয়ে বসে  ছিল, সবাই খুব মজাসে খাচ্ছে, গল্প করছে আর বেরসিক ভাইটি বেওকুবের মত তাদের কর্মকান্ড দেখছিল, যেটা ছবিতে খুবই দৃষ্টিকটু ঠেকে যে, সবচেয়ে ছোট্ট মানুষটির এ অনুষ্ঠানে অবশ্যই কিছু না কিছুতে  যুক্ত থাকাটা অবশ্যই দরকার ছিল। এটা নিয়ে খুব হাসাহাসি হয়। যাক্ এভাবে অনেক আনন্দ বেদনার মাঝে আমরা আমাদের হোষ্টেল জীবন কাটাই।

অনেক পরে সম্ভবতঃ বছর খানেক পরে মাথায় কিন্তু সেই যে এক্সপেরিমেন্টের ভুত চেপেছিল তা কার্যে পরিণত করতে লেগে যায় আমার সহপাঠিরা। আমি সব দিনই যথেষ্ট শান্ত শিষ্ট ছিলাম, কিন্তু সবার তালে পড়ে আমাকেও যোগ দিতে হলো তাদের এক্সপেরিমেন্টে। এবার কোথায় যাওয়া যায়? সবারই যুক্তি শিক্ষণীয় কোন একটা জায়গায় যেতে হবে। হঠাৎ ঠিক হলো ফেচুগঞ্জ সার কারখানা দেখা হয়নি এখনো, এটারই দফারফা করতে হবে। চাঁদা উঠানো হলো। জেবু আপা সেখানের মেয়ে। সুবিধা হবে উনার আব্বার মাধ্যমে গাড়ী যোগাড় করা যাবে। দুপুরের খাবারও উনার বাসায় সারার প্রোগ্রাম করা হয়। এবার বাকী থাকলো আমাদের একজন শক্ত দিক নির্দেশকের দরকার। আর এ পদটার জন্য সবার পছন্দ গণিভাই। সবাই গণিভাইকে পাকড়াও  করে ধরলো যে তুমি না বললে হবে না, আমাদের নিয়ে যেতেই হবে। স্থানে স্থানে টিকেট, গাড়ী যোগাড় করতে হবে। গণিভাই না গেলে সব প্রোগ্রাম ভেস্তে যাবে। গণিভাই কোন অবস্থায়ই রাজী হচ্ছে না। এ অসম্ভব,  নানান টালবাহানা করেও শেষতক গণিভাই আর পালিয়ে বাঁচতে পারে নি। এতটা বোনের তোপের মুখে তাকে হার মানতেই হয়।

পরদিন আমরা প্রত্যেকে আলাদা আলাদা করে হোষ্টেল সুপার আপার কাছে একদিনের ছুটি চেয়ে এপ্লিকেশন দাখিল করি। আপা টের পান নাই যে, আমরা গোটা হোষ্টেলের একই ক্লাসের সবাই জোট বেধে ছুটি মঞ্জুর করিয়ে নিচ্ছি। কারণ থার্ড ইয়ারে আমরা ছাত্রী সংখ্যা খুব একটা বেশী না, হাতে গোনা ডজনখানেক। তারপর মহানন্দে তার পরদিন আমাদের মহাযাত্রা শুরু । গণিভাই আমাদের গাইড, ওস্তাদ, পথপ্রদর্শক সবই।

ভোরে মানে একদম কাক ডাকা ভোরেই আমরা সবাই রিক্সা করে সিলেট প্ল্যাটফরমে পৌছাই। যাত্রা হলো শুরু। গন্তব্যে যাবার আগেই এসব জল্পনা কল্পনার ফাঁকেই জেবু আপা বাসায় সঠিক তারিখটি জানিয়ে চিঠি দেন এতে সুবিধা হয় অনেক। জেবু আপার আব্বা আমাদের জন্য গাড়ী ঠিক করে দেন। যাতে এজায়গা ওযায়গা ঘুরতে আমাদের সুবিধা হয়। বিকেলেও ষ্টেশন পর্যন্ত আমরা ঐ গাড়ীতেই আসি। এবার যেই সার ফ্যাক্টরীতে ঢুকতে যাব কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করলে ওরা জানায় আমাদের টিচারদের পক্ষ থেকে একটা এপ্লিকেশন দেখাতে হবে। মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো এবার টিচার পাই কই ? টিচার তো নেই গাইড মোদের গণিভাই মাত্র। বস্তুত এখানে মাথার তো আর অভাব নেই, বুদ্ধি একটা হলো।  এই ডজন সদস্যের মাঝ থেকে দু’জনকে টিচার বানিয়ে এপ্লিকেশন এ সই করে তা দাখিল করা হয়। এতে সহজেই আমাদের পাস পাওয়া সহজ হয়ে যায়। বাংলাদেশ এর মত একটা দেশে ছিলাম বলে কেমন বেওকুফের মতই না আমরা কান্ড করি। তা ছাড়া বয়সও কম। সবার মাথাই গরম। কারো মাথায় এটা নিশ্চয় নেই যে, এত দূর গিয়ে ব্যর্থ মনোরথ হয়ে ফেরত আসবো, তা ভাবাই যায় না।

