Articles published in this site are copyright protected.

Archive for March, 2005

অযোধ্যার আগুনের সলতেটা কার আজো জানা হলো না

২১ জানুয়ারী ২০০৫ এর লন্ডন থেকে প্রকাশিত সুরমার খবরের একটি শিরোনাম ছিল “গুজরাটের আগুন মুসলমানদের ছিল না”। ঢাকা ১৮ই জানুয়ারী ২০০২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারী ভারতের গুজরাটে হিন্দু তীর্থ যাত্রীবাহী একটি ট্রেনে মুসলমানরা অগ্নিসংযোগ করেছিল বলে যে অভিযোগ করা হয়েছিল গত সোমবার উচ্চপর্যায়ের সরকারী তদন্তে তা মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। এ অগ্নিকান্ডের কারণ অনুসন্ধানে গঠিত চার সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি সোমবার তাদের রিপোর্ট প্রকাশ করেছে, ট্রেনের কোচের ভিতরে কোন রান্না বা সিগারেটের আগুন থেকে এই অগ্নিকান্ডটি ঘটতে পারে। মুসলমানরা তাতে অগ্নি সংযোগ করে নি। ২০০২ সালে জাতীয়তাবাদী বিজেপি জোট সরকারের সময়ে ঘটিত  এ দুর্ঘটনার জন্য এক তরফাভাবে মুসলমানদেরে অভিযুক্ত করা হয়। এবং বলা হয়েছিল এভাবে যে কেরোসিন বোমা ছুড়ে মুসলমানরা ট্রেনটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়। এর ফলে লেলিয়ে দেয়া এই ঘটনার শেষ পরিণতি হিসাবে সচরাচরের মত যে ভয়াবহ দাঙ্গার মোকাবেলা করতে হয় গুজরাটের মুসলমানদেরে। অতীতের অনেক ঘটনার মতই উগ্র হিন্দুরা চড়াও হয় মুসলমানদের উপর, বেসরকারী হিসাবে নিহতের সংখ্যাটি ছিল দুইহাজারেরও বেশী। নিহতের বেশীরভাগই ছিল মুসলমান কারণ তারা মারতে আসে নি তারা মার খেতে থাকে।

তখনকার ঘটনাটি ছিল একটি দুর্ঘটনা। কিন্তু কেমন করে সেই দুর্ঘটনা মোড় ঘুরিয়ে নিল ধর্মীয় উন্মাদনায়। ভগবানের নাম নিয়ে শুরু হলো ভগবানের সন্তানদের নিয়ে হুলি খেলা, দোষটা এই ছিল এরা ভগবানের ভিন্নধর্মী গোষ্ঠীর সদস্য ছিল বলে। ভারতের সুপ্রিমকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিটি তাদের অন্তরবর্তীকালিন রিপোর্টে বলেছে ২০০২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারী সবরমতি এক্সপ্রেসে এস-৬ নং কোচে এটি ছিল একটি দুর্ঘটনা। প্রাপ্ত সাক্ষ্য প্রমাণ থেকে দেখা গেছে, কোচটির অভ্যন্তরেই দুর্ঘটনার সুত্রপাত হয়েছিল, বাহির থেকে নয়। বিচারপতি ইউসি ব্যানার্জি আরো বলেন, এটা কখনো বিশ্বাসযোগ্য নয় যে ত্রিশূলে সজ্জিত কর সেবকরা চুপচাপ নিজেদের পুড়ে যেতে দিয়েছে। উত্তর প্রদেশের অযোধ্যা থেকে হিন্দু তীর্থ যাত্রীরা ট্রেনটির দুটি কোচে করে গুজরাটে ফিরছিল। গুজরাটের গোধরা ষ্টেশন ত্যাগ করার পরই ট্রেনের দুটি কোচে আগুন ধরে গেলে ৫৯ তীর্থযাত্রী কর সেবক অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যান।

