Articles published in this site are copyright protected.

Archive for July, 1998

ধর্মীয় ও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা:

religion-vs-science-1একটি বিতর্কিত জিনিসের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার জবাবে আমি যুক্তির আলোকে দুটি কথা বলতে চাই। ১৬ জুন মঙ্গলবার ১৯৯৮ লং মার্চ সংখ্যার যায়যায়দিন অনলাইন কলামে জাকারিয়া স্বপনের ‘বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা কি’ বলে একটি লেখার জবাবে আমার এ লেখা। গ্রামাঞ্চলে প্রায় প্রতিটি গ্রামেই আজগুবী কান্ডকীর্তি সমৃদ্ধ ভুতুড়ে ঘটনা শোনা যায় বিশেষ করে যত অন্ধকার ঝোপঝাড় সমৃদ্ধ গ্রাম হবে তার দৌরাত্ম ততো বেশীই হয়। এ বিষয়ে লেখার উৎসাহের কারন শিশুকাল অবদি এসব ব্যাপারে আমার শিশু মনকে দারুণভাবে নাড়া দিত যার কারণে এর সূত্র খুঁজতে আমি যথেষ্ট তৎপর ছিলাম।

 

Superstitious people should be careful about the facts

 

আমাদের জনতা কল্পনা বিলাসী ও ভাবুক স্বভাবের। বেশির ভাগ মানুষ অলৌকিক, আচানক, আজগুবী গল্প কথা পছন্দ করে, ছেলেপুলে তো অবশ্যই বুড়োরা পর্যন্ত। তবে হ্যাঁ হোচট খান মাঝে মাঝে সাধারণত যুবকেরা। জনতা অজ্ঞানতা ও সংস্কারের ছোঁয়াচে প্রভাবে শিশুকাল থেকে ওই পরিবেশের কারণে নিজের বিবেক বুদ্ধিসহ সব কিছুকে জিম্মি করে রাখে। যুক্তিহীন মানুষ প্রতিটি কাজের একটি মিছে যুক্তি খুঁজে। কাক ডাকলে, পেঁচা ডাকলে অমঙ্গল। চিরুণী মাটিতে পড়লে অতিথির আগাম সংবাদ জানিয়ে যায়। খালি কলস কারো চোখে পড়লে তাও দুর্ভোগ। যাত্রার সময় পিছন থেকে ডাকতে নেই, সেটি অমঙ্গল। এসব অন্যায় সংস্কার বহু যুগ অবদি গ্রামাঞ্চলে গুরুত্ব দিয়ে মানা হয় যার আদৌ কোন যুক্তি ধোপে টিকে না। একগাদা সংস্কার ছাড়া এসব আর কিছু নয়।

শনি মঙ্গলবার যাত্রা নাস্তি। সাপ্তাহিক বা বাৎসরিক এমন কোন দিন তারিখ কি আজ অবদি পাওয়া গেছে যে এ তারিখে কোনই দুর্ঘটনা বা অমঙ্গলের কিছু ঘটবে না। এক কথায় বোকাদের বোঝাতেই এসব যুক্তিহীন সংস্কারকে লালন করা হয়। বিবরণে প্রকাশ সীমান্তবর্তী সাগর সাহার দীঘি নামে এক দীঘিতে সোনার থালা বাসন ভেসে আসতো আবার ফেরত যেত। এ ধরণের ঘটনা ফরিদপুরেও শুনেছেন লেখক। আমি সিলেট অঞ্চলের মেয়ে, এমন গল্প সিলেটেও আমি শুনেছি। এবার ঘটনার সত্যতায় আসি। গ্রামের এক থুত্থুড়ে বুড়োকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘আমরা দেখি নি তবে শুনেছি’। এবার বুঝুন এ শুনা কেয়ামত পর্যন্ত চলবে।

আরেক ঘটনা। মোটা ডালে বসে লাকড়ি ভাঙছিল ছেলেটি, তখন ডালসহ ভেঙ্গে পড়ে সে কোমর ভাঙ্গে। যে কোন কারণে এ ডাল মোটা হলেও দুর্বল অবশ্যই ছিল,  সে কারণেই ভেঙ্গে পড়েছে। সবাই বলছে এটা জ্বীনের কান্ড। সর্বযুগে মানুষ সব ঘটনার সহজ সমাধান এভাবেই খুঁজেছে। আজ কালকার প্রেশার হার্ট এটাকে মানুষ মরে। এককালে সবাই বলতো লোকটা বড় ভাগ্যবান। কোন অসুখ নেই, ঠায় ভাল মানুষ, ঠাস করে পড়ে সঙ্গে সঙ্গেই পরপার যাত্রা, কোন কষ্ট নেই। আসলে রোগের বীজ তার শরীরেই ছিল তা যাচাই করার কৌশল আমাদের জানা ছিল না।