দু গন্ডা তিন গন্ডা মাথার কুবুদ্ধি সুবুদ্ধির এক সংমিশ্রণে আমাদের উপরোক্ত অভিযান আবার  মাঝপথ থেকে গতি ফিরে পায়। শয়তানের কারখানা সচল না থাকলে সেখান থেকেই আমাদের ফিরতে হতো। যাক্ এবার দুই টিচারের পক্ষে সই করেন আমাদেরই দুই সহপাঠী একজন বাংলা ও অন্যজন দর্শনের শিক্ষক সেজে। এ দু’জনকে আমরা যথেষ্ঠ তফাতে রেখে চলি, কিন্তু সই করলে কি হবে একটু পর যে হাটতে হাটতে একে অন্যের হাত ধরে ফেলছি, কাঁধ ধরে ফেলছি তা খেয়ালই পড়ছে না যে বর্তমানে তো তিনি টিচার। হয়তো বা কেউ, সে কথা মনে করিয়ে দিলে আবার সরে আসছি। এমনি জোড়া তালি মেরে আমরা সব বাধা ম্যানেজ করে দুপুরে জেবু আপার বাসায় খেতে যাই।

এবার তো ঝামেলায় পড়ি আমরা আমাদের ব্রাহ্মণ প্রজাতির পদ্মদি’কে নিয়ে। বেচারী বড়ই জাত সচেতন। জেবুআপার বাবার ম্যনেজ করা গাড়ীতে চড়লেও বেচারী ওদের ম্যনেজ করা রান্ন্া খাবেন না, যা এতক্ষণ তিনি প্রকাশও করেন নি। পেটে রেখেছিলেন গোপন ইচ্ছাটা আর মনে মনে ভাবছেন আজ উপবাস কাটিয়ে জলপান করবেন শুধু রাস্তা থেকে বিস্কিট, কলা খেয়ে নেবেন। যা হোক বিস্কিট কোন ব্রাহ্মণ সন্তান তৈরী করলো কি না সে বড় কথা নয় অন্ততঃ তার কারিগরকে তিনি চেনেন না এই রক্ষা। এ নিয়ে নানান বাকবিতন্ডা চললো । সবচেয়ে ঝমেলায় পড়লেন জেবু আপা কারণ পদ্মদি জেবুআপারই পুরানো সহপাঠি যার কারণে দু’জনাকেই আমরা আপা, দিদি ডাকতাম তার উপর আমরা অর্থাৎ পদ্মদি’ও জেবু আপার গেস্ট। জেবু আপা কত সাধলেন এটা খেয়ে নে ওটা খেয়ে নে, কিন্তু দিদি মনির একই কথা; আমাকে সাধবে না, অসুবিধা আছে।

দিপ্তী নামের আমাদের এক সহপাঠী দেখতাম সব সময় পদ্মদি’র এসব অনাচারের কথা সমানে গজর গজর করে বলতে থাকতো আর ব্রাহ্মণদের শ্রাদ্ধ উদ্ধার করতো। এ প্রজাতি মনে হতো তার দু চোখের বিষ। দিপ্তী ছাতকের মেয়ে, উল্লেখ্য আমাদের সেই টিমে সে দিন পাঁচজন ছিলাম মুসলমান বাকী ছয়জনা হিন্দু, একজন খ্রীষ্টান। হিন্দু মেয়ে দিপ্তী ব্রাহ্মণদের অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে সারাক্ষণ এদের কথা বলতো; তার অভিযোগ দেবতা নাকি তাদের দান ধন গ্রহণ করেন না ব্রাহ্মণ ব্যতীত; এসব কথা বলতে বলতে সে তার অভিজ্ঞতার চাপা ক্ষোভ প্রকাশ করতো সবসময়। যাক্ উপস্থিত  দিপ্তী, নন্দা, অরুণা, অর্চনা, পারুল, কেউই এব্যপারে কোন আপত্তি তোলে নি।  এভাবেই জোড়াতালির খাওয়া পর্ব শেষ হলো।