ঘটনার পর পরই গুজরাট রাজ্যে ও কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয় যে, গোধরা ষ্টেশনে মুসলমানদের সঙ্গে হিন্দু যাত্রীদের বাদানুবাদের পরিপ্রেক্ষিতে মুসলমানদের একটি দল ট্রেনে কেরোসিন বোমা ছুড়ে অগ্নিসংযোগ করে। ক্ষমতাসীন সরকার বিজেপি ট্রেনের দুই কোচে হামলার জন্য ১৩১ জনকে অভিযুক্ত এবং বিশেষ সন্ত্রাস বিরোধী আইনবলে ১০৪ জনকে গ্রেফতার করে। দুই বছর আগের ঘটনাটি এভাবে ঘটেছিল বা ঘটানো হয়েছিল।

সেদিন দাঙ্গাবাজদের মুখের শ্লোগানের ভাষা ছিল, “ইয়ে অন্দর কি বাত হ্যায়, পুলিশ হামারা সাথ হায় কিংবা জানসে মার দেঙ্গে, বজরং দল জিন্দাবাদ, নরেন্দ্র মোদি জিন্দাবাদ” হাতে পুর সভার দেয়া ভোটার তালিকার কম্পিউটার প্রিন্ট আউট। মুসলিম গেরস্থ, ব্যবসায়ী বা দোকানীদের নাম ঠিকানার তালিকা। তখনকার তদন্তে প্রমাণিত ছিল যে, সুপরিকল্পিত এই আক্রমণে বেছে বেছে মুসলিম বাড়ী, দোকান বা সংস্থার উপর হামলা চালানো হয়েছে, পাশের হিন্দু বাড়ীটিকে সন্তর্পণে এড়িয়ে গিয়ে। ১লা মার্চ শুধু আহমেদাবাদেই ভাঙ্গা হয়েছে ২০ মসজিদ। ছাড় দেয়া হয় নি ঐতিহাসিক মুসলিম সৌধ গুলিকেও। অধিকাংশ মসজিদ ভেঙ্গেই তড়িঘড়ি সেখানে হনুমানের মূর্তি বসিয়ে হিন্দু মন্দির করে দেয়ার চেষ্টাও হয়েছে। তখনকার মোদি সরকারের ব্যাখ্যা ছিল এটি তার রাজ্যে যেটি হয়েছে সেটি গোধরার বদলায় মানুষের স্বতঃস্ফুর্ত প্রতিক্রিয়া। প্রাথমিকভাবে মোদী সরকার ও কেন্দ্রীয় সরকার একই সুরে বলেছিল, গোধরার ঘটনা পাক সন্ত্রাসবাদীদের চক্রান্ত। পুলিশ সেদিন সাহায্য প্রার্থীর কোন ফোন ধরে নি বরং বলেছে, ’আপনাদের বাঁচানোর কোন নির্দেশ আমাদের কাছে নেই’।

উল্লেখ্য প্রাথমিকভাবে গুজরাট সরকার ঘোষণা করেছিল, গোধরার ঘটনায় নিহত হিন্দুদের পরিবারবর্গ পাবে দুই লাখ টাকা এবং মুসলমান পাবে তার অর্ধেক। সংস্কারপন্থী হিন্দু সমাজবাদী দলের নেতা কে সি ত্যাগী দুঃখ করে বলেন, ”ভারতে মুসলমানদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণের এটি একটি দৃষ্টান্ত মাত্র”। মানবিক সাহায্য পৌছে দেয়ার কাজেও গুজরাট সরকার যে গড়িমসি করেছেন, মানবাধিকার সংগঠনগুলোর রিপোর্টেও এই ন্যাক্কারজনক সত্যটিও ফুটে উঠেছে। উপরোক্ত তথ্যাদি কোলকাতার দেশ পত্রিকার সৌজন্যে প্রাপ্ত। পুলিশের রেকর্ড অনুযায়ী মুসলমানদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। এর হার ছিল ৮৫।