এখানে নাসিমা নামের যে মেয়েটি বাড়ীর শ্মশান ঘাটের কাছে বাবার কাছ থেকে বাদাম পায় যদিও বাবা তাকে কিনে দেননি। তারপর দাড়িযুক্ত পায়জামা পাঞ্জাবি পরা একজন হুজুরের দেখা পায়। নাসিমা কোরআন পড়তে শিখলো অবশ্য এখন পারছে না। ঘরে নাসিমা কার সঙ্গে যেন কথা বলতো। সে পেল হাসান হোসেনের তরবারি। শিয়ারা নিয়ে যেতে চায়, তাই তরবারি উদাও হয়। তারপর বাবা পরীক্ষা করেন মেয়েকে তালের শাস খাওয়াতে। সেও জ্বীনের মাধ্যমে তালের শাস এনে খাওয়ায়। স্বপ্নে পাওয়া মহৌষধ, তার শিকড়ের চিকিৎসায় একটি মেয়ের ক্যান্সার ভাল হয়েছে। যখন ক্যান্সারের চিকিৎসা বের করতে বিজ্ঞান হিমসিম খাচ্ছে তখন গাছের শিকড় ভাল করছে কি করে? জাকারিয়া স্বপন এর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা চেয়েছেন।

নাসিমা নামের মেয়েটি নিশ্চয় কোন মানসিক রোগী। একজন অভিজ্ঞ ডাক্তার তার এসব অভিযোগের খুব সহজ সমাধান দিতে সক্ষম। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া আমার নিজের একটি ছোট গল্প বলি। মাস দুই আগে আমার দাদার বাড়ীতে এক চাঁদনি রাতে ফুটফুটে জোছনায় খুব ভাল লাগছিল আর ঘুম আসছিল না। চাচাতো বোনেরাও বাচ্চাদের নিয়ে বেড়াতে এসেছে। রাত দেড়টা দুইটার দিকে আমরা দশ বারো জনের এক কাফেলা বাচ্চাকাচ্চাসহ, এর মাঝে চার পাঁচ বছরের বাচ্চাও আছে। মিছিলের মতই যাচ্ছি। হাটতে হাটতে রাস্তার পাশের একটি সেতু অবদি যাই যার পাশেই একটি শ্মশানঘাটও বর্তমান। হঠাৎ দেখি দূরে টর্চের আলো। অবিশ্বাস্য গভীর রাতের এই কাফেলা তাও আবার শ্মশান সংলগ্ন দেখে কি ঐ ভদ্রলোকের আত্মা কেঁপে উঠেনি? এই গভীর নিশীথে এরা কারা? আমরা সেদিন এ নিয়ে অনেক জল্পনা করেছি। লোকটি যে কি পরিমাণ ভয়ে প্রস্থান করেন তা তার চলন দেখেই আমরা অনুভব করি। বাড়ীতে গিয়ে নিশ্চয় কয় গ্লাস পানি যে ভদ্রলোক খাবেন তার হিসাব করা মুশকিল। বাবারে! সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় সে কাফেলাতে জ্বীনেদের বাচ্চা কাচ্চাও ছিল আর বাচ্চা কাচ্চাগুলো আনন্দ করতে করতে এই কাফেলায় যোগ দেয়।