ওখান থেকে আবার বিকেলে অন্য একটা অংশ দেখতে যাই। সার কারখানার যথেষ্ট যন্ত্রপাতি ফিরে দেখাই সার। এবার আরো সামান্য ঘূরাঘুরি করে বিকালে প্রস্থান। প্ল্যাট ফরমে দেখা যায় কিছু বেকার ভ্যাগাবন্ড ছেলেপেলে আমাদের চারপাশে ঘুর ঘুর করতে থাকে। তারপর আর যায় কোথা আমাদের গণিভাই নামক গাইড এর পাল্লায় পড়ে খুব সহজে কেটে পড়ে।

সন্ধ্যে ঘনিয়ে আসছে। ষ্টেশনে এসে ট্রেন নামক জানটি থামলে পরে আমরা নেমে হাটা ধরি। কারণ আরেকটা সখ এখনও বাকী আছে নৌকা চড়া হয় নি অনেকেরই তার উপর সুযোগও আছে। আমরা তখন ঐ কিন ব্রিজের উপর দিয়ে না গিয়ে নীচে বোটে করে যেতে চাই, তাই হেটে যাত্রা দিলাম নদীর পার পর্যন্ত নদীর ঘাটে। এর মাঝে কারো একজনের অনেক দামী কলমের মাথাটা খসে পড়ে। যার মাথা গেছে তার মন কেঁপে উঠে অজানা অশংখায় কারণ নীড় ছাড়া পাখী নীড়ে ফেরার প্রাক্কালে সংস্কারাচ্ছন্ন মন চমকে উঠছে বারে বারে। জানি না আজ অনেক আকাম করে ফিরলাম, শেষ রক্ষা হবে তো? সেই ভয়ে। যেই কলমের মাথার খোঁজ পড়লো দেখা যায় ভাগ্যবতী অন্য একজনা সেটাও পেয়েছেন। এমনি এমনি করে নানান ঘাত প্রতিঘাত সেদিন সামনে পড়ে, আবার কিছু পরে তা কেটে যায়। বোটের মিষ্টি বাতাস সন্ধ্যের আলো আধারীতে আমরা চড়ায় এসে পৌছাই। তারপর রিক্সা নিয়ে সোজা হোষ্টেল।

হোষ্টেলে যেই ঢুকেছি দু’একজনা এসে একটু ইঙ্গিত দিল যে মেট্রন খালাম্মা খুব কৌশলে তা প্রিন্সিপাল আপার কাছে লাগিয়ে, তা খুব বাহাদুরি ভঙ্গিতে কানে দিয়ে এসেছেন। সব চেয়ে বড় খবর মেয়েরা কোথায় যেন দলবেধে গিয়েছে।

হ্যাঁ, ‘মিথ্যা বলা মহাপাপ’ আমাদের সময়ে এ কথাটা শিশুকালেই খুব বেশী নাড়াচাড়া করতাম তা যেন মন ও মজ্জায়ই মিশে ছিল। সেই শিক্ষাটাও এ যাবত খুব মর্যাদার সাথে পালনও করে আসছি। আর যেদিন মাত্র জীবনের প্রথমেই দলবেধে এটার প্রয়োগে বাধ্য হই সেদিন বুঝি এ যে কত সত্য। এক মিথ্যা বলে একটি সত্য চাপা দেয়া যায় না। একটা সত্য চাপা দিতে হলে হাজারটা মিথ্যা বলতে হয় । এবার আপার প্রশ্নের মোকাবেলা করতে হবে। জানলে তো আর রক্ষা নেই। কত অনাচারই না আমরা করেছি, অগত্যা তিন গন্ডা শয়তানের মাথা আবার এক হলো; স্থির হলো যে না, ফেঞ্চুগঞ্জ না বলে বরমচালে যাবার কথা প্রকাশ করতে হবে ওখানে আমাদের এক সহপাঠীর বাবা দারুণ অসুস্থ। উনাকে দেখতে গেছি বললে আপা কষ্ট পাবেন না । উনি হয়তো খুূশীও হতে পারেন যে অসুস্থ একজনকে দেখতে গিয়েছি। যাক্ যাই ভাবা তাই করা  হচ্ছে, এসবই এই ডজন মাথার নষ্টকীর্তি। আপা তো ক্ষেপে আগুন। কেন একজন অসুস্থের বাড়ী এক ডজন মানুষ হাজির হলাম কোন আক্কেলে। উনার আর্থিক অবস্থা সুবিধার না, তার উপর তোমরা এতগুলা মেয়ে হেন তেন যতটুকুই আমাদের উপর বর্ষন করা হলো আমরা নত মস্তকে সব হজম করে ফিরলাম। এবারই আমাদের আসল কষ্ট বা শাস্তি যা এখনও হয়নি। যে শাস্তির তোড়ে আজও আমি কষ্ট পাই। যে কষ্ট আজও শেষ হয়ে যায় নি। এ এক ব্যতিক্রমী কষ্ট।