২৯ আগষ্ট ২০০৩ তারিখের খবরে প্রকাশ, গুজরাট রাজ্যের গত বছরের দাঙ্গার তদন্তে সাক্ষ্য দিতে এসে কট্টরপন্থী হিন্দুদের হাতে লাঞ্ছিত হয়েছেন একজন মুসলিম বিধবা মহিলা। জাকিয়াবানু নামে এই মুসলিম মহিলার স্বামী সাবেক পার্লামেন্ট সদস্য জাফরি দাঙ্গার সময় উগ্র হিন্দুদের হাতে নিহত হন। পুলিশ তখনও নিষ্ক্রিয় থেকেছে বলে রিপোর্টে এসেছে। গুজরাটের করূণ শিকার একজন হতভাগী জহিরা শেখের ঘটনাও খবরে এসেছে। এতেই আঁচ করা যায় ওখানের ঘোলাটে পরিবেশের অবস্থান।

১৯৯২এর ডিসেম্বর থেকে যখন ভিএইচপির একদল লোক ৪শ’ বছরের পুরানো অযোধ্যার বাবরী মসজিদ ধ্বংস করেছিল, মসজিদটি দেবতা রামের পবিত্র জন্মস্থানে নির্মান করা হয়েছিল বলে তারা দাবী করেছিল। সেই সময় থেকে তারা এরকম শক্ত একটা কিছু করার সুযোগ খুঁজছিল। অনেকে মনে করেছিলেন বোকা মুসলমানেরা সে সুযোগটা করে দিল সেদিন গোধরায়। আসলে এ সুযোগ দেখা যাচ্ছে এসব বোকারা করে নি। এই গোধরায় ১৯৪৭ সালেও এরকম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছিল। আমরা আগেই জেনেছি টাইম পত্রিকার দৃষ্টিতে ভারতে হিন্দু মুসলিম বৈষম্য নিরক্ষরতার হার। হিন্দু ১৯% মুসলিম ৩০%. জিডিপি মাথাপিছু হিন্দু ৪৬১, মুসলমান ১০৯ ডলার। স্মরণযোগ্য ও উল্লেখযোগ্য খবরটি হচ্ছে গুজরাট দাঙ্গার ঘটনায় মূখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ব্যাপক সমালোচিত হলেও সেবার ডিসেম্বরের নির্বাচনে তিনি বিজয়ী হন। হিন্দু অধ্যুষিত গুজরাটের জনগণ তাকে পুর®কৃত করেন এভাবেই। মুসলমানরা সংখ্যালঘু হলেও এদের সংখ্যা বিশাল, এরা ১৫ কোটি সংখ্যার দিক দিয়ে, ইন্দোনেশিয়ার পরই এর অবস্থান। পল্লী এলাকায় ২৯ ভাগ মুসলমানের গড় আয় মাসে ৬ ডলারেরও নীচে, যেখানে এই হার হিন্দুদের বেলায় ২৬ ভাগ। মোট জনসংখ্যার তেরোভাগ মুসলমান হলেও সরকারী চাকুরীতে মাত্র ৩ ভাগ, আর বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের অবস্থা আরো করূণ।

ভারতীয় পুরাতত্ত্ব জরিপ (এএসআই) বিভাগের দেয়া রিপোর্ট নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন খ্যাতিমান পুরাতাত্ত্বিক ও ইতিহাসবিদগণ। ২৯ আগষ্ট ২০০৩ এর প্রকাশিত রিপোর্টে বলা হয়, উত্তর প্রদেশ হাইকোর্টের নির্দেশে এএসআই বাবরী মসজিদের নীচে দশম শতাব্দীর বিশাল মন্দির ছিল তার প্রমাণ মিলেছে বলে তথ্য দিয়েছে। এতে হিন্দু পরিষদ এটিকে স্বাগত জানালেও বাবরী মসজিদ অ্যাকশন কমিটি ইতিমধ্যে এ রিপোর্টটিকে খারিজ করে দিয়েছে। বিখ্যাত পুরাতাত্ত্বিক সুরষ ভান বাবরী মসজিদ এলাকার খননকাজ চলার সময় সেখানে গেছেন। তিনি টাইমস অব ইন্ডিয়া পত্রিকাকে বলেছেন, বাবরী মসজিদ চেম্বারের পশ্চিম দেয়ালের কিছু জিনিস বিবেচনা করা হয়নি। তিনি বলেন বাবরী মসজিদের দেয়াল নির্মাণে যে পোড়া ইট ব্যবহার করা হয়েছে তা আকারে বাঁকা। এ বিষয়টি যদি বিবেচনা করা হয় তাহলে তার মতে, এখানে এমন কিছু থাকা সম্ভব নয়, যা হিন্দুদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। সুরষ ভানের দাবী, খনন কাজে পাওয়া ৫০ টি পিলার বিভিন্ন ধরণের। যার অর্থ এখানে একাধিক স্থাপনা নির্মাণ হয়েছিল।

এএসআইএর খননকাজের সময় সেখানে অনেকক্ষণ কাটিয়েছেন দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আর সি ঠাকরান। তিনি বলেন পিলারগুলো কি দিয়ে তৈরী তা আমি দেখেছি। ছোট, পাতলা মধ্যযুগীয় ইট দিয়ে তৈরী, চওড়াও কম। তার প্রশ্ন এর উপরে কিভাবে একটা বিশাল স্থাপনা থাকতে পারে। অযোধ্যায় খননকাজ চলাকালে সেখানে সুন্নী ওয়াকফ বোর্ডের প্রতিনিধি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সুপ্রিয়া ডার্মা। তিনি বলেন, এএসআই রিপোর্টে বলা হয়েছে, দশম শতাব্দী থেকে এখানে মন্দির ছিল। তারপর মসজিদ। খননকাজের সময় এখানে পশুর গাড়গোড়ও আমরা কি হিসাবে বিবেচনা করবো। সুপ্রিয়া ভার্মা বলেন, ’যে ধরণের ইট ও পাথর সেখানে পাওয়া গেছে তা যে কোন স্থাপনা নির্মাণে ব্যবহার করা হতো। ঠিক মন্দিরেই এ ধরণের ইট ব্যবহার হতো এটি ঠিক নয়। অধ্যাপক আর সি ঠাকরানের মতে, এএসআই যে বিশাল স্থাপনার কথা বলেছে তার সঙ্গে মসজিদের মেঝের মিল আছে। ওগুলো মূলত চুন সুরকি দিয়ে তৈরী, যা ইসলামিক স্থাপত্যের সঙ্গে জড়িত। (৫ সেপ্টেম্বর ২০০৩, লন্ডন থেকে প্রকাশিত সুরমা)

হিউম্যান রাইটস ওয়াচএর রিপোর্ট ছিল গুজরাটে মুসলমান গনহত্যার কোন বিচার হয় নি। এ সংস্থা গুজরাটে ব্যাপক আকারে গণহত্যার ব্যাপারটি তদন্তের জন্য উদাত্ত আহবান জানিয়েছিল। কেননা গুজরাটের রাজ্য সরকার এই গণহত্যার বিষয়টি ধামাচাপা দিয়েছে। ২০০৩ সালের ২৭ জুন সে রাজ্যের ভাদোদোরায় একটি বেকারীতে ১২ জন মুসলমানকে জীবন্ত পুডিয়ে মারার দায়ে অভিযুক্ত ২১ ব্যাক্তিকে মুক্তি দিয়েছে। ৭৩ জন সাক্ষীর মধ্যে ৩৫ জন হামলাকারী চিহ্নিত করে পুৃলিশের কাছে যে বিবৃতি দেয়া হয়েছিল আদালত তা প্রত্যাহার করেছে। হিউম্যান রাইটসএর সিনিয়র গবেষক স্মিথা নারুলা বলেন, গণহত্যার ব্যাপারে সরকারের ভূমিকা আতংকজনক। তিনি আরো বলেন সহিংসতা শুরুর ১৬ মাস পরও সরকার কাউকে অভিযুক্ত করেনি। অথচ গোধরায় ট্রেনে গণহত্যায় জড়িত থাকার জন্য ভারতের বহূল সমালোচিত সন্ত্রাস প্রতিরোধ আইনে (পোটা) শতাধিক মুসলিমকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। মুসলিম গণহত্যায় জড়িত থাকার দায়ে পোটা আইনে কোন হিন্দুকে সরকার অভিযুক্ত করেনি বরং সরকার প্রচার করে এসেছে এটা স্বতঃস্ফুর্ত। দায়ী হাজার হাজার ব্যাক্তিকে লোক দেখানো গ্রেফতার দেখিয়ে পরে একে একে জামিনে মুক্তি দিয়ে দেয়া হয়। ওখানে বরাবরই এসব অপরাধকে হালকা হিসাবে দেখা হয়। হত্যা অথবা ধর্ষণকে দাঙ্গা হিসাবে প্রদর্শণ করে। অভিযুক্তদের নাম বাদ দেয়ার জন্য ভিকটিমদের বিবৃতি বার বার পাল্টানো হয়। যখন মামালা আদালতে উঠে তখন মুসলিম ভিকটিমরা পক্ষপাতদুষ্ট সরকারী কৌসলি ও বিচারকদের সম্মুক্ষীন হন। গুজরাটে শত শত মুসলিম মহিলা ও বালিকাকে পৈশাচিকভাবে ধর্ষণ করা হয় এবং আগুণে পুড়িয়ে মারা হয়। হিউম্যান রাইটসএর রিপোর্ট অনুযায়ী এসব মামলা চালাতে গুজরাটের পুলিশ অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

Babri Masjid Black day on Asaduddin Owaisi

রেলমন্ত্রী লালু প্রসাদ যাদব গত ২০০৪ এর জুলাই মাসে উচ্চ পর্যায়ের বিভাগীয় তদন্তের ঘোষনা দেন। এই কমিটি কমপক্ষে দুবার গোধরা সফর করে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। বেশ কয়েকটি দেশী এবং বিদেশী মানবাধিকার সংগঠন গুজরাটের দাঙ্গার প্রতি ক্ষমতাসীন হিন্দু জাতীয়তাবাদী বিজেপি প্রশাসনের নির্লিপ্ততা এবং কিছু ক্ষেত্রে দাঙ্গাকারীদের সহযোগিতা করার দায়ে বিজেপিকে অভিযুক্ত করে আসছে। বিজেপি নেতা মোখতার আব্বাস নকভী গত সোমবার ব্যানার্জি কমিটির এ তদন্ত রিপোর্ট রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রনোদিত বলে আখ্যায়িত করে তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। সাবেক আইন মন্ত্রী অরূণ জেট লিও প্রশ্ন তুলে বলেছেন, ঘটনাটির তদন্ত কাজ বিভিন্ন আঙ্গিকে চলছে। তারপর আরো একটি তদন্তের কি প্রয়োজন ছিল? কংগ্রেস দলীয় মুখপাত্র অভিষেক মন্নু সিং বিজেপির এসব প্রতিক্রিয়াকে দায়িত্বহীন বলে নাকচ করে দিয়েছেন। তিনি বলেন তদন্ত রিপোর্টটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত বলে যে অভিযোগ করা হয়েছে তা একটি পুরানো অভিযোগ।

বাবর ছিলেন মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা শাসক। মূলতঃ মুসলমানদের ইতিহাস বেশ একটু পুরানো হলেও মোগল সাম্রাজ্যের ইতিহাস খুব একটা পুরানো নয়। একজন শাসক যিনি তার যোগ্যতা দিয়ে নতুন জায়গায় নিজের অবস্থান করে নেন, নাকি শুরুতেই বর্বরতা দিয়ে অদূরদর্শীতার পরিচয় দিয়েই ইতিহাসের পাতায় নামটি খোদাই করেছিলেন। এ মসজিদ ভাঙ্গার কাজ যদি পরবর্তীরা করতেন না হয় তাও মানা যেত যে, বহু দিনের প্রতিষ্ঠিত উত্তরাধিকারী সম্রাট বুঝি বা এমন অপকর্ম করে ছিলেন। মাত্র তৃতীয় শাসক সম্রাট আকবর ধর্মকে অবলম্বন করে হিন্দুত্বের জয়গান গাইতে গিয়ে নিজের ধর্মটিকে বস্তা বন্দী করে বলতে গেলে বিসর্জনই দিয়েছিলেন। তখনকার এক হিন্দু ভক্ত কবির ভাষায়,

“হেতা এক দেশ আছে নামে পঞ্চগৌড়,

সেখানে রাজত্ব করে বাদশাহ আকবর।

অর্জুনের অবতার তিনি মহামতি,

বীরত্বে তুলনাহীন জ্ঞানে বৃহষ্পতি।

ক্রেতাযুগে রামহেন অতি সযতনে

এই কলিযুগে ভুপ পালে প্রজাগণে”।

(চন্ডী মাধবাবার্য্য কর্তৃক, ১৫৭৭ খৃষ্টাব্দে রচিত বঙ্গভাষা ও সাহিত্য, ৩৭২ পৃষ্ঠা), তবু কি তার সাতকুল রক্ষা হয়েছিল?

Role of RSS in Communal Politics of India- Part I

সুদূরপ্রসারী চিন্তা শক্তির অধিকারী বাবর মোগল সাম্রাজ্যের ভিতটা গড়েছিলেন নেতিবাচক কর্মকান্ড দিয়ে এবং তার গড়া সেই নেতিবাচক কাজের পরও তার বংশধারা বহুযুগ প্রচন্ড প্রতাপে এতদঅঞ্চল শাসন করে গেল হিন্দুত্ববাদীদের নাকের ডগা দিয়ে, এরা কি এতটাই মেরূদন্ডহীন প্রাণী ছিলেন। বোধ শাক্তি কি এদের এতই ভঙ্গুর ও দুর্বল ছিল? ইসলামের প্রচার হয়েছে এভাবে যুগে যুগে অনেক শাসকের রাজ্য বিস্তারের সাথে সাথেও। ইসলাম ধর্মে জোর জবরদস্তি নিষেধ, এটা কুরআনীয় নির্দেশ। যারা এটি লংঘন করবেন তারা প্রকারান্তরে আর মুসলমানই থাকবেন না কারণ এতে কুরআনকেই অস্বীকার করা হয় এভাবে। এসব ঘটনাকে তলিয়ে দেখলে বিগত কিছু শতাব্দীর দিকে তাকালেই এই ইতিহাসের সন্ধান খুজে পাবার কথা। ইতিহাস প্রমাণ করে মুসলমানরা যুগে যুগে নিজস্ব আদর্শ দিয়ে মানুষকে জয় করার চেষ্টা করেছে, তাইতো তারা বহু যুগ অবধি ভিন দেশকে নিজের দেশ মনে করে শান্তিতে শাসন করতে পেরেছে। এরা বৃটিশের মতো দমন নীতি, পীড়ন নীতির অবতারণা করে নি, ইতিহাস তাই বলে। প্রসঙ্গতঃ শাসক শক্তিকে অবজ্ঞা করার জন্য বৃটিশেরা মুসলমানদের অবহেলা করেছে এবং এর সমূহ সুযোগ নিয়েছে হিন্দুরা। নয়তো যে দেশে মুসলমানরা কিছু আগেও শাসন ক্ষমতায় ছিল কোথায় গেল তাদের প্রভাব প্রতিপত্তি, অর্থনৈতিক ভিত্তি? একটি শক্তিধর গোষ্ঠীকে দূর্বল, অথর্ব, পঙ্গু করতে যে কি পরিমাণ নির্যাতনের প্রয়োজন, কতটুকু যে তার উপর চাপ প্রয়োগ করা হয়েছিল, এটি তারই স্বাক্ষর বহন করছে। অনেকেই কিছু সংখ্যক নামকরা নায়কদের, গায়কদের নাম উচ্চারণ করে থাকেন যে এই তো দেখো মুসলমানরা কি না করছে? দীলিপ কুমার, শাহরূখ খান, অথবা নিুবর্ণ থেকে ধর্মান্তরিত আবুল কালামের উদাহরণ এনে হাজির করেন। ওদেশে এমন তরো হাজারো কালাম, কুমার, খানদের জন্মাবার কথা ছিল কিন্তু দীলিপ কুমাররা টিকে আছেন কতটুকু অস্তিত্ব নিয়ে? কেন তার নাম পরিবর্তন করতে হলো? কেন তার পরিচয় গোপন করতে হলো, আমার বিশ্বাস ঐ মাটি তার পরিচয় টিকিয়ে রাখতে দেয় নি। তাই ওটি বদলে ফেলতে হয়েছে সাপের চামড়া খসে ফেলার মতোই। কিন্তু সাপ তো তার পরিচয় কখনো হারায় না কিন্তু দীলিপ কুমারদের সে পরিচয়টুকু নিয়ে উপরের সিড়ি পার হতে বড় বেশী বেগ পেতে হয় তাদের। তাইতো নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতে খোলসটা পাল্টাবার কথা চিন্তা করতে হয়েছে তাদের।

পবিত্র কুরআনের ভুল খুঁজতে গিয়ে নিজেই মুসলিম হয়ে গেলেন

 

(উপরোক্ত লেখাটি গত ৪ঠা মার্চ ২০০৫ তারিখ লন্ডন থেকে প্রকাশিত  সুরমাতে আসে)

.নাজমা মোস্তফা, ৬ ফেব্রুয়ারী ২০০৫।.

 

সাম্প্রতিক মন্তব্যসাম্প্রতিক সময়ে ২০১৫ সালে আখলাস নামের দাদরি হত্যাকান্ড হয় ফ্রিজে গরুর মাংস রাখার অপরাধে। অতপর ফরেনসিক রিপোর্টে জানা যায় ওটি গরুর মাংস ছিল না। তারা শুরু থেকেই প্রতিবাদ করছিলেন যে ওটি গরুর মাংস নয়। তারপরও জানে বাঁচতে পারেন নাই। তাই নিহতের মেয়ে আগেই বলেছেন, এখন যদি দেখা যায় এটি গরুর মাংস নয়, তবে কি আমাদের বাবাকে ফেরত আনা যাবে? ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ জঙ্গিবাদী সাম্প্রদায়িক সরকার কি এসবের উপর কোন কমেন্ট করবে? তার পরও হরিয়ানা রাজ্যের মূখ্যমন্ত্রী মনোহর লাল খাত্তার বলছেন, গরুর মাংস না খাওয়ার শর্তে মুসলিমরা  ভারতে থাকতে পারবে। এসব হচ্ছে হিন্দু ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ বদান্যতা। একই প্রশ্ন জমা আছে গুজরাট ঘটনার উপর। ২,০০০ মানুষ হত্যার পর দেখা গেল ওরা দোষীই নয়। তা থেকে কি ভারত কোন শিক্ষা গ্রহণ করেছে ধর্মের নামে পশুত্ব চর্চা ছাড়া আর কিছু কি তারা করছে? এই হচ্ছে তাদের একবিংশ শতকের এমন আলোময় ভুবনের কর্মকান্ড। সবাইকে স্মরণ রাখতে হবে এ যুগের দাগী সাম্প্রদায়িক আসামীর নাম ভারত।

Advertisements

Tag Cloud