নাসিমাকে তার বাবার মতো যে কেউ বাদাম দিতে পারে। সম্ভবত সে বয়সেও ছোট। তাছাড়া পায়জামা পাঞ্জাবী আমাদের সমাজের লোকদেরই ড্রেস। এরকম ড্রেসের যে কোন লোকের সাথে তার দেখা হতেই পারে এতো স্বাভাবিক। কোরআনের সুরা আয়াত মুখে শেখাই মুসলমানের রেওয়াজ। সে হিসাবে এর সামান্য অংশ যে কেউ সহজেই শিখে নিতে পারে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াও। শুনে শুনেও এসব অনেক সময় শেখা হয়ে যায়। কোরআনের সুললিত ছন্দ মাধুর্য এর শেখার পেছনে এক সহায়ক শক্তি। শিয়ারা নিয়ে যাবে বলে তরবারি উদাও হয়ে যায়। শিয়ারাও মানুষ আমাদেরই ভাই। সুন্নীদের ডাকেও হাসান হোসেনের তরবারি কখনো আসবেও না। সুতরাং শিয়ার ভয়ে উধাও হওয়ার প্রশ্নই উঠে না। আর সবাই যখন নাসিমাকে নিয়ে অলৌকিক ঘটনার নায়িকা বানিয়ে দেন তখন অলক্ষ্যে নাসিমার অবচেতন মনও অলৌকিক ঘটনারই প্রকাশ ঘটাতে চাইবে, এটাও বিচিত্র নয়। কারণ তালের শাস দিয়ে বাবা নাসিমাকে পরীক্ষা করলেন যা খুবই সহজলভ্য। সম্ভবত যেটা সে পাশের গাছ থেকে কোন এক ফাঁকে তুলে এনেছে। মানসিক রোগীরা এসব করে। তিনি অবিশ্বাস্য বা কষ্টকর অসাধ্য জিনিস দিয়ে পরীক্ষা করেননি। অজপাড়াগায়ে তার মেয়ের জ্বীন তাকে আলাউদ্দিনের মিষ্টি খাওয়ায় নি, খাইয়েছে তালের শাসই। যা হোক আমার মতে এর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা খুব সহজ। যুক্তি দিয়েই তাকে খুঁজে পাওয়া সম্ভব। আর জ্বীনেদের কান্ড সম্বন্ধে যে ধারণা তা মাত্র একটি আয়াত দিয়ে এর খন্ডন করে দিচ্ছি যার স্বপক্ষে কোরআনে এই জ্বীনেদের সম্বন্ধে সুরা সাফ্ফাতের আট নয় আয়াতে আল্লাহ বলেছেন এরা দৈবের বা অলৌকিকের কোনই ক্ষমতা রাখে না। এই সব বিতাড়িত গণনাকারীদের জন্য রয়েছে নিরবিচ্ছিন্ন শাস্তি।

এই অল্প পরিসরে এক বিশাল বিতর্কিত বিষয়ের আলোচনা সম্ভব নয়। বাড পাবলিকেশন ”পুজারী দুয়ার খোল” নামে আমার একটি বই ছাপে। বইটি উপস্থিত জনতাকে অবশ্যই দিক নির্দেশনা দিতে সক্ষম তা আমার বিশ্বাস।। এতে গবেষনার আলোকে ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে এর সহজ সমাধান দেবার চেষ্টা করেছি।

স্বপ্নে পাওয়া ঔষধ আজ কোন নতুন জিনিস নয়। আমিও বর্ডারের পাশের বাসিন্দা। বর্ডার এরিয়ায় ঠিক দশ বারো বছর আগে আমি শুনেছিলাম এক মেয়ে এক অলৌকিক গাছ পেয়েছে যেখানে হুমড়ি খেয়ে পড়েছে দুই দেশের জনতা। গুজব যখন ছড়ায় তখন কিছু মানুষ অবশ্যই অতি উৎসাহী হয়ে রটনার রুটিন কাজটি করেন। আর হুজুগে কল্পনা বিলাসী কুসংস্কার আচ্ছন্ন জনতা হুজুগের বশে ছুটেই বেড়ায় এর গন্ধ শুকে শুকে। এসব প্রমাণ সবারই দৃষ্টি গোচর হয়।

মাত্র কিছু দিন আগে এক হাবিলদার মাইকে ফু দিয়ে লাখ লাখ লোকের চিকিৎসা করেন পেপারেই ছেপেছে। খোঁজ নিয়ে দেখুন তার আসল চিকিৎসায় কয়জন উপকৃত হয়েছে। তাছাড়া উনি পরের সপ্তাহে ছুটি পেলে আবার চিকিৎসা করতে আসবেন বলে কথা ছিল আর তিনি দাবী করেছিলেন এসব তুকতাক তিনি স্বপ্নে পেয়েছেন। এভাবে একজন হাবিলদার যদি সপ্তাহে লক্ষাধিক চিকিৎসা করতে পারেন তবে তো কথাই ছিলনা।

উপরের লেখাটি ১৯৯৮ সালে যায়যায়দিন বর্ষ ১৪ সংখ্যা ৪১ মঙ্গলবার ২৮ জুলাই ১৯৯৮ ১৩ শ্রাবণ ১৪০৫ তারিখে প্রকাশ করে। লেখাটি মূলত মার্চ সংখ্যার জাকারিয়া স্বপনের একটি লেখার কিছু প্রশ্নের জবাব হিসাবে লেখা হয়।

 

নাজমা মোস্তফা, ২৮ জুলাই ১৯৯৮|

Advertisements

Tag Cloud