এ কষ্ট আমাদের এ ডজনের উপর দিয়ে মোটেও যায় নি। জানি না কার কি রকম মনে আছে, আমি আজো জর্জরিত সেই কষ্টের, সেই শাস্তির কুটিল পরিণতিতে। এক  ডজন সদস্যের খারাপ কাজের খেসারত যে নিতান্ত একজন সহজ, সরল, সৎ, অতিরিক্ত দায়িত্ব সচেতন সেই আমাদের একান্ত গাইড, পথপ্রদর্শক, সবার প্রিয় গণিভাইটিকে দিতে হয়। আজও আমি খুজে বেড়াই কোথায় আছে গণিভাই, কেমন আছে জানি না। মানুষের জীবনে এমনি অনেক কষ্ট জমা পড়ে থাকে, যার হয়তো কোন সহজ সমাধান আমরা দিতে পারবো না।

প্রিন্সিপাল আপা গণিভাইকে কলেজ থেকে বের করে দেন। গণিভাইএর চাকরি চলে যায়। সেদিন  অসহায় ছিলাম আমরা এই ডজন মেয়ে। কড়া শাসন আপার, আপাকে শোনানোর কারো সাধ্য নেই ।  কিন্তু আজো দুই হাত তুলে পরম করূণাময়ের কাছে গণিভাই এর জন্য মঙ্গল কামনা করি। গণিভাই সুস্থ থাকুক। গণিভাই এর ভালো হোক। আমাদের এখান থেকে বের হয়ে গণিভাই যেন আরো ভালো আরো সৎ সুন্দর হয়ে বাঁচতে পারে, আল্লাহর কাছে তার সুন্দর জীবন তার মহৎ হৃদয়ের সঠিক মূল্যায়ন হোক, গণিভাই তোমার জন্য আমার এ দোয়া জমা রইল।

ঢাকা ক্লাবের সে মিলন মেলায় সেদিনের সে বিশেষ মূহূর্তে এটি প্রকাশ করতে পেরে আমার ভালো লেগেছে। গণিভাইএর চাকরিচ্যুতি হয়তো যুক্তির বিচারে সঠিকই ছিল। গোটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে নিয়োজিত একজন কর্তা ব্যক্তির কর্তব্য সচেতনতা প্রশংসনীয় ছিল সন্দেহ নেই কিন্তু অল্প বয়স ও অনভিজ্ঞতার কারণেই আমরা আঁচ করতে পারি নি যে এরকম একটা কিছু হতে পারে। নিরাপত্তার জন্য অন্য কাউকে না নিয়ে গণিভাইকে নেয়া হয়। সেদিন ওটিই ছিল আমাদের এই ডজন গোয়েন্দার গলদ।

(বক্তব্যটি রেখে ষ্টেজ থেকে নামার সময় আমার শ্রদ্ধেয় আপা বললেন, ‘তোমাদের গণিভাই ভালই আছে, সে দেশে কোন এক ব্যাংকএ চাকরি করছে আজো এবং ভালোই আছে’। আমার সকল কষ্ট যেন সে মূহূর্তে মুছে গেল আজ প্রায় তিরিশ বছর পর।)

সুসংগ্রহ : “আর যারা ঈমান এনেছে ও সৎ কাজ করেছে তাদের আমরা শীঘ্রই প্রবেশ করাবো স্বর্গোদ্যান সমূহে, যাদের নীচ দিয়ে বয়ে চলে ঝরণারাজি (২ঃ২৫ ), তারা সেখানে থাকবে অনন্তকাল (১১ঃ১০৮) ; আল্লাহর এ ওয়াদা ধ্রুবসত্য। আর কে বেশী সত্যবাদী আল্লাহর চেয়ে কথা রাখার ক্ষেত্রে?” (সুরা আন-নিসা, ১২২ আয়াত, আল-কুরআন )

 

নাজমা মোস্তফা, রচনাকাল ১৯৯৮ সাল। 

 

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

Tag Cloud

%d bloggers like this: